নেটওয়ার্ক – ২০

২০

দেখতে দেখতে কাসেমগাঁওতে পনেরো দিন কেটে গেল রোহিণীর। প্রথমদিন ভোরে জানলার পর্দা সরানো মাত্রই যে ছবির মতো কাসেমগাঁওকে দেখে স্বর্গরাজ্য মনে হয়েছিল, তার সৌন্দর্য্য এখন রোহিণীর চোখে সয়ে গিয়েছে। সে’ও পুরোনো হয়ে গিয়েছে রিসর্টের কর্মীদের কাছে। তবে প্রতিদিন সন্ধে থেকে তাকে নতুন করে মেলে ধরতে হয় হাই প্রোফাইল খদ্দেরদের জন্য।

এই রিসর্টে সাধারণ ট্যুরিস্ট আসে না। তাদের ভিড় স্যালাম্যান্ডারে। এর মধ্যে চারদিন সে বাইরে গিয়েছে সেই লেপচা মেয়েটির সঙ্গে। ওর নাম তনুজা। বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে ওদের মধ্যে। যাওয়ার পথে জঙ্গলে, নদীর ধারে অনেক ট্যুরিস্টকেই সে দেখেছে কিন্তু তারা কেউ স্যামের রিসর্টে ওঠেনি। বছর ত্রিশ বত্রিশের এক পুরুষকে প্রতিবারই দেখেছে রোহিণী। ছোটখাটো চেহারা তার, পরনে অতি সাধারণ পোশাক আর মাথায় সবসময় কানঢাকা টুপি। লোকটির চাহনি ভাল না। জীবন রোহিণীকে পুরুষের চাহনি নির্ভুলভাবে চিনে নিতে শিখিয়েছে। তনুজার সঙ্গে সে বিষয়টা নিয়ে আলোচনাও করেছে। তনুজার ধারণা লোকটা হয় স্থানীয় অফানেজের কর্মচারী অথবা বড় রাস্তার ধারের গেস্টহাউজে এসে উঠেছে। এতদিন ধরে স্যালাম্যান্ডারে থাকার মতো পয়সা তার থাকার কথা নয়।

তবে গত পরশু তুমুল বৃষ্টির মধ্যে একটা অল্পবয়সী কাপল এসে রুমের খোঁজ করেছিল ওদের রিসর্টের রিসেপশনে। তারা এখনো আছে রিসর্টে। আজ সকালে রোহিণী ছাদে উঠেছিল কাচা জামাকাপড় মেলতে। তখন সেই কাপলের সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছে তার। রোহিণী জানে যে জীবিকা সে বেছে নিয়েছে বা ভগবান তার জন্য বেছে দিয়েছেন, সেই জীবিকা সমাজে মেয়েদেরকে চিহ্নিত করে ‘নোংরা মেয়েছেলে’ হিসেবে কিন্তু পেশা নোংরা হলেও, রোহিণী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে বরাবর। নোংরা জামাকাপড়, বিছানা, বালিশের ওয়্যার, বেড শিট, থালা বাটি, কোনো কিছুই সে বরদাস্ত করে না এবং নিজের জিনিস পরিষ্কার রাখার দায়িত্বটা সে নিজেই পালন করতে পছন্দ করে। তনুজা অনেকবার তার ঘর থেকে নোংরা জিনিস নিয়ে যেতে চেয়েছে কেচে দেওয়ার জন্য কিন্তু সে দেয়নি। কাপড় কাচার ডিটারজেন্ট সে আনিয়ে নিয়েছে। তনুজার কাজ শুধু সেগুলো নিয়ে গিয়ে ছাদে মেলে, শুকিয়ে আবার ঘরে দিয়ে যাওয়া। আজ সে রিসর্টে নেই। অসুস্থ মা’কে দেখতে বাড়ি গিয়েছে, তাই রোহিণীকেই ছাদে উঠতে হয়েছিল।

রোহিণীর ঘরে প্রতি সন্ধ্যায় নতুন নতুন অতিথি আসে বটে কিন্তু একজন তার স্থায়ী খদ্দের। গোপালদা বলেছেন তিনি এই জেলার ডিএসপি কিন্তু বকলমে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পুলিশ প্রশাসনের মাথা তিনিই। এসপি তাঁর পকেটে। তাঁর এক ভয়ংকর কুকর্মের নথি আছে ডিএসপির কাছে। সেটাকেই হাতিয়ার করে এসপিকে ঠুটো জগন্নাথ বানিয়ে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর কারবার। তনুজা বলেছে রোহিণীর আগে আকাঙ্খা নামে একটি মেয়ে এই রিসর্টে হস্টেসের কাজ করতো। তার দায়িত্ব ছিল প্রতি রাতে ডিএসপিকে খুশি করা কিন্তু মাস দেড়েক আগে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায় সে। ডিএসপি সাহেবের শরীরের খিদেটা তীব্র। টাকাপয়সার ভাগে একটু ওদিক হলেও তিনি মেনে নেন কিন্তু রাত্রে বিছানায় নারী শরীর তাঁর চাই’ই চাই। সেই সাপ্লাইটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনিও বেঁকে বসেছিলেন। ফলে অনেক গোপন ‘অপারেশন’ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রোহিণী তনুজার কাছে জানতে চেয়েছিল অপারেশন বলতে সে কী বোঝাতে চেয়েছে কিন্তু শুকনো একটা হাসি ছাড়া কোনো জবাব সে পায়নি।

এখন বিকেল। রিসর্টের জানলা দিয়ে অস্তগামী সূর্য দেখা যায় না কিন্তু দিনের এই সময়টায় আকাশটাকে অন্যরকম দেখায়। আলো যত কমে আসে, ততই তার কমলা রঙ ক্রমশ তামাটে হতে হতে এক সময় বেগুনি হয়ে যায়। রোহিণীর মনে হয় কাসেমগাঁওয়ের এই রিসর্টে ট্যুরিজমের আড়ালে পাপকাজের যে প্রক্রিয়াটা চলতে থাকে, তারই প্রতিফলন দেখা যায় পশ্চিমের আকাশে।

সোয়া পাঁচটার সময় তনুজা এসে কফি দিয়ে গেল। শরীর বিক্রি করার জন্য তাকে আনা হয়েছে এখানে। যিনি এনেছেন, রোহিণীর শারীরিক সুস্থতার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত যত্নবান। ঘড়ির কাঁটা ধরে দিনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয় চলে আসে তার ঘরে। কফিটার স্বাদ বেশ ভাল লাগে রোহিণীর। এরকম কফি অন্য কোথাও খায়নি সে।

কাপটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে ওয়ার্ডরোবটা খুলল সে। কোচি’র পিঙ্ক মুন বারে সেই রাত্রে যে স্লিভলেস টপটা সে পরেছিল, সেটার কোমরে একটা বেল্ট আছে। সেই বেন্টের বাকলটি বেশ বড়। একটি প্রজাপতির আকারে সেটি তৈরি। অ্যালয় মেটালের এই বেল্ট বাকলটির এক জায়গায় ছোট্ট একটা ফাঁকা জায়গা কিছুছ। সেখানে নখ দিয়ে একটু চাপ দিলেই প্রজাপতির উপরের আর নিচের অংশ আলাদা হয়ে যায়। নিচের অংশে তুলো কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে একটি সিম কার্ড। যে জীবন সে পিছনে ফেলে এসেছে, এই সিম কার্ড তাকে যুক্ত করে সেই জীবনের কিছু কিছু অংশকে। এমন কিছু অংশ যেগুলোকে সে বাদ দিয়ে উঠতে পারেনি

ফুরসৎ মতো এই সিম কার্ড বের করে মোবাইলে লাগায় রোহিণী। তার মোবাইলে যে সিমটা লাগানো ছিল, সেটা কোচিতে থাকতেই বাতিলের খাতায় চলে গিয়েছিল। বদলে মোবাইলে ভরে দেওয়া হয়েছিল নতুম সিম। ডুয়াল সিম কার্ড স্লট থাকার ফলে এই মোবাইলে দ্বিতীয় সিমটা ভরে নিতে সমস্যা হয় না তার। কাসেমগাঁওতে আসার পরেও বারপাঁচেক এই সিম ব্যাবহার করেছে রোহিণী। তাকে করতেই হয়।

একটি বিশেষ নাম্বারে এসএমএস করলো রোহিণী। এখানে এসে থেকে এই সিমে সে ইন্টারনেট ব্যাবহার করেনি।

মিনিট দুয়েক বাদে ইংরিজি হরফে লেখা বাংলা অক্ষর জবাব এলো, “ekhon onektai bhalo. Chinta koris na. Amra achhi to. Nijer kheyal rakh”

এক মুহূর্তের জন্য রোহিণীর চোখের কোল ঠেলে জল বেরিয়ে এসে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। কত কথা, কত স্মৃতি যে হুড়মুড় করে চোখের সামনে উঠে আসতে চাইল ছবি হয়ে, তার হিসেব নেই। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদলো রোহিনী। বুকের জমাট বেঁধে থাকা কষ্টগুলোকে বেরিয়ে যেতে দিলো। যে জীবন সে বেছেছে, যন্ত্রণা সেখানে নিত্যসঙ্গী। সে জীবনে যন্ত্রণাই ক্ষত তৈরি করে, যন্ত্রণাই তাতে প্রলেপ দেয়। তাই তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া চলবে না।

দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা ছয়ের ঘর স্পর্শ করলো। ব্যক্তিগত জীবনকে গোপন কুঠুরিতে পাঠিয়ে সেজেগুজে সন্ধের জন্য তৈরি হয়ে নিলো সে। একটু বাদেই দরজায় টোকা পড়বে। নতুন ক্লায়েন্টকে নিয়ে আসবেন গোপালদা।

২১

ক্লারেন্টের কাছ থেকে আক্ষরিক অর্থে কড়া হুমকি শুনে মোবাইলটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখলেন অনামিত্র। বড্ড বিধ্বস্ত বোধ করছেন তিনি। ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির কাজ যে কী ঝক্কির, তা যেন প্রতিনিয়ত নতুন করে টের পান তিনি। দুই পক্ষের মাঝে হুকুমের গোলাম হয়ে থাকার মতো একটা কাজ। এক পক্ষ জিনিস পাঠাবে, আরেক পক্ষ সে জিনিস নেবে। মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে সে জিনিস এক পক্ষের ঘর থেকে তুলে আরেক পক্ষের ঘরের দরজায় গিয়ে পৌঁছনো, এই হলো তাঁদের কাজ কিন্তু এই জিনিস পৌঁছনোর প্রক্রিয়াটি প্রায়শই বিভিন্ন কারণে বিঘ্নিত হয়। জলপথ এবং বায়ুপথে সমস্যা কম কিন্তু সড়কপথে যে কখন কোন ঝামেলা মাথা তুলে দাঁড়াবে, তার কোনো ঠিক নেই। কখনো পথ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনতার বিক্ষোভ, নাগরিকদের প্রতিবাদ মিছিল, কখনো রাজনৈতিক সংঘর্ষ বা জাতিদাঙ্গা। কোনো একটা হলেই হলো। ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ট্রাক, অয়েল কন্টেনার, কারগো ভ্যানগুলিকে। এর উপর আছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নিজস্ব হিসেবনিকেশ। সেখানে সব ঠিক থাকলে সড়কপথ মসৃণ কিন্তু হিসেবে সামান্য গোলমাল হলেই তারা রাস্তার মাঝে টুল পেতে, বাঁশ টাঙিয়ে যানবাহন আটকে দেয়।

অনামিত্রদের কোম্পানিকে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে শেষের কারণটির জন্যই। উত্তরবঙ্গের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়মিত যাতায়াত করে তাঁদের কন্টেনার ট্রাক আর কারগো ভ্যান। বড় বড় অর্ডার আসে ওখানকার সাপ্লায়ার, ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে কিন্তু গত দেড়মাস ধরে সে অঞ্চলে কন্টেনার পাঠানো এমনই ঝঞ্জাটের বিষয় হয়ে উঠেছে, যে অনামিত্র রীতিমতো দিশেহারা বোধ করছেন। বিগত কয়েকদিনে সমস্যা কিছুটা কমেছে অবশ্য কিন্তু আগের সেই মসৃণতা দূর অন্ত।

কিন্তু জিনিসের আদানপ্রদান যে দুই পক্ষের মধ্যে হয়, তারা অনামিত্রদের এই সমস্যাকে আমল দিতে নারাজ। কন্টেনার ট্রাক সময়মতো গিয়ে না পৌঁছলেই তারা ফোনে, মেসেজে, মেলে বাপ-বাপান্ত করে ছেড়ে দেয়। আজও ঠিক সেটাই হয়েছে। আজকাল কেদার স্যারের অভাব বড় বেশি করে অনুভব করেন অনামিত্র। এই সমস্যা নতুন নয়। প্রায়ই হয়ে থাকে কোথাও না কোথাও কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে স্যার যে কীভাবে নিজেকে একেবারে ঠান্ডা রাখতেন, তা ভেবে পান না তিনি। অনামিত্রও ঠান্ডা মাথার মানুষ হিসেবেই পরিচিত তাঁর অফিসে কিন্তু আজকাল এত রুক্ষ ব্যাবহার তাঁকে পেতে হচ্ছে, যে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারছেন না তিনি।

আজ তো সবকিছুর সীমা পেরিয়ে গিয়েছে ফোনের ওপারে বসা লোকটা। এত স্পর্ধা যে, বলে দিল সে চাইলে আটচল্লিশ ঘন্টায় অনামিত্রকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় অন্য কাউকে বসানোর ব্যাবস্থা সে করে দিতে পারে। অনামিত্রর কানে বারবার করে তার সেই কথাগুলোই বেজে চলেছে। তাঁর সুসজ্জিত কেবিনের এক কোণে একটা ছোট ফ্রিজ আছে। তার ভিতর থেকে জলের বোতল বের করে নিলেন অনামিত্র। এক গ্লাস ঠান্ডা জল একটানে পান করার পর একটু স্বস্তি পেলেন তিনি। মোবাইলের কন্ট্যাক্ট লিস্ট থেকে বেছে নিলেন একটা নাম্বার। ওপার থেকে ফল রিসিভ করতেই অনামিত্র বিরক্তিভরা কণ্ঠস্বরে বললেন, “মিস্টার স্যামুয়েল, ফর হাউ লং উইল দিস স্টুপিড অ্যাক্ট অফ ইয়োরস কন্টিনিউ? সেদিন এত বড় মুখ করে প্রমিস করে গেলেন ‘এভরিথিং উইল বি সেটলড!’ কোথায় কী?”

ওপার থেকে জবাব এলো, “ইয়েস, আই প্রমিসড বাট আই অলসো অ্যাডেড দ্যাট ইট উইল টেক আ ফিউ ডেজ টু গেট থিংস স্ট্রিমলাইনড। সেটা কিন্তু হয়েছে। অপারেশন অনেকটা স্মুদ হয়েছে। বাকিটাও হয়ে যাবে!”

“কবে হবে মিস্টার স্যামুয়েল, কবে হবে? দেখতে দেখতে আগস্ট মাস শেষ হতে চললো। এ বছর সেপ্টেম্বরে পুজো। মাসের কুড়ি তারিখ থেকেই ওই রুটে ট্যুরিস্ট ডেকিল প্রচুর বেড়ে যাবে। সেই বিজি ট্রাফিকের মধ্যে এই বড় বড় কন্টেনার, কারগো ভ্যান কীভাবে মুভ করবে বলুন তো? ডোন্ট ইউ থিঙ্ক উই আর লুজিং প্রেশাস টাইম!”

কথাটা বেশ চেঁচিয়েই বললেন অনামিত্র। ওপার থেকে কোনো জবাব এলো না। আসবে না যে, তা তিনি জানতেন। কোন মুখে কথা বলবে লোকটা? নিজের অপদার্থতার জন্য একটা সেট সিস্টেমকে নষ্ট করতে বাধ্য হয়েছে। মরিয়া হয়ে নতুন সিস্টেম চালু করেছে কিন্তু পুরোনোকে ভুলে যাওয়া কি অতই সহজ?

স্যামুয়েলের উপর ক্ষোভটা উগরে দিয়ে একটু হালকা বোধ করছিলেন বটে কিন্তু অনামিত্র’র অস্থিরতাটা কিছুতেই কমছিল না। নিজের অজান্তেই তিনি আসলে চাইছিলেন কেউ তাঁকে বলুক, “দোষ তোমার নয়, অযথা উত্তেজিত হয়ে নিজের কাজ নষ্ট কোরো না।” একবার ভাবলেন কেদার স্যারকে ফোন করবেন কিন্তু মোবাইলে তাঁর নাম্বারটা ডায়াল করতে গিয়ে করলেন না অনামিত্র। লোকটা রিটায়ার করে এখন সপরিবারে থাইল্যান্ডে ছুটি কাটাচ্ছে। এভাবে তাকে বিরক্ত করাটা অন্যায় হবে বলে মনে হলো তাঁর। মিনিট দশেক চুপচাপ বসে ভাবলেন তিনি। একটা দোটানায় ভুগলেন। তারপর মোবাইলটা তুলে নিলেন টেবিল থেকে।

শিলচর শহরে একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বেজে উঠলো এক ব্যক্তির মোবাইল। ভাবলেশহীন কণ্ঠে তিনি জবাব দিলেন, “হ্যা, মিস্টার রায়। খবর পেয়েছি। হাফিজকে আমি বুঝিয়ে বলেছি। এখন একটু ব্যস্ত আছি, বুঝলেন। বিকেলে কল করছি।

২২

নয়ডা সেক্টর টুয়েন্টি ফোর মেট্রো স্টেশনে যখন ট্রেনের দরজা খুলল, তখন সূর্য অস্ত গিয়েছে। পশ্চিমের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে উজ্জ্বল কমলা আলো। স্টেশন থেকে নেমে এসে অটোতে ওঠার সময় অ্যারেন এক মুহূর্তের জন্য তাকাল সেই আকাশের দিকে। সূর্যাস্তের পর পশ্চিমের আকাশে এই আলোর খেলা দেখতে সুন্দর লাগে বটে কিন্তু অ্যারেনের চোখে সেই দৃশ্য যেন দূরে কোথাও এক অগ্নিকাণ্ডের প্রতীক হয়ে দেখা দিচ্ছিল।

অগ্নিকাণ্ডের খবর নিয়েই কলকাতা থেকে এসেছে অ্যারেন। তার ল্যাপটপে একটি বিশেষ নামে সেভ করা ফাইলে রয়েছে সেই আগুনের হদিশ। ধোঁয়া তার চোখে কিছুদিন আগেই পড়েছিল। সেই থেকেই অনুসন্ধান শুরু করেছিল অ্যারেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে আসা তথ্যকে যাচাই করে, একের সঙ্গে অপরকে জুড়ে জুড়ে সে আগুনের উৎসস্থল অবধি পৌঁছে গিয়েছে। ভয়ংকর এক নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে অ্যারেন। কীভাবে সেই নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় হয়ে কাজ করছে, তার স্পষ্ট আভাস সে পেয়েছে। সবকিছুকে একত্রিত করে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট সে তৈরি করেছে।

এই রিপোর্ট তার জমা দেওয়ার কথা ছিল বস সুদর্শন কৃষ্ণামূর্তির কাছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলেছে অ্যারেন। গতকাল সকালেই সে সংস্থার ডিরেক্টর অবিনাশ ধাওয়ানের সঙ্গে মেলে যোগাযোগ করে। খুব কনফিডেনশিয়াল কিছু কথা সাক্ষাতে বলার জন্য সময় চায়। ধাওয়ান তার অনুরোধকে গুরুত্ব দেবেন কি না, সে বিষয়ে অ্যারেনের মনে সন্দেহ ছিল কিন্তু তিনি আজ সন্ধে সাতটায় সময় দিয়েছেন। এই সপ্তাহে এমনিতেই এজেন্সির একটা বিশেষ কাজে তার দিল্লি আসার কথা ছিল। ফলে আজ দুপুরের ফ্লাইটে তার চলে আসার বিষয়টা সুদর্শনের চোখে সন্দেহজনক ঠেকবে না।

অ্যারেনের ল্যাপটপ থেকে প্রিন্ট নিয়ে পুরো রিপোর্টটা পড়ে যখন চোখ তুললেন অবিনাশ ধাওয়ান, তখন আটটা বেজে গিয়েছে। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে অ্যারেনকে প্রচুর প্রশ্ন করেছেন তিনি। অস্পষ্টতাগুলো কাটিয়ে নিয়েছেন।

টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি বিশেষ খাম বের করে প্রিন্ট আউটগুলো তাতে ভরলেন অবিনাশ। এই ধরনের খামে সেই কাগজই ভরা হয়, যেগুলোকে দ্রুত নষ্ট করে ফেলা হবে। কে যে কখন বিগড়ে গিয়ে শত্রুপক্ষের সঙ্গে হাত মেলাবে, কিছু বলা যায় না। দেশের নিরাপত্তা ছেলেখেলার বিষয় নয়। একটা ছোট্ট তথ্যও ফাঁস হয়ে গেলে বিরাট বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ, গোপন নথি দ্রুত পড়ে নিয়ে তাকে ধ্বংস করে দেওয়াই অবিনাশের দস্তুর।

অবিনাশকে ‘চিফ’ বলে সম্বোধন করে বিএনআইয়ের সকলে। চিফের দু’চোখে ক্ষোভের আগুন জ্বলতে দেখলো অ্যারেন। সে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে না, তার লেলিহান শিখারা ঊর্ধ্বগামী নয় এখনো কিন্তু ধীরে ধীরে সে আগুন ছড়াচ্ছে।

“চিফ, আই নো হোয়াট আই হ্যাভ ডান ইজ এগেইন্সট প্রোটোকল। বাট দেয়ার ইজ আ রিজন ফর মি নট শেয়ারিং দিস উইথ সুদর্শন স্যার ফার্স্ট!”

অ্যারেন ব্যখ্যা করতে চাইল রিপোর্ট নিয়ে তার সোজা নয়ডা চলে আসার কারণ কিন্তু অবিনাশের অভিব্যক্তি দেখে তার মনে হলো তিনি এই মুহূর্তে ওই বিষয়টা নিয়ে ভাবছেনই না। বৃহত্তর কোনো ভাবনা আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাঁর মস্তিষ্ককে।

কয়েক মিনিট সময় নিলেন তিনি। মাথার মধ্যে যে চিন্তাগুলো তোলপাড় চালাতে শুরু করেছিল অ্যারেনের নিয়ে আসা নথিগুলি ঘাঁটতে ঘাঁটতে, সেগুলোকে গুছিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, “তোমার থিওরিটা বুঝলাম কিন্তু এরকম একটা ভয়াবহ অভিযোগ, যার সত্যতা প্রমাণিত, সেটার কথা জানা সত্ত্বেও তুমি এজেন্সির কাছে এতদিন তা গোপন রেখেছ! এটা কি সঠিক কাজ হয়েছে বলে তোমার মনে হচ্ছে?”

“হয়তো হয়নি চিফ কিন্তু আমি গোপন রেখেছি একটাই কারণে। আমি চাইনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এখনই শাস্তিমূলক ব্যাবস্থা নিয়ে সে যে নেক্সাসের অংশ, সেই নেক্সাসের বাকিদের সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিতে। এই নেক্সাসের প্রত্যেকে সমান বিষাক্ত এবং ধরতে হলে প্রত্যেককে একসঙ্গে ধরা উচিত, এটাই আমার মনে হয়। সেটা তখনই সম্ভব, যখন এরা কমপ্লেসেন্ট হয়ে কোনো ভুল পদক্ষেপ নেবে।

কিছুক্ষণের জন্য আবার মৌনতা অবলম্বন করলেন অবিনাশ। কিছু তথ্য, কিছু ভয়েজ রেকর্ড এবং কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ তাঁর বিশ্বাস, ভরসার ভিতটাই নাড়িয়ে দিয়েছে গত এক ঘন্টায়। দেশের মানুষের অগাধ আস্থা সেনাবাহিনী এবং ইন্টেলিজেন্সের উপর। তারা জানে সারা বছর ঝড়, জল, তুষারপাতের মধ্যেও সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরীর মতো যেমন দাঁড়িয়ে থাকে একদল মানুষ, তেমনি আরেকদল সাধারণের ভিড়ে মিশে সারাক্ষণ নজরদারি চালায় দেশের কোণায় কোণায়। অথচ সে কাজের দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছে, তারাই যদি…

আর ভাবতে চাইলেন না অবিনাশ। ভাবতে পারছেন না তিনি। ভয়ংকর একটা নেটওয়ার্ক কীভাবে কিছু মানুষকে নিজের জালে জড়িয়ে নিয়ে কুৎসিত অপরাধ করে চলেছে দেশজুড়ে, তারই একটি চিত্র তাঁর টেবিলে এনে ফেলেছে অ্যারেন। অবিলম্বে এই নেটওয়ার্ককে ভাঙতে না পারলে সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে দেশের জন্য।

“চিফ, ইফ ইউ অ্যালাও…”

“ওহ, প্লিজ অ্যারেন! ডু ইউ রিয়েলি থিঙ্ক দিস ইজ আ টাইম ফর ফাকিং ফর্মালিটিজ? জাস্ট স্পিক ইওর মাইন্ড আউট!”

অ্যারেনকে মাঝপথে থামিয়ে প্রায় ধমকে উঠলেন অবিনাশ। সহসা মেজাজ হারান না তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁকে গলা তুলে কথা বলতে দেখা গেছে, এমন নজির তিনটির বেশি নেই কিন্তু আজ সত্যিই তিনি নিজের মেজাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না।

অতঃপর অ্যারেন তার একটি বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানালো তার চিফকে।

২৩

বেডরুমের এসিটা আঠারোয় দিয়ে রিমোটটা বিছানার একপাশে ছুঁড়ে দিলেন অর্ধেন্দু। তারপর শরীরটা এলিয়ে দিলেন। আজ অসম্ভব ক্লান্ত তিনি। লম্বা সফর সেরে আজ সকালেই কলকাতায় ফিরেছেন কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফেরার সুযোগ পাননি তিনি। অনেকদিন ধরে হাসপাতাল দুটোতে ওপিডি করা হচ্ছে না তাঁর। এদিকে অ্যাপয়েন্টমেন্টের পাহাড় জমে গিয়েছে। তাই ভিজিটিং টাইমের কাছাকাছি সময় এয়ারপোর্ট থেকে বেরোনোয় সোজা হাসপাতালেই চলে গিয়েছিলেন। অর্ধেন্দু জানতেন আজ রাশ থাকবে, তাই দু’ঘন্টার পরিবর্তে টানা সাড়ে পাঁচ ঘন্টা পেশেন্ট দেখেছেন।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছেন দুপুর সাড়ে তিনটে’তে। আজ বাইরে অসহনীয় আবহাওয়া। রোদের তাপের দোসর হয়েছে ভয়ানক আদ্রতা। এসি গাড়ির মধ্যে বসেও যেন হাঁসফাস করছিলেন তিনি।

শার্টের বোতামগুলো খোলার মতো শক্তিও যেন পাচ্ছিলেন না অর্ধেন্দু। কেবল টাইটা কোনোরকমে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ফ্লোরে। স্নিগ্ধার স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়নি এখনো। পাশের ঘরে মাম আর তার ন্যানি ঘুমে কাদা হয়ে রয়েছে। একটু যে গ্লুকোজের জল কেউ করে এনে সামনে ধরবে, সে সম্ভাবনাও নেই। আঠারো ডিগ্রি তাপমাত্রায় শরীরটা সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার পর অগত্যা তিনি নিজেই গেলেন কিচেনে। এক চুমুকেই ক্লান্তি কেটে গিয়ে শরীরটা চনমনে হয়ে উঠল।

বেডরুমে ফিরে এসে মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে কখন যে ঘুমে ঢলে পড়েছিলেন, তা টেরই পাননি অর্ধেন্দু ঘুমটা ভেঙে গেল দরজার ল্যাচ ঘোরানোর শব্দে।

“এ কী! বাইরের ড্রেসে বিছানায় শুয়ে আছ! মিস্টার হাইজিনের এ কী অধঃপতন! শরীর খারাপ নাকি?” বলতে বলতে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন স্নিগ্ধা। স্বামীর কপালে হাত ঠেকিয়ে বুঝতে চাইলেন জ্বর এসেছে কি না।

“আরে, বাইরে যা তা অবস্থা! তার উপরে এই হেকটিক শিটিউল! গতকাল প্রায় ন’ঘন্টা জার্নি করেছি। আর পারা যায়?”

“সে কথাই তো তোমাকে বলছিলাম সেদিন। এদিকটা তুমি ভীষণ নেগলেক্ট করছো ইদানীং। সেই জন্যই এখন এত প্রেশার হয়ে গেছে।”

অর্ধেন্দু মেনে নিলেন স্নিগ্ধার কথা। সত্যিই, একটু ব্যালেন্স করা দরকার ছিল এবং সেই প্রক্রিয়া শুরুও করে দিয়েছেন তিনি।

“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিলে। আজ অ্যাডমিনে বলে এসেছি এই সপ্তাহে থার্সডে ছাড়া স্যাটারডে’ও আমার জন্য বুকিং নিতে। আজ টিউসডে। আজকেরটা তো সেরেই এলাম। প্লাস অনেকটা অভারটাইমও দিয়েছি। গ্লাস আরো দু’দিন,” শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে বললেন অর্ধেন্দু।

পাঁচটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে বেডরুমে এসে বাবাকে দেখেই তাঁর বুকের উপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লো মাম। বাপ-মেয়ের খেলা চললো বেশ কিছুক্ষণ। তার অ্যাবাকাসের টিচার আসার পর ছুটি পেলেন অর্ধেন্দু। বাইরে প্যাঁচপ্যাচে গরম, তাই বিকেলের চা’টা স্নিগ্ধা ঘরেই নিয়ে এলেন। তাঁর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলেন স্নিগ্ধা। একটু অস্বস্তি বোধ করলেন অর্ধেন্দু। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “কী দেখছ ওরকম করে? কিছু বলবে?”

স্নিগ্ধা মৃদু ঘাড় নেড়ে, হেসে বললেন, “না, ভাবছি কী প্রচণ্ড ব্যস্ত তুমি! হয় হসপিটালে ওপিডি, নয়তো তোমার এই চ্যারিটি ওয়ার্ক আর না হলে বাইরে কনফারেন্স, সেমিনার! নিজের জন্য তোমার আর সময়ই নেই!”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্ধেন্দু বললেন, “কী করবো বলো? কিছু কাজ এমন থাকে, যেগুলোতে একবার কমিট করে ফেললে আর পিছিয়ে আসা যায় না। অসুবিধে হয়, মাঝেমাঝে বিরক্তও লাগে কিন্তু তারপর যখন নিষ্পাপ মুখগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে; তখন মনে হয় ধুর, কী এত স্বার্থপরের মতো নিজের কথা ভাবছি। আমার তো একটা হ্যাপি ফ্যামিলি আছে, পয়সা আছে, বাড়ি গাড়ি সব আছে। ওই ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়েগুলোর জন্য কে আছে?”

স্নিগ্ধার মনে একটা প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে। এটা শুরু হয়েছে স্কুলে এক কলিগের কাছ থেকে একটা বিষয় জানার পর থেকে। তার শ্যালক আসামের একটা খবরের কাগজে চাকরি করে। সে একটা ‘প্রতিবেদন করেছে দিনকয়েক আগে। প্রতিবেদনে সে. দাবী করেছে আসাম-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ‘অনাথ ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এক এক জঘন্যা কারবার চলছে। বিভিন্ন অনাথ আশ্রম থেকে আবাসিকরা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। কখনো কখনো বিষয়টা ধরা পড়ছে, কখনো পড়ছে না। পাহাড়ি অঞ্চলে যেহেতু সকলকেই দেখতে একরকম, সেহেতু এই কারবারিদের একটা বিশেষ সুবিধে হচ্ছে কাজে। তারা যে কটি ছেলেমেয়েকে অনাথ আশ্রম থেকে বের করে নিচ্ছে, গুনে গুনে আবার সেই কটি ছেলে মেয়েকেই বাইরে থেকে এনে ভর্তি করে দিচ্ছে আশ্রমে। দেখতে একরকম হওয়ার ফলে এই বদলাবদলি অনেকসময়ই চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তারাও ওই কারবারে স্বেচ্ছায় সামিল হচ্ছে। বিনিময়ে তাদের পকেটে ঢুকছে মোটা টাকা। তার কিছু প্রমাণও। সেই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।

স্নিগ্ধার খুব ইচ্ছে করছিল এই বিষয়ে স্বামীর মতামত জানতে চাইবেন কিন্তু প্রসঙ্গটা তোলার সুযোগ। তিনি পেলেন না। বেজে উঠলো অর্ধেন্দুর মোবাইল। কানে মোবাইল ধরে ইশারায় স্নিগ্ধাকে একটা পেন আর কাগজ [ দিতে বললেন অর্ধেন্দু। সে দুটো তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে স্নিগ্ধা চায়ের কাপ রাখতে চলে গেলেন কিচেনে। স্বামীর কাজের কথার সময় হাঁ করে বসে, কান খাড়া করে সব শোনা তাঁর একদম পছন্দ নয়।

একটা বিশেষ স্ন্যাক বানানোর তোড়জোড় শুরু করলেন স্নিগ্ধা। মিনিট পনেরো বাদে অর্ধেন্দু এসে দাঁড়ালেন কিচেনের দরজার সামনে। দুজনের চোখাচোখি হতে অর্ধেন্দু বললেন, “একটু আগেই বলছিলাম না, কমিট করে ফেললে আর পিছিয়ে আসা যায় না। আসলে আমাদের এই চ্যারিটেবল ট্রাস্টের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন নতুন অনেক এনজিও, অর্ফানেজ থেকে আমাদের সাইটে আবেদন জানায় ফ্রি হেলদ চেক আপ ক্যাম্প করার জন্য। যে ফোনটা এসেছিল, সেটা করেছিল একটা অর্ফানেজ থেকে। সামনেই ওদের ফাউন্ডেশন ডে। সেই উপলক্ষ্যে ওরাও ক্যাম্প করতে চাইছে।”

স্নিগ্ধা রান্নার সামগ্রী থেকে চোখ না সরিয়েই প্রশ্ন করলেন, “তা, এবার কোথায়?”

“নতুন জায়গা। জানো ফোন ছাড়ার পর ইউটিউবে সার্চ করছিলাম। কয়েকটা ভুগ পেয়ে গেলাম। দারুণ সুন্দর জায়গাটা। নদী আছে, পাহাড় আছে আর ঘন জঙ্গল। দারুণ সিনিক বিউটি। দেখার পর থেকে একটা প্ল্যান ঘুরঘুর করছে মাথার মধ্যে।”

২৪

বিএনআইয়ের অফিসে নিজের কেবিনে কয়েকজন ফিল্ড এজেন্টের সঙ্গে জরুরি আলোচনা করছিলেন অবিনাশ। দেশের দক্ষিণ প্রান্তের সিমান্তবর্তী একটি অঞ্চল নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। বেশ কিছু প্রশিক্ষিত জঙ্গি জলপথে দেশে ঢুকে পড়ার তোরজোড় করছে বলে বিশ্বস্ত্র সূত্রে খবর এসে পৌঁছেছে। আগামী মাসে তামিল নাড়ুর হোসুরে এক বিখ্যাত অটোমোবাইল কোম্পানির নতুন ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের উদ্বোধন করতে আসার কথা প্রধানমন্ত্রীর। অবিনাশের কাছে খবর এসে পৌঁছেছে সেই অনুষ্ঠানের সময় বড় একটি নাশকতার ছক কষছে জঙ্গিরা।

এদিকে কেরালার কোচিতে গত কয়েকদিনে কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। বিএনআইয়ের ইনফর্মারদের অনুমান দেশের অন্যতম কুখ্যাত জঙ্গি গোষ্ঠীর স্লিপার সেল সেখানে নতুন করে স্বক্রিয় হয়ে উঠছে। এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে সেই . জঙ্গি সংগঠনের রিক্রুটমেন্ট ড্রাইভ। রাজনৈতিক দলের মুখোশের আড়ালে এই সংগঠন দেশজুড়ে সে কারবার চালাচ্ছে, তা ভয়াবহ। অস্ত্র, ড্রাগ, টাকাপয়সা, সোনাদানা, যার জন্য যে টোপ উপযুক্ত, তাকে সেই টোপ দিয়ে দলে টেনে নিচ্ছে। তারপর তাদের মগজধোলাই করে নিজেদের কাজে লাগাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিচিত্র কৌশলে সোনা পাচার করে এদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সোনা লুকিয়ে আনার জন্য হার্ডওয়্যার সামগ্রী, বাথরুম ফিটিংস, রোলার বল পেন, এমনকি মানুষকেও ব্যাবহার করা হচ্ছে। গত জুন মাসে কোচি বিমানবন্দরে কাস্টমস একটি ব্যাগ আটক করেছিল। ব্যাগটি যে নিয়ে এসেছিল, তাকে গ্রেফতার করে জেরা করেছিল গোয়েন্দারা। জেরা করে তারা বুঝেছিল লোকটি ব্যাগের ক্যারিয়ার বা বাহক মাত্র। ব্যাগে কী আছে, ‘কোন উদ্দেশ্যে সেটাকে পাঠানো হয়েছিল, সে কিছুই জানে না। তাকে নির্দেশ দেওয়া ছিল বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে একটি বিশেষ জায়গা গিয়ে ব্যাগটা নিয়ে অপেক্ষা করতে। নির্দিষ্ট সময় একটি ট্যাক্সি এসে থামবে তার সামনে। ট্যাক্সি থেকে একজন মহিলা নামবেন এবং লোকটির সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন। মহিলার সঙ্গে থাকবে হুবহু সেই একইরকম একটি ব্যাগ। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তিনি চলে যাবেন অন্যদিকে। এই কথাবার্তা চলাকালীনই অদলবদল হয়ে যাবে ব্যাগ . দুটি। লোকটিকে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আবু ধাবির বিমানবন্দরে। এক প্রবীণ ব্যাক্তি তার সঙ্গে দেখা করে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন।

লোকটির কাছ থেকে বিবরণ শুনে বিএনআইয়ের এজেন্টরা একটা স্কেচ আঁকিয়েছিল কিন্তু অবিনাশ সেটাকে গুরুত্ব দেননি। এই ব্যক্তি কে হতে পারে, তা তিনি অনুমান করতে পেরেছিলেন। ওর মতো ভয়ংকর ধুরন্ধর মানুষ সংখ্যায় বেশি নেই। বারোটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে; প্রয়োজন অনুযায়ী ছদ্মবেশ ধারন করে একেবারে নতুন মানুষ হয়ে উঠতে পারে। দিন পনেরো আগে কনট প্লেস সংলগ্ন একটি হোটেলে এক সন্দেহভাজনের উপরে নজর রেখেছিল অবিনাশের এজেন্টরা। হোটেলের রিসেপশনে এক এজেন্টের সঙ্গে গল্পে মেতেছিলেন এক প্রবীণ। এজেন্ট কিছু বুঝতেই পারেনি কিন্তু পরে তার কাছ থেকে সেদিনের বিস্তারিত রিপোর্ট শুনতে শুনতে অবিনাশের মনে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। তার নাম হাফিজ। একটি রাজনৈতিক দল গড়েছে সে কিন্তু তার প্রেসিডেন্ট করেছে এক প্রাক্তন সাংসদকে। লোকে জানে দলটি তিনিই চালান। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া থেকে শুরু করে রাজধানীর রাজপথে প্রতিবাদ কর্মসূচী, সবেতে তাঁকেই দেখা যায় কিন্তু আদতে তিনি একটা রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয়। সাংঘাতিক এক পরিকল্পনা নিয়ে নেমেছে হাফিজ। গোটা দেশে একটা নতুন শাসন ব্যাবস্থা চালু করা তার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে দেশের সর্বত্র জেহাদের আগুন ছড়িয়ে দিতে চায় সে।

অবিনাশের কেবিনে উপস্থিত ছিলেন এজেন্সির চারজন সিনিয়র এজেন্ট। প্রত্যেকেই এজেন্সির সাফল্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। কোনো গুরুতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হলে তিনি প্রথমে এঁদের সঙ্গেই করেন।

আজকের মতো আলোচনা শেষ হয়ে গিয়েছিল। এজেন্টদের কাজে ফিরে যেতে বললেন অবিনাশ। তারপর নিজেও চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। তাঁর কেবিন থেকে বেরিয়ে অফিসের কনফারেন্স হলের দিকে যাওয়ার পথে একটা কফির কাউন্টার পড়ে। তিনি ঠিক করলেন এক কাপ কফি নিয়ে কনফারেন্স হলে ঢুকবেন। আরেক দফা গোপন আলোচনা শুরু করতে হবে তাঁকে একটু পরেই। সেটা হবে কনফারেন্স কলের মাধ্যমে।

অবিনাশের মোবাইল বেজে উঠলো। কফি কাউন্টারের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। মোবাইল কানে ধরে দ্রুত একবার দু’চোখ দিয়ে স্ক্যান করে নিলেন গোটা ফ্লোরটাকে। তারপর বেশ উত্তেজিতভাবে বললেন, “সো, হোয়াট আর ইউ ওয়েটিং ফর? ইসসে বড়া মওকা অওর কেয়া হো সকতা হ্যায়? মেক আ টিম অ্যান্ড গো ফর আ রেইড টুডে ইটসেল্ফ। বাট নট বিফোর এইট!”

ফোনে কথা বলতে বলতেই কনফারেন্স হলের কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেলেন তিনি। দরজার পাল্লা বন্ধ হতেই হারিয়ে গেল তাঁর কন্ঠস্বর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *