কালিন্দী – ৩৩

৩৩

আরও মাস তিনেক পর।

মাঘ মাসের প্রথমেই একদিন প্রাতঃকালে কলের মালিক অকস্মাৎ সমস্ত চরটাই দখল করিয়া বসিলেন, রংলাল-প্রমুখ চাষীরা যে-জমিটা অল্পদিন পূর্বে জমিদারের নিকট বন্দোবস্ত করিয়া লইয়াছিল। সে -অংশটা পর্যন্ত দখল করিয়া লইলেন।

মোটর-সংযুক্ত বিলাতী লাঙল চালাইয়া চরের সমস্ত আবাদী জমি এ-প্রান্ত হইতে ও-প্রান্ত পর্যন্ত চষিয়া এক করিয়া দিল। সংবাদ পাইয়া সমস্ত রায়হাট গ্রামখানাই বিস্ময়ে কৌতুহলে উত্তেজনায় মাতিয়া উঠিল। চরের উপর কলের লাঙল আসিয়াছে। গরু নাই, মহিষ নাই, কোন লোক লাঙলের মুঠা ধরিয়া নাই, অথচ চাষ হইয়া চলিয়াছে। কেবল একজন লোক গাড়ির মত কলটার উপর বাবুর আরামে বসিয়া আছে, হাতে পায়ে দু-একটা কল ঘুরাইতেছে টিপিতেছে, আর গাড়িটা চলিতেছে, পিছনে ইয়া মোটা মোটা মাটির চাঁই উল্টাইয়া পড়িতেছে। ওটা নাকি মোটরের লাঙল, ঠিক মোটরের ধোঁয়া ছাড়ে শব্দ করে। ভট্‌ভট্‌ শব্দ করিয়া বুনো শূকরের মত এ-প্রান্ত হতে ও-প্রান্ত ছুটিয়া চলিয়াছে; বাধাবিঘ্ন বলিয়া কিছু নাই, উঁচু-নীচু খাল-ঢিপি সব উখড়াইয়া দিয়া চলিয়াছে।

গ্রামের অবালবৃদ্ধ কালিন্দীর ঘাট হইতে চর পর্যন্ত ভিড় জমাইয়া ছুটিয়া আসিল। বনিতারা সকলে না আসিলেও অনেকে আসিয়াছিল। তাহারা কালিন্দীর এ-পারেই দাঁড়াইয়া ছিল। চাষীদের বউগুলি দাঁড়াইয়া ঘোমটার অন্তরালে কেবলই কাঁদিতেছিল। তাহারা কল দেখিতে আসে নাই, তাহারা দেখিতেছিল, তাহাদের জমি চলিয়া যাইতেছে। দূরান্তর হইতে প্রিয়জনের মৃত্যুশয্যার শিয়রে যেমন মানুষ আসিয়া অঝোরঝরে কাঁদে, আর নির্নিমেষ নেত্রে মৃত্যুপথযাত্রীর দিকে চাহিয়া থাকে, এ দেখিতে আসা তাহাদের সেই দেখিতে আসা। তাহাদের চোখে সেই মমতাকাতর দৃষ্টি। চাষীরা কিন্তু আসে নাই। সমবেত জনতা প্রতি মুহূর্তে প্রত্যাশা করিতেছিল, চাষীদের সঙ্গে ছোট রায়-বাড়ি ও চক্রবর্তী-বাড়ির পাইকেরা রে রে করিয়া আসিয়া পড়িল বলিয়া। কিন্তু বহুক্ষণ চলিয়া গেল, তবু কেহ আসিল না। ও-দিকে চরটা সমস্তই চষিয়া ফেলিয়া কলটা স্তব্ধ হইল।

রায়-বাড়ির ও চক্রবর্তী-বাড়ির পাইকদের না আসিবার কারণ ছিল। তাহারা আর কোনদিন আসিবে না। চর লইয়া জমিদার ও কলের মালিকের দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটিয়াছে। জমিদারপক্ষ সমস্ত মামলায় হারিয়া গিয়াছেন। গত কাল অপরাহ্নে বিচারকের রায় বাহির হইয়াছে, সংবাদটা এখনও সকলের মধ্যে প্রচারিত হয় নাই।

মামলার পরাজয়ের সংবাদ সুনীতিও জানিতেন না। ইন্দ্র রায় সে সংবাদ এখন তাঁহাকে জানাইতে পারেন নাই, সুনীতি কেন, হেমাঙ্গিনীকেও জানাইতে তাহার বাধিয়াছে। কলের মালিক কলের লাঙল চালাইয়া চর দখল করিতেছেন। সংবাদ পাইয়া সুনীতি নূতন দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কায় উদ্বেগে অস্থির হইয়া উঠিলেন। ভাঁড়ার বাহির করিতে গিয়া তাঁহার হাত কাঁপিতেছিল। নীরবে নতমুখে বাঁটির উপর বসিয়া উমা শ্বশুরের জন্য আনারস ছাড়াইয়া কুটিতেছিল। এমন সময় মানদা ছড়া কাটিয়া ভণিতা করিয়া বাড়ি ফিরিল; সেও কলের লাঙল দেখিতে গিয়াছিল। চোখ দুইটি বড় করিয়া গালে হাত দিয়া বলিল, ‘যা দেখি নাই বাবার কালে, তাই দেখালে ছেলের পালে!’ কালে কালে আরও কত হবে, বেঁচে থাকলে আরও কত দেখব।

সুনীতি ব্যাগ্রভাবে প্রশ্ন করিলেন, কোনও খুনখারাপি হয় নি তো?

না গো না। কেউ যায়ই নাই। দিব্যি কলের লাঙল চালিয়ে এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো পর্যন্ত চষে নিলে কলওয়ালা।

সুনীতি পরম স্বস্তিতে একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলেন। মানদার আসল বক্তব্য তখনও শেষ হয় নাই। সে বলিয়াই গেল, গরু নাই, মোষ নাই, চাষা নাই, লাঙলের ফাল নাই-এই একটা গাড়ির মতন, ফটফট শব্দ করে চলেছে, আর জমি চাষ হয়ে যাচ্ছে। এক দণ্ডে এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত চাষ হয়ে গেল।

উমা মৃদু হাসিয়া বলিল, ওটা হল মোটরের লাঙল, মোটর গাড়ি তো আপনি চলে দেখেছ, এও তেমনি চলে। নীচে বড় বড় ধারালো ইস্পাতের ছুরি লাগানো আছে, মোটরটা চলবার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো মাটি কেটে উল্‌টে দিয়ে যায়।

মানদা সবিস্ময়ে মৃদুস্বরে বলিল, তাই সবাই বলছে বৌদিদি। আর ধোঁয়া ছাড়ছে কলটা, তার গন্ধ নাকি অবিকল মোটরের ধোঁয়ার গন্ধের মত। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া আবার সে বলিল, আঃ, অনাথা গরু-মোষের অন্নই মারা গেল, আর কি!

সকৌতুকে উমা মানদার দিকে চাহিল, মানদা বলিল, গরু-মোষ তো আর কেউ পালাবে না বৌদিদি, না খেতে পেয়েই ওরা মরে যাবে!

উমা এবার বেশ একটু জোরেই হাসিয়া উঠিল। সুনীতি মৃদু হাসিয়া বলিলেন, তা এতে এমন করে হাসছ কেন বউমা? ও-বেচারার যেমন বুদ্ধি তেমনি বলছে।

মানদা একটা সমর্থন পাইয়া বেশ জাঁকিয়া উঠিয়া কি বলিতে গেল, কিন্তু নবীন বাগদীর স্ত্রী মতি বাগদিনী হন্তদন্ত হইয়া বাড়ির মধ্যে আসিয়া পড়ায় সে-কথা তাহার বলা হইল না। মতির মুখে প্রচণ্ড উত্তেজনাভরা উচ্ছ্বাস; সে বাড়িতে প্রবেশ করিয়াই ডাকিল, রাণীমা!

কি রে? কি হয়েছে বাগদীবৌ? সুনীতি শঙ্কিত হইয়া প্রশ্ন করিলেন। চরে কি আবার-

চরে নয় মা, রংলাল মোড়লের এক-পাটি দাঁত লাথি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন রায়হুজুর।

সে কি? কেন?

ওই চরের জমির লেগে মা। চরের জমি লিয়ে চাষীরা নাকি কলের সায়েবের সঙ্গে কি ষড় করেছিল। সায়েব আজ চর দখল করেছে কিনা! তাই জানতে পেরে-

সুনীতির মুখ বিবর্ণ হইয়া উঠিল। ঠোঁট দুইটি থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল। রংলালের মুখ তাহার মনে পড়িয়া গেল, নির্বোধ দৃষ্টি, ঘোলাটে চোখ, পুরু ঠোঁটে বিনীত তোষামোদভরা হাসি; আহা সেই মানুষকে-! টপ্‌ টপ্‌ করিয়া চোখের জল মাটির উপর ঝরিয়া পড়িল।

উমা বটি ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল, সে জমিদার-কন্যা জমিদার বধূ হইলেও নবীন যুগের মেয়ে, তাহার উপর মুহূর্তে তাহার মনে পড়িয়া গেল অহীন্দ্রকে। মানুষের মুখে লাথি মারার কথা শুনিয়া সে যে কি বলিবে, হয়তো কিছু বলিবে না, কিন্তু অদ্ভুত দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিবে, ক্ষুরধার মৃদু হাসি হাসিবে। সে বলিল, আমি একবার ও-বাড়ি যাব মা।

সুনীতি বলিলেন, মানদা, সঙ্গে যা মা। তুমি দেখো বউমা, আর যেন কোন উৎপীড়ন না হয় গরীবের ওপর। বলো, ও-চর আমি চাই না, ও যাওয়াই ভাল।

উমা ও মানদা চলিয়া গেল, সঙ্গে সঙ্গে মতিও গেল। মতি এখন সাধ্যমত প্রহরিণীর কাজ করিয়া স্বামীর কাজ বজায় রাখিবার চেষ্টা করে। প্রয়োজন হইলে লাঠি হাতে লইতেও লজ্জিত হয় না।

সুনীতি স্তব্ধ উদাস হইয়া বসিয়া রহিলেন।

সর্বনাশা চর! ওই চরের জন্যই এত। তাহার মনে পড়িল, এই লইয়া দ্বন্দ্বের প্রথম দিন হইতে রংলাল জড়িত আছে। খানিকটা জমির জন্য বেচারা চাষীর কি লোলুপ আগ্রহ! নবীনদের দাঙ্গার মকদ্দমাতেও রংলাল জড়িত ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্দ্যুতচমকের মত মনে পড়িয়া গেল একদিনের কথা। নবীনদের মকদ্দমার সময়েই একদিন তিনি চরটাকে যেন ঘুরিতে দেখিয়াছিলেন; এই বাড়িটাকেই কেন্দ্র করিয়া চক্রান্তের চক্র সৃষ্টি করিয়া ঘুরিতেছিল। সেটা কি আজও ঘুরিতেছে? নইলে ওই নিরীহ চাষীর মুখ দিয়া এমন করিয়া রক্ত ঝরিয়া পড়িল কেন? সর্বনাশা চর!

তাহার ভাবপ্রবণ অনুভূতিকাতর মন শিহরিয়া উঠিল। না, ও-চরের সঙ্গে আর কোন সংস্রব তিনি রাখিবেন না। অহীন্দ্রকে তিনি আজই পত্র লিখিবেন, সে আসুক, চর বিক্রয় করিবার জন্য সে আসুক।

সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, সে আজ পনেরো দিনের উপর পত্র দেয় নাই। সে আজকাল কেমন যেন হইয়াছে!

* * *

প্রাতঃকাল হইতেই রায় গুম হইয়া বসিয়াছিলেন।

ভোর রাত্রে সদর হইতে মামলার সংবাদ লইয়া লোক ফিরিয়া আসিয়াছে। সমস্ত মামলাতেই জমিদার-পক্ষ পরাজিত হইয়াছেন। চর লইয়া সমস্ত দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটিয়াছে। মাথা হেঁট করিয়া নিস্পন্দের মত তিনি বসিয়া রহিলেন। তাহার পরই সংবাদ আসিল, কলের মালিক মোটর লাঙল চালাইয়া চর দখল করিতেছে, এমন কি হালে বন্দোবস্ত করা চাষীদের জমিও দখল করিয়া লইতেছে। রায় সোজা হইয়া বসিলেন, আবার একটি সুযোগ মিলিয়াছে। চাষীদের সম্মুখে রাখিয়া আর একবার লড়িবেন তিনি। নায়েব মিত্তিরকে ডাকিয়া তিনি বলিলেন, জলদি বাগদীদের আর কাহারদের তলব দাও। আর চাষীদের ডাকাও দেখি।

সঙ্গে সঙ্গে লোক ছুটিল। রায় আবার গোঁফে পাক দিতে আরম্ভ করিলেন। চেয়ার ছাড়িয়া তিনি উঠিয়া পড়িলেন। সন্ধ্যার অন্ধকারের জন্য প্রতীক্ষামান গুহাচারী অস্থির বাঘের মত বারান্দায় পায়চারি আরম্ভ করিলেন। ঠিক এই সময়েই রংলাল আসিয়া তাহার পায়ের উপর উপুড় হইয়া পড়িল, ডাকিবার পূর্বেই সে নিজেই আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে।

রায় সস্নেহে বলিলেন, ওঠ্‌ ওঠ্‌, ভয় নেই। আমি লাঠিয়াল দিচ্ছি, তোদের কিছু করতে হবে না, তোরা কেবল দাঁড়িয়ে থাকবি, দেখবি। টাকা পয়সা সমস্ত খরচ আমার, কোনও ভয় নেই তোদের।

রংলাল ভেউ ভেউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, আমরা যে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মেরেছি হুজুর!

রায় চমকিত হইয়া উঠিলেন, এই নির্বোধদের তিনি ভাল করিয়াই জানেন। ইহাদের সকলের চেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা এই যে, ইহারা নিজেদের ভাবে অতি বুদ্ধিমান-ভীষণ চতুর। বৈষয়িক জটিল বুদ্ধির প্রতি, কুটিল চাতুরির প্রতি এদের গভীর আসক্তি। সচকিত হইয়া রায় বলিলেন, কি করেছিস, সত্যি করে বল দেখি? সত্য কথা বলবি। ছাড় পা ছাড়-। তিনি আবার চেয়ার টানিয়া বসিলেন।

হাতের তালুর উলটা পিঠ দিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে রংলাল বলিল, আজ্ঞে হুজুর, ওই মজুমদারের ধাপ্পায় পড়ে, -উনিই বললেন, হুজুর-

মজুমদার কি বললে?

বললে টাকার ভাবনা কি? আমি টাকা দেব।

কিসের টাকা?

আজ্ঞে, সেলামীর টাকা। আমাদের টাকা ছিল না হুজুর। উনিই আমাদিগে টাকা দিয়েছিলেন। আমাদের ‘বাপুতি’ সম্পত্তি বন্ধক নিয়ে দলিল করে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, চরের জমি বন্দোবস্ত হয়ে গেলে এ দলিল ফেরত দিয়ে চরের জমি বন্ধক দিয়ে দলিল করে নিতে হবে। এখন নতুন দলিলে সই করিয়ে নিয়ে বলছে হুজুর, বন্ধক নয়, জমি তোদের বিক্রি হয়ে গেল, এ দলিল কবলা-দলিল।

অজগরের মত একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া রায় বলিলেন, হুঁ।

হুজুর আমাদের কি হবে?

দলিল তোরা রেজেস্ট্রী করিস নে।

দলিল যে রেজেস্টারী হয়ে গেল হুজুর। নইলে যে সাবেক বন্ধকী দলিল ফেরত দিচ্ছিল না।

রংলাল আবার ফোঁসফোঁস করিয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল।

রায় রুদ্ধমুখ আগ্নেয়গিরির মত বসিয়া রহিলেন। এই নির্বোধ অথচ কূটমতি অপদার্থগুলির উপর ক্রোধের তাঁহার সীমা রহিল না। তাঁহার জমিদার মন হতভাগ্যের নিরুপায় দিকটা দেখিতে পাইল না। হতভাগ্য অন্ধ বাঘের লেজে পা দিলে বাঘ তাহার অন্ধত্ব দেখিতে পায় না।

রংলাল তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া ছিল, রায়ের কোন উত্তর না পাইয়া সে আবার তাঁহার পা দুইটি চাপিয়া ধরিল। আর রায়ের সহ্য হইল না, প্রচণ্ড ক্রোধে তিনি ফাটিয়া পড়িলেন, রংলালের মুখে সজোরে লাথি মারিয়া আপনার পা ছাড়াইয়া লইলেন। সেই আঘাতে রংলালের সম্মুখের দুইটা দাঁত উপড়াইয়া গিয়া তাহার নির্বোধ মুখখানাকে রক্তাক্ত করিয়া দিল।

হেমাঙ্গিনী কিছু বলিতে সাহস করেন নাই, কিন্তু উমা করিল। বাপের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, ছি ছি ছি, এ কি করলে বাবা? সে যাই হোক, সে তো মানুষ!

রায় নীরবে ঘরের মধ্যে একা পদচারণা করিতেছিলেন, তিনি থমকাইয়া দাঁড়াইলেন, মেয়ের মুখের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন, পাপ করেছি মা। মানুষ আমি, মতিভ্রম হয়েছিল। কিন্তু রংলালের পায়ে ধরে প্রায়শ্চিত্ত তো করতে পারব না।

এ কথার উত্তরে উমা আর কিছু বলিতে পারিল না, সে যেন এতটুকু হইয়া গেল। একটা দীর্হনিঃশ্বাস ফেলিয়া রায় ডাকিলেন, তারা, তারা মা!

উমা এবার লজ্জিত হইয়া কুণ্ঠিত স্বরে বলিল, আপনি একটু বসুন বাবা, আমি বাতাস করি।

রায় হাসিলেন, কিন্তু কন্যার কথা উপেক্ষা করিলেন না, বসিলেন। বসিয়া বলিলেন, মানুষের দিন যখন শেষ হয়, তখন অমনি করেই মতিভ্রম হয়। আমাদের দিন শেষ হয়েছে মা।

উমা শিহরিয়া উঠিল, ও কি বলছেন বাবা?

মরণের কথা বলছি না মা, আমাদের সুদিনের কথা বলছি। চাষীরা সব আমাদের বিপক্ষ হয়ে কলের মালিকের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। অথচ একদিন খুন করলেও তারা আমাদের বিপক্ষে কথা বলে নি, বিচার বলে মেনে নিয়েছে।

উমা চুল করিয়া রহিল।

রায় বলিলেন, আজ একটা কথা মুখ দিয়ে বের করতে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে মা। অথচ তোর শ্বশুর-শাশুড়ীকে বলতেই হবে। তুই-ই সে কথাটা বলে দিবি মা।

কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করিয়া উমা বলিল, বলুন।

চরের সমস্ত মকদ্দমায় আমাদের হার হয়েছে মা।

উমা একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, বলব।

আমার অনেক লজ্জা মা। জেদের বশে তোর শ্বশুরদের আমি অনেক অনিষ্ট করে দিলাম। সম্পত্তি তো শুধু অহীন্দ্রের নয়, মহীন্দ্রও ফিরে আসবে। লজ্জা আমার তার কাছেই হবে বেশি। আমার ইচ্ছে কি জানিস? আমার সম্পত্তির অর্ধেক আমি অহীন্দ্রকে উপলক্ষ করে ওদের দুজনকেই দিই। অহীন্দ্রের শ্বশুর হিসাবে নয়, সুনীতির ভাই সম্বন্ধ নিয়েই দিতে চাই।

উমা বলিল, বেশ তো, বিবেচনা করে যা হয় করবেন। কিন্তু কিছুদিন যাক, নইলে ওঁরা ভাববেন, আপনি ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন।

রায় হাসিয়া বলিলেন, কিছুদিন সময় আর আমার নেই মা। আমি আর সংসারে থাকব না, আমি কাশী যেতে চাই।

উমা মৃদুস্বরে বলিল, সংসারে হারজিত তো আছেই বাবা। তার জন্যে কাশী কেন যাবেন?

হেমাঙ্গিনী আসিয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন, তার হাতে শরবতের গ্লাস। উমা আসিয়াছে- এই সুযোগে তিনি রায়কে শরবত খাওয়াইতে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছেন।

রায় বলিলেন, আজ আহ্নিকে বসে জপ ভুলে গেলাম, মায়ের রূপ ধ্যান করতে পারলাম না। শুধু বললাম, চর চর, মামলা মামলা; আর ধ্যান করলাম, ওই রংলাল আর কলওয়ালার মুখ। আর নয়, আর সংসার নয় মা, আমি মন স্থির করে ফেলেছি, আমি কাশী যাব।

হেমাঙ্গিনী বলিলেন, বেশ তাই হবে। কিন্তু সে তো আর এখুনি নয়। এখন শরবতটা খাও দেখি।

* * *

চরের মামলায় পরাজয় হইয়াছে, চরটার সাথে সকল প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ শেষ হইয়া গিয়াছে- সংবাদটা শুনিয়া সুনীতি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন। দুঃখের দীর্ঘনিঃশ্বাস। অথচ এই কামানা তিনি কিছুক্ষণ পূর্বেই শুধু নয়, চর লইয়া দ্বন্দ্ব আরম্ভ হইবার পর হইতেই অহরহ করিয়া আসিয়াছেন। বার বার তিনি মনে করিতে চেষ্টা করিলেন, ভালই হইয়াছে, ভাগ্যবিধাতা নিষ্ঠুর চক্রান্ত হইতে তাহাকে নিষ্কৃতি দিলেন। কিন্তু স্মৃতির মমতা তাঁহাকে তাহা ভাবিতে দিল না। তাঁহার মহীন্দ্র দ্বীপান্তরে গিয়াছে ওই চরের জন্য, তিনি নিজে প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়াইয়াছেন ওই চরের জন্য। সংসারের চরম দুঃখের বিনিময়ে যাহা পাওয়া যায়, তাহার এক পরম মূল্য আছে।

আজ অহরহ তাঁহার মনে পড়িতে লাগিল মহীন্দ্রকে। দিনান্তে সন্ধ্যার সময় তিনি আসিয়া বারান্দায় বসিলেন। ও-পারের চরের উপর আজ বাজনা বাজিতেছে, আনন্দোন্মত্ত মানুষের কোলাহল ভাসিয়া আসিতেছে। হিন্দুস্থানি ঢোলক বাজিতেছে, আরও অনেক বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি শোনা যাইতেছে, কলের মালিক বোধ হয় বিজয়োৎসব জুড়িয়া দিয়াছে। তিনি ছাদে গিয়া উঠিলেন, ছাদ হইতে চর, কালিন্দীর গর্ভ পরিষ্কার দেখা যায়। বাদ্যযন্ত্র ও কোলাহলের শব্দ স্পষ্ট হইয়া উঠিল।

অন্ধকার গাঢ় হইয়া আসিয়াছিল, দূরের চরের উপর আলো জ্বলিতেছে, আলোর ঘটা আজ অনেক বেশী। কালিন্দীর শুষ্ক গর্ভে বালির উপর একটা আলোর সমারোহ, মশালের আলোর মত দুই তিনটা আলো জ্বলিতেছে-রক্তাভ আলো! আলোর চারিপাশে ক্ষুদ্র একটা জনতার মধ্যস্থলে একটি দীর্ঘাঙ্গী কালো মেয়ে হাত ঘুরাইয়া, দেহ বাঁকাইয়া নানা ভঙ্গিতে নাচিতেছে।

মা!

সুনীতি চমকিয়া উঠিলেন, কে? পরক্ষণেই ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন, বউমা!

উমাই ডাকিতেছিল, সে বলিল, এই আলোয়ানখানা গায়ে দিন মা, বড় কনকনে হাওয়া দিচ্ছে।

সত্য এইবার শীতটা বেশ তীক্ষ্ণ হইয়া উঠিয়াছে। সুনীতি আলোয়ানখানি গায়ে দিয়া সস্নেহে বধূর দিকে চাহিয়া রহিলেন। উমা আজ মনে মনে লজ্জিত হইয়া ছিল, তাহার বাবা আজ সকালে যে বলিয়াছিলেন, ‘আমি জেদের বশে অনেক ক্ষতি করে দিয়েছি’, সেই কথাটা তাহার মনের মধ্যেও সংক্রামিত হইয়াছে। সে মাথা হেঁট করিল। অন্ধকারের মধ্যে সুনীতি উমার মুখ দেখিতে পাইলেন না বলিয়া কিছু বুঝিতেও পারিলেন না। সস্নেহেই তিনি প্রশ্ন করিলেন, আর কিছু বলছ বউমা?

না।-বলিয়া সে মন্থর পদক্ষেপে সিঁড়ির দরজা অতিক্রম করিয়া নীচে নামিয়া গেল। এপাশে সুনীতির সম্মুখে চক্রবর্তী-বাড়ির কাছারির প্রাঙ্গণে নারিকেল গাছগুলির মাথা, অন্ধকারের মধ্যে জটাজূটধারী তমোলোকবাসীদের মত শূন্যলোকে সভা করিয়া বসিয়া আছে। দীর্ঘ পাতাগুলির মধ্যে কি যেন গোপন কথার কানাকানি চলিতেছে। সুদীর্ঘ ঝাউগাছ দুইটা মর্মন্তুদ বেদানায় যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলিতেছে।

সুনীতির মনে পড়িয়া গেল অহীন্দ্রের কথা। বেশী দিন নয়, অল্পদিন পূর্বেই, এই ছাদে এমনি অন্ধকারে এমনি আবেষ্টনের মধ্যে অহীন্দ্র একা শুইয়া ছিল; তিনি আসিয়া তাহার কাছে বসিয়া কাতর-ভাবে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, কেন তুই দূরে চলে যাচ্ছিস, অহীন? আমরা যে তোর নাগাল পাচ্ছি নে বাবা?

তাঁহার আজিকার বিচলিত মন একেবারে অস্থির হইয়া উঠিল। অহীন্দ্র আজ পনেরো দিন পত্র দেয় নাই। পূজোর ছুটির পর সেই গিয়াছে আর আসে নাই। যে-পত্র সে লেখে, সেও যেন কেমন-কেমন, মাত্র দুই তিন ছত্র। উমা চলিয়া গেল, তাহার মন্থর গতি এখন একটা অর্থ লইয়া তাহার মনের মধ্যে জাগিয়া উঠিল। উমা শুকাইয়া গিয়াছে। তাহাকেও কি সে এমনি ভাবে পত্র লেখে? সেও কি তাঁহারই মত তাহার নাগাল পায় না? দ্রুত ছাদের সিঁড়ির মুখে আসিয়া তিনি ডাকিলেন, বউমা!বউমা! উমা!

মা!

উমা আবার আসিয়া তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইল।

অহীন তো তোমাকে পত্র দেয় নি বউমা!

উমা নীরবে নতমুখে দাঁড়াইয়া রহিল।

অহীন কেন এমন হল? আমার মন যেন কেমন হাঁপিয়ে উঠেছে।

আজ সমস্ত দিনটা উমার মনও বিচলিত হইয়া ছিল, সে আর থাকিতে পারিল না। কাঁদিয়া ফেলিল, অন্ধকারের মধ্যে কম্পনত্রস্ত দেহ দেখিয়া উমার কান্না সুনীতি অনুমান করিলেন, বধূর মুখে হাত দিয়া তিনি চমকাইয়া উঠিলেন, বলিলেন, কাঁদছ কেন বউমা? কি হয়েছে মা? আমাকে বলবে না?

উমা আর গোপন করিতে পারিল না; নূতন যুগের মেয়ে সে, আধুনিক শিক্ষাদিক্ষার সহিত পরিচয়ের ফলে অহীন্দ্রের যে-কথা সে স্বীকার করিয়া লইয়াছে, কঠিন উদ্বেগ আশঙ্কা সহ্য করিয়াও এতদিন গোপন রাখিয়াছিল, আজিকার এই বিচলিত চরম মুহূর্তটিতে অহীন্দ্রের মায়ের কাছে তাহা প্রকাশ করিয়া ফেলিল। সবটা সে জানিত না, যতটুকু জানিত ধীরে ধীরে ততটুকুই বলিল।

সুনীতির সর্বাঙ্গ থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল, সমস্ত ব্যাপারটা না বুঝিলেও তাহা যে ভয়ঙ্কর কিছু ইহা অনুভব করিলেন; ব্যাকুল আশঙ্কায় অধীর হইয়া তিনি প্রশ্ন করিলেন, এরা কি চায় মা?

ঠিক তো জানি না মা। তবে মনে হয়, এরা চায়, মানুষের সঙ্গে মানুষের কোন ভেদ থাকবে না; জমি ধন সব সামানভবে ভাগ করে নেবে। সেইজন্য তারা বিপ্লব করে এ-রাজত্ব উলটে দিতে চায়। সে আবার কাঁদিয়া ফেলিল।

সুনীতির মনে পড়িল, অহীন্দ্র তাহাকে ইঙ্গিতে বলিয়াছিল, তিনি তাহা বুঝিতে পারেন নাই। তিনি স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পর উমা বলিল- সে আজ আর কথাগুলি গোপন করিয়া রাখিতে পারিতেছে না-বলিল, সাঁওতালদের চরের জমি কেড়ে নেওয়ার পর তারা একদিন ভোর-রাত্রে চর থেকে উঠে চলে গেল; তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলেন। সেদিন আমায় বলেছিলেন, এ-পাপ আমাদের পাপ। পুরুষ পুরুষ ধরে এই পাপ আমাদের জমা হয়ে আসছে, কলের মালিক একা এর জন্য দায়ী নয়। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমাকে করতে হবে। আমি সেদিন বুঝতে পারি নি মা। আবার পূজোর সময় আমি বুঝতে পারলাম; সুটকেস খুলে কাপড় গোছতে গিয়ে, কখানা চিঠি থেকে বুঝতে পারলাম। আর সে বলিতে পারিল না, অনর্গল ধারায় চোখের জল তাহার মুখ ভাসাইয়া ঝরিতে আরম্ভ করিল।

অনেকক্ষণ পর সুনীতি বলিলেন, চল, বউমা, দাদার কাছে যাই। তিনি ভিন্ন আর কে উপায় করবেন?

উমা অতিমাত্রায় ব্যাগ্র হইয়া কাতরভাবে বলিয়া উঠিল না, না মা। তাতে তাঁকে বিশ্বাসঘাতক হতে হবে, সমস্ত দল ধরা পড়ে যাবে মা। না না।

সুনীতি পাথর হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। উমাও নীরব।

ও-পারের চরে বাজনার শব্দ উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খলতায় উচ্চ হইয়া উঠিয়াছে। নদীর চরের উপর লাল আলোর মধ্যে সেই দীর্ঘাঙ্গী কালো মেয়েটা উন্মত্ত আনন্দে যেন তাণ্ডবনৃত্য করিতেছে। লম্বা ফালি সর্বনাশা চরটা যেন ঐ দীর্ঘাঙ্গী কালো মেয়েটার রূপ ধরিয়া সর্বনাশীর মত নাচিতেছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *