ধূমকেতু যখন আসে
মধুময় রাতের আকাশ দেখছিলেন। কালো পরদায় কাচপোকা টিপ হয়ে জ্বলছে।
চন্দ্র, গ্রহ, তারা, নীহারিকা। তারই মাঝে একটি আকর্ষণীয় উজ্জ্বল বিন্দু—ধূমকেতু সুইফ্ট-টাট্ল। খালি চোখে ওটাকে চিনে নিতে কোনও অসুবিধেই নেই। এখনকার হিসেবমতো আর পাঁচবছর পরেই, ২১২৬ সালের ১৪ আগস্ট, এই বেপরোয়া ধূমকেতু এসে পৌঁছবে পৃথিবীর কক্ষপথে। তারপর সেকেন্ডে ষাট কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা দু-কোটি মিলিয়ন টন ওজনের বস্তুটির সঙ্গে সংঘর্ষ হবে এই প্রাচীন পৃথিবীর। ব্যস, সব গল্প শেষ। শেষ হয়ে যাবে দিন-রাতের খেলা।
‘দাদাভাই, কোনটা? ওইটা—ওই যে হলদে বলের মতন?’
টুবুনের দিকে ঘুরে তাকালেন মধুময়। কিশোর মুখমণ্ডলে চাঁদের আলো পড়েছে। কী নিষ্পাপ দেখাচ্ছে! চাঁদের আলো কি পাপ ধুয়ে দেয়?
খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে মধুময়ের শীত-শীত করছিল।
এখন অঘ্রাণের শুরু। হানাদার বাতাস পাতা খসানোর কাজ করে চলেছে গোপনে। মধুময়ের সাদা চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আর জ্যোৎস্না সেই ফিনফিনে সাদা সুতোয় খেয়ালখুশি মতো নকশি-কাঁথা বুনে চলেছে একমনে।
মধুময় স্ট্যান্ডে দাঁড় করানো টেলিস্কোপটার দিকে আঙুল দেখিয়ে নাতিকে কাছে ডাকলেন, ‘এখানে আয়, এই টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে দেখ। আরও স্পষ্ট দেখা যাবে—।’
টুবুন দাদুর কাছে এগিয়ে এল। টেলিস্কোপের ঘষা কাচের পরদায় চোখ রাখল। একটু দেখেই বলল, ‘ওরে ব্বাবা, শুধু আলো আর কালো-কালো ফুটকি। এটাই কি ধূমকেতু, দাদাভাই?’
‘হ্যাঁ।’ আকাশের দিকে চোখ রেখে মধুময় বললেন, ‘আর পাঁচবছর পর। তোমার বয়েস যখন উনিশ বছর হবে, তখন ওই ধূমকেতুটা পৃথিবীকে এসে ধাক্কা মারবে।’
টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে টুবুন জিগ্যেস করল, ‘কী হবে তখন?’
আকাশের দিকে আনমনা চোখে তাকিয়ে মধুময় বললেন, ‘সব ধ্বংস হয়ে যাবে—।’
‘বাঃ রে, কেউ পৃথিবীটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করবে না? ধূমকেতুটাকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেই হয়—ওটা পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে।’
‘এত বছর ধরে সবাই সেই চেষ্টাই করছে রে। আমিও করছি। এতদিনের পৃথিবীটা নিমেষে ধ্বংস হয়ে যাবে এটা কেউ সইতে পারে!’
মধুময়ের কথা শেষ হতে-না-হতেই দীপান্বিতার গলা শোনা গেল, ‘বাবা, আপনার ফোন।’ তারপর একটু থেমেইঃ ‘টুবুন, নীচে এসো। ঠান্ডা লেগে যাবে। এমনিতেই তো সারাটা দিন খকখক করে কাশছো—।’
ছাদের সিঁড়ির মুখে দীপান্বিতা ছায়ার মতো এসে দাঁড়িয়েছিল। কথাগুলো ও খারাপভাবে বলেনি। কিন্তু তবুও মধুময় যেন অতৃিপ্তর ছোঁওয়া টের পেলেন।
টুবুনকে নিয়ে দীপান্বিতা নীচে নেমে গেল। সিঁড়িতে যে পায়ের আওয়াজ উঠল তার মধ্যে কি বাড়তি শক্তি ছিল? নাকি শোনার ভুল?
অন্ধকার সিঁড়ি ধরে নেমে এলেন মধুময়। বাল্বটা কেটে গেছে আজ প্রায় দিনদশেক। কিন্তু এখনও পালটানো হয়নি। অঞ্জনের সময় হয়নি। নিজের ব্যাবসা নিয়ে বড় বেশি ব্যস্ত ও। টুবুনের পড়াশোনা নিয়েও বসতে পারে না কখনও। এই নিয়ে দীপান্বিতার সঙ্গে অঞ্জনের মাঝেমধ্যেই কথাকাটাকাটি হয়।
টেলিফোনটা অঞ্জনদের বসবার ঘরে। বাড়িটা এখনও মধুময়েরই নামে। কিন্তু তবুও কী করে যেন ঘরগুলোর নাম ‘অঞ্জনদের বসবার ঘর’, ‘টুবুনের পড়ার ঘর’, ‘দীপান্বিতার রান্নাঘর’, এইরকম হয়ে গেছে। এমনকী বারান্দা, অলিপথ, একফালি উঠোন—সবজায়গাতেই বেহিসেবিভাবে কেউ যেন ভাগাভাগির পাঁচিল তুলে দিয়েছে।
বসবার ঘরে পা দিয়েই মধুময় দেওয়াল-ঘড়িতে ন’টার মিষ্টি ঘণ্টা শুনতে পেলেন।
রোজকার সবকিছুই যদি এরকম মিষ্টি হতো!
বসবার ঘরে ঢুকে দেখলেন, অঞ্জন পারসোনাল কম্পিউটারে বসে ব্যাবসার হিসেবপত্র বা ওই জাতীয় কিছু নিয়ে ব্যস্ত। সবসময় হিসেব নিয়েই থাকে ও। মাঝে-মাঝে মধুময় অবাক হয়ে ভাবেন। এই কি তাঁর একমাত্র পুত্র! একেই কি পাখির মতো মমতায় তিনি আর অঞ্জলি এই এত্তটুকুন থেকে বড় করে তুলেছিলেন! আঃ, যদি অঞ্জলি আজ থাকত কী কষ্টই না পেত! এই কষ্ট থেকে বাঁচার জন্যই অঞ্জলি একযুগ আগে ছবি হয়ে গেছে। ওর গলায় শুকনো ফুলের মালা দোলে।
বসবার ঘরের এক কোণে কম্পিউটার, আর তার বিপরীত কোণে ভিডিয়োফোন। ঘরের দেওয়ালের সর্বত্র অঞ্জন, দীপান্বিতা আর টুবুনের ছবি। অঞ্জলি সেই কবেই চালান হয়ে গেছে মধুময়ের একতলার এক কোণের ঘরের আস্তানায়। রোজ রাতে শোওয়ার আগে মধুময় অঞ্জলির ফটোর সঙ্গে কথা বলেন।
‘জানো, আর পাঁচবছর পরে পৃথিবীর দারুণ বিপদ আসছে। এখন থেকে চেষ্টা না করলে সব শেষ হয়ে যাবে।’
ফিকে হয়ে আসা রঙিন ফটোয় অঞ্জলির ভুরু ধনুকের মতো বেঁকে গেলঃ ‘কেন গো? তুমি, খোকা, টুবুন, দিপু…তোমরা খুব সাবধানে থেকো।’
মধুময় হাসেন। বিষণ্ণ হাসি। ওঁর বলতে ইচ্ছে করলঃ ‘অঞ্জ, কিছুই আর আগের মতো নেই। সব পালটে গেছে।’
তারপর মধুময় ওকে বলেছেন সুইফ্ট-টাট্ল-এর কথা।
সেই কোন ১৮৬২ সালে দুই মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী লিউইস সুইফ্ট আর হোরেস টাট্ল এই ধূমকেতুটিকে প্রথম লক্ষ করেন। খালি চোখেই পৃথিবীর মানুষ তাকে দেখতে পেয়েছিল—এখনকার মতন। লোকে এই ধূমকেতুটির নাম দিয়েছিল ‘গ্রেট কমেট অফ ১৮৬২’। পরে তার নাম রাখা হয় ‘সুইফ্ট-টাট্ল’—ওই দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানীর নামে।
কে জানত, কালক্রমে এই ধূমকেতুই ডেকে আনবে পৃথিবীর শেষ দিন!
ভিডিয়োফোনে সীতাংশুর ছবি। সীতাংশু রায়। দুঁদে উকিল। মধুময়ের একরকম বন্ধুর মতো। মধুময় জানেন সীতাংশু কেন ফোন করেছেন।
‘কী খবর, সীতাংশু?’ ভিডিয়োফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বললেন মধুময়।
সীতাংশু হাসলেন। বললেন, ‘খবর আর কী! এখন তো উকিলদের শ্বাস ফেলার সময় নেই। পাঁচবছর পর দুনিয়া খতম হয়ে যাবে, সেই ভেবে সবাই খালি উইল করছে। ভাবছে, সম্পত্তি ভোগ করার জন্যে ওয়ারিশ বহাল তবিয়তে দিব্যি বেঁচে থাকবে।’ হো-হো করে হেসে উঠলেন সীতাংশুঃ ‘এই তুই যেমন ভাবছিস।’
মধুময় হাসলেন না। বললেন, ‘আমার লেখাটা তুই পড়েছিস?’
‘হ্যাঁ, পড়েছি। তোর লেখা দেখে একটা খসড়া উইল আমি দাঁড় করিয়েছি। ওটা পড়ে আমাকে গ্রিন সিগন্যাল দিলেই আমি সবকিছু ফাইনাল করে দেব।’
মধুময় সামান্য আনমনা হয়ে পড়েছিলেন। ভিডিয়োফোনের পাশে রাখা শো-কেসের কাচে ছেলের আবছায়া প্রতিবিম্ব দেখতে পেলেন। অঞ্জন এই মুহূর্তে আর কম্পিউটারে কাজ করছে না। মধুময়ের কথা শুনছে, ওঁকে লক্ষ করছে।
গত ক’দিন ধরেই বাড়ির অবস্থা থমথমে। মধুময় সবই বোঝেন। কী করে যেন ওঁর উইল করতে যাওয়ার ব্যাপারটা দীপান্বিতা অথবা অঞ্জন জেনে গিয়েছিল। তারপর থেকেই ওদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। সীতাংশুর টেলিফোন এলেই ওরা আর সহজ-স্বাভাবিক থাকতে পারে না।
গত কয়েকমাস ধরেই এগিয়ে আসা ধূমকেতুর কক্ষপথ যথেষ্ট খুঁটিয়ে লক্ষ করছেন মধুময়। তাঁর টেলিস্কোপের ব্যাস মাত্র সাড়ে ছ’-ইঞ্চি। কিন্তু কার্ল জাইসের নিখুঁত লেন্স—চন্দ্র, গ্রহ, তারা কী স্পষ্ট দেখা যায়!
মধুময় কলকাতার একটি জ্যোতির্বিদ সংস্থার সক্রিয় সদস্য। সংস্থার সাপ্তাহিক মিটিং-এ এই ভয়ংকর ধূমকেতুকে ধ্বংস করার নানান পরামর্শ দেন তিনি। সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্থা এই সঙ্কট নিয়ে ভাবছে। ধূমকেতুকে ঘিরে ধ্বংসের কতরকম যে কুসংস্কার আছে! সেগুলো কি এবার সত্যি হতে চলেছে?
মধুময় কথা বলা শেষ করে ভিডিয়োফোনের সুইচ অফ করতেই অঞ্জন ডেকে উঠলঃ ‘বাবা!’
মধুময় ছেলেকে দেখলেন। ওর ঘাড়ের কাছে চুলগুলো কেমন খোঁচা-খোঁচা হয়ে আছে। উদ্ধত ঘোড়ার কেশরের মতো।
‘কিছু বলবি?’
‘উইল কি না করলেই নয়?’
মধুময় ধাক্কা খেলেন। এই প্রথম বুঝি সরাসরি সংঘর্ষ হতে চলেছে। দুটি মহাজাগতিক জ্যোতিষ্কের কক্ষপথের কাটাকুটি খেলা। কিছুতেই কি এই সংঘর্ষ এড়ানো যায় না?
‘খোকা, আমার উইলে তোর কোনও ক্ষতি হবে না। শুধু মাইকেলনগরের বাগানটুকু আমি মানমন্দির করার জন্যে আমাদের সোসাইটিকে দান করে যেতে চাই। তা ছাড়া—।’
অঞ্জন ক্ষিপ্র হাতে চোখের চশমা খুলে এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি আর শুনতে চাই না, বাবা! তুমি সারা পৃথিবীকে ধূমকেতুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে খেপে উঠেছ, অথচ নিজের ছেলেকে বাঁচাতে পারছ না।’ একটু থেমে চোখ নামাল অঞ্জন। চাপা অভিমানের গলায় বলল, ‘আমি এতদিন কিছু বলিনি। জানতাম না, মানুষ এতটা অকৃতজ্ঞ হতে পারে—।’
অঞ্জলি! শুনতে পাচ্ছ, খোকা কী বলছে! মধুময় ডুকরে উঠলেন মনে-মনে। একযুগের ভাত-কাপড়ের ঋণে তিনি কি খোকার কেনা জনম্দাস হয়ে গেছেন! ওঁর যে বড় আশা ছিল, যে-কোনও দিন, যে—কোনও দিন, খোকা আবার ছোটবেলার মতো হয়ে যাবে। এখনকার টুবুনের মতো। অঢেল কৌতূহল থাকবে, কিন্তু লিপ্সা থাকবে না।
এতদিন পর্যন্ত বড় প্রত্যাশা নিয়ে সেই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করে ছিলেন মধুময়। স্থির প্রতিজ্ঞায় নিজের কক্ষপথে পরিক্রমা করে গেছেন অবিরাম। কিন্তু…।
মধুময়ের শরীরে এক অদ্ভুত জ্বালা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কানে এল, পাশের ঘরে দীপান্বিতা রুক্ষভাবে টুবুনকে ধমকাচ্ছে। টুবুন কি ফুঁপিয়ে কাঁদছে? মধুময়ের কানে সবরকম শব্দ জড়িয়ে যাচ্ছিল, জট পাকিয়ে যাচ্ছিল।
কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছাদে ফিরে এলেন মধুময়। প্রত্যাশাহীন অবাঞ্ছিত এক বৃদ্ধ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যে গ্রহ-তারা চেনে, অথচ আত্মীয়দের চিনতে পারে না। মধুময় অবাক চোখে আকাশের দিকে তাকালেন। গ্রহ-তারা-নীহারিকা বয়েসে কত প্রাচীন! কত প্রাচীন ওদের সংসার! কিন্তু তবুও ওদের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ এতটুকু কমে না। কী অনুগতভাবে ক্রমাগত ঘুরে যায় কক্ষপথে! সময়ের ঘড়ি ওদের এই টানে ক্ষয় ধরাতে পারে না।
ক্লান্ত মধুময় রাতের আকাশে উজ্জ্বল সুইফ্ট-টাট্লকে দেখলেন। ভাঙাচোরা গলায় বললেন, ‘তুই ছুটে আয়। আমার দিকে ছুটে আয়!’ বাঁ-হাতে নিজের বুকে কয়েকবার আলতো আঘাত করে বৃদ্ধ বলে উঠলেনঃ ‘আমি তোর জন্যে বুক পেতে অপেক্ষা করব।’
শুধু কালো রাত আর ঠান্ডা বাতাস মধুময়ের হাহাকার শুনছিল।
