ছাতিম – ৬

ষষ্ঠ অধ্যায়

সতু

সাড়ে আটটা বেজে গিয়েছে। ছোটখাটো দোকানপাট কয়েকটা খোলা। তা ছাড়া বড় দোকানগুলো সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই আটটা, সাড়ে আটটাকে সন্ধে বলবে, না রাত বলবে, বুঝতে পারে না সতু। তবে যাই হোক, আজ বাবার কাছে খুব বকুনি খেতে হবে, এটা বুঝতে পারছে।

কলকাতায় লোকজন আজকাল জাপানি বোমার ভয়ে রাতের দিকে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পড়ে। আলো বেশ কমিয়ে রাখা হয়। নানান জায়গায় ট্রেঞ্চও কাটা হচ্ছে। মাঝে মাঝে কারফিউ-ও জারি করা হচ্ছে। আসলে জাপানিরা বার্মা দখল করা পর থেকেই মানুষের মনের মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, এবার কলকাতায় জাপানি বোমা পড়বে। তবে তার মধ্যেও যে নানান পাড়া-সহ ওদের পাড়াতেও পুজোর তোড়জোর চলছে, সেটাই আশ্চর্যের। অনেকে ভয়ে কলকাতা ছাড়লেও, যাদের কলকাতাতেই সব কিছু, তারা যাবে কোথায়! আর ভয়ে ভয়ে কত দিনই-বা মানুষ বাঁচতে পারে!

যদুজ্যাঠা তো তাই বলেন, “পুজো এবার শুধু মায়ের আরাধনাই নয়, মনের শক্তিও।”

কে জানে কী! কিন্তু পাড়ায় প্রথম বার পুজো বলে কথা! তবে সত্যি বলতে কী, সতুর যেন সেই আগ্রহটাই আর নেই। সারাক্ষণ মনের মধ্যে ঝিঁঝি ডেকে চলেছে। কুসুমদির জন্য মনের মধ্যে কেমন একটা ভার- ভার ভাব।

তাও যদি এমনটা হত যে, ও কুসুমদিকে দেখতে পাচ্ছে না চোখের সামনে, তা হলে একটা কথা ছিল। সবটা ভুলতে বা নিজেকে সামলে নেওয়া সহজ হত। কিন্তু কুসুমদি আরও যেন আঁকড়ে ধরেছে ওকে। সেদিন ও রকম করে জড়িয়ে ধরল। তার পর আজকাল রোজ ডেকে পাঠায়। আর কাউকে মনের কথা বলতে পারে না বলে, ওকেই বলে। কাঁদে। এত কাছে এক জন! তাকে এত ভালবাসে সতু, কিন্তু তাও বলতে পারে না! জানে, ও কোনও দিন কুসুমদির কাছে ‘বিশেষ কেউ’ হবে না। কুসুমদি যে কাচের ওপারে থাকা মানুষ! কিন্তু কী যে অসহ্য কষ্ট হয় সতুর!

সেদিন তো আর না পেরে সতু রাতে শুয়ে কাঁদছিল। না, শব্দ করেনি, নিঃশব্দেই বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছিল। আর তখনই আলতো করে ওর মাথায় হাত দিয়েছিল অমর।

চোখ মুছে উঠে বসেছিল সতু। ভারী গলায় বলেছিল, “তুই ঘুমোসনি?”

রাতের অন্ধকার ঘরে বাইরে থেকে চাঁদের আলো এসে পড়েছিল ওদের বিছানায়, মেঝেতে। অমর সেই আলো-আঁধারির মধ্যে বসে বলেছিল, “তুই কাঁদছিস আর আমি ঘুমোব?”

“কী বলছিস!” গলাটা যত দূর সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলেছিল সতু, “তুই বুঝলি কী করে?”

অমর হেসেছিল। বলেছিল, “আমার চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তো, তাই অন্য সেন্সগুলো বোধহয় আজকাল খুব সজাগ হয়ে যাচ্ছে, জানিস। তা ছাড়া, আমি কান্নার গন্ধ পাই। বৃষ্টির যেমন গন্ধ থাকে, কান্নারও তেমন থাকে রে দাদা।”

“তুই ঘুমো,” সতু আর কথা বাড়াতে দেয়নি ওকে।

অমর শুয়ে পড়েছিল আবার। বলেছিল, “পরিরা রূপকথায় থাকে দাদা, জীবনে নয়। তাদের জন্য দুঃখ পেতে নেই।”

.

আজ ভ্যাপসা গরম বেশ। সাইকেলে আছে বলে যদিও খুব-একটা গরম লাগছে না। সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বাঁধা লোহার জালটা সামান্য লাফাচ্ছে আর শব্দ হচ্ছে।

এটা কাশীপুর থেকে নিয়ে এসেছে ও। নশার সাইকেলটা ধার করেছে। আসলে ছাতিম গাছটাকে ঘিরতে হবে তো! ছোট্ট চারা, গরু- ছাগলে কখন মুড়িয়ে দেবে কে জানে!

ভারতী সঙ্ঘের লাগোয়া একটা মাঠমতো জায়গা আছে। সেখানেই এক পাশে সেই গাছটা লাগিয়েছে ওরা। কুসুমদি গাছটা লাগানোর সময়ও কাঁদছিল।

সতু বলেছিল, “তুমি সারাক্ষণ কেঁদো না। অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর তিনুদা তো বলেছে আসবে দেখা করতে! তুমি এমন কোরো না।”

কুসুমদি বলেছিল, “এইটুকুই স্মৃতি এখন আমার কাছে। মা আর সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। ভাগ্যিস ওই বাক্সটা খুব গোপনে লুকিয়ে রেখেছি! জানিস সতু, আমার ভয় হচ্ছে! ও যদি আসে, বাবা-মা যে কী করবে! এই গাছটাকে কিছুতেই মরতে দেওয়া যাবে না। সতু, তুই এর জন্য বেড়া কিনে আনবি? আমি টাকা দেব। আনবি তো? লোহার বেড়া কিন্তু।”

সতু বলেছিল, “সে আনব। আর তিনুদা লুকিয়েই আসবে নিশ্চয়ই। তোমাদের বাড়ির পেছনে জমাদার ওঠার ওই ঘোরানো সিঁড়িটা আছে না!”

কুসুমদি বলেছিল, “জানি না। আমি কিছু ভাবতে পারছি না!”

গাছ পুঁতে ওরা বাড়ির দিকে যাবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু যাওয়ার আগেই দেখেছিল, হরেনদা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে!

“আরে ছাতিম গাছ দেখছি! এই গাছ কেউ লাগায়?” হরেনদা হেসেছিল, “ছেলেমানুষি যত! একে ডেভিলস ট্রি বলে। শয়তানের গাছ। নেহাত কুসুম লাগিয়েছে বলে কিছু বলছি না। না হলে আমি তুলে ফেলতাম এখনই।”

কুসুমদি মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সতু বলেছিল, “গাছ তো ভাল হরেনদা। অসুবিধে কী?”

হরেনদা মাথা নেড়ে বলেছিল, “সব গাছ ভাল নয় রে! জীবনের অনেক কিছু আপাতভাবে মনে হয় ভাল, আসলে কিন্তু তা একদম ভাল নয়।”

“চল সতু,” কুসুমদি সতুকে ঠেলেছিল।

সতু যেতে যেতে তাকিয়েছিল হরেনদার দিকে। হরেনদা হেসে বলেছিল, “ভাল-খারাপের পার্থক্য করতে শেখ সতু। সবাই পারে না ভাল-খারাপের পার্থক্য করতে।”

পাড়ার মোড়ে প্যান্ডেলটা শেষ হয়ে গিয়েছে। ক’দিন পরেই ঠাকুর আসবে। অক্টোবরের শুরু এখন। এই ডামাডোলের মধ্যেও যে পুজো হচ্ছে এটাই বিশাল ব্যাপার!

.

সতু সাইকেল থেকে দেখল, সৌদামিনীদের বাড়ির রোয়াকে পাগলটা বসে আছে আজ। আর ওর সামনে হরেনদা দাঁড়িয়ে। হরেনদার হাতে একটা ঠোঙা। পাগলটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কী যেন বলছে।

ওকে দেখে হরেনদা বলল, “আরে, এত রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিস! ঘরে ঢোক তাড়াতাড়ি।”

“হ্যাঁ হরেনদা,” সতু বলল।

হরেনদা বিরক্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ নয়, ঢোক তাড়াতাড়ি। আর বেরোবি না।”

সতু কথা না বাড়িয়ে প্যাডেলে জোরে চাপ দিল। সাইকেলটা আজ ওদের উঠোনেই রেখে দেবে। কাল সকালে নশাকে দিয়ে দেবে। ও লক্ষ করল, হরেনদা ঘড়িতে সময় দেখল। তার পর ক্রাচে ভর করে এগিয়ে গেল মোড়ের দিকে।

সাইকেলটা উঠোনের কোনায়, যেখানে জলের কল, তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখল সতু।

“কী রে, এখন ফিরছিস!”

সতু হাসল। গোপুজ্যাঠার কাজ নেই কিছু, সারা দিন বসে কে এল আর গেল এ সব দেখে!

“বাবা এসেছে গো?” সতু জিজ্ঞেস করল।

“আরে, এসেছিল। তার পর যদুবাবু আর পাড়ার কয়েক জনের সঙ্গে কুমোরটুলি গিয়েছে। কী সব ঠাকুর নিয়ে কথা আছে আর কী! তবে এসে পড়বে যে-কোনও সময়ে। যদুগিন্নিও নেই। বসাকদের বাড়িতে গিয়েছে। তারক ব্যাটাও আসেনি। হয়েছে বটে আজকালকার ছেলে-ছোকরারা! যুদ্ধ লেগেছে সারা পৃথিবীতে আর এদের রস যায় না!”গোপুজ্যাঠা কাশল শব্দ করে।

কুসুমদি আজ একা। কেউ নেই বাড়িতে। সতু সাইকেলটা রেখে ক্যারিয়ার থেকে লোহার জালের রোলটা বের করল। কুসুমদিকে বলে চার তলার ছাদের ঘরে রেখে দেবে। কাল না-হয় সকালে গাছটা ঘিরে দেবে।

জালটা নিয়ে তিন তলায় উঠল সতু। শুনশান সব! কুসুমদি হয়তো নিজের ঘরে আছে। সতু আর বিরক্ত করল না। ও ছাদের দিকে এগোল। সিঁড়িটা অন্ধকার। কিন্তু অসুবিধে নেই সতুর। ওর সবই চেনা। চোখ বেঁধে দিলেও সহজে উঠে যেতে পারবে।

সিঁড়ির মাথায় উঠে থমকে দাঁড়াল সতু। এ কী! ছাদের দরজা খোলা কেন?

ওর কেমন একটা লাগল। জালের রোলটাকে দরজার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে পা টিপে-টিপে, কোনও শব্দ না করে, দরজা ঠেলে ছাদে গেল। আর যা দেখল, তাতে নিমেষের মধ্যে শরীরের সব রক্ত যেন জমে গেল ওর!

সতু দেখল, ছাদের কোনায় চাঁদের আলোর নীচে আবছায়া দুটো শরীর একে-অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। আধো আলোতেও তিনুদা আর কুসুমদিকে চিনতে অসুবিধে হল না ওর।

সতু দেখল দু’জনে যেন জগৎ বিস্মৃত! একে-অপরকে জীবনের শেষ অবলম্বনের মতো জড়িয়ে ধরে রয়েছে। দু’জনের ঠোঁট এক। মৃদু চুম্বন- শব্দ ছোট্ট প্রজাপতির মতো উড়ছে চারিধারে।

সতু কী করবে যেন বুঝতে পারল না। ওর তো এ সব দেখা উচিত নয়। কিন্তু ও যেন সরতে পারছে না! নড়তে পারছে না! আজকেই এল তিনুদা! জমাদার ওঠার সিঁড়িটা বাড়ির পেছনদিকে পেঁচিয়ে ছাদ অবধি উঠেছে। কারণ, ছাদেও একটা বাথরুম আছে। সেই সিঁড়ি দিয়েই কি উঠেছে তিনুদা?

সতু দেখল নরম লেবু-রঙা আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে ছাদ। আর তার এক পাশে দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আচমকা বুকের মধ্যেকার কষ্টটা কেমন যেন হারিয়ে গেল সতুর। ওর মনে হল এটাই তো হওয়ার ছিল। এই গল্পে ও তো বরাবর পাশের লোক। বায়োস্কোপে, প্রমথেশ বড়ুয়ার পেছনে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা আবছা মানুষ। বরং আজ কেমন এক প্রশান্তি এসে ক্রমে ক্রমে ঘিরে ধরল সতুকে। এই জীবনে ভালবাসার মানুষকে নিজের করে কাছে পাওয়া তো সহজ ব্যাপার নয়। সেখানে এই দু’জনে দু’জনকে তো পেল অন্তত।

সতু মাথা নিচু করে পিছিয়ে এল। কিন্তু দরজা পেরিয়ে সিঁড়িতে নামার আগেই আচমকা তীক্ষ্ণ একটা হুইসলের আওয়াজ পেল ও! আর দেখল, সঙ্গে সঙ্গে কুসুমদি আর তিনুদা ছিটকে সরে গেল একে-অপরের থেকে। আর তখনই কুসুমদি দেখতে পেল ওকে।

তিনুদাও দেখল। উত্তেজিত গলায় বলল, “সতু, পুলিশ!”

সতু নড়ে গেল যেন! পুলিশ! সে কী!

কুসুমদি দ্রুত প্যাঁচানো সিঁড়ির দিকে দৌড়ে গেল। তার পরেই চেঁচিয়ে বলল, “এখানেও পুলিশ! ওপরে উঠে আসছে! নীচে চলো। কয়লার ঘরের পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। ওই দিকটায় একটা ময়লা ফেলার জায়গা আছে। খুব সরু রাস্তা। সতু, তুই নীচে গিয়ে মেন দরজা বন্ধ কর তাড়াতাড়ি। চলো!”

মেন দরজা! মানে বাড়িতে ঢোকার বড় দরজা। সেখান দিয়েও কি পুলিশ আসবে!

সতু প্রাণপণে দৌড় দিল। দুটো করে সিঁড়ি টপকে নিমেষে মধ্যে পৌঁছে গেল এক তলার উঠোনে। ওই তো মেন দরজা। সামনে কিছু মানুষ। পুলিশই তো! ও দৌড়ে গেল দরজার দিকে। কিন্তু দরজা বন্ধ করার আগেই একটা শক্ত হাত ওকে কোমর পেঁচিয়ে টেনে নিলে উঠোনের চৌবাচ্চার দিকে। সতু দেখল গোপুজ্যাঠা!

“চুপ করে থাক একদম! না হলে তোকেও মেরে দেবে ওরা!” কানের কাছে ফিসফিস করে বলল গোপুজ্যাঠা!

সতু কিছু বলার আগেই দেখল মূল দরজা পেরিয়ে আট-ন’জন পুলিশ বন্দুক হাতে ঢুকে পড়েছে বাড়িতে। আর ওদের পেছনে রিভলভার হাতে ঢুকল সেই পাগলটা!

স্পাই! পাগলটা তা হলে পুলিশের স্পাই!

পাগলটা চেঁচিয়ে বলল, “তিনু বাড়িতেই আছে। কয়লা-ঘরের পাশের দরজায় যাও। আর…”

কিন্তু কথা শেষ করতে পারল না পাগলটা। উপরের বারান্দা থেকে গুলির শব্দ হল এবার।

চমকে উঠল সতু!

পাগলটা উঠোনের কোনার কয়লার ঢিপির পাশে লুকিয়ে পড়ে বলল, “গুলি চালাচ্ছে! তোমরাও চালাও। ফায়ার!”

নীচের পুলিশরাও এবার গুলি চালাতে শুরু করল। উপর থেকেও মুহুর্মুহু গুলি চলছে। গোপুজ্যাঠা সতুকে আড়াল করে রেখেছে। সতু ভাবল মা আর অমর ঠিক আছে তো! এমনিতে ওদের ঘরের দরজা বন্ধই থাকে। কিন্তু অমর যদি বেরিয়ে আসে!

আচমকা নীচ থেকে গুলির শব্দ থেমে গেল। কিন্তু তার বদলে উপরের তলায় গুলি চলল বেশ কয়েকবার। ওই ছাদে উঠে আসা পুলিশগুলোই কি গুলি চালিয়েছে?

আবার হুইসল শোনা গেল।

পাগলটা এবার বেরিয়ে এল কয়লার ঢিপির আড়াল থেকে। তার পর চিৎকার করে বলল, “মিত্তির, কী হল?”

উপর থেকে উত্তর এল, “তিনু শেষ! আর মেয়েটা… স্ট্রেচার পাঠান স্যার।”

“নামিয়ে আনো। আমি পাঠাচ্ছি,” পাগলটা স্ট্রেচার নিয়ে যেতে বলে গোপুজ্যাঠার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনারা ঠিক আছেন তো? আর সতু তুমি!”

সতুর হাত-পা কাঁপছে। ওপর থেকে পুলিশের বুটের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে এবার। ওই যে স্ট্রেচার গেল উপরে। দরজার কাছে পাড়ার লোকেদের ভিড় বাড়ছে। পুলিশ সরাচ্ছে ওদের। আর তার মধ্যেই উপর থেকে দুটো স্ট্রেচার নামিয়ে আনা হল নীচে। সতু দেখল, দোতলার বারান্দা থেকে মা, সুধীরকাকুর স্ত্রী ও আরও কয়েক জন উঁকি মারছে।

সতু স্ট্রেচারের দিকে তাকাল। একটায় তিনুদা শুয়ে আছে। বুকের কাছে চারটে গুলির ক্ষত! এখনও তাজা রক্ত বেরোচ্ছে! কিন্তু দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, তিনুদার দেহে প্রাণ নেই।

আর অন্য স্ট্রেচারে শুয়ে আছে কুসুমদি! পেটে গুলি লেগেছে কুসুমদির, যন্ত্রণায় ছটফট করছে, তাও ‘তিনু তিনু’ বলে ডেকে চলেছে!

কুসুমদির গুলি লেগেছে! কিন্তু কুসুমদি তো কিছু করেনি! কেন ওকে গুলি করল পুলিশ!

সতু কুসুমদির দিকে এগোতে গেল। পুলিশ বাধা দিল ওকে।

পাগলটা বলল, “আরে, কোথায় যাচ্ছ তুমি? সরে দাঁড়াও! মিত্তির, ভ্যানে তোলো মেয়েটাকে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”

মিত্তির নামে পুলিশটা বলল, “কী সাঙ্ঘাতিক মেয়ে স্যার! এই দেখুন, লুগার ছিল ওর কাছে। আমাদের লক্ষ করে গুলি চালাচ্ছিল। ছেলেটা তো চালাচ্ছিলই, মেয়েটাও চালাচ্ছিল! কী সব হচ্ছে!”

কুসুমদি গুলি চালিয়েছে! সেই লুগার! সতু কী বলবে যেন বুঝতে পারল না!

মা এবার নেমে এল উপর থেকে। দরজার কাছে আরও জটলা। যদুজ্যাঠা এসে গিয়েছেন! বাবাও এসেছে! পাড়ার আরও লোকজনও পেছন পেছন ঢুকে পড়েছে! সবাই কী সব কথা বলছে। কুসুমদির মায়ের কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। জেঠিমাও চলে এসেছে তা হলে।

সতু দেখল, যদুজ্যাঠা চিৎকার করছেন! বলছেন, “নিয়ে যান, নিয়ে যান! ও আমার মেয়ে নয়! ও আমার মেয়ে নয়! ও পাপ!”

আরও কত লোক! আরও কত শব্দ! চিৎকার! সব কেমন যেন জট পাকিয়ে আছে। তছনছ হয়ে যাচ্ছে সব। সতুর মাথা ঘুরছে। কুসুমদি কোথায়! কোথায় নিয়ে গেল ওরা কুসুমদিকে!

সতু বাইরে এসে দাঁড়াল রাস্তায়।

পুলিশ বেরিয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে। বড় কালো গাড়ির পিছনে দুটো ছোট গাড়িও দাঁড়িয়ে রয়েছে। কুসুমদিকে তোলা হয়েছে বড় জাল ঘেরা কালো গাড়িটাতে। যদুজ্যাঠা রাস্তার পাশে বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। বাবা, গোপুজ্যাঠা-সহ সবাই পাশেই দাঁড়িয়ে। মা গিয়ে ধরেছে জেঠিমাকে।

সতুর কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু! এ সব কী হল! সবই তো ঠিক ছিল একটু আগেও! এর মধ্যে এমন করে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল!

তা ছাড়া তিনুদা যে এখানে এসেছে, সে ব্যাপারে কে খবর দিল পুলিশকে? সতু কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল!

আর হঠাৎই দমকা হাওয়া দিল একটা। কিছু শুকনো পাতা আর কাগজ উড়ে এল। মাথার চুল এলোমেলো হয়ে গেল সতুর। ঘড়ঘড় করে ওই পুলিশের কালো গাড়িটা ছাড়ল এবার। সতু আর পারল না থাকতে। আচমকা সবার মধ্য থেকে দৌড়ে গিয়ে গাড়ির জাল লাগানো জানলা আঁকড়ে বেয়ে উঠল। দেখল, গাড়ির ভেতরে কাঠের মেঝেতে পাশাপাশি শুইয়ে রাখা হয়েছে তিনুদা আর কুসুমদিকে। আর কুসুমদি হাত বাড়িয়ে ধরে রয়েছে তিনুদার হাত!

“কুসুমদি!” সতু ডাকল।

কুসুমদি তাকাল, কিন্তু কিছু বলার আগেই একটা পুলিশ সতুকে টেনে নামিয়ে দিল রাস্তায়। সতু পড়ে গেল মাটিতে। আর ওর পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল পুলিশের বড় কালো গাড়ি, সঙ্গে দুটো ছোট গাড়ি।

রাস্তায় বসে সতু দেখল, পিছনের গাড়িটাতে বসে রয়েছে পাগলরূপী পুলিশটা। আর যেতে যেতে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো হরেনদার দিকে তাকিয়ে লোকটা হাত তুলল। হাসল। আর সতু অবাক হয়ে দেখল হরেনদাও পালটা মাথা নাড়ল। মুখে হাসি!

এগারো

ইজনা

দুটো বাঁশি বাজিয়ে রেফারি হাত তুলে নির্দেশ করল— হাফ টাইম! ইজনা দেখল, হাট্টিম জার্সি দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এ দিকেই আসছে। বৃষ্টির মাঠ তাই জুতো মোজা জার্সিতে কাদা লেগে রয়েছে। ও সরে গেল একটু। সেদিনের পর থেকে হাট্টিমকে এড়িয়েই চলছে ও। সেদিন ওরকম কথা-কাটাকাটিতে না জড়িয়ে পড়লেই হত। বোকার মতো কী সব বলে গেল! এখন বলে দিয়েছে যখন আর কথা ফিরিয়েও নিতে পারছে না। কী যে করল! কত করে নিজেকে এত দিন ঠিক রেখেছিল যে, মাথা গরম করবে না, ঝামেলা বা ঝগড়া এড়িয়ে থাকবে। কিন্তু সেদিন কী যে হল! আসলে হাট্টিমের বিয়ের কথাটা শোনার পর থেকেই মনটা এতটা অস্থির হয়ে আছে যে, কী বলবে!

ইজনা নিজেকে জিজ্ঞেস করেছে, মানে একদম নিজের কাছে স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করেছে, ও এখনও হাট্টিমের দিকেই ঝুঁকে আছে কি না!

আসলে মানুষ বোধহয় সবচেয়ে বেশি মিথ্যে নিজেকেই বলে। বোধহয় সবচেয়ে বেশি লুকোচুরি নিজের সঙ্গেই খেলে। তাই এক রাতে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে বসেছিল ও। আর যা রেজ়াল্ট হয়েছে, তাতে নিজের গালেই চড় মারতে ইচ্ছে করেছে ইজনার। এখনও, ও সব দেখার পরেও ও হাট্টিমকে ভালবাসে। তাই হিংসে হচ্ছে। রাগ হচ্ছে। শরীরের মধ্যে থেকে থেকেই ধুলোর ঝড় পাকিয়ে উঠছে। ডিসগাস্টিং! ভালবাসার মতো এত জঘন্য জিনিস আর কিছু নেই! সব জেনেও মানুষ কেন যে নিজের ভাঙা পা গর্ততেই টিপ করে ফেলে কে জানে! জানে উল্টোদিকের মানুষটা শঠ, জানে সে তাকে ততটাও ভালবাসে না, খুব কিছু পাত্তা দেয় না। তাও মন সে দিকেই যায়। কেন?

এই একটা ঝামেলা যদি বাদ দিতে পারত, তা হলে ওর জীবনটা যে কী দারুণ হত! ভাল চাকরি, বাড়িতে শান্তি, ‘ক্রাফট’-এর হয়ে কাজ… সব নিয়ে ওর মতো এত সুখের জীবন আর কার হতে পারে!

কিন্তু ঈশ্বর কাউকেই নিরবচ্ছিন্ন শান্তি দেন না।

মা বলে, “আরে, তা হলে ঠাকুরকে ডাকবে কে! তিনি চান লোকে তাঁকে স্মরণ করুক। তাই সবাইকে কিছু না-কিছু কষ্ট দিয়ে রাখেন। চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স আর কী।”

ধুত্তোরি চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স! গত দু’বছরে কম চেষ্টা তো করেনি ইজনা। কিন্তু পারল কি? মানুষ যে কী করে না! ওই যে জার্সিতে মুখ মুছতে মুছতে হেঁটে আসছে ছেলেটা। লম্বা, মাজা রং, পরিষ্কার করে কামানো গাল। টানা ভুরু। গালে একটা ছোট্ট লাল তিল! দেখেই তো ইজনার বুকের মধ্যে কেমন একটা করছে! দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ভালবাসার মধ্যে একটা অদ্ভুত ছিটকে চলে যাওয়াও যে থাকে, সেটা বুঝতে পারছে ও। মানুষের মনের যে ডিফেন্স মেকানিজম থাকে, সেটাই এর জন্য দায়ী।

ইজনার মনে হয় ভগবান সব দিয়েছিল মানুষকে, তার পর সেই সব কিছুকে আন্ডারমাইন করার জন্যই প্রেম ভালবাসার মতো জিনিস ঢুকিয়ে দিয়েছে মনে।

গগনের কথাটাই ধরা যাক। সিমির কথামতো, এরই মধ্যে গগনকে শ্যামবাজারের কাছে একটা কফি শপে ডেকেছিল ইজনা। ও যখন শুরু করেছে, শেষটাও ওকেই করতে হবে।

গগন এসেছিল ঠিক সময়ে। কিন্তু কফি শপে ঢোকেনি। বাইরেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। গগনের মুখ দেখেই ইজনা বুঝেছিল যে, কিছু একটা হয়েছে।

ইজনা জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে তোমার?”

রাস্তার ধারের নীল-সাদা রং করা রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল গগন। গালের না-কামানো দাড়িতে হাত ঘষে বলেছিল, “তুমি জানো ইজনা। আর আমার মনে হয় সেই জন্যই আজ ডেকেছ আমায়। তাই না?”

কী বলবে বুঝতে না পেরে ইজনা মাথা নিচু করে নিয়েছিল।

গগন শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “আমি তো আগেই বলেছিলাম। এটা বাচ্চা মেয়ের জেদ। ওই পুতুল চাই টাইপ ব্যাপার। তবে হ্যাঁ, ভুল বলেছিলাম যে, ছ’মাস পর ওর মন সরে যাবে। এটা তো জাস্ট কয়েক সপ্তাহ থাকল!”

“আই অ্যাম সরি। সিমি আমায় বলেছিল তোমায় বুঝিয়ে বলতে,” ইজনা কথা বলতে বলতে নিজের কাঁধের ব্যাগের লেসটা আঙুলে জড়াচ্ছিল।

“দ্যাখো, আমি তো গবেট নই! বেশ কিছু দিন আর আমার মেসেজের রিপ্লাই করছে না। ফোন ধরছে না। রিতেশ নামে একটা ছেলের সঙ্গে নানা জায়গায় যাওয়ার ছবি দিচ্ছে ফেসবুকে। তো, ইট ইজ় অবভিয়াস,” গগন হেসেছিল। দুর্বল হাসি।

ইজনা চুপ করেই ছিল।

গগন বলেছিল, “আমরা এমন এক নিষ্ঠুর সময়ে বাস করছি, যেখানে সবাই সবাইকে ইউজ় করতে চাইছে। অন্যের ঘাড়ে ভর দিয়ে বেঁচে থাকতে চাইছে। সবটাই মজা! ফান! নিজের ভাল লাগাটাই আসল। সবাই ভাবছে, তার জন্যই চন্দ্র সূর্য ওঠে, ডোবে, গ্রহ নক্ষত্ররা পাক খায়। দ্যাখো না, আজকাল সবাই সব কিছু ছবি তুলে পোস্ট করে? যেন এই সব ডকুমেন্টেশন ইউনিভার্সের জন্য খুব দরকারি। সবাই একটা বাবলে বেঁচে আছে। কেউ কারও মনের দিকটা দেখছে না। অন্যকে হেল্প করলেও সেটা ঘটা করে নির্লজ্জের মতো প্রচার করছে। কে কত মহান তার বিজ্ঞাপনের একটা আহাম্মকি প্রতিযোগিতা লেগেছে। এই অবস্থায় সবটাই তো কমোডিটি। নিজেকে মহান প্রমাণ করার জন্য মানুষ বাকি সবাইকে কমোডিটির মতো ইউজ় করছে। সেই মাইন্ডসেটটাই সব দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রেমের দিকেও পড়ছে। সেখানে যতক্ষণ কেউ ‘ফিলিং গুড’, ততক্ষণ তাকে কাছে রাখছে। যেই আর-একজনকে দেখে মনে হচ্ছে এর কাছে গেলে ‘ফিলিং বেটার’ লাগবে, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে চলে যাচ্ছে! বললে বলছে, ‘মাই লাইফ মাই চয়েস।’ লয়ালটি আর ভার্চু বলে কিছু নেই। সে সব স্টুপিডিটি হয়ে গিয়েছে।”

ইজনা চুপচাপ শুনে গিয়েছিল। গগনকে বলতে না দিলে ওর কষ্টটা বেরোবে কী করে! আর ও যা বলল, সব তো মিথ্যে নয়। টু মাচ সোশ্যাল মিডিয়া, এমপ্যাথিটাই নষ্ট করে দিয়েছে। আর এর শেষও নেই। আসলে সমস্যাকে যদি কেউ সমস্যা বলে চিহ্নিতই না করে, তা হলে আর সেটাকে শুধরে নেবে কী করে!

গগন বলেছিল, “সিমি যে আর আমার সঙ্গে নেই, সেটা বলার জন্য কেন বেকার দু’শো টাকার কফি আর আর তিনশো টাকার খাবার নষ্ট করবে? ফ্রি এয়ার আর লাইটই এনাফ।”

“আই অ্যাম সরি গগন!” ইজনা অস্ফুটে বলেছিল।

“ডোন্ট বি। আমি জানতাম এটা হবে। তোমার দোষ নেই! সিমির ও দোষ নেই। ইটস লাইফ। ইটস নেভার ফেয়ার। বাট ইটস অলরাইট। জন্মানোর সময় তো জীবন বলে দেয়নি, আমি তোমার জন্য ফেয়ার থাকব,” গগন হেসেছিল আবার। ক্লান্ত হাসি।

ইজনা বলেছিল, “কী যে বলি! তুমি মন খারাপ কোরো না।”

গগন মাথা নেড়েছিল, “মন খারাপ হবে। বাট আই উইল ম্যানেজ। যাক গে, আমি আসি। মায়ের শরীর ভাল নেই। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সামনের অঘ্রানে আবার দাদার বিয়ে! ওইটুকু বাড়িতে কী যে হবে! ভাবছি, মাকে নিয়ে উঠে যাব কোনও মফস্সলে। ডেলি প্যাসেঞ্জারি করব। লোকাল ট্রেন জিন্দাবাদ!”

ইজনা মাথা নেড়েছিল। কী আর বলবে! সিমির সঙ্গে গগনের কোনও দিকেই মেলে না। ও নিজে বোকার মতো কেন যে কিউপিড সাজতে গিয়েছিল! নিজের লাভ লাইফ ঘেঁটে ঘ হয়ে আছে আর গিয়েছে অন্যের লাইফ সারাতে!

.

“কী রে ইজনা, তোরা কেউ প্রতিবাদ করলি না!”

রাখোর গলাটা চকোলেট বোমার মতো ফাটল ইজনার কানের কাছে। ওর যেন ঘোর কাটল।

ইজনা দেখল, গোটা টিম মাঠের ধারে ছড়িয়ে বসে আছে। শুধু রাখো দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে!

“কী হয়েছেটা কী!” ইজনা রাখোর দিকে তাকাল।

রাখো বলল, “তোরা এসেছিস কেন খেলা দেখতে? যদি প্রতিবাদই না করিস, তা হলে এখানে এসেছিস কেন?”

“আরে বাবা, কী হল?” পাশ থেকে মুদ্রা জিজ্ঞেস করল এবার।

রাখো বলল, “ফার্স্ট হাফে ফিনিক্সকে ও-ভাবে দুটো পেনাল্টি দিয়ে দিল! শালা, রেফারি না ‘ধন্যি মেয়ে’-র রবি ঘোষ! হাফ প্যান্ট পরে মুখে বাঁশি নিয়ে পিঁ পিঁ করলেই যদি রেফারি হওয়া যেত, তা হলে আমাদের পাড়ায় সকালে যে বুধন আসে ময়লা ওঠানোর গাড়ি নিয়ে, সে ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল খেলাত! বুধনও তো হাফ প্যান্ট পরে। এর চেয়ে ভাল বাঁশি বাজায়। রেফারি হয়েছে! আবার আমি বলেছি বলে হলুদ কার্ড দেখাল! বলে, আরও বললে লাল কার্ড দেখাবে! কিচ্ছু নেই খালি কার্ডে দেখাবে! কেন রে শালা, তুই কলেজ স্ট্রিটে বিয়ের কার্ড বিক্রি করিস! খেলা শেষ হোক ওকে টালার ট্যাঙ্কের মাথায় তুলে আকণ্ঠ ক্যালাব! সারা কলকাতা দেখবে!”

পাতাদা রেগে গেল এবার। অর্ধেক খাওয়া জলের বোতল ছুড়ে মারল রাখোর দিকে। বলল, “আর তুই যে দুটো ওপেন নেট মিস করলি, তার বেলা?”

মাদুলি এতক্ষণ পিন্টুদা-সহ পাড়ার অন্যদের সঙ্গে বসেছিল। উঠে এসে বলল, “ঠিকই তো! ওরকম গোল কেউ মিস করে!”

“তুই আবার কথা বলছিস!” রাখো চোখ পাকাল, “ভুলু এসেছে কিন্তু!”

আসলে পাড়ার সবাই প্রায় ঝেঁটিয়ে এসেছে খেলা দেখতে। উত্তর কলকাতা থেকে এই গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম অনেকটা দূর। কিন্তু তাতেও কাউকে দমানো যায়নি। বুড়োদাদুও বলেছিল আসবে। কিন্তু তিরানব্বই বছর বয়সে সেটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যেত বলে সবাই বারণ করেছে।

ভুলু ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “আমি আছি রাখোদা…”

“কী রে যাবি? পেনাল্টি মারবি?” রাখো মাদুলির হাফহাতা জামার তলা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া সাদা গেঞ্জির হাতাটা টেনে আরও লম্বা করে দিয়ে জিজ্ঞেস করল।

মাদুলি চোখ বন্ধ করে হাত তুলে বলল, “আঃ, এ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার!”

“রাখো, ফালতু কথা রাখ!” হাট্টিম বিরক্ত হয়ে বলল এবার।

পিন্টুদাও রাগের গলায় বলল, “এ ভাবে জেতা যাবে? দু’গোলে পিছিয়ে আছি! বি সিরিয়াস!”

রাখো ইজনার কানের কাছে মুখ নিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “নিজে ক্রিকেটের সৎকার সমিতি বানিয়েছে! বউয়ের গয়নাগাটি বিক্রি করতে গিয়েছে। সে বলে, বি সিরিয়াস! লোকটা পুরো হ্যালুতে থাকে। সত্যি-মিথ্যে বোঝে না।”

পিন্টুদা বলল, “আর তিরিশ মিনিট আছে হাতে।”

“প্লিজ় মাইরি, আর ভাল লাগছে না। ভোকাল টনিক আর কাজ করবে না। ইমিনিউনিটি ডেভেলপ করে গিয়েছে,” পাতাদা বিরক্ত হল, “টাকাটা দরকার, এটাই মোদ্দা কথা। কারণ, তুমি সলমান খান! কথা দিয়েছ! তাই আমরা বাম্বু নিচ্ছি!”

পিন্টুদা রেগে গেল, “তোদের ফিলিংগুলোই নেই! একটা বয়স্ক মানুষ বলেছেন। তার সঙ্গে পাশের পাড়া থেকে অমন অপমান। ওদের নাকি হিরোর পুজো! একটা জবাব দিতে হবে না?”

হাট্টিম উঠে দাঁড়াল। বলল, “চল, অনেক হয়েছে! ওই বাঁশি বাজাল রেফারি। চল।”

পিন্টুদা এগিয়ে গেল হাট্টিমের দিকে। বলল, “আজ তুই আর হাট্টিম নোস কিন্তু। মনে রাখিস আজ তুই কৃশানু! নিজের ভাল নামটা ভুলিস না।”

সবাই লাইন করে মাঠে নামছে এবার। হাট্টিম আচমকা ইজনার পাশে দাঁড়াল এক মুহূর্তের জন্য। তার পর বলল, “যদি জিতি…. মনে আছে তো?”

ইজনা কিছু বলার আগেই হাট্টিম নেমে গেল মাঠে!

মুদ্রা পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, “দিদি, সিরিয়াস কিছু?”

ইজনা হেসে কথা ঘোরাল, “তুই এখানে কী করছিস?”

মুদ্রা লজ্জা পেল, “ওই রাখো! আসতে হল অফিস থেকে। নিজে তো ভিতুর ডিম একটা! জানো, লাস্ট ইয়ারেই আমাকে ওর ভাল লেগেছিল। কিন্তু আমি যদি ‘না’ বলে দিই, সেই ভয়ে আমার সঙ্গে কথাই বন্ধ করে দিয়েছিল। এক বার বিয়ে হয়েছিল শুনে নয়! তার পর বললাম ওকে আমার ভাল লাগে। সেটা নিয়েও ছেলের কী টেনশন! বলে মা মানবে না এই আগের বিয়ের ব্যাপারটা! আমিও ছাড়ার পাত্রী নই। সোজা ওর মাকে ফোন করলাম। বললাম সব। উনি হাসলেন শুনে, তার পর বললেন, ‘আমি বল করতে নাই পারি, কিন্তু তাই বলে এমন ছোট মনের নাকি! তবে মা, রাখোর মাথা খারাপ কিন্তু!’ আমি বললাম সব সাইজ় করে নেব। সাইজ় করেই তো নিতে হয়, তাই না ইজনাদি? সত্যিই ভালবাসলে কি ছেড়ে দেওয়া যায়, বলো? ভুলচুকগুলো তো ঠিক করেই নিতে হয়, তাই না?”

ইজনা ফুটবল ভালবাসে। আর সেটা মূলত হয়েছিল হাট্টিমের জন্যই। হাট্টিম যখন ইন্ডিয়ার হয়ে খেলেছে, সল্ট লেক স্টেডিয়ামে ইজনা কত বার গিয়েছে! হাট্টিমের দুর্ঘটনার পরে ওর পাশেপাশেই থেকেছে। কিন্তু সেই হাট্টিম কী যে করল! তাই তো গত দু’বছর আর ফুটবল দেখেনি ইজনা।

ইজনা মাঠের দিকে তাকাল। খেলা ভালই হচ্ছে। অঞ্জনদের পাড়ার ক্লাব এই ‘ফিনিক্স’। তবে ভাগ্য ভাল যে, অঞ্জন মাঠে আসেনি। হাট্টিমকে দেখে সেদিনের ব্যাপার নিয়ে সবার সামনে কী বলত কে জানে!

খেলা চলতে লাগল। সে ভাবে কিছুই হচ্ছে না। চোদ্দো মিনিটের মাথায় ইজনা দেখল, ভারতী সঙ্ঘ নিজের অর্ধে একটা ফ্রি কিক পেয়েছে। পেনসিল বলটা বসিয়ে দু’হাত দিয়ে সবাইকে উঠে যেতে বলছে। সবাই সেন্টার সার্কেল পার করে গিয়েছে। পেনসিল ছোট্ট করে দৌড়ে এসে লম্বা কিক মারল।

বিকেলের রোদে বলটা হাওয়ায় উঠে ভাসল খানিকটা। তার পর পাকা আমের মতো টুপ করে খসে পড়ল হাট্টিমের কাছে!

হাট্টিমের পেছনে দুটো প্লেয়ার। ও বলটাকে বুক দিয়ে রিসিভ করে এমন একটা টার্ন করল যে, দুটো প্লেয়ার দু’দিকে কেটে গেল। সামনে আরও দু’জন এগিয়ে এসেছে! রাখো দৌড়ে জায়গা নিচ্ছে। পড়ার মন্টু, জগাদারাও জায়গা নিচ্ছে।

ইজনা শুনল, পাশ থেকে পিন্টুদা চিৎকার করছে, “পাস দে হাট্টিম, ফার্স্ট টাইম দে…”

হাট্টিম যেন কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছে না! ইজনার মনে হল হাট্টিম যেন হাওয়ায় ভাসছে। অনায়াসে আরও দু’জনকে ইন সাইড আউট সাইড করে কাটিয়ে নিল ও। এবার সামনে শুধু ফিনিক্সের লম্বা ঝাঁকড়া চুলের স্টপার।

হাট্টিম ছোট্ট টোকায় ছেলেটার পায়ের ফাঁক দিয়ে বলটা গলিয়ে দিয়ে ওকে পার করে বলটা দখল নিল আবার। গোলকিপার উপায় না দেখে গোলের মুখ ছোট করে নিয়ে এসেছে। হাট্টিম আর অপেক্ষা না করে আলতো করে লব করে দিল। বলটা ধনুকের মতো বেঁকে গোলকিপারের মাথা টপকে জড়িয়ে গেল জালে!

‘গো-ও-ও-ও-ল!’ এমন চিৎকার হল যে, ইজনা কানে হাত দিতে বাধ্য হল! দেখল, পিন্টুদার চোখে জল। বারবার মাথায় হাত ছোঁয়াচ্ছে। কাকে প্রণাম করছে কে জানে! আশপাশের সবাই নাচছে। সিটি দিচ্ছে। মুদ্রা হাতের হেলমেটটা আকাশে ছুড়ে লোফালুফি শুরু করেছে। মাদুলি মাটিতে বসে টেনশনে দু’চোখ ঢেকে বলছে, “পারবেন তো? পারবেন তো? আজ প্লিজ় পারতেই হবে! আপনি কৃশানু যে! আপনি ছাড়া আর কে পারবে বলুন!”

এর পর ভারতী সঙ্ঘ আরও চেপে ধরল। কিন্তু ফিনিক্সের গোলকিপার ছেলেটা দারুণ খেলছে। রাখোর দুটো শট বাঁচাল। পেনসিলের হেড বাঁচাল। মন্টুর পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নিল দুটো বল। এদিকে আর সময় নেই।

ইজনার গলা শুকিয়ে গিয়েছে! বুকের মধ্যে মনে হচ্ছে দশ হাজার হাতি দাপাচ্ছে! মুদ্রা ওর হাত চেপে ধরেছে। হাতের তালু ঠান্ডা। খেলার মাঠে টেনশন খুব ছোঁয়াচে।

বিকেল হেলে পড়ছে এবার। রোদের রং সস্তার ঘুগনির মতো এখন হাওয়া দিচ্ছে বেশ। সারা মাঠ থরথর করে কাঁপছে! আর এক মিনিট বাকি! ড্র করতে পারলে অন্তত পেনাল্টি শুট আউট আছে। না হলে যে কী হবে!

এবার ফিনিক্সের ভুল পাস থেকে বল ধরল রাখো। তার পর এক জনকে কাটিয়ে সামনে বাড়িয়ে দিল। হাট্টিম বলটা ধরে এক জনের পাশ দিয়ে গতি বাড়িয়ে পেনাল্টি বক্সে ঢুকতে গেল। কিন্তু ছেলেটা পেছন থেকে ছোট্ট টোকা মারল হাট্টিমকে! হাট্টিম ভারসাম্য হারিয়ে বেশ জোরেই পড়ল মাটিতে! আর রেফারিও বাঁশি বাজাল সঙ্গে সঙ্গে। ডাইরেক্ট ফ্রি কিক।

পিন্টুদা মাথায় হাত দিল, “আর এক ফুট পরে মারলে পেনাল্টি হয়! ইস!”

হাট্টিম, প্যান্ট জার্সি ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল মাটি থেকে। সামান্য খোঁড়াচ্ছে। পায়ে বেশি চোট পেল নাকি! হাট্টিম থাইয়ের একটা জায়গায় নিজেই হাত দিয়ে ভাল করে ঘষল। তার পর বলটা টেনে নিল পা দিয়ে।

এদিকে রেফারি ঘড়ি দেখছে। সামনে ফিনিক্সের প্লেয়াররা পাঁচিল তুলে দাঁড়িয়েছে। স্পটে বল বসিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল হাট্টিম। সারা মাঠে নিস্তব্ধতা।

হাট্টিম এক বার তাকাল এদিকে। ইজনার দিকে কি?

রেফারি বাঁশি বাজাল।

হাট্টিম দৌড়ে গিয়ে কোনাকুনি শটটা মারল বলের তলায়। বলটা ফ্লাইওভারের মতো বাঁক খেয়ে লাফিয়ে ওঠা মানব পাঁচিলের মাথা এড়িয়ে ভেসে গেল গোলের দিকে। গোলকিপার লাফাল। কিন্তু নাগাল পেল না। বলটা আরও যেন সামান্য বাঁক খেলো, গোলকিপারের হাত এড়াতে। তার পর ভেসে গেল গোলের দিকে।

সারা মাঠ দাঁড়িয়ে উঠেছে। কী হল! কী হল এবার!

ইজনা আর পারল না। টেনশনে চোখ বন্ধ করে নিল! আর দেখল, বহু দিন আগের একটা শীতের বিকেল। দেখল, গোলাপি রোদ্দুর এসে পড়ছে সামান্য এক ব্লাইন্ড লেনের শেষে, ভাঙাচোরা বাড়ির গায়ে। আর সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ওর দিকে ভয় আর ভালবাসা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে একটা নরম মুখের ক্লাস টুয়েলভের ছেলে। হাওয়ায় অল্প অল্প উড়ছে তার চুল। আর গালটা ক’দিনের না কামানো দাড়িতে নীলচে ভেলভেটের মতো হয়ে আছে!

বারো

হাট্টিম

আজ কৃষ্ণচূড়া গাছটায় অন্য রকম আলো। দুটো ঝুঁটিওলা পাখি এসে বসেছে সামনের ডালে। রোজকার মতো আজও কিচকিচ করছে। কী বলে পাখিরা? ইস, মানুষ যদি পাখিদের ভাষা বুঝতে পারত! কিন্তু যা যা হলে ভাল হত, তা তো আর হয় না জীবনে। নিরন্তর না-হওয়াগুলো শুধু ঢেউয়ের মতো ফিরে ফিরে আসে। আর মানুষকে সব সহ্য করে নিতে হয়।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল হাট্টিম। আজ রবিবার, ছুটির দিন। ভেবেছিল অনেক দেরি করে উঠবে। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেল তাড়াতাড়ি। আর উঠেই পাখিদের দিকে চোখ পড়ল রোজকার মতো।

পাশ ফিরে কোল-বালিশটা টেনে নিল হাট্টিম। তার পর শুয়ে শুয়ে শুনল, রাস্তার ও পারের বাড়ি থেকে মন্টুর বোন তোতা, গলা সাধা শুরু করেছে। শুনল, ফেরিওয়ালা হরেক মালের ভ্যান নিয়ে ঢুকে বক্স বাজিয়ে বিক্রি করছে রকমারি জিনিস। আর শুনল, পাড়ায় লরি ঢুকল খরখরে শব্দ তুলে।

নাঃ, আর শুয়ে থাকার মানে নেই। ও উঠল। বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা তুলে দেখল, পৌনে আটটা বাজে। তার পর হাত বাড়িয়ে জলের বোতল নিয়ে জল খেল বেশ খানিকটা।

কী করবে আজ? গোটা দিনটার দিকে তাকিয়ে মনে হল, ওর সামনে যেন বন্ধের দিনের শূন্য রাস্তা পড়ে আছে। কী করবে ও এমন একটা দিন নিয়ে? কী আছে ওর জীবনে?

আচ্ছা, ইজনা থাকলে কি সব থাকত? একটা মানুষ থাকা আর না- থাকার মধ্যে জীবনের অর্থ এতটা পাল্টে যায়? হ্যাঁ, যায় তো। যার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তার কাছে না থাকলে জীবন তো শূন্য লাগবেই!

হ্যাঁ, সবার কাছে এই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের রূপগুলো আলাদা আলাদা। কারও কাছে চাকরি টাকা জীবনের প্রতিষ্ঠা গাড়ি বাড়ি সমাজে প্রতিপত্তি নাম যশ। আবার কারও কাছে শুধু ভালবাসা! যার যার জীবন, তার তার মতো!

ফুটবলার হতে চেয়েছিল হাট্টিম। কিন্তু একটা সময়ের পরে দুর্ঘটনার জন্য সরে যেতে হয়েছে। এই জীবনে ফুটবল ছাড়া ও চেয়েছে শুধু ইজনাকে। আর তো কিছু চায়নি! কিন্তু সেটাও যে আর হবে না! ইজনা তো বলেছিল জিতলে ওর সব কথা শুনবে। কিন্তু গত কাল কী যে হল!

ফ্রি-কিকটা মেরেছিল ঠিকই। বলটা লাফিয়ে ওঠা মানব প্রাচীরের মাথা টপকে, ঝাঁপিয়ে পড়া গোলকিপারের হাত এড়িয়ে ভেসে গিয়েছিল গোলের দিকে। তার পর জালে না-জড়িয়ে ক্রসপিসে লেগে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল বাইরে! আর, তার সঙ্গে সঙ্গে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল খেলা শেষ।

খেলা সত্যি শেষ। আর সেটা শেষ করেছে হাট্টিম নিজে। যেমন গতকাল, তেমন দু’বছর আগে! এখনও ভাবলে নিজেকে চড়াতে ইচ্ছে করে হাট্টিমের। কেন ও-সব পার্টিতে গিয়েছিল ও!

পুরনো এক ফুটবলার বন্ধুর জন্মদিনের পার্টি ছিল সেটা। ইজনাসমেত ওকে নেমন্তন্ন করেছিল বন্ধুটি।

ইজনা যেতে চায়নি একদম। কিন্তু হাট্টিমই জোর করেছিল। বন্ধুটি গোয়ার ফুটবলার। কলকাতায় ওর সঙ্গে দীর্ঘ দিন খেলেছে। কী করে ‘না’ করবে ও!

অনুষ্ঠানে পৌঁছনোর পরে বন্ধুটি জড়িয়ে ধরে খুবই আপ্যায়ন করেছিল। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল নিজের ইউক্রেনিয়ান বান্ধবী ডারিনার সঙ্গে।

সত্যি বলতে কী, অনেক দিন পরে আনন্দ হয়েছিল হাট্টিমের। পুরনো পরিচিতদের মুখ দেখে মনে হয়েছিল, এত দিন পরে যেন নিজের জায়গাতে এল। ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল কোনও ট্রোফি জেতার পরের পার্টির কথাগুলো! আর সত্যি বলতে কী, ইজনাকে কিছুটা নেগলেক্টই করছিল ও। ওর মনে হয়নি যে, ইজনা এখানে কাউকে চেনে না। ওরও বিরক্ত লাগতে পারে।

কোনও দিন মদ-টদ খায় না হাট্টিম, কিন্তু সেদিন বন্ধুটি সফট ড্রিঙ্কে মিশিয়ে বেশ কিছুটা মদ খাইয়ে দিয়েছিল ওকে। এক বার মনে হয়েছিল সফট ড্রিঙ্কটা কি একটু বেশি তেতো নয়? কিন্তু যেদিন গোলমাল হওয়ার, সেদিন কে বাঁচাবে!

দু’গ্লাস পানীয়ের পরে সারা পৃথিবীটা কেমন যেন হালকা আর মজার লাগছিল। আলো, গান, নাচ সব কিছুর মধ্যেই কেমন যেন একটা ফুরফুরে ভাব! জীবনে যেন কোনও চিন্তা নেই! ভাবনা নেই! শুধু আনন্দই আনন্দ!

কুড়ি তলার উপরে নিউটাউনের একটা ফ্ল্যাটে হচ্ছিল পার্টিটা। নাচতে নাচতে এক সময় টলমলে মাথা নিয়ে বারান্দার খোলা হাওয়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল হাট্টিম। এত ওপর থেকে সামনে ছড়িয়ে থাকা শহর দেখে মনে হয়েছিল, কে যেন এলইডি আলো দিয়ে ঝুলন সাজিয়ে রেখেছে। এত উঁচুতে ফ্ল্যাট হলে কী মজা হয়, না! নিজেকে পাখির মতো লাগে। হঠাৎই কে যেন কাঁধে হাত দিয়েছিল ওর। ও ঘুরে দেখেছিল, ডারিনা। হেসেছিল হাট্টিম।

ডারিনা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলেছিল, “ইউ লোনলি? মি লোনলি টু!”

হাট্টিম কী বলবে বুঝতে না পেরে হেসেছিল আবার।

“ইউ হ্যাভ আ নাইস স্মাইল!” ডারিনা আচমকা এগিয়ে এসে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছিল হাট্টিমকে। তার পর মাথাটা টেনে নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরেছিল। দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড়ে দিয়েছিল ঠোঁট। নিজের জিভের ডগাটা দিয়ে স্পর্শ করেছিল হাট্টিমের জিভ।

হাট্টিমের মাথা কাজ করছিল না। বুঝেছিল, ডারিনা ওর হাত দুটো ধরে নিজের কোমরে জড়িয়ে নিয়েছে। নিজের বুক চেপে ধরেছে ওর বুকে। আরও ঘন ভাবে চুম্বন করছে হাট্টিমকে।

এ সব কী হচ্ছে! কেন হচ্ছে! ডারিনা তো অন্যের বান্ধবী! তা হলে এমন করছে কেন! ও নিজেই-বা সরে যেতে পারছে না কেন!

মাথাটা হালকা লাগছিল হাট্টিমের। অ্যালকোহলের গন্ধ পাচ্ছিল ডারিনার শ্বাসে। সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল। আর তখনই ‘হাট্টিম’ বলে প্রচণ্ড শব্দে ওর নামটা ফেটে পড়েছিল বারান্দায়।

ঘোর কেটে গিয়েছিল হাট্টিমের। ও ডারিনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিল জোর করে। দেখেছিল, বারান্দার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইজনা।

“ইজনা…” হাট্টিম কী বলবে বুঝতে পারছিল না!

ইজনা রাগের চোটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর উপর। তার পর জামা ধরে ঝাঁকিয়ে দু’গালে থাপ্পড় মেরেছিল গায়ের সব জোর দিয়ে। মার গায়ে লাগেনি সে ভাবে হাট্টিমের। মাথা কাজ করছিল না ওর। কিন্তু ইজনার কান্না দেখে কষ্ট হচ্ছিল। বুঝতে পারছিল, খুব বড় গোলমাল হয়ে গিয়েছে।

ইজনা আর দাঁড়ায়নি। চলে গিয়েছিল ঝড়ের মতো। হাট্টিম পিছন পিছন গিয়েছিল। কিন্তু ইজনা বলেছিল, “আর জীবনে আমার কাছে আসবে না তুমি! আলজিভ পরীক্ষা করছিলে তুমি! লম্পট!”

হাট্টিম কত চেষ্টা করেছিল নিজের কথাটা ইজনাকে বলতে। কিন্তু খুব জেদি মেয়ে ইজনা। তার পর থেকে কোনও দিন ও কিছু শোনেনি। হাট্টিমকে সুযোগই দেয়নি কিছু বলার। নিজের জীবন থেকে একদম সরিয়ে দিয়েছিল হাট্টিমকে।

আর আজ এই শূন্য একটা দিনের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করছে হাট্টিমের। কাল যদি জিততে পারত! তা হলে হয়তো…..

‘যদি’! এই একটা শব্দেই কত কিছু পাল্টে যায় জীবনের!

নাঃ, আর শুয়ে থেকে লাভ নেই। উঠে পড়ল হাট্টিম। বিছানা থেকে নামতে গিয়ে বুঝল কাল খেলতে গিয়ে পাওয়া পায়ের চোটটায় ব্যথা হয়েছে বেশ। মালে লেগেছে। ক’দিন ভোগাবে!

ও বাথরুমের দিকে গেল। রোজ মামারা বাজারে যায়। আজ ও যাবে।

ফ্রেশ হয়ে ঘরে এসে দেখল, বুজু দাঁড়িয়ে আছে। একটা ম্যাগাজ়িনের পাতা ওল্টাচ্ছে। ওকে দেখে বলল, “আরে দাদা, নীচে চল। এক জন এসেছে। তোর মোবাইল কই? বন্ধ?”

“হ্যাঁ,” মাথা নাড়ল হাট্টিম।

আসলে গত কাল বাড়িতে এসে মোবাইল অফ করে দিয়েছে ও। কী হবে চালু রেখে! মাঠেই যে ভাবে ইজনা ওর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। একেই হেরেছে। তার পর ইজনার ওরকম ব্যবহার। আর কিছু ভাল লাগে!

“কী যে করিস না! চল তাড়াতাড়ি!”

“আরে, সাত-সকালে কী ব্যাপার? কে এসেছে?” হাট্টিম জিজ্ঞেস করল!

“আটটা কুড়ি বাজে এখন। সাত-সকাল আবার কালকে হবে। চল না!” বুজু ভুরু কোঁচকাল।

হাট্টিম আর কথা না বাড়িয়ে পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে নামল নীচে।

কিন্তু বসার ঘরে যাওয়ার আগেই বড়মামার সঙ্গে দেখা হল ওর।

বড়মামা খবরের কাগজ নিয়ে খাওয়ার টেবিলের দিকে যাচ্ছিল। ওকে দেখে থমকে গেল। জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁরে হাট্টিম, সকাল সকাল লরিতে করে পাড়ায় বাঁশ, কাঠ এ সব পড়ছে কেন?”

হাট্টিম হাসল। বলল, “পুজো হবে তো।”

“পুজো?” বড়মামা অবাক হয়ে তাকাল, “কাল হেরে গিয়েছিস না? তা হলে টাকা পাবি কোথা থেকে!”

হাট্টিম বলল, “জিতলে সাড়ে সাত লাখ, মামা। কিন্তু রানার্স হলেও তো প্রাইজ মানি আছে! রানার্সদের জন্য সাড়ে তিন দিয়েছে। আমায় দিয়েছে ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট হিসেবে পঞ্চাশ হাজার। সেটা যোগ করো, মোট চার লাখ। পাতাদা বেস্ট গোলকিপার হিসেবে পেয়েছে পঁচিশ হাজার। সেটাও যোগ করো। বাকি লাখখানেকও ঠিক উঠে যাবে। চাপ নেই। তাই পিন্টুদা মাঠ থেকেই পাতাদাকে বলেছিল ওদের ডেকরেটার্সদের বলতে। আর বেশি দিন নেই পুজোর। শুনছি, বিকেলে কয়েকজন কুমোরটুলি যাবে ঠাকুর বায়না করতে।”

বড়মামা খুশিতে মাথা নাড়ল, “যাক, আমাদের পাড়াতেও পুজো হবে! উফ দারুণ। আর লাখখানেক নয়। তোদের এবার তুলতে হবে পঁচাত্তর। নে আমরাও কোম্পানি থেকে পঁচিশ হাজার দিলাম। পুজো জমিয়ে করতে হবে। ওখানে রানার্স হলে চলবে না হাট্টিম।”

হাট্টিম হাসল। তার পর বসার ঘরের দিকে গেল। দেখল, ঘরের দরজায় বুজু দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি। ওকে দেখে, ‘যা’ বলে চলে গেল। হাট্টিম ঘরে ঢুকল আর ঢুকেই চমকে উঠল! দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইজনা!

“ত-তুমি?” হাট্টিম কী বলবে বুঝতে পারল না।

“কেন আসতে নেই?” ইজনার গলায় সেই রাগ!

“হ্যাঁ নিশ্চয়ই! বলো!” হাট্টিম বলল।

“ফোন অফ কেন তোমার? দরকারে পাওয়া যায় না!” ইজনা ঝাঁজের সঙ্গে বলল।

“এমনি। তা তুমি তো ওপরে গেলেই পারতে!”

“সে আমি কী করব না করব তুমি বলে দেবে?” ইজনা ভুরু কুঁচকে তাকাল। বলল, “বুড়োদাদু ডেকেছে। চলো এক্ষুনি!”

“এখন!” হাট্টিম অবাক হল।

“সব বিষয়ে খালি এখন-তখন করা, না? চলো,” ইজনা জোর করল।

“আচ্ছা আচ্ছা। আমি মামিদের বলে আসি। জাস্ট আ মিনিট।”

হাট্টিম ভেতরে গেল আবার। দেখল, খাবার ঘরে তিন মামিই আছে।

ও বলল, “আমি বুড়োদাদুর কাছ থেকে ঘুরে আসছি একটু। ডেকেছে।”

“ব্রেকফাস্ট করে যা!” বড়মামি বলল, “আর ওই মেয়েটাকেও খেতে বল। ও এমন করে বাইরের ঘরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এই বাড়িতে নতুন! ঢং দেখে বাঁচি না বাবা! নিয়ে আয় ওকে।

“আমি বুড়োদাদুর কাছ থেকে চট করে ঘুরে আসি এক বার। তার পর দেখছি।”

হাট্টিম আর দাঁড়াল না!

বাইরে আজ যুবক সিংহের মতো রোদ উঠেছে। কাল রাতে বৃষ্টি হয়েছিল বলেই যেন আকাশ আজ ধুয়েমুছে একদম সাফ। এমন সুন্দর টলটলে নীল রং যে, মনে হচ্ছে যেন নতুন পাতা বেডকভার। আর তার মাঝে মাঝে সাদা ফোলা বালিশের মতো মেঘ! শরৎকালের আনন্দটাই অন্য রকম।

পাড়ার মোড়ের কাছে প্যান্ডেল হচ্ছে। যা যা পারমিশন-টারমিশন নেওয়ার পিন্টুদা নাকি আগেই নিয়ে রেখেছিল। নিজের ছাড়া বাকিদের সব ব্যাপারে পিন্টুদা খুব করিতকর্মা!

প্যান্ডেলের বাঁশ পড়ে গিয়েছে। লোকজন রাস্তায় গর্ত করছে খুঁটি পুঁতবে বলে। পুজো হচ্ছে, পুজো হচ্ছে পাড়ায়।

এই আনন্দের মধ্যেও একটা মন খারাপ। ইজনা এত কাছে, তবু কথা বলছে না কোনও। হাট্টিমও কথা বলছে না। কী আর বলবে! জিতলে না-হয় বলার মতো জায়গায় থাকত। ইজনা তো শর্ত দিয়েই দিয়েছিল।

.

বুড়োদাদু বসে ছিল টানা বারান্দায়। বড় ছাতিম গাছের আলোছায়া এসে পড়েছে বুড়োদাদুর গায়ে। মানুষটাকে আজ বেশ উজ্জ্বল লাগছে।

বুড়োদাদু হাট্টিমকে দেখে হাসল, উঠে দাঁড়াল। তার পর এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল আলতো করে। কিছুক্ষণ ওই ভাবেই ধরে রইল। হাট্টিম বুঝল, কোনও কোনও সময় এমন স্পর্শই কথোপকথন।

দাদু সরে দাঁড়াল এবার। বলল, “আমার সুযোগ থাকলে মাঠে গিয়ে তোর খেলা দেখতাম। তুই তো জানিস আমি নিজে প্লেয়ার ছিলাম। জ্যোতিষ গুহ আমার খেলা দেখে খুশি হয়ে অনেক কথা বলেছিলেন। নিজেদের দলে নিতে চেয়েছিলেন। সে এক সময় ছিল! দামাল সময়! ফুটবলটাই ছিল জীবন। আমরা যারা ফুটবল ভালবাসি, তাদের জীবনের সব চলে গেলেও এই খেলাটা থেকে যায়। আর সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হল, এই খেলার মাধ্যমেই তোরা পাড়ায় পুজো নিয়ে এলি। জানিস তো, আমার কিশোর বয়সে এই পাড়ায় পুজো হতে হতেও হয়নি। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তোরা আমার মতো সামান্য মানুষের কথায় তা আবার চালু করলি। আমি কী বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাব তোদের? বিশেষ করে তোকে! পিন্টু, পাতা, মাদুলি, রাখো সবাই এসেছিল। ওদের কাছে শুনলাম তুই কেমন খেলেছিস। প্রাইজের টাকাটাও দিয়ে দিয়েছিস।”

হাট্টিম বলল, “আমরা সবাই খেলেছি দাদু। পাতাদাও দারুণ খেলেছে।”

“ঠিক,” বুড়োদাদু হাসল, তার পর বলল, “ঠিক। আমরা একা রাজা নই। আমরা সবাই মিলে রাজা। ফুটবল তো এটাই শেখায়। দিনের শেষে সবাই এক হতে না পারলে মানুষের অগ্রগতি হয় না। তাও আমি একটা জিনিস দিতে চাই তোকে।”

“আমায়!” হাট্টিম অবাক হল।

“এটা রাখ। আজ থেকে এটা তোর,” বুড়োদাদু ফতুয়ার পকেট থেকে একটা ভেলভেটের কৌটো বের করে রাখল ওর হাতে, “বহু বছর এটা আছে আমার কাছে। আমার জিনিস নয়। আমি জিম্মাদার মাত্র। অপেক্ষা করছিলাম যোগ্য কাউকে দিয়ে যাওয়ার জন্য।”

“কী এটা?” অবাক হল হাট্টিম।

“এখন না, পরে দেখিস, কেমন?” বুড়োদাদু মাথায় হাত দিল হাট্টিমের। বলল, “ভাল থাকিস।” তার পর ইজনার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “সারা জীবন রাগ করেই কাটিয়ে দিবি? এই ছিল তোর মনে?”

ইজনা কিছু না বলে মাথা নামিয়ে নিল শুধু।

বুড়োদাদু আর কিছু না বলে হেসে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

শুনল, ছোটদাদু ঘরের ভেতর থেকে বলছে, “কে দাদা? আবার পরি এল!”

বুড়োদাদুর গলা পাওয়া গেল, “না, এবার মানুষ।”

হাট্টিম বারান্দা দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কী দিল দাদু এটা? ইজনাও পাশে পাশে আসছে।

সিঁড়ির মুখে এসে রাস্তা থেকে নিজের নামটা শুনতে পেল হাট্টিম। “এই হাট্টিম, হাট্টিম!” রাখোর গলা।

তার সঙ্গে পিঁ পিঁ করে বাঁশিও বাজাল একটা। এবার শোনা গেল পিন্টুদার গলা, “এই হাট্টিম। ক্লাবে মিটিং আছে। চলে আয়!”

আবার পিঁ করে বাঁশি। হাট্টিম শুনল রাখো চিৎকার করছে, “কী কানের কাছে বাঁশি নিয়ে পিঁ পিঁ শুরু করেছ পিন্টুদা! কিচ্ছু নেই! সাত- সকালে বাঁশি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে! আচ্ছা জ্বালাতন মাইরি!”

এবার মাদুলির গলা শুনতে পেল হাট্টিম। শুনল, মাদুলি বলছে, “দুর্গাপুজো তো হল। কিন্তু কালীপুজো? পারবেন কালীপুজো করতে?”

রাখো এখনও চেঁচিয়ে যাচ্ছে, “তুই চুপ করবি! বাজির বদলে না হলে তোকে ফাটাব! সারাক্ষণ খালি পিনিক দেওয়া!” তার পর ডাকল, “এই হাট্টিম, কী রে! ওই!”

হাট্টিম দ্রুত নীচের দিকে নামতে গেল। কিন্তু ইজনা আচমকা খপ করে হাতটা ধরল ওরা।

হাট্টিম কিছু বলতে গেল। কিন্তু ইজনা অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরল ওর মুখ। বলল, “একদম উত্তর দেবে না। সারাক্ষণ খালি বন্ধু, আড্ডা, না? চলো চলো।”

ইজনা ওকে নীচে যেতে দিল না। বরং টানতে টানতে নিয়ে গেল ছাদে।

বড় ছাদ এখন শূন্য। কেউ নেই। শুধু বাড়ির লাগোয়া ছাতিম গাছের ফুল ঝরে ঝরে নরম সবুজ রঙে মুড়ে দিয়েছে চারিদিক!

ইজনা ওকে ছাদের রেলিংয়ে চেপে ধরল এবার। তার পর বলল, “খালি পালানো! বলো, বলো এবার, কী বলবে বলো!”

“বলব?” হাট্টিম অবাক হল, “কিন্তু সেদিন যে বললে না জিতলে…”

“এখন কে সিনেমার মতো বলছে! সব কথা ধরে বসে থাকতে হবে? দু’বছরেও সময় পাওনি বলার? আমি ‘না’ করেছি তো জোর করা যায় না?”

হাট্টিম কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল ইজনার দিকে।

“শয়তান একটা! লম্পট!” ইজনা বড় বড় চোখ তুলে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।

হাট্টিম দেখল ইজনার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। মুখে আলো লেগে টলটল করছে দুটো চোখ। ওর বুকের মধ্যে যে কী কষ্ট হল। চোখ জ্বালা করে উঠল হঠাৎ।

ও মৃদু গলায় বলল, “আমার তোমাকে ছাড়া থাকতে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু যে ভুলটা…”

“চুপ লম্পট!” ইজনা হাতে খিমচে দিয়ে হাট্টিমকে থামিয়ে দিল। তার পর ওর পাঞ্জাবির বুকের কাছটা ধরে টেনে নিয়ে ঠোঁটে চেপে ধরল ঠোঁট।

আর বহু দিন পরে আবার সেন্টার সার্কেল থেকে বল ধরে এক এক করে সবাইকে কাটাতে কাটাতে এগোতে লাগল কৃশানু। সবুজ ঘাস থেকে ছিটকে উঠল শিশির। দর্শকরা চিৎকার করতে লাগল। হাওয়া এসে জড়িয়ে গেল সারা গায়ে। সামনে গোলকিপার এগিয়ে এসে গোলের মুখ ছোট করে দিল। কিন্তু ও জানে আজ ওকে থামাবে, এই সাধ্য কারও নেই।

হাট্টিম বুঝল জীবন আসলে ফুটবলের মতোই। এখানেও হারা জেতা পার করে খেলে যাওয়াতেই আনন্দ।

ইজনা এবার ছাড়ল ওকে। তার পর বলল, “আর যদি কোনও দিন…”

“ক’টা মাথা আমার ঘাড়ে!” হাট্টিম বলতে গেল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন গলা বুজে এল।

ও হাসল। তার পর কথা ঘোরাতে ওর হাতের বাক্সটা খুলল এবার। দেখল, ছোট্ট একটা লকেট। সোনার। সাতটা পাতাফুলের মতো করে একটা বৃন্তে যুক্ত। এটা ওকে দিল বুড়োদাদু! দেখে তো বেশ পুরনো মনে হচ্ছে। কার এটা!

ইজনা হাতে নিল ছোট্ট পাতার লকেটটা। তার পর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বলল, “কী সুন্দর! চিনতে পারছ কী পাতা?”

হাট্টিম বলল, “হ্যাঁ, ছাতিম!”

ইজনা ওর কাঁধে মাথা রেখে বলল, “এর ভাল নাম আছে একটা। খুব সুন্দর শুনতে। জানো তো?”

হাট্টিম তাকাল ছাদের পাশের গাছটার দিকে। ছাতার মতো ছড়িয়ে আছে আকাশে। সকালের হাওয়ায় গুঁড়ো গুঁড়ো ফুল ঝরে পড়ছে ছাদ জুড়ে। ও ইজনার দিকে তাকাল। গালটা ধরল আলতো করে। তার পর বলল, “হ্যাঁ জানি। সপ্তপর্ণী।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *