নেটওয়ার্ক – ১

১

অমাবস্যার রাত। দিগন্ত জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় মিশে গিয়েছে ঘন অন্ধকারে। শুধু থেকে থেকে যখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, এক মুহূর্তের জন্য মায়াবী একটা গোলাপী আলো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশ জুড়ে, তখন এক পলকের জন্য দৃশ্যমান হচ্ছে সে।

জায়গাটার নাম ভুটানঘাট। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলের অন্তর্গত একটি ট্যুরিস্ট স্পট। পাহাড়, নদী এবং জঙ্গল এখানকার প্রকৃতিকে যেন চিত্রশিল্পীর ক্যানভাসের মতো করে সযত্নে সাজিয়েছে। প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে বহু পর্যটক আসেন এখানে। তবে অঞ্চলটি স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে অনেক সময়ই বন দফতর থেকে ভুটানঘাটে প্রবেশ করার অনুমতি পাওয়া যায় না।

গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেঠো পথ চলে গিয়েছে ভারত-ভুটান সীমান্তে অবস্থিত এই ছবির মতো সুন্দর জায়গাটিতে।

জঙ্গলের সীমানা শেষ হয়ে যেখানে উন্মুক্ত প্রান্তর ভুটানঘাটের প্রবেশদ্বার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছে, সেখানেই এসে জড়ো হয়েছে আটজন মানুষ। দুটি তাবু ফেলেছে তারা। দুটিকে পাশাপাশি ফেলা হয়নি, মাঝে বেশ কিছুটা ব্যাবধান রাখা হয়েছে। এমনভাবে জায়গা বাছা হয়েছে তাবু পাতার জন্য, যাতে দূর থেকে শক্তিশালী বাইনকুলারে চোখ লাগালেও সহজে চোখে না পড়ে জংলা ছাপের কাপড় দিয়ে তৈরি তাবু সহজেই মিশে গিয়েছে জঙ্গলের লতাপাতার সঙ্গে।

আটজনের একজন তাবু থেকে বেরিয়ে এসেছে একটু আগে। উন্মুক্ত প্রান্তরের বুকে দাঁড়িয়ে রায়ডাক নদীর ওপারে যে সুউচ্চ পাহাড়ের দেওয়াল, সেদিকে তাকিয়ে ছিল সে। দূরের আকাশে দুর্যোগের পূর্বাভাস। তাদের জন্যে এ এক অশনি সংকেত।

বৃষ্টিটা আর ঘন্টাদুয়েক বাদে নামলে সমস্যা নেই কিন্তু এখনই যদি শুরু হয়ে যায়, তাহলে সব পরিকল্পনাই মাটি হয়ে যাবে।

রিস্টওয়াচের বোতাম টিপলো সে। স্মার্টওয়াচের অন্ধকার স্ক্রিন জেগে উঠলো। এখন সময় এগারোটা বাহান্ন। যার জন্য এখানে এসে তাবুতে অপেক্ষা করছে তারা, তার আসার সময় হয়ে এসেছে। সে যেখানে আসবে, সেখানে পৌঁছতে অনেকটা সময় লাগবে। পায়ে হেঁটে যেতে হবে। পেরোতে হবে নদী। সরিসৃপের মতো নিঃশব্দ হতে হবে পদচারণ! একটুও শব্দ হলেই উড়ে যাবে পাখি।

তাবুর সামনে ফিরে এলো সে। চাপা গলায় বললো, “ইটস টাইম!”

তাবুর ভিতরে বসে নিজেদের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো অ্যাসেম্বল করে নিচ্ছিল বাকিরা। কম্ব্যাট ভেস্টের পকেটে ঢুকে যাচ্ছিল স্পেয়ার ম্যাগজিন, হোলস্টারে বসে যাচ্ছিল নাইন এম এম পিস্তল। অ্যাসল্ট রাইফেলের মাথায় স্কোপ বসিয়ে সেটার নাট টাইট করে নিলেন টিম লিডার। চারজনের একটি দল বেরিয়ে পড়লো শিকারের উদ্দেশ্যে। বাকি চারজন সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে থেকে গেল ব্যাক আপ হিসেবে। নদীর ওপারে পাহাড়ের গায়ে এক গোপন স্থানে রয়েছে এক জঙ্গি সংগঠনের ঘাঁটি। সূত্রের খবর এই মুহূর্তে সেই ঘাঁটিতে আছে মাত্র দুজন। তাদের সঙ্গেই গোপন বৈঠক করতে আসছে তাদের নেতা। এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে চায় ওই আটজন।

প্রশিক্ষিত কমান্ডো বাহিনী নিঃশব্দে পেরিয়ে গেল নদী। স্যাটেলাইট ইমেজিং টেকনোলজির সাহায্য নিয়ে তারা আগেই চিহ্নিত করে রেখেছে সামনের পথ। পাহাড় বেয়ে সেই পথে রওনা দিলো তারা। ঘন অন্ধকারকে এক মুহূর্তের জন্য ফিকে করে আকাশ জুড়ে দেখা দিল বিদ্যুতের ঝলকানি। তারপরই কর্কশ একটা শব্দে চারপাশ যেন কেঁপে উঠলো। কাছেই কোথাও বাজ পড়েছে। এই বজ্রপাত অবশ্য ওদের জন্য বড় একটা সুবিধে করে দিলো। এক মুহূর্তের আলোর ঝলকানিতেই ওরা চিহ্নিত করে নিতে পারলো জঙ্গিদের তাবুটা। চাইলে এখনই অ্যাসলট রাইফেলের ট্রিগার টিপে কন্টিনিউয়াস ফায়ারিং করে তাবুটা ঝাঝরা করে দিতে পারে ওরা কিন্তু শত্রুদের প্রাণে মারার উদ্দেশ্যে আসেনি ওরা, এসেছে সংগঠনের মাথাকে অক্ষত অবস্থায় ধরতে।

এক পা এক পা করে তাবুর কাছে এগোতে লাগল ওরা। তাবুর ভিতরে সাদা আলো জ্বলছে, ভেসে আসছে কথাবার্তা। পাহাড়ের ভাষায় কথা বলছে ওরা। একজনের গলাই বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সে কিছু বলছে আর বাকি দুজন ‘হো’ ‘হো’ করে সায় দিচ্ছে তার কথায়।

ওরা যখন তাবুর একেবারে সামনে এসে পড়েছে, বিদ্যুতের গতিতে ভিতরে ঢুকে পড়া যখন স্রেফ মুহূর্তের অপেক্ষা, তখনই তাবুর ভিতর থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো আর তার সঙ্গে সঙ্গেই তাবুর দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো একটা গুলি। টিম লিডারের গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল সেটা। তাবুর ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো দুই সশস্ত্র জঙ্গি। আর উপায় নেই! প্রতিপক্ষ কম্ব্যাট চাইলে, এই পরিস্থিতিতে কম্ব্যাটেই যেতে হবে। দুজনের রাইফেল থেকে নিখুঁত নিশানায় ছোঁড়া দুটো বুলেট দুই জঙ্গিকে কাটা গাছের মতো ফেলে দিলো মাটিতে।

টিম লিডার তাঁর ভেস্টের একটা পকেট থেকে ছোট মাইক বের করলেন। সেটাকে মুখের সামনে ধরে বললেন, “মাস্টার দীপন, ইওর মেন আর ডাউন। এনি অ্যাটেম্পট টু অ্যাক্ট স্মার্ট অ্যাট দিজ পয়েন্ট মে কস্ট ইওর লাইফ! গিভ আপ ইওর আর্মস অ্যান্ড সারেন্ডার!”

কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল নিঃশব্দে। টিম লিডার হাতের ইশারায় বাকিদের অ্যালার্ট থাকতে বললেন। এবার তাঁকে ভিতরে যেতেই হবে ঝুঁকি নিয়ে। চারজনের একজন পা টিপে টিপে চলে গেল তাবুর পিছনদিকে, যাতে মাস্টার দীপন সেদিক দিয়ে পালাতে না পারে। তাবুর একপাশে খাদ, আরেকপাশে রাইফেল তাক করে দাঁড়ালো দুজন।

কিন্তু টিম লিডার তাবুর মধ্যে ঢোকার সুযোগ পেলেন না। তাঁর উপর বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো মাস্টার দীপন। দুজনে ছিটকে পড়লো মাটিতে। দুজনের মধ্যে ধ্বস্তাধ্বস্তি চললো কিছুক্ষণ। তারপর টিম লিডারের বুকের উপর চেপে বসলো মাস্টার দীপন। তার ডানহাতে ধারালো ছুরি। সেই হাত সে উপরে তুললো ছুরিটা প্রতিপক্ষের বুকে বিঁধে দেওয়ার জন্য কিন্তু তার সেই হাত পিছন থেকে ধরে দুমড়ে দিলো একজন।

মিনিট দশেক বাদে মাস্টার দীপনকে হাত বাঁধা অবস্থায় নিয়ে ফেরার পথ ধরলো চারজন। মিশন সাকসেসফুল!

রাত দেড়টা নাগাদ রাজাভাতখাওয়ার উদ্দেশ্যে রওন হলো দুটো গাড়ি।

.

দোকানের মেঝেতে বসে দেওয়ালে হ্যালান দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল অজয়। তার ডান হাতের কড়ে আঙুলের উপর বসে মনের সুখে রক্ত শুষছিল একটা মশা। ফুলতে ফুলতে ঢোলের মতো হয়ে উঠেছিল তার পেটটা কিন্তু অজয় কিছুই টের পাচ্ছিল না।

একটা বিশ্রী শব্দে অজয়ের ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলে সে দেখল দোকানের বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আবছা আলোয় তার চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, একটা ছায়ামূর্তির মতো দেখাচ্ছে। লাঠির মতো একটা জিনিস ধরে আছে সে। সেটা দিয়ে কাচের বয়ামের টিনের ঢাকনার উপর টোকা মারছে আর তার ফলেই টং টং __র শব্দটা হচ্ছে।

“ভাই, দোকান খুলে রেখে মাটিতে বসে নাক দিয়ে জেনারেটর চালালে হবে? কাস্টমার তো তোমার সব বয়াম ফাঁকা করে দেবে গো! দাও দেখি, এক প্যাকেট নেভি কাট। হবে?”

ছায়ামূর্তির কথাটা কানে যেতেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এলো অজয়। শেফ থেকে সিগারেটের প্যাকেট নামাতে নামাতে বাইরে তাকিয়ে দেখলো রাতের অন্ধকার কিছুটা ফিকে হয়েছে। দোকানের ভিতর থেকে রাস্তার ওপারের জঙ্গলের ফাঁক গলে একচিলতে আকাশ দেখা যাচ্ছে। সেই আকাশে এখন ফুটেছে নীলচে আলো। বড় রাস্তার এক ধারে অজয়ের দোকান, আরেক ধারে আছে একটি হাসপাতাল। দোকানের ঠিক উল্টোদিকেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা মেঠো পথ চলে গিয়েছে। সেই পথ ধরে মিনিটখানেক হাঁটলেই সেখানে পৌঁছনো যায়। এই তল্লাটে হাসপাতাল এই একটিই। ফলে অঞ্চলের মানুষের জন্য এটিই ভরসা। চব্বিশ ঘন্টাই রোগী এবং তাদের বাড়ির লোকেদের যাতায়াত চলতে থাকে এখানে আর সে কারণেই অজয়ের এই চা, সিগারেট, ডিম পাউরুটির দোকানের ঝাঁপ কখনো বন্ধ হয় না। মাঝরাত হোক কিংবা ভোর, ঝড়বৃষ্টি আসুক বা শৈত্যপ্রবাহ, এই দোকানে সারাক্ষণ খদ্দের আসতেই থাকে। অজয় এবং তার দাদা অনন্ত শিফটিং ডিউটি করে চালায় এই দোকান। রাত দশটা থেকে সকাল দশটা অজয় বসে দোকানে। তারপর শুরু হয় অনন্ত’র ডিউটি।

দোকানের ছাদ থেকে ঝুলছে কম ওয়াটের এলইডি আলো। একেই তার প্রাণশক্তি কমে এসেছে, তার উপর অমলেট ভাজার তৈলাক্ত ধোয়া লেগে লেগে তার সাদা বলের মতো গোলাকার শরীরটা হয়ে উঠেছে হলদেটে। সেই আলোয় বাইরে দাঁড়ানো লোকটির চেহারা খুব স্পষ্ট বুঝতে পারছিল না অজয়। তবে তার চেহারাটা বেশ বড়সড়। তার পরনে একটা হাফ জ্যাকেট। তাতে প্রচুর পকেট।

অজয় সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিতে সে’ও ঢুকে এলো দোকানে। অজয় দেখতে পেলো লোকটার কপাল থেকে রক্ত ঝরছে, জ্যাকেটের বাঁদিকে, বুকের কাছে ত্যাড়ছা করে অনেকটা কাটা। তার মনে হলো ধারালো কোনো অস্ত্র চালানো হয়েছিল লোকটার বুক লক্ষ্য করে। চোখেমুখে একটা বিধ্বস্ত ভাব তার। এক ঝলক দেখে অজয়ের মনে হলো লোকটা বেশ শক্তিশালী এবং সাহসী।

সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে সবে লোকটা পার্স বের করেছে, এমন সময় ল্যান্ডল” ন ফোনের মতো একটা শব্দ শুরু হলো। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করলো সে আর ঠিক তখনই একটু দূর থেকে ভেসে এলো ফট ফট করে দুটো শব্দ। লোকটা সেই শব্দকে অনুসরণ করে পিছন ফিরে তাকালো। তারপর বাজতে থাকা মোবাইলটা ধরলো কানের কাছে।

“বাঞ্চোত, এইটুকু সময়ও সামলাতে পারলি না তোরা! আবার ফোন করে নালিশ মারাচ্ছিস বাল!”

লোকটা গর্জে উঠলো। বিদ্যুতের গতিতে সে ডানহাতটা পিছন দিকে নিলো। জ্যাকেটের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো তার আগ্নেয়াস্ত্র। চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গলের মেঠোপথ ধরে দৌড় শুরু করলো সে।

উত্তেজনায় থ হয়ে গিয়েছিল অজয় কিন্তু তৃতীয়বার ফট করে শব্দটা হতেই সে সম্বিত ফিরে পেলো।

“আরিশশালা! অ্যাকশন হইতাসে মনে হয়!”

মনের কথাটা মুখে বলেই ফেললো অজয়। রইলো পড়ে দোকান। সে’ও রাস্তা পেরিয়ে ছুটতে শুরু করলো হাসপাতালের দিকে। শব্দগুলো ওদিক থেকেই এসেছে।

অজয় আসিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। জঙ্গলের মধ্যে নিঃশব্দে কেমন করে দৌড়তে হয়, তা তার জানা আছে। সে জ্যাকেটওয়ালার থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দৌড়তে লাগল।

জঙ্গলের দিকটা হাসপাতালের পিছন দিক। এদিকেও একটা এন্ট্রান্স আছে। একটু দূরেই রেলগেট। প্রায়ই গেট পড়ে গিয়ে রাস্তায় যানবাহনের লম্বা লাইন লেগে যায়। সেই যানজটের কারণে মুমূর্ষু রোগী বা অ্যাম্বুলেন্সের যাতে হাসপাতালে ঢুকতে অসুবিধে না হয়, তার জন্যই পিছনদিকের এন্ট্রান্সটা করা হয়েছে।

দেখতে দেখতে আকাশের অন্ধকার আরো কিছুটা কেটে গিয়েছে। সামনেটা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। অজয় দেখলো হাসপাতালের দরজা দিয়ে একটা লোক রুদ্ধশাসে দৌড়ে বেরিয়ে আসছে। তারও হাতে পিস্তল। জ্যাকেটওয়ালাকে দেখতে পেয়েই গুলি চালালো সে। বিপদ বুঝে অজয় এক লাফে বাঁপাশে সরে গিয়ে একটা প্রকাণ্ড পিপুল গাছের আড়ালে চলে গেল। ‘ঠাস’ করে একটা শব্দ ভেসে এলো। গাছের কাণ্ডের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে অজয় দেখলো হাসপাতালের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। তার দিকে বন্দুক নিক্ষেপ করে রয়েছে জ্যাকেটওয়ালা।

২

দু’বছর বাদে:

ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘর ছুঁতেই স্তব্ধ হয়ে গেল ডলবি স্পিকারগুলো। আচমকাই যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো সময়। থেমে গেল আলোয় ভেসে যাওয়া স্টেজের উপরে মাইনে করা নর্তকীদের শরীরি হিল্লোল। স্টেজটা হারিয়ে গেল অন্ধকারে। একটা একটা করে নিভতে শুরু করলো লাউঞ্জের বাহারি রঙিন আলোগুলো।

বিন্দু ঢুলু ঢুলু চোখে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে পঞ্চাশোর্দ্ধ স্যামুয়েলের মনে হচ্ছিল তাঁর দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে আসছে জমাট বাঁধা অন্ধকার। টেবিলের উপর থেকে হুইস্কির গ্লাসটা শেষবারের মতো তুলে নিলেন তিনি। শেষ পেগের অবশিষ্ট অংশুটুকু একবারে পান করে নেবেন ভেবে গ্লাসটাকে ছোঁয়ালেন ঠোঁটে কিন্তু চুমুক আর দেওয়া হলো না স্যামুয়েলের। একটা মেয়েলি কন্ঠ কেড়ে নিল তাঁর মনযোগ। তাঁর থেকে ফুট দশেক দূরে একটা টেবিলে বসে আছে একটি মেয়ে। তার দিকে এর আগেও বারকয়েক চোখ গিয়েছে স্যামুয়েলের কিন্তু বারের ভিতরে আলোর সেটিং এমন যে তার পিছনদিকে একটি নীলচে আলো থাকার ফলে স্যামুয়েল কেবল একটি সিল্যুয়েট দেখেছেন। তা ছাড়া যতবারই সেদিকে চোখ গিয়েছে, তিনি দেখেছেন মেয়েটি টেবিলের উপর মুখ গুঁজে বসে আছে। তার মাথার কালচে সোনালি চুল নেমে এসে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে মুখখানা, সে সুশ্রী না কুশ্রী তা বোঝার সুযোগ পাননি স্যামুয়েল। তবে এখন তার মুখখানা দেখা যাচ্ছে, কারণ বাহারী আলোর খেলা বন্ধ হয়ে এখন জ্বলে উঠেছে সিলিং থেকে ঝুলন্ত স্যান্ডেলিয়ারের ওয়ার্ম অ্যাম্বার এলইডি।

বাদামী শার্টের উপর কালো ওয়েস্টকোট পরা ছোটখাটো চেহারার একটি ওয়েটারের সঙ্গে তর্কাতর্কি চলছে মেয়েটির। এলোপাথাড়ি হাত নাড়ছে সে।

“বোলা না, ফ্রাইডে কো সারে প্যায়সা দে দুঙ্গি! কাহেকো খিচির খিচির কর রহা হ্যায় শালে!”

জড়ানো গলায় মুখঝামটা দিলো মেয়েটি। তার মুখের উপর এসে পড়েছে স্যান্ডেলিয়ারের আলো। সে আলোয় বড়ই সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। যেমন সুন্দর তার মুখশ্রী, তেমনই তার শরীরের ভাঁজগুলি। পরনে তার স্লিভলেস টপ, ফলে দুটি হাত একেবারে অনাবৃত অবস্থায় ধরা দিচ্ছে। মাখনের মতো মসৃণ তার ত্বক। হলদে এলইডির আলো যেন পিছলে পড়ছে সেই ত্বক বেয়ে।

স্যামুয়েলের জিভে যেন হুইস্কির শেষ চুমুকটা সুস্বাদু ঠেকল। ওয়েটারটি মেয়েটির কাঁধে একটা আলতো ঠেলা দিয়ে বললো,

“প্যায়সা কওন মাঙ্গা রে তুঝসে? শালি ভিখারি, তেরি অওকাত হ্যায় প্যায়সে দেনে কি? বার বনধ হোনে কা টাইম হো গ্যায়া। চল, চল নিকাল অভি।”

ইতিমধ্যেই স্যুটবুট পরা এক সৌম্যদর্শন ব্যাক্তি এসে দাঁড়িয়েছেন স্যামুয়েলের সামনে। তিনি সামান্য ঝুঁকে অত্যন্ত মোলায়ম স্বরে বললেন,

“এক্সকিউজ মি স্যার! সরি টু বদার ইউ! অ্যাকচুয়ালি উই আর ক্লোজিং নাউ!”

ঘোলাটে চোখে স্যামুয়েল তাকালেন তাঁর দিকে। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে আশপাশটা দেখলেন একবার। হ্যাঁ, বিরাট লাউঞ্জে একমাত্র তাঁর এবং ওই মেয়েটির টেবিল বাদে সব টেবিলই খালি।

বেসামাল শরীরটাকে চেয়ার থেকে টেনে তুলতে একটু কষ্ট করতে হলো স্যামুয়েলকে। নিট পান করা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন অনেকদিন। আজ যে কেন আবার সেই বেয়ারা শখটা জাগল! কাউন্টারের দিকে এগোতে এগোতে স্যামুয়েল টের পেলেন তাঁর পা ঠিকঠাক পড়ছে না মেঝেতে, মাথাটা যেন ভীষণ ভার ভার লাগছে।

বিল মিটিয়ে বারের পার্কিং লটে পৌঁছতে তাঁর লেগে গেল আরো মিনিট পাঁচেক। গাড়িতে ওঠার সময়, এক মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে হলো বারের এন্ট্রান্সে আলো আঁধারিতে একটু আগের স্যুট বুট পরা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো লক্ষ করছেন স্যামুয়েলকেই। বেসামাল হয়ে পড়ে কেউ কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে গেলেই ছুটে এসে পরিস্থিতি সামলে নেবেন।

কোনো অঘটন অবশ্য ঘটলো না। স্যামুয়েলের একটি বিশেষ গুণ আছে। নেশার মাত্রা যতই বেশি হোক, গাড়ির স্টিয়ারিং একবার ধরে নিলে তিনি সুপার স্টেডি মোডে চলে যান আর যাই হোক, নেশার ঘোরে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলবেন, এমন আশঙ্কা তাঁর মনে কস্মিনকালেও জাগেনি।

আজও স্যামুয়েলের অডি মসৃণভাবেই পেরিয়ে গেল পার্কিং লট কিন্তু গেট দিয়ে বেরোনোর সময়ই ঘটে গেল বিপত্তি। কোথা থেকে একটা অবয়ব একেবারে গাড়ির সামনে এসে পড়লো। সজোরে ব্রেক কষলেন স্যামুয়েল। গাড়ি থেমেও গেল কিন্তু থামবার ঠিক আগের মুহূর্তে ধপ করে একটা ভোঁতা শব্দ কানে এলো তাঁর। নেশার ঘোর কাটতে এক সেকেন্ডও লাগল না। বিদ্যুৎ গতিতে গাড়ি থেকে নেমে এলেন তিনি। দেখলেন একটি মেয়ে গাড়ির সামনে পড়ে রয়েছে। ডান হাঁটুটা দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে রয়েছে সে, যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছে তার মুখ। স্যামুয়েলের দৃষ্টি এখনো একটু ঝাপসা, তবু তাঁর মনে হলো এই মেয়েটিকেই একটু আগে তিনি লাউঞ্জে দেখেছিলেন।

ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করামাত্রই গেটের সামনে থেকে সিকিউরিটি গার্ড ছুটে এলো। মেয়েটির চিৎকার শুনে এগিয়ে এলেন সেই স্যুট পরা ভদ্রলোক। স্যামুয়েল একটু ঘাবড়ে গেলেন। এমন ঘটনা তাঁর জীবনে এই প্রথম ঘটেছে। তিনি সিকিউরিটি গার্ডটিকে বলতে চাইলেন যে দোষটা আদৌ তাঁর ছিল না কিন্তু তার প্রয়োজন হলো না। স্যুট পরা ভদ্রলোক বললেন তিনি গোটা ঘটনাটাই লক্ষ্য করেছেন এবং জানেন বেসামালভাবে হাঁটতে গিয়ে পায়ের স্টিলেটো জুতোর লম্বা হিল হড়কে গিয়ে মেয়েটিই হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়েছিল স্যামুয়েলের গাড়ির সামনে।

যদিও মেয়েটির চোট খুব গুরুতর বলে মনে হচ্ছিল না, তবুও স্যামুয়েল তাকে নিজের গাড়িতে করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যে অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর ফ্ল্যাট, সেখানে নিচের ফ্লোরেই এক ডাক্তার দম্পতি থাকেন। তার সঙ্গে দুজনেরই ভীষণ খাতির। যদিও এটা তাঁদের ঘুমে কাদা হয়ে থাকার সময়, তবু স্যামুয়েল নিশ্চিত, তাঁর অনুরোধ মানুষ দুটি ফেরাবেন না।

কোচি শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত স্যামুয়েলের অ্যাপার্টমেন্ট। নিশুতি রাতে রাস্তা একেবারে শুনশান। ঝড়ের বেগে গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন তিনি। মাত্র পনেরো মিনিটেই অতিক্রম করে ফেললেন পথটুকু। ডাক্তার দম্পতি জেগেই ছিলেন। মেয়েটির চোট পরীক্ষা করে তাঁরা জানালেন চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে সঙ্গে এ কথাও বললেন যে তার গায়ে বেশ জ্বর আছে। নেশায় বুঁদ হয়ে রয়েছে মেয়েটি। কথা জড়িয়ে গিয়েছে তার। এই অবস্থায় তাকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসতে স্যামুয়েলের মন সায় দিলো না। তাঁর ফ্ল্যাটের গেস্টরুমটা ফাঁকাই পড়ে আছে। ঠিক করলেন, আজ রাতটুকু অন্তত অসুস্থ মেয়েটিকে সেখানেই থাকতে দেবেন।

নিজের ফ্ল্যাটে পৌঁছে এতটাই ক্লান্ত বোধ করছিলেন তিনি, যে বাইরের পোশাক বদল করার শক্তিটুকুও পেলেন না। নরম বিছানায় এলিয়ে দিলেন পঞ্চান্ন বছরের সুঠাম শরীরটাকে।

৩

সকাল সাড়ে সাতটায় কর্কশ শব্দে বাড়ির কলিং বেলটা বেজে উঠতেই বিরক্তিতে মুখ ভ্যাটকালো তানিয়া। বুড়োটার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই? ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি চলছে গতকাল মাঝরাত থেকে। রাস্তায় কোমর সমান জল, একটা মানুষের দেখা নেই; সাইকেল, রিক্সার শব্দ নেই, অথচ তিনি ঠিক ঘড়ির কাঁটা ধরে এসে হাজির।

তানিয়া সামনের বছর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে। প্রতিদিন নিজের ঘরে প্রাইভেট টিউটরদের সঙ্গে তার কেটে যায় অনেকটা সময়। আজ বুধবার, ভূগোল পড়ার দিন। মলয় স্যার তাকে ভূগোল আর সোশিওলজি পড়ান কিন্তু তেষট্টি বছরের প্রবীণ মলয় স্যারের কাছে পড়তে একদম ভাল লাগে না তানিয়ার হাড় জিরজিরে চেহারা, গালচোপড়া ভাঙা একটা মানুষ। চোখের চশমাটার ওজনই বোধহয় কয়েকশো গ্রাম হবে।

আজ সকালে তানিয়ার ঘুম ভেঙেছে মুষলধারে বৃষ্টির শব্দে। তার বাবা খুব শৃংখলাপরায়ণ মানুষ। সমস্ত কাজ নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে করেন। সে’ই তিনিও আকাশের অবস্থা দেখে আজ অফিস যাও” র পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়েছেন। তা দেখে তানিয়া মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়েছিল যে এই দুর্যোগের মধ্যে মলয় স্যার আসবেন না কিন্তু বেলের শব্দটা তানিয়ার হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল। বিছানার উপর থেকে বই খাতা সরিয়ে সেটাকে ভদস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আনতে তানিয়া শুনতে পেলো বাবা মলয় স্যারকে বলছেন, “কাকু, আপনি এই বৃষ্টির মধ্যে এলেন কী করে? এই অবস্থায় কেউ বেরোয়! দুমদাম বাজ পড়ছে! অন্যদিন পড়িয়ে দিতেন না হয়!

মলয় স্যারের পাতলা কন্ঠস্বর তানিয়ার কান অবধি এসে পৌঁছলো না। বিরক্তিতে মুখ বেঁকাল সে। তার গলা দিয়ে “হুঁ” করে একটা শব্দ বেরোলো।

.

অনেকদিন বাদে অপ্রত্যাশিতভাবে সদাব্যস্ত স্বামীকে ঘরে পেয়ে তানিয়ার মা সুলগ্না বেশ খুশি হয়েছিলেন। দুজনের জন্য যত্ন করে আদা, এলাচ দিয়ে দুধ চা করে বেডরুমে নিয়ে এলেন তিনি। তানিয়ার বাবা শান্তনু তাঁকে দেখে বললেন,

“লোকটা খ্যাপা নাকি, বলো তো! এই অবস্থায় কেউ বাইরে বেরোয়? কী হতো আজ না পড়াতে এলে? আমরা কি ওঁর কাছে কৈফিয়ত চাইতাম? বয়স হয়ে গেছে, তার উপর একা মানুষ! এই আকাশভাঙা বৃষ্টিতে একটা মান্ধাতার আমলের ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়েছেন! একটা অসুখ বিসুখ বাঁধালে কে দেখবে?”

সুলগ্না সেরামিকের ডিশের উপর কাপ বসিয়ে তাতে চা ঢেলে শান্তনুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“আমার মনে হয় একা একা বাড়িতে থাকতে পারে না বলেই সারাদিন বাউন্ডুলেপনা করে বেড়ায়। শুধু যে টিউশনের জন্য বেরোন, তা নয় কিন্তু। দিনের মধ্যে কতবার যে মলয়কাকুকে আমি রাস্তা দিয়ে এদিক ওদিক যেতে দেখি! সকাল, দুপুর, সন্ধে, রাত সাড়ে দশটা, সব সময় কাকু রাস্তায়! এ পাড়ায় হেন কোনো লোক নেই যার সঙ্গে কাকুর আলাপ নেই। কারোর না কারোর সঙ্গে কথা বলতে দেখবে তুমি ওঁকে সবসময়!”

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন শান্তনু। বাইরে তুমুল বৃষ্টি চলছে। ঝাপসা দেখাচ্ছে দূরের জিনিস। দেখা যাচ্ছে মলয় স্যারের বাড়িটাও। সেদিকেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন শান্তনু। চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,

“সত্যিই, ছোট মেয়েটা চলে গিয়ে কাকুকে একেবারে একা করে দিয়েছে। বড়’র কথা আর কী বলবো! কবেই খরচের খাতায় চলে গেছে সে। বাড়ির পথ তো ভুলেই গেছে। অবশ্য, আসবেই বা কোন মুখে? কোনোরকম যোগাযোগও বোধহয় রাখে না!”

৪

সাড়ে আটটা নাগাদ ঘুম ভাঙল স্যামুয়েলের। বেডরুমের জানলায় টাঙানো পর্দার ফাঁক দিয়ে তাঁর মুখের উপর এসে পড়ছিল রোদের আলো। গতকাল রাত্রে নেশার ঘোরে এসি অন করতেই ভুলে গেছিলেন। বিছানায় ফ্যানের রিমোটটা পড়ে ছিল। কোনোরকমে সেটার ‘অন’ বাটনটা প্রেস করেই ডুব দিয়েছিলেন ঘুমের সমুদ্রে। ফ্যানের ফুল স্পিডের হাওয়া পর্দাগুলোকে থেকে থেকে নাচাচ্ছে আর তারই সুযোগ নিয়ে মাঝে মাঝে ঘরে ঢুকে পড়েছে সকালের রোদ।

শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসতেই স্যামুয়েল টের পেলেন তাঁর মাথাটা এখনো ভার হয়ে রয়েছে। প্যান্টের পকেটের মধ্যে মৃদু কম্পন শুরু হলো। মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। স্ক্রিনে কলারের নামটা দেখামাত্র মাথার ভার ভাবটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল তাঁর। কল করছেন গোপাল শ্রীবাস্তব।

উত্তরবঙ্গের কাসেমগাওঁতে স্যামুয়েলের একটি রিসর্ট আছে। গোপাল সেই রিসর্টের ম্যানেজার। পাহাড় আর জঙ্গলের ঘেরাটোপে নদীর ধারে এই রিসর্টটি তিনি গড়ে তুলেছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। এক স্থানীয় গ্রামবাসীর বাড়ি লিজ নিয়ে তার ভোল সম্পূর্ণ বদলে ফেলে রিসর্টে পরিণত করেছিলেন। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে সেটি অসম্ভব জনপ্রিয়ও হয়েছিল। সারা বছর ট্যুরিস্টের ভিড় লেগে থাকত সেখানে। প্রায়শই বিনম্রভাবে ওয়েবসাইটে লিখে দিতে হতো এই মুহূর্তে আমরা আর বুকিং নিচ্ছি না!

কিন্তু খেলাটা বদলে গেল বছর দেড়েক আগে যখন এই রিসর্টের থেকে কিছুটা দূরে চালু হলো ‘স্যালাম্যান্ডার’ নামে আরেকটি রিসর্ট। নদীর ঠিক মাঝখানে জেগে আছে একটি ছোট ভূখন্ড। সেটাকে দেখতে ঠিক একটা দ্বীপের মতো। সেই দ্বীপেরই লেজের মতো একটা সরু অংশ এসে মিশেছে নদীর ধারে। ঠিক এই জায়গাটাতেই গড়ে উঠেছে স্যালাম্যান্ডার। লেজের মতো অংশটাকে কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘিরে তারা জায়গাটাকে প্রাইভেট আইল্যান্ডের মতো করে নিয়েছে। ফলে সেটি অতিথিদের জন্য হয়ে উঠেছে একটি বাড়তি আকর্ষণ। দ্বীপে বসে গানবাজনা করা যায়, ছবি তোলা যায়, পিকনিকও করা যায় খাবার নিয়ে গিয়ে। এই অস্ত্র দিয়েই স্যালাম্যান্ডার বাজিমাত করে দিয়েছে। ট্যুরিস্টদের ভিড়টা সরে গিয়েছে তার দিকে। রেণুতে ইদানীং সেসব মানুষই আসে, যারা হৈচৈ থেকে অনেক দূরে নিরালায় সময় কাটাতে চায় কিন্তু সেরকম মানুষের সংখ্যা অতি নগন্য! ফলে আড়াই বছর রমরমিয়ে ব্যাবসা করার পর রেণুর রথের চাকাটা থেমে গিয়েছে। লাভ তো দূরের কথা, ক্রমশই বাড়ছে তার ক্ষতির পরিমাণ। অতিথিদের বিলাসবহুল পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আপস করতে চাননি স্যামুয়েল। অতিথিদের এখনো সেরা মানের পরিষেবা দেয় রেণু। রিসর্টে নতুন অতিথি এলেই তাদের অভ্যর্থনা জানাতে রুমে পাঠানো হয় ফ্রেশ অর্কিডের বোকে কিন্তু সেসব বজায় রাখতে গিয়ে যে টাকা খরচ হয়, তার অনুপাতে রোজগার হয় সামান্যই।

আর্থিক সঙ্কটের কারণে গত ছ’মাসে রিসর্টের চাকরি ছেড়েছে পাঁচজন কর্মচারী। যারা বাজার থেকে জিনিসপত্র এনে সরবরাহ করতো রিসর্টে, নিয়মিত টাকা পাওয়া বন্ধ হওয়ায় তাদের আসাযাওয়াও অনিয়মিত হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি নিত্যনতুন ছোটখাটো সমস্যা লেগেই আছে। ইদানীং সকাল সকাল গোপালের ফোন এলে এই কারণেই বিরক্ত বোধ করেন স্যামুয়েল। তাঁর মনে সন্দেহ জাগে, গোপাল নির্ঘাৎ কোনো দুঃসংবাদ দেবে।

আজও স্যামুয়েলের অনুমান মিলে গেল। রিসর্টের ইলেক্ট্রিক বিল দেওয়া হয়নি গতমাসে। গোপাল ভেবেছিলেন এই মাসেই দু’মাসেরটা একবারে দেবেন কিন্তু অবস্থা এতটাই করুণ, যে সেটাও সম্ভব হবে বলে তাঁর মনে হচ্ছে না।

কিছু টাকা রিসর্টের অ্যাকাউন্টে ট্র্যান্সফার করছেন, এ কথা বলে ফোন ছাড়লেন স্যামুয়েল। আর ভাল লাগছে না তাঁর। এভাবেই চলছে বিগত কয়েক মাস। মোবাইলটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলতে না ফেলতেই সেটা আবার কেঁপে উঠল। কল আসছে ‘পিঙ্ক মুন’ থেকে। ফোন তুলতেই ওপার থেকে বিনম্র কণ্ঠে এক মহিলা জানালেন গতকাল একটি টেবিলের নিচ থেকে একটি সিগারেট কাম কার্ড হোল্ডার উদ্ধার করেছে তাঁদের এক সাফাইকর্মী। সিগারেট হোল্ডারের উপরে এম্বস করা স্যামুয়েলের নাম, ফোন নাম্বার দেখে তাঁর সঙ্গে গতকাল রাত্রেই যোগাযোগ করা হয়েছিল। আজ সকালেও দুবার তাঁকে কল করে পাওয়া যায়নি। অগত্যা তিনি আবারও যোগাযোগ করেছেন।

স্যামুয়েল জানালেন বেলার দিকে গিয়ে তিনি হোল্ডারটা সংগ্রহ করে নেবেন। জিনিসটা জরুরি নয় বটে, তবে সেটি বেশ দামী। খাঁটি সোনার তৈরি, ঢাকনার মাঝবরাবর একটা হীরে বসানো আছে।

ব্রেকফাস্ট আর স্নান সেরে সাড়ে দশটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোলেন স্যামুয়েল। তাঁর মাথায় অজস্র চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। একটি বিশেষ কারণে বেশ উদ্বেগে রয়েছেন তিনি। আগামী সপ্তাহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের জন্য দিল্লি যেতে হবে তাঁকে কিন্তু তার আগে একটা বড় সমস্যার সমাধান তাঁকে করে ফেলতে হবে। আজ বুধবার। হাতে আর মাত্র চার পাঁচ দিন। কী করে কী করবেন, কিছু ভেবে উঠতে পারছেন না তিনি। এই উদ্বেগই গতকাল তাঁকে বাধ্য করেছিল মাত্রাতিরিক্ত পান করে ফেলতে।

.

পিঙ্ক মুনের বিলিং কাউন্টার থেকে তিনি যখন সিগারেট হোল্ডারটা নিচ্ছেন, তখন স্যামুয়েল লক্ষ্য করলেন একটু দূরে একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি লোক। সে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকেই। দুজনের চোখাচোখি হতেই লোকটি এগিয়ে এলো। কেরলীয় ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, গতকাল যে মেয়েটি তাঁর গাড়ির সামনে পড়ে গিয়ে চোট পেয়ছিল, তার কী অবস্থা?

স্যামুয়েলের মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের ঘটনাটা। এই লোকটিই হিন্দিতে কথা বলছিল মেয়েটির সঙ্গে। এই শহরতলিতে হিন্দি ভাষার চল একেবারে নেই বললেই চলে অথচ লোকটির হিন্দি শুনে তাঁর একবারও মনে হয়নি সে কষ্ট করে হিন্দি ভাষাটা রপ্ত করেছে। লোকটির কাছ থেকে তিনি মেয়েটির সম্বন্ধে কিছু তথ্য পেলেন।

বাড়ি ফিরতেই স্যামুয়েলের কাজের লোক ভেলু বললো গেস্টরুমের অতিথির ঘুম ভেঙেছে। কে তাকে এই অচেনা জায়গায় নিয়ে এসেছে তা সে জানতে চায়। তার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কেউ তার সঙ্গে কোনো অপকর্ম করেছে বলেও সে আশঙ্কা করছে। বিপদ বুঝে ভেলু গেস্টরুমের দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছে।

স্যামুয়েল তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে তালা খুললেন। ভিতরে ঢুকে দেখলেন বিছানার উপর থম মেরে বসে আছে মেয়েটি। তার দু’চোখে ক্রোধের আগুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *