কালিন্দী – ২৭

২৭

চরের উপর কর্মকোলাহল তখনও স্তব্ধ হয় নাই। শেডটার লৌহকঙ্কাল তৈয়ারী ইহারই মধ্যে শেষ হইয়া গিয়াছে, আজ তাহার উপর কারোগেটেড শীট পিটানো হইতেছে। বোল্টগুলির উপর হাতুড়ির ঘা পড়িতেছে। আকাশমূখী সুদীর্ঘ চিমনিটার আকার এইবার সরু হইতে আরম্ভ করিয়াছে; আজ আবার নূতন মাচান বাঁধা হইতেছে। নীচে কোথাও গাঁথনির কাজে কার্ণিকের শব্দের ধাতব ধ্বনিত হইতেছে। ছাদের উপর অসংখ্য পিটনের আঘাত একসঙ্গে পড়িয়া চলিয়াছে, মেয়েগুলি কিন্তু এখন আর গান গাহিতেছে না, আর বোধ হয় ভাল লাগে না। একটা লরির এঞ্জিন কোথায় দুর্দান্তভাবে গর্জন করিতেছে, বোধ হয় কোন দুরন্ত বাধা ঠেলিয়া চলিতে হইতেছে। মাঝে মাঝে অবরুদ্ধ স্টীমে বয়লারটা থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। এ সমস্তকে একটা ক্ষীণ আচ্ছাদনের মত আবরণে আবৃত করিয়া মানুষের কোলাহল-কলরবের উচ্চ গুঞ্জনরোল অবিরাম গুঞ্জিত হইয়া চলিয়াছে। অহীন্দ্র নদীর বুকে দাঁড়াইয়া এই অর্ধনির্মিত যন্ত্রপুরীটির দিকে বিস্ময়বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া দেখিল; সে নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র, বিজ্ঞানকে সে মনে মনে নমস্কার করিল।

নদী হইতে চরের ঘাটে উঠিয়াই সে দেখিল, বেনাঘাসের মধ্যে গরুর গাড়ির চাকার রেখার চিহ্নিত সে কাঁচা পথটি আর নাই; রাঙা কাঁকর বিছানো প্রশস্থ সুগঠিত রাজপথের মত একটি পথ, ঘাটের মুখ হইতে গুণ-টানা ধনুকের মত দীর্ঘ ভঙ্গিতে বাঁকিয়া কারখানার দিকে চলিয়া গিয়াছে। কিছুদূর আসিয়া তাহাকে সে-পথ ছাড়িয়া ডান দিকে ফিরিতে হইল, এতক্ষণে সেই কাঁচা পথটির দেখা মিলিল। পথটি চলিয়া গিয়াছে সাঁওতাল-পল্লীর দিকে। দুই পাশে সাঁওতালদের চাষের ক্ষেত। ক্ষেতগুলি সমস্তই অকর্ষিত, কোথাও ফসল নাই; সমস্ত ক্ষেত্রভূমিটাই একটা ধূসর উদাসীনতায় সদ্য-বিধবার মত বিষণ্ণ, রিক্ত। সে বিস্মিত হইয়া গেল, এ কি! সাঁওতালেরা জমিগুলিকে এমন অযত্নে একেবারে রিক্ত করিয়া ফেলিয়া রাখিয়াছে! গত বৎসরে এই সময়ের ক্ষেত্রের ছবি তাহার মনে পড়িয়া গেল, বিচিত্রবর্ণের ফুলে ফসলে ভরা সে যেন একখানি সবুজ গালিচা। আলুর সতেজ সবুজ গাছে ভরা ক্ষেতগুলির চারিপাশে ফুলে ভরা কুসুমফুলের গাছ, পুস্পিত মটরশুঁটির লতা-ভরা ক্ষেত; এক চাপ সবুজের মত ছোলা ও মসুরের ক্ষেত, তাহার ভিতর অসংখ্য বেগুনি রঙের কুচি কুচি মসিনার ফুল; সদ্যোদ্গত সবুজ কোমল শীষে ভরা গম ও যবের ক্ষেত। সকলের চেয়ে বাহার দিত সরিষার ক্ষেতগুলি, হলুদ রঙের ফুলগুলি চাপ বাঁধিয়া ফুটিয়া থাকিত গাঢ় সবুজের মাথায় একটি পীতাভ আস্তরনের মত। ক্ষেতের আইলে সাঁওতাল চাষীরা অকারণে ঘুরিয়া বেড়াইত, তাহাদের কালো মুখে সাদা চোখে আনন্দ প্রত্যাশার সে কি বিপুল ব্যগ্রতা! অহীন্দ্রের মনে পড়িয়া গেল সচল পাহাড়ের মত বিপুলদেহ কঠিনপেশী কমল মাঝিকে। শেষ সে তাহাকে দেখিয়াছে বর্ষার সময় জলে-ভরা এই ধানক্ষেতের মধ্যে, কর্দমাক্ত দেহে সে তখন হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া ধানক্ষেতের কাদানো জমি সমান করিয়া দিতেছিল। বন্য বরাহের মত হামা দিয়া এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত নরম মাটি যেন দলিয়া খুঁড়িয়া ফেলিতেছিল। কমল থাকিলে বোধ হয় ক্ষেতের চাষের এমন দুর্দশা হইত না। অহীন্দ্র বেশ বুঝিল, দৈনিক নগদ মজুরির আস্বাদ পাইয়া ইহারা এমন করিয়া চাষ পরিত্যাগ করিয়াছে। কমল বোধ হয় কাছকাছি কোথাও আড্ডা গাড়িয়াছে; নহিলে সারী কেমন করিয়া উমাকে দেখিতে আসিল? উমা তো বলিল, খুব লম্বামত মেয়েটি, নামটি বেশ-সারী। মাঠ পিছনে ফেলিয়া অহীন্দ্র সাঁওতাল-পল্লীর ছায়াঘন প্রান্তসীমায় প্রবেশ করিল। পল্লীটা নীরব নিস্তব্ধ ; কেবল গোটাকয়েক কুকুর তাহাকে দেখিয়া তারস্বরে চীৎকার করিয়া পথরোধ করিয়া দাঁড়াইল। অহীন্দ্র শঙ্কিত না হইলেও সতর্ক না হইয়া পারিল না, সে ভ্রুকুঞ্চিত করিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। ঠিক সেই মুহূর্তেই নিকটতম বাড়ি হইতে একটি মেয়ে বোধ হয় ঘটনাটা কি দেখিবার জন্য বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল এবং রাঙাবাবুকে দেখিয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল, রাঙাবাবু!

অহীন্দ্র হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ রে। কিন্তু তোদের কুকুরগুলো যে আমাকে যেতে দেবে না বলছে।

মেয়েটি বেশ একটু ত্রস্ত হইয়া কুকুরগুলোকে তাড়াইয়া দিবার জন্য হাত তুলিয়া অগ্রসর হইয়া বলিল, হড়িচ্‌-হড়িচ্‌! কুকুরগুলো তবু গেল না, মেয়েটির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করিয়া লেজ নাড়িতে নাড়িতে চীৎকার আরম্ভ করিল, মেয়েটি এবার অত্যন্ত ক্রদ্ধস্বরে বলিয়া উঠিল, ই- রে কম্বড়ো সে- তা হড়িচ্‌-হড়িচ্‌! অর্থাৎ, ওরে চোর কুকুর, পালা বলছি, পালা বলছি, পালা। এবার কুকুরগুলো মাথা নীচু করিয়া মৃদু গর্জনে আপত্তি জানাইতে জানাইতে সরিয়া গেল।

অহীন্দ্র অগ্রসর হইয়া বলিল, তোরা সব কেমন আছিস?

মেয়েটি একটু আশ্চর্য বোধ করিয়া বলিল, কেনে, ভাল আছি। সেই যি তুমার বিয়ার ‘ল-সম্বন্ধিতে’ (নব সম্বন্ধ উপলক্ষে) নেচ্যা এলম গো! হাঁড়িয়া খেলম, গান করলম।

অহীন্দ্র হাসিয়া ফেলিল, বলিল, তা বটে, নেচে যখন এলি, তখন খারাপ থাকবি কি করে? ঠিক কথা।

মেয়েটি সবিস্ময়ে অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই কথার অর্থ উপলব্ধি করিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিয়া বলিল, হেঁ। লইলে নেচ্যা এলম কি করে?

রাঙাবাবু!

রাঙাবাবু! এ বাবা গো!

হালে -ভালা-রাঙাবাবু গো-

হাসির ধ্বনি শুনিতে পাইয়া আশেপাশের বাড়িগুলি হইতে তিনচারটি মেয়ে উঁকি মারিয়া দেখিয়া বিস্ময়ে আনন্দে রাঙাবাবুর আগমনবার্তা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ঘোষণা করিয়া অহীন্দ্রের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। দেখিতে দেখিতে দলবদ্ধ হইয়া তরুণীর দল তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিল। বয়স্কা মাঝিনেরা তাড়াতাড়ি ছোট্ট একটা চৌপায়া আনিয়া তাহাদের ‘জহর সার্না’ অর্থাৎ দেবতার কুঞ্জভবন কৃষ্ণচূড়াগাছের ছায়ায় পাতিয়া দিয়া সম্ভ্রমভরে বলিল, আপুনি বোস্‌ বাবু।

তরুণী পরস্পরের গলা ধরিয়া দাঁড়াইয়া আপানাদের মধ্যেই নিজেদের ভাষায় অনর্গল কথা বলিতেছিল, তাহার সমস্তই অহীন্দ্রকে লইয়া। অহীন্দ্র বলিল, কি এত সব বলছিস তোরা?

মেয়েগুলো খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। একটি মধ্যবয়স্কা মেয়ে বলিল, উয়ারা বুলছে, রাঙাবাবুকে শুধা, বহুটি কেমন হল? কত বোড়ো বেটে বহুটি? তাই ই উয়াকে বুলছে, তুই শুধা; উ ইয়াকে বুলছে, তুই শুধা; শরম লাগছে উয়াদের।

অহীন্দ্র বলিল, এই এদের মতই হবে।

এবার একটি মেয়ে বলিল,আ আমদের পারা কালো বেটে, না গোরা বেটে?

অহীন্দ্র বলিল, সে আমি বলব কেন? তোরা গিয়ে দেখে আয়। সারী গিয়েছিল দেখতে, সে আমার বউয়ের নাম দিয়ে এসেছে-রাঙাঠাকরুন।

মেয়েগুলি একসঙ্গে অকস্মাৎ গম্ভীর হইয়া স্তব্ধ হইয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে গম্ভীর মৃদুস্বরে দুই-একজনের মধ্যে দুই-একটা বাদানুবাদের সুরে কথা আরম্ভ হইল। অহীন্দ্র বুঝিতে পারিল না এবং লক্ষ্যও করিল না তাহাদের আকস্মিক সুরবৈষম্য। সে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে সপ্রশ্ন হইয়া উঠিয়াছিল, ভ্রু এবং কপাল কুঞ্চিত করিয়া সে বলিল, ভাল কথা, সারীরা এখন কোথায় থাকে রে? কমল মাঝিরা এখান থেকে উঠেই বা গেল কেন?

মেয়েগুলি আবার স্তব্ধ হইয়া গেল, তাহাদের অপ্রসন্নতার গাম্ভীর্য অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রকট হইয়া উঠিল। অহীন্দ্র তাহাদের মুখের দিকে চাহিয়া বিস্মিত হইয়া বলিল, কি, তোরা সব গুম্‌ মেরে গেলি যে? তাহার সন্দেহ হইল যে, ইহাদের সকলে চূড়ার নেতৃত্বে দল পাকাইয়া কমলকে তাড়াইয়াছে।

একটি তরুণী এবার বলিয়া উঠিল, উ মেয়েটার নাম তু করিস না রাঙাবাবু, ছি।

আরও বিস্মিত হইয়া অহিন্দ্র বলিল, কেন?

সকলের মুখে ঘৃণার অতি তীব্র অভিব্যক্তি ফুটিয়া উঠিল, যে-মেয়েটি কথা বলিতেছিল সে বলিল, ছি, উ পাপী বেটে, পাপ করলে।

পাপ করলে?

হেঁ, পাপ করলে; আপোন বরকে-মরদকে ছেড়ে উ ওই সায়েবটার ঘরে থাকছে।

অহীন্দ্র চমকিয়া উঠিল, বাক্যের অর্থে অর্থে সম্পূর্ণভাবে কথাটা না বুঝিলেও অর্থের আভাস সে একটা বুঝিতে পারিতেছিল, তীক্ষ্ণ তির্যক দৃষ্টিতে চাহিয়া সে প্রশ্ন করিল, বরকে ছেড়ে সায়েবের ঘরে থাকছে? সায়েব কে?

ওই যি কল বানাইছে, উয়াকে আমরা সায়েব বলি।

হুঁ। ছোট একটা ‘হুঁ’ বলিয়াই অহীন্দ্র স্তব্ধ হইয়া গেল।

অপর একটি মেয়ে বলিয়া উঠিল, উ এখুন ভাল কাপড় পরছে, গোন্দ মাখছে, উই সায়েব দিচ্ছে উকে।

অহীন্দ্র প্রশ্ন করিল, সেইজন্য বুঝি কমল মাঝি আর সারীর বর এখান থেকে পালিয়ে গেছে?

হে, শরম লাগল উয়াদের, আমরা সব উয়াদের সঙ্গে খেলম নি, তাতেই উয়াদের শরম বেশি হল, উয়ারা সব চলে গেল। হেঁ।

অন্যান্য মেয়েগুলি আপনাদের ভাষায় অনর্গল কিচির-মিচির করিয়া আলোচনা করিয়া চলিয়াছিল দলবদ্ধ সারিকা পাখির মত। অকস্মাৎ একটি মেয়ে আপনাদের ভাষায় বলিয়া উঠিল, দেখ্‌ দেখ্‌, রাঙাবাবুর মুখখানা কেমন হইছে দেখ্‌।

সবিস্ময়ে আর একটি মেয়ে বলিয়া উঠিল, জেঙ্গেৎ-আরা (অর্থাৎ টকটকে রাঙা)! উ বাবা রে!

অহীন্দ্র আবার স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল, দুঃখে ক্রোধে তাহার মনের মধ্যে একটা আলোড়ন জাগিয়া উঠিল। সেই দীর্ঘতনু মুখরা মেয়েটিকে তাহার বড় ভাল লাগিত, তাহার পরিণতি শেষে এই হইল? আর তাহাদেরই অধিকৃত ভূমির মধ্যে একজন আগন্তুক ধনের দর্পে এমনি করিয়া অত্যাচার করিল সরল নিরীহ জাতির নারীর উপর?

মাথার মধ্যে সে কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করিল, রক্তের চাপে মাথাটা যেন ভারী হইয়া উঠিতেছে।

একটি প্রৌঢ়া মেয়ে বলিল, হাঁ বাবু, কেনে তুরা ওই সায়েবটাকে ইখিনে কল বোসাতে দিলি? ওই মেয়েটাকে উ জোর করে বশ করলে। উয়ার ভয়ে কেউ কিছু বলতে লারলে।

অহীন্দ্রের স্থিরদৃষ্টি একটি স্থানেই আবদ্ধ হইয়া ছিল, তাহার মনের মধ্যে বিদ্যুৎগতিতে ছবি ভাসিয়া যাইতেছিল, সবই ওই সারী ও কমল মাঝির স্মৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাহার মনে পড়িল, ওই সম্মুখের উঠানে যেখানে তাহার দৃষ্টি আবদ্ধ হইয়া আছে, ওইখানেই প্রথম দিন সে আসিয়া বসিয়াছিল। তখন চারিপাশে ছিল কাশ ও বেনাবন। সম্মুখে উবু হইয়া একখানা বিরাট পাথরের মত বসিয়া ছিল কমল। আর সম্মুখেই পরস্পরের গলা জড়াইয়া ধরিয়া দাঁড়াইয়া ছিল মেয়েগুলি, ঠিক মাঝখানে ছিল সারী।

বৃদ্ধা বলিয়াই চলিয়াছিল, আবার এই দেখ্‌, আমাদের জমিগুলি উ সব কেড়ে লিছে।

অহীন্দ্র যেন গর্জন করিয়া উঠিল, কেড়ে নিচ্ছে?

তাহার এই গর্জনে সমস্ত দলটি চমকিয়া উঠিল, অহীন্দ্রকে এমন রূপে তাহারা কখনও তো দেখেই নাই, এমন রূপের প্রকাশকেও তাহারা কল্পনা করিতে পারে না। যে প্রৌঢ়াটি কথা বলিতেছিল সেও ভয়ে চুপ করিয়া গেল। অহীন্দ্র অপেক্ষাকৃত শান্ত স্বরে আবার প্রশ্ন করিল, জমি কেড়ে নিচ্ছে কি মেঝেন?

ভয়ে ভয়ে প্রৌঢ়া বলিল, বুলছে, তোদের কাছে আমি টাকা পাব। জমিগুলা আমাকে দিতে হবে। লইলে লালিশ করব।

টাকা পাবে? কিসের টাকা?

ওই যে চিবাস মোড়ল, উয়ার কাছে আমরা সোব ধান খেতম বর্ষাতে, তাই চিবাস খত করে লিলে ধানের দামে। উহার কাছ হতে উই সায়েব আবার কিনে লিলে খতগুলান। তাথেই বুলছে, জমিগুলা দে, তুদিকে আরও টাকা দিব, খতও শোধ করে লিব। লইলে লালিশ করব।

করুক নালিশ, খবরদার তোরা জমি লিখে দিবি না। যে টাকা পাবে সে আমরা শোধ করে দেব।

মেয়েটি হতভম্বের মত খানিকক্ষণ অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া সহসা কাঁদিয়া ফেলিয়া বলিল, জমি যে বাবু লিলে।

লিখে নিলে?

হেঁ বাবু। আজকে সোঁকালে মরদগুলাকে লিয়ে শহরে পাঠায়ে দিলে তুদের সেই মজুমদারের সোঙ্গে হাকিমের ছামুতে টিপছাপ লিবে, রেজস্টালি করে লিবে।

অহীন্দ্র অনুশোচনায় অস্থির হইয়া উঠিয়া বলিল, ছি ছি ছি! তোরা দিলি কেন? আমাদের ওখানে গেলি না কেন?

মেয়েটি সকরুণ স্বরে বলিল, উ যি বলতে বারণ করলে রাঙাবাবু। উয়াকে দেখলে যে আমরা ডরে মরে যাই। পাহাড়ে চিতির ছামুতে ছাগল ভেড়ার মোতন আমরা লড়া-চড়া করতে লারি বাবু।

সমবেত সকলেই যেন এতক্ষণ উদ্বেগে নিঃশ্বাস রুদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, প্রৌঢ়ার কথা শেষ হইতেই দুঃখে হতাশায় দীর্ঘ প্রক্ষেপে সে নিঃশ্বাস তাহারা ত্যাগ করিল। মৃদুস্বরে আক্ষেপ করিয়া দুই-চারিজন বলিয়া উঠিল, আঃ আঃ! হায় রে!

অহিন্দ্রের চোখের উপর চকিতে ভাসিয়া উঠিল, সে যেন স্পষ্ট দেখিতে পাইল, সম্মুখেই একটা স্থানে একটা বিরাট অজগরের মৃতদেহ, নিস্পন্দ চিত্রিত মাংসস্তূপ। ঠিক ওইখানেই সেটা সেদিন পড়িয়া ছিল, তীরে তীরে বধ করিয়াছিল সেটাকে সারীর স্বামী। সে উঠিয়া দাঁড়াইল, দাঁড়াইয়া অনুভব করিল, সর্বশরীর থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। মাথাটা যেন অবরুদ্ধ ক্রোধে ফাটিয়া পড়িতেছে।

* * *

এমন দুর্দমনীয় ক্রোধের অস্থিরতা সে জীবনে অনুভব করে নাই; দুই কান দিয়া আগুন বাহির হইতেছে, শীতের কনকনে বাতাসের স্পর্শেও আরাম বোধ হইতেছে না। রগের শিরা দুইটা দপদপ করিয়া স্পন্দিত হইতেছে। বারা বার তার ইচ্ছা হইতেছিল, ওই কলের মালিকের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইতে। একবার খানিকটা অগ্রসরও হইয়াছিল, কিন্তু পথ হইতেই ফিরিল; এই অবস্থার মধ্যেও তাহার শৈশব হইতে মায়ের দৃষ্টান্তে অভ্যাস করা আত্মসংযম তাহাকে নিবৃত্ত করিল। আরঐ একটা চিন্তা তাহার পথ রোধ করিল, সে তাহাদের বংশপ্রচলিত মর্যাদা-রীতি। সে রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী অহীন্দ্রের এমন করিয়া বিমলবাবুর ওখানে যাওয়া চলে না। চক্রবর্তীদের আসনের সম্মুখেই ওই কলওয়ালাকে আসিয়া দাঁড়াইতে হয়। সঙ্গে সঙ্গেই সে ফিরিল। শীতের কালিন্দীর বালুকাময় তটভূমি ধরিয়া একটা নির্জন স্থানে আসিয়া সে বসিল। সম্মুখেই পশ্চিম দিকে অপরাহ্নের সূর্য দিকচক্ররেখার দিকে দ্রুত নামিয়া চলিয়াছে, ইহারই মধ্যে শুকতারাটি ক্ষীণ প্রভায় প্রকাশিত হইয়াছে।

বসিয়া বসিয়া সে ভাবিতেছিল ওই কলওয়ালার অত্যাচারের কথা। নিরীহ সরল জাতির নারী কাড়িয়া লইয়াছে, ভূমি কাড়িয়া লইয়াছে। আর তাহাদের পৃথিবীতে আছে কি? আর কি অপদার্থ ভীরু জাতি এই সাঁওতালেরা! তীর ধনুক লইয়া কারবার করে, বুনো শূকর মারিয়া খায়। কুমীর মারে, বাঘও নিস্তার পায় না, অতি কদর্য ভয়াল অজগর, ওই সারীর স্বামীই সে অজগরটাকে বধ করিয়াছিল, আর এটাকে পারিল না! ওই সাঁওতাল রমণীটি তো মিথ্যা বলে নাই, অর্থের শক্তিতে বুদ্ধির কুটিলতায় ও অজগরই বটে; পাক দিয়া জড়াইয়া ধরিয়া পেষণে পেষণে রক্তহীন হত্যা করিয়া ধীরে ধীরে গ্রাস করিতে থাকে। অজগরই বটে! সারীর স্বামী এ অজগরটাকে বধ করিতে পারিল না? এমনি ধারার অত্যন্ত নিষ্ঠুর কামনা তাহার মাথার মধ্যে যেন চিতাগ্নিশিখার মত পাক খাইয়া খাইয়া ফিরিতে আরম্ভ করিল।

কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে উঠিয়া বালুরাশি ভাঙ্গিয়া কালিন্দীর ক্ষীণ জলস্রোতের কিনারায় আসিয়া আঁজলা আঁজলা জল মাথায় মুখে দিয়া ধুইয়া ফেলিল। কনকনে ঠাণ্ডা জলের উপর শীতের বাতাসের স্পর্শে এবার একটু শীত বোধ করিল। মস্তিষ্ক যেন এতক্ষণে সুস্থ হইয়া আসিতেছে। বেশ পরিস্ফুট কণ্ঠে সে বলিয়া উঠিল, আঃ!

ধীরে ধীরে সে বালির উপর দিয়া হাঁটিয়া চলিল। উঃ, কি কঠিন ক্রোধই না তাহার হইয়াছিল। ওই লোকটার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলে আজ একটা অঘটন ঘটিয়া যাইত। কিন্তু এই যে অন্যায় অত্যাচার, ধনদর্পিত স্বেচ্ছাচার-স্বেচ্ছাচার কেন, ব্যভিচার-ইহার প্রতিকার করিতে হইবে। করিতে যে সে ধর্মত ন্যায়ত বাধ্য। ওই নিরীহ সাঁওতালগুলি তাহাদেরই প্রজা, শুধু প্রজাই নয়, তাহার পিতামহ হইতে আজ পর্যন্ত তাহাদের বংশকে উহারা দেবতার মত মান্য করে। শুধু তাই বলিয়াই কেন? মানুষ হিসাবে তাহার কর্তব্য। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করার অধিকারই মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিকার। সকল ব্যাথিতের বেদনায় ব্যাথিতা অশ্রুমুখী মায়ের মুখ তাহার মনে জাগিয়া উঠিল, তাহার মা ননী পালের মৃত্যুর জন্য কাঁদেন, অথচ পুত্রের দ্বীপান্তরের আদেশ অবিচলিত ধৈর্যের সহিত সহ্য করেন।

অকস্মাৎ পাশের বেনাবন আন্দোলিত হইয়া উঠিতেই সে ঈষৎ চকিত হইয়া উঠিল। চরের এই খানিকটা অংশের বেনাবন এখনও সাফ হয় নাই। বেনাবনের ও-পাশেই চরের উপর সারি সারি ইটের পাঁজা; ওগুলিই এখন সরিসৃপ ও বন্যজন্তুদের একমাত্র আশ্রয়স্থল হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখিয়া একটু সরিয়া অপেক্ষা করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আত্মরক্ষার্থে একটা পাথরের নুড়িও নদীর বালি হইতে কুড়াইয়া লইল। জানোয়ার নয়, মানুষ। বেনাবনের অন্তরালে একেবারে সম্মুখেই আসিয়া পৌঁছিয়াছে, সাদা কাপড় স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। অহীন্দ্র হাতের ঢেলাটি ফেলিয়া দিয়া আবার ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হইল। তাহার মনে পড়িল, রবীন্দ্রনাথের “গান্ধারীর আবেদনে ”র কথা। পাপে আসক্ত পুত্রের প্রতি অভিশাপের বজ্র নিক্ষেপ করিতে করিতে দৌপ্রদীর লাঞ্ছনায় চোখে তাঁহার জল আসিয়াছে। কৃষ্ণার লাঞ্ছনার চেয়ে কৃষ্ণকায়া হতভাগিনী সারীর লাঞ্ছনা তো কম নয়।

রাঙাবাবু! পিছন হইতে মৃদুস্বরে কে ডাকিল, রাঙাবাবু!

অহীন্দ্র পিছন ফিরিয়া দেখিল, বেনাবনের পটভূমির গায়ে দাঁড়াইয়া সারী, হাতে দুইটি গাঢ় লাল রঙের ফুল। মুহূর্তে তীব্র কঠিন ক্রোধে আবার তাহার মাথা হইতে পা পর্যন্ত স্নায়ুগুলি গুণ-দেওয়া ধনুকের ছিলার মত টান হইয়া টঙ্কার দিয়া উঠিল। দুর্নীতিপরায়ণা মেয়েটার উপর ক্রোধের তাহার সীমা রহিল না। তাহার চোখে পড়িল না সারী কত শীর্ণ হইয়া গিয়াছে; তাহার কালো রঙের উপরও চোখের কোলে গাঢ়তর কালির রেখায় আঁকা গভীর ক্লান্তির অতি স্পষ্ট ছাপটিও সে দেখিতে পাইল না।

সারী হাসিয়া ফেলিল; তাহার সেই হাসির মধ্যে একটা শঙ্কার আভাস, সে বলিল, আমি দেখলাম আপোনাকে; নদীর বালিতে বালিতে রাঙা আগুনের পারা মানুষ, তখুনি চিনতে পারলম। ফুল নিয়ে এলম। কথা বলিতে বলিতেই কৃষ্ণাভ-রাঙা মখমলের রঙের গোলাপ ফুল দুইটি তাহার দিকে প্রসারিত করিয়া ধরিল। অহীন্দ্র সে-দিকে দৃষ্টিপাতই করিল না, ভ্রূকে স্পর্শ করিয়া প্রসারিত তাহার অতি তীব্র দৃষ্টি সারীর মুখের উপরেই স্থিরভাবে নিবদ্ধ ছিল। অগ্নিবর্ণ উত্তপ্ত লৌহশলাকার মত সে-দৃষ্টি মর্মঘাতি তীক্ষ্ণ। সারী সভয়ে হাতটি গুটাইয়া লইয়া চরমদণ্ডে দণ্ডিতা অপরাধিনীর মত নীরবে বিহ্বল হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

নিষ্করুণ কঠিন কণ্ঠে এতক্ষণে অহীন্দ্র বলিল, সরে যা আমার সুমুখ থেকে। তোর লজ্জা করে না মানুষের সামনে দাঁড়াতে? যা এখান থেকে।

সারীর চোখ হইতে দুইটি অশ্রুর ধারা গাল বাহিয়া ঝরিয়া পড়িল। ভয়ার্ত বিহ্বলতার মধ্যেও সে অস্ফুট স্বরে বলিল, আমাকে ঘরের ভিতর এই এত বড় ছুরি দেখালেক বাবু, কাঁড়ার চাবুক করে আমাকে মারে, ওগো রাঙাবাবু গো!

অতীন্দ্র অসহিষ্ণু হইয়া তীব্রস্বরে বলিল, যা যা, এখান থেকে যা বলছি!

সারী আর সাহস করিল না, ক্লান্ত বাহুবিক্ষেপে বেনাবন ঠেলিয়া তাহারই মধ্যে ডুবিয়া গেল।

* * *

সারী চলিয়া গেল। আরও কয়েক পা অগ্রসর হইয়া অহীন্দ্র আবার স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইল। বেড়াইতেও আর ভাল লাগিতেছে না, সে একটা গভীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিল। দীর্ঘনিঃশ্বাসের মধ্য দিয়া বুকের আবেগ অনেকটা বাহির হইয়া আসিল কাঁপিতে কাঁপিতে, যেন কত অফুরন্ত কান্না সে কাঁদিয়াছে। সে নিজেই আশ্চর্য হইয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত চোখ বুজিয়া ভাবিয়া লইয়া সে আবার কালিন্দীর জলস্রোতের কিনারায় আসিয়া চোখ-কান আর একবার ধুইয়া ফেলিল। ধুইয়া সেইখানেই সে বসিল, প্রয়োজন হইলে আবার একবার মাথা ধুইয়া ফেলিবে। মাথার মধ্যে ক্রোধের এমন যন্ত্রণা হয় সে তাহা জানিত না। জ্বরোত্তপ্ত মস্তিষ্কের যন্ত্রণার চেয়ে এ-যন্ত্রণা তো কোন অংশে কম নয়! তাহার মনে পড়িল, আরও একদিন ক্রোধে তাহার মাথা ধরিয়াছিল। নবীন বাগদী ও রংলাল মোড়ল তাহাকে বলিয়াছিল, আইনে পান তো লেবেন সেলামী। তাহার মা সেদিন সস্নেহে মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে যন্ত্রণার উপশম হইয়াছিল। সেদিনের যন্ত্রণা আজিকার যন্ত্রণার তুলনায় নগণ্য, তুচ্ছ। আজও সে মায়ের হাতের স্পর্শের জন্য লালায়িত হইয়া উঠিল। এমন কোমল শান্ত স্পর্শ মায়ের হাতের, আর এত শীতল সে হাত! সে বাড়ি যাইবার জন্যই উঠিয়া পড়িল।

কিছুদূর আসিতেই দেখা হইল অমলের সঙ্গে। অমল বলিল, বাঃ বেশ! খুঁজে খুঁজে হয়রান তোমাকে-যাকে বলে গরু খোঁজা তাই। পরমুহূর্তে সে বিস্ময়মুগ্ধ কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, বাঃ, আকাশের গোধূলি যে তোমার মুখে নেমেছে হে! ওঃ, সো বিউটিফুল ইউ লুক? মুখে যেন লাল রুজ মেখেছ মনে হচ্ছে। না, রক্তসন্ধ্যাই হবে আরও মিষ্টি-

অহীন্দ্র বলিল, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার অমল। অত্যন্ত রাগে আমার ভয়ঙ্কর মাথা ধরে উঠেছে।

রাগে? তুমি আবার রাগ করতে শিখলে কবে?

আজই। বস বলি।

ধীরে ধীরে সমস্ত বলিয়া সে বলিল, এরই মধ্যে সাঁওতালদের অবস্থা যা হয়েছে, সে কি বলব। মাঠগুলো পড়ে ধু ধু করছে। তাদের পাড়াতে সে গান নেই, আনন্দ নেই। তাদের মুখের হাসি যেন ফুরিয়ে গেছে। অমল, তাদের মেয়েদের ওপর পর্যন্ত অত্যাচার আরম্ভ করেছে এর প্রতিকার করতেই হবে।

অমল ম্লান হাসি হাসিয়া বলিল, আজই পড়ছিলাম গোল্ডস্মিথের Deserted Village। -বলিয়া সে আবৃত্তিও করিয়া গেল-

Ill fares the land, to hastening ills a prey

Where wealth accumulates, and men decay,

Princes and lords may flourish, or may fade

A breath can make them, as a breath has made;

But a bold Peasantry, their country’s pride

When once destroyed, can never be supplied.

অহীন্দ্রেরও মনে পড়িয়া গেল। স্মৃতি-স্মরণের মধ্যে আবৃত্তি করিতে করিতে অস্ফুটস্বরে আবৃত্তি করিয়া উঠিল-

His best companions, innocence and health,

And his best riches, ignorance of wealth.

ঠিক ঐ সাঁওতালদের ছবি। ওদের বাঁচাতেই হবে অমল, bold Peasantry কে রক্ষা করতেই হবে।

অমল বলিল, চল, আজ বাবাকে গিয়ে বলি। বাবাও লোকটার উপর খুব চটে আছেন। কালিন্দীর ওই বাঁধটা, ওই যে পাম্প করে জল তুলছে, ওটা নিয়ে বোধ হয় শিগ্‌গিরই একটা গোলমাল হবে। ফৌজদারিই হবে বলে মনে হচ্ছে।

অহীন্দ্র বার বার ঘাড় নাড়িয়া অস্বীকার করিয়া বলিল, নো নো অমল, নট অ্যাজ এ প্রিন্স অর এ লর্ড, জমিদার বা ধনী হিসেবে নয়। মানুষ হিসেবে মানুষের দুঃখ দূর করতে হবে। জমিদার আর কলওয়ালার তফাৎ কোথায়?

অমল বিস্মিত হইয়া অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। কিছুক্ষণ নীরবে বসিয়া থাকার পর নদীর বালির উপর অর্ধশায়িত হইয়া অহীন্দ্র যেন আপনাকে এলাইয়া দিল, এমন আকস্মিক উগ্র উত্তেজনার ফলে তাহার দেহ ও মন যেন বিপর্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে।

অমল বলিল, এ কি, শুয়ে পড়লে যে। চল, বাড়ি চল।

অহীন্দ্র ক্লান্তির একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল,চল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *