১০
স্কুল ব্যাগটা এক হাতে নিয়ে মন্থর পায়ে আলিয়া রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালে রিফত টিফিন বাক্স ও জলের বোতল এগিয়ে দেন।
আজকাল একদিনও টিফিন খাস না। সারাদিন না খেয়ে থাকলে শরীর কী করে ঠিক থাকবে আলিয়া?
মায়ের কথা কানে ঢুকলেও মনে প্রবেশ করে না। যন্ত্রের মতো জিনিসগুলো ব্যাগে ভরে পায়ে জুতো গলিয়ে বাড়ির বাইরে আসে। গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার চোখ চলে যায় তারার বাড়ির দিকে। গেটের কাছে এসে ডাকতে গিয়েও ডাকে না। ডাকতে পারে না। কাকে ডাকবে? তারা তো নেই।
.
কীরে আলিয়া, তারা কোথায়?
পার্বতী ছাদে কাপড় তোলার সময় নীচে তাকাতে দেখেন আলিয়া একা। হাঁপাচ্ছে।
বন্ধুকে রাস্তায় কোথায় ফেলে চলে এলি নাকি?
চাচি, চাচি—বলতে বলতে আলিয়া থরথর করে কাঁপতে থাকে।
আলিয়া! বেটি কী হয়েছে?
পার্বতী হাতের কাপড় ছাদে রেখে এক ছুটে নেমে এসে গেট খোলেন।
কী হয়েছে তোর? তারা কোথায়?
চাচি ওরা…ওরা তারাকে…
কারা? তারাকে কী?
আমার চোখের সামনে ওরা তারাকে তুলে নিয়ে গেল। আমি কিছু করতে পারলাম না—আলিয়া কাঁদতে কাঁদতে পার্বতীকে জড়িয়ে ধরে।
দিশাহারা পার্বতী আলিয়ার কাঁধ ধরে ঝাঁকান।
কী বলছিস তুই? কারা নিয়ে গেল আমার তারাকে?
কী করে আলিয়া বলবে, কারা নিয়ে গেছে? যে দুজনকে দেখেছে তাদের ও চেনে না আর বাকি যারা গাড়িতে বসেছিল তাদের মুখ দেখতে পায়নি।
ওর বাবার ফিরতে তো দেরি…আমি এখন কী করব? হে ভগবান! আমি…
ওরা বলেছে এক ঘণ্টার মধ্যে লালচকে যেতে, সেখানে তারাকে পাওয়া যাবে।
লালচক!
পার্বতী দৌড়ে বাড়ির ভেতর থেকে চাবি নিয়ে মেইন দরজা লক করে বলেন, চল, থানায় চল।
হাঁপাতে হাঁপাতে আলুথালু বেশে ওরা দুজন থানায় আসে।
অফিসার আরবাজ খান নিজের টেবিলে কাজ করছিলেন। এভাবে তাদের আসতে দেখে অবাক হয়ে বলেন, ভাবী আপ? এমন অবস্থা কেন? কী হয়েছে?
আরবাজ ভাই, আমার মেয়েকে বাঁচান! পার্বতী ওর হাত দুটো ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন আরবাজ।
মানে! কী হয়েছে?
থানার বাকি কনস্টেবল, সাব ইন্সপেক্টর আরবাজের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। আলিয়ার মুখ থেকে সবটা শুনে সবাই স্তম্ভিত।
এক ঘণ্টা?
আরবাজ ঘড়ি দেখেন।
মানে ক’টার সময় আন্দাজ ওরা লালচক আসতে পারে?
ছ’টার কাছাকাছি।
চলুন ভাবি, গাড়িতে উঠুন। আরবাজ ফাইল বন্ধ করে কনস্টেবলকে জিপ বার করার হুকুম দেন। স্যারের কথায় সে ড্রাইভারকে খবর দিতে গেলেও বাকিরা নড়ে না।
কী হল? তোমাদের কি আলাদা নেমন্তন্ন করতে হবে? হাঁ করে দাঁড়িয়ে না থেকে মুভ ফাস্ট।
বাকি দুজনের মাথা নিচু। মোইন এক পা এগিয়ে এসে বলে, স্যার, আপকো ভি পতা হ্যায় কে এই কাজ করতে পারে। হামকো জান পেয়ারি হ্যায়। আমরা যাব না। আপনাকেও বলব আপনি এর মধ্যে ঢুকবেন না।
মোইন! আরবাজের ধমকে কেঁপে ওঠে সবাই, শ্রীধরজীর মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে! আমাদের শ্রীধরজী, আমাদের বড় ভাই, আমাদের কাশ্মীরের শান। তাঁর মেয়ে আমাদের মেয়ে। আজ তোমার মেয়েকে তুলে নিয়ে গেলে আমরা এসব বলে পিঠ বাঁচাতে পারতাম?
নিয়ে যেত না স্যার। আমরা মুসলমান।
কথাটা শুনে আরবাজের ইচ্ছে করে মোইনের গালে সপাটে একটা থাপ্পড় মারতে, পারেন না।
কাউকে আসতে হবে না, আমি একাই যাব।
আলিয়াদের নিয়ে গাড়িতে বসান তিনি। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। রাস্তার জ্যাম ঠেলে লালচক পৌঁছতে পৌনে ছ’টা বাজে। ঘড়ি ঘরের থেকে ১০০ মিটার দূরে গাড়ি রেখে আরবাজ নজর বোলান চারদিকে। শান্ত পরিবেশ। রোজকার যেমন জীবন চলে তেমনি চলছে। দোকান পাট খোলা। বাইক, স্কুটার ছুটছে, লোক ঠাসা লোকাল বাস স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। কয়েকজন আড্ডা মারছে। পুলিশ তার মতো পাহারায়। আরবাজ ওয়াকি-টকি হাতে তুলে নিয়ে স্থানীয় পুলিশ চৌকির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ছ’টা বাজতে আর দশ মিনিট। নজর রাখো। আমি ঘড়ি ঘরের সামনেই আছি। বেগতিক দেখলে ফোর্স নিয়ে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই চকের মাঝখানে একটা মারুতি ভ্যান এসে থামে।
এইতো সেই ভ্যানটা! আলিয়া পার্বতীর হাত চেপে ধরে।
তুমি শিওর এই ভ্যানটা? আরবাজের নজর ভ্যানের দিকে।
জী বিলকুল।
দুজন লোক হাতে একটা চোঙা নিয়ে ভ্যানের পেছনের দরজা খুলে নেমে পড়ে।
আসসালামু আলেকুম নাজনিন। মেরে ভাই, ইধর ধ্যান দেনে সে আচ্ছা হোগা।
অ্যানাউন্স করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আশপাশের দোকানের শাটার নেমে যায়। রাস্তা খালি। যারা দাঁড়িয়েছিল তারা একধারে সরে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকে। আরবাজের ডান হাত রিভলভারের খাপের বোতাম খোলে, চোখ লোকগুলোর দিকে।
আমরা অনেকদিন ধরে ভালোভাবে বোঝাচ্ছি, সাবধান করছি, নোটিশ পাঠাচ্ছি। পণ্ডিতদের বলছি কোনো অশান্তি না করে কাশ্মীর ছেড়ে চলে যেতে। আরে ভাই, কানে কথাই তুলছে না? অজিব বাত! কহতে হ্যায় না, লাথো কে ভূত বাতো সে নহী মানতে। তো আখির মে এক লাথ মার না হি পড়া।
চকের মাঝে অল্প অল্প করে লোক জমতে শুরু করে। দোকানের শাটার খুলে কেউ কেউ বেরিয়ে আসে, পথচারীরা থমকে যায়। বাস থেকে লোক নামে।
অব দেখতে হ্যায় ইসমে কাম হোতা হ্যায় কে নহী। এ, লেকে আও উসে।
ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে একজন নেমে গাড়ির পেছনে উঠে যায়।
শাহিদ না?
আলিয়া অবাক। তার মানে তখন গাড়িতে শাহিদ ছিল? ইসকো ম্যায় আজ নহী ছোড়ুঙ্গি।
জিপের দরজা খুলে আলিয়া ভ্যানের দিকে ছুটে গেলে পার্বতী আর আরবাজও নেমে পড়েন।
আলিয়া রুকো! আরবাজের কথা কানে না তুলে আলিয়া দৌড় লাগায়।
ততক্ষণে শাহিদ পেছনের সিট থেকে কালো বোরখা পরা এক মেয়েকে নামিয়ে এনেছে, মুখ ঢাকা।
হামনে ইসকো স্কুলকে বাহার সে যব উঠায়া থা তখন ও হিন্দু ছিল। পণ্ডিত কি বেটি।
ততক্ষণে আলিয়া ভ্যানের কাছে এসে গেছে। কথাটা কানে যেতেই সে থামে, তার ঠিক পেছনেই পার্বতী।
কথা দিয়েছিলাম মেয়েটিকে এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরিয়ে দেব। দিতে এসেছি। সিরফ এক ফরক হো গয়া। ও আর হিন্দু নেই, মুসলিম হয়ে গেছে।
লোকটা কথা শেষ করে মেয়েটির মুখের ওপর থেকে বোরখার পর্দা সরাতে তারাকে দেখা যায়।
তারা!
পার্বতীর কান্না জড়ানো চিৎকার ঘড়ি ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। শাহিদের দলের ওদের ওপর নজর পড়ে।
এই তো এসে গেছে বাড়ির লোক!
লোকটা এগিয়ে আসে—লিজিয়ে আপকি বেটি। লেকিন ও এখন আর তারা নয়, তসলিমা। মসজিদে নিজে উচ্চারণ করে কলমা পড়ে মজহব পাল্টেছে। জিগ্যেস করুন।
কামিনা! আলিয়া নিজেকে আর সামালতে না পেরে শাহিদের ওপর ঝাঁপিয়ে এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড় চালিয়ে তারাকে টেনে নিয়ে আসতে গিয়ে আটকে যায়। অন্য আরেকটা হাত ধরে একজন তারাকে আটকে রেখেছে।
নিয়ে যাওয়ার আগে আমার অনুমতির প্রয়োজন আছে।
আলিয়া ঘুরে দেখে তারার বাঁ-হাত ধরে রেখেছে দুধওয়ালা ইমতিয়াজ।
ও এখন শুধু শ্রীধর পণ্ডিতের মেয়ে নয়, ইমতিয়াজ মকলুর স্ত্রী। আমার অনুমতি বিনা ও কোথাও যেতে পারবে না।
.
দোতলার বারান্দার দিকে আলিয়া তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। চোখ থেকে ঝরঝর করে জল পড়ছে। তার তারা আর এখানে থাকে না, ঠিকানা বদলে গেছে। সেদিন লালচকের ঘড়ি ঘর থেকে তারাকে নিয়ে শাহিদের দল প্রসেশান করেছিল অর্ধেক শ্রীনগর জুড়ে। উদ্দেশ্য ছিল তাদের আদেশ পালন না করলে পণ্ডিতদের বাড়ির মেয়ে বউয়ের সঙ্গে কী কী হতে পারে!
পুলিশ কিচ্ছু করতে পারেনি বা বলা ভালো করেনি। আরবাজ এটা নিয়ে মুভ করতে চাইলে ওপর থেকে তাকে আটকে দেওয়া হয়। শ্রীধর থানায় এফ আই আর করতে যান। কিন্তু কেউ এক কলম লেখে না, উল্টে ‘মেয়ে নিজের ইচ্ছেয় চলে গেছে’ বলে তাকে ভাগিয়ে দেওয়া হয়।
শাহিদ এখন মহল্লা কেন শ্রীনগরের হিরো, কেএলএফ-এর নয়নের মণি। বাইক নিয়ে বেরোলে সেলাম ঠুকে সবাই সরে যায়। পাড়ার ঝুট ঝামেলা শাহিদ ভাইকে বললে মুহূর্তে সল্ভ হয়ে যায়। শুক্রবার নামাজ পড়ার পর মসজিদের ইমাম তাকে আলাদা করে ডেকে প্রাইভেট মিটিং করে।
দূর থেকে দেখে সইফ। যে মাস্টারমশাইয়ের কাছে ছোট থেকে গান শিখেছে তাঁরই মেয়ের এত বড় ক্ষতি শাহিদ করতে পারল কী করে? তার নিজেরও সংকোচ বোধ হয়। কিন্তু মসজিদে এসে যখন ইমামের মুখে শোনে শ্রীধরের মেয়ের সঙ্গে যা হয়েছে সব আল্লাহর ইচ্ছেয় তখন তাতেই তার মন সায় দেয়।
সত্যি তো! আল্লাহর ইচ্ছে ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। তারা যে আজ ইমতিয়াজের ঘরণী সে নিশ্চয়ই আল্লাহ তালা চেয়েছিলেন বলেই!
আমাদের শাহিদ ভাই যে কাজ করেছে তা বড়ে ফকর কি বাত হ্যায়। একজন হিন্দুকে মুসলমান বানানো, একজন কাফেরকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে আসা মানে তোমার এ জন্মের সব গুনাহ আল্লাহর কাছে মাফ।
ইমামের এই কথা শুনে সইফ উদ্বুদ্ধ হয়। ভাগ্যিস আলিয়া বা মাস্টারজিকে মুখ ফসকে বলে ফেলিনি, আল্লাহর রোষে পড়ে যেতাম।
যত পণ্ডিতদের ইসলামে আনতে পারবে, জানবে ততই জন্নতের রাস্তা তোমাদের জন্য খুলে যাচ্ছে।
সুভান আল্লাহ!
ইমামের লেকচার শুনে মসজিদ ভর্তি লোক হইহই করে ওঠে।
সন্ধের মিটিং ভাঙে। সইফ বেরিয়ে এসে পায়ে জুতো গলাতে গেলে শাহিদ ডাকে।
সইফ, ইধার আ।
বাধ্য ছাত্রের মতো তার কাছে যায় সইফ।
ইয়াসিন ভাই আজ তোকে ডেকেছেন।
আমায়! কেন?
সওয়াল মত কর। আমি আজ রাতে বাইক নিয়ে আসছি, রেডি থাকিস।
শাহিদের কথায় সইফ শিহরিত হয়। একদিনের আলাপে তার মানে ইয়াসিনের মনে ও দাগ কাটতে পেরেছে, নাহলে এত লোক থাকতে তাকে ডাকবে কেন? রাতে সন্তর্পণে বাইকে চেপে চলে যায় ইয়াসিনের বাড়ি। দোতলার ঘরে সেদিনের থেকেও বেশি লোক। ইয়াসিন সইফকে নিজের পাশে বসিয়ে পিঠে হাত রাখে।
তোমার জিন্দেগির মকসদ কী ভাই?
কী বলবে বুঝতে না পেরে বোকা বোকা হাসে সইফ।
পতা নহী। মতলব আব্বুর কাজে…
একটা কথা বলো, নিজের দেশের পায়ে গুলামির বেড়ি দেখতে ভালো লাগে?
শাহিদের দিকে তাকায় সইফ। সে মাথা নাড়তে বলায় সইফ ‘না’ বলে।
তো ফির আজ থেকে আমার দলে সামিল হয়ে যাও। ইয়াসিন সইফের হাতদুটো ধরে, এ হাত এতদিন কী করেছে আমি জানি না। তবে গুলামির জঞ্জির কাটবে সে আমি হলফ করে বলতে পারি।
ইনশাআল্লাহ! সইফের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, বোধহয় ইয়াসিনের কথার জাদুতে।
শাহিদ, কাল তাহলে একে নিয়ে চলে যাও।
কোথায়? সইফ ভয় মিশ্রিত উত্তেজনায় জানতে চায়।
ঠোঁটের কোনায় হাসি খেলে যায় ইয়াসিনের।
উসপার।
.
১১
ফিওডোর ইজ ডেড।
শেফটেল নিজের চেম্বারে। সামনে অনিন্দ্য, জন আর আলিয়া। কথাটা শুনে তিনজনেই স্তম্ভিত।
কী করে?
ম্যাসিভ অ্যাটাক।
সেদিন ওনার আচরণে একবারও মনে হয়নি যে বাবাকে উনি চিনতেন, জন বলে, সো হি ওয়াজ নট আ থ্রেট।
ইউ নেভার নো। সাজানো কেসে কে কখন থ্রেট হয়ে যায় বলা যায় না।
তাহলে ওনার মারা যাওয়ায় আমাদের কেস স্ট্রং হল না উইক? অনিন্দ্য জানতে চায়।
এর সঠিক উত্তর নেই বলে শেফটেল এড়িয়ে যান। তবে স্বভাবসিদ্ধভাবে বারবার বলেন ওরা জিতছেই। ক’দিন পর ডেট পড়লে এবার সরকার পক্ষের উকিল হাজির করেন ইউক্রেনের এক বাসিন্দা ফেদিরকে।
আপনি এনাকে চেনেন?
ইয়েস। আমার কলোনিতে থাকত।
কোথায়?
ইউক্রেনের ডুভোবিতে। আস্ক হিম।
আপনাকে যা জিগ্যেস করা হবে তার বাইরে কোনো কথা নয়। ডালিয়া ডরনার মৃদু ধমক দেন।
আই অ্যাম সরি।
ডেমিয়ানুক ফ্যামিলির ব্যাপারে কী জানেন বলুন।
ওর বাবা ফারমার ছিলেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। ১৯৪০ সালে রেড আর্মি জয়েন করে জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াই করে ইভান। তারপর যুদ্ধবন্দি হয়ে থাকার পর ও জার্মান আর্মিতে যোগদান করে। হি বিকেম দ্য গ্যাস চেম্বার অপারেটর অ্যাট ট্রেবলিঙ্কা।
দ্যাটস অল ফর নাও। মাইকেল সরে যেতে শেফটেল এগিয়ে আসেন।
ফেদির, আপনি বললেন আপনারা একসঙ্গে ডুভোবিতে থাকতেন। সেখানে তো থাকত ইভান, যেমন আপনি আদালতকে জানালেন। কিন্তু ইনি তো মারকো। আপনি শিওর, আপনি ঠিক বলছেন?
অফ কোর্স। দিস ম্যান ইজ ইভান।
ওকে। তাহলে যাকে জার্মান সেনা যুদ্ধবন্দি করে নিল সেই আবার নাৎসিদের হয়ে মানুষ মারতে লাগল?
ইয়েস। এটা সত্যি। ট্রেবলিঙ্কাতে পাঠানোর আগে ১৩ জুন ১৯৪২-এ ট্রনিকি ক্যাম্পে ওর ট্রেনিং হয়েছিল কিনা জিগ্যেস করুন।
নিশ্চয়ই জিগ্যেস করব। তার আগে আপনাকে জিগ্যেস করি আপনি এত ডিটেলস জানলেন কী করে? আপনিও কি ওখানে ট্রেনিং নিয়ে ছিলেন?
অবজেকশান!
সাসটেন্ড। শেফটেল আপনি উইটনেসকে ট্যাম্পার করছেন।
সরি ইয়োর অনার। আই হ্যাভ নো মোর কোয়েশ্চেন্স। কিন্তু আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি দিস ইস জাস্ট আ ‘শো ট্রায়াল’ ডিজাইন্ড বাই কে জি বি।
ওয়ার্নিং শেফটেল! ডালিয়া কড়া গলায় বলেন, নো সেকেন্ড চান্স। এরপর এরকম কোনো কথা এই কোর্ট শুনতে পেলে আপনাকে আর মিস্টার ডেমিয়ানুকের কেস লড়তে দেওয়া যাবে না।
সরি এগেন ইয়োর অনার।
শেফটেল নিজের সিটে বসতে বসতে বলেন, বাঞ্চ অফ হিটলারস।
.
হিটলার কম বয়েসে পেইন্টার ছিল?
অনিমা অবাক। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ খুনি হয়ে গেল?
ভাবা যায় বলো! অর্পিতা দুটো তাঁতের শাড়ি হাতে নিয়ে বলে, এগুলো কি কাচতে দেবে?
হ্যাঁ দেব। ন্যাতাপ্যাতা হয়ে গেছে।
অনিমা শাড়ি দুটো পাশে রাখেন।
লোকটার ছবি দেখলেই মাথাটা গরম হয়ে যায়, চিরকাল। একটা মাছি গোঁফ নিয়ে…উফ অসহ্য!
অনিন্দ্যর বিয়ে থেকে যা ঝড় চলছে কারোর নিজের দিকে খেয়াল করার সময় বা ইচ্ছে হয়নি। নেহাত এবার কাচতে না দিলে নয় বলে মা-মেয়ে আলমারি খুলে শাড়ি গোছাতে বসেছে। আর যা হয়, ঘুরে ফিরে সেই এক টপিক। হিটলার।
কিন্তু ইহুদিদের এইভাবে মারত কেন লোকটা? একটা তো কারণ থাকবে।
সেরকম কোনো কারণ নেই। শোনা যায় ছোট থেকেই ভিয়েনাতে থাকাকালীন একটা বিদ্বেষ জন্মেছিল ওর। অর্পিতা তিনটে সিল্কের শাড়ি পাট করে মায়ের হাতে ধরায়। বেসিক্যালি খ্রিস্টানরা ইহুদিদের কোনোদিন পছন্দ করত না, জোর করে কনভার্ট করত।
যেমন কাশ্মীরে হচ্ছে। অনিমা শাড়িগুলো নিয়ে তাকে রাখেন।
তাই নাকি?
কেন, কাগজ পড়িস না? বেনারসি দুটো রোদে দেওয়ার জন্য এক ধারে রেখে বলেন, সিনেমার পাতায় চোখ আটকে থাকলে আর জানবি কী করে?
সিনেমার কথা বলতেই অর্পিতা নড়েচড়ে বসে।
মা জানো, আমার বন্ধু আছে না সাগরিকা…ও কাল ত্রিদেব দেখে এসেছে। বলছিল আবার যাবে। অর্পিতা হাসি হাসি মুখে তাকায়, আমি যাব?
একদম না। অনিমা আলমারি লক করে উঠে পড়েন।
ক্লাস এইটে পড়া মেয়ে ত্রিদেব দেখবে! আমাদের সময়…
থাক মা, আমি যাব না। আবার তোমাদের সময়ের গল্প নিয়ে বসো না। অর্পিতা ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে জিগ্যেস করে, আচ্ছা, কাশ্মীরে কী হচ্ছে বললে?
একটা হিন্দু মেয়েকে ফোর্স করে মুসলমান বানানো হয়েছে। তবে অদ্ভুতভাবে টিভিতে এর কোনো খবর নেই। হয়তো প্রশাসন সামনে আনতে চায় না।
জোর করে ধর্ম পাল্টানো যায়?
কথা শুনে বোঝা যায় অর্পিতা বিস্মিত। যে মন এতদিন ধরে এক ঈশ্বরকে তার গুরু মেনে এসেছে সে রাতারাতি আরেক ঈশ্বরকে সেই স্থানে বসাতে পারবে?
পারে নাকি? সম্ভব? জোর করে যেখানে কারোর ভালোবাসা পাওয়া যায় না সেখানে এক অন্য ধর্মের ভগবানকে ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই তাকে মন দিয়ে ডাকতে পারবে? কী যে হয় এসব করে!
শাড়িগুলো নিয়ে অনিমা বেরিয়ে যান।
আজ শনিবার স্কুল ছুটি। সকালে খানিকক্ষণ পড়াশোনা করে অর্পিতা মাকে সাহায্য করতে এসেছিল। ঠিক করেছিল কাজের ফাঁকে মায়ের মন ভিজিয়ে সিনেমা যাওয়াটা পাকা করে ফেলবে। হল না। কিন্তু হঠাৎ করে ত্রিদেব না দেখার দুঃখ ভুলে ওর ইচ্ছে হয় কাগজটা খুঁজে বার করতে।
অনিমার ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং স্পেসের কর্নার ব়্যাকে কাগজের গাদা। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দশ দিন আগের কাগজে খবরটা পায়। ভেতরের পাতায় বেরিয়েছে, তাও বড় করে নয়। মেয়েটার নাম ধাম কিছু দেয়নি। শুধু লেখা ক্লাস সেভেনে পড়া এক মেয়েকে কেএলএফ ইসলাম ধর্ম নিতে বাধ্য করেছে। বাকি কাগজগুলো রেখে অর্পিতা জানলার কাছে এসে দু-তিনবার খুঁটিয়ে পড়ে।
এত বড় একটা ঘটনার সেরকম কোনো গুরুত্ব নেই? স্কুলে বা টিউশানে কাউকে এ নিয়ে কিছু বলতেও শুনলাম না। আশ্চর্য!
সত্যিই সে কখনোই ভালো করে কাগজ পড়ে না। এই প্রথম পাতা উল্টে সব খবরে চোখ বুলিয়ে দেখে কোথাও দেশের প্রধানমন্ত্রীর গুনগান তো আবার তাকেই কী এক টাকা তছরুপ নিয়ে টার্গেট করে অন্যদলের কাদা ছোড়াছুড়ি। আর খুন, জখম, রাহাজানি ছাড়া সেরকম কিছু নেই। এমনকী আলিয়ার বাবাকে নিয়েও আর কোনো খবর হয় না।
কীরে, ভাবুক হয়ে কী কবিতা লিখছিস?
অম্লান ফ্রিজ খুলে জলের বোতল বার করে গলায় ঢালে।
দাদা আর ফোন করেছিল?
না, কালকেই লাস্ট। বলল ওই ফিওডোর বলে লোকটা পরের হিয়ারিং-এর আগেই হঠাৎ মারা গেছে।
সে কী! বলিসনি তো?
বাড়িসুদ্ধ সবাই জানে, আর তুই জানিস না? কী করিস সারাক্ষণ? অম্লান জলের বোতলটা ফ্রিজে রেখে চেয়ার টেনে বসে।
দাদা যে কী করবে? ছুটি শেষ। উইদাউট পে হয়ে বসে আছে। এবার চাকরিটা থাকলে হয়!
দাদা ফিরে এলে বউদি কী করবে?
খুব অসুবিধে হবে না, ওর দাদা আছেন তো।
তাও। হাজবেন্ড পাশে না থাকলে…তুই কি চলে যাবি?
অম্লান কিছু বলতে গিয়ে থমকায়। এদিক ওদিক দেখে গলা নামিয়ে বলে, আমার সেরকমই ভাবনা চিন্তা আছে।
মানে?
বলব যদি পেটে কথা রাখতে পারিস।
অর্পিতা তার ছোড়দাকে ভালো করে চেনে। একেক সময় একেকটা জিনিস নিয়ে হুজুগে মাতে। এই কিছুদিন আগে ছিল থিয়েটার নিয়ে পাগলামি। মাঝে হল স্কেচ করার শখ। তারপর গান। গিটার কিনে, টিচার রেখে, বন্ধুদের নিয়ে গানের ব্যান্ড বানানো সব শিকেয় তুলে এখন গিটারের ব্যাগ দেওয়ালে ঝুলছে। জেরুসালেম গিয়ে নিছক বউদির পাশে দাঁড়াতে হলে গলা নামিয়ে কথা বলত না।
কীরে, শুনবি?
বল। বলার ধরনেই বোঝা যায় শোনার ইচ্ছে নেই।
অম্লান চেয়ারটা আরও কাছে নিয়ে আসে।
বউদির বাবার ওপর একটা ডকুমেন্টরি বানাব।
কী? তুই কি এবার ফিল্ম মেকার হতে চাস?
আহ্ আস্তে! চেঁচাচ্ছিস কেন? সামনা সামনি থেকে যা যা হচ্ছে দেখে ফিরে এসে একটা…
বউদি দেবে কেন?
না দেওয়ার কিছু নেই। দাদা বলল তো আঙ্কেলের কেসটা ইজরায়েলে ডাইরেক্ট টেলিকাস্ট হচ্ছে। এটা তো সিক্রেট নেই আর।
না থাক, কিন্তু এটা আমাদের বাড়ির ব্যাপার। ধ্যাত, একদম বাজে প্ল্যান। অর্পিতা একটু ভেবে বলে, ইজরায়েল তো অনেক দূর, দেশে যা হচ্ছে সে নিয়ে কিছু তো করতে পারিস।
দেশে কী হচ্ছে?
হাতের কাগজটা এগিয়ে পাতাটা খুলে দেয়। অম্লান খবরটা পড়ে।
শকিং!
খবর পড়ে অম্লানের মুখ শুকনো। ক্লাস সেভেন মানে তোর থেকে বছর খানেকের ছোট।
মায়ের কাছে শোনার পর থেকে আমার ভেতরটা কী রকম একটা করছে। অর্পিতা অম্লানের হাত থেকে কাগজটা নেয়। পারলে এর ডকুমেন্টেশন কর। এক চিলতে খবরটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক।
.
১২
থমথমে মুখে জানলার দিকে তাকিয়ে আছেন প্রতাপ রাই, হাতে চায়ের কাপ। রিভলভিং চেয়ারের পিঠ মোহনলালের দিকে।
কী করে হল মোহনলালজি?
প্রতাপের মেজাজ ভালো নেই বোঝা যায়।
এমন খবর চেপে রাখার মতো নয় স্যার, বেরোবেই।
এ খবর বেরোনো মানে মুশকিল বাড়ানো। সারা দেশ কাশ্মীরকে ইস্যু বানিয়ে…
কাশ্মীর কি এখনও ইস্যু নয় স্যার?
মোহনলাল একটু অন্য গলায় কথাটা বলে বোঝেন হয়ত বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে।
আই মিন, ইট শুড বি…
আমি জানি কী করতে হবে। প্রতাপ ওঁর দিকে ঘুরে টেবিলে কাপ রেখে বলেন, আর আপনি কথায় কথায় ওখান থেকে চলে আসছেন কেন? ল অ্যান্ড অর্ডার…
নেই স্যার। হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আপনি এবার হুজত উল ইসলামকে রাশ টানতে বলুন। বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে যা হল এরপর আরও খারাপ কিছু হলে…
আই হ্যাড আ টক উইথ হিম। ওই মেয়েটা যাকে বিয়ে করেছে তার সঙ্গে ওর অ্যাফেয়ার ছিল।
হুজত বললেন?
প্রতাপ হাসেন। কাম অন মোহনলালজি। আজকালকার কোনো মেয়েকে জোর করে কেউ বিয়ে দিতে পারে?
কথাটা শুনে মোহনলালের কান লাল হয়ে যায়। একটা ক্লাস সেভেনে পড়া বাচ্চার সঙ্গে একটা দুধওয়ালার প্রেমের সম্পর্ক ছিল! কথা না বাড়িয়ে মোহনলাল উঠে পড়েন।
ওকে স্যার। আই টেক ইউর লিভ নাও।
অফিসের বাইরে এসে চোখ থেকে চশমা খুলে দু-আঙুল দিয়ে দুটো রগ চেপে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন।
ফিলিং সিক?
গলার আওয়াজে মোহনলাল ঘুরে তাকান। প্রতাপ রাইয়ের পি এ সাধনা কখন এসে দাঁড়িয়েছে।
লিটারালি সিক। স্যার কাশ্মীর নিয়ে কিছু শুনতেই রাজি নন। কেন বলুন তো?
সাধনা মাথা নীচু করে, মোহন স্যার, ওই মেয়েটাকে তো বাঁচাতে পারলাম না আমরা। দেখবেন যাতে আর কেউ ওর মতো বলি না হয়।
.
কুপর উপর, কুপর উপর…জলদি, জলদি। কুপর উপর…
কলকাতার মিনি বাসের থেকে ছোট আকারের সাদা রঙের বাসের পা-দানিতে দাঁড়িয়ে হেল্পার অনেকক্ষণ চিৎকার করে যাচ্ছে। বাসের মাথায় গুচ্ছের জিনিস, ভেতরে বসার জায়গা কম। যা আছে সব ভর্তি। দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকজন আরও চড়তে পারে, তাই শেষ মুহূর্তের হাঁকাহাঁকি।
কুপর উপর…আও আও…
আরও কয়েকবার ডেকে বাসের গায়ে হাত ঠুকে সিগনাল দিতে যাবে শাহিদ আর সইফ হন্তদন্ত হয়ে আসে। শাহিদকে দেখে একগাল হাসে হেল্পার।
সালাম ভাই, ছেড়ে দিচ্ছিলাম প্রায়।
কেন, বলেনি আমরা যাব?
বলেছে কিন্তু দেরি দেখে…উঠে আসুন।
সইফ বাসে ওঠার আগে ভালো করে চারদিক দেখে নেয়, চেনা কেউ চোখে পড়ে না। ক’দিন আগে বাবাকে বলেছিল কিছুদিনের জন্য বাইরে যেতে হতে পারে। আমির এত প্রশ্ন করেছেন যে পাগল হওয়ার জোগাড়।
বাইরে কেন? পড়াশোনা করতে তো যাবি না। নিশ্চয়ই বন্ধুদের সঙ্গে হাওয়া খেতে যাচ্ছিস?
না আব্বা। মানে…
আমার পয়সা সস্তা নয় যে তোকে ফুর্তি করতে টাকা দেব।
টাকা লাগবে না আব্বা।
মুখ ফস্কে সইফ বলে ফেলায় আমির আরও চেপে ধরেন।
টাকা লাগবে না! এদিকে বাইরে যাবি? বাত সমঝা নহী।
শাহিদ বলছিল…
খবরদার! শাহিদের নাম নিবি না। জো কিয়া উসনে বহুত গলত কিয়া। ওর সঙ্গে তোকে দেখলে আমি ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব।
এরপর আর সইফের পক্ষে সম্ভব হয়নি কিছু বলার। এদিকে যাওয়ার দিন এগিয়ে আসে। ওদের যেতে হবে শ্রীনগর থেকে কুপওয়ারা। সেখান থেকে পি ও কে। ইয়াসিনের লোক সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। বাস স্ট্যান্ডে লোক থাকবে, সেই ওদের নিয়ে যাবে।
কিন্তু শাহিদ, শ্রীনগর থেকে পি ও কে যাচ্ছি বললে কেউ যদি পুলিশকে…
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে শাহিদ।
বোলা না বাচ্চা হ্যায় তু। আরে ইয়ার, শ্রীনগর বাস স্ট্যান্ডে গেলে রোজ শুনতে পাবি ‘কুপর উপর’ বলে বাসে লোক তুলছে। এই ‘উপর’ হচ্ছে উসপার। ঘাবড়াস না, আমাদের ওপর ইয়াসিন ভাইয়ের হাত আছে। কুপওয়ারা পৌঁছে দেখবি, ওসব পুলিশ ফুলিশের চোখের সামনে দিয়ে খাতিরদারি করে আমাদের নিয়ে যাবে। কেউ ছুঁতেও পারবে না।
শাহিদের কথাই মিলে যায়। কুপওয়ারা বাস স্ট্যান্ডে নামতেই দুজন লোক এসে হাত মেলায়।
সব ঠিক ভাই?
হাঁ ভাই।
সইফ দেখে বাস স্ট্যান্ডে দূরে ক’জন পুলিশ ওদের দেখে আবার নিজেদের মধ্যে আড্ডায় মশগুল হয়ে যায়। লোকদুটো কথা না বাড়িয়ে ওদের গাড়িতে উঠিয়ে একজন ড্রাইভারের আসনে বসে, আরেকজন তার পাশে।
কতক্ষণ লাগবে? শাহিদ জানতে চায়।
এখান থেকে বর্ডার মাত্র ৩৭ কিলোমিটার।
সেখান থেকে কীভাবে যাব?
উৎসুক সইফ।
আপ টেনশান মত লো। সব সেট হ্যায়।
আর্মি পাহারা?
দুজনে হাসে। কুছ নহী হ্যায়।
সইফ অবাক তার সঙ্গে উত্তেজিতও। পাশে বসা শাহিদকে আড়চোখে দেখে হিংসে হয়। কী মারাত্মক কনফিডেন্স ওর ভেতর। কিছুতেই যেন ভয় নেই। সকালে বাস ধরতে আসার সময় গিরিজার পরিবারকে দেখে ও নিজে থেকেই কথা বলতে এগিয়ে যায়।
গিরিজা! চলে যাচ্ছ তোমরা?
কিছু বলে না গিরিজা। বাবার দিকে তাকায়।
খুব ভালো ডিসিশান নিয়েছেন। হাসতে হাসতে শাহিদ গিরিজার বাবার সামনে আসে, কোথায় যাচ্ছেন চাচাজি?
দিল্লি।
মাশা আল্লাহ! দেখুন আপনার মতো সবাই বুঝতে পারলে আর আমাদের কিছু করতে হত না।
গিরিজারা আর কথা না বাড়িয়ে জম্মুগামী বাসে উঠে পড়ে।
সইফকে দেখে গিরিজার চোখ ভিজে যায়। ছোটবেলার খেলার সাথী, ঘর, উঠোন সব ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। আর কোনোদিন এখানে ফিরে আসা হবে না, ফিরে আসা যাবে না। চারটে স্যুটকেস, তিনটে ব্যাগে পরিবারের তিনজন তাদের দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিলেও অদরকারি অথচ ভুলতে না পারা হাজারো স্মৃতি গুছিয়ে নিতে পারেনি। সেইসব দিনগুলো, যখন স্কুল ছুটির পর ডালের ধারে আখরোট খেতে খেতে গল্পে মশগুল গিরিজারা বাড়ি ফিরত। মাঝে একটা রাত, পরদিন আবার স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। তাতেই মনে হত কতদিন দেখা হয়নি! আর এখন? হয়তো এ জীবনে দেখাই হবে না।
সইফও ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, নিষ্পলক। মাস্টারজির কাছে গান শেখার দিনগুলো মনে পড়ে। এমনকী শেষ দিন ওর পায়ে চিমটি কাটাও।
শাহিদ হাত ধরে না টানলে হয়ত ওদের বাস ছাড়া অবধি ও ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকত।
ভাবতে ভাবতে কখন বর্ডারের কাছে চলে এসেছে খেয়াল করেনি সইফ। গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা এগোতেই গাছের আড়াল থেকে দুজন বেরিয়ে এসে সেলাম ঠোকে।
চলুন ভাই।
ওদের পেছন পেছন সীমানা টপকে শাহিদরা চলে আসে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে। সইফ একবার ঘুরে দেখে। জঙ্গলে ঘেরা জায়গায় কেউ কোথাও নেই।
আনপ্রোটেক্টেড ইন্ডিয়ান বর্ডার। শাহিদ হাসে।
কেন?
যাতে আমরা আসতে পারি। হাসতে হাসতে সইফের পিঠে চাপড় মারে শাহিদ, গভরমেন্ট আমাদের সঙ্গে আছে ইয়ার।
.
সঙ্গে আর কেউ থাক আর না থাক, আলিয়া জানে তারাকে ফিরিয়ে আনতে ওকে একাই যা করার করতে হবে। স্কুলে বেরোনোর সময় ব্যাগের মধ্যে রান্নাঘর থেকে ছুরিটা খাতা বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে ভরে নেয়।
আলিয়া, সবজি কাটার ছুরিটা পাচ্ছি না। কোথায় রাখলাম দেখ তো।
মায়ের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আলিয়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্কুলের পথ না ধরে ইমতিয়াজের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।
বড় রাস্তায় পেরিয়ে সবজি মণ্ডির উল্টোদিকের সরু গলিতে ঢুকে একদম শেষ মাথায় ইমতিয়াজের বাড়ি। আলিয়া জানে আজ শুক্রবার, বাড়িসুদ্ধ সবাই নামাজ পড়তে যাবে। গেটের সামনে এসে দেখে লোহার পাল্লা ভেজানো, ঠেলতেই খুলে যায়। সিঁড়ির নীচে জুতো খুলে উঠে এসে দরজায় হাত রাখে। সেটাও খোলা। পা টিপে টিপে এগিয়ে আলিয়া ভেতরে উঁকি মারে। নিশ্চিন্ত, কেউ নেই।
রান্নাঘরও ফাঁকা। তার মানে ইমতিয়াজের মা-ও বাড়ি নেই। দোতলায় উঠে বাঁ-দিকের ঘরে দরজার সামনে আসতেই আলিয়া আঁতকে ওঠে।
তার প্রিয় বান্ধবী তারা সিলিং থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে।
.
১৩
দুটো ডেটের মাঝের দিনগুলো দুর্বিষহ মনে হয়। হোটেলে বসে বাবার জন্য চিন্তায় মাথা খারাপ করা, শেফটেলের সঙ্গে হয় দেখা করতে যাওয়া, নাহলে ফোনে কথা বলা আর বাড়িতে মায়েদের খবর নেওয়া। আলিয়ার পাগল পাগল লাগে। কবে সব ঠিক হবে? কবে বাবাকে বাড়ি ফেরাতে পারবে?
কখনো মনে হয় শেফটেল এই কেসের জন্য পারফেক্ট উকিল। আবার ট্রায়ালের সময় মনে হয় যতটা ক্যাজুয়ালি শেফটেল ব্যাপারটা নিচ্ছেন ততটাও সহজ নয়। সরকার পক্ষ এমনভাবে মারকোকে আক্রমণ করে, আলিয়ার মনে হয় বাবা আর কোনদিন এখান থেকে বেরোতে পারবে না।
অনিন্দ্যর জন্য কষ্ট হয়। ছুটি শেষ হওয়ার পর ও বলেছিল বাড়ি ফিরে যেতে, শোনেনি।
জন আছে তো। প্লিজ গো ব্যাক।
বিয়ের সময় যে মন্ত্র পড়েছি সেটা শুধুই উচ্চারণ করিনি, মন থেকে বলেছি। চাকরি গেলে আবার আসবে, কিন্তু এই সময়টা তোমায় একা রেখে চলে গেলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।
সারাক্ষণ রুমে বন্ধ থেকে দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছিল। জেরুসালেমে এসে কোথাও ঘুরতে ইচ্ছে হয়নি। ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’ যাওয়ার জন্য অনেক বলাতেও আলিয়া রাজি হয় না।
বাবাকে মুক্ত করে দিক…সেদিন আমি নিজে থেকে যাব।
নিজের কাছে আলিয়াকে টেনে নিয়ে অনিন্দ্য বলে, ঈশ্বরের দরজায় গিয়ে না দাঁড়ালে তিনিই বা তোমার কথা শুনবেন কেন?
দরজায় না দাঁড়ালে তিনি শুনতে পান না? এই যে সবাই বলে তিনি অন্তর্যামী?
অনিন্দ্য চুপ করে যায়।
আলিয়ার মনে হয় এ জীবনে তার পরিবার তো এমন কোনো খারাপ কাজ করেনি, যার জন্য আজ এমন দিন দেখতে হবে!
নাতালিয়া রোজ ফোন করে কান্নাকাটি করেন। বলেন স্বামীকে ছাড়া এক মুহূর্ত তিনি বাড়িতে টিকতে পারছেন না। জনকে অনেক বলাতেও সে রাজি হয়নি মাকে আনতে।
মা এখানে এলে বাবাকে কোর্টে একটুর জন্য দেখলেও ভালো লাগত। আলিয়া যুক্তি দিয়ে দাদাকে বোঝায়।
নারে, উল্টো ফল হতে পারে। এ অবস্থায় বাবাকে দেখে মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। বাবার হাতে হাতকড়া, তাকে কেসের পর সেলে নিয়ে যাচ্ছে। মা বরদাস্ত করতে পারবে না।
ফিওডোরের মৃত্যু এবং ফেদিরের টেস্টিমনির পর শেফটেল বুঝতে পারছিলেন আলিয়া ভেঙে পড়ছে। মা সারার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, তুই সত্যি বল তো, ওই লোকটাকে ছাড়িয়ে আনতে পারবি?
চট করে উত্তর না দিয়ে একটু ভেবে শেফটেল বলেন, না পারলে এই কেস আমি নিতাম না মম। আমিও ইহুদি। আই নো আমাদের ওপর কী অত্যাচার হয়েছিল। সারা দেশ আমার বিরুদ্ধে যাবে এও জানতাম মম। বাট দ্য থিং ইজ, কে জি বি চক্রান্ত করে সাধারণ লোকেদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। দ্যাট আই কান্ট টলারেট।
আই আন্ডারস্ট্যান্ড। তোর ওপর এতবড় হামলার পরেও তুই না থামাতে বুঝেছিলাম ঠিক পথে আছিস বলেই পিছিয়ে আসিসনি। কিন্তু তাও, কোথাও একবার হলেও মনে হচ্ছে দিস ম্যান ইজ টু স্মার্ট। টিভিতে যখন দেখি অবাক হয়ে যাই। একটা লোক, যে কোনোদিন ট্রায়াল ফেস করেনি, তার মুখের একটা মাসলও কাঁপে না যখন তার দিকে আঙুল তুলে তাকে খুনি বলা হয়!
এটা আমাকেও প্রথম ক’দিন ভাবিয়েছে। পরে মনে হয়েছে কোর্টকে দেখাতে চায় না ও দুর্বল। শেফটেল ফোন তুলে নেন, আজ একবার আলিয়ার সঙ্গে কথা বলা দরকার। ওদের আসতে বলি।
কথা হয়ে গেলে আমায় দিস।
মিনিট দুয়েক কথা বলে শেফটেল মাকে ফোনটা ধরিয়ে দেন।
আলিয়া, আই অ্যাম শেফটেল’স মম, সারা।
হ্যালো।
তোমার ব্যাপারে ছেলের কাছে শুনি, সবটাই জানি। আজ ডিনারে এসো আমার বাড়ি।
না। এখন এসব…
হোটেলে খাচ্ছ নিশ্চয়? খাওয়া বন্ধ তো করে দাওনি! তাহলে এখানে এসে খেতে অসুবিধে থাকার তো কথা নয়।
সারার কথার সামনে আলিয়া কোনো যুক্তি খাড়া করতে পারে না।
ওরা তিনজনে সন্ধেবেলা শেফটেলের বাড়ি পৌঁছে যায়। বড় বড় কাচের জানলা ঘেরা ক্রিম রঙের সুন্দর দোতলা বাংলো। গেট থেকে বাড়ির দরজা অবধি দুদিকে নানা বাহারি গাছের মেলা। বেল বাজাতে হাসিমুখে সারা বেরিয়ে আসেন।
হ্যালো ডিয়ার। কাম ইন।
আলিয়াকে জড়িয়ে ধরতে ওর মায়ের কথা মনে হয়। সব মায়েদের স্পর্শ বোধহয় একরকম। লিভিং এরিয়ায় বসার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই শেফটেল নীচে নেমে আসেন। কেস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
পরের ডেটে সরকার পক্ষ বিখ্যাত ফেসিয়াল এক্সপার্ট প্যাট্রিশিয়াকে নিয়ে আসছে। মারকোর এখনকার আর পুরোনো ছবি মিলিয়ে…
এখনকার ছবি বলতে?
যে সেলে মারকো আছে সেটা আন্ডার সিসি ক্যামেরা। সেখান থেকেই ফুটেজ নিয়ে চেক করবে।
চেক করে কী দেখবে? দুজন এক কিনা? জন জিগ্যেস করে।
এক্স্যাটলি।
কিন্তু মিলবে না তো। বোথ আর ডিফারেন্ট পিপল।
মিলবে না, কিন্তু ওরা মেলাবে। বলবে এক লোক। তাই পরের স্টেপ ভাবা আছে। আমরা আনব ভিভিয়ানকে যার কাছে প্যাট্রিশিয়া কাজ শিখেছে। হি ইজ দ্য বেস্ট ইন ট্রেড। সো নো ওয়ারিজ।
সফট ড্রিঙ্কের গ্লাস নিয়ে আলিয়া সোফায় হেলান দিয়ে বসে।
তাহলে এর পরেই বাবার টেস্টিমনি হবে আর তারপর ফাইনাল ভারডিক্ট?
নো। শেফটেল হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দেন, আই হ্যাভ অ্যানাদার প্ল্যান।
তিনজনে উৎসুক মুখে তাকায়।
ইভান ডেমিয়ানুকের যে আইডি কার্ড কোর্ট দেখালো সেটা এবার জাল প্রমাণ করার সময় এসে গেছে। আই হ্যাভ দোজ এভিডেন্সেস। তার আগে এই সব নাটক হয়ে যাক…
শেফটেলকে জন থামায়। আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে কেস টানার সত্যি ক্ষমতা নেই। আপনার ফি…
ডিড আই আস্ক ফর ইট?
শেফটেল চশমার ফাঁক দিয়ে জনের দিকে তাকিয়ে বলেন, কেস টেনে টাকা বাড়াবার ইচ্ছে আমার নেই জন ডেমিয়ানুক। জানি আপনাদের কন্ডিশান। রিলাই অন মি। প্লিজ।
অনেক কেসের কথা হয়েছে। সারা চিকেন নাগেটসসের প্লেট এনে রাখেন টেবিলের ওপর। এবার একটু গল্প করা যাক। নাও।
সবাই একটা দুটো করে নাগেট তুলে নেয়।
আন্ট সারা, আই হ্যাভ আ ফিউ থিংস টু নো, আলিয়া ছোট্ট করে নাগেটে কামড় বসায়। এখানে আসার আগে হলোকস্ট সম্পর্কে জানলেও এত ডিটেলসে শুনিনি। কোর্টে যা চলছে সেটা বাবার ক্ষেত্রে সাজানো হলেও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তো সাজানো নয়। আপনার চেনা কেউ আছেন যিনি এসবের মধ্যে দিয়ে গেছেন?
সারা অল্প হেসে শেফটেলের দিকে তাকান, তিনিও হাসেন।
ওদের অভিব্যক্তি দেখে অনিন্দ্যর মনে হয় আলিয়ার প্রশ্ন করাটা সমচীন হয়নি।
আজ আমরা একটু অন্যরকম সময় কাটাতে এসেছি, এসব প্রসঙ্গ থাক আলিয়া। অনিন্দ্য আরেকটা নাগেট তুলে নেয়, অনেকদিন পর নাগেটস খেলাম।
জন বোঝে অনিন্দ্য পরিবেশ হালকা করতে চাইছে। সেও তার খালি হয়ে যাওয়া গ্লাস শেফটেলের দিকে এগিয়ে দেয় রিফিলের জন্য। শেফটেল উঠে গিয়ে সেলার থেকে ড্রিঙ্ক বানিয়ে জনের হাতে দেন।
মম, আর ইউ ওকে?
আই অ্যাম সান। সারা ধরা গলায় বলেন।
আই অ্যাম সরি আন্ট সারা…
আলিয়াকে থামিয়ে সারা বলেন, আমার বাবা একজন ক্যাম্প সারভাইভার।
সবাই চুপ। অনিন্দ্য জন দুজনেরই খাওয়া থেমে গেছে। আলিয়া অপ্রস্তুতভাবে সারার পাশে এসে বসে।
সরি। আই থট…আমি…
তুমি কী করে জানবে? শেফটেল কাউকে এসব বলে না।
ইজ হি অ্যালাইভ?
লাস্ট ইয়ার চলে গেলেন। বাবার যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে মা। সেই ১৯৪০ সাল থেকে একে অপরকে ছেড়ে ওরা থাকেনি। মৃত্যুও তাদের বেশিদিন আলাদা করতে পারেনি।
১৯৪০ মানে…
বাবার যখন পনেরো বছর বয়স তখন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। জানি না তোমরা জানো কিনা এই যে এত নাৎসি সেনাদল, তারা কিন্তু বেশিরভাগ আদতে সেনা নয়। সব সাধারণ মানুষ। হিটলার যখন ঠিক করল পোল্যান্ড আক্রমণ করবে তখন দেখল তার লোকবল দরকার। ছুতোর, বেকারি মালিক, জমাদার থেকে শিক্ষিত ডবল ডিগ্রিধারী লোকেদের রিক্রুট করতে লাগল। তাদের কিছু মাস ট্রেনিংয়ের পর পাঠানো হল এক একটা ক্যাম্পে। ইনিশিয়ালি কেউ জানত না কী করতে যাচ্ছে। তারপর যখন শুনল মানুষ মারতে হবে, অনেকে পিছিয়ে আসে। অনেকে হিটলারের নেক নজরে থাকার জন্য রয়ে যায়। তারাই হয়ে ওঠে এক-একজন জল্লাদ।
সারা ঘাড় ঘুরিয়ে ডানদিকের শেলফে রাখা বাবার ছবির দিকে তাকান।
বাবাদের ট্রেনে করে নিয়ে গিয়ে সোবিবোর ক্যাম্প স্টেশনে নামানো হয়। আমার দাদু নামকরা পেইন্টার ছিলেন। তাদের যে সময় ধরে আনা হয়, বাবা দাদুর রঙ-তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে বসেছিল। তাই তার জামায় রঙের দাগ ছিল।
নাৎসি বাহিনী সবার নামধাম নোট করতে করতে জানতে চায় কেউ ইট গাঁথনির কাজ জানে কিনা। ভিড়ের মধ্যে থাকা একটি মেয়ে এগিয়ে এসে হঠাৎ বাবার হাতটা তুলে ধরতে এক নাৎসি সেনা এগিয়ে আসে। বাবার রঙ লাগা নোংরা জামাকাপড় দেখে মনে করে কাজ জানা মিস্ত্রি। তাকে তখনি ধাক্কা মেরে ক্যাম্পের ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। ডরমেটরিতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে যখন কাউকে দেখতে না পেয়ে বাবা বাইরে বেরোতে যাবে তখন সেই মেয়েটির সঙ্গে আবার দেখা।
বাবা জানতে চায় ট্রেন থেকে নামা ৬০০০ লোক কোথায়? মেয়েটি বলে ৫৯৯৮ জনকে সেই মুহূর্তে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বেঁচে আছে শুধু তারা দুজন।
ঈশ্বর বাবার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়ে এক অমূল্য রত্ন তার হাতে সেদিন তুলে দিয়েছিলেন। এই মেয়েটি আমার মা।
বাকিদের মেরে ফেলল নিয়ে এসে? কেন? অনিন্দ্য হতবাক।
কারণ তার ঠিক পরেই আর এক ট্রেন লোক আসছিল, তাদের থাকার জায়গা ছিল না।
সারা চোখের জল মোছেন। ক্যাম্পে পৌঁছে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে মাথা ন্যাড়া করে, বিবস্ত্র করে গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হত। বলা হত স্নান করানো হবে। শয়ে শয়ে মানুষ সেই বিশ্বাসে গিয়ে আর ফিরত না।
শেফটেল দেখেন ওরা তিনজনে অবাক হয়ে তার মায়ের কথা শুনছে।
একই স্কুলে দুজনে পড়ত, মা দু-বছরের জুনিয়র ছিল। বাবা স্কুলে ফুটবল টিমকে রিপ্রেসেন্ট করত বলে মা আগে থেকে চিনত, ভালো লাগা ছিল। নিজে বেঁচেছিল কন্সট্রাকশানের কাজ করতে পারে বলে আর বাবাকে…বাবা সেই কৃতজ্ঞতা ভোলেনি। যদিও ক্যাম্পের ভেতর ছেলেমেয়েদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা ছিল তাও তারা একে অপরকে ছাড়া খেত না। এমনও দিন গেছে নিজের ভাগের এক টুকরো কেক বা ব্রেড না খেয়ে বাবা মাকে খাইয়ে দিয়েছে। ক্যম্পের কাজের মধ্যে মায়ের ডিউটি ছিল টয়লেট ক্লিন করা, লুকিয়ে সেটা বাবা করে দিত। ধরা পড়ে মারও খেয়েছে কিন্তু তাও থামেনি। গ্যাস চেম্বার থেকে বডি বার করে মাঠে ফেলে আসার পর বাবার হাত ধরে মা একটা কথাই বলত, ‘দিস টু শ্যাল পাস’।
ওনারা ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফিরলেন কী করে?
গড হেল্পড দেম, মে বি।
ইয়েস বাট হাও? আলিয়া জানতে চায়।
পালানোর প্ল্যান করল দুজনে।
সে কী! নাৎসিদের পাহারা থেকে পালানো মানে তো…
ডেথ। ওরা জানত। কিন্তু আর পারছিল না। একে পেটে সারাক্ষণ খিদে, তারপর অমানুষিক খাটনি। তক্কে-তক্কে ছিল কোন সময় পালানো যায়।
একদিন সন্ধের সময় কাউন্টিং করে ভেতরে ঢোকানোর পর মা অসহ্য পেটে ব্যথার অছিলায় বাথরুম যায়। বাবাও তাই। ক্যাম্পের ফেন্সিং হিসেবে মোটা খড় দেওয়া থাকত। রাতের অন্ধকারে বাথরুম থেকে বেরিয়ে খড়ের ভেতর মাঝ রাত অবধি দুজনে লুকিয়ে ছিল। তারপর রাত বাড়তেই পাহারারত অফিসাররা যখন মদ খেয়ে বেহুঁশ, সেই সময় কোনোমতে ফেন্স ভেদ করে দুজনে পালায়।
কতক্ষণ দৌড়েছিল জানে না, একসময় মা জ্ঞান হারায়।
দুহাতে মুখে ঢেকে আলিয়া চুপ করে বসে থাকে। সারা তার পিঠে একটা হাত রাখেন।
বাবা-মা দুজনেই বাকি জীবনটা আনন্দে থাকলেও সোবিবোরের কাটানো একটা মুহূর্তের কথাও ভোলেনি। ভোলা সম্ভব? তোমার বাবাকে যারা রোজ গালিগালাজ করছে, শাপশাপান্ত করছে, তাদের চোখের জলের প্রত্যেক কণায় আগুন ঝরছে আলিয়া। এ আগুন আজীবন জ্বলবে, তোমার বাবা নির্দোষ প্রমাণ হলেও।
.
দোষীদের শাস্তি হবে না? অম্লান কাগজে খবরটা পড়ে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
আত্মহত্যা কোথায়? এ তো হত্যা! একটা নিষ্পাপ বাচ্চা মেয়েকে সবাই মিলে মরতে বাধ্য করল।
টেবিলে খবরের কাগজটা আছড়ে ফেলে সে অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারি করে বেড়ায়।
সরোজ, আর সময় নষ্ট না করে চল কাজে লেগে পড়ি।
অম্লানের স্কুলের বন্ধু সরোজ প্রসাদ। ক্লাস সিক্সের পর দিল্লি শিফট হয়ে যায়। তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে অম্লানের। সরোজ বাবার সিমেন্টের ব্যবসায় বসলেও ফিল্ম মেকিংয়ের দিকে ঝোঁক। মাঝে মাঝেই একটা ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে এদিক-ওদিক বেরিয়ে পড়ে। কখনো জঙ্গল, কখনো পাহাড়, কখনো আদিবাসীদের জীবন বৃত্তান্ত শুট করে আনে। এডিট করে ছোট ছোট ছবি বানায়। অম্লানের মুখে ডকুমেন্টরির কথা শুনে উৎসাহিত হয়ে ওকে চলে আসতে বলে। তবে এখন অম্লানের প্রস্তাবে সে দোনামোনা করে।
তোর ভয়টা কোথায়?
কাশ্মীর এখন সেফ নয়। বিপদে পড়লে বাঁচাবার কেউ নেই।
তাহলে তুই এত আশা দেখিয়ে আমাকে ডাকলি কেন?
অম্লান বন্ধুর মুখোমুখি বসে।
জানিস, কলকাতায় খবরটা পড়ার পর আমি বারবার ওই মেয়েটার জায়গায় আমার বোনকে বসিয়ে দেখেছি আর অস্থির হয়েছি। তোরও তো বোন আছে, তোর কষ্ট হচ্ছে না?
হচ্ছে ভাই।
তাহলে পিছু হটছিস কেন?
কারণ আছে। এই ক’দিন আগে আমাদের কলোনিতে কাশ্মীর থেকে আসা এক পণ্ডিত ফ্যামিলি আশ্রয় নিয়েছে। আমার বোনের সঙ্গে ওই পরিবারের মেয়ের স্কুলে আলাপ হয়েছে। যা গল্প শুনলাম তারপর…
এটা আগে বলবি তো! অম্লান লাফিয়ে ওঠে, এখুনি আমার সঙ্গে আলাপ করা। নাম কী?
মেয়েটির নাম গিরিজা কিচলু।
.
১৪
দেখলে মনে হয় পরিত্যক্ত বাড়ি, রাতে রীতিমতো গা ছমছম করে। সন্ধেবেলা কোনার ঘরটায় কোনোদিন টিমটিম করে আলো জ্বলে বা জ্বলে না। লোহার গেট সবসময় ভেতর থেকে তালা মারা। পার্বতী সারাদিন ঘোরের মধ্যে থাকেন। যেদিন ইচ্ছে হয় রান্না করেন, না হলে করেন না। পাড়ার কেউ এসে খাইয়ে যায়। কারোর সঙ্গে কোনো কথা হয় না।
যারা আসে তারাও বলে না। কী বলবে? চোখের সামনে একটা ফুটফুটে মেয়েকে মেরে ফেলল, কেউ কিছু করতে পারল না। থানা পুলিশ কম করেননি শ্রীধর পণ্ডিত। হাতে পায়ে ধরলেও কেউ তার কথা কানে তোলেনি।
আরবাজের ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না। অন্যায় মেনে শুধু নীরবে দেখে গেছেন। এই আক্ষেপ তাঁর কোনোদিন যাবে না। ডিউটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে শ্রীধরের দরজার সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে অনেকবার ভেবেছেন ভেতরে যাবেন, পারেননি। রাতে ঘুমের মধ্যে তারার অসহায় মুখটা দেখে ধড়মড় করে উঠে বসেছেন বেশ কয়েকবার।
ইয়া আল্লাহ! এ কী হয়ে গেল? তুমি আমার হাতে এমন শিকল পরিয়ে রেখেছ যে চোখের সামনে খুনিগুলো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ আমি তাদের ধরতে পারছি না।
শ্রীধরের ছটফটানি আরও বেশি। তিনি বাবা। তাঁর একরত্তি মেয়েটাকে যখন স্কুল থেকে তুলে নিয়ে গেল তিনি তখন অফিসে। কয়েকটা পেন্ডিং কাজ সারতে দেরি হওয়ায় সেদিন ভালো করে লাঞ্চ করাও হয়নি, বস এত তাড়া দিচ্ছিলেন। ফিরতি পথে স্কুটার নিয়ে মায়সুমা বাজারের সামনে দিয়ে আসার সময় সবজিওয়ালার সামনে দাঁড়াতেই সে কেমন সিঁটিয়ে যায়।
কী হল, ভূত দেখলে নাকি? জলদি টমেটো, শাক আর নদ্রু দাও। আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।
শ্রীধর বাজারের ব্যাগটা এগিয়ে দিতে পাশের গলি থেকে দুজন বেরিয়ে এসে ওঁকে দেখে বিশ্রীভাবে হাসতে থাকে।
নদ্রু কিনছেন?
পাত্তা না দিয়ে টাকা মিটিয়ে শ্রীধর স্কুটার স্টার্ট দিতে যাবেন, এমন সময় ছেলেদুটো সামনে এসে দাঁড়ায়।
আজ রাতে ভাবীকে বলবেন তিনজন নয়, চারজনের রান্না করতে। নতুন অতিথি আসবে।
কথার মানে সেদিন বুঝতে পারেননি। কখনো তিনি দুঃস্বপ্নেও দেখেননি তাঁর তারাকে একদল হিংস্র পশু টানতে টানতে মসজিদে নিয়ে গিয়ে ধর্ম পাল্টে ইমতিয়াজের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। অপরাধ? সে ইয়াসিনের মুখে মুখে কথা বলেছিল।…মেয়েটা নিশ্চয়ই সে সময় বাবাকে খুঁজেছে? সেই মুহূর্তে বাবাই হয়তো একমাত্র পরিত্রাতা যে তাকে শয়তানের হাত থেকে রেহাই দিতে পারত। নিশ্চয় ওদের হাতে পায়ে ধরে ‘ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও’ বলে লুটিয়ে পড়েছিল সে…।
যখন ইমতিয়াজের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যখন লালচক থেকে ব়্যালি করে ম্যাচের ট্রফির মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গোটা শহরকে দেখানো হচ্ছিল তখন তারার অবস্থা কী হয়েছিল? লজ্জায় অপমানে মনে মনে সেদিনই কি ঠিক করে নিয়েছিল এ জীবন আর রাখবে না?
সিলিং থেকে নামিয়ে আনার পর গলার লাল হয়ে যাওয়া ফাঁসের দাগে হাত বুলিয়ে শ্রীধর কেঁপে উঠেছিলেন…মেয়েটার কত না লেগেছে! তাও দাঁতে দাঁতে চেপে ঝুলে থেকেছে পশুটার হাত থেকে বাঁচার জন্য!
সেদিন শ্রীধর যখন খবর পেয়ে পৌঁছোন তখন ব়্যালির শেষে তারাকে আবার ইমতিয়াজের সঙ্গে গাড়িতে তোলা হচ্ছে।
তারা!
তাঁর গলার আওয়াজ তারার কানেও পৌঁছেছিল। সে শুধু ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকিয়েছিল। এক পাও এগোয়নি, কিচ্ছু বলেনি।
মেরি বেটি কো ছোড় দো—বলে শ্রীধর ইমতিয়াজের হাত থেকে মেয়েকে ছাড়াতে গিয়ে দেখে সে তারার হাতটা শক্ত করে ধরে পশুর মতো হাসছে।
ও এখন তসলিমা, আমার দওলত। আমার কথামতো কাজ করবে।
ইমতিয়াজ!
সজোরে থাপ্পড় মারেন শ্রীধর। অপনি অওকাদ মত ভুলো।
লাল হয়ে যাওয়া গালে হাত বুলিয়ে ইমতিয়াজ তারাকে ডানহাতে জাপটে ধরে।
অওকাদ মালুম হ্যায়। আমি এখন আপনার জামাই, অস্বীকার করার কোনো রাস্তা আছে? আমাদের নিকাহর এই এতগুলো লোক সাক্ষী। আজকের পর তসলিমা আমার কাছেই থাকবে। খবরদার যদি ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন! করলে মেয়ে আর বাঁচবে না।
ইমতিয়াজের শেষ কথাগুলো শ্রীধরের কানে আজও বাজে। একদল গুন্ডা মেয়েটাকে নিয়ে চলে গেল। অক্ষম বাবা কিছু করতে পারেননি। গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার পর আলিয়া অনেকক্ষণ ছুটেছিল পেছন পেছন, বন্ধুকে বাঁচাতে। এ দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলে শ্রীধরের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সারারাত ঘরময় পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়ে দুম দুম করে দেওয়ালে মাথা ঠোকেন।
‘মেরি বেটি, মেরি বেটি’ বলে তাঁর হৃদয় নিংড়োনো কান্না বাড়িটার দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফেরে।
পারলাম না। আমার তারা চলে গেল, আমি বাঁচাতে পারলাম না!
কাঁদতে কাঁদতে ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে এসে মহাদেবের মূর্তি হাতে তুলে নিয়ে বলেন, কী করলে? কী করলে তুমি? জন্ম থেকে শুধু তোমায় মেনেছি। এই মাথা শুধু তোমার সামনেই নত হয়েছে…তার এত বড় শাস্তি? মেয়েটা সোমবার করে তোমার মাথায় জল ঢেলে উপোস ভাঙত। তোমার বোধহয় ওর মতো ভক্তের ভক্তির দরকার নেই, তাই না? তাই তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে না! তোমার মতো স্বার্থপর ঈশ্বরের আমার বাড়িতেও আর কোনো জায়গা নেই। জানব তারার সঙ্গে তুমিও মারা গেছে, চিরতরে।
কথাগুলো বলে শ্রীধর ঘোরের মধ্যে শিবমূর্তি দেওয়ালে ছুড়ে মারেন। খানখান হয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে মাটির শিবমূর্তি।
কী হল?
পার্বতী পাশের ঘর থেকে আতঙ্কিত হয়ে ছুটে আসেন। কীসের আওয়াজ? নিশ্চয় তারা কিছু ভেঙেছে? জানি, আচারের শিশি। খালি চুরি করে আচার খাবে। কতবার বলেছি খাস না, গানের গলা নষ্ট হয়ে যাবে। শুনলে তো! পার্বতী ছদ্ম রাগে বলেন, যাই রান্নাঘরটা পরিষ্কার করি।
.
মরশুম পালটাচ্ছে। বিকেলের পর ঠান্ডা বাড়ছে, বাইরে থাকা যাচ্ছে না। তাই বাগানের বদলে সন্ধের মিটিং হুজত বাইরের ঘরেই বসান। দলের কিছু লোক তাকে ঘিরে বসে আর উল্টো দিকে ইয়াসিন মালিক। হুজতের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে আছে সে। সামনে ট্রেতে চা, চানাচুর, মেওয়া। বাটি থেকে কয়েক টুকরো কাজু মুখে ফেলেন হুজত।
মুখে হাসি দেখছি ইয়াসিন!
মকসদ কামিয়াব হচ্ছে ভাইজান। তারার ঘটনার পর পণ্ডিতরা এবার ভয় পাচ্ছে। বেশ কিছু পরিবার বিদায় হচ্ছে কাশ্মীর ছেড়ে। বাকিরাও যাতে যায় তার…
আহিসতা। আমাকেও গদি সামলাতে হয়।
আপনার ফিকর কীসের? দিল্লি তো…
দিল্লি হাতে ততদিন, যতদিন প্রতাপ রাই চেয়ারে বসে। তার দাদুর হাত ধরেই কাশ্মীরের স্পেশাল স্ট্যাটাস হয়েছিল আর এখন নাতিও আমাদের ফরে, আই নো। তবে যে-কোনোদিন গদি উল্টে যেতে পারে। নতুন সরকার এলে কী হবে সেটাই চিন্তা বাড়াচ্ছে।
নতুন সরকার এত সহজে আসবে না।
ওনার টার্ম শেষ হওয়ার আগে পণ্ডিতদের টার্ম খতম হয়ে যাবে সাব। ১ জানুয়ারি আজাদ কাশ্মীরের ফ্ল্যাগ লালচকের ঘণ্টাঘরে উড়ছে, ইনশাআল্লাহ!
তার আগে আমায় কিছু একটা ভাবতে হবে, নাহলে…হুজত বিড়বিড় করে।
কিছু বললেন?
নাথিং। চায়ের কাপ তুলে নেন হুজত, অব বতাও ওপারের খবর কী?
বড়িয়া। ফান্ডিং আসছে রেগুলার। তার সঙ্গে যা চাইছি তাই। এখানকার বাচ্চা বাচ্চা বলছে ‘উসপার জায়েঙ্গে ক্যালাশনিকভ লায়েঙ্গে’।
মাশাআল্লাহ! হুজত হা-হা করে হাসেন, ট্রেনিং ক্যায়সা চল রহা হ্যায়?
সুপার! রোজ চারটে-পাঁচটা করে ছেলে যাচ্ছে এখান থেকে। ভালো তৈরি হচ্ছে, লেকিন জো লড়কা উসদিন মেয়েটাকে কিডন্যাপ করতে হেল্প করল, শাহিদ, ও লাজওয়াব! ওকে দিয়ে অনেক কিছু হবে।
.
পি ও কে-তে ট্রেনিং ক্যাম্পের ট্রেনার আব্দুলও ভেবেছে একই কথা, শাহিদকে দিয়ে অনেক কিছু হবে।
বহুত জোশ হ্যায় তুঝমে। আবদুল শাহিদের হাত থেকে বন্দুক নিয়ে জায়গায় রেখে দেয়, আগ লগা দেগা তু উসপার।
শাহিদ হেসে আদাব জানায়।
তেরা দোস্ত ভি জবরদস্ত হ্যায়। দুজনে মিলে তো কাশ্মীর লুটে নিবি রে!
আব্দুল একটা সিগারেটের প্যাকেট শাহিদ আর সইফের দিকে বাড়িয়ে দেয়। তিনজনে সিগারেট ধরিয়ে ঘরের বাইরে আসে। রাত হয়ে গেছে। আকাশে টিমটিম করছে তারা, বাঁকা একফালি চাঁদ। সামনে অনন্ত অন্ধকার, ঠিক ওদের জীবনের মতো। বাঁকা চাঁদের মতো আলো নেই, দেখাবার লোকও নেই।
সইফের বাড়ির কথা মনে হয়। পনেরো দিন হয়ে গেছে সে এখানে। শাহিদের সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছে বললেও এতদিন বাড়ির বাইরে…বাবা কী করছে কে জানে? ফিরে গিয়ে কী করে সামনে দাঁড়াবে, কী বলবে? মনটা বাড়ির জন্য কেমন করে ওঠে। ইচ্ছে করে চলে যেতে কিন্তু হাঁড়িকাঠে মাথা গলিয়েছে যে; বার করতে পারবে না। সিগারেট টানতে টানতে শাহিদদের থেকে একটু দূরে এসে ওপারের কালো পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে সইফ। ওখানেই তার বাড়ি। ঘড়িতে রাত দশটা। এতক্ষণে বাবা, মা, বোন খেয়ে শুয়ে পড়েছে নিশ্চয়!
.
আমির শুয়ে পড়েছেন ঠিকই, তবে ঘুম আসে না। ছেলের জন্য বড্ড চিন্তা হয়। বদ সঙ্গে পড়ল কিনা…পড়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিত। কারণ শাহিদ আছে সঙ্গে। ভয় হচ্ছে সেও কি ‘উসপার’ গেল ট্রেনিং নিতে?
ঘুম নেই আলিয়ার চোখে, সেও জেগে আছে। সময় গুনছে। এখনও নীচের রান্নাঘর থেকে বাসনের আওয়াজ আসছে মানে রিফত জেগে আছেন। তাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। ঘরের এক কোণে রাখা বোরখা গায়ে চাপাতে গিয়ে পকেটে হাত পুরে দেখে নেয় ছুরিটা আছে কিনা। আছে। এটা আজ কাজে লাগতে পারে।
ঘরের জানলা থেকে উঁকি মেরে দেখে এতক্ষণে নীচের আলো নিভে গেছে। আরও প্রায় পনেরো মিনিট অপেক্ষা করার পর আস্তে আস্তে একতলায় নামে আলিয়া। গেটের তালা খুলে, বাইরে থেকে হুড়কো টেনে গলি ধরে হাঁটতে থাকে।
রাস্তায় একটাও লোক নেই। কুকুরগুলো ঘাড় তুলে চেনা মুখ দেখে আবার শুয়ে পড়ে। কয়েকমাস আগে হলে ওর হয়ত ভয় করত কিন্তু এখন আর করে না। বড় রাস্তায় এসে দাঁড়াতে শাল মুড়ি দেওয়া এক ব্যক্তি ওর দিকে এগিয়ে আসে। কাছে এসে মুখের ঢাকা সরিয়ে দেন অফিসার আরবাজ।
আমি আবারও বলছি আলিয়া, বাড়ি যাও।
আলিয়া মাথা নাড়ে, মুখে কোনো কথা নেই। ওর চোখের ভাষা পড়ে আরবাজ আর কিছু বলতে সাহস পান না।
ঠিক আছে, এসো। কিন্তু তুমি কিছু করবে না।
দুজনে চারদিক দেখতে দেখতে খানিক হেঁটে, খানিক দৌড়ে হাজির হয় ইমতিয়াজের বাড়ির সামনে। গেট ভেতর থেকে বন্ধ। আরবাজ পাঁচিল টপকে হাত বাড়িয়ে আলিয়াকে ভেতরে আনেন।
অন্ধকার বাড়ি। একতলায় ইমতিয়াজের বাবা, মা, ভাই থাকে আর দোতলায় ইমতিয়াজ। আগে থেকেই খবর নিয়ে রেখেছেন আরবাজ। ক্যাঁচ শব্দে কাঠের দরজা খুলে ওরা সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে ওপরে উঠে আসে।
ভেজানো পাল্লা খুলতে দেখা যায় ইমতিয়াজ পরম শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। ঘরটা দেখতেই তারার ঝুলন্ত শরীরটা আলিয়ার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রাগে ওর মুখ লাল হয়ে যায়। ছুরি হাতে নিয়ে মারতে উদ্যত হলে আরবাজ খপ করে হাত ধরে ফেলে।
বোলা না, নহী। ওকে আমি ধরব, জিন্দা।
কোমরে জড়ানো মোটা দড়ির গোছা বার করে ইমতিয়াজের হাতে পরাতে গিয়ে থেমে যান আরবাজ। হাতের তালু ভেজা লাগছে কেন? পকেট টর্চ বার করে জ্বালাতেই দেখা যায় রক্তে ভেসে যাচ্ছে ইমতিয়াজের শরীর। কেউ ওদের আগে এসে ওকে খুন করে গেছে।
.
