৩০
কোথায় যাবে বলো? আমিও যাব।
তুমি এতদিন পরে বাড়ি এলে, ছেলে-বউমা, নাতি-নাতনিদের নিয়ে আনন্দ করো…
আমার সব আনন্দ ঘুরে ফিরে তুমিতেই।
মারকোর গালে হাত রাখেন নাতালিয়া। সেইজন্য তুমি আমাকে ক’দিন ছুটি দেবে আমি জানি। একটাই রিকোয়েস্ট। কোথায় যাচ্ছি বলব না, তবে আই উইল বি সেফ, আলিয়া থাকছে সঙ্গে।
বলেননি নাতালিয়া যে তিনি রেবেকার সঙ্গে তার অতীত দিনে ফিরে যেতে চলেছেন। কিন্তু কেন সেখানে, যেখানকার ভীতি ওকে তাড়া করে বেড়ায়? সেদিন সুপার মার্কেটে জ্ঞান হারানোর পর রেবেকা তাকে তার বাড়ি নিয়ে যান। নাতালিয়ার পার্স থেকে বাড়ির নম্বর পেয়ে আলিয়াকে খবর দিলে সে মাকে নিতে আসে।
আপনাকে দেখে মম ফেইন্ট হয়ে গেল? স্ট্রেঞ্জ!
স্ট্রেঞ্জ নয় আলিয়া। শি হ্যাজ আ হিস্ট্ররি…
না না! এসব বাজে কথা। জড়োসড় নাতালিয়া কাউচে আধশোওয়া অবস্থায় চেঁচিয়ে ওঠেন।
ভয় কাটাতে রেবেকা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
মাই ডিয়ার, আই অ্যাম আ হিলার। বুঝতে পারছি তুমি নিজেকে নিয়ে কুঁকড়ে আছ। ওপেন আপ।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না নাতালিয়া।
রেবেকা, আমার সব শেষ হয়ে যাবে।
হবে না। ইউ আর অ্যান অ্যাঞ্জেল।
সাধ্য সাধনা করে তার ফেলে আসা দিনের কথা মেয়েকে বলতে শুরু করেন। জানান একমাত্র এক বান্ধবী ছাড়া এ কথা আর কেউ জানে না। আলিয়ার কাছে এটা কতটা বিস্ময়ের তার মুখ দেখেই বোঝা যায়।
মম, ডিড ইউ ডু এনিথিং রঙ?
আলিয়া জানতে চায়।
না, সেরকম কিছু…
তুমি গ্যাস চেম্বারে মানুষ মেরেছ?
নো, নেভার! নাতালিয়ার মুখ ঘৃণায় বিকৃত হয়।
তাহলে কীসের ভয়?
রেবেকা তার কাউচের পাশে স্টুল টেনে বসে।
ইউ হ্যাভ ডান গুড টু আস। আমাদের বাঁচতে সাহায্য করেছ, রোজ খেতে দিয়েছ, নরক থেকে উদ্ধার করেছ…এগুলো প্রত্যেকটা ভালো কাজ। যদি কেউ কখনো তোমায় কাঠগড়ায় তোলে, আমি বাকি সারভাইভারদের নিয়ে কোর্টে এসে সাক্ষী দেব। বলব তুমি আমাদের ভগবান ছিলে।
কথাগুলো এতটাই স্পর্শ করে নাতালিয়াকে যে তিনি রেবেকার হাতদুটো ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন। রেবেকা আলিয়াকে ইশারা করেন মাকে শান্ত করতে।
মম, তুমি একটা উদাহরণ তুমি কি জানো?
চোখের জল মুছে আলিয়াকে কাছে টেনে নাতালিয়া বলেন, প্রমিস মি, এটা শুধু তোমার মধ্যে রাখবে?
আই প্রমিস।
এক কাজ করি চলো। আমরা দুই বুড়ি মিলে আউশুইট গিয়ে তোমার খারাপ স্মৃতিগুলো বাকি জীবনের মতো ওখানে কবর দিয়ে আসি।
দুই নয়, আমিও যাব। লেট মি উইটনেস আউশুইট। মাকে মেন্টালি সাপোর্ট করার জন্য আলিয়া বলে।
.
রাতে ভয়ে ঘুমোতে পারি না। এই বুঝি সাপে কামড়ালো, বিছে বেরোলো! কত লোক এখানে এভাবে মারা গেছে কেউ খবর রাখে?
কেউ খোঁজখবর করে না?
মিনিমাম খাবার জলের ব্যবস্থা নেই!
জম্মুর মিস্রিওয়ালা, নাগরোটা ক্যাম্প ঘুরে তিনজনে এসেছে পুরখু ক্যাম্পে আশ্রিত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ক্যামেরাবন্দি করতে। তিনজন মানে সরোজ, অম্লান আর আলিয়া।
হ্যাঁ, অম্লান আর সরোজ বেঁচে আছে, অলৌকিক হলেও সত্যি। মৃত্যু সামনে এসেও তাদের স্পর্শ করতে পারেনি একজনের জন্য, তাঁর নাম আরবাজ।
সেদিন বন্দুক সম্বল করে সইফকে বাইকে বসিয়ে তিনি যখন উদ্ধারকার্যে বেরোন, তখন করিমা হোটেলের সামনে তাণ্ডব দেখে বুঝে যান—কী হতে চলেছে। একটু দূরে বাইক রেখে ক্রাচে ভর দিয়ে সইফ এগিয়ে এলে রওফের দল ভাবে সে তাদের মদত করতে এসেছে। আর সেই ফাঁকে নজর বাঁচিয়ে আরবাজ পাইপ বেয়ে ওপরে উঠে ছাদ টপকে বারান্দায় নেমে পড়েন।
ব্রাদার, দরজা খুলুন। আমি আপনাদের বাঁচাতে এসেছি।
প্রথমে ওরা কেউ আরবাজের কথায় বিশ্বাস করতে পারে না।
আমি জে কে পুলিশের লোক, প্লিজ দরজাটা খুলুন।
সরোজ বাধা দিলেও পুলিশ শুনে অম্লান দরজা খুলে দেয়।
আপনাদের কেউ কিছু করতে পারবে না। যান, বাথরুমে লুকিয়ে পড়ুন।
তাই করেছিল তারা। ঘণ্টা দুয়েক পর যখন গোলাগুলি আর মানুষের কোলাহল মিলিয়ে যায়, তখন বেরিয়ে এসে দেখে কেউ নেই। শুধু ঘরে চাপ চাপ রক্তের দাগ। দরজা বন্ধ করে নিদ্রাহীন রাত কাটানোর পর ভোর হতেই আলিয়াকে নিয়ে আমির হাজির হন।
আমাদের আর ভাবার কিছু নেই, নিয়ে যান, ওকে বাঁচান।
মেয়ের জিনিসপত্র অম্লানদের হাতে তুলে দেন আমির। বেটি ইধর কভি মত আনা। আমরা যাব তোর সঙ্গে দেখা করতে।
নিজের কষ্টকে সবথেকে বেশি বলে মনে হয়, আলিয়ারও হয়েছিল। কিন্তু জম্মু ক্যাম্পে আসার পর ধারণা পাল্টে যায়। তাঁবু খাটিয়ে শরণার্থী শিবিরে হাজার হাজার মানুষের বাস। পুরখু ক্যাম্পে ওদের সামনেই অন্তত আরও পাঁচ ট্রাক পণ্ডিত আসে। হাতে ধরা স্যুটকেস, ব্যাগে জীবন গুছিয়ে ভয়ার্ত মুখগুলো রেজিস্টারে নাম লিখিয়ে তাঁবুর ভেতর সেঁধিয়ে যায়।
অম্লানরা ইন্টারভিউ নিতে ব্যস্ত থাকায় আলিয়া এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। চারপেয়ে খাটিয়ায় বসে এক বুড়ি সুর করে করে কাশ্মীরি গান গাইছে আর কাঁদছে।
ইয়ে না দোদমুত সিনা ব হাওয়াস
নাওয়াস ওয়ান্দিও সর।
দিলবর লগিও ল্যাজথাস দাওয়াস, নাওয়াস ওয়ান্দিও সর।
একদিন অভিমান করে হাজার ডাকলেও আমি আর তোমার কাছে ফিরে যাব না। ‘তোমার’ মানে কাশ্মীর, সে ডাকলেও বুড়ি আর ফিরবে না। গানটা কানে যেতেই আলিয়ার হৃদয় মুচড়ে ওঠে। দু-হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলে।
ভুখ লগি হ্যায়?
মুখ তুলে আলিয়া দেখে তার বয়সি একটি মেয়ে হাতের বিস্কুট এগিয়ে ধরেছে।
খালো।
ওখান থেকে এক ছুট্টে পালিয়ে যায় আলিয়া।
.
নাতালিয়ার হাত ধরে রেবেকা আউশুইট ক্যাম্পের গেটের সামনে আসেন। রেল লাইনটা এখনো আছে কিন্তু ট্রেন আর আসে না। একটা মালগাড়ির বগি রাখা। হাত ছেড়ে রেবেকা তার গায়ে কান পাতেন।
দেখো, ভোলেনি আমাদের কথা। বলছে, তুমি এসেছিলে মনে আছে!
তিনজনে ভেতরে আসে। এই ক্যাম্প এখন ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। বাঁ-দিকে একটা বড় বোর্ডের সামনে আলিয়া এগিয়ে যায়।
১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করার পর এই আর্মি ব্যারাককে ‘প্রিজনার অফ ওয়ার ক্যাম্প’-এ পরিণত করে ডিজাইনার ইগ ফারবেন।
দেখছ আলিয়া, কী হিউজ এরিয়া!
রেবেকা কখন তার পাশে এসেছেন আলিয়া খেয়াল করেনি।
ওই যে ইটের বাড়িগুলো, একেকটার গায়ে নম্বর দেওয়া। এর কিন্তু আলাদা আলাদা ফাংশান ছিল।
কীরকম?
এসো আমার সঙ্গে।
মাঝখানে চওড়া রাস্তা। দু-ধারে অসংখ্য দোতলা লাল ইটের বাড়ি। এক নম্বর, দু-নম্বর পড়তে পড়তে ওরা এসে দাঁড়ায় এগারো নম্বর বাড়ির সামনে।
মনে পড়ছে নাতালিয়া? রেবেকা জিগ্যেস করেন।
ইয়েস, হাট নাম্বার ইলেভেন। এখানে নতুন নতুন অত্যাচারের পদ্ধতি আবিষ্কার করা হত।
মানে?
মানে, কী কী রকমভাবে হত্যা করা যায়। সে ছিল নাৎসীদের একধরনের পাশবিক আনন্দ।
উল্টোদিকের বাড়িটা দেখিয়ে রেবেকা বলেন, আর ওই কুড়ি নম্বর বাড়িটা ছিল হাসপাতাল। নামেই হাসপাতাল, আসলে ওখানে চলত বন্দিদের ওপর ডাক্তারদের এক্সপেরিমেন্ট।
ভুরু কুঁচকে আলিয়া তাকিয়ে আছে দেখে রেবেকা ব্যঙ্গ করে বলেন, আমরা ছিলাম গিনিপিগ। কত তাড়াতাড়ি মেরে ফেলা যায় সেসব গবেষণা চলত।
আমাকে রোজ বলা হত এখানে মেয়েদের নিয়ে আসার জন্য। কিছু না কিছু কাজের অছিলায় আমি এড়িয়ে যেতাম। সেই নিয়ে অনেক ঝামেলাও হয়েছিল।
কতদিন ছিলে মম?
ছ’মাস।
আর আপনি?
৪১ থেকে ৪৩। দু-বছর হলেও লাগত দুশো বছর। কী করে যে বেঁচে গেলাম?
ওই বোর্ডে লেখা দেখলাম ১৩ লাখ যুদ্ধবন্দির মধ্যে ১১ লাখকে মেরে ফেলা হয়েছিল। ৮০২ জন পালাবার চেষ্টা করেছিল যার মধ্যে মাত্র ১৪৪ জন সাকসেসফুল হয়েছিল।
রেবেকারা আবার এগোতে থাকে। ওদের সঙ্গে আরও কিছু লোকজন যারা মিউজিয়াম দেখতে এসেছে, তারাও ওদের মতো শিউরে উঠছে। কেউ রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে।
নাও লুক অ্যাট দিস—রেবেকা থামেন একটা একতলা বাড়ির সামনে।
ধীর পায়ে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে চুপ করে দেখতে থাকেন। সার সার দোতলা বাংক খাটগুলো এখনো রাখা আছে।
নাতালিয়া রেবেকার দু-কাঁধ শক্ত করে ধরতে তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।
এখানে রেবেকারা থাকত। নাতালিয়া আলিয়াকে বলে, একটা ঘরে এক হাজার জন। খাটে আটজন শেয়ার করে শুতো। যারা খাট পেত না তারা স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে ঘুমোত। ঘুমোত না, সারারাত ইঁদুরের সঙ্গে যুদ্ধ করত। কতজন ইঁদুরের কামড় খেয়েই মারা গেছে! সুতির জামা, কাঠের জুতো পায়ে বারো ঘণ্টা খাটনির পর এই জুটত কপালে।
আই কান্ট টেক দিস এনিমোর।
বাইরে বেরিয়ে আসে আলিয়া, সামান্য নিশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে।
ম্যাম, আর ইউ ওকে?
একজন মিউজিয়াম স্টাফ এগিয়ে আসে। নিড এনি হেল্প?
নো।
লোকটা কথা না বাড়িয়ে চলে গেলে আলিয়া মায়েদের ডাকতে যায়। ঠিক তখনই দেখতে পায় একদল লোক কিছু একটা দেখে এসে হাত-পা নেড়ে আলোচনা করছে। কৌতূহলবশত সেও মেইন মিউজিয়ামের ঘরটায় ঢোকে। কাচের বাক্সের ভেতর রাখা হলোকস্ট সারভাইভারদের জিনিসপত্র। ডাঁই করা কয়েক লাখ চামড়ার জুতো, নানা সাইজের। শিশুদেরও।
কাউকে ছাড়েনি শয়তানের দল!
হাত দুয়েক দূরে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক আঙুল দেখিয়ে বলে, জুতোর সাইজটা দেখেছেন? ওইটুকু একটা বাচ্চা নাৎসি বাহিনীর কি ক্ষতি করতে পারে? দেখুন, এই গ্লাস বক্সটা…
লোকটা পাশের কাচের বাক্সটা দেখায়—হাজার হাজার চশমা, কাঠের পা, দাঁতের ব্রেস…গ্যাস চেম্বারে ঢোকানোর সময় সব এগুলো খুলে নেওয়া হত।
কান্নায় আলিয়ার গলা বুঝে আসে।
আপনি গ্যাস চেম্বার দেখেছেন?
মাথা নেড়ে না বলে আলিয়া।
আই জাস্ট কেম আউট। আসুন একবার।
উত্তরের অপেক্ষা না করে আলিয়াকে নিয়ে ভদ্রলোক ওখান থেকে বেরিয়ে পাশের ব্লকের গ্যাস চেম্বারে আসে। এই সেই বিখ্যাত গ্যাস চেম্বার যার অপারেটর বলে মারকোর নামে কেস হয়েছিল। কোর্টে তার ভয়াবহতা সম্বন্ধে শুনলেও প্রত্যক্ষ দর্শনে শরীর হিম হয়ে যায়।
স্নান করার শাওয়ার আছে, মাথার ওপর। হ্যাভ আ লুক।
ওপর দিকে তাকিয়ে দেখে শাওয়ার নজল লাগানো।
কিন্তু জল পড়ত না। জানেন, কী গ্যাস ইউজ করত? গাড়ির এক্সহস্ট পাইপ থেকে কার্বন মোনো অক্সাইড এখানে ছাড়া হত, বড়বড় পাইপের সাহায্যে। বাঁচার জন্য লোকগুলো আকুলি বিকুলি করত…এখনও দেওয়ালে নখের আঁচড় রয়ে গেছে।
সত্যি তো! দেওয়ালের আঁচড়ের গায়ে হাত দিয়ে আলিয়া শিউরে ওঠে।
এদিকে আসুন…
ভদ্রলোক অস্থির হয়ে আরেকদিকে এগিয়ে যায়।
কী লেখা আছে দেখতে পাচ্ছেন? ‘ঈশ্বর আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেও ক্ষমা করব না’।
চশমা খুলে ভদ্রলোক চোখ মোছেন। কতখানি যন্ত্রণায় এটা কেউ লিখতে পারে!
সহ্য করতে না পেরে আলিয়া ছুটে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখে তার মা আর রেবেকা তাকে খোঁজাখুঁজি করছে।
.
কোথায় ছিলে?
অম্লান আর সরোজ হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসে।
এলোমেলো চুল ঠিক করে আলিয়া। এই তো এখানেই ছিলাম। আচ্ছা, কিছু করা যায় না এদের জন্য? এত কষ্ট!
সরোজ কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আলিয়ার মুখোমুখি দাঁড়ায়। তোমরাই তো দায়ী।
আহ সরোজ, প্লিজ!
বলতে দে আমায়। অম্লানের ইচ্ছেতে তোমায় আনা হয়েছে, না-হলে আমার মত ছিল না। কেন থাকবে? তোমাদের জন্য আজ এই পরিবারগুলো রাতারাতি ঘরছাড়া হয়ে উদ্বাস্তু হয়ে গেল! কী দোষ এদের? কেন নিজের জায়গায় নিজেদের ভিটেতে থাকতে পারবে না? আজ যদি সারা ভারতের হিন্দু একজোট হয়ে বলে তোমাদের পাকিস্তান চলে যেতে? যাবে?
সরোজের কথা খারাপ লাগলেও আলিয়ার গায়ে লাগে না। জানে, সে কতটা দুঃখ থেকে বলছে। আরও দুদিন জম্মুতে থাকার পর ওরা দিল্লিগামী ফ্লাইট ধরে। এয়ারপোর্টে নেমে সরোজ লাগেজ নিতে গেলে আলিয়া অম্লানকে বলে, আমি দিল্লিতে থাকব না।
কেন?
গিরিজা যতই আমার বন্ধু হোক, তার পরিবার যে সরোজ ভাইয়ার মতো ভাববে না, কে বলতে পারে?
আই অ্যাম সরি ফর ইট। সরোজ ভালো ছেলে। ও বলে ফেলেছে ঠিকই কিন্তু…
আমি কলকাতা যাব আপনার সঙ্গে।
অম্লান থতমত খায়। তোমার বাবা-মা তো দিল্লিতে…
আপনার অসুবিধে থাকলে আলাদা কথা।
না তা নেই…আচ্ছা দাঁড়াও আমি…
সরোজ আসছে কিনা দেখতে ঘাড় ঘোরাতেই চোখ পড়ে কয়েকটা কনভেয়ার বেল্ট পেরিয়ে একজন চেনা কেউ স্যুটকেস নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
মাই গড!
অম্লান ছুটতে ছুটতে তার রাস্তা আটকায়। বউদি!
চেনা কণ্ঠস্বর শুনে আলিয়া অবাক। অম্লান, ইউ?
আমি কাশ্মীর থেকে ফিরছি।
কেমন আছ তুমি? ইউ রিস্কড ইওর লাইফ সো মাচ!
আমি ঠিক আছি। তুমি কি কলকাতা যাচ্ছ?
হ্যাঁ।
আমিও। সরোজ আলিয়াকে নিয়ে…
আলিয়া?
অম্লান হাসে। এসো আলাপ করিয়ে দিই। হাঁক পাড়ে অম্লান, আলিয়া, ইধর আও।
আলিয়া দেখে ফুটফুটে সুন্দর একটি মেয়ে কুণ্ঠাভরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। পরনে সালোয়ার কামিজ, বাঁ হাতে ধরা কালো বোরখা।
স্যুটকেসটা নামিয়ে আলিয়া বসু মুখোমুখি দাঁড়ায় আলিয়া বেগের। দুই প্রান্তের দুই ইতিহাসের সাক্ষী একে অপরের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
.
৩১
চোখের জল বাঁধ মানে না। কতবার রুমাল দিয়ে মোছে গিরিজা, তাও নিঃশব্দে ঝরে যায়। এয়ারক্রাফ্ট শ্রীনগর শহরে নামার সময় হালকা বরফে ঢাকা পাহাড়গুলো মাথা তুলে জিগ্যেস করে, ‘কীরে, এলি এতদিনে?’
এয়ারপোর্ট থেকে বডগাম বাইপাস করে যাওয়ার সময় চারদিকে শুধু ইন্ডিয়ান আর্মি নজরে আসে।
এত আর্মি! এত পাহারা? আমাদের সময় থাকলে আজ আর ঘরছাড়া হতে হত না।
লালচকের সামনে দিয়ে পাস করলে তারার কথা মনে পড়ে গিরিজার। ইয়াসিনের মহল্লাও এখন শান্ত, চুপচাপ।
ডাল লেক জানা হ্যায় না?
হাসিখুশি ড্রাইভার ছেলেটি জানতে চায়।
হাঁ।
পহলি বার কাশ্মীর মে?
হ্যাঁ বলতে গিয়েও গিরিজা না বলে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যায় ডালের ধারে। গাড়ি থেকে নেমে চেনা ডাল অচেনা ঠেকে।
এত হোটেল, এত দোকান হয়ে গেছে! পাহাড়চূড়ায় শংকরাচার্যের মন্দিরের দিকে চোখ যেতে কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে।
জয় ভোলেনাথ। কেমন আছ বাবা? কতদিন পর তোমার মন্দিরটুকু দেখেই মনটা শান্তিতে ভরে গেল!
ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে জলের কাছে আসতেই একজন শিকারাওয়ালা এগিয়ে এলে গিরিজা হাত তুলে না বলে দেয়। শেষ ধাপে বসে আঁজলা ভরে জল হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
কীরে গিরিজা, আজ চশমে শাহি যাবি, নাকি ফেরার পথে?
না না, সামনে পরীক্ষা না!
অস্ফুটে বলেই খেয়াল হয় ছেলেবেলার বন্ধু সরস্বতী তো পাশে নেই? কার সঙ্গে কথা বলছে সে?
সরস্বতীর কথা মাথায় আসতেই মনে পড়ে ডালের ধারে তার বাবার হোটেল ছিল। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে উল্টোদিকের ফুটপাথ ধরে একটু হাঁটতেই দেখতে পায় হোটেল কচ্রু ইন্টারন্যাশানাল। গেট দিয়ে ঢুকে ছোট লন, তারপরেই দুটো বিল্ডিং।
কাহাঁ জানা হ্যায় ম্যাডাম? দারোয়ান প্রশ্ন করলে গিরিজা বলে, রিসেপশান মে।
গ্রাউন্ড ফ্লোরের রিসেপশান ডেস্কে একটা লোক খাতায় কিছু লিখতে লিখতে মুখ তোলে।
আস সালামু আলেকুম। জী কহিয়ে।
নমস্তে…জহর কচ্রু হ্যায়?
জী কওন?
ইস হোটেল কা মালিক।
ইনি তো মালিক নন।
মানে? নাম তো কচ্রু ইন্টারন্যাশানাল, আপনি ঠিক জানেন?
জী হাঁ।
তাহলে তো উনিই মালিক। ওনার মেয়ে সরস্বতী কচ্রু আমার…
মিস্টেক হচ্ছে। ওই নামে কেউ নেই।
হতাশ হয়ে ফিরতে গিয়ে অদূরে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবি চোখে পড়ে।
ওই তো জহর আঙ্কলের ছবি।
গিরিজা দিদি!
গলা শুনে গিরিজা পেছন ফেরে। বছর তিরিশের একটা ছেলে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখটায় দাঁড়িয়ে। খুব চেনা চেনা লাগে, ঠাওর করতে পারে না।
আপ আইয়ে মেরে সাথ।
ছেলেটা গিরিজাকে নিয়ে তার চেম্বারে আসে।
তুই বসন্ত না!
গিরিজার মুখে হাসি ফোটে। গালের কাটা দাগটা দেখেই চিনেছি।
ঠিক চিনেছেন দিদি।
তাহলে লোকটা মিথ্যে বলল কেন?
কারণ আমরা আর জহর বা বসন্ত নেই। আমাদের পরিচয় এখন ফরহাদ আর কবীর কচ্রু।
ধপ করে সোফায় বসে পড়ে গিরিজা।
সব দিদিকো বচানে কে লিয়ে কিয়া বাবা…আব্বা নে। না-হলে সে রাতে ওকে ছাড়ত না ইয়াসিনের লোকেরা। বাড়ির দরজা ভেঙে ঢুকে দিদিকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, আব্বা ওদের পায়ে ধরে। বলে যা বলবে তাই করবে। ব্যস, আমরা কনভারটেড হয়ে যাই।
সরস্বতী কচ্রু এখন হুমেয়রা, তিন ছেলে মেয়ের মা। ওর হাসবেন্ড গুলজার শেখ বড় ব্যবসায়ী, চারটে হাউজবোটের মালিক।
রূপকথা, গল্পকথা না মিথ্যে কথা বলছে বসন্ত ওরফে কবীর? গিরিজা হতবুদ্ধি হয়ে সবটা শুনে যায়। তার প্রাণের বন্ধু সরস্বতী হুমেয়রা হয়ে গেছে?
তোমরা ভালো আছ বসন্ত?
ভালো আছি দিদি। ২৫ বছর হয়ে গেল এই জানুয়ারিতে। ধর্ম পাল্টে বেঁচে তো আছি, নাহলে আজ আর আমাকে খুঁজে পেতেন না।
গিরিজা কী বলবে বুঝতে পারে না। সেই ছোট্ট বসন্ত এত বুঝতে শিখে গেছে!
খারাপ লাগছে, তাই না? আমারও লাগে। এখনও মন্দির দেখলে মাঝে মাঝে কপালে হাত চলে যায়, ছোটবেলার অভ্যেস তো। কিন্তু দেখুন, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য সরকার বা দেশের কেউ এগিয়ে এসে এতগুলো বছরে কিছু করল? ফিরিয়ে আনতে পারল কাশ্মীরে?
ফিরিয়ে আনলে তোমরা আর থাকতে দেবে বসন্ত? কারণ তোমরা এখন কবির হয়ে গেছ। এখানে এখন নতুন ইয়াসিন ‘বুরহান ওয়ানি’র রাজত্ব চলছে।
কী বলবে বুঝতে না পেরে কথা ঘোরায় বসন্ত। একবার শ্রীনগর ঘুরিয়ে দেব নাকি?
ম্লান হাসে গিরিজা। আমার বাড়ি আমাকেই ঘোরাবে?
বসন্তর মুখ শুকিয়ে যায়। না না, আসলে এতদিন পর…
বাবা যাওয়ার আগে বলেছিল, একবার বাড়িটা দেখে আসিস, পারিনি। আইটি সেক্টরে কাজের প্রেসার সামলে…
ও আর দেখে কী হবে?
কেন?
না এমনিই…
গিরিজা উঠে পড়ে। তুমি কাজ করো। কাউকে বলার দরকার নেই আমি এসেছিলাম।
বেরিয়ে এসে ড্রাইভারকে ফোন করতে সে গাড়ি নিয়ে আসে।
অব কিধর?
করণনগর চলো।
করণনগরের গলির মুখটা একই রকম আছে। গায়ে গায়ে বাড়িগুলোও একরকম; শুধু বাসিন্দারা পাল্টে গেছে। এখানে এখন আর শাঁখ বাজে না, পুজো-পার্বণে দুয়ারে আলপনা পড়ে না, জয় ভোলেনাথের ধ্বনিও শোনা যায় না। পায়ে হেঁটে গলির মাথায় আসার পর গিরিজার চোখে পড়ে পণ্ডিতদের কয়েকটা পুড়ে যাওয়া বাড়ি দাঁত মুখ বার করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনোটার জানলা ভেঙে ঝুলছে তো কোনোটার দেওয়াল ধসে গেছে।
লাজবন্তী দিদির বাড়িটা পুড়িয়ে দিয়েছে!
কাঁপা হাতে গিরিজা গেটে হাত রাখে। সেও কি এখন নাম পাল্টে…
গিরিজা এই দেখ! আমরা কেউ কোথাও যাইনি, এখানেই আছি।
লাজবন্তীর গলা শুনে দোতলার বারান্দায় চোখ যায়। কই, কেউ নেই তো! গায়ে কাঁটা দেয় গিরিজার। তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরে আরও চারটে বাড়ি পেরিয়ে নিজের বাড়ির গেটে এসে চমকে ওঠে। এত ঝকঝকে বাড়ি! কী করে সম্ভব?
বছর দশেকের একটি মেয়ে গেটের কাছে কিছু করছিল, গিরিজাকে দেখে হাসে।
এই বাড়িটা কার?
মেরে আব্বু কা হ্যায়।
হোঁচট খায় গিরিজা। আব্বু? মতলব উনি এই বাড়ির মালিক?
জী।
কি নাম?
গুলজার শেখ।
নামটা শুনেই শক খায় গিরিজা। বসন্তর জামাইবাবু না?
কিসসে বাত কর রহি হ্যায় জুবেদা?
সরস্বতীর গলা!
সেই রিনরিনে মিষ্টি আওয়াজ! শ্রীধর মাস্টার ওর গান শুনে বলতেন তোমার নাম সার্থক। গলায় মা সরস্বতী বিরাজ করছেন।
কেয়া হুয়া? কওন হ্যায়?
ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে জুবেদার মা। গিরিজার খেলার সাথী সরস্বতী। বন্ধুকে এতদিন পর দেখে গিরিজা স্তম্ভিত। এ তো তার সরস্বতী নয়? হাতে কানে সোনার গয়না, মাথায় লাল টিপ কিছুই নেই! সালোয়ার কামিজের ওপর মাথা থেকে সারা গা চাদরে ঢাকা।
‘একটা গান শোনা না?
কেন রে, আমি কি রেডিও নাকি খালি গান শোনাব?’
কথাটা মনে পড়াতে গিরিজা ভাবে তার বন্ধু এখনও গান গায় নাকি হাজার ঘেরাটোপে থেকে সেসব প্রতিভা মুছে গেছে?
কেমন আছিস সরস্বতী? চিনতে পারছিস?
জুবেদা মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে সরস্বতী অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে বলে, কিসকো চাহিয়ে?
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফোটে গিরিজার, আমার বন্ধু সরস্বতীকে। তবে সে আর নেই, মারা গেছে।
.
দিল্লির আর্য অডিটোরিয়াম কানায় কানায় ভরা। বড় স্ক্রিনে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিয়ে তৈরি এক অনবদ্য ডকুমেন্টরির কোলাজ এতক্ষণ দর্শক দেখছিল, যেখানে একে একে গিরিজা থেকে সইফ থেকে শাহিদ সবার কথা উঠে এসেছে। এতটাই ডিস্টার্বিং, কেউ রিঅ্যাক্ট করে না। কষ্ট হয়, কান্না পায়, রাগ হয়।
স্টেজে অ্যাংকর আসে।
আপনাদের মতো আমিও চুপ করে থাকতে চাইছিলাম কিছু সময়; কিন্তু সেটা সম্ভব নয়, অনুষ্ঠান এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মে আই প্লিজ কল আপ অন স্টেজ মিস্টার অম্লান বসু অ্যান্ড সরোজ প্রসাদ? জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বানানো এই অনন্য কাজের জন্য বিড়লা ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান ওয়েলফেয়ার আজ ওনাদের পুরস্কৃত করছে।
সিট ছেড়ে উঠে আসে অম্লান আর সরোজ। বিপুল হাততালির মধ্যে তারা পুরস্কার গ্রহণ করে। অ্যাংকর একটা মাইক অম্লানের হাতে ধরিয়ে বলে, স্যার, এই যে যাদের আমরা দেখলাম বা যাদের কথা শুনলাম তাদের এখনকার অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানেন? আর ওইসব দোষীদের শাস্তি হয়েছিল?
একটু চুপ করে থেকে অম্লান উত্তর দেয়, রামায়ণে রাম রাবণকে হারিয়ে দিলেও সীতার পাতালপ্রবেশ দিয়ে ইতি ঘটেছিল। এখানেও তাই। যতই কিছু লোক বাঁচাবার চেষ্টা করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত পণ্ডিতদের ঘর ছাড়তে হয়েছিল।
সইফ আর শাহিদ সারেন্ডার করেছিল। কিন্তু সাক্ষী প্রমাণ না থাকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আরবাজ সাসপেন্ড হয়। গিরিজা কিচলু সেবার কাশ্মীর গিয়ে জানতে পারেন ইমরান স্যার গুরুতর ঘায়েল হয়ে শয্যাশায়ী থেকে একসময় মারা যান।
মহেন্দ্র মুন্সীর পরিবারের কোনো ট্রেস পাওয়া যায় না। শ্রীধর আর পার্বতী পণ্ডিতের বাড়ি ওইভাবেই পড়ে আছে, কেউ দখল করেনি। তারাও হয়তো সেই রাতে মারা গেছেন…।
এসবের মধ্যে মন ভালো করা খবর একটাই। কাশ্মীরি পণ্ডিতরা হাজারো যন্ত্রণা সহ্য করেও একজনের হাত ছাড়েনি, বিদ্যাদেবীর। তাই আজ তারা জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বিভিন্ন জায়গায় সেটেলড।
আর একটা কথা। আমরা ডকুমেন্টরি বানিয়ে ছিলাম ১৯৯০ সালে। এই কিছু বছর আগে সেটা সবার সামনে এল, পুরস্কার পেল…এটা সেই সময় সামনে আসা উচিত ছিল না কি? তাহলে তো সারা পৃথিবী পাশে এসে দাঁড়াতে পারত। কী জানেন, আমাদের দেশে সবকিছুই সরকারভিত্তিক। যাইহোক, বিড়লা ইন্সটিটিউটকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের রেকগনাইজ করার জন্য।
মাইক ফেরত দিয়ে দুজনে নেমে আসে।
এবার সেই পুরস্কার যা এই ইন্সটিটিউটের সবথেকে বড় সম্মান বলে গণ্য। প্রয়াতা প্রধানমন্ত্রী গায়ত্রী দেবী নামাঙ্কিত শান্তি পুরস্কার। দিস গোজ টু নান আদার দ্যান আলিয়া ডেমিয়ানুক বসু।
সামনের সারি থেকে উঠে দাঁড়ায় সাদা সোনালি তাঁতের শাড়িতে প্রসাধনহীনা, চশমা পরা আলিয়া। স্টেজে এসে হাতজোড় করে নমস্কার করে অ্যাংকারকে ফিসফিস করে কিছু বলে। সে আলিয়াকে পোডিয়াম ছেড়ে দেয়।
গুড ইভনিং লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! সবার আগে লেট মি কারেক্ট মাই নেম। আমি আলিয়া ডেমিয়ানুক বসু নই, জাস্ট আলিয়া ডেমিয়ানুক। বসু পরিবারের সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই, আমি ডিভোর্সড।
.
একে রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর!
ভীষণ উত্তেজিত হয়ে মুখে পান পোরেন সুষমা।
কী ভেবেছ, যা ইচ্ছে তাই করবে? আমার ছেলের জীবনটা শেষ করে…
আমি আপনার ছেলের জীবন কীভাবে শেষ করলাম মা? আলিয়া ধাক্কা খায়।
করোনি? বাবা বাবা করে এতদিন বিদেশে পড়ে রইলে। নতুন সংসার ফেলে কেউ দুম করে চলে যায়?
বাবা বাবা করে? মাই পাপা ওয়াজ…
জানি জানি! আর কাঁদুনে গেও না তো!
অনি, মা কী বলছেন?
অনিন্দ্যকে চুপ করে থাকতে দেখে আলিয়ার অসহায় লাগে।
আমি কাঁদুনে গেয়েছি বাবাকে নিয়ে?
আর এখন একটা অজাত-কুজাতকে নিয়ে এসে বাড়িতে তুলেছ। এটা কি হোটেল? একবারও জিগ্যেস করেছ আমাদের মত আছে কিনা?
দরজার পাশ থেকে আরেক আলিয়া শোনে। কথা না বুঝলেও তাকে নিয়ে অশান্তি চলছে আন্দাজ করে।
ওকে এখানে রাখা চলবে না, নিয়ে যাও এখান থেকে।
মা, বউদির আগে আমি ডিসাইড করেছিলাম আলিয়া এখানে থাকবে। অম্লান জোর গলায় বলে।
থাম তুই! আর একটা কথা বললে…
হঠাৎ মাথা ঘুরে যায় সুষমার। খাটের বাজু ধরে ধপ করে বিছানায় বসে পড়েন।
মা, মা! কী হল কী?
অনিন্দ্য ছুটে যায়, আলিয়াও।
মনে হচ্ছে বেশি জর্দা খেয়ে মাথা ঘুরে গেছে।
চুপ!
ধমকে ওঠে অনিন্দ্য।
জানো তো মায়ের একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে, তাও সারাক্ষণ বাড়িতে অশান্তি বাধিয়ে রেখেছ। যাও তো এখান থেকে!
অনিন্দ্যর বলা শেষ কথাটা আলিয়া অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। চলে যায় বিপিন পাল রোডের বাড়ি ছেড়ে। একা নয়, আলিয়া বেগকে নিয়ে। কলকাতা ছেড়ে কিছুদিন দিল্লিতে এসে একটা চাকরি জুটিয়ে নেয়। আর তার সঙ্গে শুরু করে জম্মু ক্যাম্পে পণ্ডিতদের সেবার কাজ, দুজনে মিলে।
.
মাইক্রোফোনটা মুখের সামনে অ্যাডজাস্ট করে নেয় আলিয়া। অ্যান্ড সেকেন্ডলি আই রিফিউজ দিস অ্যাওয়ার্ড।
দর্শকের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়।
গায়ত্রী দেবী চাইলে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন। তিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন কনভারশান থেকে হত্যা কিছুই রুখতে পারেননি, বা রোখেননি। তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউ পণ্ডিতদের দেশবাসী বলে যেখানে মেনে নেয়নি, সেই তাদের রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য এ পুরস্কার আমি নিতে পারব না। আপনারা হয়তো জানেন না, পণ্ডিতরা প্রতাপ রাইয়ের সঙ্গে দিল্লিতে কতবার দেখা করতে গেছেন। কখনো তিনি দেখা করেননি। কখনো বলেছেন— আপনাদের সঙ্গে কী হয়েছে জানি না তো! কখনো তাদের ১০ নম্বর জনপথ থেকে তাড়াবার জন্য জল কামানও ব্যবহার করা হয়েছে।
তাদের কথা সবরকম ভাবে চেপে রাখা হয়, বলা হয় ‘এক্সোডাস অফ কাশ্মীরি পণ্ডিতস’। এক্সোডাস মানে তো পলায়ন। হঠাৎ একদিন নিজের ইচ্ছেয় ঘর ছেড়ে তারা দলে দলে পালিয়ে গেল? ইসন্ট ইট ভেরি ফানি? অথচ লুক অ্যাট দ্য হলোকস্ট সারভাইভারস? তাদের সবকিছু ডকুমেন্টেড আছে। আউশুইট ক্যাম্পের একটা ভিজিট এবং আমার সহকর্মী আলিয়া বেগ, আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে।
সরি, আপনাদের সময় নষ্ট করার জন্য। শুভ রাত্রি।
গটগট করে আলিয়া স্টেজ থেকে নেমে হলের বাইরে এলে অম্লানের সঙ্গে দেখা হয়।
তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
খুব খুশি হয়েছি অম্লান, ফাইনালি তোমাদের কাজ স্বীকৃতি পেল। তুমি খুশি তো?
ইয়েস। এক পুরস্কার পেয়েছি বলে আর দুই তোমাকে দেখে। এতগুলো বছর কীভাবে কাজ করে চলেছ বউ…সরি, আলিয়াদি।
বাড়ির সবাই ভালো?
হ্যাঁ। দাদা…
আসি। জম্মু ফিরব।
এখন তো ওরা সব সেটেল্ড। আর কী করছ তুমি?
আছে কাজ। যতক্ষণ না পণ্ডিতদের তাদের জায়গায় ফেরাতে পারছি, থামব না। দুই আলিয়ার কেউ নয়।
সমাপ্ত
