ভালোবাসা নাও, হারিয়ে যেও না – ৪

চম্পকের সঙ্গে হলদিয়া গিয়ে আমি তিন–চারদিন আটকে গেলুম।

ইন্টারভিউ বোর্ডে চম্পকের চেনা বেরিয়ে গেল একজন। ওর জামাইবাবুর বন্ধু। চম্পক যদি ঘুণাক্ষরেও জানত যে অরবিন্দ রায় মাত্র কয়েক মাস আগে এই মাল্টি–ন্যাশনাল কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন তাহলে ও আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে ফেলতে পারত। অরবিন্দ রায় ওদের বাড়িতে বেশ কয়েকবার এসেছেন ব্যাডমিন্টন খেলতে। চম্পকদের বাড়ির উঠোনে প্রত্যেক বছর নেট টাঙানো হয়।

ইন্টারভিউ দিতে ঢুকে চম্পক দারুণ চমকে উঠেছিল, কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ করেনি। ইন্টারভিউ বোর্ডে নিজের মামা থাকলেও তাকে মামা বলে না ডেকে স্যার বলতে হয়।

মোটামুটি উত্তর ভালোই দিয়েছে চম্পক, শুধু দুটো প্রশ্নের বেলায় একটু থতমত খেয়েছিল। তখন অরবিন্দ রায়ই উদারভাবে বলেছিলেন, অল রাইট, অল রাইট, দ্যাট উইল ডু!

সুতরাং চম্পক ধরেই নিয়েছিল যে চাকরি হয়ে গেছে। ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় লাফায় আর কি!

উচ্ছ্বাস একটু কমবার পর চম্পক বলল, এখন সবচেয়ে জরুরি কাজটা কী জানিস? এখানে একটা সুবিধেমতন থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা। পোস্টিং তো হবে এখানেই। এরা কোয়ার্টার দিতে পারবে না আগেই বলে দিয়েছে।

আমি বললুম, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা কবে দেবে, এখন না ছ’মাস বাদে, সেই পাকা খবরটা নে আগে।

–আরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সামনের মাস থেকেই। ওরাই তো জিজ্ঞেস করল, আমি এক্ষুনি জয়েন করতে রাজি আছি কি না! অরবিন্দ রায় যখন আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখ দিয়ে হাসি ফুটে বেরুচ্ছিল!

–চম্পক, আমি তো শুনেছি, কার কার চাকরি হবে তা আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকে। ইন্টারভিউটা একটা ফার্স।

–সে তোদের গভর্নমেন্ট অফিসে হয়। এসব বিলিতি কোম্পানিতে ওসব চলে না। তাছাড়া আমি অরবিন্দ রায়ের সঙ্গে ব্যাডমিন্টনে সিঙ্গল্স খেলেছি, তুই জানিস? আমার জামাইবাবু, মানে প্রকাশদার বুজুম ফ্রেন্ড।

তবু সন্ধের পর আমরা কোম্পানির গেস্ট হাউস খুঁজে বার করে অরবিন্দ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম।

দু’পাশে ব্যর্থ বাগান–চেষ্টা, মাঝখানে সুদর্শন দোতলা বাড়ি, সব কটি ঘরেই আলো জ্বলছে। বাংলোতে ঢোকার সময়েই আমার কেয়ারটেকার বা দারোয়ানের কথা মনে পড়ে। সেরকম কেউ নেই, আমরা গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লুম।

সামনের বারান্দায় আমাদেরই বয়েসী একজন যুবক চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছে। মফস্বলের দিকে এরকমই হয়। এরা সন্ধেবেলা কাগজ পড়ে। আমাদের দেখে যুবকটি মুখ তুলে বলল, কী চাই?

আমরা আমাদের মনোবাঞ্ছা জানালুম। যুবকটি বলল, মিঃ এ কে রায়? হ্যাঁ, তিনি আছেন ঘরে, কিন্তু এখন তো দেখা হবে না।

আমরা বললুম, আমাদের বিশেষ দরকার আছে।

যুবকটি রূঢ় বা অভদ্র নয়। বরং একটু গূঢ়ভাবে হেসে কিছু যেন একটা বোঝাবার চেষ্টা করে বলল, এখন দেখা করার মুশকিল আছে।

চম্পক এবারে জোর দিয়ে বলল, আপনি গিয়ে বলুন, ওঁর বন্ধু প্রকাশবাবুর কাছ থেকে এসেছি। প্রকাশ মজুমদার শিবপুরের প্রফেসার

লোকটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে গেল। একতলাতেই অরবিন্দ রায়ের ঘর, সেখানে আরো লোকজন আছে বোঝা যায়।

একটু বাদে অরবিন্দ রায় বেরিয়ে এলেন পাজামা পাঞ্জাবি পরে। বেশ সুপুরুষ। বিলেত–ফেরৎ অফিসারদের মতন মুখের ভাব। কিন্তু তিনি একটি অদ্ভুত ব্যবহার করলেন। প্রথমে চম্পকের মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী খবর?

আমি বললুম, আমি চম্পকের বন্ধু, ওর সঙ্গে এসেছি।

এবারে তিনি চম্পকের দিকে ফিরে অধীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার?

চম্পক আকাশ থেকে পড়ল। উনি তাকে চিনতে পারছেন না। চম্পক চট করে একবার তাকাল আমার দিকে। তারপর ম্রিয়মাণ ভাবে বলল, প্রকাশ মজুমদার আমার জামাইবাবু হন, আপনার বন্ধু…

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা তো বুঝলুম। এখানে কী ব্যাপার?

–আজ দুপুরে আমি একটা ইন্টারভিউ দিয়েছি আপনাদের কোম্পানিতে….

—ইন্টারভিউ? আজ দুপুরে…

হঠাৎ চুপ করে গিয়ে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কী রকম যেন একটা অপ্রস্তুত ভাব।

সেই দীর্ঘশ্বাসটিতে আমি বিলিতি মদের গন্ধ পেলুম। বিলিতি কোম্পানির বড় অফিসার, সন্ধের পর মদ্যপান করবেন সহকর্মী বা বন্ধুদের সঙ্গে, এতে আর আশ্চর্যের কী আছে? সেজন্য ইনি লজ্জা লজ্জা ভাব করছেন কেন?

প্রায় মিনিট খানেক চুপচাপ থেকে তারপর অরবিন্দ রায় বললেন,

তুমি ইন্টারভিউ দিচ্ছ, সে কথা প্রকাশ তো আমায় কিছু জানায়নি। ঠিক আছে, তুমি কাল সকালে একবার দেখা করো আমার সঙ্গে…ও না, না, কাল সকালে তো সময় হবে না, ওয়ার্কশপ ইনস্পেকশান আছে কাল দুপুরে… পর পর দুটো মিটিং, তুমি বিকেলবেলা দেখা করো, এখানে ঠিক সাড়ে পাঁচটার সময়। আচ্ছা?

এই বলেই অরবিন্দ রায় পেছন ফিরলেন। আমি আর চম্পক নেমে পড়লুম সিঁড়ি দিয়ে। গেটের কাছে পৌঁছেছি, তখন অরবিন্দ রায় আবার ডেকে বললেন, এই “যে, ইয়ে, শোনো, তোমার নামটাই তো জানা হয়নি।

চম্পক ফিরে দাঁড়িয়ে নিজের নাম বলল।

–তোমরা উঠেছ কোথায়? তোমার বন্ধুটি কিলোক্যাল?

–না, আমরা দু’জনেই কলকাতা থেকে এসেছি, দুর্গাচকের একটা হোটেলে উঠেছি।

–কাল বিকেল পর্যন্ত থাকলে শুধু শুধু তোমাদের হোটেল খরচ হবে। এক কাজ করতে পার… এখানে তো সম্ভব নয়, আমাদের আর একটা গেস্ট হাউস আছে, সেখানে উঠতে পার, আমি বলে দিচ্ছি…।

অরবিন্দ রায়ের চরিত্রটি যে বেশ বিচিত্র তা বলতেই হবে। চম্পকের সঙ্গে উনি একাধিকবার ব্যাডমিন্টন খেলেছেন, তবু ইন্টারভিউ বোর্ডে বসে তিনি ওকে চিনতে পারেনি। এ রকম হয় নাকি? আমাদের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু’মিনিট কথা বলে উনি বিদায় করে দিতে চাইছিলেন, তারপর আবার অযাচিত ভাবেই থাকার জায়গা ঠিক করে দিলেন!

কেয়ারটেকার যুবকটি আমাদের দ্বিতীয় গেস্ট হাউসে পৌঁছে দিল। এটা একটু নিরেশ ধরনের। জনতা টাইপ। চ্যাপ্টা ধরনের বাড়ি, খান দশেক ঘর। বোধ হয় কোম্পানির হেড অফিস থেকে কেরানি–টেরানিরা এলে এটাতে ওঠে।

কিন্তু আমাদের হোটেলের ঘরটি একেবারেই বুক–চাপা, জানলা দিয়ে কিছুই দেখা যায় না।। সেই তুলনায় এখানে আলো–হাওয়া আছে। রাত্তিরেই আমরা হোটেল ছেড়ে চলে এলুম এখানে। এখানকার ক্যান্টিনে মাংস–ভাত বেশ সস্তা। অতিরিক্ত ঝোল চাইলে তার সঙ্গে দু’–এক টুকরো আলুও দেয় বেশ উদারভাবে।

পরদিন বিকেলে অরবিন্দ রায়ের কাছে আমি আর যেতে চাইলুম না। চাকরির খোঁজখবরের ব্যাপারে কোনো বন্ধুকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ঠিক সঙ্গত নয় বোধহয়।

চম্পককে বুঝিয়ে একা পাঠিয়ে আমি বেড়াতে লাগলুম হলদি নদীর ধারে। এখানে খেয়া নৌকো চলে। অনেকেই ওপারে যাচ্ছে। খেয়া নৌকো দেখলেই আমার অন্য পারে যেতে ইচ্ছে করে। অন্ধকার নামবার আগে চম্পক ফিরে এলে একবার ওপারটা ঘুরে আসতে হবে!

…রোমির মতন মেয়ে, যাদের দেখলেই মনে হয়, অন্য অনেকের স্তুতি পাবার জন্যই এরা জন্মেছে, তাদেরও জীবনে সমস্যা থাকে? কেন থাকবে না? কোথায় যেন পড়েছিলুম, সুন্দরী মেয়েরা কখনো সুখী হয় না। ক্লিয়োপেট্রাকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল…

না–না, এসব আমি বাজে কথা ভাবছি। রফিকের কথার কোনো গুরুত্ব দেওয়া যায় না। রফিক অত্যন্ত সুখী ছেলে, আলমারির তলায় একটা ইঁদুর মরে পচা গন্ধ বেরুলে সেটাই ওর জীবনে একটা বিরাট সমস্যা! রোমি এই পৃথিবীর মাটি থেকে এক ইঞ্চি ওপরে হাঁটবে, ও কোনোদিন নোংরা কিছু দেখবে না, ওর জন্য এই পৃথিবী আর একটু সুন্দর হবে।

আমি জানি, রোমির সঙ্গে কোনোদিন আমার অন্তরঙ্গতা হবে না, কোনোদিন আমরা নিরালায় মুখোমুখি বসে ভুল বোঝাবুঝিগুলো শুধরে নেব না। ভালোবাসা তাকেই বলে যখন একজন আরেক জনের কথা ভাবলেই বুকটা সম্পূর্ণ খালি হয়ে যায় শুধু তাকেই জায়গা দেবার জন্য।

রোমির প্রতি আমার যেটা হয়েছে সেটা চোখের ঘোর, কিংবা সুন্দরের বন্দনাও বলা যেতে পারে। ওসব দূর থেকেই ভালো। সুন্দরের বেশি কাছে যেতে নেই।

টাটকা হাওয়া মুখে ভরে নিয়ে কুলকুচি করতে করতে এক সময় আমি আপন মনে বকে উঠলুম, কি হে, নীললোহিত চন্দর, খুব যে একলা একলা নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সুন্দরী মেয়ের ধ্যান করা হচ্ছে! জীবনে কি আর কিছু নেই? কতদিন আর এই রকম গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াবে? কোনো দায়িত্ব নিতে হবে না! কথায় বলে, কাঁধে একটা দায়িত্বের জোয়াল না চাপলে ছেলেরা ঠিক পুরুষমানুষ হয়ে ওঠে না!

ভেতর থেকে আমার অলটার ইগো উত্তর দিল, দ্যাখো বাপু, বেশি উপদেশ ঝেড়ো না! সবাইকেই যে চাকরি–বাকরি, ব্যাবসা–বাণিজ্য, জীবনের উন্নতি, সামাজিক কর্তব্য এই সব নিয়ে মেতে থাকতে হবে তার কি কোনো মানে আছে! দু’চারটে থাক না একটু ছন্নছাড়া! তারা নিয়মের বিরুদ্ধে চলুক, তা হলেই ব্যালান্স ঠিক থাকবে।

–এটা হলো ফাঁকির কথা। পলায়নপন্থীর যুক্তি!

–পলায়ন পন্থাটা কি সব সময় খারাপ নাকি? মনে করো, উদাসীনতা। সেটাও তো বাস্তব অবস্থা থেকে পলায়ন। সেটাকে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে দিতে চাও? তাহলে তো পৃথিবীর অর্ধেক দর্শন আর কবিতাই বরবাদ হয়ে যাবে?

—ফরগেট ইট! তুমি দার্শনিকও নয়, কবিও নয়। তুমি হচ্ছো একটা রোমান্টিকতার ফাঁপা মানুষ!

–গালাগাল দেওয়া খুব সোজা। আজকাল সবাই সবাইকে মওকা পেলেই এক হাত নিয়ে নিচ্ছে। আমি একটা সোজা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। একটি সুন্দর সৃষ্টি, একটি বাইশ বছরের নারী, আমি যার কোনোদিন হাতটাও ছুঁয়ে দেখব না—শুধু মনে মনে যদি আমি তার কথা চিন্তা করে, অর্থাৎ দিবাস্বপ্ন দেখে আনন্দ পাই তাতে দোষের কী আছে?

–সেই সময়টা তুমি আরো ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারতে!

—কাজ! একটা সত্যি কথা বলব! আজকাল যে যত বেশি কাজ করছে, সে ততই পৃথিবীটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে!

—অদ্ভুত বোকার মতন কথা!

—বোকাই তো, আমি একটা বোকা। ধুরন্ধরদের নিয়েই তো যত বিপদ। মনে করো, একজন বড় বৈজ্ঞানিক, তাঁর খুব বুদ্ধি। ঠিক তো? কিন্তু সেই বৈজ্ঞানিকের বুদ্ধি দিয়ে কী হয়? মানুষ মারার নতুন নতুন অস্ত্র তৈরি হয়!

–তোমার সঙ্গে কোনো কথাই বলা যায় না!

–বলো না!

–বাঃ! তোমাকে একটু অবসর দিলেই তো তুমি অমনি সেই রোমি নামের মেয়েটাকে নিয়ে ধ্যান শুরু করবে!

–রোমি, রোমি, আমি তোমাকে পরিত্যাগ করলুম। বিদেশী বাতাস এসে তোমাকে নিয়ে চলে যাবে আমি জানি!

এক ঘণ্টা বাদে ফিরে এলো চম্পক। চোখমুখ খুবই উজ্জ্বল। চাকরি পাওয়া সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিন্ত। অরবিন্দ রায় ডেফিনিট কথা দিয়েছেন। মিনিট পনেরো ধরে অরবিন্দ রায়ের প্রতিটি সংলাপ আমার কাছে দু’বার ধরে পুনরুক্তি করার পর চম্পক হঠাৎ থেমে গেল।

আমার ডান বাহু ধরে, গাঢ়ভাবে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে চম্পক বলল, এখন সব কিছু তোর ওপর নির্ভর করছে। তোর সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে!

চম্পক যদি চাকরি পেয়ে গিয়েই থাকে, তা হলে তারপর আর কী জরুরি কথা থাকতে পারে আমার সঙ্গে? সারা জীবনটাই কি ও জরুরি অবস্থায় কাটিয়ে যাবে?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললুম, আমার সাহায্য? কী ব্যাপার, বল্!

–দ্যাখ নীলু, আমি মোটেই ইনকনসিডারেট নই। আমার চাকরির ইন্টারভিউ, তুই এমনি এমনি আমার সঙ্গে এসেছিস, কটা বন্ধু এ রকম আসে?

–তুই তো আমার বাস ভাড়া দিয়েছিস, হোটেল খরচ দিচ্ছিস, তা হলে আসব না কেন? সবাই আসবে!

—না রে, নীলু, না! বাস ভাড়া, হোটেল খরচ ছাড়াও সময়ের একটা দাম নেই? অন্য কে নিজের কাজ ফেলে আসবে! তাছাড়া আমি জানি তো, অনেকেই এইসব ব্যাপারে খুব হিংসে করে। সেদিন দেখলি না বরুণ তোকে ভাঙিয়ে পাটনায় নিয়ে যেতে চাইছিল।

—আমি কি এম. এল. এ. যে আমাকে অন্য কেউ ভাঙিয়ে নেবে? তুই কী জরুরি কথা বলবি বলছিলি?

—হ্যাঁ, সেটাই তো মোস্ট ইমপর্টান্ট! অরবিন্দ রায় যখন বললেন যে আমার চাকরিটা হবেই তখন আমি ওঁর কাছে অন্য একটা কথা পাড়লুম। অবশ্য তোর কাছ থেকে অনুমতি নিইনি, অনেকটা নিজের দায়িত্বেই।

—আমার অনুমতি?

–আমি অরবিন্দদাকে বললুম, কাল আমার যে বন্ধুকে দেখেছিলেন, কলকাতা থেকে আমার সঙ্গে এসেছে, ওরও কোনো চাকরিবাকরি নেই, আপনি ওর জন্যও যদি একটা ব্যবস্থা করে দেন…

–তুই, তুই চম্পক আমার চাকরির জন্য ভিক্ষে চাইলি?

–আরে চটে যাচ্ছিস কেন? ভিক্ষে মোটেই নয়। অরবিন্দদা আমার সঙ্গে খুব ফ্রেণ্ডলি ভাবে গল্প করছিলেন, আমায় চা খাওয়ালেন। তোর সম্পর্কে খুব ইন্টারেস্টেড। তুই আমার সঙ্গে এসেছিস শুনে বললেন, আজকাল কি কোনো বন্ধু অন্য বন্ধুর জন্য এতটা করে? তাতেই আমি কথায় কথায় বললুম, আপনি যদি আমার বন্ধুর জন্যও একটা চাকরি করে দেন!

—উনি কী বললেন?

–একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জানতে চাইলেন তোর কোয়ালিফিকেশন।

—আমার তো কোয়ালিফিকেশান কিছুই নেই।

–শোন না তারপর কী হলো! অরবিন্দদা খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেন, হ্যাঁ, ওর জন্য একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, একটা পোস্ট খালি আছে, তার জন্য বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়নি। তোর কি ভাগ্য বল তো নীলু!

—তুই কি পাগল হয়েছিস চম্পক? দরখাস্ত করিনি, কিছু না, এমনি এমনি কেউ চাকরি দিতে চাইলেই বা আমি নেব কেন? আমার তো এইটাই একমাত্র অহঙ্কার, কেউ কিছু দিতে চাইলেও আমি চট করে নিতে রাজি হই না। সে আমার যতই অভাব থাক্ …

–শোন, নীলু, তোর ওপরেই আমার হলদিয়ার চাকরিটা নির্ভর করছে।

—তার মানে?

অরবিন্দদা তোকে কী চাকরি দিতে চাইলেন, তুই তো সেটা শুনলিই না।

—যেটা আমি নিতে চাই না, সেটার কথা আমি শুনেই বা কী করব?

—শুনলেই তুই নিতে চাইবি। আমরা এখন যে বড় গেস্ট হাউসটায় আছি, সেটার জন্য একজন কেয়ারটেকার দরকার। সেই পোস্টটাই খালি আছে।

—কেয়ারটেকার?

—ডেজিগনেশানটাই শুনতে তেমন কিছু নয়, কিন্তু মাইনে খারাপ না। স্টার্টিং প্রায় আমারই সমান। ইয়ে, মানে, তোর তো কোনো টেকনিক্যাল কোয়ালিফিকেশন নেই! আমি অরবিন্দদাকে বললুম, আমার ঐ বন্ধু খুব সিনসিয়ার আর হার্ড ওয়ার্কিং…

—ক্যারেকটার সার্টিফিকেটের ভাষায় কথা বলা বন্ধ কর তো! তুই কি ভেবেছিস, এই চাকরির কথা শুনে আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠব?

–আমরা দুজন একই জায়গায় থাকব, নীলু বুঝতে পারছিস না, এটা একটা কত বড় সুযোগ! আজকাল চাকরির জন্য স্বামী–স্ত্রীকেও আলাদা আলাদা থাকতে হয়, আমার দিদিদেরই দেখ না, জামাইবাবু শিবপুরে আর দিদি নর্থবেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে…।

–কলকাতা ছেড়ে আমি হলদিয়াতে থাকব? ভাগ্‌!

— স্বার্থপরের মতন কথা বলিস না, নীলু। তুই না থাকতে চাইলে আমারও থাকা হবে না। আমরা যে গেস্ট হাউসে উঠেছি, ওটার জন্যই একজন কেয়ারটেকার দরকার। ভেবে দ্যাখ, তুই ঐ চাকরিটা নিলে আমিও ওখানেই পার্মানেন্ট বোর্ডার হয়ে থাকব, আমাকে আর বাড়ি–ফাড়ি খুঁজতে হবে ….

আমি কথা থামিয়ে চম্পকের দিকে চেয়ে রইলুম। স্বার্থপরতা কার, আমার? আমি ঐ গেস্ট হাউসের বাজার সরকারের চাকরি নিলে চম্পক ওখানে আরামে থাকবে, ওকে আর বাড়ি খুঁজতে হবে না।

অবশ্য চম্পকও বলতে পারে যে এই বাজারে কেউ কোনো চাকরি পায় না। চম্পকই তো উদ্যোগ করে আমার জন্য একটা কিছু ব্যবস্থা করেছে।

চম্পক আবার বলল, তোর থাকা খাওয়া ফ্রি। তা হলেই বুঝে দ্যাখ নীলু, তোর কত টাকা বেঁচে যাচ্ছে। এই সব চাকরিতে মাইনে খুব বেশি না হলেও লাভ বেশি। মাইনে বেশি হলে তো ইনকাম ট্যাক্সই সব কেটে নেবে।

আমার চোখের সামনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। গেস্ট হাউসের বারান্দায় আমি সন্ধেবেলা বসে চা খাচ্ছি আর সদ্য–আসা খবরের কাগজে চোখ বুলোচ্ছি, এমন সময় একজন গেস্ট এসে বলল, এই যে ভাই, আমার বাথরুমের ফ্ল্যাসটা কাজ করছে না, একটা কিছু ব্যবস্থা করুন! আর একজন বলল, কী ব্যাপার মশাই, সাতবার চেয়ে চেয়ে এক কাপ চা পাই না আর নিজে তো দিব্যি চা প্যাঁদাচ্ছেন…এই যে দাদা, বিছানায় কি স্পেশাল সাইজের ছারপোকা ছেড়ে দিয়েছেন? একে তো মশার জ্বালায় ঘুমোতে পারি না… কেয়ারটেকার ভাই, আপনার কাছে ছিপি–ওপনার আছে? বরফ পাওয়া যাবে? আলাদা টাকা দিচ্ছি, ইলিশ মাছ এনে একটু স্পেশাল করে ভাজিয়ে আমাদের ঘরে পাঠিয়ে দিন না…

এখান থেকে পালাতে হবে।

চম্পক এবারে কলকাতার নিন্দে শুরু করে দিল। কলকাতায় কি মানুষ থাকে? বাতাস এত পলিউটেড যে প্রতিটি নিশ্বাসেই বিষ। সী–পোর্ট, এয়ারপোর্ট দুটোই প্রায় বাতিল হয়ে গেছে, কলকাতার আর আছে কী? পশ্চিমবাংলার ভবিষ্যৎ এখন হলদিয়াতে। আর এক দশকের মধ্যেই কলকাতা একেবারে ডেড সিটি হয়ে যাবে, ততদিনে শুধু শিল্প–বাণিজ্য নয়, আর্ট অ্যাণ্ড কালচারের সেণ্টারও হবে এই হলদিয়া। বুঝলি, নীলু?

আমি প্রতিবাদ না করে ঘাড় নেড়ে যেতে লাগলুম।

কলকাতার অবস্থা এখন কাদায় পড়ে যাওয়া হাতির মতন। ব্যাঙেও লাথি মেরে যেতে পারে। তবু মরা–হাতি লাখ টাকা।

চম্পক বলল, দ্যাখ তো, এখানকার বাতাস কত টাটকা। ফ্রেস মাছ পাওয়া যায় নদী থেকে। এখানকার মানুষজনও খুব ফ্রেগুলি। আমরা যে দু’দিন এখানে আছি, এর মধ্যে একজনের কাছ থেকে অভদ্র ব্যবহার পেয়েছি?

রাত্তিরেই চম্পক আমাকে দিয়ে একটা অ্যাপলিকেশন লেখাল। সকালে ঐ দরখাস্ত হাতে নিয়ে অরবিন্দ রায়ের সঙ্গে অফিসে দেখা করতে হবে।

সারারাত চম্পকের পাশেই খাটে আমি ঠায় জেগে রইলুম। আমাকে একটা ফাঁদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। যে–কেউ শুনলেই বলবে, সে কি নীলু, এমন লোভনীয় কাজ তুমি নিতে চাইছ না? খাওয়া–থাকা ফ্রি, তাছাড়া মাইনে পাবে, উপরন্তু প্রত্যেক দিনের বাজার খরচ থেকে কিছু মারতেও পার…

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লুম। চম্পকের ফিঁচ্ ফিচ করে নাক ডাকছে। দু’ লাইন একটা চিঠি লিখে চম্পকের মাথার কাছে রেখে দিলুম, তারপর ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে।

সাড়ে পাঁচটার সময় একটা বাস ছাড়ে। সেই বাসে খানিকটা আসার পর মন বদল করে নেমে পড়লুম কোলাঘাটে। কলকাতাকে আমি এত বেশি কিছু ভালোবাসি না যে এক্ষুনি ফিরতে হবে। দেউলটিতে আমার এক বন্ধু আছে, সেখানে দু’–একটা দিন থেকে গেলে মন্দ কী!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *