সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
1 of 2

সুখ-দুঃখের সরণি – অনীশ দেব

সুখ-দুঃখের সরণি

চিৎকার-চেঁচামেচি ইত্যাদি রাস্তা থেকেই শুনতে পাচ্ছিলেন সুরনাথ।

মালবিকার গলা। স্বর তীব্র করে কথা বলছে অলকার সঙ্গে। সাদা কথায় ঝগড়া। কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই। কারণ বলামাত্রই ছোট চোখ বড় করে অবাক গলায় চিৎকার করেই বলবে, ‘কী বলছ, দাদা! ঝগড়া কোথায়? আমি শুধু বউদিকে বলছিলাম—।’

বাকিটা আর শোনার প্রয়োজন নেই। সুরনাথের কাছে যেটা ঝগড়া মনে হয়, মালবিকার কাছে তা কোনওমতেই ঝগড়া নয়। অল্পবয়েসে স্বামী ভানুপ্রতাপ মারা যাওয়ার পর থেকেই মালবিকা রুক্ষ হয়ে গেছে। অথচ তার আগে ওর কথাবার্তা কী সুন্দর ছিল! সুরনাথের ভালো লাগত। ভালো লাগত আর সবার।

ভানুপ্রতাপের টিটেনাস হয়েছিল। একেবারে হঠাৎ। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে মালবিকাকে বলেছিল, জুতোর শুকতলা ফুঁড়ে নাকি একটা পেরেক ঢুকে গেছে পায়ে। তারপর ডাক্তার দেখানোর গা করেনি। শুধু লাল ওষুধ লাগিয়ে সেঁক দিয়েছিল। কিন্তু দেড়দিন পরেই পা ফুলে ঢোল। ডাক্তার, হাসপাতাল। তারপর আড়াইদিনের টানাপোড়েনের পর সব শেষ। একটা বইয়ের অনেকগুলো পাতা ছিঁড়ে নিয়ে কেউ যেন আচমকা শেষের পাতাটা তুলে ধরল চোখের সামনে। সমাপ্ত।

ভানুপ্রতাপের শেষ সময়ে সুরনাথ কাছে ছিলেন। একটা প্রাইভেট নার্সিং হোমে চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছিল। চিকিৎসার যাবতীয় খরচ দিয়েছিল কোম্পানি। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। শেষশয্যায় ভানুপ্রতাপকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওঁরা তিনজনঃ সুরনাথ, মালবিকা, আর মালবিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আটবছরের রানা—রানাপ্রতাপ।

ভানুপ্রতাপ ঠোঁট নেড়েছিল, কিন্তু তাতে শব্দ ওঠেনি। ওর চোখ-মুখ দেখে সুরনাথ বুঝতে পেরেছিলেন ওর কথা। তাই মালবিকার মাথায় আশ্বাসের হাত রেখেছিলেন। চোখের জল লুকোনোর চেষ্টা করেননি। সুরনাথ নির্বোধ, সেইজন্যেই কিছু লুকিয়ে রাখতে পারেন না।

মালবিকা চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। রানা প্রথমটায় স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু হঠাৎ মা-কে কেঁদে উঠতে দেখেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল। কান্না এত সংক্রামক যে, বলার নয়।

কাঁদতে-কাঁদতেই ‘বাবা! বাবা!’ বলে কীসব বলছিল রানাপ্রতাপ। একটা কথাও বোঝা যাচ্ছিল না। তবে বালকের শোকের সুর সুরনাথের বুকে গভীর দাগ কেটে দিচ্ছিল। সম্পর্কের সুতোয় মৃত্যু বেপরোয়া টান দেয় সবসময়। বড় অবাধ্য।

অফিস আর ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি থেকে ভানুপ্রতাপের পাওনাগন্ডা বুঝে পেতে মাসছয়েক মতো লেগেছিল। তারপরই বেহালার অফিসের কোয়ার্টার ছেড়ে দিয়ে মালবিকা আর রানা চলে এসেছিল সুরনাথের কাছে। সে কি আজকের কথা!

দেখতে-দেখতে সাতাশটা বছর গড়িয়ে গেছে। এসেছে ছেলে অপরূপ, আর মেয়ে মমতা। সুরনাথ মাঝবয়েসি থেকে প্রৌঢ় এবং প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ হয়েছেন। আর অলকার সুন্দর মুখশ্রী ভরাট হতে-হতে, চিবুকে ভাঁজ পড়তে-পড়তে কখন যেন বার্ধক্য ছুঁয়ে ফেলেছে।

বাড়িতে ঢুকে সুরনাথ লাঠিতে ভর দিয়ে সবে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করেছেন, রাণুর মায়ের সঙ্গে মুখোমুখি। হাতে আবর্জনার পুঁটলি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আর-এক হাতে মাথায় ঘোমটা টেনে দিতে চেষ্টা করল রাণুর মা।

সুরনাথ হাসলেন মনে-মনেঃ রাণুর মায়ের মাসমাইনে তিনি দেন না, দেয় রানা আর অপু। তবুও এই কাজের মহিলা সুরনাথকে সমীহ করে। এ কি বয়েসের পাওনা?

অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে-উঠতে মালবিকার গলার স্বর ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছিল। বিষয়টা কী? ভাবলেন সুরনাথ। তারপর মাথা নাড়লেন। বিষয় জেনে কোনও লাভ নেই। কারণ সমাধানের পদ্ধতিটা তাঁর জানা। এ-বাড়িতে যে-সমস্যাই মাথাচাড়া দিক না কেন, দেখা গেছে তার সমাধানের পথে একমাত্র বাধা সুরনাথ। সমস্যাটা কখনও ঘরের, কখনও খাটের, কখনও টেবিলের বা বাথরুমের—অর্থাৎ, যা হোক কিছু হলেই হল। অঙ্কের উত্তর যেহেতু সবসময় জানা সেহেতু অঙ্কের ধরন-ধারণ জানার বিন্দুমাত্রও আগ্রহ আর নেই। এ যেন যে-কোনও বিষয় থেকে ঘুরে-ঘুরে সেই গরু রচনায় ফিরে আসা।

সুরনাথের মাথার তালুর কাছে সাদা চুলের আস্তানায় দুর্ভিক্ষ লেগেছে। তবু আশ্চর্য, ওই জায়গাটাই বারবার চুলকোয়। চটি ছেড়ে পাপোশে পা মুছে ঘরে ঢুকলেন। জানলার পাশে দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখলেন হাতের লাঠিটা। ঝগড়ার বিষয়টা তাঁর কানে ঢুকে পড়ছিল এবার। না, এখন অলকা নয়, অপুও নয়। মালবিকা চিৎকার করছে ছেলের সঙ্গে। রানার সঙ্গে।

‘তুই আর আমাকে শেখাতে আসিস না। দিনরাত্তির খালি তনুর কথায় নাচবি।’

‘মা! বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।’ রানাপ্রতাপ গম্ভীর গলায় বলল।

তনু—তনুশ্রী রানার বউ। তনু আবার কী করল?

‘তুই যা তো এখান থেকে। মেয়েদের কথায় থাকতে লজ্জা করে না তোর? আমার গয়না ভাঙব না গড়ব সে আমি ঠিক করব। কেন, তনুকে কি কম দেওয়া হয়েছে? জিগ্যেস কর না তোর মামিকে, কোন সাতনরী হার দিয়েছিল মমতাকে—।’

রানাই প্রথম সুরনাথকে দেখতে পেল। চুপ করে গেল বটে, কিন্তু মুখে বিরক্তির ছোঁওয়া লেগে রইল।

অলকা আলতো গলায় বলল, ‘এখন থাক, ছোড়দি—।’

মালবিকা ঠাকুর পুজোয় বসবে বোধহয়। কারণ হাতে ক’টা শিউলি আর নয়নতারা ফুল। দোতলার পিছনদিককার বারান্দায় চার-পাঁচটা ফুলগাছের টব আছে। মালবিকা তার তদারকি করে। আর মাঝে-মাঝে সুরনাথের নাতি পলাশ। রানাপ্রতাপের ছেলে। সাড়ে সাতবছর মাত্র বয়েস, কিন্তু ভীষণ চটপটে, ফুটফুটে।

এখন সকাল সবে আটটা। নভেম্বরের শেষ। বাতাসে শীতের আলপিন। সুরনাথ রোজ উষাভ্রমণে বেরোন ঠিক সাড়ে পাঁচটায়। যদি কুয়াশার আড়াল না থাকে তা হলে শুকতারাকে চিনে নেওয়া যায়। মাফলারে কান-গলা ঢেকে, পায়ে উলের মোজা পরে সুরনাথ বেরিয়ে পড়েন। কাঁপা ঠোঁটে গুনগুন গানের কলিঃ শরণাগত কিঙ্কর ভীত মনে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে…।

উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলটা গলিময়। ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে-পিছনে শুধু গলি। বড় রাস্তা খুঁজে পাওয়া ভার। নতুন কোনও লোক এ-অঞ্চলে এলে পথ হারিয়ে ফেলবেই। পাড়ার ছেলে-ছোকরারা ঠাট্টা করে বলে ভুলভুলাইয়া সরণি। তা এই ভুলভুলাইয়া সরণির এ-গলি ও-গলি করে একসময় একটা খোলা মাঠে পৌঁছে যান সুরনাথ। একটা বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ভোরের সূর্য দেখেন। তখন বাচ্চা বয়েসের কথা মনে পড়ে যায়। মাইকেলনগরে বাবার হাত ধরে ভোরবেলায় বেরোতেন রোজ। কী ভালো লাগত! বাবা হাঁটতেন আর নানা গল্প শোনাতেনঃ জন্তু-জানোয়ারের গল্প, মানুরে গল্প, আর গাছপালা নদীনালার গল্প। বাবা জরিপের কাজ করতেন, ঘুরে বেড়াতেন নানা জায়গায়। খুব ধার্মিক ছিলেন। অনুগত ছিলেন দেবদেবীর। অপ্রিয় সত্য বলতে সঙ্কোচ করতেন না।

বাবা চলে গেছেন প্রায় চার যুগ আগে। তবুও দীর্ঘকায় ঋজু মানুষটাকে সুরনাথ কখনও ভুলতে পারেন না। ফুল সাজানো খাটে তাঁর শোয়ানো মৃতদেহও ছিল টানটান। বাবা সজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু একফোঁটা চোখের জল ফেলেননি। সুরনাথ, অলকা, মালবিকা কাঁদছিল। বাবা দুর্বল স্বরে বলেছিলেন, ‘কেঁদো না। পুরোনো চলে না গেলে নতুনের জায়গা হবে কেমন করে?’ তারপর কিছুক্ষণ দম নিয়ে সুরনাথকে বলেছিলেন, ‘জ্ঞানত তোমাকে কখনও কুশিক্ষা দিইনি। কর্তব্য থেকে কখনও বিচ্যুত হবে না। মালাকে তোমার দায়িত্বে রেখে গেলাম।’

সেই বাবার শেষ কথা।

ভোরের মাঠে ছেলেরা ছুটোছুটি করে বল খেলছিল। ঘাসে হিম পড়েছে। যেখানে ঘাস নেই সেখানে পায়ে-পায়ে সামান্য ধুলো উড়ছিল। এই মাঠেই একসময় বল খেলেছে অপরূপ। ধুলো তখনও উড়েছে, কিন্তু এ-ধুলো নতুন। পুরোনো ধুলো আর নেই। পুরোনো চলে না গেলে নতুনের জায়গা হবে কেমন করে?

হাত-পা নেড়েচেড়ে ব্যায়াম করছিলেন সুরনাথ, একটা ছেলে খেলা থামিয়ে হঠাৎই তাঁকে জিগ্যেস করল, ‘দাদু, ক’টা বাজে?’

সুরনাথ সূর্যের অবস্থান দেখে অনুমান করে বললেন, ‘সাড়ে ছ’টা হবে—’

সূর্যই এখন সুরনাথের ঘড়ি।

সূর্যের দিক থেকে চোখ নামিয়ে আকাশরেখা দেখলেন। মনটাকে মাঝে-মাঝে ছুটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে ওই আকাশরেখার দিকে, যেখানে দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, যন্ত্রণা নেই—গরু রচনাও নেই।

ধীরে-ধীরে বাড়ি ফেরার পথে অদ্ভুত কতকগুলো কথা মনে হচ্ছিল সুরনাথের। দুঃখ কাকে বলে? সুখই-বা কী? আনন্দ কাকে বলে?

আজকাল এসবই মনে হয়। ছোটবেলার খেলার সাথীদের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে স্কুলের কথা। মাইকেলনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় এই এত্তটুকু। মাঠঘাট গাছপালাটাই ছিল বেশি। বকুল গাছ থেকে বকুল ফল পাড়তেন। তারপর বকুল বিচি ঘষে-ঘষে বাঁশি। সেই বাঁশির বিনিময়ে বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া যেত অনেক কিছুঃ পেনসিল কাটার কল, রঙিন ছবি, কত কী!

চুমকির কথাও মনে পড়ে। ফ্রক ছেড়ে সবে শাড়ি ধরেছে। জনার্দনস্যারের কোচিংয়ে পড়তে যেত। খুব হাসত। যে-কোনও কথাতেই হাসত। কোচিংয়েই প্রথম আলাপ হয়েছিল। তারপর নীতিন আর পরি—দু-বন্ধুর প্ররোচনায় কত না কাণ্ড করেছিলেন সুরনাথ! কাগজের বল ছোড়াছুড়ি, চুমকির প্র্যাকটিক্যাল খাতায় ছবি এঁকে দেওয়া, ওকে গল্পের বই পড়তে দেওয়া। তারপর সেই বইয়ের মধ্যে করেই একদিন চিঠি। ওঃ, কী ভয়! কী ভয়! চব্বিশ ঘণ্টা ধরে বুকের ভেতরে যেন ফুটবল খেলা চলছিল। তারপর…।

এমনি করেই কেটে গিয়েছিল কয়েক মাস। বাবা-মা আত্মীয়স্বজনকে লুকিয়ে এই খেলায় এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। তারপর হঠাৎই একদিন চুমকিরা বেড়াতে গেল বসিরহাট—ওর মাসির বাড়ি। বলেছিল, ফিরে আসবে পনেরোদিন পর। চোদ্দোদিন যেতে-না-যেতেই সুরনাথ নীতিনকে সঙ্গে করে যশোর রোডের কিনারায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন সারাদিন। প্রত্যেকটা বাস থামামাত্রই খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতেন বাস থেকে নামা যাত্রীদের। বুকের মধ্যে জোরে-জোরে শব্দ হতো। কিন্তু সেই চেনামুখ মেয়েটা নামত না। পনেরোর পর ষোলো, সতেরো…কুড়িদিন পেরিয়ে গেল।

একদিন ফিরে এল ওরা সবাই। শুধু চুমকি ছাড়া। পরে খবর পেলেন পরির কাছে। ও নাকি বসিরহাটেই থাকবে। ওখানে থেকেই পড়াশোনা করবে।

আশ্চর্য! সেদিন প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলেন সুরনাথ। একটা মাছ কেউ আচমকা তুলে ফেলেছে ডাঙায়। মাছটা ছটফট করছে, কিন্তু মরছে না কিছুতেই।

পরি আর নীতিনের কথায় একদিন বসিরহাটে গিয়েওছিলেন সুরনাথ। এলোমেলোভাবে খুঁজেছিলেন মেয়েটাকে। জানা কথাই, এভাবে ঠিকানা ছাড়া কাউকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, কিন্তু তবুও মন মানতে চায়নি। বারবারই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি হঠাৎ করে রাস্তার মাঝে দেখা হয়ে যাবে চুমকির সঙ্গে। বেনি দুলিয়ে কোচিংয়ে পড়তে যাচ্ছে।

না, দেখা হয়নি ওর সঙ্গে। ফেরার সময় সারাটা পথ মুখে রুমাল গুঁজে চোখের জল ফেলেছেন সুরনাথ। পরি আর নীতিন অনেক সান্ত্বনা দিয়েছিল। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি।

সেই সময়ে বারবারই মনে হতো আত্মহত্যার কথা। কত মানুষই তো কত দুঃখে শেষ করে দেয় নিজের জীবন। খবরের কাগজে রোজই তো থাকে কারও-না-কারওর চলে যাওয়ার খবর। কিন্তু বাবা রামায়ণ-মহাভারত পাঠ করতেন নিয়মিত। বলতেন, আত্মহত্যা মহাপাপ। সুরনাথকে সেই পাঠ শুনতে হতো। পাঠ শুনতে-শুনতে ডুরে শাড়ি পরা হারানো মেয়েটার জন্য কাঁদতেন সুরনাথ। বাবা ভাবতেন, চোখের জল দ্রৌপদীর দুঃখের জন্য, অথবা লাঞ্ছিতা সীতার জন্য।

সুরনাথ আত্মহত্যা করেননি। কিন্তু পথেঘাটে চুমকির মতো শাড়ি পরা কোনও মেয়েকে দেখলেই তাঁর বুকে হঠাৎই হাতুড়ি পড়ত। কল্পনায় ওকে দেখতে পেতেন বসিরহাটের কোনও বাড়িতে। সে-বাড়ির বাগানে দুটো বকুল গাছ। বাতাসে নড়ছে।

ধীরে-ধীরে বয়েস বেড়েছে সুরনাথের। বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। তখন নিজেকে বুঝিয়েছেন, প্রত্যেক মানুরে জীবনেই এরকম একটা ছেলেমানুষি ভালোবাসা থাকে। এর কোনও দাম নেই।

অথচ আজ কিছুদিন ধরেই চুমকির কথা খুব মনে পড়ছে। আর আত্মহত্যার কথাও। কিন্তু একজন সত্তর বছরের বৃদ্ধ আত্মহত্যা করেছে, এই খবরটা কেমন শোনাবে? বৃদ্ধদের আত্মহত্যা মানায় না। আত্মহত্যা করারও একটা বয়েস থাকে। সে-বয়েস সুরনাথ পেরিয়ে এসেছেন বহুদিন। তাই আত্মহত্যার কথা মনে হলেই সুরনাথ তাঁর সাদা বাক্স আর কালো বাক্স নিয়ে খেলতে বসে যান।

এ এক অদ্ভুত খেলা! সুরনাথের নিজের তৈরি।

সকলের জীবনেই সুখ-দুঃখের স্মৃতি থাকে। সুরনাথেরও আছে। এই স্মৃতিগুলো তিনি ভরে রেখেছেন দুটো কাল্পনিক বাক্সে। সুখের স্মৃতি রাখার বাক্সটার রং সাদা। আর দুঃখের স্মৃতিগুলো রেখেছেন কালো রঙের একটা বাক্সে। সন্দেহ নেই, কালো বাক্সটা সাদা বাক্সের চেয়ে মাপে অনেক বড়। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই বোধহয় তাই।

সুরনাথ মাঝে-মাঝেই এই বাক্সগুলো নিয়ে খেলতে বসে যান। রাতের অন্ধকারে অলকার পাশে চোখ চেয়ে শুয়ে থাকেন সুরনাথ। খেলতে থাকেন সাদা বাক্স কালো বাক্সের খেলা। এ-খেলায় অনেক সুবিধে। একা-একাই খেলা যায়। আর খেলার সময় কোনও শব্দ কিংবা হইচই হয় না।

কল্পনায় সাদা বাক্সটা কোলের ওপর তুলে নেন। তারপর বাক্সের ডালা খুলে একটা-একটা করে সুখের স্মৃতিগুলো বের করেন। সেগুলো ঘষে-মেজে ঝকঝকে করে তোলেন, যাতে কোনওদিন মলিন না হয়। এর মধ্যে রয়েছে হারানো ছেলেবেলা, মাইকেলনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চুমকি, পরি, নীতিন, বাবার হাত ধরে বেড়ানো, মায়ের আদর, অলকার সঙ্গে ফুলশয্যার রাত, ওকে নিয়ে পুরীতে বেড়িয়ে আসা দিনগুলো, মালবিকার বিয়ে, অপরূপ আর মমতার পৃথিবীতে আসা, মমতার বিয়ে, আর সবশেষে রানাপ্রতাপের ছেলে—সুরনাথের নাতি পলাশ—সবচেয়ে প্রিয় খোকাটির জন্ম।

এরকম আরও কত!

সত্যি, ভাবেন সুরনাথ, সাদা বাক্সটা বেশ বড়। সাদা বাক্সের সমস্ত অলংকার ঘষে-মেজে বাক্সে তুলে রেখে সযতনে বাক্সের ডালা আবার বন্ধ করে দেন। তারপর অন্ধকারে চোখ বোজেন।

আর তখনই কালো বাক্সটা খুলে যায় এক ঝটকায়। সুরনাথ না চাইলেও নিষ্ঠুর দুঃখের স্মৃতিগুলো একে-একে বেরিয়ে আসে, উদোম হয়ে নির্লজ্জভাবে নাচতে থাকে চোখের সামনে। চুমকির হারিয়ে যাওয়া, বাবা-মায়ের চলে যাওয়া, ভানুপ্রতাপের শেষ দিনটি, অলকার বদলে যাওয়া, রানাপ্রতাপ আর অপুর অচেনা মুখ, আর গরু রচনার সেই হতবাক বড়-বড় চোখে তাকিয়ে থাকা গরুটা।

বড় কষ্টের। সুরনাথের কালো বাক্সটা সাদা বাক্সের চেয়ে মাপে অনেক বড়, অনেক।

আজকের সাতসকালে যে-সমস্যাটা নিয়ে মালবিকা, রানা, অলকা, বা তনুশ্রী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে, সেটা বোধহয় সোনাদানার ভাগাভাগি নিয়ে। সুরনাথ জানেন, এ নিয়ে বিশদ আলোচনার পর দেখা যাবে, মমতার বিয়ের সময় অলকার কোনও একটা পরামর্শ তিনি আমল দেননি, তার জন্যই আজকের এই সমস্যা জন্ম নিয়েছে। তখন গরু রচনার হতভাগা গরুটা শূন্য চোখে হাঁ করে চেয়ে থাকবে। আর চোখে জল কাটবে। জল কাটবে।

সমস্যা থেকে দূরে থাকার জন্য যতক্ষণ পারা যায় বাড়ির বাইরে থাকেন সুরনাথ। পাড়া-প্রতিবেশীদের ফাইফরমাশ খাটেন টুকটাক। আর লাঠি হাতে ঘুরে বেড়ান, বা কারও বাড়ির রোয়াকে বসে থাকেন, সঙ্গী পেলে গল্প করেন।

নিজের প্রয়োজনের কথাটা কখনও কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারেন না। তিনি নিজে যেমন অন্যের প্রয়োজন বেশিরভাগ সময়েই অন্তর দিয়ে বুঝে নেন, ঠিক তেমনটাই আশা করেন অন্যের কাছে। আর সেইজন্যই তাঁকে বঞ্চিত হতে হয় বেশি করে।

দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের ভেতর থেকে। সয়ে গেছে, সবটাই সয়ে গেছে। এখন শুধু যাওয়ার অপেক্ষা। তাঁর শেষ শয্যায় শুধু একটা ছোট্ট মুখ দেখতে চান তিনি। পলাশের নিষ্পাপ মুখ।

ভোরবেলা স্কুলে যায় পলাশ। রানা দিয়ে আসে সাইকেলে করে। আর ছুটির সময় সুরনাথ নিয়ে আসেন ওকে। তখন অনেক গল্প করেন ওর সঙ্গে। দিলখোলা খোশগল্প।

‘দাদু, সাইকেল দু-চাকায় চলে, কিন্তু মোটরগাড়ির চার চাকা লাগে কেন?’

‘অতসব কি আমি জানি, দাদুভাই! ওসব বিজ্ঞানের ব্যাপার—।’

পলাশের সব জিনিসেই কৌতূহল। ওর প্রশ্নের কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই।

সুরনাথ ছেলেটাকে নানা গল্প শোনান। রূপকথার গল্প, জন্তু-জানোয়ারের গল্প, সুখ-দুঃখের গল্প।

বিকেলে পলাশকে নিয়ে মাঠে বেড়াতে যান সুরনাথ। ও হুটোপুটি করে খেলে। আর সুরনাথ বসে থাকেন গাছতলায়। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, মাইকেলনগরের মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর চোখের সামনে শিশু সুরনাথ খেলছে।

মাঠ থেকে ফেরার পথেও অনেক গল্প হয় দাদু-নাতিতে।

এই তো সেদিন ফেরার সময় এক দুঃখী কৃষকের গল্প শোনাচ্ছিলেন সুরনাথ, ছেলেটা ফস করে জিগ্যেস করে বসল, ‘দাদু, দুঃখ কাকে বলে?’

সুরনাথ চমকে গেলেন। চুমকির কথা মনে পড়ে গেল পলকে। কাকে বলে দুঃখ? যখন চারপাশে সবকিছু হাসিখুশি থাকা সত্ত্বেও মনটা খুশি হতে পারে না, তাকেই কি দুঃখ বলে?

সুরনাথ চুপ করে ছিলেন। জবাব দিতে পারেননি। ইদানীং এই প্রশ্নগুলো মনের কোণে উঁকি মারছে বারবার।

সুখ কাকে বলে? যে-কোনও অবস্থায় তৃিপ্ত পাওয়ার নামই কি সুখ? মনে পড়ে গেল, সেই ছেলেবেলায় খেলতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন ইট-পাথরের ওপরে। হাঁটুর কাছে মাংস উঠে গিয়েছিল। অসহ্য জ্বালা করছিল। রক্ত পড়ছিল। সুরনাথ তখন চুমকির মুখটা মনে করার চেষ্টা করছিলেন প্রাণপণে। স্পষ্ট মনে আছে, জ্বালা-যন্ত্রণা কমে গিয়েছিল পলকে। সুরনাথ সুখী হয়েছিলেন। এরকম কত রকমফের হতে পারে সুখী হওয়ার!

অনেকক্ষণ ভেবে বলেছিলেন, ‘তোমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমার খুব মন খারাপ হবে। তাকেই বলে দুঃখ।’

‘যাঃ, তুুমি আবার কোথায় যাবে!’

পলাশ সুরনাথের চলে যাওয়ার কথা মোটেই মানতে পারেনি। সুরনাথ অবাক হয়ে বালককে দেখছিলেন। এই হতভাগাটাই এখন একমাত্র পিছুটান। ওর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তের স্মৃতি জমা হয়ে যায় সুরনাথের সাদা বাক্সে। বাক্সটা মাপে বাড়তে থাকে। কিন্তু কালো বাক্সের চেয়ে বড় হতে পারে না কখনও।

সুতরাং ক’দিন পরে পলাশ যখন এসে মেলা দেখতে যাওয়ার বায়না ধরল তখন রাজি না হয়ে পারেননি। দেশবন্ধু পার্কে নাকি এক ‘ইলেকট্রনিক ফেয়ার’ শুরু হয়েছে।

রানা অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তনু সংসারের কাজকর্মের হাল ধরতে গিয়ে বেসামাল। আর মালবিকার ঠাকুরঘরই সব। অপুকেও নাকি পলাশ একবার বলেছিল। তাতে ‘কাকু’ বলেছে, ‘আজ নয়, কাল।’ ব্যস, ওই পর্যন্তই।

মেলার কথায় অনেক স্মৃতিই মনে এসে ভিড় করে। তার দু-একটা গল্প পলাশকে শোনাতেই খিলখিল করে হেসে উঠল নাতি। বলল, ‘ওসব পুরোনো খেলা না, দাদু। এসব একেবারে তাক লাগানো খেলা। দেখলে তুমি চমকে যাবে।

‘জানো, আমাদের ক্লাসের অর্ণব গিয়েছিল কাল। বলল, কম্পিউটারের খেলা আছে, টাইম মেশিনের খেলা আছে, রোবট ডিটেকটিভ আছে—সে তুমি না দেখলে বুঝবে না।’

আজকালকার যুগের অনেক কিছুই বুঝতে পারেন না সুরনাথ। এখন নাকি যন্ত্রের যুগ। যন্ত্রই মানুষকে সুখী রাখে। সুতরাং নাতিকে নিয়ে এক সন্ধেয় বেরিয়ে পড়লেন তিনি।

যে-মাঠে মেলা বসেছে, সে-মাঠটা বেশি দূরে নয়। বাসে চারটে মাত্র স্টপেজ। কিন্তু সারাটা পথ পলাশ উত্তেজনা আর রোমাঞ্চে চনমন করতে লাগল। হাত-মুখ নেড়ে কত কথা বল দাদুর সঙ্গে। মেলায় গিয়ে কী-কী করবে তার লম্বা ফিরিস্তি শুনিয়ে দিল বারবার। বাবার কাছে বায়না করে দুশো টাকা পেয়েছে পলাশ—মেলায় নানা খেলা দেখার জন্য। সে-টাকা এখন দাদুর হেফাজতে।

বাস থেকে নেমে কয়েক পা হাঁটতেই নানা রঙের আলোর হাতছানি। বিচিত্র আলোয় সাজানো যেন এক আরব্যরজনী। পলাশ দাদুকে একরকম টেনেই নিয়ে চলল।

সুরনাথ লাঠি ঠকঠকিয়ে তাল রাখতে পারছিলেন না ওর সঙ্গে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় অলকা বলেছিল, ‘ছেলেটার দিকে খেয়াল রেখো। এমন কাণ্ড কিছু কোরো না যাতে তনুর কাছে মুখ খেতে হয়—।’

সুরনাথ চুপ করেছিলেন। কথার পিঠে কথা বলে লাভ নেই। তাঁর ভাষা ওরা কেউ বুঝতে পারে না—একমাত্র হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া এই দস্যি ছেলেটা ছাড়া।

টিকিট কেটে মেলায় ঢুকে অবাক হয়ে গেলেন সুরনাথ। এ কোথায় এলেন তিনি! রূপকথার জগৎ যেন সত্যি হয়ে উঠেছে।

নিশি পাওয়া মানুষের মতো পলাশের পিছু-পিছু ঘুরে বেড়াতে লাগলেন তিনি।

টিকিট কেটে দাদুকে নিয়ে পলাশ ঢুকে পড়ল ‘কথা বলা কম্পিউটার’-এর ঘরে।

সুন্দর করে সাজানো ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা চকচকে কাচের বাক্স। তার ভেতরে বসানো রয়েছে একটা সুপারকম্পিউটার ‘ক্রে-১০’। একটা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে যে-কোনও প্রশ্ন করলেই কম্পিউটার তার ধাতব যান্ত্রিক স্বরে উত্তর দিচ্ছে। উত্তর দেওয়ার সময় তার প্যানেলের লাল-নীল-হলদে-সবুজ বাতিগুলো জ্বলছে নিভছে। সামনে টাঙানো ডিজিটাল বোর্ডে প্রশ্ন করার নির্দেশ লেখা রয়েছে।

সুরনাথ পড়লেনঃ কোনও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা চলবে না, কোনও দার্শনিক প্রশ্নও করা চলবে না। শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন। যেমনঃ ‘মেটো রেল কত ভোল্টেজে চলে?’, ‘শহিদ মিনারের উচ্চতা কত?’, ‘রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম কবিতা কী?’, ‘মিশরের পিরামিডের বয়েস কত?’ এইরকম আরও সব হরেকরকম প্রশ্ন।

পলাশের খেলার পর সুরনাথের পালা। দাদুকে পলাশ খেলাবেই। অতএব নিরুপায় সুরনাথ সুপারকম্পিউটারের সামনে ভ্যাবাচাকা হয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে লাগলেন। তাঁর বেশিরভাগ প্রশ্নই অর্থহীন—অন্তত কম্পিউটারের কাছে। ‘মানুষ এতদিন বাঁচে কেন?’ ‘সুখ কাকে বলে?’—এইরকম গোটাতিনেক প্রশ্ন করতেই কম্পিউটার যান্ত্রিক গলায় জানিয়ে দিল, ‘অর্থহীন প্রশ্ন। নির্দেশ মেনে তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন করুন।’

পলাশও বারবার বলতে লাগল, ‘কী হচ্ছে দাদু! একটা বুদ্ধির প্রশ্ন করো না!’

বুদ্ধির প্রশ্ন? সব প্রশ্ন কেবলই মাথা খাটিয়ে করতে হবে? মনের ভেতর থেকে কোনও প্রশ্ন করা যাবে না? কম্পিউটারের ক্ষমতা এতই সীমাবদ্ধ!

সুতরাং সতর্ক সুরনাথ মাথা খাটিয়ে কয়েকটা মামুলি প্রশ্ন করতে পারলেন। কম্পিউটারও দিব্যি তার উত্তর দিল।

‘কথা বলা কম্পিউটার’-এর পর ‘রোবট ডিটেকটিভ’। তারপর ‘মহাকাশের রোমাঞ্চ’। পলাশের পাল্লায় পড়ে সব খেলাই খেলতে লাগলেন সুরনাথ। খেলতে খেলতে তাঁর বয়েস যেন কমে যাচ্ছিল। খেলাগুলো সম্পর্কে ডিজিটাল বোর্ডে নানা কথা লেখাঃ ‘রোল প্লেয়িং গেম’, ‘ভারচুয়াল রিয়েলিটি’, ‘হলোগ্রাফিক গ্রাফিক্স’, আরও অদ্ভুত-অদ্ভুত সব কথা।

সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল। পলাশকে তাড়া দিতেই ও অনুনয়ের সুরে বলে উঠল, ‘ওই খেলাটাই লাস্ট, দাদু—প্লিজ।’

সুরনাথ তাকিয়ে দেখলেনঃ ‘সময় সাফারি’।

আরও কাছে এগোতেই ‘সত্যিকারের টাইম মেশিন’ কথাটাও চোখে পড়ল। টিকিট কাটার পর একজন লোক এগিয়ে এসে খেলার নিয়মকানুন জানিয়ে দিল বিশদভাবে। লোকটির সঙ্গে পলাশ ঢুকে পড়ল একটা ঘরে। তারপর পরদা টেনে দিল কে যেন।

পরদার বাইরে দাঁড়িয়ে সুরনাথ অপেক্ষা করতে লাগলেন। লক্ষ করলেন, তাঁর পিছনে যারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের প্রায় সকলেই কমবয়েসি—সুরনাথের মতো বৃদ্ধ কেউই নেই।

সুরনাথের সঙ্কোচ হচ্ছিল। নাতির সঙ্গে মেলায় এসে এ কী বিড়ম্বনা! নিজের বয়েসটার কথা ভুলে যাওয়া মোটেই ঠিক হয়নি।

আর ঠিক তখনই পরদা সরিয়ে বেরিয়ে এল পলাশ, পিছনে সেই লোকটি।

পলাশ সুরনাথের হাত চেপে ধরে উত্তেজিত গলায় বলল, ‘দাদু, কী দারুণ খেলা! ডিজনিল্যান্ড দেখলাম, ব্রাজিলের পেলের খেলা দেখলাম, আইজ্যাক নিউটনকে দেখলাম অঙ্ক করছে, সিপাহি বিদ্রোহ, আইফেল টাওয়ার—আরও কত সব জিনিস দেখলাম…।’

পরদার পাশে দাঁড়ানো লোকটি সুরনাথকে তাড়া দিয়ে ডাকল, ‘জলদি আসুন, দাদু, দেরি হয়ে যাচ্ছে—’ তার মুখ দেখে বোঝা গেল, সুরনাথকে দেখে বেশ অবাক হয়েছে।

পলাশ বলল, ‘তাড়াতাড়ি যাও, দাদু। আমি এইখানে দাঁড়িয়ে থাকব—তোমার কোনও চিন্তা নেই।’

সুরনাথ ইতস্তত করছিলেন। নিশ্চয়ই নানারকম ফিল্ম দেখিয়ে বাচ্চাদের ভুলিয়ে মুগ্ধ করার ব্যবস্থা রয়েছে ভেতরে। তবে তাঁর মতো একজন বৃদ্ধকে ওরা বোধহয় ভোলাতে পারবে না।

ভেতরে ঢুকতেই পরদা টেনে দিল লোকটি। পলাশ আড়াল হয়ে গেল। তখনই ঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখলেন সুরনাথ।

ছিমছাম সাজানো ঘর। লুকোনো আলোয় আলোময়। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা বিচিত্র চেহারার গাড়ি। গাড়িটায় কোনও চাকা নেই। গাড়ির ওপরটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ডোমে ঢাকা। গাড়িতে বসার আসন মাত্র একটাই। তবে কোনও স্টিয়ারিং নেই। তার বদলে রয়েছে একটা প্যানেল। প্যানেলের ওপরে কয়েকটা বোতাম, রঙিন বাতি, দুটো ডায়াল, আর একটা ডিজিটাল ঘড়ি রয়েছে। অন্তত সুরনাথের তাই মনে হল।

পেশাদারি সুরে লোকটি সুরনাথকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছিল।

এই গাড়িটা সাধারণ গাড়ি নয়, টাইম মেশিন। এতে চড়ে প্যানেলের ডায়াল ঘুরিয়ে অতীতে যে-সময়ে যেতে চাই তার সময়টা সেট করে দিতে হবে। আর দ্বিতীয় ডায়ালটা আসলে একটা ডিজিটাল ডিকশনারি। ইতিহাসের কোনও ঘটনা বা দ্রষ্টব্য কোনও জিনিস দেখতে চাইলে তার নাম বোতাম টিপে ফুটিয়ে তুলতে হবে ডায়ালের ওপরের ছোট পরদায়। তারপর নির্দিষ্ট কয়েকটা বোতাম টিপলেই মনের মতো দৃশ্য দেখা যাবে। তবে এই সময়-ভ্রমণ শুধুমাত্র অতীতে হতে পারে, ভবিষ্যতে নয়।

সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার পর লাল রঙের একটা ছোট্ট বোতাম ভালো করে দেখিয়ে দিল লোকটি। এই বোতাম টিপে ফিরে আসতে হবে এই ঘরে—অর্থাৎ বর্তমান সময়ে।

সুরনাথকে গাড়িতে বসতে সাহায্য করল লোকটি। তাঁর হাতের লাঠিটা রেখে দিল ঘরের এক কোণে। বৃদ্ধকে সিটে বসিয়ে বলল, ‘আপনি একটুও ভয় পাবেন না যেন। আপনি যেখানেই বেড়াতে যান না কেন, সেখানকার কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না। আর কোনওরকম অসুবিধে হলেই ওই লাল বোতামটা টিপে দেবেন, কেমন—?’

ঘরের এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল লোকটি। কী যেন একটা করল, সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের আলোর তেজ কমতে শুরু করল। অন্ধকার হয়ে আসা ঘরের এক কোণ থেকে লোকটির আবছায়া মূর্তি বলে উঠল, ‘এবারে মেশিন চালু করুন—।’

কাঁপা হাতে বোতাম টিপলেন সুরনাথ। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে। শিশুদের এই খেলায় বৃদ্ধ বয়েসে কেন নাম লেখালেন তিনি? আশঙ্কা আর রোমাঞ্চ লুকোচুরি খেলছিল তাঁর মনের মধ্যে। ঠিক তখনই আবছা অন্ধকারে একটা লেখা ফুটে উঠল তাঁর চোখের সামনেঃ ‘কোথায় বেড়াতে যেতে চান আপনি?’ সেইসঙ্গে ‘বেড়াতে’ যাওয়ার জন্য কোন-কোন বোতাম কীভাবে পরপর টিপতে হবে তারও স্পষ্ট নির্দেশ ফুটে উঠল।

দিশেহারা সুরনাথ বিয়ের পরে পুরীতে বেড়াতে যাওয়ার সময়টা বেছে নিলেন। বোতামগুলো টিপে দিলেন ঠিকঠাক। বুঝতে পারছিলেন, যন্ত্র তাঁকে কিছুতেই সেখানে নিয়ে যেতে পারবে না। বাচ্চাদের ভোলানোর জন্য ওরা নানারকম ফিল্মের ব্যবস্থা রাখে—সুরনাথের বেলা সে তো আর সম্ভব নয়…।

ঠিক তখনই অলকাকে দেখতে পেলেন। কী আশ্চর্য!

তরুণী সদ্যবিবাহিতা অলকা পড়ন্ত বিকেলে হোটেলের সমুদ্রমুখী বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হুহু সাগরিকা বাতাসে ওর চুল উড়ছে। হাতিবাগানের শ্রীমার্কেট থেকে গোলাপি সাদা ফুলকাটা একটা শাড়ি খুব পছন্দ করে কিনেছিলেন সুরনাথ। অলকা সেই শাড়িটা পরে আছে।

সুরনাথের বুকের ভেতরে কষ্ট হল। চোখ জ্বালা করতে লাগল। অলকা যদি সারাজীবন এইরকম থাকত। যদি কোনও কালো বাক্স না থাকত সুরনাথের জীবনে!

সুরনাথ একবার ডেকে উঠলেন অলকার নাম ধরেঃ ‘বউ।’ এটা সুরনাথের দেওয়া অলকার একান্ত গোপন নাম। গত দশবছরে এই নামটা কি একবারও ব্যবহার করেছেন তিনি? মনে পড়ে না।

অলকা সুরনাথের ডাক শুনতে পেল না। ওর ঠোঁট নড়ছিল। বোধহয় গান গাইছে গুনগুনিয়ে। জীবন্ত এক ছবি।

সুরনাথ আবার হাত দিলেন বোতামে। স্মৃতিপথের গোলকধাঁধায় আজ স্বেচ্ছাচারীর মতো ঘুরে বেড়াবেন তিনি। সুতরাং পর্যটক সুরনাথ ফিরে গেলেন ছেলেবেলায়।

মাইকেলনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। একেবারে চোখের সামনে। ওই তো নীতিন, পরি! টিফিনের সময়ে খেলতে বেরোচ্ছে মাঠে। মাঠের প্রান্তে পরপর কয়েকটা বকুল গাছ। সুরনাথ জানেন, খেলার শেষে ওরা বকুল ফল পাড়বে। ওরা সবাই আছে, শুধু সুরনাথ সেখানে নেই।

এরপর শুধু বোতাম টেপার খেলা।

জনার্দনস্যারের কোচিংয়ে চুমকিকে দেখতে পেলেন সুরনাথ। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। ওঃ, সেই ডুরে শাড়িটা! সারাটা জীবন ধরে এই শাড়িটার রং সুরনাথ ভুলতে পারলেন না কিছুতেই। জীবনে এক-একটা জিনিস এরকম থাকে।

চুমকিকে দেখতে-দেখতে সুরনাথ সাদা বাক্সটার কথা ভাবছিলেন। সাদা বাক্সে চুমকির অনেক স্মৃতি, অনেক গল্প। আর কালো বাক্সে চুমকির হারিয়ে যাওয়ার দুঃখ। চুমকি ছিল বলেই তো ওকে হারাতে কষ্ট হল। সাদা বাক্স থেকেই কি তা হলে কালো বাক্সের জন্ম? সাদা-কালোয় কোনও তফাত নেই?

চুমকিকে দেখার দিনগুলোয় পরপর ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সুরনাথ। ওকে গল্পের বই পড়তে দেওয়া, চিঠি দেওয়া, পুকুরপাড়ের কলাবাগানে লুকিয়ে দু-মিনিট কথা বলা।

না, চুমকির কোনও কথাই শুনতে পাচ্ছেন না সুরনাথ। আর সেইজন্যই হয়তো চুমকির ভালোবাসা-আতুর মুখের প্রতিটি খুঁটিনাটি গভীর মনোযোগে লক্ষ করতে পারছেন।

ওঃ, কী সুন্দর ছিল অতীতের এই দিনগুলো!

সুরনাথ আচ্ছন্নের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন স্মৃতিপথে। ভাবলেন, লাল বোতাম টিপে ফিরে না গেলে ক্ষতি কী! যদি থেকে যাই এই গাছপালা প্রকৃতিমাখা ছেলেবেলায়! চুমকির কাছে! তাঁর অভাব টের পাবে না কেউ। অলকা, মালবিকা, রানা, তনু, অপু, মমতা, রাণুর মা, কেউ টের পাবে না। শুধু পলাশ—।

ঠিক তখনই কচি গলায় একটা ডাক শুনতে পেলেন যেন।

‘দাদু!’ পলাশ ডাকছে!

সত্যিই কি পলাশ ডাকছে?

চুমকিকে দেখতে-দেখতেই পলাশের ডাক কানে গিয়েছিল সুরনাথের। এক অদ্ভুত টানাপোড়েন তাঁকে অস্থির করে তুলল। স্মৃতিপথে হারিয়ে যাওয়া মানুষটা অন্ধের মতো হাতড়ে-হাতড়ে ফিরে আসতে চাইল বর্তমানে। আর তখনই মনে পড়ে গেল উপেক্ষাময় জীবনের কথা, উত্তর জানা অঙ্কের কথা, গরু রচনার কথা।

লাল বোতামটার ওপরে সুরনাথের আঙুল অপেক্ষা করতে লাগল। পলাশ কি এখনও ডাকছে? আর চুমকি, নীতিন, পরি, ওরা সবাই…।

‘দাদু…।’

ছিন্নবিচ্ছিন্ন সুরনাথ গভীর শূন্য চোখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। লাল বোতামের ওপরে তাঁর আঙুল তখনও অপেক্ষা করছে…।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *