কালিন্দী – ২৮

২৮

অমলের মুখে অহীন্দ্রের মাথা ধরার সংবাদ এবং অপরাহ্নের সমস্ত ঘটনার কথা শুনিয়া হেমাঙ্গিনী মাত্রতিরিক্তরূপে চিন্তিত হইয়া উঠিলেন। রায় তর্পণের আসনে নীরবে জপে ব্যাপৃত ছিলেন, তাঁহার সম্মুখে বসিয়াই কথা হইতেছিল, তাঁহার ধ্যানগম্ভীর মুখে একটু মৃদু হাসি ফুটিয়া উঠিল; বিশেষ একটা উপলব্ধির ভঙ্গিতেই হাসির মৃদুতার সহিত সমতা রাখিয়া মাথাটি বার কয়েক দুলিয়া উঠিল।

হেমাঙ্গিনী বলিলেন, অহীনের তো রাগ কখনও দেখি নি। ওর স্বভাব হল ওর মায়ের মত। অমল হাসিয়া বলিল, পূর্বে কখনও রাগ হয় নি বলে পরে কখনও রাগ হতে পারে না, এ তোমার অদ্ভুত যুক্তি মা!

হেমাঙ্গিনী দৃঢ় স্বরে বলিলেন, না, রাগ করতে পারে না। এমন মায়ের ছেলে সে কারও ওপর রাগ করবে কেন? সুনীতির দয়ামায়ার কথা তোরা জানিস, গোটা পৃথিবীর ওপর তার মায়া ছড়ানো আছে। তার ছেলে-

মায়ের স্বভাব কন্যার প্রাপ্য, গিন্নী, ছেলে পাবে পৈতৃক স্বভাব। তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন, অহীন্দ্র হল শাক্ত জমিদার-বংশের সন্তান! তার স্বভাব হবে সিংহের মত। দুর্বলকে সে স্পর্শ করবে না, যুদ্ধ হবে তার সবলের সঙ্গে। অহীন্দ্রের তেজস্বিতায় আমি খুব খুশি হয়েছি। তারা, তারা মা! -রায়ের জপের এক পর্যায় শেষ হইয়াছিল, সেই অবসরে তিনি এই কথা কয়টি বলিয়া কারণ-পাত্র পুনরায় পূর্ণ করিয়া লইয়া ক্রিয়া আরম্ভ করিলেন।

হেমাঙ্গিনী কিন্তু অপ্রসন্ন হইয়া উঠিলেন, স্বামীর কথাগুলি তাঁহার ভাল লাগিল না। বলিলেন, তোমাদের ওই এক ধারার কথা। শাক্ত জমিদার-বংশের ছেলে হলে তাকে রাগ করে মাথা-ধরাতে হবে, কিংবা দাঙ্গাহাঙ্গামা করতে হবে কেন শুনি? এমন কিছু শাস্ত্রের নিয়ম আছে নাকি?

ক্রিয়ায় নিযুক্ত রায় কোন উত্তর দিতে পারিলেন না, কিন্তু মুখে তাঁহার মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, ওদের গুষ্টির রাগকে আমার বড় ভয় করে বাপু। ওর বাপের রাগের সে থমথমে মুখ মনে হলে হাত-পা যেন গুটিয়ে আসে।

রায়ের মুখও গম্ভীর হইয়া উঠিল। হেমাঙ্গিনী বলিয়াই চলিয়াছিলেন, অহীনের এখন থেকে এ-সব মাথা ঘামানোই বা কেন? সে এখন পড়ছে পড়ে যাক। বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপার, তুমি রয়েছ, যেমনই অসুস্থ হোন-তার বাপ রয়েছেন, সে-সব তাঁরা যা হয় করবেন।

বলিয়াই তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন, অমলকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, চল, তুই আমার সঙ্গে চল্‌, একবার দেখে আসি, আর বলে আসি। উমিটা কোথায় গেল? সেও চলুক।

* * *

অহীন্দ্র একখানা ডেক-চেয়ারে চোখ বুজিয়া ক্লান্তভাবে হেলান দিয়া শুইয়া ছিল। পদশব্দে চোখ খুলিয়া সে দেখিল; তাহার মা, এবং মায়ের পিছনে হেমাঙ্গিনী ও অমল। ব্যস্ত হইয়া সে উঠিবার উপক্রম করিল, হেমাঙ্গিনী বলিলেন, না, না, উঠতে হবে না। তোমার শরীর খারাপ হয়ে রয়েছে, শুয়ে থাক তুমি। তারপর, তুমি নাকি এত রাগ করেছিলে যে, তোমার মাথা ধরে উঠেছে? ছি বাবা, রাগ চণ্ডাল, তাকে এত প্রশ্রয় দিও না। যে-মায়ের ছেলে তুমি, তাতে রাগ তোমার শরীরে থাকাই উচিত নয়।

অহীন্দ্র দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আপনারা জানেন না, কি অমানুষিক অত্যাচার ওই কলওয়ালাটি করেছে ওই নিরীহ সাঁওতালদের ওপর।

হেমাঙ্গিনী বলিলেন, বেশ তো, তার জন্য তোমার বাবা রয়েছেন, তোমার-। বলিয়াই তিনি হাসিয়া ফেলিলেন, হাসিতে হাসিতে বলিলেন, মামা বলা তো আর চলবে না, শ্বশুর বলতে হবে; তাই বলি, তোমার শ্বশুর রয়েছেন, তাঁরা তার প্রতিকার নিশ্চয় করবেন। গরিব প্রজা, তাদের বাঁচাতে হবে বই কি। এটা তো জমিদারের ধর্ম। যত কিছু দোষ রায়-হাটের বাবুদের থাক, ও-ধর্ম তাঁড়া কখনও অবহেলা করেন না। তোমার এখন পড়ার সময়, তুমি লেখাপড়া কর।

সুনীতি বলিলেন, আমি বলি কি অহীন,আমাদের খাসে যে জমিটা আছে, যেটা সাঁওতালরাই ভাগে চাষ করছে, ওইটে ওদের বন্দোবস্ত করে দেওয়া হোক। তা হলে ওদের দুঃখও ঘুচবে, আর কলের মালিককে বুঝিয়ে বলে দিলেই হবে যে, ওটাতে যেন আর তিনি হাত না দেন।

অমল হাসিয়া এবার বলিল, পিসীমার ধর্মটি কিন্তু বড় ভাল। ও ধর্মের মহিমায় সকল সমস্যার সমাধান জলের মত পরিস্কার হয়ে যায়।

সুনীতি লজ্জা পাইলেন, কিন্তু হেমাঙ্গিনী বলিলেন, ‘পড়িলে ভেড়ার শিঙে ভাঙে রে হীরার ধার!’ গোঁ ধরা শাক্ত-তান্ত্রিকের বংশ তোমাদের, তোমরা আর এ ধর্মের মহিমা কি বুঝবে বল? ওরে, ও-ধর্ম যদি সকলে বুঝত, তবে কি পৃথিবীতে এত দুঃখ থাকত?

অমল হাসিয়াই উত্তর দিল, সে তো অস্বীকার করছি না মা, কিন্তু পিসিমার ধর্মে মুশকিল কি জান? মুশকিল হচ্ছে, নিঃসম্বল অবস্থায় আর ও-ধর্ম নিয়ে চলা যায় না। মানে, ব্রহ্মাণ্ড যাঁর উদরভাণ্ড, সেই তিনি যখন ননীগোপাল সেজে ননীলোলুপ হয়ে ওঠেন, তখন যশোদাকে মুশকিলে পড়ে ও-ধর্ম ছেড়ে বিপরীত ধর্ম গ্রহণ করতে হয়, দায়ে পড়ে তখন ননীগোপালকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধতে হয়। পৃথিবীতে মানুষ মাত্রেই যে ব্রহ্মাণ্ড-ভণ্ডোদর বিষয়-গোপাল-বিপদ যে ওইখানে।

অমলের কথার ভঙ্গিতে সবাই হাসিল, হাসিল না কেবল অহীন্দ্র, সে যেমন গম্ভীর মুখে অবসন্ন ভঙ্গিতে ডেক-চেয়ারে এলাইয়া পড়িয়া ছিল, তেমন ভাবেই রহিল। হেমাঙ্গিনী হাসিতে হাসিতে বলিলেন, তুই কিন্তু ভারী জ্যাঠা হয়েছিস অমল।

অহীন্দ্র চোখ বুজিয়াই ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে বলিল, তুমি ভুল বুঝেছ অমল, মায়ের ধর্ম যশোদার ধর্ম নয়, মায়ের ধর্ম গান্ধারীর ধর্ম। দাদার গুলিতে যখন ননী পাল মল, তখন মা ননী পালের জন্যে কেঁদেছিলেন, কিন্তু দাদার দ্বীপান্তরের হুকুম যেদিন হল, এক ফোঁটা চোখের জল তিনি ফেলেন নি। শুধু পাথরের মূর্তির মত বসে রইলেন।

লজ্জা এবং দুঃখ একই সঙ্গে সুনীতিকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, সেই তো বাবা, হাজার অপরাধ করলেও তোমার মা কখনও কারও ওপর রাগ করেন না। অন্যায় করেও কেউ দণ্ড পেলে তোমার মা তার জন্যে কাঁদেন। সেই মায়ের ছেলে তুমি, রাগ করা তো তোমার সাজে না।

অহীন্দ্র নীরবে কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিল, হ্যাঁ, রাগ করাটা আমার অন্যায় হয়েছে। কিন্তু রাগ তো আমি ইচ্ছে করে করি নি, হঠাৎ যেন কেমন হয়ে গেলাম আমি। তা নইলে অত্যাচার অবিচার কোথায় নেই বলুন? ধনী দরিদ্রও পৃথিবীর সর্বত্র, অত্যাচার অবিচারও সর্বত্র। কজনের ওপর রাগ করব?

হেমাঙ্গিনী বলিলেন, না না না, তা বললে চলবে কেন? যতটুকু তোমার আয়ত্তের মধ্যে, তার ভেতর অন্যায়ের প্রতিকার করতে হবে বৈ কি। আর সে হবেও। লোকটিকে ভালমত শিক্ষা দেবার জন্যে উনি উঠে-পড়ে লেগেছেন। তবে আমাদের তরফ থেকে যাতে অন্যায় না হয়, সেজন্যে আমি বার বার করে বলেছি। বলেছি, ও লোকটি অন্যায় করেছে, তাকে শাস্তি দিতে হলে ন্যায়পথে চলে শাস্তি দিতে হবে, কৌশল অবলম্বন করতে পারবে না।

অহীন্দ্র এ কথার কোন জবাব দিল না, নীরবে চোখ বুজিয়া চেয়ারে হেলান দিয়া শুইয়া রহিল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, মাথা কি এখনও ধরে রয়েছে তোমার? এক কাজ কর, ওডিকোলনের একটা পটি দাও কপালে, না হয় পিপার্‌মেণ্ট জলে গুলে কপালে বুলিয়ে নাও। তারপর সুনীতির দিকে ফিরিয়া বলিলেন, চল, আমরা যাই, একবার চক্রবর্তী মশায়ের সঙ্গে দেখা করে আসি চল।

সুনীতি গভীর চিন্তায় দিশাহারা হইয়া বলিলেন, আমার বড় ভয় দিদি। ওই চরটা সর্বনাশা চর; যখনই চর নিয়ে কোন হাঙ্গামা বাধে, আমার বুক থরথর করে কেঁপে ওঠে। অহি আবার চর নিয়ে যে কি করবে, ওর ভাবগতিক আমার ভাল লাগল না দিদি। কেমন উদাসী মন হয়ে গেছে দেখলেন!

হেমাঙ্গিনী হাসিয়া বলিলেন, ও তুমি কিছু ভেবো না সুনীতি, ও সব ঠিক হয়ে যাবে। উমার আমার স্বামীভাগ্য খুব ভাল; তাছাড়া উমা একালের লেখাপড়া জানা চালাক মেয়ে। বিয়ে হোক না, কেমন মন-উদাসী থাকে, দেখব। দেখবে? এক্ষুনি বাবার মন ভাল করে দিচ্ছি বলিয়াই তিনি উচ্চকণ্ঠে ডাকিলেন, অমল!

অমল আসিতেই বলিলেন, একটা কাজ যে ভুলেছি বাবা! এক্ষুনি তোকে বাড়ি যেতে হবে, গিয়ে স্যাকরাকে বলে পাঠাতে হবে যে, উমার রুলির প্যাটার্নটা অন্য রকম হবে; আজই সেটা আরম্ভ করার কথা, সেটা যেন আজ আরম্ভ না করে। কাল সকালে আমার কাছে এলে আমি সব বুঝিয়ে দেব। তিনি ইচ্ছা করিয়াই অহীন্দ্রের নিকট হইতে সরাইয়া অমলকে বাড়ি পাঠাইয়া দিলেন।

অমল চলিয়া গেল; হেমাঙ্গিনী ওডিকোলনের জল তৈয়ারি করিয়া ডাকিলেন, উমা!

উমা মানদা ঝির পাল্লায় পড়িয়াছিল, ভাবী বউদিদিকে মানদা ছোটদাদাবাবুর বাল্যকালের কথা বলিয়া নিজের গুরুত্ব এবং প্রবীণত্বের দাবি প্রতিষ্ঠিত করিতেছিল। উমারও শুনিতে মন্দ লাগিতেছিল না। মায়ের আহ্বান শুনিয়া সে উপরে আসিয়া সুনীতি ও হেমাঙ্গিনীর সম্মুখে দাঁড়াইল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, এই ওডিকোলনের জলটা আর এই ন্যাকড়ার ফালিটা দিয়ে আয় তো মা। আমরা দুজনে চক্রবর্তী মশায়ের ঘরে যাচ্ছি। তুই বরং ন্যাকড়াটা ভিজিয়ে কপালে একটা পটিই লাগিয়ে দিয়ে আসবি। বড্ড মাথা ধরেছে অহির।

উমা লজ্জায় স্থানুর মত হইয়া না গেলেও সঙ্কুচিত অনেকটুকুই হইল। রক্তাভ মুখে সে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল, হেমাঙ্গিনী ওডিকোলনের পাত্রটি হাতে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, তোমার তো লজ্জা করলে চলবে না মা; বাড়িতে একটি ননদ-দেওর নেই যে, তাকে পাঠিয়ে দেবেন তোমার শাশুড়ী। যাও, দিয়ে এস।

উমা পাত্রটি হাতে করিয়া চলিয়া গেল। হেমাঙ্গিনী সুনীতির দিকে চাহিয়া ফিক করিয়া হাসিয়া বলিলেন, এ কি আর আমাদের কাল আছে ভাই? সেকালে আর একালে অনেক তফাত।

সুনীতি মৃদু ম্লান হাসি হাসিলেন, বসিলেন, তারপর বলিলেন, ভাল আর মন্দ ভাই, যে কালের যে ধারা। এরপর আবার কত হবে, নাতি-নাতনীর আমলে বেঁচে থাকলে সেও দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গ শেষ করিয়া ক্ষণিক স্তব্ধ থাকিয়া আবার বলিলেন, চল, চক্রবর্তী মশায়কে একবার দেখে আসি। আজই একবার দেখা হয়েছে, তবু যখন এসেছি চল।

অহীন্দ্র চোখ বুজিয়াই শুইয়া ছিল, ঠিক ঘুমায় নাই-কিন্তু সজাগও ঠিক ছিল না। জাগ্রত পৃথিবীর সকল সংস্পর্শকে দূরে সরাইয়া দিয়া সে যেন আপন অন্তরের চিন্তালোকের গভীর-গর্ভ রুদ্ধদ্বার এক কক্ষের মধ্যে স্তব্ধ হইয়া বসিয়া ছিল। অকস্মাৎ কপালের উপর শীতল একটি স্পর্শ যেন করাঘাত করিয়া তাহাকে বাহির হইতে ডাকিল। উমা আসিয়া তাহাকে ঘুমন্তই মনে করিয়াছিল; ডাকিয়া ঘুম না ভাঙাইয়া সন্তর্পণে ওডিকোলনের পটিটি কপালে বসাইয়া দিয়াছিল।

অহীন্দ্র স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখ মেলিয়া উমার মুখের দিকে চাহিল।

উমা লজ্জা পাইল, আরক্তিম মুখে বলিল, ওডিকোলনের পটি! আমি ভেবেছিলাম, ঘুম আর ভাঙাব না।

স্মিত হাসিতে অহীন্দ্রের মুখ ঈষৎ দীপ্ত হইয়া উঠিল, সে বলিল, আমি ঘুমুই নি।

ঘুমোও নি? তবে এমন ভাবে শুয়ে ছিলে যে? মাথা বুঝি খুব ধরেছে?

মাথার যন্ত্রণা অনেকটা কমেছে; কিন্তু মন যেন কেমন vacant হয়ে গেছে।

উমা মৃদু হাসিয়া এবার বলিল, সায়েবলোকের কিন্তু এ-রকম দুর্বল হওয়া উচিত নয়। রাগ দুর্বলচিত্তের একটি লক্ষণ।

অহীন্দ্রের মুখের হাসি এবার আরও একটু উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে বলিল, কথাটা তোমার মুখে শোভন হল না, হে বাঙালিনী শ্রীমতি উমা দেবী। যেহেতু স্মরণ কর, পুরাকালে পর্বত দুহিতা উমার প্রিয়তম পরম যোগী শঙ্করেরও একদা ক্রোধ হয়েছিল, যে ক্রোধের অগ্নিতে কাম হয়েছিল ভস্মীভূত।

উমা হাসিয়া বলিল, তুমি কি ওই কলওয়ালাটিকে ভস্মীভূত করতে চাও নাকি?

একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলিয়া অহীন্দ্র বলিল, তখন তাই চেয়েছিলাম। কিন্তু আর তা চাই না। একটু আগে মনকে ওই চিন্তা থেকে মুক্ত করবার জন্যে পড়ছিলাম, রবীন্দ্রনাথের ‘গান্ধারীর আবেদন’, তার কটা লাইন আমাকে পথ দেখিয়ে দিলে। লাইন কটি মুখস্থ হয়ে গেছে আমার-

“দণ্ডিতের সাথে-

দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে,

সর্বশ্রেষ্ট সে বিচার। যার তরে প্রাণ

কোন ব্যাথা নাহি পায়-তারে দণ্ড দান

প্রবলের অত্যাচার।”

আমি লোকটাকে শাস্তি দিতে চাই, তার অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই, কিন্তু তার ওপর কোন বিদ্বেষ আমি রাখতে চাই না।

অহীন্দ্রের কথাগুলি শুনিতে শুনিতে উমার মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে এ যুগের মেয়ে, তাহার তরুণ মন আদর্শের স্বপ্নে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল। অহীন্দ্রের গৌরবে সে গরবিনী হইয়া উঠিয়াছে।

ও-দিকে রামেশ্বরের ঘর হইতে ফিরিয়া নীচে নামিবার পথে সিঁড়ির একটি গোপন স্থানে সুনীতি ও হেমাঙ্গিনী আপনা-আপনিই যেন দাঁড়াইয়া উমা ও অহীন্দ্রকে লক্ষ্য করিয়া দেখিতে ছিলেন। হেমাঙ্গিনী আত্মসম্বরণ করিতে পারিলেন না, সুনীতিকে স্পর্শ করিয়া ফিসফিস করয়া বলিলেন, দেখলে?

সুনীতি বলিলেন, ফাল্গুনের প্রথমেই দিন ঠিক করুন দিদি। আমার অদৃষ্টকে আমার সর্বদাই ভয় হয়। আমার সম্বলের মধ্যে অহি। উমার হাতে ওর ভার দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই।

* * *

হেমাঙ্গিনী উৎসাহে ব্যগ্র হইয়া উঠিলেন, রণবাদ্যে উৎসাহিত যুদ্ধের ঘোড়ার মত। ফাল্গুনেই বিবাহ দিবার জন্য তিনিও ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। বিবাহের মধ্যে যেন একটা কল্পলোকের মাদকতা আছে, পাড়াপড়শি পর্যন্ত নিদ্রা বিসর্জন দিয়া মাতিয়া উঠে, এ-ক্ষেত্রে তো মেয়ের মা এবং ছেলের মা। সুনীতিও সঞ্জীবিত হইয়া উঠিলেন। রায়ের মনেও উৎসাহের সীমা ছিল না। রাধারাণীর অন্তর্ধানের লজ্জায় ক্ষোভে আগুন ধরিয়া পুড়িতে আরম্ভ করিয়াছে, কিন্তু এখনও তাহাতে পূর্ণাহুতি পড়ে নাই। কিন্তু তিনি পুরুষমানুষ, সাত-পাঁচ ভাবিয়া বৈশাখে বিবাহ দিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন। ফাল্গুন ও চৈত্র দুই মাস জমিদারদের দারুণ ঝঞ্ঝাটের সময়। বাকিবকেয়া আদায়, বৎসরান্তে আখেরী হিসাবনিকাশ লইয়া মাথা তুলিবার অবসর থাকে না। সেই সব ঝঞ্ঝাট মিটাইয়া তিনি বৈশাখে বিবাহ দিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন।

কিন্তু হেমাঙ্গিনী কিছুতেই শুনিবেন না, বলিলেন, বোশেখ মাস গরমের সময়, গা প্যাচ-প্যাচ করবে ঘামে-

বাধা দিয়া রায় হাসিয়া বলিলেন, আমি নিজে তোমার পাংখা-বরদার হব। পাখা নিয়ে পেছনে পেছনে বাতাস করে ফিরব, তা হলে হবে তো?

না। খেয়ে-দেয়ে কোথায় কার বদহজম হবে-

বাড়িতে একটা ডাক্তার আমি বসিয়ে রাখব, খাওয়ার পর প্রত্যেককে একদাগ হজমী ওষুধ দেওয়া হবে।

হেমাঙ্গিনী রাগ করিয়া উঠিয়া গেলেন, যাইবার সময় বলিলেন, ছেলের মায়ের মতটা তো মানতে হবে। যত খাতিরই তোমাকে সুনীতি করুক, তুমি মেয়ের বাপ, সে ছেলের মা।

রায় হাসিয়া পাঁজি খুলিয়া বসিলেন।

ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহেই বিবাহের দিন পাওয়া গেল, শুক্লা ত্রয়োদশী তিথি। রায় উৎসব-আয়োজনের ত্রুটি রাখিলেন না; গ্রামস্থ লোক, প্রজা সজ্জন সমস্ত নিমন্ত্রিত হইল।

সাঁওতালদেরও সমস্ত দলটিকে বরযাত্রী যাইবার জন্য নিমন্ত্রণ করা হইল। কিন্তু তাহারা কেহ আসিল না।

অচিন্ত্যবাবু আসিয়াছিলেন, তিনি ফিসফিস করিয়া বলইলেন, বারণ করে দিয়েছে মশায়। যে আসবে, তার জরিমানা হবে।

চক্রবর্তী-বাড়ির নায়েব বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল, বারণ করে দিয়েছে! কে? জরিমানাই বা কে করবে শুনি?

মুখার্জি সাহেব-মিস্টার মুখার্জি।

নায়েব গম্ভীরভাবে ডাকিল, কে রয়েছিস রে, বাগ্‌দী পাইকদের ডাক্‌ তো এখানে।

অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, ঠকবেন মশায়, ঠকবেন। এমন কাজটি করবেন না। সাঁওতালদের প্রজাই-স্বত্ব এখন মুখার্জি সায়েবের। তারা এখন মুখার্জি সায়েবের প্রজা। আপনাদের প্রজা হল মুখার্জি সায়েব, সাঁওতালরা মুখার্জি সায়েবের প্রজা, মজুর, আশ্রিত, তিনিই এখন ওদের মা-বাপ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর সব।

কথাটা অহীন্দ্রের কানেও উঠিল। বরবেশে চতুর্দোলে বসিয়া, কুঞ্চিত ললাটে সে জ্যোৎস্নার আলোকে আলোকিত চরখানির দিকে চাহিয়া দেখিয়া, গভীর বেদনা অনুভব করিল। দলিলের কৌশলে সাঁওতালদের বিচ্ছিন্ন করিয়া লইল। জাল দলিলে মানুষ বিকাইয়া গেল।

রাঙা ইটের তৈয়ারী সুদীর্ঘ চিমনিটা শাসনরত তর্জনীর মত উদ্যত হইয়া আছে।

ও-দিকে সংবাদটা শুনিয়া ইন্দ্র রায় সারাদিনের উপবাসে পরিশ্রমে ক্লান্ত দেহখানিকে টানিয়া মুহূর্তে সোজা হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। কিন্তু তিনি কিছু বলিবার বা করিবার পূর্বেই হেমাঙ্গিনী আসিয়া মৃদুস্বরে বলিলেন, আজ তুমি কিছু করতে পাবে না, আজ আমার উমার বিয়ে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *