সপ্তম অধ্যায়
সতু
গঙ্গার ঘাট থেকে যত দূর ওদের বাড়ি, তার থেকেও কি দীর্ঘ ওর মন খারাপ?
সতু গঙ্গার ঘাটের ধাপ পেরিয়ে রাস্তায় উঠে এল। বিকেল নরম হয়ে এসেছে। রাস্তায় লোকজন বেড়ে গিয়েছে আগের চেয়ে। অফিস ছুটির সময় হয়েছে বলেই কি?
একটা ঘোড়ার গাড়ির পাশ কাটিয়ে সতু এগোল। মাথা যে কাজ করছে না ওর। সব আছে, তাও যেন কিছু নেই। একটা জীবন যেন চিরকালের মতো শূন্য হয়ে গিয়েছে। কোথায় ফিরবে ও! কার কাছে ফিরবে! আর কে রইল সতুর!
কোনও কোনও কষ্ট কি এমনও হয়, যেখানে চোখ দিয়ে জল পড়ে না? শুধু বুকের মধ্যে মাইলের পর মাইল জেগে থাকে মরুভূমি আর কাঁটাতার?
বুকপকেটে হাত দিল সতু। খামটা স্পর্শ করল। ওর জন্য কুসুমদির রেখে যাওয়া শেষ চিহ্ন! খামের ওপরে লেখা আছে বাড়ি গিয়ে যেন পড়ে।
তাই হবে। কুসুমদি যখন এমনটা চায়, তাই হবে। আর সত্যি বলতে কী, পড়েই-বা কী হবে! যে ওর সমস্তটা, সেই তো আর নেই।
কুসুমদি আর তিনুদাকে নিয়ে যাওয়ার দু’দিন পরে সুধীরকাকু উঠোনে ধরেছিল সতুকে। তার পর বলেছিল, “পুলিশ মেডিক্যাল কলেজে রেখেছে কুসুমকে! বাড়ির লোক হিসেবে একজনকে দেখা করতে দেবে। যদুবাবু পাষাণ মানুষ। নিজেও যাবেন না, তারক বা বৌঠানকেও পাঠাবেন না। স্নেহের চেয়ে কি সম্মান বড় হল?”
সতু কী বলবে বুঝতে পারছিল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল সুধীরকাকুর দিকে।
সুধীরকাকু চারিদিকে দেখে স্বর নামিয়ে বলেছিল, “সতু, তুই দেখতে যাবি? আমি ব্যবস্থা করে দেব তা হলে। যদিও তুই আত্মীয় নোস। তা হলেও আমি ওই হাসপাতালেই তো আছি, অসুবিধে হবে না। যাবি?”
সতুর কি যাওয়া উচিত? ও বুঝতে পারছিল না।
সুধীরকাকু আবার বলেছিল, “তা ছাড়া কুসুমও বলছিল যদি তুই যাস…”
“কুসুমদি ডেকেছে আমায়!” সতুর চোখে জল চলে এসেছিল।
সুধীরকাকু ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলেছিল, “এ কী! এ ভাবে কেউ কাঁদে! শক্ত হতে হবে না? চোখের জল কোনও কিছুর সমাধান নয়। বুঝেছিস? কাল চলে আসিস বেলা চারটে নাগাদ। আমি থাকব।”
.
হাসপাতাল চত্বরটা কী বিশাল। গাছপালা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। পুরনো দিনের থামওয়ালা বাড়ি। বিশাল চওড়া দালান। লম্বা সিঁড়ি কত উপর অবধি উঠে গিয়েছে। তার পাশে লতিয়ে উঠেছে গোলাপি কাগজ ফুলের গাছ। বিকেলের আলোয় সবটাই কী সুন্দর!
সতু ভাবে, পৃথিবী খুব নিষ্ঠুর। মানুষ কেমন আছে, তার কিচ্ছু যায় আসে না। সে তার খেয়াল খুশিমতো রঙ্গমঞ্চ সাজিয়ে যায় নির্বিকারভাবে।
লম্বা সেই সিঁড়ি বেয়ে মূল হাসপাতাল বিল্ডিংয়ে ঢুকেছিল সতু। সুধীরকাকু অপেক্ষা করছিল। ও যেতেই ওকে নিয়ে গিয়েছিল কুসুমদির কাছে।
বড় একটা ঘরের এক পাশে সবুজ কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল কুসুমদিকে। গায়ে চাদর ঢাকা! একটা হাত দড়ি দিয়ে লোহার খাটের সঙ্গে বাঁধা!
এই মারাত্মক আহত অবস্থায় কোথায় পালাবে কুসুমদি যে, এ ভাবে বেঁধে রেখেছে!
সঙ্গের পুলিশটা বলেছিল, “আমি দরজায় আছি। দু’মিনিট মাত্র সময়।”
পুলিশটা বেরিয়ে যেতেই সতু ভাল করে তাকিয়েছিল কুসুমদির দিকে। এই ক’দিনে কুসুমদি কেমন যেন হয়ে গিয়েছে! যেন সুন্দর মার্বেলের পরির উপর জমে উঠেছে হাজার বছরের ধুলো! সতু চোয়াল শক্ত করে সামলাচ্ছিল নিজেকে।
ওকে দেখে কুসুমদি হেসেছিল দুর্বলভাবে। সতু এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে পড়েছিল সামনে। জিজ্ঞেস করেছিল, “কষ্ট হচ্ছে কুসুমদি?”
কুসুমদি বলেছিল, “না তো! তিনু আরও কত কষ্ট করে চলে গেল! আমিও যাব ওর কাছে। মা-বাবা আমার মুখ দেখতে চায় না, তাই না রে সতু? কেমন আছে ওরা?”
সতু বলেছিল, “কেউ ভাল থাকে কুসুমদি? তোমাকে ছাড়া আমরা কেউ ভাল থাকব মনে হয়?”
কুসুমদির কষ্ট হচ্ছিল। মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছিল কষ্টে। তাও বলেছিল, ‘সেদিন যে ও আসবে কেউ জানত না, জানিস! পাড়ার কেউই ওকে দেখে খবর দিয়েছিল পুলিশকে!”
সতুর আবার মনে পড়ে গিয়েছিল সেই দৃশ্যটা। পাগলের ছদ্মবেশে থাকা পুলিশটার দিকে তাকিয়ে হরেনদার হাসি!
কুসুমদি বলেছিল, “তোর হরেনদা এমনটা করতে পারে আমায় বলেছিল তিনু। বলেছিল, জেলে থাকার সময় পুলিশের চাপে ও ক্ষমা চায় ব্রিটিশদের থেকে। তার পর ছাড়া পেয়ে পুলিশের হয়ে কাজ করত, তা ছাড়া তিনুর উপর ওর রাগ ছিল।”
“রাগ!” সতু বুঝতে পারেনি যেন!
“আমায় বিয়ে করতে চেয়েছিল লোকটা। এক দিন অন্ধকারে আমার গায়ে হাতও দিয়েছিল। আমি শক্ত গলায় ওকে জানিয়েছিলাম তিনুর কথা। সেদিন থেকেই ও আমার ক্ষতি করতে চেয়েছে,” উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল কুসুমদি। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল, “এর কি কোনও শাস্তি হবে না সতু? পাগল-সাজা স্পাইটার সঙ্গে ও-ই তো ধরিয়ে দিল তিনুকে! জানিস, তিনুর পিস্তলের গুলি ফুরিয়ে গিয়েছিল। আমি বারান্দায় চিৎকার করে বলেওছিলাম যে ওর গুলি নেই। ওকে মারবেন না। কিন্তু ওরা শোনেনি। কাছ থেকে গুলি করে তিনুকে। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকেও…”
“এই, সময় হয়ে গিয়েছে। চলো!” পুলিশটা ঢুকে এসেছিল ঘরে, “আর একটা কথাও নয়। চলো বলছি।”
সতু তাকিয়েছিল কুসুমদির দিকে। বলেছিল, “আমি অপেক্ষা করব কুসুমদি। তোমার ফেরার অপেক্ষা আমি করব!”
পুলিশটা ঘাড় ধরে এবার ধাক্কা দিয়েছিল সতুকে। সতু দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। তাও ঘুরে তাকিয়েছিল কুসুমদির দিকে।
কুসুমদি বলেছিল, “এই অন্যায়ের কোনও শাস্তি হবে না সতু?”
“শাস্তি তো হবেই,” নশা দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছিল। আহিরিটোলা ঘাটে সেদিন হাওয়া ছিল খুব। বিড়িটা মাটিতে ফেলে চটি দিয়ে পিষে নশা যেন ফুঁসছিল, “তোকে আগেই বলেছিলাম, হরেন একটা বেজম্মা। তুই শুনিসনি। আর, দেখলি তো কী হল!”
রাগে সতুর মাথা যেন কাজ করছিল না। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, “কী শাস্তি হবে ওর! কোনও শাস্তিই যথেষ্ট নয়। আমি চাই ও… ও মরে যাক।”
নশা বলেছিল, “বলাইদার সঙ্গে কথা বলব আমি। দেখি কী করা যায়।”
বলাই! মানে সেই রোগা ছেলেটা, যে তিনুদার সঙ্গে থাকত! সে কী করবে! আর, তাকে চেনে নশা!
“তুই চিনিস বলাইদাকে?” অবাক হয়ে তাকিয়েছিল সতু।
নশা বলেছিল, “তুই কী ভাবছিস সতু? আমার মতো ছেলেরা দেশের কাজ করে না?”
.
দু’রাত ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি সতু। কারও সঙ্গে কথা বলেনি। স্কুলে যাওয়ার নাম করে বেরিয়েও কখনও গড়ের মাঠে বসেছিল, কখনও-বা গঙ্গার ধারে। হরেনদাকেও দেখা যাচ্ছিল না পাড়ায়। ওর ভেতরে সারাক্ষণ একটা অস্থিরতা আর রাগ ওকে ঘুণপোকার মতো কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। খেতে ইচ্ছে করছিল না। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। কারও মুখ দেখতে ইচ্ছে করছিল না। শুধু তীব্র এক জ্বালা শুঁয়োপোকার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল পাঁজরময়।
তার পর এক রাতে অমর বলেছিল, “দাদা, পরিদের ভালবাসতে নেই। তারা মানুষকে ছেড়ে উড়ে চলে যায়।”
সতু বলেছিল, “কিন্তু আমি যে নিরুপায় অমর। আমি যা, তা তো কুসুমদিকে ভালবেসেই। বল?”
অমর হেসেছিল, “গোপুজ্যাঠা বলে আমরা পোলাপান। বয়স কম। তাই নাকি এমন। এই ভালবাসা যদি আরও অনেক বছর পরে অবধি থাকে, তা হলে জানবি সত্যি ভালবেসেছিলিস।”
সতু কিছু না বলে তাকিয়েছিল অমরের দিকে। দেখেছিল অমর মোটা কাচের ওপর থেকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।
.
দু’দিন পরে সুধীরকাকু আবার ডেকেছিল ওকে। বলেছিল, “আজ আসিস। আর সময় নেই রে সতু! কুসুমের অবস্থা খুব খারাপ। শেষবারের মতো তোকে দেখতে চায়।”
আবার সেই বিশাল থামওলা বাড়ি। লম্বা সিঁড়ি। লতিয়ে ওঠা কাগজ ফুলের গাছ। আবার সেই দালান পেরিয়ে পৌঁছনো সবুজ কাপড়ের পার্টিশন করা ঘর।
সতু থমকে গিয়েছিল ঘরে ঢুকে। এই ক’দিনে কুসুমদি যেন শেষ হয়ে গিয়েছে। বিছানার সঙ্গে মিশে গিয়েছে। সতুর গলার কাছটা কী যে ব্যথা করছিল! ওর মনে পড়ছিল, ওদের বাড়ির ছাদে সকালের আলোয় চুল খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুসুমদি। তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। মনে পড়ছিল উঠোনের তুলসী মঞ্চে জল দিচ্ছে স্নানের পরের ভিজে চুলে। ওর সঙ্গে বাড়ির দালানে বসে গল্প করতে করতে মাথা ঝুঁকিয়ে হাসছে। আর মনে পড়ছিল সেই সন্ধেবেলার ঘর। ওকে ঘন করে জড়িয়ে ধরেছে কুসুমদি। আর কী সুন্দর এক গন্ধ ঘিরে আছে ওর সবটা!
সেই কুসুমদি এ ভাবে শুয়ে আছে!
কুসুমদি হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল ওকে। সতু দেখেছিল, আজ আর হাতে বন্ধন নেই! আর পুলিশটাও কিছু বলেনি ওকে। হয়তো বুঝেছিল
মেয়েটা এই জীবনের সমস্ত বন্ধন প্রায় কাটিয়েই নিয়েছে।
সতু সামনে গিয়ে ঝুঁকে পড়েছিল।
কুসুমদি আবছা গলায় বলেছিল, “সতু, আমার সময় হয়ে এল রে!”
‘না কুসুমদি! তুমি আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে!’ খুব বলতে ইচ্ছে করছিল সতুর। মনে হচ্ছিল দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখে কুসুমদিকে কিন্তু মানুষের আর কতটুকু ক্ষমতা! সে মৃত্যুর সামনে বড্ড অসহায়।
কুসুমদি বলেছিল, “পাড়ায় শুনলাম পুজো হচ্ছে না। বাবা সব বাতিল করে দিয়েছে। বোধনের আগেই যে বিসর্জন হয়ে গেল সতু। আমার যে খুব ইচ্ছে ছিল পুজো হবে। খুব ইচ্ছে ছিল বাবাকে দেখার। মাকে দেখার। কিন্তু ওরা তো আসবে না। আমি যে ওদের অবাধ্য মেয়ে, তাই না! সতু, তাই কি পুজো বন্ধ করে দিল বাবা?”
সতু কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কুসুমদি যেন ঘোরের মধ্যে ছিল। কুসুমদি এবার বালিশের তলায় হাত দিয়ে বের করে এনেছিল একটা খাম। বলেছিল, “বাড়ি গিয়ে খুলবি, এখানে না। আর আমায় কথা দে… কথা দে, তুই আমাদের পাড়ায় আবার দুর্গাপুজো শুরু করাবি। কথা দে!”
খামটা নিয়ে কুসুমদির হাত ধরেছিল সতু। কিছু বলতে পারেনি। কথা আসছিল না ওর। ও শুধু তাকিয়েছিল কুসুমদির দিকে। কেমন আবছা হয়ে গিয়েছে পরি! বুঝতে পারছিল এই জীবন ছেড়ে রূপকথার গল্পে
এবার তার উড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে।
কুসুমদি বুজে আসা আবছা গলায় বলেছিল, “তুই আমায় কথা দিলি সতু… পুজো করবি পাড়ায়… আমাদের নিজস্ব পুজো!”
.
গঙ্গার ঘাট থেকে পাড়া অবধি পথটা কি আজ কেউ টেনে লম্বা করে দিয়েছিল! হাসপাতাল থেকে বাড়ি না গিয়ে সতু ঘাটে এসে বসেছিল কিছুটা সময়।
এবার পাড়ায় ঢুকে থমকে দাঁড়াল সতু। সামনে খুলে ফেলা হচ্ছে প্যান্ডেল। মধুদার লোকজন সব খুলে দিচ্ছে! ও মাথা নিচু করে প্যান্ডেলের পাশ দিয়ে এগোল।
ওই যে ওদের ক্লাব। পাশের ছোট্ট জমি। ওই জমির ধারে হাওয়ায় নড়ছে ছাতিম গাছ। না সেই লোহার বেড়া আর লাগানো হয়নি। তাও বেঁচে আছে গাছ! এখনও!
সতু গাছটার সামনে থমকে দাঁড়াল। সন্ধে হয়ে গিয়েছে প্রায়। ওর মনে হল যেন আবছায়ায় মাথা নত করে বসে আছে দুঃখী, একলা কোনও মানুষ।
আচমকা পেছন থেকে নশার গলা পেল সতু। কেমন চাপা আর সতর্ক ডাক, “সতু, শোন!”
সতু ঘুরল। দেখল, সাইকেলে বসে আছে নশা। একটা পা মাটিতে। নশার মুখচোখে চাপা উত্তেজনা। বলল, “শুয়োরের বাচ্চাটা ওই পাড়ায় ঘাঁটি গেড়েছে। তোকে বলেছিলাম না ওই সব জায়গায় ও যায়! আজ বলাই দুটো ছেলে নিয়ে যাবে।”
“মানে?” সতু তাকাল।
“মানে জানিস না?” নশা দাঁতে দাঁত পিষল, “তুই কী চেয়েছিলিস মনে নেই? বিশ্বাস ভাঙার শাস্তি জানিস না?”
সতু তাকাল নশার দিকে। হ্যাঁ, নশাকে ও বলেছিল বটে।
আবছায়ায় নশার চোখ যেন জ্বলছে। নশা বলল, “শালা, এবার দেখ কী হয়!”
নশা আর কথা না বলে বেরিয়ে গেল সাইকেল নিয়ে!
সতু ধীরে ধীরে এগোল বাড়ির দিকে। দূর থেকে মনে হল ওদের বিশাল বাড়িটা যেন এক ধ্বংসস্তূপ! চারিদিকে কী যে হচ্ছে বুঝতে পারছে না। হরেনদা এমন করল! যাকে সবচেয়ে বিশ্বাস করেছিল, সে এমন মানুষ! না, এর বাঁচার কোনও অধিকার নেই!
আজও উঠোনের এক পাশে গোপুজ্যাঠা বসে সিগারেট খাচ্ছে। ওকে দেখল, কিন্তু কথা বলল না।
সতু দোতলার সিঁড়িতে উঠল। বারান্দা ফাঁকা। কেউ নেই। শুধু হলুদ আলো জ্বলছে।
সতু এবার পকেট থেকে বের করল খামটা। তার পর তার মুখটা ছিঁড়ে বের করল চিঠি।
সতু দেখল, চিঠিটা কুসুমদির হাতের লেখা নয়। মানে কাউকে দিয়ে লিখিয়েছে। সুধীরকাকু কি? নাকি ওখানকার কোনও সিস্টার?
চিঠিটা পড়ল সতু। দেখল তাতে লেখা:
সতু,
ছাদের ওপরে গোলাপ গাছের পাশে একটা জিনিস রাখা আছে। সেই রাতে তিনু দিয়েছিল আমায়। ওর মায়ের জিনিস। ওটা আর সরানোর সময় পাইনি। আমার তো ব্যবহার করা হল না। যদি এখনও থাকে, তা হলে ওটা তোকে দিলাম। ওটা তোর। প্রথম দিন যখন এলি, ভেবেছিলাম বলব কি না! তার পর ভাবলাম, তোর মতো আমার আর কে আছে! আর আমি জানি তুই কী ভাবিস! কিন্তু সব ভাবনা তো পূর্ণ হয় না এক জীবনে। সতু, মন খারাপের মধ্যে নয়, আনন্দের মধ্যে আমায় মনে রাখিস।
তোর, কুসুমদি।
সতু ছাদে উঠল এবার। আজ আকাশে চাঁদ উঠেছে বড় করে। লেবু রঙের জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে ছাদময়! ওই তো গোলাপের টব! জিনিসটা কি এখনও আছে?
.
সতু এগোল। তার পর টবের কাছে গিয়ে হাত দিয়ে দেখল। আরে, পেছনে এই তো একটা কাগজের পুঁটলি, টব আর দেওয়ালের মাঝে গোঁজা আছে। বাড়ির লোকেদের যা অবস্থা, এটা কেউ দেখেনি। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক।
সতু হাত বাড়িয়ে নিল পুঁটলিটা। তার পর খুলল। আর দেখল, ছোট্ট একটা লকেট। সোনার। সাতটা পাতা ফুলের পাপড়ির মতো করে একটা বৃন্তে যুক্ত। ছাতিম পাতা! সপ্তপর্ণী!
আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল সতু। সোনার থালার মতো চাঁদ উঠেছে। তার আলোয় ওর হাতে ধরা সপ্তপর্ণী।
সতু মুঠো বন্ধ করে নিল। কুসুমদি ওকে নিজের সবচেয়ে কাছের উপহারটা দিয়ে গেল। কে বলে শুধু রক্তমাংসের মধ্য দিয়ে কাউকে পাওয়ার ভেতরে জীবনের পূর্ণতা লুকিয়ে থাকে! সতু বুঝল, জীবন অনেক ভাবে মানুষকে পূর্ণতা দেয়। সব হয়তো চোখে দেখা যায় না! কিন্তু যার মনের ঔজ্জ্বল্য আছে, সে ঠিক দেখতে পায়!
ছোট্ট লকেটটা হাতের মুঠোয় নিয়ে সতু চোখ বন্ধ করল। আর ছোট্ট এক কুচি জল চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল গালে।
চোখ মুছল না সতু। একা দাঁড়িয়ে রইল, বাকি একটা জীবন জুড়ে।
শেষটুকু
সতু দেখল, ওই চলে যাচ্ছে হাট্টিম আর ইজনা। দু’জনে ধরে আছে দু’জনের হাত। কী যে ভাল লাগল সতুর! ঠিক জায়গায় ও পৌঁছে দিয়েছে কুসুমদির সপ্তপর্ণী।
অমর জিজ্ঞেস করল, “পরির গয়না হারিয়ে গেল দাদা?”
সতু উত্তর দিল না। হাসল শুধু। তার পর বারান্দার থেকে তাকিয়ে দেখল ওদের দু’জনকে।
ও ভাবল, আচ্ছা, ভালবাসার মানুষরা কি হারিয়ে যায়? মিলিয়ে যায় সময়ের ভাঁজে? কিন্তু তার পরেই মনে হল, না তো, তারা যে ভালবাসা হয়ে থেকে যায়! দিনের রোদ্দুরে, রাতের জ্যোৎস্নায় তারা বেঁচে থাকে। হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে তুলো বীজের মতো তারা পৌঁছে যায় অন্য মানুষের কাছে। বলে, এ জীবন অতটাও খারাপ নয়। এই পৃথিবীতে আর যাই হোক না কেন, ভালবাসাই মানুষকে আগলে রাখে। প্রতিটা মন খারাপের পরে সে-ই আবার নতুন গল্প শুরু করে। পাতা আনে গাছে, কুঁড়ি ফোটায়। জীবন জাগিয়ে তোলে আবার। আর বলে, আছে, আছে, এখনও বেঁচে থাকার মানে আছে! বলে, ভালবাসা যত দিন থাকবে, তত দিন মানুষ হারবে না। তত দিন মানুষ ফিরে ফিরে আসবে! না পেলেও, প্রিয় মানুষকে লালন করবে মনে। তাকে যত্নে বাঁচিয়ে রাখবে আজীবনের ভালবাসায়।
.
(পরি, যুবক সিংহের মতো রোদ্দুর আর ছাদময় ছড়িয়ে থাকা ছাতিম ফুল ছাড়া এই গল্পের বাকি সব কিছু কাল্পনিক।)
সমাপ্ত
