আলিয়া – ২৫

২৫

সিটি অফ সালেম থেকে জেরুসালেম। আবার তাকে সিটি অফ ডেভিডও বলা হয়। হিব্রু বাইবেলের মতে, রাজা ডেভিড এই শহরকে জয় করে এখানে ইজরায়েলের রাজধানী গড়ে তোলেন। ইতিহাস বলে, দুবার ধ্বংস আর চুয়াল্লিশ বার আক্রমণ করা হয়েছে জেরুসালেমকে। খ্রিস্টানদের কাছে এ শহর যেমন যীশুর, তেমন মুসলমানদের কাছে মক্কা, মদিনার পর তিন নম্বর পবিত্র স্থান জেরুসালেম। আবার রাজা ডেভিডের ছেলে সলোমন এখানেই প্রথম ইহুদি মন্দির স্থাপন করেছিলেন।

হলদেটে পাথরের বিশাল বড় গির্জাতে প্রার্থনা সেরে বেরিয়ে আসে আলিয়া। হ্যাঁ, সে প্রভুকে প্রণাম জানাতে এসেছে অবশেষে।

দ্য কোর্ট ফাইন্ডস মারকো ডেমিয়ানুক নট গিল্টি কারণ কোনোভাবেই প্রমাণ করা যায়নি তিনি ইহুদি হত্যাকারী। প্রমাণ হয়নি উনি ট্রেবলিঙ্কা বা সোবিবোর ক্যাম্পে গ্যাস চেম্বার অপারেটর ছিলেন। আর যেটা নিয়ে কেস, উনি ইভান দ্য টেরিবল, দ্যাট ইজ বেসলেস। দুই, ইভান মারচেঙ্কো সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। এমনকী মারকো ডেমিয়ানুকের অল্প বয়সের যে ছবি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে প্রোডিউস করা হয়েছিল সেটাও ট্যাম্পারড। ডেথ সেন্টেন্স ভুল ছিল, সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।

‘মধুর অমৃত বাণী’ বোধহয় এমনই শোনায়। আলিয়া আর জন জাজেদের ফয়সালা শোনার পর নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি। সাড়ে পাঁচ মাসের যুদ্ধ তাহলে শেষ হল?

টেক ইওর পাপা হোম।

স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে শেফটেল যখন কথাটা বলেন, জন তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।

ইউ আর গড টু আস শেফটেল!

নো জন। আলফ্রেড না থাকলে আমরা এ কেস জিততাম না। থ্যাংক হিম।

বুড়ো আলফ্রেড লাঠি নিয়ে কোর্টের বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছে দেখে আলিয়া দৌড়ে যায়। আই রিয়েলি ডোন্ট নো হাও টু থ্যাঙ্ক ইউ!

ইওর ড্যাড ওয়াজ ফ্রেমড, এটাই সত্যি।

মিথ্যে, মিথ্যে! সুপ্রিম কোর্ট পারে না ইহুদিদের আবেগ নিয়ে এ ভাবে খেলতে!

রায় ঘোষণার পর কোর্ট চত্বর জুড়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধে। যারা কেস ট্রায়াল শুনতে এসেছিল আর যারা বাইরে অপেক্ষা করছিল তারা ‘রে রে’ করে তেড়ে আসে। একে একে ক্যাম্প সারভাইভারেরা বেরিয়ে এলে তাদের বাইট নিতে ছোটে মিডিয়া। ক্যামেরার সামনে তারা চিৎকার করে, কেঁদে কেটে, জামাকাপড় ছিঁড়ে সিন ক্রিয়েট করে।

ইজরায়েলের জুডিশিয়াল সিস্টেমকে ধিক্কার! লাখ লাখ ইহুদিদের মৃত্যুর কোনো মূল্য নেই?

আলফ্রেডের সঙ্গে আলিয়াকে দেখে মিডিয়া এবং পাবলিক এগোতেই শেফটেল তাকে হাইজ্যাক করে কোর্টের আরেক প্রান্তে নিয়ে আসেন যেখানে মারকোর হাতকড়া খুলিয়ে পুলিশ তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। দুই ছেলেমেয়েকে পেয়ে মারকো নিজেকে সামলাতে পারেন না। জাপটে ধরে এই প্রথম ভেঙে পড়েন।

আই অ্যাক্টেড স্ট্রং অল দিজ ডেস, আর পারছি না।

জন আর আলিয়া বাবাকে কাঁদতে দেয়। এতদিন সারা বিশ্বের সামনে কত হেকেল হতে হয়েছে! ভেতরে জমে থাকা কষ্টের লাভা বেরিয়ে গেলে লোকটা শান্তি পাবে। বাচ্চাকে শান্ত করার মতো জন বাবার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।

ইটস ওভার ড্যাড। এবার বাড়ি ফেরার পালা।

হোটেলে এসে জন ওহিওর টিকিট বুক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আলিয়া কলকাতায় ফোন করে।

বাবা, আমি…

আলিয়ার গলা ধরে আসে।

কী হয়েছে? সুনীতি অস্থির হয়ে ওঠেন।

জিতে গেছি…বলেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

জানতাম, আই নিউ ইট!

বাড়ির সবাইকে…

আমি বলে দেব।

অনি আছে?

না নেই। অফিসের এক বন্ধুর বাড়ি গেছে, চলে আসবে বাই নাইন।

ওকে। আমি আবার ঘণ্টা খানেক পর কল করছি।

.

চার্চ সংলগ্ন ফুলের বাগানে এসে ঘাসের ওপর বসে আলিয়া। ভেবেছিল যেদিন এখানে আসবে, সেদিন পূর্ণ শান্তি নিয়ে ফিরবে, তা আর হয় না। উল্টে মনে প্রশ্ন জাগে।

ঈশ্বর মানুষকে কেন সুখী দেখতে চায় না? কেন সারাক্ষণ চিন্তায় রাখে? সুখে রাখলে তাকে কেউ ডাকবে না সেই ভয়ে? তাহলে ঈশ্বরও ইনসিকিওর!

বাবার জিতের আনন্দ সে কিছুতেই উপভোগ করতে পারে না, বারবার অনির কথাগুলো কানে বাজে।

হ্যালো অনি, আমরা…

শুনলাম বাবার কাছে। কংগ্র্যাচুলেশানস। জানতাম জিতবে।

সত্যি অনি? তুমি মনে মনে জানতে?

উচ্ছ্বাসহীন গলায় অনিন্দ্য বলে, সেইজন্য বলেছিলাম আমার সঙ্গে এসো।

অনিন্দ্য, তার অনি…সবার থেকে কত আলাদা, অন্যরকম মনে হত। তাহলে সে তা নয়! এখনও আলিয়ার না যাওয়াটাকে ধরে আছে?

আজ আমরা এসব আর নাই বা আলোচনা করলাম। লিসেন, আমি বাবাকে ওহিওতে রেখে খুব তাড়াতাড়ি…

কথা শেষ করতে দেয়নি অনিন্দ্য, চাইলে আরও ক’দিন বাবার কাছে থেকে আসতে পারো। আমি ফিরতে জোর করছি না।

সে কী! জোর করবে না অনি? আলিয়া তো ভেবেছিল তার ফেরার জন্য সে উন্মুখ হয়ে আছে। শুনেই বলবে—‘আর ওহিও যেতে হবে না, কলকাতা চলে এসো।’

ওহিও ফিরলে জানিও, পাপাকে বাবা-মা কল করবে। সৌজন্য বলে তো একটা ব্যাপার আছে।

ও! তাহলে এখন শুধুই সৌজন্য? আন্তরিকতা নেই? অনিন্দ্যর এই আলগা ব্যবহার আলিয়ার অসহ্য মনে হয়।

সিরিয়াসলি টেল মি অনি, আমার জায়গায় তুমি থাকলে বাবাকে হাজতে ছেড়ে কলকাতা ফিরে যেতে?

ঠান্ডা গলায় অনিন্দ্য বলেছিল, তোমার পাপাকে নিজের মনে করেছিলাম, তুমি সেই জায়গায় আমার মাকে বসাতে পারোনি। নট ইওর ফল্ট। সবাই সব পারে না।

চার্চের বাইরে মাতা মেরির মূর্তির দিকে তাকিয়ে আলিয়ার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ে।

আরেকটা লড়াই তাহলে শুরু হল মাদার? ঠিক আছে। জানি অন্যায় করিনি, তাই আমিও মাথা উঁচু করেই থাকব।

বাড়ি ফিরে মারকোর আনন্দ আর ধরে না। এতদিন পর সবুজ লনে ঘেরা বাড়িটা যেন স্বর্গস্বরূপ মনে হয়। তেমনই অনুভূতি জনের। সোফি আর দুই বাচ্চাকে ছেড়ে কতদিন বাড়ির বাইরে। বাবাকে পেয়ে ঘাড়েপিঠে উঠে ছেলেমেয়ে দুটো লাফালাফি শুরু করে। সোফি কাছে আসে, একগাল হাসি নিয়ে।

থ্যাঙ্ক ইউ সোফি। তুমি না থাকলে আমি কী করতাম কে জানে!

জন বউকে জড়িয়ে ধরে। এক ছাদের নীচে কতদিন পর সবাই একসঙ্গে। নিষ্প্রভ বাড়িটা জাদুকাঠির ছোঁওয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সারাদিন বন্ধুবান্ধব প্রতিবেশী অনেকেই দেখা করতে আসে। সোফির স্ট্রিক্টলি বলা আছে কেউ কেস নিয়ে কোনো কথা বলবে না।

দুপুরে খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম করে বিকেলে মারকো চায়ের কাপ হাতে কাচ ঘেরা বারান্দায় নাতালিয়ার সঙ্গে বসেন।

স্টিল সিমস লাইক আ ড্রিম।

একটু অন্যমনস্ক নাতালিয়া বুঝতে পারেন না—কোনটা?

আমার ফিরে আসা। আমি ভাবতাম…

আচ্ছা, তোমাকে ওরা টিপিকাল সেলে রাখেনি না? নাতালিয়া মারকোর কথা যেন শুনতে পান না।

না, একটা বাড়ির ছাদের ঘরে ছিলাম। সলিটারি কনফাইনমেন্ট। চারধারে উঁচু পাঁচিল। ঘরটায় নড়ার জায়গা ছিল না। ছোট্ট খাটে পা বেরিয়ে যেত। তার মধ্যে প্রথমদিকে গরম। সারা গায়ে ব়্যাশ বেরিয়ে…

শুনে নাতালিয়া আঁতকে উঠে চোখ বন্ধ করেন, প্লিজ, আর বোলো না।

চায়ের কাপ রেখে মারকো হাসেন, তুমি শুনেই এমন করছ, আমার কথাটা ভাবো। বিনা দোষে দিনের পর দিন…ভেবেছিলাম আর বোধহয় দেখা হবে না আমাদের। আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারার মধ্যে তোমার মুখটা বসিয়ে রোজ সন্ধেবেলা গল্প করতাম।

চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়ান নাতালিয়া, বোঝা যায় এসব শুনে তার প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে।

আজকের পর আমরা আর এ প্রসঙ্গ তুলব না। ভুলে যাও সব। কাপদুটো তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে যান তিনি।

ভুলে যাও বললেই তো ভুলে যাওয়া যায় না। জেল থেকে বেরিয়ে এলেও তার ভয়াবহতা মনে থেকে যায়। প্রতিদিন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচা, তার থেকে কঠিন কিছু নেই। রাতে চোখ বন্ধ করলেই বারবার কোর্টের দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে।

কী হল?

ঘুম ভেঙে মারকোকে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নাতালিয়া বেডসাইড ল্যাম্প জ্বালিয়ে খাট থেকে নেমে আসেন।

কান্ট স্লিপ।

বাট ইউ হ্যাভ টু। ডাক্তার বলেছেন মেন্টাল আর ফিজিকাল রেস্ট সবথেকে প্রয়োজন।

মারকোকে খাটে বসিয়ে ওষুধের বাক্স বার করেন নাতালিয়া।

হি সেড, ঘুম না এলে ইনিশিয়ালি ডবল ডোজ চলতে পারে।

হাত বাড়িয়ে মারকো ওষুধ নিলে নাতালিয়া জলের গ্লাস এগিয়ে দেন।

ঘুমিয়ে পড়ো।

ওষুধ খেয়ে পাশ ফিরে মারকো শুয়ে পড়লে আলো নিভিয়ে নাতালিয়া খাটে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। চোখের সামনে ভেসে ওঠে এয়ারপোর্টের সেদিনের দৃশ্য, যেদিন মারকোকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল।

নাতালিয়া…সেভ মি…

অস্থির নাতালিয়া সন্তর্পণে ঘর থেকে বেরিয়ে লিভিং এরিয়ায় আসেন। জন, আলিয়া যে যার ঘরে ঘুমোচ্ছে। ছোট আলোটা জ্বেলে কর্নার টেবিল থেকে রিসিভার তুলে ফোন ডায়াল করেন। কিছুক্ষণ বাজার পর ওপ্রান্তে এক মহিলা কণ্ঠ শোনা যায়।

ঘুমোওনি?

ভয় করছে।

কীসের?

মারকোকে না-হয় কেজিবি ফাঁসাতে চেয়েছিল কিন্তু আমাকে যদি…

চুপ!

কড়া গলায় ধমকে ওঠেন মহিলা।

কান ঘেঁষে গোটা ব্যাপারটা বেরিয়ে গেছে। ডোন্ট ফরগেট, তুমি এখন মারকো ডেমিয়ানুকের স্ত্রী নাতালিয়া ডেমিয়ানুক। নাৎসি বাহিনীর অফিসার নাতালিয়া বেলসেনকে পৃথিবী ভুলে গেছে…তাকে আর জাগিয়ে তোলার চেষ্টা কোরো না।

.

২৭

মোহনলালের দৃষ্টি জানলার বাইরে। কাশ্মীরের হাল আর আবহাওয়া দুইই খারাপ। মোহনলালের ইন্টারফেয়ারেন্সে কাজ করা যাচ্ছে না বলে আচমকা হুজত ইস্তফা দিয়ে লন্ডন চলে যাওয়ায় দিল্লি ‘গভরনর’স রুল’ চালু করেছে জম্মু কাশ্মীরে।

চাল বুঝতে সময় লাগেনি তাঁর। খুব শিগগির এমন কিছু ঘটতে চলেছে, যার দায় এড়াতে হুজত পালিয়ে গেছে। সি এম চলে যাওয়ার পরেই সমগ্র কাশ্মীর উত্তপ্ত। ‘দিল্লির লোক’ এবং হিন্দু মোহনলালের হুকুম মানবে না বলে নানা জায়গায় প্রোটেস্ট শুরু হয়েছে। শ্রীনগরে রাস্তা বন্ধ করে চলেছে অবরোধ। পুলিশ আনরুলি মব রুখতে গেলে পাথর ছুড়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারীর দল। যার জেরে কাশ্মীর জুড়ে কারফিউ। বিপর্যস্ত জনজীবন। কখনো এক ঘণ্টা-দু ঘণ্টা কারফিউ শিথিল করলে লোকে বাজার দোকান সেরে নেয়।

তারই মধ্যে দলে দলে পণ্ডিতরা পাড়ি দিচ্ছেন অন্যত্র। বাস, ট্রাক, টেম্পো যা জোগাড় করতে পারছে, তাতেই। অনুরাগের মৃত্যুর পর মহেন্দ্রর পাড়া আরও খালি হয়ে যায়। যদিও পুলিশ বলেছিল পথ দুর্ঘটনায় অনুরাগ মারা গেছে।

রাতে বাস থামিয়ে টয়লেট করতে নেমেছিল, গাড়ি মেরে বেরিয়ে গেছে। কার নামে কেস করবেন?

খোদ পুলিশের লোক আরবাজ এক ফোঁটাও বিশ্বাস করেনি এই আজগুবি গল্প।

ইম্পসিবল! তাহলে তেহজিব গেল কোথায়?

ইমরান আর মহেন্দ্ররও একই কথা। তেহজিব কি কর্পূরের মতো উবে গেল? কিন্তু মজার ব্যাপার তারা পুলিশকে বলতে পারে না অনুরাগের সঙ্গে সেদিন তেহজিব ছিল। এক, কেউ বিশ্বাস করবে না, দুই, মহেন্দ্রর পরিবারের বিরুদ্ধে সাধারণকে খেপিয়ে তোলা হবে।

ভাইকে চিতায় পুড়তে দেখে শোকে পাগল মহেন্দ্র। কী করবে এরপর? পরিবার নিয়ে আর কি এখানে থাকা ঠিক হবে? সারাদিন বাড়ির বাইরে সে পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায়। জায়গায় জায়গায় ড্রাম আর তার দিয়ে রাস্তা আটকানো, এলাকা ভিত্তিক কারফিউ। পাহারারত পুলিশের কাছে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করে, আমার ভাইয়ের কেস কেউ রেজিস্টার করছে না, দয়া করে সাহায্য করুন। বলছে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে। এ সত্যি নাও হতে পারে, তাই না?

তেড়ে আসে তারা। এখানে কী করছেন? দেখছেন না এলাকায় কারফিউ চলছে! যান, না-হলে গুলি খেয়ে মরবেন।

.

ভগবানের মার দুনিয়ার বার!

শাহিদের মাথায় হাত রাখেন শ্রীধর।

কথাটা জানো তো বেটা? তার লাঠির আওয়াজে শব্দ হয় না কিন্তু এমন বেদম পেটায় যে সেই ঘা দগদগে হয়ে আমৃত্যু থেকে যায়।

হুইলচেয়ারে বসিয়ে শাহিদকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় দেখা। শ্রীধরকে দেখে শাহিদ চোখ নামিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল। আকবরও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেলে শ্রীধর তার সামনে আসেন।

উনি পাদুটো নিয়েছেন, হাত তো এখনও আছে বেটা। পারলে রোজ একবার তার কাছে ক্ষমা চেও। যদি পাপের বোঝা একটু হলেও কমে!

ঠোঁটদুটো কেঁপে ওঠে শাহিদের। ইচ্ছে হয় শ্রীধরের পা জড়িয়ে ধরে মাপ চাইতে। কত আদর ভালোবাসা পেয়েছে এই মানুষটার কাছে, তারাকে নিজের বোনের মতো দেখত। আর সেই তারা যখন সেদিন শাহিদের পায়ে পড়তে বাকি রেখেছিল সে কর্ণপাতও করল না? এখন নিজেকে ধিক্কার দেওয়া ছাড়া আর কীই বা করার আছে?

যে বাইকে চেপে শ্রীনগর চষে বেড়াত সেটার দিকে চোখ গেলে ভেতরটা হুহু করে ওঠে। তখনই মনে পড়ে ইয়াসিন মালিকের মুখটা, রাগে কাঁপতে থাকে সারা শরীর।

কিন্তু ওই পর্যন্ত। করার কিছু নেই। সইফও সেই একই কথা রোজ ভাবে। মোজা পরা পায়ের চেটোয় হাত বুলোলে গলা কান্নায় বুজে আসে।

তোর বয়সে মনে হয় বাবা-মা যা বলছে, সব ভুল। তা নয়। বাবা-মা তোর থেকে বেশি দুনিয়া দেখেছে বলেই সতর্ক করে।

ছেলের চোখের জল মুছিয়ে রিফত গরম দুধের গ্লাস সইফের মুখের সামনে ধরেন।

আব্বা কত বারণ করেছিল, শাহিদের সঙ্গে মিশিস না, শুনলে আজ তোর এ হাল হত? তোর মনে হল তোকে শাহিদের মতো হতে হবে।

সইফ মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদে।

গলতি হো গয়ী আম্মি…

মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে খানিক শান্ত করেন রিফত। নেক কাম কর বেটা। আল্লাহ মাফ কর দেগা।

কথাটা মনে ধরে সইফের। ভালো কাজ তাকে করতেই হবে। ক্রাচে ভর দিয়ে চলা মোটামুটি রপ্ত হয়ে যাওয়ায় সবার আগে শাহিদের সঙ্গে দেখা করতে আসে।

শাহিদ ভেবেছিল সইফ এ জীবনে তার কাছে আর আসবে না।

ওকে দেখে বিস্মিত হয়।

তু মুঝসে অভিভি দোস্তি রখনা চাহতা হ্যায়?

পতা নহী। এতদিন আমি তোর কথা শুনে চলেছি, আজ একবার আমার কথা শুনে দেখ, মনে হয় পস্তাবি না।

কী কথা?

মালিকের দলের ভেতরের খবর সবই জানা। কবে কী হবে, সব। তাহলে আমরা ওদের আটকাতে পারি না?

শাহিদের চোখদুটো জ্বলে ওঠে। পারব সইফ?

পারতেই হবে। যদি দশটা জানও বাঁচাতে পারি…

এক কাজ করি। বাবা এখনও ওখানে যায়, লেটেস্ট খবর পেয়ে যাব।

বড়িয়া! কিন্তু খবর পেলেই তো হবে না, অ্যাকশান লেনা জরুরি হ্যায়।

ক্যায়সে? কথাটা শুনে শাহিদ কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসে।

গভরনার মোহনলালজির কানে সবটা তুলতে হবে।

হতাশ হয়ে শুয়ে পড়ে শাহিদ। পহলে হোতা তো বাইক লেকে চলা যাতা।

পহলে আপকে পাস অগর দিমাগ হোতা তো তারা আজ জিন্দা হোতি!

গলার আওয়াজ পেয়ে দুজনেই দরজার দিকে তাকায়। দেখে আলিয়া দাঁড়িয়ে। বোরখার কাপড় সরিয়ে শাহিদের খাটের কাছে আসে।

আর তাতে যোগ দিয়েছিল আমার এই বোকা দাদা। তাইতো আমায় সেদিন মামারবাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। তাই না ভাইজান?

সইফ আর শাহিদ দুজনেরই লজ্জায় মাথা নিচু।

একবারও মনে হল না? বলি ইয়াসিনের দল তারাকে কিডন্যাপ করার কথা ভাবছে, একবারও মনে হল না ভাইজান?

আলিয়া রাগে থরথর করে কাঁপে।

আল্লাহ পা কেটে নিয়েছে, গলা কাটার আগে পুলিশের কাছে যাও। সারেন্ডার করো যে তোমরা তারাকে মেরেছ। যাও।

যায়েঙ্গে কসম সে। শাহিদ বলে।

তবে তার আগে ইয়াসিনের প্ল্যানের কথা মোহনলালজির কানে তুলতে হবে। পারবে একবার আরবাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে?

.

আকবরের বাড়িতে আরবাজের পক্ষে আসা সম্ভব নয়। এদিকে শাহিদ বেরোতে পারবে না। তাই ঠিক হয় বিকেলে হুইলচেয়ারে বসিয়ে পাশের ডিস্পেনসরিতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে ওরা দেখা করবে।

আকবর দোকানে চলে যাওয়ার পর মায়ের অনুমতি নিয়ে আলিয়া শাহিদকে ডিস্পেনসরির থেকে একটু এগিয়ে পার্কের কোণে আনে। আরবাজ আর সইফ সেখানেই অপেক্ষা করছিল।

জলদি বলো, হাতে সময় নেই।

.

সময় ইন্ডিয়া কা বহুত খরাব আ রহা হ্যায়। পাকিস্তান দেখো না কাশ্মীর দখলের পর আর কী কী করে?

ক্যামেরায় লুকিয়ে তোলা শাহিদ আর রওফের কথাগুলো সরোজ কয়েকবার চালিয়ে দেখে। ভেতরে ভেতরে সে ফুটছে।

আনইম্যাজিনেবল! এসব ফুটেজ বাঘা বাঘা লোকেরা পায় না। কী বল?

বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আছে অম্লান। হ্যাঁ, না কিছু না বলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কীরে, তুই মনমরা হয়ে আছিস কেন?

এতদিন এতকিছু দেখার পরেও লাফাচ্ছিস আমাদের ডকুমেন্টরি সফল হবে ভেবে?

ক্যামেরা সরিয়ে রেখে সরোজ অম্লানের খাটে এসে বসে। কী বলছিস বল তো?

সেদিন হাসপাতালে আলিয়াকে গিরিজার কথা বলাতে ওর মুখে একরাশ খুশি দেখেছিলাম। জিগ্যেস করেছিলাম বন্ধুকে হারিয়ে কষ্ট হচ্ছে না? বলেছিল ‘না, ও বেঁচে গেছে’। লেখাপড়া করতে পারবে, নিজের জীবন ইচ্ছেমতো গড়তে পারবে। আমাদের তো সব শেষ। লেখাপড়া শিকেয় তুলে বিয়ে আর বাচ্চা বিয়োনোই একমাত্র কাজ।

মনে আছে কথাগুলো। আমারও খারাপ লেগেছিল।

বলেছিল স্কুল যাওয়া ইরেগুলার হয়ে গেছে। গেলেও অর্ধেক ক্লাস হয় না।

কী করবি বল?

কিছুই কি করা যায় না সরোজ?

কী?

ওকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে গেলে কেমন হয়?

সরোজ লাফিয়ে ওঠে, পাগল নাকি? খবরদার! অনেক রিস্ক নিয়েছি, আর নয়। কাল আমাদের জম্মু ফেরার কথা, ফিরছি। ব্যাস।

না ফিরছি না। অম্লান উঠে বসে। আমার বোনের বয়সি একটা মেয়েকে আমি জলে ভাসিয়ে দেব? না না, পারব না। দাঁড়া, ওর বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলি।

গায়ে মোটা জ্যাকেট চাপিয়ে, মাথায় টুপি পরে অম্লান পায়ে জুতো গলায় বোরখার জন্য।

কোথায় যাচ্ছিস?

আমাদের হোটেল থেকে আলিয়ার বাড়ি কাছেই।

কারফিউ চলছে তো!

হাতঘড়ি দেখে অম্লান। দু’ঘণ্টার ছাড় আছে। চট করে ঘুরে আসি।

.

২৮

মিস বেলসেন, মেট্রন ডাকছেন।

একজন পেশেন্টের প্রেশার চেক করে আরেকজনের ইনসুলিন পুশ করতে যাবে নাতালিয়া, এক সহকর্মী তাকে খবর দেয়।

কেন?

কেউ এসেছে দেখা করতে।

সবে ফিমেল ওয়ার্ডের চারজনকে অ্যাটেন্ড করেছে, এখনই তলব! বিরক্ত হয় নাতালিয়া।

বলো, রাউন্ড শেষ করে যাচ্ছি।

ইটস আর্জেন্ট। তুমি যাও, আমি এদের দেখে নিচ্ছি।

পেশেন্ট চার্ট হ্যান্ডওভার করে ম্যাক্লেনবার্গের সরকারি হাসপাতালের করিডোর ধরে যেতে যেতে নাতালিয়া ভাবে, কে আসতে পারে? বাড়ির কেউ তো হবে না। আর বাইরের কেউ বলতে তার বন্ধুরা সবাই এ সময় কাজে ব্যস্ত। তাহলে? তাহলে কি বাস স্ট্যান্ডের ওই ছেলেটা যে রোজ ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, ফলো করে? সে হলে আজ ও পুলিশ ডাকবে।

কল্ড মি মেট্রন?

নাতালিয়া ডেস্কের সামনে এলে মেট্রন মুখ তুলে তাকান।

ইয়েস মিস বেলসেন। নাৎসি বাহিনী ফিমেল অফিসার রিক্রুট করছে। দে হ্যাভ সেন্ড আ লিস্ট যেখানে এখানকার অনেকেই আছে। ইউ আর ওয়ান অফ দেম।

এক মাঝবয়সি লোককে দেখিয়ে মেট্রন বলেন, টক টু হিম।

হতবাক নাতালিয়াকে দেখে লোকটা হাতে ধরা কাগজ এগিয়ে দেয়, ইটস কম্পালসরি।

মানে? আমি এস এস আর্মিতে যাব কেন?

নট ইয়োর চয়েস। আমাদের অনেক মহিলা অফিসার দরকার, পেমেন্ট ইজ প্রিটি গুড। প্রথমে চার সপ্তাহের ট্রেনিং তারপর ক্যাম্পে পোস্টিং।

রক্ত দেখলে যে বমি করে ফেলত সেই মেয়েকে নার্সিংয়ের কাজ নিতে হয়েছিল সংসার চালাতে। সুপ্ত ইচ্ছে ছিল গায়িকা হওয়ার। মাস মাইনে থেকে সামান্য কিছু বাঁচিয়ে গানের টিচারের কাছে ভর্তি হয়েছিল, স্বপ্নপূরণ করতে। কিন্তু বিধির বিধান খণ্ডাবে কে? বাধ্য হয়ে নাতালিয়া বেলসেন আউশুইট ক্যাম্প জয়েন করে ব্লক লিডার হয়ে। আউশুইট সবথেকে বড় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। তাই পুরুষ ও মহিলা বিভাগ আলাদা। মেয়েদের ক্যাম্পে শেষ কথা ফিমেল অফিসারেরা, সেখানে মেল অফিসারদের নো এন্ট্রি। কিন্তু জয়েন করার ক’দিনের মধ্যেই নাতালিয়ার চোখে পড়ে রাতের দিকে বেশ কিছু পুরুষ অফিসার বোতল বগলে মহিলা অফিসারদের কোয়ার্টারে ঢোকে। অন্যান্য ব্লক অফিসারদের বলাতে সবাই তাকে চুপ করে থাকতে বলে।

নিয়ম যখন ভাঙাই হচ্ছে তাহলে সেও ভাঙবে না কেন? অবশ্যই ভালো কাজের জন্য। রাতে যখন তার বসেরা ব্যস্ত থাকত তখন সে লুকিয়ে ক্যাম্পের অভুক্ত মানুষগুলোর জন্য খাবার নিয়ে আসত। নেড়া মাথার নানা বয়সি মেয়ে-মহিলারা খাবার পেয়ে কী পরম তৃপ্তির হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকত! চোখে জল ধরে রাখতে পারত না নাতালিয়া। অনেক রাত এমনও গেছে সে তাদের সঙ্গে বসে গল্প করেছে।

তুমি গান গাইতে পারো?

ইনমেট রেবেকা হাসে।

হ্যাঁ, শিখছিলাম।

একটা শোনাবে?

নাতালিয়া গলা নামিয়ে দু-কলি গেয়ে শোনায়। তাদের জীবনের নানা গল্প শোনে। কত স্বপ্ন, কত আকাঙ্ক্ষার সমাধি হতে চলেছে এই ক্যাম্পে।

আই প্রে এভরি ডে, যাতে তোমরা তাড়াতাড়ি বাইরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারো। নাতালিয়া আশ্বাস দেয়।

আচ্ছা আমাদের স্যুটকেসগুলো কোথায় আছে জানো?

আছে…রাখা।

যাক। সোনাদানা যা যা ছিল সব নিয়ে এসেছি। একদিন তো বেরোবোই এখান থেকে, সেদিন ওগুলো বেচে জীবন শুরু করব।

নাতালিয়া জানত স্যুটকেসের জিনিস একটাও অবশিষ্ট নেই। ফিমেল অফিসারেরা তালা ভেঙে কিছু নিজেরা রেখে বাকি বিক্রি করে সেই টাকায় ক্যাম্পের খরচা চালাচ্ছে। এসব দেখে অসহ্য হয়ে একদিন নাতালিয়া সত্যিটা এদের বলে ফেলে। সেদিন রাতে খাবার দিতে এলে কেউ খাবার মুখে তোলে না।

বেঁচে কী হবে? বেরিয়ে পথের ভিখিরি হয়ে থাকার থেকে মরে যাওয়াই ভালো।

নো, প্লিজ। খেয়ে নাও তোমরা না-হলে কাল সকালে কাজ করবে কী করে? আর না পারলে জানোই তো কী হবে!

ভুলিয়ে ভালিয়ে হাতে সবে খাবারের থালা তুলে দিয়েছে হঠাৎ শোনা যায়, মিস বেলসেন! এসব কী হচ্ছে?

চমকে তাকায় নাতালিয়া। দরজার কাছে তার বস এলিজাবেথ বেকার কোমরে হাত দিয়ে রণমূর্তি ধারণ করে দাঁড়িয়ে।

খবরটা তাহলে ঠিক। ইউ আর ব্রেকিং রুলস।

এলিজাবেথ, হ্যাভ মারসি। তোমার আমার মতো এরাও মানুষ। প্লিজ এদের খেতে দাও।

এক বাচ্চা মেয়ের হাতে ধরা থালা লাথি মেরে ফেলে দেয় এলিজাবেথ, তোমার ব্যবস্থা পরে করছি। আগে এদের শায়েস্তা করি।

শায়েস্তা মানে নাতালিয়া জানে কী। চাবুক বর্ষণ হবে এদের ওপর। সে এলিজাবেথের রাস্তা আটকায়।

কী পাও অত্যাচার করে? তোমার বাড়িতে বাবা, মা, ভাই বোন কেউ নেই? ইউ হার্টলেস ক্রিচার!

হাও ডেয়ার ইউ কল মি দ্যাট!

এলিজাবেথ নাতালিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই ঘরে থাকা মহিলারা তেড়ে এসে তাকে মাটিতে ফেলে পেটাতে থাকে।

স্টপ ইট! স্টপ ইট আই সে!

নাতালিয়ার কথা কানে না তুলে তারা প্রায় আধমরা করে ফেলে এলিজাবেথকে।

লেট হার ফিল, মারলে কেমন লাগে!

নাতালিয়া দরজার দিকে দৌড়ে যায় দেখতে আর কেউ আসছে কিনা, কেউ দেখে ফেললে রক্ষে থাকবে না। উঁকি মেরে বাইরে তাকাতেই দেখে ক্যাম্পের সাইড গেট খোলা। মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। ওদের কাছে ফিরে এসে এলিজাবেথকে কোনোমতে টেনে সরিয়ে বলে, গড হ্যাজ আনসারড মাই প্রেয়ার। ক্যাম্পের গেট ভুল করে খুলে রেখে গেছে কেউ। পালাবার এই সুযোগ, কাম উইথ মি।

সার্চলাইটের আলো এড়িয়ে একসঙ্গে দশ বারোজন করে পালাতে শুরু করে। এইভাবে যখন সবাই প্রায় বাইরে, মহিলা ওয়ার্ডের দরজা বাইরে থেকে লক করে নাতালিয়া এক দৌড়ে বেরিয়ে আসে।

কাম অন, রান! রান!

কী হল মম, আর ইউ ওকে?

আই সে রান ফাস্টার!…

মৃদু ধাক্কা দিয়ে সোফি শাশুড়িকে জাগায়। সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কথা বলছেন নাতালিয়া। হাতের স্পর্শে ‘আঁক’ করে জেগে ওঠেন। ঠিক সেই সময় রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন কানে যেতে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেন, দে হ্যাভ কাম টু ক্যাচ মি! কী হবে এখন?

সোফি কিছু বোঝার আগেই নাতালিয়া দুদ্দাড় করে দোতলায় উঠতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আলিয়ার সঙ্গে ধাক্কা লাগে।

মম, কী হয়েছে?

ততক্ষণে সাইরেনের আওয়াজ মিলিয়ে গেছে দূরে।

কী হয়েছে? ফিলিং সিক?

ধাতস্ত হন নাতালিয়া। হাঁপাতে হাঁপাতে সোফায় এসে বসেন।

আলিয়াও পেছন পেছন আসে। কী হয়েছে সোফি? মম হঠাৎ…

বুঝতে পারছি না।

কিছু হয়নি, আমি ঠিক আছি। একটা বাজে স্বপ্ন দেখে…গিভ মি সাম ওয়াটার।

সোফি জল এনে দিলে আলিয়া গ্লাসটা নিয়ে মায়ের পাশে বসে। ঢকঢক করে জল খান নাতালিয়া।

তুমি কি কোনো ব্যাপারে খুব চিন্তিত মম?

তুমি ইন্ডিয়া ফিরবে কবে? নাতালিয়া কথা ঘোরান।

আরেকটু সেটল হয়ে যাক পাপা, তারপর।

তোমার সঙ্গে আমি যাব, একটা ব্রেক দরকার।

সোফি আর আলিয়া দুজনে দুজনের দিকে তাকায়।

কী হল? কান্ট আই আস্ক ফর আ ব্রেক? আমিও ক্লান্ত হতে পারি।

নাতালিয়া সোফা ছেড়ে ওঠেন। অসুবিধে থাকলে বলো, সেরকম হলে আমি একাই কোথাও ঘুরে আসব।

নিজেকে শান্ত করতে নাতালিয়া গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান বাড়ির কাছের সুপার মার্কেটে। আনাজপাতি, চিকেন ইত্যাদি কিনে বিল মিটিয়ে পার্কিং লটে এসে গাড়ির ডিকিতে জিনিস ভরে ফ্রন্ট ডোর খোলেন। ঠিক সেই সময় একজন বয়স্কা মহিলা তার দিকে হাত নেড়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন।

ইয়েস? নাতালিয়া অল্প হাসেন।

ও মাই গড! আই কান্ট বিলিভ দিস…আই কান্ট!

অপরিচিতা মহিলা তাকে দেখে এভাবে রিঅ্যাক্ট করাতে নাতালিয়া বেশ অবাক।

চিনতে পারছ আমায়? এর আগে একদিন তোমায় এখানে দেখেছি, কথা বলতে যাব, তুমি গাড়িতে উঠে চলে গেলে।

দু-পা তার দিকে এগোন নাতালিয়া, আই অ্যাম সরি লেডি, আমি চিনতে পারছি না।

আই নো। চেনা পসিবল নয়। আর বয়স আমায় অনেক পাল্টেও দিয়েছে। আমি আউশুইট ক্যাম্পের রেবেকা…মনে আছে তুমি আমাদের জীবন বাঁচিয়েছিলে?

নাতালিয়ার সারা পৃথিবী দুলে ওঠে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হতে হতে দপ করে অন্ধকার হয়ে যায়।

.

২৯

কী সিনেমা দিয়েছে রে আজ?

দো আঁখে বারা হাত।

ধুস! পুরনো ফালতু ফিল্ম…ভাবলাম তেজাব দেবে। বারা হাত ফাত কী সব!

দশ হাতের ঠাকুর পণ্ডিতদের বাঁচাতে পারছে না আবার বারো হাত!

হাসিতে ফেটে পড়ে দুটো ছেলে। বন্দুক কাঁধে গলির মোড়ের চায়ের দোকানে উর্দু কাগজ অল সফা পড়তে পড়তে হিন্দু দেবদেবীদের নিয়ে ঠাট্টা মশকরা চালিয়ে যায়। জানে, রুখে দাঁড়াবার কেউ নেই। আর থাকলেও পেরে উঠবে না, সঙ্গে বন্দুক আছে যে!

১৯৯০, ১ জানুয়ারি। নতুন বছর শুরু, দেশ জুড়ে হইহই, উৎসব। আশায় বুক ভরে আরও এক বছরের শুরুয়াত। কিন্তু এখানে কাশ্মীরে? ছবি আগে যা ছিল একই আছে। আশা নেই, আকাঙ্ক্ষা নেই, স্বপ্ন নেই…শুধু আতঙ্ক।

১৪০০ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীরের বাদশা সুলতান কালীশ্রী মন্দির গুঁড়িয়ে তৈরি করে শাহ-এ-হামদান মসজিদ। মসজিদ চত্বরে জলাশয়ের ধারে সিঁদুর লেপা দেওয়াল এখনো দৃশ্যমান।

প্রতি বছর শ্রীধর এই দিনটায় এখানে প্রণাম করতে আসেন, তার মনে হয় মা ওই জলের ভেতরেই আছেন। বুক ভরা কষ্ট নিয়ে অহরহ কাঁদছেন। এবারেও মসজিদের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কী মনে হতে, জলাশয়ের বন্ধ লোহার গেটের কাছে এসে জলের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

কেন মা? কেন তুমি লুকিয়ে? কার ভয়ে? তোমার অস্তিত্ব লোপাটের চেষ্টায় যারা আছে কেন তাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠছ না? মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের বাস, তারার মধ্যেও তো তুমি ছিলে। তাহলে সেদিন এমনই এক মসজিদে যখন ওর ওপর নির্মম অত্যাচার হল, তুমি তোমার খড়্গ নিয়ে কেন একবারও বেরিয়ে এলে না? জাগো মা, জাগার সময় হয়ে গেছে। এরপর তোমায় জাগাতে তোমার ছেলেমেয়েরা কেউ আর এখানে অবশিষ্ট থাকবে না।

.

এত বছরে বাবার জন্মদিন পালন করিনি, এমনটা হয়নি, আমি আজ যাবই।

কড়াইয়ে তেল ঢেলে সন্ধ্যা রান্নাঘর থেকেই বলে, তুমি যাবে তো?

পাশের ঘরে স্বামী গৌতম কাক কাংড়ি পরিষ্কার করতে করতে হেঁকে বলে, যাবে কী করে? কারফিউ তো!

শুনলাম আজ ১ জানুয়ারি বলে সকাল দশটার পর উঠে যাবে। বাবার জন্য পালক পনির নিয়ে যাচ্ছি, বাবা খুব ভালোবাসে।

চলো তাহলে, সারাদিন কাটিয়ে আসি। কাশ্মীর ছেড়ে যাওয়ার আগে…

কেন এসব কথা বলো? সন্ধ্যা খুন্তি হাতে বেরিয়ে আসে। বাড়িঘর ছেড়ে কোথায় গিয়ে যাব?

জানি না সন্ধ্যা। পাশের বাড়ির আসিফ বলছিল চলে যাও, এরপর আর সেই সুযোগ নাকি থাকবে না।

ও বলবেই, আমাদের বাড়ির ওপর অনেকদিনের নজর। সারাক্ষণ বলে, কাশ ম্যায় অ্যায়সা ঘর বনা পাতা। গেলেই দখল করে নেবে।

না না, ছোট থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি। ভাই মানে আমায়।

মেয়েরা অনেককিছু বোঝে, যা তোমাদের নজরে ধরা পড়ে না কাক সাহেব। আসিফ ভাই আগের মতো নেই। যাকগে, আমি রান্না সেরে তৈরি হচ্ছি। গুড়িয়াকে বল গুড্ডুকে রেডি করতে, ছাদে রোদ পোহাচ্ছে দুজনে।

.

রান্নাঘরে আমির আর রিফত কাহওয়ার কাপ নিয়ে চুপ করে বসে আছেন। দুজনেই চিন্তিত তবে সইফের জন্য নয়, আলিয়ার জন্য।

জানি আমি অচেনা মানুষ, বিশ্বাস করে মেয়েকে পাঠানো মুশকিল। তবে আমার বোন আছে। দরকার হলে বাড়িতে ফোন করে বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে পারি।

অম্লানের প্রস্তাব মনে ধরলেও আমির দোনামনা করেন।

আলিয়া ওখানে গিয়ে অ্যাডজাস্ট করবে কী করে? তাছাড়া আপনার বাড়ির লোক যদি মুসলিম বলে…

কিচ্ছু হবে না, আমার বউদি খ্রিস্টান।

কিন্তু ও কি রাজি হবে?

কথা শুনে মনে হয় হয়ে যাবে। যদি কলকাতায় পাঠাতে না চান, সরোজের সঙ্গে দিল্লি পাঠিয়ে দিন। ওখানে গিরিজা আছে, দুই বন্ধু একসঙ্গে থাকবে।

শেষ চুমুক দিয়ে কাপদুটো কলের জলে ধুয়ে রিফত বলেন, আমার মতে আলিয়া গিরিজার কাছে থাকলেই আমি নিশ্চিন্ত।

আমিও। তাহলে তাই করি রিফত। নতুন বছরে আলিয়ার নতুন জীবন শুরু হোক।

.

নতুন কোনো খবর আছে?

আরবাজ সইফকে জিগ্যেস করেন।

চারদিকে নজর রাখতে রাখতে সইফ বলে, আকবর চাচার থেকে শাহিদ যা শুনেছে তাতে মালিক প্ল্যান চেঞ্জ করেনি। আচ্ছা, মোহনলালজি…

মাথা নাড়েন আরবাজ। দিল্লি থেকে কোনো সাপোর্ট পাচ্ছেন না।

ক্যায়সে?

সরকার বিশ্বাস করছে না। বলছে এসব অপপ্রচার। মজার কথা ওনাকে গতকাল দিল্লিতে জরুরি কাজে ডেকে পাঠানো হয়েছে।

আরবাজ ভাই, আমি রাওয়ালকোটে ট্রেনিংয়ের সময় যা দেখেছি…বর্ডারে কোনো পাহারা নেই, অবাধে যাতায়াত চলছে।

খোদ শ্রীনগরেই বন্দুক হাতে ওপেনলি ঘুরে বেড়াচ্ছে…ঘেন্না ধরে গেছে এই দেশের নেতাদের ওপর। মুখে অ্যান্টি পাকিস্তান স্লোগান, আবার তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে…দেখো সইফ যতটুকু যা আমাদেরই করতে হবে। ওয়াদিয়ে কাশ্মীর হিন্দু মুসলমান দুজনেরই।

জী।

মহেন্দ্রর থ্রু দিয়ে ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওনার বাড়িতে বেশ কিছু পরিবারকে শিফট করিয়েছি, মহেন্দ্ররাও আছে। আজ বিকেলের মধ্যে আলিয়ার বাড়ি পাঁচঘর হিন্দুদের শেলটার দেওয়া হবে।

আমার বাড়িতে চারটে ফ্যামিলি।

একটাই চিন্তা। ওদের অস্ত্রের সামনে আমরা ফিকে না পড়ে যাই। আচ্ছা, তোমাদের কাছে বন্দুক আছে?

না।

সইফ এক মুহূর্ত ভাবে, এক মিনিট। আকবর চাচার কাছে থাকতে পারে।

.

এখন বিকেল পাঁচটা। হাতে আর তিন ঘণ্টা।

ইয়াসিনের কথায় মাথা নেড়ে হেসে আমানুল্লাহ দলের ছেলেদের হাতে একটা করে ক্যালাশনিকভ তুলে দেয়। বাকি সদস্যরা আগেই মসজিদে চলে গেছে, ইশা নামাজ শেষ হতেই যাতে মিশন শুরু করতে পারে।

শাহিদ ঘড়ি দেখে। সাড়ে ছ’টা। একটু আগে সইফ খাটের তলায় লুকিয়ে রাখা দুটো বন্দুক নিয়ে গেছে। ভয় হয়েছিল বাবা জানতে পারলে কী হবে, পরক্ষণেই ঠিক করে নিয়েছে তার আজ কী করা উচিত।

বেটা ক্যায়সা হ্যায় আজ?

আকবর ঘরে এসে ছেলের পাশে বসে। ঠিক সে দওয়াই লে রহা হ্যায় না?

জী আব্বা।

তু আরাম কর, ম্যায় আতা হু।

আব্বা!

আকবর বেরোতে যাবে, শাহিদ ডাকে, আমার পায়ে আজ ভীষণ ব্যথা করছে, কেন কে জানে। একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে?

এখন?

আকবর ঘড়ি দেখে। চেম্বার তো আজ জলদি বন্ধ হবে।

পতা হ্যায়। আজ এক তারিখ তো?

ধূর্ত হাসি ফোটে আকবরের মুখে। ইয়াদ হ্যায় তুঝে? মাশাআল্লাহ!

নহী রহেগা আব্বা?

কাশ তু ভি ইসমে শামিল হো সকতা।

আব্বা!

যন্ত্রণায় কাতর শাহিদ।

কী হল?

বোধহয় ঠান্ডার জন্য কি না জানি না, পা-টা খুব…

যতই হোক ছেলে, তাকে তো ফেলে দেওয়া যায় না। আকবর হুইলচেয়ারে শাহিদকে বসিয়ে ডাক্তারের উদ্দেশে রওনা হয়। রাস্তা ফাঁকা। খানিকটা আসার পর হঠাৎ শাহিদ ‘ভাই’ বলে চেঁচাতেই আরবাজ বেরিয়ে এসে আকবরকে পেছন থেকে জাপটে ধরলে সইফ তার কপালে বন্দুক ঠেকায়। হতভম্ব আকবর ছেলের দিকে তাকায়।

তোমায় দিয়েই শুরু করলাম আব্বা, দেখিই না ক’জন খুনিকে আটকাতে পারি!

.

টিভিটা চালা না মা।

প্রভাত সপ্রু মেয়ে সন্ধ্যার হাত থেকে কেকের প্লেট নেন।

আজকেও টিভি। আমরা এলাম, ভালো লাগছে না বাবা?

হাসেন প্রভাত। লাগবে না? ভেবেছিলাম এই ঝামেলায় এবার আর দেখা হবে না।

দু-হাত ঘষতে ঘষতে টিভি চালিয়ে গৌতম শ্বশুরের পাশে বসে।

শুনছিলাম আজ ভি শান্তারামের ‘দো আঁখে বারা হাত’ দেখাবে…জন্মদিনটা ভালোই কাটবে। প্রভাত কেক মুখে পোরেন।

শারদা মেয়ের দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসেন। তোমার শ্বশুর সন্ধ্যা শান্তারামকে দেখেই মেয়ের নাম রেখেছিল। এত ফ্যান ছিল। তার ছবি ছাড়বে?

সবাই হেসে ওঠে। ছবি শুরু হয়। তার মধ্যেই সন্ধ্যা আর শারদা রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে থাকে।

চুপ করে বসে দেখো না, কী যে এত কাজ তোমাদের! বিরক্ত হয়ে মা মেয়েকে বলেন প্রভাত।

এসব ছবি আর হবে? আহা কী সাবজেক্ট, কী অভিনয়!

তুমি দেখো তোমার সন্ধ্যাকে, আমাদের কাজ সারতে দাও।

মা, টয়লেট যাব। সন্ধ্যার চার বছরের ছেলে গুড্ডু উঠে দাঁড়ায়।

গুড়িয়া, যা ভাইকে নিয়ে যা তো।

না না, আমি সিনেমা দেখছি যেতে পারব না।

বাইরে মসজিদে আজান শুরু হয়। প্রভাত ঘড়ি দেখেন, সাড়ে সাতটা বাজে। কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করেন।

সেই বিয়ে হয়ে থেকে দেখছি, আপনি আজানের সময় প্রণাম করেন। কেন? গৌতম জিগ্যেস করে।

আমার কাছে সব এক।

ও মা, টয়লেট যাব। গুড্ডুর তর সয় না।

ওফ! চল। সন্ধ্যা হাতের কাজ ফেলে ছেলেকে নিয়ে যায়।

সবাই আপনার মতো হলে দুনিয়াটা অন্যরকম হত বাবা। গৌতমের গলায় আক্ষেপের সুর।

আমাদের পাড়া তো খালি হয়ে গেল, জানি না আমরা কী করব…শারদাকে চিন্তিত দেখায়।

কিচ্ছু করব না। এখানে জন্মেছি, এখানেই মরব।

ছেলেকে নিয়ে সন্ধ্যা ফিরে আসে। আজ এসব কথা থাক। রোজ তো এই ভেবেই দিন কাটে…

হাত ধুয়ে পরোটার আটা মাখতে সবে মাটিতে বসেছে ওমনি আবার গুড্ডু বলে, ও মা, টাট্টি যাব।

সন্ধ্যা চোখ বড়বড় করে তাকায়। বদমায়েশি হচ্ছে?

পেয়েছে তো…

জ্বালিয়ে মারে এই ছেলেটা। হাত ধরে টানতে টানতে বাথরুমের দিকে নিয়ে যায়।

চক মেলানো বাড়ির উঠোন পেরিয়ে শেষ প্রান্তে বাথরুম। শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়ায় সন্ধ্যা কেঁপে ওঠে। যে বাড়িতে বড় হয়েছে সেই বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কী রকম একটা লাগে। ভয় লাগে, না গা ছমছম করে বুঝতে পারে না। তবে ভালো লাগে না।

শারদার আটা মাখা শেষ। আজ একটু ক্ষীর করেছি, খেও।

তুমিই তো বলো ডায়াবিটিস, খাওয়া যাবে না। প্রভাত ঠাট্টা করেন।

আবার আমিই বলছি আজ খেতে। শারদা ফেরানের পকেটে হাত মোছার কাপড় পুরে আটার গামলা নিয়ে বেরোতে যাবে, এমন সময় সন্ধ্যার চিৎকার শোনা যায়।

বাবা! শিগগির বাড়ির গেটে তালা দাও!

‘হাম কেয়া চাহে আজাদি, আজাদি কা মতলব কেয়া? লা ইলাহা ইল্লালাহ’!

গোটা শ্রীনগরের সবক’টা মসজিদের লাউডস্পিকার থেকে কান ঝালাপালা করা স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়। ক্যালাশনিকভ হাতে দলে দলে ছেলেরা রাস্তায় নেমে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে পণ্ডিতদের বাড়ির দরজায় লাথি মারতে মারতে চেঁচায়—কাফেরদের এখানে থাকার কোনো অধিকার নেই। রলিভ, চলিভ ইয়া গলিভ!

ছেলেসুদ্ধ সন্ধ্যাকে ঘরে ঢুকিয়ে প্রভাত তালা হাতে সদর দরজার দিকে এগোতে যাবেন, কানে আসে—আরে এ বুঢ্‌ঢা! তোর মেয়ে এসেছে না? আমাদের হ্যান্ডওভার কর।

শারদা সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে।

অব কেয়া হোগা?

গৌতম দরজার দিকে এগোতে গেলে প্রভাত তাকে থামিয়ে এক দৌড়ে রান্নাঘর থেকে কাটারি নিয়ে আসেন।

চিন্তা নেই, এটা আছে।

এটা দিয়ে কতজনকে আটকাবে? শারদা কাঁদো কাঁদো হয়ে জিগ্যেস করে।

ওদের জন্য না, এটা আমাদের কাজে আসবে। একটা হাতও শরীর ছোঁয়ার আগে তোমাদের শেষ করে দেব।

.

যে শীতের পাহাড় সন্ধে হতেই ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তার এই ভয়ঙ্কর রূপ আগে কেউ দেখেনি। ডাল লেক, রাজবাগ থেকে রয়নাওয়ারী হয়ে শফা কদল, সেখান থেকে ফতেহ কদল, করণনগর, বটমালু…এমন একটা জায়গা বাকি নেই যেখানে ইয়াসিনের দল ত্রাস সৃষ্টি করেনি।

জো রহেনা চাহে ওহ অভি মসজিদ চলকে মুসলমান বন জায়ে। আর না হলে কাশ্মীর ছেড়ে আজ রাতের মধ্যে রওনা হয়ে যাও।

যারা বাধা দিতে গেছে মার খেয়েছে, মরেছে। যারা পারেনি তাদের বাড়ির দরজা ভেঙে কমবয়সি মেয়ে-বউদের চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে চলে গেছে মুজাহিদের দল। হাহাকার, কান্না, প্রতিবাদের আওয়াজে বাতাস বিষাক্ত।

হোটেলে বসে সরোজ আর অম্লান আগামী জম্মু যাত্রার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে।

আলিয়াকে নিয়ে এখান থেকে আগে জম্মু যাব। সেখানকার পণ্ডিতদের রিফিউজি ক্যাম্প ঘুরে দিল্লি।

কী মনে হয়? আলিয়ার বাবা রাজি হবে?

নিমরাজি তো আছেই। যতই হোক সন্তান তো, সময় লাগবে ডিসিশান নিতে।

তাড়াতাড়ি যা ভাবার ভাবুক, এখান থেকে বেরোতে পারলে শান্তি।

ঠিক সেই সময় বাইরে গোলমাল শুনে দুজনে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে আসে। মানুষের মিছিল আর আন্দোলনের ভাষা শুনে আঁচ করে সাংঘাতিক কিছু একটা হচ্ছে। অম্লান দৌড়ে ক্যামেরা নিয়ে এসে রেকর্ড করতে গিয়ে দেখে—একদল লোক কিছু মহিলাকে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনি একজন মাঝবয়সি লোক তাদের বাধা দিতে গেলে একজন তলোয়ারের কোপে তার হাত কেটে দেয়।

চিৎকার করে ওঠে অম্লান। এই! কী হচ্ছে কী এসব?

তলোয়ারধারী লোকটা ওপর দিকে তাকাতেই অম্লানের মুখ হাঁ হয়ে যায়। এ তো রওফ! হাতে ক্যামেরা দেখে তার চোখ জ্বলে ওঠে।

হারামজাদা! ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছিস? তার মানে দিল্লির লোক তোরা! ট্যুরিস্ট সেজে ধোঁকা দিয়েছিস আমাদের?

এক হাতে তলোয়ার আর এক হাতে একটা মেয়েকে জাপটে ধরে হুঙ্কার ছাড়ে রওফ—ভাইলোগ, ইয়ে দিল্লি কা এজেন্ট হ্যায়, লাও ইন দোনো কো নীচে।

পা কাঁপতে শুরু করে অম্লানের। সরোজ চট করে ক্যামেরাটা ব্যাগে ভরে ওকে ঘরে ঢুকিয়ে বারান্দার দরজা বন্ধ করে দেয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দরজা ধাক্কানোর সঙ্গে শুরু হয় অশ্রাব্য গালিগালাজ।

কী হবে অম্লান? আমাদের তো জানে মেরে দেবে!

মুখে কথা সরে না অম্লানের। সারা শরীর কাঁপছে। মায়ের মুখটা মনে পড়াতে কান্না পেয়ে যায়। আর কোনোদিন দেখতে পাবে তো?

.

খোল, খোল দরজা! ছোটলোক! মুসলমান হয়ে হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছিস? আল্লাহকে মুখ দেখাবি কী করে?

মহেন্দ্রর মা, বোন, কাকিমা ছাড়া আরও কিছু হিন্দু পরিবার ইমরানের বাড়ির একটা ঘরে দরজা জানলা বন্ধ করে লুকিয়ে আছে। গোটা বাড়ির আলো নেভানো, পাছে কেউ বুঝতে পারে। তা সত্ত্বেও কী করে জানতে পারল ইমরান ভেবে পান না। তার বাবা-মা, ভাই, বউ-ছেলেকে এক আত্মীয়র বাড়ি রেখে এসেছেন, নাহলে এদের জায়গা হত না।

অনেকক্ষণ দাবড়ানির পরেও সাড়াশব্দ না পেয়ে এক সময় দরজা ভাঙার উপক্রম শুরু হয়। ইমরান বোঝেন একবার ভেতরে চলে এলে সবাইকে রক্ষা করা যাবে না, তাই ঠিক করেন নিজেই বেরিয়ে আসবেন।

আপনি বাইরে গেলে আমাদের মেরে ফেলবে!

আতঙ্কিত মানুষগুলোর কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড ভাবেন। পাশের ঘরে চারটে ক্রিকেট ব্যাট আছে আর আমার কাছে একটা বড় হাতুড়ি। তৈরি থাকুন, কাজে লাগতে পারে।

বেরিয়ে আসেন ইমরান, দুহাত পেছন করে হাতুড়িটা ধরা।

মুসলমান হোকে ইয়ে সব করতা হ্যায়!

কেয়া কিয়া হ্যায়?

তোর বাড়িতে হিন্দু নেই?

না নেই।

আছে।

ভিড়ের মধ্যে থেকে এগিয়ে আসে সাজিদ। একমাত্র তার কাঁধে ঝুলছে বন্দুক।

কাফেরদের সঙ্গে মিশে তুইও কাফের হয়ে গেছিস! ভুলে যাস না তুই সিদ্দিকি।

উত্তেজিত না হয়ে ইমরান বলেন, আমি জানি আমি সিদ্দিকি, অসলি মুসলমান, কিন্তু আপনি মনে রেখেছেন তো আপনি কে? সাজিদ পণ্ডিত। কোনো মুসলমানের সারনেম পণ্ডিত হয়? আপনার পূর্ব পুরুষ ছিলেন আসলে কাশ্মীরি পণ্ডিত। কনভারটেড হয়ে পিঠ বাঁচিয়ে কাশ্মীরে টিকে আছেন আর সচ্চা মুসলমানের কী ধর্ম তা আমাকে শেখাতে এসেছেন?

ইমরান!

চিল্লাইয়ে মত। যে কটা মট্টু, রায়না, ডার, কুন্ডূ আছে সবাইকে জিগ্যেস করে দেখুন কী তাদের হিস্ট্রি? পাকিস্তানের চামচা হয়ে ইসলাম রক্ষা করতে বেরিয়েছে কতগুলো আধা মুসলিম। থু!

ব্যাস, এইটুকুই যথেষ্ট ছিল সাজিদের দলের জন্য। লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে আসতেই ইমরানের এক ডাকে পণ্ডিত পুরুষের দল ব্যাট হাতে বেরিয়ে আসে। ইমরান হাতুড়ি দিয়ে দমাদ্দম যাকে হাতের কাছে পায় পেটাতে থাকে। কারোর মাথা ফাটে, কারোর মুখ ফেটে যায়। বাকিদের মারে অনেকেই ঘায়েল, কেউ কেউ ময়দান ছেড়ে পালায়।

দলের কিছু লোককে ঢালের মতো সামনে রেখে সাজিদ ঘাপটি মেরে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ইমরানরা ব্যস্ত থাকায় খেয়াল করেন না। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা মহিলাদের গুলি করে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে মহেন্দ্রর বোনকে পাকড়াও করে।

লুকিয়ে বসে থাকলে পার পেয়ে যাবি? চল, চল তোকে আজকেই পাকিস্তানে পাঠাব।

মেয়েটার ঘাড় ধরে ঠেলে দরজা দিয়ে বেরোতে যাবে, সামনে ইমরান এসে দাঁড়ান।

কোথায় পাঠাবেন, পাকিস্তান?

সাজিদ কোমর থেকে ছুরি বার করে মারতে যেতেই ইমরান সেটা ছিনিয়ে নিয়ে তার গলায় গেঁথে দেয়। দুহাতে রক্তাক্ত গলা ধরে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকা সাজিদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসেন ইমরান।

যে হাত পেন ধরে সে হাত অন্যায় রোধ করতেও জানে। যে তারার জীবন বরবাদ করেছিল, তার গলায় ঠিক এইভাবেই ছুরি বসিয়েছিলাম। মনে আছে দুধওয়ালা ইমতিয়াজকে?

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *