সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
1 of 2

চরম অস্ত্র – অনীশ দেব

চরম অস্ত্র

কন্ট্রোল টাওয়ারের ইমার্জেন্সি ভিডিয়োফোন হঠাৎই জেগে উঠল।

জ্যামিতিক আকারের ছ’কোণা ঘর। ফাইবারগ্লাসের দেওয়ালে ঘেরা। ঘরের মাঝখানে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসেছিলেন জেনারেল ডেভিড সোয়ার্জকফ, পাশে মার্কিন অস্ত্রবিভাগের প্রধান টমাস ফাউনটেন।

সোয়ার্জকফ মুখের ওপরে হাত রেখে দুশ্চিন্তায় মাথা ঝুঁকিয়ে চোখ বুজে ছিলেন। আর ফাউনটেন তাকিয়ে ছিলেন প্যানেলের কম্পিউটার পরদার দিকে। তাঁর কপালে কয়েকটা ভাঁজ বলে দিচ্ছে যুদ্ধে তাঁরা সুবিধেজনক অবস্থায় নেই। যে-যুদ্ধ কয়েকঘণ্টায় শেষ হওয়ার কথা তা আজ গড়িয়ে কয়েকদিন, এমনকী দেড়সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। উপসাগরের একটা ছোট্ট দেশ যে এইভাবে রুখে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন লড়তে পারে এ-কথা কেউই ভাবতে পারেননি।

টমাস ফাউনটেন প্রেসিডেন্টের কথা ভাবছিলেন। জরুরি মিটিং-এ তিনি স্পষ্টই আদেশ দিয়েছেনঃ ‘নিত্যনতুন মারাত্মক অস্ত্র তৈরি করুন। ফ্যাক্টরিতে চব্বিশঘণ্টা কাজ চলবে। চব্বিশঘণ্টা মানে চোদ্দোশো চল্লিশমিনিট—তার একমিনিটও কম নয়।’

সুতরাং আর্মস ফ্যাক্টরির চিফ ইঞ্জিনিয়ার জোসেফ আইনস্টাইনকে ফাউনটেন সেইরকমই নির্দেশ দিয়েছেন। আইনস্টাইন এই পদে আছেন প্রায় বারোবছর। বয়েস মাত্র চল্লিশ, কিন্তু এর মধ্যেই কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত ছ’টা ক্ষেপণাস্ত্রের পেটেন্ট নিয়েছেন। তৈরি করেছেন লেজার নিয়ন্ত্রিত ‘স্মার্ট’ বোমা। নিত্যনতুন মারণাস্ত্র তৈরিতে আইনস্টাইনের জুড়ি নেই। এখন আইনস্টাইনই দেশের একমাত্র ভরসা। সারা বিশ্বের কাছে মার্কিন শক্তির ভাবমূর্তি যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সোয়ার্জকফ, ফাউনটেন সকলেই তাকিয়ে আছে আইনস্টাইনের অভিনব আবিষ্কারের দিকে।

ফাইবারগ্লাসের একটা দেওয়াল জুড়ে ফুটে উঠেছিল আইনস্টাইনের রঙিন ছবি। ইমার্জেন্সি ভিডিয়োফোনে আইনস্টাইন কথা বলতে চান।

মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকা সোয়ার্জকফকে খোঁচা মারলেন ফাউনটেন। তারপর কন্ট্রোল প্যানেলের একটা বোতাম টিপতেই জোসেফ আইনস্টাইনের কথা শোনা গেল।

‘গুড মর্নিং, স্যার—।’

‘জলদি বলো, কী খবর? নতুন কিছু বের করতে পারলে?’ ফাউনটেন বুঝতে পারছিলেন তাঁর প্রত্যাশা ও কৌতূহল মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আবেগ ইত্যাদি কিছুতেই আর নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।

সোয়ার্জকফ বললেন, ‘একটু আগেই খবর এসেছে, আমাদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও ওরা অকেজো করে দিতে পেরেছে। তার ওপর সাগরে তেল ঢেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমাদের নৌ-বাহিনী আর এগোতে পারছে না। এদিকে প্রায় দু-শো প্লেন ধ্বংস হয়ে গেছে। ওঃ, আইনস্টাইন, ডু সামথিং ফর গড্স সেক, উইল য়ু?’

দেওয়ালে আইনস্টাইনের ছবি হাসল, তারপর কথা বলল, ‘স্যার, আমাকে এত চাপ দেবেন না, আমি আর পারছি না। আসলে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে আমার শুধু পদবিটুকুরই মিল, প্রতিভার ছিটেফোঁটাও মিল নেই। তবে প্রেসিডেন্টের আদেশ, তাই আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ আইনস্টাইন এবার ফাউনটেনকে লক্ষ করে বললেন, ‘কেন স্যার, গত সপ্তাহে আপনাদের দু-দুটো নতুন ক্ষেপণাস্ত্র আমি তৈরি করে দিইনি?’

ফাউনটেন ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তা দিয়েছ—।’

‘তবে সেগুলোকেও শত্রুপক্ষ ঘায়েল করতে পেরেছে।’ বিদ্রূপের সুরে বলে উঠলেন সোয়ার্জকফ, ‘এখন তৃতীয় বিশ্বের সবক’টা দেশ আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করছে। আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নামে পোষা পায়রার নাম রাখছে—।’

শেষ কথাটায় যেন চমকে উঠলেন আইনস্টাইন। অপমানের সামান্য ছায়াও যেন নেমে এল মুখে।

ফাউনটেন বললেন, ‘এখন সবাই ভাবছে রেগনের আমলে আমরা যে স্টার ওয়ার্স-এর জিগির তুলেছিলাম, তার সবটাই ফাঁকা আওয়াজ। আশ্চর্য, এত সব আধুনিক অস্ত্র ওইটুকু একটা পুঁচকে দেশ পেল কেমন করে?’

সোয়ার্জকফ ব্যঙ্গের সুরে ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, ‘তা-ও বুঝতে পারছেন না? আমরাই গত দশবছরে যেসব অস্ত্র বেচেছি সেগুলোই এখন বুমেরাং হয়ে আমাদের ঘাড়ে ফিরে আসছে।’

‘কিন্তু আমরা তো সাধারণত সেকেলে অস্ত্র বেচে থাকি—।’

ফাউনটেন কোনও জবাব দিলেন না।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কিছু একটা না করলেই নয়। তারপর মরিয়া চোখে তিনি তাকালেন জোসেফ আইনস্টাইনের ছবির দিকে। বললেন, ‘১৯৪৫-এর ৬ আগস্টের কথা মনে আছে, আইনস্টাইন? আমি চাই হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো কিছু একটা হেস্তনেস্ত হোক। এমন কিছু একটা তোমাকে তৈরি করতেই হবে যাতে এই যুদ্ধ একেবারে খতম হয়ে যায়। আর কোনও বিকল্প আমাদের হাতে নেই।

আটঘণ্টা অন্তর-অন্তর এই কন্ট্রোল টাওয়ারে আমাকে কনট্যাক্ট করবে। ওভার অ্যান্ড আউট।’

কন্ট্রোল প্যানেলের বোতাম টিপলেন ফাউনটেন। আইনস্টাইনের হতবুদ্ধি মুখের ছবিটা দেওয়াল থেকে মুছে গেল। বেচারা যে-চাপের মধ্যে কাজ করছে! ওঁকে আর দোষ দিয়ে লাভ কী!

ফাউনটেনের চোখ জ্বালা করছিল। গত চব্বিশঘণ্টা দু-চোখের পাতা এক করতে পারেননি।

সোয়ার্জকফের অবস্থাও তাই। তিনি জড়ানো গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘প্রেসিডেন্টকে একটু পরেই খবর জানাতে হবে। কী বলব?’

ফাউনটেন কন্ট্রোল প্যানেলের টিভি পরদার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেদিকে চোখ রেখেই বললেন, বলবেন প্রগ্রেস স্যাটিসফ্যাকটরি। আশা করছি কাল সকালের মধ্যে কিছু একটা ব্যবস্থা হবে।’

রাত ঠিক একটার সময় ইমার্জেন্সি ভিডিয়োফোনে কথা বললেন জোসেফ আইনস্টাইন। সোয়ার্জকফ জেগে ছিলেন, কিন্তু ফাউনটেন কন্ট্রোল প্যানেলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ভিডিয়োকল বোতাম টিপে অ্যাকসেপ্ট করে সোয়ার্জকফ জাগিয়ে দিলেন ফাউনটেনকে।

আইনস্টাইন বললেন, ‘গুড নিউজ, স্যার। একটা মারাত্মক মিসাইল তৈরি করে ফেলেছি। ওটা লঞ্চ করার জন্য এক্ষুনি ব্যবস্থা করুন। আপনি যা চেয়েছিলেন একেবারে তাই। যদি এটা ফায়ার করে যুদ্ধ খতম না করতে পারি তা হলে আর কিছু করার নেই।’

সোয়ার্জকফ জিগ্যেস করলেন, ‘এক্সপ্লোসিভ পাওয়ার কত টন?’

‘সেটা হিসেবের বাইরে, স্যার,’ আইনস্টাইন গর্বের সঙ্গে জানালেন, ‘তবে এর নাম দিয়েছি “ওয়ার-স্টপার”—নাম শুনেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন স্যার। আর আপনাকে ধন্যবাদ, স্যার, কারণ আপনার জন্যেই এই ক্ষেপণাস্ত্রের আইডিয়াটা পেয়েছি।’

সোয়ার্জকফ অবাক হয়ে গেলেন। ফাউনটেন ভিডিয়ো কানেকশন অফ করে দিয়ে চারিদিকে এমার্জেন্সি রেডিয়ো মেসেজ ছড়িয়ে দিলেন।

চারঘণ্টার মধ্যেই স্পেস প্লেনে করে ‘ওয়ার-স্টপার’ পৌঁছে গেল যুদ্ধ ঘাঁটিতে এবং সঙ্গে-সঙ্গেই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণের সাহায্যে বসরা বন্দর-শহর লক্ষ করে ক্ষেপণাস্ত্রটি ছুড়ে দেওয়া হল। বহুজাতিক বাহিনীর অফিসার ও সৈনিকরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধ খতম হতে চলেছে।

বসরার ভোরের আকাশে ‘ওয়ার-স্টপার’-এর বিস্ফোরণ ঘটল। ইরাকি সমর-বিশারদরা শত চেষ্টাতেও এই অভিনব ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ঘায়েল করতে পারেননি।

কিন্তু বিস্ফোরণের সঙ্গে-সঙ্গে হতবাক হয়ে গেল সকলে। কোথায় চোখধাঁধানো আগুন? কোথায় বিষাক্ত ধোঁয়া? তার বদলে চোখে পড়ল তুষার-কুচির মতো অসংখ্য সাদা ফুটকি ভোরের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে।

ওগুলো ক্রমশই চেনা গেলঃ হাজার-হাজার সাদা পায়রা পাগলের মতো ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে। সদ্য উঁকি দেওয়া সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে ওদের ডানার পালক থেকে। রাস্তায় লক্ষ-লক্ষ মানুষ এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখার জন্য জড়ো হয়ে গেল।

পায়রাগুলো আরও নীচে নেমে আসতেই ওদের কারও-কারও ঠোঁটে ধরা পলিমার দিয়ে তৈরি ইংরেজি হরফগুলো সকলের চোখে পড়ল। উড়ন্ত পায়রার ঝাঁক নিজেদের সাজিয়ে নিতেই পাঁচ অক্ষরের শব্দটা সকলে পড়তে পারলঃ PEACE।

পায়রার ঝাঁক তখনও আনন্দে উড়ছে…উড়ছে…।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *