গ্লানির্ভবতি ভারত – ৪৫

৪৫

“মায়াপুরের আগের নাম ছিল মিয়াঁপুর। নবদ্বীপের একেবারে কাছেই, গঙ্গা ও জলঙ্গী নদী যেখানে মিশেছে। এখানকার সনাতনধর্মীদের দৃঢ় বিশ্বাস, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর ভাই বলরাম এখানে পুনরাবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দ হয়ে। কলিযুগ দিনে দিনে যেভাবে পঙ্কিল হয়ে উঠছিল, সেইসময়ে শ্রীচৈতন্য এসে মানুষের মধ্যে ভক্তিরসের জোয়ার আনেন। হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে তিনি মানুষকে বোঝান, এই জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ি সব ভুল। মানুষ হয়ে মানুষকে নিঃশর্ত ভালোবাসাই হল ঈশ্বর প্রেম।”

লোকেশবাবু একটানা বলে দম নেওয়ার জন্য থামতেই প্রিয়াঙ্কা প্রশ্ন করল, “তারপর?”

“শ্রীচৈতন্য বলেছিলেন, মুচি যদি ভক্তিসহ ডাকে কৃষ্ণধনে, কোটি নমস্কার করি তাহার চরণে। তিনি মুসলমান হয়েও যবন হরিদাসকে কোল দিয়েছিলেন, সত্যবাঈ, লক্ষীবাঈয়ের মতো পতিতাকে সৎপথে এনেছিলেন, শূদ্র রামানন্দ তাঁর আদেশে করেছিলেন শাস্ত্রের ব্যাখ্যা। তিনি কোনো উঁচু-নীচু ভেদাভেদ করেননি। কৃষ্ণনামকে তিনি জন আন্দোলনের রূপ দিয়েছিলেন। ঝিমিয়ে পড়া, কুসংস্কারের জাঁতাকলে ডুবে থাকা হিন্দুরা এতে প্রাণ পেয়েছিল। সকলে আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এমনকি, মুসলমানরাও বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিতে শুরু করেছিল। তখন বাংলার শাসক হুসেন শাহ। চৈতন্যের এই প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা না মুসলমান সমাজ, না গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণরা, কেউই পছন্দ করেননি। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত’ তে রয়েছে, একদল মুসলমান সংঘবদ্ধভাবে তাদের কাজির কাছে গিয়ে নালিশ জানাচ্ছে।”

মৃদঙ্গ করতাল সংকীর্তন মহাধ্বনি।

হরি হর বিনা অন্য নাহি শুনি।।

শুনিয়া সে ক্রুদ্ধ হইল সকল যবন।

কাজী পাশে আসি সব কৈল নিবেদন।।

“নবদ্বীপের তখন আইনি ব্যাপারে নগরকর্তা চাঁদ কাজী। যিনি আবার সুলতান হুসেইন শাহর আধ্যাত্মিক গুরুও। তিনি নালিশ পেয়ে রেগেমেগে সেনা পাঠিয়ে সংকীর্তনের মৃদঙ্গ, খোল-করতাল সব ভেঙে দিলেন। সঙ্গে বললেন, কেউ যদি আর হরিনাম জপ করে, তিনি তার সর্বস্ব কেড়ে নেবেন। এমনকি ধর্মও।

আর যদি কীর্তন করিতে লাগ পাইনু।

সর্বস্ব দন্ডিয়া তার যাতি সে লইমু।।

‘চৈতন্য মহাপ্রভু কিন্তু এই অন্যায় হুকুমনামা আর পাঁচজন ভীতু অমেরুদণ্ডী ব্রাহ্মণের মত মেনে নেননি। তিনি নবদ্বীপের আশপাশের প্রচুর গ্রাম, যেমন, পারডাঙ্গা, গাদিগাছা এমন গ্রামের হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং গোটা নগর জুড়ে হরিনাম সংকীর্তনের নির্দেশ দেন। তিনি একজন বলিষ্ঠ নেতাও ছিলেন। মিছিলের একেবারে সামনে থেকে তিনি গোটা নবদ্বীপবাসীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।”

চাঁদ কাজি তখন ভয় পেয়ে যান।

কীর্তনের ধ্বনিতে কাজী লুকাইল ঘরে।

তর্জন গর্জন শুনি না আসে বাহিরে।।

মহাপ্রভুর সঙ্গে চাঁদকাজীর তুমুল যুক্তিতর্ক বাদানুবাদ হয়। বিচারে কাজী হার মানেন। কিন্তু মহাপ্রভু তারপরই নবদ্বীপধাম ছেড়ে চলে যান উড়িষ্যায়। সেখানে তখন হিন্দু রাজত্ব। রাজা গজপতি প্রতাপরুদ্র নিজে মহাপ্রভুর ভক্ত। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মহাপ্রভু আর কখনো নবদ্বীপে ফেরেননি। ইহলীলা সাঙ্গ করেন নীলাচলধাম পুরীতেই।”

লোকেশ ব্যানার্জি হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার করে দুবার ‘হরে কৃষ্ণ’ জপলেন।

“বাবা! আপনার তো দেখছি সব কণ্ঠস্থ!” প্রিয়াঙ্কা বলল।

লোকেশ ব্যানার্জি আড়চোখে একবার এ এস পি ম্যাডামের দিকে তাকালেন।

রুদ্রর মুখ ভাবলেশহীন। এখনো অবধি লোকেশবাবুর সঙ্গে সে একটা বাক্যালাপও করেনি।

লোকেশবাবুকে মৌখিকভাবে সাসপেন্ড করার হুমকি শোনালেও লিখিত অর্ডার এখনো ইস্যু করা হয়নি। আর সেই জোরেই বোধ হয় অ্যাডিশনাল এস পি ম্যাডামের মায়াপুর আসার খবর পেয়ে লোকেশ ব্যানার্জি রাতেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন মায়াপুর থেকে। কিছুদূর এসে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাস্তার ওপরে।

রুদ্র দেখে চমকে গেলে তিনি কাঁচুমাচু মুখে বলেছেন, “এক্সট্রিমলি স্যরি ম্যাডাম!”

রুদ্রদের গাড়ি এখন ছুটছে উত্তরদিকে। গাড়ি চালাচ্ছে পাঁচু, পাঁচুর পাশেই বসে রয়েছে রুদ্র। পেছনে প্রিয়াঙ্কা আর জয়ন্ত। একেবারে পেছনে লোকেশবাবু আর রুদ্রর দেহরক্ষী তিমির। লোকেশবাবুর গাড়িতে করে পেছনে আসছেন বীরেনবাবু আর তিনজন কনস্টেবল। কমিশনার সুনীত বসু প্রয়োজনীয় পারমিশন ও অন্যান্য অফিশিয়াল অর্ডারে সম্মতি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি মাঝেমাঝেই রুদ্রর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখছেন। ধর্মীয় স্থান, এমনিতেই স্পর্শকাতর। খুব সতর্কভাবে এগোতে হবে।

শেওড়াফুলি, সুগন্ধা, সপ্তগ্রাম, কালনা পেরিয়ে এসে গাড়ি এখন ধাত্রীগ্রাম পেরোচ্ছে। এতক্ষণ গঙ্গার দেখা না মিললেও তিনি সমান্তরালে বয়ে চলেছিলেন কিছুদূর দিয়ে। এখন ধাত্রীগ্রামে এসে একেবারে পাশাপাশি চলছে রাস্তা ও নদী।

রুদ্র অনেকক্ষণ পর গলাখাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “শ্রীচৈতন্যের শুরু করা হরেকৃষ্ণ আন্দোলনই কি এখনো চলছে মায়াপুরে?”

“না।” লোকেশ ব্যানার্জি ম্যাডামের প্রশ্নে উৎসাহিত হয়ে পড়লেন। দ্রুত মাথা নেড়ে বললেন, “যদিও মায়াপুরেরও মেইন অ্যাজেন্ডা কৃষ্ণনাম কিন্তু এই মুভমেন্ট শুরু হয়েছিল আমেরিকা থেকে। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদ ষাটের দশে আমেরিকায় এই গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতের প্রচার শুরু করেন। তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে তিনি প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। নিউইয়র্কে ইসকন প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি চোদ্দবার গোটা বিশ্বভ্রমণ করেন। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, সব মহাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষজন ইসকনের সদস্য হন। ইসকনের পুরো অর্থ ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের অবতার আমাদের চৈতন্য মহাপ্রভু, তাই তাঁর জন্মস্থানে তৈরি করা হয় ইসকনের প্রধান দপ্তর। সত্তরের দশকে প্রতিষ্ঠিত হয় চন্দ্রোদয় মন্দির। বৈদিক প্ল্যানেটোরিয়াম। আরো অনেক কিছু। গেলে দেখতে পাবেন। বিশাল ক্যাম্পাস। গোশালা থেকে শুরু করে অতিথি নিবাস সবকিছু আছে। সারা পৃথিবী থেকে ভক্তরা আসেন তো। জয় গৌরনিতাই।”

প্রিয়াঙ্কা বলল, “ম্যাডাম, এস পি স্যারকে কি এখনো পেলেন না ফোনে?”

 ”না!” রুদ্র অন্যমনস্কভাবে বলল। কমিশনার সুনীত বসু এস পি স্যারের ওপর খুব রেগে গিয়েছেন। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে শো-কজ চলে আসত। ওদের এই পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কথায় কথায় শো-কজ, কথায় কথায় সাসপেনশন অর্ডার। কিন্তু রাধানাথ স্যারের আর কয়েকমাস মাত্র বাকি, তার ওপর ওঁর কেরিয়ার এতটাই দাগবিহীন, কমিশনার স্যার কিছু বলতে পারেননি।

লোকেশ ব্যানার্জি বললেন, “এস পি সাহেবকে এখন পাওয়া যায় নাকি! আজ জন্মাষ্টমী। চোদ্দোবছর ধরে সাহেবকে দেখছি। খাঁটি বৈষ্ণব, জন্মাষ্টমী এলেই ওঁর ফার্মহাউজে চলে যান।”

“এস পি স্যারের ফার্ম হাউজ?” বীরেন শিকদার উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “সেটা কোথায়?”

“হুগলীরই কোথাও একটা। আমি ঠিক জানি না। তবে শুনেছি স্যার খুব বনেদি বংশের ছেলে। একবার ইসকনেও দেখেছিলাম। সবাই খুব খাতির করছিল। এমনকি ইসকনের সন্ন্যাসীরাও।” কথাটা বলেই চেঁচিয়ে উঠলেন লোকেশ ব্যানার্জি, “এই পাঁচু, হাটশিমলা পেরিয়ে গেছে। সামনে সমুদ্রগড় মোড়। সেখান থেকে ডানদিকে নাও। সোজা কিছুদূর গিয়ে গৌরাঙ্গ সেতু পেরোলেই আমরা মায়াপুরে ঢুকে যাব। বড়জোর আর পঁয়তাল্লিশ মিনিট। গৌরাঙ্গ সেতুর মুখেই নদীয়া পুলিশের ফোর্স দাঁড়িয়ে থাকবে। হরে কৃষ্ণ।”

রুদ্র হঠাৎ বলল, “জয়ন্ত, তোমার যে বন্ধু ডায়রেক্টোরেটে পোস্টেড রয়েছে, তাকে একবার ফোন করতে পারবে?”

“সুবিমল?” জয়ন্ত সচকিত হয়ে বলল, “পারব। কিন্তু আজ তো জন্মাষ্টমী, ওদের ছুটি।”

রুদ্রর মাথা কাজ করছিল না। এখুনি সার্ভিস বুক দেখা প্রয়োজন! কিন্তু আজ সরকারি ছুটি, কীভাবে দেখবে?

হঠাৎ করে ওর মনে পড়ে গেল, ইন্টারনেটে সমস্ত আই এ এস বা আই পি এস অফিসারদের ডেটাবেস রয়েছে। সেখানেই দেওয়া থাকে তাদের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল।

সাংঘাতিক … সাংঘাতিক বাজে দিকে ইঙ্গিত যাচ্ছে! এর চেয়ে ভয়ংকর, এর চেয়ে শকিং কিছু হতে পারে কি?

রাধানাথ রায় … রাধানাথ রায় … কোন ব্যাচের আই পি এস?

নাহ, তার প্রয়োজন নেই। নাম দিয়ে সার্চ করলেই সরকারি ওয়েবসাইট দেখিয়ে দিচ্ছে।

৪৬

রুদ্র স্তব্ধ হয়ে বসে রইল গাড়িতে। গাড়ি গৌরাঙ্গ সেতু দিয়ে গঙ্গা পেরোচ্ছে। নদীর ঠান্ডা হাওয়া এসে ঝাপটা দিচ্ছে ওর নাকেমুখে।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না ও!

সেদিন ভবানীপুরের বিলাসবহুল ‘চৌধুরীভিলা’ থেকে বেরোনো ইস্তক ওর মনে কিছু একটা খচখচ করছিল। কিছু একটা খটকা, যা মেলাতে পারছিল না ওর অবচেতন মন। এখন বুঝতে পারছে।

চৌধুরীভিলার ড্রয়িং রুমে থাকা পঞ্চাশ বছর পূর্তির ‘মৃন্ময়ী টেক্সটাইলস’ এর সেই দুর্গামূর্তিতে কোম্পানির লোগোটা দেখেই ওর চেনা চেনা লেগেছিল। কারণ মাসখানেক আগেই যে ওই একই লোগো ও দেখেছিল এস পি স্যারের ডায়েরির কভারে। যেদিন স্যারের বাংলোয় ও একা গিয়েছিল। রাধানাথ স্যার সুদৃশ্য ডায়েরির পাতা খুলে ওকে দেখিয়েছিলেন পরপর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ।

সেই ডায়রির একেবারে প্রচ্ছদে জ্বলজ্বল করছিল ‘মৃন্ময়ী টেক্সটাইলস’ এর লোগো।

 ওহ! এতদিনের তদন্তশেষে ও এই বাঁকে এসে উপনীত হল? শেখর চৌধুরীর একমাত্র ভাই কৃষ্ণভক্ত শঙ্কর চৌধুরী পালিয়ে গিয়েছিল বন্ধু কানু চক্রবর্তীর সঙ্গে। সেই ‘শঙ্কর’ পরে নতুন নাম নিয়েছে ‘রাধানাথ’? শেখর চৌধুরী ইচ্ছা করেই প্রকাশ্যে নিজের ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না?

বুঝতে পারছে কেন প্রথম থেকে ‘হুগলীর খুন’ বলে জেলাশাসক থেকে কমিশনার প্রত্যেককে বিভ্রান্ত করেছিলেন রাধানাথ স্যার। বুঝতে পারছে কেন এত সিনিয়র অফিসাররা থাকতে রুদ্রর মতো আনকোরা নভিশ একজন অফিসারকে দিয়েছিলেন স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম লিড করার দায়িত্ব। ভেবেছিলেন রুদ্রর মতো প্রোবেশনারের ক্ষমতা হবে না এই রহস্যজাল ভেদ করার।

বুঝতে পারছে, ক্ষমাকে অপহরণের দিন কেন রুদ্রর ‘অফ’ থাকা সত্ত্বেও আর্জেন্ট মিটিং এ তাকে নিজের অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন রাধানাথ রায়। যাতে বাংলো ফাঁকা থাকে।

এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ওর বুকের ভেতরটা কেমন হালকা লাগছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল, বদনপুরের চৌধুরীরা আসলে ‘রায়চৌধুরী’। খেতাব পেয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকারের থেকে। এস পি স্যার নিজে শুধু রায়’ টাই ব্যবহার করেন।

উঁচু তরফের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনা যে একেবারেই ওর মাথায় উদয় হয়নি তা নয়। প্রথম থেকে সাতখানা খুনে যেভাবে লোকাল থানা একটুও এগোতে পারেনি, তাতে মনে হতেই পারে কোন মহল থেকে চাপ এসেছে। কিন্তু তা যে পুলিশের উচ্চপদস্থ অফিসার এবং আর কেউ নয়, স্বয়ং রুদ্রর বস রাধানাথ রায়, তা ও দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।

মনে পড়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। সেদিন শেখর চৌধুরীর বাড়ি থেকে বেরোনোর পর রাধানাথ স্যার ক্রুদ্ধভাবে ফোন করেছিলেন ওকে। বলেছিলেন, কলকাতা পুলিশ থেকে অভিযোগ গিয়েছিল উঁচুমহলে জানাশোনা থাকা শেখর চৌধুরীকে রুদ্র বিনা অনুমতিতে হ্যারাস করেছে।

আসলে কেউ ফোন করেনি স্যারকে। স্যার নিজেই রুদ্রকে ফোন করে ভড়কে দিয়েছিলেন। যাতে নতুন অফিসার হিসেবে রুদ্র আর খোলামনে কাজ করতে না পারে। বাগডাঙা সরলাশ্রম থেকে অন্যান্য মার্ডার কেস, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বারবার।

জেলাশাসক এবং কমিশনার মিলে যখন ঠিক করছিলেন এই ম্যারাথন খুনের জন্য টিম গঠন করতে হবে, ইচ্ছে করে নিজের আণ্ডারে থাকা অনভিজ্ঞ অফিসার রুদ্রকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি। যাতে রুদ্রর তদন্তের প্রোগ্রেস জানা থেকে শুরু করে প্রয়োজনে রাশ টানা, সব কিছুই তাঁর কন্ট্রোলে থাকে।

কিন্তু কেন? কেন করলেন স্যার এরকম? স্যারই কি মূল পান্ডা? না আরো কেউ রয়েছে এর পেছনে? কী উদ্দেশ্য তাদের?

রুদ্র আর কিছু ভাবতে পারছিল না।

মনে পড়ে যাচ্ছিল কানু চক্রবর্তীর সেই বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো।

“রাধা জানে!”

রাধা অর্থাৎ রাধানাথ। কানু চক্রবর্তী কি বাল্যবন্ধুর দিনের পর দিন এই অন্যায় দেখেও কিছু প্রতিবাদ করতে পারত না? তাই কি লক-আপের অন্তরালে তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জল?

সেই জল কি অনুশোচনার? কেন পারত না প্রতিবাদ করতে?

গৌরাঙ্গ সেতু পেরোতেই দেখা গেল ওপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে নদীয়া পুলিশের জিপ।

রুদ্র ছটফট করে উঠল। বলল, “লোকেশবাবু। আপনি সবচেয়ে সিনিয়র। আপনাকে আমি এই মিশনটার দায়িত্ব দিচ্ছি। আপনি নদীয়া পুলিশের সঙ্গে কোলাবরেশনে মায়াপুর মন্দির ভ্যাকেট করান। প্রিয়াঙ্কা আর বীরেনবাবু আপনাকে সহযোগিতা করবে। আমি জয়ন্তকে নিয়ে এখুনি চন্দননগরে ফিরব।”

লোকেশবাবু তো বটেই, গোটা গাড়ির সকলেই হকচকিত। এমন একটা ক্রুশিয়াল অপারেশন, আর ম্যাডাম নিজে পিছু হটছেন!

এটা কী করে হয়?

“আমি পরে আপনাদের সব ক্ল্যারিফাই করবো।” রুদ্র গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, “শুধু একটা কথা মাথায় রাখবেন। মায়াপুর মন্দিরে যদি কোন হামলার প্ল্যান করা থাকে, সেটা হবে প্রাচীন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, বম্বিং বা ফায়ার আর্মস নয়। আপনারা ক্যাম্পাসের ভেতরে সমস্ত অতিথি এবং আবাসিকদের সার্চ করুন। পুকুর বা রান্নার জায়গাগুলোও বাদ দেবেন না। আমি ফোনে যোগাযোগ রাখছি।”

কারুর কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা না করেই ও নেমে পড়ল। পেছনের গাড়ি থেকে বীরেনবাবুকে নিয়ে এল সামনের গাড়িতে। তারপর জয়ন্তকে নিয়ে পেছনের গাড়ি ঘুরিয়ে রওনা দিল উলটোপথে।

জয়ন্ত হতভম্ব মুখে বলল, “কী হচ্ছে ম্যাডাম? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমরা ফেরত যাচ্ছি কেন?”

“ফেরত যাচ্ছি না জয়ন্ত। আমরা যাচ্ছি সেই আমীশ সমাজের গ্রামটাকে খুঁজে বের করতে। সেটা অনেক বেশি ইম্পরট্যান্ট।”

এ এক ভয়ংকর লড়াই। যে লড়াই অসম হলেও শুভশক্তিকে জয়ী করতেই হবে।

কমিশনার সাহেবের নম্বরে ডায়াল করল রুদ্র।

৪৭

প্রিয়াঙ্কা সতর্ক চোখে নজর রাখছিল। সুবিশাল এই মায়াপুরের মন্দির ক্যাম্পাস। চারপাশে একাধিক প্রাসাদোপম অট্টালিকা, অধিকাংশই অতিথি নিবাস। সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয়েছে এখন মায়াপুরে, শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষ্যে। উচ্চকিত স্বরে ভেসে আসছে কীর্তন।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।।

মাঝে মাঝেই পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে সংকীর্তনরত ভক্তদের ছোট ছোট দল। অধিকাংশই বিদেশি। সনাতন ধর্মের প্রাণেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিজেদের দেহমন সমর্পণ করেছে তারা।

প্রিয়াঙ্কা ওয়াকিটকিটা মুখের কাছে আনল। রুদ্রাণী ম্যাডামের নির্দেশ মতো প্রিয়াঙ্কাদের গোটা টিমটা ছড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পাসে। নদীয়া পুলিশ থেকে দেওয়া হয়েছে পঞ্চাশ জনের টাস্ক ফোর্স, সঙ্গে রয়েছেন অফিসার র‍্যাংকের দশজন অফিসার। প্রিয়াঙ্কা, বীরেন শিকদার ও লোকেশ ব্যানার্জি তাঁদের সঙ্গেই কাজ করছেন। টাস্ক ফোর্সের প্রত্যেকে সাধারণ পোশাকে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা চত্বরে।

“হ্যালো লোকেশবাবু, হ্যালো … গোশালা’র দিকটা লোক পাঠিয়েছেন? হ্যালো … হ্যালো?”

লোকেশবাবু পেছন থেকে এগিয়ে এলেন, “আরে আমি তো এদিকেই আসছিলাম।”

প্রিয়াঙ্কা পেছন ফিরে বলল, “বীরেনবাবু কোথায়?”

“উনি গেস্টহাউজগুলো দেখছেন।” লোকেশবাবু বললেন, “এত বড় জায়গা, হাতের তালুর মতো চিনি আমি। অসংখ্যবার এসেছি। কিন্তু কীভাবে যে কে খুন হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“আপনার মিসেস কোথায়?”

লোকেশবাবু বললেন, “তিনি তো মন্দিরে রয়েছেন। সকাল থেকে বেচারিকে একা একা কাটাতে হচ্ছে। কী করে জানব যে প্রভুর ধামে এত বড় কাণ্ড হতে পারে! আচ্ছা, ম্যাডাম শিওর?”

প্রিয়াঙ্কা বলল, “যে সংকীর্তনের আওয়াজ আসছে, সেটা কতক্ষণ চলবে?”

“আজ তো জন্মাষ্টমী। সকাল থেকে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলবে এই হরিনাম কীর্তন। তারপর রাত বারোটায় মহা আরতি মিটলে মহাপ্রসাদ বিতরণ হবে।” লোকেশবাবু কথাগুলো বলে মাথায় জোড়হাত ঠেকালেন।

প্রিয়াঙ্কা হাতে ধরা ম্যাপটার দিকে চোখ রাখল। রাধামাধব মন্দির, শ্রীল প্রভুপাদের পুষ্পসমাধি মন্দির, ভজন কুটির পেরিয়ে গোশালা। অন্যদিকে গীতা ভবন, গদা ভবন।

এই প্রতিটা জায়গাতেই ছড়িয়ে রয়েছে পুলিশের লোক। সতর্ক দৃষ্টিতে দেখভাল করছে সবকিছু।

ম্যাডাম যাওয়ার সময় যেন কী বলে গেলেন? প্রিয়াঙ্কা মনে করতে থাকে। প্রাচীন কোনো পদ্ধতিতে হামলার চেষ্টা হবে। অর্থাৎ গোলাগুলি বা কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নয়। প্রাচীন পদ্ধতি বলতে কী কী হতে পারে?

আগের সাতটা মার্ডার যদি লক্ষ্য করা যায়, তবে ছুরি চালানো, গলা টিপে শ্বাসরোধ করা, পুকুরে চুবিয়ে মারা কিংবা উঁচু বহুতল থেকে ফেলে দেওয়া। ম্যাডামের বাংলোয় যে খুন হয়েছিল, সেটা তির ছুঁড়ে।

অতিথি নিবাসে থাকা প্রতিটা মানুষকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ যদি আগে থেকেই কোথাও লুকিয়ে থাকে?

প্রিয়াঙ্কা অন্যমনস্কভাবে নিজের সালোয়ার কামিজের ওড়নায় কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছল। ঘড়িতে রাত সাড়ে আটটা।

এ এস পি ম্যাডামের ফোনে ডায়াল করতে যাবে, হঠাৎ লোকেশবাবুর ইশারায় মুখ তুলে তাকাল।

একেবারে কাছ দিয়ে চলে যাচ্ছে চোদ্দো-পনেরোজনের একটি দল। তাদের প্রত্যেকের মস্তক মুণ্ডিত, মাথার পেছনদিকে দুলছে ব্রহ্মশিখা। পরনে আশ্রমের অন্যান্য সেবাইতদের মতোই সাদা ধুতি-ফতুয়া।

কিন্তু প্রিয়াঙ্কা সে’সব দেখছে না। দলটির একেবারে পেছনে যে কিশোরটা হাঁটছে, সে হাত দিয়ে কী যেন ইশারা করছে এদিকে।

প্রিয়াঙ্কা কিছু বুঝতে পারল না। কিশোরটির মুখচোখে ক্লান্তির ছাপ। আয়ত চোখদুটোয় একাকার হয়ে রয়েছে ভয়, আশঙ্কা ও উদ্বেগ। ভয়ে ভয়ে সে একবার তাকাল পাশে হেঁটে চলা দলের এক যুবকের দিকে।

প্রিয়াঙ্কা চোখ সরু করল।

কিশোরটি কি লুকিয়ে তাকে কিছু বলতে চাইছে?

নাম সংকীর্তনের শব্দ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

“আপনার মিসেস কোথায় লোকেশবাবু?”

লোকেশবাবু বললেন, “ও এই কাছেপিঠেই কোথাও রয়েছে। আমি তো কাজে ঢুকে গেলাম, বেচারি একলা হয়ে পড়ল। মন্দিরে বসে আছে বোধ হয়।”

“তাঁকে একটু ফোন করে এখানে আসতে বলুন না। আমি এখুনি আসছি।”

লোকেশবাবুর উদ্দেশ্যে কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে প্রিয়াঙ্কা খুব মৃদু লয়ে এগিয়ে গেল।

ছেলেটা কে?

৪৮

সুনীত বসু বললেন, “আমি তোমার কথা শুনে ডি এম ম্যাডামের সঙ্গে কথা বললাম। একজন স্টাফকে ডাইরেক্টোরেটে পাঠিয়ে এমারজেন্সি বেসিসে অফিস খুলিয়ে মি. রায়ের সার্ভিসবুকও নিয়ে এলাম। রাধানাথ রায় পড়াশুনো করেছেন মায়াপুরের আবাসিক স্কুলে। সেখান থেকেই আই এস সি পাশ করেন, তারপর দিল্লি চলে যান। সেখান থেকে গ্র্যাজুয়েশন, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ।”

রুদ্র আর জয়ন্ত বিমূঢ় হয়ে বসেছিল।

রুদ্র বলল, “আমি প্রচণ্ড শকড স্যার! আমাদের এখন কী করা উচিত?”

“স্বাভাবিক। রাধানাথ রায়ের এই কেসে কী ভূমিকা তা এখনো স্পষ্ট না হলেও তিনি যে স্ট্রংলি কানেক্টেড, তা পরিষ্কার।” সুনীত বসু বললেন, “আমাদের খুব কেয়ারফুলি এগোতে হবে। রাধানাথ রায়ের অ্যাসেট লায়াবিলিটি রিপোর্টও হাতে এসেছে। মি. রায়ের নামে কোনো বড় অ্যাসেট নেই।”

“স্যার আপনাকে যে বললাম, শেখর চৌধুরীর নামে হুগলী, হাওড়া, কলকাতা এইসব জেলায় কী অ্যাসেট আছে, সেগুলোর রেকর্ড বের করতে, সেটা কি করেছেন?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।

কমিশনার সুনীত বসু মাথা নাড়লেন, “তাও করা হয়েছে। শেখর চৌধুরীর মৃন্ময়ী টেক্সটাইলসের নামে হাওড়া, কলকাতা ছাড়াও হুগলীতে একটা বিশাল প্লট রয়েছে। খোশলাপুর বলে একটা জায়গায়। প্রায় এক হাজার একর।”

“হাজার একর!” বিস্ময়ে রুদ্র চমকে উঠল, “তা কী করে হয় স্যার? ল্যান্ড রিফর্ম অ্যাক্ট অনুযায়ী, চব্বিশ একরের বেশি তো একজন কোনো জমি হোল্ড করতে পারে না।”

“সে তো ব্যক্তিগত কারণে। এখানে তো জমিটা রয়েছে মৃন্ময়ী টেক্সটাইলসের নামে। কারখানার কারণে সরকার প্রয়োজন বুঝে বেশি জমি দিতেই পারে। কিন্তু সেই জমি প্রপারলি ইউটিলাইজ করা হচ্ছে কিনা, সেটাও রেগুলার মনিটর করা হয়। এক্ষেত্রে সে’সব কিছুই হয়নি। প্রায় কুড়িবছর ধরে সেই জমিতে কারখানার কিছুই হয়নি। ইন্ডাস্ট্রির বদলে সেখানে নাকি গড়ে উঠেছে ফার্মহাউজ। যেটা পুরোপুরি ইললিগ্যাল। এক্ষেত্রেও নিজের ইনফ্লুয়েন্স ইউজ করেছেন রাধানাথ রায়।” কমিশনার বললেন, “আপাতত এই চার্জ এনে তাঁর এগেন্সটে এনকোয়ারি শুরু করাই যায়। কিন্তু তাতে ফোকাস সরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এবং তাতে মি. রায় অ্যালার্টও হয়ে যেতে পারেন। আমাদের খুব কশাসলি এগোতে হবে।”

সুবিশাল পুলিশ কমিশনারের অফিস ঘর। সুনিত বসু বসে আছেন একটি প্রকাণ্ড কাঁচের টেবিলের বিপরীতে। উলটোদিকে ঘরের কোণায় তিনখানা কম্পিউটার সেট। সেগুলো মূলত কোনো চিঠি ড্রাফট বা অফিশিয়াল কাজে কমিশনারের সহকারীরা ব্যবহার করেন।

রুদ্র বলল, “আমি কি কম্পিউটারটা একবার ব্যবহার করতে পারি, স্যার?”

“ইয়েস! শিওর।”

রুদ্র গিয়ে কম্পিউটারে বসল। মিনিটদুয়েকের মধ্যেই ও উজ্জ্বল চোখে বলে উঠল, “যা ভেবেছি তাই। দেখুন স্যার! বাগডাঙার সামনে দিয়ে যে খালটা চলে গিয়েছে, সেটাই বইছে খোশলাপুরের পাশ দিয়ে। সেটা পুরোনো সরস্বতী নদীর একটা শাখা। অনেকদূর এঁকেবেঁকে গিয়ে মিশেছে গঙ্গায়। অর্থাৎ হুগলী নদীতে। আবার বদনপুর গ্রামের জিওগ্রাফিক লোকেশনটা লক্ষ্য করুন। খোশলাপুরের পাশের নদী একটা বাঁক সৃষ্টি করেছে, সেই বাঁকের ওপারেই বদনপুর। আমীশ কমিউনিটি থেকে মাঝেমাঝেই লোক নদী পার হয়ে তাই বদনপুরে এসে উঠত। বদনপুর, খোশলাপুর, বাগডাঙা এগুলো সব জলপথে ওয়েল কানেক্টেড। এবং ওই খোশলাপুর থেকে সরস্বতী নদী নেয়ে গঙ্গায় এসে সেখান দিয়ে যাওয়া সম্ভব মায়াপুরেও!”

সুনীত বসু এগিয়ে এসে মন দিয়ে দেখছিলেন। বললেন, “এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে এই টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরির ভারতবর্ষে একটা গোটা কমিউনিটির সমস্ত লোক এইভাবে লুকিয়ে বসবাস করছে? মানে তাদের ভারতীয় আদমশুমারিতে কোনো হিসেব নেই, তাদের কোনো সরকারি পরিচয়পত্র নেই, তাদের সরকারি খাতায় কোনো অস্তিত্ব নেই? হাউ স্ট্রেঞ্জ!”

রুদ্র বলল, “স্ট্রেঞ্জ হলেও এটা সত্যি, স্যার। আমেরিকার মতো উন্নত দেশকেই দেখুন। আমেরিকায় এরকম বেশ কয়েকটা আমীশ কমিউনিটি আছে, যাদের পপুলেশন লক্ষাধিক। হ্যাঁ, মার্কিন সরকার তাদের অস্তিত্ব জানে ঠিকই, কিন্তু সেভাবে কোনো সরকারি কন্ট্রোল ওইসব কমিউনিটির ওপর নেই। এমনকি পরিচয়পত্রও তারা করাতে চায় না। এই নিয়ে আপনি ইন্টারনেটে অনেক নিউজ পাবেন। এস পি স্যারের মামা গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, মানে যিনি ওই তর্কপঞ্চাননের বংশের দত্তক সন্তান ছিলেন, তিনি নিজেও ওই আমীশদের মধ্যে নাকি কাটিয়েছেন অনেককাল।”

“কিন্তু রাধানাথ রায় তাঁর মামার কথায় ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে বাংলায় এমন কমিউনিটি করেছেন কেন? শুধুমাত্র যারা পালিয়েছে, তাদের মারবেন বলে আর যারা মডার্ন টেকনোলজির সঙ্গে যুক্ত, তাদের ক্ষতি করবেন বলে?” কমিশনারকে বিভ্রান্ত দেখায়, “এটা কোন যুক্তি হল? তোমার ওই জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের দশানন বধ-এর পুনরাবৃত্তি যদি মেনেও নিই, করে লাভটা কী হবে?”

রুদ্র চুপ করে গেল। এই একটা প্রশ্নের সামনে এসে সে প্রিয়মের সামনেও থমকে গিয়েছিল, কমিশনার সাহেবের সামনেও।

ও বলল, “স্যার, বৈদিক সমাজের যতজনের সম্পর্কে জানতে পেরেছি, প্রত্যেকের নাম কৃষ্ণ দিয়ে শুরু বা কৃষ্ণের একশো আটটা নামের একটা। আমার বাড়িতে যে মেয়ে-মা থাকত, তারাও কৃষ্ণভক্ত ছিল। রাধানাথ স্যার সম্ভবত নিজেকে শ্রীকৃষ্ণ মনে করতেন।”

“তো?” কমিশনার বিরক্তমুখে তাকালেন, “নিজেকে কৃষ্ণ মনে করেন বলে খুনখারাপি করবেন কেন? তুমি জানো নব্বইয়ের দশকে উত্তরপ্রদেশে একজন সিনিয়র পুরুষ আই পি এস অফিসার ছিলেন, যিনি নিজেকে রাধা মনে করতেন। শুধু তাই নয়, পুরুষ হয়েও আইজি থাকাকালীন তিনি অফিসে রাধার পোশাকে, গয়না, সিঁদুর পরে আসতে শুরু করেছিলেন। সেইসময়ে এই নিয়ে সারাদেশে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। কী যেন নাম ছিল … হ্যাঁ মনে পড়েছে, ডি কে পাণ্ডা। তিনি নিজেকে ‘দুসরি রাধা’ বলে পরিচয় দিতেন। সে’সব নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। আমরা তখন ইয়ং। কিন্তু তার সঙ্গে ক্রাইমের সম্পর্ক কী?”

রুদ্র চুপ করে রইল।

কমিশনার চিন্তিতমুখে বললেন, “যাইহোক, তাই বলে চুপচাপ বসে থাকা যায় না। মোটিভ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আপাতত তুমি আর জয়ন্ত বেরিয়ে যাও। আমি তোমায় ফোর্স দিয়ে দিচ্ছি। আর সঙ্গে রাধানাথ রায়ের বডিগার্ড অর্জুনকে নাও।”

“কিন্তু এস পি স্যার তো বডিগার্ড সঙ্গে নিতেন না?”

“না নিলেও অর্জুন একবার নাকি ওঁর সঙ্গে খোশলাপুরের ফার্মহাউজে গিয়েছিল। বলেছে আমার এক স্টাফকে। ও থাকলে সুবিধা হবে। আমি ওকে ডেকে পাঠিয়েছি।” কমিশনার বললেন, “আর বুঝতেই পারছ, কতটা সাবধান হয়ে কাজ করতে হবে। ইটজ এক্সট্রিমলি ডেলিকেট সিচুয়েশন।”

“ইয়েস স্যার।” রুদ্র বলল, “কিন্তু রাধানাথ স্যার এখন কোথায়?”

সুনীত বসু একমুহূর্ত থামলেন। থমথমে মুখে বললেন, “উনি সম্ভবত নবদ্বীপেই আছেন। আমি ওঁর মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করেছি। শেষ লোকেশন ওখানেই দেখাচ্ছে। ওখানে কী হতে পারে, রুদ্রাণী?”

“আমি জানি না স্যার!” রুদ্র অস্ফুটে বলল, “তবে যেটা হবে, সেটা ভালো কিছু নয়। এটুকু বলতে পারি!”

৪৯

অর্জুন দশ মিনিটের মধ্যে ঘরে ঢুকে স্যালুট ঠুকল। সে এস পি স্যারের সামান্য দেহরক্ষী, খোদ কমিশনার কেন তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ছুটির দিন প্রায় ছুটতে ছুটতে শ্রীরামপর থেকে বাইক নিয়ে এসেছে। মুখচোখে উদ্বেগ স্পষ্ট।

 সুনীত বসু সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “আপনি রাধানাথ রায়ের সঙ্গে কখনো তাঁর ফার্ম হাউজে গিয়েছেন?”

অর্জুন এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে আরও বিস্মিত হল। অবাকচোখে সে তাকাল জয়ন্তর দিকে। জয়ন্ত আর সে ব্যাচমেট।

জয়ন্ত দুই বড়কর্তার সামনে এতক্ষণ চুপ করে ছিল। কিন্তু এবার চাপাস্বরে ধমকে উঠল, “স্যার যা জিজ্ঞেস করছেন, তার উত্তর দে না।”

অর্জুন বলল, “হ্যাঁ। একবার গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম বলাটা ভুল হবে। মানে ভুল করে পৌঁছে গিয়েছিলাম।”

“ভুল করে মানে?” কমিশনার জিজ্ঞেস করলেন।

অর্জুন আরও ঘাবড়ে গেল। ইতস্তত করে বলল, “আমি তখন সবে স্যারের আন্ডারে জয়েন করেছি। জানতাম না স্যার প্রতি মঙ্গলবার রাতে ওই ফার্মহাউজে চলে যান। আর সেইসময় কাউকে সঙ্গে নেন না। কী করব, আমায় আগের গার্ড বলে দেয়নি স্যারকে হঠাৎ বাংলো থেকে নিজে গাড়ি চালিয়ে বেরোতে দেখেই আমি বাইক নিয়ে পিছু নিয়েছিলাম।”

“তারপর?”

“তারপর স্যারের গাড়ির পিছন পিছন পৌঁছে গেলাম সেই ফার্ম হাউজে।”

“সেখানে কী দেখলেন?”

অর্জুন আবার ঘাবড়ে গেল। সম্ভবত সে বুঝে উঠতে পারছে না, তার বলা উচিত কিনা।

রুদ্র ওর অবস্থা বুঝতে পেরে নরম গলায় বলল, “বলুন। আপনার হেজিটেট করার কিছু নেই।”

অর্জুন বলল, “এস পি স্যারের ফার্ম হাউজ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সামনে লোহার গেট। তার ওপর লেখা সম্বল ফার্ম হাউজ।”

“সম্বল?” ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন সুনীত বসু, “সম্বল ফার্ম হাউজ? এটা আবার কেমন নাম হল? ঠিক দেখেছ?”

“হ্যাঁ স্যার। পরিষ্কার মনে আছে। লাল রঙের সাইনবোর্ড। আমি ঢুকতে যেতেই লোক আটকাল। আমি স্যারের দেহরক্ষী শুনে ঢুকতে দিল। ভেতরে ফুল, ফল, গাছপালা, সবজি তরিতরকারির চাষ। আমি সব ঘুরে ঘুরে দেখছি, হঠাৎ দেখি স্যার আসছেন দেবদত্তর পিঠে চড়ে।”

“দেবদত্তর পিঠে চড়ে মানে?” সুনীত বসু ভ্রূ কুঁচকলেন।

অর্জুন বলল, “এস পি স্যারের ফার্ম হাউজে তো একটা ঘোড়া আছে স্যার। স্যার ওখানে গেলে সেই ঘোড়ায় চেপে ঘুরে বেড়ান। আমার সামনে ঘোড়াটা দু’বার ছটফট করছিল বলে স্যার ‘দেবদত্ত, অমন করেনা’ বলে আদর করেছিলেন।”

“মাই গড! এগুলো আমরা কিছুই জানি না! বলে যাও।” কমিশনার অবাক চোখে বললেন।

“আমাকে দেখতে পেয়ে স্যার প্রথমে হতবাক হয়ে গেলেন। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে ঘুরিয়ে দেখালেন পুরোটা। ফার্ম হাউজের এলাকাটা বিশাল, কিন্তু তার বেশিরভাগটাই জঙ্গল। ঘন জঙ্গল।”

“সেই জঙ্গলে ঢুকেছিলেন আপনি?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।

“পাগল নাকি?” অর্জুন চোখ বড় বড় করে বলল, “খুব ঘন বন ম্যাডাম। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত বড় জঙ্গল সাফ করেননি কেন। স্যার উত্তর দিয়েছিলেন, বন্য প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁর ভালো লাগে।”

“তারপর?”

“স্যার একজনকে বলে ওই সন্ধেবেলাতেই গাছ থেকে ডাব পেড়ে এনে আমায় খাওয়ালেন। অত মিষ্টি ডাব আমি জীবনে খাইনি। তারপর আমাকে গেটের বাইরে নিয়ে এসে বললেন, আমি যেন শ্রীরামপুরে ফেরত চলে যাই। এই ফার্ম হাউজে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে থাকবেন বলেই তিনি বিয়ে করেননি। প্রতি মঙ্গলবার তিনি এখানে আসেন, আমি যেন আর কোনোদিনও এরকম পিছু নিয়ে বিরক্ত না করি। উনি ঠিকসময়ে ফিরবেন বৃহস্পতিবার ভোরে।”

“তারপর থেকে আপনি কোনোদিনও আর ওখানে যাননি, তাই তো?”

অর্জুন বলল, “আর কেউ যায় স্যার? এস পি স্যার ভীষণ রাগী, আবার আমাকে ওই তল্লাটে দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকত না!”

সুনীত বসু রুদ্রর দিকে তাকালেন। চোখে অনেক জিজ্ঞাসা।

রুদ্র বলল, “কীভাবে আপনি ওই ফার্ম হাউজে গিয়েছিলেন?”

“দিল্লি রোড থেকে বাঁদিকে টার্ন নিয়ে। দোগাছিয়া, বাহির রাণাগাছা, এইসব গ্রাম পেরিয়ে যেতে হয়।” অর্জুন বলল।

“ওকে।” সুনীত বসু বললেন, “আপনি বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন।”

অর্জুন স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে গেল। সে বেরিয়ে যেতেই রুদ্র বলল, “জঙ্গলটা মনে হচ্ছে মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য স্যার!”

সুনীত বসু বললেন, “কীরকম?”

রুদ্র উঠে গিয়ে আবার কম্পিউটারের সামনে বসল। গুগল ম্যাপে মাউস স্ক্রল করে বলল, “দেখুন স্যার। ফার্ম হাউজটার প্রোব্যাবল লোকেশন বদনপুরের সামনে দিয়ে সরস্বতীর যে শাখা বয়ে গেছে তার উলটোদিকে।। ওই জায়গায় সরস্বতী চক্রাকারে ঘুরেছে। আর সেই লুপের মধ্যেই রয়েছে শেখর চৌধুরীর ফার্ম হাউজ।”

সুনীত বসু ছবিটা দেখছিলেন, “কিন্তু অর্জুনের কথামতো ফার্ম হাউজের একটুখানি জায়গা বাদ দিলেই পুরোটাই তো জঙ্গল। তাহলে সেখানে ওই আমীশ কমিউনিটি কোথায়?”

“আমীশ তো ক্যাথলিকদের ওই কমিউনিটিকে বলে স্যার।”

“ওই যাই হোক, বাংলার ওই আমীশের মতো যে কমিউনিটি রাধানাথ রায় বানিয়েছেন বলে তুমি মনে করছ, সেটা কোথায়? পুরোটাই তো জঙ্গল।”

এবার জয়ন্ত ম্যাপের দিকে আঙুল তুলল। বলল, “এও তো হতে পারে, জঙ্গল স্রেফ ফার্ম হাউজের সামনের দিকটাকে আলাদা করে জনসমক্ষে দেখানোর জন্য। হয়ত ওই দুর্ভেদ্য জঙ্গলের পেছনেই রয়েছে সেই সমাজ। লক্ষ্য করে রেখুন, এরিয়াটার পেছনেই আবার সরস্বতী। আর সেই নদী বেয়ে কিছুদূর গেলেই পড়বে বাগডাঙার সেই আশ্রম। আর পূর্বদিকে সেই নদী বরাবর গেলে পৌঁছে যাওয়া যাবে মূল হুগলী নদীতে।”

সুনীত বসু চুপ করে রইলেন। বুঝতে চেষ্টা করলেন ব্যাপারটা। তারপর বললেন, “আর দেরি কোরনা। তোমরা বেরিয়ে পড়ো। আমি ফোর্স দিয়ে দিচ্ছি।”

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *