২০
মেঘ সরে রোদ ওঠায় সকালের মিটিং হুজত আবার বাড়ির লনেই বসিয়েছেন। দোতলার জানলার পর্দা সরাতে তেহজিব দেখে চামচা পরিবৃত হয়ে বাবা গভীর আলোচনায় মগ্ন। ক্ষমতার লোভে মানুষটা কেমন পাল্টে গেল! তার দাদুর মধ্যে হিন্দু বিদ্বেষ থাকলেও বাবা কখনও এসব পাত্তা দিত না। পুজো-পার্বণে হিন্দু বন্ধুদের বাড়িতে যে হুজত উল ইসলাম পাত পেড়ে বসে খেয়েছে সেই আজ ইয়াসিন মালিকের মতো একটা ক্রিমিনালকে বাড়িতে অ্যালাও করে!
কী খাবি আজ বল! হালিমা মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়।
তুমি জানো আম্মি আমার এখানে থাকতে ভালো লাগে না। দম ঘুটতা হ্যায় মেরা। কেন ডেকেছ জলদি বলো, আমি জম্মু ফিরে যাব।
হালিমা চাইলেও বলতে পারবে না—আমি ডাকিনি, বাবা ডেকেছে।
ও হ্যাঁ তা ঠিক। একজন গ্র্যাজুয়েট মহিলাকে রাঁধুনি বানিয়ে রাখা হয়েছে যার কোনো কথাই চলে না এ বাড়িতে। সে শুধুই হুকুম তামিল করে।
থাম তো! হালিমা কথা ঘোরায়। হ্যাঁরে, তোর সেই বন্ধু অনুরাগ, তার কী খবর?
ভালো, জম্মুতে আছে। মার্চে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ, খুব খাটছে।
সে বাড়ি আসবে কবে?
ডিসেম্বরে ওর মায়ের জন্মদিনে। একবার অনুরাগের ভালো জব লেগে যাক, ব্যস আমি এই মিনিস্টারের কবল থেকে মুক্ত।
বনের পাখির মনের কথা আন্দাজ করেই তো তার বাবা তাকে খাঁচায় পুরতে ডেকে এনেছে। কিন্তু তেহজিবের শ্রীনগর আর ভালো লাগে না। চিফ মিনিস্টারের মেয়ে বলে সারাক্ষণ সঙ্গে লোক নিয়ে ঘুরতে হবে এ কেমন কথা! মিটিং শেষ হলে তেহজিব নীচে নেমে আসে।
আমি একটু বেরোব আব্বা।
চায়ের কাপ নামিয়ে হুজত সাজিদকে বলেন, গাড়ি রেডি রাখো আর সঙ্গে তুমি যাও।
গাড়ি আমার লাগবে না। আর সঙ্গে কাউকে যেতেও হবে না।
জানো তো কাশ্মীরের সিচুয়েশান?
কে করল বলো তো?
তেহজিবের এই উদ্ধতভাব দেখলেই হুজতের মাথা গরম হয়ে যায়। মেয়ের সঙ্গে কোনো তর্কে যাবেন না বলে এড়িয়ে যান, কারণ অনুরাগের ভূত তার ঘাড় থেকে নামাতে হবেই। হালিমার সঙ্গে এ ব্যাপারে ইচ্ছে করে আর কোনো আলোচনা করেননি। বলা যায় না তলে তলে সে যদি মেয়েকে মদত জোগায়! জানতে পারলেই তেহজিব পালাবে। মুশকিল হচ্ছে চেনাজানার মধ্যে সেরকম কাউকে মনে ধরছে না যার সঙ্গে তেহজিবের নিকাহ করাতে পারে। দু-একবার সাজিদের কথা মাথায় এসেছে কিন্তু চাকরকে মাথায় চড়াতে মন চাইছে না।
ওদিকে প্রভুভক্ত সাজিদ লোক ফিট করে নজর রেখেছে মহেন্দ্রর বাড়িতে। নজরদার জানিয়েছে অনুরাগকে এ তল্লাটে দেখা যায়নি।
যাবে কী করে? সেদিন বাস স্ট্যান্ডে ভাইকে দেখার পর মহেন্দ্র ভিরমি খায়।
তুই! তোকে যে বারণ করলাম আসতে?
বিশ্বাস হয়নি তোমার কথা। খোঁজ নিয়ে দেখলাম কারফিউ তো নেই এখানে! তাই চলে এলাম। তুমি উজান বেয়ে জম্মু গিয়ে আমায় মিথ্যে বলে এলে কেন ভাইয়া?
ভাইয়ের কথা শুনে মহেন্দ্র কী বলবে বুঝে পায় না। তার চোখ এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। কেউ অনুরাগকে দেখে ফেলল কিনা।
কী হয়েছে বলো তো? তোমাকে এমন অদ্ভুত লাগছে কেন? সেদিনও কেমন অন্যমনস্ক লাগছিল, আজকেও তাই।
কিছু হয়নি। অনুরাগ, তুই এখন বাড়ি যাস না।
মানে?
মহেন্দ্র হাত নেড়ে আলিয়াকে ডাকে। শোনো, তুমি আমার এই সাইকেলটা তোমার বাড়িতে রেখে দিতে পারবে? আমি পরে নিয়ে নেব।
কিন্তু স্যার, আপনি ফিরবেন কী করে?
আমি ভাইকে নিয়ে এক জায়গায় যাব, তাই…
অনুরাগ খেপে যায়। আশ্চর্য! আমি নিজের বাড়ি না গিয়ে অন্য কোথাও যাব কেন?
কথার জবাব না দিয়ে মহেন্দ্র হাত দেখিয়ে গন্দেরবলগামী বাস থামিয়ে তাকে তুলে নিজেও উঠে পড়ে।
ব্যাপারটা দেখে আলিয়া অবাক। মহেন্দ্র স্যারের এমন ব্যবহার তো একেবারেই স্বাভাবিক নয়। হাত উল্টে ঘড়ি দেখে সে। আকবরের খবর দিতে তাকে আরবাজের কাছে যেতে হবে।
.
মহেন্দ্র ভাইকে বাড়ি নিয়ে গেল না?
আরবাজের কপালে ভাঁজ। কুছ গড়বড় হ্যায় আলিয়া।
আকবরের কাছ থেকে আলিয়া কোনো খবর বার করতে পারেনি জেনে আরবাজ ঠিক করে লোকটাকে ক’দিন চোখে চোখে রাখবে। সারাদিন কী করে, কোথায় যায় ইত্যাদি। আপাতদৃষ্টিতে আকবরের ডেইলি রুটিনে বিশেষ হেরফের নেই। সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দোকানে আসে, বেলায় কাজ মিটিয়ে বাড়ি যায়। আর শুক্রবার করে মসজিদ। নামাজ পড়ে চেনাজানা কিছু লোকের সঙ্গে গল্পগুজব করে বাড়ি এসে দুপুরের খাওয়া সেরে বিশ্রাম। আবার বিকেলে দোকান। সন্দেহজনক কিছুই নয়।
তাহলে শাহিদের কথা এড়িয়ে গেল কেন?
আলিয়ার যুক্তি অগ্রাহ্য করতে পারেন না আরবাজ।
এড়িয়ে মানুষ তখনই যায় যখন সে কিছু লুকোয়। কী লুকোচ্ছে আকবর? শাহিদ রাতারাতি কী করে হিরো হয়ে গেল ওর বাবা জানে না, আমি বিশ্বাস করি না।
মহল্লার একজনকে আকবর চাচা বলেছে—‘শাহিদ ফিরলে দেখো না কী করে’।
শুনেছি ইয়াসিনের বাড়ি যাতায়াত আছে ওদের। কিন্তু আকবরকে এক সপ্তাহ ফলো করে কিছুই তো পেলাম না!
আপনি ফলো করছেন দিনে, রাতে যাচ্ছে না কে বলল?
কথা শুনে চমকে ওঠেন আরবাজ। সত্যি তো, এটা তো ভেবে দেখেননি!
পরদিন রাত আটটা নাগাদ আরবাজ সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। উদ্দেশ্য আকবরের বাড়ি। দূর থেকে লক্ষ্য রাখছিলেন তিনি। ন’টা নাগাদ দুজন ছেলে আসে তার বাড়ির সামনে। ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে তিনজনে বাইকে চেপে বেরিয়ে যায়। আরবাজ সাইকেলে করে ফলো করতে থাকেন। ফাঁকা রাস্তায় স্পিডে ধাওয়া করে পৌঁছে যান মায়সুমা, ইয়াসিনের বাড়ি।
আলিয়া তাহলে ঠিক আন্দাজ করেছে। আরবাজ মনে মনে ভাবেন।
আকবরেরা বাড়িটায় ঢুকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গেট বন্ধ হয়ে যায়। আরবাজ বুঝতে পারেন না কীভাবে ভেতরে প্রবেশ করবেন। দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে হঠাৎ চোখে পড়ে পাশের বাড়ির কার্নিশ বেয়ে ছাদ টপকে অনায়াসে ইয়াসিনের বাড়ি চলে যাওয়া যায়।
চলে আসেন আরবাজ। ছাদের লাগোয়া ঘরে মিটিং বসেছে। বন্ধ কাচের জানলা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কম্বলে পা ঢেকে মোটা জ্যাকেট পরে ইয়াসিন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বসে আছে। দরজাটা অল্প ভেজানো থাকায় কিছু কথা কানে আসে আরবাজের।
বেটে কা কোই খবর?
সব বড়িয়া হ্যায়। শাহিদ আর তার সাথীরা ট্রেনিং নিয়ে পি ও কে থেকে রওনা হচ্ছে ক’দিনেই। সঙ্গে আব্দুল আর বাকি ট্রেনিরা থাকবে। শ্রীনগর পৌঁছে কাজ শুরু করবে। হাতে সময় কম।
আমার একটাই চিন্তা ইয়াসিন ভাই। বরফ গির রহা হ্যায় বহুত, ওরা ঠিকমতো আসতে পারবে তো?
.
পিঠে অস্ত্র বোঝাই ভারী ব্যাগ, গায়ে সোয়েটার, জ্যাকেট, ফেরান, কান মাথা ঢাকা মোটা ফারের টুপি। আর পায়ে…পায়ে সাধারণ মানের জুতো, ঠান্ডা আটকাচ্ছে না। রাওয়ালকোট থেকে কুপওয়ারা ৮৬ কিলোমিটার। বাস বন্ধ হয়ে গেছে সময়ের আগেই তাই বরফ মাড়িয়ে চলতে গিয়ে পায়ের আঙুল অসাড় হয়ে যাচ্ছে। হাত-মুখ সাদা, গাল ফেটে লাল হয়ে যাওয়ার অভ্যেস থাকলেও এইভাবে ভয়ানক ঠান্ডায় হাঁটার অভিজ্ঞতা শাহিদ সইফদের নেই।
আব্দুলের আছে, সেইমতো প্রিকশন নিয়ে সে বেরিয়েছে। এই নিয়ে এপার ওপার তো কম করেনি, তাই বাকিদের তুলনায় ক্লান্তি বোধ কম।
আরে পা চালাও! সন্ধের মধ্যে কুপওয়ারা ঢুকতে না পারলে এই বরফে শুয়েই রাত কাটাতে হবে।
কথাটা শুনে সইফ ধপ করে বসে পড়ে। মুঝসে নহী হোগা।
শাহিদও হাঁপাচ্ছে। করনা হি হোগা। এক কাজ কর। আমি তোকে পিঠে তুলে নিচ্ছি।
বাকি ছেলেদেরও এক অবস্থা, তবে তারা পা চালিয়ে এগিয়ে যায়। বন্ধুকে পিঠে নিয়ে শাহিদ দু-পাও চলতে পারে না। ভুস করে হাঁটু পর্যন্ত পা ঢুকে গেলে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায়। অগত্যা সইফকে হাঁটতেই হয়। সীমান্ত পেরিয়ে যখন ওরা কুপওয়ারায় পা রাখে তখন আকাশের আলো নিভু নিভু। যে বাস স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি করে পি ও কে গেছিল সেটা এখন আর চেনা যায় না, যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সাদা আর সাদা। কেএলএফের দুজন লোক ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
এত দেরি আব্দুল ভাই? আমরা ভাবলাম আপনারা আজ আসবেন না।
কী করব বলো, এরা তো চলতেই পারে না। শরীরে কিছু নেই, কে জানে কী লড়াই করবে!
করব করব, ঠিক করব। ক্যালাশনিকভ নিয়ে কি ইয়ারকি মারতে এসেছি? কী রে সইফ…
হাসতে হাসতে শাহিদ ঘুরে দেখে বেশ খানিক দূরে সে পড়ে আছে। ‘আব্দুল ভাই’ বলে চিৎকার করে কাঁধের ব্যাগ ফেলে সে দৌড়োয়। বাকিরাও আসে। ফ্লাস্ক থেকে জল নিয়ে চোখে মুখে ছিটিয়ে তাকে খানিক চাঙ্গা করে।
গাড়ি রেডি হ্যায়। কিন্তু যা অবস্থা দেখছি, আজ রাতটা এখানে থেকে গেলে ভালো। দলের একটা লোক আব্দুলকে বলে।
কোথায় রাখবে?
রওফের বাড়ি।
দরজা খুলে রওফ থ। আগে বলবে তো আসছ!
এক বিমার হো গয়া রস্তে মে। শুধু আজকের রাতটাই থাকব।
কোই নহী আও।
আব্দুল রওফকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সরি ভাই, তকলিফ দিয়া।
কোনো তকলিফ নয়, ব্যাস একটাই ব্যাপার…আমার এখানে দুজন মেহমান আছে।
মেহমান! এখানে, এই সময়? আব্দুল চোখ কুঁচকে তাকায়।
ঘাবড়াবার কিছু নেই, ভালো মানুষ।
ভালো খারাপ জানি না, তবে খেয়াল রেখো আমাদের আইডেন্টিটি যেন কোনোভাবেই সামনে না আসে।
আমার যখন আসেনি তখন এক রাতে আপনাদেরও আসবে না।
আড়াল থেকে রওফের কথা শুনে সরোজের পা কাঁপতে থাকে। অম্লানেরও যে ভয় করছে না তা নয়, তাও সে এতক্ষণ যা দেখল কাঁপা হাতে ক্যামেরাবন্দি করেছে।
আইডেন্টিটি মানে কী বলতে চাইল বল তো? সরোজ জিগ্যেস করে।
কিড ব্যাগটা ঘরের কোনায় রেখে অম্লান বলে, নট শিওর, বাট মনে তো হচ্ছে…
কেএলএফ?
এক্স্যাক্টলি। মওকা যখন পেয়েছি তখন ক্যামেরা রেডি রাখিস…আজ না হয় কাল আমাদের এই ডক্যুমেনটরি কাজে আসবেই।
.
২১
গেট খুলে দিলে সোজা দরজার সামনে গাড়ি দাঁড় করায় অনিন্দ্য। পেছনের সিটে সুনীতির পাশে সুষমা বসে। ক্লান্ত হলেও বাড়ি ফেরার আনন্দে মন চনমনে। বিয়ে হয়ে থেকে টুকটাক বেড়াতে যাওয়া বাদ দিলে বিপিন পাল রোডের বাড়ি ছেড়ে বিশেষ বাইরে থাকেননি। অনিন্দ্য হওয়ার সময় কিছু মাস বাপের বাড়িতে ছিলেন, অম্লানের সময় তাও নয়।
একে তো এই প্রথম এতদিন বাড়িছাড়া, তার ওপর নার্সিং হোমে। যদিও সেপারেট কেবিনে রাখা হয়েছিল, তাও…সারাক্ষণ ফিনাইল আর ওষুধের গন্ধে গা বমি করত। অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেওয়ার পর বারবার ডাক্তারের কাছে জানতে চেয়েছেন কবে ছুটি হবে।
ছুটি করে দিতেই পারি কিন্তু বাড়ি গিয়ে এখানকার মতো রেস্ট হবে? ডাক্তার মজা করে বলেন।
সুষমা বলেন, নিজের লোকের মাঝখানে থাকলে আমি বেশি ভালো থাকব।
কথাটা ডাক্তারবাবুর মনে ধরে। নার্সিং হোম যা চিকিৎসা করার করেছে, তাই ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেন।
গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অনিমা আর অর্পিতা বেরিয়ে আসে। সুনীতির হাত থেকে একজন ব্যাগ নেয় আর অপরজন সুষমাকে ধরে নামায়। একতলা থেকে জগা আর অনিন্দ্য মিলে চেয়ারে বসিয়ে তাকে ওপরে তোলে।
এতদিন পর নিজের ঘরে ফিরে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায় সুষমার।
কেমন আছিস রে জগা?
ভালো মা।
আমার গাছগুলোকে মেরে ফেলিসনি তো?
কী যে বলেন মা! আপনি নেই বলে বেশি করে যত্ন নিয়েছি। তবে গাছের প্রাণ আছে এ আবারও দেখলাম, আপনার জন্য চিন্তায় চিন্তায় আমার সঙ্গে ওরাও কেমন নেতিয়ে থাকত। জগার গলা ধরে আসে।
পাগল একটা। কিছুই সেরকম হয়নি আমার।
হয়নি তো। অর্পিতা কাছে এসে সুষমার হাতটা ধরে। কী রোগা হয়ে গেছ এই ক’দিনে বড়মা!
আবার ঠিক হয়ে যাব। আয় বোস তো পাশে। তোর মায়ের খুব খাটনি যাচ্ছে নারে? দুই বাড়ির দেখভাল করা।
মাকে তো চেনো, ম্যানেজ করে নিয়েছে। অর্পিতা সুষমার গলা জড়িয়ে ধরে, তুমি ছিলে না, আমাদের একদম…
কথা শেষ করতে পারে না অর্পিতা, চোখ জলে ভরে যায়।
এসে গেছি তো। এখন মন খারাপ কীসের?
বেশি কথা নয় কিন্তু, ডাক্তার বলে দিয়েছে। সুনীতি খাটের ওধারে বসে বেডসাইড টেবিলে প্রেসক্রিপশান মিলিয়ে ওষুধগুলো রাখতে রাখতে বলেন।
এলেন আমার বড় ডাক্তার! সুষমা হাসেন। এতদিন পর ফিরলাম, খবরাখবর নেব না? সংসারের আরেক নাম চিন্তা।
চিন্তা তো বটেই। মুখে কিছু না বললেও মনের ভেতরে একটা কথা সমানে চলছে, অনি কেন আলিয়ার ব্যাপারে এত অ্যালুফ হয়ে আছে? নার্সিং হোমেও জিগ্যেস করাতে ‘কেসের ডেট আছে’ বলে এড়িয়ে গেছে। তারপর যতবার জানতে চেয়েছেন, বলেছে সব ঠিক আছে। কিন্তু ছেলের মুখ দেখে বুঝতে পারছেন ঠিক নেই। ঘর খালি হতে স্বামীকে জিগ্যেস করেন, এবার একটা সত্যি কথা বলো তো—অনি একা এল কেন?
বেয়াইয়ের কেস ফেলে বউমা আসবে কী করে?
আমার ছেলে যে গেল সব ফেলে, তার বেলা? তাছাড়া আমার স্ট্রোক কি কিছুই না?
উত্তর না দিয়ে সুনীতি নিজের কাজ করতে থাকেন।
এই ক’দিনে সে একবারও ফোন করেনি?
করেছে।
জানতে চেয়েছে আমার কথা?
চাইবে না কেন?
অনির সঙ্গে কথা বলেছে?
না। আমার সঙ্গে কথা বলে রেখে দিয়েছে। বলেই সুনীতির মনে হয় এখন কোনোরকম টেনশান দেওয়া চলবে না সুষমাকে, উকিলের সঙ্গে মিটিং ছিল। তাই ছেড়ে দিয়েছিল।
.
সত্যি শেফটেলের সঙ্গে মিটিং ছিল আলিয়ার। শেষদিনের শুনানির পর তিনি জন আর আলিয়াকে ডেকেছিলেন তার চেম্বারে।
ট্যাটুটা কীসের?
দুজনেই চুপ।
আপনারা আপনাদের বাবাকে কখনো খালি গায়ে দেখেননি?
অফ কোর্স দেখেছি। জন বলে।
ট্যাটু চোখে পড়েছে আই থিঙ্ক। তো জিগ্যেস করেননি এটা কী, কেন করিয়েছেন?
জিগ্যেস করেছি। আলিয়া মনে করে বলে, বাবা বলেছিল ওটা ব্লাড গ্রুপ।
সেটা আমায় বলেননি কেন?
কী বলব? বাবার কোমরে ব্লাড গ্রুপ ট্যাটু করা আছে?
অফ কোর্স!
বাট হাও ডু আই নো এটা একটা ইস্যু হতে পারে?
মাথা ঠান্ডা করে শেফটেল ভাবেন আলিয়ার কথায় যুক্তি আছে। সত্যি তো, ও কী করে জানবে?
নেক্সট ডেটে মারকোর টেস্টিমনি শুরু হবে। জাজেরা তাকে জেরা করে বেহাল করে দেবে আই টেল ইউ। ইফ দ্য কোর্ট ফাইন্ডস হিম গিলটি, ফাঁসি কিন্তু শেষ কথা।
শেফটেলের কথা শুনে আলিয়া কেঁদে ফেলে।
ওহ! প্লিজ ডোন্ট ক্রাই। আমাদের কাছে একটা রাস্তা খোলা আছে এখনও, সুপ্রিম কোর্ট।
আর সেখানেও যদি…
এই কথার উত্তর এখন শেফটেলের কাছে নেই। গোড়া থেকে যতটা কনফিডেন্ট ছিলেন তিনি, ব্লাড গ্রুপের ট্যাটুটা সামনে আসায় তার মাথা কাজ করছে না। চেম্বার থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সোজা নিজের স্টাডি রুমে চলে যান শেফটেল। যদি সুপ্রিম কোর্টে যেতে হয়, সেইমতো কেস সাজাতে হবে। আরও অনেক তথ্য চাই, সেগুলো নোট করতে করতে রাত হয়ে যায়।
কীরে, খাবি আয়—সারা ঘরে ঢোকেন।
হুম, চলো।
মা-ছেলে মিলে খেতে বসে কিন্তু আগের মতো গল্প আড্ডা হয় না।
হেরে যাবি ভাবছিস?
হারার তো কথা নয় মম।
তাহলে মাথা খারাপ করছিস কেন?
ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট আবেগের বশে কী করে বসবে তাই ভাবছি।
ছেলের পাতে আরেকটু হামাস তুলে দিয়ে সারা বলেন, একটা কাজ করা যায়। একবার আলফ্রেড বোয়েমের কাছে যাবি?
আলফ্রেড বোয়েম, হলোকস্ট সারভাইভার। একজন নামকরা ভাস্কর। সোবিবোর ক্যাম্প থেকে ফিরে এসে জেরুসালেমে সেটল করেছেন। সোবিবোরে দৈনন্দিন জীবনের স্মৃতি একত্র করে তাঁরই হাতে গড়া ভাস্কর্যের মাধ্যমে একটা ‘হলোকস্ট মিউজিয়াম’ বানিয়েছেন। দুটো বছর সোবিবোরে যে পাশবিক অত্যাচার সহ্য করেছিলেন তারই রোজনামচা তুলে ধরেন তিনি। ছোট ছোট মূর্তিগুলো বড় জীবন্ত। মনে হয় এই বোধহয় কথা বলে উঠবে।
হিটলারের এস এস আর্মির অত্যাচারের বিবরণ দেখতে দেখতে একটা ভিন্ন মূর্তির সামনে এসে সারা আর শেফটেল দুজনেই থমকে দাঁড়ান।
দ্য গ্রেট শেফটেল!
আলফ্রেড এগিয়ে গিয়ে তার হাতদুটো ধরেন। আই নিউ তুমি আসবে।
হাও?
হাসেন আলফ্রেড। কিছু বলেন না। সারার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে তাদের বসিয়ে তিনকাপ কফি আর কুকিজ আনান।
কী দেখছিলে মন দিয়ে সারা?
দুজন লোক লং কোট পরে ভায়োলিন হাতে…ক্যাম্পে এন্টারটেনমেন্ট থাকত বলে শুনিনি!
সব ক্যাম্পে নয়, সোবিবোর ক্যাম্পে ছিল।
মাই গড!
তবে তোমরা যে ভাবছ গান গেয়ে সাংঘাতিক এন্টারটেন করত নাৎসি বাহিনী তা কিন্তু নয়। ক্যাম্পে নানা রকমের বন্দি থাকত। কেউ গান গাইতে পারত, কেউ পারত ছবি আঁকতে, কেউ ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতে। এমনই বাজনদারদের ভিড়ের মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে সাজানো হত, জাস্ট লাইক আ জোকার। লং কোট, মাথায় ফানি হ্যাট। মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য গ্যাস চেম্বারের সামনে ভায়োলিন বাজানো ছিল তাদের কাজ।
বুঝলাম না।
যাতে চেম্বারে ঢোকার মুখে সবাই ভাবে আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা আছে! ওই পনেরো কুড়ি মিনিট যা সময় লাগত ওদের মারতে, ততক্ষণ ভায়োলিন বাজিয়ে যেতে হত।
ইনহিউম্যান!
সারার মুখ থমথম করে।
কফি মাগ নামিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে আলফ্রেড একটা মেয়ের মূর্তির সামনে যান।
একে দেখেছ? পরনে কিছু নেই। গ্যাস চেম্বারে ঢোকার আগে উলঙ্গ মানুষগুলোকে ন্যাড়া করা ছিল আমার কাজ। ইম্যাজিন! ডে ইন অ্যান্ড ডে আউট। যন্ত্রের মতো অনেককে ন্যাড়া করেছি কিন্তু এর মুখটা ভুলিনি। চুল কেটে ফেলার সময় একটাও কথা বলেনি, চুপ করে ছিল। যখন গ্যাস চেম্বারের দিকে দলের সঙ্গে রওনা হয় তখন একবার ঘুরে তাকিয়েছিল আমার দিকে।
হলুদ দাঁত বের করে হাসেন আলফ্রেড। কী ভাবলে? আমার প্রেমে পড়ে ঘুরে তাকিয়েছিল? না। শেষবারের মতো এই সুন্দর পৃথিবীটাকে দু-চোখ ভরে দেখেছিল। ভেবেছিল একটা পূর্ণ জীবন বাঁচতে আবার ফিরতে পারবে তো?
গলার কাছে দলা পাকানো আবেগ চেপে শেফটেল মূর্তির সামনে গিয়ে মেয়েটিকে দেখে। কী নিখুঁত কাজ আলফ্রেডের! মেয়েটার চোখের ভাষা আজও পড়া যায়।
নাও টেল মি, হাও ক্যান আই হেল্প ইউ? আলফ্রেড ফিরে এসে কফিতে চুমুক দেন।
সারা অবাক। আমরা হেল্পের জন্য এসেছি জানতেন?
নাহলে এতদিন তো তুমি একাই এসেছ, ছেলে তো আসেনি!
.
ইয়োর অনার এই কেসের সঙ্গে জড়িত একটা গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও আমি অনারেবল কোর্টকে দেখাতে চাই।
অবজেকশান! শেফটেলের বিরুদ্ধে রুখে ওঠেন মাইকেল।
উইটনেসের দিন শেষ, আজ মারকোর টেস্টিমনি। আমার মনে হয় অযথা কোর্টের সময় নষ্ট হচ্ছে।
আমি সময় বাঁচাতে চাই বলেই বলছি। এই ভিডিও দেখলে…
সরি শেফটেল। নো মোর উইটনেসেস।
ডভ একটা কাগজে চোখ বুলিয়ে শুরু করেন। সো মারকো ডেমিয়ানুক, এতদিন অনেক কিছু শুনলেন আপনার সম্বন্ধে, এবার বলুন আপনার কী বলার আছে?
জাস্ট আ লাইন। আমি নির্দোষ।
ফরেনসিক রিপোর্ট অ্যান্ড হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্টদের কথা ধরলে ইয়েস ইউ আর।
শুধু তাই নয়, দুজনের ছবি পাশাপাশি রেখেও প্রমাণিত আমরা আলাদা মানুষ। আর আমার ব্লাড গ্রুপ ট্যাটুর ব্যাপারটাও আমি ক্লিয়ার করে দিচ্ছি।
বাট ক্যান ইউ ডিনাই আপনি যখন আমেরিকায় সিটিজেনশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করেন তখন জানা যায় ‘মারচেঙ্কো’ আপনার মায়ের বিয়ের আগের সারনেম ছিল।
ট্রু।
আপনি রেড আর্মিতে ছিলেন?
হ্যাঁ, ছিলাম।
এই প্রথম বাবার স্বীকারোক্তি আলিয়াকে অবাক করে। জন্ম থেকে কখনো তার মুখে শোনেনি তিনি কোনো আর্মিতে ছিলেন।
ব্লাড গ্রুপ ট্যাটু তখনই করানো।
রেড আর্মিতে থাকাকালীন আপনার নাম কী ছিল?
মারকো।
ফুল নেম?
মারকো মারচেঙ্কো।
নিজের কানকে বিশ্বাস হয় না আলিয়ার। জনকে জিগ্যেস করে, বাবা নাম পাল্টেছিল? তুমি বা মা জানতে?
জন মাথা নাড়ে। এই প্রথম শুনছি!
আপনার আসল নাম মারকো?
ইয়েস ইয়োর অনার।
নো। আপনার রিয়েল নেম ইভান। স্কুলে এই নামেই অ্যাডমিশন হয়েছিল।
নো। অ্যাকচুয়ালি বাড়িতে আমায়…
জাস্ট ইয়েস অর নো! ডালিয়া ধমকে ওঠেন, ইভান ডেমিয়ানুক নামে আপনি স্কুলে ভর্তি হননি?
একবার ছেলেমেয়ের দিকে তাকান মারকো। দুজনেই বাবার দিকে কাতর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
ইয়েস হয়েছিলাম। কিন্তু ইভান বলে একমাত্র আমার বাবা ডাকতেন। স্কুলে ভর্তির সময় ভুল করে সেই নামে…
ইভান ডেমিয়ানুক থেকে মারকো মারচেঙ্কো হয়ে রেড আর্মি, সেখান থেকে ইভান মারচেঙ্কো হয়ে এস এস আর্মি। আবার ১৯৪৪-এর পর আমেরিকায় সেটল করার সময় তৃতীয়বার নাম পাল্টে মারকো ডেমিয়ানুক। ইয়েস অর নো মিস্টার ডেমিয়ানুক?
মারকোর মুখ রাগে লাল—আই অ্যাম টেলিং ইউ দ্য ট্রুথ! মারকো-ই আমার আসল নাম। ইভান আমার নিকনেম কিন্তু আমি নাৎসি সেনাদের সঙ্গে কোথাও ছিলাম না।
ইয়োর গেম ইস ওভার মিস্টার ডেমিয়ানুক।
হাত নেড়ে কিছু বলতে গিয়েও হতাশ মারকো চুপ করে যান। আলিয়ার প্রাণটা বোধহয় মুখ দিয়েই বেরিয়ে যাবে। জন মাথা নীচু করে চোখ বন্ধ করে প্রেয়ার করতে থাকে।
নাও ইয়োর সাইলেন্স প্রুভস দ্যাট ইউ আর গিলটি।
ডভ, জি আর ডালিয়া নিজেদের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত আলোচনা করে বলেন, মারকো ডেমিয়ানুক এস এস আর্মির অন্তর্ভুক্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। নিজের নাম ভাঁড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করলেও আজ ইজরায়েল ডিসট্রিক্ট কোর্টে তিনি কিছু কথা বলে আর কিছুটা চুপ থেকে স্বীকার করে নিয়েছেন তিনিই ইভান দ্য টেরিবল। অনারেবল কোর্ট মারকো ডেমিয়ানুকের সাজা ঘোষণা করছে…উইল বি হ্যাংড টিল ডেথ।
.
২২
বারামুল্লাহর সরকারি হাসপাতালের গেটে এসে আমির বুঝতে পারেন না, কার সঙ্গে কথা বললে সঠিক খবর পাবে। গিজগিজে ভিড়। একবার এই কাউন্টার, আরেকবার ওই কাউন্টারে ছোটেন। সঙ্গে আলিয়া। সেও এসেছে বাবার সঙ্গে। রিফত আসতে চেয়েছিলেন, ওরা আনেনি।
একে সাংঘাতিক ঠান্ডা, তারপর বরফ পড়ার দরুন শ্রীনগর থেকে বারামুল্লাহ রুটের বাস কম চলছে। পাহাড়ি রাস্তা ধরে সারিবদ্ধ হয়ে শামুকের গতিতে চলাচল করছে। সব গাড়ির চাকায় চেইন লাগানো যাতে পিচ্ছিল বরফে গড়িয়ে না যায়। এদিকে সন্ধের মধ্যে যে করে হোক বাড়ি ফিরতেই হবে। তবে দুজনে নয়, সইফকেও নিয়ে যাবেন।
আপকা বেটা তো অসপতাল মে হ্যায়।
হজরতবল দরগায় প্রার্থনা করে বেরোবার সময় এক বন্ধুর মুখে খবরটা পেয়ে আমির আল্লাহকে ধন্যবাদ জানান। মুখে যাই বলুন, যতই ধমকান, সইফ ওর প্রাণের আরেক টুকরো। তার একটা খবরে আমিরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেও নিভে যায়।
হাসপাতালে মতলব? আপনি কেমন করে…
আমি ওখান থেকেই আসছি, দেখা ম্যায়নে উসকো।
মাথা কাজ করে না আমিরের। কী হয়েছে সইফের?
জানি না, বাত নহী হুই। লেকিন হালত নাজুক হ্যায়।
বাড়িতে জানাতে রিফত কান্নাকাটি জুড়ে দেন। আমি এখুনি যাব, আমায় নিয়ে চলো।
স্কুলে শীতের ছুটি পড়ে যাওয়ায় আলিয়া বাড়িতেই ছিল, জানতে পেরে সে বাবার সঙ্গে বাস ধরে চলে আসে।
আব্বু, তুমি দাঁড়াও এখানে, আমি একবার ভেতর থেকে আসছি।
বলেই করিডোর ধরে ছুটতে থাকে সে। দুদিকে ঘর, গুচ্ছের পেশেন্ট। দাদাকে খুঁজে পাওয়া মুখের কথা নয়। ভিজিটিং আওয়ার্স চলছে এই এক বাঁচোয়া, নাহলে ওকেও বার করে দিত। একটা, দু্টো, তিনটে… পরের পর ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজে চলে…কোথাও সইফ নেই। তাহলে কি বাবাকে লোকটা ভুল খবর দিল?
ভাইজান। সইফ বেগ নামের কেউ এখানে ভর্তি আছে? হাতের কাছে এক বেয়ারাকে পেয়ে আলিয়া জিগ্যেস করে।
পতা নহী। আপ রিসেপশান মে বাত করো।
ওরা বলতে পারল না।
তাহলে নেই। লোকটা নিজের কাজে চলে যায়।
.
নেই! নেই মানে?
জম্মুর কলেজ হোস্টেলে ফোন করে তেহজিব অবাক।
কোথায় গেছে?
বলে তো গেল শ্রীনগর। লায়লাকে ছেড়ে মজনু কি থাকতে পারে? বন্ধুরা ফোনের ওপার থেকে মশকরা করে।
অনুরাগ কাশ্মীরে, অথচ ও জানে না? এ তো আশ্চর্য ব্যাপার! হালিমাকে কিছু না বলে শপিংয়ে যাওয়ার নাম করে তেহজিব বেরোয়। গাড়ি করণনগরে না ঢুকিয়ে খানিক দূরে ড্রাইভারকে রাখতে বলে সে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে মহেন্দ্রর বাড়ির গলিতে ঢুকে পড়ে।
কোন ছোটবেলায় পড়তে আসত, এখন গায়ে গায়ে অনেক বাড়ি হয়ে গেছে, চেনা মুশকিল। আগে এই গলিটা সারাদিন গমগম করত, বাচ্চারা খেলে বেড়াত আর এখন কেমন খাঁ খাঁ করছে। মনেই হয় না এ চত্বরে কেউ থাকে। বাড়ির দরজাগুলোয় ‘হুমকি লিফলেট’ ঝোলানো। দু-একটা তেহজিব নিজেই ছিঁড়ে ফেলে দেয়। প্রাইমার করা একটা গেটের সামনে এসে বাড়ির মাথায় ‘মুন্সী নিবাস’ দেখে চিনতে পারে। বেল নেই। লোহার গেটে কয়েকবার আওয়াজ করলেও কেউ বেরোয় না। শুনতে পায় না, নাকি ইচ্ছে করে বেরোয় না কে জানে? আরেকবার ঠং করে আওয়াজ করতে একটা পুরুষ কণ্ঠ শোনা যায়।
মহেন্দ্র স্যার আছেন?
গেট খুলে বেরিয়ে আসে মহেন্দ্র। বলুন।
মুখ থেকে ওড়না সরায় তেহজিব। স্যার, আমি।
তুমি!
মহেন্দ্র ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। তুমি এখানে!
স্যার, অনুরাগ আছে?
না।
কিন্তু কলেজ থেকে বলল ও বাড়ি এসেছে?
আসেনি। মহেন্দ্র গেট বন্ধ করতে উদ্যত হয়।
আপনি এরকম ব্যবহার করছেন কেন স্যার? আমি তো আগেও এসেছি আপনার বাড়ি।
তেহজিব, নিজের এবং অনুরাগের ভালো চাও তো এখানে আর এসো না, প্লিজ।
এক সেকেন্ডের জন্য মনে হয় তাহলে অনুরাগ বাড়িতে ওদের কথা বলে দেওয়াতে কি মহেন্দ্র স্যার এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করছেন? কিন্তু বলার কথা তো চাকরি পাওয়ার পর। তাহলে কি বাবা…মুহূর্তে মিলে যায় অঙ্ক। ওদের সম্পর্কের কথা জেনে তাকে ডেকে এনে অনুরাগকে এখান থেকে হাওয়া করে দিয়েছে? নাকি মহেন্দ্র মুন্সীর পরিবারকে এমন থ্রেট করেছে যে তারাই অনুরাগকে সরিয়ে দিয়েছে? তাকে জানতেই হবে। মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যাওয়া গেটে মহেন্দ্র তালা লাগাবার আগেই সে ঠেলে ভেতরে চলে আসে।
তেহজিব! কী করছ কী তুমি?
অনুরাগ কোথায়, আপনাকে বলতেই হবে স্যার।
উপায় না দেখে মহেন্দ্র তাকে ঘরে নিয়ে যায়।
গলির অপর প্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসেন আরবাজ। চিফ মিনিস্টারের মেয়েকে এখানে আসতে দেখে সে হতবাক!
তেহজিব ম্যাডাম এখানে? মহেন্দ্রর ভয়ের কারণ এ কী করে হতে পারে?
.
প্রাণে ভয় নেই?
হুজত রিভলভিং চেয়ার ছেড়ে উঠে বাঘের মতো ঘরময় পায়চারি করতে থাকেন।
কোথায় লুকিয়ে আছে?
গন্দেরবলে এক বন্ধুর বাড়ি। সাজিদ বলে।
এত সাহস! আমার হুমকি অগ্রাহ্য করে ভাইকে নিয়ে এল?
এবার কী করণীয় জনাব?
পথের কাঁটা না সরালে আমার মেয়ের পায়ে ফুটবে সাজিদ।
একটু গম্ভীর দেখায় সাজিদকে। আপনার সব কাজে আমি সায় দিই স্যার, কিন্তু এই কাজটায় ডাইরেক্ট ব্লেম আপনার ওপর এসে পড়তে পারে।
কী করে? কেউ জানে নাকি তেহজিবের সম্পর্কের কথা?
মহেন্দ্র তো জানে।
হুজত দমে যান। গুম হয়ে খানিকক্ষণ ভাবেন। তাহলে?
খুন খারাবা না করে আমার একটা আইডিয়া নিন। কাশ্মীরের বাইরে ক’দিন…
এই সময়? ইম্পসিবল!
এই সময়েই পসিবল স্যার। জানুয়ারি মাসে কাশ্মীরে যা হতে চলেছে তার দায় আপনার ঘাড়ে আসবে যদি আপনি তখন এখানে সি এম হয়ে থাকেন। এক কাজ করুন। গভরনর মোহনলালজির সঙ্গে ঝামেলা লাগিয়ে ইস্তফা দিয়ে ম্যাডামকে নিয়ে বিদেশ চলে যান। চট করে জম্মু-কাশ্মীরের চিফ মিনিস্টার হিসাবে কাউকে মনোনীত করা দিল্লির পক্ষে সম্ভব হবে না। কেএলএফ তার কাজ করবে আর আপনি আপনার ঘর বাঁচাবেন।
.
বাঁচাও! আমায় বাঁচাও…ইয়া আল্লাহ!
পাঁচ নম্বর ঘর থেকে বেরিয়ে আলিয়া আমিরের কাছে ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ কাতর কণ্ঠের আওয়াজ শুনে মনে হয়, গলাটা চেনা লাগছে! চকিতে যেখান থেকে আওয়াজ আসছে সেই ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে দেখে একটা বেডের সামনে কিছু লোক জড়ো হয়ে আছে আর পেশেন্ট সমানে বিলাপ করে চলেছে।
মুঝে ঘর জানা হ্যায়। মেরে আব্বাকো বুলাও।
ধীর পায়ে ভেতরে এসে লোকগুলোর মাঝখান থেকে উঁকি মেরে আলিয়া দেখে খাটে শুয়ে শাহিদ কাতরাচ্ছে।
শাহিদ ভাইজান!
আলিয়ার গলা পেয়ে বাকিরা ওর দিকে তাকায়। একজন ডাক্তার এগিয়ে এসে জিগ্যেস করে, আপনি এনাকে চেনেন?
জী। ওর কী হয়েছে?
বলছি। তার আগে ওর কিছু ওষুধ লাগবে, সেটা নিয়ে আসুন। ডাক্তার আলিয়ার হাতে একটা প্রেসক্রিপশান ধরিয়ে বেরিয়ে যান।
ততক্ষণে ইঞ্জেকশানের ঘোরে শাহিদ ঘুমিয়ে পড়েছে। খাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলে এগিয়ে আসে। আপনার এখানে কেউ ভর্তি আছে?
আমার ভাইকে খুঁজতে এসেছি, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছে না।
কী নাম?
সইফ বেগ।
সইফ! ছেলেটি একটু অবাক হয়ে পাশের বেডের দিকে তাকায়, ওই তো—।
বলার সঙ্গে সঙ্গে আলিয়া ঘুরে দেখে কম্বল ঢাকা দিয়ে সইফ অকাতরে ঘুমোচ্ছে।
ভাইজান!
জাগাবেন না! অনেক কষ্টে ঘুম পাড়ানো গেছে।
আপনি…
আমি…আমার নাম অম্লান আর এ আমার বন্ধু সরোজ।
ভাইজানকে এখানে কী করে? কথাটা বলতে গিয়ে আলিয়া লক্ষ করে সইফের পায়ের কম্বলটা একটু সরে গেছে। পাছে ঠান্ডা লাগে তাই সেটা ঠিক করে দিতে গিয়ে দেখে, সইফের পায়ের পাতা সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া।
ভাইজনের পায়ে ব্যান্ডেজ কেন?
কম্বলটা অল্প সরিয়ে পায়ে হাত দিয়েই আলিয়া চমকে ওঠে। একী!
নেই। অম্লান এক-পা এগোয় আলিয়ার দিকে। তুষার ঝড়ে আটকে পড়েছিল শাহিদ আর সইফ। যখন উদ্ধার করা হয় তখন ফ্রস্ট বাইটে…সইফের তাও কপাল ভালো একটা পায়ের দুটো আঙুল কাটা গেছে। শাহিদের দু-পায়ের চেটো আর নেই।
ইয়া আল্লাহ! আলিয়া দুহাতে মুখ ঢাকে।
কী হল? আপনি ওষুধগুলো আনেননি?
ডাক্তার ফিরে এসে আলিয়াকে দেখে জিগ্যেস করেন, আর এইভাবে এখানে কান্নাকাটি করবেন না। বাইরে যান।
দিন, আমি এনে দিচ্ছি। প্রেসক্রিপশান নিয়ে অম্লান বেরোতে যাবে, আলিয়া কান্নাধরা গলায় বলে, আমার আব্বা বাইরে আছে। তাকে একবার…
অবশ্যই। কিন্তু চিনব কীভাবে?
দেখবেন কালো পাঠান ড্রেসের ওপর লাল সাদা জ্যাকেট পরে আছেন। বলবেন আলিয়া ডাকছে।
আলিয়া! নামটা শুনেই অম্লানের মনে পড়ে, অবন্তী কিচলু বলেছিল তারার বন্ধুর নাম আলিয়া! তাহলে এই কি সেই মেয়ে?
.
২৩
সুষমার কথা শোনার পর নাতালিয়া অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। অনিন্দ্যর থেকে খবর নিলেও ইচ্ছে ছিল সুষমা বাড়ি ফিরলে ফোন করবে।
আই ওয়াজ শকড দিদি! এখন কেমন আছেন?
নাতালিয়াকে সুষমার বেশ ভালো লেগেছিল, খুবই মার্জিত ব্যবহার। বিশেষ করে তাকে যখন ‘দিদি’ বলে মন ভরে যায়।
অনেক ভালো। রেস্ট নিয়ে নিয়ে মোটা হয়ে গেলাম।
না দিদি, রেস্ট ইজ মাস্ট। ওপর নীচ করবেন না।
করতে দিচ্ছে নাতো। যাই হোক আপনাদের কথা তো…
ফোনের ও প্রান্তে নাতালিয়ার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। কপালের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। প্রার্থনা করার মতো মনের জোরও আর নেই।
সুনীতি আর শিবাজী একদিন মারকোর কেসের কথা আলোচনা করছিলেন তখনই সুষমার কানে আসে।
ফাঁসি! তাহলে তো সব শেষ।
ক্ষীণ হলেও আশা আছে। আলিয়ার উকিল সুপ্রিম কোর্টে…
ডাইনিং টেবিলে বসে কড়াইশুঁটি ছাড়াতে ছাড়াতে সুষমা বলেন, সুপ্রিম কোর্ট তো আরও সাংঘাতিক জায়গা। কেস ধোপে টিকবে বলে মনে হয়?
এখন সবটাই লাক।
দেখো, যা রটে তার কিছু তো বটে। ছি ছি! আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ দেখাব কী করে?
সুনীতি ভাইকে ইশারা করেন থেমে যেতে।
যাই হোক, তুমি বেশি কথা বোলো না বউদি। আমি যাই, স্নান সারি। শিবাজী উঠে পড়েন।
অনি কি আবার যাবার কথা ভাবছে?
বলেনি কিছু। সুনীতি বলেন।
আর ছোটকুমারের কী খবর? মায়ের মৃত্যু হলে সে ফিরবে নাকি?
সেদিন তো কথা হল তোমার সঙ্গে। কী বলল?
দেশ উদ্ধার করতে গেছেন। কে যে ওর মাথাটা খেলো?
কথা কানে যেতে থমকে দাঁড়ান শিবাজী। ভেতরে ভেতরে তিনি মরমে মরে আছেন। মেয়ের এক ভুলে অম্লান আজ ঘরছাড়া। অনেকবার ভেবেছেন বলে দেবেন কিন্তু অনিমা মত দেননি।
বোলো না। দিদির শরীর যদি হঠাৎ করে খারাপ হয়ে যায় তাহলে বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে। বুবলি ভুল করেছে ঠিকই, তবে আমিও সেদিন কেন যে এসব নিয়ে আলোচনা করতে গেলাম! মাথাতেই আসেনি যে ও বাপ্পাকে বলবে আর সে ছুটে বেরিয়ে যাবে। তবে একটা কথা বলব, যদি সত্যি ছেলেটা যা করতে গেছে তাতে সফল হয়ে ফিরতে পারে, বিরাট ব্যাপার হবে কিন্তু।
.
অম্লান সবসময় জীবনে বিরাট কিছু করতে চেয়েছে। পড়াশোনায় দাদার তুলনায় কমা বলে পাত্তা পায়নি। বাড়িতে কেউ ওকে সিরিয়াসলি নেয়নি, যা করতে গেছে তাই নিয়েই সবাই ঠাট্টা-তামাশা করেছে।
স্কেচ শেখার সময় মাকে বসিয়ে একটা পোট্রেট আঁকতে চেষ্টা করেছিল। শেষ হওয়ার পর সবাই এমন হেসেছিল যে সেদিনের পর আর পেনসিল হাতে ধরেনি। এক রবিরার দুপুরে গিটার নিয়ে গান শোনাতে বসতেই সবাই ঘুম পাচ্ছে বলে উঠে গেছিল। কিছু বলেনি কাউকে, তবে কষ্ট হয়েছিল। একবার গানটা কি শোনা যেত না?
তাই এবার সে হাজার বারণ বা তিরস্কার শুনলেও পিছু হটবে না। জানে কাজটা শক্ত বলাটা বোকামি, জান যেতে পারে এতটাই রিস্কি। ঝোঁকের মাথায় কুপওয়ারা আসাটা ভুল হয়েছে প্রথমে বুঝতে পারেনি।
যেদিন রওফের বাড়িতে এসে ওঠে তখনও এত বরফ পড়েনি, বাস চলছিল। ভেবেছিল দুদিনের মাথায় তথ্য জোগাড় করে শ্রীনগর কেটে পড়বে। কিন্তু রাতারাতি এমন বরফ পড়া শুরু হল যে সব স্তব্ধ হয়ে গেল।
চিন্তা নেই। যেদিন বাস চালু হবে সেদিন আপনাদের ফিরিয়ে দেব।
রওফের কথায় ভরসা করে রয়ে যায় অম্লান, আর নজর এড়িয়ে রেকর্ড করতে থাকে যা চোখে পড়ে। বাড়িতে যারা আসত তাদের কথাবার্তা বুঝতে না পারলেও কিছু একটা প্ল্যান করছে বোঝা যেত। আর তারপর যখন শাহিদরা আসে তখন…তখন অম্লান সত্যি ভয় পেয়েছিল।
একটু এদিক ওদিক হয়ে গেলে ওদের মেরে ফেলতে এক মিনিটও লাগত না রওফ বা আব্দুলের। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিল না কীভাবে ব্যাগটা সবার সামনে রাখবে। ঈশ্বর সুযোগ করে দিলেন যখন রওফ তাদের বলল, আজ রাতটা সইফ যদি আপনাদের সঙ্গে থাকে, অসুবিধে আছে?
শুধু একটা রাত না, অসুস্থ সইফকে বেশ কয়েকটা রাত থাকতে হয়েছিল। আর অম্লান পেয়ে গেছিল ভাব জমানোর সুযোগ। তবে সময় লেগেছিল। সইফ প্রথমে মুখ খোলেনি। সরোজ নানাভাবে তাকে কথা বলানোর চেষ্টা করে ফেল দেখে একদিন অম্লান একটা সিগারেট তার দিকে এগিয়ে দেয়।
চলবে?
বরফ গলে। কথা শুরু হয়।
কোথা থেকে এলে তোমরা সবাই মিলে?
রাওয়ালকোট থেকে।
সে তো পাকিস্তানে!
হ্যাঁ। তাতে কী?
বেড়াতে গিয়েছিলে?
ট্রেনিং লেনে।
কীসের?
আজাদির।
কবে আসবে আজাদি?
জানুয়ারি মে।
কীভাবে?
পণ্ডিতদের কাশ্মীরছাড়া করে।
কিন্তু ওই সময় তো ম্যাক্সিমাম ঠান্ডা থাকে!
সেই জন্য তো জানুয়ারি। অর্ধেক ঠান্ডাতেই মরে যাবে।
সইফের কথা শুনে অম্লানের তৎক্ষণাৎ শিবাজীর কথা মনে পড়ে। মারকোর ঘটনার পর বাড়িতে প্রায়ই এসব আলোচনা হত। শুনেছিল অসহনীয় ঠান্ডায় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে কীভাবে অত্যাচার করত নাৎসিরা।
ধর এক ট্রেন লোক এসেছে, তাদের দুদিন ট্রেনেই রেখে দিল।
কেন?
ক্যাম্পে রাখার জায়গা নেই তো! লোকগুলোকে মেরে ঘর খালি হবে, তবে তো এরা ঢুকতে পারবে। কনকনে শীতে দুদিন ট্রেনে বসে থেকেই কত লোক মারা যেত।
শুধু কি তাই? একটা মোটা কম্বল সাত আটজন ভাগাভাগি করে শুত। সকালে ঘুম ভাঙলে দেখা যেত পাশের লোকটা ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে মরে পড়ে আছে।
.
জেনোসাইড। এ শব্দটা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে আলিয়া কখনও ভাবেনি। চোখ বন্ধ করলেই কতগুলো কঙ্কালসার মুখ তাকে তাড়া করে বেড়ায়। সন্ধেবেলায় হোটেল লনে বেশিক্ষণ হাঁটা যায় না, ঠান্ডা পড়ে গেছে। রাতে ঘুম আসে না, আলো জ্বালিয়ে জেগে হিজিবিজি ভাবে। মনে হয় অনিন্দ্যকে ফোন করে সারারাত গল্প করে। হাজার হাজার মাইল দূরে তার ভালোবাসা অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। অভিমান আর অহংকারের মধ্যে কি একটা সূক্ষ্ম রেখা আছে? আছে নিশ্চয়। না-হলে রেখা মুছে গেলে অভিমানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে অহংকার জায়গা করে নেয়!
মারকোর ফাঁসির আদেশ হয়েছে শুনেও অনিন্দ্য কেন জিগ্যেস করে, আমি আসব? কেন বলতে পারে না ‘আমি আসছি’? টিকিটের খোঁজ করেও তার অহংকার তাকে আটকে দেয়। মনে করায় ‘মায়ের সময় সে কি আসতে পারত না?’
পারতাম কি জন? আলিয়া তার দাদার কাছে জানতে চায়।
পারতিস না। বাট দিস ইজ মেল ইগো। ইউ কান্ট হেল্প।
ফিমেল ইগো থাকতে নেই?
হেসে ফেলে জন। কাম অন আলিয়া, সব ঠিক হয়ে যাবে ওয়ান্স পাপা ইজ আউট।
বোনকে এসব বলে থামালেও সেও এখন রাতজাগা পাখি। বাবার চিন্তায়। জনের দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে কোনো কথাই ওঠে না। একধারে যেমন ওহিওতে রেখে আসা পরিবারের প্রতি কর্তব্য করে চলেছে তেমনি অন্যদিকে শেফটেলকে আঁকড়ে ধরে আছে।
সুপ্রিম কোর্টে অ্যাপিল করেছি, এখন ডেটের অপেক্ষা। শেফটেল জানান।
ধরুন পেয়ে গেলেন, তারপর? হাও উইল ইউ ফাইট?
অস্ত্র আছে।
কিন্তু শেফটেল এবার আর কিছু বলেন না। যা হবে একেবারে কেসের দিন দেখা যাবে।
পেয়ে যায় ডেট। দুরুদুরু বক্ষে আলিয়া জন হাজির হয়। এখানে তিনজনের বদলে পাঁচজন প্যানেল অফ জাজেস। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের মতো ক্যামেরা নিয়ে মিডিয়াও আছে।
প্রসিড। হুকুম দেন একজন জাজ।
ইয়োর অনার, মারকো ডেমিয়ানুক ইজ গিল্টি এবং ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট তাকে ফাঁসির সাজা শুনিয়ে দিয়েছে। এরপর এই কেস নিয়ে এগোনোর কোনো মানে নেই, সরকার পক্ষের এবারের উকিল নোয়াম তার বক্তব্য রাখেন।
আছে ইয়োর অনার। শেফটেল জাজেদের টেবিলের সামনে আসেন, আই হ্যাভ আ উইটনেস যে প্রমাণ করে দেবে ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের রায় একেবারেই ভুল।
জাজেরা ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে থাকেন।
লেট মি কল আলফ্রেড বোয়েম, হলোকস্ট সারভাইভার ফ্রম সোবিবোর ক্যাম্প।
আলফ্রেডকে এ শহর চেনে, সম্মান করে। তাই তাকে ডাকায় উপস্থিত সবাই নড়ে চড়ে ওঠে। টুকটুক করে এসে আলফ্রেড উইটনেস বক্সে বসেন।
আলফ্রেড বোয়েম আপনি সোবিবোর ক্যাম্পে ছিলেন?
ইয়েস।
কতদিন?
১৯৪২ থেকে ৪৪।
দুবছরে দেখা কিছু মানুষকে নিশ্চয় মনে আছে স্পেশালি আপনি তাদের মেমরিতে যখন একটা মিউজিয়াম বানিয়েছেন?
অফ কোর্স! বেশি মনে আছে অত্যাচারী নাৎসি বাহিনীকে।
ওকে। তাহলে একে চেনেন? শেফটেল মারকোর দিকে নির্দেশ করেন।
আলফ্রেড একটু সময় নিয়ে দেখে বলেন, ওনাকে টিভিতে দেখেছি এত মাস ধরে। কেস চলছিল।
তার বাইরে? সোবিবোর ক্যাম্পে?
এবার আর আলফ্রেড সময় নেন না। না, আই ডোন্ট নো হিম।
সেকী! ইট হ্যাজ বিন প্রুভড উনি সোবিবোরে গ্যাস চেম্বার অপারেটর ছিলেন।
ইম্পসিবল! সোবিবোর ক্যাম্পে অপারেটর ছিল ইভান মারচেঙ্কো আর ইনি ইভান মারচেঙ্কো নন।
নোয়েম মওকা পেয়ে যান।
আই অবজেক্ট! ইউ আর লাইং আলফ্রেড বোয়েম। হি ইজ ইভান মারচেঙ্কো।
নো হি ইজ নট! আলফ্রেড উত্তেজিত। ইভানকে এরকম দেখতে ছিল না আর সর্বোপরি ওর কালো চুল আর চোখের রঙ ব্রাউন ছিল।
শিওর? শেফটেল জিগ্যেস করেন।
এবং ইভান এর থেকে অনেকটাই বেঁটে ছিল।
কিন্তু ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এত ভুল করল আলফ্রেড? আমি বলছি ভালো করে দেখুন মারকোকে! নোয়াম ধমকের সুরে বলেন।
দেখার কিছু নেই।
আপনার বয়স হয়েছে আলফ্রেড, থিঙ্ক টোয়াইস।
জ্বলে ওঠেন আলফ্রেড। বয়স হয়েছে তো কী হয়েছে? আমার সব মনে আছে। এত সহজে ক্যাম্পের দিনগুলো ভোলা সম্ভব নয়।
আপনার মাথা কাজ করছে না। ভালো করে ভেবে আরেকদিন আসুন।
শাট আপ আই সে! বোয়েম এবার চেঁচিয়ে ওঠেন।
বিহেভ মিস্টার বোয়েম! জাজেরা ওয়ারনিং দেন।
আলফ্রেডের গলা নামে না। ইয়োর অনার, আমি নিজের হাতে ইভান মারচেঙ্কোকে খুন করেছি, আমি কী করে ভুল হতে পারি?
.
২৪
অনুরাগ গন্দেরবলে আছে।
আমি যাব।
খবরদার! আমার ভাইকে জানে মেরে দেবে তাহলে।
কে মারবে?
তোমার বাবা।
মহেন্দ্রর কাছ থেকে কথাটা শুনে তেহজিবের কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। তার বাবা কাউকে প্রাণে মেরে দিতে পারে! তার বাবা? হুজত উল ইসলাম লোকটা সাদা থেকে এতটা কালো হয়ে গেল? তাহলে রাজনীতি মানুষকে পাঁকে নামায় এ কথা সত্যি! তবে আন্দাজ করা উচিত ছিল। অসৎ সঙ্গে নরকবাস। ইয়াসিন মালিকের হাত ধরার ফল।
সেদিন বাড়ি এসে তেহজিব এতটাই নর্মাল ছিল যে কেউ বুঝতে পারেনি সে মহেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করে এসেছে। চুপচাপ মনে মনে প্ল্যান ভাঁজতে থাকে কীভাবে অনুরাগকে নিয়ে এখান থেকে পালাবে। মাকে অন্য সময় মনের কথা শেয়ার করে, এবার আর সে ওই ভুলটা করেনি।
কিন্তু তেহজিবের এই একটু ‘বেশি স্বাভাবিক’ ব্যবহার সাজিদের চোখ এড়ায় না। ড্রাইভারকে জিগ্যেস করে জানতে পারে, ম্যাডাম গাড়ি রেখে বেশ কিছুক্ষণের জন্য কোথাও গিয়েছিল।
কোথায় যেতে পারে?
জানি না সাব। ড্রাইভার একটু ভাবে। বটমালুতে গাড়ি রেখে হেঁটে বড়জোর করণনগর যেতে পারে।
কথাটা স্ট্রাইক করে।
করণনগর, মানে মহেন্দ্রর বাড়ি? তাহলে তো তেহজিব সবটা জেনে গেছে।
সাজিদ ভাবে, বিদেশ যাওয়া আজকেই ফাইনাল করতে হবে।
সময় নষ্ট না করে সাজিদ হুজতের কাছে আসে। স্যার!
কেয়া হুয়া?
আপ জলদি ডিসিশান লিজিয়ে। ম্যাডামকে বেশিদিন আটকানো যাবে না। অলরেডি উনি মহেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করে ফেলেছেন।
দরজার বাইরে আড়ি পেতে ওদের কথা শোনে তেহজিব। জুম্মা নামাজের সময় গেটের পাহারা শিথিল থাকে। তার বাবাও একটু পরে মসজিদ যাবে দলবল নিয়ে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। দুপুর একটায় আজান হয় আর তার দশ মিনিট পর হুজতরা বেরিয়ে গেলে বোরখা পরা তেহজিব গেটের কাছে এসে দেখে আজ চারজন পাহারাদার মোতায়েন। হঠাৎ খেয়াল হয় বাড়ির পেছনের ছোট লোহার গেটটা হয়ত খালি থাকলেও থাকতে পারে। ঠিক তাই। কোনমতে দুহাতে গেট ধরে, সাবধানে টপকে বরফে ঢাকা চিনার বাগানের ভেতর দিয়ে তেহজিব প্রাণপণে ছুটে চলে।
.
কাশ্মীরের অন্যান্য জায়গা সাদা হয়ে গেলেও শ্রীনগরবাসী বরফ দেখতে পায় জানুয়ারিতে। কিন্তু এবার আগে ভাগেই রাস্তাঘাট, বাড়ির চাল সাদা হতে শুরু করেছে। কেউ বলছে এমন চলতে থাকলে জানুয়ারির গোড়াতেই ডাল লেক জমে যাবে।
সুলতান সিকন্দর যেমন এক লাখ পণ্ডিতকে বরফ জলে চুবিয়ে মেরেছিল, সেই ভাবে এবারেও মারব!
আগুনঝরা চোখে আমানুল্লাহ কথাগুলো বলে।
ঠান্ডায় ঘর থেকে লোকজন কম বেরোলেও তাদের মিটিং থেমে নেই। ইয়াসিনের বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জল্পনা কল্পনা চললেও সে নিজে অশান্ত। শাহিদের খবর শোনার পর থেকে সে অস্থির হয়ে আছে।
আব্দুল! বহুত গলত হুয়া! রাগে গরগর করে ইয়াসিন।
ভাই, আমি কী করব? ওদের কিসমত…
কিসমত আমার খারাপ তাই শাহিদকে হারাতে হল। আগ থা শাহিদ, মেরা বচ্চা। টেরর বন গয়া থা শ্রীনগর কা। কত কী ভেবে ছিলাম ওকে নিয়ে!
ইনশাআল্লাহ! দলের বাকি ছেলেরা তো আছে। টোটাল ১০৩ জন ট্রেনিং নিয়ে এসেছে রাওয়ালকোট থেকে। তার মধ্যে দুজন…
সবাই সর্দার হয় না আব্দুল। তাহলে গলি গলি মে ইয়াসিন মালিক রহতা।
ইয়াসিনকে এক জায়গায় বসিয়ে আমানুল্লাহ ওর মাথায় হাত রাখে। আল্লাহ পে ভরোসা রখ্খো। প্ল্যান বাতাও, শোনার জন্য ছেলেরা বেতাব হয়ে আছে।
ইয়াসিন খানিক ঠান্ডা হয়ে বসে। মসজিদে খবর দেওয়া আছে। ওরা জানে ওদের কী করতে হবে। একসঙ্গে সব জায়গায় অ্যানাউন্সমেন্ট শুরু হবে।
ঘরে বসে থাকা কয়েকটা ছেলেকে উদ্দেশ্য করে ইয়াসিন বলে, তোমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলবে মেয়েদের হ্যান্ডওভার করতে। ভালো কথায় না শুনলে প্রথমে ধমকাবে, ভয় দেখাবে। তাতেও কাজ না হলে ছিনিয়ে নিয়ে আসবে।
বন্দুক দিখাকে! আমানুল্লাহ যোগ করে, ডরপোক পণ্ডিতলোগ দে দেগা।
‘অসকিস পাকিস্তান, বটভ রোস্তে, বটনিয়েন সান’। মেয়েদের চাই। ১৩ থেকে ৩০। সবাইকে তাড়িয়ে দিলে আমাদের বংশ এগোবে কী করে?
ইয়াসিনের মুখে শয়তানের হাসি।
বাকি ভাইয়েরা রাস্তায় রাস্তায় প্রসেশান বার করে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে হিন্দু বাড়িগুলোকে। য্যায়সে দোনো হাথো সে গলা দবা দেনা। সিচুয়েশান এমন তৈরি করতে হবে যাতে সবাই ভয়ে থরথর করে কাঁপে। রলিভ, চলিভ ইয়া গলিভ…কনভার্ট, ভাগো ইয়া মরো—এই হবে আমাদের মন্ত্র। কথা না শুনলে কাফেরদের নিজের হাতে মারতে হবে। হ্যায় তৈয়ার সব?
মহেন্দ্রর হাতে এখন টিউশান কম। এক তো হিন্দু পরিবারগুলো একে একে শ্রীনগর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, দ্বিতীয়ত মুসলিম মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিচ্ছে অভিভাবকেরা। আর পড়ার যোগ্য ছেলে যে ক’টা ছিল, বেশিরভাগ ‘হিন্দু তাড়াও’ আন্দোলনে সামিল হয়েছে। যে সব মাথা মহেন্দ্রকে দেখে সম্ভ্রমে নত হত, তারাই এখন কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
শিক্ষার আলো থেকে শত মাইল দূরে সরিয়ে এদের মারণ নেশায় বুঁদ করে রেখেছে, মহেন্দ্রজি। যাতে সমগ্র জাতটাই অশিক্ষিত হয়ে থেকে যায়। তারার স্কুল শিক্ষক ইমরান অনেকবার দুঃখ করেছেন বন্ধুর কাছে।
স্কুল ফাঁকা, কেউ নেই। কাকে পড়াব? এইভাবে চলতে থাকলে কয়েক মাসে ইনস্টিটিউশানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। বসে বসে কে মাইনে দেবে বলুন?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহেন্দ্র। সব তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইমরান ভাই। না আছে চাকরি, না ব্যবসা। আমাদের তাড়িয়ে দিলেই কি লক্ষ্মী উপচে পড়বে?
লক্ষ্মী! তিনি তো কবেই হাত ছেড়ে চলে গেছেন! দিল্লি সরকার এখনো অবধি পারল একটা ইন্ডাস্ট্রি এখানে খাড়া করতে? উল্টে চোখের সামনে শ্রীনগরে ন’টা সিনেমা হল পরপর বন্ধ হয়ে গেল। এন্টারটেইনমেন্ট ইসলামে পাপ। তাহলে পাকিস্তানে সিনেমা তৈরি হচ্ছে কী করে?
ইমরান সজল চোখে তাকান। একটা কথা কী জানেন? আপনাদের শিরদাঁড়া সোজাই আছে। আমরাই বিক্রি হয়ে গেছি।
সবাই নয় ইমরান ভাই। আপনার মতো মানুষ এখনও এখানে আছে বলেই আমরা আছি।
এই ভরসাতেই মহেন্দ্র অনুরাগকে ইমরানের বাড়িতে রাখতে সাহস করেছে। কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝেই ভাইকে দেখতে যায়। বাড়িতে কাউকে কিছু বলেনি। কাকিমা থেকে থেকেই জিগ্যেস করে, কীরে, মুন্না ফোন করছে না কেন?
হোস্টেলের ফোন খারাপ হতে পারে। মহেন্দ্র এড়িয়ে গেছে।
বরফের জন্য হাইওয়ে কিছুদিন বন্ধ থাকায় অনুরাগকে রাখতে বাধ্য হয়েছে সে।
ভাইয়া, তুমি কি করতে চাইছ বলো তো? এতদিন এখানে আছি, বাড়িও যেতে দিচ্ছ না। আমি এভাবে বন্দি হয়ে কতদিন থাকব? ক্ষিপ্ত অনুরাগ জিগ্যেস করে।
ইমরান সব জানে, সেও চায় না অনুরাগ আর থাকুক। তাই বরফ সরিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার হতেই বাসের টিকিট অনুরাগের হাতে ধরিয়ে দেয়।
কাল সকাল আটটায় ছাড়বে। এখান থেকে ডাইরেক্ট জম্মু।
যাওয়ার আগে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে মহেন্দ্র বেরোবে। তাড়াহুড়ো করে সাইকেল বার করবে, দরজায় টোকা। খুলে দেখে তেহজিব।
তুমি আবার এসেছ?
আমি একেবারে বেরিয়ে এসেছি স্যার।
দূর থেকে আরবাজ দেখে সি এম-এর মেয়ে মহেন্দ্রর সামনে হাতজোড় করে করুণভাবে কিছু বলছে।
মসলা কেয়া হ্যায়? তেহজিব আবার এখানে?
একটু পরেই তাকে নিয়ে মহেন্দ্র হনহন করে বড় রাস্তার দিকে বেরিয়ে যায়। ফলো করেন আরবাজ। বড় রাস্তায় এসে ট্যাক্সি ধরে শহর ছেড়ে বেরোলে, তিনিও বাইক নিয়ে পিছু নেন।
সূর্যহীন দুপুরে কনকনে হাওয়া তিরের মতো চোখে মুখে বিঁধে যাচ্ছে। প্রায় মিনিট কুড়ি পর গন্দেরবলের এক গলিতে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে মহেন্দ্ররা একটা বাড়িতে ঢোকে।
কাছের এক মুদির দোকান থেকে আরবাজ জানতে পারে ওটা স্কুল মাস্টার ইমরান সিদ্দিকির বাড়ি।
বাড়িটা পাঁচিল ঘেরা না হওয়ায় জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পান তেহজিব একটা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
অনুরাগ না? সর্বনাশ!
হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায় আরবাজের। হুজত তো ছাড়বে না।
মিনিট পাঁচেক পর মহেন্দ্র অনুরাগ আর তেহজিবকে নিয়ে আবার সেই ট্যাক্সি করে গন্দেরবল বাস স্ট্যান্ডে আসে। ঘড়ির কাঁটা তিনটে ছুঁই ছুঁই। দিনের শেষ বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। লুকিয়ে আরবাজ দেখেন দুজনকে জম্মুগামী বাসে উঠে পড়তে।
শুকর খুদা কা! বেঁচে গেল এ যাত্রায়। আরবাজ বাইক স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যান।
.
দুপুরের সময়, বাসে মোটামুটি ভিড়। জম্মু পৌঁছতে রাত দশটা এগারোটা হবেই। অনুরাগরা একেবারে শেষ সিটে জানলার ধারে বসে।
যা করছি ঠিক করছি তো তেহজিব?
বোরখার জালির ফাঁক দিয়ে তেহজিব তাকায়। কিছু না বলে অনুরাগের হাতটা শক্ত করে ধরে। বাস চলতে শুরু করে। আস্তে আস্তে সন্ধে নামে, আশপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়। পাম্পোর অবন্তিপোরা পেরিয়ে বাস চলেছে বরফ মাড়িয়ে পাহাড়ি রাস্তা ধরে বিজবেহেরার দিকে।
জানলার কাচ নামিয়ে তেহজিব অনুরাগের কাঁধে মাথা রাখে। ভালোবাসার মানুষটাকে দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। তাদের জন্য জম্মুও নিরাপদ নয়, যে করে হোক দিল্লি পালিয়ে গেলে কেউ আর ছুঁতে পারবে না। তেহজিবের কপালে আলতো করে চুমু খায় অনুরাগ। মাথায় গিজগিজ করছে চিন্তা। আগু পিছু না ভেবে বেরিয়ে এসেছে; কিন্তু উঠবে কোথায়? কলেজে ফেরা এই মুহূর্তে অসম্ভব। ক’দিন গা ঢাকা দিয়ে অন্যত্র থাকতে হবে। ঠিক করে জম্মুর কোনো হোটেলে রাতটা কাটিয়ে পরদিন ওর বন্ধু হিম্মত সিংয়ের সঙ্গে দেখা করবে।
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি খেয়ে বাস থেমে যায়। হুমড়ি খেয়ে সামনে পড়তে গিয়ে যাত্রীরা নিজেদের বাঁচিয়ে নেয়। তেহজিব মাথা তুলে দেখে তিনজন লোক, বাসে উঠে সোজা ওদের সামনে এসে অনুরাগকে চুলের মুঠি ধরে টেনে তোলে।
চে শোক ওয়ারিয়া শোবান, স্মার্ট বন রহা হ্যায়—বলেই তাকে এক থাপ্পড় কষিয়ে পাণ্ডা গোছের লোকটা তেহজিবকে বলে, ম্যাডাম আপ নীচে আইয়ে।
যাব না আমি। ছাড় ওকে!
তেহজিব লোকটার হাত ধরে টানতে যাবে তখনি আরেকজন অনুরাগের কপালে পিস্তল ঠেকায়।
আপ আইয়ে ম্যাডাম, নহিতো ইসকো হম মার দেঙ্গে।
অনুরাগ তেহজিবের হাত ধরে। কুছ ভি করলো, ইয়ে নহি জায়েগি।
কোই বাত নহী।
চুলের মুঠি ছেড়ে বাকি যাত্রীদের দিকে ঘুরে লোকটা বলে, ভাইলোগ এই ছেলেটা হিন্দু পণ্ডিত। একটা মুসলমান মেয়েকে নিয়ে পালাচ্ছে রাতের অন্ধকারে। আপনারাই বলুন একে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে?
কভি নহি! গর্জে ওঠে একজন, কাফের হ্যায় ইয়ে পণ্ডিত!
একজনের উসকানিতে আরেকজন; তা থেকে আরেকজন, উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বাসের যাত্রীরা। তারাই অনুরাগকে হিঁচড়ে একদিকে নিয়ে গিয়ে মারতে শুরু করে। তেহজিবকে টানতে টানতে বাস থেকে নেমে যায় দলের পাণ্ডা।
ছোড়ো, ছোড়ো! তেহজিব নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে। অনুরাগ! আরে কোই তো মদত করো।
অন্ধকারে নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে তেহজিবের গলা পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফেরে। কিন্তু একটাও সাহায্যের হাত এগিয়ে আসে না। ততক্ষণে তাকে গাড়িতে তোলা হয়ে গেছে। অ্যাম্বাসেডারের ভেতরটা অন্ধকার, কাউকে ঠাওর করা যায় না, তবে বোঝা যায় সামনে কেউ আছে। তেহজিব চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে অনুরাগকে ডাকতে থাকে।
মু বন্দ করো ইসকা।
গলা শুনেই তেহজিব চিনতে পারে সাজিদকে।
সাজিদ, কমিনে! তোকে আমি দেখ কী করি…
সর্বশক্তি দিয়ে তেহজিব এলোপাথাড়ি চড় মারতে থাকে। পাশে থাকা দুজন নিমেষে তার হাত দুটো ধরে মুখে কাপড় বেঁধে দেয়। ড্রাইভারের সিটে এসে বসে পাণ্ডা।
জম্মু এয়ারপোর্ট, জলদি। সাজিদ হুকুম দেয়।
জী মালিক। মুখ থেকে কাপড় সরায় রওফ।
ব্যাক গিয়ারে গাড়িটা সামান্য পিছিয়ে আবার গিয়ার চেঞ্জ করে স্পিড তুলে রাস্তায় পড়ে থাকা আধমরা অনুরাগের ওপর দিয়ে চালিয়ে বেরিয়ে যায়।
.
