পিকনিকে তিনটে বিকেল
কয়েকটা ঝোপঝাড় সরিয়ে বেরিয়ে এল বিকাশ। চোখ-মুখ যেন কীরকম, চুল ছড়িয়ে গেছে কপালে। অসহায়ভাবে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে নমিতাকে দেখতে পেল। দেখে যেন ভরসা পেল। চটপট ওর কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘আমার সঙ্গে চল, তোকে একটা দারুণ জিনিস দেখাব।’
নমিতা খালি পায়ে ঘাসের ওপরে হাঁটছিল। দুপুরের রোদ নিস্তেজ হয়ে বিকেল এসে পড়েছে। সেইসঙ্গে ঠান্ডা বাতাস বুঝিয়ে দিচ্ছে এখন শীতের সময়। পিছনে একটু দূরে অপর্ণা, সুজিত, সমীর, নিখিল, কেয়া, মিমি, সিতি ওরা সব গাছতলায় বসে তাস খেলছে, টেপরেকর্ডার চালিয়ে ব়্যাপ শুনছে। ওদের কাছ থেকে একটু দূরে একটা সবুজ বেডকভার পেতে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে অরুণ। ওর নাকি জ্বর-জ্বর লাগছে।
নমিতার কিছু ভালো লাগছিল না। তাই এপাশটায় এসে একা-একা পায়চারি করছিল। গঙ্গা এখান থেকে অনেক দূরে, দেখা যায় না। তবে ‘নদীর কাছাকাছি আছি’ ভাবলেই মনটা কেমন হয়ে যায়। অন্তত নমিতার হয়।
বিকাশ ওর খুব কাছে এসে বলল, কী রে, কথা বল—নাকি পাত্তাই দিবি না?
নমিতা মুখ তুলে বিকাশকে ভালো করে দেখল। হায় রে আমার সহপাঠী! পাত্তা দিলে তারপর যখন পাত্তা পাও তখন কেন নিজেকে সংযত করো না!
বিকাশ এমনিতে একটু গায়ে-পড়া বোধহয়। নাকি শুধু নমিতার জন্যই গায়ে পড়া? সামান্য ছুতো পেলেই বলে, নে, হ্যান্ডশেক কর।
নমিতা এড়িয়ে যায়। বলে, এসব আমি ভালোবাসি না।
বিকাশ আবার বলল, সত্যি বলছি, নমি। চল, তোকে একটা দারুণ জিনিস দেখাব—তুই লাইফে কখনও দেখিসনি।
নমিতার কৌতূহল হচ্ছিল। কিন্তু ওই ‘নমি’ শব্দটা এক অদ্ভুত বিরক্তি ছড়িয়ে দিল মনে। শুধু নামটা সংক্ষিপ্ত করে ডাকলেই কি দূরত্ব সংক্ষিপ্ত হয়!
পিকনিকের প্রস্তাবে নমিতা প্রথমটায় রাজি হয়নি। কিন্তু ক্লাসের বন্ধুদের উৎসাহে শেষ পর্যন্ত আর আপত্তি বজায় থাকেনি। তার ওপর নিখিল আবার বলেছিল, দ্যাখো বস, এটাই রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে আমাদের লাস্ট ইয়ার। তারপর কে কোথায় চাকরি-বাকরি নিয়ে চলে যাবে, কার কোথায় ম্যারেজ-ফ্যারেজ হয়ে যাবে—শালা, ঝট করে স্টুডেন্ট থেকে এক্স স্টুডেন্ট হয়ে যাব। না, এই লাস্ট পিকনিক—যেতে তোমাকে হবেই।
নিখিলকে নমিতার খারাপ লাগে না। সত্যিই বন্ধু। ইয়ারকি ফাজলামির সুযোগে কখনও অসভ্যতা করে না।
ক্লাসরুমে ওদের জটলার মধ্যে কখন যেন সমীর নমিতার ঠিক ঘাড়ের ওপর এসে দাঁড়িয়েছিল। পিঠের কাছে সামান্য ছোঁয়া পেয়েই চাবুকের মতো ঘুরে তাকিয়েছে নমিতাঃ অ্যাই, তুই আগে আমার ঘাড়ের কাছ থেকে সরে দাঁড়া।
সমীর খানিকটা অপ্রস্তুত হওয়ার ভান করে বলল, কেন, আমি কী করলাম? পিকনিকের ব্যাপারে তোর ওপিনিয়ানটা শুনতে এসেছিলাম শুধু…।
নিখিল চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বলল, সমীর, আর কতদিন তোকে মাইরি বারণ করব! সবসময় দেখি তুই নমিতার গায়ের ওপরে ঝুঁকে না পড়ে কোনও কথা বলতে পারিস না। তুই কি শালা ম্যাগনেট যে, নমিতার ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মধ্যে ঢুকে পড়লেই ঢলে পড়িস?
সমীর সরে গিয়ে ইতস্তত করে কী যেন বলছিল বিড়বিড় করে। নমিতাই নিখিলকে বাধা দিল, ওসব বাদ দে। কাজের কথা বল।
তো সকলে মিলে চেঁচামেচি হইহই করে আলোচনা হল ‘কাজের কথা’। পিকনিক হবে। আগামী রবিবার—ছাব্বিশে ডিসেম্বর। স্পট ভদ্রেশ্বর। মিমি আর সুজিত ভদ্রেশ্বরে থাকে। ওরাই সব খোঁজখবর করে ঠিক করে রাখবে। কার নাকি একটা বিশাল বাগান আছে—সেটাই আইডিয়াল স্পট হবে পিকনিকের।
পিকনিকে আসার জন্য অরুণও অনেকবার বলেছিল নমিতাকে। ডিপার্টমেন্টের তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল ওরা দুজনে। কাছাকাছি আর কেউ ছিল না।
তুই চল। তুই না গেলে আমিও যাব না।
নমিতা অবাক হয়ে হেসেছিলঃ এরকম খ্যাপামির মানে?
তুই কি সবসময়েই শুধু মানে জানতে চাইবি? তা হলে তো আমাকে লেখাপড়া ছেড়ে তোর জন্যে একট মোটাসোটা মানেবই লিখতে হয়।
নমিতা সামান্য নীচু গলায় বলেছিল, অরুণ, এই কয়েকটা বছর আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করছি। আর ক’টা মাস মাত্র বাকি। সহজভাবে এ ক’টা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায় না?
অরুণ মাথা নামিয়ে বলেছে, আমি পারছি না। সবসময় যে তোর কথাই মনে পড়ে।
অন্য কথা ভাব, তা হলে আর মনে পড়বে না।
তুই কোনও ব্যাপারই সিরিয়াসলি নিস না কেন বল তো?
নমিতা অরুণের দিকে তাকাল। কিন্তু আশ্চর্য, ওর চোখ লম্বা বারান্দায় দাঁড়ানো অরুণকে দেখতে পেল না। বরং বাইরের লন থেকে বেড়ে ওঠা কদম গাছ, রাধাচূড়া আর বুলবুলি দেখল। বিকেলের রোদ কয়েকটা বিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে এসে ওদের চুমু খাচ্ছে।
নমিতা একটু চুপ করে থেকে বলল, যেটা সিরিয়াসলি নেওয়ার সেটা সিরিয়াসলি নিই। অন্য কেউ সিরিয়াস বলে বোঝাবে তারপর সেটা সিরিয়াসলি নেব—এসব থিয়োরিতে আমি বিশ্বাস করি না।
কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইল অরুণ। বারান্দায় এখন ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। অফ পিরিয়ডে ছেলেমেয়েরা এখানে ভিড় করে, গল্পগুজব করে। আর অনেক সময় কেউ-কেউ টিফিন খায়। যেমন মিমি আর সুজিত রোজই এই বারান্দার চওড়া রেলিঙে টিফিন বাক্স রেখে ভাগাভাগি করে টিফিন খায়।
একটা ফোঁস শব্দ করে পকেট থেকে একটা ক্যাডবেরি চকোলেট বের করল অরুণ। বলল ছোট্ট করে, তোর জন্যে এনেছি।
নমিতা হাত বাড়াল না। এটা নেওয়াই যায়। কিন্তু ও জানে, নেওয়া মানেই এর একটা ভুল অর্থ খুঁজবে অরুণ। আচ্ছা, এক ক্লাসে পড়া মানেই একটা প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপার থাকতে হবে! জোড় বাঁধতে হবে! শুধু সহপাঠী হয়ে দিনগুলো কাটানো যায় না?
নমিতা জানে অরুণ ব্যথা পাবে, তবু বলল, হঠাৎ ক্যাডবেরি দিচ্ছিস?
অরুণের ফরসা মুখ লাল হল। কোনওরকমে বলল, ঠিক আছে, নিস না।
এ-কথা বলেই চকোলেটটা ও ছুড়ে ফেলে দিল নীচের লনে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে হনহন করে হাঁটা দিল, নমিতার কাছ থেকে দূরে চলে গেল।
নমিতা ভেবেছিল অরুণ বোধহয় পিকনিকে যাবে না, কিন্তু রবিবার সকালে অরুণ এল। হাওড়া স্টেশনের বড় ঘড়ির নীচে ওরা পাঁচজন দাঁড়িয়েছিল। মিমি আর সুজিতের আসার কোনও ব্যাপার নেই। ওরা পিকনিক স্পটে গিয়ে ভোরবেলা থেকেই আয়োজন শুরু করে দেবে। আর কেয়া শ্রীরামপুরে থাকে। ও বলেছে আমি আর উলটোদিকে আসব না, সোজা সুজিতদের বাড়ি চলে যাব। তারপর স্পটে দেখা হবে।
সিতিকণ্ঠ তখন ফোড়ন কেটেছিল, হ্যাঁ, সেই ভালো, গাছপালা ঘেরা উপবনে দেখা হবে ভালোবাসা বেদনায়।
সুজিতের সম্পর্কে কেয়ার একটু দুর্বলতার ব্যাপার আছে। সেটা সবাই জানে, কিন্তু কিছু করার নেই। সিতিটা একটু ঠোঁট কাটা। ঘড়ির নীচে দাঁড়িয়ে ফস করে বলে বসল, অ্যাই, যদি মিমির আজকে জ্বর-টর হয়, যেতে না পারে, তা হলে কেয়া তো গোল করে দেবে।
অন্য অনেকে হেসে উঠল, কিন্তু নমিতা হাসতে পারল না। মানুষের অনেক সত্যিকারের ব্যথার জায়গা থাকে। ও শুধু বিরক্তভাবে বলল, সিতি, সবকিছুর একটা লিমিট আছে।
সিতি বলল, হ্যাঁ, জানি। কিন্তু ভালোবাসার কোনও লিমিট নেই, সোনা। তুমি জানো না বুঝি? এখন ছোট তো, বড় হলে বুঝতে পারবে।
সিতির বলার ঢঙে প্রায় সবাই হেসে উঠল। আর তখনই নিখিল আর অরুণকে দেখা গেল। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে। ওরা হস্টেলে থাকে, রুমমেট। তাই একসঙ্গে এসেছে।
নিখিল বলল, অ্যাই, অরুণের মাইরি বেশ জ্বর হয়েছে। আমি বারণ করলাম, শুনল না। বলল, না, পিকনিকে আমি যাবই।
অরুণের গায়ে মোটা চাদর। চোখ একটু লাল, ছলছল করছে।
ওকে দেখে নমিতার মায়া হচ্ছিল। কাছে গিয়ে বলল, জ্বর নিয়ে এলি কেন?
তোর জন্যে।
নমিতা আর কোনও কথা বলল না। এই হচ্ছে মুশকিল। বন্ধু হিসেবে যদি স্বাভাবিক উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা হয় তা হলেও সেটার ব্যাখ্যা করা হবে অন্য সম্পর্ক দিয়ে।
ওরা সবাই মিলে হইহই করে এগোল দু-নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে। বিকাশ গেল টিকিট কেটে নিয়ে আসতে।
চলতে-চলতে সমীর কখন যেন নমিতার কাছে এসে গিয়েছিল। ওর কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, আজ তোকে বিউটিফুল লাগছে।
নমিতা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল হতবাক হয়ে। তারপরই এক ধাক্কায় কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে দিয়ে শাসনের গলায় বলেছিল, আমার সঙ্গে এসব অসভ্যতা কখনও করবি না। আমি কিন্তু এখান থেকেই ফিরে যাব—পিকনিকে যাব না।
নিখিল আর সিতি এগিয়ে এল সমীরের কাছে। সিতি বলল, সমীর, কী হচ্ছে! তুই দেখছি পিকনিকের মুডটাই একেবারে জন্ডিস করে দিবি!
সমীর মিনমিন করে বলল, না রে, আমি তো কিছু করিনি…মানে…।
নিখিল হাত-পা নেড়ে বলে উঠল, ওসব মানে-টানে আমাদের বুঝিও না, বাপ! শুধু জোড়হাত করে বলছি, তোমার ওই নমিতা-স্পেশাল ম্যাগনেটিক প্রপার্টিটা আজকের দিনটার জন্যে লক-আপে ভরে রাখো, কাল ব্রাহ্মমুহূর্তে আবার শান দিয়ে বের কোরো।
সমীর তখনও কোনওকিছু না বোঝার ভান করে বোকা-বোকা হাসছে।
এমন সময় বিকাশ টিকিটগুলো এনে নমিতার হাতে দিল। ওর আঙুলের ছোঁয়া টের পেল নমিতা। বিকাশ সমীরের মতো বেহায়া নয়। আবার অরুণের মতো চুপচাপও নয়। ও যে ঠিক কী চায় নমিতা বুঝতে পারে না। ওর সবকিছু কেমন জট পাকিয়ে যেতে চায়। কেমন যেন পাগল-পাগল লাগে।
ট্রেনে উঠেই পাগলটার কথা আবার মনে পড়ল নমিতার। ওর ছোটকাকার বন্ধু। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। মোটরবাইক নিয়ে ঘুরে বেড়াত দিনরাত্তির। একটা বিয়েবাড়িতে আলাপ হওয়ার পরই বলেছিল, আপনি আমার চেয়ে একযুগ ছোট।
নমিতার ভুরু কুঁচকে গিয়েছিলঃ এক যুগ মানে?
মানে আর কী, সিম্প্ল ম্যাথামেটিক্স—মানে বারো বছরের ছোট।
তারপরই গলা ছেড়ে হাসি।
দেখতে-দেখতে কী যে হল, নমিতার সবকিছু যেন ওলটপালট হয়ে গেল। ওকে দু-তিন দিন না দেখলেই খারাপ লাগত। অফিসের কাজে মাঝে-মাঝেই ট্যুরে যেতে হতো ওকে। তখন এস. টি. ডি. করে কথা বলত নমিতার সঙ্গে। তা ছাড়া এমনি ফোন তো ছিলই। কথা বলতে কী যে ভালোবাসত পাগলটা! ওর কথাগুলো নমিতার মনে পড়ছিল বারবার। আর ঠান্ডা বাতাস ট্রেনের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে চোখেমুখে আদর করছিল।
নমিতা, জানো, একটা পাগল তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে?
আবার একদিন ফোন করে বলে, এখন কী পরে আছ—শাড়ি না ম্যাক্সি?
কিংবা আর কোনওদিনঃ তুমি আমার ভালোবাসার বালিকা। পায়ের নখ থেকে মাথার চুল তক, আপাদমস্তক, তোমায় ভালোবাসি।
অথবাঃ এই মুহূর্তে প্রতিজ্ঞা করলাম, তোমাকে একবার না দেখে জলস্পর্শ করব না।
একদিন হঠাৎই পাগলটা রাত সাড়ে ন’টায় মোটরবাইক নিয়ে নমিতার বাড়িতে এসে হাজির। সে কী হেনস্তার ব্যাপার! কী লজ্জা! নমিতাকে ডেকে বলে কি না, কী করব বলো, একবার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করল যে!
নমিতাকে পিছনে বসিয়ে বেপরোয়া বাইক চালাত পাগলটা। হাওয়ায় চুল উড়ত দুজনের, নমিতার আঁচল উড়ত। কিছু বলতে গেলে বলত, একটাই তো জীবন, ম্যাডাম। তাই কেতায় বাঁচার চেষ্টা করছি।
এইভাবে বোধহয় আটমাস আর কয়েকটা দিন কেটেছিল। তারপরই, হঠাৎ একদিন, পাগলটা উধাও হয়ে গেল। তিনদিন চারদিন কেটে গেল ফোন করে না, আসে না। এসে বলে না, তোমাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছিল।
ছোটকাকাকে বলে-কয়ে খবর নিতে রাজি করিয়েছিল নমিতা। পাঁচদিনের দিন রাতে খবর পাওয়া গেল। মোটরবাইক অ্যাকসিডেন্টে সব শেষ। ধূপকাঠি আর ফুলের মালার কাছে হার মেনেছে বেপরোয়া পাগলটা। ও কেতায় বাঁচতে চেয়েছিল।
প্রায় তিনদিন ধরে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল নমিতা। চারপাশটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। একমাত্র সঙ্গী ছিল ঘুমের ওষুধ আর রাতজাগা চোখ। তখন প্রত্যেকটা মুহূর্তে ওর কান্না পেত। টেলিফোন বেজে উঠলে কান্না পেত। ম্যাক্সি পরলে কান্না পেত।
পাগলটা একদিন হাসতে-হাসতে বলেছিল, তোমার কথা ভেবে-ভেবে মরি, মরে গিয়েও তোমার কথা ভাবি।
এখন কি সত্যিই ও নমিতার কথা ভাবছে?
এক অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে দিয়ে দেড়বছর কেটে গেছে। অন্য একটা নমিতা যেন দূর থেকে এই বিষণ্ণ নমিতাকে দ্যাখে। আর ভাবে, বাঁচতে হবে। পাগলটা বলত, বাঁচাটাই আসল, নমিতা, মৃত্যুটা ফাঁকি।
পাগলটার কথা নমিতার সহপাঠীরা কেউ স্পষ্ট করে জানে না। নমিতাও জানাতে চায়নি কখনও।
পিকনিকের রান্নাবান্না হইহুল্লোড় নাচগানের মধ্যে নিজেকে জোর করে মিশিয়ে দিতে চাইছিল নমিতা। কিন্তু কী করে যেন তাল কেটে যাচ্ছিল।
সুজিতের নিয়ে আসা টেপরেকর্ডারে ‘চড় গয়া উপর রে, অটরিয়ামে লোটন কবুতর রে, গুটুর-গুটুর’ বাজছিল আর অপর্ণা অদ্ভুতভাবে শরীর দুলিয়ে নাচছিল।
বিশাল বাগানের গাছপালা ঝোপঝাড়ের মধ্যে কখন যেন সুজিত আর মিমি হারিয়ে গিয়েছিল। কেয়া আর নিখিল খুঁজতে যাবে বলে রওনা হচ্ছে, ঠিক তখন সিতি মেয়েলি গলায় বলে উঠল, পিকনিকে এসে জোড়ায়-জোড়ায় হারিয়ে গেলে খুঁজতে নেই, সোনা। তোমরা এখন ছোট তো, বড় হলে বুঝতে পারবে কেন খুঁজতে নেই।
সঙ্গে-সঙ্গে হাসির হররা ছুটল খোলা বাগানে।
অরুণ বারবারই নমিতাকে দেখছিল। আর সমীরও নানান ছুতোনাতায় নমিতার আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। বিকাশ পাখি দেখছিল, গাছের পাতা কুড়োচ্ছিল। মাঝে-মাঝে নমিতার কাছে এসে ডাকছিল, চল না, গাছপালার মধ্যে একটু ঘুরে আসি।
নমিতা যায়নি। ও দল থেকে সরে গিয়ে ঘাসপাতার ওপরে হাঁটছিল। পাগলটার কথা মনে পড়ছিল আবার। ওদের থেকে কত আলাদা ছিল! নমিতাকে একদিন বলেছিল, ম্যাডাম, ভগবান যে সাংঘাতিক দয়ালু সেটা কী করে বোঝা যায় জানো?
কী করে? অবাক নমিতা জিগ্যেস করেছিল।
বাঁচার জন্যে যে-তিনটে জিনিস সবচেয়ে জরুরি, ভগবান সেই তিনটে জিনিসই বিনি পয়সায় ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
কী জিনিস?
জল, বাতাস আর ভালোবাসা।
তারপরই খোলামেলা হাসি।
নমিতার কিছুই ভালো লাগছিল না। তবে বিকাশের কথায় ওর সামান্য কৌতূহল হচ্ছিল। মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য ও বিকাশের সঙ্গে যেতে রাজি হল। বলল, চল, কী দেখাবি…।
গাছপালা ঝোপঝাড়ের দিকে এগোতে-এগোতে বিকাশ পকেট থেকে একটা সুন্দর চাবির রিং বের করল। নীল রঙের মোল্ডেড প্লাস্টিকের চাকতি থেকে তিনটে ছোট-ছোট রিং ঝুলছে। তাতে চারটে চাবি।
চাবির রিংটা নমিতাকে দেখিয়ে বিকাশ বলল, এটা ভালো করে দ্যাখ।
নমিতা দেখল, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না বিকাশ কী বলতে চাইছে।
বিকাশ বলল, এটা আমার চাবির রিং। আমার পকেটে ছিল। আমি একটা জায়গায় ঘুরে আসতেই এটা তিনটে হয়ে গেল।
কথাটা বলেই পকেট থেকে হুবহু একইরকম আরও দুটো চাবির রিং বের করল বিকাশ। নমিতা অবাক হয়ে দেখল। সত্যি, কোনও তফাত নেই! কেউ যেন কোনও আশ্চর্য জেরক্স মেশিন দিয়ে চাবির রিংটাকে কপি করে দিয়েছে।
দুটো হেলে পড়া আমগাছের পাশ দিয়ে ওরা বাগানের আরও নির্জন অংশে চলে গেল। সেখানে শুধু নারকেল আর সুপুরি গাছ। কিন্তু তার মাঝখানটায় খানিকটা পরিষ্কার ফাঁকা জায়গা। সেখান থেকে ওপর দিকে তাকালে গাছের ঝাঁকড়া মাথাগুলোকে মন্দিরের চূড়ার মতো মনে হয়।
একবার পিছনদিকে তাকাল নমিতা। অনেক দূরে গাছপালার ফাঁক দিয়ে নিখিল, কেয়া ওদের দেখা যাচ্ছে। ওদের কাছ থেকে খানিকটা দূরে ইটের উনুন, এঁটো বাসনপত্র আর শালপাতার থালা। সেগুলো ঘিরে কয়েকটা কাক আর কুকুর।
নমিতা টেপরেকর্ডারের গানের মিহি গুনগুন শব্দ শুনতে পেল এতদূর থেকেও। আর ঠিক তখনই ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
কারণ, ওর কানের কাছে মুখ এনে বিকাশ হঠাৎই বলে উঠেছে, নমি, বল তো আমি কে?
নমিতা থতমত খেয়ে বিকাশকে দেখল। কিন্তু ভয় পেল না। বিকাশের সাহস কখনও বিপদসীমা ছাড়াতে পারে না।
কিন্তু নতুন ধরনের একটা গুনগুন শব্দ ওর কানে এল। অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল নমিতা। গাছে ঘেরা ছোট্ট ফাঁকা জায়গাটায় কেমন যেন একটা ভারী বাতাবরণ। বাতাস নড়ছে খুব ধীরে। আর তারই মধ্যে কোনও অলৌকিক গুনগুন।
বিকাশ আবার জিগ্যেস করল, বল তো, আমি কে?
নমিতা অস্বস্তি কাটিয়ে বলে উঠলঃ যাঃ, ইয়ারকি মারিস না, বিকাশ—।
বল না, আমি কে? এবার বিকাশের গলাটা অনুনয়ের মতো শোনাল।
নমিতা জোর করে হাসলঃ তুই বিকাশ।
হাসিস না। আমার সবকিছু কেমন গুলিয়ে গেছে। এই জায়গাটায় ঢুকে পড়ে আবার বেরিয়ে যাওয়ামাত্রই দেখি আমি…।
কয়েকটা গাছের আড়াল থেকে আরও দুটো বিকাশ বেরিয়ে এল ওদের সামনে। ওই দুজন বিকাশের মুখেও কেমন বিমূঢ় ভাব। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বিকেলের রোদের কয়েকটা তির এসে পড়েছে ওদের মুখে, গায়ে।
নমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে আর্ত গলায় তিনজন বিকাশ বলে উঠল, আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছি না আমাদের মধ্যে কে আসল আর কে জেরক্স কপি।
মৌমাছির গুঞ্জনের শব্দ তখনও শোনা যাচ্ছিল। ওদের কথাগুলো কেমন যেন অপার্থিব প্রতিধ্বনির মতো শোনাল নমিতার কানে। ওদের ঘিরে থাকা গাছগুলোর পাতা অস্বাভাবিকভাবে নড়ে উঠল বাতাসে। অদ্ভুত এক আলোর রেখা ছায়াঘেরা মাটিতে আঁকিবুকি টেনে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল নিমেষে। আর গুনগুন শব্দটাও থেমে গেল তৎক্ষণাৎ।
নমি, আমি এখন নিজেকেই চিনতে পারছি না। আমার অবস্থা এখন এই চাবির রিংটার মতো।
কেমন যেন হাহাকারের সুর ভেসে উঠল বিকাশের গলায়।
সমীর আর অরুণের কথা মনে পড়ল নমিতার। এই রহস্যে ঘেরা জায়গাটা থেকে বেরোলেই কি একটা নমিতা তিনটে নমিতা হয়ে যাবে? তখন আসল নমিতাকে খুঁজে পাবে না কেউ। বিকাশ, সমীর আর অরুণ—প্রত্যেকেই একজন করে নমিতা পেয়ে যাবে। ওরা সবাই ওদের মতো করে সুখী হবে। আর আসল নমিতার মন শুধু পাগলটার কথা ভাববে। পাগলটার কথা ভাববে।
ঘরে ফেরা পাখির ডাক শুনতে পেল নমিতা। মাথার ওপর চোখ তুলে তাকাল। নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা গেল। ভিনগ্রহ থেকে কেউ এই অলৌকিক জেরক্স মেশিন নিয়ে আসেনি তো! যা দিয়ে যে-কোনও জিনিসের জেরক্স কপি করা যায়!
আবার তিনজন বিকাশের দিকে তাকাল নমিতা। বিকেলের মরা রোদ ওদের চোখে-মুখে। তিনজন বিকাশ অসহায়ভাবে তিনটে বিকেল দেখছে।
