৩০
“আর ইউ শিওর দ্যাট ইউ ক্যান পুল ইট অফ?”
“ইয়েস চিফ, আই অ্যাম!”
মোবাইলে কথা হচ্ছিল অবিনাশ এবং অ্যারেনের মধ্যে। এখনো অবধি অ্যারেনের বিশেষ পরিকল্পনার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেননি তিনি। তোলার সুযোগও ছিল না। সে যা যা অভিযোগ করেছে, সব সত্যি প্রমাণিত হয়েছে কিন্তু এই পর্যায়ে অবধি অ্যারেন আগুনের বলয়ের বাইরে থেকে যুদ্ধ করেছে। এবার সে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে আগুনে। তাকে ভরসা না করার কোনো কারণ অবিনাশের সামনে নেই কিন্তু তবু তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। তাঁকে ভাবাচ্ছে অ্যারেনের প্রতিপক্ষ। তাকে যে হাড়ে হাড়ে চেনেন তিনি। অবশ্য গতকালের ঘটনাটার পর তাঁর মনে প্রশ্ন জাগছে, যাকে চেনেন বলে দাবী করছেন, তাকে আদতে কতটুকু তিনি চিনতে পেরেছেন এতদিনে?
“ইফ এনিথিং গোজ রং অর দ্য টেবল গেটস টার্নড, আমার কিন্তু কিছু করার থাকবে না অ্যারেন। তুমি জানো ইন্টেলিজেন্সের রুলগুলো।”
“জানি স্যার। আমার জন্য ভাববেন না। আমি প্রতিটি স্টেপ আগে থেকে ফুলপ্রুফ করে রেখেছি। তাও যদি কোনো মিসহ্যাপ হয়, হবে। মিসহ্যাপ তো মিসহ্যাপই! দু’বছর আগে মাস্টার দীপনের এনকাউন্টারটাকেও তো আমাদের রেকর্ডে মিসহ্যাপ বলেই দেখানো আছে। সেদিন মিসহ্যাপটা না হলে তো আজকের দিনটা আসতোই না। হাফিজ উড হ্যাভ বিন বিহাইন্ড বারস উইদিন টুয়েন্টি ফোর হাওয়ার্স আফটার মাস্টার দীপন ওয়াজ ন্যাবড! লোকটা বেপরোয়া ছিল কিন্তু ওর সহ্যশক্তি ছিল না। ওকে থার্ড ডিগ্রি দিলে সব উগরে দিত। ওর চেয়ে ওর ছোটভাই অনেক বেশি ডেঞ্জারাস!”
“অ্যান্ড হোয়াট অ্যাবাউট দ্যাট ডেভিল? ওর লোকেশন কি ট্র্যাক করা গেছে, “ অবিনাশ প্রশ্ন করলেন। “গতকাল কাকভোরে কার্শিয়াং থেকে রওনা হয়েছে। একটা পয়েন্টের পর ওর গাড়িটাকে আর ফলো করতে পারেনি আমাদের লোক। তবে, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর, ওরও ডেস্টিনেশন সেম। পেয়ে যাব ওকে। আসলে দার্জিলিং থেকে ইন্টেলটা কনফার্ম করতে একটু দেরি হলো। ওর বেকারির আউটলেটে গিয়ে ওকে আইডেন্টিফাই করা হয়েছে জাস্ট কিছুদিন আগে। এই কাজটা অনেক আগেই হয়ে যাওয়া উচিত ছিল কিন্তু হয়নি। ইউ নো দ্য রিজন!”
অ্যারেন কথা বলছিল ওদলাবাড়িতে ওদের সেফ হাউজে বসে। এখানে সে অপেক্ষা করছে রক্তিমদার জন্য। দিল্লিতে খারাপ আবহাওয়ার জন্য রক্তিমদার ফ্লাইট দু’ঘন্টা দেরিতে ছেড়েছে। নাহলে এই মুহূর্তে এক ঘরেই থাকার কথা ওদের।
চরম মুহূর্তের জন্য মনকে প্রস্তুত করতে শুরু করলো অ্যারেন। প্রতিষ্ঠিত প্রতিপক্ষদের কীভাবে সামলাবে, সে প্রশ্ন তাকে ভাবাচ্ছে না কিন্তু এদের বাইরেও আরেক প্রতিপক্ষ আছে আজ তার সামনে। তার সঙ্গে লড়াইটা কেমন হবে, কল্পনাও করতে পারছে না অ্যারেন।
৩১
স্যামুয়েলের নির্দেশে বিকেলে বড় রাস্তার দিকে গিয়েছিল রোহিণী। রাস্তার ধারে একটা বড় মেক আপ ভ্যান অপেক্ষা করছিল তার জন্য। সেই ভ্যানের মধ্যে তাকে বিশেষভাবে সাজিয়ে তোলা হচ্ছিল আজ রাত্রের জন্য। রোহিণীকে বলে দেওয়া হয়েছে আজ রিসর্টে এক বিশেষ অতিথি আসবেন। তিনি একান্তে তার সঙ্গে কিছু কথা বলবেন। এমনকি তাকে ভিডিও কলে কারোর সঙ্গে কথা বলতে হতে পারে। সে ব্যক্তি নাকি বসে আছে বিদেশে। তাঁর আবদার মতো রোহিণীকে মোবাইলের ক্যামেরার সামনে হয়তো কিছু অঙ্গভঙ্গিও করে দেখাতে হতে পারে।
একটি পুরুষ ও একটি মহিলা রোহিণীকে তিলতিল করে সাজিয়ে তুললো। আজ রাত্রে পরার জন্য তার হাতে তুলে দেওয়া হলো একটা চেরি রেড বডি ফিট গাউন। ওরা চেয়েছিল সে এখানেই পোশাক বদলে গাউনটা পরে নিক কিন্তু রোহিণী তা করতে চাইল না। কাদামাখা এবড়োখেবড়ো পথ ধরে তাকে রিসর্টে ফিরতে হবে। একটু অসাবধান হলেই গাউনটা নোংরা হয়ে যেতে পারে।
মেক আপ ভ্যান থেকে যখন বেরোলো রোহিণী, তখন কাসেমগাঁওতে সন্ধে নেমেছে। গোপাল শ্রীবাস্তব অপেক্ষা করছিলেন ভ্যানের বাইরে। রোহিণীর একটা হাত ধরে রাখলেন তিনি, যাতে হঠাৎ পা হড়কে গেলেও সে পড়ে না যায়। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা গিয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফলে শ্রীবাস্তব তাঁর মোবাইলের টর্চ ব্যাবহার করছেন।
হঠাৎই খুব কাছ থেকে গাছপালার নড়াচড়ার শব্দ ভেসে এলো। পরক্ষণেই একটা চাপা আর্তনাদ করে উঠলেন গোপাল। তাঁর হাতের মুঠোটা আলগা হয়ে গেল। মাটিতে পড়ে গেলেন তিনি। তাঁর টর্চের আলোয় রোহিণী দেখতে পেলো একটি লোককে। চিনতে পারল সে। এ সেই লোক যাকে সে অনেকবার দেখেছে এই তল্লাটে। সে গোপালের মুখটা চেপে ধরেছিল যাতে তাঁর আর্তনাদের শব্দ বেশি দূর অবধি যেতে না পারে। লোকটা ঝড়ের গতিতে তার পিঠ থেকে একটা ব্যাগ নামালো। চেন খুলে একটা কালো বেল্ট বের করে সে রোহিণীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, “আপনে কমরে সে নিকলনে সে পহলে ইয়ে পহেন লে না! ইস কি বাকল কে অন্দর হিডেন ক্যামেরা হ্যায়। বাকল কে পিছে এক ছোটা সা বাটন হ্যায়। জাস্ট প্রেস ইট বিফোর ইউ গেট আউট অফ ইয়োর রুম!”
গোটা ঘটনাটার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গিয়েছিল রোহিণী। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই জঙ্গলের অন্ধকার থেকে আরেকজন মানুষ বেরিয়ে এলো। দুজনে বেহুঁশ গোপালকে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল জঙ্গলের মধ্যে।
নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পরেও রোহিণীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। যে খেলায় সে নেমেছে, তা যে কতটা বিপজ্জনক, একটু আগের ঘটনাটা তা তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। খেলাটা সে’ই শুরু করেছে কিন্তু শেষটা কি তার মনের মতো হবে? এই প্রথম একটা ভয় আঁকড়ে ধরতে চাইছে রোহিণীকে। তার দুই পা যেন অবশ হয়ে আসতে চাইছে।
৩২
রাত নটায় স্নিগ্ধা মামকে নিয়ে শুয়ে পড়লেন। লম্বা জার্নি তাঁকে ভীষণ ক্লান্ত করে দেয়। সন্ধে থেকেই এত ক্লান্ত তিনি যে ডিনারের জন্য ডাইনিং রুমেও যেতে চাননি। ঘরে বসেই তার ফেবারিট ওয়ান্টন স্যুপ খেয়েছেন। খেতে খেতেই ঘুমে ঢলে পড়ছিলেন তিনি। অর্ধেন্দু তাকে শুইয়ে, বুক অবধি ব্ল্যাঙ্কেট টেনে দিয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন। এবার তাকে বেরোতে হবে।
দ্য স্যালাম্যান্ডার থেকে রিসর্ট রেণুর দূরত্ব বেশি নয় কিন্তু বৃষ্টির ফলে রাস্তা পিছল হয়ে রয়েছে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা পেরোতে তার লেগে গেল বারো মিনিট। রেণুর 1 গেটে স্যামুয়েল অপেক্ষা করছিলেন তাঁর বসের জন্য। দুজনে হ্যান্ডশেক করলেন।
“হোয়াই আর ইউ লুকিং টেন্সড?”
প্রশ্ন করলেন অর্ধেন্দু। স্যামুয়েল জানালেন, বিশেষ কোনো কারণ নেই, শুধু গোপাল শ্রীবাস্তব না বলে কোথায় বেপাত্তা হয়ে গেল, সেই চিন্তাই তিনি করছেন। বসকে রিসর্টের আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বারে নিয়ে গিয়ে বসালেন তিনি। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন হাফিজ। অর্ধেন্দুকে দেখেই হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “সো, উই মিট এগেইন!”
দুজনে আলিঙ্গনবদ্ধ হলেন। দিনের পর দিন একটা অপারেশন চলছে দেশজুড়ে অথচ সেটাকে চালাচ্ছেন যাঁরা, সামনাসামনি দেখা তাঁদের প্রায় হয়ই না। হওয়া সম্ভবও না।
.
রাত নটা কুড়িতে রোহিণীর ঘরের দরজায় টোকা পড়লো। সে গাউন পরে তৈরি হয়েই ছিল। বেল্টটা বেঁধে নিয়ে বাকলের পিছনে লাগানো বোতামটা আলতো করে টিপে দিল। সে দরজা খুলতেই স্যামুয়েলের দু’চোখে যেন হাজার ওয়াটের রোশনাই দেখা দিল। রোহিণীর রূপ তাঁকে পাগল করে দিচ্ছে কিন্তু তার কোমরে বেল্টটা পছন্দ হলো না স্যামুয়েলের। তাঁর চাহনি দেখেই প্রশ্নটা অনুমান করে নিল। উত্তর সে ভেবেই রেখেছিল।
“ইটস টু বডি হাগিং, ইউ নো! আই অ্যাম অ্যাফ্রেইড, মাই স্টামাক মে বালজ আউট। সো আই থট আই শুড ওয়্যার দিস।”
স্যামুয়েল মেনে নিলেন তার যুক্তি। শুধু বললেন স্পেশাল গেস্ট বললে যেন বেল্টটা সে খুলে ফেলে।
দরজার বাইরে পা রাখতেই রোহিণীর দু’চোখে ঘন অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। দরজার বাইরে আরেকজন কেউ দাঁড়িয়েছিল। সে তার দুই চোখ বেঁধে দিচ্ছে এখন।
স্যামুয়েল ধরে রাখলেন তার এক হাত। অন্ধের মতো এগোতে লাগল রোহিণী। একটা শব্দ তার কানে এলো। যেন মেঝের উপর ভারী কোনো জিনিস সরানো হচ্ছে। স্যামুয়েল চাপা গলায় বললেন, “প্যায়ের রাখখো নিচে। সিঁড়ি হ্যায় সামনে!”
রিসর্টের ঠিক পাশেই জঙ্গলের মধ্যে ট্রান্সমিটার নিয়ে বসে ছিল দুজন। রোহিণীর বেল্ট বাকলে লাগানো ক্যামেরা যে ফিড পাঠাচ্ছিল, তা ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছিল জায়গামতো কিন্তু এবার সিগন্যাল অফ হয়ে গেল। গাড়ির মাঝের সিটে বসে মোবাইলে সেই ফিড লাইড দেখছিল অ্যারেন। এখন মোবাইলের স্ক্রিন কালো। তার উপরে লেখা ‘সিগন্যাল লস্ট!’
আর ফিডের দরকার নেই অ্যারেনের। তার উদ্দেশ্য ছিল রিসর্টের এই আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বারে পৌঁছনোর রাস্তাটা চিহ্নিত করা। ওখানে সিসিটিভি লাগানো আছে প্রতিটি কোণে। ফলে ফিল্ম ডিরেক্টর আর ডিওপি সেজে ইউনিটের যে দুজন সেখানে বসে আছে আজ দুপুর থেকে তাদের পক্ষে স্যামুয়েলকে ফলো করা সম্ভব ছিল না। ধরা পড়লেই খেলা শেষ!
৩৩
বরাবরের মতোই গাড়ির সামনের সিটে বসেছেন অ্যারেনদের টিম লিডার রক্তিম দত্ত। তাঁর কানে এয়ারডোপ গোঁজা, তাতে গান বাজছে। যে কোনো মিশনে বেরোনোর আগে এভাবেই গান শুনে নিজেকে রিল্যাক্সড রাখেন তিনি। চোখ বুজে গুনগুন করছেন রক্তিম। ডানহাতটা রেখেছেন সিটের উপর, ড্রাইভার ব্রজেশের পিঠের কাছে। আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে গানের সঙ্গে তাল দিচ্ছেন।
একটা গাড্ডায় পড়ে গাড়িটা নেচে উঠতেই তাল কাটলো রক্তিমের। গাড্ডার উদ্দেশে একটা খিস্তি দিয়ে পিছন ফিরলেন তিনি।
“কী রে অরিন্দম, আর কতক্ষণ? চলেছি তো চলেইছি। আর তুই’ই বা এরকম বাংলার পাঁচের মতো মুখটা করে বসে আছিস কেন? জাস্ট চিল ম্যান! কয়েকটা ইয়ং রেবেলস! কী করে নেবে? এর চেয়ে অনেক কঠিন অপারেশন করেছি আমরা। দশ মিনিটে কাজ শেষ করে বেরিয়ে আসব!”
অ্যারেন একবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকালো। পথ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সিটে রাখা গ্লক নাইনটিন পিস্তলটা হোলস্টারে ভরতে ভরতে সে বললো, “সেটাই তো চিন্তার বিষয় রক্তিমদা। আমাদের টার্গেট যে কয়েকজন ইয়ং রেবেলস নয়!”
“মানে!” উত্তেজনা ঝরে পড়লো রক্তিমের প্রশ্নে।
“মানে, আমরা যাকে ধরতে যাচ্ছি তার নাম হাফিজ!”
“হোয়াট ডু ইউ মিন? আমার কাছে হেড কোয়ার্টারের নোট আছে। টার্গেটদের ফটোগ্রাফ আছে। এর মধ্যে হাফিজ কোথা থেকে আসছে অরিন্দম?” রীতিমতো ধমকে উঠলেন রক্তিম কিন্তু অ্যারেন বরফের মতো ঠান্ডা স্বরে জবাব দিলো, “প্রথম থেকেই হাফিজ ছিল রক্তিমদা। শুধু তুমি জানতে না!
“এই শালা, গাড়ি থামা!” চেঁচিয়ে উঠলেন রক্তিম। ড্যাশবোর্ডের উপর থেকে মোবাইলটা তুলে নিলেন। অ্যারেন বললো, “লাভ নেই রক্তিমদা। তোমার দুটো সিমই ডি-অ্যাক্টিভেট করে দেওয়া হয়েছে এতক্ষণে। কারোর সঙ্গে আর কন্ট্যাক্ট করতে পারবে না তুমি! কাউকে অ্যালার্ট করতে পারবে না আর!”
রক্তিমের ধমকে ব্রজেশ সত্যিই গাড়ি থামিয়ে দিয়েছিল। গাড়ি থেকে নামার জন্য দরজার হাতলে হাত রাখতে গেলেন রক্তিম কিন্তু পারলেন না। ঘাঁড়ের কাছে একটা শীতল ধাতব স্পর্শ অনুভব করলেন তিনি।
“রক্তিমদা, তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। দুবার তুমি আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছ। আমাকে এর পরের স্টেপটা নিতে বাধ্য কোরো. না প্লিজ!”
অ্যারেনের গ্লুক পিস্তল ধরা হাতটা যেন কেঁপে উঠতে চাইল। তার কাজে আবেগের কোনো জায়গা নেই, তবু সে চলেই আসে।
“কী করছিস এটা তুই, অরিন্দম? পাগল হয়ে গেছিস তুই?”
“হয়ে গেছিলাম রক্তিমদা। আমি সেদিন পাগল হয়ে গেছিলাম সেদিন তুমি আমাকে ফোন করে বলেছিলে বাধ্য হয়ে মাস্টার দীপনের এনকাউন্টার করতে হয়েছে তোমাকে। মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে যে লোকটাকে অক্ষত অবস্থায় ধরার জন্য এত পরিশ্রম করলাম, সে লোকটা মরে গিয়ে আমাদের কাজটা পণ্ড করে দিলো, এটা মানতে পারিনি। পাগল হয়ে গেছিলাম তার কয়েকদিন পরে, যেদিন সেই হসপিটালের একটা মেয়ে আমাকে কল করে দাবী করেছিল যে সেদিন যেটা হয়েছিল, সেটা এনকাউন্টার নয়, ফেক এনকাউন্টার ছিল। তোমারই নির্দেশে মাস্টার দীপনকে আমাদের এক এজেন্ট তার হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করে নিতে অ্যালাও করেছিল। সে পিস্তলে ভরা ছিল ব্ল্যাঙ্ক বুলেটস। দুজন এজেন্টকে মাস্টার দীপন গুলি করেছে। তোমাকেও করেছিল, তাই বাধ্য হয়ে তুমিও গুলি চালিয়েছ, এই ছিল তোমার সাজানো গল্প। গল্পের সাক্ষী রাখার জন্য তুমি রাস্তার ধারের সিগারেটের দোকানে গেছিলে সিগারেট কিনতে। দোকানদারের সঙ্গে কথা বলেই আমার মাথায় স্ট্রাইক করেছিল কথাটা। সিগারেট! রক্তিমদা সিগারেট কিনতে গেছে? যে জীবনে স্মোক করে না, সে একটা ডেডলি মিলিট্যান্টকে দুজন জুনিয়র এজেন্টের জিম্মায় রেখে বেরিয়ে এসেছিল সিগারেট কিনতে! আসলে তুমি চেয়েছিল এনকোয়েরি হলে তোমার গল্পটাকে সাপোর্ট করার কেউ থাকুক। দোকানদার অজয় হেমব্রম সেই কাজ তোমার জন্য করে দিয়েছিল। তোমার খেলায় সামিল হয়ে দুজন এজেন্ট ইনজিওরড হওয়ার ভান করে হসপিটালের মেডিসিন রুমের ফ্লোরে পড়ে রইলো। হসপিটাল যিনি চালান, তিনিও তোমাদের খেলার পার্টনার। তিনি ফলস মেডিকেল রিপোর্ট দিলেন। মাসছয়েক বাদে দুটো আলাদা মিশনে দুজনকে পাঠিয়ে, খতম করিয়ে দিলে তুমি। তোমার কুকুর্তীর আর কোনো সাক্ষী রইলো না!
কথাগুলো বলতে বলতে থরথর করে কাঁপছিল অ্যারেন। রাগ আর ঘৃণা মিশ্রিত হয়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনার সৃষ্টি করছিল তার মনে।
“আটার রাবিশ! কোথা থেকে এই থিওরি তোর মাথায় এলো অরিন্দম? তুই জানিস, কার সম্বন্ধে কী বলছিস, “ প্রতিরোধের স্বরে বললেন রক্তিম।
“জানি রক্তিমদা, সব জানি। জানতে না শুধু তুমি আর এই ভয়ংকর নাটকের সেকেন্ড লিড ডক্টর অর্ধেন্দু ব্যানার্জি। তাঁর হস্পিটালের মেডিসিন রুম থেকে জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে, এই সন্দেহে তিনি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একটি মেয়েকে বলেছিলেন রুমে সিক্রেট ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন লাগাতে কিন্তু সেই কাজ যে সে এত দ্রুত সেরে ফেলেছে, তা তিনি জানতেন না। সিস্টেম ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা সেটা চেক করার জন্য সে রাতে সে সিসিটিভি রুমে বসেছিল। তোমাদের মেডিসিন রুমে ঢোকা, তোমার ফোন আসা, সমীর আর ধনুশকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে তোমার প্ল্যান সাজানো, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের পকেট থেকে ব্ল্যাঙ্ক বুলেটস বের করে পিস্তলে ভরা, মাস্টার দীপনের ফায়ারিং, সবকিছু যে সিক্রেট ক্যামেরায় রেকর্ড হয়ে গেছিল সেদিন, রক্তিমদা। ডাক্তারেরই নির্দেশ ছিল তো মাস্টার দীপনকে মেরে ফেলার? যাতে তাকে জেরা করে আমরা তাঁদের হাফিজ অবধি পৌঁছতে না পারি? তাই তো? দিনের পর দিন তুমি এজেন্সিকে বিট্রে করে গেছ রক্তিমদা। এমন লেভেলে পৌঁছে গেছ যে, এজেন্সি রেইড করতে যাচ্ছে, এই খবর অবধি তুমি পৌঁছে দিচ্ছ দেশের শত্রুদের কাছে। তুমিই যে এজেন্সির মোল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই সেদিন চিফ অফিসের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে ফোনে রেইডের কথাটা বলেছিলেন। সে সময়ে তাঁর কাছাকাছি একমাত্র তুমি ছিলে!”
এবার ভেঙে পড়লেন রক্তিম। আর মেজাজ চড়ানোর শক্তি পাচ্ছেন না তিনি।
গাড়ি থেকে নেমে পড়লো অ্যারেন ব্রজেশ আর পিছনের সিটে বসা দুজন জুনিয়র এজেন্ট। জঙ্গলের মধ্যে ট্রান্সমিটার নিয়ে বসেছিল যে দুজন, তারা বেরিয়ে এলো। রক্তিমের পিস্তলটা কেড়ে নিয়ে তাদের হাতে দিলো অ্যারেন। জিজ্ঞেস করলো, “অল ক্লিয়ার তো?
দুজনই আঙুলের ইশারায় জানালো ‘অল ক্লিয়ার!’
৩৪
রোহিণীকে দেখে, তার সঙ্গে কথা বলে অর্ধেন্দু আর হাফিজ খুবই খুশি। সুদূর বাহরাইন থেকে ভিডিও কলে তার বিষয়ে সবুজ সংকেত দিয়েছেন এক রহম্যময় ব্যক্তিও।
“দেখুন, আমাদের হয়ে আপনাকে বিভিন্ন টার্গেটের কাছে যেতে হবে। তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে হবে, কথা বলতে হবে। তাদেরকে সবরকমভাবে স্যাটিসফাই করে ইম্পর্ট্যান্ট ইনফো বের করে আনাই হবে আপনার কাজ। হাইলি কনফিডেনশিয়াল এই ব্যাপারটা। যাকে তাকে পাঠানো যায় না। সবার মধ্যে সেই ফিচারসও থাকে না। আপনার আছে। আপনি নিজেকে ক্যারি করতে পারবেন। তবে শুধু শরীর আর স্মার্টনেস দিয়েই তো কাজ হবে না। ইউ হ্যাভ টু আন্ডারগো সাম ট্রেনিং। আপনাকে শিখতে হবে কনভিনসিংলি মিথ্যে কীভাবে বলতে হয়। বিদেশের ইন্টেলিজেন্স খুব টাফ। তাদের হাতে পড়লে তারা আপনাকে সবরকমভাবে ব্রেক করার চেষ্টা করবে। কীভাবে নিজেকে স্টেডি রাখবেন সেসব সিচ্যুয়েশনে, তা আপনাকে শেখানো হবে।”
কথাগুলো বলছিলেন অর্ধেন্দু। দূরে বসে মিটিমিটি হাসছিলেন হাফিজ। মনে মনে হাসছিল সে’ও। সে রোহিণী, সে প্রজ্ঞাও। আবার স্যামুয়েল ডি’কস্টাকে জালে ফাঁসানোর জন্য সে অঙ্কিতা শর্মাও। বাবা তাকে ডাকত লিলি বলে। ডাকত, নাকি এখনো ডাকে? দেখা হলে এখনো কি বাবা ডাকবে লিলি বলে? নাকি বাবা ভুলে গেছে তাকে?
সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল তার মাথার মধ্যে। অর্ধেন্দু তার হাতটা আলতো করে ধরে নিজের দিকে টানতে গেলেন আর ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে ঘরের ছাদটার একাংশ যেন ফাঁকা হয়ে গেল। হুড়মুড় করে ছাদ থেকে নেমে আসা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো তিনজন মানুষ। তাদের পরনে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হাতে পিস্তল। সবশেষে নামল সেই মানুষটা, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যার সাক্ষাৎ পেয়েছিল প্রজ্ঞা। আটমাস আগে সেই লোকটার হাতে তুলে দিয়েছিল একটা পেনড্রাইভ।
স্যাম্যুয়েন্সের শার্টের কলার ধরে হিড়হিড় করে তাঁকে টেনে নামাল সে। স্যামুয়েলের চোখেমুখে বিস্ময়ের বিস্ফোরণ। যেন একটা ঝড়ের মধ্যিখানে পড়ে গেছেন।
এক ধাক্কায় তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে অ্যারেন ইংরিজিতে বললো, “কী মিস্টার স্যামুয়েল ডি’কস্টা! সেদিন পিঙ্ক মুন’বারে যে নরম গলায় বললাম উই আর ক্লোজিং নাউ, সেটা বিশ্বাস হ। তাই না? এবার বিশ্বাস হচ্ছে তো?”
মনে পড়লো স্যামুয়েলের। একটু আগে যখন লাথি মেরে তাঁর ঘরের দরজা ভেঙে বাঘের মতো ঢুকে এসেছিল লোকটা, তখনো যেন চেনাচেনা লেগেছিল। পিঙ্ক মুন বারে এই লোকটাই স্যুট বুট পরে দাঁড়িয়ে ছিল কার পার্কিং এরিয়ায়। এ’ই স্যামুয়েলকে সাপোর্ট করেছিল রোহিণীর চোট লাগার পর। সব বুঝতে পারছেন এবার তিনি।
“গোল্ড স্মাগলিংয়ের টাকায় রিসর্ট, তারপর সেই রিসর্টের আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বারে বর্ডার পেরিয়ে দেশে ঢুকে আসা টেররিস্টদের রেখে আদরযত্ন! আর্মস থেকে শুরু করে ড্রাগস, সব এনে এনে মজুত করেছ এখানে দিনের পর দিন। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে নতুন রিসর্ট খুলে খুব সমস্যা হয়ে গেল। সারা বছর ট্যুরিস্টের আনাগোনা থাকত আগে। তাদের ফাঁকে ফাঁকেই স্পেশাল গেস্টস, স্পেশাল লাগেজ চলে আসত। সেটা বন্ধ হয়ে গিয়ে এলাকার লোকের নজরে পড়ার ভয় ঢুকল মাথায়। তাই লোকাল পুলিশকে পকেটে পুরে রাখতে রিসর্টটাকে ব্রথেল করে তুললে! যাকে কাজে লাগাচ্ছিলে, সে তোমার কোনো কূকীর্তি ধরে ফেলায় তাকে দিলে সরিয়ে! কিন্তু এবার? রিপ্লেসমেন্ট চাই তো? ভাগ্যিস সরিয়েছিলে মেয়েটাকে! পুত্তর গার্ল, উই প্রে ফর হার সোল! কিন্তু সে সরে গিয়েই আমাদের রাস্তাটা খুলে দিলো!
স্যামুয়েল মাটিতে বসে থরথর করে কাঁপছিলেন। প্রজ্ঞার চোখ চলে যাচ্ছিল হাফিজের দিকে। যাকে তার হ্যান্ডসাম হাঙ্ক মনে হচ্ছিল একটু আগেও, এই মুহূর্তে তার দু’চোখেও আতঙ্কের ছায়া।
হাফিজকে জ্যাকেটের কলার ধরে টানতে টানতে উপরে নিয়ে গেল দুজন। অ্যারেন গিয়ে দাঁড়াল অর্ধেন্দুর সামনে। পিস্তলটা তাঁর কপালে ঠেকিয়ে বললো, “আপনাকে নিয়ে কী করা যায় বলুন তো? আপনার যা পারফরম্যান্স, তার পাশে এরা তো কিন্ডারগার্টেনের শিশু! একজন গোল্ড স্মাগলিং করে পয়সা কামিয়েছে, আরেকজন দেশে জেহাদের আগুন জ্বেলে দিতে চেয়েছে আর আপনি? দ্য গ্রেট কার্ডিওলজিস্ট। যাঁকে ভিজিট করার জন্য শয়ে শয়ে মানুষ বিভিন্ন স্টেট থেকে ট্র্যাভেল করে কলকাতায় আসেন। আর তিনি কী করেন? চ্যারিটেবল ট্রাস্টের হয়ে ফ্রি হেলথ চেক আপ ক্যাম্পের নামে সারা দেশে ঘুরে বেড়ান আর বিভিন্ন অর্ফানেজ, হোম আর এনজিও’তে ক্যাম্প করতে গিয়ে সেখান থেকে ক্যান্ডিডেট বাছেন। যুবতীদের বাছেন এসকর্ট সার্ভিসের জন্য আর যুবকদের বাছেন বডি অর্গ্যান বের করে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য! ডাক্তারবাবু, আপনি এত বিখ্যাত একজন মানুষ, রাজ্যের সরকারের এত কাছের এক ব্যক্তি, আপনি কি চাইলে শিলিগুড়ি শহরে বা অন্য যে কোনো প্রাইম লোকেশনে হসপিটাল করার জন্য জমি পেতেন না? শেষে ওরকম একটা জায়গায়, জঙ্গলের মধ্যে হাসপাতাল করতে হলো? অবশ্য লাশ পোঁতার জন্য জঙ্গলের মাটিই নিরাপদ, তাই না?”
নিপাট ভদ্রলোক অর্ধেন্দুর দু’চোখ ঠেলে যেন ভিতরের পিশাচটা বেরিয়ে আসতে চাইল। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বললেন, “যা যা বললেন তার কোনোটা প্রমাণ করতে পারবেন?”
অ্যারেন জবাব দিলো, “অ্যানেজে ফ্রি হেলথ চেক আপ করতে এসে এমিনেন্ট কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর অর্ধেন্দু একজন মোস্ট ওয়ান্টেড টেররিস্টদের সঙ্গে বসে গোপন মিটিং করছিলেন, সেটুকু তো পারবো। দুবাইতে কিছুদিন আগে রেড কর্ণার নোটিস খাওয়া সন্ত্রাসবাদীর সঙ্গে আপনার যে ছবিটা উঠেছে, সেটা তো দেখাতে পারব। তার বাবা আসলে কত বড় একটা ডেভিল সেটা আপনার ছোট্ট মেয়েটাকে জানাতে তো পারব। তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আপনাকে হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে গাড়িতে তো তুলতে পারব। সেটাই বা কম কী?”
অর্ধেন্দু আর কিছু বলতে পারলেন না। বসে পড়লেন সোফায়।
