কালিন্দী – ৩৫

৩৫

গভীর রাত্রি।

রামেশ্বর তেমনি পাথরের মূর্তির মত বসিয়া আছেন। তেমনি দৃষ্টি তেমনি ভঙ্গি। ঘরের মধ্যে তেমনি স্বল্প আলোক, আলোক-পরিধির চারিপাশ তেমনি নিথর অন্ধকার। সুনীতি তেমনি উপুড় হইয়া মাটিতে মুখ গুঁজিয়া পড়িয়া আছেন। উমাকে হেমাঙ্গিনী লইয়া গিয়াছেন। রায় লইয়া যাইতে চান নাই। কিন্তু হেমাঙ্গিনীর কাতরতা দেখিয়া না বলিতেও পারেন নাই। অপরাধীর মত বলিয়াছিলেন, কাল সকালেই পাঠিয়ে দেব উমাকে।

একবার মাত্র মুখ তুলিয়া সুনীতি বলিয়াছেন বেশ।

মানদা নীচে পড়িয়া কাঁদিতেছে।

শোকাচ্ছন্ন নীরবতা ভঙ্গ করিয়া রামেশ্বর বলিলেন, জল। শুষ্ক কণ্ঠস্বর দিয়া রব বাহির হিল না, কিন্তু ভাষা বোঝা গেল।

সুনীতি একটা দীর্ঘনিঃসশ্বাস ফেলিয়া উঠিলেন, মনে তাহার অনুতাপ হইল, আজ রামেশ্বরের খাওয়া পর্যন্ত হয় নাই। উঠিয়া তিনি দেখিলেন, উমা জলখাবার সাজাইয়া কোণের টেবিলের উপর নিয়মমত রাখিয়া গিয়াছে। জলখাবারের থালা ও গ্লাসটি আনিয়া মৃদুস্বরে বলিলেন, খাও কিছু। আমি ভুলে গেছি, মনে করতে পারি নি।

জলের গ্লাসটি শুধু তুলিয়া লইয়া নিঃশেষে পান করিয়া রামেশ্বর খাদ্য প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন, না।

সুনীতি এতক্ষণে ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন।

রামেশ্বর মৃদুস্বরে প্রশ্ন করিলেন, অহীনের কি ফাঁসী হবে?

আর্তস্বরে সুনীতি বলিয়া উঠিলেন, না না, সে তো খুন করে নি, বিপ্লবের খুনের ষড়যন্ত্র করেছিল, খুন তো করে নি।

রামেশ্বর বলিলেন, তোমার পূণ্য, উমার ভাগ্য তাকে বাঁচিয়েছে

সুনীতি চুপ করিয়া রহিলেন।

রামেশ্বর বলিলেন, আচ্ছা, ওরা আমাকে কেন সাজা দিক না। অহীন তো আমারই ছেলে। দোষ তো আমারই।

আবেগপীড়িত কণ্ঠে সুনীতি বলিলেন, না না, আমার জন্যেই তোমার এত কষ্ট। তোমার দোষ নয়, আমার ভাগ্যের দোষ, আমার গর্ভের দোষ।

অতি ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়িয়া অস্বীকার করিয়া বলিলেন না।

তারপর বহুক্ষণ নীরবতার পর বলিলেন, জান না তুমি, কেউ জানে না। আমারই রক্তের দোষ। ছায়ামূর্তির মত মৃদু সঞ্চালনে হাত তুলিয়া অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া বলিলেন, ওইখানে তোমার দিদিকে-রাধারাণিকে আর আমার প্রথম সন্তানকে গলা টিপে মেরেছিলাম।

সুনীতি আতঙ্কে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন।

রামেশ্বর বলিতেছিলেন, একদিন দেখলাম, রায় বাড়িতে রাধারাণী সুন্দর একটা ছেলের সঙ্গে হাসছে। সে তার পিসতুতো ভাই। আমার চরিত্র-দোষ ছিল কিনা, আমার সন্দেহ হল। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন, সংসারে এই নিয়ম, ‘আত্মবৎ মন্যতে জগৎ’। যে অন্ধ সে পৃথিবীকে অন্ধকার দেখে, এ প্রকৃতির নিয়ম। রামেশ্বর নীরব হইলেন।

কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিলেন, ছেলেটা হল, তার চুল কালো হল, আমাদের মত পিঙ্গল হল না। আমি যেন পাগল হয়ে গেলাম। ঠিক মনে হল, ছেলেটা তার মত দেখতে। একদিন শুয়ে ছিল ছেলেটা, গলা টিপে দিলাম।

সুনীতি থরথর করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে স্বামীর মুখ চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন, না না না। বলো না, বলো না।

রামেশ্বর নীরব হইয়া বসিয়া রহিলেন। বহুক্ষণ পর আবার অকস্মাৎ বলিলেন, কিন্তু রাধারাণি বুঝতে পেরেছিল। হয়ত দেখেছিল। কিন্তু সে কাঁদলে না। শুধু বললে, যে চোখে তুমি এমন কূ দেখলে ওই চোখ তোমার অন্ধ হয়ে যাবে।

আবার কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া বলিলেন, সে কাউকে কিছু বললে না, বাপের বাড়িও গেল না; একদিন কাশী যাবে বলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। সন্ধ্যাবেলা একাই চলে গেল। আমি সেই রাত্রেই স্টেশন থেকে ফিরিয়ে এনে, ওইখানে গলা টিপে-। যখন তার গলা টিপে ধরলাম, সে অভিশাপ দিল,চোখ নয়, ওই দুই হাতেও তোমার কুষ্ট হবে।

সুনীতির যে সব গোলমাল হইয়া যাইতেছে। স্থান কাল পাত্র সব ঝাপসা হইয়া গিয়াছে। বিহ্বল দৃষ্টিতে তিনি স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া ছিলেন, নির্বোধের মত তিনি এবার বলিলেন, কই, তোমার তো কুষ্ঠ হল না? তোমার চোখ তো অন্ধ হয় নি?

হয়েছিল; ভাল হয়ে গেল। মহীন আর অহীন ভাল করে দিলে। একটি হাত ও চোখ দেখাইয়া বলিলেন, এইটে অহীন, আর এইটে মহীন। তারপর মৃদুস্বরে বলিলেন তোমার গর্ভের দোষ নয়, আমার রক্তের দোষ। জান সুনীতি আমাদের বংশ পাপের বংশ। নবাবরা দেওয়ালে পুঁতে মানুষ মারত। আমার কিন্তু সব পাপ নষ্ট হয়ে গেল। সব রোগ ভাল হয়ে গেল।

সুনীতি নীরবে বসিয়া রহিলেন, সূতা কাটা ঘুড়ির মত তাহার মন জীবনকেন্দ্র হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছে, তাহাকে আকর্ষন করিতে আর কিছুতেই পারিতেছে না। বিহ্বল দিশাহারার মত উদাস তিনি।

কিছুক্ষণ পরেই বাহিরে পাখীরা কলরব করিয়া প্রত্যুষ ঘোষণা করিয়া দিল। রামেশ্বর চকিত হইয়া বলিলেন, ভোর হয়ে গেল? বলিতে বলিতে বিছানা হইতে নামিয়া তিনি জানলা খুলিয়া দিলেন। আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া তিনি দাঁড়াইলেন, সম্মুখে আকাশে মুক্তির বার্তা বহন করিয়া উদায়াচল হইতে মৃত্তিকার বুকে লক্ষ লক্ষ যোজনা অতিক্রম করিয়া ধারায় ধারায় আলোকের বন্যা ছুটিয়া আসিতেছে। মুহুর্তে মুহুর্তে চারিদিক পরিষ্কার হইয়া উঠিতেছে সমস্ত দেখা যাইতেছে-জীর্ণ রায়হাট, শীতের শীর্ণা কালিন্দী, ও পারের চর আকাশে উদ্যত চিমনী কলের সারি সারি অট্টালিকা প্রশস্ত সুগঠিত পথ, লোকজন ঐশ্বর্যময়ী চর।

চরটা চোখে পড়িতেই সুনীতি চমকিয়া উঠিলেন। সর্বনাশা চর। ব্যাকুলভাবে তিনি প্রশ্ন করিলেন, তুমি কি-তুমি কি আমার সতীনের দেহ ওই-ওই ওই চরে পুঁতেছিলে?

সবিস্ময়ে মুখ ফিরাইয়া রামেশ্বর বলিলেন না বাড়িতে কুয়ার মধ্যে। সেটা বন্ধ করে দিয়েছি।

সুনীতি বিহ্বল বিস্ময়ে প্রশ্ন করিলেন তবে? দিশাহারা বিহ্বল মন উদ্ভট চিন্তা, উদ্ভট প্রশ্ন জাগিয়া উঠিতেছিল। সতীনের কঙ্কালের উপর তো চরটা গড়িয়া উঠে নাই তবে কেন এমন হল?

রামেশ্বর সে কথায় কান দিলেন না, মুখ ফিরাইয়া আপনার দুইটা হাত শূন্যালোকে প্রসারিত করিয়া দিলেন। তখন দিগন্তশিখরে সূর্য দেখা দিয়াছে, অতিরিক্ত আলোক অকৃপন দীপ্তি ও উত্তাপ লইয়া রামেশ্বরের হাতের উপর ছড়াইয়া পড়িল। হাতের দিকে চাহিয়া রামেশ্বর বলিলেন, আঃ, কোন দাগ নেই একেবারে সাদা হয়ে গেছে।

অস্থিচর্মসার রক্তহীন বিবর্ণ দুখানি হাত।

হাত দুইখানি মুক্ত করিয়া রামেশ্বর সূর্যকে প্রণাম করিলেন জবাকুসুম-সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং। ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্‌।

সুনীতি উদাস দৃষ্টিতে চরটার দিকে চাহিয়া ছিলেন, রামেশ্বর কথা কানে যাইতেই তিনি আকাশের দিকে চাহিলেন; সম্মুখেই রক্তিম সূর্য উদয়শিখর হইতে অস্তাচল পর্যন্ত মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ সর্ব পাপঘ্ন দেবতার মহাদ্যুতিতে ঝলমল করিতেছে। তাহারই প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে রায়হাটে কালিন্দীর চরে সর্বত্র সর্বত্র।

ওই দূরে নতুন ওঠা সর্বনাশা চরটার কোল ঘেঁষিয়া শীর্ণা কালিন্দীর বারোমেসে অগভীর অপরিসর জলধারা বহিয়া চলিয়াছে। মন্থর তাহার গতি এখন। কালের ভগ্নী কালিন্দী! কালিন্দীর জলস্রোতের মধ্যে নূতন চরটার ছায়া প্রতিফলিত হইয়াছে। গাছ-গাছালির মধ্যে চিনির কলের চিমনিটা স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। চিমনিটার গায়ে প্রভাতসূর্যের রৌদ্র পড়িয়াছে-তাহাও ফুটিয়াছে প্রতিবিম্বের মধ্যে।

নিত্য প্রভাতে উঠিয়াই প্রথম এই চরটার ছবি ওই কালিন্দীর জলে দেখিয়া আসিতেছেন। চরটা যেন তাহার ভাগ্য তাহার ঘর সংসারকে বেষ্টন করিয়া পাক দিয়া পাকে পাকে জড়াইয়াছে বলিয়া তাহার মনে হইত। আজ মনে হইল কালের ভগ্নী কালিন্দী মহাকালের নির্দেশকে প্রতিফলিত করিয়া চলিতেছে। আগে যেখানে কালিন্দীর জলে শুধু আকাশ ও নদীতীরের গাছ গাছালি তৃণবনের ছায়া ভাসিত আকাশে ওড়া বকের সারির ছবি ভাসিত-আজ সেখানে কালিন্দীর সেই স্রোতধারায় উদয় সূর্যের আলোয় আলোকিত কলের চিমনি এবং চিমনিতে ওঠা ধোঁয়ার রাশি একটা অনির্দেশ্য শাসনের মত ভাসিতেছে বলিয়া মনে হইল। আরও ভবিষ্যত কালে এই চরের ভাঙা গড়ার সঙ্গে আরও কত ছায়া আরও কত নবতর মূর্তি ওই স্রোতে ফুটিয়া উঠিবে মানুষকে ভয় দেখাইবেন কে জানে। কিন্তু তাহার আর ভয় নাই। না। বরঞ্চ চরাচরব্যাপী আলোর মধ্যে যে আশ্চর্য অভয় আছে তাহারই স্পর্শ পাইয়া সুনীতি আশ্বস্ত হইলেন। তাহার চোখ ফাটিয়া জল আসিল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *