চতুর্থ অধ্যায়
সতু
নাখোদা মসজিদের কাছে মকসুরচাচার গড়গড়া, হুঁকো আর পাইপের দোকান। পাইপ মানে গড়গড়া নল। রাস্তার পাশে বেশ বড় দোকান। আর দোকানের পেছনে ছড়ানো একটা টালির ঘরে নল বানানোর কারখানা।
যদুজ্যাঠার খুব পরিচিত মানুষ মকসুরচাচা। জেঠুই সতুকে এখানে পাঠান এই নল নিয়ে যেতে। আর শুধু যে নল তা নয়, মাঝে মাঝে গড়গড়ার মাথায় বসানো কলকে নিতেও পাঠান।
আজও স্কুল থেকে বেরিয়ে নল নিতে গিয়েছিল সতু। ওকে জেঠু নলের দামের সঙ্গে বাসের টিকিটের পয়সাও দেন। কিন্তু সতু হেঁটে সেটা বাঁচায়। সামান্য পয়সা, কিন্তু সেটাই-বা কে দেয় ওকে! বাবা তো আর হাতখরচ দেয় না। বাজারের থেকে কিছুটা পয়সা ম্যানেজ করে। আর ভাল খেললে কখনও কখনও হরেনদা এক-দু’ টাকা দেয়।
পয়সা বাঁচিয়ে নিজের জন্য কিন্তু সেভাবে কিছু কেনে না সতু। অমরের জন্য কেনে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের উপর একটা আচারওলা
বসে। সে দারুণ দারুণ সব আচার বানায়। অমরের জন্য সেখান থেকে আচার কিনে নিয়ে যায় সতু। আচার, হজমি খেতে ছেলেটা খুব ভালবাসে।
আজও কিনেছে সতু। আমসি আর চালতার আচার। শালপাতার উপর আচার দিয়ে ঠোঙায় মুড়িয়ে দিয়েছে। আজ ডবল লাভ হয়েছে আসলে। মকসুরচাচাও ফুটকড়াই দিয়েছে এক ঠোঙা। সেটা আর এই আচার। অমর খুব খুশি হবে।
এ সব ভাবতে ভাবতে পাড়ায় ঢুকেই থমকে গেল সতু। আরে বাবা! সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তো ছিল না, আর এখন একদম দাঁড়িয়ে গিয়েছে! সতু বড় বড় চোখ করে দেখল, রাস্তার এক পাশ জুড়ে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে গিয়েছে। পাড়ার কুঁচোকাচারা সেখানে দোল খাচ্ছে, ঝুলছে। বড়রা কয়েকজন আশপাশে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে। পাড়ার মধুদা নারকেলের দড়ি দিয়ে প্যান্ডেলের মাথার বাঁশ বাঁধছে। আর পাগলটা দূরে বসে সব দেখতে দেখতে নিজের মনে ফিক ফিক করে হাসছে।
পুরো ব্যাপারটা দেখে সতুর মন ভাল হয়ে গেল। যাক, এবার ওদের পাড়াতেও পুজো হবে। অন্য পাড়ার পুজোয় যেতে হবে না। জেঠু মানে কুসুমদির বাবা না থাকলে এটা হতই না। কুসুমদিও তো কত খুশি! সতু দাঁড়িয়ে পড়ল।
“তুই কাল প্র্যাকটিসে আসিসনি কেন রে?” হরেনদার গলা।
সতু দেখল ক্রাচে ভর করে হরেনদা এগিয়ে আসছে।
সতু আমতা আমতা করল। প্র্যাকটিসে না গেলে হরেনদা খুব রাগ করে। ও বলল, “আসলে পুজোর পরেই পরীক্ষা। তাই বাবা বলল, ক’দিন খেলা বন্ধ রাখতে।”
হরেনদা গম্ভীর গলায় বলল, “আচ্ছা, তোর বাবার সঙ্গে আমি কথা বলব। পড়াশোনার মতোই জরুরি খেলাধুলো। তুই কলকাতা মাঠে খেলতে পারিস। সামনের বছর আমিই তোকে বড় ক্লাবে নিয়ে যাব। ওরাও তো প্লেয়ার খোঁজে। তোর পায়ে খেলা আছে। সেখানে নিজেকে এ ভাবে নষ্ট করছিস! কালকেই মাঠে আসবি। বুঝেছিস?”
হরেনদা আরও কিছু বলত সতুকে, কিন্তু আচমকা বাড়ির দরজার কাছে এসে দাঁড়াল কুসুমদি। হরেনদা নিজেকে সামলে নিল। কুসুমদিও হরেনদাকে দেখে একটু থতমত খেয়ে গিয়েছে!
হরেনদা হাসল। মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল, “আরে, কুসুম যে! কেমন আছো? কত দিন দেখিনি তোমায়!”
কুসুমদি মাথা নত করে নিল। এবার কোনওমতে বলল, “এই চলছে।”
“নিজের যত্ন নিয়ো। কেমন? এদিক-ওদিক বেশি ঘুরো না। দিনকাল ভাল নয়। লোকজনও খারাপ। বুঝেছ?” হরেনদা শান্ত গলায় বলল।
কুসুমদি চট করে এক বার তাকাল হরেনদার দিকে, তার পর সতুকে বলল, “তুই ভেতরে আসবি? আমার একটা দরকার আছে। আসবি?”
সতু তাকাল হরেনদার দিকে। হরেনদা হাসল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “যা, তোর কুসুমদি ডাকছে। যা। দেখ, কী বলে। কাল চলে আসবি সকালে। আমি তোর বাবাকে বলে দেব যা বলার। সিনসিয়ারিটি নষ্ট করবি না! ওটাই সব!”
হরেনদা ক্রাচ নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল। সতু আর-একবার তাকাল প্যান্ডেলের দিকে। মধুদা এবার নেমে আসছে। প্যান্ডেলের কাঠামো তৈরি প্রায় শেষ। ওঃ, এবার যা মজা হবে না!
“কী রে, তাড়াতাড়ি আয়,” কুসুমদি ডাকল ওকে।
আজকাল সতু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। কুসুমদির জন্য যে চোরা মন খারাপটা ওর ভেতরে সুড়ঙ্গ কাটে, সেটাকে মাটি দিয়ে বোজানোর চেষ্টা করছে। ও বুঝতে পারছে মন খারাপ হল কুকুরের মতো, লাই দিলেই মাথায় ওঠে।
এই যে কুসুমদি ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাতেও মন খারাপটা লাফালাফি করছে খুব। মাটি খুঁড়ে বেরোনোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সেটাকে বেরোতে দিলেই মুশকিল হবে ও জানে। এই যে কুসুমদি চোখ, ঘাড়ের উপর আলতো হয়ে পড়ে থাকা খোঁপা, তিল, হাওয়ায় মৌরি আর কর্পূরের গন্ধ— এই সব কিছু সেই মন খারাপের নাছোড় প্রাণীটাকে উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু সতু প্রাণপণে অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করছে। ও ভাবার চেষ্টা করছে মকসুরচাচা কী সুন্দর গান করে। মধুদা কাল প্যান্ডেলে ত্রিপল লাগাবে। অমর আচার আর ফুটকড়াই দেখে কী খুশিই হবে! কিন্তু তবু মনটা ঠিক হচ্ছে না। ওই ওর সামনে দিয়ে সামান্য দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছে কুসুমদি। শাড়ি বেসামাল হচ্ছে! সরু কোমরের ভাঁজ বেরিয়ে পড়ছে! মাখন-রঙা ত্বকের ওপর বিকেলের আলো এসে পড়েছে! যেন গোলাপি মার্বেল! আর কুসুমদির চুল উড়ছে, সঙ্গে শাড়ির আঁচলও! ওই যে ঘুরে তাকাচ্ছে ওর দিকে। গালে রোদের আভায় সোনালি রোমের সারি। নাকের পাটা ফুলছে সামান্য। বুক ঘন হয়ে আন্দোলিত হচ্ছে। সতু যে এবার মারা পড়বে, সেটা কুসুমদি বুঝতে পারছে না। ওর শরীর আর ওর বশে নেই যেন। এ কী লজ্জা!
সতু চোয়াল শক্ত করে মন অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। ও জানে কুসুমদি এই অবস্থায় ওকে দেখলে খুব লজ্জার হবে। ও দ্রুত কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে সামনে দু’হাত দিয়ে নিজের উত্তেজনাকে আড়াল করল।
“কী হল তাড়াতাড়ি আয়!” কুসুমদি আজ যেন একটু বেশিই অধৈর্য।
সতু বলল, “আমি ঘরে ব্যাগটা রেখেই আসছি। মাকেও বলে আসছি, না হলে চিন্তা করবে খুব।”
“ওফ, ঠিক আছে। দু’মিনিটের মধ্যে আয়। খুব দরকার আমার! আয়!” কুসুমদি আর অপেক্ষা না করে চলে গেল উপরে।
সতু দ্রুত নিজের ঘরে গেল। দেখল, অমর জানলার কাছে বসে আছে। ও ব্যাগটা ঝুলিয়ে রাখল দেওয়ালের হুকে। তার পর সেখান থেকে খাবারগুলো বের করে হাতে দিল অমরের। অমর চশমার মোটা কাচের আড়াল থেকে বড় বড় চোখে তাকাল, “আমার জন্য?”
“হ্যাঁ রে,” সতু হাসল।
নিজেকে এখন তাও কিছুটা ঠিক লাগছে! ওঃ, আজ যা লজ্জায় পড়ে যেত আর-একটু হলে! সতু বড় বড় করে শ্বাস নিয়ে নিজেকে আরও স্থির করার চেষ্টা করল।
“পরি এসেছিল দাদা। তোকে খুঁজছিল,” অমর আচারের ঠোঙাটা নিয়ে আবার জানলার দিকে ঘুরল, “যা, দেখা করে নে। পরিদের অপেক্ষা করাতে নেই।”
সতু ব্যাগ থেকে এবার কাগজে মোড়ানো গড়গড়ার নলটা বের করল, তার পর পাশের ঘরে গেল। মা বসে আছে বই নিয়ে। রবি ঠাকুরের উপন্যাস। ওকে দেখে বলল, “এই এলি? আরে, কুসুম এসেছিল খুঁজতে তোকে। দেখা করে আয়। আমি ভাত বাড়ছি।”
স্কুল থেকে ফিরে ভাত খায় সতু। ভাত ডাল আর আলু ভাজা।
সতু আর দাঁড়াল না। কুসুমদির এত কিসের দরকার কে জানে! সেদিন তিনু বলে যার ঠিকানাটা দিয়েছিল, সেখানে গিয়েছিল সতু। রাজাবাজারে সেই গলি, সেই ঠিকানা। কিন্তু ও মা! কেউ তো নেই!
একটা রোগামতো লোক বেরিয়ে এসে বলেছিল, “তিনু-ফিনু কেউ থাকে না। তুমি কে হে?”
সতু রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিল। লোকটা এমন মারমুখো কেন রে বাবা!
সতু আমতা আমতা করে বলেছিল, “আমি কুসুমদির কাছ থেকে আসছি। এই যে ঠিকানা।”
লোকটা ঠিকানাটা দেখে ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর গলা নামিয়ে বলেছিল, “পুলিশ কি পিছু নিয়েছে তোমার?”
“পুলিশ? কেন?” সতু ঘাবড়ে গিয়েছিল!
“ঠিক আছে, ঠিক আছে,” লোকটা এবার ফতুয়ার পকেট থেকে একটা মুখ বন্ধ খাম বের করে দিয়েছিল ওর হাতে। বলেছিল, “এটা কুসুমকে দেবে। খুব জরুরি। আর, পড়বে না কিন্তু।”
সতুর অপমানে লেগেছিল খুব। ও কেন অন্যের চিঠি পড়তে যাবে! কিন্তু কিছু বলেনি।
লোকটা এবার ওর হাতে দুটো তামার চার আনা দিয়েছিল। বলেছিল, “এটা তোমার।”
সতু হাত সরিয়ে নিয়েছিল। বলেছিল, “লাগবে না। আমি আসি।”
মুখ বন্ধ খামটা এনে ও দিয়েছিল কুসুমদিকে। কুসুমদি প্রথমটা অবাক হলেও, চিঠিটা পড়ার পরে কিছুটা শান্ত হয়েছিল। বলেছিল, “যাক, তিনু ঠিক আছে। আর আমি পরে বলব আবার তোকে। তোকে আমার পরে দরকার হবে। তুই সাহায্য করবি তো আমায় সতু?”
সতু আর কী বলে! কুসুমদি কি জানে না ওর সাধ্য নেই কুসুমদির কোনও রকম কাজে ‘না’ বলার! কুসুমদি জানে আসলে। কিন্তু কুসুমদি পরোয়া করে না। আসলে কুসুমদি তো আর ওকে ভালবাসে না।
নশা এই নিয়ে বলছিল সেদিন। বলছিল, “বেকার পড়ে আছিস শালা। শালা প্রেম নাকি! হাসব না তোকে প্যাঁদাব বুঝতে পারি না। তোকে দিয়ে খাটায় আর তুইও গাধার মতো খেটে মরিস। এ সব চালু মেয়ে। কাজ গুছিয়ে সরে পড়বে। তুই কোল-বালিশকে আদর করে কাটিয়ে দিস বাকি জীবন। শালা ফালতু!”
নশার কথাগুলো মাঝে মাঝে মনের মধ্যে জেগে ওঠে। মনে হয়, কেন কাজ করে দেবে কুসুমদির? কুসুমদি কে ওর? আর কোনও দিন সম্পর্কও তো হবেও না ওদের মধ্যে। তা হলে? কিন্তু তার পরেই মনে পড়ে মায়ের কথা।
মা বলে, “যে নিজের জন্য শুধু বাঁচে সে অমানুষ! সবার জন্য সাধ্যমতো করতে হয়। জানিস, আমার ভাই ফটিক যখন মারা গেল, বাবা একটুও কাঁদেনি। আমরা সবাই যখন কাঁদছি, বাবা বলেছিল, ফটিক দেশের মানুষের হয়ে কাজ করতে গিয়ে মারা গিয়েছে। ওর মৃত্যুর জন্য শোকপালন করতে নেই। তাতে ওর অপমান হয়। সতু, সবার জন্য সাধ্যমতো করবি বুঝেছিস?”
ফটিকমামাকে সেই ভাবে মনে নেই সতুর। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময়ে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল, এটুকু শুধু ও জানে!
সতু তিন তলায় উঠল এবার। দেখল, দালানে পাখির খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুসুমদি।
সতু গিয়ে নলের মোড়কটা দিল। বলল, “এই যে জেঠুর নলটা,” তার পর বুক-পকেট থেকে ফেরত আসা পয়সাটা রাখল জানলার গোড়ায়।
সে সব দিকে তাকাল না কুসুমদি। বরং অস্থির গলায় বলল, “তুই সেদিন যে চিঠিটা এনে দিয়েছিলিস, মনে আছে?”
“হ্যাঁ আছে!”
“সতু ওতে লেখা আছে যে আজ মির্জাপুর স্ট্রিটের যে ফেভারিট কেবিন আছে না, সেখানে তিনু আসবে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। ও একটা জিনিস দেবে। মানে, যেটা আগের দিন দেওয়ার ছিল কিন্তু দেয়নি। তুই একটু নিয়ে আসবি? খুব দরকারি জিনিস কিন্তু,” কুসুমদি একটু থমকাল, তার পর বলল, “ও সবুজ হাফ শার্ট পরে থাকবে। ওকে পুলিশ খুঁজছে। দেশের কাজ করে যে! ব্যাগ নিয়ে যাবি তুই। আর বলবি ‘কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও’ বুঝেছিস? এটা কোড। আমি তারকদার সাইকেল দিচ্ছি তোকে। যাবি আর আসবি কিন্তু। দেরি করবি না।”
কুসুমদি দালানে ঝোলানো হুক থেকে একটা ব্যাগ আর সাইকেলের চাবি বাড়িয়ে দিল সতুর দিকে। বলল, “তিরিশ মিনিট মতো সময় আছে। দেরি করিস না। রাস্তায় কারও সঙ্গে কথা বলবি না। বুঝেছিস? যা। আর এই নে দু’টাকা। এটা তোর।”
কুসুমদি ওকে টাকা দিচ্ছে! সতু আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওরা গরিব বলে সবাই ভাবে যে, কয়েকটা টাকা দিলেই ও কাজ করে দেবে। ঠিক আছে, না হয় যে যা ভাবল ভাবুক! কিন্তু কুসুমদিও এমন ভাববে!
সতুর আচমকা রাগ হয়ে গেল। ও শক্ত গলায় ভাবল, “আমাদের অবস্থা ভাল নয় জানি কুসুমদি, কিন্তু তোমার কাজ করে দেবার জন্য আমি টাকা নেব না।”
কুসুমদি থমকে গেল। আচমকা লাল হয়ে উঠল মুখটা। নরম হয়ে এল চোখের দৃষ্টি! বলল, “আমি সে রকম কিছু ভেবে দিইনি রে সতু। তুই রাগ করিস না। আমার আসলে মাথার ঠিক নেই। তিনুর যদি কিছু হয়ে যায়!”
সতু জিজ্ঞেস করল, “তুমি ওকে ভালবাস, না কুসুমদি?”
কুসুমদি মাথা নামিয়ে নিল। চোখ ভিজে এল জলে। বলল, “কিন্তু কেউ মানবে না আমি জানি। আর ও নিজেই এখন কিছু করবে না। ও বলে, ব্রিটিশরা যত দিন না যাবে, তত দিন ওর শান্তি নেই। তত দিন অন্য কোনও দিকে মন দেবে না!। আমি জানি না আমাদের ভবিষ্যৎ কী! কিন্তু আমি তিনুর জন্য সব করতে পারি!”
কুসুমদি অন্য একটি পুরুষের জন্য সব করতে পারে! সতুর বুকের মধ্যে কী যে হল! মনে হল কেউ যেন লন্ডভন্ড করে দিয়েছে ওর সব কিছু! জ্বালা করছে শরীরে! মনে হচ্ছে খুব কঠিন একটা শাস্তি দেয় ও কুসুমদিকে! মা যে সবাইকে সাহায্য করতে বলে, সেটার যেন কোনও মানে খুঁজে পাচ্ছে না! ওর মনে হচ্ছে পুলিশকে বলে দেয় সব কিছু। জানিয়ে দেয় তিনুর কথা। শরীরের জ্বালাটা যেন আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে মাথায়!
কুসুমদি এবার আলতো করে গালে হাত দিল সতুর। তার পর বলল, “যাবি না?”
রাগ না কষ্ট থেকে কে জানে, আচমকা চোখে জল চলে এল সতুর। আর সেটা লুকোতে ও মুখ ঘুরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল দ্রুত। শুধু যেতে যেতে বলল, “আমি নিয়ে আসছি কুসুমদি। তুমি ভেবো না।
দোতলার বারান্দায় গিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়াল সতু। দেওয়ালে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করল। কান্নাটা যেন তাতার দস্যুর মতো উঠে আসছে মনের বিস্তীর্ণ মাঠ পেরিয়ে। এদের আটকাতেই হবে! সতু চোয়াল শক্ত করল। ওর শরীর কাঁপছে থরথর করে! কাউকে ভালবাসলে এত কষ্ট হয় কেন? কিসের অপরাধে এমন শাস্তি দেয় জীবন!
আচমকা পেছন থেকে একটা হাত স্পর্শ করল ওকে। সতু প্রাণপণে নিজেকে সামলে নিয়ে পেছনে ঘুরল। দেখল, অমর দাঁড়িয়ে আছে। এলোমেলো চুল। মোটা কাচের আড়ালে বড় বড় চোখ। ওকেই দেখছে। কিন্তু কতটুকু দেখতে পাচ্ছে!
অমর হাত বাড়িয়ে আলতো করে ধরল ওর মুখটা। তার পর বলল, “কাঁদছিস দাদা? কষ্ট পেয়েছিস? আমি জানি তুই কাকে পছন্দ করিস। ঘুমের মধ্যে সেদিন বলছিলিস। আমি শুনেছি। আমি জানতাম তুই কষ্ট পাবি। আসলে পরিদের ভালবাসতে নেই রে দাদা। পরিরা ছেড়ে চলে যায় যে! ওরা মানুষকে কষ্ট দেয় খুব!”
সাত
ইজনা
মুদ্রা স্কুটি কিনেছে একটা। সমুদ্র-নীল রঙের স্কুটি। বেশ রাজহাঁসের মতো শহরের রাস্তায় চলে-ফিরে বেড়ায়। তবে কসবা থেকে এই কালাকার স্ট্রিট অনেকটাই দূর। মেয়েটা এতটা পথ রোজ আসবে স্কুটি চালিয়ে! ইজনা অবাক হয়েছে বেশ। কিন্তু কিছু বলেনি।
অফিসের ঘড়িতে এখন সওয়া সাতটা বাজে। কাল সারা রাত জেগে খাতা দেখতে হয়েছে ইজনাকে। তার পর ভোর ভোর উঠে যেতে হয়েছে কলেজে। তাই ঘুম হয়নি। এখন ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু ইজনা জানে ওর এখন বাড়ি গেলে হবে না। কারণ, কাজ আছে। সিমির বাড়িতে যেতে হবে।
মুদ্রা অফিসের স্টোর রুম থেকে বেরিয়ে এল। হাতে একটা কাগজ। কাল বর্ধমানে কিছু মাল যাবে, তার বিস্তারিত লিস্ট।
মুদ্রা এসে বসল নিজের চেয়ারে। বলল, “তুমি এখনও যাওনি ইজনাদি? আমি ছেড়ে দেব?”
ইজনা হাসল, “তোর হাত পাকা হয়েছে?”
“একদম গাছ-পাকা! আমি সারা জীবন সাইকেল চালিয়ে এসেছি। রোড নার্ভাসনেসও নেই আমার। তুমি দেখো, আমি ঠিক আরামসে পৌঁছে দেব তোমায়।”
ইজনা হাসল। অফিসে এখন আর কেউ নেই। সবাই বেরিয়ে গিয়েছে। ওরা দু’জনে বেরোলেই বিহারি দরজা বন্ধ করে দেবে।
মুদ্রা বলল, “আমি জাস্ট একটা মেল করে নিই। বর্ধমানে ওদের এই লিস্টটা পাঠিয়ে দিই। মালটা গেলে পার্ট নাম্বার দেখে মিলিয়ে নিতে পারবে।”
“ঠিক আছে তুই করে নে। আমি বসছি।”
ইজনা পাশের একটা চেয়ারে বসে মোবাইলটা দেখল। সিমি মেসেজ করেছে। ওর জেঠু সাড়ে সাতটায় অপেক্ষা করবেন, ওরা যেন দেরি না করে।
ছোট্ট করে, ‘ঠিক আছে’ রিপ্লাই করে দিল ইজনা। মেয়েটা ভাল। হেল্প করছে ওকে।
আসলে এমনটা যে হবে সেটা ভাবতে পারেনি ইজনা। পাড়ায় দুর্গাপুজো নিয়ে একটা চাপা অশান্তি হচ্ছে। পাড়ার লোকজন, সত্যি বলতে কী, বিরক্ত। এই বাজারে কেউ বাড়তি টাকার বোঝা নিতে চাইছে না। পাশের পাড়ার মিলন সমিতির সঙ্গে যৌথভাবে ওরাও পুজো করত। যৌথভাবে হলেও পুজোটা হত পাশের পাড়াতেই। এবার ভারতী সঙ্ঘকে ওই পুজো থেকে বাদ দিয়েছে মিলন সমিতির লোকজন।
কোন এক ফিল্ম স্টার নাকি ওদের পুজোর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হয়েছে। সে-ই ফান্ড আনবে। ফলে যা নাম আর মাইলেজ সেটা হিরোই খাবে। আর তার সঙ্গে খাবে মিলন সমিতির লোকজন। কারও সঙ্গে ভাগ করবে না। ফলে ভারতী সঙ্ঘের লোকজন পিন্টুদা, মাদুলি এদের সোজা বের করে দিয়েছে।
তার মধ্যে বুড়োদাদুর ওই ব্যাপারটায় পিন্টুদা দুম করে বলে দিল পুজো করবে। আবেগ এত বেশি লোকটার! আর যেমন পিন্টুদা তেমন ওই হাট্টিম। মাথায় গোবর পোড়া ওর। ক্লাবে সেদিন বলে নাকি নিজে দু’লাখ দেবে! ও কী ভেবেছে বাইরে ছিল বলে ইজনা শোনেনি কথাটা? পাগল না পেট খারাপ! মামার বাড়িতে থাকে। নিজের কোনও জায়গা নেই। সেখানে জমানো টাকা থেকে কেউ ওভাবে টাকা বের করে দেয়! কে হয় বুড়োদাদু ওর! ভদ্রতা এক জিনিস আর বোকামো আর-এক। এত রাগ হয়ে যায় ইজনার! সবার সামনে ভাল সাজতে হবে বাবুকে! নামের লোভ খালি! এই নামের লোভের চক্করে পড়ে কত মানুষ যে হাবিজাবি কাজ করে তার ঠিক নেই! এত গা জ্বলে এসব দেখে!
এক দিক থেকে দেখলে কিন্তু ইজনার জীবনে কোনও সমস্যা নেই। বাড়িতে মা দাদা বৌদি মিলেমিশে শান্তিতেই আছে। ওরও ভাল চাকরি। বাবা কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছে, কিন্তু মন খারাপ ছাড়া তার অন্য কোনও ছাপ নেই! তাও শুধুমাত্র ওই একটা ছেলের জন্য মনের মধ্যে সারাক্ষণ কী যেন একটা অস্থিরতা হয় ওর। দু’বছর হয়ে গেল, তবু আজও চোখের সামনে সেই সন্ধেবেলার দৃশ্যটা ভেসে ওঠে। সারা শরীরে আগুন লেগে যায়।
সেদিনই ইজনা ঠিক করে নিয়েছিল যে, আজকের পর থেকে আর কোনওদিন হাট্টিমের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না! কিন্তু মানুষ ঠিক করে এক, আর হয় আর-এক।
ইজনা দেখেছে, জোর করে কিচ্ছু করা যায় না জীবনে। বিশেষ করে কাউকে ভালবাসলে তো আরওই সমস্যা। নিজের মন যে এমন অবাধ্য হতে পারে, ভাবা যায় না! যত ও হাট্টিমের থেকে দূরে থাকতে চায়, ওর থেকে মন ঘুরিয়ে রাখতে চায়, ততই যেন হাট্টিম পেয়ে বসে ওকে। কী যে জ্বালা করে মনে!
রাখো বলে, “ভাঙা-প্রেম হল মনের পাইলস! শালা, এদিক-ওদিক হলেই জ্বালিয়ে মারবে।”
বড্ড বাজে কথা বলে ছেলেটা। কিন্তু সব যে উড়িয়ে দেওয়ার মতো, তা নয়।
পুজোর ব্যাপারে হাট্টিম নাকি পিন্টুদার সঙ্গে আছে। সেদিন সকলের সামনে এমন করে বলল, যেন দৈববাণী করছে! যত বার মনে পড়ছিল, গা জ্বলছিল ওর। কিন্তু সত্যি বলতে কী, মন থেকে সরিয়েও দিতে পারছিল না! কী যে জ্বালা!
কলেজে সিমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, “এমন বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে আছিস কেন? কিছু হয়েছে?”
সিমি আজকাল সিগারেট খাওয়া ধরেছে। ওর নাকি ভাল লাগে! জীবনকে নাকি নতুন করে দেখতে পাচ্ছে ও গগনকে পেয়ে! ‘গগন’ কথাটাও বাঁ হাতের বাজুতে ট্যাটু করিয়েছে! বলছে, ডান হাতেও আর- এক স্টাইলে করাবে! আজকাল সকলের সব কিছু প্রদর্শন না করলে হয় না। আরে বাবা ভালবেসেছিস ঠিক আছে, নাম খোদাই করার কী আছে! সব সময় অন্যকে দেখানো! কিছু খেলে ছবি তুলে পোস্ট। কেউ কিছু বললে স্ক্রিনশট নিয়ে পোস্ট। কোনও কাজ শুরু করার আগে পোস্ট। কাজ শেষ করার পরে পোস্ট। শরীর খারাপ করলে পোস্ট। সুস্থ হয়ে গেলে পোস্ট। মানে, সবাই যেন পিওন হয়ে গিয়েছে!
ইজনা বলেছিল, “গগনের সঙ্গে কোনও দিন ব্রেক আপ হয়ে গেলে ট্যাটুটা কী করবি?”
“উফ, খালি নেগেটিভ কথা!” সিমি বলেছিল, “আমি আর গগন এখন এক। আর সেটা তোর জন্যই হয়েছে। ও সব বাদ দে, তুই বল না, কী হয়েছে?”
ইজনা সামান্য থমকেছিল। সিমি জানে হাট্টিমের ব্যাপারটা। এখন যদি সিমি জানতে পারে যে, হাট্টিমের ব্যাপারে ওর মনটা বিগড়ে আছে, তা হলে আরও হাবিজাবি জ্ঞান দেবে।
ইজনা বলেছিল, “আরে, পাড়ায় একটা অশান্তি হয়েছে!”
সিমি আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসে বসেছিল। সিগারেটটা মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে নিভিয়ে বলেছিল, “কী কেস?”
হাট্টিমকে বাদ দিয়ে যতটা সম্ভব গুছিয়ে, ইজনা মূল কথাটা বলেছিল সিমিকে
সবটা শুনে সিমি বলেছিল, “তাতে তুই আপসেট হচ্ছিস কেন?”
“আরে, হব না! আমাদের পাড়া। পাশের পাড়ার ক্লাব অপমান করল। বয়স্ক একটা মানুষ একটা অনুরোধ করেছেন। হবে না মন খারাপ?” ইজনা যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য ভাবে তাকিয়েছিল, ওর দিকে।
সিমি ভুরু কুঁচকে বলেছিল, “এতে হাট্টিমাটিমটিম কি যুক্ত? সত্যি করে বল।”
ইজনা বেশি মিথ্যে-টিথ্যে বলতে পারে না। ও আমতা আমতা করেছিল একটু, তার পর বলেছিল, “আর বলিস না! ইডিয়ট একটা। টাকা উঠছে না দেখে বলে কিনা নিজে দু’লাখ টাকা দেবে! নবাব তো! ট্যাঁকখালির নবাব!”
“তাই বল!” সিমি হিহি হেসেছিল, “ঠিক আছে, সত্যি যখন বললি, আমি জেঠুকে বলব। পলিটিক্স করে। মন্ত্রী মানুষ। বললে কিছু একটা হয়ে যাবেই। আমি জেঠুর সঙ্গে কথা বলে তোকে ফোন করব। তুই বেকার টেনশন করিস না। তোর হাট্টিমের কোনও প্রবলেম হবে না।”
হাট্টিম নাকি ওর! যে অমন কাজ করে! যার ভালবাসায় লয়ালটি নেই! সে কী করে ওর হবে! এমন ছেলেকে মন থেকে দূর করে দিতে হয়!
দিতে তো হয় কিন্তু পারছে কই!
দু’দিন আগে সিমি ফোন করে বলেছিল, আজ সন্ধেবেলা জেঠু সময় দিয়েছে। ওরা যেন বাড়িতে পৌঁছে যায়। সেদিন ক্লাবে গিয়ে সেই কথাই বলে এসেছে। বলেছে, “জয়দ্রথ সান্যালের সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি হয়তো কিছুটা হেল্প করতে পারবেন। তা, তোমরা যদি যেতে পারো, তবে কাজ হবে।
“জয়দ্রথ!” রাখো ছিটকে উঠেছিল, “হুম, জয়দ্রথ-ফয়দ্রথ কী করবে! মহাভারত থেকে তুলে এনেছিস! এত এনশেন্ট জিনিস! মরচে-ফরচে পড়ে যায়নি তো?”
“তুই চুপ কর!” পিন্টুদা ধমক দিয়েছিল জোরে, “সব কিছুতেই বাজে কথা! ইজনা, তুই বলিস কবে যেতে হবে, আমরা যাব। পুজোটা করতেই হবে আমাদের।”
“করতেই হবে,” হাট্টিমও চাপা গলায় বলেছিল।
“পাহাড় নাকি শালা তুই? ইকো দিচ্ছিস?” রাখো পিন্টুদার ধমক খেয়েও দমেনি।
পিন্টুদা হাতের কাছে রাখা ক্যারমের গুটির বাক্স তুলে বলেছিল, “চুপ না করলে মাথা ফাটিয়ে দেব এবার! দিমাগ খারাপ আছে এমনিতেই।”
ইজনা বুঝতে পারছিল রিনাবৌদি সোনার বালার ব্যাপারটা বলে দিয়েছে বলে পিন্টুদা আপসেট হয়ে আছে। ও ‘কবে যেতে হবে জানাব’ বলে রিনাবৌদিকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ক্লাব থেকে। শুধু আসতে আসতে এক বার পিছন ফিরে দেখেছিল, মাথা নিচু করে বসে আছে হাট্টিম। ক্লাবের মরা বালবের আলোয় কেমন যেন দুঃখী লাগছে ওকে। দু’দিনের না-কামানো দাড়িতে গালটা ঘন নীল। ও চোখ সরিয়ে নিয়েছিল চট করে। ওর স্মৃতিতে যেন ফিরে আসছিল ওই গাল থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা জলের মতো আফটার শেভের গন্ধ।
.
পিন্টুদারা সব আসবে আজ। সঙ্গে ওই চিটিংবাজটাও আসবে। ইজনা চায়নি থাকতে। কিন্তু বাকিরা এমন করে বলল! সঙ্গে সিমিটাও! ওকে বেকায়দায় ফেলে সবাই কিসের এত মজা পায় কে জানে!
ইজনা দেখল, মুদ্রা কাজ গুছিয়ে উঠল এবার।
“দিদি চলো। শিয়ালদার কাছে নামবে তো? আমি নামিয়ে দেব।”
ইজনা বলল, “আবার ধাক্কা-ফাক্কা মারবি না তো? আর হেলমেট? এক্সট্রা আছে?”
“আমাদের অফিসে চারটে হেলমেট রাখা থাকে। একটা নিয়ে নেব। তুমি চলো তো!” মুদ্রা দরজার দিকে এগোল।
বাইরে আজ বেশ গরম। বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল ভাল। মনে হয়েছিল এর পর হয়তো আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা হবে। কিন্তু কোথায় কী! বিজবিজে একটা ঘাম হচ্ছে।
মুদ্রা অফিস থেকে বেরোনোর আগে একটা অতিরিক্ত হেলমেট নিয়ে এসেছিল। ইজনা সেটা মাথায় দিয়ে স্কুটির পেছনের সিটে উঠে বসল।
মুদ্রা জেনে নিয়েছে কোথায় যেতে হবে।
স্কুটি চলার পরে আরাম লাগল ইজনার। হাওয়ায় শরীর জুড়াচ্ছে যেন।
মুদ্রা স্কুটি চালাতে চালাতেই বলল, “দিদি, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“বল।”
“আচ্ছা, ওই বৌধায়নের প্রবলেমটা কী?”
“কে? বৌধায়ন! সেটা কে?” ইজনা অবাক হল।
“মানে?” সামনে লাগানো আয়না দিয়ে পেছনে বসা ইজনাকে দেখল মুদ্রা, “আরে, সেদিন এল যে তোমাকে নিতে!”
“ওহ্, রাখো!” ইজনা হেসে ফেলল। আসলে ওর ভাল নাম যে বৌধায়ন, সেটা মনেই থাকে না!
অনেক আগে এক বার ইজনা রাখোকে জিজ্ঞেস করেছিল, “বৌধায়ন নামটা তো ভাল। ওটা কাউকে বলিস না কেন রে?”
“সেই তো। তোর তো ভাল লাগবেই,” রাখো দাঁত কিড়মিড় করেছিল, “জানিস, স্কুলে একজন নতুন স্যার এসেছিলেন। আর এসেই আমায় বউ বউ বলে কী ডাকাডাকি! ব্যস, বাকি স্টুডেন্টরা যা শুরু করেছিল! স্যারের সঙ্গে নাকি আমার ফুলশয্যা হবে। তুই বল, বউ বলে কেউ কাউকে ডাকে?”
“তাই তার পর থেকে তুই নিজের ডাকনামটাই বলিস?” ইজনা হেসেছিল।
“হ্যাঁ, আবার কী! ভাগ্যিস স্যার ক’দিন পরেই কেটে পড়েছিলেন! না হলে আমার যে কী হত!” বলেই রাখো বলেছিল, “দেখিস, এর মধ্যে আবার জেন্ডার পলিটিক্স খুঁজিস না! আজকাল পান থেকে চুন খসলেই তো সব জ্ঞানপাপী চলে আসে জ্ঞান দিতে। শালা, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মরালিটি, আর্ট ক্রিটিসিজম আর সিমপ্যাথি শিখতে হবে এখন! আমার বাপ ঠাকুরদাদারা তো ঘাস ছিঁড়ল!”
মুদ্রার কথায় ইজনা আবার বর্তমানে ফিরে এল।
মুদ্রা বলল, “মেসেজ করলে তো ম্যাক্সিমাম টাইম রিপ্লাই-ই করে না। আর ইদানীং করলেও কেমন একটা রিপ্লাই করে! যেন কথা বলতে ইচ্ছে নেই ওর। এদিকে আমার স্টেটাস দেখবে। এফবি-তে যাই পোস্ট করি না কেন, তাতে লাইক করবে। কিন্তু মেসেজ করলেই পালাই পালাই। কেন বলো তো?”
ইজনা জিজ্ঞেস করল, “তাতে তোর কী?”
মুদ্রা ডান দিকে বাঁক নিল এবার। সামনে অনেকটা ফাঁকা রাস্তা। হাওয়াও যেন আরও জোরে এসে লাগছে চোখে-মুখে। সাদা হলুদ আলোর কলকাতা দ্রুত ছিটকে যাচ্ছে পেছনে। এমন খোলামেলা গাড়িতে বসে যেতে কী যে ভাল লাগে!
মুদ্রা বলল, “আরে, আমার ওকে ভাল লাগে। তাই তো জিজ্ঞেস করছি। আমি জানি আমি খুব কিছু সুন্দরী নই। তাই কি ও আমায় এড়িয়ে যায়?”
“তুই পাগলি! তুই যথেষ্ট সুন্দরী। আর তোর ওকে ভাল লাগে, এটা তো ভাল কথা। সেটা ওকে বল,” ইজনা বলল স্বাভাবিক গলায়।
“আরে, এক বছর আগেই বলতাম ওকে। কিন্তু দুম করে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। কেন কে জানে! কী বলেছি আমি জানি না। বিয়ের কথাটা বলেছিলাম। সেটার জন্যই কি? আর এখন আমি নিজের চেয়ে বেশি কথা বলি বলেই কি ও আমায় এমন করে এড়িয়ে যায়? সহজলভ্য হয়ে গেলে কি মানুষ তাকে অবহেলা করে?” মুদ্রার গলাটা আচমকা কেমন যেন বিষণ্ন শোনাল!
ইজনা বুঝতে পারল না কী বলবে। কিছু কিছু কষ্ট আছে, যা থেকে কোনও উত্তরণ হয় না।
ইজনা বলল, “ওই সামনে রাখ। এসে গিয়েছি আমরা।”
মুদ্রা সামনের একটা গলির পাশে স্কুটি থামাল।
ইজনা স্কুটি থেকে নেমে মাথার হেলমেটটা খুলে মুদ্রাকে দিল। মুদ্রাও নামল স্কুটি থেকে। তার পর সিটটা তুলে তার মধ্যে হেলমেট ঢুকিয়ে রেখে বলল, “সরি ইজনাদি, তোমায় এসব বললাম। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।
“দূর পাগলি!” ইজনা হাসল, “রাখোটার মাথা খারাপ। দেখবি, ও ঠিক লাইনে চলে আসবে।”
মুদ্রা আবার স্কুটিতে বসে স্টার্ট দিয়ে বলল, “যত যাই বলো, বিয়ে হয়ে ভেঙে যাওয়া মেয়েদের নিয়ে এখনও ম্যাক্সিমাম মানুষের রিজার্ভেশন থাকে।”
ইজনা বলল, “রাখো পাগলা, কিন্তু ওরকম নয়। তুই দেখ না কী হয়। আমি আসি রে, সাড়ে সাতটাই বাজে এখন। দেরি হয়ে গেল।”
.
সিমির জেঠু মানে জয়দ্রথ সান্যাল বেঁটেখাটো মানুষ। মাথায় বিরাট টাক। মুখে সারাক্ষণ একটা হাসি লেগে থাকে!
স্কুটি থেকে নেমেই সিমিকে ফোন করে দিয়েছিল ইজনা। তখনই জেনেছিল যে, ওদের পাড়া থেকে সবাই এসে গিয়েছে। আর সিমি হেসে বলেছিল, “মাঠে ডিম পাড়ার লোকও এসেছে।”
জেঠুর ঘরটা বড়। ভদ্রলোক পেশায় উকিল বলে ঘরে প্রচুর বই রাখা। তার মধ্যেই বড় একটা টেবিলের এক দিকে বসে আছেন জেঠু। আর উল্টোদিকে পাঁচটা চেয়ারে বসে আছে পিন্টুদা, রাখো, মাদুলি, পাতাদা আর হাট্টিম।
ইজনা ঘরে ঢোকামাত্র সবাই ঘুরে তাকাল ওর দিকে। ইজনা সবার দিকে তাকিয়ে হাসলেও হাট্টিমের দিকে তাকালই না। কিন্তু তাও কী করে যে দেখল, চিটিংবাজটা আজও ওই দাড়ি না কামিয়ে গালে নীল কালি মেখে এসেছে।
সিমি একটা মোড়া টেনে দিল। তাতেই বসল ইজনা। সিমি বসল না।
জেঠু বলল, “ইজনা, ইউ আর লেট! আর ওঁরা আর্লি! আমি ওঁদের কাছ থেকে সবটা শুনলাম। এখনকার দিনে এমন পাড়া খুব একটা দেখা যায় না। বয়স্ক মানুষকে তো সবাই জঞ্জাল বলে সরিয়েই রাখে। কেউ তাদের খবর রাখে না। সেখানে তোমরা যে এমন একজন অলমোস্ট সেঞ্চুরি করা মানুষের মান রাখার চেষ্টা করছ, এটাই অনেক বড় ব্যাপার।”
রাখো বলল, “তাহলে স্পনসর জোগাড় করা যাবে?”
জেঠু হাত তুলে রাখোকে থামালেন, “না ভাই, করা যাবে না। অলরেডি চার জনকে জোগাড় করে দিয়েছি। আমার এলাকার তারা। তোমরা তো আমার এলাকার নও। আর, এবারের পুজোর তোড়জোর গতবারের পুজোর পরেই শুরু করে দিয়েছিল সবাই। তোমরা অনেক পরে এসেছ। আর, মার্কেটও খুব টাফ!”
“তা হলে কিছু করা যাবে না? ও জেঠু!” সিমি অধৈর্য গলায় বলল!
“আরে,আমি কিছু করতে পারব না। কিন্তু ওরা অনেক কিছু করতে পারে। বুঝেছিস?” জেঠু পিন্টুদাকে দেখিয়ে হাসলেন।
“স্পষ্ট করে বলবেন?” আচমকা পাতাদা গম্ভীর গলায় বলল, “আমার তাড়া আছে একটু।”
জেঠু থমকে গেলেন। এই রে! ইজনার ভয় লাগল। পাতাদা খুব ঠোঁটকাটা। এবার না কিছু কেলেঙ্কারি হয়!
কিন্তু জেঠু পুরনো লোক। মানুষ সামলে রাজনীতি করেন। বললেন, “সেটাই তো বলছি। জানো তো, কলকাতায় বড় একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে! সারা দেশব্যাপী একটা বড় লিগ হবে, তার জন্য প্রোমোশনাল টুর্নামেন্ট। আটটা টিম খেলবে, জানো?”
আরে! সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল ইজনার। অঞ্জন বলেছিল না এটার কথা!
পিন্টুদা বলল, “হ্যাঁ জানি। আটটা টিম। চারটে কোয়ার্টার ফাইনালের মতো করে ম্যাচ। জিতলে সেমি-ফাইনাল। তার পর ফাইনাল। কিন্তু তাতে কী?”
জেঠু হাসলেন, “আমি ওদের হেল্প করছি টু সেট আপ দ্য টুর্নামেন্ট। তোমাদের পাড়া থেকে টিম নামাও নর্থ কলকাতার হয়ে। জিতলে সাড়ে সাত লাখ টাকা প্রাইজ় মানি। বুঝেছ?”
“সাড়ে সাত!” মাদুলি এই প্রথম কথা বলল। ওর চোখ দুটো গোল হয়ে গিয়েছে।
“এটাই করতে পারি আমি। লাস্ট একটা টিম ফাইনাল হওয়া বাকি। তোমরা নাম দাও। কালকেই আমি নমিনেশন জানিয়ে দেব। স্পনসর স্পনসর করে হ্যান্ড-আউট না নিয়ে আর্ন ইট। জিতে টাকা তুলে নাও। কী বলো, খেলবে তোমরা? পারবে? কী কৃশানু? আলাপ না থাকলেও তোমায় তো আমি চিনি। ভাল প্লেয়ার ছিলে। পারবে না তুমি? নাকি সব ভুলে মেরে দিয়েছ?”
ইজনা নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও কেন কে জানে এবার তাকিয়ে ফেলল হাট্টিমের দিকে। দেখল, হাট্টিম তাকিয়ে আছে জেঠুর দিকে। স্থির দৃষ্টি। চোয়াল শক্ত।
এই দৃষ্টিটা ইজনা চেনে।
আট
হাট্টিম
আজ বাইক আনেনি হাট্টিম। আসলে বাইকটা সার্ভিসিং-এ দিয়েছে। বাইক ছাড়া কেমন যেন লাগে নিজেকে। সারাক্ষণ কী নেই কী নেই মনে হয়! রাখো ইয়ার্কি মেরে বলে ময়ূর ছাড়া কার্তিক।
কিন্তু কিছু করার নেই। বড়মামা বলেছিল গাড়ি নিয়ে যেতে, কিন্তু ও নেয়নি। মাঝে মাঝে ট্রামে, বাসে, মেট্রোতে না উঠলে নিজেকে এই শহরের বাসিন্দা বলে মনে হয় না হাট্টিমের।
আজ ময়দান মার্কেটের মধ্যে বেশ বড় স্পোর্টস গুডসের দোকানে এসেছে হাট্টিম। সঙ্গে রাখো নেই আজ। আছে পাতাদা আর পেনসিল। রাখোর নাকি কী একটা খুব জরুরি কাজ আছে।
পেনসিলকে জিজ্ঞেস করেছিল হাট্টিম, “তোর দাদার কাজটা কী? পাড়ার কাজের চেয়েও কী এমন জরুরি?”
পেনসিল বলেছিল, “আমি কী জানি! তোমার বন্ধু তুমি জানো। তবে দু’দিন ধরে কিছু একটা নিয়ে টেনসড হয়ে আছে। গত কাল তো রাতে খেতে বসে রুটি ছিঁড়ে ঝোলে না চুবিয়ে জলের গ্লাসে চুবিয়ে দিব্যি দু’বার খেয়ে নিল। তার পর বাবা দিল ঝাড়। মানে, বাবা ফলো করছিল আর কী! বাবা বলল দোকানেও নাকি কী সব গোলমাল করছে। কান বললে ধান শুনছে। পরে দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বলল, হেভি টেনশনে আছে। জীবন মরণ সমস্যা নাকি! তুমি জিজ্ঞেস কোরো তো।”
জীবন মরণ সমস্যা! হাট্টিম হেসেছিল মনে মনে। রাখোর জীবন মরণ সমস্যা এর আগেও অনেক বার হয়েছে। মানে, কোন জিনসটা পরবে সেটা নিয়ে হয়েছে। পুজোয় কোথায় ঘুরতে যাবে সেটা নিয়ে হয়েছে! শরৎকালে ছাতা নেবে কি নেবে না, সেই নিয়েও হয়েছে। ফলে পাত্তা দেয়নি ও।
আজ ফ্যাক্টরি থেকে সোজা সেকেন্ড ব্রিজ দিয়ে বাস ধরে এসে নেমেছে এক্সাইড মোড়ে। সেখান থেকে মেট্রো ধরে এসেছে ময়দানে। আর দোকানে পৌঁছে দেখেছে, পাতাদা আর পেনসিল এসে অপেক্ষা করছে।
ওকে দেখে পাতাদা জিজ্ঞেস করল, “টাকা আছে তো সঙ্গে?”
হাট্টিম বলল, “হ্যাঁ, সবটাই এনেছি। যা দাদু দিয়েছে।”
পেনসিল বলল, “এটাই খারাপ লাগছে আমার।”
হাট্টিম কিছু বলল না। কিছু জিনিস আছে, যা খারাপ লাগলেও তেতো ওষুধের মতো গিলে নিতে হয়।
আসলে গত কাল বুড়োদাদুর কাছে গিয়েছিল ওরা। জয়দ্রথবাবুর সঙ্গে কথার পরে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল, সেটা জানানোর ছিল।
সন্ধেবেলা বুড়োদাদু খেলা দেখছিল টিভিতে। ছোটদাদুও বসে ছিল পাশে। কিন্তু চোখে দেখতে পায় না বলে কমেন্ট্রি শুনছিল।
ইপিএল শুরু হয়েছে সবে। বুড়োদাদু আবার ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের ভক্ত। হাট্টিমদের দেখে কমেন্ট্রিটা মিউট করে দিয়েছিল বুড়োদাদু।
পিন্টুদাই প্রথম কথা বলেছিল, “দাদু, আমরা পুজো করব। তবে তার জন্য আমাদের একটা টুর্নামেন্ট জিততে হবে। তিনটে ম্যাচ। নক আউট টুর্নামেন্ট। জিতলে যা টাকা আসবে, তাতে পুজো হয়ে যাবে ভালমতো।”
দাদু কী বলবে বুঝতে পারেনি যেন।
ছোটদাদু বলেছিল, “আরে, তোমার তো ক্রিকেটের কী একটা ক্লাব আছে না? নিজে বানিয়েছ?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, সৎকার সমিতি,” পাশ থেকে রাখো ফুট কেটেছিল, “পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে বানিয়েছে। সব টুর্নামেন্টের ফার্স্ট রাউন্ডে হারে। আজ পর্যন্ত কোনও ম্যাচে পিন্টুদার টিম সর্বোচ্চ রান করেছে— বাইশ।”
“তুই চুপ কর! দাঁড়া তোকে শোকজ় করব,” পিন্টুদা রাখোর দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করেছিল। তার পর বুড়োদাদুকে বলেছিল, “ভারতী সঙ্ঘের হয়ে খেলবে সবাই। আমাদের ভারতী তো বহু পুরনো। রেজিস্ট্রেশন আছে। আপনিও তো খেলেছেন এর হয়ে!”
বুড়োদাদু চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তার পর বলেছিল, “হ্যাঁ, রাইট আউটে খেলতাম। বড় ক্লাবেও খেলেছিলাম কয়েক বছর। ভারতীতে আমার বন্ধুও খেলত। নশা। ভাল নাম ছিল বগলা পাল। পাতার ঠাকুরদা।”
হ্যাঁ, পাতাদার ঠাকুরদার কথা শুনেছে হাট্টিম। খুব ডানপিটে ছিল নাকি।
বুড়োদাদু বলেছিল, “ভারতী আবার খেলবে, এটা শুনেও ভাল লাগছে। দাঁড়াও।”
বুড়োদাদু উঠে আলমারি খুলেছিল এর পর। তার পর একটা খাম নিয়ে এসে হাতে দিয়েছিল ওদের। বলেছিল, “এতে সামান্য টাকা আছে। এটা রাখো। আমার একটা কথায় তোমরা এতটা করছ। তা ছাড়া ক্লাবের কিট কিনতে হবে তো। জার্সি, বুট, বল। প্র্যাকটিস করতে হবে না? ক’দিন সময় আছে?”
“দশ দিন মতো,” পাতাদা বলেছিল, “কিন্তু টাকা…”
“না না টাকা নিতে পারব না,” পিন্টুদা মুখ গোঁজ করে বলেছিল, “আপনি সামান্য একটা কথা বলেছেন, সেটা আমরা পাড়ার সকলে মিলে করতে না পারলে কী আর পারলাম জীবনে! আমরা এতটাই অপদার্থ নাকি?”
রাখো চট করে খামটা নিয়ে বলেছিল, “না দাদু, আমরা এখনকার মতো অপদার্থ। আমাদের এখন টাকার দরকার। তাই আমি নিচ্ছি। কিন্তু এটাই ফার্স্ট আর লাস্ট। এর পর আর টাকা নেব না তোমার কাছ থেকে। দেখো, পুজো হবেই।”
“কী আমার বিজ্ঞ রে! জিতলে তো পুজো হবে! পারবেন জিততে?” মাদুলি বিরক্ত গলায় বলেছিল।
রাখো বলেছিল, “ডাকব ভুলুর রিকশা? ডাকব? যাবেন আবার আপনি? কী রে যাবি?”
মাদুলি চোখ বন্ধ করে হাত তুলে বলেছিল, “সে যাব কি যাব না, সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনাকে বলব কেন?”
“কী ব্যাপার? কোথায় যাবে?” বুড়োদাদু অবাক হয়েছিল।
পিন্টুদা বলেছিল, “ওদের কথা ছাড়ুন তো! সব উন্মাদ এসে জুটেছে পাড়ায়! সারাক্ষণ হাবিজাবি করে যাচ্ছে,” তার পর রাখোর হাত থেকে খামটা নিয়ে বুড়োদাদুর হাতে ফেরত দিয়ে বলেছিল, “এটা আপনি রাখুন প্লিজ। আমরা ঠিক ম্যানেজ করে নেব।”
বুড়োদাদু বলেছিল, “না, আই ইনসিস্ট পিন্টু। আমি তো কিছুই করতে পারছি না। এটা করতে দাও। প্লিজ।”
রাখো জিজ্ঞেস করেছিল, “আচ্ছা দাদু, হঠাৎ দুর্গাপুজো করার কেসটা কী বলো তো? মানে, হঠাৎ পুজো করার কথা বললে! এত দিন তো বলোনি!”
ছোটদাদু বলেছিল, “আছে আছে। গল্পের আড়ালে গল্প থাকে।”
বুড়োদাদু গম্ভীর গলায় বলেছিল, “অমর, তুই চুপ করবি!” তার পর ওদের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আর খেলায় যদি জিততে না পারো, তা হলে কী হবে?”
পিন্টুদা বলেছিল, “জানি না দাদু। কিন্তু চেষ্টা তো করব। আমাদের পাড়াটা কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে। অন্য পাড়ার ভরসায় থাকতাম পুজোর জন্য। কিন্তু আমাদেরও তো এক হয়ে কিছু করা দরকার! কমিউনিটি ড্রাইভ খুব ইমপর্ট্যান্ট দাদু। আপনি আমাদের সেই সুযোগটাই করে দিলেন। আমরা প্রাণপণে চেষ্টা করব।”
রাখো সামান্য তুতলে চাপা গলায় হাট্টিমের কানের কাছে বলেছিল, “তার পর দেখা যাবে বাইশ গোল খেয়ে বসে আছি। তুই সেদিন রাজি হলি কেন? মন্ত্রী মানুষ, ইচ্ছে করলে টাকাটা জোগাড় করে দিতে পারত না! তুই শালা আসল কালপ্রিট। ইজনাকে দেখলেই তোর মধ্যেকার ধর্মেন্দ্র জেগে ওঠে! ‘কুত্তে’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়িস! আগুন না জল দেখিস না। শালা, তুই একটা চিটিংবাজ।”
সেদিন জয়দ্রথবাবুর ওখানে সত্যি মাথাটা ঘেঁটেছিল হাট্টিমের। ওরা আগেভাগে পৌঁছে গেলেও ইজনা এসেছিল একটু দেরি করেই।
আর যখন এসেছিল, হাট্টিমের যেন কেঁপে গিয়েছিল সারা পৃথিবী! সারা দিনের ক্লান্তি ইজনাকে যেন আরও সুন্দর করে তুলেছিল। ও দেখেছিল, ইজনা সবার দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু ওর দিকে তাকাচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছিল হাট্টিমের। আর কত শাস্তি দেবে ইজনা! হ্যাঁ, ভুল করেছে ও। কিন্তু সেটা তো নিজে স্বীকারও করেছে। কিন্তু মেয়েটা কিছু শুনতেই চায়নি। এত রাগ! নাকি ঘৃণা! এত দিনের ভালবাসা সব ব্যর্থ হয়ে গেল জাস্ট দু’মিনিটের একটা ভুলে! ওর মনে পড়ছিল পাড়ার লাইব্রেরিতে ইজনাকে প্রথম দেখার সেই বিকেলটার কথা।
ক্লাস টুয়েলভের টেস্ট পরীক্ষার পরের একটা দিন ছিল সেটা। সেবার কলকাতায় বেশ জাঁকিয়ে বসেছিল শীত। কে যেন মশারির মতো কুয়াশা টাঙিয়ে দিয়েছিল শহরের আনাচে-কানাচে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের নেতাজি-মূর্তির ঘোড়াটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না সকাল থেকে। তার পর আচমকাই দুপুরের দিকে কুয়াশা কেটে নরম বেড়ালছানার মতো রোদ উঠেছিল। আর পাড়ার মধুসূদন লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ানের কাজ করার জন্য পৌঁছেছিল হাট্টিম। আর তখনই ও দেখেছিল ইজনাকে।
না, তার আগেও তো দেখেছিল পাড়ায়। কিন্তু খেয়ালই হয়নি। আসলে এ সব দিকে খেয়াল থাকত না হাট্টিমের। ফুটবলই তো সব ছিল ওর। বড় ক্লাবে খেলবে। ইন্ডিয়ার হয়ে এশিয়ান গেমসে নামবে। এ সবই মাথায় ঘুরত। পৃথিবী বড্ড একমুখী ছিল ওর।
তার মধ্যে পিন্টুদার কথায় প্রতি শুক্রবার লাইব্রেরিতে যেত বই দেওয়ার কাজ করার জন্য। পাড়ায় থাকলে পাড়ার কাজে লাগতে হবে। এই ছিল পিন্টুদার সাফ কথা।
আর সেই বইদেওয়ার কাজেই প্রথম ভাল করে ও দেখেছিল ইজনাকে।
ঢেউখেলানো চুল। বড় বড় বাদামি চোখ। চিবুকে একটা বাদামি তিল। ইজনা পাড়ার আরও কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছিল বই নেওয়ার জন্য।
সেদিন পাড়ায় একটা শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছিল। এলোমেলো গাছের পাতা ছুঁয়ে বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছিল লাইব্রেরির মধ্যে। পড়েছিল ইজনার গালে। বাদামি চোখ দুটো যেন মেরুন জঙ্গলের মতো গভীর। কী একটা ক্রিমের আবছা গন্ধ প্রজাপতির মতো উড়ছিল পুরনো বইয়ের গন্ধের ভেতরে। হাট্টিম অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। বুঝতে পারছিল মনের মধ্যে কেমন যেন পাহাড়চূড়ো থেকে পড়ে যাওয়ার মতো একটা অনুভূতি হচ্ছে। মনে হচ্ছিল এই ওর সর্বনাশের শুরু হল। ডিসেম্বর যে কী ঘাতক মাস, বুঝেছিল হাট্টিম।
কিন্তু এটা কী রকম নাম? ইজনা! মানে কী? সাহস করে জিজ্ঞেসই করে ফেলেছিল হাট্টিম। আসলে মেয়েটার লাইব্রেরির কার্ড যে নতুন! হাট্টিম বুঝতে পেরেছিল টেস্ট পরীক্ষার জন্য ও যে কিছুদিন আসতে পারেনি লাইব্রেরিতে, তার মধ্যেই মেম্বার হয়েছে মেয়েটা।
ইজনা হেসে ঠোঁট কামড়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর বলেছিল, “মানে, আলো।”
আলো! অন্ধের জন্য!
এত দিন যেন সত্যি অন্ধ হয়ে ছিল হাট্টিম। এর পর থেকে তাই ওর চোখ দুটো ইজনাকে খুঁজে বেড়াত পাড়ায়। ও জানত, এ ভাবে কাউকে দেখাটা ঠিক নয়। কিন্তু মন যে বাঁদর ছেলে! তাকে যা করতে তুমি বারণ করবে, সে সেটাই করবে বেশি করে।
ইজনা কিন্তু তাকাত না। পাত্তাই দিত না। হাট্টিম পাশ দিয়ে গেলেও ইজনা এমন করে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকত, যেন হাট্টিম সাদা সেলোফেন কাগজের তৈরি!
হাট্টিম বুঝতে পারত না কী করবে! কষ্ট হত খুব। ভাবত এর থেকে কে উদ্ধার করবে ওকে! কে আছে ওর!
কেন? অর্জুনের ছিল কৃষ্ণ, আর ওর রাখো!
এক বিকেলে বাগবাজার গঙ্গার ঘাটে বসে রাখোকে ও বলেছিল সবটা।
রাখো খানিকক্ষণ শুনে বলেছিল, “বাওয়া! কোন পুকুরে ছিপ ফেলেছ! পাড়ার সবচেয়ে বড় বাড়িটা ওদের। ওর দাদা হেব্বি স্কলার। খড়গপুর আইআইটি-তে পড়ে। মেয়েটা ক্লাস নাইন। তুই গিয়েছিস এবার!”
“প্লিজ রাখো, কিছু কর! আমার এইচএস-টা ভোগে চলে যাবে!” হাট্টিম অনুনয় করেছিল।
“ইঃ ভোগে যাবে! এমনিতে যেন কত দিগ্গজ! খেলায় মন দিতে গিয়ে পড়াশোনা সেভাবে করিস? কিচ্ছু নেই সে নাকি ভোগে যাবে!”
“প্লিজ প্লিজ!” হাট্টিম কী করে আর বলবে বুঝতে পারেনি।
রাখো গঙ্গার পাড়ের একটা ঘটি গরমওলার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “খাওয়া। তার পর দেখছি।”
তা দেখেছিল রাখো। পাড়ার শেষে একটা ব্লাইন্ড লেনের পুরনো ভাঙাচোরা বাড়ির সামনে এনে হাট্টিমকে দাঁড় করিয়েছিল পাঁচ দিন
পরে। বলেছিল, “দাঁড়া এখানে। চুপচাপ দাঁড়া।”
“কেন?” হাট্টিম অবাক হয়েছিল।
“বড্ড প্রশ্ন করিস! পড়াশোনায় এই কৌতূহল দেখালে তো মাধ্যমিকে ফার্স্ট হতিস! দাঁড়াতে বলছি, দাঁড়াবি। বুঝেছিস?”
রাখো আর কথা বাড়িয়ে চলে গিয়েছিল। আর তার একটু পরেই গলির ওই মাথায় দেখা গিয়েছিল ইজনাকে।
এই মেয়েটা এখানে কী করছে! হাট্টিমের মনে হয়েছিল ওর পা দুটো নরম কাদামাটির তৈরি! আচমকাই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল ওর। পেটের মধ্যে সমস্ত কলকাতার অবাধ্য অটো কী করে যেন একসঙ্গে চলাচল শুরু করে দিয়েছিল।
ইজনা এসে দাঁড়িয়েছিল কাছে। আবার সেই চোখ! সেই চিবুকের তিল! সেই ক্রিমের হালকাগন্ধ! হাট্টিম বুঝেছিল, শুধু এইচএস নয়, বাকি জীবনটাও ওর গেল।
কী বলবে বুঝতে না পেরে ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল ইজনার দিকে।
ইজনা ভুরু কুঁচকে বলেছিল, “এত ভিতু কেন তুমি? আমি এখানে এলাম বাড়ি থেকে লুকিয়ে। এবার প্রোপোজ়টাও কি আমিই করব?”
“হ্যাঁ?” হাট্টিম খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল।
“সারাক্ষণ তো হাঁ করে তাকিয়ে থাকো। আমি কি বুঝি না কিছু?” ইজনার ভুরু কুঁচকেই ছিল।
“তুমি জানলে কী করে?” হাট্টিম অবাক হয়েছিল। মেয়েটা তো ওর দিকে তাকাতই না!
ইজনা বলেছিল, “মেয়েদের দেখার জন্য তাকাতে হয় না।”
এ রকম যুক্তির পর আর কী বলবে হাট্টিম, ঠিক বুঝতে পারছিল না।
ইজনা এদিক-ওদিক তাকিয়ে আর-একটু কাছে এসে হাতটা ধরেছিল ওর। বলেছিল, “এই ছুঁয়ে দিলাম। এর পর অন্য মেয়েদের দিকে যদি কোনও দিন তাকিয়েছ না, এমন শাস্তি দেব, তখন বুঝবে।”
শাস্তি দিতেই কি তাই সেই দিন জয়দ্রথবাবুর ঘরে ওর দিকে তাকায়নি ইজনা! দু’বছর তো হল! আর কত শাস্তি দেবে মেয়েটা!
হ্যাঁ, ফুটবল খেলতে রাজি হয়েছে ও। ফুটবল আর ইজনা একসঙ্গে হলে মাথা ঠিক থাকে না ওর। কী করবে? তা ছাড়া ওর তখন মনে হয়েছিল এটাই একমাত্র উপায়। আর মাস দেড়েক বাকি পুজোর। এই বাজারে আর কেউ স্পনসর করবে না এখন। তাই ও হ্যাঁ বলেছে।
ক্লাবে ফিরে পিন্টুদা, পাতাদারা রাজিও হয়েছে। একটা চেষ্টা না করে তো হাল ছাড়া যায় না। হাট্টিম এই ছ’মাস আগেও টুকটাক খেলেছে। সাঁতার, সাইকেল আর ফুটবল এক বার শিখলে কেউ ভোলে না। সামনে সুযোগ পেয়েও হাল ছেড়ে দেবে হাট্টিম! ইজনা সুযোগটা এনেছে। ওর চোখে আর কত ছোট করবে নিজেকে!
.
টুর্নামেন্টটা নাইন-এ-সাইডের। ক্লাবের জার্সি ওদের জমা দিতে হবে টুর্নামেন্ট কমিটির কাছে, উদ্যোক্তারা তাতে কীসব লোগো-ফোগো প্রিন্ট করে দেবে।
পাতাদা নেদারল্যান্ডস ফুটবল টিমের সাপোর্টার। ক্রুয়েফ, খুলিট, বাস্তেন, রাইকার্ড, বেয়ার্গক্যাম্প, রোবেন বলতে অজ্ঞান। ফলে কারও কথা পাত্তা না দিয়ে পাতাদা কমলা রঙের জার্সি কিনল। সঙ্গে গাঢ় নীল রঙের প্যান্ট। কমলা হোজ। সাইজ় মিলিয়ে প্লেয়ার আর সাবস্টিটিউট প্লেয়ার হিসেব করে চোদ্দো জোড়া বুট। চারটে প্র্যাকটিস বল। কয়েকটা স্কিপিং রোপ। আর টুকটাক শিন-গার্ড, গ্লাভস। সব মিলিয়ে কুড়ি হাজার টাকার বেশিই হয়েছে। বাকি টাকাটা হাট্টিম নিজেই দিল।
সব জিনিস কিনে বড় রাস্তায় এসে উবর ডাকল হাট্টিম। মেট্রো করে তো আর এত কিছু নিয়ে পাড়া অবধি যাওয়া যায় না।
গাড়ি আসতে সময় নিল মিনিট পাঁচেকের মতো। পাতাদা চুপচাপ মানুষ। মন দিয়ে সিগারেট খেতে লাগল। পেনসিল শুধু বলল, “দাদার কেসটা কী দেখো তো!”
গাড়িটা সেডান। ফলে ডিকিতে জায়গা আছে। জিনিসপত্র সেখানে ভরে পাতাদা আর পেনসিল উঠে বসল গাড়িতে।
হাট্টিম গাড়িতে উঠল না। দরজা বন্ধ করে দিল। বলল, “তোমরা সাবধানে যাও।”
“তুই যাবি না?” পাতাদা অবাক হল, “বিশাল বৃষ্টি আসবে কিন্তু। কালো করে এসেছে কেমন দেখছিস? যে-কোনও সময় নামবে।
“একটু কাজ আছে পাতাদা। বড়মামার একটা জিনিস নিতে হবে পার্কস্ট্রিটের একটা দোকান থেকে। তোমরা যাও, সন্ধেবেলা ক্লাবে তো দেখা হচ্ছেই। আজ ক্যারম কম্পিটিশনের ফাইনাল। পিন্টুদা আমায় যে ভাবে হারাল! তোমায় কিন্তু হারাতেই হবে ওকে।”
“সে ঠিক আছে,” পাতাদা মাথা নাড়ল, “এখন ফুটবলটাই প্রায়োরিটি!”
হাট্টিম পকেট থেকে দুশো টাকা বের করে পাতাদার দিকে বাড়িয়ে বলল, “গাড়ি-ভাড়াটা রাখো।”
“তোমায় শালা ক্যালাব,” পাতাদা ভুরু কোঁচকাল, “আমার কাছে টাকা নেই? শালা! আয় সন্ধেবেলা। পিন্টুদার হার দেখবি আজ।”
গাড়িটা ছেড়ে একশো মিটারও যায়নি, হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামল। হাট্টিম কী করবে বুঝতে না পেরে রাস্তার ধারের একটা দোকানের ছাউনির তলায় দাঁড়াল কোনওমতে।
দোকানটা জামাকাপড়ের। সামনে কিছুটা প্লাস্টিক দিয়ে বাড়ানো।
হাট্টিম বাইক চালায় বলে ওয়াটারপ্রুফ থাকে ওর সঙ্গে। কিন্তু আজ নেই। এমনকি, ছাতা আনতেও ভুলে গিয়েছে।
ইস, যা মেঘ করেছে, কখন যে থামবে বৃষ্টি! বড়মামা পার্ক স্ট্রিটের একটা নির্দিষ্ট দোকানে সুট কাচতে দেয়। সেখান থেকে সুট আনতে হবে। সেই নর্থ থেকে কেন যে এত দূরে এ সব দেয় কে জানে! দোকানটা এক বৃদ্ধ চাইনিজ় ভদ্রলোকের। নাম ওয়াং লি। তবে নামেই চাইনিজ়! ঝরঝরে বাংলা বলে। দারুণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়! সুরজিৎ সেনগুপ্তর খেলার ভক্ত। দোকানে গেলেই ঝালমুড়ি খাওয়ায়। সত্যি বলতে কী, লি-কাকুর দোকানে যেতে হাট্টিমের ভালই লাগে।
“হাট্টিম!” বৃষ্টির শব্দ ভেদ করে ডাকটায় চমকে উঠল হাট্টিম। কে ডাকছে ওকে! এত চেনা গলা! বুকের মধ্যে তিরতির করে হাজার হাজার ফড়িং নড়ে উঠল ওর।
হাট্টিম তাকাল সামনে। বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে দেখল, একটা গাড়ির মধ্য থেকে কাচ নামিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে ইজনা।
ইজনা! ওকে ডাকছে! হাট্টিম হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
“কাম, আমি পাড়ায় যাচ্ছি। চলো।”
ইজনা ডাকছে ওকে! তা হলে ওর সঙ্গে যাবে কি হাট্টিম!
কিন্তু লি কাকু! বড়মামার সুট! মনের মধ্যে বসে থাকা কর্তব্যনিষ্ঠ হাট্টিমটা বলে উঠল।
আরে দূর! এই বাদলায় সুট পরে বড়মামা যাবেটা কোথায়? ইজনা ডাকছে ওকে, সেখানে সামান্য সুট!
হাট্টিমের যে কী আনন্দ হল! ইজনা কি তা হলে ওকে ক্ষমা করে দিয়েছে? পাড়ার জন্য ও যা করছে, তার জন্য কি তা হলে ওর অন্যায় মাফ হল? ইজনা কি বুঝেছে যে, ওটা একটা ফালতু ব্যাপার ছিল মাত্র?
বৃষ্টির মধ্যে সামান্য দৌড়ে গাড়ির কাছে গেল হাট্টিম। তার পর পিছনের দরজা খুলে উঠতে গেল ও।
“সামনে বোসো। পেছনে কোথায় আসছ! দেখছ না আমি আর অঞ্জন বসে আছি!” ইজনা বিরক্ত গলায় বলল।
অঞ্জন? সে কে? হাট্টিম মাথা নিচু করে দেখল, গাড়ির মধ্যে ইজনার পাশে একটা ছেলে বসে রয়েছে। গায়ে গাঢ় বেগুনি রঙের ঝলমলে টি-শার্ট। চোখে তোতা-সবুজ রঙের ফ্রেমের চশমা। আর নীচে হালকা গোলাপি চিনোজ।
হাট্টিম তাকাল ইজনার দিকে। দেখল, ইজনা ওকে দেখিয়েই যেন আরও সরে বসল অঞ্জনের দিকে।
আর, ঠিক তখনই বজ্রপাত হল ময়দানের দিকে! কড়কড় শব্দে আকাশ ফেটে দু’খণ্ড হয়ে গেল যেন! যেন এক মহাদেশ থেকে ভেঙে বেরিয়ে গেল আর-এক মহাদেশ।
হাট্টিম ভিজে গিয়েছে পুরো। ও আকাশের দিকে তাকাল। ঈশ্বরের পাশে বসে আর ডি বর্মন কি দেখছেন এ সব? না হলে মোক্ষম সময় এমন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিলেন কী করে!
হাট্টিম চুলে হাত বোলাল নিজের। দীর্ঘশ্বাস চাপল। তার পর যতটা সম্ভব সহজ গলায় বলল, “আমার কাজ আছে। যাব না। বাই।”
আর গাড়ির দিকে না তাকিয়ে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটা দিল হাট্টিম।
