প্রথম অধ্যায়
১৯৪২
উত্তর কলকাতার কোনও এক পাড়ায় …
সতু
“দাদা, তুই পরি দেখেছিস? আমাদের পাড়ায় পরি আছে, জানিস! ওই ও-পাশের ছাদে এসে দাঁড়ায় রোজ ভোরবেলা। রোদ্দুরে চুল খুলে দেয়। নীল পাথরে বাঁধানো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী ভেবে কে জানে, একা একা নিজের মনে হাসে। তার পর নীচের উঠোনে নেমে আসে। উঠোনের মাঝখানে রাখা তুলসী মঞ্চে জল দেয়। পাড়ার ভুলোকে বিস্কুট ভেঙে দেয় চারটে। লাল রোয়াকে বসে থাকা গোপুজ্যাঠার হাত থেকে কাঁচি সিগারেট নিয়ে ফেলে দেয় নর্দমার জলে। তার পর রাস্তার ও-পাশের পুটেদার কচুরির দোকানে যায়। এক চ্যাঙারি কচুরি কিনে দেয় বৈষ্ণবদাদুকে। অবশ্য রোজ কচুরি দেয় না। কোনও কোনও দিন পরোটাও দেয়। তার পর আবার ফিরে আসে। তিন তলায় উঠে দালানের টিয়াপাখিটাকে খাবার দেয়। খাঁচাটা ধরে দোলায় একটু, তার পর ঘরে গিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে। আচ্ছা দাদা, পরির ডানা কোথায় বল তো! নাকি ওই লাল শাড়ির আঁচলের নীচে লুকিয়ে রেখেছে নিজের ডানা! ভাব, আমাদের পাড়ায় পরি আছে আর সেটাই কেউ কোনও দিন দেখেনি। কেন বল তো? আচ্ছা দাদা, তুইও কি দেখিসনি? কোন দিকে মন থাকে তোর?”
অমরের গলায় যেন সামান্য বিরক্তি! সতু তাকাল ভাইয়ের দিকে। এই বারান্দায় রাখা চেয়ারটায় মাঝে-মাঝে বসে থাকে অমর। ভাল দেখতে পায় না চোখে। হাই পাওয়ারের চশমাটা যেন বোতলের নীচের মোটা কাচের তৈরি! সেটা দিয়েই অল্প-অল্প দেখে। ডাক্তার বলছেন, দিনকে দিন চোখের দৃষ্টি নাকি কমতেই থাকবে ওর। কী এক নার্ভ শুকিয়ে যাচ্ছে। এর কোনও চিকিৎসা নেই।
তাও সে সব নিয়ে অমরের ভ্রুক্ষেপ নেই। সারা দিন ক্রমাগত এ সব বলে যায় অমর। আর এমন করে বলে, যেন সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। যেন ওর সামনেই ঘটে চলেছে সব।
ভাইয়ের জন্য কষ্ট হয় সতুর। অমরের যে শুধু চোখের সমস্যা আছে তা নয়, ওর মনটাও আর-পাঁচজন তেরো বছরের ছেলের মতো নয়। পাড়ার লোকেরা কেউ আড়ালে বা কেউ সামনেই ওকে পাগল বলে। কেউ-কেউ খেপায়ও। কী যে খারাপ লাগে সতুর! হ্যাঁ, অমরের মন আর ওর চিন্তাভাবনাগুলো আলাদা। তা বলে এ ভাবে পাগল বলে ওকে হেয় করার কী মানে! অন্যের কষ্টের জায়গায় হাত দিয়ে যারা আনন্দ পায়, তারা কি আদৌ মানুষ!
কলকাতা শহরটাকে সতুর খুব একটা ভাল লাগে না। বছর দুয়েক হল গ্রাম থেকে এসেছে এখানে। কিন্তু এখনও মেনে নিতে পারছে না শহরটাকে!
এখানে বড্ড ভিড়। লোকজন সারাক্ষণ ব্যস্ত। এ ওকে যেন পায়ের তলায় চাপা দিয়ে মেরে এগিয়ে যেতে চায়। সবাই কেমন নিষ্ঠুর। অন্যের কষ্ট বোঝে না। যার যেখানে দুর্বলতা, সেখানেই যেন তাকে খুঁচিয়ে আনন্দ পায়। এই যে ও চাঁদপুর থেকে এসেছে, ওকে তো সারাক্ষণ ‘বাঙাল বাঙাল’ বলে খোঁটা শুনতে হয়। সতু চেষ্টা করে এ সব পাত্তা না দিতে। কথার বাঙাল-ভাব কাটিয়ে ফেলতে। কিন্তু মন খারাপ কি লাগে না!
সতু উঠল। আজ রবিবার। স্কুল ছুটি। বাবা আজ বাড়িতে নেই। ভোরবেলা বেলঘরিয়া গিয়েছে। তাই ওকেই বাজার যেতে হবে। আর বাজার করে এসে পড়তেও বসতে হবে। পড়াশোনায় একদম ঢিলে দেবে না ও। সামনের বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা ওর। বাবা বলেছে, ভালভাবে পাশ করতে পারলে আরও পড়াবে। আর, খারাপ ফল করলে নিজের মতোই কাশীপুরের কারখানায় কাজে ঢুকিয়ে দেবে।
কারখানায় কাজ করবে না সতু। ও পড়তে চায়। আর চায় ফুটবল খেলতে। বড় ক্লাবের ক্যাপ্টেন সোমানার মতো গোল করতে। এখনই নানান ছোটখাটো টুর্নামেন্টে পাড়ার ভারতী সঙ্ঘের হয়ে ও খেলতে যায়। এই কালকেই তো ম্যাচ আছে টিটাগড়ে। ওখানে প্রভারানি স্মৃতি চ্যালেঞ্জ শিল্ড হচ্ছে। তার সেমিফাইনালে উঠেছে ওদের ক্লাব! ক্লাবের সেক্রেটারি হরেনদা বলেছে, যদি ফাইনালে জিততে পারে, সবাইকে দুটো টাকা করে দেবে, সঙ্গে একজোড়া করে অ্যাঙ্কলেট। সতুর ইচ্ছে হয়, ও যদি আরও বড় হয়ে কলকাতার বড় ক্লাবে খেলতে পারে….
হরেনদা বলে, “নিশ্চয়ই পারবি তুই। কিন্তু মন দিয়ে খেলতে হবে তার জন্য। তোর ফার্স্ট টাচটা বেশি বড় হয়ে যায়। সেটা ঠিক করিস। আর তার সঙ্গে কিন্তু পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে হবে। এটা ভুলবি না। শিক্ষার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই!”
হরেনদার কথা মন দিয়ে শোনে সতু। হরেনদা মানে হরেন নাগ, যে-সে লোক নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে জেলে ছিল এক সময়। সেখানে পুলিশরা খুব মেরেছে হরেনদাকে। একটা পা খোঁড়া করে দিয়েছে। হরেনদা ক্রাচ নিয়ে হাঁটে এখন। চোখে গোল শেল-ফ্রেমের চশমা পরে। দেখলেই বোঝা যায় লোকটার মধ্যে একটা জোর আছে!
কাছের পোড়া বস্তির বখাটে কিছু ছেলে হরেনদাকে দেখলেই, ‘ঘোড়া ল্যাং ল্যাং ল্যাং’ বলে চিৎকার করে। হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে।
এত খারাপ লাগে সতুর! ওর অমরের কথা মনে পড়ে। এক দিন তো লাঠি নিয়ে ছেলেগুলোকে তাড়া করেছিল সতু। একটাকে পেয়েও গিয়েছিল বাগে। আরে বাবা, রাইট আউটে খেলে ও। বল নিয়ে যখন দৌড়য়, কেউ ধরতে পারে না ওকে। সেখানে এই বাচ্চাগুলো ওর সঙ্গে দৌড়ে পারবে নাকি!
আর, ধরে ফেলে কয়েক ঘা দিয়েওছিল আচ্ছা করে। কিন্তু হরেনদা এসে ছাড়িয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, “এমন করতে নেই। ওরা বলে আনন্দ পায়, পাক না। আমার খারাপ লাগে না। তুই মাথা গরম করিস বড্ড। বাঙালরা এত গোঁয়ার কেন হয় বল তো!”
“তোমাকে ওরা এমন কেন বলবে?” সতু রাগে ফুঁসছিল।
হরেনদা হেসে বলেছিল, “রাগ করলেই জানবি তুই হেরে গেলি। রাগ বুদ্ধিকে ঘোলাটে করে দেয়। নষ্ট করে দেয়। রাগ করিস না। সব ঠিক আছে।”
সব কি সত্যিই ঠিক আছে! তা হলে আজকাল সারাক্ষণ কেন এমন খারাপ লাগে! মনে হয়, সব হয়েও যেন কিছু হচ্ছে না। খেয়ে সুখ নেই। ঘুমিয়ে শান্তি নেই। গোল করেও সেই আগের মতো আনন্দ নেই। মানে খুব ছোট্ট একটা কাঁটা যেন বুকের একদম ভেতরে ঢুকে বসে আছে। মানে এতই ছোট্ট সেই কাঁটা যে, তাকে হাত দিয়ে তোলা যায় না। সন্না দিয়ে ধরা যায় না। কিছুতেই বের করা যায় না। সে শুধু সারা দিন খচখচ করে আর জানান দেয়। বলে, তুমি অসহায়। তোমাকে কষ্ট পেতেই হবে।
নশাকে এই নিয়ে গত কাল বলছিল সতু। নশা, মানে বগলা পাল ভারতী সঙ্ঘের লেফট ইন-সাইড। সতুর সঙ্গে এক ক্লাসেই পড়ে। আর ওর প্রাণের বন্ধু।
নশা আর সতু গঙ্গার ঘাটে গিয়েছিল গত কাল। সেখানে বসেই নশাকে ও বলছিল ওর কষ্টের কথা।
নশা পাকা ছেলে। এই বয়সেই বিড়ি খায়। গন্ধটা অসহ্য লাগে সতুর। কত বার ও নশাকে বলেছে, এ সব যেন না করে। কিন্তু নশা শোনেই না।
গত কালও বিড়ি ধরিয়ে নশা চুপচাপ শুনছিল ওর কথা। তার পর বিজ্ঞের মতো বলেছিল, “প্রেমে পড়েছিস, তাই এমন খারাপ হাল তোর! প্রমথেশ বড়ুয়ার ছবিতে এমন হয়। প্রেমে পড়লেই সবার হাল খারাপ হয়ে যায়। আর তুই তো বাঙাল ভূত। তোর তো কলকাতার মেয়ে দেখলে মাথা ঘুরবেই। যে দিকে মন দিলে কাজে দেবে, সে দিকে মন না দিয়ে বামন হয়ে চাঁদে সিঁড়ি লাগাতে গিয়েছিস। শোন, এই বয়সে শরীরে অনেক কিছু জমে। সে সব মাঝে-মাঝে বের করে দিবি। ওই সব প্রেম- ফেম আর মনে আসবে না। তেমন হলে পুতলির কাছে নিয়ে যাব। এক ঘণ্টা থাকবি। প্রেম বের করে চলে আসবি।”
সতু বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “তোকে কোনও কথা বলাই অন্যায়! নিজে যেমন, সারা পৃথিবীকে তেমনই ভাবিস।”
নশা হেসে বলেছিল, “শোন সতু, সারা পৃথিবীই ওই রকম। আর যেটা হবে না, সেটা নিয়ে ভাবিস না। তোদের বাড়ির উল্টোদিকে সৌদামিনী থাকে। তুই রাস্তায় বেরোলেই জানলায় এসে দাঁড়ায়। মনে নেই, তোর জন্য আমার হাত দিয়ে কুলের আচার পাঠিয়েছিল? সে সব না দেখে তুই গিয়েছিস ওই দিকে! শালা, তোকে লাথি মেরে জলে ফেলে দেব! হরেন মালটার সঙ্গে মিশে তুইও দরকচা মেরে গিয়েছিস।”
কেন কে জানে হরেনদাকে সহ্য করতে পারে না নশা। বলে, “তোর মতো আমার অত ভক্তি নেই। দেখিস না, আমায় দেখলেই কেমন জ্ঞান দেয়! জ্ঞানদা আমার!”
সতু সেদিন নদীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তুই আমার বন্ধু। তোকে কষ্টের কথা বললাম। আর সেখানে তুই এ সব বলছিস!”
নশা বিড়িটা শেষ করে পকেট থেকে একটা ছোট্ট চৌকো ডিবে বের করে তার উপর আঙুল ঠুকে বলেছিল, “ভালর জন্যই বলছি। তোর চেয়ে পাঁচ-ছ’বছরের বড়। সেখানে তুই প্রেমে পড়েছিস। পাগল নাকি! কুসুমদি জানলে কী ভাববে বল তো!”
সতু মাথা নিচু করে নিয়েছিল। বয়সটা যে একটা ব্যাপার, সেটা ও জানে। কিন্তু কী করবে সতু! প্রেম তো অত জন্ম সাল-টাল বোঝে না। রোদ, বৃষ্টি, হাওয়ার মতোই স্বাভাবিক সে।
নশা ডিবে খুলে এক টিপ নস্যি বের করে দু’আঙুলে ধরে বলেছিল, “যা বলছি শোন। সৌদামিনীর দিকে মন দে। এখনও কুঁড়ি আছে, কয়েক বছরেই ফুটবে। তখন দেখবি কত মালি চলে এসেছে তোলার জন্য। তুই আগে থাকতে বুক করে রাখ।”
সতু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই নস্যি নিচ্ছিস?”
“ট্রাই করছি,” নশা বলেছিল, “বড় হতে গেলে সব দিক থেকে হতে হয়। বুঝেছিস! কুসুমদিকে মন থেকে মুছে ফেল। আগেও বলেছি, এখনও বলছি, ও তোর জন্য নয়।”
তোর জন্য নয়। তোর জন্য নয়। এই কথাটাই আজকাল সারাক্ষণ ছোট্ট কাঁটার মতো বুকে বিঁধে থাকে ওর। কুসুমদিকে ছাড়া ক্রমে-ক্রমে এই জীবন অর্থহীন মনে হয় ওর।
আজ এই যে অমর পরির কথা বলল, আসলে তো কুসুমদির কথাই বলল ও। কুসুমদি ছাড়া পরি আর কে হতে পারে!
সতুর বাবা অনেক আগেই কলকাতায় এসেছিল চাকরি নিয়ে। কিন্তু বছর দুয়েক হল সতুদের দুই ভাই আর মাকে উত্তর কলকাতার এই পাড়ায় বাড়ি ভাড়া করে নিয়ে এসেছে।
কুসুমদির বাবা, যদুনাথ রায়চৌধুরীর এই বাড়িটা বিশাল। তিন তলায় যদুজ্যাঠারা সপরিবার থাকেন। আর নীচের দুটো তলা ভাড়া দিয়েছেন। এখানেই দোতলার দুটো ঘরে থাকে সতুরা। বারান্দার এক পাশে ছোট্ট কাঠের পার্টিশনে রান্না করে। আর বারোয়ারি বাথরুম ব্যবহার করে সবাই।
যদুজ্যাঠার পাঁচ ছেলে আর এক মেয়ে। এই মেয়েই কুসুমদি। ভাল নাম সপ্তপর্ণী। কিন্তু সবাই কুসুম বলেই ডাকে।
কুসুমদি দাদাদের চেয়ে অনেকটাই ছোট। পাঁচ ভাইয়ের চার জন কলকাতার বাইরে থাকে। শুধু ছোট ছেলে তারক আর কুসুম এই বাড়িতেই থাকে। যদিও তারকের টিকি পাওয়া ভার। সারা দিন টইটই করছে।
এই বয়সে বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু কুসুমের হয়নি। আসলে দিনকাল পাল্টাচ্ছে। তার সঙ্গে যদুজ্যাঠা মেয়েকে পড়াতেও চান। তাই এখনও বিয়ে দেননি।
যদুজ্যাঠা বলেন, “জানবে, মেয়েরাই দেশের অগ্রগতির ধারক। ছেলেগুলো সব মাথামোটা আর ঝগড়ুটে। দেখছ না, না হলে এমন ধুন্ধুমার যুদ্ধ লাগায়!”
যদুনাথকে জেঠু আর তাঁর স্ত্রীকে জেঠিমা বলে সতু। ওঁদের বাড়িতে যায়। এটা-সেটা কাজও করে দেয়। তবে কুসুমদি ছাড়া ওকে বিশেষ কেউ পাত্তা দেয় না।
দু’বছর আগে যখন ও প্রথম দেখেছিল কুসুমদিকে, সতু এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, কথা বলতে পারেনি প্রথমে। অমর যেহেতু রাখঢাক না রেখেই কথা বলে, তাই বলেছিল, “তুমি তো পরি গো! আমি চোখে ভাল দেখতে পাই না। তাও বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। আচ্ছা, আমার চোখ ভাল হয়ে গেলে তুমি আমায় বিয়ে করবে?”
সবার সামনে লজ্জায় বাবা মায়ের মাথা কাটা গিয়েছিল। বাবা তো একটা চড়ই কষিয়ে দিয়েছিল অমরকে। কুসুমদিই আটকেছিল। বলেছিল, “কাকাবাবু, ওকে মারবেন না। ও কি আর বুঝে বলেছে!”
সেই থেকে কুসুমদিকে পরি বলেই ডাকে অমর। এই এক বছরে ওর চোখের দৃষ্টি অনেক কমে গিয়েছে, তাও সকালবেলা ওদের ঘরে সামনের এক চিলতে বারান্দায় বসে অমর নিজের কল্পনার কথা বলেই যায়। ও মোটামুটি জানে কে কখন কী করে। আর সে সবই গড়গড় করে বলে।
বিছানা থেকে উঠে দাঁত মেজে বাথরুম থেকে ঘুরে এল সতু। সাড়ে সাতটা বাজে। রবিবার এমনিতেই ভিড় হয় বাজারে। তাড়াতাড়ি যেতে না পারলে মুশকিল।
হাফ প্যান্টটা ছেড়ে পাজামা আর শার্ট পরে নিল সতু। মা পাশের ঘরে আছে। টাকা আর বাজারের থলেটা নিতে হবে।
ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এল ও, আর তখনই ডাকটা শুনল, “সতু, একটু উপরে আসবি?”
কুসুমদি! সতুর গায়ে কাঁটা দিল যেন! আজ সকাল-সকাল ডাকছে।
অমর বলল, “যা, পরি ডাকছে। আমার বিয়ের কথাটা বলেই দিস আজকে। এই চোখ তো আর ঠিক হবে না। তাই বিয়েটা করে নিলেই হয়!”
সতু অমরের মাথার চুলটা ঘেঁটে দিল। তার পর সামান্য দৌড়েই তিন তলার সিঁড়িতে উঠে গেল।
কুসুমদি দাঁড়িয়ে আছে টিয়াপাখির খাঁচার সামনে। রোদ এসে পড়েছে কুসুমদির মুখে। ঘাড়ের কাছে আলতো ভেঙে পড়েছে খোঁপা। অন্যমনস্ক চুল এসে পড়েছে কপালে, গালের উপর। থুতনির বাদামি তিলটা এই রোদে কেমন যেন স্বচ্ছ লাগছে। পাতলা নাকের পাটা, গোলাপি। কাগজফুল রঙের ছোট্ট ঠোঁট। ঠোঁটের ওপর উড়ন্ত পাখির মতো খাঁজ। আর আকাশ-জোড়া দুটো চোখ।
সতুর মনে হল পায়ের তলায় মাটি নেই ওর! মনে হল এমন সুন্দরের সামনে কোনও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। উচিতও নয়। ও মাথা নামিয়ে নিল।
কুসুমদি এগিয়ে এল ওর দিকে। কেমন যেন কপূর আর চন্দন মেশানো গন্ধ পেল সতু। ও বুঝতে পারল এ আসলে ওর সর্বনাশের গন্ধ!
“কী রে? মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আমি কি তোর স্কুলের স্যার নাকি?” কুসুমদি হাসল।
সতু চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল। কুসুমদির গা থেকে কি ভাপ বেরোচ্ছে! এমন লাগছে কেন ওর! না, নিজেকে ঠিক রাখতেই হবে। এ সব কী করছে ও!
হরেনদা বলে, “মেয়েদের দেখে কুচিন্তা হলে তাদের পায়ের পাতার দিকে তাকাবি। মন ঠিক হয়ে যাবে।”
সতুর কুচিন্তা আসেনি। কিন্তু তাও কুসুমদির পায়ের পাতার দিকে তাকাল ও। ফর্সা মাখনের মতো পাতলা পা। গোলাপি নখ। কী সুন্দর আর পরিষ্কার!
সতু চোখ বন্ধ করে নিল। এখানে জলে কুমির ডাঙায় বাঘ! ওকে না বধ করে ছাড়বে না।
“শোন না, আমার একটা কাজ করে দিবি?” কুসুমদি আলতো করে জিজ্ঞেস করল।
একটা কাজ! মাত্র একটা কাজ! সতুর মনে হল, কী করতে হবে বলো না? ইডেন গার্ডেনের ঘাস কেটে দিতে হবে? মনুমেন্টকে রাস্তার শুইয়ে রং করে দিতে হবে? গঙ্গার উপরের নতুন ব্রিজটাকে কাঁধে করে কুমোরটুলির বিশুদার চায়ের দোকানের পাশে আনতে হবে? নাকি এক ডুবে সমুদ্রের তলার সবচেয়ে বড় ঝিনুক থেকে ফুটবল সাইজ়ের মুক্তো তুলে আনতে হবে? কী করতে হবে তুমি শুধু একবার বলো কুসুমদি!
“কী রে, করে দিবি?” কুসুমদি আবার জিজ্ঞেস করল।
আজ নিজেকে রাজা-বাদশার মতো মনে হল সতুর। এমন গলায় ওকে অনুরোধ করছে কুসুমদি! সত্যি! ঠিক আছে, মনে মনে কুসুমদিকে বাকিংহাম প্যালেসটা দিয়ে দিল সতু, কিন্তু মুখে নরম গলায় বলল, “হ্যাঁ, বলো।”
“আমায় একটা ভাল কলম কিনে এনে দিবি? মানে, একটু দামি। এক বান্ধবীর জন্মদিন। তাকে দেব। মানে, বিকেলে গিয়ে যদি কিনে আনিস। মা আজ বাইরে যেতে দিচ্ছে না। দিবি রে?”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই,” সতু মাথা নাড়ল, “কখন আসব বলো?”
“এই ধর, সাড়ে চারটে। কাল থেকে আসলে রাস্তায় একটু গোলমাল হতে পারে তো! তাই আজ যদি আনিস ভাল হয়,” কুসুমদি বলল।
“কী গোলমাল?” সতু অবাক হল।
“সে কী! তুই জানিস না!” কুসুমদি অবাক হল, “আরে, কাল থেকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হবে বলে শুনছি। গাঁধীজি ঘোষণা করবেন। মা বলেছে কয়েক দিন আমায় কলেজ যেতে দেবে না!”
সতু মাথা নাড়ল। বলল, “সে ঠিক আছে, তুমি আমায় টাকা দিয়ো, আমি আজই এনে দেব! কেমন চাই বলো, সে রকম এনে দেব! ধর্মতলায় ভাল-ভাল দোকান আছে।”
“ঠিক আছে!” কুসুমদি বলল, “আর-একটা কথা, তোরা কি এবারও পুজোয় গ্রামে যাবি, না এখানেই থাকবি?”
সতু অবাক হল, “কেন? আমি ঠিক জানি না গো!”
“আরে, এটাই তো আসল খবর। আমার যা আনন্দ হচ্ছে না রে! এবার আমাদের পাড়ায় দুর্গাপুজো হবে! পনেরোই অক্টোবর ষষ্ঠী, জানিস তো! সেপ্টেম্বর থেকেই প্যান্ডেল শুরু হবে। বাবা বলল। পাড়ার মুরুব্বিদের সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছে। বাবা-ই মূল টাকাটা দেবে। ভাব একবার, পুজো হবে। এই প্রথম আমাদের পাড়ার পুজো!” কুসুমদি উত্তজনায় হাতটা চেপে ধরল সতুর, “তোর হচ্ছে না আনন্দ!”
ঠান্ডা, নরম হাত। কপূর-চন্দনের গন্ধ। কুসুমদি ওর এত কাছে দাঁড়িয়ে! আনন্দ হবে কী, সতুর যে শ্বাস বুজে আসছে! ও যে এখনও বেঁচে আছে এটাই তো অনেক!
এক
এখন
উত্তর কলকাতার সেই পাড়ায়…
হাট্টিম
শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের মুখটায় আজ বিশাল জ্যাম। কী হয়েছে কে জানে! হাট্টিম বিরক্ত হয়ে ঘড়ি দেখল। সাড়ে পাঁচটা বেজে গিয়েছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখানে এমন ভিড় হলে এগোবে কী করে! ভাগ্যিস বাইকটা সূর্য সেন স্ট্রিটের ওখানে পার্ক করে রেখেছে! না হলে এই ভিড়ে বাইক নিয়ে ঢুকলে পুরো আটকে যেত। পাড়ার ক্লাবে একটা ক্যারম টুর্নামেন্ট চলছে। আজ তার সেমি-ফাইনাল। হাট্টিম উঠেছে। সাতটা থেকে শুরু হবে খেলা। দেরি হলে ফালতু কথা শুনতে হবে।
সামনে দুটো ঠেলা আর একটা ট্যাক্সি সব গিঁট পাকিয়ে রেখেছে। তার মধ্যে একটা বাইকে তিনটে ছেলে উল্টে পড়ে আছে। ফলে ঝগড়া বেঁধেছে। আর আশপাশ থেকে লোকজনও ভিড় করে সেই নাটক দেখছে।
বিরক্ত লাগে হাট্টিমের। লোকজনের কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই! আরে বাবা, তোরা একাই কাজে বেরিয়েছিস না কি? বাকিদের কাজকম্ম নেই?
হাট্টিম এগিয়ে দেখল আর-একবার। কিন্তু না, সুচ গলার জায়গা নেই! এ তো মহা মুশকিল!
পাশে তাকিয়ে ও বলল, “কী করি বল তো! মেজোমামির বইগুলো না নিয়ে বাড়ি গেলে গালি খাব।”
রাখো বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়ল, “গালি নয়, তোকে জুতোপেটা করা উচিত! আজ খেলা আর আজকেও কাজ রেখেছিস! কাল আনবি বললে হত না!”
“আসলে মনে ছিল না সকালে। তাই মামি যখন বলল বইগুলো নিয়ে আসতে, আমি হ্যাঁ বলে দিয়েছি। দুপুরে খেয়াল হল, আজ সেমি ফাইনাল আছে।”
“তোর মনেটা কী থাকে শুনি!” রাখো সামান্য তুতলে বলল, “শালা, চিটিংবাজ! কিছুই মনে থাকে না। শুধু মেয়েবাজি করতে দাও, তখন সব মনে থাকে। কিচ্ছু নেই তোর। নে, এখন আমাকেও ভুগতে হবে।”
হাট্টিম অনেক কষ্টে হাসি চাপল। রাখো কথায় কথায় ‘কিচ্ছু নেই’ বলে! ছেলেটা ওর স্কুল-জীবনের বন্ধু। এক পাড়াতেই থাকে। ওদের একটা মোবাইল ফোনের দোকান আছে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে। সেখানে ওর দুই দাদার সঙ্গে ও নিজেও বসে। ছেলেটা সামান্য তোতলা। রাগী। কিন্তু মন খুব ভাল। আর পৃথিবীর সব কিছুর জন্য ওর মনে হয় হাট্টিম দায়ী।
হাট্টিমরা আগে থাকত ব্যারাকপুরে। কিন্তু হাট্টিম যখন ক্লাস নাইনে ওঠে, তখন নর্থ কলকাতার এই পাড়ায় এসে ওঠে সবাই।
হাট্টিমের মা নেই। মারা গিয়েছে সেই ক্লাস থ্রি-র সময়ে। তার পর থেকে ও মামার বাড়িতেই মানুষ। মা মারা যাওয়ার কিছু পরেই বাবা আবার বিয়ে করেছিল। তার পর চলে গিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ব্রিসবেনে থাকে এখন। মাঝে-মাঝে ফোন করে বাবা। বাবার দ্বিতীয় পক্ষের দুই মেয়ে আছে। তারাও ফোন করে। যেতেও বলে হাট্টিমকে। কিন্তু হাট্টিমের আর যাওয়া হয় না। ইচ্ছে করে না। সেই আট-ন’বছর বয়স থেকে এই তেত্রিশ-চৌত্রিশ! এর মাঝে বাবাকে দু’বার দেখেছে ও! তাই বাবা ব্যাপারটা অনেকটা স্টিকারের মতো ওর কাছে। মানে, ওই আছে আর কী, কিন্তু তার বেশি কিছু নয়।
তিন মামা, মামি আর তাদের ছেলেমেয়েরাই হাট্টিমের জীবনে সব। মামাদের দুটো বড় লোহার ফ্যাক্টরি আছে হাওড়ায়। হাট্টিম সেখানেই কাজ করে। তিন মামার তিন ছেলে। ছোট মামার ছেলে বুজু কলকাতায় থাকলেও বাকি দুই মামার ছেলেরা বিদেশে থাকে। রিসার্চ করছে। বড় মামার এক মেয়ে, দেবাদৃতা, বিয়ে করে এখন পুণেতে থাকে। পুজো পার্বণে আসে। মেজো মামার মেয়ে বড় চাকরি করে। টেক্সাসের তেল কোম্পানিতে ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে আছে। সেখানেই বিদেশি এক ছেলেকে বিয়ে করেছে গত বছর। সেই নিয়ে মেজোমামির মনমেজাজ খারাপ থাকে। তাই মেজোমামি হাট্টিমকে কিছু করে দিতে বললে ও না করতে পারে না। মনে হয় মেজোমামি ভাল মানুষ। কষ্টে থাকে। একমাত্র বই পড়তেই যা ভালবাসে! সেখানে বই কিনে এনে দিতে বললে ‘না’ করবে কেন! তাই আজও না করেনি।
হাট্টিম ফ্যাক্টরি থেকে আজ বেরিয়েছিল একটু তাড়াতাড়ি। অগস্টের ষোলো তারিখ আজ। বর্ধমানের একটা রাইস মিলের জন্য চিমনি, চুট, এয়ার রিসিভিং ট্যাঙ্ক ইত্যাদির অর্ডার ছিল। সে সব মাল রেডি হয়ে গিয়েছিল আর তার লোডিং ছিল আজ। দুটো লো বেড ট্রেলারে সব মাল লোড করেই বেরিয়েছে হাট্টিম। মাল যদিও যাবে রাতে। তখন নো এন্ট্রি থাকে না।
আসলে এই ফ্যাক্টরিটার গোটাটাই দেখে হাট্টিম। মামারা ওর উপর ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত! ফ্যাক্টরির ম্যানেজার সিনুদাকে বাকি সব কিছু বুঝিয়ে এসেছে হাট্টিম। সিনুদা অনেক দিনের মানুষ। খুব বিশ্বস্ত আর ভরসার। সিনুদাই বলেছে ও যেন বেরিয়ে যায়, রাতে ট্রাক ছেড়ে তার পর নিজে বাড়ি যাবে। সিনুদার বাড়ি ফ্যাক্টরি থেকে পাঁচটা বাড়ি পরে। ফলে অসুবিধে কিছু নেই।
বাইকে করে হাওড়া ব্রিজ টপকে আসতে বেশি সময় লাগেনি হাট্টিমের। কিন্তু এখানে এসে ফেঁসে গিয়েছে!
রাখো বলল, “তোর পাল্লায় পড়ে আমারও দেরি হয়ে যাবে। পাড়ার সবাই আমাকে চাঁদা তুলে ক্যালাবে!”
“তোকে ক্যালাবে কেন?” হাট্টিম অবাক হল, “তোর কী দোষ!”
“দোষ নেই, তাই তো ক্যালাবে। আজকাল দেখিস না, যারা দোষ করে তাদের কিছু হয় না, যারা কিছু করে না, যারা ভাল, তাদের ধরে- ধরে অপদস্থ করা হয়! এখন অন্য পথ দিয়ে চল। এখানে পাঁচ মিনিট ধরে নাচছিস শুধু! যেতে পারছিস? কিচ্ছু নেই, বেকার সময় নষ্ট! চল ওই দিকে।”
হাট্টিমকে আর কিছু বলতে না দিয়ে রাখো ওকে হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে অন্য দিকে নিয়ে গেল। বড় রাস্তা ঘুরে আর-একটা পথ আছে শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটে ঢোকার।
বড় রাস্তার ওপর সার-সার অনুষ্ঠানের কার্ড-সহ নানান বইয়ের দোকান। এখানে আসতে ভাল লাগে হাট্টিমের। চারিদিকে বইপত্র, তার গন্ধ, পুরনো বাড়ি, খোলামেলা মানুষজন। কলকাতার মতো এমন পরিবেশ আর কোথাও নেই। এত বইপত্র দেখে হাট্টিম এখন ভাবে, ভাল করে পড়াশোনা করলে ওর জীবনটাও অন্য রকম হতে পারত। মামাদের ফ্যাক্টরিতে এ ভাবে কাজ করতে হত না।
না, মামারা ওকে কষ্ট দেয় না। অভাব রাখে না। মাসে তিরিশ হাজার টাকা করে দেয় হাতে। যেটা সে ভাবে খরচও হয় না। কিন্তু তাও পড়াশোনার ব্যাপারটা নিয়ে আজকাল খুব কষ্ট লাগে! একদম যে খারাপ স্টুডেন্ট ছিল তা কিন্তু নয়। কিন্তু ওই যে ফুটবল! প্লেয়ার হবে! খেলবে বড় টিমে! সেই সব করেই কোনওমতে কলেজে নাম লিখে পাস কোর্সে বিএ পাশ করেছে ও।
তা, কলকাতা মাঠে বড় টিমে ছ’বছর খেলেছে হাট্টিম। টাকাপয়সাও পেয়েছে ভালই। ইন্ডিয়ার হয়েও খেলেছে চার বছর। কলকাতা মাঠে কৃশানু বন্দোপাধ্যায় বলতে সবাই এক ডাকে চিনত ওকে। বলত, কৃশানু দে-র পরে এমন পায়ের কাজ আর দেখা যায়নি। ভুল ভুল, কৃশানু দে আর কেউ হতে পারে না। হাট্টিম সেটা জানে। তাও লোকজন এমন বললে খারাপ লাগত না। কে না চায় তাকে সবাই তার হিরোর সঙ্গে একটু হলেও তুলনা করুক।
সবই ভাল চলছিল, কিন্তু পাঁচ বছর আগের সেই দুর্ঘটনাই সব শেষ করে দিল ওর! ডান পায়ের শিন বোন আর ফিমার এমন করে ভাঙল যে, সব শেষ হয়ে গেল। রিহ্যাবিলিটেশন করেও কিছু হয়নি। আর সেই জোর ফিরে আসেনি পায়ে।
এই পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর। যে যতক্ষণ কিছু দিতে পারছে, ততক্ষণই তাকে মনে রাখে। তার পর দেওয়া শেষ হয়ে গেলে তাকে ভুলে যেতে এক সেকেন্ড সময়ও লাগে না কারও। ফলে কৃশানু বন্দোপাধ্যায়ও হারিয়ে গিয়েছে। এখন বেঁচে আছে শুধু হাট্টিম।
মাঝে-মাঝে রাতে নিজের ঘরের শোকেসে রাখা প্রাইজ়গুলো দেখলে ওর চোখে জল আসে। মনে হয় এ সব ও জেতেনি। জিতেছে অন্য কেউ। বা অন্য কোনও জন্মে হয়তো এ সব ঘটেছে ওর সঙ্গে।
সত্যি বলতে কী, এখনও বল দেখলে পা নিশপিশ করে। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝেই খেলার স্বপ্ন দেখে! কিন্তু তার পরেই বোঝে আর উপায় নেই!
পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে শ্যাম পার্কে মাঝে-মাঝে খেলতে যায় ও। লোকে যাতায়াতের পথে এখনও দাঁড়িয়ে দেখে ওর ড্রিবলিং। দূর থেকে শটে গোল! কিন্তু হাট্টিম নিজে বোঝে সেই স্পিড নেই ওর। নেই দম। বোঝে ও এখন বারুদ শেষ হয়ে যাওয়া তুবড়ি।
রাখো ওকে বলে, “তুই আর-একবার চেষ্টা কর। মেসি, রোনাল্ডোকে দেখ। আরও কারা-কারা সব এই বয়সে খেলছে দেখ। বুফোঁকে দেখ, চল্লিশ পার করে গিয়েছে! আর তুই পারবি না?”
রাখো পাগল। কাদের সঙ্গে কার তুলনা! হাট্টিম কিছু বলে না। শুধু হাসে।
রাখো রেগে যায়। বলে, “হেসে যা খালি! কিচ্ছু নেই তোর! তুই পাক্কা চিটিংবাজ!”
চিটিংবাজ! কথাটা কে যেন বলেছিল! ইজনা না?
রাখোর কথায় কিছু মনে করে না হাট্টিম। যে ক’জন ওকে ভালবাসে, তার মধ্যে রাখোও আছে। কিন্তু এই চিটিংবাজ শব্দটা শুনলে ইজনার কথাই মনে পড়ে ওর। মনে পড়ে, ইজনা ভুল বলেনি! সত্যি তো ও খারাপ কাজই করেছে। ওকে তো এমন কথা শুনতে হবেই।
বড় রাস্তা থেকে বাঁ দিকে একটা ছোট গলি ঢুকে গিয়েছে। এই পথ দিয়েও শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটে ঢোকা যায়।
সেই পথ দিয়ে ঢুকতে গিয়েও হাট্টিম থমকে দাঁড়াল। আরে, রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া ওই ক্যাবটার মধ্যে কে ওটা! ইজনা না! আর পাশে কে ওর? একটা লোক!
এক্ষুনি ইজনার কথা মনে পড়ছিল আর এখনই দেখল! এ টেলিপ্যাথি নাকি! কিন্তু ছেলেটা কে সঙ্গে? ওরা কি গাড়ির মধ্যে একটু ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে ছিল? নাকি দূরে দূরেই ছিল? হাট্টিমের বুকের মধ্যে আচমকা যেন জ্যাক জাম্পার অ্যান্ট কামড়াল!
রাখোর ভাই পেনসিল সারাক্ষণ নানান কিছু নিয়ে পড়াশোনা করে। ওর কাছেই শুনেছে এই পিঁপড়েটার ব্যাপারে। খুব সাংঘাতিক পিঁপড়ে নাকি!
পেনসিল বলে, “হাট্টিমদা, একবার যদি জ্যাক জাম্পার কামড়ায় না! বুঝবে মজা!”
তা এখন মজাটা বুঝল হাট্টিম। জীবনের কত কিছুর মধ্যে যে জ্যাক জাম্পার পিঁপড়ের কামড় লুকিয়ে আছে!
কিন্তু ইজনা তো বছর দুয়েক আগেই বলেছিল যে, ওদের মধ্যে সব শেষ। তা হলে? তা হলে এখনও কেন কামড় লাগল এমন! কেন ইচ্ছে হল হাল্ক-এর মতো ওই ক্যাবটা ধরে আছাড় মেরে ভেঙে দিতে! কে ওই ছেলেটা! ওর পাশে বসেছে কেন ইজনা!
হাট্টিম বুঝল, ইজনা যতই বলুক ওর সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ, কিন্তু এখনও মনে-মনে ইজনাকেই ধরে রেখেছে ও। আসলে শরীরের চেয়ে মনের ধরে থাকাটাই যে আসল।
চোয়াল শক্ত করে দূরে নানান গাড়ির ভিড়ে প্রায় হারিয়ে যাওয়া সাদা ভাড়ার গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল হাট্টিম। মুখের মধ্যে কেমন একটা তেতো ভাব। কানে মাথায় যেন লক্ষ ঝিঁঝি পোকা ঢুকে বসে আছে। চারিদিকের জমজমাট কলেজ স্ট্রিট যেন এক মুহূর্তে জনশূন্য!
“তুই কি বড় হয়ে দিলীপকুমার হবি?” পাশ থেকে রাখো ধাক্কা মারল ওকে, “তাড়াতাড়ি চল। ম্যাচটা খেলবি, না পিন্টুদাকে ওয়াকওভার দিয়ে দিবি? চল।”
হাট্টিমের ইচ্ছে হল রাখোকে এক বার বলবে যে, এই মাত্র ও কাকে দেখল। কিন্তু তার পরই মত পাল্টাল। কী হবে বলে? নিজের কষ্টের কথা অন্যকে বলার কোনও মানে নেই! তাতে কষ্ট কমে না একটুও। তা ছাড়া রাখো যেমন ছেলে, কী বলতে যে কী বলে বসবে! তা এখন নিতে পারবে না হাট্টিম।
তাই রাখোর দিকে তাকিয়ে হাট্টিম হাসল জোর করে।
রাখো ভুরু কুঁচকে বলল, “দেখিস বাবা! মিশরের মমিও এর চেয়ে সুন্দর করে হাসে। কী হয় তোর মাঝে-মাঝে! মুড সুইং নাকি? এই ভাল এই খারাপ। নাটক করতে পারিস বটে! চল!”
শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটটা সরু। দু’দিকে বইয়ের দোকান নিজেদের গণ্ডি টপকে উপছে এসে পড়েছে রাস্তায়!
মেজোমামির সব বই দাশবাবুর দোকান থেকে কেনা হয়। হাট্টিমই কিনে নিয়ে যায়। দাশবাবুকে বহু দিন থেকে চেনে হাট্টিম।
আজ দাশবাবু নেই। দাশবাবুর ছোট ছেলে হাবু বসে ছিল দোকানে আগেই ফোন করে বইয়ের কথা বলে দেওয়া হয়েছিল। তাই বই রেডি করাই ছিল। টাকা দিয়ে বইয়ের প্যাকেটটা নিয়ে নিল হাট্টিম।
এখনও ওই জ্যামটা লেগে আছে। আর ঝগড়াও শুরু হয়েছে। রাখো বলল, “যাবি নাকি দেখতে? লোকে সন্ধেবেলা টিভি খুলে যা দেখে, তা এখানে একদম সামনে থেকে দেখতে পারবি? যাবি?”
হাট্টিম জোরে শ্বাস টানল। মাথাটা এখনও টলমল করছে। চোখের সামনে লাল দুটো টেল লাইট জ্বলছে। এমন হচ্ছে কেন? ও তো মাঝে মাঝেই পাড়ায় ইজনাকে দেখতে পায়। তা হলে আজ এমন হচ্ছে কেন? মানে, ওই অচেনা এক জনের সঙ্গে দেখেই কি এমনটা হচ্ছে? হিংসে হচ্ছে ওর! ও কি হিংসুটে হয়ে গেল! ছিঃ ছিঃ! নিজের গায়েই থুতু দিতে ইচ্ছে করল। ও তো ভেবেছিল সেই শক কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু আজ বুঝল, ইজনার থেকে ও আলাদা হয়েছে বটে, কিন্তু মনে-মনে এখনও সেই বোকাটে রোম্যন্টিকটাই রয়ে গিয়েছে। নিজেকে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করল হাট্টিমের! কোন কুক্ষণে যে ও ওরকম একটা কাজ করতে গিয়েছিল!
রাখো মাথা নাড়ল। তার পর বলল, “শালা, আজ তোর ট্রান্সফরমার খারাপ হয়ে গিয়েছে! তুই চল এখন। না হলে আবার কী চিটিংবাজি শুরু করবি কে জানে!”
.
ওদের পাড়াটা বাগবাজারের কাছে। পুরনো কলকাতার পাড়া। থিন অ্যারারুট বিস্কিটের রঙের বাড়িঘর চারিদিকে। কাস্ট আয়রনের রেলিং ঘেরা বারান্দা। খড়খড়ির জানলা। লাল রোয়াকে চায়ের দোকান। ইট বের করা থামের ঘেঁষাঘেঁষি বাড়ি। কোনও-কোনও বাড়ির মাথায় ডানা ভাঙা পরির মূর্তি। পায়রাদের বসার জালি। বহু বছর আগেকার জাফরি লাগানো ছাদ। চারিদিকে বদলে যাওয়া শহরের মাঝে ওদের এই পাড়াটা যেন পুরনো কলকাতার স্ট্যাম্প সাইজের একটা ছবি।
হাট্টিমের মামারা এই পাড়াতেই একটা তিন তলা বাড়ি কিনেছে। বাড়ির এক পাশে ওদের দুটো গাড়ি রাখার গ্যারাজ আছে। সেখানে হাট্টিমের এই বাইকটাও থাকে।
রাখো বাইক থেকে পাড়ার মোড়ে নেমে ওকে ক্লাবে আসতে বলে, নিজে ক্লাবের দিকে চলে গিয়েছে।
ওদের ক্লাব ভারতী সঙ্ঘ বহু দিনের পুরনো ক্লাব। এখনও বয়স্ক মেম্বাররা আসে সন্ধেবেলা। আগে ক্যারম বোর্ড ছিল না। কিন্তু বছরখানেক হল কেনা হয়েছে। আর এ বছরই প্রথম টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে!
পৌনে সাতটা বাজে। বই কেনার পরে কলেজ স্কোয়ার থেকে রাখো জোর করে ঘুগনি খেয়েছে। হাট্টিমের ইচ্ছে করছিল না একটুও। কিন্তু রাখোকে না করতে পারেনি!
হাট্টিম ভাবল, মনটা শান্ত করতেই হবে। মনে হয়, ক্লাবে সবার মধ্যে গেলে নিশ্চয়ই ভাল লাগবে।
হাট্টিম বাড়িতে ঢুকে মেজোমামিকে বইগুলো দিয়ে ব্যালেন্স টাকাটাও ফেরত দিল।
মেজোমামি জিজ্ঞেস করল, “কী রে, এত তাড়া করছিস? খাবি না কিছু?”
হাট্টিম বলল, “ক্লাবে ক্যারম টুর্নামেন্ট। আমার খেলা আছে। আমি রাতে খাব,” তার পর আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দুটো করে সিঁড়ি টপকে নেমে এল নীচে।
ক্লাবে আজ বেশ ভিড়। কিন্তু হাট্টিম অবাক হয়ে দেখল, ক্যারম বোর্ডের কাভার এখনও খোলা হয়নি। যে-পিন্টুদার সঙ্গে ওর ম্যাচ, সে-ও প্র্যাকটিস না করে সবার সঙ্গে গোল করে কী নিয়ে যেন আলোচনায় মত্ত।
ব্যাপারটা কী! পিন্টুদা ওদের পাড়ার ইউনিভার্সাল দাদা। নিজের গাঁটের কড়ি খরচ করে ক্লাবের পিকনিক করায়। সবার সব কাজে ঝাঁপায়! এমনকি, বাচ্চাদের নিয়ে একটা ক্রিকেট ক্লাবও গড়ে তুলেছে! নাম দিয়েছে ‘নিখিল বঙ্গ ক্রিকেট সেবা ও সংরক্ষণ সমিতি’। নানা টুর্নামেন্টেও নিজের টিম নিয়ে যায় পিন্টুদা। আর বলা বাহুল্য, গো-হারান হেরে আসে। কুড়ি-বাইশ রানে অলডাউন হওয়াটা পিন্টুদার টিমের কাছে কোনও ব্যাপার নয়।
রাখো বলে, “আর বলিস না। খাঁটি পাগলা-ড্যাশ লোক। টিমের নামে সেবা ও সংরক্ষণ ঢুকিয়েছে। গন্ডার সংরক্ষণ করে নাকি? জানিস, নিকিরি পাড়ার বগা কোটাল মারা যাওয়ায় ওদের বাড়ি থেকে পিন্টুদাকে ফোন করেছিল। বলে, কাচের গাড়ি পাঠান, নিমতলা যাব। পিন্টুদার ক্লাবের নাম সেবা ও সৎকার সমিতি ভেবেছে! পিন্টুদার মাইরি পঞ্চান্ন বছর বয়স! কলপ করে চুল জুতোর ব্রাশের মতো হয়ে গিয়েছে! সে নাকি বাচ্চাদের ক্রিকেট টিম নামায়! নিখিল বঙ্গ আবার! কিচ্ছু নেই! খালি ফুটেজ খাবে! পাক্কা চিটিংবাজ!”
হাট্টিম ক্লাবের মধ্যে ঢুকল। ওকে দেখে সবাই একটু থমকে গেল। হাট্টিম বলল, “আরে, বোর্ড রেডি করোনি? পাঁচ মিনিট হাত ছাড়াতে হবে তো।”
সবার মধ্য থেকে রাখো কিছু বলার আগেই মাদুলি এগিয়ে এল। মাদুলি মানে পাপ্পাদা। চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স। বিশাল বড় টাক। ঠোঁটের ওপর সরু গোঁফ। পাজামার সঙ্গে শার্ট পরে সারাক্ষণ। দু’হাত মিলিয়ে গোটা চোদ্দো মাদুলি গাছে ঝোলা বাদুরের মতো ঝুলে থাকে! ব্যস, সেই দেখে রাখো নাম দিয়েছে মাদুলি। আর সেটাই কী করে যেন পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত কথা হল, পাপ্পাদাকে পাপ্পা বলে ডাকলে সাড়া দেয় না! মাদুলি বলে ডাকলে দেয়!
মাদুলি এসে ভুরু কুঁচকে তাকাল হাট্টিমের দিকে। বলল, “আরে, রাখুন ক্যারম! এ দিকে পাড়ার প্রেস্টিজ নিয়ে টানাটানি। আমাদের ক্লাবের চার জনকে আজ মিলন সমিতি ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছে পুজোর মিটিং থেকে। বলেছে পথ দেখে নিতে। ভাবতে পারেন? আর আপনি এসেছেন ক্যারম খেলতে? আপনার গায়ের রক্ত ফুটছে না? আপনি পারবেন? পারবেন এর একটা জবরদস্ত প্রতিকার করতে?”
হাট্টিম দেখল, অন্য সময় হলে সবাই এই সব কথার সূত্র ধরে মাদুলিকে নাস্তানাবুদ করে দিত। কিন্তু আজ সবাই খুব সিরিয়াস। সবাই কেন কে জানে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
হাট্টিমের মনে হল, যা বিপদই ঘটে থাকুক, ওর দিকে এ ভাবে তাকানোর কী আছে? ও কি ব্যাটম্যান না অরণ্যদেব!
দুই
হাট্টিম
হাট্টিমের ঘরের পাশেই একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। উত্তর কলকাতায় গাছের সংখ্যা দক্ষিণের চেয়ে সামান্য কম, তাও ওদের পাড়ায় বেশ কয়েকটা গাছ আছে এখনও। এই যেমন হাট্টিমের ঘরের পাশের কৃষ্ণচূড়া, মাদুলির কম্পিউটার আর জ়েরক্সের দোকানের পাশে কদম, ভারতী সঙ্ঘের পাশের মাঠে, বুড়োদাদুর বাড়ি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছাতিম। পিন্টুদার বাড়ির পাশের অশোক গাছ। এমনই বেশ কিছু গাছ আছে এখনও।
হাট্টিমের ঘরের পাশের গাছটায় রোজ সকালে এক জোড়া ঝুটিওলা পাখি এসে বসে। কিচমিচ করে নিজেদের মধ্যে কী সব কথাবার্তা বলে। না, এ সব পাখি-টাখি চেনে না হাট্টিম। কিন্তু ভাল লাগে ওদের দেখে। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ঝঞ্ঝাট প্রাণী বোধহয় এরাই! মানুষের থেকে দূরে থাকে। আকাশ থেকে অন্য একটা পারস্পেক্টিভ নিয়ে সব কিছু দেখে। বেশ মজাই লাগে ভাবতে। তাও কিছু মানুষ কী করে যে এদের খাঁচায় ভরে রাখে কে জানে!
মানুষ এমনই। সব কিছুতেই তার একটা ওনারশিপের ব্যাপার আছে। যা ভাল লাগবে তাই যেন তাকে পেতে হবে। নিজের কাছে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে হাট্টিমের মনে হয়, পারলে মানুষ আকাশের রামধনুকেও বোতলে ভরে বসার ঘরে সাজিয়ে রাখত।
রোজ ওই পাখিগুলোর কিচিরমিচিরেই ঘুম ভাঙে হাট্টিমের। কিন্তু আজ আর তা ভাঙেনি। আজ ওর ঘুম ভাঙিয়েছে বুজু।
বুজু কলেজে পড়ে। ইঞ্জিনিয়ারিং। থার্ড ইয়ার। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। লম্বা জুলপি। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। বুজু কবিতা লেখে। গিটার বাজিয়ে গানও গায়। তার সঙ্গে নানারকম অ্যাক্টিভিজমেও যুক্ত। বাড়িতে শুয়ে- বসে, মুখের কাছে খাবার-ধরা সোশ্যাল নেটওয়র্কের সেলফ প্রোপাগান্ডা নয়, রিয়েল অন ফিল্ড অ্যাক্টিভিজম।
সেই বুজুই আজ ঘুম ভাঙিয়েছে ওর। এখন হাট্টিম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বুজুর দিকে। কিছু বলছে ছেলেটা। কিন্তু ঘুমের কুয়াশায় মাথা আবছা হয়ে আছে হাট্টিমের। স্পষ্ট বুঝতে পারছে না!
“দাদা ওঠ! দেখ পাড়ায় কী হয়েছে!” বুজু আবার হাট্টিমকে ধরে ঝাঁকাল।
“কী বল তো!” হাট্টিম উঠে বসে হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে রাখা প্লাস্টিকের বোতলটা নিল এবার। সকালে উঠে অনেকটা জল খায় ও।
বুজু পাশ-বালিশটা সরিয়ে বসল পাশে। বলল, “বুড়োদাদুদের পাশে সমীরদারা থাকে না? ওদের বাড়িতে চোর এসেছিল। দুটো। বুড়োদাদু ধরেছে একটাকে।”
বুজু এমন করে কথাটা বলল যে, অবাক হল হাট্টিম। বুড়োদাদু চোর ধরেছে! ও বলল, “কী বলছিস তুই?”
“আর বলছি কী! চোরটা একটা কোপ মেরেছে দাদুর হাতে। ডান হাতে ইনজুরি হয়েছে। কিন্তু যা দুর্ধর্ষ লোক! এই তিরানব্বই বছর বয়সে চোরকে চেপে ধরে চেঁচিয়েছে এমন! তার পর ওদের কাজের ছেলে নিতাই এসে বেঁধে রেখেছে ব্যাটাকে। আর-একটা চোর পালিয়ে গেছে।”
হ্যাঁ, নিতাই শুধু চোরকে কেন, চোরের গোটা পরিবারকে একা বেঁধে রাখার ক্ষমতা রাখে! সাড়ে ছ’ফুট লম্বা নিতাই। বিশাল চেহারা। বুড়োদাদু আর ওর ভাই ছোটদাদুর দেখাশোনা করে নিতাই। বয়স তিরিশের আশপাশে। কিন্তু হাট্টিমের মনে হল, বুড়োদাদু এই নব্বই প্লাস বয়সে চোরকে ধরল! আশ্চর্য!
বুজু হাট্টিমের অবাক হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে, বুড়োদাদু নাইন্টি আপ হলেও দেখিস না, এখনও কেমন চেহারা! কেমন ফিট! রোজ সকালে হাঁটতে যায়! চিবিয়ে আখ খায়! সুচে সুতো পরায়! কলকাতায় ব্রিটিশ আমলের যে ক’টা জিনিস এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে এই লোকটাও একটা। শেষ রাতে বাথরুম করতে উঠেছিল। চোর দুটো নাকি সমীরদার বাড়ি থেকে চুরি করে বুড়োদাদুর ছাদ হয়ে পালাবার তাল করছিল। ব্যস, ক্যাচ কট-কট!”
হাট্টিমের মাথার কুয়াশা কেটে গিয়েছে! পাড়ায় ইদানীং বেশ কয়েকটা চুরি হয়েছে। মানে, গত পাঁচ-ছ’মাসে দশ-বারোটা চুরি। পুলিশ এখনও কিছু করতে পারেনি। সেখানে বুড়োদাদু একটা চোরকে ধরে ফেলেছে! হাতে কোপ খেয়েও ছেড়ে দেয়নি!
বুড়োদাদুকে ওরা সবাই ভালবাসে খুব। অনেক আগে নাকি এই পাড়াতেই থাকত মানুষটা। তার পর চাকরি নিয়ে চলে যায় দূরে। বছর পাঁচেক হল ফিরে এসেছে। কেন এই বয়সে ফিরল জিজ্ঞেস করলে বুড়োদাদু বলে, “যেখানে শুরু সেখানেই শেষ হোক। গ্রামে তো আর যেতে পারব না! ওটা এখন অন্য দেশ। তাই এখানেই এলাম।”
বুড়োদাদু বিয়ে করেনি। সঙ্গে ছোটভাই থাকে। তার বয়সও নব্বইয়ের ওপর! তবে ছোটভাইটি, মানে যাকে ওরা ছোটদাদু বলে সে চোখে দেখতে পায় না। মনের ভারসাম্যও সামান্য যেন টলে আছে! কিন্তু নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ দু’জনে। নিতাই ওদের সঙ্গে থাকে। সেই নির্ঝঞ্ঝাট মানুষটাই নাকি চোর ধরেছে!
হাট্টিম বলল, “আমি ফ্রেশ হয়ে যাব এক বার। পুলিশ এসেছিল?”
“হ্যাঁ, এসেছিল। এতক্ষণে চলেও গিয়েছে বোধহয়। পাড়ার লোকজন এখনও আছে।”
হাট্টিম জিজ্ঞেস করল, “আঘাত গুরুতর কি?”
“না না,” বুজু মাথা নাড়ল, “আমি গিয়েছিলাম তো। দেখলাম, ফোর আর্মে লেগেছে। ব্লিডিং হয়েছে। কিন্তু ঠিক আছে এখন। ডাক্তার এসেছিল। ড্রেসিং করা হয়েছে।তবে ব্লাড বেরিয়েছে অনেকটা। উইকনেস তো থাকবেই। তুই এক বার যাস। রাখোদাও তোর খোঁজে এক বার ঘুরে গিয়েছে।”
হাট্টিম আর সময় নষ্ট না করে বাথরুমে গেল। বুড়োদাদুর কাছে যাবে এক বার। ফিরে আবার স্নান-টান করে ফ্যাক্টরিও যেতে হবে। কাল যে মাল গিয়েছে, তার বিলিংটাও করতে হবে। কাজের কি শেষ আছে!
ফ্রেশ হয়ে ঘরে এসে হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি ছেড়ে পাজামা পাঞ্জাবি পরল হাট্টিম। তার পর মোবাইল আর মানি-ব্যাগটা নিয়ে বেরল। বড়মামি খাবার টেবিলে ময়দা মাখছিল। ওকে বেরোতে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কাল ক্যারম কম্পিটিশন হয়নি কেন রে? ওই মিলন সমিতি দুর্গাপুজো থেকে ভারতী সংঘকে বের করে দিয়েছে বলে?”
হাট্টিম হাসল। বড়মামির কাছে সব খবর থাকে! মোসাডের এজেন্ট কি না কে জানে!
ও বলল, “হ্যাঁ। ক্লাবে সেই নিয়ে বিশাল উত্তেজনা ছিল। অপমান হয়েছে সবার। তাই খেলা হয়নি। পরে এক দিন হবে। তেমন ইমপর্ট্যান্ট তো কিছু নয়। যাক গে, আমি আসি।”
“না খেয়েই চললি?” বড়মামি অবাক হল এবার।
“আরে, সবাই গিয়েছে বুড়োদাদুর বাড়িতে। আমি পাঁচ মিনিট ঘুরে আসি। এই বয়সে একটা লোক এমন কাণ্ড ঘটাল! কী করে সাহস পায় কে জানে!”
বড়মামা বসেছিল খবর কাগজ খুলে। বলল, “সাহসটা এখন আনকমন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এক সময় কমন ছিল। কেন আমাদের জেঠুর কথা শুনিসনি! ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করে মারা গিয়েছিল। ওই সময়কার মানুষের ব্যাপারটাই অন্যরকম ছিল! এখনকার মতো নয়।”
হাট্টিম আর দাঁড়াল না। এই এখনকার মতো, তখনকার মতো—এই সব তুলনা ওর ভাল লাগে না। বয়স্ক লোকজন সারাক্ষণ যেন প্রাণিকোষ আর উদ্ভিদ-কোষের পার্থক্য খুঁজে চলেছে! আরে বাবা, তখনকার দিনে কি খারাপ কাজ হত না? আজ দেশের এই হাল কি আজকের ছেলেপুলেরা করেছে নাকি! এতো কয়েকশো বছর ধরেই হয়ে চলেছে! খারাপ লোক সব যুগেই ছিল। আর দুর্ভাগ্যক্রমে থাকবেও। হাট্টিম ভাবে, বয়স হয়ে গেলে মানুষজন শরীরের নানান অসুখে এই জীবনটাকে উপভোগ করতে পারে না বলেই কি এমন নেগেটিভ হয়ে থাকে! মন চায়, কিন্তু শরীর সঙ্গ দেয় না, তাই কি তাদের ফ্রাস্ট্রেশন আসে! হবে ও- বা! আচ্ছা, হাট্টিম নিজেও বুড়ো হয়ে গেলে এমন হয়ে যাবে নাকি!
রাস্তায় বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল হাট্টিম। অগস্ট মাস। আকাশে বুনো ঝোপের মতো গাঢ় মেঘ করছে। সকাল সাড়ে আটটাকেও বিকেল সওয়া ছ’টা মনে হচ্ছে যেন!
একটু এগোতেই “এই যে প্লেয়ার, কী খবর?” বলে ডাকটা শুনল হাট্টিম। দেখল, ব্যালকনি থেকে মণিদা হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঝুঁকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মুখে সামান্য হাসি!
মণিদাদের বাড়িটা বিশাল বড় আর পুরনো। এখন কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। তাও এক-একজন যেটুকু পোর্শন পেয়েছে তাও অনেক! মণিদাদের বাড়িতে অনেক বার গিয়েছে হাট্টিম। যাবেই তো, মণিদা যে ইজনার দাদা!
ইজনার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ওই বাড়িতে আর যায় না হাট্টিম। কিন্তু এখনও মনে-মনে ওই বাড়ির মধ্যে ইজনাকে ও ফলো করে। এই যেমন এখন সকাল সাড়ে আটটা। ও জানে, ইজনা গান চালিয়ে আজকের ক্লাস নিতে যাওয়ার আগে একটু উল্টেপাল্টে পড়া- টড়া দেখে নিচ্ছে। কলেজে পড়ায় ইজনা। সকালে সেদিনের পড়া দেখে নেয়, হাট্টিম জানে।
“এই চলছে মণিদা,” হাট্টিম সামান্য হেসে রাস্তা থেকেই উত্তর দিল।
হাসলেও হাট্টিমের বুকের মধ্যে আবার কামড়াল সেই রাক্ষুসে পিঁপড়েটা! আবার যেন দেখতে পেল শেষ বিকেলে ট্রাফিক ছিঁড়ে চলে যাচ্ছে দু’ফোঁটা চোখের জলের মতো গাড়ির লাল টেল লাইট! চোয়াল শক্ত করে ও সামলাল নিজেকে। মনে মনে ভাবল, যা ভুল করেছে তার ফল তো ভোগ করতে হবেই।
“শুনলাম কী সব ক্যাচাল হয়েছে? তাই?” মণিদা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
এই কেস করেছে! মনে-মনে ভাবল হাট্টিম। মণিদার জেরা পুলিশের জেরার মতো। একবার শুরু হলে শেষ হয় না। লোকটার এত কৌতূহল কেন কে জানে!
হাট্টিম বুঝল এখানে দাঁড়ালে ওর আজ সব ঘেঁটে যাবে।
ও তাড়া আছে এমন ভাব দেখিয়ে বলল, “আমি ঘুরে এসে বলছি মণিদা। আমায় ওরা ডাকছে!”
হাট্টিম আর দাঁড়াল না। শুনল মনিদা পেছন থেকে বলছে, “আমায় জানাস কিন্তু! মেসেজ করে হলেও জানাস, কেমন?”
আরে ভাই, তোমার জানার ইচ্ছে থাকলে তুমিও চলো। কিন্তু না, তুমি তো যাবে না! তোমার যে লেজ মোটা! হাট্টিম জানে মণিদা বড় চাকরি করে। সেই জন্য একটা চাপা অহঙ্কার আছে লোকটার। তাও ওর সঙ্গে লোকটা নিজে থেকে কথা বলে। কেন কে জানে!
বুড়োদাদুর বাড়ির সামনে কয়েক জন দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে রাখোকেও দেখতে পেল হাট্টিম। রাখো হাতে চায়ের ভাঁড় নিয়ে কথা বলছিল পাতাদার সঙ্গে।
পাতাদা ওদের পাড়ার মোড়ের কনফেকশনারিটা চালায়। সঙ্গে গিটারও শেখায়। একদম নিজের মতো থাকে পাতাদা। বাড়তি কথা বলে না। আর বললেও টু দ্য পয়েন্ট। পাতাদা ভাল গিটার বাজায়। আবার প্রায় সব রকম নেশাও করে। সলিড, লিকুইড, গ্যাস! নেশা করায় পাতাদা কোনও বাছবিচার নেই। পাতাদার বাবা-কাকাদের ডেকরেটিংয়ের বড় ব্যবসা আছে। কিন্তু সে সব দিকে পাতাদার নজর নেই।
এখনও পাতাদাকে দেখে হাট্টিমের মনে হল নেশা করেই আছে। এই লোকটা আগে ফুটবল খেলত। গোলকিপার ছিল। ভাবলে অবাক লাগে!
ও গিয়ে দাঁড়াল কাছে। রাখো বলল, “এই তোর ঘুম ভাঙল? তুই সারা রাত জেগে কী করিস? পানু দেখিস?”
“আঃ,” হাট্টিম বিরক্ত হল, “তোর মতো নাকি? আমার কাজ থাকে না?”
“কী কাজ করিস! পাড়ায় চুরি-ডাকাতি হচ্ছে আর তুই ঘুমোচ্ছিস! পলিটিক্যাল পার্টি খোল। পুরো নেতাদের মতো বিহেভ শুরু করেছিস!” রাখো হাতের চায়ের ভাঁড়টা টিপ করে দূরে রাখা একটা ভাঙাচোরা ডাস্টবিনে ছুড়ে মারল। ভাঁড়টা ডাস্টবিনে কোনায় লেগে মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।
হাট্টিম বলল, “উপরে যাবি না? পাতাদা, তুমি যাবে না?”
পাতাদা নির্বিকার মুখে বলল, “আমি নেশা করে আছি। কিছু ফিল করতে পারছি না। উপরে গিয়ে যা বলব সব নকল লাগবে। ঢ্যামনামো লাগবে। আমি মেকি ফিলিং নিয়ে কনসার্ন দেখাতে পারি না!”
হাট্টিম কী বলবে বুঝতে পারল না। দেখল, রাখো হাঁ করে তাকিয়ে আছে পাতাদার দিকে।
পাতাদা বলল, “আমি আসি। নেশা কাটলে এসে দেখা করব।”
পাতাদা চলে গেল।
রাখো সেই দিকে তাকিয়ে বলল, “এই লোক নাকি প্রেম করে বিয়ে করেছিল! বউ পালাবে না তো কি একে কোল-বালিশ করে রাখবে!”
“এই যে, আপনারা এখানে!”
হাট্টিম দেখল হাতে একটা গোটানো বাজারের ব্যাগ নিয়ে মাদুলি হন্তদন্ত হয়ে আসছে। সর্বনাশ! একে এখনই রাখোর সামনে আসতে হল!
মাদুলিকে দেখেই রাখো সোজা হয়ে দাঁড়াল।
মাদুলি কাছে এসে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। তার পর জামাটাকে টেনে সোজা করে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলল, “পারবেন? পারবেন আপনারা আর-একটা চোরকে ধরতে?”
রাখো এমনিতে মাদুলিকে আপনি করেই বলে, কিন্তু রেগে গেলে তুই-তুকারি শুরু করে দেয়!
মাদুলির মুখ-চোখ দেখে রাখোর খাড়া খাড়া কানগুলো লাল হয়ে গেল নিমেষে। হাট্টিমের যেন মনে হল সামান্য ধোঁয়াও বেরোচ্ছে!
রাখো খিঁচিয়ে বলল, “তুই আবার শুরু করেছিস? তোকে কোনও দিন জিজ্ঞেস করেছি তুই কিছু পারিস কি না? দাঁড়া, তোকে দেখাচ্ছি মজা।”
পাশ দিয়ে ভুলুর রিকশা যাচ্ছিল। রাখো থামাল সেটাকে, তার পর মাদুলিকে আচমকা হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে সেই রিকশায় তুলে দিয়ে ভুলুর হাতে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বলল, “মালটাকে বি কে পাল অ্যাভিনিউতে ছেড়ে দিয়ে আয় তো।”
“এই, আমি ওখানে যাব না। আমি বাজার যাব,” মাদুলি রিকশায় বসে বিব্রত গলায় বলল।
“তুই রিকশা থেকে নেমেছিস তো…” রাখো রাস্তার এদিক-ওদিক দেখে একটা থান ইট হাতে তুলল, “তোর ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব!”
ভুলু হাসতে-হাসতে রিকশার প্যাডেলে চাপ দিল!
“এই আমি বি কে পালে যাব না!” মাদুলি চিৎকার করতে লাগল।
“ভুলু, তুই থামাবি না কিন্তু!” রাখো ইট হাতে চিৎকার করে বলল, “শালা, দেখা হলেই ‘পারবেন পারবেন!’ দেখি, আজ তুই কী পারিস! শালা হাট্টিম, মাদুলি তোর মতো চিটিংবাজ!”
হাট্টিম হাসল এবার, “আরে, আমি এলাম কোথা থেকে?”
“জমিদার শালা! দুপুরবেলা ঘুম ভাঙে। চল উপরে,” রাখো দাঁত কিড়মিড় করে ওর হাত ধরে টানল।
বুড়োদাদুর ঘরটা বেশ বড়। পাড়ার অনেকেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে বিছানায় বুড়োদাদু বসে রয়েছে, ডান হাতে ব্যান্ডেজ। চোখে-মুখে ক্লান্তি। হাট্টিমের মনে হল, এত ধকল গিয়েছে মানুষটার। সেখানে সবাই কেন এমন করে ঘিরে রেখেছে ওকে!
ও দেখল, পাড়ার সবার সঙ্গে পিন্টুদাও আছে। পাশে পিন্টুদার স্ত্রী রিনাবৌদি।
হাট্টিম বলল, “এই পিন্টুদা! এবার তোমরা সবাই যাও। দাদু রেস্ট নিক। কী করছ তোমরা!”
বুড়োদাদু হাট্টিমকে দেখে হাসল, “তুই কোথায় ছিলিস?”
হাট্টিম কিছু বলার আগেই রাখো ফস করে বলল, “পানু…”
“কী?” ঘরের সবাই একসঙ্গে তাকাল রাখোর দিকে।
রাখো অনেক কষ্টে নিজেকে ব্রেক মেরে বলল, “ভানু, ভানু! ভানুর কমিক শুনছিল।”
হাট্টিম কটমট করে তাকাল ওর দিকে, তার পর বলল, “দাদু, তুমি রেস্ট নাও। আমরা সবাই পরে আসব, কেমন?”
রাখো চাপা গলায় বলল, “এই তো এলি! এখনই কাটবি? তুই লোক ভাগাতে এসেছিস?”
হাট্টিম উত্তর দিল না। ও দেখল, পিন্টুদা উঠে দাঁড়িয়েছে এবার। বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাবে হাত জড়ো করছে। এই সেরেছে! এই ভঙ্গিটা খুব ভাল করে চেনে হাট্টিম। মানে, পিন্টুদা সমবেত জনগণের সামনে কিছু একটা বলবে।
যা ভেবেছে তাই। পিন্টু গলা খাঁকড়ে বলল, “আমি কিছু বলতে চাই দাদু!”
বুড়োদাদু অবাক হল, “এই তো এত কিছু বললে এতক্ষণ। আবার কী বলবে?”
পিন্টুদা বলল, “সবার পক্ষ থেকে আর কী। পাড়ায় বেশ কয়েকমাস ধরে চুরি হচ্ছিল। আপনি একটা চোরকে ধরলেন। এটা যে কী বড় উপকার করলেন আপনি। আমি তাই জিজ্ঞেস করছি, আমরা কি কিছু করতে পারি আপনার জন্য? মানে কোনও কিছু? প্লিজ়, বলুন।”
হাট্টিম দেখল, পাড়ার বাকি লোকজনও পিন্টুদার সঙ্গে সহমত বোঝাতে জোরে-জোরে মাথা নাড়াচ্ছে।
বুড়োদাদু তাকিয়ে রইল সবার দিকে। তার পর ধীরে-ধীরে মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ পারো।”
“প্লিজ, বলুন কী?” এবার পিন্টুদাই শুধু নয়, সবাই একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল।
বুড়োদাদু বলল, “এবার আমাদের পাড়ায় তোমরা দুর্গাপুজো করো। ওই পাশের পাড়ার মিতালি সঙ্ঘের সঙ্গে মিলে নয়। আলাদা ভাবে। একক ভাবে। আমাদের নিজের পাড়ার দুর্গাপুজো। এটা যদি করতে পারো, তা হলেই আমি খুশি হব। এত বয়স হল, সামনের বার হয়তো আমি আর থাকবই না। তাই এবার তোমরা যদি করো… করবে?”
