দ্বিতীয় অধ্যায়
সতু
লোকটাকে প্রায়ই দেখে সতু। রোগা, শ্যামলা চেহারা। গায়ে একটা চাদর, পরনে ধুতি। খালি পা। উসকো-খুসকো চুল। হাওয়ার মধ্যে আঁকিবুকি কাটে সারাক্ষণ। নিজের মনে বিড়বিড় করে। হাসে। তার পর আবার মাথা চুলকিয়ে গম্ভীর হয়ে যায়। মাধবদার কাঠের টালে উঠে বসে থাকে। বাড়িঘর গাছপালা ছাড়িয়ে কোথায় যেন তাকিয়ে থাকে দূরে। পাড়ার যে যা খাবার দেয় খায়। না দিলে খায় না। মাঝে মাঝে আবার গায়েব হয়ে যায় ক’দিনের জন্য। কোথায় যায় কে জানে!
এই যেমন গত দু’দিন লোকটার দেখা পায়নি সতু। তার পর আবার আজ— পাড়ায় নয়, এই ময়দানে!
আজ ভারতী সঙ্ঘের একটা ম্যাচ ছিল ভবানীপুরের জাগৃতি ক্লাবের সঙ্গে। চার-শূন্য গোলে ম্যাচটা জিতেছে ওরা। সতু একাই দুটো গোল দিয়েছে। কেউ ওকে আটকাতেই পারেনি। হরেনদা তো খুব খুশি। ওকে বলেছে, “আজ পাড়ার গ্রিন কাফেতে আমার নাম করে যা ইচ্ছে খাবি। আমি টাকা দেব। গত বার জাগৃতি আমাদের হারিয়ে খুব টিটকিরি দিয়েছিল। আজ বুঝেছে কত ধানে কত চাল!”
হরেনদার পরে আরও কয়েক জন এসে কথা বলছিল ওর সঙ্গে। সবার সঙ্গে কথা সেরে পায়ের ভিজে অ্যাঙ্কলেট খুলে ব্যাগে ভরছিল সতু। আর তখনই দেখল লোকটাকে! দূরে একটা ছোট্ট ঢিপির ওপর বসে আছে। আকাশের দিকে চোখ। মাথা চুলকোচ্ছে।
“নমস্কার ভাই, তোমার নাম সত্যেন্দ্রনাথ?” পাশ থেকে ডাক শুনে সতু তাকাল।
এক ভদ্রলোক। লম্বা। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা। বয়স বেশি নয়। ওর দিকে তাকিয়ে হাসছেন।
“বলুন,” কাপড়ের ব্যাগের মুখ আটকে উঠে দাঁড়াল সতু।
ভদ্রলোক বললেন, “দারুণ খেলেছ আজ। খুব ভাল স্পিড তোমার। স্ট্রেন্থও ভাল। আমার খুব ভাল লাগল। শুধু বাঁ পায়ে একটু প্র্যাকটিস কোরো। রাইট আউটে খেলো তো, উল্টো পা মানে বাঁ পা সচল থাকলে ডান পায়ে ইনসাইড ডজ করে বাঁ পায়ে শট করতে সুবিধে হবে।”
সতু কী বলবে বুঝতে না পেরে মাথা নাড়ল।
পিছন থেকে এক জন ভদ্রলোককে ডাকলেন, “জ্যোতিষ চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আসছি,” ভদ্রলোক দূরের লোকটিকে হাত তুলে আশ্বস্ত করে আবার ফিরলেন সতুর দিকে। বললেন, “থাকো কোথায়? ঠিকানাটা বলো। তোমার বাবার সঙ্গে গিয়ে কোনও দিন না-হয় কথা বলব। কেমন?”
“বাবার সঙ্গে!” সামান্য ঘাবড়ে গেল সতু। বাবা খুব রাগী মানুষ। তার সঙ্গে আবার কী কথা!
“আরে, তোমার খেলার কথাই বলব। নাও ঠিকানাটা বলো তো!” ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা ছোট খাতা বের করে ঝরনা কলম খুললেন।
সতু বাবার নাম আর ঠিকানাটা বলল।
ভদ্রলোক লিখতে-লিখতে বললেন, “নর্থে থাকো? কথায় বাঙাল টান আছে তো! বাড়ি কোথায় তোমাদের?”
সতু বলল, “চাঁদপুর। তবে এখন কলকাতায় থাকি!”
“ঠিক আছে। ভাল করে প্র্যাকটিস করো, কেমন? দেখা হবে।” ভদ্রলোক একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য লোকটির দিকে চলে গেলেন!
“কে রে?” নশা একটা পানের খিলির মতো ঠোঙা করে বাদাম খেতে-খেতে এগিয়ে এল এবার।
নশাকে দেখে সতু হাসল। আজ স্কুল থাকলেও খেলার জন্য কামাই করেছে ওরা। ও দেখল, এরই মধ্যে নশা জার্সি ছেড়ে বাংলা শার্ট আর পাজামা পরে নিয়েছে।
“কী কে?” সতু জিজ্ঞেস করল, “ওই লোকটা? আমি চিনি না। বলল, বাবার সঙ্গে দেখা করবে। কে জানে কেন?” সতু আর পাত্তা দিল না! বলল, “চল এবার। হরেনদা বলেছে আজ গ্রিন কাফেতে যত ইচ্ছে খেতে। দাম দিতে হবে না!”
“গ্রিন কাফে! হুঃ,” নশা মুখ বাঁকাল, হাতের ঠোঙা উপুড় করে সতুর হাতে বাদাম ঢেলে দিয়ে বলল, “পাওয়া তো যায় ঘুগনি আর ডিমের চপ! তাও ঘুগনিতে দানা নেই শুধু খোসা। ভাতের মাড়ের মধ্যে হলুদ গুঁড়ো। যত খুশি খা! হরেনদা মোটেও সুবিধের লোক নয়।”
সতু হাসল, “তোর এত রাগ কেন রে হরেনদার ওপর?”
নশা এবার বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগল, “আগে তো স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিল। এখন যায় না কেন দেশের কাজে? আর জানিস, শিয়ালদার সাইডিং-এর ওখানে মাঝে-মাঝে যায়! খারাপ লোকেদের আড্ডা ওখানে। গাঁজা, চরস, কোকেন খায়। আমি দেখেছি।”
নশার কথা ধরে না সতু। হেসে উড়িয়ে দেয়। ও যাকে দেখতে পারে না, তার সম্বন্ধে বানিয়ে নানান কথা বলে।
ও বলল, “ও সব বাদ দে। প্রভারানি স্মৃতি চ্যালেঞ্জ শিল্ডের সেমি- ফাইনালে হেরে গেলাম। এবার এই টুর্নামেন্টে জিততে হবে। কলকাতার মধ্যেই খেলা। সেই দিকে মন দে। আর হরেনদা ভাল মানুষ। সবাইকে হেল্প করেন। ওই দেখ, দূরে আমাদের পাড়ার ওই পাগলটাকেও পয়সা দিচ্ছেন!”
নশা তাকাল দূরে। সতু দেখল, হরেনদা পকেটে হাত দিয়ে পয়সা বের করে ছোট্ট ঢিপির ওপর বসা লোকটিকে দিচ্ছে। লোকটি বিড়বিড় করে যাচ্ছে!
“দাতা কর্ণ আমার!” নশা ঠোঙাটা ফেলে হাত ঝাড়ল, “কাউকে দু’ পয়সা দিচ্ছে, তাতেই সাত খুন মাফ যেন! শালা! চল এখন। আমাকে এক বার কলেজ স্ট্রিটে যেতে হবে। বাবার ছাপাখানার জন্য কাগজের রোলের অর্ডার করে যেতে হবে। বুঝতাম, হরেনদা যদি দিলখুশায় খেতে বলত! বা এ-ও যদি বলত যে প্যারামাউন্টে শরবত খেয়ে যাস, তা হলেও হত। নিদেনপক্ষে মিত্র কাফের ব্রেন চপ। কিন্তু না। গ্রিন কাফে। ভাগ শালা!”
হাঁটতে-হাঁটতে সতুরা এসে দাঁড়াল বড় রাস্তায়। এখন বিকেল। রাস্তায় ভিড় আছে। মানুষজন-গাড়িঘোড়ায় সব জমজমাট!
সতু জানে, কলকাতার অবস্থা ভাল নয়। একেই যুদ্ধ চলছে। জাপান নাকি কলকাতা আক্রমণ করতে পারে! তার সঙ্গে ভারত ছাড়ো আন্দোলনও শুরু হয়েছে। প্রায়ই মিটিং মিছিল লেগে আছে। গত কালও লাল দিঘির কাছে পুলিশ লাঠি চালিয়েছে। চারদিকে কেমন যেন অস্থির পরিবেশ। ভাল লাগে না সতুর। মন খারাপ করে। চাঁদপুরের জন্য কষ্ট হয়। সেই মেঘনা নদীর চর। ডাকাতিয়া নদীর ঘূর্ণি। রুপালি ইলিশের স্বাদ! গ্রামের বুড়ো বট। ব্রাহ্মণবাড়ির দুর্গাপুজো। সব হারিয়ে গেল।
এবার পাড়ায় দুর্গাপুজো হবে বলে শুনছে সতু। কুসুমদি বলছিল। কুসুমদির বাবা মানে সতু যাকে যদুজ্যাঠা ডাকে, তিনিই মূল উদ্যোগ নিয়েছেন। তাও ভাল। এই মনমরা জীবনে চার-পাঁচটা দিন তো ভাল করে কাটবে! বাবা আসলে এবার আর গ্রামে যাবে না।
নশা পকেট থেকে বিড়ি বের করে সামনে-পিছনে ফুঁ দিয়ে দাঁতে চেপে ধরল। তার পর পকেট থেকে দেশলাই বের করে বিড়িটা জ্বালাল। অনেকটা জোরে টেনে চোখ বন্ধ করে ধোঁয়াটা ধরে রাখল বুকে। তার পর ইঞ্জিনের মতো শব্দ করে ছাড়ল ধোঁয়া।
সতু বিরক্ত হয়ে তাকাল।
নশা হাসল, “এ সব তো খেলি না! বুঝবি কী করে! আচ্ছা, ভাল কথা, কাল তোদের বাড়িতে যখন গিয়েছিলাম, অমর একটা কথা বলছিল।”
“অমর? কী কথা?” অবাক হল সতু।
“বলল, তোদের বাড়িতে নাকি পরি আছে?”
সতুর হাসি পেল। অমর একটা কিছু পেলে সেটাই বলে যায়। নশা কি জানে না অমরের দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে! মনটাও ঠিক যুক্তিমতো চলে না!
বাবা বলে, “অমরের দৃষ্টিশক্তি যত কমছে, তত যেন কল্পনা বাড়ছে ওর। পরি আছে নাকি! মাথাটাও আরও বিগড়োচ্ছে দেখছি!”
সতুর খারাপ লাগে এমন কথা। অমরের মাথা সে ভাবে কাজ করে না, এটা সত্যি। কিন্তু অমরকে যে ও খুব ভালবাসে! কী যে অসহায় ওর ভাইটা! সেখানে বাবা যেন অমরকে একটু এড়িয়েই চলে। বিরক্তি নিয়ে তাকায়। বাবার ভাবটা এমন যে, অমরের এই অবস্থা যেন অমর নিজেই করেছে।
চোখে কম দেখলেও অমর তো ভুল বলেনি। সত্যিই তো আছে পরি! কুসুমদি পরির চেয়ে কম নাকি! এক দিন ওদের ছাদে পায়রার খোপের পাশে লম্বা লম্বা পালক পেয়েছিল অমর। সেটা নিয়ে সতুকে দেখিয়ে বলেছিল, “দাদা, এই দেখ পরির পালক।”
অমরকে সেদিন কিছু বলেনি সতু। কিন্তু কুসুমদি ওর কাছেও পরিই!
কুসুমদির কথা মনে আসতেই কেমন যেন বুকের মধ্যেকার একটা ছোট্ট নৌকোয় ঢেউ এসে লাগল। কয়েক মুহূর্তের জন্য বুকের মধ্যে কেমন যেন গিঁট পড়ল আচমকা! চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল সতু।
নশা বলল, “অবশ্য কুসুমদি পরির চেয়ে কম কিছু নয়। রাস্তায় বেরোলেই ছেলে-বুড়ো সবাই যে ভাবে তাকায় না!”
সতুর মনে হল এক ঘুসিতে নশাকে ফেলে দেয় মাটিতে। কেউ কুসুমদির দিকে তাকালে ওর সারা শরীরে আগুন লেগে যায়! সেখানে নশা এমন বলছে! সারা পৃথিবীটাই নোংরা হয়ে গিয়েছে। সবাই ভোগে ব্যস্ত। কারও আর মন বলে কিছু নেই।
নশা বিড়িটা শেষ করে মাটিতে ফেলে পিষে দিল পা দিল। বলল, “তোর হরেনদাও তাকায়। কয়েক বার কথাও বলতে দেখেছি। ব্যাটার ধান্দা খারাপ শিওর। জানিস তো, হরেন মালটা নাকি ওই সব পাড়ায় যায়! আমি শুনেছি।”
“নশা, এবার বাড়াবাড়ি করছিস!” সতু আর নিজেকে আটকাতে পারল না। বলল, “আর ফালতু কথা বললে তোকে মারব কিন্তু। হরেনদা মোটেও অমন নয়। আর কুসুমদিকে নিয়ে কোনও খারাপ কথা বলবি না। আমার অসহ্য লাগে।”
“রোমিও আমার!” নশা হাসল, “দেখ, আমার ওই দিকে নজর নেই। আমার ইঞ্জিন গরম হলেই পুতলিরানি আছে, ওর কাছে চলে যাই। আমার শরীরের প্রেম দরকার, মনের নয়। মনের প্রেম করেছ কি গেছ! তাই ওই পথে আমি নেই। যা দেখেছি তাই বললাম মাত্র।”
কুসুমদি, হরেনদার সঙ্গে কথা বলতেই পারে। অসুবিধে তো নেই। আর সেখানেই নশা খারাপ একটা দিক দেখার চেষ্টা করছে। সবাই আজকাল কেমন যেন হয়ে গিয়েছে! কুসুমদি জানলে কত কষ্ট পাবে!
কুসুমদিকে সব সময় খুশি দেখতে চায় সতু। এই তো সেদিন কুসুমদির কথামতো কলম কিনতে এসপ্ল্যানেডে এসেছিল সতু। বিশাল বড় একটা দোকানে ঢুকে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওর। বাপ রে, এত সুন্দর সুন্দর জিনিস! এটা-ওটা দেখতে দেখতে কলম খাতা বই যেখানে রাখা হয়, সেখানে গিয়ে গাঢ় খয়েরি রঙের একটা পেন কিনেছিল ও। দামি কলম। ঢাকনাটায় একটা মেয়ের মুখ কাঠে খোদাই করা। সোনালি ভেলভেটের মধ্যে শোয়ানো ছিল কলমটা। সতুর মনে হয়েছিল যেন কুসুমদিই কোনও সোনার পালঙ্কে শুয়ে রয়েছে!
দোকান থেকে বেরিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখেছিল সতু। পাঁচ টাকা আছে। মা ওকে যখনই বাজার করতে দেয়, ও সামান্য পয়সা ম্যানেজ করে নেয় সেখান থেকে। মা, মাছ মাংস তরিতরকারি যতটাই আনতে বলে, ও ওজনে তার চেয়ে একটু একটু করে কম আনে। তার থেকে যা পয়সা বাঁচে, সেটা ও জমায়। অমরকে মাঝে-মাঝে আচার, লজেন্স কিনে দেয়। নিজেও কখনও-সখনও আলুমাখা, ফুলুরি খায়।
কিন্তু সেদিন কলম কিনতে বেরোনোর সময় ওর মনে হয়েছিল, কুসুমদির জন্য কিছু কিনতে চায় ও। কুসুমদির যা ভাল লাগে, তেমন কিছু দিতে চায় কুসুমদিকে।
কিন্তু ওই দোকানটায় ঢুকে সতু যা দেখেছিল, তাতে বুঝেছে ওর পকেটের অত জোর নেই। তা হলে কী করবে!
তখনই মনে পড়েছিল আর-একটা কথা। কুসুমদি বলেছিল হগ মার্কেটের একটা দোকানের কথা। সেখানে নাকি দারুণ লেমোনেড পাওয়া যায়। কটসের লেমোনেড। দামও সাধ্যের মধ্যে।
ব্যস, হগ মার্কেট থেকে দু’বোতল লেমোনেড কিনেছিল সতু। কাচের বোতল দুটো নিয়ে বাড়ি যাবে বলে একটু দাম বেশি দিতে হয়েছিল বটে, কিন্তু সতুর তাতে অসুবিধে ছিল না।
বাড়িতে ফিরে একদম সোজা তিনতলায় উঠে গিয়েছিল সতু। কুসুমদি নিজের ঘরেই ছিল। দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল সতু। দেখেছিল, কুসুমদি একটা রুমালের কোনায় কী যেন সেলাই করছে। ওকে দেখেই রুমালটা বালিশের তলায় গুঁজে রেখেছিল কুসুমদি। জিজ্ঞেস করেছিল, “কী রে সতু, এনেছিস!”
সতু বাড়িয়ে দিয়েছিল পেনের বাক্সটা। কুসুমদি আগ্রহ নিয়ে বাক্সটা নিয়েছিল। তার পর ঢাকনাটা খুলে কলমটা বের করেছিল। সতু দেখেছিল
কুসুমদির মুখে আলো জ্বলে উঠেছিল যেন।
কুসুমদি সতুর চুল ঘেঁটে দিয়ে বলেছিল, “দারুণ এনেছিস তো! আমার খুব পছন্দ হয়েছে। একদম রানির মতো কলম।”
সতুর যে কী আনন্দ হয়েছিল! ও মনে মনে বলেছিল, কুসুমদি এটা তো তুমিই
কুসুমদি কলমটা নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল।
সতু এবার কাঁধের ঝোলা থেকে বের করেছিল ব্রাউন রঙের একটা বড় প্যাকেট। তার পর কাচের বোতলের টুং-টাং শব্দ তুলে বের করেছিল দুটো বোতল। লেমোনেডের।
কুসুমদি অবাক হয়ে বলেছিল, “এটা? হঠাৎ!”
“তোমার জন্য কুসুমদি। সেই এক দিন বলেছিলে হগ মার্কেটে খুব ভাল লেমোনেড পাওয়া যায়! তাই দেখলাম…” সতু চুপ করে গিয়েছিল।
কুসুমদি বলেছিল, “তুই পাগল একটা। শুধু-শুধু খরচ করলি!”
সতু হেসে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। কুসুমদি কী করে বুঝবে, এই জীবনে শুধু-শুধু যে কিচ্ছু হয় না!
.
“ওই বাস আসছে, চল,” নশা কাঁধের ব্যাগটা সামলে এগিয়ে গেল।
সতু দেখল, দু’নম্বর দোতলা বাসটা আসছে হেলেদুলে। সামনে লেখা কালিঘাট, শ্যামবাজার!
বাসটা দাঁড়াতেই লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়ল। অফিস ভাঙার সময় হয়নি এখনও, তাও কলকাতায় ভিড় বেশ।
বাসের পেছনের দিকের ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠল সতু। কোনও বসার জায়গা নেই। ও মাথার ওপর হাতল ধরে দাঁড়াল।
মনে পড়ল মা বলেছে, বাড়িতে ঢোকার আগে কবিরাজদাদুর কাছ থেকে বাতের ব্যথার তেল নিয়ে আসতে। মায়ের হাঁটুতে বাত আছে। কবিরাজদাদুর তেল লাগালে নাকি ঠিক থাকে। যখন তেল ফুরিয়ে যায়, সতু নিয়ে আসে।
কাল রাত থেকে মায়ের ব্যথাটা শুরু হয়েছে আবার। বাড়িতে তেল নেই। তাই আজ তেল নিয়ে ঢুকতে হবে।
নশা নেমে গেল শিয়ালদার কাছে। ওখান থেকে হেঁটে কলেজ স্ট্রিট কাছেই। সতু ওর সঙ্গে-সঙ্গে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়াল। আর-একটু পরেই নামতে হবে ওকে।
বাসটা আবার চলতে শুরু করেছে। সতু রাস্তার দিকে তাকাল। ঘোড়ার গাড়ির সারি দাঁড়িয়ে আছে রাজাবাজার মোড়ে। ওই দিক থেকে একটা মিছিলও আসছে। এই রে! সব আটকে যাবে এবার।
সতু মাথা নাড়ল বিরক্তিতে। তার পর মাথা নিচু করে দেখা চেষ্টা করল মিছিলটা কত দূরে আছে। আর ঠিক তখনই দেখতে পেল কুসুমদিকে।
ঠিক দেখছে কি ও? কুসুমদিই তো, না কি? জেঠিমা যে ক’দিন বাড়ি থেকে বেরোতে দিচ্ছিল না! তা হলে কি আজ বেরিয়েছে!
সতু দেখল কুসুমদি ফুটপাথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সুকিয়া স্ট্রিটের দিকে। এই রে, এদিকে যে মিছিল আসছে! সঙ্গে মাউন্টেড পুলিশও আছে। যদি গোলমাল হয়? ব্রিটিশের পুলিশ তো সামান্য সুযোগ পেলেই মারধোর শুরু করে। কুসুমদির যে বিপদ হবে!
“সরুন, সরুন, আমি নামব, সরুন,” বাসের সবাইকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল সতু। লোকজন বিরক্ত হল। কেউ কেউ কিছু বললও। কিন্তু সতু পাত্তা দিল না। মিছিল আসছে, কুসুমদির বিপদ হলে!
রাস্তায় নেমে সামনে তাকাল সতু। বিকেলের ভিড়ের মধ্যে ওই যাচ্ছে কুসুমদি। না, চিনতে ভুল হয়নি ওর।
সামনে একটা বড় মোষ শুয়ে আছে। তার পাশে একটা রিকশাওয়ালা বসে রয়েছে টানা রিকশা নিয়ে। সতু রাস্তায় নেমে সামান্য ঘুরে সামনে এগোল। ভিড়ের মধ্যে মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে কুসুমদি। ও এবার সামান্য দৌড়ে সামনের দিকে এগোল। ভিড়ের মধ্যে হাত দিয়ে জায়গা করে নিল।
এবার স্পষ্ট দেখতে পেল কুসুমদিকে। নীল শাড়ি, গায়ে আঁচল। কাঁধে একটা ব্যাগ। কুসুমদি কী করছে এখন এখানে!
সামনে একটা গলি। কুসুমদি আচমকা বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে সেই গলিতে ঢুকে পড়ল। সতুর কেমন যেন মনে হল এবার। কোথায় যাচ্ছে কুসুমদি!
সতু জানে কারও পিছু নেওয়া ঠিক নয় এ ভাবে। কিন্তু কুসুমদি বলে কথা! ওর কেমন একটা করছে বুকের মধ্যে। কুসুমদি যাচ্ছেটা কোথায়! সতুও গলির মধ্যে ঢুকল এবার। গলিটা সরু। চারপাশটা বেশ ময়লা। মাংসের দোকান। চায়ের দোকান। ছোট মুদির দোকান ছাড়াও আরও নানা দোকান আছে গলিতে। পাশের খোলা ড্রেন উপচে ময়লা চলে এসেছে রাস্তায়! সবটাই কেমন নোংরা। একটা বাজে গন্ধ ভাসছে হাওয়ায়। এমন একটা পরিবেশে কুসুমদি কী করছে!
সতু আর কুসুমদির কাছে যেতে চায় না এখন, বরং দেখতে চায় কুসুমদি কোথায় যাচ্ছে!
আর সেটাই দেখল ও। দেখল, আঁকাবাঁকা গলির ভেতরে আর- একটা সরু গলির মুখে গিয়ে দাঁড়াল কুসুমদি। আর পাশের ছোট্ট রং- চটা বাড়ির মধ্য থেকে বেরিয়ে এল একটা ছেলে। এই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়স। ছোট করে কাটা চুল। গালে দাড়ি। ছেলেটার চোখে-মুখে একটা সতর্কতা। ছেলেটা একটা বাদামি পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামা পরে রয়েছে।
সতু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দেখল, ছেলেটার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে কুসুমদি! ছেলেটা এদিক-ওদিক দেখল, তার পর কুসুমদির হাত ধরে ওকে বাড়িটার মধ্যে ঢুকিয়ে নিল।
সতু দেখল, কুসুমদিও বিনা বাধায় ছেলেটার সঙ্গে ঢুকে গেল বাড়িতে।
ওদের এক অপরের দিকে তাকানো, পরস্পরের হাত ধরে বাড়িতে ঢুকে যাওয়ার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা আছে, সেটা নাড়িয়ে দিল সতুকে। মনে হল কে যেন ওকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল মনুমেন্টের মাথা থেকে! কে যেন আগুন লাগিয়ে দিল ওর বুকের পাঁজরের সব ক’টা হাড়ে! কে যেন পেটের মধ্যে ভরে দিল ডাকাতিয়া নদীর ঘূর্ণি!
মিছিল পার করছে বড় রাস্তা! বন্দে মাতরম্ ধ্বনিতে ভরে উঠছে শহরের আকাশ, ঢেকে দিচ্ছে মাউন্টেড পুলিশের ঘোড়ার খুরের শব্দ! কিন্তু কিছুই যেন সতুর কাছে পৌঁছল না। ওর চারিদিক যেন জনশূন্য! ওর মনে হল, এই পৃথিবীতে ও সম্পূর্ণ একলা, ও বাতিল!
নির্জন আঁকাবাঁকা গলিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সতু।
তিন
ইজনা
কয়েক দিন আগে
লম্বা করিডোরের শেষে ওই চলে যাচ্ছে গগন। মাথাটা সামান্য ডান দিকে বাঁকানো। কাঁধে ঝোলা। থ্রি কোয়ার্টার করে গোটানো শার্টের হাতা। ছেলেটাকে দেখলে অদ্ভুত লাগে ইজনার। কেমন যেন চুপচাপ নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা একটা ছেলে। কোনও কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না! কোনও চাহিদা নেই। রাগ নেই। কোনও কিছু হওয়ার ইচ্ছে নেই। নদীর পাশে ফুটে থাকা সামান্য ঘাসফুলের মতো যেন বেঁচে আছে ছেলেটা।
গত কাল স্বাধীনতা দিবস ছিল। সেই উপলক্ষে কলেজে অনুষ্ঠান ছিল একটা। ইজনাকে সেখানে গান গাইতে হয়েছিল। সবাই হাততালি দিয়েছিল। ভাল বলেছিল। কিন্তু ইজনা জানে, কাল ভাল হয়নি গানটা। আর ও এ-ও জানে যে, ও সুন্দরী, তাই অনেকেই ওকে খুশি করে ওর ঘনিষ্ঠ হতে চায় বলে মিথ্যে প্রশংসা করে।
গান গেয়ে স্টেজের নীচে নামার পরেই ওকে ধরেছিল সিমি। বলেছিল, “কী রে, সকাল থেকে ফোন করছিলাম, ফোন ধরছিলিস না কেন? তোর সঙ্গে আমার খুব দরকার। শুনলাম, কাল গগন আসবে কলেজে। সত্যি?”
সিমি বা সীমন্তিনী বাসু ওর খুব বন্ধু। না ছোটবেলার নয়, এই চাকরি জীবনের বন্ধু। মেয়েটা খুবই ভাল। তবে বড্ড অস্থির। এই যেমন গত কাল এমন ছটফট করছিল যে, ওদের রিফ্রেশমেন্ট রাখা হয়েছিল যেখানে, সেই টেবিলে রাখা কোল্ড ড্রিঙ্কের একটা বোতল উল্টে ফেলে দিয়েছিল।
প্রিন্সিপালস্যার খুব রাগ করেছিলেন। বলেছিলেন, “তুমি বাচ্চাদের পড়াবে কী? তুমি নিজেই তো এখনও বড় হওনি!”
সিমি পরে বলেছিল, “কলেজে যারা পড়ে তারা নাকি বাচ্চা! স্যারের মাথায় কী আছে কে জানে।”
এমনিতেই গান ভাল হয়নি বলে মেজাজটা একটু খারাপ ছিল, তাই সিমির কথায় বিরক্তই হয়েছিল ইজনা। আর বিরক্ত হলে বা রাগ করলে ও সেটা লুকোতে পারে না। ইজনা বলেছিল, “প্লিজ ডোন্ট স্টার্ট আগেন। আসবে তো আসবে। তাতে তোর কী!
“আরে, আমার কী মানে? কেন আসবে জানিস না? ওরা যে ওয়র্কশপটা করতে চায় তার জন্য প্রিন্সির সঙ্গে কথা বলতে আসবে। আমার যে কী টেনশন হচ্ছে না! তোকে কী বলব! আমার কী হবে বল তো!” সিমি দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল।
সিমি খুব ভাল মেয়ে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এখনও ম্যাচিওরিটি আসেনি। গগন ওদের কমন ফ্রেন্ড। কয়েক মাস আগে ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সেখানে সিমির ওকে ভাল লেগে গিয়েছে। আর গত সপ্তাহে নাকি সিমি এক দিন রাতে মদ খেয়ে বিশাল লম্বা একটা প্রেমপত্র টেক্সট করেছে গগনকে। কিন্তু সেটা দেখেও গগন কিছু বলেনি। উত্তর দেয়নি। আর তার পর থেকেই সিমি এমন ছটফট করতে শুরু করছে।
ইজনা সিমির হাতটা ওর মুখ থেকে নামিয়ে দিয়ে বলেছিল, “আবার মুখে হাত দিচ্ছিস! তুই কাউকে প্রোপোজ় করেছিস, সে রিপ্লাই করেনি। এতে এত ঘাবড়ানোর কী আছে? সব কিছু নিয়ে এমন টেনশন করিস কেন? আর করলেও আমার মাথা খাস কেন?”
সিমি ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল লম্বা টানা বারান্দার এক পাশে। রিফ্রেশমেন্ট টেবিল থেকে কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল তুলে তার ঢাকনা খুলে অন্য হাতে নিয়েছিল একটা প্লাস্টিকের গ্লাস। বলেছিল, “আমি তোর মতো অমন স্টোন হার্টেড নই। আমি যাকে ভালবাসি তার রিলেটেড কিছু হলে আমার বুকের মধ্যে কেমন একটা করে!”
ইজনার এই স্টোন হার্টেড কথাটাতে বিরক্তি লেগেছিল। ও বলেছিল, “দেখ, আমি কী সেটা তোর কনসার্ন নয়। আর গগন রিপ্লাই করেনি মানে ও ইন্টারেস্টেড নয়। বুঝেছিস?”
“সে কী! ইন্টারেস্টেড নয়!” সিমি কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতলটা টেবিলে রাখতে গিয়ে উল্টে ফেলে দিয়েছিল। ব্যস, চারদিক ভিজে গিয়ে, অন্য খাবার নষ্ট হয়ে সে একশা কাণ্ড!
প্রিন্সিপালস্যার দৌড়ে এসেছিলেন আরও কয়েকজন স্টাফকে নিয়ে। বকাবকি শুরু করেছিলেন!
সিমি শিয়ালদার কাছে থাকে। খুব বড় বাড়ির মেয়ে। ওর বাবার লেদার এক্সপোর্টের ব্যবসা আছে। জেঠু পলিটিক্স করেন। মন্ত্রীও হয়েছেন সদ্য। ছোটকাকাও দিল্লিতে খুব বড় চাকরি করে। ওদের বাড়িতে মাঝে মাঝে যায় ইজনা। সবাই খুব ভালবাসে ওকে। এখনকার দিনে এমন জয়েন্ট ফ্যামিলি ও আর দেখেনি!
না, ভুল। দেখেছে। ওদের পাড়াতেই আছে এমন একটা পরিবার। কিন্তু তাদের কথা আর মনে করতে চায় না ও। কারণ, তাদের কথা মনে করলেই এক জনের মুখ ভেসে ওঠে সামনে। আর শরীরের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হয়। কান-মাথা গরম হয়ে ওঠে।
প্রিন্সিপালস্যার চলে যাওয়ার পরে সিমি ওকে বলেছিল, “কাল আমি কলেজে আসব না। তুই একটু প্লিজ় ওকে জিজ্ঞেস করবি, ওর উত্তরটা কী!”
“আমায় এ সবে ঢোকাচ্ছিস কেন?” বিরক্ত হয়েছিল ইজনা, “আমার এসব প্রেম-টেম ভাল লাগে না। যত্ত সব ন্যাকামো! আর আমি তো স্টোন হার্টেড! আমি পারব না।”
সিমি ওর হাত দুটো ধরে বলেছিল, “রাগ করেছিস! না না, স্টোন হার্টেড মোটেই নোস। তোকে রাগানোর জন্য বলেছি আমি। প্লিজ ইজনা, আমার জন্য এটুকু কর। সেদিনের পর থেকে আমার মাথা-ফাথা খারাপ হয়ে আছে। প্লিজ প্লিজ়! ডোন্ট মেক মি বেগ।”
ইজনা সিমিকে দেখে হেসেছিল এবার। বলেছিল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। ও আসুক কাল আমি জিজ্ঞেস করব।”
আজ বিকেল করে এসেছিল গগন। প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে নিজেই এসেছিল টিচার্স রুমে। টিচার্স রুম প্রায় ফাঁকাই ছিল। দু’-একজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসেছিল এদিক-ওদিক। ইজনা নিজের তৈরি একটা নোটই কারেকশন করছিল। গগনকে দেখে ও খাতাটা গুটিয়ে পাশের ব্যাগে রেখে দিয়েছিল। তার পর উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “চলো, ক্যান্টিনে যাই। আমার ক্লাস নেই আর। ওখান থেকে বেরিয়ে যাব একেবারে!”
ওদের কলেজটা সল্টলেকে। বেশ বড় ক্যাম্পাস। সুন্দর করে সাজানো। ক্যাফেটাও দারুণ। কাউন্টারে গিয়ে মাধুদাকে দুটো এস্প্রেসো অর্ডার করে গগনকে নিয়ে এক পাশে বসেছিল ইজনা।
গগন কাঁধের ব্যাগটা চেয়ারের পেছন দিকে ঝুলিয়ে হাতা গুটিয়ে বলেছিল, “এবার বলো, তোমার কাজ কেমন চলছে? মানে, ওই স্বনির্ভর প্রকল্প? আমায় বলেছিলে এক দিন নিয়ে যাবে। যাবে না?”
ইজনা হেসে বলেছিল, “আজই যাব তো। তুমি যাবে? চলো।”
“এই রে, আজ যে হবে না! এখন আমায় বিরাটি যেতে হবে। পরে এক দিন বোলো প্লিজ়। আমি একবার দেখতে চাই গিয়ে।”
মাধুদা কাউন্টার থেকে হাত তুলে ইশারা করেছিল। ইজনা উঠতে যাওয়ার আগেই গগন উঠে গিয়ে দুটো কাপ এনে আবার বসেছিল টেবিলে।
“তোমায় একটা কথা বলার ছিল,” কাপে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলেছিল ইজনা, “যদি কিছু মনে না করো!”
“না না। কী, বলো না!” গগনও কাপে চুমুক দিয়েছিল।
“সিমির ব্যাপারে,” ইজনা তাকিয়েছিল গগনের দিকে।
গগন থমকে গিয়েছিল একটু। তার পর কাপটা টেবিলে রেখে মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে শব্দ করে হেসে উঠেছিল।
“আরে, হাসছ কেন?” ইজনা অবাক হয়েছিল, “আমি কোনও জোক বললাম নাকি? মেয়েটা অস্থির হয়ে আছে! তোমায় নাকি কী সব লিখেছে?”
গগন মাথা নেড়ে সোজা হয়ে বসেছিল। তার পর আর-একটা চুমুক দিয়েছিল কাপে। বলেছিল, “আরে, ওই মেয়েটার মাথা খারাপ। এক দিন রাতে দেখি বিশাল বড় একটা মেসেজ করেছে। তাতে প্রোপোজ করেছে। আমি তো অবাক!”
“কেন, অবাক কেন? পৃথিবীতে কি এমন আগে হয়নি?” ইজনা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
গগন বলেছিল, “আরে, বিয়ে-টিয়ে করার কথা পর্যন্ত লিখেছে! মানে, কী বলব আমি! আমি আর কোনও রিপ্লাই করিনি।”
“বিয়ের কথা লিখেছে বলে?” ইজনা জিজ্ঞেস করেছিল।
“না না, সে জন্য নয়! আরে, আমি বুঝতে পারছিলাম ও নিশ্চয়ই ইনটক্সিকেটেড অবস্থায় ছিল। মানুষ ওরকম অবস্থায় থাকলে অনেক কিছু বলে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় বলতে পারে না। আমি শিওর, পরে ও রিগ্রেট করেছে। হয়তো এমব্যারাসডও হয়েছে। তাই আমি আর কিছু বলিনি,” গগন এবার কাপটায় শেষ চুমুক দিয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখ মুছেছিল।
ইজনা বলেছিল, “কিন্তু গগন, সিমি কিন্তু সিরিয়াস। বিয়ে-টিয়ের ব্যাপারটা বেশি লিখে ফেলেছে হয়তো। বাট শি লাভস ইউ। ও আমায় বারবার বলেছে, যেন তোমার সঙ্গে কথা বলি। তোমার কিছু বলার নেই?”
গগন হেসেছিল এবার। কিন্তু সে রকম মাথা তুলে মজার হাসি নয়। বরং এই হাসিতে যেন বিষণ্ণতা ছিল একটু।
ও বলেছিল, “আমার বাড়ির অবস্থা ভাল নয় ইজনা। প্রেম-টেম করার মতো অবস্থা নয় আমার। দাদা মা আর আমি থাকি ভবানীপুরে। ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে দুটো ঘর। বাড়িটার বয়স একশো কুড়ি বছর। বাবার ভাগে যেটুকু পড়েছিল, সেটুকুতেই থাকি। দাদা, নেহাত সরকারি চাকরি করে তাই রক্ষে। আমি তো জানোই, এনজিও-র হয়ে কাজ করি। বারো হাজার টাকা মাইনে পাই। মাকে দিই ন’হাজার, নিজে তিন রাখি। এতে প্রেম করা যায়, বলো? কলেজ-জীবনে একটা মেয়েকে ভালবাসতাম। মেয়েটাও ভালবাসত। কিন্তু তার পর মেয়েটার আবার ওর স্কুল-জীবনের পুরনো প্রেমিকের কথা মনে পড়ে যায় আর আমায় একদম ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে যায়। না, আমি কোনও নালিশ করছি না বা নিন্দা করছি না। ও আমায় জাস্ট এই ভাবেই বলেছিল। বলেছিল, ‘আমি আর তোকে ভালবাসি না।’ ইস সো পেনফুল ইজনা! সেটার পরে আমার খুব ভয় লাগে এসব প্রেম-টেম। আমি একদম সাধারণ মানুষ। এক বার কষ্ট পেয়েছি। অনেক লড়াই করে সামলেছি। আর পারব না? প্লাস খুব ক্লিশেড হলেও এটা তো সত্যি যে, একটা সোশ্যাল লেভেল বলেও ব্যাপার আছে! আমি সিমিদের বাড়িতে গিয়েছি। ওদের হলঘরটায় আমাদের গোটা বাড়ি ঢুকে যাবে! মানে, বুঝতেই তো পারছ। ওর খুব অসুবিধে হবে। আমার মনে হয় এটা ওর কাছে একটা জেদ। পেয়ে গেলে দেখবে, তখন খুব দ্রুত এই প্রেম শেষ হয়ে যাবে ওর। বাচ্চাদের পুতুল কেনার জেদের মতো আর কী।”
“তুমি সারাক্ষণ তো মেটিরিয়াল জিনিসের কথাই বলে গেলে,” ইজনা অবাক হয়েছিল।
“পৃথিবী যাতে চলে, সেটাই বললাম। আমি খুব সাধারণ ছেলে। অ্যাম্বিশন নেই আমার। যেমন-তেমন করে চলে গেলেই হল। প্রথম ছ’মাস সিমির খুব ভাল লাগবে। কিন্তু তার পর আমার খারাপ দিকগুলো ওর নজরে আসবে। ও যে সার্কল বা সোসাইটিতে মেলামেশা করে, তাতে আমাকে ওর মিসফিট লাগবে। আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। আমার তখন কষ্ট হবে খুব! তার চেয়ে কী দরকার বলো? তাঁতি তাঁত বুনেই খাক,” গগন সামান্য হেসে ঘড়ি দেখেছিল। তার পর উঠে দাঁড়িয়েছিল।
ইজনাও উঠে পড়েছিল। তার পর দু’জনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কাউন্টারে। মাধুদাকে এস্প্রেসোর দামটা ইজনাই দিতে চেয়েছিল, কিন্তু গগন দিতে দেয়নি।
কলেজের লম্বা করিডোর থেকে ফিরে এসে গগন বলেছিল, “আসলে আমি ভিতু, ইজনা। না হলে কে না পছন্দ করবে সিমিকে অমন সরল মেয়ে। আর অত সুন্দর চোখ কলকাতায় আর কার আছে! আমি আসি আজ।”
ইজনা বলেছিল, “আমায় যা বললে অন্তত সেটুকুই ওকে বোলো। দেন লেট হার ডিসাইড। কেমন?”
গগন মাথা নেড়ে হেসেছিল মাত্র!
.
এখন লম্বা করিডোরের শেষে ওই চলে যাচ্ছে গগন। মাথাটা সামান্য ডান দিকে বাঁকানো। কাঁধে ঝোলা। থ্রি কোয়ার্টার করে গোটানো শার্টের হাতা।
ইজনা মাথা নাড়ল নিজের মনে। তার পর ঘড়ি দেখল। এবার বেরোতে হবে। যে-কোনও সময়ে অঞ্জন চলে আসবে। ওদের যেতে হবে ‘ক্রাফট’-এ।
অঞ্জন ওর ইউনিভার্সিটি জীবনের সিনিয়র। ‘ক্রাফট’ নামে একটা এনজিও চালায়। মানে, ওদের ফ্যামিলির বাবা দাদাও আছে যুক্ত। তারাই আসল লোক। কিন্তু অঞ্জনও কাজ করে।
‘ক্রাফট’-এ মহিলাদের স্বনির্ভর প্রকল্প চলে। মহিলারা নানান জিনিস বানায়। তার পর সে সব বিক্রি করা হয়। যা বিক্রি হয় তার চল্লিশ শতাংশ পায় মহিলারা আর বাকিটা প্রোডাকশন কস্ট আর ‘ক্রাফট’-এ যারা চাকরি করে তাদের স্যালারি হিসেবে যায়।
ইজনা এখান থেকে কোনও টাকাপয়সা নেয় না। ওর মানুষের জন্য কাজ করতে ভাল লাগে, তাই কাজ করে।
অঞ্জন থাকে সল্ট লেকে। আর কালাকার স্ট্রিটের ওখানে দুটো বড় ফ্লোর নিয়ে ওদের ‘ক্রাফট’। আজ সেখানেই যাবে ইজনা। পরশু ‘ক্রাফট’- এর কাজ দেখতে বিদেশি এমব্যাসি থেকে এক জন রাষ্ট্রদূত আসছেন। সেই ব্যাপারে যাতে কোনও রকম কোনও খামতি না থাকে, সেটা দেখা দরকার। অঞ্জনের বাবা, মানে কাকাবাবু আজ সকালে ইজনাকে ফোন করে বলেছিলেন যে, এই ভিজিটটা খুব জরুরি। কারণ, রাষ্ট্রদূত ভদ্রলোক খুশি হলে বিদেশ থেকেও অর্ডার আসতে পারে।
বাড়িতে মাকে বলে এসেছে ইজনা যে, আজ ফিরতে দেরি হবে। মা শুনেই রাগ করছিল। আসলে রাগ করা স্বাভাবিক। দাদার ছেলে ভুতোর জন্মদিন কাল। সেই নিয়েও নানান কাজ আছে। বৌদি, মানে রিতু একা পেরে উঠবে না। তাই মা আর রিতু দু’জনেই ইজনাকে বলেছিল ওর সাহায্য লাগবে। কিন্তু আজই এই কাজ পড়ে গেল!
ও মেসেজ করেছে রিতুকে, কিন্তু এখনও রিপ্লাই করেনি রিতু। খুব রেগে গিয়েছে! তা যাক, ইজনা ম্যানেজ করে নেবে। দাদা প্রেম করে বয়সে অনেক ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে। তাড়াতাড়ি বাচ্চাও নিয়ে ফেলেছে ওরা। কিন্তু ইজনার মনে হয়, রিতু নিজেও এখনও বড় হয়নি। এটা ও বলেওছে রিতুকে।
রিতু হেসেছে শুনে। পাল্টা বলেছে, “আমি বাচ্চা! সিমি ইমম্যাচিয়োরড! আর তুমি? তুমি কী? তুমি তো ঠানদি! নিজেকে খুব ম্যাচিয়োরড ভাবো বুঝি? কী না কী দেখেছ, তাতে হাট্টিমকে দিলে তাড়িয়ে! এখনও বেচারা বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এমন করে আমাদের ব্যালকনির দিকে তাকায়, যেন নিজের শহিদ বেদি দেখছে।”
রিতুর কথা ধরে হাট্টিমের কথা মনে আসতেই কেমন একটা লাগল ইজনার। ও যা ভাবতে চায় না তাই কেন যে মনে আসে! কিছু কিছু স্মৃতি যেন ভেজা হাতে জড়িয়ে থাকা চুল! যতই হাত ঝাড়ো না কেন, কিছুতেই যায় না!
আর মোটেও ‘কী না কী’ নয়, ও যা দেখেছে তা স্পষ্ট দেখেছে। ইজনা ওটা কোনও দিন ভুলতে পারবে না।
.
কলেজের সামনে সাদা সেডানটা দেখে ইজনা বুঝল, অঞ্জন আজ ভাড়ার গাড়ি নিয়ে এসেছে!
অঞ্জন গাড়ির বাঁ দিকে বসে আছে। ইজনা গিয়ে ডান দিকে উঠল। গাড়িতে অঞ্জনের পারফিউমের কড়া গন্ধ ভেসে আছে। কী বিরক্তিকর! এমন কড়া মিষ্টি গন্ধ ছেলেরা গায়ে লাগালে বিরক্ত লাগে ইজনার। অঞ্জনের পছন্দগুলোই এমন। আজও ক্যাটকেটে লাল একটা টি-শার্ট আর সবুজ চিনোজ পরেছে। দেখলেই মনে হচ্ছে সিগনাল পোস্ট।
ইজনা বসামাত্র অঞ্জন গাড়ি ছাড়তে বলে ওর দিকে ঘুরে বসে বলল, “আরে, আমার গাড়িটা পাড়ার ছেলেরা নিয়ে বেরিয়েছে। ওদের কিট কিনতে হবে। সামনে ফুটবল টুর্নামেন্ট না!”
ইজনা অবাক হল। অঞ্জনের কাছ থেকে তো কিছু জানতে চায়নি ও।
অঞ্জন আবার বলল, “সামনেবিশাল বড় অল ইন্ডিয়া ফুটবল লিগ। তার প্রোমোশনের জন্য দেশের মূল ছ’টা শহরে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে উদ্যোক্তারা। আটটা দলের নক আউট টুর্নামেন্ট। পাড়ার দল টাইপের আর কী। দারুণ এক্সাইটিং ব্যাপার! নর্থ চব্বিশ পরগনা আর সল্টলেকের ক’টা ক্লাবের মধ্য থেকে আমাদের ‘ফিনিক্স স্পোর্টিং’ চান্স পেয়েছে। আমার গাড়ি করেই সবাই কিট কিনতে বেরিয়েছে।”
ইজনা তাকাল অঞ্জনের দিকে। বলল, “আমাকে আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। কাল দাদার ছেলের জন্মদিন। কাজ আছে বাড়িতে।”
“আরে, তাই নাকি!” অঞ্জন মাথা নাড়ল, “শিয়োর শিয়োর। তা, আমায় নেমন্তন্ন করবে না?”
“না, তোমায় কেন, আমার পরিচিত কাউকেই নেমন্তন্ন করব না। দাদা বৌদি ওদের মতো নেমন্তন্ন করবে,” ইজনা ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল।
কথাটা আসলে সত্যি নয়। সিমিকেই তো ও বলেছে! দাদা বলেছিল, ইজনার যাকে ইচ্ছে বলতে। কিন্তু আর কাউকে বলার নেই ইজনার।
তা ছাড়া অঞ্জনের সঙ্গে সম্পর্কটা খুব অফিশিয়াল রাখতে চায় ইজনা। ও বোঝে যে, অঞ্জন আজকাল একটু গায়ে পড়তে চাইছে। কিন্তু সেটাকে আমল দেয় না ও।
গাড়ি হু-হু করে যাচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পরে অঞ্জন যেন কথা হাতড়ে পেল এবার। বলল, “আমার পারফিউমটা কেমন?”
“খুব উগ্র!” ইজনা বলল, “বাঘ বেড়াল যেভাবে টেরিটরি মার্ক করে সেরকম করছ নাকি?”
অঞ্জন একটু থতমত খেয়ে গেল। তার পর স্মার্ট হওয়ার জন্য বলল, “আসলে সিজ়ন অনুযায়ী পারফিউম লাগাতে হয় তো! তাই এটা লাগিয়েছি! মানে এটাও একটা সায়েন্স! আসলে আমি ছোট থেকে….”
অঞ্জন কী সব বলে যাচ্ছে। ইজনা শোনার ভান করলেও শুনল না। গাড়ি কলেজ স্ট্রিট পেরোচ্ছে। ও আলগোছে বাইরের দিকে তাকাল, আর ঠিক তখনই দেখতে পেল হাট্টিমকে।
কলেজ স্ট্রিট মোড়ের কাছে ফুটপাথে হাঁটছে। সামনে রাখো। কোথায় চলেছে দুই মক্কেল? ওর ফ্যাক্টরি ছিল না আজ? এই সময়ে এখানে কী করছে ও!
মাথা না ঘুরিয়েও চলন্ত গাড়ির মধ্য থেকে আড়চোখে ইজনা দেখল, হাট্টিম দেখেছে ওকে আর অঞ্জনকে। আর দেখেই কেমন যেন আচমকা ঠান্ডায় জমে যাওয়া প্রাণীর মতো স্থির হয়ে গিয়েছে।
ইজনা চোয়াল শক্ত করল। বুকের মধ্যে আবার কেমন করছে! নিজেকে ‘ছিঃ’ বলে তিরস্কার করল ইজনা। তার পর আচমকা অঞ্জনের দিকে সামান্য চেপে বসল। অঞ্জন অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে।
গাড়িটা অনেকটাই দূরে চলে এসেছে এখন। এবার ইজনা মাথা ঘুরিয়ে ভাল করে তাকাল পেছনের দিকে। দেখল, ওই দূরে ছোট্ট খেলনা পুতুলের মতো এখনও থমকে আছে হাট্টিম! মানে লেগেছে ভালই।
ইজনা চোয়াল শক্ত করল। তার পর নিজের মনে বলল, ‘বেশ হয়েছে!’
চার
ইজনা
এখন
রেস্তরাঁটা খুব ছোট্ট। একদম একমুঠো। ভেতরে তিন-চারটে টেবিল মাত্ৰ। তাও একদম ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখা। ঢোকার মুখেই বাঁ হাতে একটা ছোট কাউন্টারে রেস্তরাঁর মালিক বসে রয়েছে। তার পিছনে কিচেন। রেস্তরাঁতে ঢোকার দরজার পাশেই একটা জানলা। তাতে বাড়ির মতো প্রিন্টেড পর্দা ঝোলানো। কলেজ স্ট্রিট ও তার আশপাশের অঞ্চলে বেশ কিছু স্কুল কলেজ থাকার ফলে স্টুডেন্টদের অভাব নেই এখানে। তাই দুপুরের দিকে এই রেস্তরাঁতে খুব ভিড় হয়। মানে, ভেতরের ওইটুকু জায়গায় তো সিট পাওয়াই যায় না, উপরন্তু বাইরেও লোকজন লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্লেট হাতে ধরে খায়।
ইজনা খুব একটা কলেজ স্ট্রিটে আসত না। আর এলেও মেন রোডের ওপর থেকে বইপত্র কিনে নিয়ে চলে যেত। এই অঞ্চলের অলিগলিতে কখনও ঢুকত না। মনে হত, কী হবে ঢুকে!
ওকে কলেজ স্ট্রিটের অলিগলিতে প্রথম নিয়ে আসে হাট্টিম। ঘুরে ঘুরে চেনায় সব কিছু। কোথায় কোন দোকানে সস্তায় কমিকস পাওয়া যায়, কোথায় সেকেন্ড হ্যান্ড কিন্তু ঝকঝকে বই পাওয়া যায়, আবার কোন গলিতে কী কী খাবার পাওয়া যায়, সব হাট্টিমই চিনিয়েছে ওকে।
এখন আর হাট্টিম নেই ওর জীবনে, কিন্তু ওর সঙ্গে এই সব জায়গার আসার স্মৃতিগুলো রয়ে গিয়েছে!
ইজনার মন খারাপ লাগে। হাট্টিমের জন্য মন খারাপ লাগে ওর। মাঝে মাঝে সব শূন্য আর অর্থহীন মনে হয়। শিশিরের মতো একটা মন খারাপ সবার অলক্ষ্যে কী করে যেন নেমে আসে ওর মনে। কিন্তু তাও এক বার যখন সরে এসেছে, তখন আর ফিরে যাবে না ইজনা। কারণ, হাট্টিমের কথা মনে এলে শুধু তো আর হাট্টিমের কথা মনে আসে না, ওর মনে আসে সেই সন্ধেবেলার দৃশ্যটাও।
কিছু কিছু দৃশ্য আছে, যা মনের মধ্যে গরম লোহার ছাপের মতো দগদগে হয়ে বসে যায়। হাট্টিম যে ওর সঙ্গে ওরকম করতে পারে, ইজনা ভাবতেই পারেনি কোনও দিন। কিন্তু কল্পনায় যা অসম্ভব বলে মনে হয়, জীবন যে আসলে সেখান থেকেই শুরু হয়!
এখন বিকেল শেষ হচ্ছে। রেস্তরাঁটা আজ ফাঁকা। পাশের টেবিলে একটা ছেলে আর মেয়ে বসে এক প্লেট আমেরিকান চপ সুয়ে ভাগ করে খাচ্ছে আর চাপা গলায় কথা বলছে। কাউন্টারের ভদ্রলোক হিসেব করায় ব্যস্ত। আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছে সিমি।
আজ ‘ক্রাফট’-এ কাজ ছিল ইজনার। কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চলে গিয়েছিল কালাকার স্ট্রিট। বিদেশি এমব্যাসির সেই ভিজিটটা ভাল ভাবেই উতরে গিয়েছে। আর তার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। ডেনমার্ক থেকে একটা সংস্থা আসছে। ওরা ‘ক্রাফট’-কে ইওরোপে রিপ্রেজেন্ট করতে চায়। কিন্তু তার আগে একটা প্রেজেন্টেশন দেখতে চায়। এখানে ওরা আসবে পুজোর পরে। তার আগে যদি প্রেজেন্টেশনটা ওরা ই-মেলে পেয়ে যায়, তা হলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে গ্রাউন্ড লেভেলের কাজটা সেরে রাখবে।
অঞ্জনের দ্বারা যে ও সব হবে না, কাকাবাবু সেটা বলেছেন ইজনাকে। বলেছেন, ইজনা যেন ব্যাপারটা করে দেয়! ‘ক্রাফট’-এ যে ক’জন চাকরি করে, তাদের মধ্যে মুদ্রা নামে একটা মেয়ে আছে। খুব ব্রাইট। ওকে কোনও কাজ দেখিয়ে দিলে চটপট করে ফেলে।
কাকাবাবুকে বলে মুদ্রাকে নিজের সঙ্গে নিয়েছে ইজনা। আসলে কলেজের ক্লাস, নোটস আর পরীক্ষার মধ্য থেকে সময় বের করে এই কাজটা তাড়াতাড়ি করা খুব মুশকিল। তাই ও কিছু পয়েন্টস করে মুদ্রাকে পাঠিয়ে দেবে। আর মুদ্রা সেটা করে রাখবে। তার পর সময়-সুযোগমতো ইজনা গিয়ে দেখে দেবে বলেছে। আজই সেরকমই গিয়েছিল। আর সেখানেই ফোন পেয়েছিল সিমির।
কী? না ও কলেজ স্ট্রিটে আসছে, ইজনা যদি একটু দেখা করে।
‘ক্রাফট’-এ ইজনার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই ও ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছিল। বাড়িতে সাত-তাড়াতাড়ি ফিরেই-বা কী করবে!
এই দোকানটায় সিমি কোনও দিন আসেনি। আসলে এমন দোকানে সিমি আসে না। খুব ঝলমলে জায়গা ছাড়া সিমি যেতে পারে না! হয়তো টাকাপয়সা থাকলে মানুষের জীবনের অরবিটটা অন্য রকম হয়ে যায়।
ইজনাদেরও টাকা আছে, কিন্তু ও এমন সব মানুষের সঙ্গে কাজ করে যে, তাদের কষ্টগুলো কাছ থেকে দেখে নিজের জন্য খুব কিছু খরচ করতে ইচ্ছে করে না ওর। বিলাসিতার প্রতি ইজনার একটা বিমুখতা আছে।
অন্য সময় হলে সিমি হয়তো এই রেস্তরাঁয় ঢোকার আগে দু’বার ভাবত। না না করত, নাক কোঁচকাত। কিন্তু আজ কিছু বলেনি। আসলে কিছু বলার মতো অবস্থাতেই যে নেই সিমি!
আজ সকালে গগন ওকে ফোন করেছে। বলেছে, বিকেল ছ’টা নাগাদ সিমির সঙ্গে দেখা করবে কলেজ স্কোয়ারে। কিছু কথা আছে, সেগুলো নাকি সামনাসামনি বলতে চায়। ব্যস, সিমির এমন টেনশন শুরু হয়েছে, তার পর থেকে আর কলেজে যায়নি! বাড়িতেও কিছু খেতে পারেনি! শেষে উপায়ান্তর না দেখে ইজনাকে ফোন করে এখানে দেখা করতে বলেছে। বলেছে, “ছ’টায় ও আসবে আমাকে ‘না’ বলতে, তার আগে অবধি আমার সঙ্গে একটু থাকিস।”
“না বলবে কেন? মানে, তুই জানলি কী করে ও না বলবে?” ইজনা অবাক হয়েছিল।
সিমি বলেছিল, “আমি জানি। আমার মন কু ডাকছে। তুই প্লিজ আয়।”
সিমির এমন ইলেকট্রন সমৃদ্ধ মন যে, কী বলবে আর! তবে এসেছে ইজনা। আর সিমিকে ধরে এনে এই রেস্তরাঁতে খাইয়েওছে। মেয়েটা খায়নি যে কিছু!
.
ঘড়ি দেখল ইজনা। পৌনে ছ’টা বাজে। পৌনে সাতটার মধ্যে পাড়ায় পৌঁছতে হবে। ভারতী সঙ্ঘে আজ মিটিং ডাকা হয়েছে। মণিদা তো আর যাবে না, তাই যেতে হবে ওকেই। দুপুরে রাখো ফোন করেছিল। বলেছে, “পৌনে সাতটায় চলে আসবি। খুব জরুরি দরকার! কাজ আছে বলে পাশ কাটাবি না কিন্তু।”
কেন মিটিং কে জানে! গতকাল পাড়ায় একটা কাণ্ড হয়েছিল। ক’মাস ধরেই চুরি হচ্ছিল বেশ। গত পরশু ভোররাতেও হয়েছিল। আর সেই চোরের এক জনকে ধরে ফেলেছিল বুড়োদাদু। সেই নিয়ে গতকাল গোটা পাড়ায় খুব একসাইটমেন্ট ছিল! সকালে সবাই গিয়েওছিল বুড়োদাদুর বাড়িতে। ইজনা সে সময় যেতে পারেনি। কলেজ ছিল বলে। ও গিয়েছিল সন্ধেবেলা।
বুড়োদাদুর বয়স অনেক। কিন্তু এখনও খুব স্ট্রং আছে।
দাদু বসেছিল নিজের ঘরে। টিভি দেখছিল। আর দাদুর পাশে বসেছিল ছোটদাদু। চোখে দেখতে পায় না লোকটা। তাও টিভিতে যা হয় শোনে।
ইজনা সোজা ঘরে ঢুকে পড়েছিল।
ছোটদাদু বলেছিল, “কী রে ইজনা, তুই এখন এলি?”
ইজনা বুঝেছিল, ছোটদাদু ওর পারফিউমের গন্ধ পেয়েছে। ওর একটা প্রশ্ন জাগে মনের মধ্যে! বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি কমে আসে ক্রমশ। কিন্তু ঘ্রাণশক্তি? সেটাও কি কমে? নাকি একই থেকে যায়! যদিও শুনেছে ছোটদাদুর দৃষ্টিশক্তি নাকি অল্প বয়সেই চলে গিয়েছিল।
ইজনা ব্যাগের ভেতর থেকে একটা হজমির কৌটো বের করে ছোটদাদুর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। তার পর বুড়োদাদুর পায়ের কাছে বিছানায় বসে বলেছিল, “তোমার ব্যাপার কী হ্যাঁ? এই বয়সে চোর ধরতে গেছ! দিয়েছে তো হাতে কোপ! যদি আর্টারি কেটে যেত! এই বয়সে বাঁচানো যেত?”
বুড়োদাদু টিভিটা মিউট করে দিয়ে রিমোটটা রেখেছিল পাশে। তার পর বলেছিল, “আরে, আমি কি আর চোর ধরতে উঠেছিলাম নাকি! তারা যে আমাদের সিঁড়ি বেয়ে ছাদ দিয়ে পালাতে যাবে, সেটা বুঝব কী করে! আর সামনে পড়ে গেলে ছাড়িই-বা কেমন করে বল?”
ইজনা মাথা নেড়েছিল। এই লোককে কিছু বলা বৃথা। ও বলেছিল, “তোমাকে আর কী বলি! সকালে কলেজ ছিল তাই আসতে পারিনি। পাড়ার সবাই এসেছিল শুনেছি!”
ছোটদাদু আচমকা বলে উঠেছিল, “হাট্টিমও এসেছিল।”
“তো?” ইজনা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল ছোটদাদুর দিকে।
ছোটদাদু বলেছিল, “তোদের বিয়ের কথা ছিল না? তার পর তো তুই ভেঙে দিলি সেটা। মনে পড়ে গেল তাই বললাম। শুধু-শুধু ভাঙলি। পাড়ার মেয়ে পাড়াতেই থাকতিস। এবার কোন পাড়ায় বিয়ে করে চলে যাবি। আমার হজমিটা পাওয়া হবে না আর।”
ছোটদাদু যে খুব একটা স্বাভাবিক নয় সেটা জানে ইজনা। তাই রাগ করেনি। বুড়োদাদুও ইশারায় বলেছিল, ও যেন কিছু মনে না করে।
ইজনা তার পরেও মিনিট দশেক ছিল ওখানে। তবে সেভাবে আর কথা জমেনি। হাট্টিমের কথাটা কোথায় যেন ঘেঁটে দিয়েছিল ওকে। মনটা কেমন বিস্বাদ হয়ে গিয়েছিল। মাঝে-মাঝে জীবন এমন একটা চোরাবালিতে নিয়ে আসে মানুষকে যে, সে কিছুতেই সেখান থেকে বেরোতে পারে না।
চলে আসার আগে ইজনা বলেছিল, “আর বাহাদুরি করতে যেয়ো না। অনেক হয়েছে।”
বুড়োদাদু বলেছিল, “আর বাহাদুরি! যখন দরকার ছিল, তখন বাহাদুরি আর দেখাতে পারলাম কই!”
সিমি এসে ধপ করে বসল এবার। ফোনটা হাতের ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে বলল,”জেঠু ফোন করেছিল। আরে, রাখতেই চায় না। কাল কে এক মন্ত্রীর ছেলেকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করেছে সেটা নিয়ে বলছিল। বলছিল, আমি যেন কাজ না রাখি। ছেলেটি নাকি আমার সঙ্গেই দেখা করতে আসছে মূলত। কী ঝামেলা বল তো! আমার বিয়ে দেবে নাকি! আরে, বিয়ে করলে আমি নিজেই করব! গগনকে পছন্দ আমার। কিন্তু আজ তো আমায় ‘না’ করে দেবে।
ইজনা হেসে ফেলল এবার। এ ভাবে কথার মধ্য দিয়ে সিমি আবার ফিরে গিয়েছে ওর নিজের জায়গায়।
দোকানের একটা ছেলে এসে ওদের শেষ হয়ে যাওয়া খাবারের প্লেটগুলো তুলে নিয়ে গেল।
ইজনা বলল, “আমি উঠব এবার। ছ’টা তো প্রায় বাজে। আমার পাড়ায় একটু কাজ আছে।”
সিমি যেন শুনলই না! বলল, “গগন ‘না’ করে দিলে আমি কী করব রে? সুইসাইড করব? ব্যথা লাগে না এমন কোনও সুইসাইডের মেথড জানিস তুই?”
ইজনা মাথা নাড়ল, “আমার তো এক্সপিরিয়েন্স নেই! কী করে বলব বল! তবে একটা কথা।”
সিমি আঙুল মটকাতে মটকাতে তাকাল ওর দিকে।
ইজনা বলল, “এই যে প্রেমে পড়ে খেপে উঠেছিস, এটা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবি তো? আমার গগনের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে হি লাইকস ইউ। কিন্তু তোকে ভরসা করতে পারছে না। বিশ্বাস করতে পারছে না। কষ্ট পেতে সবাই ভয় পায়।”
“ও যদি একবার হ্যাঁ বলে, তুই দেখিস আমি কোনও দিন ওকে ছেড়ে যাব না,” সিমি মাথা নাড়ল, “কিন্তু বলবে তো না, আমি জানি।”
“দিদি, আর কিছু দেব?” ওয়েটার ছেলেটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল।
ইজনা বুঝল এটা উঠে যাওয়ার ইঙ্গিত। বলল, “ভাই বিলটা?”
ছেলেটা বিল নিয়েই এসেছিল। এবার সেটা রাখল সামনে।
ইজনা ব্যাগ থেকে টাকাটা বের করে দিল। তার পর বলল, “চল। আমায় ট্রাম ধরতে হবে। গগনকে আমি যেটুকু জানি, ও তাড়াতাড়ি চলে এসেছে শিয়োর। চল।”
অগস্ট মাস। কেমন একটা ভ্যাপসা গরম হয়ে আছে চারিদিকটা। দু’দিন হল বৃষ্টি নেই। মাঝে মাঝে মেঘ করছে, কিন্তু বৃষ্টি না হয়েই কেটে যাচ্ছে সেই মেঘ। আকাশ কেমন যেন ছাইমাখা থালার মতো হয়ে আছে। ঘামে প্যাঁচপ্যাঁচ করছে শরীর। এখন আবার পাড়ার মিটিংয়ে যেতে হবে! বিরক্ত লাগছে ইজনার। বাড়ি গিয়ে স্নান করতে পারলে বেঁচে যেত! কিন্তু কিছু করার নেই।
ওদের পাড়াটা পুরনো। আর ইজনারা তো বহু দিনের বাসিন্দা! ওর প্রপিতামহের বিশাল বড় বাড়িতে থাকে ওরা। যদুনাথ রায়চৌধুরী এই অঞ্চলে খুব নামী মানুষ ছিলেন। এখনও পাড়ার বয়স্ক লোকজন তাঁর কথা বলে। বাড়িতে ছবি দেখেছে ইজনা। লম্বা-চওড়া মানুষ। রোমশ ভুরু। মোটা গোঁফ। দেখলেই ভয় লাগে!
কোনও কোনও মানুষ আছে, যাদের দেখলেই মনে হয় এরা কোনওদিন ছোট ছিল না! জন্মেছেই বাষট্টি বছর বয়স নিয়ে! যদুনাথের ছবি দেখে সেটাই মনে হয় ইজনার!
তবে সে যাই হোক, ওদের বাড়িটা জব্বর! কী বড় বড় ঘর! উঁচু সিলিং। প্রকাণ্ড জানলা। পুরনো সেগুন কাঠের আসবাব। চওড়া বারান্দা। পাড়ায় নতুন যারা আসে, তারা একবার না-একবার ঘুরে তাকাবেই।
রাখো বলত, “তোদের বাড়িটা আমাদের পাড়ার তাজমহল! তাই বলে তুই আবার মুমতাজ হয়ে যাস না! হাট্টিম ফুল কেস খেয়ে যাবে!
ওঃ, আবার হাট্টিম! নিজেকে চড়াতে ইচ্ছে করল ইজনার। ও দেখল, সিমি আবার ফোন বের করেছে। ফোন এসেছে আবার!
সিমি মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে একবার দেখে উত্তেজিত ভাবে বলল, “গগন!”
ইজনা হাসল শুধু।
সিমি কানে ফোনটা লাগিয়ে বলল, “বলো! কী? এসে গিয়েছ? আচ্ছা, ওই ভুট্টাওলার পাশে তো! আমি কাছেই আছি, আসছি।”
ফোনটা কেটে সিমি তাকাল ইজনার দিকে।
ইজনা বলল, “যা তুই। আমি কাটি। ওর সামনে যাব না। কেমন?”
সিমির চোখটা ছলছল করে উঠল হঠাৎ। ও হাত বাড়িয়ে ইজনার হাতটা ধরল। বরফের মতো ঠান্ডা হাত!
ইজনা হাসল, “আরে, সব ঠিক থাকবে। পাগলি কোথাকার!”
সিমি বলল, “তুই সেদিন ওর সঙ্গে কথা বলেছিলিস বলেই ও আজ এল। আমার তোর কাছে অনেক ঋণ!”
“নাইন্টিজ়ের বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমা হয়ে যাচ্ছে সিমি! এর পর আবার বন্ধু বন্ধু বলে গান ধরিস না!” ইজনা হেসে আর দাঁড়াল না। কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে ট্রাম ধরে নেবে।
.
পাড়ায় ঢুকেই গন্ধটা পেল ইজনা। ছাতিম ফুটেছে। পাড়ার হাওয়ায় তার পাতলা একটা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। ইজনা জানে শরৎ যত গভীর হবে, ছাতিমের গন্ধও তত গাঢ় হবে।
ক্লাবের সামনে পিন্টুদার স্ত্রী রিনাদিকে দেখল ইজনা। প্রায় পৌনে সাতটা বাজে। ট্রামের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়েছে ওর। আগে এলে বাড়ি থেকে চট করে স্নানটা করে আসতে পারত!
ওকে দেখে রিনাদি বলল, “কী কাণ্ড দ্যাখো তো তোমাদের দাদার। পাড়ার সবাইকে নাকি মিটিংয়ে থাকতে হবে। কারও যেন কোনও কাজ নেই!”
রিনাদির একটা ছোট কসমেটিক্সের দোকান আছে শ্যামবাজারে। আর পিন্টুদার আছে একটা রোলের দোকান। সেখানে পিন্টুদা খুব একটা যায় না। একটা ছেলে আছে, সেই চালায়। আর রোলের দোকানটা রিনাদির দোকানের পাশে বলে রিনাদিকেই দেখাশোনো করতে হয়।
পিন্টুদার ধ্যানজ্ঞান হল ক্রিকেট। পাড়ায় একটা ক্লাবও করেছে ক্রিকেটের। সবাইকে ধরে ধরে এনে মেম্বার করে। কেউ কোনও চাঁদা- টাদা দেয় না। যা খরচ পিন্টুদা নিজেই করে। আর কেউ কিছু ভুলভাল করলেই তাকে ক্লাবের লেটারহেডে শো-কজ়ের চিঠি ধরায়। সবাই এই নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু পিন্টুদার কোনও হুঁশ নেই, সারাক্ষণ একটা লোক এই লেভেলে কী করে সিরিয়াস থাকে কে জানে!
ক্লাবটা খুব পুরনো। ক্লাবের পাশে একটা ছোট্ট ফাঁকা জমি আছে। সেখানে শীতকালে কোর্ট কেটে ব্যাডমিন্টন খেলা হয়। জমিটার এক পাশে বুড়োদাদুর বাড়ি ঘেঁষে বড় একটা ছাতিম গাছও রয়েছে। এর ফুলের গন্ধই পাওয়া যাচ্ছে এখন।
ক্লাবঘরের পাশের ওই জায়গাটাতেই সবাই এসে জড়ো হয়েছে আজ। ভিড়ের মধ্যে এক পাশে হাট্টিমকেও দেখতে পেল ইজনা। ও কিছু বলল না। রিনাদির সঙ্গে গিয়ে ছাতিম গাছের নীচে দাঁড়াল।
ওকে দেখতে পেয়ে হাট্টিমের পাশ থেকে রাখো এগিয়ে এল এবার। বলল, “তুই এসে গিয়েছিস! ও রিনাদি, তুমিও আছো! তোমার বরের কেসটা কী বলো তো? সকলেকে এনে ভিড় করেছে! দাবিটা কী? আমাকে বলল সবাইকে খবর দিতে। এদিকে আমাকেও বলেনি কেন এই মিটিং। নিজের তো কাজকম্ম কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমাদেরও কি নেই! বাবা হেভি খিস্তি করেছে দোকান ছেড়ে এসেছি বলে। কী কেলো!”
রাখো যে কী সব বলে! ইজনা অন্য দিকে মুখ ঘোরাল। আর সঙ্গে সঙ্গে এক জোড়া চোখে চোখ পড়ল ওর। সামান্য হলেও কেঁপে গেল ইজনা। ও দেখল ভিড়ের মধ্যে দূর থেকে হাট্টিম ওকেই দেখছিল, কিন্তু চোখে চোখ পড়ামাত্র মাথা ঘুরিয়ে নিল। চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল ইজনা। মনে মনে বলল, ‘শয়তান একটা!”
“সবাই মোটামুটি এসে গিয়েছে! আমি তা হলে বলি?”
জমিটার এক পাশে একটা শহিদ বেদি ছিল। কার কে জানে! সেটা বহু দিন হল ভেঙে গিয়েছে, কিন্তু জায়গাটায় সিঁড়ির ধাপের মতো উঁচু একটা অংশ আছে।
পিন্টুদা বেঁটে মানুষ। বড়জোর পাঁচ ফুট। তাই সবাই যাতে ওকে দেখতে পায়, তাই পিন্টুদা সটান সেই ভাঙা বেদির ওপর উঠে বুকের কাছে আড়াআড়িভাবে হাত জড়ো করে দাঁড়াল। তার পর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি জাস্ট পাঁচ মিনিট নেব। একটা ঘোষণা করার আছে। চুরির পরের দিন সকালে বুড়োদাদুর কাছে আমরা গিয়েছিলাম সবাই। মনে আছে তো, উনি কী বলেছিলেন?”
ইজনা দেখল, সবার মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল।
মাদুলি বলল, “আছে আছে। কেন মনে থাকবে না?
রাখো চিৎকার করল, “আপনি আবার কথা বলছেন? গেছিলেন সেদিন ওই জায়গায়? আবার পাঠাব?”
মাদুলি হাত তুলে চোখ বন্ধ করে বলল, “আঃ, ও সব আবার কেন? ও সব আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।”
পিন্টুদা রাখোকে ধমক দিল, “তুই চুপ করবি রাখো? যা বলছি সেটা বল। আপনারাও বলুন, মনে আছে তো?”
এবার পাতাদা বলল, “বুড়োদাদু দুর্গাপুজো করতে চেয়েছেন পাড়ায়। তাই তো?”
“হ্যাঁ,” পিন্টুদা মাথা নাড়ল, “উনি আমাদের পাড়ার পুরনো মানুষ। মাঝে ছিলেন না বহু বছর, কিন্তু পুরনো তো! তাই উনি যখন চেয়েছেন, তখন আমি ভাবছি আমরা এবার পুজো করব। তা ছাড়া মিতালি সঙ্ঘও আমাদের যা অপমান করল! ওদের কমিটি থেকে তাড়িয়ে দিল। তাই এই দুই-এ মিলে কিছু একটা করতেই হবে। না, নমো নমো করে নয় কিন্তু, ভাল করে করব। আমাদেরও একটা মানসম্মান আছে।”
“ফালতু বাড় খেয়ো না পিন্টুদা,” পাতাদা বলল, “দাদুর বয়স হয়েছে। এত কিছু জানেন না। তাই বলেছেন। এ সব অত সিরিয়াসলি নেওয়ার কী আছে! টাকা কে দেবে! পাঁচ-ছ’ লাখ টাকার ব্যাপার! চাট্টিখানি কথা নয়!”
ইজনা দেখল পাতাদার কথায় সারা মাঠে একটা গুঞ্জন উঠল। ইজনা বুঝল, পুজোতে আপত্তি নেই কারও, কিন্তু টাকাটা যে অনেক। শুধু চাঁদা তোলায় হবে না।
“তুই কী বলিস ইজনা?” পাতাদা জিজ্ঞেস করল।
ইজনা সামান্য চমকাল। ওকে আবার কেন জিজ্ঞেস করছে! এ সবে জড়াতে ইচ্ছে করে না ওর! তা-ও বলল, “অনেক টাকার ব্যাপার! সেটাই চিন্তার।”
পিন্টুদা বলল, “সবাই চেষ্টা করলে হবে না? আমাদের পাড়ায় কোনও দিন পুজো হয়নি। এবার হোক না! সবাই নেগেটিভ হয়ে গেলে হবে না কিন্তু! আর কেউ না করলে আমি করব পুজো। যেভাবেই হোক। কী বল রাখো?”
“এই খেয়েছে!” রাখো ঘাবড়ে গেল, “আমায় নিয়ে আবার টানাটানি কেন বাবা? আমি বলে নানা দিক দিয়ে কেস খেয়ে বসে আছি। আমি কী বলব! পুজো বলতে আমি পেটপুজো বুঝি।”
পিন্টুদা বিরক্ত হল, “পাড়ার সেই স্পিরিটটাই নেই কারও? একজন বয়স্ক মানুষ বলেছেন। কথা দিয়েছি আমি। মিলন সমিতি এত অপমান করে আমাদের তাড়িয়ে দিল, আর সবাই আপনারা পিঠ বাঁচাচ্ছেন!”
মাদুলি বলল, “ঠিক আছে হোক। আমি না-হয় একশো পঁচাত্তর টাকা চাঁদা দেব।”
“একশো পঁচাত্তর টাকা! আবার তুই ভাটের কথা বলছিস? এই ভুলু, তুই কোথায়!” রাখো আপনি থেকে তুই-তে নেমে এল এবার!
ইজনা দেখল বাকিদের গুঞ্জন আরও জোরালো হল এবার।
“ঠিক আছে হবে পুজো। পিন্টুদা, আমি আছি তোমার সঙ্গে।”
ইজনা গলাটা পেয়ে মাথা নাড়ল নিজের মনে। ভিড়ের পেছন থেকে হাট্টিম বলেছে কথাটা। ছেলেটার সবেতেই বাহাদুরি! কোথা থেকে জোগাড় করবে ও অত টাকা! খেলে যা জমিয়েছিল, সব তো বাজে খরচ করে উড়িয়েছে।
জমায়েতের সবাই ঘুরে তাকাল হাট্টিমের দিকে।
রাখো চাপা গলায় বলল, “ইজনা, মালটা তোকে দেখে বাড় খেয়ে গিয়েছে! তাই এসব বলছে। তুই বেকার কেন যে ওকে ছাড়লি কে জানে! দেখছিস তো, ব্যাটা টোটাল টালটি-বালটি হয়ে গিয়েছে। ও নিজে তো ডুববেই সঙ্গে পাড়ার মানসম্মানও ডোবাবে। ও নাকি পুজো করবে! কিছু পুজো করবে না! ও একটা চিটিংবাজ।”
