তৃতীয় অধ্যায়
সতু
সৌদামিনী মানে সকলের কাছে যে মিনি, সে আজ ফ্রক পরেছে। সবুজের ওপর হলুদ ফুলছাপ ফ্রক। মাথায় লাল ফিতে। পায়ে ফ্যান্সি জুতো। সতুদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে সৌদামিনী। ওর বাবা, মানে মলয়কাকু ট্যাক্সি ডেকে আনতে গিয়েছে। আজ ওরা কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে যাচ্ছে মাদ্রাজ। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরবে।
কলকাতায় এখন একটা ভয় ঢুকেছে সবার মনে। জাপানি বোমার ভয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ব্রিটিশদের সঙ্গে ধুন্ধুমার লড়াই বেঁধেছে জাপানিদের। কলকাতা যেহেতু ব্রিটিশদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শহর, পূর্ব সীমান্তে যুদ্ধরত সৈন্যদের খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর সাপ্লাই লাইন আর পূর্ব ভারতেরও এক রকম প্রাণকেন্দ্র, তাই এখানে নাকি বোমা ফেলবে জাপানিরা।
গঙ্গার ওপর ব্রিজটা শেষ হয়ে গিয়েও যেন শেষ হচ্ছে না। এসব ঝামেলা না কাটলে নাকি ব্রিজটা চালু হবে না।
এক দিন নশার সঙ্গে গিয়ে ব্রিজটা দেখে এসেছে সতু। কী বিশাল ব্রিজ রে বাবা! দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের কঙ্কাল! কবে যে একবার ব্রিজটায় উঠতে পারবে!
সতু জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। মিনি দাঁড়িয়ে আছে। গোপুজ্যাঠার সঙ্গে কী সব কথা বলছে। ওদের বাড়ির দরজায় বাক্সপেটরা রাখা। গাড়ি এলেই তাতে তোলা হবে।
মিনি কথা বলছে বটে জ্যাঠার সঙ্গে, কিন্তু ওর চোখ মাঝে মাঝেই ছুঁয়ে যাচ্ছে এই বাড়ির জানলাটা। জানলার পাশে বসে সতু খুব বুঝতে পারছে যে, মিনি কাকে দেখছে।
আজকাল সব কিছুতেই কেমন একটা বিতৃষ্ণা এসেছে সতুর। খেতে ইচ্ছে করে না। পড়তে ইচ্ছে করে না। এমনকি, ফুটবল খেলতেও ইচ্ছে করে না। কিন্তু তাও সে সব করে। যন্ত্রের মতো করে।
আসলে ওর খালি মনে হয়, কী হবে এ সব করে! বুকের মধ্যেটা কেমন যেন শূন্য লাগে। মনে হয় পাখির শূন্য বাসা হাওয়ায় একা একা পাক খাচ্ছে ধুলোয়। মাথার পেছন দিকে মনে হয় কে যেন সীসের শেকল জড়িয়ে দিয়েছে। আর পা দুটো যেন কাগজের তৈরি। ঘুমের মধ্যে কী সব স্বপ্ন দেখে! কোনও দিন দেখে, মা মারা গিয়েছে। কোনও দিন দেখে, অমর পড়ে গিয়েছে ছাদ থেকে। আবার এক দিন দেখেছে, কুসুমদির উপর শুয়ে ও নিজে পাগলের মতো উথালপাথাল করছে। ঘামে আর পীড়নে লাল হয়ে আছে কুসুমদি। খোলা কাঁধে আর গ্রীবায় আদরের ভিজে চুল লেপ্টে রয়েছে।
যেদিন এই স্বপ্নটা দেখেছিল, সেদিন রাত্রে কী ভাবে যে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল সতুর! তলপেটে যেন ইলেকট্রিকের শক খেয়েছিল ও! সতু ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখেছিল, পাজামাটা ভিজে গিয়েছে একদম।
লজ্জায় মরমে মরে যাচ্ছিল ও। স্বপ্নের মধ্যে যা ভাল লাগছিল, বাস্তবে সেটার জন্য লজ্জায় আর নিজের উপর ঘৃণায় ওর মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল পুরনো দিনের মতো কেউ যদি ওকে বেঁধে চাবুক দিয়ে পেটাত, তা হলে হয়তো এই লজ্জা আর অধঃপতন থেকে ওর মুক্তি হত।
দ্রুত বাথরুমে যেতে হয়েছিল ওকে। রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে লোহার বালতি আর টিনের মগের আওয়াজ যেন হাজার হাজার বোমার মতো ফেটে পড়ছিল বাড়িতে! কোনও কারণ নেই, তবু সতুর মনে হচ্ছিল সবাই যেন জেনে গিয়েছে আসলে মনে মনে কতটা খারাপ ও। নিজের চৌকিতে ফিরে এসে কী যে কান্না পেয়েছিল ওর! কুসুমদির মুখটা মনে পড়ছিল খুব। ওই গলিতে কার কাছে গিয়েছিল কুসুমদি? কে বেরিয়ে এসেছিল ওই বাড়িটা থেকে! কুসুমদিকে ওরকম হাত ধরে কেন ঢুকিয়ে নিয়েছিল বাড়িতে!
চোখের সঙ্গে বুকের মধ্যেও জ্বালা করছিল সতুর। হিংসে এমনই হয়। এমন করে নিজেকে পোড়ায়। একই সঙ্গে শরীর আর মন পুড়িয়ে আংরা করে দেয়।
সেদিন ওই বাড়িটার মধ্যে কী করছিল কুসুমদি আর ওই ছেলেটা? বড় ছেলেমেয়েরা এক ঘরে নিভৃতে থাকলে কী করে? নশার কথা মনে আসছিল ওর। খারাপ কথা বলে নশা। শরীরের গোপন কথা বলে। হাতে আঁকা ছবির বই লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে আসে। টিফিনের সময় সবাই হুমড়ি খেয়ে দেখে! হাতে আঁকা নগ্ন নরনারীর ছবি! অদ্ভুত সব ব্যায়াম করার মতো ভঙ্গি!
নশা আড়ালে বলে, “তোর কুসুমদিও এমন করবে জানিস!”
এত রাগ হয় সতুর! নশাকে এসব বলতে বারণ করে। শাসায়। নশা পাত্তা দেয় না। হাসে। কুৎসিত ইঙ্গিত করে বলে, “তুইও এ সব ভাবিস তো ওই সময়গুলোয়!”
“আমি তো নোংরা নই তোর মতো!” প্রতিবাদ করে সতু।
নশা আরও জোরে হাসে। বলে, “সব শালা নোংরা। সবাই এ সব ভাবে। মুখে সবাই সাধুপুরুষ ভাব দেখায়। আরে, আমাদের সবার ভেতরে একটা জন্তু আছে! সেই জন্তু আমাদের তাড়া করে সারা জীবন। পিছু ছাড়ে না। দেখবি, সেই জন্তুটা শুধু শরীরের আরাম চায়। বুঝেছিস? ভগবান, পাপ, পুণ্য ও সব কিচ্ছু না। সব মিথ্যে। শরীর আছে, সেটাকে কাজে লাগা। এক দিন ছাদে ওই চিলেকোঠায় ডেকে নিয়ে গিয়ে কুসুমদিকে জাপটে ধর। বুকে হাত দে। জন্তুটাকে বকলস দিয়ে বেঁধে রাখিস না, ছেড়ে দিয়ে দেখ। এমন টিপে টিপে কিপটের মতো বাঁচিস না।”
সতু জানে এসব নোংরা কথা। ও আমল দেয়নি। কিন্তু একদমই কি দেয়নি? তা হলে স্বপ্নে অমন দেখেছিল কেন? কেন মনে মনে ভেবেছে, ওই বন্ধ ঘরে বাদামি পাঞ্জাবি পরা ছেলেটার সঙ্গে কুসুমদি সেই হাতে আঁকা ছবির মতো বিচিত্র ভঙ্গিতে জড়িয়ে আছে! কেনই-বা স্বপ্নে ওইভাবে পতিত হয়েছে ও!
.
জানলার পাল্লাটা ভেজিয়ে দিয়ে সরে এল সতু। মিনি ওকে দেখে এমন করে যে, ভাল লাগে না একটুও। এই যে বারবার তাকায়। নশার হাত দিয়ে এটা-ওটা পাঠায়, পাড়ায় জানাজানি হয়ে গেলে কী যে বিশ্রী ব্যাপার হবে! আর, বাবা যদি জানতে পারে তো মেরে পাট করে দেবে সতুকে!
বাবা আজকাল কেমন যেন গম্ভীর আর হিংস্র হয়ে উঠছে। গত কালও অমরকে পিটিয়ে একটা কাঠের স্কেল ভেঙে ফেলেছিল। মা এসে ঠেকাতে গেলে মাকেও একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিল।
সতুর যেন আগুন লেগে গিয়েছিল মাথায়! মাকে মারল বাবা! অমরকে অমন করে পেটাল! ওর মনে হচ্ছিল, বাবারই কি শরীরে শুধু জোর আছে? এই বয়সেই ও প্রায় ছ’ফুট লম্বা। এই চওড়া ওর কাঁধ। ওর গায়ে কম জোর নাকি! এবার গোঁসাই বাড়ির রথের সময় রথের চাকা বসে গিয়েছিল কাদায়। কে একা তুলে দিয়েছিল সেটা?
গোঁসাইজ্যাঠা বলেছিলেন, “তুই থাকলে কর্ণর চিন্তা ছিল না!”
মার খেয়ে মা এক কোনায় পড়ে গিয়েছিল। বাবাও অমরকে ছেড়ে বাদামি কেডস পায়ে গলিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল হনহনিয়ে।
সন্ধেবেলা মা ওকে দুটো নারকোলের নাড়ুর সঙ্গে মুড়ি দিয়েছিল বাটি করে।
মুখ গোঁজ করে বাটিটা সরিয়ে রেখেছিল সতু। একেই কুসুমদির জন্য মাথা খারাপ হয়ে আছে, তার মধ্যে বাবা ওরকম করে মাকে মারল!
মা বুঝতে পেরেছিল কিছুটা। সামান্য হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “বাবার ওপর রাগ করিস না। আজকাল ওর মনমেজাজ ভাল থাকে না। কাজের চাপ খুব। মাথার ওপর নতুন সাহেব এসেছেন। খুব খাটাচ্ছেন। খালি চাকরি কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। তাই মেজাজ ঠিক রাখতে পারছে না। আর আমায় ইচ্ছে করে মারেনি। তুই একটু বোঝ।”
অমর এসে সতুর সরিয়ে রাখা বাটি থেকে নাড়ু দুটো তুলে নিয়ে বলেছিল, “আমি খাই?”
অমরকে যে বাবা ওরকম মেরেছে, সেটা যেন ভুলেই গিয়েছিল ছেলেটা! ও যেমন থাকে তেমনই ছিল।
সতু মায়ের কথা শুনেও স্বাভাবিক হতে পারছিল না। মাথা গোঁজ করেই বসেছিল। কী করে মা এমন পারে! মা আর কত দিন বাবার শত দোষ ঢেকে রাখবে! এত টানাটানির সংসার। কোনও শখআহ্লাদ নেই মায়ের। এমনকি, নতুন শাড়ি জামা পর্যন্ত কেনে না কত দিন। খায় না ভাল করে। তাও এত কিছু সহ্য করে কী করে! পৃথিবীর মতো সহ্য মায়ের। নাকি ভুল হল, মায়ের মতো সহ্যক্ষমতা পৃথিবীর!
অমর নাড়ু খেয়ে জামায় হাত মুছে বলেছিল, “আরে, তোমরা সারাক্ষণ এমন মরা-কান্না জোড়ো কেন বলো তো? গোপুজ্যাঠা সেদিন বলছিল, জীবন রগড়ে খালি দুঃখ বের করা। তোমরাও কি তাই করছ? আচ্ছা মা, জীবন রগড়ালে শুধু দুঃখই বেরোয় কেন গো? নারকেল নাড়ুর মতো আনন্দও তো বেরোতে পারে!”
জীবন রগড়ে দুঃখ বের করা! অমরের কথাটা কানে লেগে রয়েছে ওর। ও কি নিজেও তাই করছে?
সেদিন ক্লাবে হরেনদা বলছিল দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। বলছিল, “এখন আর কোনওদিকে মন নয়। যা খেলছিস খেল। বাকি সবটা দেশকে দিয়ে দিতে হবে।”
নশা পরে বলেছিল, “শালা ঢপবাজ! নিজে কী করছে! শিয়ালদার সাইডং-এর ওখানে যায় মালটা। নেশার জিনিস কেনে। জানিস তুই?”
“বারবার এক কথা! কী সব বলিস তুই?” সতু বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল নশার দিকে।
নশা আবার পকেট থেকে বের করেছিল ছোট্ট চৌকো নস্যির ডিবে। তার পর হাতে এক টিপ নস্যি নিয়ে বলেছিল, “যা বলছি ঠিক বলছি। ফটিক, কদম আর চারু ওকে দেখেছে। ওরা সব সাইডিং-এর ওদিকে যায়। ওরা মিথ্যে বলে না!”
“এরা কারা?” অবাক হয়েছিল সতু।
নশা হেসেছিল, “কিছুই জানিস না দেখছি। এরা সব উঠতি ছেলেপিলে। চারু, কদম তো খুনও করেছে। ওরা অনেক খবর রাখে।”
“তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস!” সতু ভুরু কুঁচকে বলেছিল, “এদের সঙ্গে মিশছিস! কোন দিন কী বিপদে পড়বি!”
নশা নস্যিটা নাকে টেনে রুমাল বের করে মুছেছিল নাক। তার পর হাঁচি দিয়েছিল কয়েকটা। ফর্সা ছেলে নশা। হেঁচে চোখ-মুখ লাল করে বিরাম নিয়েছিল সামান্য। তার পর বলেছিল, “আরে, ওরা আমার বন্ধু। আমায় ঝামেলায় ফেলবে না। তুই বড্ড ভিতু। তবে চারুদের হরেনদার উপর রাগ আছে। এক দিন ওদের ধরে জ্ঞান দিয়েছিল। তার পর পুলিশ আসবে এই ভড়কি দেখিয়ে কোকেনের দুটো পুরিয়া সাফ করেছে। শালা, তোদের সামনে এমন করে থাকে! আসলে ঢ্যামনার গাছ।”
না, এ সব বিশ্বাস করে না সতু। নশা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলার জন্য পাড়ায় বিখ্যাত। গোপুজ্যাঠা তো নশাকে বলে, “তুই হিটলারের কাছে যা, গোয়েবেলসকে ছাড়িয়ে তোকে চাকরিতে রাখবে। এত গুলবাজ আমি বাপের জন্মে দেখিনি।”
নশা গোপুজ্যাঠার পেছনে বলে, “গোপুটা খুব হারামি! সারা দিন সিগারেট খায় আর পাড়ার বে-পাড়ার মেয়েদের দেখে। আমি নাকি গুলবাজ। আর ও নিজে? মাস্টারদা সূর্য সেনের নাকি ক্লাসমেট ছিল! ক্লাস ফোরের পরে আর পড়াশোনা করেনি আর বলে কিনা মাস্টারদার সঙ্গে পড়েছে!”
নশার যে কেন সারা পৃথিবীর ওপর রাগ কে জানে! ও বলে, “আমি দেশ ছেড়ে চলে যাব, দেখিস। কে বাপের ছাপাখানায় বই, বিল, বিয়ে, শ্রাদ্ধের কার্ড ছাপবে? আমি জাহাজে কাজ নিয়ে পালাব ঠিক। বিদেশে গিয়ে টাকা কামাব। নীল চোখ আর সোনালি চুলের মেয়েদের সঙ্গে ঘুরব। দেদার মদ খাব। ফূর্তি করব খুব। এখানে শালা হাগা বন্ধ হওয়া বুড়োদের মতো মুখ করে বাঁচতে পারব না।”
নশার কথা আর ভাবলে হবে না। সতু উঠল এবার। ক’টা বাজে এখন? ওদের বাড়িতে একটাই হাতঘড়ি আছে। সেটা বাবার। বাবা কাজে যাওয়ার সময় ওটা পরে যায়। অন্য সময় ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে হলে ও বারান্দায় গিয়ে তারকদাকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, “ক’টা বাজে গো তারকদা?”
আর উপর থেকে, তারকদা থাকলে তারকদা, নয়তো কুসুমদি গলা বাড়িয়ে সময় বলে দেয়। কুসুমদি সময় বললেই সেটাকে সুসময় বলে মনে হয় সতুর।
কিন্তু সেদিনের পর থেকে আর কুসুমদির কাছে যায়নি সতু। কুসুমদির মুখোমুখি হতেই কেমন যেন লাগছে।
এখন সময় দেখতে ইচ্ছে হলে ওদের পাশের ঘরের ভাড়াটে সুধীরকাকুদের কাছে গিয়ে দেখে আসে।
এখনও সুধীরকাকুদের ঘরের দিকে যাবে বলে বেরোল সতু। বিকেল সাড়ে চারটের সময় ক্লাবে যেতে হবে। সামনে ম্যাচ আছে একটা। জনসন কাপ। পরের খেলা মুরলী বাগান ক্লাবের সঙ্গে। বারাসতের ক্লাব এটা। ভাল টিম। টিমের দু’জন নাকি আবার বুট পরে খেলে!
মা পাশের ঘরে শুয়ে আছে এখন। সারা দিনের খাটাখাটনির পরে এই দুপুর-বিকেলের দিকটায় মা একটু বিশ্রাম করে। সতু দেখল অমর মায়ের পাশে বসে চোখের একদম কাছে আনন্দবাজার পত্রিকার একটা পুরনো সংখ্যা নিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে।
ভাইটার জন্য এত কষ্ট লাগে সতুর! এত পড়তে ভালবাসে, কিন্তু দ্যাখো, ভগবান ওর চোখ দুটো কেমন করে দিল!
মায়ের ঘরে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছোট্ট সিংহাসন আছে। তাতে লক্ষ্মী, গণেশ ছাড়াও আছে নারায়ণের ছবি। মা দু’বেলা পুজো করে। জল-বাতাসা দেয়। সতুকে শ্যামবাজার মোড়ের কাছ থেকে চাঙাড়ি করে ফুল এনে দিতে হয়। সেই ফুলও পায় ভগবান।
কিন্তু তার পরিবর্তে ভগবান কী দেয় ওদের?
মা বলে, “এমন করে ভাবতে নেই। এই যে বেঁচে আছি, এটাই তো সবচেয়ে বড় দান। আর কী দেবেন উনি? হাত-পা দিয়েছেন, সুবুদ্ধি দিয়েছেন। এতেই নিজেরটা করে নিতে হবে তোকে। জানবি ভগবান বুদ্ধি দিয়েছেন সৎ থাকার জন্য। খারাপ কাজ করার জন্য নয়। বুঝেছিস?”
সতুর হাসি পায়। ও বুঝলেও সারা পৃথিবী কি বোঝে? এমন একটা মাকে সারা পৃথিবীর দরকার খুব।
ও বারান্দায় বেরোল। সুধীরকাকুদের ঘরের জানলা খোলা থাকলে আর ডেকে জিজ্ঞেস করতে হয় না। দেওয়ালে ঝোলানো গোল বড় ঘড়িটা বাইরে থেকেই দেখা যায়।
“সতু, এই সতু, একটু উপরে আসবি?” কুসুমদির গলা ভেসে এল তিন তলা থেকে।
সতুর বুকের মধ্যেকার এক-সমুদ্র জল যেন আচমকা চলকে উঠল। গলার মধ্যে কিসের যেন কষ্ট। কুসুমদি ওকে ডাকছে! কেন?
কুসুমদি আবার ডাকল। সতুর গলা বুজে এসেছে যেন। তবু নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক করে সতু কোনওমতে বলল, “আসছি কুসুমদি!”
“এক্ষুনি আয় সতু!” কুসুমদি আবার বলল।
সতু নিজেকে সামলাল। এ ভাবে থরথর করে কাঁপলে হবে না। ওকে শক্ত হতেই হবে। ও সময় নিল একটু। তার পর পায়ে পায়ে উঠে গেল তিন তলায়।
কুসুমদিদের বাড়ির অংশটা খুব সুন্দর করে সাজানো। বিকেলের এই সময়ে টানা দালানটায় কমলা রঙের একটা রোদ এসে পড়ে। সতু দেখল, সেই রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুসুমদি।
ওকে দেখে কুসুমদি পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। বলল, “একী রে, কী হয়েছে তোর! এমন মুখ-চোখ! চোখের তলায় কালি! কী হয়েছে বল আমায়!”
সতুর আচমকা চোখে জল চলে এল। বুকের মধ্যে গ্রামের ডাকাতিয়া নদীর ঘূর্ণিটা ফিরে এল আবার। কষ্টের স্রোত যেন নাক আর গলা দিয়ে উঠে আসতে চাইছে বাইরে। সতু প্রাণপণে ঢোক দিয়ে সব কষ্ট গিলে ফেলতে চাইল।
কুসুমদি বলল, “ক’দিন আসছিস না কেন রে?”
“এমনি কুসুমদি, সামনে পরীক্ষা আছে তো। তাই…” সতু আর কী বলবে বুঝতে পারল না।
“ও তুই ব্যস্ত? আসলে একটা কাজ ছিল…” কুসুমদি বলল। গলায় সামান্য অপরাধবোধ।
“কী কাজ বলো?” সতু নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক করল, “আমার অসুবিধে নেই।
কুসুমদি এদিক-ওদিক তাকাল। তার পর গলাটা খাদে নামিয়ে বলল, “মা আমায় বেরোতে দিচ্ছে না। কিছু দিন আগে বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল আমার। তার পর থেকে মা খুব খিটখিট করছে, জানিস! কিন্তু এদিকে আমার একটা কাজ আছে। করে দিবি সতু?”
“বলো কুসুমদি!” সতু তাকাল কুসুমদির চোখের দিকে। এমন সুন্দর চোখ কী করে হয় কারও? মল্লিক বাড়ির শ্বেত পাথরের পরির এমন নাক। ছোট্ট পাপড়ির মতো ঠোঁট। রোদ্দুরের গুঁড়ো এসে পড়েছে কুসুমদির কাঁধের ওপর ভেঙে পরা চুলে। কুসুমদির রূপের মধ্যে কেমন একটা তাপ আছে যেন। সতুর যেন নিজেকে মোমের তৈরি মনে হল। মনে হল ফোঁটায় ফোঁটায় গলে যাচ্ছে ও।
কুসুমদি হাতটা ধরল ওর। তার পর বলল, “একটা ঠিকানা দেব। ওখানে একজন আছে। তার কাছে যাবি এক বার। একটা জিনিস দেবে, নিয়ে আসবি। খুব গোপনে কিন্তু! কেউ যেন না জানে। আমি তোর মতো কাউকে বিশ্বাস করি না সতু। তাই বললাম। যাবি?”
“হ্যাঁ কুসুমদি। বলো, কোথায় যেতে হবে?”
কুসুমদি ব্লাউজ়ের মধ্য থেকে একটা ছোট্ট চিরকুট বের করে ওর হাতে দিয়ে বলল, “এই ঠিকানায়। তিনু আছে এখানে। ওর কাছে যেতে হবে। তিনু রোগা। গালে দাড়ি। ওকে এই চিঠিটা দেখালেই হবে। আমাকেই যেতে বলেছিল। কিন্তু মা… তুই যদি একটু যাস!”
ঠিকানাটা দেখল সতু। রাজাবাজারের কাছের ঠিকানা। তার মানে তিনু সেই ছেলেটা। সেই বাদামি পাঞ্জাবি। তার কাছে ওকে পাঠাচ্ছে কুসুমদি!
কুসুমদি তাকাল সতুর দিকে। তার পর বলল, “সাবধানে যাবি। সাবধানে আসবি। কেমন? ওর পেছনে কিছু লোক লেগেছে। ওর যদি কিছু হয়ে যায়, আমি থাকতে পারব না রে!”
সতু স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল কুসুমদির দিকে। বিপদের মধ্যে ওকে পাঠাচ্ছে কুসুমদি, কিন্তু চিন্তা করছে তিনু নামে ওই ছেলেটার জন্য! তার জন্য থাকতে পারবে না! আর সতুর যদি কিছু হয়ে যায়? তা হলে?
সতুর মনে হল মল্লিক বাড়ির পরির মতোই কুসুমদিও পাথরের তৈরি।
পাঁচ
ইজনা
পিপিটি স্লাইডগুলো শেষবারের মতো দেখল ইজনা। স্পেল চেক করা আছে। বানান আর ভুল নেই। কিছু কিছু স্লাইডের ট্রানজিশন খুব জাক দিচ্ছিল, সেটাও ঠিক করে দিয়েছে। আর আসল যে পয়েন্টগুলো ওরা জানাতে চায়, সেটার ফন্ট সাইজ় বাড়িয়ে হাইলাইট করে দিয়েছে। ব্যস, আর তো মনে হয় না কিছু করার দরকার আছে।
অঞ্জন বলেছিল, কাজটা হয়ে গেলে যেন এক বার ওকে দেখানো হয়। কিন্তু ইজনা জানে সেটার কোনও প্রয়োজন নেই। কারণ, কাকাবাবু ওকে বলে দিয়েছেন যে, ইজনা যেটা ঠিক বুঝবে সেটাই যেন করে। এ সব কম্পিউটারের ব্যাপার উনি বোঝেন না। আর অঞ্জন তো আরওই বোঝে না।
ইজনা অঞ্জনের সমস্যাটা বোঝে। ওর বাবা গোটা সংস্থার মালিক, সেখানে মালিকের ছেলে হয়েও ওর কথার তেমন কোনও জোর নেই। নিজের বাবা কাকা দাদারাই ওকে পাত্তা দেয় না। এটা অঞ্জনকে কোথাও কষ্ট দেয়।
অবশ্য পাত্তা না দেওয়ার কারণও আছে। অঞ্জন নিজে নানান ব্যবসা করবে বলে বেশ কিছু টাকা ডুবিয়েছে। তাই বাড়ির বড়রা ওকে সাইড লাইনের ধারেই রাখে।
এটার জন্যই অঞ্জন আরও জোর করে সব ব্যাপারে নিজের গুরুত্ব বোঝাতে যায়। ঢুকতে চায়। আর তাতে এমন এমন সব সাজেশন দেয় যে, ইজনা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না।
এই প্রেজেন্টেশনের ব্যাপারেই তো ওরকম দিয়েছে। এক দিন বলে কিনা সাদা-কালোয় প্রেজেন্টেশনটা হোক!
“সাদা-কালোয়! কেন?” ইজনা অবাক হয়েছিল।
“আরে, ওরা তো কালার্ড প্রেজেন্টেশন দেখেই, আমাদেরটা সাদা- কালোয় হলে ভাল দেখাবে। বেশ একটা রেট্রো লুক। লাইট অ্যান্ড শ্যাডো। মানে, ওল্ড মাস্টার্সদের পেন্টিংয়ের মতো। দারুণ না?” অঞ্জন কথাটা বলে কাকাবাবু মানে, ওর বাবার দিকে তাকিয়েছিল।
কথাটা হচ্ছিল কাকাবাবুর অফিসের ঘরে বসেই।
ইজনা বলেছিল, “আরে, তাই হয় নাকি! আমরা তো সিনেমা বানাচ্ছি না যে রেট্রো লুক দেব!”
“আরে, আর্টটা বোঝো! তুমি হিস্ট্রি নিয়ে পড়া মেয়ে, আর্ট বোঝো না!” অঞ্জন দুম করে বলে দিয়েছিল, “আমি যেটা বলছি সেটা ফিল করার চেষ্টা করো। ওরা ডেনমার্কের লোক। রেমব্রান্টের দেশের লোক। আলো অন্ধকার ওদের মজ্জাগত।”
ইজনা বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “প্লিজ়, গেট ইয়োর ফ্যাক্টস রাইট। রেমব্রান্ট ডেনমার্কের লোক নয়, হি ওয়জ় ডাচ। নেদারল্যান্ডসের লোক,” তার পর কাকাবাবুর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “কাকাবাবু দেখুন, আমাদের হ্যান্ডিক্রাফটের জিনিস। কত সুন্দর রঙিন সব কাঁথা, শাড়ি, গ্লাস পেন্টিং, আর্দেনওয়্যার! সেখানে কেউ ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে প্রেজেন্টেশন করে?”
কাকাবাবু হাত নেড়ে অঞ্জনকে মাছি তাড়ানোর মতো করে বলেছিলেন, “আরে, তুমি ওর কথা বাদ দাও তো! গাধা একটা! সেদিন মিটিংয়ে নিজে ছিল। ওরা বলেই গিয়েছে ব্রাইট আর সুন্দর করে মাল্টিপল কালার্ড ছবি দিয়ে করতে। সেখানে গাধাটা ভুলভাল জ্ঞান দিচ্ছে। রেমব্রান্ট নাকি ডেনমার্কের লোক! এবার বলবে শেক্সপিয়র শ্রীলঙ্কায় থাকতেন! তুমি যেটা ঠিক মনে করো সেটাই করবে। আমাকেও দেখানোর দরকার নেই। জাস্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করে একটা কভারিং লেটার করে পাঠিয়ে দিয়ো। আমার লজ্জা লাগে এই গাধাটাকে আমার ছেলে বলতে।”
অঞ্জন মুখ-চোখ লাল করে বলেছিল, “আমার কোনও সম্মান নেই, না? ইজনা, তুমি প্রেজেন্টেশনটা আমায় দেখাবে বলে দিলাম।”
কাকাবাবু ওকে পাত্তা না দিয়ে বলেছিলেন, “নেক্সট উইকের মধ্যে করে ফেলো। ফোটোগ্রাফাররা প্রোডাক্টের ছবি তুলে এডিট করে দু’দিনের মধ্যে দিয়ে দেবে। তার পর তুমি আর মুদ্রা কাজ শুরু কোরো, কেমন?”
সেই কাজ আজ শেষ হল। মুদ্রা মেয়েটা ভাল। গায়ের রং সামান্য চাপা। বড় বড় চোখ। হাসলে গালে গভীর টোল পড়ে আর গজদাঁত দেখা যায়। মেয়েটা সতেরো বছর বয়সে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল। বিয়ের দু’মাস পর ওকে ফেলে ওর বর পালিয়ে যায়। পরে মেয়েটা অনেক কষ্টে ডিভোর্স পেয়েছিল।
মুদ্রার বাবা সামান্য একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করে। মুদ্রার জন্য বাবা-মায়ের খুব অপমান আর হয়রানি হয়েছিল। আসলে মুদ্রা মায়ের গয়না নিয়ে পালিয়েছিল, ওর বর চলে যাওয়ার সময় সে সব নিয়ে যায়। ফলে সামাজিক বিড়ম্বনার সঙ্গে আর্থিক বিড়ম্বনাও হয়েছিল।
মেয়েটা বাবা মায়ের কাছে ফিরে আসার পরে কলেজ পাশ করে। কম্পিউটার শেখে। তার পর এই চাকরিটা পায়।
ইজনার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট মুদ্রা। ও নিজেই সব ইজনাকে বলেছে। এখানে পনেরো হাজার টাকার মতো পায় মুদ্রা। সঙ্গে বাবার রোজগার আছে। তাতেই নাকি ওদের চলে যায় মোটামুটি। মেয়েটাকে দেখলেই ভাল লাগে ইজনার। ওর মনে হয়, মানুষ জীবনের কোনও একটা সময়ে গোলমাল করে ফেলতেই পারে, কিন্তু তার পর সে যদি সিনসিয়ার হয়, তা হলে আবার জীবনে ফিরেও আসতে পারে সে।
কাকাবাবু বলেছেন, এই গোটা কাজটা হলে বিদেশে যেতে হতে পারে কনট্র্যাক্ট সই করার জন্য। উনি চান ইজনা যায়। ইজনাকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে দেবেন সই করার।
ইজনার তাতে আপত্তি নেই। ও শুধু বলেছে, “অনেক ড্রাফটিং করার থাকবে তো। সঙ্গে কি মুদ্রা যেতে পারে!”
কাকাবাবু হেসেছেন। বলেছেন, “ওরা দু’জনের জন্য খরচ দেবে। সো ইউ ক্যান ট্যাগ হার অ্যালং!”
মুদ্রা এই ব্যাপারটায় খুব এক্সাইটেড। বিদেশ যাবে। ও যে ভাবতেও পারেনি কোনও দিন। তার পর থেকে এই কাজটা আরও যেন মন দিয়ে করছে।
প্রেজেন্টেশনটা দেখে ইজনা ল্যাপটপ ঘুরিয়ে মুদ্রাকে বলল, “এটা ঠিক আছে এবার। তোকে যে কভারিং লেটারটা দিয়েছি, সেটা ড্রাফট করে আমায় মেল করে দিস। আমি বাড়ি থেকে দেখে নেব। তার পর দুটোই ওদের মেল করে দেব।”
মুদ্রা হাসল, “আমি করে দিচ্ছি দিদি। তুমি চিন্তা কোরো না!”
ইজনা হাসল। মাত্র দু’বছরের ছোট মেয়েটা। আজকাল এই পার্থক্যে কেউ কাউকে দাদা-দিদি ডাকে না। কিন্তু মুদ্রা ওকে ডাকে। ও বারণ করে না। যে যেমন ডেকে খুশি হয়।
ইজনা টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলল। ঘড়িটাও দেখল। সাড়ে সাতটা বাজে। আজ একটু দেরি হয়ে গিয়েছে। তবে অসুবিধে নেই। কাল শনিবার, ওর ছুটি আছে। তা ছাড়া ওকে রাখো নিতে আসবে আজ। কী নাকি দরকারি কথা আছে। এখান থেকে খুব একটা দূরে নয় রাখোদের দোকান।
টিং করে একটা শব্দ হল। মোবাইলে কিছু একটা এসেছে। ইজনা মোবাইলটা দেখল। আরে, এটা কী! ব্যাঙ্কের নোটিফিকেশন। টাকা! তিরিশ হাজার টাকা ঢুকেছে অ্যাকাউন্টে! এটা কে দিল?
ও দ্রুত ফোনে নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটা চেক করল। দেখল, এই ‘ক্রাফট’ থেকেই টাকা পাঠানো হয়েছে। কী ব্যাপার! ও তো এখানে এমনি কাজ করতে আসে। তা হলে টাকা দেওয়া হল কেন?
ঠোঁট কামড়ে চিন্তা করল ইজনা। তার পর করিডর ধরে কাকাবাবুর চেম্বারের দিকে এগিয়ে গেল।
কাকাবাবু ঘরেই ছিলেন। কী একটা জার্নাল খুলে পড়ছিলেন। উনি রাত করে অফিসে থাকেন। কাজ করতে এই বয়সেও কী যে ভালবাসেন!
কাকাবাবুর ঘরের দরজা খোলাই থাকে। ফলে দরজায় নক করার দরকার পড়ে না।
ইজনা দাঁড়াল দরজার কাছে, “কাকাবাবু, আসব?”
কাকাবাবু তাকালেন, “আরে এসো,” জার্নালটা বন্ধ করে ঘুরে বসলেন ওর দিকে, “বলো।”
ইজনা বলল, “প্রেজেন্টেশন রেডি। আমি বাড়ি থেকে আর-একবার দেখে পাঠিয়ে দেব। আর পিডিএফ ফাইল করে আপনাকেও মেল করে দেব। আপনি প্লিজ় এক বার দেখে নেবেন।
“আরে, তুমি দেখলেই তো হবে!”
ইজনা মাথা নাড়ল, “না না, তাও। আর-একটা ব্যাপার…”
“হ্যাঁ বলো!” কাকাবাবু চশমাটা খুলে রাখলেন টেবিলে। তার পর গ্লাস তুলে নিয়ে জল খেলেন।
“আমায় তিরিশ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। এটা কেন?” ইজনা সামান্য ইতস্তত গলায় বলল।
“তাতে কী হল?” কাকাবাবু হাসলেন, “তুমি টাকা নিতে চাও না আমি বুঝেছি। কিন্তু আমারও তো একটা মানসম্মান আছে, না কি! গত এক বছর তুমি কাজ করছ। কিছু নাওনি! আমার খারাপ লাগে না? খুব সামান্য টাকা এটা। ফার্স্ট ইনস্টলমেন্ট। তুমি ‘না’ করবে না। প্লিজ লেট আস বি প্রফেশনালস। শোনো, আমাদের কাজের পরিধি বাড়বে। তোমাকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে। এভরিওয়ান উইল প্রফিট। তুমিও তোমার পোর্শন নেবে, কেমন? তাতে ট্যাক্সে প্রবলেম হবে নাকি?”
“আমি একটা কলেজে পড়াই, মানে…” ইজনা কী ভাবে বলবে বুঝতে পারল না।
“আই আন্ডারস্ট্যান্ড। তুমি একটা কাজ করো। তোমার এটা তো স্যালারি অ্যাকাউন্ট নয়, সেভিংস অ্যাকাউন্টই বলেছিলে আমায়। মায়ের সঙ্গে জয়েন্ট আছে বলেছিলে। আমি তোমায় একটা ইনভয়েস পাঠিয়ে দেব তোমার মায়ের নামে। উনি সই করে দেবেন। ব্যস, সিম্পল! বাট, এবার থেকে যখন যেমন টাকা দেব তুমি নেবে, আমি কোনও বারণ শুনব না।”
ইজনা কী বলবে বুঝতে পারল না। কাকাবাবুর মুখের ওপর ও কথা বলে না। ইজনা জোর করে হাসল একটু।
কাকাবাবু বুঝতে পারলেন। হেসে বললেন, “টাকা নিলে তোমার কাজের গুরুত্ব কমে না। এটা সামান্য টাকা। রোজকারের জীবনে টাকা দরকার। আমরা এমন কিছু রোজগার করি না, যাতে করে ক্রিকেট বা ফুটবল টিম কিনতে পারি। জানি, আজকাল যেখানে সব কিছুই প্রায় আপ ফর সেল, সেখানে যাদের মানসম্মান বোধ আছে, তারা টাকার দিকটা দেখে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, টাকা নিলে কাজের গুরুত্ব বা সম্মান কমে। তা ছাড়া তুমি তো আমায় টাকা দিতে বলোনি। আমি নিজে দিলাম তোমায়। ফলে একদম এ সব নিয়ে ভেবো না। তুমি তোমার কাজ করো। বাকিটা লিভ ইট টু মি।”
ইজনা মাথা নাড়ল। বলল, “তা হলে আমি আসি?”
“এসো,” কাকাবাবু ঘুরে বসে আবার চশমা পরলেন। তার পর টেনে নিলেন জার্নালটা।
করিডোর ধরে আবার অফিস ঘরের দিকে এল ইজনা। মুদ্রা-সহ আরও দু’-তিনজন আছে এখনও। ওদের বলে বেরিয়ে যাবে। রাখোকেও একটা ফোন করতে হবে, কোথায় ছেলেটা কে জানে।
কিন্তু রাখোকে ফোন করতে হল না। ইজনা দেখল, রাখো ওদের অফিসেই এসে বসে আছে। আর মুদ্রা নিজের টেবিলে নেই!
“আরে, তুই এসে গিয়েছিস!” ইজনা রাখোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
রাখো উঠে দাঁড়াল এবার। বলল, “হ্যাঁ, চল।”
যাবে বলে ইজনা ঘুরল আর তখনই দেখল লু থেকে বেরিয়ে আসছে মুদ্রা।
ইজনা বলল, “মুদ্রা, আমি এলাম তা হলে।”
ইজনা দেখল, মুদ্রা ওর কথা শুনলই না যেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাখোর দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে রইল! তার পর খুব অবাক হয়েছে এমন গলায় বলল, “আপনি!”
রাখোও ঘাবড়ে গেল। তুতলে বলল, “হ্যাঁ আমিই… কিন্তু আপনি এখানেই চাকরি করেন!”
ইজনা অবাক হল, “ইউ নো ইচ আদার!”
“হ্যাঁ, উনি তো আমার হাজব্যান্ড,” মুদ্রা হাসল।
“কী!”
রাখোকে দেখে ইজনার মনে হল এবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। ইজনা নিজেও ঘাবড়ে গেল। আরে, কী বলছে মেয়েটা! ও অবাক হয়ে বলল, “কী বলছিস তুই!”
মুদ্রা বলল, “সে আর কী বলি দিদি! দেড় বছর আগের ব্যাপার। তখনও তুমি আসোনি এখানে। আমি বাসে করে যাচ্ছিলাম। উনি বসেছিলেন আমার পাশে। পিজির কাছে বাসটা পালটি খেয়ে যায়। ব্যস, সে এক কেলেঙ্কারি! যাই হোক, আমাদের বাস থেকে বের করা হয়। আমার মাইনর ইনজুরি ছিল। ওঁরও লেগেছিল মাথায়। তা, আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। সেখানে আমাকে উনি খুব হেল্প করেন। বাড়িতে আমি জানাতে চাইনি। বাবা-মা টেনশন করবেন বলে। ডাক্তাররা ইনসিস্ট করছিলেন একজন গার্ডিয়ানের জন্য। তখন উনি ডাক্তারদের ধমক দিয়ে বলেন যে, উনিই তো আছেন! ডাক্তাররা জিজ্ঞেস করেন উনি কে। তখন উনি বলেছিলেন যে, উনি আমার হাজব্যান্ড।”
কথা শেষ করে মুদ্রা শব্দ করে হেসে উঠল!
ইজনাও হাসল। সত্যি, রাখোর পক্ষেই এ সব সম্ভব।
মুদ্রা বলল, “উনি আমায় সেদিন বাড়িতেও পৌঁছে দিয়েছিলেন। আমি থাকি সেই কসবার ওখানে। উনি অতটা পথ গিয়েছিলেন।”
রাখো কী বলবে যেন বুঝতে পারল না! তার পর বলল, “আপনার এখন চোট ঠিক আছে?”
মুদ্রা হেসে বলল, “দেড় বছর হল, এত দিন থাকে চোট! আপনি তো আর যোগাযোগ রাখলেন না। আজ দেখা না হলে তো জিজ্ঞেসও করতেন না।”
রাখো কী বলবে বুঝতে না পেরে বোকার মতো হাসল।
ইজনা বলল, “ঠিক আছে আমরা এলাম তবে।”
মুদ্রা মাথা নাড়ল। তার পর রাখোর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসল আবার।
ইজনা দেখল, যে-রাখো সারাক্ষণ ফটরফটর করে, সে একদম চুপ করে গিয়েছে!
রাখোর এই গাড়িটা নতুন। সদ্য কিনেছে। ভেতরে এখনও নতুন রাবারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
ইজনা সামনের সিটে বসে বেল্ট লাগাল। দেখল, রাখো একদম সাইলেন্ট মোডে চলে গিয়েছে।
.
ইজনা বলল, “কী রে, পুরো বোবা হয়ে গেলি! আজ এত জরুরি ভাবে আমার সঙ্গে দেখা করার কারণটাই-বা কী?”
রাখো দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িটা স্টার্ট করে বলল, “আরে, মুদ্রাকে যে এখানে দেখব ভাবিনি, জানিস! আমি যে কী কেস খেতে খেতে বেঁচেছি জানিস না!”
“কীরকম?” অবাক হল ইজনা।
“আরে, আমার সঙ্গে মেয়েটার যোগাযোগ ছিল ভালই। নানান কথা হত। ও নিজের অনেক পার্সোনাল কথাও বলেছিল আমায়। আর তার পরই কেসটা খেলাম আমি। মানে, আর-একটু হলে ওর প্রেমে পড়ে যাচ্ছিলাম আর কী। ভাবছিলাম প্রোপোজ করব। এমন সময় এক দিন বলল, ওর নাকি প্রেমে বিশ্বাস নেই। ও সব ফালতু। বলল, আমি প্রোপোজ় করিনি বা অমন কিছুর ইঙ্গিত দিইনি বলেই নাকি ও আমার সঙ্গে কথা বলে। ম্যাক্সিমাম ছেলেই তো ফালতু! সারাক্ষণ প্রেমের নামে শোয়ার তাল করে ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাব একবার! কী কেসটা খেতাম! আমার মাথায় শালা কিচ্ছু নেই! ওই মেয়ে অন্য ট্র্যাকে চলছে আর এ দিকে আমি ভালবেসে বসে আছি,” রাখো নিজের মনে মাথা নাড়ল।
ইজনা হাসল আবার। রাখোর এই ‘কিচ্ছু নেই’-টা সবাই জানে। গাড়ি চলছে। হাওয়া আসছে জানলা দিয়ে। ভালই লাগছে ইজনার।
ও বলল, “তা-ও বলে দেখতে পারতিস।”
“ইঃ, বলে দেখতে পারতাম!” রাখো জোরের সঙ্গে বলল, “তার পর যখন ‘না’ করে দিত, তখন? কেসটা কেমন খেতাম? আমার এই বয়সে আর ও সব প্রেমে ঘাঁটাঘাঁটি ভাল লাগে না। যে প্রেমেই বিশ্বাস করে না, তাকে আমি বলে কেস খাই আর কী! তোদের মতো নাকি!”
“আমরা মানে?” ইজনা অবাক হল।
রাখো বলল, “তুই আর হাট্টিম! কী না কী হল, ওকে লাইফ থেকে বের করে দিলি। কী কেস বল তো! কাউকে লাগাচ্ছিল-ফাগাচ্ছিল নাকি যে, সে সব দেখে ফেলেছিস?”
“আঃ, তুই চুপ করবি?” ইজনা বিরক্ত হল।
“যাঃ শালা! এই হাসছিস এই বিরক্ত হচ্ছিস! তোরা মেয়েরা মাইরি নিজেরাই শিয়োর নোস নিজেদের ফিলিং নিয়ে।”
“মেরে না পাট করে দেব! সেক্সিস্ট কথা বলবি না,” ইজনা ঘুসি পাকাল।
“আরে, এখন কিছু বলাই যায় না। সবার শালা এত পলিটিক্যালি কারেক্টনেস! মরালিটি! মজাটাও বুঝিস না! সারাক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে বসে থাকলে এই হয়। সেখানে পলিটিক্যালি কারেক্ট হয়ে ক্যাদ্দানি দেখাতে দেখাতে সত্যিকারের জীবনের বাঁশ করে দিস,” রাখো মাথা নাড়াল, “এ দিকে তো কেস হয়ে বসে আছে। হাট্টিমরা কোনও স্পনসর পাচ্ছে না। পিন্টুদা বাতেলা করে কথা দিয়েছে পুজো করবে। হাট্টিমও তোকে দেখে বাড় খেয়ে সেদিন কথা দিয়ে দিয়েছে। এখন নাও! বুড়োদাদু বলেছে এক লাখ দেবে। কিন্তু পিন্টুদা নেবে না। সবাই শালা সলমান খান সাজতে চায়। কথা দিয়েছে! আরে, টিভিতে শিয়োর মহাভারত দেখে এরা!” রাখো বিরক্ত হয়ে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে মারল।
“তো, আমি কী করব!” ইজনা চোয়াল শক্ত করল। ওর মনে পড়ল হাট্টিমের মুখটা। সব কিছুতে পাকামি! কে বলেছিল তোমায় ও ভাবে কথা দিতে?
“তুই একটু দেখ না। মানে, সবাই হাত লাগালে হয়ে যাবে রে!” রাখো বলল।
ইজনা বলল, “কিচ্ছু হবে না। এই তো বাজার। কারও টাকা নেই! প্লাস আমাদের পাড়াটা কতটা ভেতরে দেখেছিস? স্পনসর পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়! পাঁচ লাখ লাগবে শুনলাম।”
রাখো ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলল, “তা হলে? হাট্টিমের কথার কী হবে?”
ইজনা তাকাল রাখোর দিকে। তার পর বলল, “সেটা আমি কী জানি! হাট্টিম কে আমার?”
পাড়ায় এসে গিয়েছে গাড়ি। ইজনাদের বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখো জিজ্ঞেস করল, “তুই কেউ নোস!”
ইজনা গাড়ির দরজা খুলে নেমে দরজাটা শব্দ করে বন্ধ করে বলল, “ও আমার কেউ না। ফলে আমার কোনও দায় নেই! ফারদার আমায় এ সব বলিস না। বাই।”
ইজনা আর কোনও কথা না বলে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।
ছয়
হাট্টিম
বাইকটা স্ট্যান্ড করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল হাট্টিম। যাক, সব ভাল ভাবে মিটে গিয়েছে বাবা!
ও দেখল, রাখো বাইক থেকে নেমেই মোবাইল বের করে খুব মন দিয়ে কিছু একটা দেখছে।
হাট্টিম বলল, “ফোন রাখ! সারাক্ষণ ফোনের মধ্যে ঢুকে বসে আছে। আমার খিদে পেয়েছে। আমি চিকেন রোলের অর্ডার দিচ্ছি। খাবি তো?”
রাখো ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “সে খাব। তবে তোদের সিনুদাকে মাইরি বাঁধিয়ে রাখিস। এমন পিস সচরাচর পাওয়া যায় না। কিচ্ছু নেই, শুধু টেনশন!
হাট্টিম হাসল। বলল, “হ্যাঁ রাখব, তোর পাশে!”
“না না সিরিয়াসলি! যা প্যানিক করছিল! মাইরি!”
সত্যি সিনুদা খুব প্যানিক করেছিল। আজ দুপুরে তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল হাট্টিম।
দুপুরে পৌনে একটা নাগাদ ফোনটা এসেছিল সিনুদার, “হাট্টিম, ব্রজর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে! এক্ষুনি এসো তুমি!”
সবে খেতে বসেছিল হাট্টিম। গরম ভাতে পাঁঠার মাংসের পাতলা ঝোল পেটের ছুঁচোদের সবে পাগল করতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই এমন ফোন।
হাট্টিম অসহায়ভাবে তাকিয়েছিল লালচে-হলুদ ঝোলে স্নান করানো মনোহর মাংসের আলুর দিকে। এ ভাবে এদের ফেলে চলে যেতে হবে! এ যেন প্রেমিকাকে অন্যের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে দেখার মতো বিচ্ছেদ বেদনা!
কিন্তু ব্রজর মাথায় যে আকাশ ভেঙে পড়েছে! সেটা আরও গুরুতর! কিছু একটা হয়ে গেলে খুব বিপদ হয়ে যাবে!
আর মায়া না বাড়িয়ে উঠে পড়েছিল হাট্টিম।
“এ কী রে উঠে পড়লি!” বড়মামা অবাক হয়েছিল।
হাট্টিমের মনে হয়েছিল, রবিবারের দুপুরে সবাই খেতে বসেছে। সেখানে এমন একটা খবর দিলে মামাদেরও মাথা খারাপ হবে। টেনশন করবে। বড়মামার এমনিতেই টেনশনের বাতিক। মেজোমামা আবার মাথা গরম। ছোটমামাই যা কিছুটা মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করে। তাও সে ভিতু বেশ। তাই এ ভাবে এমন একটা খবর দিলে মামাদের খাওয়াদাওয়া ডকে উঠবে। সঙ্গে মামিদের উপর কোনও কারণ ছাড়াই রাগারাগী করবে।
হাট্টিম দেখেছে, ছেলেরা কোনও ঝামেলা হলেই নিজেদের স্ত্রীর উপর মেজাজ দেখাতে শুরু করে। একদম বিনা কারণে তাদের বকাবকি করে, তাদের উপর খিটখিট করে। খারাপ ব্যবহার করে।
ওর মামারাও এর ব্যতিক্রম নয়।
হাট্টিম শান্তভাবে বলেছিল, “এক বন্ধুর একটু সমস্যা হয়েছে। আমায় যেতে হবে। তোমরা খাও আমি আসছি।”
“তাই বলে খাবার ছেড়ে উঠে যাবি?” মেজোমামা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
“হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। খাবার তো রইল, রাতে খাব। আমি আসি। পরে কথা বলছি,” হাট্টিম আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল।
বাইকটাকে মাঝে মাঝে খুব কাজের জিনিস মনে হয় হাট্টিমের।
ও দ্রুত জামাকাপড় বদলে আলমারি খুলে হাজার কুড়ি টাকা বের করেছিল। ভাগ্যিস কাল টাকাটা তুলে রেখেছিল অফিসের অ্যাকাউন্ট থেকে! তার পর মানিব্যাগটা নিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল। টেবিলের পাশে রাখা দুটো হেলমেট নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল।
একা যেতেই পারে হাট্টিম, কিন্তু বিপদের সময় কেউ সঙ্গে থাকলে সুবিধে হয়।
হাট্টিম বাইকটা নিয়ে রাখোর বাড়ির সামনে গিয়ে ফোন করেছিল ওকে।
দু’বার রিং হতেই ফোনটা ধরেছিল রাখো, “কী রে, এখন?”
হাট্টিম সংক্ষেপে বলেছিল সমস্যার কথা। তার পর জিজ্ঞেস করেছিল, “একটু যাবি আমার সঙ্গে?”
“একটু কেন, পুরোটাই যাব। তুই দু’মিনিট দাঁড়া। আর তোর পক্ষীরাজ আছে, নাকি আমার গরুর গাড়িটা নেব?”
“আছে আছে, তুই আয়,” হাট্টিম অপেক্ষা করেছিল রাস্তায়।
সত্যি দু’মিনিট সময়ই নিয়েছিল রাখো। পাঞ্জাবি আর জিনস পরে এসে উঠে বসেছিল বাইকের পেছনে। হাট্টিম ওর হাতে একটা হেলমেট ধরিয়ে দিয়েছিল।
“কী রে কোথায় যাচ্ছিস?” রাখোর মা মানে কাকিমা এসে দাঁড়িয়েছিল দোতলার ঝুল-বারান্দায়। পাশে পেনসিলও ছিল।
রাখো গম্ভীর ভাবে বলেছিল, “বিয়ে করতে যাচ্ছি। বউ নিয়ে এসে বাকি কথা বলছি।”
কাকিমা সহজ সাদাসিধে মানুষ। খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল, “সে কী! কী বলছিস তুই!”
“হ্যাঁ বিয়ে করতে!” সারা পাড়াকে জানান দিয়ে রাখো চিৎকার করে বলেছিল, “সেই ক্লাস টু থেকে বলছি বিয়ে দাও বিয়ে দাও! তোমরা তো আর শুনলে না। তাই আজ নিজেই ডিসিশন নিলাম।”
“কী সব বলছিস তুই!” কাকিমা আতান্তরে পড়েছিল যেন, “আমায় তো আগে বলিসনি!”
রাখো একই ভাবে বলেছিল, “তুমি বল করতে পারো? ইন সুইং? আউট সুইং? ইয়র্কার? পারো নাতো! তবে বলে লাভ!” তার পর হাট্টিমের কোমরে খোঁচা মেরে বলেছিল, “তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন! চল!”
গোল চোখ আর পেনসিলের খিকখিক হাসি এড়িয়ে বাইক ছুটিয়ে দিয়েছিল হাট্টিম।
রবিবারের দুপুরে কলকাতার রাস্তায় ভিড় কম থাকে। সারা শহর যেন মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে পর্দা টেনে, ফ্যান চালিয়ে, কোল-বালিশ জড়িয়ে ঘুমোতে যায়! মফস্সলের দুপুরবেলাগুলো এমন নিঝুম থাকে, হাট্টিম দেখেছে। রবিবারের কলকাতাকে দেখে ওর মনে হয়, এমন মফস্সল ধাঁচের মেগা সিটি সারা পৃথিবীতে আর একটাও আছে কি না সন্দেহ।
পথে রাখো জিজ্ঞেস করেছিল, “ব্রজ, তোদের ওয়েল্ডার ছেলেটা না? আর, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে মানে?”
হাট্টিম বলেছিল, “আর বলিস না সিনুদার কথা। একটা স্ক্যাফোল্ড আছে, কাঠের। সেটা আকাশ উড ওয়ার্কস নামে একটা কাঠের দোকানের লোক বানিয়েছিল। ব্যস, সিনুদা সেই স্ক্যাফোল্ডকে আকাশ বলে ডাকে। মোনালিসা হার্ডওয়্যার নামে একটা কোম্পানি থেকে চেন পুলি কেনা হয়েছিল। সেই চেন পুলিকে মোনালিসা বলে ডাকে! আরে, সবার সামনে বলে, ‘মোনালিসাকে ধর। মোনাসিলাকে টান। মোনালিসাকে তোল।’ মানে যা-তা আর কী! স্ক্যাফোল্ডটা ক’দিন হল নড়বড় করছিল। বলছিলাম ঠিক করাতে। সে ও করাবে না। কী? না টাকা নষ্ট হবে! নাও এখন একটা বিপদ হল তো!”
রাখো বলেছিল, “সিনুদা গুরুদেব মানুষ। আর রবিবার কিসের কাজ! তোরা কি নীলকর সাহেব নাকি? সারাক্ষণ মানুষকে দিয়ে কাজ করাচ্ছিস!”
“আরে, ওভার টাইম। কাজের চাপ আছে,” হাট্টিম বলেছিল, “কথাটা যদি শুনত! কী যে বিরক্ত লাগে আমার! বাড়িতে এখনও বলিনি। আগে গিয়ে দেখি কী হয়েছে।”
রাখো বলল, “মরে-ফরে যায়নি তো?”
হাট্টিম বিরক্ত হল, “তোর সবেতে এক্সট্রিম কেস! মরে যাবে কেন? এত পেসিমিস্টিক কেন তুই?”
রাখো বলেছিল, “চারিদিকে যা অবস্থা, পেসিমিজ়মটাই তো আসবে।”
রাস্তা ফাঁকা ছিল। হাওড়ার ফ্যাক্টরিতে পৌঁছতে দেরি হয়নি হাট্টিমের। গেটের কাছেই দেখেছিল সিনুদা অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। ওকে দেখেই দৌড়ে এসেছিল। বলেছিল, “আরে, কী কাণ্ড বল তো! মাথায় এভাবে আকাশ ভেঙে পড়বে আমি ভাবতেই পারিনি!”
হাট্টিম সামান্য বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “আমার কথাটা শুনলেন না তো! স্ক্যাফোল্ডটা সারাই করলে এমন হত না। ইনজুরি খুব মারাত্মক?”
সিনুদা বলেছিল, “কাছেই একটা নার্সিং হোম আছে। সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ব্রজকে। আঘাত মারাত্মক নয়। কিন্তু হলেও হতে পারত। শালা ব্ৰজটা গান্ডু আছে। আকাশের তলার নাট-বল্টু খুলতে গিয়েছে। আরে বাবা, তলায় দাঁড়িয়ে কেউ ও সব করে!”
রাখো পাশ থেকে চাপা গলায় বলেছিল, “এ তো ডাবল মিনিং করে ফাটিয়ে দিচ্ছে রে! হিন্দি ছবির গান লিখতে বল।”
হাট্টিম কনুই দিয়ে রাখোকে খোঁচা মেরে সিনুদাকে বলেছিল, “চলুন, গিয়ে দেখি! বাইকেই উঠুন! রাখো, তুই চেপে বোস।”
হাট্টিমের বাইকটা বেশ বড়সড়। বসতে তাই খুব একটা অসুবিধে হয়নি।
নার্সিং হোমটা কাছেই। ওদের যেতে বেশি সময় লাগেনি। আর গিয়ে দেখেছিল মাথায় ব্যান্ডেজ করে বসে আছে ব্রজ। মুখে হাসি।
ব্রজর বড় বড় বাদামি চুল। গালে বাদামি দাড়ি। ও খুব ফর্সাও। আর মুখে হাসি লেগেই থাকে।
ওকে ওই অবস্থায় দেখে প্রাণে জল এসেছিল হাট্টিমের। হ্যাঁ, মাথা ফেটে গিয়েছে। আর হাতেও চোট লেগেছে। কিন্তু সিরিয়াস নয়।
রাখো পাশ থেকে ফিসফিস করে বলেছিল, “কী রে, বিয়ন বর্গকে কাজে রেখেছিস নাকি!”
রাখোকে “চুপ কর,” বলে হাট্টিম ব্রজকে বলেছিল, “তুমি ঠিক আছো তো?” তার পর পকেট থেকে চার হাজার টাকা বের করে ওর হাতে দিয়ে বলেছিল, “এটা রাখো। কয়েকটা দিন রেস্ট নাও। সিনুদা তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। আর অন্য কিছু দরকার হলে আমায় জানিয়ো, কেমন?”
ব্রজ হেসে মাথা নেড়েছিল। তার পর সিনুদাকে বলেছিল, “পাটাতনটা ঠিক করাও এবার। মাইরি, ডেঞ্জারাস কিছু হয়ে গেলে তোমার পেছনে বাঁশ হয়ে যেত।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে,” সিনুদা হাট্টিমকে বলেছিল, “তোমায় আসলে ঘাবড়ে গিয়ে ডেকে এনেছিলাম। এখন তো সব ঠিক আছে। তুমি এখন এসো তা হলে।”
তা-ও কিছুক্ষণ ছিল হাট্টিম। এ ভাবে গিয়েই তো আর ফেরা যায় না। সবার সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা বলে, রাখোকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।
খিদে পেয়েছিল খুব। তাই হাওড়া ব্রিজ পার করে ওরা কলেজ স্ট্রিটের কাছে বাইক দাঁড় করিয়েছে এখন।
হাট্টিম বাইক থেকে নামল এবার। কলেজ স্ট্রিট মোড়ের একটু আগেই বাঁ দিকে বড় একটা রেস্তরাঁ। তার পাশেই একটা রোলের দোকান। এখন বেশ ফাঁকা। সেখানেই দুটো চিকেন রোলের অর্ডার দিল হাট্টিম। দেখল, আবার ফোন বের করে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে রাখো।
খাবার অর্ডার দিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকাটা দিল হাট্টিম।
আকাশে বেশ রোদ এখন, কিন্তু বড় বাজারের দিকটায় কালো করে এসেছে। একটা গোলা পায়রা রঙের ঘন মেঘ ধীরে ধীরে ঢেকে নিচ্ছে শহরের আকাশ। সূর্যটা তাতে সামান্য ঢাকা পড়েছে, আর কী সুন্দর কাচের পাতের মতো রোদ ছড়িয়ে আছে আকাশে!
কোনও কারণ ছাড়াই মনটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল হাট্টিমের। আজকাল সুন্দর কিছু দেখলেই মন খারাপ হয় ওর। মনে হয় কার সঙ্গে ভাগ করবে এই সৌন্দর্য! কাকে ডেকে দেখাবে এই সব? কাকে বলবে ওর কেমন লাগছে!
হাট্টিম দেখল, বিকেলের কমলা আলো মহাত্মা গাঁধী রোডের উঁচু- নিচু অসমানভাবে পিচ করা রাস্তায় পড়ে আছে। আর তাতে কয়েকটা চড়াই ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ছে। এত অবহেলায় এত সুন্দর কিছু পড়ে আছে! আর কেউ দেখছে না!
“কী রে কী দেখছিস?” রাখো ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে এসে দাঁড়াল ওর পাশে।
হাট্টিমের যেন ঘোর কাটল। ও তাকাল রাখোর দিকে। জোর করে হাসল। তার পর বলল, “আবার ফোন বের করেছিলি?”
“আরে, পিন্টুদা ফোন করেছিল। ও দিকে কেস হয়েছে এক,” রাখো বিরক্তিতে মাথা নাড়ল।
“আবার কী হল?” হাট্টিম অবাক হল।
“আজ লাস্ট একটা চান্স ছিল,” রাখো দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “সেটাও গেল। ওই যে সেন জুয়েলারি হাউসে যাওয়ার কথা ছিল না আজ? সেখানে গিয়েছিল পিন্টুদা আর মাদুলি! কিন্তু…”
“কিন্তু কী? স্পনসর করবে না ওরা?” হাট্টিম জিজ্ঞেস করল।
“বলেছে করবে, কিন্তু পরের বছর থেকে। নতুন পুজো, তাও মেন রোড থেকে পাড়ার এত ভেতরে। কে দেখবে বিজ্ঞাপন, হোর্ডিং? কী লাভ হবে ওদের? ইকনমির হাল তো জানেই সবাই। কেউ রিস্ক নিচ্ছে না। ওরাও নেবে না।”
“যাঃ!” হাট্টিম কী বলবে বুঝতে পারল না।
“আট-ন’টা জায়গায় গেল পিন্টুদা। আমিও চারটে জায়গায় গেলাম। বাবা বলেছে কুড়ি হাজার টাকা দেবে। আমিও নিজের থেকে পাঁচ দেব। গাড়ির ইএমআই-টা না থাকলে আরও দিতে পারতাম। জানিসই তো পাড়ার ম্যাক্সিমাম পাবলিক চিপ্পু মাল! এক টাকাকে একটা কিডনির মতো দেখে! তাই সব বাড়ি মিলিয়ে ম্যাক্সিমাম দশ হাজার টাকা উঠবে। পাঁচ লাখ মতো তো লাগবে। সেটা হবে কী করে? এই যে তুই শালা সেদিন ইজনাকে দেখে বার খেয়ে বলে দিলি, তুই পিন্টুদার সঙ্গে আছিস, সেটা নিয়ে কী করেছিস? মানে, তুই কিছু করবি?”
হাট্টিম মাথা নাড়ল, “আমি বার-টার খাই না! ইজনার সঙ্গে আমার কিসের কী! ও আমায় ছেড়ে গিয়েছে। সব শেষ।”
রাখো একটু চেপে এল ওর দিকে, তার পর সামান্য গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক কী করেছিলিস বল তো? মেয়েটা অমন ক্ষার খেয়ে আছে! ওর মাকে চোখ-ফোখ মেরে দিয়েছিলিস নাকি?”
“তুই মানে… তোকে শালা…” হাট্টিম কী বলবে বুঝতে পারল না!
রাখো বলল, “আরে, সেদিন ওকে ধরেছিলাম। তোর কথা তুললাম। বললাম, তুই দেবদাস টাইপ হয়ে যাচ্ছিস। পানু পর্যন্ত দেখিস না। তাতে মেয়েটা পাত্তাই দিল না।”
“তুই এ সব বলেছিস! তোকে বলেছি আমি এসব বলতে?” হাট্টিম এত অবাক হল যে, রাগ করতেও ভুলে গেল!
রাখো হাসল, “না না, এতটা বলিনি। তবে অনেকটা এরকমই বলেছি। মেয়েটাও তেরিয়া আছে। স্ট্রেট বলে দিল পুজোর ব্যাপারে ওর ইন্টারেস্ট নেই। কেসটা বুঝলি তো? পিন্টুদা এখন কী করবে বল তো? জানিস তো পিন্টুদাকে। এক কথার মানুষ। ক্রিকেট মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, এখন পুজো ঢুকেছে। রিনাদির গয়না-ফয়না যা আছে, তা নিয়ে না টানাটানি করে! আচ্ছা, তুই কী ভাবে হেল্প করবি শুনি?”
হাট্টিম দেখল দুটো রোল বাড়িয়ে দিয়েছে দোকানের ছেলেটা। ও একটা রোল রাখোর হাতে দিয়ে বলল, “মামাদের কুড়ি-তিরিশ হাজার মতো দিতে বলব। আমারও কিছুটা টাকা আছে। এফডি করা। দু’লাখের মতো। সেটা দিয়ে দেব।”
“তুই পাগল না গাধা?” রাখো বিরক্ত হল।
“হ্যাঁ, বাকি টাকাপয়সা এমন জায়গায় আছে যে, ভাঙা যাবে না। এটা ভাঙা যাবে,” হাট্টিম আর কথা না বাড়িয়ে রোলে কামড় দিল।
রাখো অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে। তার পর বলল, “কিচ্ছু নেই তোর! মাথায় জাস্ট কিচ্ছু নেই! ক্লাবে চল, তোকে দেখছি।”
রাখো রোলে কামড় দিয়েই মুখটা বেঁকাল, তার পর দোকানের ছেলেটাকে বলল, “ভাই রে, লঙ্কা আর লেবুটা দে বেশি করে! বলও করতে পারিস না, রোলও বানাতে পারিস না। কী পারিস বল! দে তাড়াতাড়ি!”
ছেলেটা ঘাবড়ে গিয়ে লেবু আর লঙ্কার ট্রে-টা এগিয়ে দিল।
রাখো লেবু তুলে নিয়ে বলল, “হাট্টিম, বি প্র্যাকটিকাল। প্রেমে পড়লে সত্যি সবার তার কেটে যায়। এই জন্য শালা আমি মুদ্রার মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছি না। শুধু পড়ছি।”
.
পিন্টুদা ক্লাবেই ছিল। একটা খাতায় কী সব লিখছিল বসে। ওদের দেখে খাতাটা বন্ধ করে বলল, “আমি ফিক্সচার করছিলাম। ক্যারাম কম্পিটিশনটা সেই যে আটকাল, আটকেই গেল! আমি দেখছি আবার কবে শুরু করা যায়।”
রাখো ও সব পাত্তা দিল না। বলল, “আরে, বাদ দাও তোমার ক্যারম। পুজোর কী হবে? জানো, এই মাল হাট্টিম বলে কিনা ওর এফডি ভেঙে দু’লাখ টাকা দেবে ক্লাবের ফান্ডে। বাকিটা ম্যানেজ করতে হবে নাকি।”
পিন্টুদা গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, “আমিও দেব লাখখানেক। মোট তিন লাখ। আমি হিসেব করে দেখেছি পাঁচ লাখ পঁচিশ মতো লাগবে। মানে ভোগ হবে। অষ্টমীতে পাড়ার লোকজন বসে খাবে। নবমীতে বাড়ি বাড়ি ভোগ যাবে। আর বিজয়াতে একটা বাংলা গানের অনুষ্ঠান।”
রাখো বিরক্ত হয়ে বলল, “ছোট করে করো না! হয়ে যাবে। তুমি মন্ত্রী না ফিল্মস্টার যে, পুজোতে এত কিছু করতে হবে তোমায়?”
পিন্টুদা বলল, “মিলন সমিতি খুব আওয়াজ দিয়েছে আমাদের। বুড়োদাদু আমাদের ঠিক সময়ে পুজো করার কথা বলেছেন। উনি নাকি এক লাখ দেবেন। কিন্তু আমরা নেব না। ওই বয়সে চোর ধরলেন! ভাবতে পারিস! আমরা পাড়ার লোকেরা কিছু করতে পারি না একটা বুড়ো মানুষের জন্য? আমাদের কি কোনও কিছু করার নেই? একটা পাড়া থেকে পাঁচ লাখ টাকা ওঠে না!”
হাট্টিম একটা উঁচু টুলে বসে ছিল। এবার আর থাকতে না পেরে সেখান থেকে নেমে এসে বলল, “তুমি এক লাখ দেবে? পিন্টুদা, কিছু মনে কোরো না, তুমি ওই টাকা পাবে কোথায়? তোমার রোলের হুইলার! বৌদির ওই ছোট দোকান! তুমি কোথা থেকে পাবে ওই টাকা?”
রাখো থতমত খেয়ে গেল। বলল, “সত্যি তো! এটা তো মাথায় আসেনি! কী কেস বলো তো পিন্টুদা? চিট ফান্ড-টান্ড শুরু করলে নাকি? নাকি রিনাদির গয়না সরাবে?”
পিন্টুদা কথাটা শুনতে পায়নি এমন করে আবার খাতাটা খুলল।
হাট্টিম পিন্টুদার হাত থেকে খাতাটা টেনে নিয়ে বলল, “উত্তরটা দাও আগে তুমি! রিনাদির গয়না বিক্রি করবে?”
পিন্টুদা কিছু বলার আগেই ক্লাবের দরজা থেকে একটা গলা পেল হাট্টিম।
“হ্যাঁ, তাই করবে। কালকেই নাকি নিজের মায়ের পুরনো সোনার দুটো বালা নিয়ে যাবে দোকানে বিক্রি করতে। ওই দুটোই আমি বাঁচিয়ে রেখেছি এত কষ্টে। আমার শাশুড়ির জিনিস। আমায় দিয়ে গিয়েছেন। পুরনো জিনিস। আর কী ভারী! এত দিন বাঁচিয়ে রেখেছিলাম, কিন্তু এবার আর পারলাম না,” রিনাদি ক্লাবের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
হাট্টিম দেখল রিনাদির চোখে জল। আর, রিনাদির পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইজনা!
রাখো কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “কিচ্ছু নেই! মানে কারও কিচ্ছু নেই! ধুর, অনেক পুজো হয়েছে! এবার যে যার বাড়িতে পুজো করো। আজ থেকে পাড়ার পুজো ক্যানসেল!”
“না, ক্যানসেল এখনও নয়!” ইজনা ঠান্ডা গলায় বলল, “একটা উপায় আছে। তবে তোমরা যদি এক জনের সঙ্গে দেখা করতে পারো, তা হলে।”
হাট্টিম দেখল শেষ শব্দটা বলে ইজনা সরাসরি তাকাল ওর দিকেই। আরও বুঝল এখনও ইজনা গম্ভীরভাবে তাকালে ওর বুকের মধ্যে হাজার হাজার জাটিঙ্গা পাখি আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে!
