১৫
দক্ষিণ কলকাতার বহুতল আবাসনের ব্যালকনিতে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন অর্ধেন্দু। তাঁদের ফ্ল্যাটটা আট তলায়। এই উচ্চতা থেকে ঢাকুরিয়া লেকটাকে চমৎকার দেখায়। দুপুরে এক পশলা ভারী বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। ফলে তাপমাত্রাও নেমেছে বেশ কিছুটা। ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে। পুবের আকাশে একটা রামধনু দেখা দিয়েছে। তারই শোভা দেখছিলেন তিনি।
স্ত্রী স্নিগ্ধা তাঁর বাঁ হাতে মৃদু একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “তুমি কি মামকে সিরিয়াসলি বললে তখন কথাটা?”
অর্ধেন্দু অন্যমনস্ক ছিলেন। নানারকম চিন্তা আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাঁর মনকে। ফলে চমকে উঠলেন তিনি। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, “কোন কথাটা?”
“ওই যে বললে, এবার ওর বার্থডেতে আমরা কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি না!”
অর্ধেন্দু লম্বা একটা শ্বাস নিলেন। কাপের অবশিষ্ট চা’টুকু এক চুমুকে শেষ করে কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন তিনি, “হ্যাঁ, সিরিয়াসলিই বলেছি। তবে বার্থডেতে যাব না মানে আমি বলতে চেয়েছি যে একেবারে ওই ডেটেই যাব না। এবার ব্যাপারটা একটু বিলেটেড হবে। তুমি বাড়িতে পার্টি অ্যারেঞ্জ করো না! তাতে কোনো অসুবিধে নেই। পরশু দিন তো! আমি থার্সডে অবধি বাড়িতেই থাকব। তারপর ট্যুরে যাব!”
স্নিগ্ধার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। সেটা লক্ষ্য করে অর্ধেন্দু বললেন, “জানি তুমি কী ভাবছ। এই তো সবে বাইরে থেকে এলে। আবার কেন এখনই বাইরে যেতে হবে, তাই তো?”
“হ্যাঁ, সেটাই ভাবছি। তবে তার কারণ এই নয় যে তুমি ফ্যামিলিকে টাইম দিচ্ছ না বা বেসিক রেসপন্সিবিলিটিগুলোও এড়িয়ে যাচ্ছ। আমি ভাবছি এভাবে আজ দিল্লি, কাল দুবাই, পরশু আসাম, তরশু মণিপুর; এভাবে তোমার কাজের ক্ষতি হচ্ছে না? তোমার প্র্যাকটিসের সময় কমে যাচ্ছে না? শহরের দুটো এমিনেন্ট প্রাইভেট হসপিটালের ডক্টরস প্যানেলে তোমার নাম আছে; যেদিন সেখানে বসো, কতটা টায়ার্ড হয়ে ফেরো সেটা তো আমি দেখি। বুঝতে পারি চেম্বারে প্রচণ্ড রাশ থাকে পেশেন্টদের। দেশের টপ ফাইভ কার্ডিওলজিস্টদের মধ্যে একজন তুমি। তোমার ডিম্যান্ড হাই হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই জায়গাটা হ্যাম্পার হচ্ছে না এসব করে? রেপুটেশন নষ্ট হচ্ছে না?”
স্ত্রী’র প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারলেন না অর্ধেন্দু। প্রশ্নটা সত্যিই গুরুতর। স্নিগ্ধা এখনো জানেই না যে নিউ জার্সিতে থাকাকালীনই এম এন ইন্টারন্যাশনাল হসপিটাল থেকে একটা মেল এসেছে তাঁর কাছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন অর্ধেন্দুর অনুপস্থিতির কারণে তাঁদের পাবলিকের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। জানলে সে কী বলতো, সে কথাই ভাবছিলেন তিনি।
“কী করি বলো? ওটাও তো আমার কাজ। গরীব ঘরের শিশুগুলোকে, অনাথ আশ্রমের বাচ্চাগুলোর কথা কে ভাববে? রাজ্যের সরকারগুলো শহরের মানুষদের প্রতিই উদাসীন। রিমোট এরিয়ার লোকেদের জন্য ভাবতে তাদের বয়েই গেছে। আমার ট্রাস্ট সেই অভাবটা পূরণ করার চেষ্টা করে। সারাদিন বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট, বিভিন্ন স্টেট থেকে কতগুলো এনজিও আর অর্ফানেজ থেকে মেল আসে তুমি ভাবতে পারবে না। যত রিকোয়েস্ট আসে, আমি হয়তো তার টুয়েন্টি পার্সেন্ট অ্যাক্সেপ্ট করতে পারি। হ্যাঁ, ডাক্তারিটা আমার পেশা। শহরের এমিনেন্ট হসপিটালে আমাকে ভিজিট করার জন্য বহু মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়, আমাকে চোখের দেখা দেখতে পেলে দেবতার দর্শন পাওয়ার মতো রিয়াক্ট করে তারা, হসপিটালের স্টাফেরা খুব রেসপেক্ট করে, সেসব আমি জানি। ওগুলো আমার কাছে স্যাটিসফ্যাকশন কিন্তু এই যে এদিক ওদিক যাওয়া, এগুলো আমার ভালবাসা। আমি চেষ্টা করছি দুটোর মধ্যে একটা ব্যালেন্স আনার। আসলে এটা মনসুন তো! এই সময়টায় রিমোট এরিয়ায় রোগভোগ বেড়ে যায়। তাই আর কি। এবার যে যাব, অনেকটা এরিয়া কভার করে আসবো একবারে। যাতে নভেম্বরের আগে আর যেতে না হয়!”
স্নিগ্ধা বুঝে উঠতে পারলেন না স্বামীর এই যুক্তিকে গ্রহণ করবেন নাকি বর্জন? অতি সম্প্রতি এম এন ইন্টারন্যাশনালে একটা রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কদিন তোলপাড় চলেছে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যে ডাক্তারের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে, তিনিও কার্ডিওলজিস্ট। একটি পোস্টে তাঁকে তুলোধোনা করতে গিয়ে পাবলিক হসপিটালের ম্যানেজমেন্টের প্রসঙ্গ তুলেছে আর সেই প্রসঙ্গেই উঠে এসেছে অর্ধেন্দুর অনিয়মিত হয়ে পড়ার বিষয়টা। অনেকেই খুব খারাপ ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাঁর স্বামীকে। ভয়ংকর কিছু মিথ্যে অভিযোগও তাঁরা করেছেন কমেন্ট বক্সে। সে কারণেই উদ্বীগ্ন বোধ করছেন স্নিগ্ধা কিন্তু পাশাপাশি তাঁর স্বামীর এই চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গড়ে তোলা, বিভিন্ন স্পেশালিস্টদেরকে এনে একটা প্যানেল তৈরি করা, ট্রাস্টের তরফে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুস্থ শিশুদের বিনামূল্য চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া, এই ভূমিকাটা তাঁকে গর্বিতও করে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় অর্ধেন্দুর এই কাজের বিষয়ে খবরও বেরোয়। আজ সন্ধেবেলাই একটি পোর্টাল থেকে ইন্টারভিউ নিতে আসার কথা। অর্ধেন্দু যে আজই দুপুরে বাড়ি ফিরছেন, সে খবরও তারা জানে।
এই জনপ্রিয়তাও তো প্রাপ্তি।
দিনের আলো কমে আসছে বাইরে, যানবাহনের ইঞ্জিনের শব্দ, লেক কালিবাড়ির ঘন্টার শব্দ; সবকিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে দিনশেষে ঘরে ফেরা পাখিদের কিচিরমিচির। এতটাই তার তীব্রতা যে বিকেলে এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলে রীতিমতো গলা তুলতে হয়।
অর্ধেন্দু অবশ্য গলা তুললেন না। স্ত্রীর কাঁধ আলতো স্পর্শ করে বললেন, “ডোন্ট বি আপসেট স্নিগ্ধা। না আমি আমার কাজকে ইগনোর করছি, না’ই সংসারের প্রতি, তোমার আর মামের প্রতি আমার যে রেসপন্সিবিলিটি, সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছি। আমরা অবশ্যই ট্রিপে যাব। শিগগিরিই যাব। একটু ওদিকটা দেখে নিই, তারপর।
১৬
কনট প্লেস দিয়ে হেঁটে হোটেলে ফেরার সময় বেশ হালকা বোধ করছিলেন স্যামুয়েল। মনের উপর কয়েকশো কিলোর পাথরের মতো যে দুশ্চিন্তাটা চেপে বসেছিল, সেটা নেমে গিয়েছে। একটা রহস্যময় ঘটনার ফলে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, আজকের মিটিংটার পরে সেটাও যে কেটে যাবে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত।
সন্ধেবেলার আলো ঝলমলে কনট প্লেস স্যামুয়েলের ভীষণ পছন্দ। তাঁর কর্মজীবনের একটা দীর্ঘ অধ্যায় কেটেছে দেশের রাজধানীতে। কনট প্লেস সে সময়ে হাতের তালুর মতো চেনা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। প্রতিটি দোকান, রেস্তোরা, এমনকি হকাররাও তাঁকে দেখলেই সেলাম ঠুকতো। দেশের দক্ষিণ প্রান্তে চলে যাওয়ার পর দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগটা ক্ষীণ হয়েছে বটে কিন্তু মনের টান রয়ে গিয়েছে একইরকম।
মিটিংয়ে নানারকম স্ন্যাক্স, দামী চায়ের ব্যাবস্থা ছিল। স্যামুয়েল কিছুই খাননি। কাজের কথা আর খাওয়া, দুটো জিনিসকে একসঙ্গে বজায় রাখতে বরাবরই অসুবিধে হয় তাঁর। স্যামুয়েলের কাছে খাওয়াটা স্রেফ পেট ভরানো বা গলা ভেজানো নয়, একটা রিল্যাক্সেশন। কথা বলতে বলতে খেলে না খাওয়ায় মন দেওয়া যায়, না কথায়। তাই যে কোনো মিটিংয়েই খাওয়া এড়িয়ে যান তিনি।
চমৎকার সব রেস্তোরাঁ হয়েছে কনট প্লেসে। তাদের বাহ্যিক সাজসজ্জা এতটাই আকর্ষণীয়, যে কেবল পরিবেশটা উপভোগ করার জন্যই ঢুকে পড়তে ইচ্ছে করে। পরিচিত ক্যাফের কায়দা করে লেখা নামটা যেন স্যামুয়েলকে টেনে নিয়ে গেল ভিতরে। এই কাফের মালিকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয়। একটি রেস্তোরাঁয় দীর্ঘদিন ম্যানেজার হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে সেখানকার চাকরি ছেড়ে একটা কনফেকশনারি করেছিলেন। তারপর খোলেন এই কাফে।
স্যামুয়েলকে দেখেই কাফের মালিক বলবন্ত মেহতা হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন দুজন। খোশগল্প হলো কিছুক্ষণ। পরিচিতের পছন্দ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল বলবন্ত, ফলে অর্ডার নেওয়ার জন্য কোনো ওয়েটারকে ওদের টেবিল অবধি আসতে হলো না। আড্ডায় পুরোনো দিনের কথার পাশাপাশি স্যামুয়েলের বর্তমান জীবন, কাজকর্মের বিষয়ও উঠে আসছিল। কথায় কথায় বলবন্ত উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে জমি কিনে হোম স্টে খোলার ইচ্ছের কথা জানালেন। সে কথা শুনে স্যামুয়েল বললেন, “যদি সিরিয়াসলিই সেরকম ভাবনাচিন্তা করে থাকো, তাহলে কষ্ট করে জমিটমি খোঁজার দরকার কী? আমার রিসর্টটাই তো আছে। উই ক্যান বি পার্টনারস!”
স্যামুয়েল তাঁকে জানালেন স্যালাম্যান্ডারের আবির্ভাব কীভাবে তাঁর রিসর্টের ব্যাবসাকে আঘাত করে চলেছে।
সাড়ে আটটা নাগাদ কাফে থেকে বেরোলেন স্যামুয়েল। পায়ে হেঁটে হোটেলে পৌঁছতে লাগল মাত্র সাড়ে চার মিনিট। রিসেপশনে গিয়ে স্যামুয়েল খোঁজ নিলেন তাঁর খোঁজ করতে কেউ এসেছিল কি না। রিসেপশন থেকে জানালো কেউ আসেনি। চাবি হারিয়ে ফেলার বাতিক আছে বলে সচরাচর হোটেল, রিসর্টে উঠলে সেটা সঙ্গে না নিয়ে রিসেপশনেই রেখে যান তিনি। আজও তাই করেছিলেন। চাবিটা যখন তিনি নিচ্ছেন, তখন কয়েক ফুট দূরেই এসে দাঁড়িয়েছিল এক প্রবীণ ব্যাক্তি। গায়ের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে তাঁর, বয়সের ভারে একটু কুঁজোও হয়ে গিয়েছেন। ভদ্রলোকের পরনে কুর্তা পায়জামা, হাতে মজবুত লাঠি। দুজনের চোখাচোখি হলো এক নিমেষের জন্য। তারপর লিফটের দিকে পা বাড়ালেন স্যামুয়েল।
রুমে ফিরেই মোবাইলে বিশেষ অ্যাপের আইকন প্রেস করলেন তিনি। এই অ্যাপের মাধ্যমে দেশের যে কোনো প্রাপ্তে বসে তিনি তাঁর কোচির বাড়ি, রিসর্ট আর বিশেষ কয়েকটি জায়গার লাইভ সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে পারেন। মোবাইলের স্ক্রিনে ছোট্ট ছোট্ট আটটা জানলা খুলে গেল। একটি জানলায় প্রেস করলেন স্যামুয়েল। বাকি জানলাগুলোকে ছাপিয়ে স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠলো একটি ঘরের দৃশ্য। বিছানায় একজন বড়সড় চেহারার পুরুষের বুকের উপরে চেপে বসেছে এক নারী। কারোরই শরীরে পোশাক নেই। নারী তার শরীরকে ক্রমশ যেন মেলে ধরছে পুরুষটির কাছে। দুজনে যে খেলায় মত্ত হয়েছে, তা দ্রুত জমে উঠছে।
খুশি হলেন স্যামুয়েল। রোহিণী ডেবিউ ম্যাচেই বড় স্কোরের দিকে এগোচ্ছে। তাঁর মন বলছে ঝুঁকি নিয়ে যে পদক্ষেপ করেছেন, তা মুনাফা দেবে। দিতে শুরু করেও দিয়েছে ইতিমধ্যে।
কলিং বেল বাজলো। চিন্তার গভীরে চলে গিয়েছিলেন, ফলে শব্দটায় চমকে উঠলেন স্যামুয়েল। মোবাইল লক করে বিছানায় রেখে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আইহোলে চোখ রাখতেই তাঁর কপালে ভাঁজ পড়লো। বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন রিসেপশনে দেখা সেই প্রবীণ ব্যাক্তি।
১৭
ইংরিজি নিউজ চ্যানেলের টক শো’তে অংশগ্রহণ করে বাড়ি ফিরছিলেন গোয়েন্দা কর্তা অবিনাশ ধাওয়ান। মসকো’তে গতকাল এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে গিয়েছে। আরেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি। শহরের যে অভিজাত স্থানে সে বৈঠক হয়েছিল, তার থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়েছে এক সুইসাইড বম্বার। দক্ষ গোয়েন্দা অফিসাররা সুকৌশলে বম্বারকে নিরস্ত করে বড় নাশকতার ছক বাঞ্চাল করে দিতে পেরেছেন বটে কিন্তু মজবুত নিরাপত্তা বলয় ভেঙে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের অনুষ্ঠানস্থলের এত কাছে একজন সুইসাইড বম্বারের পৌঁছে যাওয়া অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
নিউজ চ্যানেলের টক শোয়ের বিষয় ছিল মসকোর এই ঘটনাই। অবিনাশ ধাওয়ান দেশেরইন্টেলিজেন্স জগতের একজন শীর্ষকর্তা। এই চাঞ্চল্যকর বিষয়ে তাঁর মতামত জানতে চেয়েছিলেন সঞ্চালিকা। গোয়েন্দা সতর্কতায় সামান্যতম ফাঁক কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সেই নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
গাড়িতে বসে মোবাইলে সেই টক শোয়েরই ক্লিপস দেখছিলেন অবিনাশ। আজকাল আর টেলিভিশন চ্যানেলের স্টুডিও থেকে বাড়ি ফিরে টিভি চালিয়ে শোয়ের রিপিট টেলিকাস্ট দেখার প্রয়োজন হয় না। শো চলাকালীনই সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন হ্যান্ডেলে তার ছোট ছোট ক্লিপ আপলোড হয়ে যায়। লাইক আর কমেন্ট পাওয়ার নেশায় লোকে টিভির পর্দার সামনে মোবাইল ধরে ভিডিও রেকর্ড করে অবধি আপলোড করে দেয়। সেরকমই টুকরো টুকরো ক্লিপ দেখতে দেখতে হাসি পেয়ে যাচ্ছিল অবিনাশের। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’! বিষয়টার গুরুত্ব যে কতটা, ফিল্মস্টারদের সঙ্গে কফি হাতে সঞ্চালকের আড্ডা আর জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে একজন সিনিয়র অফিসারের বক্তব্যকে এক স্তরে এনে ফেলাটা যে কতটা অবমাননাকর, তা যদি এরা বুঝত! অবিনাশ এবং তাঁর মতো গোয়েন্দা কর্তারা জানেন কতটুকু, ঠিক কতটুকু তাঁরা প্রকাশ্যে বলতে পারেন। সূক্ষ একটা সীমারেখা টানা আছে তাঁদের মতো মানুষদের জন্য। মুহূর্তের অসাবধানতার বশে যদি সে সীমারেখা পেরিয়ে এক ইঞ্চিও কেউ এগোয়, বিরাট বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কত মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয় প্রতিটি মুহূর্তে দেশের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করতে, তা যদি এরা জানত! সবই ভাইরাল করে দেয় এরা। পোস্টগুলোতে মানুষের আগুনঝরানো কমেন্ট পড়তে পড়তে চোখ কপালে উঠে যাচ্ছিল অবিনাশের। তিনি ভাবছিলেন আহা, এরা যেভাবে আমাকে সুপার হিরো হিসেবে কল্পনা করছে, সত্যিই যদি তেমনটা হতে পারতাম, তাহলে…
ভাবতেই ভাবতেই যেন একরাশ উদ্বেগ কালো মেঘের মতো এসে ছেয়ে গেল তাঁর মনের আকাশে। অন্য দেশের নিরাপত্তায় গাফিলতি নিয়ে বক্তব্য পেশ করে এসেছেন তিনি। আর নিজের দেশে?
ভয়ংকর একটা চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দেশে। তাঁদের লক্ষ্য আগামী বারো বছরের মধ্যে এক বিকল্প শাসন ব্যাবস্থা গড়ে তোলা। সেই চক্রের মাথায় বসে আছে কিছু উচ্চশিক্ষিত মানুষ, কিছু মেধাবী ছাত্র। সুপরিকল্পিতভাবে তাদের মগজধোলাই করে চলেছে এক মৌলবাদী! তার একটি সংগঠন আছে। বিপুল অর্থ সাহায্য নিয়মিত পেয়ে চলেছে সেই সংগঠন। তাদের অর্থ জোগানোর জন্য মধ্য প্রাচ্য থেকে আসছে সোনা। এমনভাবে লুকিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে সেই সোনাকে, যে বিমানবন্দর বা বন্দরের স্ক্যানারে ধরা পড়ছে না। বিচিত্র কৌশলে ড্রাগ পাচার হয়ে চলেছে নিয়মিত। কোনো নাকা চেকিং, ফুল বডি চেকিং দিয়ে রোখা যাচ্ছে না এই দুষ্টচক্রকে। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে সম্প্রতি অবিনাশের কাছে খবর এসেছে কিছুদিনের মধ্যেই ভারত- নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে একদল প্রশিক্ষিত জঙ্গির। নিঃসন্দেহে কোনো নাশকতার নীল নকশা বানিয়েই তারা আসছে। অবিনাশ জানেন না তাদের দেশে প্রবেশ করা আদৌ আটকানো যাবে কি না। জানেন না, কারণ তিনি নিশ্চন্ত নন দেশের নিরাপত্তা বলয় সম্পর্কে। কোথায় যে কোন ফাঁক হয়ে আছে, কোথায় কোন এজেন্ট, কোন চেক পোস্টে কোন অফিসার কম্প্রোমাইজড হয়ে বসে আছেন, তা বলা বড় কঠিন। অর্থের লোভে বা কোনো প্রিয়জনের প্রাণ বাঁচাতে তাদের কেউ যে ইচ্ছাকৃতভাবে কর্তব্যে গাফিলতি করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এভাবে ভাবতে খারাপ লাগে অবিনাশের কিন্তু এটাই বাস্তব। এমন কিছু অফিসার আছেন, যাঁদের দক্ষতা বা সাহস নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই কিন্তু কিছু কিছু পরিস্থিতিতে তাঁদের পদক্ষেপ প্রশ্ন তুলে দেয়। এঁরা হলেন সর্ষের মধ্যেকার ভূত! তথ্য প্রমাণের অভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যাবস্থা নেওয়া যায় না। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেটাকে তাঁরা সিস্টেমের দুর্বলতা বলে মনে করেন এবং একই অন্যায় করে চলেন বারবার।
মোবাইল লক করে সিটে রাখলেন অবিনাশ। এই চিন্তা তাঁকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে। একটি এজেন্সির প্রধান তিনি। তাঁরই নির্দেশে কাজ করে এজেন্সির বিভিন্ন ইউনিট। কাজেই, দায় এবং দায়িত্ব, কোনোটাই তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না।
দেখতে দেখতে ময়ূর বিহারে অবিনাশের বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল তাঁর গাড়ি। নামতে যাবেন, এমন সময় নরম একটা ‘টুং’ শব্দ করে জেগে উঠলো তাঁর মোবাইল। একটি কোডেড মেসেজ এসেছে। গাড়িতে বসেই সেটা খুললেন তিনি। মেসেজে একটা লিঙ্ক দেওয়া আছে। লিঙ্কে ক্লিক করতেই খুলে গেল একটা ছবি। দেশের এক বিশিষ্ট মানুষকে দেখা যাচ্ছে এমন এক ব্যাক্তির সঙ্গে,
যার বিরুদ্ধে ভয়ংকর কিছু অভিযোগ আছে। ছবিটি তোলা হয়েছে বিদেশের একটি বিলাসবহুল হোটেলের নিচে অবস্থিত রেস্তোরাঁয়। ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল।
বিশিষ্ট মানুষটি অতি সম্প্রতি অবিনাশের র্যাডারে এসেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এসে পৌঁছেছে অবিনাশের মেলবক্সে। এজেন্সির একজন এই ব্যক্তির কার্যকলাপ ট্র্যাক করে চলেছে আর অবিনাশ তার ওভারসীজ এজেন্টদের নির্দেশ দিয়েছেন বিদেশে ইনি কোথায় কী করে বেড়াচ্ছেন, সেদিকে নজর রাখতে।
১৮
এক ঘন্টার গোপন বৈঠকের শেষে স্যামুয়েলের অতিথি ধাপে ধাপে ফিরে এলেন প্রবীণ নাগরিকের বেশে। রুমে প্রবেশ করার পরই তিনি একে একে খুলে ফেলেছিলেন তাঁর পরচুলা, মুখ ও হাতের প্রস্থেটিক মেক আপ এবং কুর্তার আড়ালে রাখা কর্সেট। সম্পূর্ণ অন্য একটি মানুষ আবির্ভূত হয়েছিল স্যামুয়েলের রুমে পাতা দামী সোফা সেটের সামনে।
এই মুহূর্তে রুমের দেওয়ালে সাঁটা তিন ফুট বাই দু’ফুট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই ব্যক্তি তাঁর চেহারাটা দেখছিলেন। এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে বুঝে নিতে চাইছিলেন গালের কৃত্তিম ভাঁজগুলো ঠিক আগের মতোই দেখাচ্ছে কিনা। আয়নায় স্যামুয়েলের প্রতিবিম্বও দেখা যাচ্ছে। থমথমে মুখে বসে আছেন তিনি বিছানায়।
ছদ্মবেশী মানুষটি বিভিন্ন ভাষায় অনর্গল কথা বলে যেতে পারেন। কেরলীয় সেই ভাষার মধ্যে একটি। সেই ভাষাতেই তিনি স্যামুয়েলের প্রতিবিম্বকে প্রশ্ন করলেন, “তোমাকে এত আপসেট দেখাচ্ছে কেন? এতক্ষণ যে আলোচনা আমরা করলাম, তাতে তোমার বিজনেসের জন্য চমৎকার প্রস্পেক্টটা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না?”
স্যামুয়েল ধীরে ধীরে চোখ তুললেন। ছদ্মবেশীর প্রতিবিম্বে তাঁর চোখে চোখ রেখে বললেন, “আমি একটা সংকটের মধ্যে ছিলাম। সেটাকে কাটিয়ে ওঠার পথে প্রথম পদক্ষেপটা নিয়েছি মাত্র। এখনই কোনো নতুন অ্যাক্টিভিটি আমার জন্য খুব রিস্কি হয়ে যাবে। তোমাকে এতক্ষণ বারবার এ কথা বলেছি, সেটাই রিপিট করছি। একটু সময় দাও আমাকে!”
বিদ্যুতের গতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন ছদ্মবেশী। এতক্ষণের শান্ত, মার্জিত প্রবীণের দুই চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। রুক্ষ স্বরে তিনি বললেন, “সেটাই তো আমাদের হাতে নেই স্যামুয়েল! তোমার অপদার্থতার জন্য একটা সিস্টেম ব্রেক ডাউন হয়ে পড়ে ছিল দু’মাস। তুমি বোঝো না আমাদের কাজ, আমাদের মিশনের জন্য দু’মাস হাত গুটিয়ে বসে থাকা মানে কতটা পিছিয়ে যাওয়া? ফিফটি এইট ডেজ! ঘন্টায় হিসেব করলে কত হয়? এতগুলো ঘন্টা সব রকমের ট্রাফিক স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। জায়গায় জায়গায় আমাদের স্টক আন্ডারগ্রাউন্ড গোডাউনগুলোতে পড়ে পড়ে পচছে! ফ্রেশ স্টক আর ডাম্পড স্টকের কোয়ালিটি ওয়াইজ কতটা ডিফারেন্স, তুমি বোঝো না? ইউ আর অলওয়েজ আন্ডার দ্য ওয়াচ অব দি স্লিউথস! তা সত্ত্বেও এত বড় ঝুঁকি নিয়ে আমাকে তোমার কাছে আসতে হলো! কতটা আর্জেন্সি হলে তবে আমি এরকম রিস্ক নিতে পারি, সেটা কি ভেবেছ?”
স্যামুয়েল ফের মাথা নিচু করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। লোকটার কথাগুলো অবহেলা করার মতো নয়। ও যে ক’টা প্রশ্ন তুলছে, সবক’টি এই কদিন স্যামুয়েলকে ভাবিয়েছে। তিনি একটা সিস্টেমের অংশ। সিস্টেম বিগড়ে গেলে বাকি অংশগুলোর সঙ্গে সঙ্গে তিনিও যে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তা তিনি ভালই বোঝেন। কিন্তু…
“এই চিন্তাগুলো আমার মাথায় নেই, সে কথা তোমাকে কে বললো? এতদিন যে সিমলেসলি তোমাদের অপারেশনস চলেছে ওই বেল্টে, সেটা এই স্যামুয়েল ছাড়া সম্ভব হতো? ট্রাফিক স্তব্ধ হওয়া তো দূরের কথা, কোনোদিন একটা চেকিং অবধি ফেস করতে হয়েছে তোমাদের একটা ভেকলকে? হয়নি, কারণ স্যামুয়েল সবদিকটা ম্যানেজ করেছে এফিশিয়েন্টলি কিন্তু তার আসল চাবিটাই যদি বিগড়ে যায়, সে’ই বা চলবে কেমন করে? আর রইলো বাকি তোমার রিস্ক নিয়ে আমার কাছে আসার বিষয়টা। কেন এলে? যতই আমার উপর নজরদারি থাকুক, হাফিজ ভাই চাইলে আমাকে অন্য উপায়ে মেসেজ দিতে পারত না, এটা আমি বিশ্বাস করি না।
ছদ্মবেশী হেসে উঠলেন এবার। রুমের দরজার দিকে এগোতে এগোতে আচমকা পাল্টে ফেললেন কন্ঠস্বর। রিসেপশনে যে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই ভঙ্গিতেই ফিরে গেলেন। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া এক প্রবীণের সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে গেল সেই কন্ঠস্বর। তিনি বললেন, “যে কোনো মুহূর্তে চরম পরিণতি হতে পারে, এই সত্যিটা জেনেও যখন শিকার শিকারীর পাশে বসে খোশগল্প করে, তখন বুঝতে হয় শিকারীর শিকারকে চেনার ক্ষমতা এখনো হয়নি। বয়স তো হচ্ছে, স্যামুয়েল। দশ বছর আগে যেভাবে শিকারীদের বোকা বানাতে পারতাম, এখনো সেভাবে পারি কি না, সেটা একটু পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার ছিল। পুরোনো বন্ধু স্যামুয়েল ডি’কস্টাই যখন চিনতে পারল না, তখন রিসেপশনে তার অপেক্ষায় বসে থাকা কচি গোয়েন্দা কী চিনবে? আসি! দ্রুত তোমার তরফ থেকে সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রইলাম!”
মৃদু শব্দ বন্ধ হয়ে গেল রুমের দরজা। চোখ বুজলেন স্যামুয়েল। তার মাথার মধ্যে সব আবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
১৯
প্রতিদিনের মতো ভোর সোয়া চারটেতে বিছানা ছাড়ল বিমল। গতকাল বেকারি বন্ধ ছিল। এদিকে আজকের জন্য বিপুল অর্ডার এসে জমা পড়েছে তাদের ওয়েবসাইটে। আজ ফ্রেশ রেশনও আসার কথা। সকাল ছ’টার মধ্যে রেশন নিয়ে গাড়ি চলে আসবে। কর্মীদের গত পরশুই বিমল বলে দিয়েছিল আজ পাঁচটার মধ্যে বেকারিতে চলে আসতে।
আজ যে ডেলিভারি ভ্যানটা দার্জিলিং যাবে, তাতে সে নিজে থাকবে। নতুন কাস্টমারের থেকে প্রথম অর্ডার এসেছে গত পরশু। ডেলিভারি হবে আজ। সব কাস্টমারের ক্ষেত্রেই প্রথম ডেলিভারিটা নিজে করে থাকে বিমল। সে মনে করে এতে ডাউনটাউন বেকারির বিষয়ে তাদের প্রাথমিক ধারণাটা ভাল হয়।
সাড়ে পাঁচটায় সে পৌঁছে গেল তার বেকারির আউটলেটের সামনে। শাটার তুলে ভিতরের সমস্ত আলো জ্বেলে দিলো, চালু করে দিল ডেস্কটপটা। তারপর সে গেল বেকারির কিচেনে। একপাশ দিয়ে দশ ধাপ কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়ে থেমেছে একটা ঘরের দরজায়। তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে লোহার দরজায় লাগানো বায়োমেট্রিক লক খুললো বিমল। সে ছাড়া আর একজন ব্যক্তিরই আঙুলের ছাপ রেজিস্টার করা আছে এই লকে। কাজের জন্য বিমলকে মাঝেমাঝে কার্শিয়ঙের বাইরে যেতে হয়। কোনো জরুরি প্রয়োজনে যদি একান্তই এই ঘরে ঢোকার প্রয়োজন হয়, তখন সেই দায়িত্ব পালন করে সেই ব্যক্তি।
দরজা খুলে ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলো বিমল। দেওয়ালের বিশেষ অংশে ফিট করা আছে সুইচ বোর্ড। সে আলো জ্বেলে দিলো। দেখতে পেলো ঘরের কোণে একটা বিছানায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে একটা মেয়ে। বিমল তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়েটার কবজিটা ধরে মেপে নিলো পালস। ঠিকই আছে। কড়া সিডেটিভের প্রভাবে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে সে। সিডেটিভের প্রভাব থাকবে আরো ঘন্টা চারেক। তার মধ্যে ডাউনটাইন বেকারির ওয়েবসাইটে কাস্টমারদের এক্সেল শিটে নতুন কাস্টমারের অর্ডারের পাশের রো’তে ‘অর্ডার ডেলিভারড’ রিমার্ক বা যাবে।
“দাজু, ক্রেট রেডি ছ!”
নিচ থেকে চেঁচিয়ে বললো বিমলের বিশ্বস্ত সহকারী সঞ্জীব প্রধান। ঘর থেকে বেরিয়ে বেকারির একজিটের কাছে চলে এলো সে। বিশেষ বিশেষ অর্ডার ডেলিভারির জন্য বিশেষভাবে তৈরি ফাইবারের ক্রেট ব্যাবহার করে বিমল। এই ক্রেট লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুট, চওড়ায় দু’ফুট। পাঁচ ফুট তার গভীরতা। এমনভাবে সেটাকে ডিজাইন করা হয়েছে যে দেখলে মনে হবে গোটা আষ্টেক ছয় ইঞ্চি গভীরতার ক্রেট একটার উপর আরেকটা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাকা চেকিংয়ে পুলিশকর্মীদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য এই বিশেষ ক্রেটের উপরের অংশে সাজানো থাকে গার্লিক ব্রেড, ক্রসা, কুকিজ আর নানা ধরনের কেক। যে পথে এই ডেলিভারি ভ্যান যাতায়াত করে, সে পথে সচরাচর কড়া চেকিং থাকে না। তা ছাড়া বাবার পরিচয়টা বিমলকে বাড়তি সুবিধে দেয়। জেলার পুলিশ প্রশাসন জানে বিমলের বেকারির ব্যাবসার বিষয়ে। তবুও সাবধানতায় কোনো ফাঁক রাখে না সে। পুলিশ ছাড়াও একটা ফোর্স কাজ করে পাহাড়ে। তারা যে কখন, কোথা থেকে উদয় হবে আর ভ্যান থামিয়ে তল্লাশি শুরু করে দেবে, তার কোনো ঠিক নেই। সেরকমই একটা ফোর্সের মুখে বিমল পড়েছিল একবার। তবে বড় সমস্যা হয়নি। এদেরকে কী করে নিষ্ক্রিয় করতে হয়, তা সে জানে।
দশ মিনিটের মধ্যে উপরের ঘর থেকে ঘুমন্ত মেয়েটাকে নামিয়ে আনা হলো। তার নাকে পরিয়ে দেওয়া হলো অক্সিজেন মাস্ক। ক্রেটের পিছনদিকে একটা বোতাম আছে। সেটা প্রেস করতেই ক্রেটের একদম নিচের অংশের একটা দেওয়াল ডালার মতো খুলে গেলো। ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো মেয়েটাকে। সবশেষে অক্সিজেন মাস্কের সঙ্গে ঝুলন্ত এয়ার টিউবটাকে জুড়ে দেওয়া হলো একটা এক ফুট লম্বা সিলিন্ডারের সঙ্গে। মেয়েটা গভীর ঘুমে ডুবে আছে। নড়াচড়া করার অবস্থায় সে নেই। এইটুকু অক্সিজেন তার নিশ্বাস প্রশ্বাস সচল রাখার জন্য যথেষ্ট। এভাবেই তো দিনের পর দিন সে অর্ডার ডেলিভারি করে চলেছে। কোনো সমস্যা হয়নি আজ পর্যন্ত। ছোট্ট একটা বদ্ধ জায়গায় কয়েক ঘন্টা থাকার ফলে সাময়িকভাবে তাদের শারীরিক সমস্যা হয় বটে কিন্তু তারা ফিরে আসে স্বাভাবিক অবস্থায়।
ঘড়ির কাঁটা ধরে ডেলিভারি ভ্যান এসে থামল বেকারির একজিটে। খুলে গেল তার দরজা। নানা ধরনের বেকারি আইটেমে ঠাসা আরো চোদ্দটা ক্রেটের সঙ্গে ভ্যানে লোড হয়ে গেল ডাউনটাউন বেকারির স্পেশাল অর্ডার। ভ্যানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো কেক, কুকিজের মনমাতানো গন্ধ। এই গন্ধ যে কতকিছুকে চাপা দিয়ে দেয়, তার কোনো হিসেব নেই। শুধু তো মানুষ নয়, লোহার জিনিস, নানারকম কেমিক্যাল, পাউডার আরো কতকিছু ডাউনটাউন বেকারির এই সুগন্ধকে ঢাল করে প্রতিদিন পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। ডেলিভারি নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করে লোক। কাজ মিটিয়ে সময়মতো ভ্যান ফিরে আসে বেকারিতে। খুব শিগগিরিই বড় একটা অর্ডার আসবে। ডেলিভারিটা হবে একটা দুর্গম জায়গায়। বেশ কিছুদিন সেই পথে পড়েনি বিমলের ভ্যানের চাকার দাগ। পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল এক বিশেষ কারণে। গতকাল থেকে সেই অবরোধ উঠে গিয়েছে। সবুজ সংকেত এসে গিয়েছে তার কাছে। এবার শুধু অর্ডার আর ডেলিভারি করার আইটেম ডাউনিটাউন বেকারির ওই বিশেষ ঘরে এসে পৌঁছনোর অপেক্ষা।
বিমলের নির্দেশে ভ্যানের ইঞ্জিন চালু করে দিল ড্রাইভার। সকালের নরম আলোয় পাহাড়ি পথ ধরে ডাউনটাউন বেকারির ডেলিভারি ভ্যান এগোতে লাগল দার্জিলিঙের পথে।
