১০
সন্ধেবেলা কার্শিয়ঙের ডাউনটাউন বেকারির ক্যাশ সেকশনে বসে সারাদিনের হিসেব দেখছিল বিমল। কার্শিয়ং স্টেশনকে পিছনে ফেলে বাজারের মধ্যে দিয়ে দার্জিলিংয়ের দিকে চলে গেছে যে রাস্তাটা, তারই একধারে অবস্থিত বিমলদের এই আউটলেট। বিভিন্ন ধরনের বেকারি এবং কনফেকশনারি আইটেম তৈরি করে ওরা। দোকানের পিছনদিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে ওদের বেকারি। সারাদিন চালু থাকে সেখানকার হেঁশেল। গোটা এলাকা মেতে থাকে ডাউনটাউন বেকারি থেকে নির্গত কেক, কুকিজের গন্ধে। এই রাস্তায় প্রায়শই যানজট হয়। লম্বা লাইন পড়ে যায় গাড়ি আর বাসের। দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে যান চলাচল। তাতে বিমলদের বিশেষ উপকার হয়। দোকানের সাজসজ্জা আর কুকিজের গন্ধ দার্জিলিংগামী ট্যুরিস্টদের গাড়ি থেকে নামিয়ে টেনে আনে এখানে। দোকানে ঢুকে কেনাকাটা সেরে নেন তাঁরা। সারাদিনে বিক্রিবাটা ভালই হয় বিমলদের। স্থানীয় ক্রেতা তো আছেই। তা ছাড়া দার্জিলিংয়ের কয়েকটি রিসর্ট তাদের নিয়মিত ক্রেতা। প্রতিদিন সন্ধেবেলা তারা অনলাইনে পরের দিনের জন্য অর্ডার প্লেস করে দেয় বিমলদের ওয়েবসাইটে। ভোরবেলা একটা ডেলিভারি ভ্যান এসে দাঁড়ায় ডাউনটাউন বেকারির হেঁশেলের বাইরে। গরম গরম সব আইটেম ক্রেটে ভরে ভরে লোড করে দেওয়া হয় ভ্যানে। সেই ভ্যান দার্জিলিংয়ে পৌঁছে বিভিন্ন রিসর্টে আইটেম ডেলিভারি করে ফিরে আসে সকাল দশটার মধ্যে।
বিমলদের বেকারির প্যান্ট্রি সারারাত খোলা থাকে। চারজন কর্মী রাত দশটায় সেখানে ঢোকে। তাদের ছুটি হয় পরদিন সকাল আটটায়। তবে আজ সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে। আগামীকাল বিমলের দাদা বিনয়ের মৃত্যুদিন। দাদাকে ভীষণ ভালবাসতো বিমল। খুব অর বয়সে বাবা-মা’কে হারিয়েছে ওরা। বাবা পুলিশে চাকরি করতেন। পৃথক রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল পাহাড়ে। অশান্ত হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে একটানা বনধ চলেছিল সেবার। ব্যাবসা বন্ধ, রোজগার বন্ধ। প্রায় কুড়িদিন এমন অচলাবস্থা চলার পর কিছু স্থানীয় ব্যাবসায়ী একজোট হয়ে তাঁদের দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে খবর কানে যেতেই অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেছিল আন্দোলনকারীরা। ব্যাবসায়ীদের দোকানে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল তারা। বেধড়ক মেরেছিল প্রত্যেককে। আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল দোকানগুলোতে। পুলিশ নেমেছিল পতিস্থিতি সামাল দিতে। তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল আন্দোলনকারীদের। তাদেরই একজন এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়েছিল। বিমলের বাবার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল একটি গুলি। মা স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াতেন। নর্থ সিকিম গিয়েছিলেন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এক্সকার্শনে। যাত্রাপথের মাঝে খাদে গড়িয়ে পড়েছিল স্কুলবাস। ঘটনার দুদিন বাদে বিমলের মা বাড়ি ফিরে এসেছিলেন বটে, তবে কাঠের কফিনের মধ্যে ঘুমিয়ে।
সেই থেকে মামার কাছে বড় হয়েছে ওরা। মামাই বেকারিটা করে দিয়েছিলেন ওদের জন্য। পয়সার অভাব ছিল না তাঁর, ছিল না কোনো সন্তানও। দুই ভাগ্নেই ছিল তাঁর প্রাণ কিন্তু বিনয় বেশিদিন ব্যাবসায় থাকেনি। তার দু’চোখে জ্বলত বিপ্লবের আগুন। ঘর ছেড়ে সে যোগ দিয়েছিল এক নিষিদ্ধ সংগঠনে। বদলে ফেলেছিল নিজের নাম। সংগঠনের কাজ করতে গিয়েই মারা গিয়েছিল সে। বড় ভাগনের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু মামাকে এতটাই ধাক্কা দিয়েছিল যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। মামা আজও জীবিত, শারীরিকভাবে সুস্থ কিন্তু জীবনের প্রতি কেমন যেন একটা উদাসীনতা এসে গিয়েছে তাঁর মনে।
সাড়ে সাতটা নাগাদ বেকারির ঠিক উল্টোদিকে রাস্তার ধার ঘেঁষে একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়ালো। বিমলের কাজ হয়ে গিয়েছিল। সে বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল তখন। গাড়িটার দিকে চোখ যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। বিভিন্ন মডেলের দেশি, বিদেশি গাড়ি সারাদিনই এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসা করে কিন্তু এই গাড়ি সে আগে কখনো দেখেনি। তার দৈর্ঘ্য বলছে গাড়িটা টুয়েলভ সিটার। হেডলাইটের ডিজাইনটা অসাধারণ। যেন নিকষ অন্ধকার চিড়ে সরু দুটো আলোর রেখা বেরিয়ে এসেছে, এতটাই স্লিক লাইট প্যানেলটা। ম্যাট ফিনিশ বডি বলে কালো রংটা সন্ধের অল্প আলোয় আরো মায়াবী দেখাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে গাড়িটা দেখছিল বিমল।
গাড়ির মাঝের দরজা ঠেলে নেমে এলেন মোটাসোটা, গোলগাল চেহারার একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। রাস্তা পার হয়ে এসে তিনি ঢুকলেন বিমলের আউটলেটেই। উঁকিঝুকি দিয়ে র্যাকে রাখা বিভিন্ন আইটেমের দাম ১কিলেন।পাঁচটা আইটেম, দশ পিস করে প্যাক করে দিতে বললেন ভদ্রলোক। বিমল বেশ খুশি হলো। ভদ্রলোক যে আইটেমগুলো বেছেছেন, সবই বেশ দামী। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ বিক্রিবাটা কম হয়েছে। আগামীকাল বেকারি বন্ধ থাকবে। শাটার নামানোর আগে যে কটা বাড়তি পয়সা ক্যাশবাক্সে জমা পড়ে, তাই লাভ।
আগামীকাল যেহেতু বেকারি খুলবে না, সেহেতু প্যান্ট্রির কর্মীদের আজ বিকেলে ছুটি দিয়ে দিয়েছে বিমল। অগত্যা তাকেই প্যাকিং করতে হবে। কাগজের রেডি বাক্স শেষ হয়ে গিয়েছিল, রাখা ছিল বাক্স বানানোর বোর্ডগুলো। সেগুলিকে ভাঁজ করে করে বাক্স বানাতে হবে এখন তাকে। ভদ্রলোক সেটা লক্ষ্য করে বললেন, “আপ পেমেন্ট লে লিজিয়ে! মেরা ড্রাইভার আকে লে লেগা প্যাকেট!”
বিমল হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলো দেওয়ালে সাঁটা স্ক্যানারটা। ভদ্রলোক দাম হিসেব করে পেমেন্ট করে দিয়ে চলে গেলেন। গাড়ির ড্রাইভারের সিট থেকে একজোড়া চোখ নজর রাখছিল বিমলের দিকে। সে হাত তুলে ইশারা করতেই বড়সড় চেহারার ড্রাইভার নেমে রাস্তা পেরিয়ে চলে এলো দোকানের সামনে। চারটে প্যাকেট হয়েছিল। সেগুলো আউটলেটের স্ল্যাবের উপর থেকে তোলার সময় ড্রাইভারের সঙ্গে চোখাচোখি হলো বিমলের। লোকটার চাহনি ভাল লাগল না তার।
ঘরঘর শব্দে যখন নেমে এলো ডাউনটাউন বেকারির শাটার, তখন প্রায় আটটা বাজে। অন্যদিন বাইক নিয়ে দোকানে আসে বিমল কিন্তু আজ সে হেঁটেই এসেছে। আজ তার মন ভাল নেই। সকাল থেকে খুব মনে পড়ছে ছোট দাদার কথা। স্বাভাবিক কাজকর্মে গোলমাল হয়ে গেছে বারবার। তাই বাইক বের করেনি সে আজ। মন বিক্ষিপ্ত থাকলে বাইক চালানোটা এড়িয়ে যায় বিমল। একবার এরকমই অস্থির মনে বাইক চালাতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করে পায়ে গুরুতর চোট পেয়েছিল সে।
কার্শিয়ং স্টেশনের থেকে একটু নিচে বিমলদের বাড়ি। স্টেশন পেরিয়ে কয়েক পা এগিয়েই সে মোবাইল বের করলো জ্যাকেটের পকেট থেকে।
১১
রিসর্টের সবচেয়ে বিলাসবহুল ঘরে ইজিচেয়ারে শরীর এলিয়ে বসে ছিলেন স্যামুয়েল। এই ঘরের কাচের জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই নিচ দিয়ে প্রবল গতিতে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদীকে দেখা যায়। রাতের অন্ধকারে সে দৃশ্যমান হয় না বটে কিন্তু তার স্রোতের শব্দ কাচের জানলা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করে।
এই মুহূর্তে চোখ বুজে বসে আছেন স্যামুয়েল। শুনতে পাচ্ছেন নদীর বয়ে চলার সেই শব্দ। মেজাজ গরম হলে এভাবেই চোখ বুজে, শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে স্নায়ুগুলোকে শিথিল হতে দেন তিনি। এই মুহূর্তে তিনি ঠিক সেটাই করছেন। একটু আগে মোবাইলের স্পিকার থেকে বেরিয়ে এসে যে অশালীন কথাগুলো তাঁর মেজাজটা বিগড়ে দিয়েছিল, সেগুলো এখনো থেকে থেকেই বেজে উঠছে তাঁর কানে। জীবনে খারাপ সময় যখন আসে, তখন এমন অনেক ঘটনারই সম্মুখীন হতে হয়, যার কথা কল্পনাও করা যায় না। স্যামুয়েলের জীবনে এখন সেরকম একটা সময় চলছে। এমন কিছু মানুষ তাঁকে অপমান করছে; বিদ্যা, বুদ্ধি বা যোগ্যতায় যারা তাঁর নখেরও যোগ্য নয়। স্যামুয়েল ডি’কস্টা! আইএএস অফিসার ছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন বিভিন্ন পদে, বিভিন্ন রাজ্যে। অবসর নিয়েছিলেন কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে। তিন বছর হয়ে গিয়েছে তিনি অবসৃত কিন্তু আজও সেই রাজ্যের সচিবালয়ে পা রাখলে চেনা পরিচিতরা সম্ভ্রমের সঙ্গে তাকায় স্যামুয়েলের দিকে। জুনিয়র কর্মীরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তাঁকে দেখলে। চাকরি জীবনের শেষ লগ্নে সচিবালয়ে এতটাই দাপট ছিল তাঁর, যে মুখ্য সচিব পর্যন্ত স্যামুয়েলকে সমীহ করে চলতেন আর আজ, কতগুলো অশিক্ষিত, গোঁয়ার কচি বাচ্চা তাঁর সঙ্গে গলা তুলে কথা বলার সাহসও দেখাচ্ছে।
চোখ বন্ধ করে নিজের ভাবনা, চিন্তা এবং কয়েকটি সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ ভেবে নিলেন স্যামুয়েল। আগামীকাল তিনি উড়ে যাবেন দিল্লি। পরশুদিন চরম ব্যস্ততায় সেখানে কাটবে তাঁর। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মিটিংয়ের ফলাফলের ভিত্তিতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ তাঁকে করতে হবে অবিলম্বে।
কীভাবে কী করবেন, তা মাথার মধ্যে ছকে নিচ্ছিলেন স্যামুয়েল কিন্তু বাধ সাধলো ডোর বেল। দরজা খুলে দেখলেন হাতে একটা মোবাইল নিয়ে গোপাল দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি গলা দিয়ে কোনো শব্দ করলেন না, কেবল ঠোঁট নেড়ে বললেন, “পাণ্ডেজি”!
মালিকের চোখেমুখে একটা বিরক্তি ফুটে উঠতে দেখলেন শ্রীবাস্তব। স্যামুয়েল মোবাইলটা তাঁর হাত থেকে তুলে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ওপার থেকে ভেসে এলো জেলার ডেপুটি পুলিশ সুপার পবন পাণ্ডের পাতলা কন্ঠস্বর: “গুড ইভনিং মিস্টার স্যামুয়েল। শুননে মে আয়া কে আপ পাধারে হ্যায় হামারে গরীবখানে মে! অওর হামে কানো কান খবর হি নেহি! অ্যায়সি কেয়া নারাজগি হো গয়ি হাম সে স্যার, কে আপ বাতায়ে ভি নেহি!”
পবন পাণ্ডের কথায় মেকি অভিমানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন ক্ষোভের আঁচ টের পেলেন স্যামুয়েল। তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন ঘরের কাচের জানলাটার সামনে। আগস্ট মাস। বাইরে ঠান্ডা নেই। জানলার একটা পাল্লা স্লাইড করে কিছুটা খুলে দিলেন তিনি। একটু টাটকা বাতাস তাঁর প্রয়োজন এই মুহূর্তে। এক বেয়াদপের সঙ্গে কথা বলেই মেজাজটা সপ্তমে চড়ে ছিল। এবার যে ডায়ালগ ঝাড়তে শুরু করেছে সে আগেরজনের থেকে এক কাঠি উপরে কিন্তু স্যামুয়েল জানেন তাঁকে মাথা ঠান্ডা রাখতেই হবে এখন।
১২
সকাল সাড়ে সাতটায় সাইকেল নিয়ে বেরোনোর তোড়জোড় করছিলেন মলয়। আজ তাঁকে যেতে হবে রামগড়ে। নবগ্রাম থেকে অনেকটা দূরত্ব, সুতরাং হেঁটে যাওয়া যাবে না। মেয়ের কড়া হুকুম আছে, বাবার বেশি হাঁটাচলা করা চলবে না।
সাইকেল নিয়ে বাইরের দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়েছেন তিনি, এমন সময় দোতলা থেকে বিক্রমের গলা ভেসে এলো।
“কাকু, আজ কোনদিক যাওয়া?”
মলয় ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, “আজ রামগড় আছে, তারপর লালকা।”
“আচ্ছা, তাহলে সাইকেল রেখে দাও। আমিও যাচ্ছি রামগড়। সুমনাকে একটা জিনিস দিয়ে অফিস বেরিয়ে যাব। তোমাকে ছেড়ে দেবো।”
মলয় আপত্তি করলেন না। সাইকেল নিয়ে চলাফেরা করতে আজকাল আর ভাল লাগে না তাঁর। বয়স হয়েছে জিনিসটার, আগের মতো আর গতি নেই। বিক্রম মিনিট দুয়েকের মধ্যেই নেমে এলো। তার বাইকটা রাখা থাকে বাড়ির কুয়োতলার একপাশে শেডের নিচে। সে সেদিকে এগোতেই মলয় বাইরের দরজাটা খুলে দিলেন।
রামগড় রোড ধরে কিছুটা এগোলেই সুমনাদের বাড়ি। ওরা আগে বিক্রমদের পাড়াতেই থাকতো। বছর তিনেক হলো ওরা নতুন বাড়িতে শিফট করেছে। সুমনার মা নিবেদিতা বাড়ির গেটের সামনেই দাঁড়িয়েছিলেন। বিক্রমের পিছন থেকে পুরোনো পাড়ার পরিচিত মানুষকে নামতে দেখেই তিনি হাসিমুখে বললেন, “বাবা, কী সৌভাগ্য আমার! মলয়দাকে প্রায়ই এই রাস্তা দিয়ে যেতে দেখি। আমাকে যেন দেখেও দেখেন না। হনহন করে হেঁটে চলে যান!”
মলয় অস্বস্তি ঢাকার জন্য শুকনো হাসি হেসে বললেন, “আরে না না। চিনব না কেন? আসলে তাড়ায় থাকি তো। মাথার মধ্যে নানারকম চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে, তাই একটু অন্যমনস্ক থাকি হয়তো!”
বিক্রম জিজ্ঞেস করলো, “তোমার রূপসী কন্যার কি ঘুম ভেঙেছে, নাকি এখন গিয়ে দরজা পিটাতে হবে?” “উঠেছে মনে হয়। উপরে গিয়ে দেখ,” হেসে বললেন নিবেদিতা। যদিও ঘন্টাখানেক আগেই নিজে চা করে খেয়েছেন, তবু নিবেদিতার চায়ের প্রস্তাবে আপত্তি করলেন না মলয়। দুজনে গিয়ে বসলেন নিবেদিতার কাজের ঘরে।
সুমনার ঘরের দরজার কাছে যখন পৌঁছেছে বিক্রম, তখন তার মোবাইলে নোটিফিকেশনের টোন বেজে উঠলো। হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ এসেছে- “কেমন বুঝছিস?”
বিক্রম রিপ্লাই টাইপ করলো, “সবে তো এলাম। ঠিকঠাকই তো মনে হচ্ছে। তুই টেনশন করিস না বেকার। আমি আছি তো!”
মিনিট পনেরো বাদে বিক্রম নেমে এলো একতলায়। সে ডাকতেই মলয়ও বেরিয়ে এলেন। তাঁরও যে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ঘনঘন ঘড়ি দেখছিলেন তিনি এতক্ষণ। দ্রুত পায়ে বাড়ির গেটের দিকে হাঁটা দিলেন মলয়। নিবেদিতা বিক্রমকে বললেন, “হোয়াটস অ্যাপ করে দিচ্ছি একটু পরে। এনে নিস আর গৌরীকে বলিস বারোটা- সাড়ে বারোটা নাগাদ যেন আমাকে একটা ফোন করে। আমি যা বলার বলে দেবো।”
রামগড়ে যে বাড়িতে মলয় পড়াতে যান, সেটা নিবেদিতাদের বাড়ি থেকে একেবারেই কাছে। তাই বিক্রম বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি কিছুতেই তার বাইকে আর উঠতে চাইলেন না। তাঁকে পাশ কাটিয়ে বিক্রমের বাইক চলে গেল নাকতলার শ্রী গুরু আশ্রমের দিকে।
১৩
ঘরের কাচের জানলার পাল্লা দুটো খুলে দিতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল রোহিণী। জানলার ওপারে দিগন্ত জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়। তার নিচ দিয়ে গর্জন করে বয়ে চলেছে একটা নদী। ভোরের নরম আলোয় তাকে দেখে মনে হচ্ছে জল নয়, বয়ে যাচ্ছে একটা দুধের স্রোত। সেই স্রোতের শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে নানারকম পাখির শিস। কাছেই কোথাও গলা ছেড়ে ডাকছে একটা মোরগ। সেই ডাকেই ঘুম ভেঙেছে তার।
অপার মুগ্ধতায় নয়নাভিরাম প্রকৃতিকে দেখতে লাগল রোহিণী। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না কোথা থেকে কোথায় তাকে এনে ফেলেছে এই জীবন। একটা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সেই কোচি শহর থেকে উড়ে এসে সে নেমেছে এই পাহাড়, নদী, জঙ্গলে ঘেরা রূপকথার রাজ্যে। বদলে গিয়েছে তার নাম, পরিচয়। গতকাল এই রিসর্টে এসে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। নদীর স্রোতের শব্দ আর ঝিঝি পোকার ডাক ছাড়া প্রকৃতির স্পর্শ সেভাবে অনুভব করতে পারেনি সে। সাড়ে সাতটা নাগাদ স্যাম তার রুমে ডিনার পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছিল। রোহিনীর কাছে স্যাম্যুয়েল ‘স্যাম’ হয়ে উঠেছেন তাঁরই নির্দেশে। কোচিতে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে বিন্দু সেরে ওঠার সময়ই দুজনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। কেন স্যাম তাকে রেণুকায় নিয়ে আসতে চান, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন গোড়াতেই। রোহিণী আপত্তি করেনি। করার কথাও ছিল না।
দরজায় মৃদু শব্দ হলো। রোহিণীর মুগ্ধতার রেশ কেটে গেল সেই শব্দে। দরজা খুলে সে দেখলো স্যাম দাঁড়িয়ে আছেন। কোচি থেকে রওনা দিয়েছিলেন ক্যাজুয়াল শার্ট আর স্পোর্টস ট্রাউজার পরে কিন্তু এখন দামী স্যুট, টাই, ঝকঝকে বুটে তাঁকে একেবারে কর্পোরেট ব্যাক্তিত্বের মতো দেখাচ্ছে। কেরালার মানুষ হলেও হিন্দিটা মসৃণভাবে বলতে পারেন তিনি। স্যুটের ইনসাইড পকেট থেকে একটা সাদা খাম বের করে রোহিণীর দিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, “তুমহারি পেহলি পেমেন্ট; ইন অ্যাডভান্স! আই গেস, অওর কুছ বাতানে কি জরুরত নহি হ্যায় তুমকো! আই হ্যাভ এক্সপ্লেইনড এভরিথিং!”
স্যামুয়েল বেরিয়ে গেলেন বাগডোগরার উদ্দেশ্যে। এই অফবিট ডেস্টিনেশন থেকে সেখানে পৌঁছতে কমপক্ষে আড়াই ঘন্টা লাগবে। সেখান থেকে দিল্লি। গাড়িতে যেতে নানারকম চিন্তা তাঁর মাথায় আসছিল। একেবারে অচেনা একটা মেয়েকে মাত্র কয়েকদিনের ব্রিফিংয়ের ভরসায় ফিল্ডে নামিয়ে দিয়ে বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেললেন কিনা, সেই প্রশ্ন স্যামুয়েলকে ভাবাচ্ছে কিন্তু তাঁর হাতের কাছে এর চেয়ে ভাল অপশনও ছিল না। রিসর্টটা ডুবতে বসেছে কিন্তু তার ঘুরে দাঁড়ানো স্যামুয়েলের জন্য ভীষণ প্রয়োজন। সেটা যত দ্রুত হয়, ততই তাঁর জন্য মঙ্গলের।
.
সাড়ে আটটার সময় বছর তেরো চোদ্দর একটা ফুটফুটে লেপচা মেয়ে ব্রেকফাস্ট নিয়ে এলো রোহিণীর জন্য। তার পিছন পিছন এসে ঘরে প্রবেশ করলেন গোপাল শ্রীবাস্তব। গতকাল সন্ধেবেলাই স্যাম রোহিণীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন গোপালের। মেয়েটি চলে যাওয়ার পর দরজা লক করে দিলেন তিনি। রোহিণী একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে টান হয়ে বসলো তার বিলাসবহুল ঘরে পাতা দামী কাঠের সোফায়। তার জব প্রোফাইলটা কী, তা স্যাম বুঝিয়ে দিয়েছেন। এখন গোপাল এসেছেন তার হাই এস্টিমড এবং রেগুলার ক্লায়েন্টদের সম্বন্ধে তাকে ব্রিফ করতে।
এই কাজ তার জন্য নতুন কিছু নয়, ফলে বেশি মনোযোগ দিচ্ছিল না রোহণী। চারজন রেগুলার ক্লায়েন্টের ছবি সে তার মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ করে দিতে বললো গোপালকে। আধঘন্টা বাদে গোপাল চলে গেলেন। বলে গেলেন আজ সন্ধেবেলাতেই একজন ক্লায়েন্ট দর্শন দেবেন রিসর্টে। রোহিণী যেন তৈরি থাকে।
কথা বলতে বলতে কাপের চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। বাথরুমের বেসিনে কাপের চা ফেলে দিল রোহিণী। তারপর ফ্লাস্ক থেকে গরম চা ঢেলে কাপ নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো জানলার সামনে। আকাশে রোদ ঝলমল করছে এখন। সেই রোদের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নদীর বহমান জলে। ঠিকরে আসছে রোদের আলো। নাইটক্লাবে স্টেজগুলোর উপরে ছোট ছোট আয়নার টুকরা লাগানো যে বলগুলো ঘোরে, তার গায়ে লেগে মায়াবী রঙিন আলোও এমনভাবেই ঠিকরে আসে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে সেই আলোই দেখছিল রোহিণী। তার কানে বাজছিল কদিন আগে বাড়ির গেস্টরুমে স্যামের করা প্রশ্নটা- “পয়সা কামানোর জন্য কতটা বেপরোয়া হতে পারো?”
১৪
অ্যারেন প্রাণপণ চেষ্টা করছিল মেয়েটার হাতটা ধরে রাখতে কিন্তু সে বুঝতে পারছিল ক্রমশই আলগা হচ্ছে তার রাশ। খাদে ঝুলছে মেয়েটা। মৃত্যুভয়ে আর্তনাদ করছে, আপ্রাণ চেষ্টা করছে অ্যারেনের হাতটা ধরে উপরে উঠে আসতে। কিন্তু …
শেষরক্ষা হলো না! অ্যারেনের হাতের রাশ আলগা হয়ে গেল। খাদের অতলে তলিয়ে গেল মেয়েটা। অ্যারেন উঁকি দিয়ে দেখলো কাটা ঘুড়ির মতো নিচে পড়ছে সে। তার শরীরটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। পড়তে পড়তে একটা পাথরে ঠাস করে ঠুকে গেল তার মাথাটা। যন্ত্রণাটা যেন অ্যারেন তার মাথার পিছনে অনুভব করলো। দৃশ্যটা সহ্য করতে না পেরে সে এক ঝটকায় মুখটা ঘুরিয়ে নিতে চাইল…আর অমনি তার ঘুমটা গেল ভেঙে। কোথায় খাদ? কোথায় পাহাড়ের নিসর্গ! সে তো শুয়ে আছে তার বিছানায়। কাচের জানলা দিয়ে সকালের আলো এসে পড়ছে ঘরে। ভ্যাপসা একটা গরম ভাব ঘরের ভিতরে। সিলিংয়ের দিকে তাকাতেই কারণটা স্পষ্ট হলো। ফ্যানটা স্থির হয়ে রয়েছে। কখন থেকে, কে জানে! এসি সে গতকাল রাত আড়াইটে নাগাদ বন্ধ করে ফ্যানটা চালিয়েছিল।
কিন্তু মাথার পিছনে যন্ত্রণাটা তো হচ্ছে! সেটা তো দুঃস্বপনের সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। বিছানায় উঠে বসলো অ্যারেন। পিছন ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারলো যন্ত্রণার কারণটা। বালিশ থেকে নেমে বিছানার একেবারে বাঁপাশে সরে গিয়েছিল সে। খাট ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বেডসাইড টেবিল। সেটারই কোণে ঠুকে গিয়েছে অর মাথার পিছনদিক।
টেবিলের উপরে রাখা ডিজিটাল ক্লক বলছে এখন সকাল সাড়ে আটটা। এমনিতে ভোর সাড়ে পাঁচটায় বিছানা ছাড়ে সে। এক ঘন্টা শরীর চর্চা করে পাশের খেলার মাঠে কিন্তু আজ ব্যতিক্রম হয়েছে। গতকাল রাত তিনটে অবধি কাজ করেছে সে। বিভিন্ন ডেটা, সোর্সদের পাঠানো বিবি, মোবাইলের স্ক্রিনশটকে পাশাপাশি রেখে সূত্রের সঙ্গে সূত্রকে মেলানোর চেষ্টা করেছে। সুদর্শনকে সে বলে এসেছে আগামী দুদিন অফিসে আসবে না। এই সময়টা সে দিতে চায় নিজের চিন্তাভাবনা এবং অনুসন্ধানকে। বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজের থিওরি এবং সংগৃহীত তথ্যকে পাশাপাশি রেখে সে সামনে এগোনোর পথ খুঁজতে চায়।
কিন্তু তার মনের অবচেতনে যে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটা সে টের পেতো না এই দুঃস্বপ্নটা না দেখলে। বর্তমানে যে কাজ নিয়ে সে ডুবে আছে, দুঃস্বপ্নটা তার সঙ্গে জড়িত। এই মেয়েটা, তার চিৎকার করতে করতে খাদে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা আগেও স্বপ্নে দেখেছে অ্যারেন। একটা ব্যার্থতার যন্ত্রণা, একটা আফসোস থেকে জন্ম হয়েছে এই দুঃস্বপ্নটার। সে ফিরে ফিরে আসে, অ্যারেনকে যেন বলে যায় সেদিন সে খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছিল।
দু’বছর কেটে গেছে ঘটনাটার পর অথচ আজও যেন সবকিছু ভীষণ টাটকা। চোখ বুজলেই সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ছবিগুলো পরপর ভেসে উঠতে শুরু করে। উত্তরবঙ্গে ভারত-ভূটান সীমান্তের কাছে পাহাড়ি অঞ্চলে গভীর জঙ্গলের মধ্যে সিক্রেট অপারেশন চালিয়েছিল বিএনআই। অ্যারেনদের হাতে ধরা পড়েছিল মাস্টার দীপন, এক কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠীর লোকাল কম্যান্ডার। অপারেশনে আহত হয়েছিল সে। প্রাথমিক শুশ্রূষার জন্য তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছিল অ্যারেনরা কিন্তু মাঝপথে তাকে গাড়ি থেকে নেমে পড়তে হয়েছিল। অন্য একটি কেসের গুরুত্বপূর্ণ লিড এসে যাওয়ায় চালসার দিকে চলে যেতে হয়েছিল তাকে। তবে সেখানেও যাওয়া হয়নি অ্যারেনের। পথেই সে খবর পেয়েছিল হাসপাতাল থেকে পালানোর সময়ে এনকাউন্টারে মৃত্যু হয়েছে মাস্টার দীপনের।
ফের সেখানে ছুটেছিল অ্যারেন। সেই হাসপাতালেই সে দেখেছিল মেয়েটাকে। প্রোটোকল ভেঙে তাকে নিজের প্রকৃত পরিচয় দিয়েছিল অ্যারেন। রেখে এসেছিল একটি ফোন নাম্বার। তার চোখ জোড়া দেখে অ্যারেনের মনে হয়েছিল সে কিছু বলতে চায়। তার অনুমানকে সত্যি প্রমাণ করে কিছুদিন বাদে সেই মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করেছিল মেয়েটা। সে এক ভয়াবহ অভিযোগ জানিয়েছিল। সে বলেছিল অভিযোগের স্বপক্ষে তার কাছে জলজ্যান্ত প্রমাণও আছে। অ্যারেন তখন সিলারিগাওঁতে ছিল। একটা কোভার্ট অপারেশন লিড করছিল সে। মেয়েটি যোগাযোগ করেছিল জানতে পেরেই তাকে দুদিন বাদে দার্জিলিংয়ের একটি হোটেলে আসতে বলেছিল কিন্তু মেয়েটি দার্জিলিং অবধি এসে পৌঁছতে পারেনি। কদিন পরে পাহাড়ের খাদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল তার মৃতদেহ। গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাকে হত্যা করে নিষ্প্রাণ দেহটা কেউ বা কারা ফেলে দিয়েছিল খাদে।
অ্যারেনের আজও আক্ষেপ হয়ে সেদিন হাসপাতালে যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে মাঝরাস্তায় নেমে পড়ার জন্য। : টিমের হেড রক্তিমদা ছাড়া টিমে আর যে দুজন সদস্য ছিল, তারা তখন নতুন। সেটাই ছিল তাদের প্রথম অপারেশন। অন ফিল্ড এক্সপিরিয়েন্স ছিল না, ফলে পরিস্থিতি সামলাতে পারেনি। বিএনআইয়ের রেকর্ডে লেখা আছে তাদেরই একজনের মুহূর্তের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে তারই পিস্তল হাতিয়ে নিয়ে তাকে গুলি করেছিল দীপন। তার গুলিতে আহত হয়েছিল দ্বিতীয়জনও। রক্তিমদা সেই মুহূর্তে হাসপাতালের বাইরে ছিলেন। গুলির শব্দ শুনে তিনি ছুটে যান। তাঁকে লক্ষ্য করেও গুলি চালায় দীপন। নিরুপায় হয়ে ফায়ার করতে হয় রক্তিমদাকেও। মাস্টার দীপন মারা যায়। একটা অপারেশন সফল হতে হতেও ব্যর্থ হয়ে যায় সেই ভোরে। মাস্টার দীপন ছিল একটা বিরাট চক্রের ছোট অংশ। সেই চক্রের মাথা কে, কী তার উদ্দেশ্য, সেসব প্রশ্নের উত্তর বের করে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ শেষ হয়ে গিয়েছিল দীপন মরে যাওয়ায়।
সেই চক্র আজও বহালতবিয়তে তার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। ড্রাগ থেকে নারী পাচার, সোনার চোরাচালান থেকে জঙ্গিদের অর্থ সাহায্য এবং সীমান্ত পারাপার, সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত এই চক্র কিন্তু এতটাই মজবুত সেই নেটওয়ার্ক যে, আইনের চোখে ধুলো দিয়ে দিব্যি কাজ করে যাচ্ছে। মাঝে কিছুদিন তাদের কার্যকলাপ একটু গতি হারিয়েছিল কিন্তু গতকাল খবর এসেছে, অক্টোপাস আবার শুঁড় নাড়াতে শুরু করেছে।
এই বিরাট চক্রের মাথায় যারা বসে আছে তারা সমাজের মান্যগণ্য মানুষ। এদের বিভিন্ন গতিবিধি, কাজকর্মকে ট্র্যাক করাই অ্যারেনের কাজ। সেই কাজের জন্যই কলকাতার বাইরে গিয়েছিল সে কয়েকদিনের জন্য। কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য তার হাতে এসে পৌঁছেছে বিভিন্ন সূত্র মার্ফৎ কিন্তু সেগুলির ভিত্তিতে কোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়াটা ঝুঁকির হয়ে যাবে। গতকাল সকালের মিটিংটার পর অফিসে আরো একদফা মিটিং হয়েছিল। অ্যারেন আর সুদর্শন ছাড়াও সেই ভার্চুয়াল মিটিংয়ে যোগ দিয়েছিলেন রক্তিমদা। তিনিও অ্যারেনের ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ থিওরিকেই সমর্থন জানিয়েছেন। এই চক্রকে ভাঙতে হলে এদের হাতেনাতে ধরতে হবে। একটা নিখুঁত ফাঁদ সাজাতে হবে তার জন্য। বিভিন্ন তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি এবং চক্রের মাথাদের গতিবিধির উপর নজরদারি চালানোর পাশাপাশি সেই ফাঁদ সাজানোর কাজেও ধাপে ধাপে এগোচ্ছে অ্যারেন। সে জানে এই কাজে সময় লাগবে। হয়তো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে ধৈর্য্য ধরে। অপরাধীরাও যথেষ্ট সতর্ক। তাদেরও চোখ কান খোলা আছে। তারা তখনই কোনো ভুল চাল দেবে যখন তারা প্রতিপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত হবে। অ্যারেনদের অপেক্ষা করতে হবে তাদের সেই ভুল পদক্ষেপের জন্যে।
