জীবনের সুর
পৃথিবীর হিসেবে প্রায় দু-বছর পরে স্পেসভিউতে অলককে দেখল তনুজা।
হলোগ্রাফিক পদ্ধতিতে তৈরি করা অলকের প্রতিবিম্ব যেন মায়া নয়—বাস্তব।
দেখে মনেই হয় না, আসল মানুষটা রয়েছে তিন লক্ষ চুরাশি হাজার চারশো কিলোমিটার দূরে—চাঁদে। চন্দ্রনগরীর স্থাপত্যের কাজে অলক সরকারি দায়িত্ব নিয়ে রওনা হয়েছিল দু-বছর আগে। তারপর একটানা দু-বছর মানুষটার কোনও দেখা নেই, কোনও কথা নেই। শুধু কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে স্বামীর সংক্ষিপ্ত খবর এসে পৌঁছেছে তনুজার কাছেঃ ‘আপনার স্বামী অলক দত্ত ভালো আছেন।’ সরকারের ছক-বাঁধা নিয়মকানুনের সিলমোহর যেন লাগানো রয়েছে এই সংক্ষিপ্ততম সংবাদের প্রতিটি শব্দে। কিন্তু নিয়ম না মেনে তনুজার উপায় নেই। তাই বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে ও শুধু অপেক্ষা করেছে। দিন গুনেছে, ঘণ্টা গুনেছে, মিনিট গুনেছে। তারপর গত সপ্তাহেই নতুন খবর এসেছেঃ স্থাপত্যের কাজে অলক দত্তের দায়িত্ব শেষ, সে ফিরে আসছে সাতদিন পরে।
চন্দ্রনগরী নির্মাণ নিয়ে কেন যে এত গোপনীয়তা বা নিয়মের কড়াকড়ি তা জানে না তনুজা। সে নিয়ে ওর কোনও মাথাব্যথাও নেই। ওর চিন্তা শুধু অলককে নিয়ে। বিয়ের পর স্বামীকে মাত্র ছ’টা মাস ও কাছে পেয়েছে, ভালোবাসতে পেরেছে—তারপরই সে দিয়েছে চাঁদে পাড়ি। নিরুপায় অলক যাওয়ার সময়ে শুধু বলে গিয়েছিল, ডার্লিং, দেখবে কয়েকটা মাস হুউস করে কেটে যাবে। তারপর এসে তোমাকে চাঁদের গল্প শোনাব—চাঁদের আলোয় বাগানে বসে। তারপর…।
স্পেসভিউতে অনেক কথা বলল অলক, কিন্তু তনুজার কিচ্ছু কানে ঢুকছিল না। ওর ইচ্ছে হচ্ছিল, ছুটে গিয়ে ‘সত্যিকারের প্রতিবিম্ব’টাকে জড়িয়ে ধরে প্রচণ্ড আবেগে কয়েকটা চুমু খায়, আদরে-আদরে অস্থির করে তোলে, ওর বুকে দমাদম কিল মেরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, তারপর…।
অলককে আগের মতোই সুন্দর দেখাচ্ছিল। তনুজা শুধু বলল, তুমি এক্ষুনি আমার কাছে ফিরে এসো।
বলেই স্পেসভিউর কানেকশান কেটে দিল।
তার পরদিনই বাড়িতে এসে হাজির হল অলক।
হোভার-মোবিল বাড়ির কাছে এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল অলক। তারপর রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় গাড়িটাকে ফেরত পাঠিয়ে দিল।
বাড়ির দরজার মুখোমুখি হয়ে আবার রিমোট কন্ট্রোল ইউনিটের বোতাম টিপল অলক। দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। অলক বাড়িতে ঢুকল। তারপর দেখতে পেল তনুজাকে। ও দু-হাত বাড়িয়ে ডাকল, তনু! আমি এসে গেছি।
তনুজা যেন হাওয়ায় ভেসে ছুটে এল অলকের কাছে। দু-হাতে আঁকড়ে ধরল ওকে। অলক! আমার অলক!
অলকের বুকে মাথা রেখেই প্রথম একটা অচেনা অস্বস্তি টের পেল তনুজা। কেমন যেন আড়ষ্ট লাগছে অলককে। ওর বাহুডোরে যেন সেই আবেগ, সেই জোর আর নেই। তনুজা মুখ তুলে স্বামীকে দেখল। না, ওর মুখে সত্যিই রয়েছে বহুদিন পরে প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসার তৃিপ্ত, প্রিয়জন মিলনের আকাঙ্ক্ষা।
তনুজা নতুন অস্বস্তিটা প্রকাশ করল না। গোপন করে রাখল বুকের মধ্যে। এমনটা বিশ্বাস করা খুব কষ্ট যে, চন্দ্রনগরীতে গিয়ে অলক দ্বিতীয় কোনও তরুণীর প্রেমে পড়েছে।
কিন্তু প্রতিদিন অস্বস্তির মাত্রা বাড়তেই থাকল। অলকের হাঁটা-চলা, শোওয়া-বসা সবই কেমন যেন অদ্ভুত। তা ছাড়া এই দুধ খেতে গিয়ে গ্লাস ভাঙছে, নয়তো চায়ের কাপ খসে পড়ছে হাত থেকে, কিংবা চলতে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে চেয়ার-টেবিলে।
তনুজা বিরক্ত হয়ে একদিন বলেই ফেলল, তোমার কী হয়েছে বলো তো?
ওরা ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। অলক কাপটাকে দু-হাতে আঁকড়ে ধরে মুখ নামিয়ে একটু-একটু করে অতি সাবধানে চা খাচ্ছিল। ওর খাওয়ার ভঙ্গি দেখে ভীষণ বিরক্ত হল তনুজা। শুধু চায়ের কাপ নয়, তনুজাকে ধরার সময়েও অলকের একইরকম আতঙ্ক থাকে—এই বোধহয় বাঁধন ঢিলে হয়ে খসে পড়ে যাবে তনুজা।
তনুজার কথায় অলক চোখ নামাল। কী বলবে? এভাবে বাড়িতে ফিরে আসাটা ওর ঠিক হয়নি। হেডকোয়ার্টারে ওর জানানো উচিত। কিন্তু অলকের কথা শুনলে ওরা কি হাসাহাসি করবে না?
অলক বলল, আমার একরকম অসুখ করেছে, তনু—।
কী অসুখ? বলো তো ডাক্তারবাবুকে…।
না, না, তার দরকার নেই। সেরকম কিছু নয়।
তনুজার অদ্ভুত লাগল। এই মানুষটা দুটো বছরে এরকম বিচিত্রভাবে পালটে গেল! যখন-তখন জিনিসপত্র ভাঙছে, ঠিকমতো হাঁটা-চলা করতে পারছে না, এমনকী নতুন বিয়ে করা বউকে ঠিকঠাক আদর পর্যন্ত করতে পারছে না—অথচ বলছে, সেরকম কিছু নয়!
আশ্চর্য!
তনুজার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। বুকের মধ্যে পীড়নের যন্ত্রণা। এ কোন অলক ফিরে এল চন্দ্রনগরী থেকে! এই অদ্ভুত মানুষটাকে নিয়ে একটা মসৃণ দাম্পত্য জীবন কি ভাবা যায়?
যতই সহ্য করছিল ততই বাষ্প জমছিল তনুজার মনে। চাপ বাড়ছিল ক্রমশ। অবশেষে একদিন সন্ধের মুখে অলক একটা ফুলকাটা কাচের ফুলদানি ভেঙে ফেলতেই তনুজা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। একেবারে ফেটে পড়ল।
বিয়ের ঠিক পরে-পরেই একটা কিউরিয়ো শপ থেকে আড়াইশো বছরের পুরোনো একজোড়া কাচের ফুলদানি কিনেছিল তনুজা। চিনদেশে তৈরি জিনিসটার গড়ন, রং ও কারুকাজ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। তনুজার ভীষণ কাচের ফুলদানির শখ। বাড়িতে নানারকম মাপের, গড়নের আর রঙের ফুলদানি রয়েছে। সবই তনুজার কালেকশান। সারি-সারি সুন্দর করে ওগুলো সাজানো রয়েছে তাকে। সেখানেই ছিল এই চিনে ফুলদানি জোড়া। অলক যে কী করতে ওখানে হাত দিতে গিয়েছিল কে জানে। ওর কোন এক অসর্তক মুহূর্তে তারই একটা মাটিতে পড়ে চুরমার। একেবারে টুকরো-টুকরো।
রাগে অন্ধ হয়ে তনুজা যে ঠিক কী-কী বলেছে ওর খেয়াল নেই। এটুকু বুঝতে পেরেছে যে, কথাগুলো বলার সময়ে ওর কোনও জ্ঞানগম্যি ছিল না। প্রিয় ফুলদানি চুরমার হয়ে যেতে ওর সংযম আর ধৈর্যের বাঁধও বোধহয় চুরমার হয়ে গিয়েছিল।
তনুজা যখন থামল তখন অলক দু-হাতে মুখ ঢেকে একটা সোফায় বসে পড়েছে। যেন একটা জড় পদার্থ বসে আছে—ভাঙাচোরা, নিষ্প্রাণ।
তনুজা বুঝতে পারল অলক কাঁদছে। ওর শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠছে। শোনা যাচ্ছে অবরুদ্ধ ফোঁপানি।
তনুজা মরমে মরে গেল যেন। ওর সংবিৎ ফিরে এল। সত্যিই তো! চিনে ফুলদানির চেয়ে অলক ওর কাছে অনেক বেশি প্রিয়!
অলকের কাছে এগিয়ে গেল তনুজা। সোফার হাতলে বসে অলকের পিঠে হাত রাখল। তারপর ওর মাথাটা টেনে নিল বুকে।
অলক! অলক!
অলক তনুজার শরীর আঁকড়ে ধরতে চাইল। ভারী গলায় বলল, আমি আর সইতে পারছি না, তনু!
তনুজা কোনওরকমে বলল, কিছু মনে কোরো না, সোনা। আমার ভুল হয়ে গেছে।
অলক চোখ মুছে মুখ তুলে তাকাল। বলল, ভুল তোমার নয়—আমার। কারণ, গ্র্যাভিটির ব্যাপারটা আমি হিসেবের মধ্যে ধরিনি।
গ্র্যাভিটি? মাধ্যাকর্ষণ?—তনুজা অবাক হয়ে অলককে দেখল।
হ্যাঁ, চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ।—অলক তনুজার শরীরে মিশে যেতে চাইল। বলল, চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর প্রায় ছ’ভাগের এক ভাগ, তনু। আর সেই কম মাধ্যাকর্ষণের জগতে দু-দুটো বছর কাটিয়ে এসেছি আমি। তারপর ফিরে এসেছি জন্মভূমিতে—যে জন্মভূমির টান চাঁদের ছ’গুণ। মাধ্যাকর্ষণ কেন আছে আমরা এখনও জানি না। একে চোখে দেখতে পাই না, একে রুখতে পারি না, শুধু অসহায়ভাবে অনুভব করতে পারি। তাই পৃথিবীতে ফিরে এসে আর সবকিছু আবার খুব চেনা লাগলেও, মাধ্যাকর্ষণ যেন অচেনা হয়ে গেছে! তাই চাঁদের অভ্যেস থেকে পৃথিবীর অভ্যেসে আমি সহজে ফিরতে পারছি না। এখানে আমার হাঁটা-চলা, কথা বলা, এমনকী তোমাকে আদর করা পর্যন্ত ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার উচিত ছিল, হেডকোয়ার্টারে মাসখানেক কাটিয়ে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টান রপ্ত করে তার পরে তোমার কাছে ফিরে আসা।
অলককে নিজের আরও কাছে টেনে নিল তনুজা। ভাবল এই অদৃশ্য মৌলিক আকর্ষণের কথা। জন্মমুহূর্ত কিংবা তারও আগে থেকে কোনও ভ্রূণ অথবা শিশু এই আকর্ষণ অনুভব করে। তারপর তার পরিমণ্ডলেই বেড়ে ওঠে। মাধ্যাকর্ষণ তার রক্তের অণু-পরমাণুতে মিশে যায়। এর শিকড় অনেক-অনেক গভীরে।
তনুজা অলকের চোখের জল মুছিয়ে দিল। বেচারা অলক! চন্দ্রনগরী স্থাপন করতে গিয়ে ও জন্মভূমির টান ভুলে বসে আছে।
তনুজা বলল, কী বলছ তুমি! এতদিন পর আমার কাছে ছাড়া আর কোথায় তুমি ফিরবে! আর ক’টা দিন। তারপরই আবার সবকিছু আগের মতো সহজ সরল হয়ে যাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
অলকের মুখে হাসির হালকা রেখা ফুটে উঠল। বলল, সত্যি তনু?
তনুজা বলল, সত্যি।
ওদের সুখের আকর্ষণের বাঁধনে মাধ্যাকর্ষণ যে চিড় ধরিয়েছিল তা জোড়া লেগে যাবে ধীরে-ধীরে। যতই হোক, পৃথিবীর টান যে চাঁদের ছ’গুণ।
