নেটওয়ার্ক – ৫

৫

বিকট একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল অর্ধেন্দুর। চোখ খুলতেই তীব্র একটা আলো এসে তাঁকে বাধ্য করলো হাত সামনে এনে সেই আলোকে আড়াল করতে। মোবাইলটা বাজছে। চেনা রিংটোনও যে গভীর ঘুমের পরিবেশে এতটা কর্কশ লাগতে পারে, তা অর্ধেন্দুর জানা ছিল না। মোবাইলের ঘড়ি বলছে এখন রাত দুটো বাহান্ন বাজে। স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে তাঁর স্ত্রী’র নাম। প্রাথমিক বিরক্তিটা কাটিয়ে মোবাইলটা বালিশের পাশ থেকে তুললেন অর্ধেন্দু। চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে, তবু কলটা রিসিভ করার আগে তাঁর ঠোঁটে একটা হাসির ঝিলিক দেখা দিল। অর্ধেন্দু জানেন তাঁর স্ত্রী এই সময় তাঁকে কখনোই ফোন করবেন না। এই ফোন করছে সে, যার এখনো এটা বোঝার বয়স হয়নি যে কলকাতায় এখন বেলা এগারটা হলেও, নিউ জার্সি শহরে এটা সবার ঘুমোনোর সময়।

এপার থেকে মোলায়েম কণ্ঠে অর্ধেন্দু “হ্যালো মাম্মা” বলতেই ওপার থেকে মিষ্টি বাঁশির সুরের মতো একটা শব্দ ভেসে এলো। সে শব্দ জুড়ে কেবলই সরল উচ্ছ্বাস।

“বাবা! তুমি কখন বাড়ি আসবে?”

অর্ধেন্দুর উদ্দেশ্যে ভেসে এলো তাঁর পাঁচ বছরের মেয়ে অনন্যার প্রশ্ন। বাবা-মা অবশ্য বাড়িতে তাকে মাম বলে ডাকে।

“এই তো মাম্মা, সকাল হলেই ব্রাশ করবো, ব্রেকফাস্ট করবো, তারপর সোওওওজা এয়ারপোর্ট করা ফ্লাইটে বসবো আর…”

“আর?” মাম ফের প্রশ্ন করলো।

“আর…সানডে বিকেলে মাম যখন ঘুম থেকে উঠবে, দেখবে বাবা বাড়ি পৌঁছে গেছে!”

“ইয়েএএএএএএএ!”

সরল, নিষ্পাপ আনন্দের প্রকাশ যেন কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মোবাইলের স্পিকার বেয়ে নেমে এলো অর্ধেন্দুর কানে। পেশায় তিনি ডাক্তার। ভারতবর্ষের অন্যতম নামী কার্ডিওলজিস্ট। ডাক্তারির প্র্যাক্টিসের পাশাপাশি তাঁকে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন সেমিনার, কনফারেন্সে যেতে হয়। বক্তৃতা দেওয়ার জন্য অর্ধেন্দুকে আমন্ত্রণ জানান আয়োজকেরা। এবার নিউ জার্সিতে আসার কারণও সেটাই। তবে অন্যান্য বিদেশ সফরের তুলনায় এবারের সফর একটু বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছে কিছু ব্যক্তিগত কারণে।

বাড়ি ফেরার জন্য মুখিয়ে ছিলেন অর্ধেন্দু নিজেও। সামনের সপ্তাহে যে মামের জন্মদিন! তা ছাড়া কলকাতায় তাঁর অত্যন্ত জরুরি কিছু কাজ রয়েছে। সেই কাজ সামলেই তাঁকে যেতে হবে আসামে। এভাবেই এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে সপ্তাহ, মাস, বছর কেটে যাচ্ছে অর্ধেন্দুর। ব্যক্তিগত জীবন বা সময় বলে আর কিছুই থাকছে না ইদানীং। তবে এবার দেশে ফিরে চারটে দিন তিনি স্রেফ স্ত্রী স্নিগ্ধা আর মামের সঙ্গে থাকবেন। সেভাবেই নিজের কাজের শিঢিউল সাজিয়ে রেখেছেন।

যদিও কলটা এসে তাঁর গভীর ঘুম ভাঙিয়েছিল, তবু এখন আর ঘুম পাচ্ছে না অর্ধেন্দুর। গতকাল রাত্রে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বিছানায় ঢলে পড়েছিলেন কিন্তু এখন বেশ চনমনে বোধ করছেন তিনি।

“বাবা!”

“হ্যাঁ মাম্মা, বলো!”

“বাবা, আমার তো নেক্সট উইক বার্থডে। তুমি গিফট আনবে তো আমার জন্য?”

“ওহ শিওর মাম্মা! তোমার জন্য গিফট নিতেই তো বাবা দুবাই যাবে কাল। সেখান থেকে গিফট নিয়ে একদম গিফট র‍্যাপ করে আবার প্লেনে উঠে একদম মাম্মার সামনে, “ শিশুসুলভ সুরে বললেন অর্ধেন্দু। মায়ের মৃদু বকুনি খেয়ে মাম ফোন ছেড়ে দিল।

৬

সন্ধেবেলা চা আর মুড়ির বাটি নিয়ে বিছানায় বসে একটা বই পড়ছিলেন মলয়। আজ আর তাঁর কোথাও পড়াতে যাওয়ার নেই। বিকেল অবধি একটানা ব্রষ্টি হয়েছে। অঞ্চলের সমস্ত অলিগলি কোমর সমান জলের তলায়। একেবারে নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ এই অবস্থাতেও বাইরে বেরোচ্ছে অবশ্য। জল ভেঙে তারা এগোলেই ঘরে বসে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুনতে পাচ্ছেন মলয়। দুজন ছাত্রীকে পড়াতে যাওয়ার কথা ছিল আজ সন্ধেবেলা কিন্তু দুই বাড়ি থেকেই তাঁকে ফোন করে আজ আসতে বারণ করে দিয়েছে।

মলয় বোঝেন এলাকায় সকলেই তাঁর বয়স আর শরীর স্বাস্থ্যের কথা ভাবেন। একা মানুষ বলে পাড়া প্রতিবেশীরা যে যেভাবে পারেন তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান। বইয়ের একেবারে গভীরে চলে গিয়েছেন, এমন সময় বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তাঁর মনসংযোগে বিঘ্ন ঘটালো। দরজা খুলে দেখলেন ভোম্বল দাঁড়িয়ে আছে। গড়িয়া স্টেশনে চায়ের স্টল আছে ভোম্বলের। প্রতিদিন সকালে আর রাত্রে সেই স্টলের সামনে কিছুটা সময় কাটে মলয়ের। সমবয়সী আরো জনাপাঁচেক মানুষ আসেন সেখানে, সুখ-দুঃখের ক’টা কথা হয়।

ভোম্বল হাতে একটা থলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্যান্টখানা হাঁটুর উপর অবধি গোটানো। থলেটা মলয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে সে হাসিমুখে বললো, “নিন জেঠু, ভাল মাল পেয়ে গেলাম, তাই আপনার জন্যেও নিয়ে নিলাম একটু।”

মলয় থলে ফাঁক করে দেখলেন। তারপর বললেন, “এই দুর্যোগের মধ্যে এই জিনিস তুই কোত্থেকে জোগাড় করলি? সব তোদের পাগলামি! আমি একা মানুষ, রান্নার লোক যা রাধে, তা দিয়েই দিব্যি চলে যায়। কে খাবে এসব?”

“কুলপি থেকে আমার এক বন্ধু নিয়ে এসেছে। বড় মাল পেলেই ও এনে দেয় আমাকে। বর্ষার দিন, ঠান্ডা ঠান্ডা ওয়েদার। রান্না করে গরম ভাত দিয়ে সাঁটিয়ে দিন। ভাল লাগবে।”

ভোম্বল কথা শেষ করেই জলডোরা সাপের মতো জল ভেঙে উধাও হয়ে গেল। মলয় থলে নিয়ে এসে রাখলেন রান্নাঘরে। আচমকাই যেন চোখের কোল ঠেলে নেমে এলো জলের ধারা। ভোম্বল কচ্ছপের মাংস দিয়ে গেছে কিন্তু এ খাদ্য কি তাঁর গলা দিয়ে নামবে? জুলি ভীষণ ভাল খায় কচ্ছপের মাংস। এ জিনিস তো আর চাইলেই পাওয়া যায় না। অনেক কষ্টে জোগাড় করতেন মলয়। যেদিন রান্না হতো, তার আনন্দ দেখে কে! আর এখন! কাজের সূত্রে বাড়ি থেকে অনেক দূরে থাকে সে। বছরে বড়জোর একবার দেখা হয় বাপ-মেয়ের। বড় প্রাণবস্তু ছিল মেয়েটা; সবসময় হাসিখুশি থাকত। খেলাধুলো, নাচগান, খাওয়াদাওয়া, সবেতেই তার ভরপুর উৎসাহ ছিল কিন্তু আজকাল ফোনে তার গলা শুনলেই মলয় বুঝতে পারেন মেয়েটা ভীষণ ক্লান্ত। অন্য শহরে, অন্য ভাষাভাষির মানুষের সঙ্গে সে ভালভাবে মিশতেও পারে না, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও বোধহয় করে না।

থলে থেকে মাংসের প্যাকেট বের করে একটা বড় বাটিতে ঢাললেন মলয়। তারপর সেই বাটি ফ্রিজে রাখতে যাবেন, এমন সময় ফের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। আবার কে? একটু বিরক্তই হলেন তিনি এবার কিন্তু দরজা খুলতেই সে বিরক্তি বাষ্পের মতো উবে গেল যেন। এ কী! এক্ষুণি যার কথা ভেবে চোখের কোণে জল এসেছিল, সে’ই যে একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে।

“আরে, তুই? কী ব্যাপার! কিছু জানাসনি তো! একটা ফোন, এসএমএস, কিচ্ছু করিসনি!”

ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে এলো জুলি। মলয়ের অপরিষ্কার ঘরে যেন ছড়িয়ে পড়লো জুঁই ফুলের গন্ধ। কাঁধের ভারী ব্যাগটা বিছানার উপরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে বললো, “আগে জানালে কি আর সারপ্রাইজটা বজায় থাকতো? কেমন দিলাম বলো?”

ঘরের টিউবলাইটটা খারাপ হয়ে গেছে প্রায় মাসখানেক হলো। আরেক দেওয়ালে টিমটিম করে একটা নয় ওয়াটের সিএফএল জ্বলছে কিন্তু এই মুহূর্তের মলয়ের ঘরে নেমে এসেছে হাজার ওয়াটের রোশনাই। আদরের স্পর্শে মেয়েটার দুই গাল টিপে দিয়ে মলয় বললেন, “তবে রে! শোন, বাবা বাবাই হয় বুঝলি? বাবা সব বুঝতে পারে আগে থেকে। তোর জন্যেও সারপ্রাইজ আছে, বুঝলি?”

“হুঁ, বাজে কথা। আসলে তুমি যে একেবারে তাজ্জব বনে গেছ, সেটা লুকোতে চাইছ। আমি জানি,” নকল রাগ দেখিয়ে বললো জুলি।

“তাই? চল তাহলে। দেখাচ্ছি তোকে।

মেয়ের হাত ধরে ফ্রিজের সামনে এসে দাঁড়ালেন মলয়। দরজা খুলে স্টিলের বাটিটা বের করে দেখিয়ে বললেন, “এই দ্যাখ!”

বিস্ময়ে, আনন্দে জুলির দুই চোখ বিস্ফারিত হলো। বাটিটা বাবার হাত থেকে কেড়েই নিল সে।

এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি পেয়ে গেলেন মলয়। জুলিকে বললেন, “একা একা কি আর এসব করে খেতে ইচ্ছে করে বল? তাই ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলাম। তুই যখন এসেই পড়েছিস, রান্নাটা করেই ফেলি, কী বলিস?”

.

সাড়ে দশটা নাগাদ বাড়ির আরেক দিকের দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ হলো। এই দরজাটা সবসময়ই বন্ধ থাকে, কারণ বাইরের প্যাসেজটা বাড়িওয়ালারা ব্যাবহার করেন। একমাত্র তাঁরা কোনো দরকারে মলয়ের কাছে এলে তবেই এই দরজাটা খোলেন তিনি। মলয় দেখলেন বাড়িওয়ালার ছেলে বিক্রম দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। সে চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো, “কী ব্যাপার, আজ তোমার এত গলা পাচ্ছি, রান্নার গন্ধ পাচ্ছি! কেউ এসেছে ঠেসেছে নাকি?”

“আরে বাবা, আজ আমার লটারি লাগার দিন রে! যা না, রান্নাঘরে গিয়ে দেখ কে এসেছে, “ মলয় উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বললেন। বিক্রম গিয়ে দাঁড়ালো রান্নাঘরের কাছে। ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখলো একবার। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

৭

সফটওয়্যার সলিউশন প্রোভাইডার ‘স্পাইনাল টেক’ এর অফিসে নিজের কিউবিক্যালে মনিটরে চোখ লাগিয়ে গবেষণায় ডুবে ছিল অ্যারেন। জরুরি কাজের জন্য দিন সাতেক সে কলকাতার বাইরে ছিল। গতকাল রাত্রেই ফিরেছে। তার আসল নাম অবশ্য অরিন্দম অধিকারী কিন্তু দিনের মধ্যে ষোলো ঘন্টা যে বিদেশী ক্লায়েন্টদের সঙ্গে তাকে অনর্গল কথা বলে যেতে হয় তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে দেওয়ার জন্য, তারা ‘অরিন্দম’ উচ্চারণ করতে পারে না। সমস্যার সমাধান তারা নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে। গোড়ার দিকে ‘অ্যারেন’ আর ‘ড্যাম’ এর মাঝে বিশ্রী একটা স্পেস রাখতো তারা। তারপর ক্রমে ক্রমে ‘ড্যাম’কে বাদ দিয়ে তারা ‘অ্যারেন’কে আপন করে নিয়েছে। আর ভাইরাল রোগের মতো সেই নামই ছড়িয়ে পড়েছে অফিসের ফ্লোরে। সহকর্মী থেকে সাবস্টাফ, বাইরে থেকে খাবার ডেলিভারি করতে আসা ফুড জয়েন্টের ছোকরা থেকে অফিসের এক কোণে কাচের ঘরে বসা গুরুগম্ভীর বস সুদর্শন কৃষ্ণামূর্তি, সকলের কাছেই সে অ্যারেন হয়ে উঠেছে। ইদানীং তো নতুন আলাপীদেরকে নিজের নাম বলতে গিয়ে তাকে কষ্ট করে মনে করতে হয় বাপ-মায়ের দেওয়া ভালনামটা।

অ্যারেনের মনযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়ে বেজে উঠলো তার ডেস্কের এক কোণে রাখা ইন্টারকম ডিভাইসটা। তার স্পিকার বাটনটা টিপতেই ভেসে এলো সুদর্শনের রাশভারী কণ্ঠস্বর: “অ্যারেন, কাম টু মাই কেবিন!

কাচের ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই সুদর্শন ইশারায় অ্যারেনকে বললেন তার এয়ারডোপটা কানে লাগাতে। অ্যারেনের মোবাইল বেজে উঠলো। এয়ারডোপ দুটো দ্রুত দুই কানে গুঁজে কল বাটনটা প্রেস করে দিলো সে। সুদর্শন বললেন, “ইয়েস এ ডি, অ্যারেন ইস ইন লাইন। ইউ মে স্টার্ট নাউ!”

শুরু হলো কনফারেন্স কল। সল্টলেক সেক্টর ফাইভে এসডিএফ মোড়ের কাছে একটি অট্টালিকার সাততলায় অবস্থিত অফিসের দুই ব্যাক্তির সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিলেন সুদূর নয়ডা সেক্টর টুয়েন্টি ফোরে বসা এক ব্যক্তি। আলোচনা চললো পনেরো মিনিট। তারপর কল ডিসকানেক্ট করে দিলেন সুদর্শন। কান থেকে এয়ারডোপ খুলে তাঁর টেবিলের উপরে রাখলো অ্যারেন। তার চোখের চাহনি ভাল করে জরিপ করে নিয়ে সুদর্শন বললেন, বুঝলে? স্লিপিং জায়ান্ট আবার জেগে উঠছে?”

অ্যারেনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো, ঠোঁটের গোড়ায় দেখা দিল একটা কৃত্তিম হাসি। বরফের মতো ঠান্ডা স্বরে সে বললো, “জাগলে তো ভালই। গুড় ফর আস! ইট ইজ বেটার টু কিল দ্য জায়ান্ট হোয়েন ইট ইজ অন র‍্যাম্পেজ। এভরিথিং উইল বি ওয়েল ডকুমেন্টেড! সেটাই তো দরকার। নাহলে তো শুধু অ্যারেস্ট আর বেল, বেল আর অ্যারেস্ট, এই সাইকেলই চলতে থাকবে স্যার!”

“গট ইট কিন্তু তার জন্য তো অপারেশনটা ফুলেস হতে হবে অ্যারেন। লাস্ট টাইম…”

“সরি টু ইন্টারাপ্ট ইউ স্যার,” সুদর্শনকে বাধা দিয়ে বলে উঠলো অ্যারেন, “পাস্ট টাইমও অপারেশনটা ফ্ললেসই ছিল। ফ্ল হয়েছিল পোস্ট অপারেশন! কোথায় হয়েছিল, কার তরফে হয়েছিল, সেটা আমিও জানি, আপনিও জানেন। বারবার সেই একই ভুলের রিপিটেশন আমরা করবো না নিশ্চয়ই!”

সুদর্শনের সুদৃশ্য কাচের কেবিন থেকে বাইরেটা চমৎকার দেখায়। সুদর্শন অ্যারেনের চোখ থেকে সরিয়ে নিজের চোখ সেদিকে রাখলেন। নলবনের সুবিশাল জলাশয়ের বুকে অসংখ্য তরঙ্গ উঠেছে। দূরের গাছগুলি এলোমেলোভাবে দুলছে। বোঝা যাচ্ছে বাইরে জোরালো বাতাস বইছে। আকাশ আংশিক মেঘলা। দৃশ্যটি মনোরম কিন্তু তা উপভোগ করার মতো মনের অবস্থা সুদর্শনের নেই। সফটওয়্যার কোম্পানির খোলসের নিচে ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির যে শাখাটির তিনি চিফ অফ স্টেশন, সেটির ঘাড়ে এই মুহূর্তে এক গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে। এজেন্সির নাম ব্যুরো অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স, সংক্ষেপে বিএনআই। দেশের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যে ক’টি এজেন্সির, তার মধ্যে অন্যতম। দেশের যে কোনো জায়গায়; শহর, শহরতলি, গ্রাম, মফস্বল বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলছে কিনা, সে খবর জোগাড় করা এবং প্রয়োজনমতো ব্যাবস্থা নেওয়া বিএনআইয়ের দায়িত্ব। গত পাঁচ বছরে এই এজেন্সি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের কাজে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে কিন্তু একটি ঘটনা দগদগে ঘায়ের মতো আজও যন্ত্রণা দেয় সুদর্শনদের। একটি ব্যার্থতা! মাত্র একটি কিন্তু তার মাত্রা এতটাই যে তার তলায় চাপা পড়ে যায় অনেক সাফল্য। অ্যারেন যে সেই ব্যার্থতার কথাই বলছে, তা অনুমান করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয়নি তাঁর।

প্রসঙ্গটা সুদর্শনের জন্য অস্বস্তিকর, তাই আলোচনার দিক পরিপর্তন করতে চাইলেন তিনি।

“এনিওয়ে, তোমার অ্যানালিসিস কতদূর। কী বুঝছ?”

প্রশ্ন করলেন তিনি। অ্যারেন তার এয়ারডোপ দুটো তুলে শার্টের বুকপকেটে ভরে নিয়ে বললো, “ওয়ার্কিং অন ইট স্যার। আপনি তো জানেন, আমি প্রিম্যাচিওর ডিসিশন মেকিংয়ে বিশ্বাসী নই। অনেক ডেটা এসেছে। আরো কিছু বাকি আছে। আমার লোকেরা কাজ করছে। তারাও কন্টিন্যুয়াসলি ইনফো দিচ্ছে আমাকে। সেগুলো কম্পাইল করে ফাইনাল রিপোর্ট সাবমিট করতে আর এই সপ্তাহ লাগবে।”

সুদর্শন আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছিলেন কিন্তু অ্যারেনের শরীরী ভাষা তাঁকে স্পষ্ট বলছে সে এখন কথা বলে সময় নষ্ট করতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়। অ্যারেন বেরিয়ে এল কেবিন থেকে। ফিরে গেল তার কিউবিক্যালে তার এক কোণে একটা ফাইবারের ছোট্ট টব আছে। টবে মাটি ভর্তি কিন্তু কোনো গাছ নেই। সহকর্মী বিপ্লব টয়লেট থেকে ফিরছিল কাজের জায়গায়। অ্যারেনকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “সুদর্শন চক্রের মুড কেমন? কাটাকাটি করলো?”

অ্যারেন জবাবে কেবল হাসলো। বিপ্লবের মতো আরো বাইশজন কর্মী আছে এই অফিসে, যারা জানেই না তাদের কোম্পানির একটা দ্বিতীয় সত্ত্বা আছে। তাদের কাছে স্পাইনাল টেক কেবলই একটা সফটওয়্যার কোম্পানি, যার দেশে বিদেশে প্রচুর ক্লায়েন্ট। তাদের বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা দিয়ে থাকে স্পাইনাল। বাইশজনের মধ্যে ছ’জনকে নিয়ে গড়া হয়েছে মিনি কল সেন্টার। তাদের কাজ সারাদিন ধরে ফোনে ক্লায়েন্টদের নানা ধরনের উপদেশ দেওয়া এবং সমস্যার সমাধান বাতলানো। ওদের মধ্যে দুজন এবং অ্যারেন হলো স্পাইনালের সেই দ্বিতীয় সত্ত্বার সদস্য আর ওদের উপরে আছেন সুদর্শন কৃষ্ণামূর্তি। বাকিরা জানেও না যে স্পাইনাল এর মধ্যে আসলে স্পাই আর ‘ন্যাশনাল’ এর নাল লুকিয়ে আছে।

বিপ্লব অ্যারেনের কিউবিক্যালের সামনে এসে দাঁড়াল। ভিতরে উঁকি দিয়ে বললো, “কী রে, তোর গাছের খবর কী? কবে থেকে তো সেই কালা মাটিই দেখে যাচ্ছি। কোথায় এদিক ওদিক চলে যাস মাঝেমাঝে! আরে বাবা, গাছ হলো সন্তানের মতো। তার একটা যত্নআত্তি লাগে! জল টল দে ঠিকমতো! নইলে ওরকমই থেকে যাবে। দেখবি পাতার দেখা নাই রে, পাতার দেখা নাই!”

অ্যারেন এয়ারডোপ দুটো চার্জিং কেসে ভরতে ভরতে জবাব দিলো, “পাতা সঠিক সময়ে মাটি ফুঁড়ে বেরোবে বন্ধু। এখন তো সবে সয়েল টেস্টিং চলছ!”

৮

পিঙ্ক মুন বারের বাইরে সেই ঘটনার পর কেটে গিয়েছে চারদিন। ইতিমধ্যে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে তার জীবন সম্পর্কে সবই জেনেছেন তিনি। মেয়েটির নাম অঙ্কিতা শর্মা। পুনের একটি অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে সে। পড়াশোনায় ভাল ছিল না তেমন, তবে সে ছিল সুন্দরী। নাচ, গানেও সে বরাবর ভাল ছিল। অনাথ আশ্রমে এক ফিল্ম প্রযোজকের যাতায়াত ছিল। আশ্রমকে নিয়মিত আর্থিক অনুদান দিতেন তিনি এবং ফলস্বরূপ সেখানকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুখ্য অতিথি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ছিল অবধারিত। সুন্দরী অঙ্কিতার মধ্যে তিনি বড় সম্ভবনা দেখতে পাচ্ছেন, এ কথা বলে তাকে আশ্রম থেকে নিয়ে এসেছিলেন। অঙ্কিতাও মনে করেছিল ফিল্মি দুনিয়ায় তার আত্মপ্রকাশ স্রেফ সময়ের অপেক্ষা কিন্তু এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ যে তাকে গিলে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে, তা সে বুঝেছিল পরে। যতদিনে বুঝেছিল, ততদিনে মুম্বইয়ের কোলাবায় একটি ডিস্কো বার তার প্রতি সন্ধ্যার ঠিকানা হয়ে গিয়েছে। সেখানে স্বল্প পোশাক পরে স্টেজে উঠে চটুল গানের তালে তালে নেচে, শরীরের ভাঁজ দেখিয়ে অতিথিদের মনোরঞ্জন করতো সে। সেখানেও এক ব্যাক্তির নজরে পড়ে যাওয়ায় কয়েক মাসের মধ্যেই তার ঠিকানা ফের বদলে গিয়েছিল। কোলাবার ডিস্কো বারের সস্তার আলো আর মিউজিক সিস্টেম অতীত হয়ে গিয়েছিল তার কাছে। বদলে অঙ্কিতার শরীরী হিল্লোল ঝড় তুলতে শুরু করেছিল মুম্বই শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে একটু দূরে অবস্থিত একটি থ্রি-স্টার হোটেলে। রোজগার বাড়তে শুরু করেছিল, সেই সঙ্গে সাহসও। হোটেলের বার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও অঙ্কিতার ডিউটি চালু থাকত, পয়সাওয়ালা অতিথিদের বিছানায়। প্রথম প্রথম আড়ষ্ট থাকত সে, শরীরে আপত্তিকর স্পর্শ সহ্য করতে পারত না। পালিয়ে আসত রুম থেকে কিন্তু জড়তা কাটিয়ে প্রথমবার নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এক পুরুষের হাতে সঁপে দেওয়ার পর ভোররাত্রে ঘুমে জড়ানো চোখে বেডসাইড টেবিলের উপর তার জন্যে রেখে যাওয়া টাকার অঙ্কটা তার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল আর ভাবেনি সে।

কিন্তু ভাল সময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি তার জীবনে। হোটেলের মালিকের বাড়িতে এবং অন্যান্য হোটেলগুলোতে একযোগে কেন্দ্রীয় সংস্থার রেইডের পর টান পড়েছিল অঙ্কিতার রোজগারে কিন্তু ততদিনে বৈভবের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে সে। দামী গাড়ি কিনেছে, মোটা অঙ্কের বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে প্রতি মাসে। আবার তাকে ফিরতে হয়েছে সস্তার ডান্স বারে কিন্তু সেখান থেকে যতটুকু রোজগার হচ্ছে, তা দিয়ে পেট চালানোই দুষ্কর হয়ে উঠেছে, গাড়ির ই এম আই আর বাড়িভাড়া দেবে কোত্থেকে? ফলে গাড়ির মালিকানা ছাড়তে হয়েছে, এক সময় মাথার উপর থেকে চলে গিয়েছে ছাদটুকুও।

এখন সে কোচি শহর থেকে একটু দূরে একটি শপিং মলে চাকরি করে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে জামাকাপড় খুঁজতে সাহায্য করা তার কাজ। সে কাজ করে মাসের শেষে যে কটা টাকা হাতে আসে, তাতে দু’বেলার খাওয়া জোটানোই কঠিন।

এ সব তথ্য স্যামুয়েল সংগ্রহ করেছেন পিঙ্ক মুনের সেই ওয়েটারের কাছ থেকে। তার নাম অশোক। সে’ও বিকালাবার সেই হোটেলে চাকরি করতো। সেই থেকেই অঙ্কিতার সঙ্গে পরিচয়। কাজ হারিয়ে অশোক চলে আসে কোচিতে। পিঙ্ক মুনেই একদিন দেখা হয় দুজনের তারই দৌলতে শপিং মলের চাকরিটা পায় অঙ্কিতা এবং অশোকেরই বদান্যতায় বারে ধারবাকি রেখে মদ খাওয়া হয়ে যায় তার।

প্লেনের উইন্ডো সিটে বসে ঘুমে ঢুলছিল অঙ্কিতা। তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন স্যামুয়েল। জানলা দিয়ে উজ্জ্বল আলো এসে পড়ছে মেয়েটার মুখে। বড় ক্লান্ত সে, তবু এই আলোয় তাকে যে কী অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছে!

আলতো করে তার হাত স্পর্শ করলেন স্যামুয়েল। মোলায়েম স্বরে ডাকলেন, “রোহিণী!”

চোখ খুলল সে। অচেনা নাম শুনে অবাক দৃষ্টিতে চাইল স্যামুয়েলের দিকে। তিনি হাসিমুখে বললেন, “এয়ারপোর্ট সে নিকালনে কে বাদ সে ইয়েহি তুমহারা নাম হোগা! অঙ্কিতা কো ভুল যাও, রোহিণী কো আপনা লো অভি সে!”

৯

নয়াদিল্লির মাণ্ডি হাউস অঞ্চলে একটি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির অফিসে লাঞ্চ পার্টি চলছিল। আজ কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর কেদার শর্মার কর্মজীবনের শেষ দিন, সেই উপলক্ষ্যেই এলাহি খাওয়াদাওয়ার ব্যাবস্থা হয়েছে। কেদার খুব আমুদে মানুষ, সবসময় উৎসবের মেজাজে থাকতে পছন্দ করেন। অফিসের কোনো কর্মীর জন্মদিনই হোক কিংবা তার ছেলে অথবা মেয়ের পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট; কোম্পানির অ্যাচিভমেন্টই হোক বা কারোর প্রোমোশন, কেদার শর্মা হাত খুলে খরচ করে থাকেন আনন্দ উদযাপনের জন্য।

এরকম একটা দিলদরিয়া মানুষের প্রস্থান অফিসের কর্মীদের জন্য একটু মনখারাপেরই বিষয় কিন্তু আজ সকালে অফিসে ঢুকে থেকে তিনি এমন হৈচৈ বাঁধিয়ে রেখেছেন যে সেই দুঃখটা উপলব্ধি করার সামান্য সুযোগটুকুও কেউ পাচ্ছেন না। কাউকে তিনি ব্যস্ত করে রেখেছেন স্যালাড কাটায়, কাউকে পাঠিয়ে দিয়েছেন শপিং মলে, প্রত্যেক কর্মীর জন্য গিফট কিনে আনার জন্য।

পার্টিতে কেদার ছাড়াও সামিল ছিলেন তাঁর ডেপুটি অনামিত্র রায়। আগামীকাল থেকে কেদারের চেয়ারে তিনিই বসবেন। অনামিত্র জানেন কতটা গুরুদায়িত্ব চাপতে চলেছে তাঁর কাঁধে। আনন্দ উদযাপনের ফাঁকে ফাঁকে সেই চিন্তা তাঁকে সাময়িকভাবে তাঁর মনকে আচ্ছন্ন করছে। সেটা কেদার লক্ষ্যও করছেন।

“ওকে গাইজ, আপলোগ এনজয় করতে রহিয়ে, হামলোগ থোড়া আপস মে কুছ বাতে করকে আ রহে হ্যায়। তব তক কে লিয়ে জুড়ে রহিয়ে!”

নিউজ চ্যানেলের সঞ্চালকদের ভঙ্গিতে কথাটা বলে একটু মুচকি হেসে তিনি কনফারেন্স রুমের মাঝখানে রাখা চেয়ারটা ছেড়ে উঠে অনামিত্রর পাশে এসে দাঁড়ালেন। পদবী শর্মা এবং এই দিল্লি শহরেরই মানুষ, তবু কেদারের বাংলা উচ্চারণ এখনো মাখনের মতো মসৃণ এবং অনর্গল। আসলে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। অনেকগুলো বছর তিনি কাটিয়েছেন কলকাতায়, বিভিন্ন জেলায়। ফলে বাংলাটা রপ্ত হয়েছিল ভালই। তার উপর স্ত্রী বাঙালি হওয়ায় ঘরেও ভাষাটির চর্চা থেকে গিয়েছে বরাবর। সেই মসৃণ বাংলাতেই তিনি অনামিত্রকে বললেন, “এই, ওঠ তো; চল লু থেকে ঘুরে আসি!”

অনামিত্র বিনা বাক্যব্যায়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। কেদারের সঙ্গে কিছু কথা বলার জন্য একটা ব্যক্তিগত পরিসর তিনিও খুঁজছিলেন অনেকক্ষণ থেকে।

লু’তে ঢুকেই দরজাটা ভিতর থেকে লক করে দিলেন কেদার। অনামিত্রর চোখেমুখে ফুটে ওঠা উদ্বেগের ছাপটা তিনি অনেকক্ষণ থেকেই লক্ষ্য করেছেন। এখন যেন মুখটা একেবারে থমথমে হয়ে উঠেছে। তাঁর কাঁধে হাত রেখে কেদার বললেন, “কেয়া বাত হ্যায়? অ্যায়সে মুহ লটকায়ে কিউ ব্যায়ঠা হ্যায় তু সুবেহ সে? এত টেনশন কেন করছিস তুই? পুরো অপারেশনটা তো তুই জানিস! আমার বাইপাসের সময়, লাস্ট ইয়ার আমার শ্বশুরের হস্পিটালাইজেশনের সময় তুই তো লম্বা সময় ধরে অফিস সামলেছিস! কোনো ইস্যু হয়নি তো! না আমি, না উপর থেকে কেউ কোনো কমপ্লেইন করেছে তোর কাজ নিয়ে। তাহলে আজ এত ঘাবড়ে আছিস কেন?”

অনামিত্র বেসিনে হাত ধুলেন। তারপর চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে দেওয়ালে টাঙানো প্রকাণ্ড আয়নায় কেদারের প্রতিফলনের উদ্দেশে বললেন, “টাইমিং স্যার, টাইমিং! কাজ নিয়ে অনামিত্র রায় টেনশন করে না কিন্তু আপনি এমন একটা সময়ে ছেড়ে যাচ্ছেন এবং আমাকে আপনার জায়গাটায় বসে স্টিয়ারিংটা ধরতে হচ্ছে যখন আরেকদিকেও নতুন করে শুরু হতে চলেছে অপারেশন। আমার দিকটা তো আমি সামলে নেবো স্যার কিন্তু ওদিকে গোলমাল হলে তো পুরো সিস্টেমই নড়বড় করে উঠবে। স্পেশালি যখন অ্যাট প্রেজেন্ট আমরা সেই জোনটাতেই ফোকাস করছি!”

কেদার প্যান্টের পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করলেন। তাতে হাত মুছতে মুছতে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। সে ভাবনা যে আমারও একেবারে হচ্ছে না, তা নয়। পর হামলোগ কর ভি কেয়া সকতে হ্যায়? লোগ আতে রহেঙ্গে, যাতে রহেঙ্গে! ইয়া সিলসিলা তো চলতা হি রহেগা। একটু টাইম হয়তো লাগবে। সেটা আমাদের দিতে হবে।”

“সেটাই তো চিন্তার জায়গা স্যার। টাইম যে একটু দিতে হবে সেটা আমিও বুঝি। টাইম দিতে আমার কোনো আপত্তিও নেই কিন্তু প্রায় দেড়মাস বিজনেস বন্ধ হয়ে থাকার জন্য পার্টি যে ছটফট করছে। তারা কি পেশেন্স দেখাবে? আপনার কী মনে হয়?”

অনামিত্রর এই প্রশ্নের কোনো জবাব কেদার দিতে পারলেন না। কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হু!”

নিজেদের উদ্বেগকে লু’তে ফ্ল্যাশ করে দিয়ে পার্টিতে ফিরে এলেন দুজনে। কেদারের সামার কোটের ইনসাইড পকেটে মৃদু কেঁপে উঠলো তাঁর আইফোন। সেটাকে বের করে কলারের নাম দেখে “এক্সকিজ মি গাইজ” বলে তিনি চলে গেলেন তাঁর কেবিনে। সশব্দে বন্ধ হয়ে গেলো ভারী কাঠের দরজাটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *