আলিয়া – ১

‘খাট দিলাম পালং দিলাম সাত ভরি সোনা, রায়বাঘিনী ননদি গো খোঁটা দিও না।’

গান থামিয়ে ঘোমটার ফাঁক দিয়ে মুচকি হাসে আলিয়া।

একঘর লোক, সবার চোখ ওর দিকে। বিস্ময়ে কারও মুখ থেকে কথা সরে না।

কী, বিশ্বাস হল এবার? সুষমা পানের বাটা থেকে এক চিমটি জর্দা মুখে ফেলে গর্বের হাসি হাসেন।

নতুন বউ তুমি এত ভালো বাংলা শিখলে কোথা থেকে? শিখা হাঁটুতে ভর দিয়ে আলিয়ার কাছে এগিয়ে আসে।

আমি তো শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছি।

ও মাগো! এক ফোঁটা টান নেই কথায়! এ তো তোমার আমার মতো বাংলা বলে গো জেঠিমা!

শুধু যে বাংলা বলি তা নয়, আমি আপনাদের মতো রান্নাও পারি।

যেমন?

ধোঁকার ডালনা, ছোলার ডাল, মোচার ঘন্ট…

মোচা কাটতে পারো?

আলিয়া হেসে মাথা নাড়ে, না, সেটা পারি না। কিন্তু কেউ কেটে দিলে রেঁধে ফেলতে পারি।

মেয়েমহলের প্রায় প্রত্যেকেরই কমবেশি ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। প্রথম যখন শুনেছিল অনিন্দ্য মেম বউ বিয়ে করে আনছে, ভেবেছিল সুনীতি বসুর মতো বনেদি পরিবার মানবে কী করে? সুষমাও ছেলের মুখে শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিল ফুটফুটে সুন্দর একটা মেয়েকে বউ করে আনবেন। তাকে নিজের হাতে শিখিয়ে পড়িয়ে আস্তে আস্তে সংসারের ভার সঁপে দিয়ে বাকি জীবনটা বিশ্রাম করবেন। মেম বউ এলে তো সবার আগে ভাষা বুঝতেই কালঘাম ছুটবে। তার ওপর তার কি দায় পড়েছে সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার?

কিচ্ছু কালঘাম ছুটবে না মা, আলিয়া পরিষ্কার বাংলা বলে। মায়ের হাত দুটো ধরে বলে অনিন্দ্য।

আলিয়া! এ আবার কী ম্লেচ্ছদের মতো নাম!

অনিন্দ্য হাসতে হাসতে মায়ের পাশে বসে। আলিয়া মোটেই ম্লেচ্ছদের নাম নয় মা। ও হচ্ছে ইউক্রেনিয়ান। এখন অবশ্য আমেরিকার সিটিজেন। ওহিও শহরের বাসিন্দা।

ইউক্রেনটা আবার কোন চুলোয়?

ম্যাপ দেখে বুঝিয়ে দেব?

থাক থাক। পরিবারের সম্মান, মায়ের মন এসব না বুঝে আমায় ম্যাপ বোঝাতে এলেন!

 .

আলিয়া আসছে শুনে, ২০/২ বিপিন পাল রোডের দোতলা বাড়িটা ক’দিন কেমন যেন নিভে গিয়েছিল। সুনীতি আর শিবাজী দুই ভাই একই বাড়িতে থাকেন। শিবাজী বসু থাকেন অনিমা আর মেয়ে অর্পিতাকে নিয়ে একতলায়, সুনীতি বসু দোতলায় সুষমা, অনিন্দ্য আর ছোট ছেলে অম্লানকে নিয়ে বাস করেন। সুনীতি-শিবাজীর বাবা এখানে জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন। দুই ভাই একসঙ্গে থাকলেও হাঁড়ি আলাদা, তবে এত বছরে এক ফোঁটাও মনোমালিন্য হয়নি।

সুষমা হাতিবাগানের মেয়ে। করিতকর্মা। ছেলেদের মানুষ করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সবদিকে তার নজর। অনিমা জায়ের তুলনায় খাটো হলেও ‘দিদি সব পারে’ বলে নিজের খামতি ঢেকে ফেলেন। সত্যি সুষমা অনেক কিছু পারেন। যেমন হাতের রান্না, তেমন আত্মীয়দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, নিজের হাতে বাগান করা। রথের মেলায় গাছ কিনে কিনে বাড়ির পেছনের জায়গাটা ভরিয়ে ফেলেছেন। জগা মালিকে বহাল করা হয়েছে সেই গাছের পরিচর্যা করার জন্য। তার কাজের সময় সুষমা নিজে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এই, ফাঁকি দিবি না। মনে রাখবি, গাছেরও প্রাণ আছে। ভালো করে জল দে।

কিন্তু ক’দিন হল গাছের তদারকিতে আসছেন না সুষমা। জগা না পেরে জিগ্যেস করে বসল, বাবু, মায়ের শরীর ভালো আছে তো?

বেতের চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে সুনীতিবাবু উত্তর দেন, তোমার মায়ের মন ভালো নেই জগা।

কেন বাবু?

বাড়িতে মেম বউ আসতে চলেছে।

কথাটা জগার থেকে আরও পাঁচকান হল। পাশের বাড়ির যোগেশ মল্লিক একদিন বাড়ি বয়ে এসে বললেন, তাহলে কি অনিন্দ্য বিয়ের পর ফরেনেই শিফট করবে?

ভয়টা সুষমার মনেও ছিল। অনি কি বাবা, মা, ভাইকে ছেড়ে আলিয়ার হাত ধরে ঘরজামাই হয়ে যাবে?

কেন? অনিন্দ্য বিরক্ত হয় শুনে, আলিয়াকে বিয়ে করার সঙ্গে ঘরজামাই হওয়ার প্রসঙ্গ আসছে কোত্থেকে?

না মানে, ওর বাবা-মা যদি এখানে থাকতে না দেয়?

উফ! মা, আগে থেকে এত স্পেকিউলেট কোরো না। ১৯৮৯-তে দাঁড়িয়ে ওদের ওখানে ছেলে-মেয়েদের জীবন বাবা-মা ঠিক করে দেয় না। আলিয়ার বয়সিরা ছোট থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

এখানেই বা কম কী? আমরা কি তোর বিয়ে আটকেছি?

অনিন্দ্য এবার মাকে জড়িয়ে ধরে, তাহলে একদিন আলিয়াকে নিয়ে আসি, কথা বলে দেখ?

.

আলিয়া যেদিন প্রথম এ বাড়িতে আসে সেদিনই সবার মন জয় করে নেয়। ওর মুখে বাংলা শুনে সবাই কাত।

কীরে অনি, তুই তো বলিসনি ও এত ভালো বাংলা বলে! অনিমার গলায় অভিযোগের সুর।

সব বলে দিলে সারপ্রাইজটা কেমন করে দিতাম কাকিমা?

তাছাড়া আলিয়ার সহবত দেখে সুষমা তো থ। মেম কিনা পায়ে হাত দিয়ে সবাইকে প্রণাম করে!

তারপর নির্বিঘ্নে বিয়ের তারিখ পাকা হয়ে গেল। আলিয়ার বাড়ি থেকে ওর বাবা মারকো ডেমিয়ানুক আর মা নাতালিয়া বিয়ের বেশ কিছুদিন আগেই কলকাতা চলে এলেন। তাঁরা হোটেলেই উঠবেন; এমনটাই স্থির করে এসেছিলেন। অনিন্দ্য হোটেলের সমস্ত ব্যবস্থা করে দিতে গেলে মারকো রাজি হন না।

আমাদের খরচা তুমি বেয়ার করবে কেন! উই উইল পে অ্যান্ড স্টে।

তবে বাড়ির গাড়িটা ওদের ব্যবহারের জন্য অনিন্দ্য দিয়ে দিয়েছিল। হোটেলে একদিন ব্রেকফাস্ট দিতে দেরি হওয়ায় বসু বাড়ির লুচির স্বাদ পেয়ে মারকো-নাতালিয়া আর হোটেলের খাবার মুখে তোলেননি। সুনীতি বলেছিলেন হোটেল ছেড়ে এ-বাড়ি চলে আসতে, সুষমা রাজি হননি।

যতই মডার্ন হই আমরা, ছেলে-মেয়ে কি এক বাড়ি থেকে বিয়ে করবে নাকি? ছেলের বাড়ির হলুদ নিয়ে তো মেয়ের বাড়ি যেতে হয়। আর হ্যাঁ, বিয়ে কিন্তু বাড়ি ভাড়া করে হবে। এখানে নয়।

কেন?

নিয়ম-কানুন শিকেয় তুলব নাকি? ছেলের বাড়িতেই ছেলের বিয়ে?

সুষমার কথাই থাকে। হাজরা মোড়ে বসুশ্রী সিনেমার কাছে একটা বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। বিয়ে সেরে পরদিন সকালে বউ নিয়ে অনিন্দ্য নিজের বাড়ি আসে।

কড়ি খেলার সময় অনিন্দ্যর খুড়তুতো বোন শিখা আলিয়ার কাছে বাংলা গান শুনবে বলে বায়না ধরে বসল। আর তখনই আলিয়া এই গান শুনিয়ে সব্বাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।

আমি কিন্তু তোমার থেকে বয়সে বড়, রায়বাঘিনী বলে আমায় অপমান করলে যে বড়? শিখা কপট রাগ দেখিয়ে চোখ পাকায়।

এখানে মেয়েদের বাঘিনী বলা মানে তো ইন্সাল্ট নয়, ইটস আ ম্যাটার অফ প্রাইড। যেমন মাতঙ্গিনী হাজরা।

শিখার কথা মুখেই আটকে যায়।

অর্পিতা গলা নামিয়ে বলে, দিদি, তুই আর ঘাঁটাস না।

সত্যি আর নতুন বউকে কেউ ঘাঁটাতে সাহস করেনি। বউভাতের দিন মারকো আর নাতালিয়াকে ধুতি-পাঞ্জাবি আর শাড়িতে দেখে পাড়ার সবাই মুখ টিপে হাসাহাসি করলেও আলিয়াকে তাদের খারাপ লাগেনি। যারাই ওর কাছে আলাপ করতে গেছে, তারাই মুগ্ধতা নিয়ে ফিরেছে।

কপাল গুণে ছেলে পেয়েছ সুষমাদি। আমার তো সে ভাগ্য নেই। পিকলু যে কী একটা বিয়ে করে আনল…। মল্লিক গিন্নি দুঃখ ঘোচাতে গোটা দুয়েক আইসক্রিম খেয়ে নেয়।

সেই রাতেই মারকোদের দিল্লিতে ফেরা। দিল্লি থেকে ওহিও যাওয়ার জন্য ক্লিভল্যান্ডের ফ্লাইট। তাই খাবার পাট তাড়াতাড়ি চুকিয়ে হোটেল ফেরার আগে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন তাঁরা। আলিয়া মাকে জড়িয়ে ধরে খানিক কান্নাকাটি করল। মারকোর চোখেও জল এসে গেল।

আমি জানি তুমি যা ডিসিশান নিয়েছ সেটা বেস্ট ফর ইউর লাইফ। সবাইকে নিয়ে ভালো থেকো।

.

ফুলশয্যার খাট সাজিয়ে হাতের সুতো খুলিয়ে মহিলার দল যখন ঘর ছাড়ে তখন বাজে রাত সাড়ে বারোটা। অনিন্দ্য দরজা বন্ধ করে ফিরতেই আলিয়া ডান হাতে নাইট ড্রেস তুলে দেখায়।

ক্যান আই?

ও প্লিজ, ইটস ইউর হোম টু।

দ্যাট আই নো। কিন্তু এসেই আমি কাউকে হার্ট করতে চাই না।

দরজা বন্ধ, কে দেখবে? রিল্যাক্স করো।

ওকে। তাহলে তুমি ওদিকে ঘোরো।

অনিন্দ্য হাসে, আজ কিন্তু কালরাত্রি নয়।

আই উইল শাউট দেন!

আলিয়া হাঁ করতে গেলেই অনিন্দ্য চট করে পেছন ঘুরে যায়।

তোমার এ ক’দিন খুব ধকল গেল না? অভ্যেস নেই তো।

গেল একটু, বাট আই এঞ্জয়েড। আমার বাবা-মাও। দাদা-বউদি আসতে পারল না, খুব মিস করল। ঘোরো, হয়ে গেছে।

আলিয়া শাড়ি ভাঁজ করে আলমারিতে রেখে হাতের চুড়ি খুলতে থাকে। অনি, আই অ্যাম টেকিং দিজ ব্যাঙ্গলস আউট, সকালে পরে নেব।

অনিন্দ্য মাথার নীচে একটা হাত দিয়ে কাত হয়ে শোয়। যা প্রাণ চায় করো, আরাম করে ঘুমোও আগে।

হোয়াট! আরাম করে ঘুমোও? এখন আমি তোমাকে গান শোনাব।

মানে?

অর্পিতা আমায় উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের ফিল্ম দেখিয়েছে। এসব রাতে গান গাইতে হয়।

অনিন্দ্য হাহা করে হেসে ওঠে।

রিয়েলি!

ইয়েস। আই হ্যাভ পিকড আপ আ সং, ‘তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার’।

অনিন্দ্য হাসতে হাসতে আলিয়ার হাত দুটো ধরে বসায়। তুমি জানো, তুমি খুব সিম্পল একজন মানুষ।

ইউ টু ডিয়ার। যখন প্রথম আমাদের দেখা হয়েছিল, আই রিমেম্বার হাও ইউ হেল্পড মি। ট্রেনে বসার জায়গা ছিল না, আমায় বসতে দিয়ে সারা রাস্তা দাঁড়িয়ে কলকাতা ফিরেছিলে।

বোলপুর থেকে হাওড়া আর কতটুকু রাস্তা?

কথাটা রাস্তার নয়, মেন্টালিটির। এই যে বাবা-মা চলে গেল, আই অ্যাম সো ফার অফ ফ্রম মাই প্লেস, আমার ভয় করছে না। তুমি আছ বলে।

অনিন্দ্য আলিয়াকে জড়িয়ে ধরে। সারাজীবন এই ভরসাটুকু রেখো, দেখো দারুণ থাকব।

ওকে। তাহলে এবার গানটা শোনাই?

একা কেন, আমিও গলা মেলাব।

আলিয়া খাটে বসে অনিন্দ্যকে ইশারা করে ওর কোলে মাথা রেখে শুতে, সিনেমায় দেখা দৃশ্যের মতো। তারপর গান ধরে। গাইতে গাইতে মাঝে মাঝে খাটে বিছোনো ফুল তুলে অনিন্দ্যর গায়ে ছড়িয়ে দিতে থাকে। অনিন্দ্যও গলা মেলায়।

‘আমারও পরাণে আসি, তুমি যে বাজাবে বাঁশি…’

হঠাৎ দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ পেয়ে ওরা দুজনেই থেমে যায়।

অনিন্দ্য উঠে বসতেই অম্লানের গলা পাওয়া যায়, দাদা, একবার খুলবি?

আলিয়া গায়ে চাদর টেনে নাইট ড্রেস ঢেকে খাটে শুয়ে পড়ে, অনিন্দ্য দরজা খোলে।

কী হয়েছে?

সরি, না ডেকে উপায় ছিল না। বউদির বাবাকে…

কথা শেষ হওয়ার আগেই আলিয়া ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। ওয়াট হ্যাপেন্ড টু মাই ফাদার?

দিল্লি এয়ারপোর্টে ইজরায়েল পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে আঙ্কলকে।

আলিয়া নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। বিছানা ছেড়ে ছুটে আসে অম্লানের কাছে।

বাবাকে! বাট ওয়াই?

ডিটেলস জানি না বউদি। তবে বাবা বলল তাকে ওখান থেকেই ওরা ইজরায়েল নিয়ে চলে যাবে। ওদের বক্তব্য তিনি নাকি সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার ক্রিমিনাল।

.

হারমোনিয়ামটা নিজের কোলের কাছে টেনে শ্রীধর পণ্ডিত ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকান। মাস্টারমশাইয়ের ধমকের ভয়ে চারজনেই চুপ। শ্রীধরের আঙুল সাদা কালো রিডে খেলা করে সুর তুলছে বটে, কিন্তু চোখ ওদের দিকেই স্থির। বাঁ-হাতে বেলো করতে করতে ইশারা করেন, শুরু করো।

গিরিজা গলা খাঁকারি দিয়ে আড়চোখে সরস্বতী, সইফ আর শাহিদকে দেখে নেয়। শ্রীধরের নজর বাঁচিয়ে ওরা তাকে গান ধরতে বারণ করে, গিরিজা থেমে যায়।

কী হল, শুরু কর বেটি। শ্রীধর বেলো থামিয়ে দেন।

মাস্টারজি, আমি তো…

গিরিজার পায়ের বুড়ো আঙুলে সইফ চিমটি কাটে, গিরিজা ‘আহ’ বলে পায়ে হাত বোলায়।

হারমোনিয়াম সরিয়ে শ্রীধর এবার কঠিন চোখে তাকান, রেওয়াজ হয়নি তো? কেন?

স্কুলের পরীক্ষার জন্য মাস্টারজি, সইফ মুখ খোলে, আজকেই শেষ হল।

আমার মেয়ে তারা তো তোমার বোনের সঙ্গেই পড়ে। সে যে বলল পরশু সবার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে!

সইফ প্রমাদ গোনে, আমাদের একটা সাবজেক্ট বাকি ছিল।

দেখ বেটা, পড়াশোনা যেমন সাধনা না করলে হয় না, তেমনই সঙ্গীত। জোর করে মেরে বকে তো শেখাতে পারব না।

আর বেশিদিন শেখাতেও পারবেন না, শাহিদের ঠোঁটের কোনায় অদ্ভুত হাসি, সময় থাকতে থাকতে চলে যান।

শ্রীধর ওর কথার মানে বোঝেন না। বলেন, কোথায় যাব?

সমঝ আয়েগা কুছ দিনো মে, শাহিদ উঠে পড়ে, চল সইফ। এসব করে কওম-এর নাম খারাপ করছি আমরা।

সইফ ইতস্তত করলে শাহিদ তাকে হাত ধরে টেনে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায়। সরস্বতী আর গিরিজা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।

কী ব্যাপার? শাহিদের কথার মানে তোমরা বুঝলে?

রাতে রান্নাঘরের কাজ সেরে ঘরে এসে পার্বতী লক্ষ করেন শ্রীধর তখনও জেগে আছেন। অন্যদিন তিনি ঘুমিয়ে পড়েন, আজ জেগে আছেন দেখে একটু অবাক হন। শ্রীধর কর্ণাটকী সঙ্গীত নিয়ে চর্চা করে এসেছেন সেই ছোটবেলা থেকে, শ্রীনগর শহরে তাঁর বেশ নাম ডাক। পুজো-পার্বণ, শ্রীনগর কালচারাল ফোরামের শো, এছাড়াও শহরের বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান তাঁর গান ছাড়া সম্পন্ন হয় না। লোকাল কাগজে প্রায়ই সেসব অনুষ্ঠানের সংবাদ প্রকাশিত হয়। অনেকেই তাঁকে বলে বম্বে গিয়ে কাজের চেষ্টা করতে। কিন্তু শ্রীধর টিক্কুর একটাই কথা।

এই ওয়াদি ছেড়ে, পাহাড় ছেড়ে আমি কোথাও থাকতে পারব না। দম ঘুটতা হ্যায় মেরা।

কীগো, তুমি এখনও ঘুমোওনি?

পার্বতীর গলা পেয়ে শ্রীধর তার দিকে ফেরেন, কিছু বলেন না।

মাথা ধরেছে? ওষুধ দেব? অনেকবার বলছি চোখটা একবার দেখিয়ে নাও।

চোখ বন্ধ করে শ্রীধর চাদরটা বুক অবধি টেনে নেন। পার্বতী ঘরের কোণে ঠাকুরের ছবিতে প্রণাম করে আলো বন্ধ করে পাশে এসে শোন। ডান হাতটা শ্রীধরের কপালে ঠেকিয়ে বলেন, গা তো ঠান্ডা!

আমি কি বলেছি জ্বর এসেছে?

তুমি জেগে আছ, ভাবলাম…কী হয়েছে বলো তো?

শ্রীধর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিত হয়ে শোন।

আজ ক্লাসে শাহিদের কথা শুনে থেকে মনটা কেমন করছে…।

আমাদের শাহিদ বেটা, ভারি মিষ্টি ছেলে। নিশ্চয় গলা সেধে আসেনি?

মিষ্টি ছেলের মুখে মিষ্টির বদলে এই প্রথম কড়া কথা শুনলাম। বলল আর বেশিদিন গান শেখাতে পারবেন না, সময় থাকতে চলে যান।

মানে! পার্বতী ভুরু কুঁচকে তাকান, কোথায় যাব?

.

শ্রীনগরে প্রায় পাঁচ লাখ কাশ্মীরি পণ্ডিতের বাস। আজ নয়, যবে থেকে কাশ্মীর তবে থেকেই তারা এখানে। কত বার কত রকমভাবে কত শাসক তাদের মেরে ধরে উচ্ছেদ করতে চেয়েছে! পেরেছে খানিক। তাও জমি আঁকড়ে হিন্দুরা রয়ে গেছে। কেন থাকবে না? এ জমি তাদের। আজ যদি কোনো মারাঠিকে বলা হয় তুমি পুণে থেকে বেরিয়ে যাও, সে কি যাবে? লড়াই করবে। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের এখানেই সমস্যা। তারা লড়াকু জাত নয়। তারা বিদ্বান, মননশীল এক গোষ্ঠী, কথায় কথায় হাতে তলোয়ার বন্দুক তুলে নিতে পারে না। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে তারা নিজের জায়গাতেই এখন সংখ্যালঘু।

বেশ কিছুদিন যাবৎ ঘুরে-ফিরে তাদের কানেও এই কথাটা আসছে—‘তোমাদের চলে যেতে হবে।’

কেন চলে যাবে? চলে গেলে আমি তারাকে ছেড়ে বাঁচব কী করে?

কামিজ সেলাই করতে করতে আলিয়া সইফকে জিগ্যেস করে।

শাহিদ আজ বলছিল…

ফালতু ছেলে!

ফালতু নয়। ক্লাস থেকে বেরিয়ে জিগ্যেস করলাম। বলল মসজিদে শুনেছে খুব শিগগিরি আমরা আজাদ হব।

সেলাইয়ের সুতোটা দাঁতে কেটে আলিয়া তাকায়। আলিয়া ডার। ক্লাস এইটে পড়া একটা ফুটফুটে মিষ্টি মেয়ে। দাদার কথা শুনে সে একেবারে থ।

আজাদ হব? আমরা তো আজাদ!

তোর মোটা মাথায় ঢুকবে না। সইফ কার্পেটের ওপর শুয়ে পড়ে, আজাদী আসছে। মসজিদের ইমাম সাব কি মিথ্যে বলবে নাকি?

কথা না বাড়িয়ে আলিয়া নিজের ঘরে আসে কিন্তু দাদার কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খায়। আজাদী আবার কী! ওরা তো পরাধীন দেশে জীবন কাটাচ্ছে না? ভাবে পরদিন সকালে শাহিদের সঙ্গে দেখা হলে ওকেই জিগ্যেস করবে।

.

সকাল হতেই আলিয়া স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ির গলি পেরিয়ে তারার বাড়ির সামনে এসে হাঁক পাড়ে।

তারা, আ যা।

তারা ঠাকুর প্রণাম করে টিফিন বক্স ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বাইরে আসে। গেট বন্ধ করার সময় সিমেন্টের থামে চোখ যেতেই দাঁড়িয়ে পড়ে। থামের গায়ে উর্দুতে লেখা একটা কাগজ সাঁটা। তারা উর্দু পড়তে পারে।

এখান থেকে চলে যাও। নাহলে কী অবস্থা হবে তা কল্পনাও করতে পারছ না। কাশ্মীর হামারা হ্যায়, কাশ্মীর আজাদ হ্যায়।

তারাকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে আলিয়াও এগিয়ে এসেছে।

এসব কী! কে লিখেছে বল তো আলিয়া?

আমি জানি, আয় আমার সঙ্গে।

দেওয়াল থেকে লিফলেট ছিঁড়ে ফেলে আলিয়া তারাকে নিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়তেই শাহিদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।

তুমি আমার দাদার বন্ধু বলে ভেবো না তোমায় ছেড়ে কথা বলব। তারার বাড়ির গেটে তুমি…

আমি না, তবে জানি কে লিফলেট সাঁটিয়েছে। কেএলএফ-এর লোক। শুধু ওর বাড়িতে নয়, এখানে যত পণ্ডিত আছে সবার বাড়িতেই নোটিশ পড়বে।

শাহিদ ভাই, কী ইয়ারকি হচ্ছে এসব?

এরা এখনও ইয়ারকি ভাবছে, সচ মাননা শুরু করনে বোলো, নহী তো জান যায়েগি।

শাহিদ পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখনই আলিয়া ওর হাত ধরে টানে, জান যায়েগি মতলব?

আগামী পয়লা জানুয়ারি কাশ্মীর আজাদ হো রহা হ্যায়। ইসলামিক রিপাব্লিক কান্ট্রি হব আমরা।

শাহিদ আলিয়ার হাত ছাড়িয়ে তারার সামনে এসে দাঁড়ায়। তোমার বাবাকে বলে দিও এখন থেকে আমি, সইফ বা অন্য মুসলিম ভাইয়েরা কেউ আর গান শিখতে যাবে না। হিন্দু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখা আর ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করা এক।

ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ওদের মুখের ওপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে শাহিদ চলে যায়।

আলিয়ার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে তারা। আলিয়া মাথা নেড়ে সাহস জোগায় ওকে। ওরা দুজনে আবার স্কুলের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করে। আলিয়ার বুকের ভেতরে শাহিদের কথাগুলো হাতুড়ি পেটার মতো আঘাত করতে থাকে।

.

শিবাজী খবরের কাগজে আতিপাতি করে খুঁজে কিছু পান না।

আলিয়ার বাবার ব্যাপারে কোত্থাও কিছু তো নেই!

ভাইয়ের কাছ থেকে কাগজটা নিয়ে আরও একবার প্রত্যেকটা পাতা খুঁটিয়ে দেখে ভাঁজ করে টেবিলে রেখে দেন সুনীতি, অনেক রাতের কেস বলে ছাপাতে পারেনি, মে বি।

সামনে দুকাপ চা পড়ে পড়ে জল হচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কারোর খেয়াল নেই। গত রাত থেকেই হঠাৎ করে সবকিছু পাল্টে গেছে। মারকো অ্যারেস্ট হওয়ার পর থেকে আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আলিয়া অনিন্দ্য সেই রাত থেকে আই এস ডি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওহিওতে, কিন্তু লাইন মেলেনি। সকাল থেকে ইজরায়েল এমব্যাসির নম্বরে ট্রাই করে যাচ্ছে, ফোন লাগছে না।

ভদ্রলোকের ব্যাপারে তুই কী জানিস আরেকবার বল তো দাদা। শিবাজী কাপে চুমুক দেন।

অনি যা বলেছে তাই, যা তোরা জানিস। আমেরিকাতে সেটেল্ড বহু বছর, ওখানকার সিটিজেন। ওহিওতে ফোর্ড কোম্পানিতে সুনামের সঙ্গে চাকরি করেছেন। খুবই ধর্মপ্রাণ মানুষ। সপ্তাহে একবার করে মাস অ্যাটেন্ড করেন, গরিব দুঃখীদের সাহায্য করেন…এইসব।

মানে ওনার ব্যাপারে এতবছরে খারাপ কিছু শোনা যায়নি।

আমরা কলকাতায় বসে কী শুনব বল তো?

তা ঠিক।

.

অনিমা বিছানা তুলে আগের রাতের বাসি জামাকাপড় সাবানের বালতিতে ভিজিয়ে দোতলায় আসে। সুষমা তখন ডাইনিং টেবিলে গালে হাত দিয়ে বসে।

আজ আর তোমাকে কিছু করতে হবে না। যা হোক একসঙ্গে খেয়ে নেব।

সুষমা সামনের চেয়ারটা টেনে হাত দেখিয়ে অনিমাকে বসতে বলেন।

কী হল বল তো? মাথায় তো কিছু আসছে না। ওয়ার ক্রিমিনাল মানে কী তাই তো বুঝতে পারছি না।

মেয়ে বলল উনি নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু খারাপ কাজ করেছিলেন।

খারাপ কাজ বলতে?

মানুষ মেরেছিলেন।

সুষমা অনিমার হাত খামচে ধরেন, কী বলছিস?

আমার মনে হয় এটা ঠিক কথা নয় দিদি। ভদ্রলোককে তো এ ক’টা দিন দেখলাম, একবারও মনে হয়েছে উনি খুন করতে পারেন?

.

স্কুলে ১৫ অগস্ট পালনের জন্য অর্পিতা ছাদে বসে একটা বড় ট্রেতে সাবুদানা, কাঁচা লঙ্কা আর গুঁড়ো কমলা রঙ কিনে ভারতের পতাকা তৈরিতে ব্যস্ত। ওর কয়েক হাত দূরে অম্লান লুকিয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছে।

কী মনে হয় তোর? আঙ্কেল খুনি?

ধ্যাত! অর্পিতা রঙমাখা হাত ন্যাকড়ায় মুছে অম্লানের দিকে ঘোরে।

আলিয়া বউদির বাবা-মা এত ভদ্র নম্র মানুষ…

তুই তো বলবি। তোকে বিদেশি পারফিউম গিফট করেছে আলাদা করে।

তুই বা বলবি না কেন? তোকে আলাদা করে কিছু দেয়নি বলে?

অম্লান সিগারেটের টুকরোটা পাঁচিলের ওপাশে ছুড়ে দিয়ে বোনের কাছে আসে।

মজা করছি রে বাবা।

করিস না ছোড়দা। বউদির মনের অবস্থাটা ভাবতে পারছিস? তুই আমি হলে কী করতাম? হুট বলতে সে তো বাবার কাছে যেতেও পারছে না।

জ্ঞান দিস না। নিজে স্কুলের ক্রাফট না এক্সিবিশন কী সব নিয়ে পড়ে আছিস। তোর তো এই সময় বউদির পাশে থাকা উচিত।

অর্পিতা সকালে গিয়েছিল আলিয়ার কাছে। একটু খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু আলিয়া মুখে তোলেনি কিচ্ছু। তুলবেই বা কী করে? ওর বাবাকে যে কেউ অ্যারেস্ট করতে পারে, সেটা ও এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। যে মানুষটা সবার জন্য ভাবেন…চার্চের যে-কোনো চ্যারিটেবল কাজে সবার আগে থাকেন, কী করে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনতে পারে!

এই মুহূর্তে দরকার ভালো একজন উকিল, কিন্তু নিজের জায়গা হলে কাজটা সহজ ছিল। দাদা জনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছে নাতালিয়া ওহিওর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। যতক্ষণ না তাঁর পৌঁছনোর খবর আসছে, আলিয়া কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। সারাক্ষণ ফোনের পাশেই ঘুরঘুর করে সে। সিঙ্গল রিং মানে লোকাল কল। বাইরের কল হলে একটানা রিং হয়। বাজলেই উৎকণ্ঠা নিয়ে রিসিভ করছে। তবে বেশিরভাগ কলকাতার বাইরের আত্মীয়দের ফোন।

নতুন বউমা নাকি? সুনীতির রাঙাপিসি বলছি। বিয়েতে তো যাওয়া হল না মা, যা বাতের ব্যথা! শুনলাম তুমি নাকি দারুণ বাংলা বলো?

আলিয়া হুঁ-হাঁ করে সুষমা বা সুনীতিকে ফোন ধরিয়ে দেয়।

বাড়ির বাইরে কাউকেই মারকোর কথা জানানো হয়নি। পেটপাতলা জগার কান বাঁচিয়ে সবাই কথা বলে।

কী হয়েছে গো ছোড়দা, নতুন বউদিকে কেমন একটা আনমনা ঠেকছে? জগা গাছের ডাল ছাঁটতে ছাঁটতে অম্লানকে জিগ্যেস করে।

অম্লান তার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেও ভাবে ক’দিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব। একবার কাগজে বেরোলে তো হুড়মুড়িয়ে ফোন আসতে শুরু করবে।

.

অনিমা এক বাটি দই চিঁড়ে মেখে আলিয়ার সামনে ধরেন।

জানি খেতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু কিছু মুখে না দিলে এবার তো পিত্তি পড়ে যাবে!

কাকিমা, আমার গলা দিয়ে কিছু নামবে না।

না খেলে বাবার জন্য লড়াই করবে কী করে মা?

বাবার জন্য লড়াই? কী লড়াই করব, কার সঙ্গে লড়ব?

কাকিমা এতবার করে বলছে, একটু খেয়ে নাও। অনিন্দ্য আলিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে আলিয়া অনিন্দ্যকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।

আমি আবারও বলছি, এটা বিরাট কোনো ষড়যন্ত্র। আঙ্কল ইনোসেন্ট সেটা ঈশ্বরও জানে।

ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে। অনিন্দ্যই রিসিভ করে।

হ্যালো…ইয়েস মম…ইউ রিচড?

আলিয়া অনিন্দ্যর হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়।

কী করে হল মম? আমায় এখুনি ডিটেলসে বলো।

আলিয়ার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনে একে একে সবাই ঘরে হাজির হয়।

কী! এটা কী করে সম্ভব? দিস ইজ আ হিউজ মিস্টেক…

ফোনের ওপাশ থেকে নাতালিয়া কী বলেন শোনা যায় না। তবে যে ভালো কিছু নয়, সেটা আলিয়ার মুখ দেখে সবাই আন্দাজ করে।

এভাবে হবে না মম, আমাদের ওখানকার একজন ল ইয়ার ঠিক করতে হবে। ইয়েস, ইজরায়েল…ডোন্ট ক্রাই মম, উই হ্যাভ টু বি স্ট্রং নাও। বাবাকে বাঁচাতেই হবে…হ্যালো…হ্যালো…

লাইনটা কেটে যায়। আলিয়া রিসিভার নামিয়ে রাখে।

কী হল বউমা? সুনীতি জিগ্যেস করেন, মা পৌঁছেছেন বুঝতে পারছি…কিন্তু বাবাকে…

আলিয়া সোফায় বসে খানিক ধাতস্ত হয়ে মুখ খোলে।

ইজরায়েল ক্লেইম করছে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ এই দুটো বছর নাৎসিদের ট্রেবলিঙ্কা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আমার বাবা লাখ লাখ ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে হত্যা করেছে।

ওয়াট! অনিন্দ্য হতবাক।

ইয়েস অনি। সেই চার্জে বাবাকে ধরা হয়েছে। আর তার ট্রায়াল ইজরায়েলেই চলবে। আলিয়া চোখ মোছে, শুধু তাই নয়, বাবার আমেরিকান সিটিজেনশিপ ক্যানসেল হয়ে গেছে।

.

চায়ের কাপ আর খবরের কাগজ নিয়ে সইফ ছাদে আসে। ঘুম থেকে উঠে মোড়ের মাথার দোকান থেকে রুটি কিনতে গিয়ে কানে এসেছে আজকের উর্দু কাগজ ‘রোশনি’-তে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়েছে। রাস্তাঘাটে সবাই সেটা নিয়েই কথা বলছে। সইফ কাগজ পড়ে না, খবরও রাখে না, তাই মাথা ঘামায়নি। কিন্তু যে ভাবে সবাই আলোচনা করছে, তাই বড্ড কৌতূহল হচ্ছে ওর। সদ্য সিগারেট ধরেছে সইফ, তাই চায়ের সঙ্গে এখন একটা করে খেতে মন্দ লাগে না।

কাপে চুমুক দিয়ে শার্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরিয়ে খবরের কাগজের ভাঁজ খোলে।

প্রথম পাতার হেডলাইন—‘ভারতের হোম মিনিস্টার মহম্মদ আলমের মেয়ে, রুবাইয়ার কিডন্যাপে কার হাত?’

গোটা খবরটা খুঁটিয়ে পড়ে চা শেষ করে ছাদের কোণে আসে সইফ। ধোঁয়া ছেড়ে নিজের মনেই বলে, সামনেই ১৫ অগাস্ট, এই সময় কিডন্যাপ! এখানে তো আগুন জ্বলবে!

.

আগুন না জ্বললেও বিক্ষোভ শুরু হয়। পাড়ায় পাড়ায় চলতে থাকে মিটিং মিছিল।

দিল্লিতে প্রাইম মিনিস্টার প্রতাপ রাইকে জম্মু-কাশ্মীরের গভর্নর মোহনলাল বারবার সাবধান করেছেন কাশ্মীর নিয়ে।

মোহনলালজি, আমাদের দেশে আরও অনেক সমস্যা আছে। শুধু কাশ্মীর নিয়ে পড়ে থাকলে হবে?

স্যার, জানি আপনার হাজারও কাজ, কিন্তু রুবাইয়ার কিডন্যাপটা…আপনি নিশ্চয় আন্দাজ করতে পারছেন?

প্রতাপ ফাইল থেকে মুখ তুলে তাকান।

কেএলএফ আর পাকিস্তানের আই এস আই মিলিত হয়ে আমাদের বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। আন্দাজ করতে পারছি এই কিডন্যাপের কী রেপারকেশান্স হতে পারে। কী ডিমান্ড হতে পারে কিডন্যাপারদের।

প্রতাপ হাসেন, কাশ্মীরের চিফ মিনিস্টার হুজত উল ইসলামও বোধহয় এত টেন্সড নন, যতটা আপনি মোহনলালজি। কাশ্মীর ইজ নট আ মেজর ইস্যু রাইট নাও।

প্রাইম মিনিস্টারের অফিস থেকে বেরোতেই খবরটা আসে মোহনলালের কাছে। লালচকে একটা বড়সড় জমায়েতে ‘ইন্ডিয়া হায় হায়’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। আর সেই স্লোগানে মেতে উঠেছে গোটা শ্রীনগর।

.

তারা নিজের জগতে খুশি। সামনেই ১৫ অগস্ট। নিজের হাতে ছোট্ট ছোট্ট পতাকা তৈরি করেছে সে। বাড়ির সদর দরজা থেকে ছাদ অবধি সব জায়গায় এখন সেগুলোই সাঁটতে ব্যস্ত সে।

সবজির গামলাটা কোথায় রে তারা?

পার্বতী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে কোমরে হাত দিয়ে চোখ পাকাতেই তারা হেসে ফেলে।

তুই আবার ওটা নিয়েছিস?

এক্ষুনি হয়ে যাবে মা।

অন্য বাসন নে, ওটা কেন?

তারা গামলায় রাখা গঁদ পতাকার গায়ে লাগিয়ে গেটের পাশের দেওয়ালে এঁটে দেয়।

এইতো আর শুধু আমার ঘরেরটা বাকি।

এমন সময় সদর দরজায় দুধওয়ালা ইমতিয়াজ সাইকেল থামায়। সপ্তাহে দু’দিন দুধ নেওয়া হয় এ বাড়িতে।

ইমতিয়াজ হাঁক পাড়ে, বর্তন লে আও—।

এক মিনিট। হাতের কাজটা সেরেই যাচ্ছি।

তারা ঝটপট পতাকা সেঁটে, বারান্দার বেসিনে হাত ধুয়ে রান্নাঘরে যায়।

ইমতিয়াজ এসেছে?

হ্যাঁ মা।

ওকে জিগ্যেস করিস তো রাখীর দিন এল না কেন?

ক্যান নিয়ে এক ছুটে বাইরে এসে তারা দেখে ইমতিয়াজ একটা পতাকা খুলে হাতে নিয়ে দেখছে। দুধের ক্যানটা সামনে নামিয়ে তারা হেসে বলে, আমি বানিয়েছি, সামনেই স্বাধীনতা দিবস তো। কেমন হয়েছে বলো?

ইমতিয়াজের চোখ মুখ পাল্টে যায়। এক চিলতে পতাকা হাতের মুঠোয় পিষে দলা পাকিয়ে ফেলে পা দিয়ে রগড়াতে থাকে।

ইমতিয়াজ মামা! তারা হতবাক, এ তুমি কী করছ? আমাদের দেশের পতাকাকে এভাবে অপমান করছ!

আমাদের দেশের নয়, ইন্ডিয়ার। আমরা ইন্ডিয়ান নই। পতাকা লাগাতে হলে আজাদ কাশ্মীরের লাগাও। এনে দেব?

রাগে তারার মাথায় যেন আগুন জ্বলে ওঠে। ইমতিয়াজের আনা দুধের ক্যানে সজোরে লাথি মারে সে।

তারা! ধমকে ওঠে ইমতিয়াজ।

এবার কেমন লাগল? ওটা তো সামান্য দুধের ক্যান আর এটা আমার দেশের ইজ্জত। খবরদার! দ্বিতীয়বার পায়ে মাড়ানোর আগে দুবার ভাববে।

ইমতিয়াজ তড়িঘড়ি পড়ে যাওয়া দুধের ক্যান তুলে সাইকেলে ঝুলিয়ে নেয়।

বহুত মেহেঙ্গা পড়েগা ইয়ে তুমকো। দেখ লেনা। বলতে বলতে সাইকেল নিয়ে তারাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

তারা মাটি থেকে পতাকাটা তুলে বেসিনের জলে ধুয়ে আবার দেওয়ালের গায়ে আটকে দেয়। এতদিনের চেনা ইমতিয়াজমামা, যাকে মা নিজের ভাই বলে, তার এই আচরণ যে কতবড় ধাক্কা দিয়েছে তারাকে, সে ও কাউকে বোঝাতে পারবে না। হয়ত বুঝবে শুধু একজন, আলিয়া।

.

শ্রীধর স্কুল-ফেরতা মায়সুমা বাজারে আসেন সবজি কিনতে। মেয়েটা নদ্রু পালক খেতে ভালোবাসে, ক’দিন আগেই বলছিল, ‘বাবা তুমি অনেকদিন নদ্রু আনোনি।’ স্কুটার নিয়ে পেরিয়ে যাওয়ার সময় তাজা নদ্রু এসেছে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন শ্রীধর।

বাজারের একটা থলি সবসময় স্কুটারে রাখা থাকে। সবজিওয়ালার সামনে ধরতে সে তাতে নদ্রু ভরে দেয়।

পালকও দিও।

সে আর বলতে। আপনাকে দেখেই আমি বুঝেছি।

মাহোল ক্যায়সা হ্যায়?

ভালো না। লালচকে ঝামেলার পর পুলিশ পোস্টিং বেড়েছে, ওই দেখুন—।

সত্যি তাই। শ্রীধর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন বাজারের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পুলিশ পাহারায় আছে।

কী যে হচ্ছে…রুবাইয়াকে এইভাবে…

চুপ সাব! সবজি-বিক্রেতা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে পাশের গলিতে ইশারা করে। চকিতে শ্রীধরের মনে পড়ে যায় তিনি খাস ইয়াসিন মালিকের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

ঠিক সেই সময় তাঁর চোখের সামনে একটা জিপ এসে দাঁড়ায়। চার-পাঁচজন অল্পবয়সি ছেলে জিপের পেছন থেকে নেমে সামনের দরজা খুলে দিতে ইয়াসিন মালিক নামে। ছোটখাটো চেহারা, একমুখ দাড়ি। পরনে কালো পাঠান স্যুট, গলায় সাদা কালো চেক স্কার্ফ। সেই বাহিনী নিয়েই সে বাড়ির দিকে এগোয়।

তার আশে পাশে থেকে সবাই তটস্থ হয়ে সরে সরে যায়, সামনে পড়ে গেলে সেলাম ঠোকে। বাজারের থলি একধারে ছুড়ে ফেলে সবজিওয়ালাও লাফিয়ে ওঠে জি-হুজুরি করতে।

শ্রীধরের চোখ চলে যায় ইয়াসিনের হাতে ধরা একটা একে৪৭-এর দিকে। তাহলে এর ভয়েই সবাই অস্থির? তাই অনতিদূরে পুলিশ থাকলেও তারা না দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে? একটা বন্দুকের জোরে এই রোগা-প্যাংলা লোকটা গোটা কাশ্মীরকে পায়ের সামনে নত করে রেখেছে? কিন্তু একটা সাধারণ বাড়ির ছেলের হাতে হঠাৎ করে এমন আগ্নেয়াস্ত্র এল কী করে? কোত্থেকে আসে এই টাকা? মনে একটা নামই আসে—পাকিস্তান।

ইয়াসিন হাত তুলে সবাইকে সেলাম জানিয়ে এগোতে গিয়ে থমকে যায়। নজরে আসে কালো প্যান্ট, নীল শার্ট, চোখে চশমা পরা একটা বোকাসোকা লোক ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ও এগিয়ে যায় তার দিকে।

পণ্ডিত?

শ্রীধর ইয়াসিনের চোখদুটো লক্ষ করেন, শেয়ালের চেয়েও ধূর্ত।

চেনা লাগছে! ইয়াসিন আরেকটু কাছে ঘেঁষে আসে। ও হো! দেখো মেরি কিস্‌মত। কাশ্মীরের সঙ্গীত জগতের সিতারা আমার সামনে!

শ্রীধর চোখ সরিয়ে নেন।

এতগুলো হাতের মধ্যে তোমার হাতটা সেলামের জন্য উঠল না কেন সিঙ্গার সাব? কাশ্মীরে থাকার ইচ্ছে তোমাদের একেবারেই নেই দেখছি।

শ্রীধর কথার উত্তর না দিয়ে নীচু হয়ে বাজারের থলিটা নিতে যান। কিন্তু তার আগেই ইয়াসিন নিজেই সেটা ওঁর হাতে তুলে দেয়।

এই হাত সব সময় এইভাবে সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে দেব, যদি আমাদের কথা মেনে চলো।

শ্রীধর ইয়াসিনের কথার মানে না বুঝে ভুরু কুঁচকে তাকান।

বন যাও মুসলমান, রহে যাও কাশ্মীর মে। কওন মনা কর রহা হ্যায়?

শ্রীধরের কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শান্ত রেখে ইয়াসিনের চোখে চোখ রেখে বলেন, এরকম প্রস্তাব যদি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পান? বন যাও হিন্দু, রহে যাও কাশ্মীর মে। কেমন লাগবে শুনতে?

ইয়াসিনের চোখদুটো দপ করে জ্বলে ওঠে। আজ অবধি কেউ ওর সামনে এমন কথা বলার সাহস পায়নি শুধু নয়, এমন বেয়াদপি করার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। ইয়াসিন রাগে ফুঁসতে থাকে, কিছু বলতে পারে না। দলের একজন শ্রীধরের দিকে এগোতে গেলে ও হাত তুলে আটকায়।

কিছু ঝামেলা হচ্ছে বুঝে বেশ খানিকটা জমায়েত হয়েছে এতক্ষণে। তাদের দিকে ইয়াসিন হুঙ্কার ছেড়ে বলে, কী দেখছ? নিজেদের কাজ করো।

ধমক খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সবাই দম দেওয়া পুতুলের মতো আবার কাজে জুটে যায়। শ্রীধরও সবজির দাম মিটিয়ে স্কুটার স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যান।

ইয়াসিন দলের একজনকে ডাকে।

কোথায় থাকে রে?

.

বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু না বলে শ্রীধর হাত-মুখ ধুয়ে তানপুরা নিয়ে বসেন। কিছুতেই তাঁর মন লাগে না রেওয়াজে। বারবার ইয়াসিনের চোখদুটো আর তার কথা মনে পড়ে। তানপুরা তুলে রেখে রেডিয়োটা চালিয়ে দেন।

খবর শুনতে শুনতে সামনে বসে শ্রীধর পণ্ডিত তাজ্জব হয়ে যান একটা সংবাদে—রুবাইয়াকে ছাড়া হবে একটা শর্তে। দিল্লি সরকারকে আতঙ্কবাদী সন্দেহে ইন্ডিয়ার জেলে থাকা পাঁচজন পাকিস্তানিকে ছেড়ে দিতে হবে।

.

সইফের বাড়ির সবাই একসঙ্গে চা খেতে খেতে সন্ধেবেলা রেডিওতে খবর শুনছিল, কানে যেতে আলিয়ার খাওয়া থেমে যায়।

এতজন আতঙ্কবাদীকে ছেড়ে দেবে? দিল্লি এতবড় ভুল করলে কাশ্মীরকে তো আর বাঁচানো যাবে না!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *