নেটওয়ার্ক – ২৫

২৫

হিল কার্ট রোডের ধারে অবস্থিত শিলিগুড়ির সবচেয়ে বিলাসবহুল হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হলে ট্যুরিজমের বিষয়ে একটি সেমিনার চলছিল। কাঁটায় কাঁটায় দুপুর দেড়টায় মঞ্চে উঠলেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। মাইকে ঘোষণা করলেন, “লেডিজ অ্যান্ড জেন্টেলমেন, উই আর নাউ রেডি ফর লাঞ্চ। আই রিকোয়েস্ট অল ফিগনিটারিজ অ্যান্ড আওয়ার ফ্রেন্ডস ফ্রম দ্য মিডিয়া টু জয়েন আস ফর লাঞ্চ অ্যাট দ্য লাউঞ্জ!”

সেমিনারে যোগ দিয়েছে অসংখ্যা ট্যুর অপারেটর ট্র্যাভেল এজেন্সির মালিক, হোটেল এবং হোম স্টে ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষ। এসেছেন স্যামুয়েলও। তাঁর রিসর্টের হয়ে প্রচার করার একটা বড় সুযোগ ছিল এই সেমিনার। সুযোগটা কাজে লাগিয়েছেন তিনি। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দর্শকদের বুঝিয়েছেন কেন কাসেমগাঁওতে তাঁর রিসর্ট রেণু পর্যটকদের জন্য সেরা ঠিকানা।

রেণুকে গড়ে তোলার নেপথ্যে তাঁর কোনো বদ অভিসন্ধি কখনো ছিল না। কেরালার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তাঁকে করতে হয়েছে। অনেক গর্হিত কাজ তিনি দক্ষ হাতে সামলেছেন। তারই ইনাম স্বরূপ পেয়েছেন বিপুল টাকা। সবচেয়ে বড় ইনামের টাকাটাই তিনি কাসেমগাঁওতে লগ্নি করেছিলেন। ভেবেছিলেন শেষ বয়সে যখন শরীরে আর পরিশ্রম করার শক্তি থাকবে না, তখন কাসেমগাঁওতে চলে যাবেন। সবুজ বনানী আর নদীর কল্লোলকে জীবনের সঙ্গী করে নেবেন কিন্তু আজকাল নিজের জীবনের শেষটুকুর কথা ভাবলে অন্য এক পরিবেশ ভেসে ওঠে স্যামুয়েলের চোখের সামনে। একটা ভয় যেন ক্রমশ চেপে বসতে চাইছে তার মনের উপর।

লাঞ্চটাইমে অবশ্য স্যামুয়েলের বেশ ভাল একটা অভিজ্ঞতা হলো। এক নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে চাইলেন। স্যামুয়েল আপত্তি করলেন না। সাংবাদিক জানালেন আজ সন্ধেবেলাই পোর্টালের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এই সাক্ষাৎকার আপলোড করা হবে।

দুপুর আড়াইটে নাগাদ শব্দ করে উঠলো তাঁর মোবাইল। কলারের নাম দেখামাত্রই স্যামুয়েলের হৃদকম্প শুরু হয়ে গেল। দিনের এই সময়ে এই ব্যক্তির কল! নির্ঘাৎ বড় কিছু ঘটেছে, না হলে গভীর রাত ছাড়া যোগাযোগ করার লোক নয় এই কলার। দ্রুত ব্যাঙ্কোয়েট হল থেকে বেরিয়ে টয়লেটে ঢুকে পড়লেন স্যামুয়েল। মোবাইল বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কল ব্যাক করলেন তিনি। ওপার থেকে ভেসে এলো উত্তেজিত কন্ঠস্বর, “মাই অফিস ইজ গোয়িং টু বি রেইডেড। মুভিং আউট। কান্ট অ্যাফর্ড টু টেক শেল্টার ইন আদার অ্যাড্রেসেস। অল মাইট বি অন দেয়ার র‍্যাডার। কিপ আ রুম ফর মি ইন ইওর রিসর্ট। উইল রিচ ডে আফটার টুমরো!”

পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হলেন স্যামুয়েল। এ তিনি কী শুনলেন? দুর্ধর্ষ জঙ্গি হাফিজ আসছে তার আতিথেয়তা গ্রহণ করতে। একে সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য, কীভাবে দেখবেন? বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি কিন্তু লোকটা কি ভয় পেয়েছে? ওর গলার স্বরে যেন ক্ষীণ একটা প্যানিকের ছাপ ছিল।

টয়লেট থেকেই গোপাল শ্রীবাস্তবকে কল করে চি রিসর্টের আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বারের ঘরটা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিলেন স্যামুয়েল। তাঁরা দুজন ছাড়া আর কেউ এই গুপ্তকক্ষের কথা জানে না। এই কক্ষ ব্যাবহার করা হয় বিশেষ প্রয়োজনে। বিশেষভাবে তৈরি এই কক্ষ স্যামুয়েলের অনেক গোপন কারবারের সঙ্গী। গোপালের অসাবধানতার কারণে কিছুদিন আগে আরেকজন পেয়ে গিয়েছিল এই গুপ্তকক্ষের হদিশ। তাই তাকে সরিয়ে দিতে হয়েছে পৃথিবী থেকে।

২৬

ভোররাতে বিমলের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার মৃদু শব্দ হলো। বিমল এই শব্দের অপেক্ষাতেই জেগে বসেছিল সারা রাত। সঞ্জীব এসেছে। এখন রাত তিনটে কুড়ি। ঠিক চারটের সময় বিমল রওনা দেবে। সে যাবে অনেক দূরে, ডুয়ার্সের পথে। তার সঙ্গীরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে শীতঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাদের জাগাতে হবে এবার।

দিনদশেক সে কার্শিয়ঙে থাকবে না। এই সময়টায় বেকারির প্রোডাকশন, অর্ডার নেওয়া, আউটলেট সামলানো; সবটাই করতে হবে সঞ্জীবকে। তাকে ভাল করে সবকিছু বুঝিয়ে দিলো বিমল। এরকম প্রক্সি দেওয়ায় সঞ্জীব অভ্যস্ত, তাই সে চিন্তিত ছিল না কিন্তু তার মনে হচ্ছিল বিমল কোনো কারণে উদ্বীগ্ন হয়ে আছে। স্থানীয় ভাষায় কথা বলছিল ওরা। সঞ্জীবকে কালো প্লাস্টিকে মোড়া একটা বড় পার্সেল সঙ্গে করে নিয়ে আসতে বলেছিল বিমল। পার্সেলটা রাখা ছিল বেকারির সেই লোহার দরজাওয়ালা ঘরে, একটা চোরা কুঠুরিতে। বিছানার উপর পার্সেল রেখে, সেটা খুলে ভিতর থেকে একটা একটা করে জিনিস বের করে নিচ্ছিল সে। তার ডাফল ব্যাগে জামাকাপড়ের একটা স্তরের উপর পাশাপাশি সে সাজিয়ে রাখছিল জিনিসগুলো। এর উপর জামাকাপড়ের আরেকটা স্তর চাপানো হবে এরপর। সেই কাজ করতে করতে সে বললো, “এই কদিনে স্পেশাল কার্গো যাবে না কোনো ক্লায়েন্টের কাছে। কেউ একস্ট্রা পেমেন্ট করতে চাইলেও তাদের না বলে দিবি। ভ্যান আর ক্রেট, দুটোই আমার অ্যাভেলেবল চাই। যে কোনো মুহূর্তে প্রয়োজন হতে পারে। তুই তৈরি থাকবি। যখনই বলবো, ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়বি। কোথা থেকে ভ্যানে মাল লোড করতে হবে, জানিয়ে দেবো। লোড করবি, বেরিয়ে যাবি। কোথাও চেকিংয়ের জন্য আটকালে কীভাবে সেটা ট্যাকেল করতে হবে, সে তো তুই জানিসই!”

সঞ্জীব ঘাড় নাড়লো। সে বুঝতে পারছে বড় কোনোকিছুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বিমল। তাকে বেকারির দায়িত্বে রেখে বিমল মাঝেমাঝেই এদিক ওদিক যায় দিনকয়েকের জন্য কিন্তু এর আগে তাকে এভাবে স্নাইপার রাইফেল ডি-অ্যাসেম্বল করে লাগেজে ভরতে দেখেনি সঞ্জীব।

দ্রুত গোছগাছ সেরে ফেললো বিমল। সবশেষে একটা মাঝারি গড়নের কাঠের বাক্স বিছানার তলা থেকে বের করে সঞ্জীবের দিকে ছুঁড়ে দিল সে। হালকা কাঠের তৈরি এই বাক্স চা কোম্পানির আউটলেটগুলোতে খুব কমন। এই বাক্সের মধ্যে ভরা থাকে চায়ের প্যাকেট। তাতে চা যেমন ভাল থাকে, তেমনি একটু বাড়তি পয়সার বিনিময়ে ক্রেতাও একটা শোপিস নিয়ে যেতে পারে বাড়ি। বাক্সটাও সেরকমই। লম্বা, চ্যাপ্টা। ঢাকনা খুলতেই দার্জিলিংয়ের নামী চা বাগানের লোগো লাগানো কালচে সবুজ প্যাকেট উকি দিলো ভিতর থেকে। সেই প্যাকেটটা তুলে নিতেই সঞ্জীব দেখলো নিচে শুয়ে আছে একটা স্মার্ট ফোন। তার বুকের উপর রাখা আছে একটা সিম কার্ড।

“অ্যাক্টিভেট করে নিস। সকাল আটটার মধ্যে চালু হলেই চলবে। এটাকে সাবধানে রাখবি। আমার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করবি না। আমি সময়মতো করে নেবো আর আমাদের কোড ল্যাঙ্গোয়েজ নিশ্চয়ই মনে আছে তোর। নাকি ব্যাবহার না করে করে মেমোরিতে মর্চে পড়ে গেছে?”

বিমলের প্রশ্নে একটা রসিকতার ছোঁয়া ছিল। জবাবে সঞ্জীবও মুচকি হাসল শুধু। ভোর তিনটে পঞ্চান্নয় নিভে গেল বাড়ির আলো। বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছিল একটা অল্টো। সহকারীকেও গাড়িতে তুলে নিলো বিমল। যাওয়ার পথেই পড়বে ওর বাড়ি। ওকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে সে। সকাল সাতটায় বেকারিতে পৌঁছনো সঞ্জীবের রুটিন। বিমল চায় না সেই রুটিন ভেঙে কারোর মনে কোনো সন্দেহ তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিতে।

গাড়ি থেকে নামার সময় সঞ্জীব বিমলের কাঁধে ভরসার স্পর্শ দিয়ে তাকে বললো চিন্তা না করতে। যা হবে ভালই হবে। বিমল কোনো জবাব দিলো না। দিল্লিতে আচমকা রেইডের খবরটা তাকে চিন্তামুক্ত থাকতে দিচ্ছে না। হঠাৎ যদি এখানেও এসে উপস্থিত হয় সেই ফোর্স? দাদার মৃত্যুর পর তিল তিল করে যে সাম্রাজ্য সে গড়েছে, এক নিমেষে তা ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে। তা হতে দিতে পারবে না বিমল। দাদার স্বপ্নকে সত্যি করতে হবে তাকে, বড় করতে হবে এই সাম্রাজ্যকেও আর একটা লক্ষ্য আছে বিমলের। তার কথা কেউ জানে না। সেই লক্ষ্য পূরণের আশাতেই স্নাইপার রাইফেলটা সঙ্গে নিয়েছে সে। কোনোক্রমে সেই সুযোগটা যদি এসে যায়, প্রতিশোধ নিতে সে ছাড়বে না!

২৭

কাসেমগাঁওয়ের অর্ফানেজটায় এলেই রোহিণীর মন ভাল হয়ে যায়। দেখতে দেখতে প্রায় একমাস কাটানো হয়ে গেল তার এই নদী আর জঙ্গলে ঘেরা প্রকৃতিতে। শরীর এবং মনে প্রতিদিন যে যন্ত্রণা জমে, সকালে ঘরের জানলা থেকে পর্দা সরালেই তার অর্ধেকটা বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যায় বাতাসে। বাকি অর্ধেকটায় মলমের প্রলেপ দিয়ে যায় অর্ফানেজ থেকে ভেসে আসা আবাসিকদের সমবেত কণ্ঠে গাওয়া প্রার্থনা সঙ্গীতের শব্দে। রোজ সেই সঙ্গীত ঘরে বসে চা খেতে খেতে শোনে রোহিণী। আজ সেই প্রার্থনা সে প্রত্যক্ষ করেছে অর্ফানেজের করিডরে দাঁড়িয়ে। এর আগেও দুবার সে এসেছে এখানে কিন্তু বিকেলে। সকালে যেন এখানকার পরিবেশটা আরো সুন্দর।

কোনো এক অজানা কারণে গতকাল রাত্রে রোহিণীর ঘরে তার প্রতিদিনের অতিথির আবির্ভাব হয়নি। তাই আজ সকালে ঘুম ভাঙা থেকেই তার মনটা বেশ হালকা লাগছে। অর্ফানেজ জুড়ে একটা ব্যস্ততা চলছে। আগামী পরশু এদের প্রতিষ্ঠা দিবস। নানা ধরনের অনুষ্ঠান হবে। অতিথি অভ্যাগতরা আসবেন। তনুজা বলছিল অস্ট্রেলিয়া থেকেও নাকি দুজন বিশেষ অতিথি আসবেন সেদিন। তাঁরা নিয়মিত অর্থ সাহায্য করে থাকেন এই অফানেজকে। এখানকার আবাসিকরা সকলেই অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের লেখাপড়ার জন্য স্কুল আছে এখানে। বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানোর জন্য দুজন শিক্ষকও আছেন। এখানকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দেখেন একজন মহিলা। তাঁর নাম রমলা ছেত্রী। এর আগে যেদিন রোহিণী এসেছিল এখানে, সেদিনই আলাপ হয়েছে দুজনের।

লম্বা করিডরে সকালের রোদ এসে পড়েছে। নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়ানো কংক্রিটের থামগুলোর ত্যারছা ছায়া পড়ছে মেঝেতে। দেখে মনে হচ্ছে যেন মেঝেটাকে কতগুলো সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। বড় ভাল লাগল রোহিণীর এই নরম রোদের স্পর্শ। গত তিনদিন এক নাগাড়ে বৃষ্টি হয়েছে এখানে। ফলে তাপমাত্রাও নেমে গিয়েছে অনেকটা। এমনিতেই গরমের অনুভুতি এখানে হয় না। আজ যেন বেশ শীত শীতই লাগছে তার।

রমলা ছেত্রী তাঁর ঘরে ফোনে কথা বলছিলেন কারোর সঙ্গে। রোহিণীকে দেখেই হেসে, হাতের ইশারায় তাকে বসতে বললেন।

সেই সময়ে রিসর্টে, নিজের ঘরে ল্যাপটপের সামনে বসে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না স্যামুয়েল। তাঁর মেলবক্সে একটি ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানির থেকে পাঠানো মেল এসে জমা হয়েছে। কোম্পানির তরফ থেকে বলা হয়েছে তাদের ফিল্মের একটি গানের দৃশ্যের শ্যুটিং হবে কাসেমগাঁওতে। অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা শ্যুট করবেন এবং গানের কয়েকটি ইন্ডোর দৃশ্যের জন্য তাঁদের পছন্দ স্যামুয়েল রিসর্টটি। ছবির পরিচালক গত ডিসেম্বরে উঠেছিলেন ‘রেণু’তে। তাঁর খুব ভাল লেগেছিল রেণুর অন্দরসজ্জা এবং তার ব্যালকনি থেকে নদীর ভিউ। তাই তিনি কোম্পানিকে জানিয়েছেন এই রিসর্টে কাজ করতে চান।

প্রোডাকশন কোম্পানি শ্যুটিংয়ের অনুমতি চেয়ে পাঠিয়েছে মেলটি। তারা জানতে চেয়েছে স্যামুয়েল কত টাকা নেবেন এবং তার কতখানি অংশ অ্যাডভান্স দিতে হবে। তারা একথাও জানিয়েছে যে স্যামুয়েল সবুজ সংকেত দিলে দিনদুয়েকের মধ্যেই পরিচালক, ডিওপি এবং ইউনিটের দুজন একবার রিসর্টে এসে শ্যুটিংয়ের সম্ভাব্য জায়গাগুলো চিহ্নিত করে যাবেন।

সকাল সকাল এমন একটা মেল তাঁর মনে যেন আনন্দের তরঙ্গ বইয়ে দিচ্ছিল। পরশুদিনের ইন্টারভিউটা তাঁর অনেক উপকার করেছে। গতকাল রাত্রে গোপাল তাঁকে জানিয়েছেন সারা দিনে নাকি প্রচুর কোয়েরি এসেছে তাঁর কাছে পুজোর সময় বুকিংয়ের বিষয়ে। একটা ইন্টারভিউতেই যদি এতটা সাড়া পাওয়া যায়, তাহলে বিগ স্ক্রিনে এই রিসর্টের ইন্টিরিয়র ডেকরেশন আর ব্যালকনি থেকে নদীর দৃশ্য তো আরো বেশি করে মানুষের নজরে পড়বে।

রোহিণীর কথা খেয়াল হলো স্যামুয়েলের। তার যে কেবল পুরুষদের চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করার একটা শরীর আছে, তাই নয়। সে কথাও ভাল বলতে পারে। তিনি ঠিক করে নিলেন প্রোডাকশন কোম্পানির লোকেরা এলে তাদের রিসর্ট ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্বটা রোহিণীকেই দেবেন। মোবাইলে তার নাম্বার ডায়াল করলেন স্যামুয়েল কিন্তু বারদুয়েক রিংটোন বাজার পরেই লাইনটা কেটে গেল। বাইরে জুতোর শব্দ পেলেন স্যামুয়েল। পরক্ষণেই ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে উকি দিলো রোহিণী। বিনা মেক আপে, সাধারণ একটা ট্রাউজার আর টপেও কি সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে!

“অন্দর আও। কুছ বাতে করনি হ্যায় তুমসে!”

স্যামুয়েলের নির্দেশে ঘরে ঢুকলো রোহিণী। দুজনের মধ্যে কথা হলো কিছুক্ষণ। প্রোডাকশন কোম্পানির প্রসঙ্গে শেষ করে আরেকটি বিষয়ে সবে কথা শুরু করতে যাবেন স্যামুয়েল, এমন সময়ে দরজায় ফের টোকা পড়লো। স্যামুয়েল রাশভারী কন্ঠে “ইয়েস” বলতেই ভিতরে ঢুকলেন গোপাল। রোহিণী দেখলো তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন’র এক পুরুষ। ছিপছিপে চেহারা, মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রঙ ফর্সা। পরনে ধুসর রঙের স্যুট, মাথায় তাঁর গল্ফ ক্যাপ, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা, মুখে মুচকি হাসি। এমনই এক ব্যক্তিত্ব, যে রোহিনীর বুকে এক মুহূর্তের জন্য যেন ঝড় উঠে গেল। এমন হ্যান্ডসাম পুরুষের দর্শন বহুদিন পায়নি সে।

২৮

আরে কাকু, এই কথাটা বলার জন্য আপনি আবার ছুটতে ছুটতে এলেন এই ভরদুপুরে!”

দরজার বাইরে দাঁড়ানো মলয়কে কথাটা বললেন শান্তনু। আজ তাঁর ওয়ার্ক ফ্রম হোম, তাই সকাল থেকে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে বসে ছিলেন। ভরদুপুরে কর্কশ শব্দে বেল বেজে ওঠায় বেশ চমকে উঠেছিলেন।

“না মানে, মেয়েটার পরীক্ষা সামনে। এরকম সময় আমি দিনকয়েক থাকবো না! তাই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, “ মলয় ইতস্তত করে জবাব দিলেন।

“আরে, তাতে কী হয়েছে? তানিয়ার টেস্ট পরীক্ষার তো অনেক দেরি আছে! আর এই সপ্তাহের পড়ানো তো আপনি পড়িয়েই দিয়েছেন। আপনি তো বলছেন দিনচারেকের মধ্যে ফিরে আসবেন। তাহলে আর সমস্যা কীসের? যান, নিশ্চিন্তে ঘুরে আসুন। একা একা থাকেন, একটু চেঞ্জও হবে। দেখবেন, মনটাও ভাল লাগবে।”

“আরে, আর বোলো না! বিক্রমটা হঠাৎ এমন আবদার করে বসলো, যে কী বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওর বাবা অসুস্থ, তাই ওর বৌ বাড়ি ছেড়ে বেরোতে পারবে না। এদিকে ও একা যেতেও ভরসা পাচ্ছে না। ওর তো আবার এক থাকার সেই ফোবিয়াটা আছে। তাই আমাকে বলছে কাকু, তুমি একটু আমার সঙ্গে চলো না। দু’তিনদিনের তো ব্যাপার! আমি তো ‘দেখছি’, ‘ভাবছি’ এসব বলে টেলে দিতে চাইছিলাম ব্যাপারটা কিন্তু দুপুরে খেতে বসেছি, এমন সময় ওর বৌ এসে হাজির। বলছে ‘কাকু, দেখুন না যদি একটু সঙ্গে যেতে পারেন। আমার খুব টেনশন হচ্ছে। অফিসের ব্যাপার, তাই ওকে যেতে বারণও করতে পারছি না!’ তারপর এই মিনিট পনেরো আগে সে ছোকরা ফোন করে সব ডকুমেন্টস চাইলো। ফ্লাইটের টিকিট কাটতে নাকি লাগবে। বোঝো কাণ্ড!”

মলয় বিভিন্নভাবে হাত নেড়ে, চোখ কপালে তুলে বোঝাতে চাইলেন যে গোটা বিষয়টা তাঁর কাছে একটা কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ধেয়ে এসেছে। শান্তনু সব শুনে হেসে বললেন, “আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান কাকু। আমরা একটুও অফেন্ডেড হচ্ছি না আপনি আসবেন না বলে আর আপনার ছাত্রী তো এই খবর শুনলেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে!”

মলয়ও হেসে বললেন, “স্বাভাবিক! ওরা এই প্রজন্মের মানুষ। আমার মতো ব্যাকডেটেড একটা লোককে অ্যাক্সেপ্ট করতে ওদের অসুবিধে হয়, বুঝি। আসলে মেয়েটার মুখটার সঙ্গে জুলির এত মিল যে…যাই হোক, আসি তাহলে। সামনের সপ্তাহে আমি দুটো এক্সট্রা ক্লাস নিয়ে নেবো, ওকে বলে রেখো!”

হস্তদন্ত হয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলেন মলয়। শান্তনু সেদিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ফিরে গেলেন তাঁর কাজের জায়গায়।

বাড়ি ফিরেই আলমারি থেকে কিছু জামাকাপড় বের করে নিলেন মলয়। টু’স্টেপ টুল বেয়ে উঠে লফট থেকে নামিয়ে নিলেন তাঁর লম্বাটে কাপড়ের ব্যাগ। বিক্রম বলেছে যেখানে যাচ্ছে সেখানে তেমন ঠান্ডা নেই এখন। তবে বৃষ্টি হচ্ছে খুব। মলয়ের মনে পড়লো তাঁর রেনকোটটার কথা। সেটা আলমারিতে থাকে না। সেটাকে তিনি আলাদা করে রাখেন বক্স খাটের ভিতরে। সেলোটেপ দিয়ে চারদিক মোড়া প্লাস্টিকের প্যাকেটটা বের করে ব্যাগে ভরে নিলেন তিনি। খাওয়ার টেবিলের উপরে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। কল রিসিভ করেই ধমকের সুরে মলয় বলে উঠলেন, “এখন খুব ব্যস্ত আমি। তুই পরে ফোন কর!”

ওপার থেকে আবছা কন্ঠস্বর ভেসে এলো, “ব্যস্ত মানে? এই ভরদুপুরে কীসের ব্যস্ততা তোমার? এখন কোন স্টুডেন্ট স্কুল কামাই করে বসে আছে বাবা তোমার কাছে পড়বে বলে?”

“আরে পড়ানোর জন্য না। আমি এখন প্যাকিং করছি।”

“প্যাকিং? মানে? কীসের প্যাকিং?”

“আছে আছে। সব বলে দেবো কেন তোকে? সারপ্রাইজ, সারপ্রাইজ!”

২৯

বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে লাগেজ তুলছিলেন অর্ধেন্দু। পাশে দাঁড়িয়ে স্বামীকে মন দিয়ে জরিপ করছিলেন স্নিগ্ধা।

“তোমাকে একটু টেনসড লাগছে। কাজে এসেছ। আমরা সঙ্গে থাকায় অসুবিধে হবে, তাই না গো? আমার আর মামের খারাপ লাগবে বলে তুমি কিছু বলছো না!”

স্নিগ্ধার কথায় হেসে ফেললেন অর্ধেন্দু।

“ধুর পাগল! তোমাদের নিয়ে আসার প্ল্যানটা তো আমিই করেছি। তুমি কি আমার কাছে বায়না করেছিলে? করোনি তো! তাহলে? আমার কাজের অসুবিধে হবে বুঝলে কি প্ল্যান করতাম? এত আননেসেসারি ব্রেনটাকে খাটিও না। শেষে দরকারের সময় বেচারি স্লো হয়ে পড়বে। আমি কাজ করবো অর্ফানেজে। তাও ঘন্টা তিনেকের ব্যাপার। তারপর আবার রিসর্টে ফিরে আসব। কী অসুবিধে হবে তোমরা সঙ্গে থাকলে?”

স্বামীর কাছ থেকে এই কথা শোনার পর আর এই প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন দেখলেন না স্নিগ্ধা। গাড়ি গড়াতে শুরু করলো। বাগডোগরা থেকে পাহাড়ে অনেকবার গেছেন স্নিগ্ধা কিন্তু এবার যেন কিছুটা এগোনোর পরই পথটা বড় অচেনা ঠেকতে লাগল তাঁর চোখে। এই রাস্তা অন্যান্যগুলোর মতো ভাল না। দুধারে জঙ্গলের আধিক্য। শেষে তিনি বলেই ফেললেন, “এই ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো গো? কেমন যেন অচেনা অচেনা লাগছে সবকিছু!”

“সেটা লাগছে কারণ এই রাস্তায় তুমি আগে আসোনি। আর কিছুটা রাস্তা প্রোলেই আমার হসপিটাল। তারপর রেলগেট। সেটা পেরোলেই দেখবে সামনের প্রকৃতিটা আমূল বদলে যাবে।”

অর্ধেন্দু যে ভুল বলেননি, সেটা আধঘন্টা বাদেই অনুভব করলেন স্নিগ্ধা। সবুজ বনানীর বুক চিড়ে চলে গিয়েছে কাচা রাস্তা। গাড়ি লাফাচ্ছে, রীতিমতো অসুবিধে বোধ হচ্ছে মাঝেমাঝে কিন্তু যখনই নিচ দিয়ে বয়ে চলা নদীটা দেখা দিচ্ছে, সব বিরক্তি যেন বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে। নদীর লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে অবশেষে তাঁদের গাড়ি যখন একটা নকশা করা বড় লোহার গেটের সামনে থামল, তখন বিকেল সাড়ে চারটে বেজে গিয়েছে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। স্নিগ্ধা এক জোড়া ছাতা গাড়ির সিটে নিয়েই বসে ছিলেন। একটা অর্ধেন্দুর দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি। গাড়ির শব্দে গেটের ওপার থেকে একটি বছর কুড়ি বাইশের ছেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। ছাতা মাথায় গেট পেরোলেন ওঁরা। নুড়ি পাথর ঢেলে সাজানো রাস্তা। তার দু’ধারে সুন্দর চারটে কটেজ। ধবধবে সাদা দেওয়াল তাদের, মাথায় সবুজ রঙের চাল। টিপিক্যাল পাহাড়ি চেহারা। গেটের পাশেই রিসেপশন। সেখান থেকে পাহাড়ি ভাষার গান ভেসে আসছিল। বেশ জোরে কিন্তু সেই শব্দকেও ছাপিয়ে আরেকটা শব্দ যেন চুম্বকের মতো নিজের দিকে আকৃষ্ট করছিল স্নিগ্ধাকে। সে শব্দ যন্ত্রের নয়, প্রকৃতির। সে শব্দ আপন বেগে বয়ে চলা পাহাড়ি নদীর।

মেরুন রঙের কোট প্যান্ট পরা একটা পাহাড়ি মেয়ে বেরিয়ে এলো রিসেপশন থেকে। অর্ধেন্দু লাগেজ নামাচ্ছিলেন। স্নিগ্ধা দাঁড়িয়ে ছিলেন রিসেপশনের এন্ট্রান্সের বাইরে। মেয়েটি হেসে বললো, “ওয়েলকাম টু দ্য স্যালামান্ডার, ম্যাম!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *