৩৫
রাত সাড়ে এগারোটায় মিশনের জন্য টিম নিয়ে বেরিয়েছিল অ্যারেন। সবকিছু মিটতে মিটতে প্রায় ভোর হয়ে এসেছিল। একটা গাড়িতে তোলা হলো হাফিজ আর অর্ধেন্দুকে। আরেকটায় উঠলেন স্যামুয়েল। অ্যারেনের নির্দেশে রক্তিমও উঠতে যাবেন গাড়িতে, এমন সময় প্রজ্ঞা বললো, তার পাঁচ মিনিট সময় চাই। সে ফোন করলো একটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যালাম্যান্ডারের দিক থেকে আসতে দেখা গেল এক তরুণ আর এক বয়স্ক মানুষকে। রক্তিমের দিকে আঙুল দেখিয়ে প্রজ্ঞা বয়স্ক মানুষটাকে বললো, “এই দেখো বাপি! এই সেই লোকটা, যে জুলিকে মেরে খাদে ফেলে দিয়েছিল। তোমাকে কথা দিয়েছিলাম তোমার আদরের মেয়েকে যে পৃথিবী থেকে সরিয়েছে, তাকে একদিন তোমার পায়ের কাছে এনে ফেলবো। আমি তোমার নষ্ট মেয়ে বাপি! তোমার জন্য এটুকুই করতে পারতাম। করলাম!”
বড় মেয়ে লিলিকে বহুদিন বাদে দেখছেন মলয়। রাতের অন্ধকার এখনো ফর্সা হয়নি। গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। সেই আলোতেই মেয়েটাকে যেন ভীষণ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। মলয় জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে। তার মাথায় হাত রাখলেন। কান্না ভেজা গলায় বললেন, “আমাদের সবার জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেছে রে মা!”
প্রজ্ঞা রক্তিমের গালে সপাটে একটা চড় কষাল। তাঁর শার্টের কলার চেপে ধরে বললো, “কী অন্যায় করেছিল আমার বোনটা? আপনার কুকীর্তির কথা জানাতে গিয়েছিল তার বসকে। দুজনে প্ল্যান করে মেরে ফেললেন মেয়েটাকে? কী লাভ হলো তাতে? তার রেকর্ড করা ফুটেজ তো আমাকে সে পাঠিয়েই দিয়েছিল। শুধু তার প্রাণটা চলে গেল। জানেন, আমার বাবা এখনো মাঝেমাঝে বোনকে হ্যালুসিনেট করেন? বাবা দেখতে পান বোন বাড়িতে এসেছে, খাচ্ছে, গল্প করছে, মোবাইলে কল করছে। বাবার উপর নজর রাখতে আমাকে বাড়িতে সিসিটিভি লাগাতে হয়েছে, জানেন? আমাদের পরিচিত মনোবিদের কাছে নানা ফন্দিফিকির করে বাবাকে নিয়ে যেতে হয়। তিনি ওষুধ লিখে দেন, আমাদের রান্নার মাসি বাবার খাবারে সেই ওষুধ মিশিয়ে দেয়। এভাবেই বেঁচে আছে আমার বাবা। এভাবেই আমরা বেঁচে থেকেছি এতদিন, শুধু আপনার মুখোমুখি একদিন হবে বলে!”
রক্তিম হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে যাচ্ছিলেন প্রজ্ঞার কাছে, কিন্তু…
ভোররাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে বিকট একটা শব্দ ভেসে এলো জঙ্গলের ভিতর থেকে। রক্তিমের কপালে তৈরি হলো একটা বিরাট ক্ষত। গাড়ির বনেটের উপর এলিয়ে পড়লো তাঁর নিষ্প্রাণ শরীরটা।
অ্যারেনের টিমের দুজন শব্দটাকে অনুসরণ করে ছুটে গেল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দৌড়তে শুরু করলো বিমলও। তার বড়ভাইকে অন্যায়ভাবে গুলি করে মেরেছিল যে লোকটা, তার কোনো ক্ষমা নেই। এতদিনে তাকে শাস্তিটা দিতে পেরেছে বিমল, এতেই তার শাস্তি। এই মুহূর্তে ধরা পড়ার ভয় পাচ্ছে না বিমল, মরে যাওয়ার ভয়ও না। তবু ছুটছে সে। তিল তিল করে গড়ে তোলা সাম্রাজ্যটাকে সে বাঁচাতে চায়। মাস্টার দীপন গেছে, আজ হাফিজও গেল। কোনোক্রমে পালাতে পারলে হাফিজের ছেড়ে যাওয়া সিংহাসনটা তারই হবে। ছুটছে বিমল, তার পাশেপাশে ছুটে চলেছে কাসেমগাঁওয়ের পাহাড়ি নদী।
সমাপ্ত
