আলিয়া – ৫

অল রাইজ।

কেসের সঙ্গে যুক্ত বা কেস দেখতে আসা সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

ডভ লেভিন, ডালিয়া ডরনার আর জি তাল তিনজন জাজ কোর্ট রুমে প্রবেশ করে তাদের চেয়ারে বসেন। সামনে বিরাট কাঠের টেবিল, তাতে নানা কাগজ, ফাইলপত্র, আর তিনটে মাইক্রোফোন।

মারকো ডেমিয়ানুকের কেসটা আজ থেকে জেরুসালেম ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে শুরু হয়েছে। ওহিও থেকে এসেছে জন। নাতালিয়া, জনের স্ত্রী সোফি আর বাচ্চাদের নিয়ে বাড়িতেই আছেন। আর কলকাতা থেকে এসেছে অনিন্দ্য আলিয়া।

কথা ছিল হানিমুনে সাউথ ইন্ডিয়া যাবে। আলিয়াই ঠিক করেছিল। দক্ষিণ ভারতের মন্দির দর্শনের শখ অনেকদিনের। বিয়ের আগেই টিকিট কেটে, হোটেল বুক করে সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল দুজনে। কিন্তু এখন সবকিছু বাদ দিয়ে তাকে বাবার পাশে থাকতেই হবে। সুনীতি এক কথায় বউমার সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও সুষমা দোনামোনা করেন।

যাওয়া উচিত হবে? খুন টুন কীসব উনি করেছেন শুনছি। ওরাও যদি এসবে ফেঁসে যায়?

তোমার বাবার সঙ্গে এসব হলে তুমি যেতে না? সুনীতি বিরক্ত হন।

থামো দিকিনি! আমার বাবা জীবনে একটা পিঁপড়েও মারেনি।

আলিয়ারও একই বক্তব্য, ওর বাবার সম্বন্ধে।

সুষমা পান সাজা থামিয়ে বলেন, তুমি কী ভাবছ? আমি বউমার বিরুদ্ধে?

বিরুদ্ধে বাড়ির কেউ নয়, তবে এক তো নাৎসি অত্যাচারী বলে মারকো চিহ্নিত তারপর ইজরায়েলে ট্রায়াল। মুখে প্রকাশ না করলেও সবার মনেই নানা কুচিন্তা উঁকি মারে। এদিকে কাগজে খবরটা বেরিয়ে যেতে এখন সবাই জানে। হামেশাই আত্মীয় বন্ধুদের ফোন আসছে। পাড়ার লোকেরাও উৎসুক কী হল জানতে। তাই অনিন্দ্য জেরুসালেম যাওয়ার ব্যবস্থা করে সবাইকে জানাতে বাড়ির লোকেরা আরও চুপসে যায়।

কী হবে গো? এখানকার বাস উঠবে নাকি?

অনিমা ক্রুশ বোনা থামিয়ে শিবাজীর দিকে তাকান।

শিবাজীর মনে একই কথা চলছে। পাড়া, প্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধব কেউ না কেউ জিগ্যেস করতেই থাকে মারকোর কথা।

জানি না, দেখো কী হয়।

আলিয়া স্যুটকেস লক করে খাট থেকে নামিয়ে বলে, আমি জানি অনি, তোমার বাড়ির কেউ আমাদের যাওয়াটা মন থেকে মেনে নিতে পারছে না, বাট আই হ্যাভ টু গো।

আমি আছি তো তোমার সঙ্গে। আর কাউকে দরকার?

দাদা—, অম্লান দরজায় এসে দাঁড়ায়, আমিও যেতে পারি। এই সময় বাড়ির একজন তোদের সঙ্গে থাকলে…

জন অলরেডি চলে গেছে। তুই বললি এই অনেক।

কেস শুরু হওয়ার পনেরো দিন আগেই জেরুসালেম পৌঁছে জন উকিল খুঁজতে শুরু করে। পেয়ে যায় শেফটেলকে। জন্মসূত্রে সে ইহুদি হলেও কেসটা নেয় এবং আগেই বলে দেয়—এটা একটা একশ শতাংশ ফলস কেস!

কী করে বুঝলেন?

কে জি বি আপনার বাবাকে ফাঁসানোর জন্য ছক কষেছে। এ কেসের কোনো মেরিট নেই।

শেফটেল প্রথম থেকেই ভীষণ কনফিডেন্ট কেসটা নিয়ে।

মারকোর জবানবন্দি সবশেষে নেওয়া হবে। তার মধ্যেই আমি এমন কেস সাজাব যে ধোপে টিকবে না।

একজন ইহুদি হয়ে ইহুদি-অত্যাচারীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে বলে রাতারাতি সমাজ এবং মিডিয়ার চোখে শেফটেল খলনায়ক হয়ে ওঠে।

শুনলাম আপনি শয়তানটাকে ডিফেন্ড করছেন? এক প্রতিবেশী শেফটেলের ওপর খেঁকিয়ে বলে ওঠে, টাকা আর নামের জন্য ইহুদিদের সম্মানটাও জলাঞ্জলি দিলেন?

শেফটেল কিছু বলতে গিয়েও বলেন না। হাজার হাজার মুখ বন্ধ হবে একমাত্র কেসের রায় শুনে, এই তার ধারণা। কিন্তু যেটা ধারণা ছিল না, সেটা হচ্ছে দেখে শেফটেল বেশ অবাক। এই প্রথম ইজরায়েলি কোর্টে কোনো কেস সরাসরি টিভিতে সম্প্রচারের অনুমতি পেয়েছে। তাই কোর্টরুমে এক ঝাঁক ক্যামেরা তাক করে সকাল থেকে বিভিন্ন চ্যানেল উপস্থিত।

এসব কী? ওরা তো সারাক্ষণ আমাদের ফোকাস করে আছে! কোর্টে ঢোকার সময় আলিয়া গলা নামিয়ে শেফটেলকে জিগ্যেস করে।

উপায় নেই, সহ্য করতে হবে। কিপ আ স্ট্রেট ফেস, কারোকে কোনো ইন্টারভিউ দেবেন না।

গোল্ড হোটেলে জন আর আলিয়ারা উঠেছে। সেখান থেকে ট্যাক্সিতে কোর্ট পনেরো মিনিটের পথ। আসার সময় কেউ কারোর সঙ্গে একটাও কথা বলেনি। আলিয়া শুধু ভেবেছে কতক্ষণে বাবাকে দেখবে। এসে থেকে ছটফট করছে কিন্তু একেবারে ট্রায়ালের দিন ছাড়া দেখা হবে না, এটাই নিয়ম।

জাজেরা বসতেই কোর্টরুমের বাঁ-দিকের দরজা ঠেলে দুজন পুলিশ মারকোর হ্যান্ডকাফ খুলিয়ে কাঠগড়ায় নিয়ে এসে বসায়। কাঠের চেয়ার, ডেস্ক আর তার ওপর রাখা আছে একটা মাইক্রোফোন। বাবাকে এভাবে দেখে আলিয়ার বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে, অনিন্দ্যর হাত ধরে কেঁদে ফেলে সে। মারকো ওদের দিকে তাকিয়ে হাসেন, বোঝান তিনি ঠিক আছেন।

সরকার পক্ষের উকিল মাইকেল ব্ল্যাটম্যানকে কেস শুরু করতে হুকুম দেন ডভ। সঙ্গের অ্যাটর্নিদের থেকে কিছু কাগজ জাজেদের কাছে পেশ করে তিনি শুরু করেন।

ইয়োর অনার, মারকো ডেমিয়ানুক তার আসল পরিচয় গোপন করে দীর্ঘ বছর আমেরিকার ওহিওতে লুকিয়ে ছিলেন। উনি আসলে ট্রেবলিঙ্কা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বার অপারেটার ছিলেন এবং ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ এই দু’বছরে কমপক্ষে ৫ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছেন।

কোর্টে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়। আলিয়াদের আশেপাশে বসে থাকা কিছু প্রবীণ ইহুদি নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলেন, অনিন্দ্যরা বোঝে না। তবে এটুকু আন্দাজ করা যায় মারকোকে নিয়েই মন্তব্য করছেন তারা।

আমাদের এই দাবি একেবারেই মিথ্যে নয় ইয়োর অনার। যথেষ্ট প্রমাণ নিয়েই আমরা নেমেছি।

যেমন?

যেমন এই মুহূর্তে আমি আপনাকে দেখাতে পারি ট্রেবলিঙ্কা ক্যাম্পের একটা আইডি কার্ড। এই বলে মাইকেল একটা কার্ডের ছবি পেশকারের হাতে দেন।

ভালো করে দেখুন। মারকোর কম বয়েসের ছবি, কিন্তু নাম আলাদা। লেখা আছে ইভান। আমি হলফ করতে বলতে পারি মারকো আর কেউ নয়, ট্রেবলিঙ্কা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ‘ইভান দ্য টেরিবল’।

কোর্টে আবারও জোর গুঞ্জন ওঠে। জাজের কড়া ধমকে সবাই চুপ করে যায়। ক্যামেরাগুলো মারকোর দিকে তাক করলে দেখা যায় তিনি নির্বিকার হয়ে বসে আছেন। ভয় বা আশঙ্কার লেশমাত্র নেই চোখে মুখে। ডভ, ডালিয়া আর জি এক এক করে কার্ড দেখে মারকোর দিকে তাকান।

এ ছাড়া আমাদের কাছে আছেন ট্রেবলিঙ্কা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সেইসব সারভাইভারেরা, যারা যে-কোনো সময়ে সাক্ষ্য দিতে পারেন ইভান, আই মিন মারকোকে আইডেন্টিফাই করতে।

এমন কতজন সাক্ষী আছে?

পাঁচজন।

ডিফেন্স, আপনার টার্ন।

শেফটেল চেয়ার ছেড়ে ওঠেন।

কার্ডটা আমায় কি একবার দেখানো যেতে পারে?

পেশকার হাতে দিলে শেফটেল উল্টে পাল্টে দেখেন।

এর একটা কপি আমি চাই। আর আমার কোনো প্রশ্ন নেই।

পরবর্তী ডেট দিয়ে জাজেরা উঠে গেলে মারকোকে আবার পেছনের দরজা দিয়ে ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

.

আলিয়া, জন, অনিন্দ্য বাইরে বেরিয়ে কোর্ট চত্বরে অপেক্ষা করছিল।

আর ইউ ওকে নাও? অনিন্দ্য আলিয়াকে জিগ্যেস করে।

লিটল। বাবাকে দেখার পর আমি একটু বেটার। বাট…

হি উইল কাম আউট ক্লিন…। শেফটেল তার দলকে বিদায় জানিয়ে ওদের কাছে আসেন। ছবিটা জাল করা হয়েছে সেটা প্রমাণ হয়ে যাবে। দ্যাট আইডি কার্ড ইজ ফেক।

হাও উইল ইউ প্রুভ দ্যাট?

শেফটেল হাসেন, আছে নিশ্চয় কোনো রাস্তা, না-হলে আশ্বাস দিচ্ছি কেন?

কথা বলতে বলতে ওরা পার্কিং লটে চলে আসে। শেফটেল নিজের গাড়ি আনলক করে বলেন, আপনারা হোটেলে ফিরে যান, টেক রেস্ট। আমি রাতে কল করছি।

কোর্ট থেকে গাড়ি বার করে শেফটেল বাড়ির দিকে রওনা হন। মনটা আজ ফুরফুরে। বেশিদিন এ কেস চলবে না, সহজেই মারকোকে জিতিয়ে দিতে পারবেন। বাঁ-হাতের কবজি উল্টে ঘড়ি দেখেন একবার।

বাড়ি ঢোকার আগে একটা বিয়ার খেয়ে গেলে কেমন হয়?

নিজেকেই কথাটা বলে শেফটেল স্টিরিও সাউন্ড বাড়িয়ে দেন। বেন ইয়েহুদা স্ট্রিটে বাঁক নিয়ে ‘হ্যাচ’ নামক একটা পাবের সামনে গাড়ি পার্ক করে এক পা এগোতেই তার মনে হয়, কেউ একজন তাড়াহুড়ো করে ডানদিক থেকে এগিয়ে আসছে।

শেফটেল পাবের দরজার কাছাকাছি পৌঁছে ডোরনব ঘোরাতে যাবেন, এমন সময় একটা কাচের বোতল থেকে কিছু একটা ওর দিকে ছুড়ে একজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। জলের মতো জিনিসটা মুখে এসে পড়ার আগে শেফটেলের সিক্সথ সেন্স বলে, ‘অ্যাসিড নয় তো’?

আর তখনই মুখটা দু-হাত দিয়ে ঢেকে ফেলেন তিনি। ছলাৎ করে হাতের ওপর অ্যাসিড পড়াতে মুহূর্তে আঙুলগুলো ভয়ঙ্কর জ্বলতে শুরু করে। আর্ত চিৎকার করে শেফটেল মাটিতে বসে পড়েন। আর তখন দূর থেকে শোনা যায়, ট্রেটার! দেখি, এবার তুই কী করে ইভান দ্য টেরিবলকে বাঁচাস?

.

কে ডেকেছে?

ইয়াসিন ভাই।

সইফ লাফিয়ে ওঠে, চোখে মুখে বিস্ময়।

কী বলছিস শাহিদ! সচ মে?

শাহিদ বিশ্বজয়ের হাসি হেসে সইফের কাঁধে হাত রাখে।

ভাই বলেছে আজ রাতে ওর বাড়ি যেতে, মিটিং আছে।

তোকে চিনল কী করে?

ভাই সবাইকে চেনে। শ্রীনগরে ক’টা পণ্ডিত পরিবার আছে, তাদের কী নাম সব জানে। কাঁপে সব ভাইকে দেখে।

সইফের ঘোর কাটে না তখনও। ও ভাবতেই পারছে না কেএলএফ-এর ইয়াসিন মালিকের সঙ্গে ওর ছোটবেলার বন্ধু দেখা করতে যাবে। খুব ইচ্ছে করে বলতে, যে ও সঙ্গে যাবে কিন্তু বাবার মুখটা মনে পড়ায় পারে না। সইফ আলিয়ার বাবা আমির বেগ কড়া ধাতের লোক। আজে বাজে কথা কানে তোলে না, কাউকে বেশি পাত্তাও দেয় না। একটাই ইচ্ছে, সইফকে জে কে পুলিশে ভর্তি করার।

সারাদিন আওয়ারা গর্দি করে ঘুরে না বেড়িয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব।

বাবার ভয়ে মুখ খোলে না সইফ। কিন্তু তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই পুলিশ হওয়ার। ওর যে কী ইচ্ছে সেটাই ও ওর পনেরো বছরের জীবনে এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। আমির বেগ ক্লাস ফাইভ অবধি পড়ে অর্থাভাবে আর এগোতে পারেনি। তাই সে চায় ছেলেমেয়ে দুজনেই পড়ুক, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক।

পণ্ডিতদের ছেলেমেয়েদের দেখে শেখ সইফ, লেখাপড়ায় সবাই কত ভালো। মেহনত করে ফল পায়। তোর না আছে মেহনত না পাস ফল। সব জিরো।

আমির শাল আর ফেরান আলাদা করে রেখে সইফের দিকে তাকায়, ভালো কথা। শুনলাম তুই নাকি শ্রীধরজির কাছে গান শেখা বন্ধ করে দিয়েছিস?

চোখ নামিয়ে নেয় সইফ। সেদিনের সেই ঘটনার পর যাবে বলে পা বাড়িয়েও শাহিদের কথা মনে পড়ায় যেতে পারেনি।

কী হল? যাস না কেন? তুই জানিস উনি কত বড় গুণী মানুষ? আরে বেটা কিছু তো শেখ জীবনে।

আমি গান শিখে কী করব আব্বা?

তাহলে কী শিখবি? বলেছিলাম মহেন্দ্রর কাছে অঙ্ক নিয়ে বসতে, বসেছিস?

ঠিক সেই সময় শাহিদ গেট থেকে হাঁক পাড়ে। ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে সইফ পালিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

.

কীরে কী ভাবছিস?

না। কিছু না। সইফ ব্যাট নিয়ে এক পা এগোয়, বাড়ি যাই। ছ’টা বাজে। পড়তে না বসলে বাবা বকবে।

তুই এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি।

মোটেই না! আমি এখন সিগারেট খাই।

বাচ্চা তুই সইফ! শাহিদ হাসে।

বাচ্চা শুনলেই সইফের মাথা গরম হয়ে যায়। শাহিদ, বচ্চা মত বোল।

তো ফির কুছ করকে দিখা—শাহিদ চ্যালেঞ্জ ছোড়ে।

ঠিক হ্যায়। আজ রাতে তোর সঙ্গে ইয়াসিন ভাইয়ের বাড়ি যাব।

কথাটা শুনে শাহিদ অবাক। তুই? বাবাকে কী বলবি?

লুকিয়ে বেরিয়ে আসব। তুই বাইক নিয়ে রেডি থাখিস।

.

ডাল লেকের পেছনে অঙ্ক টিউশান সেরে মহেন্দ্র বই, খাতা, পেন কাঁধের ঝোলায় ভরে সাইকেল বার করতে গিয়ে দেখে দুটো চাকাতেই হাওয়া নেই।

আশ্চর্য! একসঙ্গে দুটো চাকার হাওয়া বেরিয়ে গেল কী করে?

সন্ধে হয়ে গেছে। এই সময় এদিকে সাইকেল সারাইয়ের দোকান খোলা থাকবে না। অগত্যা সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে হাঁটতে থাকে সে। এখান থেকে করণ নগর ৬ কিলোমিটার। পৌঁছতে এক ঘণ্টারও বেশি, ভাবলেই বিরক্ত লাগে। ঠিক করেছিল ফেরার সময় পাশের পাড়ার অনিলকে একটা থিওরেম শিখিয়ে আসবে। ছেলেটার মাথা আছে তাই মহেন্দ্রর ওর পেছনে খাটতেও ইচ্ছে করে। যারা অমনোযোগী তাদের পড়াতে একদম ভালো লাগে না। যেমন পাশের বাড়ির রাজু। ক’দিন আগে ১১ গুণ শূন্য ১১ লিখে এসেছে।

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে এগোতে গিয়ে রাস্তাঘাট একটু বেশি ফাঁকা লাগে মহেন্দ্রর। চেনা শহরটা রোজ একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। চারিদিকে সবুজ রঙের আধিক্য বাড়ছে, পড়শি দেশের দেখাদেখি। আনাচে-কানাচে মনে হয় অজানা ভয় ওত পেতে রয়েছে। কী যে চলছে তলে তলে বোঝা দায়। ক’দিন আগে বাড়ির বাইরে নোটিশ পড়েছে—‘যানে কি তৈয়ারি করো।’ মসজিদগুলো দেখলে আগে যেমন ভক্তি হত এখন ভয় হয়। সব সময় জমায়েত চলছে, মিটিং হচ্ছে।

কী মাস্টার? বাড়ি ফিরছ?

দুজন ছেলে মহেন্দ্রর সামনে আসে। অন্ধকারে মুখগুলো বুঝতে পারে না।

কী হল, জবাব নেই কেন?

কে বলুন তো? চিনতে পারছি না।

আমরা তোমায় চিনি।

আপনারা বোধহয় ভুল করছেন কারোর সঙ্গে। মহেন্দ্র সাইকেল নিয়ে আবার হাঁটতে থাকে।

একটা ছেলে ওর পথ আটকায়, ভুল করিনি। বাড়ির বাইরের লিফলেটটা ছিঁড়ে ফেললি কেন?

মহেন্দ্র এবার ঘুরে দাঁড়ায়। আজে বাজে কথা লেখা ছিল তাই।

আজেও না বাজেও না। সত্যি কথা লেখা ছিল।

বলেই ছেলেটি একটা ছুরি বের করে মহেন্দ্রর গলায় ধরে।

কবে যাবি বল?

ঘটনার আকস্মিতায় মহেন্দ্রর গলা থেকে আওয়াজ বেরোয় না, হাত থেকে সাইকেলটা পড়ে যায়।

বল! ছেলেটি এবার ছুরিটা একদম নলির কাছে চেপে ধরে।

তবে সবাই যাস না। বোনটাকে রেখে যাস, আমাদের কাজে লাগবে।

কথাটা শুনে মহেন্দ্রর মাথায় আগুন জ্বলে যায়। উত্তর দিতে যাবে সেই সময় দূর থেকে একটা পুলিশ ভ্যানের আলো দেখা যায়। সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা পকেটে ঢুকিয়ে নেয় ছেলেটা।

লাস্ট ওয়ার্নিং দে দিয়া। ইসকে বাদ, সিধা উপর।

ছেলেদুটো যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে হন হন করে হেঁটে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

.

আও ভাই আও—। ইয়াসিনের লোক দরজা খুলে শাহিদকে ভেতরে ডাকে।

সঙ্গে কে?

আমার বন্ধু, জিগর হ্যায় মেরা।

শাহিদ সইফকে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে।

একতলার ছোট ঘর পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় এসে দেখে একটা বড় ঘরের ঠিক মাঝখানে ইয়াসিন বসে আছে। তাকে ঘিরে তার চামচা ছাড়াও শাহিদদের মতো কিছু নতুন মুখ আছে।

ভাইজান, এসে গেছে। সঙ্গের লোকটি শাহিদকে এগিয়ে দেয়।

ইয়াসিন উঠে দাঁড়িয়ে আলিঙ্গন করে। এসব দেখে সইফের শিহরন জাগে। তার বন্ধু না জানি কত বড় একজন মানুষ বনে গেছে যে ইয়াসিনের মতো ভগবানতুল্য লোক তাকে জড়িয়ে ধরছে।

সাথ মে দোস্ত হ্যায়?

জী জনাব।

ভালো করেছ এনে। তোমাদের মতো তাজা খুন না-হলে কাশ্মীর আজাদ হবে কী করে?

বলে সে সইফের দিকে হাত বাড়ায়। তার হাত ধরে যে ছেলেটা ধন্য হয়ে গেছে ইয়াসিন বোঝে। ওদের বসিয়ে চা সার্ভ করতে বলে। দলের একটা ছেলে চায়ের ট্রে নিয়ে এসে সবার সামনে ধরে।

তোমার জন্য আমরা সবাই অপেক্ষা করছিলাম শাহিদ।

একটা কাপ তুলে নেয় ইয়াসিন। দেখলাম পণ্ডিতদের তাড়াতে গেলে এইসব লিফলেট টিফলেট দিয়ে চলবে না। কুছ জবরদস্ত করনা হোগা যাতে ওরা আমাদের সিরিয়াসলি নিতে শুরু করে।

আজকেও দুজন ফেইল করেছে। পুলিশের গাড়ি এসে যাওয়ায়…। দলের একজন বলে।

ইয়াসিন মাথা নাড়ে, পতা হ্যায়।

কী করবেন ভাইজান? শাহিদ সাহস করে জিগ্যেস করে।

এটা তুমি করবে। তোমার চেনা লোক তাই তোমাকেই করতে হবে।

শাহিদ আর সইফ একে অপরের দিকে তাকায়।

শ্রীধর পণ্ডিত মেয়ে তারাকে স্কুল ফেরতা হাপিস করতে হবে।

সইফ আঁতকে ওঠে, কিঁউ?

ডর গয়া তু? বচ্চা হ্যায় অভি! ইয়াসিন হ্যা হ্যা করে হাসে।

নিজেকে সামলে সইফ বলে, না না, ভয় পাব কেন? জানতে চাইছি কেন হাপিস করতে হবে?

কার্পেটের ওপর দু-পা ছড়িয়ে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে ইয়াসিন বলে, উসকো তারা সে তসলিমা বনানা হ্যায়।

.

মানুষ বাস না করলে বন্ধ ঘর গুমোট হয়ে থাকে, ভ্যাপসা গন্ধ বেরোয়। যদিও প্রত্যেক দিন ঝাঁট মোছা করা হয় তাও ছেলের ঘরে ঢুকে সুষমার মনে হয় বাড়ির এক কোনায় যেন ঘরটা প্রাণহীন হয়ে পড়ে আছে।

বসু বাড়ির দোতলার এ ঘরটা আগে দু-ভাই ভাগ করে নিলেও বিয়ের পর অম্লানকে চলে যেতে হয়েছে ছাদের ঘরে। তাতে সে বেজায় খুশি। মা, বাবা, বাড়ির সবার নজর থেকে মুক্ত। ইচ্ছেমতো গিটার নিয়ে বসে যায়, গান বাঁধে। রাত বারোটা একটা অবধি চলে এই পাগলামি।

অনিন্দ্য সব সময় খুব ডিসিপ্লিন্‌ড। যাদবপুর থেকে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পাস করেই বড় চাকরিতে ঢুকে কাজের জায়গায় যেমন সুনাম কুড়িয়েছে তেমন বাড়িতেও সবাইকে নিয়ে চলতে শিখেছে, সুষমার মতো। ছেলেকে ছোট থেকে সব কাজ শিখিয়েছেন সুষমা। দোকান বাজার করা, বাসন মাজা, ঘরদোর ঝাড়া মোছা, টুকটাক রান্না করা যাতে বড় হয়ে একা থাকলে কোনোদিন সমস্যায় পড়তে না হয়।

তাই ওরা চলে যাওয়ার পর আজ ঘরে ঢুকে একটুও অবাক লাগে না। বউভাতের ক’দিনের মধ্যেই হুড়োহুড়ি করে ইজরায়েল ছুটতে হলেও সুষমা জানতেন অনি এভাবেই পরিপাটি করে যাবে। দক্ষিণ দিকের খড়খড়ির জানলাটা খুলে গরাদ ধরে দাঁড়ান সুষমা। প্রায় মাস ঘুরতে চলল, কিন্তু এখনো সেইভাবে কোনো ভালো খবর এল না। এখানকার কাগজে বেয়াইকে নিয়ে আর এক কলম লেখাও বেরোয়নি, শুধু লিখেছিল কেস চলছে। কতদিন চলবে, কবে ওরা বাড়ি ফিরবে? খোঁজ খবর না নিয়ে কি সত্যি বিয়ে দেওয়াটা ভুল হয়ে গেল? কথাটা ভেবে মনে মনে হাসেন সুষমা। দিলাম কোথায়? সে তো নিজেই ঠিক করে আনল। জানি না ছোটটা আবার কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে!

দিদি, গুনোর দোকান থেকে মাসকাবারি এসেছে। একবার দেখে নেবে?

দরজা থেকে কথাগুলো বলে চলে যেতে গিয়ে অনিমা দাঁড়িয়ে পড়েন।

দিদি! কী হয়েছে?

জায়ের দিকে না ঘুরেই সুষমা মাথা নাড়েন। অনিমা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন।

অনিদের কথা ভাবছ? আমারও সর্বক্ষণ মনে হয়। মেয়েটা বিয়ে হয়ে এসে থিতু হওয়ার আগেই…কী যে হল, কেন হল! কপাল ছাড়া আর কী বলি বলো?

থমথমে মুখে সুষমা বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

উত্তর না পেয়ে অনিমা স্বান্ত্বনা দিয়ে বলেন, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে, চিন্তা কোরো না।

.

সত্যি কি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে মারকো?

ঘুম থেকে উঠে আর ঘুমোতে যাওয়া অবধি এই একটা প্রশ্ন রোজ নাতালিয়াকে কুরে কুরে খায়। সকালের চা শেষ করে বাগানে ‘বুকেই’ গাছের সামনে এসে দাঁড়াতে মনে পড়ে বাড়িটা কেনার পর প্রথম অ্যানিভারসারিতে দুজনে এই গাছটা পুঁতেছিল।

আমরা যখন থাকব না, এই সাদা ফুলগুলো তুমি আর আমি হয়ে বাগান আলো করে থাকবে! নাতালিয়া মারকোর গালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন।

মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। সত্তরের ঘরে পা রাখা মারকোর শরীর আগের মতো ভালো নেই। মোটা হয়ে যাওয়ায় সুগার, কোলেস্টেরল বাসা বেঁধেছে শরীরে। এয়ারপোর্ট থেকে ওভাবে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় নাতালিয়া বোবার মতো শুধু দেখেছেন, মুখ থেকে একটা শব্দও বেরোয়নি। কত অসহায় লাগছিল মারকোকে! বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন তাকে ভুল করে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাত বাড়িয়ে নাতালিয়ার হাত ধরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু তিনি স্থানুর মতো এক জায়গায় আটকে গিয়েছিলেন।

একই অবস্থা এই এক মাসে আলিয়ারও হয়েছে। কাঠগড়ায় বসা বাবার দিকে সরকারি উকিল যখন যা নয় তাই বলে যায়, সেও বেঞ্চ থেকে নড়তে পারে না। কেসের সময় ওভার হয়ে যাওয়ার পরেও। হোটেলে ফিরে অনিন্দ্য তাকে এক মুহূর্ত কাছছাড়া করে না। খেতে না চাইলে জোর করে খাইয়ে দেয়, রাতে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়ায়। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই কোর্টের মুহূর্তগুলো যেই ভেসে ওঠে, আলিয়া ধড়মড় করে উঠে বসে। অনিন্দ্য তাকে আবার বাচ্চাদের মতো শান্ত করে শুইয়ে দেয়। পাশের রুমে জনেরও একই অবস্থা। রাতে একটা ড্রিঙ্ক নিয়ে খানিক্ষণ সোফির সঙ্গে কথা বলার পর রোজ শেফটেলকে ফোন করে।

কেমন আছেন এখন?

মাচ বেটার। সেদিন পাবের লোকেরা সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা জল দিয়ে আমার হাত ধুইয়ে না দিলে হয়তো সারা জীবনের মতো অক্ষম হয়ে যেতাম।

থ্যাঙ্ক গড আপনি চোখদুটো বাঁচিয়েছিলেন।

রিফ্লেক্সে হয়ে গেছে। যাইহোক। কাল প্রথম উইটনেস। আমি ভয় দেখাচ্ছি না বাট বি স্ট্রং।

শেফটেল, এতদিন তো আপনি বলছিলেন…

এখনও বলছি আমরাই জিতব। কিন্তু উইটনেস অনেক কিছু বলতে পারে। পাবলিক সিম্প্যাথি তার দিকে থাকবে স্বাভাবিক। বাবার নামে অনেক কিছু শুনবেন, ভেঙে পড়বেন না।

.

পিনহাস এপস্টেন।

নাম ডাকতেই সাদা জামা ধূসর প্যান্ট পরা এক মাঝবয়সি লোক উইটনেস বক্সে এসে বসে।

আই হোপ, আপনি জানেন আজ যা বলবেন সেটা মারকো ডেমিয়ানুকের বিরুদ্ধে চার্জ হিসেবে কোর্ট বিচার করবে—জাজ ডালিয়া জিগ্যেস করেন।

আজ্ঞে হ্যাঁ।

মাইকেল উঠে দাঁড়ান।

মিস্টার এপস্টেন আপনি ওরিজিনালি কোথাকার?

পোল্যান্ডের ওয়ারশও।

সেখানে জন্ম থেকেই থাকতেন?

ইয়েস।

আপনাকে যখন নাৎসিরা গ্রেফতার করে তখন আপনার পরিবারে কারা ছিলেন?

আমার বাবা, মা, ভাই।

গ্রেফতারের পর আপনাদের কোথায় আনা হয়েছিল?

ট্রেবলিঙ্কা ক্যাম্পে।

একটু ডিটেলস জানতে চায় কোর্ট।

আমাদের বাড়িতে যখন নাৎসি আসে তখন বলা হয় আধঘণ্টার মধ্যে চারটে স্যুটকেসে দরকারি জিনিসপত্র ভরে ওদের সঙ্গে যেতে হবে। আমার বাবাকে ধাক্কা মারতে মারতে তারা বাড়ি থেকে বার করে, আই রিমেম্বার।

কেন?

দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে। তারপর হাজার হাজার লোকের সঙ্গে আমাদের নিয়ে আসা হয় ট্রেবলিঙ্কা ক্যাম্পে। সেখানে পৌঁছে ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা করে দেওয়া হয়। সেই শেষবার আমি আমার মাকে দেখি।

এতদিন পরে মায়ের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তার।

ক্যাম্পে বৃদ্ধ এবং অসুস্থ লোকেদের আগে সরিয়ে ফেলা হত। মায়ের শরীর ভালো ছিল না। প্রথমদিনই তাকে মেরে ফেলা হয়।

কী ভাবে মেরে ফেলা হয়?

একসঙ্গে মায়ের মতো অসুস্থ যারা ছিলেন, তাদের দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়েছিল।

আলিয়া অবাক হয়ে শুনতে থাকে, অনিন্দ্যও।

ট্রেবলিঙ্কাতে গ্যাস চেম্বার ছিল?

অফ কোর্স। সেখানেও রোজ শয়ে শয়ে লোককে মারা হত। অন্যভাবেও মরত অনেকে। যারা ক্যাম্প থেকে পালাবার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ত তাদের অন স্পট গুলি করা হত।

ক্যাম্পে শুনেছি নানা কাজ দেওয়া হত প্রিজনারদের। আপনার সেরকম কিছু বাঁধা-ধরা কাজ ছিল?

ছিল। গ্যাস চেম্বারে থেকে মৃতদেহ বার করে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া।

আলিয়াদের সঙ্গে বসে থাকা ইহুদিরা সবাই আঁতকে ওঠে।

আপনার তখন বয়স কত?

এগারো।

মাই গুডনেস! তো আপনি যখন গ্যাস চেম্বারে যেতেন বডি বার করতে তখন এমন কাউকে দেখেছেন যে আজ এখানে আছে?

আই ক্যান নেভার ফরগেট দ্যাট ম্যান, দ্য মেইন অপারেটর। ইভান। ওকে ‘ইভান দ্য টেরিবল’ বলা হত কারণ রোজ মানুষ মেরে ও এক পৈশাচিক আনন্দ পেত।

আই রিপিট, সেই ইভানকে এখানে আপনি দেখতে পাচ্ছেন?

আই অবজেক্ট! শেফটেল উঠে দাঁড়ান, হি ইজ লিডিং দ্য উইটনেস।

কাম টু দ্য পয়েন্ট মাইকেল। জাজ ডভ বলেন।

আসামীর কাঠগড়ায় যিনি আছেন তাকে আপনি চেনেন?

ফর দ্যাট আমাকে ওনার কাছে যেতে হবে। আই হ্যাভ টু সি হিজ আইজ।

অবজেকশান!

ওভার রুল্‌ড। আপনি আসুন ওনার সামনে। জাজ জি এপস্টেনকে হাত দেখান।

নিজের জায়গা ছেড়ে মারকোর সামনে এগিয়ে যায় এপস্টেন। সবাইকে অবাক করে মারকো হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন, এপস্টেন ধরে না।

উনি চশমা পরে আছেন। আস্ক হিম টু রিমুভ।

অবজেকশান!

ওভার রুল্‌ড। মিস্টার ডেমিয়ানুক, চশমা খুলুন। ডালিয়া অর্ডার দেন।

মারকো আলিয়া জনেদের দিকে একবার দেখে চোখ থেকে চশমা নামাতেই এপস্টেন চেঁচিয়ে ওঠে, এইতো, এইতো শয়তানটা! এই চোখ আমি জীবনে ভুলব না। যেদিন আমার ভাইকে মারা হয় সেদিন এ আমাকে বাধ্য করেছিল ভাইয়ের বডি ডাম্প করতে। হি ইজ ইভান দ্য টেরিবল!

কথাগুলো বলে এপস্টেন কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ে। কোর্টে জোর গুঞ্জন শুরু হয়। ইহুদিদের একাংশ বেঞ্চ ছেড়ে লাফিয়ে উঠে তাদের ভাষায় চিৎকার করতে থাকে।

হ্যাং হিম, হ্যাং দ্য ডেভিল!

আলিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসে।

আর ইউ ওকে? অনিন্দ্য একটা হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।

আলিয়া অস্ফুটে কিছু বলতে বলতে অনিন্দ্যর কোলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়।

.

স্কুল ব্যাগে বই ভরতে গিয়ে আলিয়া খেয়াল করে পেনসিলের শিস ভাঙা। জিওমেট্রি বাক্স থেকে শার্পনার বার করে ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সইফকে ডাকে।

ভাইজান, পেনসিলটা কেটে দাও না। আমার এখনো স্নান হয়নি, স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।

একবার দুবার ডাকার পর সাড়া না পেয়ে দোতলায় এসে দেখে সইফ তখনও ঘুমোচ্ছে।

এখনো ওঠোনি? আব্বার কাছে আবার বকুনি খাবে। আলিয়া সইফকে ধাক্কা মেরে তোলে।

উফ! একটু ঘুমোব তাতেও…চেঁচাচ্ছিলি কেন?

তার মানে কানে সবই গেছে। পেনসিলটা কেটে দাও, স্নানে গেলাম।

পেনসিল আর কাটার হাতে ধরিয়ে আলিয়া ঘর থেকে বেরোতে যাবে তখন সইফ ডাকে।

শোন। স্কুল যাওয়ার খুব দরকার আজকে?

সে তো সব সময় দরকার। কেন?

আজকে কোনো পরীক্ষা আছে?

না নেই।

তাহলে চল না মামার বাড়ি ঘুরে আসি।

সইফের ঘরের কুলিঙ্গি থেকে শিশি নিয়ে হাতে তেল ঢেলে মাথায় দেয় আলিয়া।

তুমি যাবে মামার বাড়ি! কী হল ভাইজান?

কেন, যেতে পারি না?

বিছানা ছেড়ে ওঠে সইফ।

কতদিন হয়ে গেল নানিকে দেখি না। রাতে স্বপ্ন দেখলাম নানি আমায় আসতে বলছে।

তুমি যাও। আমি তো স্বপ্ন দেখিনি তাই আমি স্কুল যাব। আলিয়া হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

.

দেখ, ১৯৮৮-তে কাশ্মীরে যেভাবে আন্দোলন শুরু হয়েছিল…

সেইভাবে কিছু হচ্ছে না তাই তো? মানে বলতে চাইছেন আন্দোলন করে লাভ হল না। চিফ মিনিস্টার হুজত উল ইসলাম চায়ে চুমুক দিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসেন।

তার অফিসে কাজ অকাজের লোক সারাদিন আসতেই থাকে। কিন্তু সকালের এই সময়টায় বাগানে চা সহযোগে তিনি শুধু কাজের লোকেদের সঙ্গেই প্রথম বৈঠক সারেন। তার মধ্যে এমন কথা শুনলে মাথাটা গরম হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক, যদিও তিনি তা প্রকাশ করেন না। ক্ষমতায় আসার পর একটা কথা মাথায় রেখেছেন হুজত, মাথা গরম নয়, বরফের মতো ঠান্ডা রেখে তবেই রাজ্য চালাতে হবে। বিশেষ করে যেখানে রাজ্যের নাম জম্মু-কাশ্মীর।

দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় তার বাবা ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের সঙ্গে যা চুক্তি করেছিলেন সেটা মেনে চলছেন তো বটেই, তার সঙ্গে ক্রমশ আগ্রাসী হয়ে একছত্র মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠার দিকে পা বাড়াচ্ছেন। তিনি খুব ভালো করে জানেন হাত পেতে ভিক্ষে চাইলে কিছু পাওয়া যাবে না। তাই আঙুল বেঁকিয়ে ঘি তোলাই শ্রেয়।

লাভ-লোকসান সব যদি আপনি বুঝে যেতেন রিয়ান সাব, তাহলে তো আজ আপনি এখানে বসতেন, আমি না।

দলের বয়স্ক নেতা রিয়ান দমবার পাত্র নন।

কোথায় হল কাশ্মীর আমাদের? ওরা তো ভয় পাওয়া দূর, দিব্যি জাঁকিয়ে বসে আছে।

চা শেষ করে হুজত একটা সিগারেট ধরান।

যতদিন ওদের ভগবান এখানে থাকা ওদের নসীবে লিখে রেখেছেন ততদিন থাকবে, তারপর আর থাকবে না।

কথার মাঝেই পি এ সাজিদ টেলিফোন হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

স্যার—।

শুধু ‘স্যার’ বলাতেই হুজত বুঝে যান জরুরি ফোন। সাজিদকে ইশারা করে নিরাপদ দূরত্বে এসে ফোন ধরেন।

সব ঠিক?

শুকর আল্লাহ কা। ওপাশ থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ শোনা যায়।

উসকো লাইন দো। হুজত একবার বাগানে অপেক্ষমান বাকিদের মুখগুলো দেখে নেন।

হাঁ বেটি, কেমন আছ?

এমনি কোনো সমস্যা নেই আঙ্কল। তবে…রুবাইয়া থামে।

তবে কী বেটি? তোমার সঙ্গে কেউ খারাপ ব্যবহার করেছে?

না না, তা নয়। আমার আর এখানে ভালো লাগছে না, বাড়ি যেতে চাই।

জানি বেটি। কী করবে, নিজেদের জন্য এটুকু স্যাক্রিফাইস তো করতে হয়। তবে চিন্তা নেই, দিল্লিকে চাপে রেখেছি। কয়েকদিন কেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেও গুড নিউজ চলে আসতে পারে।

আরও কিছু কথা বলে ফোন রেখে হুজত ফিরে আসেন।

চলুন, দিন শুরু করা যাক।

রিয়ান উঠে দাঁড়াতে এগিয়ে এসে তার হাত ধরে বলেন, আপনার বয়স হয়েছে জনাব। কেন রোজ অফিসে আসেন? যান বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিন, কুরান পড়ুন।

আমি তো…

হুজত নিজের হাতের মুঠোয় রিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরে ঝাঁকিয়ে বলেন, কথা শুনুন, লাভ হবে।

হাত ছাড়িয়ে গাড়ির দিকে এগোবার সময় পাশে হাঁটতে থাকা সাজিদকে ফিসফিস করে হুকুম দেন, দলে আমার থেকে বেশি বয়সের সবাইকে এবার রেস্টে পাঠাও। এরা শুধু কথা বলে, কাজে আসে না।

জী স্যার।

ইয়াসিন কী বলছে?

আজকেই হবে। বিকেলের মধ্যে।

.

স্কুলের সায়েন্স এক্সিবিশানের জন্য মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের একটা লিস্ট টাঙিয়ে দারোয়ান ছুটির ঘণ্টা বাজাতেই হুড়মুড় করে ক্লাস থেকে সবাই বেরিয়ে পড়ে। গল্প করতে করতে তাদের মধ্যে অনেকেই বোর্ডের সামনে আসে। তারা আর আলিয়াও। লিস্টে নাম দেখে কয়েকজন হইহই করে ওঠে, বন্ধুরা পিঠ চাপড়ে দেয়। কিন্তু হাজার খুঁজেও তারা তার নাম দেখতে পায় না।

আশ্চর্য! আমার নাম নেই কেন?

সর, আমি দেখছি।

আলিয়া বোর্ডে চোখ বোলায়।

কীরে পেলি?

বার দু-তিন খুঁজে হতাশ হয়ে বন্ধুর কাছে ফিরে আসে। নারে, নেই।

থাকবে না কেন? আমি তো ফিজিকাল সায়েন্সে বরাবর হায়েস্ট মার্ক্স পাই!

কী হবে পেয়ে?

গলা পেয়ে আলিয়া আর তারা পেছন ঘুরে দেখে এজাজ আর আরেকজন সহপাঠী কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে।

মানে? আমি পেয়েছি সেটা তো ডিপার্টমেন্ট জানে।

এজাজ হাসে, এই নম্বরগুলো নিয়ে জম্মুর স্কুলে ট্রাই কর, ভালো চান্স পেয়ে যাবি।

তারা কথার মানে বোঝে না, আলিয়ার দিকে তাকায়।

বুঝলি না? হিন্দু হ্যায় না, তাই পাসনি। মুসলমান হলে পেয়ে যেতিস।

হাসতে হাসতে এজাজরা চলে যায়।

আলিয়া তারার হাত ধরে টানে, তুই আয় তো আমার সঙ্গে।

সোজা সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে এসে দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

স্যার। একটা কথা জানতে চাই।

ছুটির সময় ইমরানস্যার খাতার বান্ডিল বেঁধে বাড়ি যেতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন।

আজ নয়, কাল এসো।

প্লিজ স্যার, দু’মিনিট।

জলদি বলো।

স্যার তারা ফিজিকাল সায়েন্সে হায়েস্ট মার্ক্স পাওয়ার পরেও সায়েন্স এক্সিবিশানে ওর নাম নেই। তাই…

আলিয়ার কথা শুনে ইমরান এবার মুখ তুলে তাকান।

তারা আমতা আমতা করে বলে, স্যার আমি কেন সুযোগ পেলাম না সেটা জানতেই…

তারাকে থামিয়ে দেন ইমরান।

এটা স্কুলের ডিসিশান।

ইমরানস্যারের ব্যবহারে দুজনেই অবাক। তিনি নিজে তারাকে কতরকম ভাবে উদ্বুদ্ধ করেন ক্লাসের সবাই জানে, দেখে। অন্যদের বারবার বলেন তারার মতো পড়াশোনা করতে। সেই স্যার তাদের সঙ্গে এভাবে কথা বলছে?

এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না তারা। এটা প্রিন্সিপালের সিদ্ধান্ত।

ইমরান খাতা নিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে হনহন করে বেরিয়ে যান। আলিয়া ছাড়ার পাত্রী নয়, সেও ইমরানের পেছন পেছন যায়।

প্লিজ স্যার, বলুন না কেন হল না?

ইমরান থামেন। আলিয়ার দিকে ঘুরে বলেন, তুমি জানো না কেন তারাকে সিলেক্ট করা হল না? ও হিন্দু বলে।

হতাশ ইমরান থামের গায়ে হাত রাখেন, কী যে শুরু হয়েছে এখানে! কৃতি ছাত্রছাত্রীদের হিন্দু বলে সবকিছু থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। মাইনরিটি কম্যুনিটির একটা কোটা থাকে, সেগুলো কেউ গ্রাহ্য করছে না। এটা স্কুল, টেররিজমের আখড়া নয়। আই ডোন্ট সাপোর্ট দেম।

ততক্ষণে আলিয়ার পাশে তারা এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে জল দেখে ইমরানের খারাপ লাগে, তারার মাথায় হাত রেখে বেরিয়ে যান।

দুই বন্ধু নীরবে স্কুলের গেট পেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটতে থাকে। কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলছে না। ইমরানস্যারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে। স্কুলের সামনের রাস্তাটা ফাঁকা, বাকি সঙ্গীসাথীরা বাড়ির পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে।

এলাহি বাগের রাস্তায় পড়ার আগে একটা ছোট কালভার্ট পেরোতে হয়। রোজ আলিয়া তারার হাত ধরে পার করায়। আজও হাত ধরে পেরোতে যাবে, সেই সময় একটা মারুতি ওমনি সাঁ করে ওদের সামনে এসে থামে। পেছনের দরজা খুলে দুজন লোক নেমে আসে।

এ, হাত ছোড় ইসকা! জোরে ধমকাতে ওরা চমকে তাকায়।

তুই মুসলমান তো? হাত ছাড় ওর।

আলিয়ার হাতটা জোর করে ছাড়িয়ে হাতের তেলোতে তারার মুখ চেপে টানতে টানতে গাড়ির অবধি নিয়ে যায় লোকগুলো।

এক সেকেন্ড বুঝতে সময় নিয়ে আলিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে। লোকটার হাত ধরে বলে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ওকে?

এক ঝটকায় আলিয়ার হাত ছাড়িয়ে তারাকে ঠেলে গাড়িতে উঠিয়ে লোকটা বলে, ওর বাড়ির লোকেদের বলে দিবি; ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে লালচকে আসতে, মেয়ে পেয়ে যাবে।

.

সুখবর আছে তোমাদের জন্য। যারা চাইবে তাদের আঙুর খেতে চাষ করার সুযোগ দেওয়া হবে। মানে রোজগারের রাস্তা, বাকি জীবনটা স্বচ্ছন্দে কাটানোর জন্য। আজ রাত ন’টায় ক্রাকোর প্রোকোসিম স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়বে, এক সুন্দর ভবিষ্যতের উদ্দেশে।

ঘোষণার পর ক্যাম্পের সবার মধ্যে এক খুশির ঢেউ খেলে যায়। ক্রাকো ক্যাম্পে ৬৮০০০ ইহুদি কতদিন বন্দি হয়ে আছে সে হিসেব একজনের কাছেও নেই। ক্যাম্পের ডরমেটরিতে ঠাসাঠাসি করে থাকা। প্রত্যেকের মাথাপিছু ৪ কিউবিক মিটার জায়গা ধার্য। রোজ সকালে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গুনতি শুরু আর রাতে শুতে যাওয়ার সময় গুনতি শেষ। এর মধ্যের সময়টায় অকথ্য নাৎসি অত্যাচার। কথায় কথায় মার।

খাবারের নামে দুপুরে ট্যালট্যালে জলের মতো স্যুপ আর রাতে এক টুকরো রুটি। সারাদিন পেটে জ্বালা নিয়ে ফরমাস খাটা। কাজে দেরি হলে লাথি, চড়। কেউ জ্বর গায়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, বাচ্চাকে দুধ খাইয়ে লাইনে আসতে দেরি হলে বন্দুকের বাঁট দিয়ে মায়ের পেটে খোঁচা… এসব এখন জীবনের অঙ্গ।

তাই এক নাৎসি সেনার মুখে এমন দৈববাণী শুনে মনে হয়—‘আহা ঈশ্বর অবশেষে মুক্তি দিলেন’! কে যেতে চাইবে না? সবাই যাবে। এ যেন দীর্ঘদিন ম্যানহোলে আটকে থাকার পর কেউ এসে ঢাকনা খুলে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই হাত তারা ধরবে না?

সারাদিন কাজের মাঝে নিজেদের যতটুকু অবশিষ্ট সম্পদ আছে তা ছোটবড় নানা আকারের স্যুটকেসে ভরে নিয়েছে তারা। কখন রাত ন’টা বাজবে তার অপেক্ষায় আছে এখন উৎসুক মুখগুলো।

স্ট্যান্ড ইন আ লাইন।

রাত আটটার সময় ক্যাম্পের মাঠে তাদের আনা হয়।

পাঁচজন নাৎসি অফিসার এসে ৬৮০০০-এর মধ্যে বেছে বেছে ৫৩০০০-এর নাম ডেকে বাকিদের আটকে দেয়।

গো ইনসাইড। তোমরা এখানেই থাকবে।

কেন জিগ্যেস করার ইচ্ছে থাকলেও সাহস নেই। তাও একটি লোক ছেলের হাত ধরে দুপা এগিয়ে জানতে চাওয়াতে ঘুষি মেরে তার ঠোঁট ফাটিয়ে দেওয়া হয়। শুধু ফিওডোর দেখে আশ্চর্য হয়, যারা চলে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে কেউ আজ খারাপ ব্যবহার করছে না।

রেডি টু গো?

সমস্বরে এবং হইহই করে সবাই ‘হ্যাঁ’ বললে ক্যাম্পের দরজা খুলে অফিসারদের ফলো করতে বলা হয়। বেরোবার সময় অনেকেই একবার ক্যাম্পের দিকে ঘুরে মনে মনে ঈশ্বর ‘ইয়াওয়েহ’-কে ধন্যবাদ জানায়।

জানি না যারা রইল তাদের কী হবে; তবে প্রভু, আমাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য তোমায় অন্তর থেকে প্রণাম জানাই।

রাতের অন্ধকারে বাহিনী নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন সেনাদল প্রোকোসিম স্টেশনে পৌঁছয় তখন ন’টা বাজতে পনেরো মিনিট বাকি। প্ল্যাটফর্ম বলতে নীচু একফালি জমি, তার গায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিরাট মালগাড়ি। ফিওডোর উঁকি-ঝুঁকি মেরে খুঁজতে থাকে তাদের নিয়ে যাওয়ার ট্রেন।

মনে হয় আসেনি এখনও। ফিসফিস করে বাবা ওটোকে বলে সে। সঙ্গে মা এডিথ আর বোন মারগটও আছে। তাদের চোখ ওর মতোই প্যাসেঞ্জার ট্রেন খোঁজে।

ওপেন দ্য ডোরস।

হুকুম করতেই মালগাড়ির দরজাগুলো জুনিওর অফিসারেরা এক এক করে খুলতে থাকে। সার্চ লাইটের আলোয় ভূতপুরী মালগাড়িটা আলোময় হয়ে ওঠে।

যাও, উঠে পড়।

উঠে পড়বে, কোথায়? এই মালগাড়িতে? প্রথমে মনে হয়, অফিসার হয়ত মজার ছলে বলছে।

কী হল? ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে আসছে। গেট ইন ফাস্ট! পেছন থেকে জোরে ধাক্কা মারে সেনারা।

ফিওডোর বাবার দিকে তাকায়। ট্রেন বলেছিল, এ তো গরু ছাগল নিয়ে যাওয়ার মালগাড়ি! এতে করে যাব?

ওটো স্ত্রী ও মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে।

উপায় নেই। নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ হাতছাড়া করা সম্ভব নয়।

৫৩০০০ মানুষকে ২০ বগির মালগাড়িতে তোলা যায়? অফিসারেরা সেরকম ভাবলেও রেল থেকে আপত্তি করতে তখন আরও মালগাড়ির ব্যবস্থা করা হয়। আপাতত যেটা আছে তাতে ঠেলে ধাক্কা মেরে যতজন সম্ভব ইহুদিকে বস্তার মতো ঠুসে দেওয়া হয় আর তারপরেই বগির দরজাগুলো দুম দুম শব্দে বন্ধ হয়ে যায়। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাশের লোকের মুখ দেখা যায় না, নিশ্বাস নেওয়া যায় না। ওটো মারগটকে কোলে নিয়ে কাঠের কামরার এক চিলতে ফুটোর সামনে আনে।

ট্রেন ছাড়লে এখান থেকে হাওয়া আসবে। দেখবি কোনো অসুবিধে হবে না।

আই কান্ট ব্রিদ! মারগট কাঁদতে থাকে।

একটু কষ্ট কর। কাল সকালেই আমরা সুন্দর এক জায়গায় পৌঁছে যাব।

হ্যাঁচকা মেরে ট্রেন ছাড়ে। একে অপরের গায়ে পড়ে যাওয়ারও জায়গা নেই। ফিওডোর বাবা মায়ের থেকে একটু দূরে আনার পাশে বসে। সে চুপ করে আছে। জানতে চায়নি কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে। গিয়েই বা কী হবে? দুদিন আগে তার বাবা ক্যাম্পে ঠিকমতো কাজ না করায় গুলি খেয়ে মারা গেছে আর তার পর থেকেই আনা নীরব। বাবার নিথর দেহ যখন ওর সামনে দিয়ে সেনাদল টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তখনও কাঁদেনি। চোখের জল চোখেই রয়ে গেছে। উস্কোখুস্কো সোনালি চুল, চোখের তলায় কালি, শুকনো ঠোঁট…ফিওডোরের মায়া হয়। সে আনার মাথাটা তার কাঁধে রাখে। আনা মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে কিনা ফিওডোর বুঝতে পারে না। শুধু আশায় বুক বেঁধে থাকে এক নতুন সকালের।

কামরার গায়ের ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকলে বোঝা যায় সূর্য উঠেছে। অল্প অল্প করে রোদ বাড়ে কিন্তু ট্রেন কোথাও থামে না। গুঁতোগুঁতি করে বসে থাকা মানুষের মুখগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। সবাই ওটোর মতো ভাগ্য করে আসেনি। প্রোকোসিমে যাত্রী ভাগ হয়ে যাওয়াতে অনেকেই নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। কারোর স্ত্রী, কারোর বাবা-মা তো কারোর সন্তান অন্য অন্য মালগাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

একে স্বজন হারানোর কষ্ট, তার সঙ্গে জল তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে, খিদেও পেয়েছে। রাত থেকেই অনেকে বাথরুম চেপে বসে, ভেবেছিল দিনের আলো ফুটলেই ট্রেন থামলে হালকা হবে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হওয়ার পালা, ট্রেন আর থামে না। চেপে থাকতে থাকতে তলপেটে যন্ত্রণা শুরু হয়।

উপায় নেই। এ ভাবে আর সম্ভব হচ্ছে না।

ওটো হাঁটুতে ভর দিয়ে ওঠে।

এক কাজ করো, ওই কোণ থেকে সরে এসো। ওখানেই না হয়…

দুপুরের দিকে যখন ট্রেন থামে তখন খিদে, তেষ্টায়, দুর্গন্ধে সবাই আধমরা। কোথায় এল, কী স্টেশন কেউ আগ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করে না। ঘড়ঘড় শব্দে মালগাড়ির ঢাকনা খুলে যায়। আচমকা এত আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেলে কিছুক্ষণের জন্য কেউ ভালো করে দেখতে পায় না।

কাম আউট অফ দ্য কার। নাৎসি অফিসারদের ধমকে নতুন সকালের আশায় হুড়মুড় করে ইহুদির দল স্টেশনে নামতে থাকে।

তারপর?

ফিওডোর থামে। একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে গেছে। মাইক্রোফোনের পাশে রাখা গ্লাস থেকে অনেকটা জল খায়।

টেক ইউর টাইম। জাজ ডালিয়া ডরনার সহানুভূতির চোখে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।

আঙুর খেত নয়, আমাদের নিয়ে আসা হয়েছিল ট্রেবলিঙ্কা ক্যাম্পে। প্ল্যাটফর্মের এক কোনায় নিয়ে গিয়ে সবার নাম খাতায় তোলা হয়, বলা হয় হাতে ট্যাটু করা হবে। আমরা ভাবি নাম লিখে দেবে, তা নয়। আমাদের সবার নামের পাশে থাকা নম্বর হাতে দাগিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন থেকে ঠিকানার সঙ্গে নামগুলোও মুছে ফেলে সবাই একটা নম্বরে পরিণত হয়েছিলাম।

আপনার হাতে সেই নম্বর এখনও ট্যাটুড আছে?

জাজ জানতে চান।

ইয়েস। ফিওডোর শার্টের হাতা গুটিয়ে দেখায়। ৪৬ বছর ধরে রোজ স্নানের সময় ঘষেও তুলতে পারিনি।

এরকম ট্যাটু শুধু ইহুদিদের হাতেই করা হত? মাইকেল ফিওডোরের সামনে আসেন।

হ্যাঁ। তবে ওখানকার প্রত্যেক নাৎসি অফিসারের হাতে ট্যাটু ছিল, সেটা অন্যরকম।

অন্যরকম মানে, নম্বর নয়?

নো। ওদের ব্লাড গ্রুপ লেখা থাকত।

লাইক দিস? মাইকেল এক নাৎসি সেনার হাতের ছবি দেখান।

এক্স্যাক্টলি।

কিছু না বলে মাইকেল মারকোর কাছে এগিয়ে আসেন।

মিস্টার ডেমিয়ানুক, আপনার হাতে এমন কোনো ট্যাটু আছে?

অবজেকশান!

শেফটেল উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার ক্লায়েন্টের সম্মানহানি হয় এমন কোনো কাজ আশাকরি কোর্ট হতে দেবে না।

জাজেরা কিছু বলার আগে মারকো মাইকের সুইচ অন করে বলেন, আমার কোনো আপত্তি নেই শেফটেল। হি ক্যান সি মাই হ্যান্ডস।

চেয়ার ছেড়ে উঠে ফুল স্লিভ শার্টের হাতা সম্পূর্ণভাবে গুটিয়ে মারকো দেখান, সি, নো ট্যাটু।

আলিয়া অনিন্দ্যর দিকে ফেরে। এই ক’দিনে প্রথম ওর মুখে হাসি ফোটে।

পাপা ইস ক্লিন, প্রুভড।

অনিন্দ্য আলিয়ার হাত নিজের হাতের মধ্যে নেয়।

শেফটেল ঠিক বলেছিল। সাজানো কেস।

সেদিন ফিওডোরের জবানবন্দি শেষ হয় না। জাজেরা পরের ডেট দিয়ে কোর্টরুম ছেড়ে যেতেই মারকোকে তার সেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আট বাই আট একটা ঘরে তার আস্তানা আজ দেড় মাস যাবৎ। একটা খাট আর ছোট আলমারি ছাড়া আছে সিসি ক্যামেরা, ২৪ ঘণ্টা তাকে নজরে রাখা হয়। ঘরে এসে জামা প্যান্ট ছেড়ে তোয়ালে কাঁধে নিয়ে গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরে বাথরুমে যান।

আয়নায় নিজের মুখটা ভালো করে দেখে তাকের ওপর চশমাটা রাখেন। শাওয়ার অন করে গেঞ্জি খুলতেই কোমরের বাঁ-দিকে ট্যাটুটা বেরিয়ে পড়ে, যেখানে লেখা আছে—‘বি’। মারকো ট্যাটুর ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে স্নান করতে থাকেন।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *