পঞ্চম অধ্যায়
সতু
সামনে দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে নিজের মনে। কেমন উদাসীন আর বৈরাগী যেন। শেষ বিকেলের আলোয় নদীকে এখন মোহহীন সন্ন্যাসী বলে মনে হচ্ছে সতুর।
এমনটা যদি ও নিজে হতে পারত! তা হলে কষ্ট পেত না এ ভাবে। আসলে মানুষ যখন সত্যি সত্যি কারও প্রেমে পড়ে, সে তখন নিজের শত্রু হয়ে যায়। যে কাজ তাকে কষ্ট দেয়, সেটাও সে করে যায় শুধুমাত্র ভালবেসেছে বলে। এর চেয়ে নিজেকে ঠকানো আর কী হতে পারে!
গোপুজ্যাঠা যখন কথকতার আসর বসায় পাড়ার মোড়ে, তখন বলে, “নিজেকে কষ্ট দিয়ো না। নিজের আত্মাকে কষ্ট দিয়ো না। সবার আগে নিজের ভেতরের ভগবানকে চেনো। তার সাধনা করো। এমন কিছু কোরো না, যাতে তোমার মধ্যেকার ঈশ্বর পীড়িত হন।”
মাঝে মাঝে শোনে সতু। মানতেও চায়। কিন্তু পারে না! যেই কুসুমদির মুখটা মনে পড়ে, অমনি কী করে যেন সব গুলিয়ে যায়! নিজের চেয়ে মানুষ যখন অন্যকে বেশি ভালবাসে, তখন সেটা হয়তো মহৎ প্রেমের ইঙ্গিত হয়, কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে, সেটা আসলে আত্মধ্বংসের একটা পথ মাত্ৰ।
আজকাল সারাক্ষণ মাথার মধ্যে কেমন যেন একটা কষ্ট হয় সতুর। কী যে ভাল ছিল ও! তার পর কেন যে এমন করে কুসুমদিকে ভালবাসতে গেল! হ্যাঁ, ও বোঝে যে, এ সবে কারও হাত নেই! এ সব দুর্ঘটনার মতো। কখন যে কে এতে পড়বে তার ঠিক নেই। তা হলেও কোনও একটা বিন্দু তো থাকে, যেখান থেকে ভালবাসার অনুভূতিটা শুরু হয়! কোনও এক বিকেলবেলার ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, জলের ঘটি থেকে মাথা উঁচু করে জল খাওয়া, জলের দাগ ঠোঁট থেকে গড়িয়ে গলার দিকে নেমে যাওয়া, লম্বা দালানে দাঁড়িয়ে রোদের আভার মধ্যে ঘুরে তাকানো! অথবা উঠোনের শিউলি গাছের তলায় দাঁড়িয়ে হাত ভর্তি সাদা-কমলা ফুলের মধ্যে নাক ডুবিয়ে দেওয়া!
কোনও না-কোনও একটা মুহূর্তে তো সতু সেই ভাল লাগা থেকে ভালবাসায় যাওয়ার বিন্দুটা পার করেছিল! সেদিন, সেই মুহূর্তে যদি নিজেকে আটকাতে পারত, তা হলে তো এমন করে কষ্ট পেত না আজ। কিন্তু মনের অগোচরে বসে থাকা আর-একটা মন মানুষের সঙ্গে কী শত্রুতাই না করে! সে যেন অনেকটা সিঁধেল চোরের মতো!
আজ গঙ্গার পাড়ে কী হাওয়া! মাথার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সতুর। দূরে নৌকা ভাসছে দু’-একটা। কী সব ময়লা ভেসে যাচ্ছে নদী দিয়ে! কলকাতার অবস্থা ভাল নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। জাপানিরা নাকি কলকাতা আক্রমণ করবে। তারা নাকি উড়োজাহাজ করে এসে বোমা ফেলবে। মানুষজন ভয় পেয়ে যাচ্ছে। দলে দলে তারা কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
ওদের পাশের ঘরের ভাড়াটে সুধীরকাকু চাকরি করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। সেদিন একটা পুরনো রেডিও সেট কিনে এনেছে। তাতে মাঝে মাঝে খবর শোনে গোটা বাড়ির ভাড়াটিয়ারা। সেখানে যেমন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির কথা শুনেছে সতু, তেমন শুনেছে জাপানি বোমার খবরও। কোনটা যে ভাল আর কোনটা মন্দ, সব গুলিয়ে যাচ্ছে ওর।
এ দিকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চলছে, আর ও দিকে যুদ্ধ! বাজারে জিনিসপত্রের দাম আগুন! বাবা খেতে বসে বলে আজকাল। বাবা নাকি মাঝে মাঝে ভাবে চাকরি ছেড়ে আবার গ্রামে ফিরে যাবে। আবার কখনও বলে, কারখানার কাজের পরে বড়বাজারে মারোয়ারিদের গদিতে পার্ট টাইম হিসেবপত্র দেখাশোনার কাজ করবে।
সতু বোঝে, বাবা বিভ্রান্ত। আর শুধু বাবা নয়, এই সময়ে সবাই যেন আতান্তরে পড়ে যাওয়া মানুষ। মাঝসমুদ্রে জাহাজডুবির পরে কাঠ ধরে ভেসে থাকা জনগণ! আজ খেতে পাচ্ছে, কিন্তু কাল কী হবে কেউ জানে না! সেখানে সতু প্রেম নিয়ে ভাবছে! ছিঃ! নিজেকে মাঝে মাঝেই ধিক্কার দেয় সতু। মনে হয় পায়ের চটি খুলে সপাসপ করে লাগিয়ে দেয় নিজের গালে। আর মনে মনে সেই অভিশপ্ত সময়ের বিন্দুটিকে খোঁজে, যার পর থেকে ও নিজেই নিজের শত্রু হয়ে গিয়েছে।
তিনুদার ভাল নাম তৃণাভকান্তি মুখোপাধ্যায়। নরম করে কথা বলে তিনুদা। প্রাণ খুলে হাসে। বড় বড় চোখ করে তাকায়! কী যে সুন্দর তিনুদা! কুসুমদি যে এমন লোকের প্রেমে পড়বে, এতে আর অস্বাভাবিক কী আছে!
সেই যে ফেভারিট কেবিনে সেদিন গিয়েছিল সতু, সেদিনই প্ৰথম আলাপ হয়েছিল তিনুদার সঙ্গে। সেই রাজাবাজারের ওই ছোট্ট গলিতে তো দূর থেকে আগেই দেখেছিল, কিন্তু আলাপ হয়েছিল এই প্রথম।
ওর হাতে ব্যাগ দেখে আর তিনুদার খোঁজ করছে শুনে একটা রোগামতো ছেলে কেবিনের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসে সতুকে নিয়ে গিয়েছিল পাশের একটা সরু গলিতে। তার পর ভাল করে জিজ্ঞেস করেছিল ওর সম্বন্ধে
কুসুমদির শিখিয়ে দেওয়া কথা অনুযায়ী সতু বলেছিল, “কুসুমে কুসমে চরণ চিহ্ন দিয়ে যাও।” রোগামতো ছেলেটা এবার হেসেছিল। তার পর মুখের মধ্যে আঙুল পুড়ে শিস দিয়েছিল জোরে।
কাছের একটা পুরনো বাড়ির কাঠের দরজা খুলে গিয়েছিল এবার। আর বেরিয়ে এসেছিল সবুজ হাফ শার্ট আর ধুতি পরা তিনুদা।
তিনুদার হাতে একটা ব্রাউন পেপারে মোড়ানো বাক্স ছিল। তিনুদা এসে হেসেছিল ওর দিকে তাকিয়ে। তার পর বলেছিল, “আমি তৃণাভকান্তি মুখোপাধ্যায়, তিনু। আর ও বলাই। তুমি সতু তো? কুসুম খুব বলে তোমার কথা। বলে, তুমি খুব ভাল ফুটবল খেলো। খুব সাহসী। ব্যাগটা দাও তোমার।”
বলাই মানে যে ওকে এই গলিতে নিয়ে এসেছিল আর হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়েছিল পাশে।
সতু কী বলবে বুঝতে না পেরে হাতের থলেটা এগিয়ে দিয়েছিল। তিনুদা সেটার মধ্যে ভরে দিয়েছিল ব্রাউন পেপারে মোড়ানো বাক্সটা। তার পর বলেছিল, “আরাম করে সাইকেলে ঝুলিয়ে নিয়ে যাবে। তাড়াহুড়ো করবে না। চোখ-মুখ স্বাভাবিক রাখবে। কেমন? ভয় পাবে না। এটা আমাদের দেশ। এখানে আমরাই সব।”
সতুর মনটা এমন খারাপ হয়েছিল যে, জানতেও ইচ্ছে করছিল না ওই বাক্সে কী আছে। ওর কেবলই মনে হচ্ছিল, এই তিনুদা! একেই ভালবাসে কুসুমদি! এর জন্য সব করতে পারে!
সতু জানে এমন অভদ্রের মতো চুপ করে থাকতে নেই। তাই ও সৌজন্যমূলক ভাবে বলেছিল, “আপনার ভয় লাগে না?”
“ভয়?” মাথা তুলে হেসেছিল তিনুদা। তার পর বলেছিল, “কেন লাগবে না? আমিও মানুষ যে! কিন্তু দেশ তো আমাদের মা। তাকে কেউ নিপীড়ন করবে, সেটা সন্তান হয়ে মেনে নিই কী করে বলো! মাকে যে ভালবাসি আমরা! আসলে ভালবাসার জোরটা ভয়ের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ভয়ের কথা মাথায় আসে না। এই যে তুমি। তুমি তো জানো আমি কিসের সঙ্গে যুক্ত, তাও এসেছ। কেন? কারণ, তোমার পুলিশের ভয়ের চেয়ে কুসুমের প্রতি ভালবাসার জোরটা বেশি, তাই না?”
কী বলল এটা তিনুদা! কুসুমদির প্রতি ভালবাসা! তিনুদা জানল কী করে!
তিনুদা হেসে ওর কাঁধে হাত দিয়ে বলেছিল, “ভাল করে খেলো! বড় মানুষ হতে হবে। আজ না হোক কাল, আমরা ঠিক দেশ স্বাধীন করে দেব। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই যে থাকব না! তখন দেশটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে ভাল করে চালাতে হবে তো! দেখতে হবে তো যে, দেশ যেন স্বার্থপর, লোভী আর সুযোগসন্ধানীদের হাতে না পড়ে। আমাদের এত ভালবাসার, এত কষ্টের স্বাধীন করা দেশ কিছু লোভী আর খারাপ লোক যেন নষ্ট করতে না পারে, সেটা তোমাদেরই দেখতে হবে সতু।”
কী সুন্দর বলছিল তিনুদা! শেষ বিকেলের আলো সরু গলির রংচটা দেওয়ালে পড়ে কেমন যেন ম্রিয়মান হয়েছিল! তার মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনুদা কী উজ্জ্বল! সত্যি, এমন মানুষকে ভাল না বেসে আর কাকে ভালবাসবে কুসুমদি!
তিনুদা জিজ্ঞেস করেছিল, “কোন পজিশনে খেলো তুমি?”
“রাইট আউট,” সতু বলেছিল।
“জুসেপ্পে মিয়াৎজ়ার নাম শুনেছ?” তিনুদা জিজ্ঞেস করেছিল।
মাথা নেড়েছিল সতু, শোনেনি।
“ইটালির ফুটবলার। তাঁকে কেউ কেউ এখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফুটবলারও বলে। আগে ইটালির ইন্টার মিলান নামে একটা টিমে খেলতেন। আর এখন এসি মিলানে খেলেন। দুটো বিশ্বকাপ জিতেছেন ইটালির হয়ে। ইউরোপিয়ানদের তুলনায় মিয়াজ্জার ছোটখাটো চেহারা, কিন্তু অসাধারণ স্কিল! সতু, শুধু খেললেই হবে না। খবরও রাখতে হবে, কেমন? আচ্ছা, আজ এসো ভাই। সাবধানে যেয়ো,” তিনুদা আলতো করে হাত রেখেছিল সতুর মাথায়।
ওইটুকু সময়ের মধ্যেই তিনুদাকে কী যে ভাল লেগে গিয়েছিল সতুর! কিন্তু আবার কষ্টও হচ্ছিল এটা ভেবে যে, এই ছেলেটাকে ভালবাসে কুসুমদি। সত্যি মন এক অতি বিচিত্র নিরাকার উপদ্রব বিশেষ।
বাড়িতে ফিরে সতু ব্যাগটা দিয়েছিল কুসুমদিকে। কুসুমদি ঠোঁট কামড়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তার পর বলেছিল, “তুই জানিস, কী নিয়ে এসেছিস সঙ্গে করে?”
“না,” সতু ছোট্ট করে মাথা নেড়েছিল।
কুসুমদি দ্রুত হাতে ব্রাউন পেপারের মোড়ক খুলে বাক্সটা বের করেছিল। তার পর তার ডালাটা খুলে দেখিয়েছিল, “এই দেখ।”
সতু অবাক হয়ে দেখেছিল, দুটো বন্দুক আর তার সঙ্গে একটা থলে!
কুসুমদি বলেছিল, “থলেতে গুলির ম্যাগাজিন আছে। আর এগুলো জার্মান পিস্তল। নাম লুগার। হাই রেঞ্জ নাইন মিলিমিটার পিস্তল। আটটা গুলি ধরে ম্যাগাজ়িনে। পাতলা দেওয়ালও ভেদ করে দেয় এর গুলি। দামি জিনিস।”
“তোমায় দিয়েছে কেন?” সতুর বুক কাঁপছিল।
“কারণ, তিনুকে তো নানান জায়গায় ঘুরতে হয়। ওর ছ’ঘড়ার রিভলভার আছে, কিন্তু এটা দামি জিনিস, হারিয়ে গেলে বিপদ। দরকারমতো ও আবার নিয়ে নেবে,” কুসুমদি হেসেছিল।
সতু জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি পিস্তলের ব্যাপারে জানলে কী করে? তুমি চালাতে জানো পিস্তল?”
কুসুমদি উত্তর দেয়নি। বাক্সটা বন্ধ করে তুলে রাখতে রাখতে বলেছিল, “এসব কথা যে কাউকে বলতে নেই, সেটা নিশ্চয়ই তোকে বলে দিতে হবে না?”
.
“সতু, শোনো।”
সতুর যেন ঘোর কাটল এই ডাকে। ও পেছন ফিরল। কে ডাকছে ওকে? ও ঘুরে তাকাল, আরে বলাই!
সতু উঠে ঘাটের ধাপ ভেঙে এগিয়ে গেল বলাইয়ের দিকে।
“একটু আসবে? তাড়াতাড়ি,” কথাটা বলেই বলাই আর দাঁড়াল না! রাস্তার দিকে হাঁটা দিল। সতুও এগোল পেছন পেছন।
ঘাটের কাছের রাস্তা অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। সতু দেখল, বলাই একটু দূরের একটা কুমোরের দোকানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সতুও গেল দোকানে। আর তখনই দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তিনুদা।
“তুমি!” সতু অবাক হল, “আমি এখানে আছি জানলে কী করে?”
তিনু হাসল, “আমাদের জানতে হয়। শোনো, মেদিনীপুরে কিছু ঝামেলা হয়েছে। পুলিশ আমাদের খুঁজছে। তাই এ ভাবে তোমার সাহায্য নিতে হচ্ছে। এটা তুমি একটু কুসুমকে দিয়ে দেবে?”
সতু দেখল, একটা বড় ঠোঙা এগিয়ে দিল সতু।
“কী এটা?” সতু সতর্ক গলায় জিজ্ঞেস করল।
“ভয় নেই,” তিনু হাসল, “এতে একটা ছোট্ট গাছের চারা আছে। ছাতিম গাছের চারা। ওকে দিয়ে দেবে? পরশু ওর জন্মদিন। আর ওকে বোলো, খুব শিগগিরি আমি ওর সঙ্গে দেখা করব। আর সেদিন ওকে আমি অন্য একটা জিনিস… না থাক। তুমি এটুকুই বোলো।”
সতু ঠোঙাটা খুলে দেখল, একটা নারকোলের মালার মধ্যে মাটি দেওয়া। তাতে পোঁতা আছে ছোট্ট একটা গাছের চারা।
সতু বলেছিল, “গাছ!”
তিনু বলেছিল, “হ্যাঁ, ছাতিম গাছের চারা। তুমি জানো এই গাছের ভাল নাম কী?”
সতুর বুকের মধ্যে কী যে কষ্ট হল! কুসুমদির জন্য প্রেমের উপহার ওকে বহন করতে হবে! জীবন এত নিষ্ঠুর হয়!
ও দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে মাথা নাড়ল। বলল, “জানি তিনুদা। সপ্তপর্ণী।”
.
আজ তিন তলাটা কেমন যেন থমথম করছে। সতু ঠোঙাটা নিয়ে দালানে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। দেখল, পাখির খাঁচায় বসে পাখিটা ঝিমোচ্ছে। সার সার জামাকাপড় মেলা। আর জেঠিমা দালানের ওই পাশে বসে জাঁতি দিয়ে সুপুরি কাটছে। ওকে দেখে হাতের ইঙ্গিতে কুসুমদির ঘরটা দেখিয়ে দিল। সতু কুসুমদির ঘরের দিকে এগোল।
ঘরের ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। একটা মোমবাতি জ্বলছে শুধু। তার সামনে টেবিলে হাত পেতে তাতে মাথা রেখে বসে আছে কুসুমদি। সতু গিয়ে দাঁড়াল পাশে। দেখল, কুসুমদির চোখ থেকে জলের রেখা গাল বেয়ে, হাত বেয়ে টেবিলে পড়ছে।
ওকে দেখে কুসুমদি তাড়াতাড়ি চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল।
“তুমি কাঁদছ কুসুমদি? কী হয়েছে?” সতু জিজ্ঞেস করল।
কুসুমদি উঠে আসা কান্নাটা গিলে নিল জোর করে, তার পর বলল, “কিছু বলবি?”
“তিনুদা যোগাযোগ করেছিল আমার সঙ্গে। বলেছে, খুব শিগগিরি এসে দেখা করবে তোমার সঙ্গে। আর এটা দিয়েছে,” সতু ঠোঙাটা এগিয়ে দিল।
ঠোঙাটা নিল কুসুমদি। তার পর খুলে দেখল! বলল, “ছাতিম!”
সতু দেখল, কুসুমদির চোখে আবার জল এসেছে।
“কেঁদো না কুসুমদি! কষ্ট হয় আমার,” শেষের তিনটে শব্দ যাতে কেউ শুনতে না পায় তেমন করে খুব মৃদু স্বরে বলল সতু।
কুসুমদি তাকাল ওর দিকে। তার পর ফোঁপানো গলায় বলল, “বাবা মেরেছে আমায়! তিনুর ব্যাপারে জেনে গিয়েছে। কী করে জানি না! বাবা বলেছে সামনের অঘ্রানেই বিয়ে দিয়ে দেবে। আমার যে কী কষ্ট হচ্ছে…. ওকে ছেড়ে আমি থাকব কেমন করে সতু?”
কথাটা শেষ করেই কুসুমদি হাতের গাছটা টেবিলে রেখে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল সতুকে। তার পর ওর ঘাড়ে মাথা রেখে ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল।
সতুর যে কী হচ্ছে ও কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। কী সুন্দর গন্ধ কুসুমদির গায়ে! কী নরম কুসুমদি! সারা শরীর থেকে উত্তাপ ছড়াচ্ছে যেন!
সতুর খুব ইচ্ছে হল কুসুমদির সরু মসৃণ কোমরে হাত রাখতে। ইচ্ছে হল কুসুমদিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু ও ধরল না। কুসুমদি যে তিনুদার! ওর তো নয়! আর যে সতুর নয় তাকে ও স্পর্শ করে কী করে! মোমের আলোয় আবছায়া ঘরে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সতু।
নয়
ইজনা
ওই দূরে দাঁড়িয়ে সিমি ফোনে কথা বলছে। তা প্রায় মিনিট দশেক হল। কী যে বিরক্ত লাগছে!
ঘড়ি দেখল ইজনা। সওয়া চারটে বাজে। রিতুরা নাকি এসে গিয়েছে বাড়িতে। নাঃ, এবার ফিরতেই হবে। সিমিকে জোর দিয়েই বলতে হবে যে, বাড়িতে কাজ আছে।
কত দিন পরে একটা ছুটির দিন পেয়েছিল ইজনা, কিন্তু সেটাও আজ ঘেঁটে গেল সিমির জন্য। মেয়েটা যে কী! এমন সব আবদার করে! কিছু বলতেও পারে না। ওর জেঠু সাহায্য করেছে ইজনাদের পাড়ার ক্লাবকে। আর সেটা সিমি বলেছে বলেই না করেছে! এটা তো আর অস্বীকার করতে পারে না।
তাই সিমি যখন বলেছিল আজ শপিং মলে যাবে, তখন না করতে পারেনি।
মা আপত্তি করেছিল। বলেছিল, “ছুটির দিন, আজও বেরোবি? পায়ের তলায় চাকা লাগানো আছে তোর? তা ছাড়া রিতু আসছে আজ বাপের বাড়ি থেকে ভুতোকে নিয়ে। জানিস না, ভুতো তোকে না দেখলে কেমন করে?”
ভুতো মানে দাদার ছেলে। পাঁচ বছর বয়স। সাত দস্যির এক দস্যি। রিতুকে তো মানেই না। দাদাকেও না। যা মানে, একমাত্র ইজনাকে। ইজনাকে যেমন ভয় পায়, তেমন ভালওবাসে। এই যে রিতু বাপের বাড়ি গিয়েছে, সেখানেও ভুতো যেতে চায়নি। কী না, পিপি মানে ইজনার কাছে থাকবে!
আর সেখানে গিয়েও কি রেহাই আছে? ভুতো ভিডিয়ো কল-টল সব করতে শিখে গিয়েছে। যখন তখন ভিডিয়ো কল করে।
গত পরশু ক্লাস নেওয়ার সময় ভিডিয়ো কল করে দিয়েছিল। ধরেনি ইজনা। ব্যস, ছেলের রাগ হয়ে গিয়েছে। তাই ওকে না বলে মাকে ফোন করে বলেছে যে আজ ফিরছে, পিপি যেন বাড়ি থাকে।
ভুতোর জীবনে পিপি ছাড়া আর কেউ নেই। ও তো স্থির করে নিয়েছে বড় হলে পিপিকেই বিয়ে করবে। বাচ্চারা এই বিয়ে করার ব্যাপারটা কোথা থেকে শেখে কে জানে! কোথা থেকে এই ধারণা করে নেয় যে, বিয়ে করলেই কাউকে আটকে রাখা যায়!
ইজনাও ভেবেছিল বেরোবে না। আজ ও নিজে বিরিয়ানির আয়োজন করেছিল। রিতু এলে রাতে বানাবে। ভেবেছিল সারা দিন বসে সিনেমা দেখবে। কিন্তু তার আর উপায় কই! সিমি থাকতে ইজনার কি আর সুস্থির থাকার জো আছে!
মা তাই খুব রেগে গিয়েছিল।
ইজনা বলেছিল, “উপায় নেই মা। আমার ইচ্ছে করছে না যেতে, কিন্তু ওকে ‘না’ করা যাবে না।”
“সেই! সারা পৃথিবীকে না করতে পারিস না, শুধু আমার সঙ্গে জেদ দেখাতে আর চোপা করতে পারিস,” মা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
“আমি আবার কী করলাম!” ইজনা অবাক হয়েছিল।
মা যেন সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, “আমি কত দিন বলছি বিয়ে কর, বিয়ে কর! তিরিশ হল। তুই কী ভেবেছিস? ষাট বছরে বিয়ে করবি?”
আবার সেই এক টপিক! ইজনার মনে হচ্ছিল এক দৌড়ে পালিয়ে যায়।
মা বলেছিল, “হাট্টিম তোকে এত ভালবাসত, তাকে দিলি তাড়িয়ে। কেন দিলি, সেটা কেউ জানে না। তার পর বিয়েও করছিস না। এত ছেলের কথা বললাম। ছবি দেখালাম, পছন্দ নয় তোর! অঞ্জন না কে, তাকে কি বিয়ে করতে চাস?”
“হাট্টিম ইজ় সোওও পাস্ট মা! দু’বছরে আমি অনেক এগিয়ে গিয়েছি ওই সব থেকে। আর পাগল নাকি আমি? অঞ্জন! ওই জোকারটাকে বিয়ে করব?” ইজনা বিরক্ত হয়েছিল। তার পর উঠে জামাকাপড় নিয়ে পাশের ঘরে গিয়েছিল।
মা তাও নিজের মনেই বকবক করে যাচ্ছিল। আর কান দেয়নি ইজনা। কী হবে! বিয়ে নিয়ে ও কিছু ভাবছে না। বিয়ে যেন করতেই হবে! সবাইকে এক ছাঁচে ফেলার ধান্দা!
আর হাট্টিম! কেন মা হাট্টিমের কথা তোলে? জ্বালা করে গা ওর। সেদিন ভাল দিয়েছিল হাট্টিমকে। অঞ্জনের সঙ্গে গাড়ি করে যাওয়ার সময় দেখে কী, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বাবু দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা দোকানের শেডের নীচে! কেমন একটা ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না ধরনের ভঙ্গি!
ইজনার মাথাটা চড়াৎ করে গরম হয়ে গিয়েছিল। ও যা করে না কখনও, তাই করেছিল হঠাৎ। গাড়িটাকে দাঁড় করতে বলে জানলার কাচ নামিয়ে ডেকেছিল হাট্টিমকে। মন শক্ত রাখলেও কেমন একটা লাগছিল ইজনার। কত দিন পরে যে নামটা ধরে ডাকল!
হাট্টিম এসে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে উঠতেও গিয়েছিল, কিন্তু তখনই ইজনা নিজে অঞ্জনের দিকে সরে গিয়ে হাট্টিমকে সামনে বসতে বলেছিল। আর সেই বলার মধ্যে ভরে দিয়েছিল রাজ্যের অবজ্ঞা আর অপমান।
আসলে এটাই তো করতে চেয়েছিল ও। চেয়েছিল হাট্টিমকে শাস্তি দিতে। আর শাস্তি যে দিতে পেরেছিল, সেটা হাট্টিমের মুখ দেখেই বুঝেছিল। হাট্টিম গাড়িতে ওঠেনি। চলে গিয়েছিল মাথা নামিয়ে।
খুব ভাল লেগেছিল ইজনার হাট্টিমকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পেরে। পরে অঞ্জন বলেছিল, “কেসটা কী?”
“কিছু না,” ইজনা এমন করে বলেছিল যে, অঞ্জন আর ঘাঁটায়নি ওকে। তবে প্রাথমিকভাবে যে ভাল লাগাটা ছিল ইজনার, সেটা দশ মিনিটও স্থায়ী হয়নি। বরং তার পর থেকে কেমন একটা তেতো স্বাদ লেগে রয়েছে মনে।
.
জামাকাপড় পাল্টে বেরোনোর জন্য রেডি হয়ে মায়ের কাছে গিয়েছিল ইজনা। বলেছিল, “আমি তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করব।”
মা বলেছিল, “ঠিক আছে, যাওয়ার আগে বুড়োদাদুর কাছে এই ক্যাসারোলটা দিয়ে যা। কাকরোলপুর ভাজা আছে। বুড়োদাদু খুব ভালবাসে।”
“আমি নিয়ে যাব? মালতিমাসিকে দাও না!” ইজনা বিরক্ত হয়েছিল।
“না, সব কিছু কাজের লোক দিয়ে হয় না। তুই নিয়ে যা,” মা ওর হাতে ক্যাসারোলটা ধরিয়ে দিয়েছিল।
বুড়োদাদুর বাড়িটা ওদের বাড়ি থেকে হেঁটে মিনিটখানেকের দূরত্বে, পাড়ার অন্য দিকে।
বুড়োদাদু বারান্দায় বসে পেপার পড়ছিল। এই বয়সেও বুড়োদাদু এমন ফিট থাকে দেখে অবাক লাগে ইজনার। লম্বা-চওড়া মানুষ, এখন সামান্য কুঁজো হলেও একাই হাঁটাচলা করে। পরিমিত হলেও সব কিছু খায়! ইজনা শুনেছে এক সময় ফুটবল খেলত বুড়োদাদু।
হাট্টিম মজা করে বলত, “ব্রিটিশ আমলের মাল, ভেজাল নেই!”
বুড়োদাদু ওকে দেখে সামান্য অবাক হয়েছিল, “তুই! কী ব্যাপার!”
ইজনা হাতের ক্যাসারোলটা দেখিয়ে বলেছিল, “মা পাঠিয়েছে। কাকরোলপুর ভাজা। নিতাইকে দিয়ে দিই?”
“পাশের টেবিলে রাখ,” বুড়োদাদু বলেছিল।
ইজনা বলেছিল, “আচ্ছা দাদু, তুমি ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে ভাড়া থাকতে, না?”
বুড়োদাদু যেন সামান্য চমকে উঠেছিল। তার পর বলেছিল, “হ্যাঁ রে। পরে বাবা মারা যায়। আমিও কাজ পেয়ে বাইরে চলে যাই।”
“তা, আবার ফিরলে কেন এখানে?” ইজনা জিজ্ঞেস করল।
“সময় শেষ হয়ে আসছে। তাই ফিরলাম। আমরা তো বাঙাল। গ্রাম ছিল চাঁদপুরে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার উপায় তো আর নেই। তাই এখানেই ফিরলাম। কত স্মৃতি আছে এখানে!” বুড়োদাদু হেসেছিল।
ইজনা ঘড়ি দেখেছিল। তার পর বলেছিল, “আমার বাবার এক ঠাকুমার কথা শুনেছিলাম। তুমি তাকে চিনতে? কুসুম না কী নাম?”
বুড়োদাদু বলেছিল, “তুই কোথায় যাচ্ছিলিস মনে হচ্ছে! ঘুরে আয়।”
ইজনা হেসেছিল। তার পর আর কথা না বাড়িয়ে চলে এসেছিল। ও বুঝতে পারছিল পুরনো সময় নিয়ে কথা বলতে চাইছে না বুড়োদাদু।
রাস্তায় নেমে উবর বুক করে দাঁড়িয়েছিল ইজনা। এর মধ্যেই সিমি চার বার ফোন করে ফেলেছিল ওকে। এমন অস্থির কেন মেয়েটা কে জানে! ফোন ধরেনি ইজনা। শুধু টেক্সট করে জানিয়ে দিয়েছিল যে, আসছে।
ইজনা বিরক্ত হয়ে অ্যাপে দেখছিল গাড়িটা কত দূর এল। আর তখনই শুনেছিল, “কী রে, তুই এখানে! কাল এলি না তো ম্যাচে!” রাখো
বাজারের ব্যাগ হাতে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে।
ইজনা জানে ওই ফুটবল টুর্নামেন্টটা শুরু হয়ে গিয়েছে। কাল নক আউটের প্রথম ম্যাচ ছিল।
ও বলেছিল, “কাজ ছিল রে।”
“আরে, পাড়ার সাপোর্ট দরকার, জানিস না! তবে অসুবিধে হয়নি। দু’গোলে জিতেছি। পাতাদা দুটো নিশ্চিত গোল বাঁচিয়েছে। না হলে কেলো হয়ে যেত মাইরি। পাতাদা যে ম্যানুয়েল ন্যয়ার কে জানত বল!” রাখো হাসল, “আর দুটো ম্যাচ। প্লিজ়, আসিস পরের ম্যাচে। পাড়ার প্রেস্টিজ বলে কথা!”
হ্যাঁ, ও জানে কাল ভারতী সঙ্ঘ ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু আরও দুটো ম্যাচ আছে। সে দুটো না জিততে পারলে সব বেকার হয়ে যাবে। ইজনা দেখায় না বটে, কিন্তু ওর টেনশন হয় খুব
রাখো বলেছিল, “পরের দুটোও জিতব। হাট্টিমের টাচ এখনও দারুণ আছে।”
“ওই আমার গাড়ি এসেছে, আমি গেলাম,” ইজনা আর কথা বাড়াতে দেয়নি রাখোকে।
গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করেছিল ইজনা। রাখো তাও পিছু ছাড়েনি। এসে দাঁড়িয়েছিল গাড়ির জানলায়। বলেছিল, “আরে আরে, শোন না! একটা কথা, খুব ইমপর্ট্যান্ট!”
“আবার কী! আমার দেরি হচ্ছে,” ইজনা বিরক্তি লুকোয়নি।
“আরে, রাখ তোর দেরি! আমার এ দিকে চাপে চাপাটি হওয়ার অবস্থা!” রাখো অস্থির হয়েছিল, “আমি সেদিন মুদ্রার সঙ্গে বেরিয়েছিলাম একটু। কাউকে জানাইনি। আচ্ছা, মুদ্রা মেয়েটার কি সত্যি আগে একবার বিয়ে হয়েছিল?”
ইজনা মাথা নেড়েছিল। এই ছেলেটা যে কী! ও বলেছিল, “এটা আমায় জিজ্ঞেস করছিস? মুদ্রাকে জিজ্ঞেস কর।”
রাখো বলেছিল, “না না, ও আমায় বলেছে নিজেই। আগেও বলেছিল। আবার এখন বলেছে। কিন্তু মানে… আমি যে কী করব! মাকে যে কী বলব!”
ইজনা বলেছিল, “কেন? মাকে বল! আশ্চর্য! মেয়েটার তোকে পছন্দ, বুঝতে পারিস না?”
“হ্যাঁ, পারি। ও বলেছে আমায়। প্রোপোজ় করেছে। তার পর থেকে শালা ভয়ে আমার হাল খারাপ। কাল ম্যাচেও কত যে মিস পাস করলাম ওর কথা ভাবতে গিয়ে! মা যদি জানে ওর আগে বিয়ে হয়েছিল…. মানে কী যে করব!” রাখো অস্থির হয়ে গালে হাত ঘষেছিল।
ইজনা বলেছিল, “বি আ ম্যান! তোর ওকে পছন্দ কি না সেটা ভাব আগে। আমি আসি।”
গাড়ি যখন পাড়ার মোড় পার করছিল, ইজনা পেছন ঘুরে দেখেছিল, রাখো দাঁড়িয়ে রয়েছে একা, কনফিউজড।
.
“এই আর কী খাবি বল!” সিমি ফোনটা রেখে সামনের চেয়ার টেনে বসল।
“এই বিকেলে জোর করে বিরিয়ানি খাওয়ালি! এটাই তো বাড়াবাড়ি হয়ে গেল! আর কী খাব!” ইজনা বিরক্ত হল।
সেই দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে বিরাট মলটায় ঘুরছে ওরা। সিমির যেন কেনাকাটা আর শেষ হয় না। কমপক্ষে দশ-বারোটা ব্যাগ হয়েছে! কিসের এত কেনাকাটা কে জানে! জিজ্ঞেস করলেও এখনও বলেনি। উপরন্তু ইজনাকেও একটা দামি ঘড়ি কিনে দিয়েছে। ইজনা কত বার বলল, নেবে না। কিন্তু মেয়েটা কারও কথা শুনলে তো! কী চায় সিমি? এ ভাবে ওকে নিয়ে ঘোরাচ্ছে কেন? কিছু কি বলতে চায়?
ইজনা দেখল, সিমির মুখটা খুশি খুশি দেখাচ্ছে। যাকে বলে ‘বিমিং’! কী ব্যাপার কে জানে!
সিমি বলল, “শোন না, আমাকে রিতেশ এখন ফোন করেছিল। ও দারুণ ছেলে!”
“রিতেশ আবার কে!” ইজনা অবাক হল, “এ যে নতুন ক্যারেকটার!”
“ও, তোকে তো বলিনি! বাবার কলিগের ছেলে। এত দিন অস্ট্রেলিয়ায় ছিল। রিসেন্টলি ফিরেছে! হি ইজ সো ফানি! আজ রাতে ওর সঙ্গে ডিনারে যাব। তাই তো শপিং করলাম!”
ইজনা অবাক হল, “কত দিন চিনিস ওকে?”
“জাস্ট দু’দিন! বাট হি ইজ় সো ফানি!” সিমির মুখে যেন আলো জ্বলে উঠল, “উই জাস্ট ক্লিকড! আর ওর কোনও বায়াসনেস নেই। আমার স্মোকিং বা ড্রিঙ্কিং নিয়ে ওর রিজার্ভেশান নেই। আনলাইক গগন, রিতেশ ইজ্ সো আন্ডারস্ট্যান্ডিং!”
“কী! গগন! মানে?” ইজনা অবাক হল।
সিমি মাথা নিচু করল এবার। উত্তর না দিয়ে খাবারের প্লেটের ওপর রাখা ফর্কটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল।
“সিমি, ব্যাপারটা কী রে! তোর হাবভাব আমার ভাল লাগছে না। কেসটা কী?” ইজনা হাত বাড়িয়ে সিমির হাতটা ধরল।
সিমি তাকাল ওর দিকে। ছোট্ট করে নাক টানল। আশপাশে বসে থাকা মানুষজনকে দেখল। তার পর বলল, “আসলে কী জানিস, মানে গগনকে আমার আর ভাল লাগছে না! মানে, হি ইজ় সো মানডেন! টাকাপয়সা খুব হিসেব করে খরচ করে। মানে, আমায় এখনও কোনও গিফট দেয়নি, জানিস! মানে আই ডোন্ট নিড এনিথিং ফ্রম হিম। বাট স্টিল, জেশ্চার কাউন্টস। তাই না?”
“তুই কী বলতে চাইছিস বল তো,” ইজনা অবাক হয়ে তাকাল সিমির দিকে। খুব অবাক লাগছে ওর! ক’দিন আগেই তো ‘গগন-গগন’ করে মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। আর আজকেই আবার কে এক রিতেশ, তার জন্য এমন গদগদ ভাব করছে!
“মানেটা কী বল তো? গগন জানে?” ইজনা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
“জানবে… মানে আমি জানাতে পারছি না। ইজনা…” সিমি আদুরে গলায় তাকাল, “তুই ওকে বলে দিবি যে, আমি আর ওর সঙ্গে নেই!”
“কী!” ইজনা এবার বুঝল ওকে কেন ডেকে এনেছে সিমি! আর কেনই-বা এতক্ষণ ঘুরিয়েছে! মানে, এই আবদারটাই করতে পারছিল না এতক্ষণ!
সিমি এবার উল্টো দিকের চেয়ার ছেড়ে উঠে ওর পাশে এসে বসল, তার পর বলল, “তুই প্লিজ় গগনকে আমার লাইফ থেকে কাটিয়ে দে! আমার আসলে একটা ইনফ্যাচুয়েশন হয়েছিল। এখন কেটে গিয়েছে। প্লিজ় ইজনা! না করিস না! ওর নামের ট্যাটুটাও আমি অন্য ডিজ়াইন দিয়ে ঢেকে দেব।”
ইজনার মাথাটা গরম হয়ে গেল এবার। বলল, “এটা ইয়ার্কি নাকি? এই ভাল লাগছে! এই লাগছে না! যা খুশি তাই! ও তো একটা মানুষ! আমি পারব না বলতে। ও আমাকে আগেই বলেছিল এটা হবে। আর ঠিক এটাই হল। তোর ঝামেলা আমি সামলাতে পারব না।”
“প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ়!” সিমি ওর হাত ধরল, “আমি তোকে হেল্প করিনি, বল! জেঠুর কাছে নিয়ে যাইনি! প্লিজ ইজনা। আই লাইক রিতেশ। আমি গগনকে ভালবাসি না। আমি বুঝেছি সেটা! আসলে আমাদের স্টেটাস মিলছে না। বোঝ একটু। প্লিজ হেল্প মি!”
ইজনা মাথা নিচু করল। ওকে হেল্প করার কথাটা সেই তুললই সিমি! ইজনা জানে, ও যদি কথা বাড়ায়, আরও বাড়বে। ইজনা এটাও জানে,
গগন অনেক ব্যালেন্সড ছেলে! ওকে বোঝালে ও বুঝবে। কষ্ট পাবে হয়তো, কিন্তু বুঝবে!
ইজনা দাঁড়াল, “ঠিক আছে আমি কথা বলব। বাট দিস ইজ় দ্য লাস্ট টাইম! আমি এবার বাড়ি যাব। আর আজকের খাবারের টাকাটাও আমিই দেব।”
“আরে, তা কেন?” সিমি অবাক হল, “আর, আমি ছেড়ে দিচ্ছি তোকে বাড়িতে।”
“না,” ইজনা শক্ত গলায় বলল, “সব তোর মনমতো হবে নাকি?”
সিমি থতমত খেয়ে গেল। ইজনা সামলাল নিজেকে। ও একটু জোরেই বলে ফেলেছে কথাটা। আশপাশের লোকজন দেখছে। ইজনা ব্যাগ থেকে হাজার টাকা বের করে টেবিলে রাখল। তার পর ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে যাবে বলে পা বাড়াল।
“তোর ঘড়িটা,” সিমি দুর্বল গলায় বলল।
ইজনা ঘুরে তাকাল, “ঘড়ি, না গগনকে বলা? চুজ!”
“আচ্ছা আচ্ছা, সরি! ফর দ্য লাস্ট টাইম! গগন!” সিমি কাঁচুমাচু মুখ করল।
ইজনার হাসি পেল। মাঝে মাঝে বিরক্তি ও হতাশার সীমা ছাড়ানোর পরে মানুষের আর হাসা ছাড়া কিছু করার থাকে না! ও জানে, সিমির অভিনয় এটা। যারা অভিনয় করে, তারা ভাবে অন্যরা বোকা। ইজনা মাথা নাড়ল নিজের মনে। তার পর আর দাঁড়াল না। আবার গাড়ি বুক করতে হবে। ফালতু একগাদা টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। ডিসগাস্টিং!
.
বাড়িতে ঢোকামাত্র ভুতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ইজনার ওপর। ওর চুল ধরে টেনে, খামচে একশা করে দিল! তার পর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল, কেন ওর ভিডিয়ো কল ধরেনি ইজনা। সেটাই রাগ!
এইটুকু ছেলে! তার কী জেদ! অবাক হল ইজনা। তবে ভালও লাগল। আজকাল এমন করে ভালবাসে না তো কেউ! সবাই এত মেপে চলে যে, সব প্লাস্টিকের মতো লাগে।
ভুতোকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ বসে রইল ইজনা। কান্নাটা থামতে দিল। তার পর কোলে তুলে নিল। বলল, “রাগ শেষ হয়েছে ভুতোবাবুর?” ভুতো লাল ভেজা চোখ তুলে তাকাল ওর দিকে। তার পর ইজনার গালে হাত বুলিয়ে বলল, “তোমার লেগেছে পিপি?”
“না সোনা, লাগেনি,” ইজনা হাসল।
ভুতো ইজনাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মাথা রাখল। বলল, “আমি কোল থেকে নামব না।”
“কেন নামবি না? ধেড়ে ছেলে একটা!”
রিতু সামান্য শাসনের ভঙ্গিতে কথাটা বলতে বলতে ঘরে ঢুকল। ইজনা দেখল মা-ও ঢুকেছে সঙ্গে। মায়ের মুখ বেশ ঝলমল করছে।
ইজনা বলল, “না নামুক। ও কোলেই থাকবে!”
মা এ সবের ধারেপাশে না-গিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, “আরে, এ সব বাদ দে! আসল কথাটা শোন। দারুণ খবর! ভুতোর আবার ভাই বা বোন আসছে! রিতু আমায় বলল আজ!”
ইজনা অবাক হল। রিতু প্রেগন্যান্ট! ও অবাক হয়ে তাকাল। এ তো দারুণ খবর!
মা বলল, “কী যে ভাল লাগছে! এবার মেয়েটার বিয়ে হলে বাঁচি!”
“মা, আবার!” ইজনা কী বলবে বুঝতে পারল না। মা সব কথাকেই আজকাল এই ওয়ান লাইনারে নিয়ে আসে।
“নয়তো কী! কেন করবি না বিয়ে! হাট্টিম ওদিকে বিয়ে করছে জানিস? ওর বড়মামির সঙ্গে দুপুরে কথা হচ্ছিল। আজ বিকেলে মেয়ের বাড়ির লোক আসছে কথা বলতে, জানলাম। আর তুই বিয়ে করবি না! কেন রে?”
ইজনার মনে হল কেউ ওর বুকে যেন হাতুড়ি দিয়ে মারল আচমকা! কী শুনল এটা! হাট্টিমের বিয়ে! সত্যি! আচমকা শ্বাস নিতে কষ্ট হল ইজনার। আবার মনে পড়ে গেল সেই দৃশ্যটা! আর চোখটা জ্বালা করে উঠল! ইজনা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেও এটা বুঝল যে, গত দু’বছরে ওর মন আগের জায়গা থেকে এক মিলিমিটারও এগোতে পারেনি। বুঝল, আসলে কিছুই ‘পাস্ট’ নয়। সব ঘোরতর ভাবে ঘটমান বর্তমান।
দশ
হাট্টিম
উড়ে আসা বলটা বুক দিয়ে নামিয়ে ডান পায়ে ছোট্ট আউট সাইড করে ওদের রাইট ব্যাককে কাটিয়ে নিল হাট্টিম। সামনে শুধু ওদের স্টপার। ছেলেটা এক সময় রাজস্থানে খেলত। মুখ চেনে হাট্টিম। জানে ডান পা বাড়িয়ে শেষ মুহূর্তে কেমন বাঁ পায়ে ট্যাকল করতে পারে ও!
হাট্টিম বলটা নিয়ে এগোল সামনে। ডান দিক দিয়ে রাখোকে উঠতে দেখল ও। সারা মাঠ দাঁড়িয়ে পড়েছে। কাউন্টার অ্যাটাকে হু হু করে উঠছে ভারতী সঙ্ঘ। এতক্ষণ দক্ষিণ কলকাতার ‘কুল বয়েজ়’ ক্লাবের টিমটা চেপে ধরেছিল সাংঘাতিক ভাবে। গোলে পাতাদা না থাকলে আজ যে কত গোল খেত! ডিফেন্সে পাড়ার মন্টু, পেনসিল আর জগাদা প্ৰাণপণে লড়াই করছে। তার পরও চারটে বল বারে আর পোস্টে লেগেছে!
‘কুল বয়েজ়’ টিমটায় কলকাতা মাঠের চার জন খেলে। ওদের পাড়ারই নাকি ক্লাব। নাইন সাইড টুর্নামেন্ট এটা। মাঠ ছোট। দম খুব একটা লাগে না। বক্স টু বক্স ওঠা-নামা করতে সময় লাগে না বেশি। মাঝমাঠ থেকে ঠিকঠাক শট মারতে পারলে গোলের চান্স থাকে। কিন্তু বল পেলে তো হাট্টিম মারবে!
সারাক্ষণ সবাই মিলে ডিফেন্স করছে। নাইন সাইড ম্যাচ বলে অফ সাইড নেই। তাও হাট্টিম সারা ম্যাচ ‘কুল বয়েজ়’-এর অর্ধে ঘুরছে একা একা। নীচে নেমে কয়েকবার বল নিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সাপোর্ট প্লেয়ার নেই! পাশে কাউকে না পেলে পাসটা দেবে কাকে!
এই টুর্নামেন্টে এক-একটা হাফ তিরিশ মিনিটের। হাফ টাইমে পিন্টুদা সবাইকে ও.আর.এস দিতে দিতে বলছিল, “বল হোল্ড কর! ওরা খেলার পেস বাড়াচ্ছে বলে তোদেরও সেই স্পিডে খেলতে হবে নাকি? তোরা খেলা স্লো করে দে! ডিফেন্সে নেমে আয় সবাই! আমরা যখন শ্রীরামপুর ফার্স্ট ডিভিশনে খেলতাম, এ ভাবেই ডিফেন্স করতাম।”
রাখো হাট্টিমের পাশে বসেছিল। ঘাসের ওপর ঘামে ভেজা জার্সিটা মেলে দিয়ে বলেছিল, “আমাদের আর্সেন ওয়েঙ্গার। বলছে দেখ! নিজে ক্রিকেটের সৎকার সমিতি খুলেছে! আর এখন ফুটবল নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে! ক্যারমটা ভাল খেলে। পাতাদাকে উড়িয়ে পাড়ার টুর্নামেন্ট জিতেছে। মানছি। কিন্তু ফুটবল! নিজে খেলেছে কখনও? পায়ের পাঞ্জা দেখ, চড়াই পাখির মতো! বলে শ্রীরামপুর ফার্স্ট ডিভিশন। সেটা কেমন ফার্স্ট ডিভিশন রে! শ্রীরামপুরে আলাদা ফার্স্ট ডিভিশন আছে নাকি? আজ প্রথম শুনলাম। কিচ্ছু নেই, সারাক্ষণ বাতেলা! রিনাবৌদির কথা ভাবি শুধু। গত জন্মে হেব্বি পাপ করেছিল! তাই শালা চিটিংবাজের পাল্লায় পড়েছে এই জন্মে।”
মাদুলি আচমকা বেশ জোরের সঙ্গে বলেছিল, “এই রাখো, আপনি শুনছেন না কেন কোচের কথা? পারবেন? পারবেন এই ম্যাচ নিজে থেকে জিততে?”
রাখো উঠে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করে সামান্য তুলে বলেছিল, “তুই আবার এসেছিস? দাঁড়া তোর হচ্ছে!”
“কী হবে আমার? কী করবেন?” মাদুলি গলায় তেজ নিয়ে কথাটা বললেও দু’ পা পিছিয়ে গিয়েছিল।
“তোর বিয়ে দেব দাঁড়া!” রাখো কী বলবে বুঝতে না পেরে বলেছিল।
“সে কী! কেন?”
“কেন, তুই বিয়ে করবি না?” রাখো অকারণে আরও মারমুখী হয়ে উঠেছিল।
মাদুলি ঘাবড়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে, হাত তুলে বলেছিল, “আমি বিয়ে করলে আপনি গোল দেবেন? আর আমি কী করব না করব সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।”
“তোরা চুপ করবি না দুটোকেই জুতোব?” পাতাদা বাধ্য হয়ে চিৎকার করেছিল।
মাদুলি পাতাদাকে ভয় পায়। ও চুপ করে গিয়েছিল।
পিন্টুদা বলেছিল, “আঃ! আমরা শখ করে এখানে আসিনি কিন্তু।
একটা পারপাসে এসেছি! ভুলে যাস না!”
রাখো আবার বসে পড়ে হাট্টিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেছিল, “সে আর জানি না! শালা মহান হওয়ার চক্করে আমাদের বাঁশ হচ্ছে!”
হাট্টিম কিছু না বলে মাঠের পাশে তাকিয়েছিল। দেখেছিল, ইজনা কেমন একটা অবজ্ঞার চোখে তাকিয়েছিল ওর দিকে। আর চোখে চোখ পড়ামাত্র সরিয়ে নিয়েছিল দৃষ্টি।
সেকেন্ড হাফে মাঠে নামার আগে হাট্টিম রাখোকে বলেছিল, ‘সেকেন্ড বলগুলো চেজ় করবি। আর ওভারল্যাপে আমায় সাপোর্ট করিস। বল নিয়ে উঠে কাউকে পাচ্ছি না!’
কিন্তু সেকেন্ড হাফেও ‘কুল বয়েজ়’-এর সঙ্গে মূলত ভারতী সঙ্ঘের ডিফেন্সেরই খেলা হচ্ছিল। তাও ঠেকিয়ে রেখেছে ওরা। এখানে ড্র হলে সরাসরি পেনাল্টি শুট আউট করা হবে। সেটাতে কী হবে কেউ জানে না। তা হলে কি পারবে না ফাইনালে যেতে!
এ সব ভাবতে ভাবতে হাট্টিম দেখেছিল, রেফারি ঘড়ি দেখছে। মানে সময় প্রায় শেষ। তা হলে কি সবটাই অনিশ্চিত হয়ে গেল! সেন্টার সার্কেলের বাঁ দিক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এ সবই ভাবছিল হাট্টিম আর তখনই নিজেদের বক্স থেকে পেনসিল একটা বল লম্বা ক্লিয়ার করল! আর উড়ে আসা বলটা বুক দিয়ে রিসিভ করে পায়ে ধরল হাট্টিম।
.
সামনে এবার শুধু স্টপার। ডান দিক দিয়ে রাখোকে আবার আড়চোখে দেখে নিল হাট্টিম। দর্শকরা এবার চিৎকার করছে। বলের ওপর দু’বার পা ঘোরাল হাট্টিম। না, স্টপার ট্যাকলে আসছে না। ফাইনাল ট্যাকল করলে কাটিয়ে বেরোনোর একটা সুযোগ থাকে। সেটা পাচ্ছে না হাট্টিম। ও আচমকা ডান পায়ের ইনসাইড দিয়ে বলটা ছোট্ট টোকা মেরে বাঁ দিকের টাচ লাইনে নিয়ে যাওয়ার মতো একটা ভাব করল আর স্টপারটা একটু চেপে এল ওর দিকে। এটাই সুযোগ। হাট্টিম বাঁ পায়ে বলটা ভাসিয়ে দিল রাখোর দিকে। স্টপার ছেলেটা ভেবেছিল বাঁ দিকে টাচ লাইন ধরে হয়তো হাট্টিম দৌড় লাগাবে, কিন্তু এখান থেকেই যে এ ভাবে সেন্টার করে দেবে, বোঝেনি।
ছেলেটা পেছন ঘুরে বলটা ফলো করতে গেল। পেছন থেকে বাকিরা রক্ষণ সামলাতে উঠে আসছে। কিন্তু বলটা নিখুঁতভাবে গিয়ে পড়ল রাখোর পায়ে। ওর সামনে শুধু গোলকিপার!
গোলের মুখ ছোট করে গোলকিপার এগিয়ে এল রাখোর দিকে। রাখো একবার মুখ তুলে দেখে নিল গোটা পজ়িশনটা, তার পর বুম করে গায়ের জোরে শট মারল।
বলটা গোলকিপারের হাত এড়িয়ে গোলের দিকে বুলেটের মতো বেরিয়ে গেল। কিন্তু গোলে না ঢুকে পোস্টে লাগল। সারা মাঠে একটা হুশ করে শব্দ। আর বলটা ছিটকে এল হাট্টিমের দিকে। এখন বল রিসিভ করে মারতে গেলে ডিফেন্ডার এসে কভার করে নেবে।
হাট্টিম চলন্ত বলেই বক্সের মাথা থেকে কোনাকুনি শট মারল। বলটা বিকেলের হাওয়ায় বাঁক খেল খানিকটা, তার পর ক্রসপিসের কোনায় লেগে জড়িয়ে গেল জালে।
গো-ও-ও-ও-ল চিৎকারটা হাট্টিমদের গোলের দিক থেকে উঠল প্রথমে, তার পর ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল মাঠে!
হাট্টিম কিছু বোঝার আগে পেনসিল, রাখো, মন্টুসহ সবাই এসে জড়িয়ে ধরল ওকে। মাটিতে পড়ে ওই জটলার মধ্যেও হাট্টিম দেখল, দেশবন্ধু পার্কের গাছগুলোর গায়ে বিকেলের আলো পড়েছে। এত সুন্দর আলো বহু দিন দেখেনি ও।
এই টুর্নামেন্ট নিয়ে বেশ একটা হাইপ তৈরি হয়েছে শহরে। সারা দেশে একেবারে গ্রাসরুট লেভেলে যাতে ফুটবলকে আবার পৌঁছে দেওয়া যায়, তার চেষ্টা চলছে। তা ছাড়া প্রাইজ় মানিটাও ভাল। আর সর্বভারতীয় যে-সংস্থা দেশব্যাপী ফুটবল লিগ করার জন্য প্রোমোশনাল এই টুর্নামেন্ট করছে, তাদের পিআর-ও খুব জোরদার।
ম্যাচের পরে মাঠের এক পাশেই ছোটখাটো একটা সাংবাদিক সম্মেলন হয়ে গেল। সেখানে জয়দ্রথবাবু কত কথাই যে বললেন! তার পর হাট্টিমকেও জোর করে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
এত দিন কী করছিল হাট্টিম? আবার মূল খেলায় ফিরবে কি না? ফিটনেস কেমন আছে? এ সব নানান প্রশ্ন করা হল ওকে। এ সব ভাল লাগে না হাট্টিমের। ও দায়সারাভাবে উত্তর দিল।
খেলা ছেড়েছে বেশ কয়েক বছর। তখন কারও টনক নড়েনি। আর এখন এ সব বলে কী হবে! তা ছাড়া সবে ফাইনালে উঠল মাত্র। ট্রোফি তো পায়নি এখনও। জেতার আগে কখনও সেলিব্রেট করতে নেই।
বাকি সকলের মতো মাঠের মধ্যেই এক কোণে জামাকাপড় পাল্টে নিল হাট্টিম। দেখল, সবাই বেশ হাসিখুশি আজ। দুটো ম্যাচ জেতা চাট্টিখানি কথা নয়। তবে পাতাদা দারুণ খেলেছে দুটো ম্যাচেই।
রাখো বলল, “চল এবার। শালা, হেভি খিদে পেয়েছে। মাংস আর পরোটা খাই। আমি মিসটা বাজে করেছি। খেলা-ফেলা ভুলে গিয়েছি বুঝলি। শালা, মানুষ খেলবে কী বল! যা অবস্থা হয়েছে লাইফের! রোজগারের ধান্দাতে সব মাটি হয়েছে। নেতারাই শুধু ভাল আছে, দেখা ওই জয়দ্রথকে দেখলি তো? আমরা খেলছি আর মালটা ফুটেজ খাচ্ছে! মানুষ সব বোঝে, তাও এদের ভোট দেয় কেন বল তো?”
হাট্টিম হাসল, “তুই ভোটে দাঁড়াস না বলে! না হলে তোকেই দিত।”
রাখো নাক দিয়ে একটা রাগের শব্দ করল।
পিন্টুদা এগিয়ে এল ওদের দিকে। বলল, “ক’দিন হালকা খাবি। সামনে লাস্ট হার্ডল! জিতলে সাড়ে সাত লাখ টাকা! ভাব! আমি ভাবছি প্যান্ডেল করার জন্য পাতাদের পাল ডেকরেটার্সকে বলে দিই। কী বল?”
পাতাদা ওর নাম শুনে এগিয়ে এল, “আমার বাপ হেভি কিপ্পু মাল পিন্টুদা। বললেই বলবে অ্যাডভান্স দাও। এখন বোলো না ও সব ফাইনাল মাত্র চার দিন পরে। চার দিনে কিছু যাবে-আসবে না। বুঝলে?” পাতাদার বাবা বরেন পাল লোক ভাল হলেও হিসেবি মানুষ। ডেকরেটার্সের ব্যবসা ছাড়াও একটা নামী কেকের দোকানের ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়া আছে। সেটাতেই পাতাদা বসে।
হাট্টিমের তো ভালই লাগে বরেনজেঠুকে! পাতাদা এমন কেন বলে কে জানে!
পিন্টুদা বলল, “নিজের বাবার সম্বন্ধে কী সব বলিস!”
পাতাদা হাসল, “নিজের বাবা বলেই তো জানি। বাবার বাবা, মানে আমার ঠাকুরদা নশা পাল, এই ব্যবসা খুলেছিল। সে নাকি এক পিস যন্তর ছিল! মাস্তানি-ফাস্তানি করত! সুদেও টাকা খাটাত শেষ বয়সে। সেই রক্ত গায়ে আছে। বাবা যা জিনিস না!
পিন্টুদা বিরক্ত হয়ে বলল, “তোর গায়ে সেই রক্ত নেই?”
“না!” পাতাদা শক্ত গলায় বলল, “আমার গায়ে মায়ের রক্ত আছে।” পিন্টুদা চুপ করে গেল। হাট্টিম জানে পাতাদার মায়ের ব্যাপারটা। পাতাদা যখন ক্লাস নাইনে পড়ে, গায়ে আগুন দিয়ে মারা দিয়েছিল পাতাদার মা। কেন, কিসের জন্য, সেটা জানে না ওরা। কিন্তু তার পর থেকেই পাতাদা কেমন যেন হয়ে গিয়েছে।
পাতাদার বাবা আবার বিয়ে করেছে। আর সন্তান হয়নি বটে, কিন্তু পাতাদার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ভাল নয়।
পাতাদা হাসল, “পিন্টুদা অত সিরিয়াস হোয়ো না। আমি এলাম। পরে ক্লাবে যাব।”
পাতাদা যাওয়ার পরে পিন্টুদাও মাদুলিকে নিয়ে চলে গেল। দেশবন্ধু পার্কে খেলা ছিল আজ। খেলা শেষ, অর্গানাইজাররা এবার জিনিসপত্র গোটাচ্ছে। ফাইনালটা সাউথে হবে। গীতাঞ্জলি স্টেডিয়ামে। চারিদিকে ছানাকাটা ভিড় এখন।
এই মাঠ থেকে ওদের পাড়া হেঁটে দশ-পনেরো মিনিটের মতো। সবাই যে যার মতো চলে গেলে রাখো বলল, “চল, খাই।”
“আমার ইচ্ছে করছে না,” হাট্টিম বলল, “পরোটা মাংস! খুব রিচ! তুই খা।”
“আরে চল না!” রাখো হাত ধরে টানল ওকে, “সারাক্ষণ নখরা! এটা খাব না, ওটা খাব না! না খাস, বসে দেখবি আমার খাওয়া। চল।”
মাঠ থেকে বেরিয়ে রাখোর গাড়িটার কাছে গিয়ে থমকে গেল হাট্টিম। দেখল, গাড়ির পাশে ইজনা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই মেয়েটা কী করছে এখানে!
রাখো বলল, “ইজনা ওঠ পেছনে। চল।”
ইজনা ভুরু কুঁচকে বলল, “ও যাবে নাকি?”
“হ্যাঁ। যাবে না? কী যে বলিস! যাবেই তো! তুই ওঠ না!” রাখো গাড়ির পেছনের দরজাটার দিকে ইজনাকে ঠেলল।
হাট্টিম বুঝল, কেন রাখো ওকে এমন জোরাজুরি করছিল!
“ও গেলে আমি যাব না,” ইজনা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“আবার শুরু করলি? মাইরি তোরা কি মানুষ হবি না! কিচ্ছু নেই সারাক্ষণ ঝগড়া! কেন ঝগড়া কেউ জানে না! কিন্তু ঝগড়া!” রাখো বিরক্তিতে মাথা নাড়ল, “এ দিকে খিদেয় পেট ফুটো হয়ে যাচ্ছে। চল না শালা!”
“ও গেলে আমিও যাব না,” হাট্টিমও শক্ত গলায় বলল এবার।
“লেও বাবু!” রাখো কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল, “আমিই বেকুব আসলে। তাই তোদের নিয়ে খেতে যাওয়ার প্ল্যান করেছি! কাউকে যেতে হবে না খেতে। রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে সালোকসংশ্লেষ কর।”
ইজনা বলল, “ও তো যেতে চাইবেই না! স্বাভাবিক! ওর যে সামনে বিয়ে!”
“বিয়ে!” রাখো চোখ গোলগোল করে তাকাল হাট্টিমের দিকে, “তুই বিয়ে করছিস? কেন? মানে, কবে?”
হাট্টিম কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “তুই যা তো!”
“যাব মানে? কাকে বিয়ে করছিস তুই? কবে করছিস? এ সব কী হচ্ছে!” রাখো মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়াল এবার।
হাট্টিম তাকাল ইজনার দিকে, “আমার মোটেও বিয়ে নয়। কে এ সব রিউমার ছড়ায়!”
“রিউমার! হুঃ,” ইজনা মুখ বাঁকাল, “নিজেকে রণবীর কপূর ভাবো নাকি যে, তোমাকে নিয়ে লোকে রিউমার ছড়াবে? তোমার বড়মামিই বলেছে। লাস্ট সানডে তো মেয়ের বাড়ির লোকও এসেছিল তোমায় দেখতে। ভাবো, তোমায় নাকি দেখতে এসেছিল! হাউ ফাকিং প্রিমিটিভ!”
“আরে, ও সব কিছুই না। বড়মামার চেনাজানা একজন। আমি ‘না’ করে দিয়েছি। আশ্চর্য! আমি কি যার-তার সঙ্গে গাড়ি করে ঘুরে বেড়াই যে, যাকে তাকে বিয়ে করব!”
“সেই তো!” ইজনা ছোট করে কাটা চুলগুলো ঝাঁকিয়ে বলল, “তুমি অন্য মেয়েদের আলজিভ কেমন সেটা টেস্ট করে বেড়াও!”
“আরে আরে, তোরা দেখছি লড়াই খেপা!” রাখো কিছু বুঝতে না পেরে বলল, “কনটেক্সটাই তো বুঝতে পারছি না! এ যেন রাস্তার মারামারি দেখছি!”
হাট্টিম রাখোকে পাত্তা না দিয়ে ইজনার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি…. তুমি…. আর কত বার বলব আমার ভুল হয়ে গিয়েছে! আই ওয়জ় টোটালি ড্রাঙ্ক! আমি জানতাম না কী করছি! প্লিজ়, ইজনা! ইউ নো, আই স্টিল লাভ ইউ! প্লিজ। তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমার কষ্ট হয়।”
ইজনার মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। শেষ বিকেলের রোদ এই ভিড় শহরের বাড়িঘর, বাস-ট্যাক্সি, হোর্ডিং, ঝোলানো তার, মলিন গাছ, ভাঙাচোরা দোকানপাট, সব এড়িয়ে যেন নিখুঁত থ্রু পাসের মতো এসে পড়েছে ইজনার গালে। রোদের ছটায় চোখের মণি যেন আরও বাদামি। ইজনা রাগে ফুঁসছে।
হাট্টিম বলল, “আমায় এক বারও নিজের কথা বলতে দাওনি। এক বারও আমার দিকটা শোনার কথা ভাবোনি। একটা চান্সও দাওনি। তুমি জানো, আমি মদ খাই না। কেউ জোর করে না বলে খাইয়ে দিয়েছিল… প্লিজ় ইজনা, আমার কথাটা শোনো!”
“খুব সোজা না? খুব সোজা সব?” ইজনা বলল, “বাচ্চা ছেলে তুমি! আর তোমার কথা শুনব? কেন শুনব? কী করেছ শোনার মতো?”
“তুমি বলো কী করতে হবে?” হাট্টিম নিরুপায় গলায় বলল।
ইজনা চোয়াল শক্ত করে তাকাল ওর দিকে। তার পর বলল, “চান্স দিইনি না? আচ্ছা দেব চান্স তা হলে। ফাইনালে জিততে পারলে তোমার কথা শুনব। না হলে শুনব না কোনও দিন। বুঝেছ?”
“মানে!” হাট্টিম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, “এটা সিনেমা নাকি? তোমার আমার মধ্যে এ সব আসে কোথা থেকে!”
“তুমি সিনেমার মতো যুক্তি দেবে মদ খেয়ে ও সব করার, আর আমি কিছু বললেই সিনেমা হয়ে যাবে! যা বললাম তাই হবে। যদি ফাইনাল জিততে পারো, তা হলে আমি শুনব। আমার জন্য ‘কিছু করা’-টা বাদ দাও। পাড়ার জন্য তো কিছু করো! জিতলে তোমার কথা শুনব। আর না হলে…”
ইজনা আর কিছু না বলে কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে নিয়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে হাঁটা দিল।
হাট্টিম কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল বোকার মতো!
পাশ থেকে রাখো বলল, “আলজিভ কেসটা কী বল তো? তুই ইএনটি ডাক্তার নাকি! এখানে প্লেয়ারের ছদ্মবেশে আছিস! কী কেস হাট্টিম? নিজের লাইফ যে পুরো ‘লগান’ করে ফেললি! জিতলে সব মাফ, না হলে ‘ডুগনা লগান ডেনা পড়েগা!’ শালা! কিচ্ছু নেই, দুটোরই তার কাটা! আমার ভাই মুদ্রাই ভাল।”
