সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
1 of 2

ঘাসের শিষ নেই – অনীশ দেব

ঘাসের শিষ নেই

এক

আদিত্য দাঁড়িয়ে ছিল বড় রাস্তার ধারে।

রাস্তা পার হওয়ার জন্য যতবারই এগোতে যাচ্ছে, ততবারই পাঁচ-সাতটা অটো রিকশো ছুটে আসছে ফুলঝুরির মতো। সাঁ-সাঁ করে বিপজ্জনক বাঁক নিয়ে বিকট শব্দের সারেগামা শুনিয়ে অত্যন্ত জটিল পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ছোট মাপের গাড়িগুলো ঠিক ইঁদুরের মতো। এদের গতিপথের জ্যামিতিক চেহারা এতই আঁকাবাঁকা যে, স্বয়ং ইউক্লিডও হয়তো ‘এলিমেন্ট্স্’ লেখা বন্ধ করে এই নতুন জ্যামিতির রহস্য সন্ধানে দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াতেন।

বাজারের থলেটা শক্ত হাতে ধরে আবার পা বাড়িয়েছিল, কিন্তু ক্যাবারে নর্তকীর মতো সাবলীল বাঁক নিয়ে পথ জুড়ে এসে দাঁড়ানো মিনিবাসটাকে একরকম খেয়ালই করেনি আদিত্য। সুতরাং আবার দাঁড়িয়ে পড়ল বিরক্ত হয়ে। আচ্ছা, কলকাতা শহরে এখন গাড়ির সংখ্যা কত? এক লাখ, দু-লাখ, পাঁচ লাখ, না এক কোটি? অটো, স্কুটার, মিনি, ট্যাক্সি, বাস, প্রাইভেট কার, ট্রাক, লরি—ওঃ! ভাবা যায় না। মানুষের বেড়ে ওঠার হার দিব্যি রুখে দিতে পেরেছে সরকার, কিন্তু গাড়ির বেলায় অষ্টরম্ভা।

ঠিক তখনই মিনিবাসের একজস্ট পাইপ দিয়ে ঘন কালো ধোঁয়া বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল আদিত্যর চোখেমুখে। হঠাৎ যেন দম আটকে এল ওর। শরীরটা কেমন গুলিয়ে উঠল। চট করে পিছিয়ে এল নর্দমার ধারে। শব্দ করে থুতু ফেলল দুবার। গলার ভেতরটা কেমন জ্বালা-জ্বালা করছে।

আদিত্য আর দেরি করল না। নানারকম গাড়ির যানজট ও হর্নের প্যাঁ-পোঁর মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ঠিক যেন গোলকধাঁধায় পথ চলা। ছুটির দিনেও এই রাস্তাটার এরকম বেহাল অবস্থা। হরি শা’র হাটের দিন এ-অবস্থা হবেই। সপ্তাহে দুটো দিনঃ বুধবার, আর রোববার। তখন অরবিন্দ সেতুর যে-অবস্থা হয়, ইচ্ছে করে শ্রী রবিন্দকে ডেকে এনে দেখাতে। যাঁর উপাসনা গৃহের মূল মন্ত্র নিস্তব্ধতা ও নীরব প্রার্থনা, তাঁর নাম যুক্ত করা হল কিনা সবচেয়ে উপদ্রুত রাস্তায়!

বড় রাস্তা পেরিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা চালাল আদিত্য। এখনই প্রায় সওয়া আটটা। বউদি বোধহয় বাজারের জন্য হাঁ করে বসে আছে। ঠিক দশটায় দাদার এয়ারপোর্টে যাওয়ার কথা। ওঁর অফিসের কোন এক বড়সাহেব আসবেন। তাঁকে আপ্যায়ন করে নিয়ে গিয়ে তুলতে হবে কোম্পানির গড়িয়াহাটের গেস্টহাউসে। তারপর বাকি দিনটা চলতে হবে তাঁর মরজিমাফিক।

চলতে-চলতে একবার আকাশের দিকে তাকিয়েছিল আদিত্য। মেঘে-মেঘে প্রায় ছেয়ে গেছে। অথচ বৃষ্টির কোনও নামগন্ধ নেই। ক’দিন ধরেই কেমন এক অসহ্য গুমোট।

মুখ নামাতেই চমকে গেল আদিত্য। চোখাচোখি হয়ে গেল বৃদ্ধ মানুষটার সঙ্গে।

নাম শঙ্করানন্দ চক্রবর্তী। ওদের বাড়ি থেকে তিনটে বাড়ি পরেই ভদ্রলোকের ছাপোষা একতলা বাড়ি। বয়েস প্রায় সত্তর। শুধু স্বামী-স্ত্রী দুটিতে জুটি বেঁধে ব্যাট করছেন। একটি মাত্র ছেলে। বছরদশেক আগে সেই যে বাড়ি ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছে আর ফেরার নাম নেই। সেখানেই নাকি বিয়ে-থা করে সংসারী হয়েছে। বাড়ি-টাড়িও কিনেছে বোধহয়। বছরে দু-বছরে এক-আধটা চিঠি বাপ-মাকে দেয়। সেই চিঠিটা ভদ্রলোক পাড়ার পাঁচজনকে দেখিয়ে বেড়ান। আদিত্যকেও অনেকবার দেখিয়েছেন। প্রথম-প্রথম আদিত্য বিরক্ত হয়েছিল। মনে হয়েছিল, ছেলে যে আমেরিকায় বিরাট বড়লোক সেটাই পাড়ার লোককে জানানোর একটা ছুতো বোধহয়। কিন্তু পরে আর তা মনে হয়নি।

শঙ্করবাবুর হাতে দুটো ঠোঙা। পাটের সুতলি বাঁধা। সামনেই পাড়ার জমাটি মুদি-দোকান মনোহর ভাণ্ডার। হয়তো সেখানেই কিছু কিনতে এসেছিলেন। আদিত্যর খুব কাছে এসে একটু জোরালো গলাতেই বললেন, ‘দিতু, কোনও খবর আছে?’

আদিত্যর বুকের মধ্যে পলকে অপরাধবোধ তৈরি হয়ে গেল। ইস, একেবারে ভুলে মেরে দিয়েছে। কী বিচ্ছিরি লাগছে এখন!

বৃদ্ধের পরনে সাদা শার্ট আর ধুতি। গায়ের রং টকটকে ফরসা। গাল ভাঙা। চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। মাথার চুল সাদা। ছোট্ট টুথব্রাশ গোঁফও তাই। নাকটা সামান্য মোটা। তার ওপরে একটা ছোট আঁচিল। চোখ দুটো ঠিক কটা নয়, তবে ঘোলাটে। কানে কম শোনেন বলে চেঁচিয়ে কথা বলেন অকারণে।

আদিত্য কিছুক্ষণ দেখল ঘোলাটে চোখ দুটোর দিকে। একটু আগে দেখা আকাশের কথা মনে পড়ল ওর।

শঙ্করবাবু বোধহয় ভাবলেন আদিত্য তাঁর অনুরোধটা একেবারে ভুলে মেরে দিয়েছে। তাই প্রত্যাশা-ভরা ঘোলাটে চোখে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে ঘষা গলায় বললেন, ‘তোমায় দুটো টিউশনি জোগাড় করে দিতে বলেছিলাম—মানে, আগের দুটো টিউশানি তো ফাইনাল পরীক্ষার সঙ্গে-সঙ্গে শেষ হয়ে গেল। বোঝোই তো, বাড়ির ট্যাক্স, ইলেকট্রিক বিল, আর আমরা দুটি প্রাণী! যে করে হোক চালাতে তো হবে। তা ছাড়া মাঝে-মাঝে ঘর-দোর মেরামতের ঝামেলা রয়েছে।’ বৃদ্ধ একটু কাশলেন। শব্দে বোঝা গেল গলায় কফ উঠল। কিন্তু তিনি ওই অবস্থাতেই বললেন, ‘তুমি তো এ-লাইনে রয়েছ, তাই তোমাকে বলে রেখেছিলুম—।’

আদিত্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা মিথ্যে অজুহাত ভেতরে-ভেতরে তৈরি করছিল। ও যে দুটো টিউশানি করে তা ঠিক। যাদবপুরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ঢোকার সময় থেকেই দু-একটা টিউশানি করত ও। পাড়ার মধ্যে, নয়তো তার আশেপাশে। হাতখরচের টাকাটা উঠে যেত তাতে। তারপর পাশটাশ করে চাকরি করছে প্রায় বছরদশেক, কিন্তু টিউশানির অভ্যেসটা আর ছেড়ে দেওয়া হয়নি।

আদিত্যর গলায় ভেতরটা খুশখুশ করে উঠল। দেরি হয়ে যাচ্ছে বাড়ি ফিরতে। কী বলা যায় ভদ্রলোককে?

‘মেসোমশাই, আমি ভুলিনি। দু-চারজনকে বলেছি। কোনও খবর থাকলে সামনের সপ্তাহে আপনাকে জানিয়ে দেব। শুধু ইংরেজি তো?’ গলার স্বর বেশ খানিকটা চড়িয়ে শেষ প্রশ্নটা ছুড়ে দিল আদিত্য। জানা কথাই, শুধু ইংরেজি। তবুও কেন যে ন্যাকার মতো এই প্রশ্নটা করে বসল কে জানে।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, শুধু ইংরেজি,’ বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখের তারা একটু উজ্জ্বল হল। তারপরই গলা নামিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কেন, সঙ্গে আর কিছু পড়াতে বলছে নাকি? বাংলা, ভূগোল আর ইতিহাস হলে ম্যানেজ করে নেব। তবে টাকাটা একটু বাড়িয়ে দিলে…।’

‘ঠিক আছে, কথাবার্তা ফাইনাল হলে আপনাকে খবর দেব’খন।’

‘তুুমি একটু খেয়াল রেখো, বাবা,’ বলে ছোট-ছোট পা ফেলে শঙ্করবাবু চলে গেলেন।

এই এক আশ্চর্য লোক! বাড়িতে ভাড়াটে বসাবেন না কিছুতেই। খালি বলবেন, ‘মহাদেব এসে তা হলে থাকবে কোথায়?’

মহাদেব—মহাদেবদা, ওঁর সেই আমেরিকাবাসী ছেলে। তার ফিরে আসার কথা ভেবে শঙ্করবাবু যক হয়ে গেছেন। যে-ভাবেই হোক বসতবাড়িটা ওঁকে ঠিকঠাক রাখতে হবে। নইলে এই বয়েসে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি পরে কে আর হেঁটে-হেঁটে ছাত্র পড়াতে যায়! ছাত্ররা ওঁর কাছে যজমান। আর উনি যেন পুুরুতমশাই। একটু আগেই কাঁধের পাশ দিয়ে পইতেটা উঁকি মারছিল। ভদ্রলোক খুব সাত্ত্বিক। রোজ গায়ত্রী জপ করেন। গীতা পড়েন।

আদিত্যর কষ্ট হল। কতরকম কারণেই না মানুষকে বেঁচে থাকার কসরত করতে হয়। নাঃ, অন্তত একটা টিউশানি ওকে জোগাড় করতেই হবে। সুনয়নাকে একবার বলে দেখা যেতে পারে। কিন্তু মেয়েটা যা ইয়ারবাজ! আদিত্যকে তো মাস্টারমশাই বলে পাত্তাই দেয় না। চোখ মটকে বলে, ‘ভূতের ওঝার মতো চেহারা, তাকে আবার মাস্টারমশাই বলতে হবে। অ্যাই দিতুদা, সত্যি করে বলুন না, ছোটবেলায় আপনি ভূত তাড়াতেন?’

আদিত্যর হাসি পেল। আর প্রায় একইসঙ্গে মনোহর ভাণ্ডারের দেওয়াল ঘড়িটায় চোখ গেলঃ আটটা চল্লিশ! সর্বনাশ! বাড়ির দিকে একরকম প্রায় ছুটই লাগাল আদিত্য। আজ কপালে দুঃখ আছে।

দশ-বারো পা যেতে না যেতেই পিছন থেকে কে ডাকলঃ ‘দিতু!’

ভুরু কুঁচকে মাথা ঘোরাল আদিত্য। শুভেন। পাড়ার বন্ধু। কবিতা-টবিতা লেখে। লম্বা-লম্বা চুল। চোখ টানা-টানা। গায়ের রং কালো। পরনে ডোরাকাটা শার্ট আর পাজামা। খুব সামান্য দাড়ি আছে। আর অসম্ভব রোগা।

‘কী বলছিস?’ আদিত্য বিরক্ত হয়ে জিগ্যেস করল।

‘কাল তোর অফিস থেকে একটা প্যাড এনে দিবি? আগেরটা ফুরিয়ে গেছে।’

আদিত্য বরাবরই ওর কবিতা লেখার কাগজ সাপ্লাই দেয়—সুতরাং ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘একটু পরে বটতলায় আয়, আমি থাকব।’ তারপরই চোখে ঠুলি লাগানো ঘোড়ার মতো একরকম দৌড়ই লাগাল বাড়ির দিকে।

আজ ছুটির দিনটা একেবারে যাচ্ছেতাই কাটছে ওর। হনহন করে হাঁটতে হাঁটতেই বারদুয়েক কাশল। ওদের সরু গলির মুখে পৌঁছেই দেখল পাড়ার ছোট-ছোট ছেলেগুলো এরই মধ্যে রবারের বল নামিয়ে পেটাপেটি শুরু করে দিয়েছে। হঠাৎই ওর পায়ের কাছে বলটা গড়িয়ে আসতেই বাঁ-পায়ে বলটা চেপে ধরল ও। তারপর এক জায়গায় দাঁড়িয়েই শরীরটাকে ডানদিকে সামান্য হেলিয়ে বাঁ-পায়ে চোস্ত এক শট মারল। খোকন, দিপু আর তোতা একেবারে হইহই করে উঠলঃ ‘ওয়েল প্লেড, দিতুদা! ওয়েল প্লেড!’

আদিত্য একসময়ে চার-দশে খেলত। কখনও মাঠের কমপিটিশান, কখনও গলিতে, কখনও ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে, কখনও বা হরি শা’ হাটের বাড়ির দোতলার প্রকাণ্ড বারান্দায়। ওরা সেটা জানে। আর আদিত্যও মাঝে-মাঝে খেলা নিয়ে ওদের টুকটাক পরামর্শ দেয়।

স্যাঁতসেঁতে গলিটায় কয়েক পা ঢুকেই বাড়ির দোতলার বারান্দায় চোখ গেল আদিত্যর। ঠিক যা ভেবেছে তাই। বারান্দায় গলা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনজনঃ মা, বউদি আ মুন্নি। দূর থেকে মুন্নির লাল-হলুদ ছাপা স্কার্টটা বেশ চেনা যাচ্ছে। গতবার পুজোর সময় আদিত্য এনে দিয়েছিল—দিল্লি থেকে। মুন্নি আর সেই ছোট বোনটি নেই—অনেক বড় হয়ে গেছে। সামনের বছর হায়ার সেকেন্ডারি দেবে—আর্টস-এ।

বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই ওপর থেকে বউদির তিরস্কার শুরু হয়ে গেলঃ ‘সত্যি ছোড়দা, তোমার কি কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু নেই। জানো, তোমার দাদাকে ঠিক দশটায় এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে, আর তুমি ওই ছেলেগুলোর সঙ্গে বাজার হাতে বল খেলতে লেগে গেলে—।’

আদিত্য ওপরে তাকায়নি। বউদি আরও কী বলছিল, কিন্তু ওর কানে তার কিছুই ঢুকল না। ও ততক্ষণে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে।

বাড়িতে ঢুকেই নানকুর চিৎকার কানে এল। চিৎকার করে নার্সারি রাইম আওড়াচ্ছে বাচ্চাটাঃ ‘জ্যাক অ্যান্ড জিল, ওয়েন্ট আপ দ্য হিল। জ্যাক অ্যান্ড জিল…।’ শুধু প্রথম দুটো লইন বারবার পড়ে যাচ্ছে। ওর মায়ের কাছে থেকে মার খেল বলে। একে বাজারের দেরি হয়েছে বলে বউদি রেগে টং, তার ওপরে ছেলের এই মন্ত্র আওড়ানো।

দোতলার সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে রান্নাঘরের কাছে বাজার বয়ে নিয়ে যেতে-যেতেই শুনতে পেল নানকুর পিঠে কিল পড়ার গুমগুম শব্দ। আর তারপরই ভ্যাঁ।

সঙ্গে-সঙ্গে বারান্দার কাছ থেকে মায়ের চিৎকার শুরু হয়ে গেলঃ ‘কী হচ্ছে, লতা! বাচ্চাটা কী করেছে! ওকে অকারণে মারছ কেন?’

আদিত্য বাজারের থলে দুটো রেখে দাদার ঘরে উঁকি মারল। মারপিটের ব্যাপারটা ওখানেই হচ্ছে। দাদা ঘরে নেই। বোধহয় চান করতে গেছে। তবে ঘরে থাকলেও হয়তো ছেলেকে বাঁচাতে পারত না।

আদিত্য ডেকে বলল, ‘বউদি, পরজীবে করো দয়া আমি অতি মন্দ। আজকের মতো নানকুকে তুমি ফরগিভ করে দাও। আর কোনওদিন ওর কাকুমণি দেরি করে বাজার আনবে না।’

নানকু কান্না থামিয়ে আদিত্যকে দেখল। তারপর কান্না জড়ানো গলায় ‘কাকুমণি! কাকুমণি!’ বলে ছুটে এল ওর কাছে।

লতা দাদার একপ্রস্ত জামা-প্যান্ট আলনা থেকে নিয়ে বিছানায় গুছিয়ে রাখল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আদিত্যকে। বলল, ‘সত্যি, ছোড়দা, তুমি একেবারে হোপলেস। ভালো ট্রেনিং দিচ্ছ ভাইপোকে—।’

আদিত্য নানকুর মাথার বড়-বড় চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘যাই বলো, বউদি, তোমার কিল মারার স্টাইলে ব্রুস লি-র মতো একটা আভিজাত্য আছে। অ্যাই নে, শিগগির একটা মাদ্রাজি নমস্কার কর তোর মাকে—’ শেষের কথাটা নানকুকে লক্ষ করে।

নানকু একবার আদিত্যর মুখের দিকে তাকাল, তারপর মায়ের দিকে দু-তিন পা এগিয়ে হুমড়ি খেয়ে সটান উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। বারবার মাথা ঠুকতে লাগল মায়ের দু-পায়ে। আর বিড়বিড় করে ‘জ্যাক অ্যান্ড জিল’-এর প্রথম দুটো লাইন আওড়াতে থাকল।

লতা রাগের মধ্যেও হেসে ফেলল। ছেলেটাকে টেনে তুলল মেঝে থেকে। নানকু মায়ের হাত ছাড়িয়ে চলে এল আদিত্যর কাছে। আদিত্য বলল, ‘কেমন ট্রেনিং দিয়েছি বলো! যাকগে বউদি, তুম জলদি রান্না করো। আমি নানকুকে ও-ঘরে নিয়ে যাচ্ছি। সকাল থেকে এখনও চা খাইনি। গলাটা শুকিয়ে গেল—।’

আদিত্য ছেলেটার হাত ধরে নিয়ে চলল বারান্দার দিকে। মা তখনও আপনমনে কীসব বকে চলেছে। আর মুন্নি দূর থেকে গলা বাড়িয়ে দাদার ঘরের দিকে উঁকি মেরে দেখছে।

পাশের বাড়ি থেকে উনুনের ধোঁয়া ভেসে আসছে। তার বেশ খানিকটা ঢুকে পড়ছে আদিত্যদের বাড়িতে। চোখ জ্বালা করছে। গলার কাছটাও খুশখুশ করছে আবার। কাশি পেয়ে গেল আদিত্যর। একইসঙ্গে টের পেল, পরনের পাঞ্জাবিটা ঘামে ভিজে লেপটে আছে ওর গায়ে।

বারান্দার লাগোয়া ঘরটাই দোতলা বাড়িটার সবচেয়ে বড় ঘর। বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ড গ্র্যাচুইটির টাকা দিয়ে তৈরি বাড়ি। জমিটা ছিল ঠাকুরদার কেনা। তখন, খুব বাচ্চা বয়েসে, আদিত্যরা উলটোডাঙ্গার মুরারিপুকুরে ভাড়া থাকত। বাবা রিটায়ার করার ঠিক পরেই বাড়ি করেছিল। আর বাড়ির কাজে শেষ-ছোঁওয়া দেওয়ার আগেই বাবাকে চলে যেতে হয়। যাওয়ার আগে অবশ্য একমাস ধরে লড়াই করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি। হয়তো পারত, কিন্তু ডাক্তাররা অসুখটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি।

বাবা চলে গেছে প্রায় তেরো বছর। কিন্তু মনে হয়, এই তো সেদিন।

বাড়ির কোনও-কোনও পিলারে পলেস্তারা পড়েনি। কোথাও হয়তো দু-চারখানা ঢালাইয়ের রড বেরিয়ে রয়েছে। এইরকম টুকিটাকি শেষ-না-হওয়া কাজ। এগুলোর দিকে চোখ পড়লেই আদিত্যর মনে পড়ে যায় বাবার কথা। মনে হয়, বাবা যেন বলছে, ‘দিতু, তুই আর পলাশ এসব কাজ নিয়ে মাথা ঘামাসনি। তোদের পড়ার ক্ষতি হবে। দাঁড়া, একটু ফুরসত পাই, আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এসব বাকি কাজ করিয়ে নেব।’

বাবা বাড়ির নাম রেখেছে ‘সুরেন্দ্র নিলয়’—ঠাকুরদার নামে। বাড়ির বাইরের দেওয়ালে একটা ফলকে সেটা খোদাই করা আছে। কিন্তু দেওয়ালটায় নোনা ধরে গেছে। এই এলাকার প্রায় সব বাড়িতেই ড্যাম্প, নোনা।

নানকু হাত ধরে টান মারতেই আদিত্যর খেয়াল হল মা ওকে কী যেন বলছে। আবার বলতেই কথাটা কানে ঢুকল আদিত্যরঃ ‘লতার হাত বড্ড বেড়েছে! কারণে-অকারণে ছেলেটাকে মারবে!’

আদিত্য নানকুকে দেখল। চোখের কোলে জল শুকিয়ে আছে, কিন্তু মুখে হাসি। মা জড়সড়ো হয়ে দেওয়ালের লাগোয়া বিছানায় বসেছিল। পাশেই ছোট ট্রানজিস্টর রেডিয়ো বাজছে। ওটা সব সময়েই বেজে চলে। গান-বাজনা-খবর-খেয়াল—ও থেকে যা হোক কিছু একটা আওয়াজ বেরোলেই হল।

আদিত্য বলল, ‘নানকুর সামনে বোলো না, আশকারা পেয়ে যাবে—।’

নানকু সঙ্গে সঙ্গে আদিত্যর হাত ধরে একরকম ঝুলেই পড়ল, বায়নার সুরে বলল, ‘কাকুমণি, আশকারা খাব, আশকারা কিনে দাও আমাকে—।’

মুন্নি বারান্দায় পোষা টিয়াপাখিটাকে ছোলা খেতে দিচ্ছিল, নানকুর আবদার শুনতে পেয়ে ডাকলঃ ‘এদিকে আয়, আশকারা নিয়ে যা, চা দিয়ে খাবি।’

বাচ্চাটা আদিত্যর হাত ছেড়ে বারান্দায় দৌড় লাগাল।

মা নীচু গলায় বলল, ‘চা খাবি তো?’

আদিত্য বিছানার পাশে দাঁড় করানো স্টিলের আলমারির আয়নায় নিজের চেহারা দেখছিল, বলল, ‘হ্যাঁ, দাও—।’

আলমারির পাশেই একটা ছোট টেবিলে বাবার ফটো। তাতে চন্দনের টিপ দেওয়া। সামনে রাখা ছোট্ট পিতলের থালায় তিন-চারটে সাদা ফুল। নয়নতারা। ওদের বাড়িতে ঠিক ছাদ নেই, তবে খাটো পাঁচিল ঘেরা ছাদের মতোই একটা ছোট জায়গা আছে। তার চার কোণের পিলার থেকে চারটে করে মরচে ধরা লোহার রড বেরিয়ে আছে। সেই ছাদের চাতালে গোটাপাঁচেক টবে কয়েকটা ফুলগাছ। মা আর মুন্নিই গাছগুলোর আদর-যত্ন করে। মা প্রতিদিনই খুব ভোরে ওঠে। ছাদে যায়। ফুল তুলে নিয়ে আসে বাবার ফটোতে দেওয়ার জন্য। চন্দন বেটে টিপ পরায়। এ যেন এক দেবপূজা। সেই পুজোর সময় ছবির মধ্যে থেকে সুপুরুষ অকালপ্রয়াত মানুষটা তার বিধবা বউকে দেখে। বয়েসকালে মা কম সুন্দরী ছিল না। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর তেরো বছরে মায়ের বয়েস ছাব্বিশ বছর বেড়ে গেছে। তার ওপর সাদা শাড়ি। সাদা জমিওয়ালা শাড়ি বরাবরই মায়ের দু-চক্ষের বিষ ছিল। এখনই সেই বিষ চব্বিশ ঘণ্টা গিলতে হচ্ছে।

মা ধীরে-ধীরে হেঁটে গেল চায়ের টেবিলের দিকে। ফ্লাস্কে চা ছিল। মা ভোরবেলা তৈরি করে ফ্লাস্কে ঢেলে রাখে। বাবার ছবির সামনে এক কাপ দেয়। বাবা চা ভালোবাসত। তারপর নিজে এক কাপ নেয়। রেডিয়ো শোনে, চায়ে চুমুক দেয়। এ-ঘরে টিভি আছে একটা। কিন্তু সেটা মা চালায় সন্ধেবেলা।

মায়ের ডাকে পিছন ফিরল আদিত্য। চা নিয়ে এসেছে মা। ধোঁয়া উঠছে এখনও। খুব কাছে মায়ের মুখ। চোখের চারপাশের ভাঁজগুলো চোখে পড়ল। শোকের কাটাকুটি খেলা। আদিত্য চা নিতেই নীচু গলায় মা জিগ্যেস করল, ‘তোর এত দেরি হল?’

চায়ে চুমুক দিল আদিত্য। বলল, ‘কী করব! হাটের দিনে রাস্তাটার কী অবস্থা হয় জানো তো? তার ওপর মহাদেবদার বাবার সঙ্গে রাস্তায় দেখা। টিউশানি খুঁজছিল—।’

মা আবার চলে গেল বিছানার কাছে। বসল বিছানায়। বিড়বিড় করে বলল, ‘ভদ্রলোকের কী আর উপায়! দেখার কেউ নেই। একটা ঘর ভাড়া দিলেও কিছু টাকার জোগাড় হতো। কিন্তু দেবে না। তা হলে নাকি বাড়ি হাতছাড়া হয়ে যাবে। মহাদেব আর এসে থাকতে পারবে না।’

আদিত্য কোনও জবাব দিল না। বিছানার প্রান্তে খবরের কাগজটা পড়েছিল। সেটা তুলে নিয়ে চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় গেল।

বারান্দার ডানদিকের রেলিঙে পাখির খাঁচাটা রাখা ছিল। খাঁচার সামনে নানকুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুন্নি। মাঝে-মাঝেই ‘ভক্তদাস, ভক্তদাস’ করে ডাকছে, আর পাখিটাও একই কথা শুনিয়ে দিচ্ছে উত্তরে। নানকু বারবার পাখিটার লাল ঠোঁটের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিচ্ছে। মুন্নি কোনওরকমে ওর হাতটা আটকাতে চেষ্টা করছে। বলছে, ‘কী হচ্ছে, নানকু, মার খাবি এবার!’

নানকু মুখ ঘুরিয়ে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না, মার খাব না, আশকারা খাব।’

আদিত্য বলল, ‘ওকে নামিয়ে দে, মুন্নি। ওর বোধহয় সত্যি-সত্যি খিদে পেয়েছে।’

মুন্নি কোল থেকে নামিয়ে দিয়েই বাচ্চাটা ‘জ্যাক অ্যান্ড জিল’ বলতে-বলতে ছুট লাগাল। মা বিছানা থেকে দুবার ওকে নাম ধরে ডাকল, কিন্তু ছেলেটা ভ্রূক্ষেপই করল না।

মুন্নি বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল। আর পাখিটা তখনও নিজের নাম বলে যাচ্ছে বারবার।

পাখিটা বাবা-ই কিনেছিল প্রায় চোদ্দো বছর আগে। এক পাখিওয়ালা এ-গলিতে পাখি ফিরি করতে এসেছিল। সে-ই মোটামুটি ঠকিয়ে ভালো দাম নিয়ে গছিয়ে দিয়ে যায় এই সাদামাটা টিয়াপাখিটা।

বাবা পাখিটাকে ভীষণ ভালোবাসত। নিয়ম করে খাওয়াত, যত রাজ্যের গল্প করত ওর সঙ্গে। আর পাখিটাও ‘কর-কর-কঁ-কঁ’ ইত্যাদি নানা আওয়াজ করে এদিক-ওদিক ঘাড় কাত করে সে-গল্প বোঝার চেষ্টা করত। বাবা পাখিটাকে বাইরে ছেড়ে রাখত। পাখিটা তখন ঘুরে বেড়াত বাবার পায়ে-পায়ে। বোধহয় ওর ডানা ভারী হয়ে গিয়েছিল, তাই উড়তে পারত না। বেড়ালের গন্ধ পেলেই চিল-চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করত। ঝাঁপিয়ে উঠে পড়ত বাবার কোলে।

বাবা-ই পাখিটার নাম রেখেছিল ‘ভক্তদাস’। কার ভক্ত, কারই বা দাস, কে জানে! আদিত্যর নামটাও বাবার রাখা। আর ছোটবেলায় নিজের নামটা বলতে গিয়ে ও নাকি ‘দিতু’ বলত। সেই থেকেই এই অদ্ভুত ডাক নামঃ ‘দিতু’। তবে প্রথম-প্রথম অদ্ভুত লাগলেও এখন গা সওয়া হয়ে গেছে।

আদিত্য চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে খবরের কাগজের পাতায় চোখ বোলাচ্ছিল। সাধারণত এই সময়ে গ্রীষ্মের রোদ বারান্দায় পৌঁছে যায়, কিন্তু বারান্দার বাঁ-দিক ঘেঁষে একটা মাধবীলতা গাছ থাকায় খানিকটা আড়াল পাওয়া যায়। এখন অবশ্য আড়ালের কোনও প্রয়োজন নেই। কারণ সূর্য মেঘে ঢাকা।

আদিত্য আড়চোখে মুন্নিকে দেখছিল। সকালবেলাতেই পরিপাটি করে সেজেছে। দিনরাত্তির বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। শুধু রোববার সকালটা ছাড়া। কারণ সপ্তাহে ওই একটা দিন মোহিতবাবুর ছেলে রজত ওদের বাড়ির বারান্দায় আর জানলার কাছে ঘোরাঘুরি করে। যেমন এখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ পড়ছে, অথবা পড়ার ভান করছে। আর মাঝে-মাঝেই নজর দিচ্ছে আদিত্যদের বাড়ির বারান্দার দিকে। মুন্নির দিকে।

রজত দুর্গাপুরে হোস্টেলে থেকে রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশুনো করে। আদিত্যর মতোই ইলেকট্রিক্যাল।

শনিবার বিকেলে বা রাতে বাড়িতে আসে রজত, আর সোমবার খুব ভোরে চলে যায়। ওদের বাড়িটা আদিত্যদের উলটোদিকে দ্বিতীয় সারিতে, একটু ডানদিক ঘেঁষে। চারতলা বাড়ি, সদ্য রং করা হয়েছে। রজত থাকে তেতলায়।

রজত ছেলে হিসেবে খারাপ নয়। ফরসা, চোখ-মুখ বেশ ধারালো, মাথার চুলগুলো কখনওই বশে থাকে না। কথা বলার সময় মাঝে-মাঝে নাকটানার অভ্যেস আছে।

আদিত্যর সঙ্গে আলাপ আছে রজতের। ওকে ‘দিতুদা’ বলে। বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারে। মুন্নির কাছাকাছি আসার ছুতোয় দু-একবার পড়া বুঝতেও এসেছে আদিত্যর কাছে।

কী করে ওদের দুজনের পরিচয় হল আদিত্য জানে না। পরিচয় কি সত্যিই হয়েছে? নাকি চোখের দেখা, এ-ওর দিকে তাকানো, ওইটুকু পর্যন্তই? মুন্নিকে ডেকে জিগ্যেস করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু সেটা…।

মুন্নি যদিও ভক্তদাসকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার ভান করছিল, ওর চোখ বারবার ছুটে যাচ্ছিল রজতের দিকেই। মুন্নিটার বিয়ে হয়ে গেলে বেশ হতো। পলাশ আর আদিত্য দুজনেই হালকা হতে পারত। আবার এ-ও ঠিক, এই সুন্দর ছোটবোনটা চলে গেলে বাড়িটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাবে। আদিত্য কল্পনায় সেই ফাঁকা বাড়িটা দেখতে পেল। ডাকল, ‘অ্যাই মুন্নি, শোন—।’

মুন্নি মুখ ফেরাল। ছোড়দাকে দেখল, বলল, ‘কী?’

আদিত্য চায়ের কাপে পরপর তিনটে চুমুক দিয়ে বলল, ‘একটা টিউশানি জোগাড় করে দিবি?’

মুন্নি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘কেন, দুটো টিউশানিতে তোর হচ্ছে না?’

‘না, তা না—।’

‘কী পড়াবি? ছাত্র, না ছাত্রী?’

মুন্নির সঙ্গে আদিত্যর বয়েসের তফাত প্রায় পনেরো-ষোলো বছর। কিন্তু কী করে যেন ওদের সম্পর্কটা পিঠোপিঠি ভাইবোনের মতো হয়ে গেছে।

আদিত্য ছোটবোনকে দেখছিল। কী সুন্দর দেখতে! মায়ের ছোটবেলার ফটো দেখেছে। সেই মুখটা যেন কেটে বসানো! ডান গালে একটা তিল। ঘন ভুরুর ওপরে নেমে আসা চুলের ঝালর, চঞ্চল চোখের পালক, কপালের টিপ, সব মিলিয়ে স্বপ্নের মতো। এই ছোটবোনটা কখনও যেন দুঃখ না পায়। যেন কোনও কষ্ট না আসে ওর জীবনে।

আদিত্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। মুন্নি আঙুল চালিয়ে কপাল থেকে চুলের ঝালর সরাতে চাইল। বলল, ‘কী দেখছিস হাঁ করে? বল, ছাত্র না ছাত্রী?’

আদিত্য হেসে বলল, ‘যে-কোনও একটা হলেই চলবে। আসলে আমার জন্যে নয়, মহাদেবদার বাবার জন্যে—।’

‘ও—’ ঠোঁট কামড়াল মুন্নি। বলল, তাহলে তো ইংরেজি—ঠিক আছে, জিগ্যেস করে দেখব। যদি খোঁজ পাই তোকে বলব।’

আদিত্য কয়েক চুমুকে বাকি চা-টুকু শেষ করে ফেলল। কাগজের হেডলাইনগুলোয় চোখ বুলিয়ে চলে গেল খেলার পাতায়। ফুটবল খেলোয়াড়দের দলবদলের বৃত্তান্ত পড়তে লাগল। হঠাৎই কোথা থেকে একঝলক ফুরফুরে বাতাস এল। আদিত্যর দু-হাতে মেলে ধরা খবরের কাগজ বেসামাল হয়ে গেল। সুনয়নার কথা মনে পড়ে গেল ওর। ওই মেয়েটাও যেন ওই রকম—দমকা হাওয়ার মতো। আজ সন্ধেবেলায় ওকে পড়াতে যাওয়ার কথা আছে।

সুনয়নাদের বাড়িটা খুব দূরে নয়। আদিত্যদের সরু গলি থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকে কিছুটা গেলে ফুটপাথের ওপরে একটা করপোরেশনের কল আছে। তার ঠিক সামনেই।

রোববার আর বুধবার সন্ধেবেলা ওকে পড়াতে যায় আদিত্য। ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়ে। সামনের বছরে পার্ট টু দেবে। কিন্তু কী করে পাশ করবে ঈশ্বর জানেন। পার্ট ওয়ানে অতি জঘন্য রেজাল্ট করেছে। পড়াশুনো ছাড়া আর সব বিষয়ে সুনয়নার আগ্রহের অন্ত নেই। যেমন, ওদের বাড়ির কাছে পায়রা বেশি কেন। প্রজাপতি দেখলে পরে দিন ভালো যায় কি না। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ কেমন করে জানানো হয়। টিভির অ্যানটেনায় সবসময় বিজোড় সংখ্যক এলিমেন্ট থাকে কেন। সত্যি, সুনয়নার জিজ্ঞাসার শেষ নেই।

মুন্নি হঠাৎই চলে গেল বারান্দা থেকে। আদিত্য দেখল, রজতকেও আর দেখা যাচ্ছে না।

সামনেই নরেনবাবুর বাড়ি। দোতলা, তবে অনেকটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে। বাড়িটা বেশ পুরোনো। তারই ভাঙা কারনিসে কয়েকটা কাক বসে আছে। ডাকছে এলোমেলো। একে গুমোট আবহাওয়া, তার ওপর কাকের ডাক। বৃষ্টি হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে নাকি?

মা বারান্দায় এল। বলল, ‘তুই খেতে যা। লতা ডাকছে।’

আদিত্য জিগ্যেস করল, ‘দাদা বেরিয়ে গেছে?’

এবং প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই দেখল ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরে পলাশ বাড়ি থেকে বেরোল। হাতে ফোলিও ব্যাগ, হাঁটছে হনহন করে। এয়ারপোর্টে পৌঁছতে ওর নির্ঘাত দেরি হয়ে যাবে।

মা বোধহয় আদিত্যর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল, কিন্তু আদিত্য সেটা খেয়াল করেনি। যখন খেয়াল করল তখন মা বলছে, ‘দিতু, আমার কাশিটা আবার বেড়েছে মনে হচ্ছে। বুকে খুব কষ্ট হচ্ছে। লতা বলছিল গরম জলে নুন ফেলে কুলকুচো করলেই ঠিক হয়ে যাবে—।’

আদিত্য খবরের কাগজটা ভাঁজ করে ফেলল। বলল, ‘টোটকা যা করতে চাও করো, তবে কাল তোমাকে ডাক্তারবাবুর কাছে দেখাতে নিয়ে যাব। তখন যেন না বোলো না।’

মায়ের কাশি বারো মাসের। তার ওপরে হাঁপানির টান। রোগা শরীর। খুব ধীরে-ধীরে হাঁটাচলা করে।

আদিত্য মাকে দেখছিল। মানুষটার জীবনের আর কতটুকুই বা অবশিষ্ট আছে! অঙ্কের হিসেবে একষট্টি বছর বয়েসটা হয়তো তেমন বেশি নয়, কিন্তু গত তেরো বছরে নানারকম অসুখ মাকে অসহায় করে দিয়েছে।

মাথার সামনেটা রুপোলি চুলে ঢাকা। গাল সামান্য ভাঙা। কয়েক বছর আগেও মা হাসলে এই গালে টোল পড়ত। এখনও হয়তো পড়ে, কিন্তু বোঝা যায় না। জরা কাউকে ক্ষমা করে না।

মায়ের চোখের চশমায় আলো চকচক করছিল। কীসব বিড়বিড় করল নিজের মনে।

আদিত্য বলল, ‘রান্না করবে না?’

মা অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল, ‘করব। একা মানুষের নিরামিষ রান্না আর কতক্ষণ লাগে!’

রান্না করা মায়ের নেশা ছিল। নিত্যনতুন রান্না খাইয়ে চমকে দিত বাবাকে। এখন চমকে দেওয়ার কেউ নেই।

আদিত্য মায়ের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। অজান্তেই ওর চোখ চলে গেল মায়ের হাতের দিকে। শাঁখাহীন কঙ্কালসার হাতে দু-গাছা সরু চুড়ি। তাতে দুটো সেফটিপিন ঝুলছে। মা সবসময় বলে, ‘এই চুড়ি দুটো তোর বউকে দিয়ে যাব। আর গলার হারটা মুন্নিকে। আমার তো নিজের বলতে আর কিছু নেই—।’

আদিত্যর হাসি পেল। চুড়ির সঙ্গে সবসময় সেফটিপিন থাকে। যেখানে-সেখানে বিঁধে যেতে চায়। মা জানে না।

সকালবেলার ঘোলাটে আলোয় মা নিথর মূর্তির মতো বারান্দার দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। সেই মুহূর্তে চুপিচুপি কে যেন একটা কারুকাজ করা চন্দন কাঠোর ফ্রেম মায়ের মুখের সামনে ধরল। আদিত্যর নাকে ধূপের গন্ধ ভেসে এল। ওর গলার কাছটা খুশখুশ করে উঠল আবার। গলায়, বুকে, একটা কষ্ট হল।

দুই

বিকেলবেলা ঘুম ভাঙতেই অবাক হয়ে গেল আদিত্য।

এরকম বিকেল আগে কখনও ও দেখেনি।

বটতলা থেকে আড্ডা মেরে ফিরে স্নান করে খেয়েদেয়ে একটু গড়িয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু কখন ঘুম এসে গেছে টের পায়নি। ঘুম ভাঙতেই গলির দিকের জানলায় নজর গেছে ওর। একইসঙ্গে ঘড়িও দেখেছে। সাড়ে চারটে। কিন্তু এই সময় তো জানলায় একফালি বিকেলের রোদ এসে পড়ার কথা!

খানিকটা অবাক হয়েই বিছানা ছেড়ে শ্লথ পায়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ও। তারপর রীতিমতো ঘাবড়ে গেছে।

এক অদ্ভুত ধোঁয়াশায় চারদিক ছেয়ে গেছে। হালকা বাদামি রঙের ধোঁয়া। কোথাও গাঢ়, কোথাও বা সামান্য পাতলা। তারই মধ্যে খুব ধীরে খেলা করছে ধোঁয়াশার স্রোত। চোখ যেন খুব সামান্য জ্বালা-জ্বালা করছে মনে হল। কিন্তু উনুনের ধোঁয়ার মতো অত সাংঘাতিক নয়।

দোতলা থেকে ভক্তদাসের চিৎকার শুনতে পেল আদিত্য। বেড়াল দেখতে পেলে বা তার গায়ের গন্ধ পেলে যেরকম চেঁচায়, অনেকটা সেইরকম।

তাড়াতাড়ি জামা-প্যান্ট পরে নিল আদিত্য। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে কলতলায় হাতমুখ ধুয়ে নিল। হাতে হাত ঘষতে-ঘষতে উঠে এল দোতলায়। ডানদিকে দাদার ঘরের দরজা। সেদিকে একপলক তাকিয়ে ও মায়ের ঘরে গেল। এ-ঘরে মা আর মুন্নি শোয়। আর কখনও-কখনও নানকু।

মুন্নি ঘরের আলো জ্বেলে খাটের ওপরে বসে দুলে-দুলে কী পড়ছিল। মা টিভিটা অন করে নব ঘোরাচ্ছিল। সেট থেকে শুধুই হিজিবিজি শব্দ হচ্ছিল, আর পরদায় একইরকম ছবি।

আদিত্য বিরক্তভাবে বলল, ‘কী করছ? এখন কোনও প্রোগ্রাম আছে নাকি?’

মা টিভির সুইচটা অফ করে দিয়ে বলল, ‘না, হঠাৎই শীতের মতো কুয়াশা হল, তাই দেখছি খবরে কিছু বলে কি না—।’

আদিত্য বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে মুন্নিকে জিগ্যেস করল, ‘মুন্নি, তোর চোখ জ্বালা করছে?’

মুন্নি পড়া থামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, অল্প-অল্প। তোর?’

আদিত্য বলল, ‘হ্যাঁ, আমারও।’

ভক্তদাসের খাঁচাটা সকাল-বিকেল বারান্দার রেলিঙে এনে রাখা হয়। আদিত্য দেখল, পাখিটা অস্বাভাবিক ছটফট করছে। আর ডেকে উঠছে থেকে-থেকেই।

মা চা তৈরি করে রেখেছিল। আদিত্যকে জিগ্যেস করল, ‘চা খাবি?’

আদিত্য বলল, ‘না, একটু বেরোব। নয়নাদের বাড়ি পড়াতে যাব। তা ছাড়া ব্যাপারটা কী সেটা একটু খোঁজখবর করে দেখি।’

মা পরপর কয়েকবার কাশল। ফরসা মুখ লালচে হয়ে গেল। মুন্নি তখন আবার পড়ায় মন দিয়েছে।

ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে আদিত্য জিগ্যেস করল, ‘দাদা ফিরেছে?’

মুন্নি বলল, ‘না—।’

আদিত্য আর দাঁড়াল না। চটির ফটাফট শব্দ তুলে সিঁড়ি নামতে শুরু করল।

গলিতে বেরিয়ে মনে হল ধোঁয়াশাটা যেন একটু ফিকে হয়েছে। সাধারণত এই সময়ে খোকন, তোতা ওদের বল পেটাপিটি শুরু হয়ে যায়, কিন্তু এখন ওদের দেখতে পেল না আদিত্য। আর বলের শব্দও শুনতে পেল না।

ধোঁয়াশার ভেতর দিয়ে ছ’-সাত ফুট পর্যন্ত আবছা দেখা যাচ্ছিল। তাতেই আদিত্য অস্পষ্টভাবে দেখল, আশপাশের বাড়িগুলোর দরজায়, ছাদে, বারান্দায় বেশ ভিড়ই বলতে হবে। কথাবার্তার শব্দও কানে আসছে। মেঘে ঢাকা সূর্যের কুয়াশা-ভেদ-করা ঘষা আলো চারপাশের বাস্তব জগতটাকে কেমন যেন অবাস্তব করে দিয়েছে।

আদিত্য গলির মোড়ের দিকে পা চালাল। মাথা উঁচু করে থাকা ইট বা পাথরে বারদুয়েক হোঁচট খেল।

গলির মোড়ে বাঁ-দিকে ঘুরলেই একটা ছোট চায়ের দোকান। সেখানে বিকেলবেলা এমনিতেই একটা জটলা থাকে—আজ সেটা আরও বেশি।

ক’দিন আগেই খবরের কাগজে কম্পিউটারে ভোট দেওয়ার ব্যাপার নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়েছিল। ব্যালট বাক্স বলে কোনও বস্তু আর থাকছে না। পাঁচবছর আগেই দেশের প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে গোপন নম্বর দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাকে বলা হয় সিটিজেন কোড নম্বর বা সংক্ষেপে সি সি এন। এই নম্বর আর ফটোগ্রাফ নিয়ে তৈরি হয়েছে আইডেন্টিফিকেশান কার্ড। এখন ভোটকেন্দ্র বলতে স্রেফ কম্পিউটার টার্মিনাল। যে-কোনও ভোটার সেখানে গিয়ে কিবোর্ডে নিজের গোপন কোড নম্বরটা পাঞ্চ করবে। নম্বরটা পাসওয়ার্ডের মতো। টাইপ করলেও কম্পিউটারের টিভি পরদায় দেখা যাবে না, তবে কাজ হবে। তখন কম্পিউটার ভোটারের নাম জানতে চাইবে। নাম ও কোডনম্বর যদি ঠিক-ঠিক খাপ খায় তা হলেই কিবোর্ডের নির্দিষ্ট বোতাম টিপে ভোটার ভোট দিতে পারবে। তা না হলে হাজার বোতাম টিপলেও কম্পিউটার তাকে ভোট দিতে দেবে না। আর ভোট চলবে তিনদিন ধরে। সুতরাং তাড়াহুড়োর কোনও ব্যাপার নেই। তা ছাড়া রিগিং ইত্যাদিও অকেজো হয়ে যাবে।

আর মাত্র দশদিন পরেই ভোট। সুতরাং হঠাৎই এই কম্পিউটার-নির্ভর ভোটের ঘোষণা অনেককেই চমকে দিয়েছিল। আর তাই নিয়ে এই চায়ের দোকানে কম জল্পনা-কল্পনা হয়নি। যাতায়াতের পথে টুকরো-টুকরো কথাবার্তা আদিত্যর কানে গেছে। কিন্তু স্পষ্টই বোঝা গেল, আজকের এই মুহূর্তের বিষয় ধোঁয়াশা।

জটলার মধ্যে শঙ্করবাবুকেও দেখতে পেল আদিত্য। গায়ে সাদা শার্ট আর হাঁটু পর্যন্ত ধুতি। দু-হাত পিছনে রেখে গম্ভীরভাবে সকলের মতামত শুনছেন। আদিত্যকে দেখতে পেলেন। এগিয়ে এসে কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামলে নিলেন নিজেকে। শুধু ঘোলাটে দু-চোখে কাতর অনুনয় ফুটে উঠল।

আদিত্য দূর থেকেই সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ, মনে আছে ওর। ভোলেনি।

বয়স্ক মানুষের দল এই কুয়াশা বা ধোঁয়াশা নিয়ে যতই মাথা ঘামাক আদিত্যর মনে হল, ব্যাপারটা মোটেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। ধোঁয়া ধুলোয় এরকম তো হতেই পারে! গলা খুসখুস করে উঠল, কিন্তু ও সেটাকে আমল না দিয়ে সুনয়নাদের বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

ওদের বাড়ির কাছে যে-করপোরেশনের কলটা আছে সেখানে দুজন লোককে দেখল আদিত্য। চোখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। সত্যি, মানুষের আতঙ্ক যে কতরকমের হতে পারে! এই তো, বছর-পঁচিশ আগে, ১৯৮০ সালে, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ নিয়ে কী কাণ্ডটাই না হল! প্রচারের ফলে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছিল যে, সেদিন রাস্তাঘাট ফাঁকা ধুধু করছে। আদিত্য তখন স্কুলে পড়ে, ক্লাস থ্রিতে। কিন্তু ওর মনে আছে। বাবা সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য একজোড়া কালো কাচ জোগাড় করেছিল। রাস্তায় বেরিয়ে দেখেছিল পূর্ণগ্রাস। আদিত্য আর পলাশকেও দেখিয়েছিল। অথচ প্রচারের দাপটে বেশিরভাগ মানুষেরই ধারণা হয়েছিল, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা মানেই পরলোকের পাসপোর্ট হাতে নেওয়া।

হাসি পেয়ে গেল আদিত্যর। আপনমনে হাসতে-হাসতেই সুনয়নাদের বাড়ির কলিংবেলের বোতাম টিপল ও।

রাস্তা দিয়ে কয়েকটা গাড়ি চলে গেল। হেডলাইট জ্বলছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও গতি অত্যন্ত ধীর। ফুটপাথের ধারে ডক্টর মণ্ডলের চেম্বারের সামনে একদল ছেলে আড্ডা মারছে। অবয়বগুলো বোঝা গেলেও এখান থেকে চেনা যাচ্ছে না।

চোখ ফেরাতেই চমকে উঠল। সুনয়না। সবুজ-সাদা-কালোয় ছাপা ম্যাক্সির মতন কী একটা পোশাক পরে আছে। কোমরে একজোড়া বেল্ট। চকচকে আংটা লাগানো।

‘দেখছিলাম, কতক্ষণ অন্যমনস্ক থাকতে পারেন।’ নয়না হাসল, বলল, ‘ভেতরে আসুন—’ একটু থেমে আবার, ‘নাকি কুয়াশার জন্যে পড়া থেকে ছুটি?’

আদিত্য ভেতরে ঢুকতে-ঢুকতে বলল, ‘এখন পড়াতে আসিনি। সবে তো সওয়া পাঁচটা বাজে!’

নয়না দরজা বন্ধ করছিল আবার। হেসে মন্তব্য করল, ‘আজ না হয় এক-দেড়ঘণ্টা বেশিই পড়ালেন। বাবাকে বললেই মাইনে বাড়িয়ে দেবে—।’

আদিত্য সুনয়নাকে দেখল। কী একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। তারপর ঘরের কোণে চটিজোড়া ছাড়তে-ছাড়তে নীচু গলায় বলল, ‘তোমার ইকনমিক্স নিয়ে পড়া উচিত ছিল।’

সুনয়না ভুরু কপালে তুলে বলে উঠল, ‘ও মা! কী সর্বনেশে কথা, দিতুদা! তখন তা হলে আমাকে পড়াত কে?’ তারপর একটু যেন চিন্তা করে বলল, ‘অবশ্য আপনার কোনও অসুবিধে হতো না। কমলি তো ফিজিক্স নিয়ে পড়ে—ওকে পড়াতেন। বেচারা সবসময় আপনার কথা বলে—।’

আদিত্য গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল, ‘কী হচ্ছে, নয়না!’

নয়না হাসল। সুন্দর ছোট-ছোট দাঁত দেখা গেল ওর। বলল, ‘এখনও বোঝেননি কী হচ্ছে! বাংলায় এর নাম ফাজলামি। বানান করে দেব?’

আদিত্য দম ছেড়ে মাথা নাড়ল হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে।

ঠিক তখনই নয়নার মা ঘরে এলেন। গোলগাল গিন্নিবান্নি চেহারা। বড় মাপের সিঁদুরের টিপ কপালে। ফরসা গালে সবে দু-একটা ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। রগের কাছে কয়েকটা রুপোলি চুল।

ভদ্রমহিলা মিষ্টি গলায় আদিত্যকে বসতে বললেন।

ঘরের এক কোণে একটা টেবিল। তার দু’পাশে দুটো চেয়ার। নয়না এখানে বসেই আদিত্যর কাছে পড়ে।

টেবিলের কাছ থেকে খানিকটা দূরে একটা লম্বা সোফা। বাদামি ভেলভেটের ঢাকনা দেওয়া। তার ওপরে দুটো-তিনটে ম্যাগাজিন আর একটা টিনটিনের বই।

আদিত্য মোজেইক করা মেঝেতে পা ফেলে দেওয়াল ঘেঁষা চেয়ারটায় গিয়ে বসল। তারপর মা ও মেয়েকে দেখল। কত আলাদা!

সুনয়নার বয়কাট চুল। গলা লম্বা। থুতনি সামান্য উঁচিয়ে দাঁড়ানো অভ্যেস। ফলে একটা উদ্ধত ভাব ফুটে উঠেছে। চোখ ছোট হলেও গভীর। কপালে বাঁদিকে একটা তিল রয়েছে। চোয়াল চওড়া, শক্ত। ঠোঁট পাতলা অথচ সবসময়েই যেন অভিমানে ফুলে আছে।

সুনয়না আদিত্যর উলটোদিকের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ডিসটেম্পার করা গোলাপি দেওয়ালের পটভূমিতে ওকে পোস্টারের মতন দেখাচ্ছে। আর ওর শ্যাম্পু করা চুলের ওপরে ঝুঁকে রয়েছে গাঢ় বাদামি রঙের দুটো ল্যাম্পশেড।

নয়নার মা সুইচ টিপে ঘরের টিউব লাইটটা জ্বেলে দিলেন। এবার স্পষ্ট বোঝা গেল, কুয়াশার খানিকটা ঘরের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে।

সুনয়না হঠাৎই ভেতরে চলে গেল। আদিত্য ওর চলে যাওয়া দেখল। তারপর আলতো গলায় বলল, ‘মাসিমা, আপনার চোখ জ্বালা করছে? কাশি পাচ্ছে?’

ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়েই ছিলেন। বললেন, ‘না তো, তেমন কিছু না।’ তারপর টেনে ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করলেন যেন।

টেবিলে নয়নার কয়েকটা বইখাতা অগোছালোভাবে পড়ে ছিল। উনি সেগুলো ঠিক করে সাজিয়ে দিতে লাগলেন।

ঘরের জানলাগুলো সব বন্ধ। জানলায় সুন্দর-সুন্দর পরদা। দেওয়ালে তিনটে বাঁধানো ছবি ঝুলছে। একটি বালক শ্রীকৃষ্ণ, আর দুটো প্রকৃতির ছবি—সবুজ আর নীলে মাখামাখি। শেষ ছবি দুটোর মধ্যে ইংরেজিতে ক্যাপশন লেখা রয়েছে। প্রথমটায় লেখা, ‘টুডে ইজ দ্য ডে’। আজই সেই দিন। আর দ্বিতীয়টায় লেখা, ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড নেচার’। ঈশ্বর প্রকৃতি সৃষ্টি করিলেন।

ঘরের মধ্যে মানানসই বুক কেস রয়েছে একটা। দেওয়ালে বসানো। তার নীচের তাকে ছোট রঙিন টিভি। লেসের কাজ করা সুন্দর কাপড়ে ঢাকা। আদিত্যের মনে হল, ঘরের সাজসজ্জায় আর্থিক সচ্ছলতা লুকিয়ে রাখার কোনও চেষ্টা নেই।

সুনয়নার বাবা সুখেন্দু দত্ত এ-পাড়ার বহু বছরের বাসিন্দা। ইলেকট্রনিক জিনিসপত্তরের ব্যাবসা করেন। চাঁদনি চকে বেশ বড় দোকান। প্রায়ই সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান যাতায়াত করেন ব্যবসার কাজে। সুনয়না ওঁদের একমাত্র মেয়ে। ওর জন্য আপাতত যা করেছেন তাই অনেক। এই প্রকাণ্ড তিনতলা বাড়ি। দুটো গাড়িঃ একটা মারুতি ২০০০, আর অন্যটা মারুতি জিপসি। নিজের বাড়িতেই বড় গ্যারেজ, এ ছাড়া সল্টলেকেও চারকাঠা জমি কেনা আছে। আর আদি সপ্তগ্রামে প্রকাণ্ড বাগানবাড়ি।

সুনয়নাই এসব খবর দিয়েছে আদিত্যকে। ওকে আদিত্য পড়াচ্ছে আজ প্রায় দেড় বছর। কিন্তু কখনও ওর মধ্যে বাড়তি অহংকার লক্ষ করেনি। ওর বাবার সঙ্গে কদাচিৎ দেখা হয় আদিত্যর। আর দেখা যদিও বা হয়, কথা তেমন হয় না। বেশিরভাগ সময়ে সুখেন্দুবাবু শুধু একটা কথাই বলেন, ‘কী, নয়না ঠিকমতো পড়ছে তো?’ আর আদিত্যও ঘাড় নেড়ে বলে, ‘হুঁ—’। এখানেই যাবতীয় আলাপের শেষ।

সুখেন্দুবাবুর বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি। চুল বেশ কাঁচাপাকা। চোখে শৌখিন ফ্রেমের চশমা। দেখলে রাশভারী বলে মনে হয়। তবে আদিত্যর সঙ্গে যখনই হিসেবের বাইরে কথা বলেছেন তখনই ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেছেন। এটা আদিত্যর অদ্ভুত লেগেছে। তবে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য এই পদ্ধতিটা বেশ কাজের। যদিও সুনয়নার মা এই দূরত্ব বজায় রাখেননি।

নয়নাকে পড়িয়ে আদিত্য যা মাইনে পায় সেটা ও কাউকে সহজে বলে না। কারণ, বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। সপ্তাহে দু-দিন পড়িয়ে একহাজার টাকা, এটা বিশ্বাস না করারই মতো।

সুনয়নার মা বইপত্র গোছগাছ করে সবে সুস্থির হয়েছেন, এমনসময় মেয়ে যেন হাওয়ায় ভেসে ঘরে ঢুকল।

পোশাক পালটে ফেলেছে এরই মধ্যে। দিনের মধ্যে কতবার যে ও পোশাক বদলায় তার কোনও হিসেব নেই। সেইসঙ্গে মুখেও বোধহয় পাউডার-ক্রিম কিছু একটা ঘষে থাকবে—অন্তত আদিত্যর তাই মনে হল।

ওর এখনকার পোশাকটা কাটছাঁটে আগেরটার মতোই। তবে রং অনেক ফিকে। হালকা নীল। তার ওপরে ছোট-ছোট হলদে ফুলের নকশা।

‘মা-মণি, টিভিতে নাকি স্পেশাল নিউজ হচ্ছে।’ বলেই টিভির সুইচটা অন করে দিল সুনয়না। ভলিয়ুম কন্ট্রোলের নবটা ডানদিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘আমি দোতলায় ড্রেস চেঞ্জ করছিলাম, সোনালি ও-বাড়ির বারান্দা থেকে ডেকে বলল।’

সোনালি হয়তো পাশের বাড়ির বন্ধু-টন্ধু কেউ হবে। নয়নার বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

নয়নার মায়ের ভুরু কুঁচকে উঠেছিল। তিনি সোফার দিকে সরে গেলেন। কিছুটা দূরত্ব থেকে টিভির ছবি দেখবেন। আর নয়না এসে আদিত্যর সামনের চেয়ারটায় বসল, বসে বলল, ‘দিতুদা, আপনার গার্ড হচ্ছে না তো?’

আদিত্য মাথা নেড়ে জানাল, না। ততক্ষণে টিভি সরব হয়ে গেছে।

‘…তবে আবহাওয়া দপ্তরের অধিকর্তা জানিয়েছেন, এই ধোঁয়াশায় ভয়ের কিছু নেই। তাঁরা ল্যাবরেটরিতে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করে দিয়েছেন, আগামীকালই সেসব পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবেশ দপ্তরের জনৈক মুখপাত্র বলেছেন, বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে যে-কালো বৃষ্টি হচ্ছে, তার সঙ্গে এই ধোঁয়াশার কোনও সম্পর্ক নেই। হয়তো কোথাও মাটি খোঁড়ার কাজ চলেছিল। তারপর ঝোড়ো বাতাসে ধুলোর ঝড় উঠে এই অবস্থা হয়েছে। বিষয়টা তদন্ত করে দেখার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের আবেদন জানানো হয়েছে।

‘মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের জনগণকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করেছেন। কোনওরকম গুজবে তাঁরা যেন কান না দেন। তিনি আরও বলেছেন, গুজব রটনাকারীদের সন্ধান পেলে তাদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।

‘এ-পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে এই ধোঁয়াশা কলকাতার সীমাবদ্ধ এলাকাতেই শুধু লক্ষ করা গেছে। দক্ষিণে যাদবপুর, উত্তরে বরানগর, পশ্চিমে গঙ্গা, আর পুবে সি. আই. টি. রোড ও ইস্টার্ন বাইপাস—এই হল মোটামুটি এর সীমানা। তবে বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর নিশ্চিতভাবে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এই ধোঁয়াশা মানুষের পক্ষে মোটেই ক্ষতিকর নয়। এই প্রসঙ্গে তাঁরা লন্ডন ও লস এঞ্জেলেসের ধোঁয়াশার কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৫২ সালের ডিসেম্বর মাসে ৫ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত লন্ডনে এক ধোঁয়াশা দেখা দেয়। তারও আটবছর আগে আমেরিকার লস এঞ্জেলেসের প্রায় একইরকম ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু কলকাতার এই হালকা ধোঁয়াশা তার তুলনায় নিতান্তই নিরীহ। বিজ্ঞানীরা এ-কথায় জোর দিয়ে বলেছেন, আবহমণ্ডলের টোপোস্ফিয়ার অঞ্চলের কয়েকটি স্তরে বায়ুচাপের সামান্য তারতম্য ঘটায় এই ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের বিশ্বাস, কাল সকাল ছ’টার মধ্যেই আবহাওয়া আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

‘কলকাতা দূরদর্শন থেকে প্রচারিত বিশেষ সংবাদ বুলেটিন এখানেই শেষ হল। প্রয়োজন হলে পরবর্তী বিশেষ সংবাদ বুলেটিন প্রচার করা হবে…নমস্কার…।’

চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে টিভির সুইচটা অফ করে দিল সুনয়না। হেসে বলে উঠল, ‘কী থ্রিলিং, না দিতুদা?’ তারপর আবার চেয়ারে এসে বসে পড়ল।

আদিত্য কোনও জবাব দিল না।

সুনয়নার মা খবর শুনতে-শুনতে কখন যেন সোফায় বসে পড়েছিলেন। একটু কেশে বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, কী বলো আদিত্য?’

আদিত্যর মনে হল, ভদ্রমহিলা ওর কাছে যেন ভরসা চাইছেন। ও নীচু গলায় বলল, ‘না-না, দেখবেন কাল সকালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ভদ্রমহিলা আপনমনেই কীসব বিড়বিড় করলেন। তারপর থেমে-থেমে বললেন, ‘নয়নার বাবা গতকাল টোকিও রওনা হয়েছে। প্রায় সাত-আট দিন বাদে ফিরবে। এ সময় যদি হুট করে কিছু হয়…তার ওপর সামনে ভোট…।’

আদিত্য বুঝল, ভদ্রমহিলা কোনও একটা উত্তর আশা করছেন, কিন্তু ও কোনও জবাব দিল না। লক্ষ করল, সুনয়না ওর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। সেই মুখে অস্পষ্টভাবে কয়েকটা ঘামের ফোঁটা দেখা গেল যেন। উনি শ্রীকৃষ্ণের ফটোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কপালে হাত বুলিয়ে ঘাম মুছে নেওয়ার ভান করলেন। সুনয়না হেসে বলল, ‘মা-মণি, “শোলে” ছবিতে গববর সিং কী বলেছে মনে আছে? জো ডর গয়া, সমঝো কে মর গয়া।’ শেষের কথাটা ও হিন্দি ছবির সংলাপ বলার মতো নাটকীয় ঢঙে উচ্চারণ করল।

আদিত্য বলে উঠল, ‘কী হচ্ছে, নয়না!’ তারপর ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলেন, এসব হচ্ছে গাদাগুচ্ছের ভিডিয়ো ক্যাসেট দেখার ফল—।’

ভদ্রমহিলা হেসে ফেলেছিলেন। ছোট্ট করে ‘ফাজিল’ বলে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন।

আর তখনই ট্রে-তে দু-কাপ চা ও কয়েকটা নোনতা বিস্কুট নিয়ে একজন পরিচারক ঘরে এল। ট্রে-টা নামিয়ে রাখল টেবিলে। তারপর, চলে যাওয়ার আগে, বলে গেল, ‘দিদিমণি, আপনার ফোন এসেছে—’

‘দিতুদা, আপনি চা খান, আমি এক্ষুনি আসছি। নিশ্চয়ই মোনালিসার ফোন, অপটিক্স-এর ক্লাসনোটগুলো চাইবে—।’

নয়না চলে যেতেই চায়ের কাপ তুলে নিল আদিত্য। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তখনই ওর খেয়াল হল, ধোঁয়াশা প্রায় কেটে গেছে। ওর ইচ্ছে হল, জানলা খুলে বাইরের অবস্থাটা একবার দ্যাখে, কিন্তু কেমন যেন ক্লান্তি টের পেল শরীরে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। ঘুম পাচ্ছে নাকি?

আদিত্য সাততাড়াতাড়ি চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই বুঝল জিভের ডগা পুড়ে গেছে।

সুনয়না এসে ঢুকল দমকা বাতাসের মতো। বলল, ‘যা বলেছি তাই, মোনালিসার ফোন। ও ভীষণ সিরিয়াস।’ তারপর প্লেট থেকে দুটো বিস্কুট তুলে নিয়ে কামড় দিল। চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিল তাতে।

আদিত্য আড়চোখে তাকাল হাতঘড়ির দিকে। প্রায় পৌনে ছ’টা। ওর ইচ্ছে হল, একবার ছাদে যায়। আকাশটা কেমন লাগছে এখন?

প্রস্তাবটা নয়নাকে দিতেই ও এককথায় রাজি। সুতরাং চায়ের কাপ হাতে সোজা ছাদের দিকে।

ছাদে গিয়ে আকাশ-বাতাসের অবস্থা দেখে বিচলিত হল আদিত্য। অথচ খবরে বলা হয়েছে ব্যাপার তেমন গুরুতর নয়। অবশ্য আদিত্য নিজেও তা মনে করেনি। কিন্তু এখন, এই তিনতলার ছাদে দাঁড়িয়ে এবং পশ্চিমের আকাশ-রেখার দিকে তাকিয়ে, ও যেন একটা আলতো ধাক্কা খেল।

বাদামি ধূসর ধোঁয়াশার এক বিশাল ওড়না যেন কোনও অদৃশ্য হাত বিছিয়ে দিয়েছে গোটা শহরের শরীরে। অকালসন্ধ্যায় ঝাপসা পাখিরা ডানায় ভেসে উড়ে যাচ্ছে আস্তানার দিকে। এক ম্লান কনে-দেখা আলো ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। আর পশ্চিমের লাল সূর্যের ছবি যেন ঘষা কাচের মধ্যে দিয়ে দেখা, রহস্যময়।

সুনয়না বলল, ‘আকাশটা কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে।’

আদিত্য চায়ের কাপে চুমুক দিল। দেখল নয়নাকে। ও অনেকটা দূরে। ঝাপসা দেখাচ্ছে ওকে। নয়নাদের ছাদ মাপে বেশ বড়। ছাদের পুবদিকের পাঁচিলে লম্বালম্বিভাবে মাটি ফেলে গাছ লাগানোর আয়োজন করা হয়েছে। তাতে নানারকম ফুলগাছ। আদিত্য গাছগুলোর কাছে গেল। সবুজ পাতাগুলো কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে জল পায়নি।

নয়না কখন যেন আদিত্যর খুব কাছে এগিয়ে এসেছিল। আদিত্যর থমথমে মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে-ধীরে বলল, ‘দিতুদা, কী হল?’

আদিত্য মাথা তুলে আকাশের দিকে দেখল। আকাশের একটা দিক কালচে দেখাচ্ছে। বৃষ্টি হবে নাকি? টিভির খবরের কথাগুলো মনে পড়ছিল আদিত্যরঃ ‘…এই ধোঁয়াশায় ভয়ের কিছু নেই…এই ধোঁয়াশা মানুষের পক্ষে মোটেই ক্ষতিকর নয়…।’

সুনয়না আবার বলল, ‘কী হল, দিতুদা?’

আদিত্য আকাশ থেকে ছাদে নেমে এল। অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই…।’

ঠিক সেই মুহূর্তে বড়-বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল আদিত্যর গায়ে। আদিত্য অবাক হয়ে দেখল, ওর সাদা পাঞ্জাবিতে ফোঁটাগুলো চিতাবাঘের গায়ের মতো কালো চাকা-চাকা দাগ তৈরি করেছে।

সুনয়না অবাক হয়ে এই অদ্ভুত কালো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখছিল, কিন্তু প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ওর হাত ধরে আদিত্য এক হ্যাঁচকা টান মারল। বলল, ‘নয়না, জলদি—!’

তারপর ওরা দুজনে ছুটতে শুরু করলে ছাদের সিঁড়ির দিকে।

তখনই চায়ের কাপ দুটো ছিটকে পড়ল ছাদে। ভেঙে গেল ঝনঝন শব্দে।

নিরাপদ আশ্রয়ে এসে আদিত্য টের পেল, ওর গালেও বৃষ্টির দু-একটা ফোঁটা পড়েছে।

ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে আদিত্য পড়াতে বসল নয়নাকে। কিন্তু দুজনের কেউই মন বসাতে পারছিল না। ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ থাকলেও বাইরের বৃষ্টির শব্দ ওরা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।

কলকাতায় বৃষ্টি হচ্ছে। কালো বৃষ্টি। এই প্রথম।

তিন

আদিত্যর সারা মাথা, গা, ধীরে-ধীরে ঢেকে যাচ্ছিল কালো রঙে। কালো চটচটে এক আঠালো তরল, সাপের শরীরের মতো পিছল। ওর মুখ-হাত-পা জ্বালা করছিল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল একটু-একটু করে।

ও আকাশের দিকে তাকাল। ধোঁয়াটে আকাশে কালো রঙের সূর্য। কী অদ্ভুত! সূর্যটা ধীরে-ধীরে গলে গিয়ে তরল ফোঁটা টপটপ করে ঝরে পড়ছে আদিত্যর গায়ে।

আদিত্য চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু তখনই দূরে মুন্নিকে দেখতে পেল ও। মেয়েটা অবাক চোখে আদিত্যর বিচিত্র চেহারা দেখছে। দেখতে-দেখতে কিশোরীর দু-চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল। আদিত্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। শুয়ে পড়েছিল মেঝেতে। দৌড়ে ওর কাছটিতে এসে মুন্নি ওর ওপরে প্রায় ঝুঁকে পড়ে বিস্ফারিত চোখে ওকে দেখতে লাগল। ডুকরে উঠে কয়েকবার ডাকল, ‘ছোড়দা! ছোড়দা!’ তারপর মুখে হাত গুঁজে রক্ত হিম করা চিৎকার করে উঠল। একবার। দুবার। বারবার।

মুুন্নির ভয়ঙ্কর চিৎকারে আদিত্যর কানের পরদা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যেতে লাগল।

আর তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল আদিত্যর।

এবং সঙ্গে-সঙ্গেই শুনতে পেল কোনও মেয়ের গলায় তীব্র চিৎকার। সে চিৎকারে শোক দুঃখ, আশঙ্কা এবং উলঙ্গ আতঙ্ক মিশে রয়েছে। চিৎকারটা একটানা বেশ কয়েক সেকেন্ড ধরে হওয়ার পর থামল। তারপর আবার শুরু হল। থামল। আবার…।

আদিত্য স্পষ্ট বুঝতে পারল চিৎকারটা আসছে দোতলা থেকে। কিন্তু গলার স্বর কেমন বিকৃত হয়ে পড়ায় চিৎকারের মালিককে ও শনাক্ত করে উঠতে পারছিল না।

গতকালের কথা মনে পড়ল ওর। আর সেইসঙ্গে এইমাত্র দেখা ভোরবেলার স্বপ্নটার কথা।

কাল বৃষ্টি চলেছিল প্রায় একঘণ্টা ধরে। বৃষ্টির শেষে জানলা খুলে রাস্তায় উঁকি মেরেছিল আদিত্য। ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে পরিবেশ তখন পরিষ্কার। কিন্তু রাস্তাটা কালো চকচকে হয়ে গেছে, ময়াল সাপের মতো। রাস্তায় লোকজনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল। আদিত্য তার একবর্ণও বুঝতে পারছিল না। কিন্তু ওর মনে হল, এ-আলোচনা সামনে হাজির হওয়া ভোট নিয়ে নয়।

নয়না টিভি চালিয়েছিল। তাতে অনেকক্ষণ ধরে প্রচারিত হল বিশেষ সংবাদ বুলেটিন। বক্তব্যের রকমফের কিছু হয়নি। তবে জনগণকে সাবধান ও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। একজন আবহবিজ্ঞানী ও একজন পরিবেশবিজ্ঞানীর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হল। সেই সাক্ষাৎকারের শেষে আদিত্যর মনে হল, প্রথম সংবাদ বুলেটিন প্রচারিত হওয়ার সময় যতটা জোর দিয়ে সবাইকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলা হয়েছিল, এখন তার অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে।

সাক্ষাৎকারে প্রথমে আলোচনা করা হল ধোঁয়াশা নিয়ে। তাঁরা বললেন, পরীক্ষা করে আপাতত যা জানা গেছে তাতে কলকাতার এই ধোঁয়াশা ‘ফটোকেমিক্যাল স্মগ’ বা আলোক-রাসায়নিক ধোঁয়াশা। যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়ায় যে-নাইট্রিক অক্সাইড আর হাইড্রোকার্বন থাকে, সূর্যের আলোর ক্রিয়ায় তা থেকে তৈরি হয় এক জটিল মিশ্রণ। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল ‘প্যান’ বা পারক্সি-অ্যাসিটাইল নাইট্রেট। এ ছাড়া রয়েছে ওজোন। ওজোন গ্যাস গাছের পাতায় ঢুকে পড়ে প্যালিসেড কোষকে আক্রমণ করে। ফলে ক্লোরোফিল নষ্ট হয়ে যায়, সালোকসংশ্লেষের হার কমে আসে। অবশেষে গাছের পাতায় গাঢ় রঙের ছোপ পড়ে, অথবা পাতার নানা জায়গা বিবর্ণ হয়ে যায়।

আলোচনার শেষ অংশে এল কালো বৃষ্টির কথা। এই বৃষ্টির জল যে ধর্মে আম্লিক, তা প্রাথমিক পরীক্ষাতেই ধরা পড়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে এই ‘খুনি’ বৃষ্টি ঠিক কতটা ক্ষতি করেছে তা এখনও জানা যায়নি। তবে ইওরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বহু হ্রদ ও বনাঞ্চলের ক্ষতি করেছে এই বৃষ্টি। সুইডেনের পনেরো হাজার হ্রদের জল এই বৃষ্টিতে আম্লিক হয়ে গেছে। নরওয়েরও প্রায় একই দশা। আমেরিকা আর কানাডাতেও একই ঘটনা লক্ষ করা গেছে।

আদিত্য ও সুনয়না গভীর মনোযোগে শুনছিল ভয়ঙ্কর অম্লবৃষ্টির কথা।

কোনও তরল কী পরিমাণ আম্লিক সেটা নির্ভর করে তার পি-এইচ মানের ওপরে। যেমন বিশুদ্ধ জলের পি-এইচ মান ৭, আর বৃষ্টির জলের পি-এইচ মান ৫.৬ এর নীচে হলেই তাকে অম্লবৃষ্টি বলা হয়। আমেরিকার পূর্ব অঞ্চলে ৪.৬ পি-এইচ মানের অম্লবৃষ্টি হয়েছে। ১৯৭৪-এ বম্বের টম্বে ও চেম্বুরে ৪.৫ ও ৪.৮ পি-এইচ মানের বৃষ্টি হয়েছে। এমনকী দিল্লি, নাগপুর ও পুনেতেও একই ধরনের বৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে।

এখন ভারতে কয়লার উৎপাদন প্রায় তিরিশ কোটি টন। এই কয়লার দহনের ফলেই তৈরি হচ্ছে ক্ষতিকর সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড আর নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড। জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এ থেকেই তৈরি হয়ে গেছে নানা অ্যাসিড। এই অ্যাসিড-বৃষ্টি মাটি শুষে নিলে রসায়ন ও জীববিদ্যাগত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ বহু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

শুনতে-শুনতে আদিত্যর মাথা টিপটিপ করছিল। আর নয়নার ফরসা মুখ বেশ খানিকটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। আদিত্য চলে আসার সময় ও বলেছিল, ‘দিতুদা, কী হবে বলুন তো শেষ পর্যন্ত?’

আদিত্য একটু আগেই ছাদে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘ভয়ের কিছু নেই—’ এখানে সেই কথাটাই আবার বলতে গিয়ে জিভ জড়িয়ে গেল। কেমন একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে।

ভেজা রাস্তায় পা ফেলে বাড়ি ফেরার সময় সুনয়নার প্রশ্নের উত্তরটাই খুঁজছিল আদিত্য। রাতে শোওয়ার সময়েও প্রশ্নটা ওর মাথা থেকে যায়নি। হয়তো সেইজন্যেই ভোরবেলার দুঃস্বপ্নটা দেখতে হয়েছে ওকে। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, যে-চিৎকারটা ও দোতলা থেকে শুনতে পাচ্ছে সেটা তো আর দুঃস্বপ্ন নয়। বাস্তব।

একটা চরিত্রহীন ভয় ঘিরে ধরল আদিত্যকে। ওর বড়-বড় শ্বাস পড়ছিল। এক ঝটকায় বিছানা ছেড়ে উঠে ও হুড়মুড় করে দৌড়ল সিঁড়ির দিকে। দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে যখন ও দোতলায় পৌঁছল ততক্ষণে চিৎকারটা বুক ভাঙা কান্নার চেহারা নিয়েছে।

দোতলার সিঁড়ির মুখেই পলাশের সঙ্গে দেখা হল আদিত্যর। সবে স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে। পলাশ রোজই সকাল-সকাল স্নান সেরে নেয়।

আদিত্য জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার, দাদা?’

পলাশের হাতে গামছা। মাথা ঘষছিল সেটা দিয়ে। আদিত্যর প্রশ্নে ঠোঁট ওলটাল।

পলাশকে ডিঙিয়ে আদিত্য ছুটে গেল বড় ঘরের দিকে। সেখানে পৌঁছেই শোকের ঘটনাটা ও দেখতে পেল।

ভক্তদাসের তারের খাঁচাটা দু-হাতে জাপটে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছে মা। এই কান্নার সঙ্গে তেরো বছর আগের ভয়ংকর কান্নার কোথায় যেন একটা মিল রয়েছে। আদিত্যর মনে হল, মায়ের মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে একটা অশরীরী অবয়ব। সে বলছে, ‘নিভা, কাঁদছ কেন? এই তো আমি—।’ কিন্তু মায়ের কান্না থামছে না। মায়ের বিছানায় রাখা রেডিয়োতে তখন গানের সুর বাজছে।

মুন্নি, বউদি আর নানকু মা-কে ঘিরে জটলা করে দাঁড়িয়ে ছিল। আদিত্য কাছে যেতেই লতা চাপা গলায় বলল, ‘ভক্তদাস হঠাৎ মরে গেছে—।’

এমনসময় পলাশ পিছনে এসে দাঁড়াতেই নানকুর হাত ধরে লতা ওর কাছে চলে গেল। নীচু গলায় কীসব বলতে লাগল।

মুন্নি মা-কে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। আদিত্য হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ল খাঁচার কাছে। ভালো করে দেখল ভেতরটা। সবুজ পাখিটা নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে তারজালির মেঝেতে। চোখ আধবোজা। যেন ঘুমিয়ে আছে। আর মুখের সামনে খানিকটা রক্ত পড়ে আছে।

কাঁদতে-কাঁদতে মায়ের শীর্ণ শরীরটা হাঁপাচ্ছিল। মুন্নি কিছুতেই মা-কে খাঁচার কাছ থেকে সরাতে পারছিল না। মা ভাঙা গলায় ইনিয়েবিনিয়ে কত কথাই না বলছিল।

আদিত্য এই শোকের কিছুটা বুঝতে পারছিল হয়তো। পাখিটার গায়ে বাবার আদরের ছোঁওয়া লেগে ছিল। ওর অস্তিত্বের মধ্যে পৃথিবী-ছেড়ে-চলে-যাওয়া একটা মানুষের অস্তিত্বের তীব্র স্মৃতি রয়ে গিয়েছিল। মায়ের মন কিছুতেই সেটা হারাতে চাইছিল না। কিন্তু স্নেহ-ভালোবাসার টান সুতোর মতো। নিষ্ঠুর হাতে সুতোটা ছিঁড়ে দিলেই হল।

অনেক চেষ্টার পর মা-কে বিছানায় নিয়ে যেতে পারল মুন্নি। লতা এক গেলাস জল এনে ধরল মায়ের মুখের কাছে। মায়ের শরীরটা হেঁচকি তুলে কেঁপে উঠছিল বারবার। কোনওরকমে দু-চার চুমুক জল খেল।

পলাশ নীচু গলায় আদিত্যকে ডাকল। আদিত্য তাকাল দাদার দিকে। ইশারায় বোঝাল, ‘তুমি যেতে পারো, আমি দেখছি—।’

পলাশ নানকুকে নিয়ে চলে গেল। বাচ্চাটা হঠাৎই কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে।

মা-কে স্বাভাবিক হওয়ার সময় দিচ্ছিল আদিত্য। সেই ফাঁকে ও তাকাল টেবিলঘড়ির দিকে। সওয়া সাতটা বাজে। অথচ রোদের দেখা নেই।

বারান্দার খোলা দরজার দিকে দেখল ও। গতকাল বৃষ্টির পর আবহাওয়া পরিষ্কার হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার ধোঁয়াশার মেঘ ঘষা কাচের কাজ করছে। তারই মাঝে ভেসে যাচ্ছে গাঢ়তর কুয়াশার রেখা।

খাঁচা ছেড়ে উঠে মায়ের কাছে গেল আদিত্য। মা আর মুন্নির কাছ থেকে টুকরো-টুকরোভাবে যেটুকু জানতে পারল তা হল, সকালবেলা চায়ের পাট সেরে ভক্তদাসকে বারান্দার রেলিঙে রাখতে গেছে মা। আর তখন সতেজ পাখিটা হঠাৎই বারকয়েক ঝাঁকুনি দিয়ে কাত হয়ে পড়ে যায় দাঁড়ের ওপর থেকে। ওর মুখ থেকে খানিকটা কাঁচা রক্ত বেরিয়ে আসে। মা বারবার ডাকলেও সাড়া দেয়নি আর। চোদ্দো বছরের জীবনে দাঁড়ি পড়ে গেছে।

বিছানার পাশেই একটা ছোট তাকে মায়ের নানা ওষুধ। সেখান থেকে মাকে একটা ট্যাবলেট এনে দিল মুন্নি। মা কোনওরকমে সেটা গিলে ফেলল।

গলি থেকে রামুদার গলার আওয়াজ ভেসে এলঃ ‘—কালো, জগতের আলো। কলকাতায় কালো বৃষ্টি। কী সৌভাগ্য আমাদের! আকাশ থেকে বিনি পয়সায় আলকাতরা—।’

রামুদা এ-গলির বেশিরভাগ বাড়িতেই খবরের কাগজ দেয়। আর বরাবরই সাইকেল ছুটিয়ে যেতে-যেতে কাগজের হেডলাইনগুলো নিজের মতো করে শুনিয়ে দেয় সবাইকে।

লতা জিগ্যেস করল, ‘চা দেব, ছোড়দা?’

আদিত্য বলল, ‘না, মুখ ধুইনি—।’

বারান্দায় ধপ করে একটা শব্দ হল। খবরের কাগজটা বারান্দায় ছুড়ে দিয়েছে রামুদা। আদিত্য ভক্তদাসের খাঁচার দিকে একবার দেখল, তারপর দ্রুতপায়ে বারান্দায় গিয়ে কাগজটা তুলে নিল।

কাগজের প্রথম পাতায় প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে শুধু ধোঁয়াশা আর কালো বৃষ্টির কথা। আর বাকি অংশে ভোট ও রাজনৈতিক আলোচনা। আদিত্য মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল।

এই ধোঁয়াশা শুধু কলকাতাকে ঘিরেই। তার বাইরে নাকি খুব দ্রুত ফিকে হয়ে গেছে। আর কালো বৃষ্টির ধরনটাও ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের থেকে আলাদা। বিজ্ঞানীরা এখনও এই অদ্ভুত ঘটনার সঠিক কার্যকারণ খুঁজে পাননি। তবে তাঁরা এটুকু জানিয়েছেন, এই পরিবেশ দূষণ মানুষের পক্ষে মারাত্মক নয়। অন্তত এখনও। তবে এই পরিবেশ যদি বজায় থাকে, তা হলে রাজ্যে ভোটগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ-বিষয়ে উদ্বিগ্ন। নাগরিক নিরাপত্তা পরিষদ এরই মধ্যে মহাকরণ অভিযানের হুমকি দিয়েছে।

এরপরই কয়েকটা দুর্ঘটনার খবরের দিকে নজর গেল আদিত্যর। কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণের সময় একটি যাত্রীবাহী বিমান সামান্য জখম হয়েছে। আবহাওয়ার উন্নতি না হলে আজ থেকে বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায় বাস, মিনিবাস, স্কুটার ইত্যাদি জড়িয়ে চারটি দুর্ঘটনা হয়েছে।

আদিত্য আকাশের দিকে দেখল। অবস্থা ধীরে-ধীরে কাল বিকেলের মতোই হয়ে উঠেছে। এই ধোঁয়াশা যদি আরও গাঢ় হয়ে ওঠে তা হলে রাস্তাঘাটে গাড়িঘোড়া আর চলতে পারবে না। সে-অবস্থায় মাকে নিয়ে ডাক্তারবাবুর কাছে বেরোনোটা বোধহয় ঠিক হবে না।

এরকম এলোমেলো নজর চালাতে-চালাতেই ওর চোখ গেল মাধবীলতা গাছটার দিকে। আর সঙ্গে-সঙ্গেই যেন একটা ধাক্কা খেল আদিত্য।

গতকাল সকালেও যে গাছটা সজীব সতেজ ছিল, আজ কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। গাছটার সারা শরীরে বিবর্ণ ছোপ। এই গ্রীষ্মেই যেন হেমন্ত এসে গেছে।

আদিত্য ভয় পেল। খবরের কাগজ হাতে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল ও।

লতা নেই। মুন্নি তখনও মায়ের কাছে বসে। মা চুপচাপ বসে রয়েছে জানলার দিকে তাকিয়ে। চশমায় আলো পড়েছে। চোখ দেখা যাচ্ছে না। তবে শোকের হিজিবিজি যেন এরই মধ্যে আরও নিষ্ঠুর আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

মুন্নির দিকে খবরের কাগজটা বাড়িয়ে ধরতেই ও উঠে এল কাছে। আদিত্য নীচু গলায় বলল, ‘মাধবীলতা গাছটার অবস্থা দেখেছিস?’

মুন্নি অবাক হল না। একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘ভক্তদাসকে ওই গাছটার গোড়ায় কবর দিয়ে দিস…মা বলছিল…।’

আদিত্য কাগজটা ওর হাতে দিয়ে ঘাড় নাড়ল। ওই গাছটা তেরো বছরের পুরোনো। বাবার অস্থিভস্ম ও নাভি ওই মাটিতে পুঁতে দিয়ে গাছের চারাটা বসানো হয়েছিল। আদিত্যর মনে হল, কী আশ্চর্যভাবেই না তেরো বছরের ব্যবধানে একটা সবুজ টিয়াপাখির সঙ্গে বাবার একটা স্থায়ী নিকট সম্পর্ক গড়ে উঠল।

আদিত্য গলায় টক স্বাদ টের পেল। সকালে উঠে মুখ ধোওয়া হয়নি, হয়তো সেইজন্যেই। এখনও অনেক কাজ বাকিঃ মুখ ধোওয়া, চা খাওয়া, বাজার, তারপর অফিস। একদিনের বাজার আগাম করা থাকে বলেই রক্ষে। বউদি হয়তো এতক্ষণে রান্না অনেকটা এগিয়ে নিয়েছে। দাদাকেও তো অফিসে বেরোতে হবে।

ঘর ছেড়ে কলতলায় যাওয়ার আগে বাবার ফটোর কাছে এক মুহূর্ত দাঁড়াল আদিত্য। পেতলের থালায় রাখা আজকের নয়নতারা ফুলগুলো শুকনো শীর্ণ।

অথচ ভোরবেলা আহরণের পর এরই মধ্যে ফুলগুলো এরকম শুকিয়ে যাওয়ার কথা নয়।

আদিত্য ভাবল, অফিসে বেরোনোর আগে ছাদে গিয়ে টবের গাছগুলোর অবস্থা একবার দেখবে। ওর মাধবীলতা গাছটার কথা মনে পড়ছিল।

চার

আর দুটো দিন পেরোতে-না-পেরোতেই ছবিটা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।

চটচটে কালো বৃষ্টি হল চারবার। ধোঁয়াশা তার খেয়াল-খুশি মতো কলকাতাকে জড়িয়ে ধরতে লাগল।

আদিত্য ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতঘড়ি দেখে বলা যায় এখন সূর্যাস্তের সময়। ধোঁয়াশার জন্য সূর্যকে দেখার কোনও উপায় নেই। শুধু পশ্চিমের আকাশের সামান্য লালচে আভাটুকু আশ্বাস। এই সময় পাখিরা শান্ত আকাশে ছায়াছবি হয়ে ঘরে ফেরে। দু-দিন আগেও এ-দৃশ্য দেখেছে আদিত্য। কিন্তু জানে, আজ আর দেখা যাবে না। কলকাতার পাখিরা বোধহয় আর কখনও ঘরে ফিরবে না। এখানে আর কোনও পাখপাখালি নেই, পোকামাকড়ও বোধহয় আর নেই।

আদিত্য টবের ফুলগাছগুলোর দিকে তাকাল। সব শুকিয়ে মরে গেছে। এখন শুধু অস্থিসার শুকনো কাণ্ডগুলো প্রেতের মতো হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আজও অফিসে বেরিয়েছিল আদিত্য। বেরোনোর আগে ছাদে এসেছিল একবার। ক’দিন ধরে রোজই আসছে। তখনই মরা দুটো চড়ুই পাখি দেখতে পেয়েছিল নয়নতারার টবের পাশে। ঠিক ভক্তদাসের মতোই মৃত। এবং অসহায়।

আদিত্য দুঃখ পায়নি। অবাকও হয়নি। কারণ, গতকাল সন্ধেবেলা নয়নাকে পড়ানোর সময় পরপর দুবার কালো বৃষ্টি হয়েছিল। রাতে বাড়ি ফেরার সময় পথের নানা জায়গায় কয়েকটা বেড়াল কুকুর মরে পড়ে থাকতে দেখেছিল। তখন ধোঁয়াশাটা আবার ঘন হতে শুরু করেছিল।

তারপর আজ সকাল থেকেই পথে বহু কাক, চড়ুই, শালিখ, মুরগি আর পায়রা নজরে পড়েছে ওর। সেই সঙ্গে কয়েকটা বাতাসি পাখি আর চামচিকেও। এ ছাড়া কদাচিৎ দু-একটা বাদুড়, প্যাঁচা, বুলবুলি। নিশ্চল। নিথর। কয়েকটা পাখি রাস্তার মাঝখানেও পড়ে রয়েছে। সেইসঙ্গে কুকুর, বেড়াল, ইঁদুর, ছুঁচো। চারপাশে কেমন একটা চাপা দুর্গন্ধ।

তিনতলার এই খাটো ছাদে দাঁড়ালেও বেশ কয়েকটা ঝুপসি গাছের মাথা দেখা যায়। এখনও দেখা যাচ্ছে, তবে তার প্রায় সব পাতাই ঝলসে শুকিয়ে খসে গেছে।

গত দু-দিনের বাজারের চেহারাটা মনে পড়ল আদিত্যর। তরিতরকারির নামে যা বিক্রি হচ্ছে সেসব যেন তরিতরকারির কঙ্কাল। আর সেগুলোই বিক্রি হচ্ছে আগুন দামে। শুধুই মাছ-মাংস খেয়ে ক’দিন বেঁচে থাকা যায়! এ ছাড়া চাল, ডাল, চিনির জোগান এই দু-দিনেই অবিশ্বাস্যরকম কমে গেছে।

মনোহর ভাণ্ডারে এই নিয়েই সকাল-বিকেল ঝগড়াঝাঁটি হইচই। এই বেসামাল পরিস্থিতিতে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য ভোট মুলতুবি রাখতে বাধ্য হয়েছে। আর রোজই রেডিয়ো-টিভি আর খবরের কাগজে পরিবেশের অদ্ভুত বিপন্ন অবস্থা নিয়ে নানা তত্ত্ব এবং তথ্য প্রচারিত হচ্ছে।

আদিত্য মনে-মনে খানিকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কাকের ডাকে ঘুম ভাঙে না এমন সকাল কলকাতায় ভাবা যায় না। অথচ তাই হচ্ছে। যে-কর্কশ ডাক নিত্য শুনে-শুনে বিরক্ত লাগত, এখন সেই ডাক শোনার জন্যই আদিত্যর মন কান পেতে আছে। মনে হচ্ছে, একসঙ্গে এক দঙ্গল কাক ‘কা-কা’ করে ডেকে উঠলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এমনকী কাকের বদলে চড়ুই পাখির কিচিরমিচির হলেও মোটামুটি চলত।

আদিত্য আশপাশে তাকাল। অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। সবুজ নেই। পাখিরাও আর নেই। ও ধীরে-ধীরে নেমে এল ছাদ থেকে।

দোতলায় নামতেই নানকুর গলা পেল। পড়ছে। বউদি পড়াচ্ছে। দাদা এখনও অফিস থেকে ফেরেনি। চাকরি ছাড়াও পলাশ টুকটাক অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ করে। বিভিন্ন কোম্পানিতে অফিস স্টেশনারি—প্যাড, পেন, পেনসিল এইসব—সাপ্লাই করে। হয়তো সেইজন্যই দেরি হচ্ছে ফিরতে। আজ রাস্তাঘাটের যা অবস্থা তাতে দেরি হওয়াটা তেমন অস্বাভাবিক নয়।

মায়ের ঘরে গেল আদিত্য। ঘরে টিউব লাইট জ্বলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা ঘোলাটে ভাব রয়ে গেছে। মা বিছানায় বসে চোখ বুজে রয়েছে। ঠাকুরের নাম করছে, অথবা বাবার স্মৃতি রোমন্থন করছে। আদিত্য মা-কে ভালো করে দেখল। বাদামি-কালো-হলুদ ছাপের বেডকভারের ওপরে শাড়ি পরা মায়ের শরীর বেশ স্পষ্ট। থুতনিটা সামান্য তুলে শিরদাঁড়া টানটান করে বসে আছে। অনেকটা ক্ষুদিরামের মূর্তির মতো। গলার শিরা ফুলে রয়েছে।

বাবার ফটোর সামনে ধূপ জ্বলছে। সামনের পেতলের থালা খালি।

সকালেও খালি ছিল। টবে ফুল ফোটেনি। পুষ্পহীন এই আরাধনা কতদিন চলবে কে জানে!

মা হঠাৎই কাশল। বেশ কয়েকবার। চোখ খুলে তাকাল। আদিত্য সামনের একটা চেয়ারে বসে পড়ল। ছোট টেবিলে রাখা ভাঁজ করা খবরের কাগজটা তুলে নিল হাতে। এমনসময় মা বলল, ‘দিতু, আমার খুব ভালো ঠেকছে না—।’

আদিত্য তাকাল মায়ের দিকেঃ ‘কী?’

‘এইসব—বৃষ্টি—ধোঁয়া—’ মা বারান্দার খোলা দরজার দিকে ইশারা করল।

আদিত্য ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘দেখি কী হয়। সবাই তো বলছে ঠিক হয়ে যাবে—।’

খবরের কাগজে নানা জন এই ঘটনার নানা কারণ খুঁজে বেড়িয়েছে। কেউ বলেছে, পনেরো বছর আগের উপসাগরীয় যুদ্ধ এর জন্য দায়ী। কেউ বা রাশিয়া-আমেরিকার সাম্প্রতিক পারমাণবিক যুদ্ধকে এর জন্য দায়ী করেছে। মরিয়া হয়ে এ ওর ঘাড়ে দোষ চাপাতে চাইছে। শুরু হয়ে গেছে কাদা ছোড়াছুড়ি।

মুন্নিকে ঘরে দেখতে পায়নি আদিত্য। হয়তো কোথাও গেছে। অন্য সময় হলে এই না-থাকাটা তেমন অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু আদিত্য জিগ্যেস না করে পারল না, ‘মুন্নি কোথায় গেছে?’

মা জোরে শ্বাস নিচ্ছিল। বলল, ‘অতসীদের বাড়ি গেছে।’

অতসীরা কাছাকাছি থাকে। মুন্নির সঙ্গে পড়ে। মুন্নি খুব একটা বেরোয় না রাস্তায়। কখনও গেলে অতসীদের বাড়ি যায়। ওখান থেকে রজতদের বাড়িটা অনেক কাছে দেখা যায়।

মা বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দার দরজা দুটো ভেজিয়ে দিল। আদিত্য কিছু বলল না। ওর তেতো হাসি পেল। দরজা বন্ধ করে বাতাসের বিষকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। মানুষের ফুসফুসে পৌঁছেই বিষের বিশ্রাম—তার আগে নয়।

টিভির সুইচটা অন করে দিল মা।

সরকারি চ্যানেলে সেই একই ব্যাপার। ধোঁয়াশা ও বৃষ্টি মারফত দূষণের মাত্রা
কতখানি হতে পারে তার হিসেবনিকেশের চেষ্টা এখনও চলেছে। আর সেইসঙ্গে আগমার্কা অভয়বাণীঃ মানুষের ভয়ের কিছু নেই।

সেটা শুনতে-শুনতে মৃতদেহের দুর্গন্ধ নাকে এল আদিত্যর। ওদের বাড়ির ভেতরের দিকের কার্নিশে দুটো পায়রা জোড় বেঁধেছিল। ডিমও পেড়েছিল দুটো। কিন্তু গতকাল আদিত্য দেখেছে মা-পায়রাটা কাত হয়ে পড়ে আছে। আর অন্য পায়রাটা নেই। হয়তো খাবারের সন্ধানে গিয়ে আর ফিরে আসতে পারেনি। অজাত পায়রা-শিশু দুটো থেকে গেল ডিমের আবরণের মধ্যেই।

আদিত্য খবরের কাগজটা রেখে দিল টেবিলে। উঠে গিয়ে টিভির পরদার চ্যানেল সিলেক্টর জেনে আঙুল ছোঁয়াল। সঙ্গে-সঙ্গে চ্যানেল নম্বর ফুটে উঠল পরদার মাথায় ডানদিকের কোণে। পাঁচ নম্বর ফুটে উঠতেই আঙুল সরিয়ে নিল আদিত্য। এটা প্রাইভেট চ্যানেল। সবসময় সরকারি খবরের ওপরে আস্থা রাখা যায় না। তিন-তিনটে প্রাইভেট চ্যানেল চালু হওয়ার পর সরকারি খবরগুলো বাধ্য হয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়েছে। তবে প্রাইভেট চ্যানেলের খবরের ঢং এখনও অনেক আকর্ষণীয়।

চেয়ারে ফিরে এসে বসল আদিত্য। দেখতে লাগল।

পরদায় গড়িয়াহাট অঞ্চল দেখানো হচ্ছিল। আকাশছোঁয়া বাড়িগুলো ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায় ঢাকা। সেখান থেকে ক্যামেরা নেমে এল রাস্তায়। দেখা গেল তুমুল হইচই হট্টগোল। তারই মধ্যে ইনসেট হয়ে ফুটে উঠল সংবাদ-পাঠিকার মুখ। তাঁর কথায় ও ছবিতে জানা গেল, দক্ষিণ কলকাতায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পেট্রলের দাম ছাব্বিশ টাকা লিটার থেকে চল্লিশ টাকায় পৌঁছে গেছে। আর ডিজেলের দাম সাড়ে আট থেকে পনেরোয়। অনেক মানুষই শহর ছেড়ে চলে যেতে চাইছে। এই টালমাটাল অবস্থায় একটু আগেই এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। একটা পেটল ট্যাঙ্কারের সঙ্গে একটা প্রাইভেট বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ট্যাঙ্কারটিতে আগুন ধরে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। বাইশজন এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়। এছাড়া আরও—।

হঠাৎই বউদির চিৎকার শুনতে পেল আদিত্যঃ ‘ছোড়দা। ছোড়দা! শিগগিরই এসো।’

আদিত্য চেয়ার ছেড়ে ছুটল। তখনই টের পেল ওর চোখ জ্বালা করছে।

মা পিছন থেকে ডেকে উঠল, ‘কী হল, লতা? কী হল?’

সিঁড়ির কাছে এসেই পলাশকে দেখতে পেল আদিত্য। ফিকে গোলাপি আর লালে ছাপা বুশ-শার্ট। একটু খেয়াল করতেই বুঝল, লালটা রং নয়—রক্ত।

পলাশের বাঁ-গালটা ফুলে রয়েছে। ডানভুুরুর ওপরটা ফেটে গেছে। নাকের কাছটায় রক্তে মাখামাখি। সেখান থেকেই হয়তো রক্ত গড়িয়ে পড়েছে জামার বুকে।

আধবোজা চোখে পলাশ টলছিল। আদিত্য ওকে ধরে ফেলল। পলাশ যন্ত্রণায় ডুকরে উঠল।

বউদি এবার কাঁদতে শুরু করে দিল। নানকু কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছিল ওর মায়ের পিছনে। মাকে কাঁদতে দেখে বাচ্চাটাও কান্না জুড়ে দিল।

‘পলাশ! এ কী অবস্থা হয়েছে তোর!’

মায়ের গলা চিনতে পারল আদিত্য।

পলাশকে জাপটে ধরে ঘরে নিয়ে গেল ও। লতাকে বলল, ‘বউদি, একটা গামছা জলে ভিজিয়ে নিয়ে এসো তাড়াতাড়ি—।’

আদিত্য পলাশকে শুইয়ে দিল বিছানায়।

‘আঃ—’ বলে চোখ বুজল পলাশ।

আদিত্য দাদাকে দেখছিল। ছোটবেলা থেকেই খুব নিরীহ। কখনও মারপিট করেনি। কারও সঙ্গে ঝগড়াও যখন করেছে তাও তেমন উগ্র হয়নি কখনও। একটু অন্যমনস্ক, আত্মভোলা। বউদি আর মা-কে খুব মানে। এই ভালোছেলেটাকে কে মারল? কারা মারল?

কখন যেন নানকু এসে আদিত্যর পাজামা খামচে ধরেছে।

‘কাকুমণি, বাপির কী হয়েছে?’ জিগ্যেস করল ছেলেটা। বাবাকে খুব ভালোবাসে। বাবার কোলেপিঠে চড়ে সবসময় বেড়াতে যায়।

আদিত্য পলাশের নাকের কাছে হাত রাখল। নিশ্বাস পড়ছে ধীরে।

লতা আর মা একইসঙ্গে ঘরে এল। দ্রুতহাতে শুরু করল পলাশের যত্ন। আদিত্য ওদের দেখছিল, তবে মনোযোগ ছিল না। ওর ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল। ফুটবল নিয়ে হাত ধরাধরি করে দেশবন্ধু পার্কে খেলতে যাওয়ার কথা। শীতের দুপুরে সল্টলেকের মাঠে টেনিস বলে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। বৃষ্টির মধ্যে পেটে বইখাতা গুঁজে ভিজতে-ভিজতে বাড়ি ফেরা। বাবাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময়ে খাটিয়ায় আগে-পিছে কাঁধ দেওয়া। তারপর ‘বলো হরি, হরিবোল…।’

আদিত্যর যখন খেয়াল হল, তখন পলাশ বিড়বিড় করে কথা বলছে। কথা বলছে একটানা। কিন্তু আদিত্যর কানে কিছুই ঢুকছিল না। ও বলল, ‘বউদি, আমি ডক্টর মণ্ডলকে ডেকে নিয়ে আসছি।’

একটা অ্যান্টিসেপটিক স্প্রে নিয়ে পলাশের কাটা জায়গাগুলোয় স্প্রে করছিল লতা। আদিত্যর দিকে ফিরে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল। নানকু তখন খাটের ওপর মাথা তুলে পলাশকে দেখতে চেষ্টা করছে, আর একনাগাড়ে ‘বাপি, বাপি—’ করে চলেছে।

আদিত্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। ওর চোখে সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।

বাড়ি থেকে বেরোতে-না-বেরোতেই লোডশেডিং। ভীষণ অবাক হয়ে গেল আদিত্য। কারণ, গত পাঁচবছরে বিদ্যুতের জোগান সবসময়েই চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ থেকেছে। অবশ্য বৈদ্যুতিক ফল্ট থেকে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ কচ্চিৎ কখনও বন্ধ হয়নি তা নয়। এটাও হয়তো সেইরকমই কিছু। কিন্তু আদিত্যর মন যেন সায় দিচ্ছিল না কিছুতেই। গত ক’দিনের আবহাওয়া ওকে খারাপটাই ক্রমশ ভাবতে শেখাচ্ছিল।

রাস্তার চেহারাটা ভারী অদ্ভুত। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেছে পাড়াটা। কিন্তু এক অলৌকিক ঘষা আলো ছড়িয়ে রয়েছে। বোঝা যায়, আকাশে কোথাও একটা চাঁদ রয়েছে।

পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে চাপা দিল আদিত্য। বীভৎস দুর্গন্ধ। রাস্তায় পড়ে থেকে-থেকে পশুপাখির মৃতদেহগুলো পচতে শুরু করেছে। পথ চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। হোঁচট খাচ্ছিল বারবার। ধাক্কাও লাগল কয়েকটা কালো ছায়ার সঙ্গে। কিন্তু কষ্ট করে মোড়ের মাথায় পৌঁছতেই চায়ের দোকানের মোমবাতির আলো আদিত্যকে খানিকটা স্বস্তি দিল। শ্যামাপোকার মতো সেই আলোর দিকে এগিয়ে গেল ও। ভেসে বেড়ানো ধোঁয়াশার মধ্যে অনেকগুলো অস্পষ্ট অবয়ব দেখতে পেল। সেইসঙ্গে শুনতে পেল কলরব আর রেডিয়োর সংবাদ বুলেটিনের টুকরো।

জটলার মধ্যে মহাদেবদার বাবাকে দেখতে পেল আদিত্য। একটা বেঞ্চে বসে টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন।

আদিত্য অস্বস্তি পাচ্ছিল। সুনয়নাকে টিউশানির কথা বলতে ভুলে গেছে। কিন্তু বৃদ্ধই হাসিমুখে ডাকলেন ওকে, ‘দিতু, তোমাকে যে ওই টিউশানির কথাটা বলেছিলাম—এখন আর কিছু ঠিক কোরো না। দেখছ তো এই গোলমাল। সব মিটে যাক, তারপর দেখা যাবে।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘ভাগ্যিস মহাদেবরা আমেরিকায় রয়েছে। নইলে এ অবস্থায় কলকাতায় কী করে থাকত ওরা! আর বাচ্চাটারই বা কী অবস্থা হতো!’

বৃদ্ধের মুখমণ্ডলে এক ধরনের স্বস্তির আভা। ছেলের দেশে দূষণ নেই। সেখানে কালো বৃষ্টি নেই। অথচ আলোক রাসায়নিক ধোঁয়াশার শুরু আমেরিকাতেই।

খবরে নানা দুর্ঘটনার কথা বলছিল। শঙ্করবাবু জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি কোথায় চললে এই অন্ধকারে?’

‘ডক্টর মণ্ডলের চেম্বারে—।’

পিছন থেকে বয়স্ক কেউ বলে উঠলেন, ‘ডাক্তার কাল তল্পিতল্পা নিয়ে তার দেশ মেমারিতে পালিয়েছে। বলেছে, এখানে থাকলে কেউ বাঁচবে না।’

আর একজন কে যেন বলল, ‘এখন তো সবে কুকুর-বেড়াল-গরু-ছাগল মরছে। এর পরে কী হবে কে জানে!’

‘এদিকে সরকার স্রেফ অভয়বাণী দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে।’

আদিত্যর কেমন মাথা ঝিমঝিম করছিল। কে কোন কথা বলছে সেটা ওর মগজে ঢুকছিল না। শুধু টুকরো-টুকরো কথাগুলো কানে আসছে।

‘কেন, সরকার কী করবে? তালপাতার পাখা দিয়ে ধোঁয়া তাড়িয়ে দেবে? দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের কোনও দায়িত্ব নেই? একে তো ইলেকশান গেল ভেস্তে!’

‘ইলেকশান কেন, সবই ভেস্তে যাবে। আর দু-দিন যেতে দাও, দ্যাখো না কী হাল দাঁড়ায়!’

‘আমি আর একটা দিন দেখব—।’

আদিত্য ‘আসি’ বলে মোমের আলোর বৃত্ত ছেড়ে বেরিয়ে এল। শেষ শোনা কথাটা ক্রমাগতই ওর মাথার ভেতরে বাজছিল। ও একরকম ধোঁয়াশা হাতড়েই ফিরে এল বাড়িতে।

চেনা সিঁড়ি বেয়ে অনুমানে ভর করে দোতলায় উঠতে খুব একটা অসুবিধে হল না ওর। দাদার ঘর থেকে রিচার্জেবল ইমারজেন্সি ল্যাম্পের মলিন আলো বারান্দায় এসে পড়েছে।

মুন্নির গলা শুনতে পেল। অতসীদের বাড়ি থেকে এর মধ্যেই ফিরে এসেছে।

আদিত্য দাদার ঘরে গিয়ে ঢুকল।

পলাশ খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ বোজা, হাতে হরলিক্সের গেলাস। ধীরে-ধীরে চুমুক দিচ্ছে। ডানভুরু আর নাকের কাছে সাদা প্লাস্টিকের মতো কী লাগানো। বউদি বোধহয় ইনস্ট্যাহিলার স্প্রে করে দিয়েছে। ইমারজেন্সি ল্যাম্পের সাদা আলোয় পলাশের ফরসা মুখ ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।

আদিত্য ঘরে ঢুকতেই তিনজোড়া চোখ তাকাল ওর দিকে। মা, লতা আর মুন্নি। আদিত্য মাথা নাড়ল। বলল, ‘ডাক্তারবাবু নেই—কলকাতা ছেড়ে চলে গেছে।’

আদিত্যর কথায় পলাশ চোখ খুলে তাকাল। বলল, ‘বুকের ভেতরটায় খুব কষ্ট হচ্ছে—।’

পলাশের দুর্বল মিনমিনে স্বর ওদের আলোছায়াময় মুখে ভয়ের রেখা ফুটিয়ে তুলল।

আদিত্য চাপা গলায় লতাকে জিগ্যেস করল, ‘কী করে এমন হল, বউদি?’

‘ও যে-বাসে করে ফিরছিল সেটা ধোঁয়ায় দিশেহারা হয়ে একটা মিনিবাসকে প্রায় মুখোমুখি ধাক্কা মেরেছে। দুজন স্পটেই মারা গেছে। ও বোধহয় কিছুক্ষণ অজ্ঞান হয়েছিল। তারপর জ্ঞান ফিরতে হাতড়ে-হাতড়ে কিছুটা এগিয়ে একটা গাড়ি থামাতে পেরেছে। ওর অবস্থা দেখে সেই গাড়ির মালিক দয়া করে এ-গলির মোড়ে পৌঁছে দিয়েছে—।’

লতার চেহারা ভারীর দিকে। মুখও গোলগাল। ফলে অভিব্যক্তি ভালো ফোটে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও বউদির মুখে নগ্ন আতঙ্কের অরাজকতা লক্ষ করল আদিত্য। কথা শেষ হতে-না-হতেই সবার মনের প্রশ্নটা উচ্চারণ করল মা, ‘দিতু, এখন তা হলে ডাক্তারের কী হবে?’

আদিত্য হালকা গলায় কথা বলে আশ্বস্ত করতে চাইল সবাইকেঃ ‘মা, তুমি শুধু-শুধু চিন্তা করছ। আমি এক্ষুনি বেরোচ্ছি। খালের ওপার থেকে শ্যামল ডাক্তারকে নিয়ে আসতে পারি কি না দেখছি। তোমরা যদি দেরি দেখে চিন্তা করো, তাই খবরটা দিয়ে গেলাম।’

পলাশ হরলিক্স খাওয়া শেষ করেছিল। নানকু ওর পাশে গা ঘেঁষে বসে আছে। হাঁ করে কৌতূহলী চোখে বাবার মুখের ক্ষতচিহ্নগুলো দেখছে। পলাশ বিড়বিড় করে বলল, ‘আসলে বুকের কাছটায় কীসের যেন ধাক্কা লেগেছিল…খুব জোরে…।’

আদিত্য পলাশের কাছে এগিয়ে গেল। ওর বুকে হাত বোলাল।

পলাশ যন্ত্রণায় চাপা চিৎকার করে উঠল, ‘উঃ! লাগছে।’

আদিত্য হাত সরিয়ে নিল। কতদিন…কত বছর পরে দাদার বুকে হাত রাখল ও!

নানকু ওর জামা ধরে টান মেরে বলল, ‘ও কাকুমণি, বাপিকে জলদি সারিয়ে দাও না।’

আদিত্য বাচ্চাটার গোলগাল মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে চেষ্টা করল। তারপর মজা করে বলল, ‘অ্যাই, তোর চোখগুলো অমন গোলগোল কেন রে?’

নানকু সহজ গলায় জবাব দিল, ‘আমি তো প্যাঁচা। মা বলেছে আমাকে প্যাঁচার মতো দেখতে।’

আদিত্য ওর মাথায় আলতো করে একটা চাঁটি মেরে বিছানা থেকে টর্চটা তুলে নিল, দরজার দিকে পা বাড়াল। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে-আসতে বলল, ‘তোমরা ভেব না, আমি ঝট করে ডাক্তার নিয়ে আসছি।’

মা একটা মোমবাতি জ্বেলে নিজের ঘরের দিকে এগোচ্ছিল। মোমের আলোয় আদিত্য দেখতে পেল মায়ের ঠোঁট নড়ছে। হয়তো ঈশ্বরের কাছে ছেলের আরোগ্য কামনা করছে।

হঠাৎই বাবার কথা মনে পড়ে গেল আদিত্যর।

পাঁচ

রাস্তায় পা দিয়েই আদিত্য কেমন ভয় পেয়ে গেল।

লোডশেডিং-এর অন্ধকার আর চোখ-জ্বালা-করা গাঢ় ধোঁয়াশা মিলেমিশে এক বিচিত্র শত্রু হয়ে উঠেছে।

আদিত্যর চোখ খুব একটা কাজ করছিল না। ও হাতের টর্চটা জ্বেলে এপাশ-ওপাশ ঘোরালো। যেসব বস্তু চোখে পড়ল তাতে পরিস্থিতির ছবিটা আরও কুৎসিত মনে হল।

গলির একপাশে জঞ্জালের স্তূপ। সেখানে দুটো বেড়াল আর একটা কুকুর চোখে পড়ল আদিত্যর। এর মধ্যেই ফুলে উঠেছে, তার ওপর এখানে সেখানে ঠোকরানো।

আদিত্যর গা গুলিয়ে উঠল। পাক দেওয়া দুর্গন্ধের সঙ্গে একটা তীব্র ঝাঁঝ মেশানো বলে মনে হল। চোখ ভীষণ জ্বালা করছিলঃ জ্বালা কমাতে বারবার চোখের পাতা ফেলছিল।

অন্ধকারে ভূতের মতো খানিকক্ষণ পথ চলার পর আদিত্য আর পারল না। এতক্ষণ ধরে বুকে জমাট বেঁধে থাকা ভয়টা ওর পা দুটো অসাড় করে দিতে চাইল। এই অবস্থায় ও মুচিবাজারে গিয়ে শ্যামল ডাক্তারকে ঠিকমতো ডেকে নিয়ে আসতে পারবে তো!

এইরকম একটা দ্বিধা আর সংশয়ের টানাপোড়েনের মধ্যে হঠাৎ করেই যেন নয়নার কথা মনে পড়ে গেল। ওই মেয়েটার যা সাহস আছে আদিত্যর বোধহয় তা নেই। এখন আদিত্য ওকে ডাকতে গেলে ও হয়তো ঠাট্টা করবে। গব্বর সি-এর ডায়ালগটা আবার শুনিয়ে দেবেঃ জো ডর গয়া, সমঝো কে মর গয়া।

কিন্তু কোনও উপায় নেই। নয়না ঠাট্টা করে করুক। নয়নার ঠাট্টা আদিত্য সহ্য করতে পারবে। এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে ওই ছটফটে ফাজিল মেয়েটা পাশে থাকলে আদিত্য সত্যি অনেকটা ভরসা পাবে।

সুতরাং কিছুটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সুনয়নাদের বাড়ির সামনে পৌঁছে গেল আদিত্য। কলিংবেলের বোতামে হাত রাখার পর খেয়াল হল লোডশেডিং। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে কলিংবেল টুংটাং শব্দে বেজে উঠল। তখনই আদিত্যর মনে পড়ল, সুনয়নাদের বাড়িতে মিনি জেনারেটার আছে।

দরজা খুলল নয়না নিজেই। বসবার ঘরে টিমটিম করে একটা বাল্‌ব জ্বলছে। আলোটা পিছনদিকে থাকায় ওকে ছায়াছবির মতো দেখাল। আদিত্য পরপর কয়েকবার চোখের পাতা ফেলল। চোখ জ্বালা করছিল। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে ও নয়নাকে দেখতে চাইল। খেয়াল ছিল না, হাতের টর্চটা তখনও জ্বলছে।

‘এ কী! দিতুদা!’

মেয়েটার বিস্ময় মেশানো স্বরে কোথায় যেন সামান্য ভালো লাগা জড়িয়ে ছিল।

আদিত্য একটু ইতস্তত করে বলল, ‘নয়না, আমার সঙ্গে একটু মুচিবাজার যাবে? খুব ঝামেলায় পড়ে গেছি। ডাক্তার ডাকতে হবে। দাদা…দাদার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।’

মেয়েটা সত্যিই আশ্চর্য। একটি কথাও জিগ্যেস করল না। শুধু ছোট্ট করে বলল, ‘একসেকেন্ড দাঁড়াও—মা-কে বলে আসি।’

এক সেকেন্ড নয়, ফিরে আসতে দশসেকেন্ড মতো সময় নিল সুনয়না। সদর দরজাটা টেনে লক করে দিয়ে আদিত্যর পাশাপাশি রাস্তায় নেমে এল। ওর চলার সঙ্গে দিব্যি তাল মিলিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে, দিতুদা? বড়দার কোথায় অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?’

আদিত্য টর্চের আলোর দিকে চোখ রেখে বলল, ‘দাদা বাড়িতে শুয়ে আছে। ডক্টর মণ্ডল শুনলাম কলকাতার বাড়ি ছেড়ে দেশের বাড়িতে পালিয়েছে। তাই মুচিবাজারের কাছ থেকে শ্যামল ডাক্তার—মানে ডক্টর দাসকে ডেকে আনতে যাচ্ছি।’

পথ চলতে-চলতে পলাশের ব্যাপারটা খুলে বলল আদিত্য। তারপর খানিকটা অনিশ্চিত গলায় বলল, ‘এই ধোঁয়াশার জন্যে খালের ওপারে যেতে আমার কেমন ভয়-ভয় করছিল। তাই ভাবলাম, তোমাকে…মানে…মাসিমা তোমাকে কিছু বললেন?’

নয়না এইবার হেসে ফেললঃ ‘আপনাকে এখন থেকে দিতুদা নয়, ভিতুদা বলে ডাকব।’

আদিত্য বিব্রত হল।

ওরা হাঁটতে-হাঁটতে অরবিন্দ সেতুর ওপরে উঠে পড়েছে। এখানে লোডশেডিং হয়নি। ব্রিজের দুপাশের ফুটপাথে লাইটপোস্টে সোডিয়াম ল্যাম্প জ্বলছে। তবে ধোঁয়াশা তাদের যাবতীয় ছটা শুষে নিয়েছে। রাস্তা থেকে যেটুকু চোখে পড়ে তা বাতির কঙ্কাল। গাঢ় মেঘলা আকাশের আড়ালে সূর্যকে যেমন দেখায়।

আদিত্য নয়নার হাত ধরে আলতো করে টেনে বলল, ‘রাস্তা দিয়ে এসো। ফুটপাথে অনেক গর্ত আছে—কখন হোঁচট খাবে।’

ওরা ফুটপাতের পাশ ঘেঁষে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। কয়েকটা গাড়ি ধীরে-ধীরে ওদের পার হয়ে গেল। গাড়ির হর্নের শব্দে কানে প্রায় তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। কিন্ত গাড়ির ড্রাইভারদের আর দোষ কী! চোখে ঠিকমতো দেখতে না পেলে হর্নই ভরসা।

‘আমি ভীষণ ভিতু হয়ে গেছি, নয়না।’

আদিত্যর স্বর কেমন মিনমিনে শোনাল। ওর কপাল ঘামছিল।

‘কেন? চারপাশে এইরকম অবস্থা বলে?’ নয়না চিবুক তুলে আদিত্যর ঝাপসা মুখের দিকে তাকাল।

‘হ্যাঁ। দেখছ না, একে-একে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছ না কুকুর, বেড়াল, শালিখ, চড়ুইয়ের পর কাদের পালা?’

চারপাশের ঘোলাটে আঁধারের দিকে তাকিয়ে আচমকা নানকুর কথাটা মনে পড়ে গেল আদিত্যরঃ আমি তো প্যাঁচা। এই আঁধারে স্পষ্ট দেখতে হলে এখন শুধু নানকু কেন, সবাইকেই প্যাঁচা হয়ে যেতে হবে।

নয়না আদিত্যকে কয়েকপলক দেখল। তারপর আদিত্যর আঙুলের ওপরে ওর মুঠো আরও শক্ত হল।

আদিত্য বলল, ‘কখন আমাদের পালা আসবে কে জানে!…মৃত্যু ভারী অদ্ভুত, নয়না। মৃত্যুর দরজা হাট করে খোলা থাকলেও সেই দরজা দিয়ে যেতে আমাদের কষ্ট হয়…আমারও হবে।’

‘দিতুদা!’

ঠিক সেই মুহূর্তে একটা সংঘর্ষের শব্দ কানে এল।

দুর্ঘটনাটা ঠিক কোথায় ঘটল কে জানে। তবে শব্দ শুনে মনে হল, ওদের সামনে বেশ খানিকটা দূরে ধোঁয়াশার আড়ালে একটা ছোটমাপের দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দু-চারজন লোকের চিৎকার শোনা গেল। আদিত্যরা যতই এগোচ্ছিল শব্দগুলো ততই জোরালো হচ্ছিল। গালিগালাজ কানে আসছিল। দু-একটা গাড়ি অধৈর্যভাবে হর্ন দিচ্ছিল।

আরও কাছে যেতে ব্যাপারটা স্পষ্ট হল। একটা অটোরিকশা একটা স্কুটারকে ধাক্কা মেরেছে। কালো-কালো ছায়ার মতো মানুষজন জড়ো হয়েছে সেখানে। তুমুল চেঁচামেচি চলছে।

ওরা দুজনে তাড়াতাড়ি হেঁটে জায়গাটা পেরিয়ে গেল। নয়না একবার হোঁচট খেয়ে ‘উঃ!’ করে উঠল। আদিত্য ওকে সামলে নিল।

অরবিন্দ সেতুর ঢাল বেয়ে নামতে-নামতে ওরা কয়েকটা ফ্লুওরেসেন্ট আলো দেখতে পেল। আদিত্য জানে, ব্রিজের মুখেই একটা বড়সড় মিষ্টির দোকান আছেঃ পরেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ওগুলো সেই দোকানেরই আলো। দোকানটার পাশ ঘেঁষে পাঁচমিনিট এগোলেই শ্যামল দাসের চেম্বার।

মিষ্টির দোকানের কাছে পৌঁছনোমাত্রই মাইকের বক্তৃতা ওদের কানে এসে ধাক্কা মারল। এতক্ষণ অন্যমনস্ক থাকায় বক্তৃতার রেশ ওরা খেয়াল করেনি।

‘…আজ আমাদের সকলের সামনে একটাই প্রশ্ন—বাঁচার প্রশ্ন। বন্ধুগণ, আপনারা কি জানেন গত দশবছরে কলকাতা শহর আর তার আশেপাশে গাড়ির সংখ্যা কী হারে বেড়েছে? দশবছরে, সবরকমের গাড়ি মিলিয়ে, মোট বৃদ্ধির হার প্রায় চোদ্দো গুণ। তার ওপরে রয়েছে বেপরোয়া শিল্পায়ন। সরকার এসব ঘটনার সমর্থনে বলেছেন, বেকার সমস্যার চটজলদি সমাধানে এই শিল্পায়ন জরুরি ছিল। এ ছাড়া গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি মানেও তো আরও মানুষের আরও চাকরির সুযোগ। সুতরাং, বেকার সমস্যার দ্রুত সমাধান হচ্ছেই। মাননীয় নেতাগণ, শুধু আমরা—মানে, ছাপোষা সাধারণ মানুষরা—যারা আপনাদের মতো নেতাদের ভোট দিয়ে মসনদে পাঠিয়েছি, আমরা বুঝতে পারিনি যে, আপনারা বেকার সমস্যার সঙ্গে-সঙ্গে জনসংখ্যার সমস্যাটাও চটজলদি সমাধান করার চেষ্টা করছেন। আজ পথেঘাটে কুকুর-বেড়াল মরছে, কাল আমরাও কুকুর-বেড়ালের মতো মরব। দেশে আর একটিও বেকার থাকবে না—সব খতম হয়ে যাবে, আর একইসঙ্গে মহামান্য সরকার বেকার সমস্যার সমাধান করে দেবেন।

‘বন্ধুগণ, এইরকম পরিস্থিতিতে কীসের নির্বাচন! আগে ভোটাররা বাঁচুক, তারপর তো ভোট…।’

মিটিং ঘিরে বেশ ভালোরকমই ভিড় জমেছে। জ্বালাময়ী ভাষণ শুনতে-শুনতে আদিত্য জটলা পেরিয়ে গেল।

সুনয়না বলল, ‘দেখবেন, ইলেকশান হবে না।’

আদিত্য একটু আনমনা ছিল। নয়নার কথার কোনও জবাব দিল না। ও কল্পনায় একটা থার্মোমিটার দেখতে পাচ্ছিল। তার পারা ক্রমাগত চড়ছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে কে জানে!

মুচিবাজারের পাশ দিয়ে একটা সরু গলি ঢুকে গেছে ভিতরে। গলিটা অন্ধকার। এদিকটায় বোধহয় লোডশেডিং হয়েছে। আদিত্য টর্চ জ্বালল। নয়নার হাতটা ধরল মুঠো করে।

‘ডক্টর দাসের চেম্বারটা কত দূরে?’ নয়না জিগ্যেস করল।

আদিত্য অন্ধকারে সতর্কভাবে পা ফেলতে-ফেলতে বলল, ‘এই তো, এসে গেছি।’

আর মিনিটখানেক হাঁটতেই ওরা ডক্টর দাসের চেম্বারে পৌঁছে গেল।

অন্ধকারে বাড়িটার আদল ঠিক বোঝা যায় না। তার ডান দিকে একটা ফাঁকা জায়গা—অনেকটা মাঠ মতন। তার একপাশে একটা পুকুর। গোটা জায়গাটার ওপরে কেমন এক ভূতুড়ে ঘোলাটে আলো ছড়িয়ে রয়েছে।

ডক্টর দাসের চেম্বারে ইমারজেন্সি ল্যাম্প জ্বলছে। সেখানে চেয়ারে-বেঞ্চিতে বসে আবছায়ার মতো অনেক মানুষ। বাইরের ফাটল ধরা উঁচু রোয়াকে ইমার্জেন্সি ল্যাম্পের সাদা আলো ছিটকে এসেছে।

নয়নাকে রোয়াকের কাছটায় দাঁড়াতে বলল আদিত্য। তারপর দু-ধাপ সিঁড়ি উঠে ঢুকে গেল চেম্বারের ভেতরে।

সুনয়না এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে অন্ধকার দেখল। ওর চোখ জ্বালা করছিল, আর মাথার ভেতরে একটু আগে শোনা বক্তৃতার লাইনগুলো ঘুরছিল।

আদিত্য বেরিয়ে এল মিনিটপাঁচেক পরেই। টর্চ জ্বেলে নয়নার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘চলো।’

‘ডাক্তারবাবু কী বললেন?’

‘বললেন, যত রাতই হোক যাবেন। আমাদের পাড়ার দিকে উনি কলে যান। আমাদের বাড়ির গলিটা চেনেন। আমি বাড়ির নম্বর দিয়ে দিয়েছি। আর সুদীপ্তদাকে চেনো তো? আমাদের পাড়ায় ব্রিজের বাঁ-দিকটায় থাকেন, ক্রিকেটের কোচ। ডক্টর দাসের ছেলে ওঁর কাছে ক্রিকেট খেলা শেখে। সুদীপ্তদার নাম বলার পরই উনি বললেন, আমার থাকার দরকার নেই, উনি ঠিক চলে যাবেন—।’

কথা বলতে-বলতে ওরা গলি ধরে অনেকটা পথ এগিয়ে গেল।

বাজারের কাছে মিটিং এখনও চলছে। কোনও একজন বিশেষজ্ঞ পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত দিচ্ছেন।

‘…এখন আমাদের স্ট্যাক স্যাম্পলিং করে দেখতে হবে, অ্যামবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি টেস্ট করে দেখতে হবে, মাপতে হবে নানা মিটিওরোলজিক্যাল প্যারামিটার। সোজা কথায়, যে-দূষিত বাতাস আমরা ফুসফুসে টেনে নিচ্ছি দেখতে হবে তার ক্ষতি করার ক্ষমতা কতটা মারাত্মক। এ ছাড়া, বাতাসের দূষণ জলে পৌঁছতে খুব একটা সময় লাগে না। যে-জল এখন আমরা রোজ খাচ্ছি তা কতটা বিশুদ্ধ কে জানে! বেপরোয়া শিল্পায়নের জন্যে এখন হয়তো জলের মধ্যে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, সায়ানাইড, লেড, ফ্লুওরাইড এসবের মাত্রা সাংঘাতিকরকম বেড়ে গেছে। খবরের কাগজে এত লেখালিখি হচ্ছে, কিন্তু তবুও সুরাহা কিছু হচ্ছে না। আমরা কলকাতার কয়েকটি এলাকার জল আর বাতাস অ্যানালিসিস করে দেখেছি। তার একটা রিপোর্ট আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি…।’

মিটিং-এর এলাকাটা পার হয়ে যেতেই সুনয়না বলল, ‘দিতুদা, চলুন, আমরা কলকাতা ছেড়ে চলে যাই—।’

আদিত্য মুখ ফিরিয়ে সাহসী মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল। ওর দু-কানের লতিতে দুটো মুক্তোর দুল। পাথর দুটো চকচক করছে। আর ওর চোখ দুটোও।

আদিত্য ছোট্ট করে ‘হুঁ’ বলল। আনমনাভাবে পা ফেলতে লাগল সামনের দিকে। ক’দিনের মধ্যেই চারপাশটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। জীবনটাকে যে যার মতন করে সাজাবে বলে ভাবছিল, কিন্তু…।

এমন সময় কালো ছায়ার মতো চারটে লোক ওদের কাছে এগিয়ে এল। ওদের একরকম ঘিরে দাঁড়াল।

ওরা দুজনে সবে অরবিন্দ সেতু ধরে দশ-বারো পা উঠেছে, তখনই ধোঁয়াশার আড়াল থেকে লোকগুলো বেরিয়ে এসেছে। ঘোলাটে আলোয় ওদের মুখ ভালো করে দেখা যাচ্ছে না।

‘আবে, মালকড়ি যা আছে বের কর—।’

সামনের লোকটা কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে মদের উগ্র বাষ্প নয়না আর আদিত্যর চোখেমুখে এসে ঝাপটা মেরেছে।

ডানপাশের ছায়াটা একটা লম্বা ছুরি বের করে আদিত্যর পাঁজরের কাছে ধরল।

নয়না একটা চিৎকার করতে গিয়েও সামলে নিল। শুধু অদ্ভুত একটা শব্দের টুকরো ছিটকে বেরোল ওর মুখ থেকে। আর আদিত্যর মুখের ভেতরে জিভটা যেন শিরীষ কাগজ।

‘অ্যাই সালি! চেঁচালে গলা ফাঁক করে দেব। চটপট গিনিগুলো খোল।’ পিছন থেকে একজন বলল।

নয়না সঙ্গে-সঙ্গে কাঁপা হাতে কানের দুল, গলার সরু চেন, খুলে দিয়ে দিল সামনের লোকটার হাতে। লোকটার খসখসে হাতের চামড়া নয়না ছুঁয়ে ফেলল পলকের জন্য।

আদিত্য ততক্ষণে পকেটের সামান্য ক’টা টাকা আর হাতঘড়ি আর-একজনের হাতে তুলে দিয়েছে।

‘আর কী আছে বের কর, নইলে সার্চ করব।’

‘বস, ফুলটুসিকে আমি সার্চ করব মাইরি।’ কথাটা বলার সঙ্গে-সঙ্গে পিছনের লোকটা নয়নার ঘাড়ের কাছে আলতো করে হাত দিল। নয়না শিউরে উঠে মাথা ঝাঁকুনি দিল।

আদিত্যর বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিল। ও শুকনো গলায় কোনওরকমে বলল, ‘আমাদের আর কিছু নেই। সব দিয়ে দিয়েছি।’

সামনের লোকটা জড়ানো গলায় বলল, ‘চারপাশে এই লাফড়া, তার মধ্যে গান্ডু ফুর্তি করতে বেরিয়েছে। শিগগির ফোট, নয়তো মাল এঁটো হয়ে যাবে—।’

পিছনের লোকটা ওদের ধাক্কা মারল। এবং পরক্ষণেই চারটে কালো ছায়া ধোঁয়াশার মধ্যে ক্রমে আবছা হতে-হতে মিলিয়ে গেল।

নয়না ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আদিত্য কাঁপা হাতে ওর মাথায় হাত বোলাল।

ওরা যন্ত্রের মতো হাঁটছিল। কেউ কোনও কথা বলতে পারছিল না।

অনেকক্ষণ পর আদিত্য নীচু গলায় বলল, ‘শুধু-শুধু তোমাকে ডেকে নিয়ে এসে এই ঝামেলায় ফেললাম। গয়নাগুলো…অনেক ক্ষতি হয়ে গেল…মাসিমা খুব বকাবকি করবেন…।’

নয়না হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছল। ঘাড় ঘুরিয়ে চেনা উদ্ধত ভঙ্গিতে তাকাল আদিত্যর দিকেঃ ‘আমি গয়নার জন্যে কাঁদছি না, দিতুদা। আপনার ঘড়ি আর টাকার জন্যেও না।’

‘তবে কেন?’

‘জানি না।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, তারপরঃ ‘আমার কান্না পাচ্ছে।’

‘মাসিমাকে কী জবাব দেবে?’

‘আজ নয় কাল ওগুলো যেতই। আমরাই বা আর ক’দিন আছি কে জানে!’

আদিত্যর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিম স্রোত নেমে গেল। নয়নার শেষ কথাটায় ওর মনে হল, এই দূষিত পরিবেশে আমরা সত্যি-সত্যি এখনও বেঁচে আছি তো!

ছয়

এক ভয়ংকর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।

যদি এভারেস্টের চুড়ো থেকে কয়েকহাজার প্রকাণ্ড লোহার বল গড়িয়ে-গড়িয়ে নীচে নামে, তা হলে বোধহয় অনেকটা এইরকমই শব্দ হবে। যদিও এই শব্দটা খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।

শুধু শব্দ নয়, সেইসঙ্গে কেঁপে উঠেছে মাটি। যেন কয়েক সেকেন্ডের প্রবল ভূমিকম্প। কেঁপে উঠল খাট-বিছানা। ঝনঝন করে ভেঙে গেল জানলার কাচ। দেওয়াল থেকে খসে পড়ে গেল হলোগ্রামে ধরা ত্রিমাত্রিক নিসর্গ চিত্র।

নিশ্চয়ই ভূমিকম্প! বিছানায় উঠে বসে ঘড়ি দেখল আদিত্যঃ ছ’টা দশ। আর ঠিক তখনই শুনতে পেল সমবেত গলায় উলুধবনি আর শাঁখের আওয়াজ। কিছু-কিছু সংস্কারে সময়ের মরচে ধরে না। এটাও বোধহয় তাই।

মাথাটা সামান্য টলছিল। খুব সাবধানে বিছানা ছেড়ে মেঝেতে নামল। দেখল, ঘরের পুবদিকের দেওয়ালে লম্বালম্বি এক চিড় ধরেছে। সুরেন্দ্র-নিলয়ে থাবা বসিয়েছে অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা।

দোতলা থেকে সকলের চেঁচামেচি কলরোল শুনতে পেল আদিত্য।

প্রথমে গলির দিকের জানলা দিয়ে উঁকি মারল। কিছু বোঝা গেল না। তখন কোনওরকমে হাত-মুখ ধুয়ে জামাটা গায়ে গলিয়ে চলে গেল দোতলায়।

গিয়ে দেখল যা ভেবেছে তাইঃ প্রায় সকলেই বারান্দায়। মুন্নি আর লতা শরীরটাকে বিপজ্জনকভাবে রেলিঙের ওপর দিয়ে ঝুঁকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। মা ওদের পাশে দাঁড়িয়ে। হতভম্ব মুখ-চোখ। বারবার শুধু বলছে, ‘কীসের শব্দ? কোথা থেকে এল শব্দটা?’

আদিত্য মুখ বাড়িয়ে পুবদিকটায় জমাট কালো ধোঁয়া দেখতে পেল। লক্ষ করল, গতকালের ধোঁয়াশা অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে।

গলি থেকে বেশ কয়েকজন পুরুষমানুষ রওনা দিয়েছে মারাত্মক শব্দের খোঁজে। বাড়ির বারান্দায় কিশোরী-মহিলাদের জটলা। আদিত্যর মনে হল, সবগুলো মুখের মধ্যেই কোথায় যেন একটা মিল রয়েছে। গত কয়েকদিনের অপুষ্টি ছাপ ফেলেছে। মুখগুলো শুকিয়ে গেছে। সঙ্কটের রেখা এলোমেলো জ্যামিতির সৃষ্টি করেছে সেখানে।

আদিত্য বলল, ‘মনে হয় কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমি দেখে আসছি—।’

মা ভয়ের চোখে দিতুকে দেখল।

পলাশ শয্যাশায়ী। যদিও ডাক্তারবাবু গতকাল দেখে গেছে, ওষুধ দিয়ে গেছে, আশ্বাসও দিয়েছে। তবুও কোথায় যেন একটা অনিশ্চিত আশঙ্কা কাজ করে চলেছে।

মা শুধু শুকনো ঠোঁট নেড়ে বলল, ‘সাবধানে যাস—।’

মুুন্নি হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমিও যাব তোর সঙ্গে—।’

আদিত্য মা-কে দেখল, লতাকে দেখল। তারপর ছোট্ট করে বলল, ‘চল—।’

রাস্তায় নেমে এক অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করলঃ এই সাতসকালেই অনেকে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে রওনা হয়েছে। সঙ্গে বউ-বাচ্চাকাচ্চা।

মুন্নি জিগ্যেস করল, ‘এরা সব কোথায় যাচ্ছেরে?’

আদিত্য ঠোঁট ওলটালঃ ‘কী জানি!’

ওর মনে পড়ল ডাক্তার মণ্ডলের কথা। কিন্তু মুন্নিকে কিছু বলল না।

সরু গলির ফাঁকফোকর দিয়ে আদিত্য খালের দিকেই এগোচ্ছিল। তখনই ওর চোখে পড়ল ভোরবেলা যে সামান্য গাড়িঘোড়া চলে তারা সব সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গেছে। এখন কুয়াশা তেমন নেই। বরং প্রায় স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। তাই ব্যাপারটা ওর কাছে কেমন বেখাপ্পা লাগল।

উলটোডাঙ্গার খালের দিকটায় যেতে হলে একটা ছোট পার্কের মধ্যে দিয়ে গেলে খানিকটা পথ কমানো যায়। সেইজন্যই পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল মুন্নি আর ও। ভোরবেলা এই পার্কে ছেলেরা ফুটবল খেলে, ব্যায়াম করে। আজ কেউ নেই। কেউ যে থাকবে না সেটা আরও স্পষ্ট মাঠের চেহারায়। মাঠের একটা অংশ গাঢ় সবুজ ঘাসের কার্পেটে ঢাকা ছিল—ক’দিন আগেও। এখন নেই। ঘাসের নীরস কঙ্কালগুলো কালচে হয়ে লেপটে রয়েছে মাটির সঙ্গে।

টিভির সাক্ষাৎকারের কথা মনে পড়ল আদিত্যরঃ মাটির রসায়ন পালটে গেছে। সেই মাটির নানা জায়গায় পড়ে আছে কয়েকটা মরা পাখি, মরা প্রাণী।

মুন্নির চোখে-মুখে অসহায়ভাব ফুটে উঠেছিল। তাই দেখে ছোট বোনটার জন্য মন খারাপ হচ্ছিল আদিত্যর। ও স্কুলে-কলেজে পড়া বিজ্ঞানের নানা বিষয় মনে করার চেষ্টা করছিল। কোনওভাবে কি এই অবস্থাটাকে সামাল দেওয়া যায়?

পার্কের ভেতর দিয়ে আরও অনেকে যাচ্ছিল। হঠাৎই শুভেনের গলা পেল আদিত্য।

‘অ্যাই দিতু!’

আদিত্য তাকাল। শুভেন লম্বা-লম্বা পা ফেলে ওর দিকেই আসছে। ওকে আরও বেশি কালো লাগছে আজ। তবে চোখের উজ্জ্বলতা কমেনি। মাথার চুল উসকো-খুসকো। ওকে দুটো নতুন প্যাড এনে দিয়েছে আদিত্য। কবিতা লেখার ফাঁকে-ফাঁকে ও চাকরির চেষ্টা করে। তবে সে ব্যাপারে খুব যে ঝোঁক আছে তা নয়।

শুভেন আদিত্যদের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। জিগ্যেস করল, ‘কেসটা কী বল তো মাইরি?’

আদিত্য ঠোঁট ওলটাল। সূর্যের আলো বাড়ছে, তবে এখনও মাটিতে স্পষ্ট ছায়া ফুটছে না। কোথা থেকে ভেসে আসা ধোঁয়াশার মেঘ উড়ে যাচ্ছে মাঝে-মাঝে।

‘সবাই সালা—’ বলেই মুন্নির দিকে তাকিয়ে জিভ কাটল শুভেন, তারপর আবার বলল, ‘সবাই শুনছি কেটে পড়েছে। আমার বাপটা তো দেড়বছর ধরে বিছানায় সাঁটা। জানিস তো, গলা, বুক, পেট-ফেট সব নানচাকু হয়ে গেছে। মা-টা সকাল বিকেল কাঁদছে। বলে, আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে চল। কী যে করি না—। দাদাকে পরশুদিন একটা চিঠি দিয়েছি…।’

আদিত্য সব শুনল। কথাগুলো ওর বুকের ভেতরে কেটে-কেটে বসছিল।

মুন্নি হঠাৎ বলে উঠল, ‘শুভেনদা, এই পলিউশান কলকাতা ছাড়িয়ে কত দূর পর্যন্ত গেছে জানেন?’

আদিত্য বুঝল, দুর্গাপুরের অবস্থা জানতে চাইছে মুন্নি। রজত সোমবার ভোরে সেখানে রওনা হয়ে গেছে।

শুভেন বলল, ‘সবাই তো বলছে, এখন নাকি কলকাতার বাইরে অনেকটাই ছড়িয়ে গেছে। কীরে, তোরা কী করবি কিছু ঠিক করেছিস?’

শেষের প্রশ্নটা আদিত্যকে লক্ষ করে। মুন্নি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাঁটছিল।

আদিত্য নীচু গলায় বলল, ‘এখনও ঠিক করতে পারিনি—।’

ওরা পার্কের বাইরে বেরিয়ে এল। রাস্তাটা এখানে একটু চওড়া। দুপাশে বাড়ি-ঘর। এর মধ্যে একটা বাড়ি অন্তত নব্বই বছরের পুরোনো। পাড়ার বয়েজ হাইস্কুলের প্রাক্তন হেডমাস্টারমশাইয়ের বাড়ি। তাঁর বয়েসও বোধহয় বাড়ির বয়েসের কাছাকাছি। সেই বাড়ির একটা অংশ ধসে পড়েছে রাস্তায়। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ইট, চুন, বালি, রাবিশ। সেখানে জনাকয়েক মানুষের জটলা। বাড়ির যে-অংশটা এখনও অর্ধেকটা ভাঙা বারান্দা নিয়ে খাড়া হয়ে আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন লোলচর্ম বৃদ্ধ। কুঁজো হয়ে গেছেন বয়েসের ভারে। একহাতে বারান্দার রেলিং ধরে অন্য হাতটায় চোখ আড়াল করে দেখতে চাইছেন অকুস্থল। শরীর ও হাত ভীষণ কাঁপছে। তাঁকে সামাল দিতে পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক প্রৌঢ়।

বাড়িটার নানা জায়গায় ফাঁকফোকরে বট-অশ্বত্থের রাজত্ব ছিল। আদিত্য জানে, এইসব ‘পরজীবী’ গাছ বাড়ির প্রাণ শুষে নেয়, ফাটল ধরায়। কিছুতেই এদের খতম করা যায় না। কিন্তু এখন? সবক’টা গাছই নীরস কঙ্কাল। শেকড়-বাকড় বের করে হা-হা করছে।

এবার ভিড়টা বেড়েছে, আর সেইসঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচিও। আর কয়েক পা এগোলেই হয়তো চোখে পড়বে জায়গাটা। এখান থেকে কালো ধোঁয়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

খুব সাবধানে আবর্জনা এড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ওরা। দু-দিন ধরে রাস্তা সাফাই বন্ধ। জল সরবরাহ অনিয়মিত। রেশন-দোকানে প্রায় অচল অবস্থা।

আদিত্য বলল শুভেনকে, ‘প্যাড তো নিলি। কবিতা আসছে?’

শুভেন কাশল জোরে। শব্দ করে থুতু ফেলল রাস্তায়। বলল, ‘আসছে—তবে ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো। কোনওদিন ভাবিনি এরকম লাইন লিখব—।’

মুন্নি শাড়ির কোঁচাটা সামান্য তুলে একটা মরা বেড়াল এড়িয়ে গেল। তারপর কিছুটা আগ্রহ ফুটিয়ে তাকাল শুভেনের মুখের দিকে।

শুভেন বলল, ‘দিতু, ভাবলে কষ্ট হয়, জানিস! গত সপ্তাহে লিখেছিলামঃ

“যদি ঈশ্বর হতাম,

প্রতিটি গাছের প্রতিটি পাতায় লিখে দিতাম—

তোমার নাম।”

আর এখন কী লিখছি শুনবি?

“আজ শুধু অলৌকিক খেলা।

চারিদিকে শবের পাহাড়

বলো দেখি, কোনটা আমার?

বাজি থাক এক লক্ষ টাকা।”

মুন্নি হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠল। শুভেনের চোখ জ্বলজ্বল করছিল। ও অবাক চোখে এই স্পর্শকাতর কিশোরীকে দেখছিল। আর তখনই অরবিন্দ সেতুর মাঝের অংশটা আদিত্য দেখতে পেল। অথবা বলা যেতে পারে, দেখতে পেল না। কারণ, ওটা আর নেই!

দুর্ঘটনার দৃশ্যটা ওদের স্তম্ভিত করে দিল।

একটা প্রকাণ্ড এরোপ্লেন মুখ থুবড়ে পড়েছে উলটোডাঙ্গার খালের মধ্যে। আর সেই সঙ্গে উধাও করে দিয়েছে অরবিন্দ সেতুর মাঝের অংশটা। অথচ কাল রাতেই এর ওপরে পা ফেলে হেঁটে গিয়েছিল নয়না আর আদিত্য!

আদিত্য দূর থেকেই আগুনের তাপ টের পাচ্ছিল। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে খালপাড়ের কাছটায় এগোতেই ধোঁয়ার কালো মেঘের আড়াল ভেদ করে আগুনের শিখা চোখে পড়ল। একইসঙ্গে প্লেনটার যেটুকু অংশ যে-অবস্থায় চোখে পড়ল তাতে স্পষ্টই অনুমান করা যায় চালক বা যাত্রীদের কেউই বোধহয় বেঁচে নেই।

আদিত্যর চোখ জ্বালা করছিল। সেই অবস্থাতেই ও চারপাশে দেখছিল।

খালের দু-ধার ঘেঁষে সারি-সারি খোলার ঘর আর ঝুপড়ি। বহু বছর ধরেই এই ঝুপড়িগুলো এখানে রয়েছে। এর বাসিন্দারা নানা জীবিকা আঁকড়ে ধরে কোনওরকমে টিকে থাকার লড়াই চালায়। কেউ কাগজ কুড়িয়ে সংসার চালায়, কেউ পুরোনো প্লাস্টিক আর পলিথিনের ব্যাবসা করে, কেউ লুকিয়ে চোলাই মদের ঠেক চালায়, আর বেশিরভাগই সাইকেলভ্যান চালানোর কাজ করে। এখানকার পুুরুষদের মেয়ে-বউরা লোকের বাড়ি-বাড়ি ঠিকে কাজ করে আর বাড়তি সময়ে ফষ্টিনষ্টি করে দু-পয়সা আয় করে। এখানকার মেয়েগুলো বারো-তেরো বছর বয়সেই কপালে কাচপোকা টিপ পরে, মাথায় কুচি দিয়ে লাল ফিতে বাঁধে, ঠোঁটে লিপস্টিক লাগায়, আর চোখের নজর রগরগে নেমন্তন্নর কার্ডের মতো করে ঘুরে বেড়ায়।

আদিত্য মুন্নিদের ঘিরে ঝুপড়ির মানুষজনও জটলা করেছিল। নজর সকলেরই খালের দিকে। ওদের বেশ কয়েকজনও যে এই দুর্ঘটনায় তলিয়ে গেছে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। ওরা অনেকেই পাগলের মতো ছুটোছুটি করছিল। ভাঙাচোরা ঘর থেকে নিজেদের সামান্য যা-কিছু জিনিসপত্র বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল।

আদিত্যর নাকে পোড়া গন্ধ আসছিল। কী-কী একসঙ্গে পুড়লে এরকম গন্ধ পাওয়া যায় আদিত্য সেটা ঠাহর করতে পারল না।

চারপাশে বেশ একটা হইচই হচ্ছিল। কিন্তু কোনও কথাই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। শব্দগুলো সব যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। যে-সেতারটা কিছুদিন ধরে বেসুরো বাজছিল আজ সাতসকালে সেটার তারগুলো যেন ছিঁড়ে গেছে।

খালের ধার ঘেঁষে চওড়া রাস্তা। রাস্তার একপাশে গোটাচারেক বহুতল বাড়ি। সেগুলোর ছাদ আর বারান্দায় লোকজনের ভিড়।

পুলিশ এখনও এসে পৌঁছয়নি। তবে কাছাকাছি দবকল-অফিস থাকায় কয়েকজন দমকল কর্মী পোশাক পরে এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের দৃষ্টি বিভ্রান্ত। যেন কী করবে ভেবে উঠতে পারছে না।

জটলার মধ্যে নানা মন্তব্য কানে আসছিল। সাতসকালে প্লেনটা যাচ্ছিল কোথায়? ধোঁয়াশার জন্য বিমান চলাচল তো বন্ধ থাকার কথা! হয়তো সকালে আকাশ পরিষ্কার ছিল, তাই চলতে শুরু করেছিল।

আদিত্য একবার আকাশের দিকে দেখল। ঘোলাটে ভাবটা বাড়ছে ধীরে-ধীরে।

হঠাৎই শুভেন ওর কাছে এল। এতক্ষণ ও ভিড়ের মধ্যে কোথায় ঢুকে পড়েছিল। আদিত্যর কাঁধে টোকা দিয়ে ডেকে বলল, ‘দিতু, রীতেনটা মারা গেছে!’

রীতেন। আদিত্যর সঙ্গে চার-দশে রবারের বলে খেপ খেলত। ওদের মধ্যে একমাত্র রীতেনই ডিভিশন পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল। ও এখনও থার্ড ডিভিশনে কাশীপুর স্পোর্টিং-এ খেলত। আর বডি ফিট রাখার জন্য প্রতিদিন ভোরে অরবিন্দ সেতুর ওপরে দৌড়ত।

শুভেনের পাশে রোগামতন কালো একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি, আর লাল হাফপ্যান্ট। ছেলেটাকে দেখিয়ে শুভেন বলল, ‘রীতেনের ভাই। ওর পেছন-পেছন দৌড়চ্ছিল। প্লেনটা একেবারে দৈত্যের মতো রীতেনের ঘাড়ে এসে পড়েছে। ব্যস, খেলা খতম!’

ছেলেটা শব্দ না করে কাঁদছিল। শুভেন ওকে পিঠ চাপড়ে টেনে নিয়ে গেল একদিকে।

মুন্নি কাঁপা গলায় বলল, ‘ছোড়দা, বাড়ি চল—।’

আদিত্য এবার দূর থেকে অনেকগুলো গলায় কান্নার আওয়াজ পেল।

এতক্ষণ খেয়াল করেনি। এই সর্বনাশা দুর্ঘটনা কতজনকে শেষ করে দিয়েছে কে জানে! কত বাড়ি ধসে পড়েছে, কত বাড়িতে ফাটল ধরেছে তারও কোনও হিসেব নেই।

দূরে, খালের ওপারে, ধোঁয়ার হালকা আস্তরণ ভেদ করে চোখে পড়ল বহুতল কয়েকটা বাড়ির অবয়ব। ওপারে রাস্তার ধার ঘেঁষে বড়-বড় তিনটে বাড়ি ছিল। এখন দুটো। বাঁ-দিকের বাড়িটা মাপে এখন বামন হয়ে গেছে। লোকজনের কথাবার্তায় জানা গেল, দিশেহারা এরোপ্লেনটা নাকি প্রথমে ওই বাড়িটাকেই ধাক্কা মেরেছে।

খালের জল এমনিতেই কালো। গত ক’দিনের আবহাওয়া তাকে আরও কালো করে দিয়েছে। এখন প্রচণ্ড তাপে সে-জলে টগবগ করে যেন খই ফুটছে। ফুটন্ত তেলে একটা ভাঙা এরোপ্লেন ভাজা হচ্ছে।

মুন্নি এবার আদিত্যর জামা ধরে টান মারল। মুখে হাত চাপা দিয়ে অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘ছোড়দা, বাড়ি চল। আমি আর দেখতে পারছি না।’

আদিত্যর শরীরও কেমন করছিল। ও ছোটবোনকে নিয়ে বেরিয়ে এল ফাঁকা জায়গায়।

তখনই সাইরেনের আওয়াজ ওদের কানে এল। ডপলার এফেক্টের জন্য সাইরেনের শব্দের কম্পাঙ্ক দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। দূর থেকে ছুটে আসছে কয়েকটা জিপ, ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স, আরও কত গাড়ি।

এমনসময় রামুদার চিৎকার শোনা গেলঃ ‘আজ থেকে সব ছুটি। অফিস নেই। ইস্কুল-কলেজও আর খুলবে না। কী আনন্দ! সরকার থেকে খাবার বিলির কাজ শুরু হয়েছে। রোজ দু-বেলা সরকারি নেমন্তন্ন। কেন নেমন্তন্ন? বিয়ে…কুয়াশা আর কালো বৃষ্টির বিয়ে…।’

রামুদা সাইকেল চালিয়ে আসছিল। সাইরেনের কান-ফাটানো শব্দ আর লোকের ভিড় তাকে থামিয়ে দিল। কাঁচাপাকা চুল মাঝবয়েসি লোকটা হতভম্ব হয়ে খালধারের দিকে এগোল। কয়েকবার কাশল। রোজ খবরের কাগজের হেডিং মুখস্থ করা অভ্যেস। এই দুর্ঘটনার খবরটা এখনও কাগজের হেডিং হয়নি। আদিত্য লক্ষ করল, চশমার ফাঁক দিয়ে দেখা ভয়ংকর দৃশ্যটা যে রামুদা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না, সেটা তার মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

ওরা ভাইবোনে যখন বাড়ির দিকে ফিরছে তখন প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের কয়েকটা গাড়ি ওদের পাশ দিয়ে চলে গেল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এই অদ্ভুত দুর্ঘটনার ছবিটা সকলের বাড়িতে ঢুকে পড়বে।

আদিত্যর মন বলছিল, আর সময় নেই। আর বেশি সময় নেই। তারপরেই খতমের খেলা শুরু হয়ে যাবে।

সাত

‘একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে সাড়ে সাত হাজার লিটার বাতাস দরকার।
যদি সেই বাতাসের সঙ্গে দূষিত পদার্থ মিশে থাকে, তা হলে সেগুলো গিয়ে জমা হবে ফুসফুসে। যেসব দূষিত কণার ব্যাস দশ মাইক্রোমিটারের বেশি, তাদের বেশিরভাগই আটকা পড়ে যায় নাকের সূক্ষ্ম রোমের ছাঁকনিতে। কিন্তু আরও ছোট কণাগুলো ঢুকে যায় নাকে, গলায়, শ্বাসনালিতে ও ফুসফুসে। এবার ক্ষতির পরিমাণ কতটা হবে তা নির্ভর করবে দূষণের “থ্রেশোল্ড লিমিট ভ্যালুজ”-এর ওপরে। আগে এই মানকেই বলা হতো “ম্যাক্সিমাম অ্যালাওয়েব্ল কনসেনটেশান” বা “ম্যাক”। এখন কলকাতার বাতাস যেরকম দূষিত হয়ে পড়েছে তাতে “ম্যাক”-এর মান অনেক নেমে গিয়ে বিপজ্জনক অবস্থা দেখা দিয়েছে। এখন সকলের উচিত নাকে-মুখে ভেজা কাপড় চাপা দেওয়া। আর যাদের গ্যাস-মুখোশ ব্যবহারের সুযোগ…।’

আদিত্য বিরক্ত হয়ে বন্ধ করে দিল টিভির সুইচ। ক’দিন ধরে এই এক জিনিস চলছেঃ বিশেষজ্ঞদের মতামত।

মৃতদেহ ঘিরে বসে থাকা শ্মশানযাত্রীর মতো ছ’টা প্রাণী চুপচাপ বসে রয়েছে ঘরের এখানে-ওখানে। কারও মুখে কোনও কথা নেই। ঘোলাটে আবহাওয়ায় ঘরের আলোর তেজ অনেক কম। কারও মুখই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। সকলেই বোধহয় চাইছে, অন্য কেউ কথা বলুক।

লতা মাথা নীচু করে নানকুর মাথায় হাত রেখে মেঝেতে বসে। নানকুর মুখে কোনও শব্দ নেই। ও অনেক বড় হয়ে গেছে এ-ক’দিনে, ভাবল আদিত্য। ‘জ্যাক অ্যান্ড জিল’ অথবা মাদ্রাজি নমস্কার কিংবা ‘আশকারা খাওয়ার’ ব্যাপারগুলো যেন কত বছরের পুরোনো স্মৃতি।

মুন্নি মায়ের বিছানার এক কোণে বসে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মা বিছানায় উবু হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে। অন্য হাতে একটা ছোট ভিজে গামছা। পলাশ ঘরের একমাত্র ইজিচেয়ারটায় গা এলিয়ে চোখ বুজে আছে। গত দু-দিনে শরীর মোটামুটি সেরেছে বটে, তবে মন সেরে ওঠেনি।

আদিত্য অস্পষ্ট অবয়বগুলো আর-একবার দেখল। ওর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল ভেতরে-ভেতরে। দূষিত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা যেন ‘ছায়ার সঙ্গে কুস্তি’ করা। ও কয়েকটা পা ফেলে এগিয়ে গেল বাবার ফটোর কাছে। এই মানুষটা বেঁচে থাকলে আদিত্য বেঁচে যেত। ওর ওপরে কোনও সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থাকত না। পছন্দ না হলেও সবাই চুপচাপ মেনে নিত এই লোকটার কথা।

অনেক চেষ্টা করে আদিত্য কথাগুলো বের করতে পারল মুখ দিয়েঃ ‘আর কোনও পথ নেই। আমাদের কলকাতা ছেড়ে পালাতে হবে—।’

আদিত্যর খুব কষ্ট হচ্ছিল। ওরা চলে যাবে এই শহর ছেড়ে। এখানে পড়ে থাকবে সুরেন্দ্র নিলয়, বাবার অস্থিভস্ম, ভক্তদাসের মৃতদেহ, বাবার ফটো, আর চোদ্দো বছরের হাজার স্মৃতিকণা। প্রবল বালিঝড়ে মরুভূমিতে যেমন বালিকণা বেপরোয়া উড়ে যায়, ছড়িয়ে যায়, এই ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নিষ্ঠুর হাতে ঠিক সেইরকম উড়িয়ে দেবে, ছড়িয়ে ছত্রখান করে দেবে অসংখ্য স্মৃতিকণা।

মা বিশ্রীভাবে কাশল কয়েকবার।

পলাশ চোখ খুলল, বলল, ‘সবাই পালাচ্ছে—।’

মুন্নি কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘অতসীরা চলে গেছে, নরেন জেঠুরাও আজ সকালে রওনা হয়ে গেছে—।’

আদিত্য জানে।

অফিস-কাছারি, স্কুল-কলেজ, সিনেমা হল, সব বন্ধ। দোকানে বাজারে একটুকরো খাবারের জন্য মানুষগুলো জানোয়ারের মতো লড়াই করছে। এ-ক’দিন ধরে জমানো চাল-ডাল আর দুধ খেয়ে মা কোনওরকমে টিকে আছে। কিন্তু খাবারের ভাঁড়ারও এখন প্রায় শূন্য। শুধু ওদের নয়, লক্ষ-লক্ষ লোকের। ইতিহাসে পড়েছে, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ছিল মানুষের তৈরি। এই নতুন মন্বন্তরও তাই।

গত কয়েকদিনে টিভিতে কাগজে শুধু লড়াই আর হানাহানির কথা। কেউ বলেছেন, গত বিশবছরে কলকাতাকে যে-বেপরোয়া শিল্পায়নের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাতে এই পরিস্থিতি অনিবার্য ছিল। তার ওপরে রয়েছে পেট্রল-ডিজেল নির্ভর যানবাহনের পরাবৃত্তীয় ক্রমবৃদ্ধি। আবার কেউ বলছেন, সভ্যতার ক্রমবিকাশের জন্য এই শিল্পায়ন ছিল অত্যন্ত জরুরি।

শুধু অভিযোগ, আর পালটা অভিযোগ। দেশের কর্তাব্যক্তিদের ভদ্রতার মুখোশ খসে পড়েছিল অনেক আগেই। এখন তাঁদের দাঁত-নখও দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার।

রাত বাড়ছিল। সেইসঙ্গে আদিত্যর ভয়ও। খাওয়ার সময় এগিয়ে এলেই ওর ভয় হয়।

ও মায়ের কাছে এগিয়ে গেল। মা ভিজে গামছাটা নাকে-মুখে ঘষছিল বারবার। মায়ের পিঠে আলতো হাত রেখে আদিত্য বলল, ‘সামান্য যা কিছু গুছিয়ে নিয়ো, মা। কাল ভোরে আমরা রওনা হব।’

মা আর পারল না। হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। বলল, ‘এসব ছেড়ে কোথায় যাবি, দিতু? কোথায় যাবি তুই?’

আদিত্য মাথা নাড়ল। বলল, ‘এখনও জানি না। তবে কলকাতা থেকে দূরে—গ্রামের দিকে—যেখানে এখনও গাছপালা আছে, পাখি আছে।’

নানকু মায়ের কাছ থেকে হঠাৎই ছুটে এল আদিত্যর কাছে। বায়না করে বলল, ‘কাকুমণি, পাখি নেব। পাখি নেব। ভক্তদাসের মতো—।’

দিতু ওর মাথায় হাত বোলাল। বলল, ‘দেব রে, আমরা পাখির দেশে যাচ্ছি।’

একটু আগেই বাচ্চাটা কেমন গুম মেরে বসেছিল। ‘পাখি’ কথাটাই ওকে কেমন চঞ্চল করে তুলেছে এক মুহূর্তে। আদিত্য আগে কখনও বোঝেনি এই ছোট্ট শব্দটার এরকম মনোহারী গুণ আছে। অথচ মা তখনও কাঁদছে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে।

পলাশ দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল। জড়ানো গলায় বলল, ‘লতা বলছিল, ওদের বাড়ি চলে যাবে…।’

বউদিদের বাড়ি সোনারপুর। সেখানে অবস্থা কীরকম আদিত্য জানে না। টিভি আর খবরের কাগজের মাধ্যমে যেটুকু জেনেছে তাতে এই দূষণ কলকাতাকে কেন্দ্র করে রোজই ছড়িয়ে পড়ছে দূরে, দূরান্তরে। সরকারের খাবার বিলির কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি ট্রাক আর লরি শহরের বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শহর থেকে দূরে। কিন্তু মাঝে-মাঝেই গাঢ় ধোঁয়া সবকিছু ঢেকে দিয়ে যানবাহন অচল করে দিচ্ছে। দুর্ঘটনাও হচ্ছে মুড়িমুড়কির মতো। আদিত্যর মনে পড়ল দু-দিন আগের বিমান দুর্ঘটনার কথা, রীতেনের কথা। মনে পড়ল, কান্নার শব্দ, অসংখ্য ক্রেন আর মানুষের কর্মব্যস্ততা, ধোঁয়া, আগুন—সবমিলিয়ে এক আশ্চর্য সর্বনাশ।

আদিত্য তাকাল লতার দিকেঃ ‘তুমি কী করে যাবে, বউদি? চারদিকে সাংঘাতিক অবস্থা চলছে—।’

লতা কাঁদো-কাঁদো মুখে পলাশের দিকে তাকাল। মানুষটার শরীরে এখনও তেমন জোর আসেনি। লতার একটামাত্র ভাই। পরেশ। বয়েস বাইশ-চব্বিশ হবে। সে হয়তো লতার দু-বোন আর মা-বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত আছে। কিন্তু এই মারাত্মক অবস্থার কথা জেনেও পরেশ একবার খোঁজ নিতে আসেনি।

আদিত্য নানকুকে মুন্নির কাছে দিল। তারপর বলল, ‘তুমি চিন্তা কোরো না, বউদি। আমি কাল সকালে তোমার বাড়ির খবর নেওয়ার চেষ্টা করব। তারপর আমরা রওনা হব। তবে যা বললাম, গোছগাছ করে নাও—এর পরে সে-সময়টুকুও আর থাকবে না।’

মুন্নি বলল, ‘শুনছিলাম, সুবোধদার বাচ্চা মেয়েটা নাকি মারা গেছে—।’

সুবোধ পাল। বড় রাস্তার কোণে বইয়ের দোকান আছে ভদ্রলোকের। স্কুল-কলেজের বই পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে নানান বাংলা-ইংরেজি ম্যাগাজিন। সুবোধদার দোকানে ম্যাগাজিন দ্যাখে না, এ-পাড়ায় এমন লোক খুব কম। ওঁর মেয়েটাও মাঝে-মাঝে দোকানে বসত। বছরসাতেক বয়েস। বেশ হাসিখুশি ছিল।

মা চোখ মুছে জিগ্যেস করল, ‘কী করে মারা গেল? কখন?’

মুন্নি কষ্ট করে কথা বলছিল, ‘কাল সন্ধেবেলা মারা গেছে। কী হয়েছিল কেউ জানে না। ডাক্তারও বলতে পারেনি। শুধু হাঁপের টান উঠছিল বারবার।’

লতা আচমকা ছুটে এসে নানকুকে জাপটে ধরল। ভাঙা গলায় বলল, ‘ছোড়দা, চলো আমরা এখুনি চলে যাই—।’

পলাশ বিরক্তভাবে বলল, ‘আঃ, লতা—কী হচ্ছে? কী ছেলেমানুষি করছ!’

ঘরের মধ্যে ধোঁয়াশা গাঢ় হচ্ছিল। কে যেন কেশে উঠল দুবার।

আদিত্যর গলার ভেতরে একটা গিরগিটি নড়াচড়া করছিল। পেটের ভেতরটা নখর হাতে খামচে ধরেছে যেন কেউ। কারও মুখই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। মুখগুলো ধীরে-ধীরে আবছা হয়ে যাচ্ছে। হয়তো একসময় মিলিয়ে যাবে।

মায়ের ওষুধ রাখার তাকে একটা টেবিলঘড়ি আছে। আদিত্য সময় দেখতে চাইল। কিন্তু মাত্র সাত-আট ফুট দূর থেকেও তার উপায় নেই। আদিত্য ঘড়িটার খুব কাছে গিয়ে সময় দেখলঃ ন’টা দশ। আবার মনে পড়ল, খাওয়ার সময় এগিয়ে আসছে। ওর গলার ভেতরে গিরগিটিটা নখের আঁচড় কাটল।

আঁচড়ের কষ্টটা ভোলার জন্য টিভির সুইচটা অন করে দিল আদিত্য। সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হয়ে গেল নানা চ্যানেলের প্রতিযোগিতা। বিপদকে কে কত বেশি বিপজ্জনক করে দেখাতে পারে তার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। নানকু ছাড়া আর সবাই টিভি দেখার জন্য টিভি সেটের আরও কাছে এগিয়ে এল।

আদিত্য ঘর ছেড়ে বেরোতেই শুনতে পেল কলিংবেল বাজছে। কে ডাকতে এল এখন? পিছন ফিরে ‘আমি দেখছি’ বলে ও সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নীচে।

নামতে-নামতে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপকে আজ অনেক আপন মনে হচ্ছে। ময়লা পড়া ঘোলাটে বাল্‌বটাও যেন কত চেনা। দেওয়ালের প্রত্যেকটি ত্রুটি, ড্যাম্পের দাগ, সবই কত নিজের—চোদ্দো বছরের বন্ধু। ওদের ছেড়ে চলে যেতে হবে। কে জানে, আর কখনও ফেরা হবে কি না। কে জানে, আরও কতদিন ধরে চলবে কুয়াশা আর কালো বৃষ্টির বিয়ে!

আদিত্য বুকে হাত বোলাল। রোজ সাড়ে সাত হাজার লিটার করে বাতাস নেয় এর ভেতরে। গত সাতদিনে বাহান্ন হাজার পাঁচশো লিটার বাতাস নিয়েছে। আদিত্য পরম আদরে পাগলের মতো হাত বোলাতে লাগল বুকে। ফুসফুসজোড়াকে উদ্দেশ্য করে অস্ফুট গলায় বলল, ‘কী রে, তোরা এখনও ঠিকঠাক আছিস তো?’

আদিত্যর ফুসফুস কোনও উত্তর দিল না।

সদর দরজার কাছে এসে একটা গাঢ় ছায়া দেখতে পেল। কাছে যেতেই শুনল ছায়াটা বলছে, ‘আদিত্য দাদাবাবু আছেন?’

গলার স্বরেই কিছুটা আন্দাজ করেছিল, আরও কাছে গিয়ে চিনতে পারল। দশরথ। মাঝবয়েসি মানুষ। সুনয়নাদের বাড়ি কাজ করে। খুব পান খায়, আর কারণে-অকারণে হাসে—এমনকী বকাঝকা করলেও। তবে এখন হাসছে না।

রাস্তার দুর্গন্ধ নাকে আসছিল। কিন্তু আদিত্য নাকে হাত চাপা দিল না। এভাবে কতক্ষণই বা আত্মরক্ষা করা সম্ভব? জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার, দশরথদা?’

‘দিদিমণি আপনাকে একবার ডেকেছেন—।’

আদিত্যর মনে অনেকগুলো প্রশ্ন জাগছিল, কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘তুমি যাও—আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।’

এখন রাতে রাস্তায় বেরোতে হলে সবাই টর্চ নিয়ে বেরোয়। নইলে গায়ে-গায়ে ধাক্কা লাগার ব্যাপারটা বেশিরভাগ সময়েই এড়ানো যায় না।

আদিত্য একতলার ঘর থেকে টর্চ নিয়ে এল। নীচ থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘আমি একটু বেরোচ্ছি—।’

রাস্তায় নামতেই দুর্গন্ধটা তীব্র হল আরও। মাঝে-মাঝে দরকারমতো টর্চ জ্বেলে হাঁটতে লাগল আদিত্য। আকাশের দিকে না তাকিয়েও বুঝল চাঁদ দেখা যাবে না। ঢেকে আছে গাঢ় মেঘে। হয়তো সেই মেঘ থেকেই হবে কালো বৃষ্টি। সেই পাঞ্জাবিটার কথা মনে পড়ল, যেটার ওপরে কালো বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছিল সুনয়নাদের ছাদে। কাচার পরে পাঞ্জাবিটার কয়েক জায়গায় বৃষ্টির ফোঁটার মাপে ফুটো হয়ে গিয়েছিল।

সরু গলি থেকে বেরিয়ে চায়ের দোকানের দিকে ঘুরল আদিত্য। রাস্তা যেন গতকালের চেয়েও ফাঁকা। চায়ের দোকানেও কোনও জটলা নেই। মাঝে-মাঝে কয়েকটা প্রাইভেট কার, লরি, টেম্পো, অটো পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। সবগুলোই মানুষ বোঝাই। অরবিন্দ সেতু বিকল হওয়ার পর এই ছোট রাস্তাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ব্রিজের দু-প্রান্তে আড়াআড়ি লোহার রড বেঁধে করোটি ও কাটাকুটি হাড়ের ছবিওয়ালা প্রকাণ্ড সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ব্রিজ সারানোর কোনওরকম কাজ শুরু হয়নি। এই পরিস্থিতিতে কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও বোধহয় নেই।

আদিত্য চলতে-চলতে এপাশ-ওপাশ টর্চ ঘোরাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল একজন মানুষ রাস্তার ধারে একটা বাড়ির রোয়াকে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে টর্চের আলোয় কী যেন একটা পড়ার চেষ্টা করছে।

আদিত্য চিনতে পারল। শঙ্করানন্দ চক্রবর্তী। মহাদেবদার বাবা। ও কাছে এগিয়ে গেল। চেঁচিয়ে ডাকল, ‘কী করছেন, মেসোমশাই?’

বৃদ্ধ চমকে মুখ তুলে তাকালেন। ঘোলাটে চোখের মণি দেখা যাচ্ছে না। ফরসা মুখে ভাঁজের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। হাতের কাগজটা লুকোতে যাচ্ছিলেন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায়। মুখের ভাবও হয়ে গিয়েছিল অস্বাভাবিক। কিন্তু আদিত্যকে চিনতে পেরে যেন ভরসা পেলেন। চোখ-মুখ কিছুটা উজ্জ্বল হল। চোখের মণিও যেন স্পষ্ট হল। হাতের কাগজটা বাড়িয়ে ধরে বললেন, ‘দিতু, মহাদেবের চিঠি এসেছে। আজ বিকেলে।’

আদিত্য বোধহয় অবাক চোখে তাকিয়েছিল বৃদ্ধের দিকে। ছেলের চিঠি রাতের বেলা রাস্তায় এসে পড়ার দরকার কী?

শঙ্করবাবু সেটা লক্ষ করেই হয়তো অপ্রস্তুতভাবে বললেন, ‘তোমার মাসিমা কদিন ধরে খুব খিটখিটে হয়ে গেছে। দিনরাত খালি বলছে, এই বিপদে মহাদেব তো আমাদের নিয়ে যেতে পারত ওর কাছে। যত বোঝাই, ওর সেখানে কত কাজ, কিছুতেই বুঝবে না। মহাদেবের নাম শুনলেই খেপে উঠছে। আমাকে বলছে, সবাই পালাচ্ছে—চলো, আমরাও চলে যাই—’ শঙ্করবাবু হাসলেন। বড় নির্মল মজার হাসি। বললেন, ‘কী যে বলে তোমার মাসিমা। মাথাটাই বোধহয় গোলমাল হয়ে গেছে। আরে, আমরা ভিটে ছেড়ে চলে গেলে তারপর কী হবে বুঝতে পারছ! কলকাতায় এলে আমার ছেলেটা, নাতিটা মাথায় একটা ছাদ খুঁজে পাবে না। সেটা ওকে বোঝায় কার সাধ্যি!’ শঙ্করবাবু হঠাৎই কাশতে শুরু করলেন। কাশির দমকে বৃদ্ধের শরীরটা ঝাঁকুনি খেয়ে উঠছিল বারবার। কাশি আর
থামতেই চায় না। মুখ লাল, চোখ বড়-বড় হয়ে গেছে। একটা হাত চলে গেছে গলা-বুকের কাছে।

আদিত্য ভয় পেয়ে বৃদ্ধের পিঠে হাত রাখল। শীর্ণ খাঁচাটা কাঁপছে থরথর করে। ও বলল, ‘আপনি বাড়ি যান, মেসোমশাই—।’

একসময় থামল কাশি। হাঁ করে হাঁফাতে লাগলেন বৃদ্ধ। জিভ দেখা গেল। আদিত্যর মনে পড়ল, দেশবন্ধু পার্কে দৌড়োনো অ্যালসেশিয়ান কুকুরের কথা। কুকুরদের জিভ দিয়ে ঘাম ঝরে। এই মারাত্মক পরিবেশে সবকিছুই কেমন বদলে যাচ্ছে। অচেনা লাগছে সবকিছু। আদিত্য মনেপ্রাণে চাইল, গত সাতদিনের ঘটনাটা যেন একটা দুঃস্বপ্ন হয়। ও যেন জেগে ওঠে ঘুম থেকে এবং দেখে যে, ও বিছানায় শুয়ে আছে। চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যাক এই কঙ্কালসার বৃদ্ধের হাঁফানো চেহারার অপচ্ছায়া।

কিন্তু অপচ্ছায়াটা আদিত্যর প্রার্থনা শুনল না। কয়েকবার ঢোঁক গিলে বলে উঠল, ‘দিতু, বাড়িতে আমি এক মুহূর্ত টিকতে পারছি না। তাই মহাদেবের চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম পকেটে। তাও কি আমাকে বেরোতে দেয় বাড়ি থেকে! বলে, একা-একা থাকলে তোমার মাসিমার নাকি ভয় করবে। এখন খাবার জোটানোর নাম করে রাস্তায় বেরিয়েছি। শুনলাম, মানিকতলায় বস্তিতে নাকি সরকারি খাবার বিলি হচ্ছে। এদিকটায় তো খাবারের গাড়ি আসেনি, তাই ভাবছিলাম—’ আবার কাশি এল। থামল একটু পরে।

আদিত্য গলা তুলে জিগ্যেস করল, ‘আপনার বাড়িতে খাবার নেই?’

শঙ্করবাবু সাততাড়াতাড়ি ঘাড় নাড়লেনঃ ‘না, না—আছে, বার্লি আর সাবু আছে। দুপুরে বার্লি খেয়েছি। জ্বরজারি হলেই খাই। তা এমনি খারাপ লাগল না।’

আদিত্য হতভম্ব হয়ে বুড়ো মানুষটাকে দেখছিল। বুঝতে পারল, গিরগিটিটা গলা থেকে এখনও যায়নি। ও কোনওরকমে জিগ্যেস করল, ‘মহাদেবদারা কেমন আছে, মেসোমশাই?’

‘ভালো। খুব ভালো। ওদের ওখানে ধোঁয়া নেই, কালো বৃষ্টি নেই। বেশ নিশ্চিন্তে আছে।’

আদিত্য নীচু গলায় বলল, ‘আপনি বাড়ি যান, মেসোমশাই—।’

বৃদ্ধ ওর কথা বোধহয় বুঝতে পারলেন না। উৎসুক চোখে তাকালেন।

আদিত্য মাথা নাড়ল, তারপর এগিয়ে গেল। একটু দূর থেকেও আবছা দেখা গেল, বৃদ্ধ আবার হাতের কাগজটার ওপরে ঝুঁকে পড়েছেন।

সুনয়নাদের বাড়িটা যতই কাছে এগিয়ে আসতে লাগল, ততই আদিত্যর আশঙ্কা অনিয়তাকার চেহারা নিতে লাগল। পরশুদিন ওদের বাড়িতে শেষবার গিয়েছিল। তখন সুনয়নার মাকে খুব সুস্থ দেখেনি। শরীরের অসুস্থতা যত না, তার চেয়ে বেশি ছিল মনের অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা। মেয়ের জন্য। মেয়ের বাবার জন্য। টোকিও থেকে ফোন এসেছিল সুখেন্দুবাবুর। ফিরতে ক’দিন দেরি হবে। টোকিও থেকে ওসাকায় যাবেন বিশেষ দরকারে। সেখান থেকে টোকিও ফিরে বাকি কাজ সেরে তারপর কলকাতা রওনা হবেন। নয়না বাবাকে জানিয়েছিল কলকাতার অবস্থা। তাতে সুখেন্দুবাবু বিচলিত হননি। শান্তভাবেই বলেছেন, বিপদ-আপদ দেখা দিলে নরোত্তম কওশিককে জানাতে। কওশিক ওদের চাঁদনি চকের দোকানের ম্যানেজার। প্রায় মাঝবয়েসি, তবে স্বাস্থ্যবান চেহারা। আদিত্য তাঁকে কয়েকবার দেখেছে নয়নাদের বাড়িতে। নয়নার মায়ের কাছেই শুনেছে, নরোত্তম খুব সৎ এবং পরিশ্রমী। আজকের দিনে এরকম মানুষ বিরল।

আদি সপ্তগ্রামে নয়নাদের এক প্রকাণ্ড বাগানবাড়ি আছে। প্রায় পনেরো বিঘে জমি জুড়ে। আদিত্য একবার ওদের অফিস থেকে সেখানে পিকনিকে গিয়েছিল। নয়নাই বাবার কাছ থেকে অনুমতি ও চাবি জোগাড় করে দিয়েছিল। সুখেন্দুবাবু বলেছেন, অবস্থা খারাপের দিকে গেলে চিন্তার কোনও কারণ নেই। নরোত্তম মা-মেয়ে ও বাড়ির লোকজনকে নিরাপদে পৌঁছে দেবে সেখানে। সেখানেও যদি বিপদ দেখা দেয়, তা হলে টাকার ব্যবস্থা করা আছে, নরোত্তমই যা ভালো বোঝে করবে। ভয়ের কিছু নেই।

‘…জো ডর গয়া, সমঝো কে মর গয়া…।’

নয়নার কথাটা বেজে উঠেছিল আদিত্যর কানে। আবার একইসঙ্গে মনে পড়ে গেল ওর আর-একটা প্রশ্নঃ ‘দিতুদা, কী হবে বলুন তো শেষ পর্যন্ত?’

আদিত্য মন খারাপ করে ফিরে এসেছিল সেদিন। নয়না বলেছিল, ‘দিতুদা, এখন পড়া-টড়া হবে না। সব ঝামেলা মিটে যাক, তারপর…।’

তা হলে আজ কেন এই জরুরি তলব?

দরজায় পৌঁছে কলিংবেল বাজাল আদিত্য। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে সুনয়নাই দরজা খুলল।

ওদের সদরের আলোটা টিমটিম করছিল। ওর মুখটা ঠিক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।

আদিত্য ইয়ারকি করেই টর্চটা জ্বেলে তাক করল সুনয়নার মুখে।

ও চোখ কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নিলঃ ‘কী হচ্ছে, দিতুদা!’

‘ফাজলামি।’ আদিত্য বলল, ‘বানান করে দেব?’ তারপর টর্চ সরিয়ে নিল।

সুনয়না কয়েকসেকেন্ড চুপ করে রইল। অবাক চোখে দেখতে চেষ্টা করল আদিত্যকে। দিতুদার কথায় কোনও কুয়াশা নেই, কালো বৃষ্টিও নেই। নয়না বলল, ‘আসুন, ভেতরে আসুন—।’

বাড়িতে ঢুকতে-ঢুকতে আদিত্য বলল, ‘কী ব্যাপার? এরকম বেটাইমে তলব!’

সদর দরজা বন্ধ করে দিয়ে দরজার পিঠে হেলান দিয়ে দাঁড়াল নয়না। বলল, ‘আমরা কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, দিতুদা। কাল সকালে।’

আদিত্য কোনও কথা বলল না। ওরা চুপচাপ ঘরে এসে ঢুকল।

ঘরের টিউব লাইটের আলোয় অনেক স্পষ্ট করে দেখা গেল মেয়েটাকে। পরনে জাম রঙের ম্যাক্সি। তার মধ্যে সাদা বুটি। মাথার ছোট-ছোট চুল অবাধ্য ঢঙে এলোমেলো। চোখের নীচে ময়লা ছোপ। ঠোঁটের অভিমান আরও তীব্র। সব মিলিয়ে এক অপ্রত্যাশিত রুক্ষতা। সবুজের ছিটেফোঁটাও নেই আর।

‘আমরা কাল চলে যাচ্ছি, দিতুদা।’ সুনয়না আবার বলল। ও দরজার কাছটায় দাঁড়িয়ে।

আদিত্য লম্বা সোফাটার ওপরে বসে পড়েছিল। ঘরটায় চোখ বুলিয়ে নিল একবার। দেখল, দেওয়াল ঘেঁষে কয়েকটা ‘আলফা’ সুটকেস আর সফ্‌ট লাগেজ সাজানো। এ ছাড়া বাকি সবকিছু আগের মতোই। বালক শ্রীকৃষ্ণ এখনও হাসছে। আর প্রকৃতির ছবি দুটোয় আকাশ এখনও নীল, গাছপালা এখনও সবুজ।

আদিত্য ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ওর এখন কী করা উচিত। ও অন্য যে-ছাত্রটিকে পড়ায়—অভিজিৎ—তারা তিনদিন আগেই ঘরদোরে তালা দিয়ে চলে গেছে। যাওয়ার খবরটা ওরা পৌঁছে দিয়েছিল আদিত্যকে। তবে বলেছিল, ‘কোথায় যাচ্ছি জানি না। কবে ফিরব তাও জানি না।’

এই ছাত্রীও যাচ্ছে। যাবে না কেন? সবাই তো চলে যাচ্ছে। পাড়া প্রায় শ্মশান হয়ে এল।

আদিত্য বলল, ‘তোমাদের আরও আগে চলে যাওয়া উচিত ছিল।’

‘জানি। কিন্তু মায়ের শরীরটা যে খারাপ হল হঠাৎ। মিস্টার কওশিক রোজ আসছেন। আজও এসেছিলেন। আমাদের দুটো গাড়িতেই তেল ভরতি করা হয়ে গেছে। আর ছ’টা জেরিক্যানে বাড়তি ডিজেল আর পেট্রল নেওয়া হয়েছে। আর এই মালপত্র। উনি কাল সকালে আর একটা ম্যাটাডর ভ্যান নিয়ে আসবেন…।’

আদিত্য মা, মুন্নি, পলাশ, লতা, নানকুর কথা ভাবল। ভাবল শুভেনের কথা। ওর শয্যাশায়ী বাবার কথা। শঙ্করবাবুর কথা। সুবোধদার বাচ্চা মেয়েটার কথা। নয়নার মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হল, নয়না ওর কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইছে।

আঙুলের ডগায় আঙুল ঘষল আদিত্য। বলল, ‘যাও। তবে সাবধানে যেয়ো। সাবধানে থেকো। সময় পেলে চিঠি দিয়ো…।’

আদিত্য টের পেল, গলার গিরগিটিটা এখনও যায়নি।

সুনয়না কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইল। তারপর দু-তিন পা এগিয়ে এল ঘরের ভেতরে—আদিত্যর দিকে। দু-হাত পিছনে রেখে থুতনি সামান্য উঁচু করে দাঁড়াল।

আদিত্য ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। সুনয়নার বুকের দিকে নজর গেল ওর। অপরাধবোধ মনের মধ্যে কামড় বসাচ্ছিল, কিন্তু ও তক্ষুনি চোখ ফেরাতে পারল না। নয়নার ছিপছিপে শরীরের তুলনায় বুকজোড়া উদ্ধত, বেপরোয়া। আদিত্যর অস্বস্তি হল। ছাত্রীকে এমন চোখে দেখা কি ঠিক? কিন্তু নয়না ওর তাকানো ভ্রূক্ষেপই করল না। আচমকা বলল, ‘দিতুদা, আপনারাও চলুন—আমাদের সঙ্গে—।’

আদিত্য কিছুক্ষণ কোনও জবাব দিতে পারল না। ওর মনে পড়ল, নয়না কখনও ওদের বাড়িতে যায়নি। আদিত্যও যেতে বলেনি কখনও। কারণ, সবসময়েই ওর মনে পড়ে যেত দুর্বল দিকগুলোর কথা। অন্তত যে-জিনিসগুলোকে ওর নিজের দুর্বল বলে মনে হয়। বাড়ির ড্যাম্প ধরা দেওয়াল, সর্বত্র এলোমেলো ব্যাপার, নিতান্তই ছাপোষা বাড়ির ছাপোষা বাসিন্দা…ওঃ। মনে হতো, বাড়ির বাইরের জগৎটা কত সুন্দর। আর এখন? অসহ্য ধোঁয়াশার গতিপথ কেউই রুখতে পারেনি! অনায়াসে তা সিংদরজা কিংবা ফাটা ঘুণ ধরা কাঠের পাল্লা পেরিয়ে গেছে। কোনওরকম শ্রেণিবিচার করেনি।

‘কী হল, দিতুদা, যাবেন না আমাদের সঙ্গে?’

গাড়ি দুটোর কথা মনে পড়ল আদিত্যর। ডিজেল আর পেটোলে টইটুম্বুর ট্যাঙ্ক নিয়ে যেন দু-দুটো তেজীয়ান বুড়ো ঘোড়া অপেক্ষা করছে। সামনে লম্বা দৌড়।

আদিত্য নয়নাকে বসতে বলল। আর তখনই নয়নার মা ঘরে এলেন। হাতে একটা খাম। সেটা আদিত্যর দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এটা দেওয়ার জন্যেও তোমাকে ডেকেছিলাম। নয়না তো বলেছে বোধহয়—আমরা কাল সকালে চলে যাচ্ছি।’

মাসের মাত্র এগারো দিন পেরিয়েছে। ক’দিনই বা পড়াতে এসেছে আদিত্য। কিন্তু এখন টাকার দরকার। হাজার টাকা নেহাত কম নয়। বিপদের সময় টাকার দাম আরও বেড়ে যায়।

আদিত্য নিলজ্জের মতো হাত বাড়িয়ে খামটা দিল। বলল, ‘আপনার শরীর কেমন আছে?’

‘এখন তো একরকম। পরে যদি আবার খারাপ হয়, তাই আর দেরি করছি না, কালই রওনা হচ্ছি।’

সুনয়নার ধৈর্যের সীমানা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছিল মাপে। হঠাৎই ও বলল, ‘মা, দিতুদারাও চলুক না আমাদের সঙ্গে—।’

ওর মা অদ্ভুত হেসে দেখলেন আদিত্যকে। বললেন, ‘গেলে তো ভালোই—।’

সুনয়নার মায়ের হাসিটা দেখে কষ্ট হল আদিত্যর। পুরোপুরি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে মানুষ যখন এগোয় তখনই বোধহয় সে এরকম হাসি হাসতে পারে। এ-হাসিতে কোনও পিছুটান নেই।

আদিত্যর যে আজ কী হয়েছে! ছাত্রীকে আজই প্রথম বোধহয় ও তরুণী হিসেবে ভাবছিল। বারবার খুঁটিয়ে দেখছিল মেয়েটাকে। ইস্, ওর কপালের তিলটাকে কতদিন ভালো করে দেখা হয়নি। ও ভাবত তিলটা বোধহয় ডানদিকে। কিন্তু না, ওটা তো বাঁ-দিকে রয়েছে। বাঁ-দিকেই বেশি মানিয়েছে। দু-ভুরুর মাঝখানে গাঢ় রঙের টিপটাও কী সুন্দর! ম্যাক্সিটা কি একটু আঁটোসাঁটো লাগছে ওর গায়ে? আরে, পায়ের নখে রং দিয়েছে! বেশ দেখাচ্ছে তো! কানের লতিতে লাল-সবুজ দুলটাও চমৎকার।

‘দিতুদা—’ সুনয়না অন্যরকম গলায় ডাকল। ওর চোয়ালের রেখায় এখন আর নমনীয়তা নেই।

‘কাল সকালে আমাকে সোনারপুর যেতে হবে—বউদিদের বাড়ি খোঁজ নিতে।’ আদিত্য বলল, ‘সেখান থেকে ফিরে এসে তারপর রওনা দেব। এখানে আর ভরসা পাচ্ছি না—।’

মা ও মেয়ে একইসঙ্গে বলে উঠলঃ ‘ট্রেনে যাওয়া অসম্ভব!’

আদিত্য ভুরু কুঁচকে সপ্রশ্নে তাকাল।

সুনয়নার মা তখন বললেন, ‘কওশিকজির কাছেই শুনছিলাম। কলকাতার বাইরে থেকে ট্রেন প্রায় আসছে না বললেই চলে। সব ট্রেনই রওনা হচ্ছে কলকাতা ছেড়ে। তবে—।’

আদিত্য ধৈর্য না হারিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

‘—মানে, টেনে চড়ার জন্যে নাকি সাংঘাতিক ভিড়। তুমি সোনারপুর খবর নিতে যেতে পারবে না।…আর গেলেও ফিরতে পারবে কি না সন্দেহ…।’

আজ, এখন, আর কেউ চা-বিস্কুট নিয়ে এল না। আসার কথাও নয়। সবকিছুরই ছন্দ নষ্ট হয়ে গেছে। আতিথেয়তারও।

সুনয়নার মা তখনও কথা বলছিলেন, ‘…শুরুর দিকে ভেবেছিলাম, এ-ব্যাপারটা বেশিদূর গড়াবে না। কিন্তু এখন…কওশিকজির কাছে শুনলাম, টিভি, রেডিয়ো আর খবরের কাগজের অফিসের লোকদের নাকি গ্যাস-মুখোশ দেওয়া হয়েছে। কোনওরকমে কাজ চলছে সেখানে। এ ছাড়া দোকানপাট, ব্যাবসা সবই প্রায় বন্ধের মুখে। রাস্তাঘাটে সাফাইয়ের কাজ বন্ধ হওয়ার জন্যে নানা অসুখবিসুখ ছড়িয়ে পড়ছে সব জায়গায়। পথেঘাটে খুন-জখম-রাহাজানি বেড়ে গেছে…।’

অরবিন্দ সেতুর ওপরে সেই রাহাজানির রাতটার কথা মনে পড়ে গেল আদিত্যর। মাসিমা কি পুরো ব্যাপারটা জেনেছেন? কে জানে!

একটু সময় নিয়ে আদিত্য বলল, ‘কাগজে তো এত সব লেখেনি—।’

‘বোধহয় সবাই ভয় পেয়ে যাবে, তাই। তবে প্রাইভেট চ্যানেলে কিছু-কিছু দেখিয়েছে। নয়না বলছিল, ও দেখেছে।’

শেষ কথাটা বলার সময় মেয়ের দিকে তাকিয়েছিলেন সমর্থনের আশায়। কিন্তু সমর্থন মিলল না। সুনয়না পুরোনো কথাটাই বলল আবার, ‘দিতুদা, আপনারা তা হলে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন তো? কাল সকালে আমরা স্টার্ট দিচ্ছি কিন্তু—।’

‘যাব—’ আদিত্য বলল। লক্ষ করল ঘরের ধোঁয়াশা ফিকে হয়ে যাচ্ছে ধীরে-ধীরে।

সুনয়নার মা চেয়ারে বসেছিলেন। আদিত্যর কথায় যেন স্বস্তি পেলেন। উঠে
দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভালোই হল, তোমরা থাকলে আমরাও অনেকটা ভরসা পাব।’ তারপর শিথিল পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। যাওয়ার আগে শ্রীকৃষ্ণের ফটোর দিকে তাকালেন একবার।

সুনয়নার চোয়ালের রেখা কিছুটা নরম হয়েছিল। ও হঠাৎই বসে পড়ল সোফার কোণে—আদিত্যর কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে। ঘাড় তেরছা করে জিগ্যেস করল, ‘দিতুদা, আপনি আমাকে ভয় পান?’

আদিত্য মুখ তুলে বুক খালি করে শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতেই থাকল। হাসির ছোঁয়াচ নয়নার মুখেও লাগছিল।

হাসির দমক কিছুটা কমলে পর আদিত্য বলল, ‘তোমার কথাই ঠিক। আমি ছোটবেলায় ভূত তাড়িয়ে বেড়াতাম। মাস্টারি আমাকে মানায় না।’

সুনয়না বিমূঢ়ভাবে বলল, ‘তাতে কী?’

আদিত্য হাসতে-হাসতেই বলল, ‘আজ বুঝলাম, মাস্টারিটা মানায় তোমাকেই। মাস্টারদের আমি ভয় পাই। আমি আবার ভূত তাড়ানোর চাকরিতে ফিরে যাব।’

সুনয়না দু-হাত কোলের কাছে জড়ো করে মাথা নেড়ে জিগ্যেস করল, ‘বলুন তো, ভূত আছে কি নেই?’

‘কী করে বলব, হয়তো আছে—।’

‘ভূতের আয়ু ক’বছর হতে পারে, দিতুদা? মানুুুুুুুষের সমান?’

আদিত্য ঠাট্টা করে হাত নাড়লঃ ‘ধ্যাৎ, ভূত আবার মরে গিয়ে ভূত হতে পারে নাকি! ভূত যদি থাকে তো সে অমর।’

‘বাঃ, গ্র্যান্ড। তা হলে তো বিশ লক্ষ বছরের পুরোনো আফ্রিকার আদিম মানুষ অস্ট্রালোপিথিকাস-এর ভয়ংকর আত্মা আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর বুকে—।’

নয়না হাসছিল। আদিত্যও হেসে বলল, ‘ও বেচারা ঘুরে বেড়ালে তোমার মাথাব্যথা কেন বুঝতে পারছি না।’

নয়না বলল, ‘আমি আমার কথা ভাবছি, দিতুদা। আমি যদি মরে যাই তাহলে ওরকম লক্ষ কোটি বছর ধরে ঘুরঘুর করতে পারব না, বাবা!’

‘আমি যদি মরে যাই…’। আদিত্যর মাথার ভেতরে ধোঁয়াশায় বিভ্রান্ত একটা এরোপ্লেন পাক খেতে শুরু করল। টালমাটালভাবে উড়তে উড়তে ওটা বিপজ্জনকভাবে গোঁৎ খেয়ে নামতে লাগল নীচের দিকে। বহু নীচের ভূমিখণ্ড বিদ্যুৎগতিতে ছুটে আসতে লাগল আদিত্যর কাছে। ওর খাদ্যনালির পিছল দেওয়ালে নখ বসিয়ে গিরগিটিটা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। উঁকি মারতে চাইছে আলজিভের পাশ দিয়ে। বাতাস নিতে চাইছে বুক ভরে।

সুনয়না খুব হাসছিল। হাসির কুচি ছড়িয়ে পড়ছিল ঘরের মধ্যে। আদিত্য গভীরভাবে দেখছিল ওকে। চেনা-অচেনা দুটো স্তরের মধ্যে দোলাচলে মগ্ন ওর ছবিটা।

বাড়ি ফেরার পথে মনে হল যেন শ্মশানের পথ ধরে হাঁটছে। শুধু আশেপাশে কোনও ছন্নছাড়া নেড়ি কুকুর নেই।

এমনসময় দূর থেকে ভেসে আসা কয়েকটা ‘গুম-গুম’ শব্দ শুনতে পেল আদিত্য। বোমার শব্দ? তারপরই তীব্র কানফাটানো শব্দ অনেকগুলোঃ ক্র্যাক-ক্র্যাক-ক্র্যাক—। গুলির আওয়াজ?

অন্য সময় হলে আদিত্যর মনে এখন অনেকরকম প্রতিক্রিয়া হতে পারত। কিন্তু ও অলস পায়ে চুপচাপ হাঁটতে লাগল। ভাবতে লাগল, বোমা, গুলি, ধোঁয়া আর কালো বৃষ্টি—এর মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মারাত্মক। অরবিন্দ সেতুর মুখে লাগানো করোটির ছবিটা ভেসে উঠল আদিত্যর চোখের সামনে। ভাবল, ‘আমাদের প্রত্যেকের শরীরেই একটা করে করোটি রয়েছে।’

সুনয়নার শেষ কথাটা আবার মনে পড়ে গেল ওর।

আট

এরকম ভয়ংকর দৃশ্য আদিত্য কখনও দেখেনি।

একটা দুঃস্বপ্নের নগরীর রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে ওদের গাড়ি। প্রথমে চকোলেট রঙের মারুতি গাড়ি। গাড়িতে নরোত্তম কওশিক, দশরথ, পলাশ, লতা আর নানকু। একজন ছোকরা ড্রাইভার চালাচ্ছে।

তার পিছনে সাদা জিপসিতে আদিত্য, মুন্নি, মা, সুনয়না আর সুনয়নার মা। গাড়ি চালাচ্ছে বিশু নামের একজন মোটাসোটা ড্রাইভার।

সবার পিছনে একটা সবুজ ম্যাটাডর ভ্যান। ভ্যানে মালপত্র বোঝাই। মালপত্র ছাড়া সেখানে রয়েছে ডিজেল আর পেট্রোলের জেরিক্যান। ভ্যানের ড্রাইভার ছাড়া গাড়িতে রয়েছে নয়নাদের বাড়ির দুজন কাজের লোক—একজন রোগা কিশোর, আর একজন প্রায় বৃদ্ধ, বহুদিন ধরে ওদের বাড়িতে রয়েছে।

মারুতি গাড়িতে বসা কওশিকের নির্দেশমতোই গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার। আদিত্যদের জিপসি ও ম্যাটাডর ভ্যান শুধু মারুতিকে অনুসরণ করছে।

খুব ভোরে মালপত্র নিয়ে সুনয়নাদের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল আদিত্য। ঘুমন্ত নানকু ছিল লতার কোলে। পলাশের হাত ধরে ছিল আদিত্য। আর মা নির্ভর করেছিল মুন্নির ওপরে।

জিনিসপত্র নিয়ে সবাই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসার পর সদর দরজায় তালা দিচ্ছিল আদিত্য। তখনই মা কেঁদে উঠেছিল। মুন্নিও। সুরেন্দ্র নিলয়ে তালা পড়ছে। দেওয়ালে ফাটল ধরা, ঢালাইয়ের রড বেরিয়ে থাকা এই বাড়িতে আর কখনও কি ফিরে আসতে পারবে ওরা?

আদিত্য দেওয়ালগুলো দেখল। ড্যাম্পের ছাপে তৈরি কী সুন্দর সব বিমূর্ত ছবি! সদরের মাধবীলতা গাছটা দেখে কষ্ট হল আদিত্যর। শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া এক নিষ্ঠুর কঙ্কাল। তার নীচে কালচে মাটির আড়ালে বাবার অস্থিভস্ম, ভক্তদাসের দেহাবশেষ। ওগুলো ধীরে-ধীরে মিশে যাবে দূষিত মাটির অণুতে।

আশ্চর্য! ওরা চলে আসছে, তখন একটা নির্লজ্জ অপচ্ছায়া পিছন থেকে গলা ফাটিয়ে মাকে ডাকছিলঃ ‘নিভা! নিভা! কবে ফিরবে তোমরা? চিন্তা কীসের, বাড়ি দেখার জন্যে আমি তো রইলাম। নিভা—নিভা—।’

মা পিছন ফিরে তাকিয়েছিল। স্মৃতি বড় বেহায়া। যেখানে-সেখানে উদোম হয়ে পাগলের মতো নাচে। কারও মানা শোনে না।

ছিন্নমূল পরিবারের মতো গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ওরা। চারপাশে কোনও শব্দ নেই। পাখি নেই, গাছের পাতা নেই। আকাশ ঘোলাটে। গতকাল মাঝরাতে আবার কালো বৃষ্টি হয়েছে। তবে এখন আর কেউ ভয় পাচ্ছে না। শুধু অপেক্ষা করছে।

নাকে ভিজে কাপড় চাপা দিয়ে দুর্গন্ধ ও দূষণ আড়াল করতে চাইছিল ওরা। ধোঁয়াশার হালকা আবরণ যেন শীতের ভোর তৈরি করেছে। নির্জন পথে পা ফেলতে-ফেলতে আদিত্যর মনে হল গাড়িতে রওনা হয়ে শেয়ালদা স্টেশনের কাছটা একবার ঘুরে গেলে হয়। গতকাল লতাকে ট্রেনের ব্যাপারটা বলেছিল আদিত্য, কিন্তু ওর মুখ দেখে মনে হয়নি খুব একটা বিশ্বাস করেছে। তবে এটা ঠিক ওর অফিসে যারা বাইরে থেকে আসত, তারা বলেছিল, অবস্থা খারাপ দেখলে আসা বন্ধ করে দেবে। তারপর তো অফিস-দোকানপাট সব বন্ধের মতোই হয়ে গেল। কে জানে, কলকাতা থেকে দূরে যারা আছে, তারা এখনও নিশ্চিন্ত আছে কি না!

না-নিলেই-নয় এমন সব জিনিসই ওরা সঙ্গে নিয়েছে। তা ছাড়া গয়নাগাটি টাকাপয়সা। পরিস্থিতি যখন ঘোরালো হচ্ছিল তখনই ব্যাঙ্কের শতকরা নব্বই ভাগ টাকা তুলে নিয়েছিল আদিত্য। সেসময় থেকেই সব ব্যাঙ্কে টাকা তোলার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। তবে কে জানে, এখনও যেসব বিপদের মুখোমুখি হতে হবে, টাকার বিনিময়ে তার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে কি না।

মুন্নি ভক্তদাসের খালি খাঁচাটা হাতে করে হাঁটছিল। মা কিছুতেই ওটা ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। খাঁচাটা অল্প-অল্প দুলছিল। পাখি নেই। একটা পুরোনো গানের কলি মনে পড়ল আদিত্যরঃ ‘পাখি উড়ে যাবে বলে খাঁচা কিনি না—।’ ও তাকাল চারপাশে। ওরা যে-খাঁচায় বন্দি তার দেওয়ালটা কত দূরে? তার দরজাটা খোলা আছে তো?

গাড়িতে সদলবলে গুছিয়ে ওঠা থেকে শুরু করে রওনা হওয়া পর্যন্ত সুনয়নার মেজাজ বেশ হালকা ছিল। যে-কোনও ব্যাপারের মধ্যেই একটা না একটা সুবিধের দিক খুঁজে বের করছিল মেয়েটা। কওশিকজিকে ও-ই বলেছিল কলকাতার কয়েকটা জায়গা দেখার কথা। তার সঙ্গে আদিত্য শুধু শেয়ালদার কথাটা যোগ করেছিল। কারণ, বউদির চোখের জলে ভেজা ফোলা চোখ দুটোর করুণ অবস্থা ওর নজর এড়ায়নি।

গাড়ি সরু রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় পড়ল। কাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় কুয়াশা
অনেকটা ফিকে। তবে গাড়ি চালাতে হচ্ছিল সাবধানে। দোকানপাট সবই বন্ধ থাকায় পরিবেশ থমথমে। রাস্তায় যত রাজ্যের আবর্জনা, পশুপাখির মৃতদেহ—দুর্গন্ধের ঝাপটায় গা গুলিয়ে উঠছে। যে-ক’টা গাড়ি দেখা গেল সবই লোকজন আর মালপত্রে বোঝাই। মাঝে-মাঝে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে যাচ্ছে পুলিশের জিপ, মোটরবাইক। আরোহীদের মুখে অদ্ভুত ধরনের গ্যাস-মুখোশ। এ ছাড়া খবরের কাগজ, টেলিভিশন কোম্পানি আর হাসপাতালের গাড়িও চোখে পড়ল। এখানে-ওখানে লোকজন হেঁটে যাচ্ছিল। তাদের হাতে সুটকেস, ব্যাগ, পোঁটলা-পুঁটলি।

গাড়িতে সবাই চুপচাপ বসেছিল। মা চশমা খুলে চোখ মুছছিল বারবার। মুন্নি মায়ের হাঁটুর কাছটা খামচে ধরে বসে। ফ্যাকাসে আলোছায়া সকলের মুখে।

সুনয়না হঠাৎই বলল, ‘দিতুদা, দেখেছেন কুয়াশা কেমন ফিকে হয়ে গেছে! আমি বেট রেখে বলতে পারি তিনদিনের মধ্যেই সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে।’

আদিত্য হাসল। নয়নাকে দেখল। সাদার ওপরে নানা রঙের ছাপ দেওয়া সুইস কটনের টিশার্ট পরেছে, আর ‘হারা’ জিন্স। মাথার খাটো চুলে শ্যাম্পু। মুখে কীসব মেখেছে—বেশ চকচক করছে। কানে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি আধুনিক নকশার ইয়ারিং।

কিছুক্ষণ রাস্তা দেখার পর চোখ ফিরিয়ে নিল আদিত্য। অলস চোখে দেখতে লাগল ড্যাশবোর্ডের মিটারগুলো। যন্ত্রের কাঁটা এখন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

গাড়ি নির্জন সারকুলার রোড ধরে ছুটছিল। রাস্তার দুপাশের বহুতল বাড়ির ফাঁকে-ফাঁকে গাছগাছালির কঙ্কাল।

হঠাৎই অস্বাভাবিকভাবে ব্রেক চাপল বিশু। সবাই ছিটকে পড়ল এ-ওর ঘাড়ে। ধোঁয়ার আড়াল থেকে আচমকা কয়েকটা লোক হাজির হয়েছে গাড়ির সামনে। ওদের দুজনের হাতে লম্বা বাঁশের লাঠি। আর-একজনের হাতে একটা বড় হাতলওয়ালা কুড়ুল। সঙ্গে আরও দু-তিনজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখে ঘৃণা ও হিংসার ছাপ।

নয়না ‘বিশুদা! জোরে চালাও, জোরে!’ বলে চিৎকার করে উঠল।

মারুতি গাড়িটা একটু আগে বেরিয়ে গেছে লোকগুলোর নাগালের বাইরে। সুতরাং আদিত্যদের জিপসিটাকে বাগে পেয়ে সামনের লোক দুটো ভয়ঙ্কর চিৎকার করে আক্রমণ করে বসল। কুড়ুলের প্রচণ্ড আঘাতে এসে পড়ল জিপসির সাদা বনেটে। তারপরই নিষ্ঠুর লাঠির সংঘাত।

মুন্নি ভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘ছোড়দা! সাবধান!’

বিশু প্রাণপণে স্টিয়ারিং ঘোরাল ডানদিকে। একটা লোক হেডলাইটের ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল রাস্তায়।

আদিত্য বিশুর পাশেই বলেছিল, চট করে মাথা নীচু করে আড়ালে লুকোতে চাইল। গাড়িটা টাল খেয়ে চাকায় বীভৎস ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলে লোকগুলোকে পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল সামনের দিকে। মারুতি গাড়িটাকে তখনও দেখা যাচ্ছে সামনে।

আদিত্য মাথা তুলে বলল, ‘নয়না, দ্যাখো তো, পেছনের ম্যাটাডরটা ঠিকমতো আসছে কি না—।’

সুনয়নার মুখের রক্ত কেউ পলকের জন্য শুষে নিয়েছিল। গলা বাড়িয়ে দেখে ও ঘাড় নাড়ল, ‘আসছে।’

সুনয়নার মা বললেন, ‘ওই সাংঘাতিক লোকগুলো কি গুন্ডা না পাগল? আমার বুক ধড়াস-ধড়াস করছে।’

আদিত্য পিছন ফিরে মা-কে দেখল। শীর্ণ বৃদ্ধা মেয়ের আরও কাছে সরে বসেছে। চোখ বোজা। বিপদ ভুলে থাকার জন্য স্মৃতি রোমন্থন, না ঈশ্বরের কাছে নিরাপত্তার নীরব প্রার্থনা?

বিশু কেশে বলল, ‘পালের গোদাটা ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়েছে। মাথায় চোট পেয়েছে মনে হয়—’ এবং গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল।

আদিত্যর বড়-বড় শ্বাস পড়ছিল। খানিকটা সময় নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে তারপর বলল, ‘লোকগুলো খেপে গেছে। বোধহয় শহর ছেড়ে পালানোর জন্যে মরিয়া হয়ে গাড়ি খুঁজছে।’

মুন্নি জিগ্যেস করল, ‘কেন রে—?’

আদিত্য উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল। উত্তর দেওয়ার আর প্রয়োজন হল না। কারণ সামনে তাকিয়েই দুঃস্বপ্নের দৃশ্যটা ওর নজরে পড়ল। প্রায় একইসঙ্গে গাড়ির আর সকলে দেখতে পেল দৃশ্যটা।

বিশু দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘সবাই ঠিকমতো ধরে-টরে বসুন—’ এবং পরক্ষণেই অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে এক ঝাঁকুনিতে গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দিল।

পুলিশের অনেকগুলো জিপ ও ভ্যান রাস্তার মাঝামাঝি লাইন করে দাঁড়িয়ে। বাঁ-দিকের ফুটপাথে দাঁড়ানো ই এস আই হাসপাতালের বারোতলা বাড়ির কাছ থেকে লাইনের শুরু—সেখান থেকে এগিয়ে গেছে সোজা শেয়ালদার ফ্লাইওভারের দিকে।

কোথাও সাইরেন বাজছে তীব্র স্বরে। মাইকে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছে কেউ। আর গাড়ির লাইনের বাঁ-দিকটা জনসমুদ্রে ঠাসা। অসংখ্য মানুষ মালপত্র নিয়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে। তাদের প্রচণ্ড চাপ সামলাতে পুলিশের দল হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। রাস্তার অর্ধেকটা দখল হয়ে গেলেও বাকি অর্ধেকটার কোনও যানজটের ব্যাপার নেই। কখনও-সখনও দু-একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে।

আদিত্যর মনে হল, মরুভূমিতে যেন জলের জন্য লাইন পড়েছে।

জনসাগরের রেখা অজগর সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। একটু পরেই ধোঁয়াশায় অস্পষ্ট ঝাপসা হয়ে গেছে ছবিটা।

নয়না বলল, ‘কওশিকজি ঠিকই বলেছিলেন। আপনি সোনারপুরে যেতে পারতেন না, দিতুদা। দেখেছেন, কী সাংঘাতিক অবস্থা!’

আদিত্য মাথা নাড়ল। এই অসহায় মানুষগুলো ক’দিন ধরে লাইন দিয়ে থাকবে ট্রেনের জন্য? বুঝতে পারল, একটা গাড়ি হাতে পাওয়ার জন্য মানুষ কেন মরিয়া হয়ে উঠেছে।

মায়ের কাশি শুনতে পেল ও। টের পেল, ওর নিজের গলাটাও কেমন খুসখুস করছে। শঙ্করবাবুর কথা মনে পড়ল। আমেরিকাবাসী ছেলের চিঠি হাতে বসে থাকা দিশেহারা মানুষটার শেষ ছবিটা ওর চোখে পড়ল। মনে পড়ল রীতেনের কথা। রীতেন নিশ্চয়ই কখনও ভাবেনি প্লেন দুর্ঘটনায় মারা যাবে। কারণ প্লেনে চড়া ওর কাছে নেহাতই স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই অসম্ভবও সম্ভব হল। আচ্ছা, শুভেন কী করছে এখন? কেমন আছে ওর শয্যাশায়ী বাবা?

গাড়িটা আচমকা ঝাঁকুনি খেল। কোনও গর্তে পড়ল বোধহয়। আদিত্য জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল। রাস্তার মাঝখান পর্যন্ত চলে এসেছে আবর্জনা।

ইট-কাঠ হাড়গোড় সবই বোধহয় মিশে গেছে। সবকিছুর ওপরেই কালো বৃষ্টির সিলমোহর।

শেয়ালদা ফ্লাইওভার পেরিয়ে মৌলালি, তারপর এস এন ব্যানার্জি রোডে ডানদিকে ঘুরবে ভেবেছিল, কিন্তু দেখল, সামনের গাড়িটা সোজা ছুটে চলল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কারণটা বুঝতে পারল। রাস্তা বন্ধ। করোটি আর কাটাকুটি হাড়ের ছবি। সব রাস্তাতেই ভয়ঙ্কর বিপদ। এরকম আরও কয়েকটা রাস্তা চোখে পড়েছে এর আগে।

একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে চুপচাপ বসেছিল গাড়ির যাত্রীরা। বিশু গাড়ি চালাচ্ছে একমনে। ওর চোখ একাগ্র, জ্বলজ্বল করছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িগুলো চলে এল কলকাতার সবচেয়ে খোলামেলা জায়গায়—ময়দানে। সঙ্গে-সঙ্গে অলৌকিক অবাস্তব কোনও শক্তি আদিত্যর ঝুঁটি খামচে ধরল অমানুষের মতো। তারপর নিষ্ঠুরভাবে হ্যাঁচকা টান মারতে লাগল—একের পর এক।

গাড়িটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কারণ নরোত্তম কওশিক মারুতি গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। দাঁড়িয়ে পড়েছে জিপসির পিছনের ম্যাটাডর ভ্যানও।

কওশিকজি নেমে পড়েছেন গাড়ি থেকে। এগিয়ে আসছেন জিপসির দিকে।

আদিত্যও নামল গাড়ি থেকে। মা দুর্বল গলায় বলল, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’

মুন্নি ডাকল, ‘ছোড়দা!’

আদিত্যর মাথা টলছিল। ওর ভয়াতুর চোখ অনিশ্চিত দিশেহারা ভঙ্গিতে দেখতে লাগল এপাশ-ওপাশ। এ কী সর্বনাশের ছবি দেখছে ও!

মাথার ওপরে আকাশ জুড়ে বাদামি ধোঁয়াশা। দূর দিগন্তেও তাই। স্পষ্ট আলোময় ঘোলাটে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালো রঙের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। তার সারা গায়ে কালচে ছোপ। আর সেই স্মৃতিসৌধ ঘিরে সবুজের ধূসর কঙ্কাল। মাঠের পর মাঠ কালচে-বাদামি ঘাসের মৃতদেহে ঢাকা। সমস্ত গাছপালা ডাইনির আলুথালু চুলের মতো খটখটে শুকনো শাখাপ্রশাখা মেলে ভয়ঙ্কর ছায়াহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই আশ্চর্য রুক্ষ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে যেন কয়েক কোটি বছরের জীর্ণ মলিন এক প্রাসাদ। তার মাথায় ডানাওয়ালা উপদেবী—লোহার পরি। পারদের ওপরে ভেসে নেচে বেড়াত ক’দিন আগেও। এখন তার পায়ের নীচে পারদের বিষ, মাথায় ধোঁয়াশার।

কওশিকজি আদিত্যর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম, দেখার কিছু নেই। সব শেষ। তা-ও আপনি দেখতে চাইছিলেন—’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমরা সেকেন্ড হুগলি ব্রিজের ওপর দিয়ে বেরিয়ে জি টি রোড ধরব।

আদিত্য তখনও ওর ছোটবেলার স্বপ্নটাকে দেখছিল। বাচ্চা বয়েসে বাবার সঙ্গে এখানে বেড়াতে এসেছিল ওরা। মা, পলাশ আর ও। পলাশের সঙ্গে কত ছুটোছুটি করেছিল এই সবুজ মাঠে। অভিভূত হয়ে গিয়েছিল সাদা ধবধবে এই স্মৃতি-সৌধের সৌন্দর্যে। মনে হয়েছিল, স্বপ্নে দেখা কোনও রঙিন জলছবি। যেদিকে তাকানো যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। আর পশ্চিমের আকাশরেখায় কয়েকটা দীর্ঘকায় অট্টালিকা।

আদিত্যর পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল ধীরে-ধীরে। মনও। চোখের কোণ দিয়ে দেখল, নয়না নেমে পড়েছে গাড়ি থেকে। ওদিকে পলাশও।

আদিত্যর মাথা টলে গেল। ও হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল রাস্তায়। দু-হাতে মুখ ঢাকল। এই মাটি, এই বাতাস মানুষের কখনও কোনও ক্ষতি করেনি। অথচ প্রকৃতির এই দুই অপরূপ দানকে বছরের পর বছর ধরে বিষ খাইয়ে-খাইয়ে আমরা কী অবস্থায় নিয়ে এসেছি আজ!

আদিত্য আর পারল না। বুকের ভেতরের চাপা হাহাকারটা কান্না হয়ে এক ধাক্কায় বেরিয়ে এল বাইরে। হা ঈশ্বর! আদিত্য কেন রুখতে পারছে না এই আবেগকে? কেন ভেঙে পড়ছে সব প্রতিরোধ?

আদিত্য হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। প্রকৃতির মৃতদেহের পাশে বসে যেন কোনও পরম আত্মীয় কাঁদছে। কাঁদছে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে দু-হাতে রাস্তার কালো অ্যাসফাল্ট চাপড়াতে লাগল আদিত্য। জল ভরা চোখে পিছনে মাথা হেলিয়ে ঘুণ ধরা আকাশটাকে দেখল বারবার।

আদিত্যর রকমসকম দেখে কওশিকজি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ঘন ভুরু কুঁচকে উঠল, ফরসা মুখের বিবর্ণ চেহারায় ফুটে উঠল এলোমেলো জ্যামিতিক রেখা। ঝুঁকে পড়ে আদিত্যর হাত ধরলেন তিনি। বললেন, ‘উঠুন আদিত্যবাবু, আমাদের লেট হয়ে যাচ্ছে—।’

ততক্ষণে নয়না এসে পড়েছে। পলাশও।

‘দিতুদা,’ আদিত্যর অন্য হাতটা ধরল নয়না। জোর করে হেসে হালকা গলায় বলল, ‘গব্বর সিং কী বলে গেছে ভুলে গেছেন! ওঃ কাম অন, দিতুদা, ডোন্ট বি চিকেন—।’

পলাশও বোধহয় ডাকছিল আদিত্যকে। কিন্তু নয়নার শেষ কথাটা আদিত্যর মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। সেইজন্যই পলাশের কথা স্পষ্টভাবে ও শুনতে পায়নি। ভয়! একে কি ভয় বলে?

ষাট বছর আগে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলা হয়েছিল। অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু মানুষকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। তখন আইনস্টাইন বলেছিলেন, পরমাণু বোমা যদি পৃথিবীর তিনভাগের দু-ভাগ মানুষকেও নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তা হলেও পৃথিবীতে যথেষ্ট বুদ্ধিমান মানুষ বেঁচে থাকবে, থাকবে পর্যাপ্ত বই—তারাই মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সুতরাং আদিত্য ভয় পায়নি। কিন্তু ওর শরীরের ভেতরে কোথায় যেন একটা বেদনা তরঙ্গের উৎস তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তা থেকেই চিনচিনে বেদনার স্রোত ছড়িয়ে যাচ্ছিল হাতে পায়ে মাথায়।

আদিত্য সুনয়নার দিকে তাকাল। ঝাপসা দেখাচ্ছে তরুণীকে। কওশিকজি ওকে টেনে তুললেন। বললেন, ‘আদিত্যবাবু, প্লিজ, ডোন্ট লুজ ইওর কুল। সামনে এখনও অনেক পথ বাকি।’

কওশিকজি পলাশকে গাড়িয়ে ফিরে যেতে বললেন। ইশারা করলেন মুন্নিকে, নয়নাকেও। তারপর নির্ভরযোগ্য হাতের বাঁধনে রেখে আদিত্যকে বসিয়ে দিলেন জিপসিতে।

বিশু আদিত্যকে খানিকক্ষণ দেখল। তারপর বলল, ‘বেকার চোখের জল ফেলছেন। চোখের জলের আজকাল কোনও দাম নেই।’ একটু থেমে বিশু স্বগতোক্তির মতো বলল, ‘সব শালা ফালতু—’

ওর মুখে কেমন যেন কষ্টের ছাপ পড়েছিল। সেটা দেখতে-দেখতে আদিত্য চোখ মুছছিল। পিছনে তাকিয়ে দেখল, মা মুখে আঁচল গুঁজে কাঁদছে। সুনয়নার মা হাত রেখেছে মায়ের হাতে। এই বিধবা মহিলাটি অবুঝ রয়ে গেল চিরকাল। একটা তুচ্ছ সবুজ পাখি, একটা সাধারণ ড্যাম্প ধরা ফাটল ধরা দোতালা বাড়ি, কয়েকটা নয়নতারা ফুল কিছুতেই ভুলতে পারছে না। এর কপালে অনেক দুঃখ আছে।

তিনটে গাড়ি চলতে শুরু করেছিল আবার। তখনই অনেকগুলো কঙ্কালসার মানুষকে ওরা দেখতে পেল।

দূরের শুকনো মরা গাছগুলোর গোড়ায় উবু হয়ে বসেছে দু-তিনজন করে। দু-হাতে খামচাচ্ছে রুক্ষ মাটি। এইভাবে উপড়ে নেওয়া গাছের শিকড় মুখে পুরে দিয়ে চিবোচ্ছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে এক বিন্দু রস। ওদের চোখেমুখে তৃিপ্তর ছাপ। কেউ-কেউ চোখ বুজে মুখ নাড়ছে। কিন্তু এই রসের সঙ্গেই হয়তো ঢুকে পড়ছে মারাত্মক বিষ। বাতাসের বিষ, কালো বৃষ্টির বিষ।

ধুলোর ঝড় উড়িয়ে গাড়ি ছুটল দ্বিতীয় হুগলি সেতুর দিকে। কয়েকটা মোটরবাইক বিকট গর্জন তুলে ওদের পেরিয়ে গেল। আরোহীদের প্রত্যেকের মুখেই গ্যাস-মুখোশ। কোমরে বেঢপ আকারের আগ্নেয়াস্ত্র।

ব্রিজের ওপরে উঠতেই দেখল তিরিশ মিটার উঁচু হাইমাস্ট লাইটিং স্তম্ভের মাথায় কালো রঙের সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলছে। কমলা আরও খানিকটা যেতেই চোখে পড়ল একপাশের ব্রিজের রেলিং উধাও। কোনও গাড়ি হয়তো ধাক্কা মেরেছে। আর একটা মারুতি-৪০০০ পিক্যাপ ভ্যান উলটে পড়ে আছে কিছুটা দূরে। অসংখ্য কাচের টুকরো আর পোড়া তেল ছড়িয়ে আছে রাস্তার ওপরে। ওলটানো গাড়িটার সামনের দিকটা একেবারে দুমড়েমুচড়ে গেছে।

তখনই গঙ্গার জলের দিকে নজর গেল আদিত্যর। কালচে জলে ছলাৎ-ছলাৎ ঢেউ উঠছে। আর এখানে-সেখানে ভেসে রয়েছে মরা মাছ, জলচর প্রাণী। ভেসে থাকা দুটো স্টিমারও চোখে পড়ল। চেহারা দেখে মনে হল না ওগুলোয় কোনও প্রাণ আছে।

সামনের মারুতি গতি বাড়ানোর ফলে বিশুও গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর পিছনের ম্যাটাডর ভ্যানটাও চেষ্টা করছিল তাল রাখতে।

সুনয়না নীচু গলায় কথা বলছিল মায়ের সঙ্গে। মুন্নিও মাঝে-মাঝে কথা বলছিল। কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট করে বুঝতে পারছিল না আদিত্য। ও নানকুর কথা ভাবছিল। বাচ্চাটা কি পারবে ওদের মতো বড় হয়ে উঠতে? ও কি যেতে পারবে গাছপালা-পাখির দেশে—যেখানে আকাশের ছায়া জলে মিশে জল আর আকাশ একাকার?

আদিত্যর মনে পড়ল, সুবোধদার বাচ্চা মেয়েটা পারেনি।

নয়

যে-রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটে চলেছে তাকে শ্মশান কিংবা মরুভূমি—অথবা দুটোই বলা যায়। ধোঁয়াশা আগের চেয়ে একটু গাঢ় হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা স্কুটার, মোটরবাইক বা গাড়ি চোখে পড়ছে। দুটো অসাড় দেহও দেখা গেল। তবে আদিত্যদের গাড়ি একটুও গতি কমাল না। দুর্ঘটনায় আহতদের পক্ষে মরে যাওয়াই এখন ভালো। এখন শুধু স্বার্থপরের মতো নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।

চাপা গলায় কথাবার্তা ও খুকখুক কাশির শব্দ ছাপিয়ে সুনয়নার মা হঠাৎ জিগ্যেস করলেন, ‘বিশু, আমরা কোন রাস্তা দিয়ে যাব?’

বিশু দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করে গাড়ি চালাচ্ছিল। মুখ না ফিরিয়েই বলল, ‘একটু পরেই দিল্লি রোড ধরব।’

আদিত্য সিটে মাথা এলিয়ে শুয়েছিল। বিশুর কথা শুনে তাকাল হাতঘড়ির দিকে। সওয়া বারোটা। এখন গনগনে রোদ্দুর থাকার কথা, অথচ মনে হচ্ছে সন্ধে ছ’টা। শুনতে পেল, মা মুন্নিকে বলছে, ‘খিদে পেলে বলবি, চিড়ে আর বাতাসা আছে।’

‘আমাদের ব্যাগে বিস্কিট আছে,’ সুনয়না বলল।

মুুন্নি বোধহয় মাথা নেড়ে থাকবে—খিদে পায়নি ওর। কারণ, তারপর আর কোনও শব্দ বা কথা শোনা গেল না।

আদিত্যর ঝিমুনি আসছিল। ও চোখ বুজল। মনে-মনে চাইল, ও ঘুম ভেঙে উঠেই যেন দ্যাখে সবকিছু পালটে গিয়ে আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

কিন্তু আচমকা ঘুম ভাঙতেই আদিত্য দেখল কিছুই পালটায়নি—শুধু রাস্তার দুপাশের দৃশ্য ছাড়া।

ওরা বোধহয় দিল্লি রোডে এসে পড়েছে। কারণ রাস্তাটা চলে গেছে সোজা, নাক বরাবর। অন্তত যতটুকু দেখা যাচ্ছে।

ধোঁয়াশার স্তর এখানে অনেকটা ঘন। সাপের মতো এঁকেবেঁকে দুপাশের ঢালু মাঠে নেমে গেছে। অসংখ্য সাদা সাপ যেন পরস্পর জড়াজড়ি করে এগিয়ে চলেছে।

কতকগুলো মোটরবাইকের গর্জন কানে আসছিল আদিত্যর। গোঁ—গোঁ—গর—গর—। যেন একপাল হিংস্র পশু একটি মৃত হরিণকে নিয়ে ভাগাভাগির লড়াইয়ে মেতে উঠেছে।

সামনের মারুতির গতি কমে এসেছিল। সুতরাং বিশু গতি কমাল। একইসঙ্গে শ্লথ হল ম্যাটাডর ভ্যান।

গাড়ির ভেতরে কেউ কথা বলছিল না। কিন্তু প্রত্যেকেই উইন্ডশিল্ডের ভেতর দিয়ে একাগ্র চোখে সামনে তাকিয়ে রয়েছে। সুতরাং মারুতির গতি কমানোর কারণ ও মোটরবাইকের শব্দের উৎস একইসঙ্গে দেখতে পেল সকলে।

খানিকটা দূরে একটা ছোট লরি কাত হয়ে পড়ে রয়েছে রাস্তার ওপরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকজন মানুষের দেহ। কয়েকটা মোটরবাইক জায়গাটা ঘিরে রয়েছে। মোটরবাইকের আরোহীদের মুখে গ্যাস-মুখোশ অথবা কাপড়ের টুকরো। তাদের হাতে নানা অস্ত্র।

ধোঁয়াশার জন্য কোনও কিছুই খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবে চিৎকার ও আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে নানারকম। দু-তিনটে বাইক বেপরোয়া গতিতে চক্কর মারছে। কয়েকজন মানুষ প্রাণপণ ধস্তাধস্তি করছে কালো পোশাক পরা দুটো লোকের সঙ্গে। তারই মধ্যে ফায়ারিং-এর শব্দ হলঃ ক্র্যাক-ক্র্যাক—।

গাড়ির সবাই তটস্থ হয়ে উঠেছে। চাপা অর্থহীন শব্দও বেরিয়ে এল কারও ঠোঁট চিরে। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে প্রাণভয়ে ছুটে নেমে গেল ডানদিকের মাঠে। মিলিয়ে গেল ধোঁয়াশার মধ্যে। সঙ্গে-সঙ্গে একটি লোক দৌড়ে এসে উঠে পড়ল একটা খালি মোটরবাইকে। তার হাতে এক বিশাল লম্বা ছুরি—নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে ধরা। জোরালো পায়ে এক লাথি মেরে বাইকে স্টার্ট দিল সে। তারপর বাঘের গর্জন তুলে দক্ষ ক্ষিপ্রতায় ছুটল পালিয়ে যাওয়া দুজনের পিছনে। লোকটার মুখের মুখোশ খসে পড়েছে। পুরুষ্ট গোঁফের নীচে দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছে। চোখে আগুন।

কালো পোশাক পরা লোকগুলোকে প্রথমটায় পুলিশের লোক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু দু-এক সেকেন্ডের মধ্যেই যেসব দৃশ্য চোখে পড়ল তাতে বোঝা গেল, ধারণাটা ভুল।

আদিত্য চেঁচিয়ে উঠল, ‘বিশু, গাড়ি ঘোরাও!’ কারণ, উলটে থাকা লরিটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

বিশুর মুখে ভয়ের ছাপ পড়েছিল। ও গাড়ি ঘোরানোর কাজ শুরু করতেই দেখতে পেল, তিনটে লোক এগিয়ে আসছে। দুজন বাইকে চড়ে, আর একজন দৌড়ে। তার মধ্যে দুজনের হাতে অস্ত্র চোখে পড়ল।

সামনের গাড়িটা বাঁ-দিকে বাঁক নিয়ে ঢালু মাঠে নেমে গেল। নামার সময় গাড়িটা এমন বিপজ্জনকভাবে টাল খেয়ে গেল যে, মনে হল এই বুঝি উলটে যাবে।

আদিত্য জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ‘দাদা! দাদা!’ বলে চিৎকার করে উঠল। নানকু, বউদি ওদের কিছু হবে না তো? শুনতে পেল, মা শব্দ করে জোরে কেঁদে উঠল। সুনয়না আদিত্যর পিঠের কাছে জামাটা খামচে ধরল। মুন্নি জড়িয়ে ধরেছে মা-কে। আর সুনয়নার মা কাঠ হয়ে চোখ বুজে বসে আছেন।

মারুতিটা ধোঁয়ার আড়ালে চলে যাচ্ছিল। আর ঠিক তখনই কীসের ধাক্কায় যেন জিপসির সামনের কাচটা মাকড়সার জালের মতো হয়ে গেল।

নীচের জমিতে নেমে যাওয়া মারুতিকে লক্ষ করে একটা লোক রিভলভার উঁচিয়ে ফায়ার করল। লক্ষ্যভেদ হল কি না বোঝা গেল না।

জিপসিটা ডানদিকে ঘুরে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। আর তখনই ক্ষিপ্র বেগে ছুটে আসা একটা বাইকের সঙ্গে ধাক্কা লাগল সজোরে। জিপসি টাল খেয়ে ঘুরে গেল খানিকটা। কিন্তু বিশু চোয়াল শক্ত করে স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরে বসে আছে। চাপা গলায় খিস্তি করে গাড়িটা ও নামিয়ে দিল নীচের মাঠে।

হইচই, আর্তনাদ ও ইঞ্জিনের গর্জনে আদিত্যর মাথা ঝিমঝিম করছিল। ধোঁয়াশার স্তর ভেদ করে বিপজ্জনক ঝাঁকুনি দিয়ে লাফিয়ে-লাফিয়ে চলছিল জিপসি। আদিত্য ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দেখল। কয়েকটা কালো ছায়ামূর্তি ঘিরে ধরেছে ম্যাটাডর ভ্যানটাকে। শুরু হয়ে গেছে লুঠপাটের খেলা। একটু পরেই তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকার শোনা গেল। তার মিনিট-তিন-চার পরেই এক বিস্ফোরণ।

জিপসি ছুটছে মাতালের মতো। লাফাচ্ছে, ঝাঁকুনি দিচ্ছে অনবরত। গাড়ির মধ্যে কান্না আর চাপা চিৎকার জট পাকিয়ে যাচ্ছে বারবার। পিছনে তাকিয়ে ধোঁয়াশার ভেতর দিয়ে আগুন আর কালো ধোঁয়া দেখতে পেল আদিত্য। ভ্যানটা জ্বলছে। পুড়ছে।

বিশু পাগলের মতো এপাশ-ওপাশ স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছিল, প্রাণপণ চেষ্টা করছিল গাড়িটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

আদিত্য মুুন্নি আর নয়নাকে বলল লক্ষ রাখতে, কোনও মোটরবাইক ওদের পিছনে আসছে কি না দেখতে।

ওরা তাকিয়ে ছিল পিছনদিকে। আদিত্য দেখল, সুনয়নার মুখে এই প্রথম ভয়ের স্পষ্ট ছাপ পড়েছে। সাদা টি-শার্টের নীচে ওর বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। আদিত্যর ইচ্ছে করল মেয়েটাকে কাছে টেনে নেয়। নিয়ে বলে, ‘কোনও ভয় নেই, নয়না, আমি তো আছি—।’

ঠিক সেই মুহূর্তে একটা অস্বাভাবিক শব্দ করে থেমে গেল জিপসির চাকা। গাড়িটা টাল খেয়ে গেল খানিকটা। বিশু মরিয়া হয়ে অ্যাকসিলারেটারে চাপ দিয়েই চলল। ইঞ্জিন গোঁ-গোঁ করতে লাগল, কিন্তু গাড়ির চাকা দু-ইঞ্চিও নড়ল না।

আদিত্য চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘সবাই নেমে পড়ো। এক্ষুনি!’

ওরা সবাই নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। আদিত্য আর বিশু জিপসির সামনের চাকা পরীক্ষা করল। একটা বড় গর্তে ঢুকে গেছে বাঁ-দিকের চাকাটা।

ওরা প্রাণপণে চাকাটা দু-চারবার ঠেলে দেখল। গাড়ি নড়ল, কিন্তু গর্ত ছেড়ে চাকা উঠল না। দূর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি তখন অস্পষ্টভাবে কানে আসছে। আর দেরি করা উচিত হবে না।

আদিত্যর কথায় ছোটখাটো মালপত্র যে-যার হাতে তুলে নিল। তারপর যতটা জোরে হাঁটা যায় হাঁটতে শুরু করল।

মা খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারছিল না। মুুন্নি আর নয়না সাহায্য করছিল। আদিত্যর দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে মা বলল, ‘দিতু, পলাশ—নানকু—ওরা—’ মা কথা শেষ করতে পারল না। কেঁদে উঠল অসহায়ভাবে।

আদিত্য বলল, ‘দেখছি—।’

সুনয়নার চোখ ফোলা-ফোলা লাগছিল। ও নীচু গলায় ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল। একটু আগের বিস্ফোরণটা যে ম্যাটাডর ভ্যানের হতে পারে, সেই সম্ভাবনাটা বোধহয় ওকে দুর্বল করে দিচ্ছিল।

আদিত্য চারপাশটা যতদূর দেখা যায় দেখল। সেই একই দৃশ্য। বিবর্ণ গাছপালা, ঘাস, পাতা, ফল, বিষাক্ত মাটি। জনহীন শুনশান। ধোঁয়াশা কখনও ফিকে, কখনও গাঢ়।

হাঁটতে-হাঁটতে আদিত্যর মনে হল জায়গাটা বোধহয় চাষের জমি ছিল। আর বাঁ-দিকটায় ছিল বড়-বড় গাছের বিশাল বাগান। এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে আম-জাম-কাঁঠাল গাছের কঙ্কাল। আর জমিটা ঝরাপাতায় ছাওয়া।

আদিত্যর চঞ্চল চোখ একটা আশ্রয় খুঁজছিল, কিন্তু তক্ষুনি কোনও বাড়িঘর বা কুটির নজরে পড়ল না।

এদিক-ওদিক করে দিশেহারার মতো হাঁটছিল সকলে। বিশু বলল, ‘ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা মিটে গেলে পরে গিয়ে গাড়িটা ঠেলেঠুলে তুলে নিয়ে আসব। গাড়ি না থাকলে এখানেই বেঘোরে মরতে হবে—।’

আদিত্য বিশুর দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

আর ঠিক তখনই একটা মেয়ের চিৎকার শুনতে পেল ওরা। একবার, দুবার, তিনবার।

আদিত্য যেন একটা ঝাঁকুনি খেল। এই চিৎকারটার মধ্যে যেন একটা নিরুপায় বেদনা ও হতাশা মিশে আছে। অথচ এই চিৎকারের মধ্যে আক্রান্তের মরিয়া সুর থাকা উচিত। যে সুর বলে, আমি বেঁচে উঠতে চাই।

কয়েকসেকেন্ড মাত্র। তারপরই আদিত্য ছুটতে চাইল চিৎকার লক্ষ করে। বিশুকে বলল ওদের নিয়ে এগিয়ে যেতে।

তখন বিশু কী একটা যেন এগিয়ে দিল আদিত্যর দিকে। বলল, ‘এটা কাছে রাখুন—।’

আদিত্য হাতে নিল জিনিসটা। একটা মাংকি-রেঞ্চ। প্রায় এক ফুট লম্বা। একটা প্যাঁচ ঘুরিয়ে এই ধরনের রেঞ্চের মুখের হাঁ বাড়ানো-কমানো যায়। এটাকে কি অস্ত্র হিসেবে ভাবা যায়? সাধারণ একটা যন্ত্র। অথচ এই মুহূর্তে এটা ছোঁওয়ামাত্রই আদিত্যর গায়ে কাঁটা দিয়েছে। বুঝতে পেরেছে, আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে এই ভারী যন্ত্রটা মোটেই অযোগ্য নয়।

চিৎকারটা শোনা গেল আরও দুবার।

সুতরাং আর অপেক্ষা না করে আদিত্য ছুটল।

বাঁ-দিকে একটু কোনাচে জায়গা থেকে আসছিল চিৎকারটা। পিছন থেকে মা আর মুন্নির ডাক কানে এল। কিন্তু আদিত্য থামল না। মায়ের গলা শুনতে পেল আবার, ‘দিতু, তুই যাস না। আমাদের ফেলে এভাবে যাস না—।’

‘ছোড়দা, চলে আয়! ওসব ঝামেলায় জড়াস না।’ মুন্নি।

‘দিতুদা, প্লিজ। দিতুদা—’ সুনয়না।

ওদের স্বার্থপর পিছুডাক ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছিল। আর আদিত্য রুক্ষ শুকনো এবড়োখেবড়ো জমির ওপর দিয়ে ছুটছিল। চার-দশে খেলার কথা মনে পড়ছে। পায়ে রবারের বল, একটু দূরেই গোলপোস্ট। পাড়ার ছেলেগুলো ওর নাম ধরে হইহই করে চেঁচাচ্ছে।

এদিকটাতেও অনেকগুলো বড়-বড় গাছ। মাটি ঝরাপাতায় ঢাকা। আদিত্য ছুটতে-ছুটতে একটা গাছে ধাক্কা খেল। কারণ, ধোঁয়াশা ওকে নিয়ে ইঁদুর-বেড়াল খেলছিল।

ছিটকে পড়েও হাল ছাড়েনি আদিত্য। খড়খড়ে আগাছা ও পাতায় মুখ ঘষে গেল ওর। চামড়া ছড়ে গিয়ে জ্বালা করতে লাগল। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উঠে দাঁড়াল। রেঞ্চটা বাগিয়ে ধরে আবার চলতে শুরু করল দ্রুত পায়ে।

কয়েক পা এগিয়েই মোটরবাইকটা দেখতে পেল। কাত হয়ে পড়ে আছে। প্রায় একইসঙ্গে আসল দৃশ্যটাও নজরে পড়ল।

একটা মেয়ে একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে। পরনে কালো আর সবুজ ছাপা শাড়ি। বয়েস বাইশ-তেইশ বছর হবে হয়তো। শ্যামলা মুখে অস্বাভাবিক আতঙ্ক। চোখ বড় করে তাকিয়ে রয়েছে।

মেয়েটার কাছ থেকে একটু দূরেই দুটি মানুষে ভয়ংকর লড়াই চলেছে। মরণপণ লড়াই। ধস্তাধস্তি, ঘুসি—একেবারে দাঁত-নখের যুদ্ধ।

গাছের কঙ্কালে ঘেরা রাজত্বে পাতাঝরা মরুভূমি জমিতে এ-লড়াই কেমন অদ্ভুত লাগল আদিত্যর। বাঁচার লড়াই, না মরার লড়াই?

আরও কাছে এগিয়ে গেল ও। তখনই গোঁফওয়ালা কালো পোশাক পরা লোকটাকে চিনতে পারল। একটু আগেই এই লোকটা খোলা ছুরি বাগিয়ে মোটরবাইক নিয়ে তাড়া করেছিল দুটি অসহায় মানুষকে। এরা দুজনই কি সেই দুজন?

কালো পোশাক পরা লোকটা হঠাৎই চিৎকার করে উঠল। তার রোগা প্রতিদ্বন্দ্বী নখের গভীর আঁচড় টেনে দিয়েছে চোখে, গালে, গলায়। লোকটা এক ভয়ংকর গর্জন করে হাতের কায়দায় কাত করে শুইয়ে দিল রোগা মানুষটাকে। ভারী পা দিয়ে চেপে ধরল তার গলা। তারপর নিজের দেহটাকে যতটা সম্ভব লম্বা করে কোনও জিনিসের খোঁজে হাত বাড়িয়ে দিল।

আদিত্য দেখল জিনিসটা। সেই লম্বা ছুরি, কিন্তু খাটো তরোয়ালও বলা যায়। ওটা হাতের নাগাল পেলে যে কী অবস্থা হবে সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না। সুতরাং বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল আদিত্যর শরীরে। তিনটে লম্বা পা ফেলে ও এগিয়ে গেল ওদের কাছে। এবং হাতের মাংকি-রেঞ্চটা কালো পোশাক পরা লোকটার মাথায় সজোরে বসিয়ে দিল। একবার—দুবার।

ভারী দেহটা কাত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। তখনই টলতে-টলতে উঠে দাঁড়াল রোগা মানুষটা। সারা মুখে ধুলোমাটি। জামা রক্তে ভেজা। লম্বা-লম্বা চুল উসকোখুসকো, নেমে এসেছে শ্যামলা মুখের ওপরে। মনে হল, বয়েস বেশি নয়।

শ্যামলা ছেলেটা এলিয়ে পড়ে থাকা লোকটাকে উদভ্রান্ত চোখে একবার দেখল। তারপর চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় এক লাফে তুলে নিয়ে এল ছুরিটা। এবং পাগলের মতো কোপাতে লাগল অসাড় মানুষটাকে। একইসঙ্গে অর্থহীন চিৎকারও করে চলল।

আদিত্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ, এতক্ষণে ও রোগা শ্যামলা মানুষটাকে চিনতে পেরেছে। শুভেন! শুভেন এখানে কেমন করে এল? এ কী অবস্থা হয়েছে ওর!

শুভেন তখনও ছুরি চালাচ্ছিল কসাইয়ের মতো। পড়ে থাকা লোকটা বারকয়েক নড়েচড়ে উঠেছিল। আর্তনাদও করেছিল দু-একবার। কিন্তু এখন একেবারে নিথর, চুপচাপ। তবুও শুভেন এক মারাত্মক কোপ বসিয়ে দিল লোকটার মুখের ওপরে। নাক আর চোখের মাঝে ইঞ্চিখানেক ফাঁক হয়ে গেল। রক্তে ভেসে গেল জায়গাটা। কিন্তু শুকনো মাটি পলকেই সব শুষে নিচ্ছিল। যে-শরীর থেকে আর কোনওভাবে সাড়া পাওয়া যাবে না ভাবা গিয়েছিল সেই ভারী শরীরটা ঝটকা দিয়ে উঠল বীভৎসভাবে। বেঁকে গেল অদ্ভুত কোণে। তারপর স্থির।

হাতের ছুরি ফেলে দিয়ে মুখ মুছল শুভেন। আদিত্যর দিকে দেখল। বোধহয় চিনতে পারল ওকে। সম্মোহিতের মতো শিথিল পায়ে কয়েক পা এগিয়ে এল। তারপর ‘দিতু, তুই!’ বলে হঠাৎই হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল।

হাতের রেঞ্চটা ফেলে দিয়ে চকিতে ওকে ধরে ফেলল আদিত্য। একেবারে জাপটে ধরল। ভাঙা গলায় বলল, ‘শুভেন, তুই এখানে কী করে এলি? মাসিমা মেসোমশাই—ওরা কোথায়?’

শুভেন জড়িয়ে-জড়িয়ে বলল, ‘সব শেষ!’ তারপর আরও কীসব বলছিল ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছিল না। ছুরির আঘাত ওকেও রেহাই দেয়নি।

আদিত্যর কথার উত্তর দিল কালো মেয়েটি। গাছের গুঁড়ির কাছ থেকে ও কখন যেন এগিয়ে এসেছে।

‘একটা লরি জোগাড় করে আমরা সবাই কলকাতা থেকে রওনা হয়েছিলাম। যে যেখান থেকে পেরেছে লরিতে উঠেছে—তবে লরিওয়ালাকে টাকা দিতে হয়েছে। এই রাস্তার প্রায় শুরু থেকেই এই লোকগুলো—’ পড়ে থাকা লাশটা আঙুল দিয়ে দেখাল মেয়েটিঃ ‘এই লোকগুলো আমাদের পিছু নিয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম পুলিশের লোক, কিন্তু পরে বুঝেছি না, তা নয়…।’

আদিত্য লক্ষ করল, মেয়েটির শাড়ি নানা জায়গায় ছেঁড়া। ব্লাউজও তাই। ওর যৌবন জানান দিচ্ছে অপকটে। অল্পের জন্য শরীর-দূষণের হাত থেকে বেঁচে গেছে ও।

‘জল…একটু জল দে, দিতু—’ শুভেন হাঁ করে হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল। ওর জিভটা কেমন ফ্যাকাসে।

আদিত্য এপাশ-ওপাশ দেখল। এখানে জল পাবে কোথায়! পেলেও কি তা মুখে দেওয়া যাবে? নয়নাদের সঙ্গে জলের বোতল রয়েছে। তা ছাড়া আশেপাশে যদি কোনও টিউবওয়েল থাকে?

‘কল্পনা!’ আর্ত গলায় ডাকল শুভেন।

মেয়েটি পাগলের মতো ছুটে এসে ঝুঁকে পড়ল শুভেনের ওপরে। ব্যাকুল স্বরে বলল, ‘কী শুভেনদা, বলো…।’

শুভেনের ঠোঁট নড়ছিল, কিন্তু কোনও শব্দ হচ্ছিল না।

কল্পনা অনুনয়ের চোখে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘একটু জল পাওয়া যাবে কোথাও?’

আদিত্য পাতা ছাওয়া জমির ওপরে ধীরে-ধীরে শুভেনকে শুইয়ে দিল। শুভেনের জামা থেকে রক্ত লেগে গেছে ওর জামায়। ও উঠে দাঁড়াল। কল্পনাকে বলল, ‘তুমি ওর কাছে থাকো, আমি দেখছি জল পাওয়া যায় কি না।’

কল্পনা শুভেনের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। জ্বলজ্বলে কালো চোখে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে হঠাৎই জিগ্যেস করল, ‘আপনি শুভেনদার কে হন?’

‘বন্ধু,’ আদিত্য বলল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘তুমি?’

কল্পনা শুভেনের আধখোলা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেউ না। লরিতেই আলাপ।’

আদিত্য অবাক চোখে কয়েক মুহূর্ত ধরে মেয়েটাকে দেখল। তারপর ক্লান্ত পায়ে হঁাঁটা দিল জলের সন্ধানে। বিশুরা যেদিকে এগিয়েছে, সেদিকেই হাঁটতে শুরু করল। পিছন থেকে শুভেনের অর্থহীন প্রলাপ কানে আসছিল ওর।

খানিকটা এগোতেই বিশুর দেখা পাওয়া গেল। এলোমেলো চক্করে আদিত্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ওকে চিৎকার করে ডাকল আদিত্য।

ওকে দেখে বিশুর যেন ধড়ে প্রাণ এল। ছুটে এসে আদিত্যর হাত চেপে ধরল। বলল, ‘আপনার জন্যে কেঁদে-কেঁদে আপনার মা হয়রান হয়ে যাচ্ছে। শিগগির চলুন—।’

আদিত্য অল্প কথায় সবকিছু খুলে বলল বিশুকে।

‘একটু জলের ব্যবস্থা করো—যে করে হোক। নইলে শুভেনটাকে…।’

পিছন থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েছে কল্পনা। হাউহাউ করে কাঁদছে। আগের আর্ত-চিৎকারের তুলনায় এই সর্বহারা কান্না অনেক বেশি গভীর।

বিশু চলে যাচ্ছিল, আদিত্য ওকে ডেকে দাঁড় করাল। জলের বোধহয় আর দরকার নেই। ও অবশ হয়ে হেঁটে আবার ফিরে চলল শুভেনের কাছে। বিশুও চলল ওর পিছনে-পিছনে।

কালো মেয়েটা নির্লজ্জের মতো আছাড় খাচ্ছিল শুভেনের বুকের ওপরে। আর বিকৃত গলায় চিৎকার করে ‘শুভেনদা! শুভেনদা!’ বলে ডাকছিল। কিন্তু শুভেন কোনও সাড়া দিচ্ছিল না। ওর কবিতার সেই ‘অলৌকিক খেলা’-য় মেতে উঠেছে যেন।

আদিত্য কল্পনাকে দেখছিল। মাত্র একঘণ্টার সহযাত্রীর জন্য এত চোখের জল ফেলা যায়! এইরকম তীব্রতায় প্রকাশ করা যায় শোক-দুঃখ-তাপ!

নিরুপায় আদিত্য বিশুকে ইশারা করল। তারপর এগিয়ে গিয়ে কল্পনাকে একরকম জোর করে টেনে তুলল দুজনে। শুভেনের মৃতদেহ নিয়ে কী করবে ভাবছে, এমনসময় বহু দূরে শোনা গেল বাইকের গর্জন। এদিকেই আসছে।

আদিত্য আর দেরি করল না। কল্পনার হাত ধরে টান মারল। বিশুকে তাড়া দিল একইসঙ্গেঃ ‘জলদি, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলেই বিপদ!’

বিশু রেঞ্চটা চট করে তুলে নিল। একটা হাতিয়ার থাকা দরকার। তারপর ওরা তিনজনে একরকম ছুটতে শুরু করল।

বিশুই পথ দেখানোর কাজ করছিল।

ছুটতে-ছুটতেই আদিত্য ভাবলঃ শুভেনের দেহ অন্তত শেয়াল-কুকুর বা কাক-শকুনে ছিঁড়ে খাবে না। কারণ, এরা কেউ আর নেই। শুভেনের দেহ কেউ যদি কুরে-কুরে খায় তো সে প্রকৃতি। প্রকৃতিই ওকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।

অন্ধকার গাঢ় এবং গভীর হলে বোঝা যায় পৃথিবীর একপিঠ চলে গেছে সূর্যের আড়ালে। রাত হয়েছে। যদি এই তফাতটুকুও মুছে যায়, তা হলে?

ওঃ, কতদিন যে স্পষ্ট করে সূর্য দেখা যায়নি! দেখা হয়নি চাঁদ-তারাও। ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। ভীষণ। ভাবছিল আদিত্য।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ওদের পথ চলা শেষ হয়নি এখনও। ক্লান্ত-শ্রান্ত মুখগুলো ওর মনে ব্যথা তৈরি করছিল। রুক্ষ প্রান্তর, শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা, কালোজল দিঘি পেরিয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে ওরা।

মা আর পারছিল না। মায়ের জন্যই পথে বিশ্রাম নিতে হয়েছে বারবার।

বিশু মাঝে-মাঝেই পিছনে দেখছিল। পথের নানা চিহ্ন খুঁটিয়ে নজর করছিল। ওর মুখের অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, পথ চিনে জিপসির কাছে ফিরে যাওয়াটা খুব সহজ কাজ হবে না।

এলোমেলো মেঠো পথে কয়েকটা পরিত্যক্ত কুটির যে চোখে পড়েনি তা নয়। কিন্তু সেগুলো নিরাপদ বলে মনে হয়নি আদিত্যর। যে-কোনও মুহূর্তে ও বিপদের আশঙ্কা করছিল। এই বুঝি ধোঁয়াশার পরদা চিরে বেরিয়ে আসবে বাঘের দল। কারণ রাস্তার ঘটনাটা ও ভুলতে পারছিল না কিছুতেই। ভুলতে পারছিল না শুভেনের কথা। ‘চারিদিকে শবের পাহাড়’। সব শেষ!

কল্পনা কাঁদছিল। ছেঁড়া শাড়ি-ব্লাউজের জন্য কোনও সঙ্কোচ ছিল না ওর। কারও সঙ্গে একটাও কথা বলছিল না। পায়ে জুতো-চটি কিছু নেই। শরীরের অনেক জায়গায় কেটে-ছড়ে গেছে।

আদিত্য উৎসাহ দিচ্ছিল সবাইকে। আর একটু! আর একটু।

কখনও ও মায়ের সঙ্গে হাঁটছিল। কখনও মুন্নির পাশে। কখনও মাসিমার পাশে। আর বেশিরভাগটাই সুনয়নার পাশে—ওর কাছাকাছি থাকতে ভীষণ ইচ্ছে করছিল।

আদিত্য শুধু ওকেই বলেছে শুভেনের কথা। আর কাউকে বলেনি। বিশু আর কল্পনাকেও বারণ করেছে বলতে। শুভেনের কথা শুনলে ওদের মনের জোর চুরমার হয়ে যেতে পারে।

সন্ধের অন্ধকার নামতেই নয়না জিগ্যেস করল, ‘আর কতদূর, দিতুদা?’

আদিত্য চারপাশ দেখে নিয়ে নীচু গলায় বলল, ‘থাকার মতো একটা সেফ জায়গা পেলেই থাকব।’

‘মা, মাসিমা—ওরা আর পারছে না।’

‘জানি,’ ঠোঁট কামড়াল আদিত্য। একটু থেমে বলল, ‘নানকু কেমন আছে কে জানে।’ আদিত্যর চোখে জল এসে গেল হঠাৎ। বাচ্চাটাকে ও পাখির দেশে নিয়ে যাবে বলেছিল। যে করে হোক একটা পাখির ডাক শোনাবে।

আদিত্য চোখের জল মোছার চেষ্টা করেনি। কিন্তু আবছা আঁধারে কোন অলৌকিক দৃষ্টিতে মেয়েটা সেটা টের পেল? খাটো গলায় ডাকল, ‘দিতুদা—।’

আদিত্য চোয়াল শক্ত করার চেষ্টা করে বলল, ‘জানি। গব্বর সিং কী বলে গেছে, মনে আছে।’

নয়নার মুখের কমনীয়তা এরই মধ্যে অনেকটাই বনবাসী। মাথার চুলে ধুলোর ছোঁয়া। ঠোঁটে খরা লেগেছে। কিন্তু ওর হাতের স্পর্শ উত্তাপহীন নয়।

মেয়েটা আচমকা আদিত্যর হাত চেপে ধরতেই আদিত্য সেটা বুঝতে পারল। ওর ইচ্ছে হল, ডান হাতে ঝোলানো ব্যাগটা ফেলে দিয়ে কিছু একটা করে বসে।

সুনয়না বলল, ‘নানকুদের জন্যে আপনি চিন্তা করবেন না। কওশিকজি আছেন। উনি আমাদের বাগানবাড়ি চেনেন।’

আদিত্য দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। ওর হাসি পেল। এখনকার এই অবস্থায় বাগানবাড়ি কাকে বলে? বাগানই বা কাকে বলে? সুন্দর করে সাজানো মরা গাছের সারিকেই কি বাগান বলে?

অন্ধকার অনেকটাই গাঢ় হয়েছিল। টর্চ জ্বেলেছে বিশু। ও সবার আগে-আগে হাঁটছে। আদিত্যরা একেবারে পিছনে।

ও সুনয়নার কাঁধে হাত রাখল। সামান্য কাছে টানল ওকে। সুনয়না অবাক হল না। অন্তত অনুভবে আদিত্যর তাই মনে হল। গ্যালিলেও, নিউটন, আইনস্টাইনের চেয়ে ফ্রয়েড অনেক বেশি শক্তিশালী।

নয়নার কানের কাছে মুখ নিয়ে আদিত্য বলল, ‘নয়না, এবার জেগে ওঠো। তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, বাগানবাড়ি বলে আর কোথাও কিছু নেই।’ শেষ দিকে আদিত্যর গলা বসে গেল, কথা জড়িয়ে গেল।

নয়না বলল, ‘আমি তো বলেছি, আর তিনটে দিন। দেখবেন, সব ঠিক হয়ে যাবে—।’

আদিত্য বুঝতে পারছিল, মেয়েটার গলায় আগের সেই আস্থা আর নেই। এত কষ্টের ভ্রমণ আর পথের হানাদার দস্যুর দল সবরকম আস্থা শুষে নিয়েছে।

ও কিছু বলল না। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও ‘মাদ্রাজি’ নমস্কার করা হাসিখুশি বাচ্চাটাকে ভুলতে পারছিল না। নানকু! নানকু!

তখনই দূরের একটা বাড়ি ওদের চোখে পড়ল। তার দোতলার জানলা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। ঘোলাটে আলো।

ঠিক একইরকম ঘোলাটে আলো ফুটে উঠল সকলের চোখে। আদিত্যরও মনে হল, এইবার হয়তো একটা নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যাবে। হাতের ছোট-বড়-মাঝারি লাগেজগুলো অনেকক্ষণ ধরে পাথর হয়ে ঝুলছে। হাতের ও কাঁধের প্রতিটি পেশি, শিরা, বেদনায় টনটন করছে।

নয়না বলে উঠল, ‘দিতুদা! দেখেছেন?’

আদিত্য সুনয়নাকেই দেখছিল অন্ধকারে। বলল, ‘দেখেছি—।’

সামনে আর-সকলে নানা কথা বলছিল। নতুন এই আলোর ইশারায় হঠাৎই যেন সবার মধ্যে উদ্দীপনা জেগে উঠেছে।

টর্চের আলোয় কোনওরকমে পথ দেখে হোঁচট খেতে-খেতে সবাই এগোচ্ছিল।

কল্পনার কাছাকাছি পৌঁছে আদিত্যর কানে এল ফোঁপানির শব্দ। অবুঝ মেয়েটা এখনও থামতে পারেনি।

এখন ধোঁয়াশা কিছুটা কমে এসেছে। চোখও জ্বালা করছে কম। আশ্রয়ের দেখাও মিলেছে এই রুক্ষ প্রান্তরে। তবুও কল্পনা থামতে পারেনি।

অন্ধকারে আরও অন্ধকার সাতটা প্রাণী ধীরে-ধীরে পৌঁছে গেল বাড়িটার সদর দরজায়।

তখনই বুঝতে পারল, আশেপাশে আরও কয়েকটা বাড়ি রয়েছে। কিন্তু সেগুলো সবই ঘুটঘুটে অন্ধকার।

অন্য সবাইকে থামতে বলে আদিত্য ডেকে নিল বিশুকে। ব্যাগটা নামিয়ে রেখে টর্চটা ডানহাতে বাগিয়ে ধরল।

একটা আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এখন ভয়ানক তীব্র হয়ে উঠেছে। সঙ্গে বয়ে আনা জলের সঞ্চয়ও বিপদসীমায় পৌঁছে গেছে। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যেতে চাইছে।

ঠোঁটের ওপরে জিভ বুলিয়ে নিল আদিত্য। শুকনো জিভটা গিরগিটির লেজের মতো লাগল। ও আর বিশু সদরের কাঠের পাল্লার হুড়কো খুলে ভেতরে ঢুকল।

চারিদিকে খাটো পাঁচিল ঘেরা জায়গা। তার সামনের অংশে বাগান ছিল। টর্চের আলো বুলিয়ে দেখা গেল এখন যা হওয়ার কথা তাই হয়েছে। নীরস শাখাপ্রশাখা আর ঝরাপাতা।

ওরা সাবধানে এগোচ্ছিল, পিছন থেকে মুন্নি ডেকে উঠল, ‘ছোড়দা, খুব জল তেষ্টা পেয়েছে রে…।’

আদিত্য টর্চ ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। সুনয়না ততক্ষণে প্লাস্টিকের ওয়াটার বটল এগিয়ে দিয়েছে ছোট বোনটার দিকে।

আদিত্য চাপা গলায় বলল, ‘দেখো তো আশেপাশে টিউবওয়েল আছে কি না। থাকলে জলের অভাবটা অন্তত মিটবে।’

সামনে টর্চ ঘোরাতেই বাড়ির দরজাটা দেখা গেল। ভেজানো। একতলায় কোনও আলো চোখে পড়ছে না। মনে হয়, সব জানলাই বন্ধ।

বিশু আর আদিত্য সামনে এগিয়ে গেল। টর্চ নিভিয়ে দরজার পাল্লায় সতর্কভাবে চাপ দিল।

আড়চোখে আদিত্য দেখল, বিশু রেঞ্চ বাগিয়ে ধরেছে।

আর তখনই ওদের অবাক করে দিয়ে দরজাটা খুলে গেল। বাড়িটার ভেতরের হা-হা অন্ধকার ওদের স্বাগত জানাল।

কারও কথার শব্দ কানে এল ওদের। তবে কথাগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।

অন্ধকারেই বিশুর চকচকে চোখ আদিত্যকে দেখল। আদিত্য বিশুর হাতে টর্চ দিল, কিন্তু ওকে টর্চ জ্বালতে বারণ করল।

দোতলার খানিকটা আলো ঠিকরে এসে পড়েছে নীচের একটা ছোট উঠোনে। প্রতিফলিত আলোয় যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে ভয়ের কিছু নজরে পড়ল না।

বিশুর হাত ধরে টান মারল আদিত্য। দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িটা আবছা দেখতে পেয়েছে ও।

একতলায় উঠোন ঘিরে দুটো ঘর। দুটোই অন্ধকার। প্রাণের সাড়া নেই।

সিঁড়িতে একবার টর্চের আলো ফেলল বিশু। ধুলো, নোংরা, অপরিষ্কার।

টর্চ নিভিয়ে ওরা দুজনে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।

দোতলা থেকে ভেসে আসছিল কথাগুলো। ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল। আরও কয়েক ধাপ ওঠার পর কথাগুলো বোঝা গেল। পুরুষের গলাঃ ‘…যে করে হোক এ অবস্থাকে সামলাতে হবে। এত সহজে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য আসতে শুরু করেছে। দরকার হলে বিদেশি সাহায্যও আসবে।’

পুরুষটি থামতেই শোনা গেল নারীকণ্ঠঃ ‘শুধু সাহায্য দিয়ে কী হবে! সবুজের ছিটেফোঁটা নেই, একটা পাখি নেই, পোকামাকড় নেই, আর আইন-শৃঙ্খলা বলেও তো কিছু নেই…চারদিকে শুধু লুঠপাট খুন-জখম…।’

ওরা দুজনে দোতলায় উঠে এসেছে। দোতলার তিনটে ঘরের দুটোয় আলো জ্বলছে। শব্দ অনুসরণ করে ওরা চলে এসেছে একটা আলো-জ্বলা ঘরের সামনে।

আদিত্য আর দেরি করল না। বিশুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সেই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। এবং একইসঙ্গে বলতে শুরু করল, ‘আমরা খুব বিপদে পড়ে—।’

থেমে গেল আদিত্য। ঘরে কোনও লোক নেই!

সাদামাঠাভাবে সাজানো একটা বসবার ঘর। চেয়ার, টেবিল, দেওয়াল-আলমারি, আর সাধারণ ক’টা আসবাব। টেবিলে কয়েকটা বই আর খবরের কাগজ। ঘরের এক দেওয়ালে একটা টিউব লাইট জ্বলছে। কিন্তু তার আলো ঘোলাটে—মরা মাছের চোখের মতো।

ঘরের সর্বত্র ধুলোর মিহি স্তর। আসবাবপত্র দেখে মনে হতে পারে এই ঘরটা একটু আগেই কেউ ব্যবহার করেছে, কিন্তু ধুলোর আস্তরণ অন্য গল্প বলছে।

পুরুষ আর নারীকণ্ঠ তখনও কথা বলছিল—টিভির ভেতর থেকে।

আদিত্য এগিয়ে গিয়ে টিভির সুইচটা অফ করে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে এক অদ্ভুত ছমছমে নিস্তব্ধতা গোটা বাড়িটায় চেপে বসল।

বিশু ঘরের ভেতরে ঢুকে অবাক চোখে চারপাশ দেখছিল। ও আদিত্যকে জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার, দাদা! কী বুঝছেন?’

আদিত্য বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। মাথা নাড়ল সামান্য। চুলে হাত চালাল। গলার কাছে একটা জ্বালা টের পেল।

ও বিশুকে নিয়ে গোটা বাড়ির প্রত্যেকটি ঘরে একবার করে উঁকি মারল। না, কেউ নেই এ-বাড়িতে। ধুলোর বহর দেখে মনে হল দু-চারদিন আগেই সবাই এ-বাড়ি ছেড়ে গেছে। সুরেন্দ্র-নিলয়ের মতো। নিরুদ্দেশের পথে চলে যাওয়া মানুষগুলো আর কখনও কি ফিরে আসতে পারবে এই ঠিকানায়?

বিশু সব দেখেশুনে বলল, ‘যাকগে, রাতটা নিশ্চিন্তে এখানে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।’

আদিত্য ঘাড় নাড়ল। ছোট্ট করে বলল, ‘হুঁ—।’

ও শিকড় ছিঁড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর কথা ভাবছিল। কী ভীষণ তাড়াহুড়ো ছিল তাদের। ঘরদোর খোলা, টিভি চলছে, বাতি জ্বলছে। নাকি সেসময় অপ্রত্যাশিত বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হয়েছিল?

পরিত্যক্ত একটা স্মৃতির কোঠা এখন আদিত্যদের আশ্রয়। ও বিশুকে বলল, সবাইকে ডেকে নিয়ে আসতে। সবাই চিনে নিক তাদের রাত্রিনিবাস।

আদিত্য দোতলার টিভির ঘরে দাঁড়িয়ে নানকুদের কথা ভাবছিল, এমনসময় ক্লান্ত শ্রান্ত মানুষগুলো একে-একে এল।

আদিত্য বিশুকে বলল, ‘সদর আর বাড়ির দরজায় ভালো করে খিল ছিটকিনি এঁটে দাও শিগগির।’

বিশু চলে গেল। তখন আদিত্য তাকাল মায়ের দিকে।

হাতে-পায়ে শুকনো আঁচড়ের দাগ, কিন্তু মুখে প্রশান্তি। মা ভীষণ সইতে পারে—শরীরের ব্যথা। মায়ের উদাস মুখ দেখে ওর মনে হল মা এখনও বুঝি একটা ছন্নছাড়া মানুষের ‘নিভা! নিভা!’ ডাক শুনতে পাচ্ছে। সেইসঙ্গে নানকুর চিৎকারঃ ‘ঠামা, তুমি কোথায়?’

দোতলা ও একতলায় একটা করে শোওয়ার ঘরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। আদিত্য আর বিশু মিলে মোটামুটিভাবে ঝেড়েঝুড়ে দিয়েছিল বিছানাগুলো।

আদিত্য এগিয়ে গেল মায়ের কাছে। বলল, ‘এসো—।’

সুনয়নার মায়ের মুখের বহু চেনা গিন্নি-বান্নিভাব অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। তাঁর চেহারায় এখন হতাশা ছাড়া আর কিছু নেই।

আদিত্য তাঁকেও ডেকে নিলঃ ‘আসুন, মাসিমা—’ তারপর এগোল দোতলার শোওয়ার ঘরের দিকে। ওঁদের দুজনের সবচেয়ে বেশি বিশ্রাম দরকার।

বিশু ফিরে এসেছিল। আদিত্য ওকে বলল, খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। এ-বাড়ির ভাঁড়ার আগেই খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছে ওরা। কুড়িয়ে-বাড়িয়ে সামান্য কিছু হয়তো পাওয়া যাবে। মুন্নি এসে জানাল যে, বাড়ির পিছনদিকে একটা টিউবওয়েলের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার জলটা বেশ মিষ্টি।

নয়না টিভির সুইচ অন করে দিয়ে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। তারপর বিশুর সঙ্গে খাবারের জোগাড়ে সাহায্য করতে গেল।

মুন্নি একটা চেয়ারে জড়োসড়ো হয়ে মুখ গুঁজে পড়েছিল। চোখের কোলে কালি। সুন্দর মুখ অবহেলায় মলিন।

পাশের ঘরে মা শুয়ে পড়েছে বিছানায়। সুনয়নার মা-ও।

ওঁদের দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছিল আদিত্যর। শ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। লক্ষ করেছে, মা ভীষণ হাঁপাচ্ছে, আর কাশছে ক্রমাগত। শরীরটা জীর্ণ-শীর্ণ।

সুনয়না বোধহয় হাঁটাচলা করছে মনের জোরে। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ? আর কতদিন? আর কতমাস পরে শেষ হবে নয়নার ‘তিন দিন’!

কাল সকালে ওরা সবাই যাবে জিপসিটা খুঁজতে। যে করে হোক গাড়িটাকে ঠেলে তুলতে হবে গর্ত থেকে। তারপর ওই ভাঙা উইন্ডশিল্ড নিয়েই রওনা হতে হবে।

কিন্তু কোথায়? কতদূরের গন্তব্যের দিকে? আর পলাশ-বউদি-নানকুরা?

আদিত্য এইসব উলটোপালটা ভাবছিল। তখন টিভিতে গতানুগতিক নানা কথাবার্তা হচ্ছে। পুরোনো কিছু রেকর্ডিং চালিয়ে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো দেখেশুনে আদিত্যর মনে নতুন কোনও প্রতিক্রিয়া জাগছিল না। সব মানুষই ভয় ও হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। এখন শুধু আক্রোশ, বিরক্তি, ক্ষোভ পড়ে আছে।

পরিত্যক্ত এই বাড়ির নানা ঘরে ঘুরে আদিত্য এতটুকু অবাক হয়নি। দেওয়ালে দু-তিনটে বাঁধানো ফটো। বাচ্চাদের স্কুলের বইপত্র। আলনায় এলোমেলো জামাকাপড়। রান্নাঘরে হাঁড়িকুড়ি। কলতলায় এঁটো বাসনপত্র। খাওয়ার ঘরে শুকনো বাসি খাবার। উঠোনের দড়িতে দুটো ছড়ানো কাপড়।

না, কোনও তফাতই খুঁজে পায়নি আদিত্য। যদি কোনও বাস্তুহারার দল তালা
ভেঙে ঢুকে পড়ে সুরেন্দ্র-নিলয়ে, তারাও বোধহয় একই দৃশ্য দেখবে, একই অনুভবের শিকার হবে।

কল্পনা এসে ঘরে ঢুকতেই আদিত্যর মনে পড়ল, অনেকক্ষণ ওকে দেখেনি। কিন্তু তা বলে এরকমভাবে দেখবে ভাবেনি। স্নান সেরে ফেলেছে মেয়েটা। অন্য শাড়ি-ব্লাউজও পরে নিয়েছে। গুনগুন করে গান গাইছিল। এসে একটা খালি চেয়ারে বসে পড়ল ধুপ করে। বলল, ‘দাদা, আপনাকে ক্লান্ত লাগছে। যান, একটু বিশ্রাম করে নিন—।’

আদিত্য মুন্নিকে দেখল। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর স্বপ্নের মধ্যে দুর্গাপুর কিংবা রজত ঢুকে পড়তে পেরেছে কি না কে জানে! কারণ, এখন তো স্বপ্ন বলতে দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নেই।

আদিত্য ঘড়ি দেখে বলল, ‘সবে পৌনে ন’টা। আগে দেখি খাওয়াদাওয়ার কী ব্যবস্থা হল, তারপর শোওয়ার কথা ভাবা যাবে।’

কল্পনা টিভি দেখছিল। অন্তত টিভির দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। মাথা হেলিয়ে ভিজে চুল আরও ভালো করে ছড়িয়ে দিল পিঠের ওপর। হালকা নীল সুতির শাড়ি আর হলুদ-কালো ছিটের ব্লাউজ বেশ দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। কিছুক্ষণ গুনগুন করে মেয়েটা হঠাৎই জিগ্যেস করল, ‘এখানে ক’দিন থাকবেন?’

ওর প্রশ্নটা চমকে দিল আদিত্যকে। ওর কথার ঢঙে মনে হল ও যেন প্যাকেজ ট্যুরে বেরিয়েছে। আদিত্য ওদের টিম ম্যানেজার। কিন্তু এই ট্যুরের কি সত্যিই কোনও শেষ আছে?

টিভিতে কলকাতার নানা রাস্তাঘাট দেখানো হচ্ছিল। চোখে পড়ছিল ছোট-বড় ঘর-বাড়ি। কল্পনা সেগুলো দেখতে-দেখতে বলল, ‘সব জায়গায় একই অবস্থা জানলে বাড়ি ছেড়ে বেরোতাম না। শুধু-শুধু এত ঝামেলা।’

আদিত্যর মাথার ভেতরে টনটন করে উঠল। গলার কাছটায় পুরোনো অস্বস্তিটা ফিরে এল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছল। চোখ জ্বালা করছে। থুতু উঠছে মুখে বারবার।

সত্যিই তো, কোথায় পালাচ্ছে ওরা?

কল্পনা হঠাৎই উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। অকারণে বাড়তি হাত-মুখ নেড়ে বলল, ‘দেখি গিয়ে রান্নাবান্না কী হচ্ছে…।’ তারপর গুনগুন করতে-করতে ঘর ছেড়ে চলে গেল। ওর সহজ হওয়ার চেষ্টাটা এতক্ষণ পরে খেয়াল করল আদিত্য।

কল্পনা চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর উঠে গিয়ে অফ করে দিল টিভির সুইচ। খবর শুনে বা পরিস্থিতি জেনে কোনও লাভ নেই। অতীত এ-অবস্থায় কোনওরকম সাহায্য করবে না।

যদি কাল সকালে জিপসিটা খুঁজে না পাওয়া যায়? তখন বড় রাস্তায় গিয়ে ওত পেতে থাকতে হবে একটা গাড়ির জন্য। তারপর কৌশলে সেই গাড়ি আটকাতে হবে। হানাদার খুনি হয়ে খতম করে দিতে হবে গাড়ির লোকগুলোকে। এবং নিজেদের লোকজনকে গাড়িতে তুলে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে যেতে হবে। বাঁচাতে হবে কয়েকটা
জীবন।

যদি বেঁচে থাকে, তা হলে এই ভয়ংকর অপরাধবোধ নিয়েই বাঁচতে হবেঃ
কয়েকটা জীবনের বিনিময়ে নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছে আদিত্য। আর যদি জিপসিটা খুঁজে পাওয়া যায়, তা হলে গাড়ি চালিয়ে নিরাপদ গন্তব্যে ছুটে যাওয়ার আগে নানকুদের খোঁজ করতে হবে না? সম্পর্কের সুতোগুলো কি কয়েকদিনের মধ্যেই এত সরু আর পলকা হয়ে গেছে?

আদিত্যর মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা। গলা আর বুকেও কষ্ট। ও পায়ে-পায়ে চলে এল ঘরের বাইরে। বারান্দার রেলিঙে সামান্য ঝুঁকলেই মাথার ওপরে আকাশ দেখা যায়। ধোঁয়াটে নক্ষত্রহীন আকাশ। আদিত্যর দম বন্ধ হয়ে আসছিল যেন। ও জলে ডোবা মানুষের মতো খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছিল। ছাদে যাওয়ার সিঁড়িটা কোন দিকে? আদিত্য পা চালিয়ে এগোল সেদিকে।

ছাদ মাপে খুব ছোট। এটাও যেন সেই সুরেন্দ্র-নিলয়ের অভিন্ন প্রজাতি। অন্ধকারে তার কোনাকানাচ দেখা না গেলেও আদিত্য এই এক টুকরো ছাদটার সঙ্গে এক অদ্ভুত আত্মীয়তা অনুভব করল। এর যেন এক নিজস্ব স্পর্শ আছে, ঘ্রাণ আছে।

এই সময়ে আকাশে কত তারা থাকে, কত! মাঝে-মাঝে জল নামে আকাশ থেকে। ভরা যৌবনে ছেয়ে যায় ভূমির গাছপালা। ফুলের গন্ধ আসতে থাকে ঢেউয়ের মতো। ফুলের গন্ধ কেমন হয় আদিত্য কি ভুলে গেছে? ও চোখ বুঝে বহু লক্ষ বছর আগেকার ফুলের ঘ্রাণের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চাইল। হিলহিলে সাপের মতো পিচ্ছিল হয়ে সেই স্মৃতি লুকোচুরি খেলছিল ওর সঙ্গে। এই বুঝি ধরা দেয়, আবার অধরা থেকে যায়।

চোখ বুজে থাকায় দেখতে পায়নি আদিত্য, কিন্তু ঘ্রাণে টের পেল। ফুল? কী ফুল? টের পাওয়া সত্ত্বেও ও আরও কিছুক্ষণ চোখ বুজে থেকে আন্দাজ করতে চাইল। পারল না। তাই চোখ খুলল।

সুনয়না। খুব কাছে দাঁড়িয়ে। ওর মুখমণ্ডল লিপস্টিকের বিজ্ঞাপনের মতো ক্লোজ-আপ ছবি। কিন্তু মুখটা কেমন ঝাপসা লাগছে।

আদিত্য চোখ খুলতেই নয়না নীচু গলায় বলল, ‘এখানে কী করছেন, দিতুদা?’

আদিত্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললঃ ‘মনে হচ্ছে বাড়িতেই আমরা বেশ ছিলাম—।’

‘এখানে আমার একটুও ভালো লাগছে না। বাড়ির কথা মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, জাপান থেকে ফিরে এসে বাবা একটানা কলিং বেল বাজিয়ে যাচ্ছে—।’

‘আমারও ভালো লাগছে না।’ আদিত্য সুনয়নার চোখ দেখলঃ ‘নয়না, বলতে পারো, এভাবে তাড়া খাওয়া জানোয়ারের মতো পালিয়ে-পালিয়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় যাব আমরা? আমাদের কোনও ঘর নেই, বাড়ি নেই, ঠিকানা নেই। মা, মাসিমা ওদের কষ্ট তুমি তো দেখতে পাচ্ছ—বলো, সহ্য করা যায়? তার ওপর দাদা, বউদি, নানকু, দশরথ, কওশিকজি—কোথায় হারিয়ে গেল ওরা! ম্যাটাডর ভ্যানে আগুন লেগে তিন-তিনটে লোক শেষ হয়ে গেছে। শুভেন! শুভেনটাও! যে-ছেলেটা চাকরিবাকরির তোয়াক্কা না করে ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়াত, কবিতা লিখত, ওকে আমি কয়েক মিনিটের জন্যে কসাই হয়ে যেতে দেখেছি। ভয় হয়, নয়না, বাঁচার চেষ্টা করতে করতে আমিও কি ধীরে-ধীরে ওরকম বদলে যাব? আমার হাতে একটা রেঞ্চ অথবা ছুরি থাকবে, আমি অমানুষ হয়ে যাব—।’

‘দিতুদা!’

মেয়েটার মুখ থেকে তীব্র বেদনার ভাষা হয়ে ছিটকে বেরোল শব্দটা। সুনয়না একটা হাত আদিত্যর কাঁধে রাখল, অন্যটা আলতো করে ওর ঠোঁটের ওপর। বলল ফিসফিসে গলায়, ‘এরকম বলতে নেই, দিতুদা—তুমি কখনও পালটাবে না, কখনও না।’

আদিত্য সবকিছু ভুলে গেল। দুনিয়াজোড়া দূষণের কথা মুছে গেল ওর মন থেকে। ও সত্যিকারের ডুবে যাওয়া মানুষের মতো আঁকড়ে ধরল সুনয়নাকে। ওর পবিত্র বিশ্বাসকে। তারপর পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল ওর ঠোঁটে, নাকে, ভুরুতে, কপালে, চিবুকে, গলায়। ঠোঁটে, নাকে, ভুরুতে, কপালে, চিবুকে…।

সুনয়না মন-প্রাণ দিয়ে চুমুগুলো গ্রহণ করছিল। ভাবছিল, এভাবেই অনন্তকাল কেটে যাক। তারপর যখন সকাল হবে, তখন যেন স্পষ্টভাবে সূর্য দেখা যায়, দেখা যায় গাছপালা। তা না হলে এই ভয়ংকর দূষণ মানুষগুলোকে ধীরে-ধীরে পালটে দেবে। নিরীহ মানুষগুলো স্বার্থপরের মতো প্রাণ বাঁচাতে কাপুরুষ হানাদার হয়ে উঠবে।

আদিত্য যখন থামল তখন ওর গাল বেয়ে জল পড়ছে। সুনয়নার নিটোল মুখ ও দু-হাতে আঁজলা করে ধরল। এক অঞ্জলি ফুল। ওর মনে পড়ল শুভেনের লেখা কবিতার লাইনঃ ‘তুমি চলে গেলে দিনগুলো সব রাত হয়ে যায়।’ এখন অনুভব করতে পারছে, ভালোবাসা কীরকম তীব্র হলে তবে এরকম লাইন লেখা যায়। সুনয়না কাছে থাকলে তবেই দিন আসবে, দিনগুলো দিনই থাকবে—রাত হয়ে যাবে না।

ও নয়নাকে কাছে টেনে রেখেই ভাঙাচোরা গলায় বলল, ‘নয়না, সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি। দাদাদের আগে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর আমরা সবাই মিলে বাড়ি ফিরে যাব।’

আদিত্য মনে-মনে ভাবল, নিজেদের জমিতে দাঁড়িয়ে আমরা বাঁচার জন্য লড়ব। লড়াইয়ের জায়গা থেকে পালিয়ে গিয়ে কখনও লড়াই করা যায় না। কক্ষনো না।

এরপর অনেকক্ষণ ধরে ওরা দুজনে ছাদের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। এলোমেলো বাজে কথা বলল অনেক। তারপর একসময়ে হাত ধরে নীচে নেমে এল।

মা-দের ঘরে গিয়ে দেখল মা বিছানায় বসে আছে। একপাশে একটা থালায় রুটি আর ডাল সেদ্ধ। আর কোলের কাছে বাবার ফটোটা। কাঁদছে নিঃশব্দে। আর সুনয়নার মা বিষণ্ণ হতাশ মুখে চুপচাপ পাশে বসে।

আদিত্য নয়নার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের চোখ মুছল।

ওকে দেখেই মা বলল, ‘দিতু, এখানে আমার মন টিকছে না…’ কান্না চাপতে মুখে আঁচল গুঁজে দিল মা।

আদিত্য দেখল, দেওয়ালে চার-পাঁচ বছরের একটা হাসিখুশি ছেলের ফটো। ছেলেটার মুখটা বারবারই নানকুর মতো হয়ে যাচ্ছিল।

আদিত্য এগিয়ে গিয়ে মায়ের পিঠে হাত রাখল, বলল, ‘আর কোনও চিন্তা নেই, মা। কাল সকালেই আমরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছি—সে যেভাবেই হোক। বিশু তোমাদের আগে নিয়ে যাবে, আর আমি দাদাদের খুঁজে বের করে ওদের সঙ্গে নিয়ে ফিরব। তুমি একটুও ভেব না।’

এরকম পরিস্থিতিতে কথাগুলো অন্তসারশূন্য মনে হওয়ার কথা। কিন্তু আদিত্যর গলার স্বর আর ওর চোয়ালের রেখা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছিল এর মধ্যে কোনও মিথ্যে আশ্বাস নেই, বরং পরিপূর্ণ প্রতিজ্ঞা রয়েছে।

মায়ের মুখ যেন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠল দিতুর কথায়। সুনয়নার মা মলিন হাসলেন একটু।

আদিত্য তখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল, কলকাতায় কাকের ডাকে ওর ঘুম ভাঙছে। রামুদা ভোরবেলায় খবরের কাগজ বিলি করতে এসে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে, ‘কলিকাল শেষ হল, কলকাতায় কাক এল। কলিকাল শেষ হল, কলকাতায়…।’ আর শুকিয়ে নীরস ও প্রাচীন হয়ে যাওয়া গাছপালাগুলোর শাখাপ্রশাখার সন্ধিস্থলে এই এত্তটুকু জোড়া-জোড়া সবুজ পাতা বেরিয়েছে। আবার আসছে সবুজের দিন। গাছপালার দিন, পাখপাখালির দিন, পোকামাকড়ের দিন। নানকুকে আর অন্য কোনও দেশে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। নিজের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়েই ওকে লড়াই শেখাতে হবে। শেখাতেই হবে!

ক্রমেই আদিত্যর চোয়াল আরও শক্ত হচ্ছিল। নয়না এসে ওর জামা ধরে এক টান মারল। বলল, ‘দিতুদা, এখন আর ভয় পেলে চলবে না। গব্বর সিং কী বলে গেছে মনে আছে তো?’

আদিত্য চোখে হাসল, বলল, ‘মনে আছে—।’

ও তরতর করে বয়ে যাওয়া গঙ্গার ছবি দেখতে পেল। নৌকো ভাসছে এখানে-ওখানে। হু-হু করে বাতাস দিচ্ছে। ধোঁয়াশার ছিটেফোঁটাও আর নেই। অনেকগুলো কালো-কালো ছেলেমেয়ে হাত-পা ছুড়ে দাপিয়ে স্নান করছে বহতা নদীর জলে।

এমনসময় বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির ফোঁটার টুপটাপ শব্দ ঘরে দাঁড়িয়েই টের পাওয়া যাচ্ছে।

আদিত্য সুনয়নার দিকে তাকাল। বলল, ‘চলো, ছাদে যাই—বৃষ্টিতে ভিজি—।’

সুনয়না চঞ্চল পা ফেলে এগিয়ে গেল আদিত্যর দিকে। প্রায় ছুটেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ওরা দুজনে।

কালো বৃষ্টি হলেও বৃষ্টিতে ভিজতে ওরা এখন আর ভয় পায় না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *