সময়েরে দিতে ফাঁকি
প্রিয়রূপ আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। কপালে তেল-সিঁদুরের তিলক এঁকে দিতে-দিতে বলল, ‘সজনী, সাবধানে থেকো।’
আড়চোখে ওর চোখের দিকে তাকালাম। জানতাম সেখানে কী দেখব। প্রিয়রূপ কান্না চাপতে চেষ্টা করছে।
ওর পাশ থেকে আমাদের ‘অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার’ ডিপার্টমেন্টের হেড গন্টিপ্রসাদ চন্দ্রশেখরন প্রিয়রূপের কাঁধে হাত রেখে আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘ডোন্ট উয়ারি, সজনী। কোনও ভয় নেই। এটা এমন কোনও মারাত্মক এক্সপেরিমেন্ট নয়। তোমার আগেও অনেকে এরকম এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্ট হয়েছে। তা ছাড়া আমাদের সঙ্গে তোমার যোগাযোগ তো থাকছেই! একটা বোতাম টিপলেই ফটাফট আমরা গিয়ে হাজির হয়ে যাব। নো প্রবলেম।’
এটা এমন কোনও মারাত্মক এক্সপেরিমেন্ট নয়। শুধু একটা সময়হীন চেম্বারে আমাকে পঁচিশ-তিরিশদিন থাকতে হবে। একা!
সময়হীন মানে, সেই চেম্বারে কোনওভাবেই সময় বোঝা যাবে না। ঘড়ি, খবরের কাগজ, রেডিয়ো, টিভি—সময় বা দিনের হিসেব পাওয়া যায় এমন কোনও কিছুই নেই সেই চেম্বারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই সময়হীন চেম্বারের নাম ‘ফ্যাসিলিটি’। ভারত ছাড়া আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড এবং জাপানে এরকম ফ্যাসিলিটি রয়েছে।
ফ্যাসিলিটি মানে পঁচিশ-বাই-পঁচিশ একটা ঘর। তাতে কোনও জানলা বা ঘুলঘুলি নেই। মানে, দিন-রাত বোঝার কোনও উপায় নেই। সবসময় ফ্লুওরেসেন্ট বাতি জ্বলছে। আমি ইচ্ছেমতো সেগুলো অন-অফ করতে পারব।
ঘরের দেওয়ালগুলো ফাঁপা—মাঝে বালি দিয়ে ঠাসা, যাতে বাইরের এককণা শব্দও ঘরে না ঢুকতে পারে। আর ঘরের উষ্ণতা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত—সবসময় পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বাঁধা।
বাতাস চলাচলের জন্যে ফ্যাসিলিটিতে ঠান্ডা বাতাসের পথ করা আছে। ফলে শ্বাসকষ্টের কোনও প্রশ্ন নেই।
এ ছাড়া আছে ঘরের লাগোয়া রান্নাঘর আর বাথরুম। রান্নাঘরে একা কোনও মানুষের রান্নার টুকিটাকি সরঞ্জাম আর রসদ রয়েছে।
ঘরে টেবিল-চেয়ার আছে। আছে রেফ্রিজারেটর, ভিডিয়ো ক্যাসেট প্লেয়ার, টেপরেকর্ডার। আর হালকা ব্যায়ামের জন্যে রয়েছে একটা আরগোমিটার।
বাইরের জগতের সঙ্গে আমার যা কিছু যোগাযোগ হবে তা সবই হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমে। আমার ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্যে ফ্যাসিলিটির বাইরে চব্বিশ ঘণ্টাই কেউ-না-কেউ হাজির থাকবে। আমার যে-কোনও দরকারে ওরা সাততাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেবে।
দু-বছর আগের একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ল। সেটা ছিল সেপ্টেম্বর মাস। একইরকম এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্ট হয়েছিল আমাদের সহকর্মী এক রিসার্চ স্কলার—গোপাল মারিমুথু। রাত তিনটের সময় ইড্লি খেতে চেয়েছিল। তখন সবার সে কী অবস্থা! গোপালকে কিছুতেই বলা সম্ভব নয় যে, এখন রাত তিনটে—ইড্লি পাওয়া যাবে না। কারণ তা হলেই ও সময় আঁচ করে ফেলবে, আর এতদিন ধরে কষ্ট করে চালানো এক্সপেরিমেন্ট গোল্লায় যাবে। তাই মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে ইড্লি জোগাড় করে গোপালকে দেওয়া হয়েছিল।
এই এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্টের খামখেয়ালিপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা খুব জটিল ব্যাপার। শুনেছি এই সময়ে সাবজেক্টের মনের অবস্থা পালটে যায়, এলোমেলো হয়ে যায়। কারও-কারও নার্ভাস ব্রেকডাউন পর্যন্ত হয়েছে। তবে সাবজেক্টের যে-কোনও ধরনের বিপর্যয়ের ইশারা পাওয়ামাত্রই ফ্যাসিলিটি থেকে তাকে বের করে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। ইশারা করার জন্যে ফ্যাসিলিটির ভেতরে নানারকম বোতাম আছে।
এই ডিপার্টমেন্টে যখন প্রথম এসেছিলাম তখন থেকেই ক্রোনোবায়োলজি—মানে, কালজীববিজ্ঞান—আমাকে ভীষণ টেনেছিল। আর টেনেছিল এই রিসার্চ গ্রুপের ডক্টর প্রিয়রূপ সিন্হারায়। প্রিয়রূপ প্রফেসর চন্দ্রশেখরনের কাছে ক্রোনোবায়োলজিতেই পিএইচ. ডি. করেছে। এখন ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। আমাদের রিসার্চ গ্রুপের সিনিয়ার রিসার্চার।
একা থাকার এই পরীক্ষায় আমার আগ্রহ থাকলেও কখনও এই পরীক্ষায় সাবজেক্ট হওয়ার সাধ জাগেনি। কারণ, একা থাকতে আমার ভালো লাগে না।
প্রিয়রূপ সেটা জানে। আরও জানে, কেন আচমকা জেদ করে এই এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্ট হওয়ার জন্যে আমি প্রফেসর চন্দ্রশেখরনের কাছে আবদার করেছি। আমার আর দোকা থাকার সাধ নেই। অন্তত কিছুুদিন আমি আমার ইচ্ছেমতো একা থাকতে চাই।
বলতে লজ্জা নেই, এই দু-বছর গবেষণা করতে-করতে কখন যেন আমি প্রিয়রূপকে নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেছিলাম। যখন ভালোবাসার ব্যাপারটা টের পেলাম, তখন ও আমার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। কিশোরী বয়েসের মতো ওকে একদিন না দেখলেই মনটা কেমন যেন আনচান করে ওঠে। গবেষণার ফাঁকে-ফাঁকে ওর ঠাট্টা-ইয়ারকি না শুনতে পেলে দিনটা বোধহয় অপূর্ণ থেকে যায়। ও যখন বলে, ‘সজনী, তোমার নামটা ফ্যানট্যাস্টিক—কিন্তু যখনই মনে পড়ে সজনী থেকে সজনে ডাঁটা ব্যাপারটা এসেছে—তারপর সেখান থেকে ডাঁটাচচ্চড়ি, তখনই কেমন লাগে।’ কিংবা ঠোঁট উলটে, চোখ কপালে তুলে, কপট হতাশায় বলে, ‘কী করি সজনী, আসে না প্রীতম—’, তখন বেশ মজা পাই। প্রিয়রূপ আবার ব্যাখ্যা করে বলে দেয়, ‘প্রীতম’ মানে এখানে হল রিসার্চের রেজাল্ট। এই কঠিন গবেষণায়, অত সহজে কখনও রেজাল্ট আসে না।
তো এইভাবেই সব চলছিল। আমি বেশ বুঝতাম, আমার এই ছত্রিশ বছর বয়েসে যা হওয়ার কথা নয় তাই হচ্ছে। জরুরি কাজে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছি, রাতে বেপরোয়া স্বপ্ন দেখছি, পাশবালিশ আঁকড়ে বিভোর হয়ে যাচ্ছি, এমনকী চেষ্টা করলে অমাবস্যাতেও বোধহয় চাঁদ দেখতে পাই, আর ডুমুর গাছে ফুল ফোটাতে পারি।
আমার ভেতরের হ্যাংলামির সঙ্গে বেশ ক’দিন ধরে দাঁত-নখ লড়াই চালালাম। তাতে লাভ কিছু হল না—উলটে প্রিয়রূপের সঙ্গে খানিকটা গায়ে-পড়া হয়েই দু-তিনটে ফিল্ম দেখে ফেললাম। কয়েক মাস আগেও বাড়িতে বসে কেব্ল টিভিতে যেসব প্রেমের দৃশ্য, গান-টান, বা ফুল ছোড়াছুড়ি দেখে হাসি পেত, এখন সেগুলোকে আর বোকা-বোকা বলে মনে হয় না।
অবশেষে একদিন বাথরুমে আয়নার সামনে লজ্জাহীনভাবে দাঁড়িয়ে আমার ছায়ার দিকে অপলকে তাকিয়ে স্বীকার করলাম, এতদিন যা হয়নি আজ তাই হয়েছেঃ আমি প্রেমে পড়েছি। এত গভীরে পতন হয়েছে যে, ওঠার আর উপায় নেই।
প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নিজের ওপরে ঘেন্না ধরে গেল আমার। ধন্য, সজনী! এই বয়েসে এই চেহারায় প্রেমের কোনও মানে হয়! বহু ব্যবহারে পুরোনো হয়ে যাওয়া রাবার স্ট্যাম্প যেমন কাগজের ওপরে ছাড়া-ছাড়া আবছা ছাপ ফ্যালে, আমার শরীরে যৌবনের দশা যেন তাই। এখানে-ওখানে যৎকিঞ্চিৎ ছাপ রয়ে গেছে। কিন্তু প্রেজেন্ট টেন্স দেখে পাস্ট টেন্সের রমরমা ব্যাপারটা বেশ টের পাওয়া যায়। সেটাই আমার অহঙ্কারের আগুনে বাতাসের ঝাপটা দিল।
বাবা চলে গেছেন কোন ছোটবেলায়। ভাই-বোন কেউ নেই। মা-কে নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছি। অভাব-অনটন আর হাড়ভাঙা খাটুনি। নিজের পড়াশোনা, একরাশ টিউশানি, আর সাংঘাতিক জেদ—এই নিয়ে বছরের-পর-বছর গড়িয়ে গেছে। মা প্রাইভেট স্কুলে সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বাংলা পড়াতেন। যে মাইনের ভাউচার সই করতেন, প্রিপ্সিপাল টাকা দিতেন তার অর্ধেক। বলতেন, বাকি টাকাটা নাকি স্কুলের ডেভেলাপমেন্টের কাজে খরচ হবে। কে জানে, কার ডেভেলাপমেন্টে টাকাগুলো খরচ হতো!
এইভাবেই দিন গড়িয়েছে, জীবন গড়িয়েছে, যৌবন গড়িয়েছে। যখন নাম-না-জানা অসংখ্য ফুল ফোটার কথা ছিল তখন ফোটেনি। হয়তো বা ফুটেছে, আমিই টের পাইনি—আমার ধরা-ছোঁওয়ার আড়ালে থেকে গেছে। তারপর যখন ধীরে-ধীরে নিরাপদ বয়েসের বেশ কাছাকাছি চলে এসেছি তখন এই অপরূপ সর্বনাশ। নাকি প্রিয়রূপ সর্বনাশ!
সেই সর্বনাশে প্রিয়রূপও সাড়া দিয়েছিল। রিসার্চে যেমন ওর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম, তার বাইরেও ব্যাপারটা একইরকম হয়ে গেল। একসঙ্গে আমরা অনেকটা সময় কাটাতে লাগলাম। রেস্তোরাঁয় চা-কফি-চপ-কাটলেট চলতে লাগল। টেবিলকে মাঝে রেখে অসংখ্য কথা এপার-ওপার হল। তারপর যা হয়!
একসঙ্গে আমরা সিনেমা দেখতে শুরু করলাম। সিনেমা কতটা ঠিকঠাক দেখেছি জানি না, তবে পাশাপাশি বসে অনেক কথা বলেছি। আর, অবশেষে, একে অপরকে ছুঁয়েছি।
যে-আমি সারাটা জীবন অচ্ছুৎ হয়ে কাটালাম সেই আমি একটু ছোঁয়াছুঁয়ির জন্যে পাগল হয়ে গেলাম। সবসময় আড়াল খুঁজতে লাগলাম।
বেশ কিছুদিন ধরেই বুঝতে পারছিলাম প্রিয়রূপ আমাকে কী একটা যেন বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। আমি ওকে অনেকবার জিগ্যেস করলাম, ‘কী হয়েছে? কিছু বলবে?’
ও চোখ নামিয়ে আলতো গলায় বলল, ‘না—কিছু না।’
‘কী ব্যাপার! বলো না কী হয়েছে!’
‘ন্-না…পরে কোনও সময় বলব।’
শেষ পর্যন্ত আমি হার মেনে গেলাম।
একদিন চন্দ্রশেখরন আমাদের রিসার্চ গ্রুপকে নিয়ে মিটিং-এ বসলেন। হিউম্যান সারকাডিয়ান রিদ্ম্স নিয়ে আলোচনা চলছিল। হঠাৎই হেড বলে বসলেন, ‘নেক্স্ট আইসোলেশান এক্সপেরিমেন্টে সজনীকে সাবজেক্ট করলে কেমন হয়! কারণ, এ পর্যন্ত আমরা কোনও মেয়েকে নিয়ে পরীক্ষা চালাতে পারিনি। সজনী আমাদের গ্রুপের একমাত্র লেডি। যদি ও রাজি থাকে…’ আমার দিকে তাকালেন চন্দ্রশেখরন, হেসে জিগ্যেস করলেন, ‘কী, সজনী, ফ্যাসিলিটিতে নিরিবিলি একমাস থাকবে না কি?’
আমি সাততাড়াতাড়ি বলেছি, ‘না, না, স্যার—আমার একা থাকতে ভীষণ ভয় করে। প্লিজ, আমাকে এ-রিকোয়েস্ট করবেন না।’
তখন মারিমুথু বলেছে, ‘তুমি রাজি হলে ভালো হতো। ইন্ডিয়াতে এখনও কোনও লেডিকে সাবজেক্ট করে এই এক্সপেরিমেন্ট হয়নি। তুমি তা হলে পাইয়োনিয়ার হতে। হিউম্যান সারকাডিয়ান রিদ্ম্স-এর রিসার্চে চিরকালের জন্যে তোমার নাম লেখা হয়ে যেত।’
আমি জানি, মারিমুথু একটুও মিথ্যে বলছে না। আমি রাজি হলে সত্যিই আমার নাম ইতিহাসে লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু আমার যে একা থাকতে ভয় করে!
আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বললাম।
তখন প্রিয়রূপ বলল, ‘সজনী, তুমি এক্ষুনি “না” বোলো না। স্যার, যেটা বলছেন সেটা একটু ভেবে দ্যাখো। দরকার হয় দু-চারদিন সময় নাও।’
প্রিয়রূপের দিকে করুণ চোখে তাকালাম আমি। ওর কথা যে আমি ফেলতে পারি না তা ও ভালো করেই জানে।
চন্দ্রশেখরন হাতের সিগারেটে টান দিয়ে নরম গলায় বললেন, ‘ও. কে. লেট মি সাজেস্ট ওয়ান থিং। সজনী, তুমি মাত্র একটা দিন ফ্যাসিলিটিতে কাটিয়ে একটা ট্রায়াল দাও। জাস্ট টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স। দ্যাখো, কেমন লাগে। ট্রায়ালের পর যদি তোমার মনে হয় তুমি পারবে না, তা হলে আমি তোমাকে আর রিকোয়েস্ট করব না।’
এরপর আর ‘না’ বলা যায়!
প্রিয়রূপ আমার চোখে তাকিয়েছিল। চোখের ভাষায় ভরসা দিয়েছিল।
আমি ওকে দেখছিলাম। আমার মনে একা থাকার ভয়টা পলকে কোথায় যেন উবে গেল। কিন্তু তখনও জানি না, এক সর্বনাশ থেকে আমি আর-এক সর্বনাশে পা দিতে চলেছি।
টাইমলেস ফ্যাসিলিটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথিকৃৎ হলেন জার্মানির দুই বিজ্ঞানী অ্যাশ্কফ ও ওয়েভার। ওঁদের পরীক্ষাতেই প্রথম জানা গিয়েছিল যে, সময়ের হিসেব জানা না থাকলেও মানুষের কোনও-কোনও ব্যাপারের ছন্দ-তাল-লয় একই থাকে। এই ছন্দ ঠিক রাখে মানুষের শরীরের ভেতরকার এক ‘রহস্যময় ঘড়ি’—যাকে জৈবঘড়ি বলা যায়। যেমন, রোজ যে-সময়ে আমরা ঘুম থেকে উঠি তা মোটামুটি একই। অর্থাৎ, এই ঘটনার পর্যায়কাল মোটামুটিভাবে চব্বিশ ঘণ্টা। এর সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টার দিন-রাত বা আলো-অন্ধকার পর্যায়কালের বেশ মিল আছে। সময়হীন চেম্বারে বাস করলে এই মিলটা আর থাকে না—পর্যায়কাল ক্রমশই চব্বিশ ঘণ্টার চেয়ে বাড়তে থাকে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ফ্রি রানিং’। তখন ঘুমোনো আর জেগে থাকার কালচক্র, মানে, স্লিপ-ওয়েক সাইক্ল, এমন হয়ে যায় যে, পর্যায়কাল বেশি হতে-হতে পঁয়তাল্লিশ ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। অ্যাশকফ আর ওয়েভার এও প্রমাণ করেছেন যে, রোজকার পারিপার্শ্বিক বা সামাজিক ঘটনাও আমাদের এমন সব সংকেত বা ইশারা জোগায় যার জন্যে চব্বিশ ঘণ্টার পর্যায়কাল ঠিকঠাক থাকে।
দেখে-শুনে এক্সপেরিমেন্টটা আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল। কিন্তু ওই যে বললাম—একা থাকার ভয়। যার জন্যে আমি এখনও মা-কে কাছ-ছাড়া করিনি। প্রিয়রূপ সেটা জানে। তাই ঠাট্টাও করে। বলে, ‘মাম্মিজ্ গার্ল।’
হেড আমাদের রিসার্চ গ্রুপের তিনজনকে বললেন ফ্যাসিলিটির ভেতরটা আমাকে যেন ভালো করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখানো হয়। বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমরা ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিং ছেড়ে ক্যাম্পাসের পিচের রাস্তায় পা দিলাম। রাস্তাটা পেরোলেই সবুজ মাঠ। তার এখানে-ওখানে লম্বা-লম্বা গাছ। গাছগুলো পাতায়-পাতায় ঢাকা। সন্ধের মুখে পাতার ফাঁকে পাখিরা খেলা করে, কিচিরমিচির করে।
দূরে-দূরে অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিং চোখে পড়ছে। ছাত্র-ছাত্রীর দল হাসাহাসি করতে-করতে এ-পথ ও-পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমার বুকের ভেতরে যে ঢেঁকির পাড় পড়ছে সেটা কেউই শুনতে পাচ্ছে না।
‘ওয়ান-রুম ফ্ল্যাট’টা ওরা আমাকে বেশ যত্ন করে দেখাল। সত্যিই ‘ফ্ল্যাট’টা পছন্দ হওয়ার মতো। কিন্তু একা এখানে থাকা যায়!
ঘর দেখতে-দেখতে প্রিয়রূপ কীসব রসিকতাও করছিল, কিন্তু সেসব ঠিকমতো আমার কানে ঢুকছিল না।
ঘরের একটা দেওয়ালে কুড়িটা পুশ বাটন্ লাগানো একটা প্যানেল ছিল। প্রিয়রূপ ভালো করে বুঝিয়ে দিল এর চারনম্বর বোতামটা টিপে কী করে বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
চারনম্বর বোতামটা টিপলেই বাইরে একটা বেল বেজে ওঠে আর ঘরে ডানদিকের দেওয়ালের গায়ে লাগানো একটা ছোট্ট দরজা খুলে যায়। দরজার পেছনেই পায়রার খোপের মতো একটা খুপরি। সেখানে আমি যদি একটা চিরকুট রেখে দিই তা হলে বাইরের পাহারাদার মানুষটি চিরকুটটা পেয়ে যাবে। তারপর আমার অনুরোধ মতো কাজ করবে।
প্রিয়রূপ বলল, ‘কোনও ভয় নেই। ফ্যাসিলিটির বাইরে চব্বিশঘণ্টা লোক থাকবে। আমরা প্রত্যেকে পালা করে ডিউটি দেব—মাথাপিছু চারঘণ্টা করে। তোমার সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা যা হবে সবই চিরকুটের মাধ্যমে। যদি তুমি চব্বিশ ঘণ্টা কমপ্লিট হওয়ার আগেই বেরিয়ে আসতে চাও, তা হলে স্রেফ একটা চিরকুট ওই পিজিয়ন হোলে রেখে দেবে। কোনও উত্তর দেওয়ার থাকলে সেটা আর-একটা চিরকুটে লিখে আমরা ওই একই খোপে রেখে দেব—তুমি পেয়ে যাবে। ব্যস—আর কোনও প্রশ্ন আছে?’
আমি এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লাম—না, নেই।
শেষ পর্যন্ত দিনক্ষণ দেখে এক শনিবার রাত আটটার সময় ফ্যাসিলিটিতে ঢুকে পড়লাম আমি।
এক কামরার ওই সুদৃশ্য ফ্ল্যাটে সবই আছে, শুধু সময় বলে কিছু নেই। আর বাইরের এককণা শব্দও ভেতরে আসতে পারছে না।
প্রথম অনেকটা সময় ফ্ল্যাটের এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করেই কেটে গেল। ফ্ল্যাটটা যিনি সাজিয়েছেন তাঁকে তারিফ করতেই হয়। ঘরের সর্বত্র রুচির ছাপ। সমস্ত আসবাবপত্রই ঝকঝকে তকতকে ফিটফাট।
হাতঘড়িটা বাইরে রেখে এসেছিলাম। ঘড়ি দেখতে পারছি না বলে প্রথম-প্রথম বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। যখন বুঝলাম সময় আঁচ করার কোনও উপায় নেই, তখন হাল ছেড়ে দিয়ে বিছানায় বসে পড়লাম। বিছানার পাশে একটা ছোট টেবিলে অনেক বই আর ম্যাগাজিন রাখা ছিল—সেগুলো টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করলাম।
কতক্ষণ বইপত্র নিয়ে ছিলাম জানি না, একসময় উঠে পড়ে একটা তাকে রাখা টেপরেকর্ডারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট চালিয়ে দিলাম। ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়…’ শুরু হল। আর একইসঙ্গে আমার মন খারাপ হওয়া শুরু হল। বাইরে এখন কে পাহারা দিচ্ছে? প্রিয়রূপ? নাকি অন্য কেউ?
সোজা চলে গেলাম দেওয়ালে লাগানো পুশ বাট্ন প্যানেলের কাছে। চার নম্বর বোতাম টিপে দিলাম। উলটোদিকের দেওয়ালে একটা ছোট্ট প্যানেল সরে গেল—একটা খুপরি দেখা গেল। টেবিল থেকে কাগজ পেন নিয়ে আমি খসখস করে ইংরেজিতে লিখলামঃ এখন ক’টা বাজে?
চিরকুটটা খুপরিতে রাখার কিছুক্ষণ পর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। বোধহয় বাইরে থেকে বোতাম টিপে দরজাটা খোলা-বন্ধ করা যায়।
একটু পরে আবার খুপরির দরজা খুলে গেল দেখি ভেতরে নীল রঙের একটা চিরকুট পড়ে আছে। ওরা বাইর থেকে উত্তর পাঠিয়েছে।
কাগজটা নিয়ে পড়ে দেখি তাতে লেখাঃ ‘ম্যাডাম, এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে প্রফেসর চন্দ্রশেখরন আমাদের সবসময় মিথ্যে বলার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন রাত বারোটা।’
এ কী রসিকতা! এটা তো সত্যিকারের এক্সপেরিমেন্ট নয়—এটা একটা খেলা! আমার ভীষণ রাগ হয়ে গেল। চিরকুটটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। তারপর সব আলো নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে রইলাম।
বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল ঘণ্টির শব্দে।
ঘুম ভাঙতেই ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। গুনগুন শব্দ তুলে এয়ার কন্ডিশনার চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘামতে শুরু করলাম। অন্ধকার যেন আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সেইসঙ্গে নিরাপত্তার অভাব ছুঁচের মতো মাথায় বিঁধতে লাগল। এভাবে একা থাকা যায় না।
ঘণ্টি আবার বাজল।
বিছানায় উঠে বসলাম। আলো জ্বাললাম। তাকালাম খুপরির দিকে।
খুপরির দরজা খোলা! তার ভেতরে একটা চিরকুট।
তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে চিরকুটটা হাতে নিলাম। তাতে সুন্দর হরফে বাংলায় লেখা।
‘এখন রাত একটা বাজে। আমি ডিউটিতে এসেছি। কেমন আছ?’
প্রিয়রূপ! ওঃ প্রিয়রূপ!
আমি পাগলের মতো একটা চিরকুট লিখতে বসলাম।
‘এখানে একা-একা আমার ভীষণ ভয় করছে। এখন কি সত্যি-সত্যি রাত একটা? বাইরে আর কে-কে আছে?’
চিরকুটে উত্তর এল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই।
‘ভয় পাওয়ার কী আছে! আমি তো আছি! এখন সত্যিই রাত একটা। বাইরে আর কেউ নেই। শুধু গাছপালা আর অন্ধকার। এ ছাড়া আকাশে কিছু তারা আছে—আর চাঁদের একটা ভাঙা টুকরো দেখা যাচ্ছে।’
আমাদের কথোপকথন চলতে লাগল।
‘ভীষণ একা-একা লাগছে।’
‘এটা একা থাকারই এক্সপেরিমেন্ট।’
‘না, এটা রিহার্সাল। আমি একা থাকতে পারব না।’
‘কোনও উপায় নেই। চন্দ্রশেখরনের অর্ডার।’
‘আমার উলটোপালটা সব কথা মনে পড়ছে।’
‘কী কথা?’
‘তোমার পাশে বসে সিনেমা দেখার কথা। সেইজন্যে একা থাকতে আরও কষ্ট হচ্ছে।’
‘আমারও।’
‘আমি আর একা থাকতে পারছি না। বাইরে বেরোতে চাই।’
‘এত রাতে বাইরে বেরিয়ে তুুমি কী করবে, কোথায় যাবে!’
‘তা হলে তুমি ভেতরে এসো।’
আমার মুখ দিয়ে ভয়ংকর শব্দগুলো বেরিয়ে গেল। লজ্জা বিসর্জন দেওয়ার পরে যেটুকু বা লজ্জা ছিল, এখন তা-ও গেল। আমি মনে-মনে তলিয়ে গেলাম। আর একটু পরে সত্যি-সত্যি।
কারণ প্রিয়রূপ কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে ফ্যাসিলিটির ভেতরে চলে এসেছিল।
পরদিন হেডকে বললাম যে, আমার পক্ষে এই আইসোলেশন এক্সপেরিমেন্টে সামিল হওয়া সম্ভব নয়। আমার সেরকম মনের জোর নেই।
গন্টিপ্রসাদ চন্দ্রশেখরন আমার কথা মেনে নিয়েছিলেন। প্রিয়রূপ আড়ালে আমার চোখে তাকিয়েছিল। ওর চোখে কেমন সরল নিষ্পাপ দৃষ্টি দেখেছিলাম। মনেই হচ্ছিল না গতকাল রাতের ব্যাপারটা সত্যি।
ফ্যাসিলিটির ওই ঘটনার পর প্রিয়রূপের মধ্যে কোনওরকম অপরাধবোধের ছায়া দেখিনি। আর আমার অপরাধবোধ হওয়া তো দূরের কথা, বরং মনে হয়েছিল ওই ব্যাপারটা পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক আর আকর্ষণীয় ঘটনা।
কিন্তু তার কয়েকদিন পর প্রিয়রূপের কয়েকটা কথা আমার সবকিছু পালটে দিয়েছিল। ভেতরটা আপাদমস্তক ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল।
ওর অনেকদিন ধরে বলতে-না-পারা কথাটা আমাকে বলেছিল প্রিয়রূপ। ও বিবাহিত। দেশের বাড়িতে ওর সংসার আছে।
রেস্তোরাঁয় বসে কথা হচ্ছিল আমাদের। ওর কথাগুলো শোনার পরমুহূর্তেই রেস্তোরাঁটা যেন পোকামাকড়ের চিড়িয়াখানা হয়ে গেল।
আমার উলটোদিকে একটা মাকড়সা বসে আছে। টেবিলের ওপরে একটা খোলস-ওঠা সাদা রঙের আরশোলা চলেফিরে বেড়াচ্ছে। টেবিলের পায়া বেয়ে একটা বাচ্চা অক্টোপাস ধীরে-ধীরে উঠে আসছে। গুবরেপোকা আর তেঁতুলবিছের দল হেঁটে বেড়াচ্ছে রেস্তোরাঁর মেঝেতে।
আমি জানি, নারী-পুরুষের মেলামেশায় বিয়ের কোনও শর্ত থাকে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রিয়রূপের কথাগুলো আমার কানে যেন অ্যাসিড ঢেলে দিল। আমার সেকেলে মধ্যবিত্ত মন হঠাৎই বিত্তহীন শূন্য হয়ে গেল। আমি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। কী বোকার মতো কাণ্ড!
হাজার সান্ত্বনাতেও আমার অবুঝ মন বাস্তবটাকে মানতে চাইল না, বুঝতে চাইল না। আসলে একটা স্বপ্ন বোধহয় আমি তিলতিল করে গড়ে তুলছিলাম। ভেবেছিলাম ওটা রাতের স্বপ্ন। এখন বুঝতে পারলাম, স্বপ্নটা রাতের নয়—দিনের।
বাড়িতে আমার রুগ্ন মা আমাকে অবুঝের মতো কাঁদতে দেখল। কাক, শালিক, চড়ুই, ও-বাড়ির ছাদের টিভি অ্যান্টেনা—সবাই আমাকে কাঁদতে দেখল। এক নাম-না-জানা কষ্টে যখন বুকের ভেতরটা প্রতিমুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল, তখন মনে হল আমি বালিকা বা কিশোরী নই—কিন্তু প্রথম ভালোবাসা হারানোর কষ্ট সব বয়েসেই সমান।
প্রথম ধাক্কাটা কেটে গেলে আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। এলোমেলো দিবাস্বপ্ন। নানান পুরুষ আসে আমার কাছে। আমার সব কথা শোনে ওরা। আমার সঙ্গে কথা বলে, আমাকে ভালোবাসে, আমাকে আদরও করে।
ওদের নিয়ে আর টেপরেকর্ডারে গান শুনে আমার সময় কাটতে লাগল। আমি ধীরে-ধীরে একা থাকতে শিখলাম। ডিপার্টমেন্টে যাওয়াটাও কিছুদিনের জন্যে অনিয়মিত হয়ে গেল।
প্রিয়রূপ আমাকে বাড়িতে ফোন করেছে অনেকবার। ওর সঙ্গে সহজভাবেই কথা বলার চেষ্টা করেছি। তবে সে-কথাবার্তায় পুরোনো উষ্ণতার অভাব ছিল। ও সেটা টের পেয়ে অনেক কথা বলল, অনেক কিছু বোঝাতে চাইল। আমি ওকে কথার মাঝে থামিয়ে দিইনি। ওর কথা শেষ করতে দিয়েছি। তারপর সহকর্মীর আন্তরিকতা গলায় ঢেলে জানতে চেয়েছি, ‘তোমার শরীর কেমন আছে?’
এরপর প্রথম সুযোগেই আমি প্রফেসর চন্দ্রশেখরনের কাছে গিয়ে আর্জি পেশ করলামঃ টাইমলেস চেম্বারের এক্সপেরিমেন্টে আমি সাবজেক্ট হতে চাই। হিউম্যান সারকাডিয়ান রিদ্ম্স-এর রিসার্চে পাইয়োনিয়ার হতে চাই।
চন্দ্রশেখরন স্বাভাবিক কারণেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই রিসার্চ গ্রুপের সবাইকে ডেকে লাখটাকার খবরটা শুনিয়ে হইহই করে তোড়জোড় শুরু করে দিলেন। প্রিয়রূপ তখন অসহায় শূন্য চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মায়ের কথা মনে পড়ছিল আমার। এই একমাস মতো সময় আমাকে ছেড়ে থাকতে মায়ের হয়তো কষ্ট হবে। কিন্তু উপায় নেই। এই সময়টা মেজোমাসিকে মায়ের কাছে এসে থাকতে বলেছি। এ ছাড়া রাতদিনের কাজের লোক তো আছেই!
ফ্যাসিলিটির দরজা বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে দেখি প্রিয়রূপ জল ভরা করুণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। আমাদের গোপন সম্পর্কটা জানাজানি হয়ে যাবে এই ভয় ওর আর নেই। ও বোধহয় বেপরোয়াভাবে আমাকে আবার ফিরে পেতে চায়। সত্যি কি তাই? নাকি আমার বোঝার ভুল?
ফ্যাসিলিটির দরজা বন্ধ হতেই আমি যেন অদ্ভুত এক শান্তি পেলাম। উপাসনা-গৃহ যেমন চুপচাপ হয় এটাও ঠিক সেইরকম। একটু সময় নিয়ে আমি মনটাকে একজন বিজ্ঞানীর মনে পালটে নিতে চাইলাম। অ্যাশ্কফ আর ওয়েভারের কথা ভাবতে শুরু করলাম।
এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে ছোটখাটো একটা প্রস্তুতিপর্ব আছে। সেই সময়ে আমাকে টানা কয়েকদিন নিয়ম করে ঘুমোতে যাওয়ার সময় ও ঘুম থেকে জেগে ওঠার সময় নোট করতে হয়। তারপর ‘সলিকর্ডার’ নামের একটা যন্ত্র দিয়ে আমার শরীরে ভেতরের উষ্ণতা, যাকে বলে ‘কোর বডি টেম্পারেচার’, প্রতি ছ’মিনিট অন্তর মাপতে হয়। এই উষ্ণতার তথ্য সরাসরি একটি কম্পিউটারের মেমোরিতে জমা হয়ে যায়।
উষ্ণতা মাপার একটা কারণ আছে। যদিও মানুষকে বলা হয় ‘হোমিওথার্ম’—মানে, স্থির উষ্ণতাবিশিষ্ট প্রাণী—তা সত্ত্বেও দেখা গেছে প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় মানুষের শরীরের উষ্ণতার দু-ডিগ্রি সেলসিয়াস মতো হেরফের হয়। দিনের মাঝামাঝি সময়ে উষ্ণতা সবচেয়ে বেশি হয়। আর যখন আমরা গভীরভাবে ঘুমিয়ে থাকি তখন উষ্ণতা সবচেয়ে কম হয়। এই উষ্ণতা-চক্রের পর্যায়কাল মোটামুটিভাবে চব্বিশ ঘণ্টা।
সময়হীন পরিবেশে থাকার সময় উষ্ণতা-চক্রের কীরকম পরিবর্তন হয় সেটা ঠিকমতো জানার জন্যে পরীক্ষার আগে, পরীক্ষার সময়, আর পরীক্ষার পরে নিয়ম করে উষ্ণতা মাপা হয়।
ফ্যাসিলিটির মধ্যে ঢোকার পর আমার জীবন থেকে সময় ব্যাপারটা একেবারে মুছে গেল। ঘুমোতে যাওয়ার তাড়া নেই, জেগে ওঠার তাড়া নেই, ইন্সটিটিউটে রওনা হওয়ার জন্যে নিত্য যে স্নান-খাওয়ার হুড়োহুড়ি তা-ও নেই। আমাকে কেউ কোনওরকম কাজের তাড়া দেবে না। কারও আদেশ পালন করতে হবে না আমাকে। কারও মন রেখেও চলতে হবে না। এ আমার একার জীবন। এ শুধু নিজের জন্যে বেঁচে থাকা!
আনমনাভাবে এসব কথা ভাবতে-ভাবতে আমি পুশ বাট্ন বসানো প্যানেলের কাছে গেলাম। প্রত্যেকটা বোতামের নীচে তার কাজের ধরন সংক্ষেপে লেখা আছে। যেমন, আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলেই একনম্বর বোতামটা টিপে দিতে হবে।
ঘুমোতে যাওয়ার আগে ছ’নম্বর বোতামটা টিপতে হবে। এরকম আরও নানারকম কাজের জন্যে নানান বোতাম। আমি বোতাম টিপলেই বাইরে বসানো ‘ইভেন্ট রেকর্ডার’ নামের একটা যন্ত্রে সেটা নিয়ম করে রেকর্ড হয়ে যাবে। একইসঙ্গে ফ্যাসিলিটির বাইরে যেসব গবেষক রয়েছেন তাঁরা বুঝতে পারবেন চেম্বারের ভেতরে আমি কী করছি। আমার প্রতিটি কাজের ওপরে তাঁরা বৈজ্ঞানিক নজরদারি করতে পারবেন।
এ ছাড়া আরও একটা কাজ আমাকে করতে হবে। সময় মাপার জন্যে দু-ঘণ্টা পার হয়েছে মনে হলেই প্যানেলের আট নম্বর বোতামটা আমাকে টিপতে হবে। আসল সময়ের সঙ্গে আমার মাপা সময় তুলনা করে বোঝা যাবে টাইমলেস চেম্বারে বসে আমি কতটা ঠিকঠাকভাবে সময় মাপতে পেরেছি।
আমার বাঁ-হাতে লাগানো রয়েছে একটা ‘অ্যাক্টিভিটি মনিটর’। এটা দিয়ে আমার সবরকম চলাফেরার তথ্য পাওয়া যাবে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার এই এক ঝকমারি। শরীরের এখানে-ওখানে যন্ত্রপাতি আর সেন্সর লাগানো অবস্থায় আমার চেহারা হয়েছে দেখার মতো।
ফ্যাসিলিটির প্রমাণ মাপের আয়নায় নিজের চেহারা দেখে আমার হাসি পেয়ে গেল। হাসিটা আমি বেশ তৃিপ্ত করে উপভোগ করলাম।
এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে স্রেফ বোতাম টেপা ছাড়া আমার আর খুব বেশি কিছু করার ছিল না। তাই গান-বাজনা শুনে, সিনেমা দেখে, শুয়ে-বসে সময় কাটাতে লাগলাম। আর মাঝে-মাঝে গল্প-উপন্যাস কিংবা ক্রোনোবায়োলজির বইপত্র নিয়ে ডুবে গেলাম। বাকি সময়টা নতুন-নতুন রান্না নিয়ে উদ্ভট সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে লাগলাম। ফ্যাসিলিটির এক্সপেরিমেন্টে যারা সাবজেক্ট হয় তাদের সাধারণত নিজের খাবারদাবার নিজেকেই রান্না করতে বলা হয়। তা না হলে নানারকম ঝামেলা হয়। ওই যে, মারিমুথু রাত তিনটের সময় ইড্লি খেতে চেয়েছিল!
আমি নিজস্ব একটা ক্যালেন্ডার তৈরি করে নিয়েছিলাম। তাতে আমার অনুমান অনুযায়ী রোজকার তারিখ, বার, সব লিখে রাখছিলাম। আমার হিসেবমতো চারদিন কেটে যাওয়ার পর আমার মন খারাপ হওয়া শুরু হল। তখন আমি মন ভালো করার রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে লাগলাম।
‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে…।’
‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে…।’
‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে…।’
অনেকক্ষণ ধরে গান শোনার পরেও যখন মন খারাপ ভাবটা পুরোপুরি গেল না তখন আমি মায়ের একটা ক্যাসেট টেপরেকর্ডারে বাজাতে শুরু করলাম।
মা নিয়মিত গীতা পাঠ করেন। তারই খানিকটা অংশ আমি ক্যাসেটে টেপ করে এনেছি। এখানে নির্জনে বসে শোনার জন্যে।
‘পূর্বে আমি কখনও ছিলাম না এমন নহে, তুমি কখনও ছিলে না তাহা নহে বা এই নৃপতিগণও ছিলেন না—ইহা সত্য নহে। এই দেহধারণের পূর্বে আমরা সকলেই নিত্য আত্মরূপে বিদ্যমান ছিলাম। এই দেহত্যাগের পরেও যে আমরা কেহ থাকিব না, ইহাও নহে। বর্তমানে দেহসত্ত্বেও আমরা নিত্য আত্মস্বরূপে বিদ্যমান আছি এবং দেহান্তে ভবিষ্যতেও নিত্য আত্মরূপে বিরাজমান থাকিব।…’
কিছুক্ষণ পর টেপরেকর্ডার বন্ধ করে দিলাম।
মন খারাপের এককণা কিন্তু থেকেই গেল। কারণ, প্রিয়রূপের ব্যাপারটা থেকে কিছুতেই আমি মনটাকে পুরোপুরি ফেরাতে পারছিলাম না।
প্রিয়রূপের লেখা অনেক চিঠি আমার কাছে আছে। রাগ, দুঃখ, অভিমানে ওগুলো কখনও আমি নষ্ট করিনি। এমনই আমার হতচ্ছাড়া মন যে, ফ্যাসিলিটিতে আসার সময় ওগুলো আমি সঙ্গে করে নিয়েও এসেছি।
চিঠির প্যাকেটটা নিয়ে আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিয়ে শুধু মাথার কাছে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিলাম। তারপর চিঠিগুলো বের করে একে-একে পড়তে শুরু করলাম।
প্রেমপত্র প্রেমপত্রই। তাতে কখনও বয়েসের ছাপ পড়ে না। যে লেখে, যাকে লেখে, তাদের বয়েস শুধুই প্রেমে পড়ার বয়েস। তাদের পরিচয় শুধুই প্রেমিক-প্রেমিকা।
চিঠিগুলো পড়তে-পড়তে আমার কান্না পেয়ে গেল। কান্না পাবে জানতামই। তবুও কেন যে দুঃখ পেতে চাইলাম!
টেবিল-ল্যাম্পের আলো আবছাভাবে ঘরের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। কেমন এক অদ্ভুত আলোছায়ায় গোটা ঘরটা ভাসছে। আমার চাপা কান্নার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ কোথাও নেই। আমার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে শেষ হয়ে যেতে লাগল। আর একইসঙ্গে একা থাকার একটা অলৌকিক ভয় আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
চিঠিগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে আমি বিছানায় আর্তভাবে ছটফট করতে লাগলাম। আমার ভাঙাচোরা কান্না কেমন জন্তুর গোঙানির মতো শোনাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ঘরের কোণে আলোছায়া মেখে দাঁড়ানো পুরুষটিকে আমার নজরে পড়ল।
কান্না থামিয়ে চমকে উঠে বসলাম বিছানায়। নজর তীক্ষ্ণ করে পুরুষটিকে দেখতে চেষ্টা করলাম।
লম্বা বেশি নয়। তবে পেশিবহুল সুপুরুষ চেহারা। সেটা গায়ের হালকা নীল জামার আড়ালেও বোঝা যাচ্ছে। নাক টিকোলো। আর চোখের নজর এতটাই তীব্র যে, অন্তর ভেদ করে যায়।
আমি সুইচ টিপে আলো জ্বালতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হাত তুলে ইশারায় বারণ করল সে। প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘আলো জ্বেলো না, সজনী। এই হালকা আলোই ঠিক আছে।’
‘কে তুমি…মানে, আপনি?’
গালে টোল ফেলে হাসল তরুণ, বলল, ‘আপনি নয়, তুমি। আমি কে সেটা একটু আলাপ করলেই বুঝতে পারবে। আমার নাম…ধরে নাও রূপক।’
কথা বলতে-বলতে রূপক এগিয়ে আসতে লাগল আমার বিছানার কাছে। আলতো গলায় বলল, ‘তুমি কাঁদছ কেন? কীসের দুঃখ তোমার? আমি তোমার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেব।’
রূপক আমাকে অবাক করে দিল।
ফ্যাসিলিটির ভেতরে ও কেমন করে এল? ও নিশ্চয়ই আগে থেকেই এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল! নাকি পরে কায়দা করে এর ভেতরে ঢুকে পড়েছে? কিন্তু বাইরে তো গোপাল-প্রিয়রূপের দল অতন্দ্র পাহারায় রয়েছে!
আমি অবাক হয়ে তখনও রূপকের রহস্য ভাবছি, রূপক কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর ছোঁয়ায় কোনওরকম সঙ্কোচ, দ্বিধা বা আড়ষ্টতা নেই। আর আমিও কেন যেন বাধা দিতে পারলাম না!
তারপর রূপক আমাকে চুমু খেল। বিড়বিড় করে আমার নাম বলতে লাগল বারবার, আর নামপিছু যেখানে-সেখানে একটা করে চুমু।
আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও রোমাঞ্চিত হতে লাগলাম। আমার শরীরের যৌবনের তলানিটুকু আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল। যেন নির্বিষ সাপ অনেকদিন পর ছোবল মারা বিষ ফিরে পেয়েছে।
আনন্দে উত্তেজনায় আমি ভেসে গেলাম। ভুলে গেলাম প্রিয়রূপের দুঃখ, যে-বিছানা একটু আগেই কান্নায় ভেসে যাচ্ছিল এখন সেখানে আনন্দের বন্যা। সময়হীন ফ্যাসিলিটির ভেতরে যে এরকম সুযোগ-সুবিধে আছে সে-কথা কে জানত!
রূপককে নিয়ে আমার গোপন সংসার চলতে লাগল।
আমার যখন রান্নাবান্না বা কাপড়কাচার কাজ থাকে তখন রূপক আসে না। যখন আমি এক্সপেরিমেন্টের নানান ডেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকি তখনও ও আসে না। যখন আমি অলসভাবে অবসর সময় কাটাই তখনই ও আসে—প্রবলভাবে আসে।
আমার ক্যালেন্ডারের হিসেবমতো ঠিক পাঁচদিন পর রূপক চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘সজনী, এবার ফেরার পালা। আমি যাই?’
আমার কান্না পেয়ে গেল। ওকে আঁকড়ে ধরে বললাম, ‘আমাকে একা ছেড়ে যেয়ো না। একা থাকতে আমার ভীষণ ভয় করে।’
ও বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘কিছু করার নেই—আমাকে যেতেই হবে।…তবে আবার আমি আসব…।’
‘কবে?’
‘জানি না। হয়তো অন্য চেহারায়…অন্য নামে।’
রূপ চলে গেল। কোথায় গেল জানি না।
কিন্তু একদিন পরেই ও আবার ফিরে এল। হয়তো ঠিক ও নয়—ওরই মতো কেউ। ওর চেয়ে অনেক লম্বা, আরও ফরসা, তবে স্বাস্থ্য রূপকের মতোই—একেবারে ফেটে পড়ছে।
আমি তখন ওয়াশিং মেশিনে কাপড় কাচার পাট শেষ করে শাওয়ার খুলে স্নান করব বলে তৈরি হচ্ছি।
হঠাৎই প্রিয়রূপের কথা মনে পড়ে আমার কান্না পেয়ে যাচ্ছিল—ঠিক তখনই নতুন পুরুষটিকে আমি দেখতে পেলাম। আরব্যরজনীর গল্পের মতো হুস করে কখন যেন স্নানঘরে এসে হাজির হয়েছে।
‘কে তুমি!’ অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
উত্তরে আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। কানের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি প্রিয়ব্রত। তোমাকে ভালোবাসতে এসেছি। তোমার কান্না মুছিয়ে দিতে এসেছি।’
প্রিয়ব্রত আমার ঘাড়ের কাছে চুমু খেল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই স্নানঘরে জলের ঝরনার নীচে আমাদের ভালোবাসার গান শুরু হয়ে গেল।
রূপকের মতোই বেশ কয়েকটা দিন সুন্দরভাবে কেটে গেল প্রিয়ব্রতর সঙ্গে। আমার অবসর সময়ে ও দেখা দিতে লাগল। বাকি সময়টা—আমি যখন বিজ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম—প্রিয়ব্রত আমার কাছে আসত না। আনাচেকানাচে কোথায় লুকিয়ে থাকত কে জানে!
একদিন প্রিয়ব্রত চলে গেল।
কিন্তু তার পরই আমার একা থাকার দুঃখ ভোলাতে এল স্বরূপ।
তারপর—স্বরূপের পরে—এল সুপ্রিয়।
ওদের এই নিয়মিত আসা-যাওয়ায় আমার মনটা অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। নানান ভুল হচ্ছিল এক্সপেরিমেন্টের কাজে। বাইরের গবেষকরা যে বেশ বিরক্ত হয়ে উঠছেন সেটা ওঁদের পাঠানো চিরকুট পড়েই বুঝতে পারছিলাম।
ওঁদের আমি রূপকের কথা বলিনি। বলিনি যে, ফ্যাসিলিটির ভেতরে আমি একা নই। আমার সঙ্গে চার-চারজন সুপুরুষ যুবক—রূপক, প্রিয়ব্রত, স্বরূপ আর সুপ্রিয়—এখানে লুকিয়ে রয়েছে।
আমার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ফ্যাসিলিটিতে আমার বাইশদিন কেটেছে। হেড বলেছিলেন আমাকে অন্তত একমাস একা থাকতে হবে। তখন একটা মাস অনেক লম্বা সময় বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন—ওরা চারজন আসার পর—মনে হচ্ছে একমাসের বদলে একবছর হলেও বা ক্ষতি কী!
কিন্তু না। আমার রিসার্চ গ্রুপের পণ্ডিতরা বোধহয় আমার ওপরে আর ভরসা করতে পারলেন না। বাইশদিন শেষ হতেই ওঁরা আমাকে ফ্যাসিলিটি থেকে বেরিয়ে আসতে বললেন।
বাইরে আসার পর ওঁরা আমাকে তারিখ জিগ্যেস করলেন। আমি বললাম, ২৬ মে। ওরা জানালেন, না, ৮ জুন। আমার জীবনের তেরোটা দিন আমি হারিয়ে ফেলেছি! অবশ্য এটা বোঝার কোনওরকম উপায় ছিল না। ‘আমার’ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমি ওঁদের যে-দিন জানিয়েছি, ওঁরা আমাকে ঠিক সেইদিনের খবরের কাগজ নিয়মিত পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আমাকে ডিপার্টমেন্টে নিয়ে গিয়ে ওঁরা নানান প্রশ্ন করছিলেন। আমার কাছ থেকে সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে যাবতীয় ডেটা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছিলেন। গন্টিপ্রসাদ চন্দ্রশেখরন বললেন, ‘সজনী, তুমি তো বেশ রোগা হয়ে গেছ দেখছি! হাউ ডু য়ু ফিল?’
আমি শুকনো হেসে বললাম, ‘আই অ্যাম ও. কে., স্যার।’
ওজন নিয়ে দেখা গেল আমার ওজন পাঁচ কেজি কমেছে। ফ্যাসিলিটির ভেতরে ‘আমার একদিন’ গড়ে ছিল প্রায় ছেচল্লিশ ঘণ্টা! কিন্তু টেম্পারেচার সাইক্ল মোটামুটি চব্বিশ ঘণ্টাই ছিল। ফলে স্লিপ-ওয়েক সাইক্ল আর টেম্পারেচার সাইক্ল ডিসিনক্রোনাইজ্ড হয়ে গিয়েছিল। অথচ আমার মেয়েলি ব্যাপারটা আটাশ দিন পরই হয়েছে। ‘আমার’ আটাশ দিন নয়, সত্যিকারের আটাশ দিন।
দু-দিন ধরে চলল এইসব পরীক্ষার ধকল। তার মধ্যে মা-কে একবার দেখতে গিয়েছিলাম। আর প্রিয়রূপের অসংখ্য প্রশ্ন আর কথার জবাবে কয়েকটা মাত্র ‘হুঁ’ ‘হাঁ’ করেছি। ওর কথা আমার তেমন করে আর মনে পড়ছে না।
চারদিনের দিন আমাদের রিসার্চ গ্রুপের মিটিং বসল।
আমাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে নতুন কী-কী জানা গেল তা নিয়ে টেকনিক্যাল ডিসকাশন হল। প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতামত জানাচ্ছিলেন। আমার সাহস আর নিষ্ঠা নিয়ে চন্দ্রশেখরন এক লম্বা বক্তৃতা দিলেন। তারপর আমাকে পনেরোদিনের ছুটি উপহার দিলেন।
প্রিয়রূপ আমার সাতকাহন প্রশংসা করার পর বলল, ‘ইতিহাসে সজনীর নাম লেখা থাকবে তা নয়। সজনী হ্যাজ বিকাম হিস্ট্রি। আর আমি আরও প্রশংসা করব ওর মনের জোরের। ফ্যাসিলিটি থেকে বেরিয়ে আসার পর ও যেরকম নির্লিপ্ত শান্ত রয়েছে, তা সত্যিই আশ্চর্যের। আমার ধারণা অন্য কেউ হলে এতদিন পর মানুষের সঙ্গ পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বাসে টগবগ করে ফুটত। ও যে পঁয়তিরিশটা দিন ওই টাইমলেস চেম্বারে একা কাটিয়েছে, এ-কথা নিশ্চয়ই আপনারা ভুলে যাবেন না!’
প্রিয়রূপ একটা হাত তুলে হাসিমুখে আমাকে বোধহয় অভিনন্দন জানাতে যাচ্ছিল। অন্য কেউ-কেউ সবে হাততালি দিতে শুরু করেছেন। ঠিক তখনই আমি অবাক হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ইশারায় সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ফ্যাসিলিটিতে আমি তো একা ছিলাম না!’
মিটিং রুমের ভেতরে আকাশ ভেঙে পড়ল।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বিশাল টেবিল ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলোর মুখে পলকে বিস্ময় জায়গা করে নিল।
আমি ওঁদের রূপক, প্রিয়ব্রত, স্বরূপ আর সুপ্রিয়র কথা বললাম। বললাম, ওদের সঙ্গে আমি কীভাবে সময় কাটিয়েছি।
প্রিয়রূপের মুখ ফ্যাকাসে বিবর্ণ হয়ে গেল। চন্দ্রশেখরন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় ধমকের সুরে বললেন, ‘কীসব আবোল-তাবোল বকছ, সজনী! স্টপ অল দিজ ননসেন্স!’
প্রিয়রূপ আর্তগলায় আমার নাম ধরে ডেকে উঠল।
আমি ওদের প্রতিক্রিয়ায় কোনওরকম ভ্রূক্ষেপ না করে রূপকদের কথা আবার বললাম। বললাম, ওরা এখনও ফ্যাসিলিটিতে রয়েছে। আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। আমি আবার ওখানে ফিরে যেতে চাই—আর কোনওদিন ওই টাইমলেস চেম্বার থেকে বেরোতে চাই না। কারণ, বাইরের চেয়ে ভেতরটা অনেক ভালো।
প্রিয়রূপের মুখ ভেঙেচুরে গেল। ও কেঁদে ফেলল। চেয়ার ছেড়ে প্রায় ছুটে চলে এল আমার কাছে। একটা হাত চেপে ধরে ডুকরে উঠল, ‘সজনী! সজনী! কী হয়েছে তোমার!’
আমি প্রিয়রূপকে টের পেলাম না। একই কথা বারবার বলে চললাম।
চন্দ্রশেখরন কপালে হাত চাপড়ে বলে উঠলেন, ‘মাই গড! ওর দেখছি মেন্টাল ব্রেকডাউন হয়ে গেছে। গোপাল, তুমি এক্ষুনি সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে প্রফেসর রাওকে ফোন করো। বলো, একবার আমাদের ডিপার্টমেন্টে চলে আসতে। দিস ইজ অ্যান ইমার্জেন্সি।
গোপাল টেলিফোনের দিকে ছুটে গেল। অন্য সকলে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ঘিরে ধরলেন আমাকে। একটা হইহই শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু কোনও কিছুই আমার মনে দাগ কাটছিল না। আমি ওই চারজন সুপুরুষের কথা ভাবছিলাম। ফ্যাসিলিটির ভেতরে ছায়া-ঘেরা আনাচেকানাচে ওরা কী আকাঙ্ক্ষা নিয়েই না আমার জন্যে অপেক্ষা করছে!
তাই অবাক হয়ে চন্দ্রশেখরনের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় আমি বললাম, ‘স্যার, আপনারা এরকম করছেন কেন! আমার কিচ্ছু হয়নি।’
প্রিয়রূপ আর সইতে পারল না। আমার পাশেই একটা চেয়ারে বসে পড়ে টেবিলে মাথা এলিয়ে দিল। তারপর ফুলে-ফুলে কাঁদতে লাগল।
ঘরের কোনও কিছুই আমার মনে কোনওরকম আঁচড় কাটছিল না।
