আলিয়া – ১৫

১৫

জাজেদের টেবিলের সামনে দুটো কাঠের বোর্ডে দুটো ছবি টাঙানো। একটা ট্রেবলিঙ্কা ক্যাম্পের ইভান ডেমিয়ানুকের আই ডি কার্ডের ছবি। আরেকটা মারকো ডেমিয়ানুকের এখনকার ছবি। আলিয়াদের সিট থেকে তেরচাভাবে ছবিদুটো দেখা যাচ্ছে। ক্যামেরাম্যানেরা যথাসাধ্য জুম করে টিভির দর্শকদের ছবি দেখাবার চেষ্টা করে।

ইটস নট পাপা। আলিয়া কাঁধ ঝাঁকায়।

অফ কোর্স নট। আজকের পরে শেফটেলের চাল তো আমরা জানি। অনিন্দ্য এক গাল হাসে।

মাইকেল, প্লিজ প্রোসিড। জাজ আদেশ দেন।

ইয়োর অনার, বিখ্যাত ফেসিয়াল এক্সপার্ট প্যাট্রিশিয়াকে যদি অনুমতি দেন তাহলে উনি দুটো ছবি অ্যানালাইজ করে কোর্টকে প্রমাণ করে দিতে পারেন মারকো আর ইভান এক লোক।

জি প্যাট্রিশিয়াকে হাত দেখালে সে ছবিদুটোর সামনে একটা স্কেল হাতে এসে দাঁড়ায়।

ইয়োর অনার লেট মি ফার্স্ট স্টেট—একজন মানুষের মুখ যতই বয়সের সঙ্গে চেঞ্জ হয়ে যাক না কেন, কিছু ফিচারস একরকম থাকে। যেমন শেপ অফ ফোরহেড। মাথার চুল কম বেশি হতে পারে কিন্তু কপালের কোনো পরিবর্তন হয় না।

সেটা এই বয়সে এসে আমিও বুঝতে পারছি। জি মৃদু হেসে বলেন।

আর পরিবর্তন হয় না কানের। চোখ ছোট হয়ে বা কুঁচকে যেতে পারে, আই ব্যাগস ডেভেলপ করতে পারে কিন্তু ইয়ারস রিমেন সেম।

উই আন্ডারস্ট্যান্ড। ডালিয়ার ইন্টারেস্টিং লাগতে শুরু করে।

কান, কপাল যেমন এক থাকে তার সঙ্গে আরও কিছু জিনিসের দিকে আমরা যদি নজর দিই সেগুলোও দেখা যাবে একই আছে। লাইক, দুচোখের মাঝের গ্যাপ। কান থেকে চোখের ডিসটেন্স। ঠোঁট আর চিবুক।

উদ্‌গ্রীব সাধারণ মানুষ টিভির ওপারে এবং কোর্ট রুমে অধীর আগ্রহে শুনতে থাকে প্যাট্রিশিয়ার বিশ্লেষণ।

হাতের স্কেলটা ইভানের সাদা কালো ছবির দুচোখের মাঝে রেখে প্যাট্রিশিয়া মেপে, জাজেদের দেখায়। তাঁরা নোট রাখেন। এবার স্কেলটা সরিয়ে মারকোর ছবিতে চোখের মাঝে রাখে।

সি, দ্য গ্যাপ ইজ সেম।

দর্শক আসনে বসে থাকা সবার মুখ হাঁ। আলিয়া অনিন্দ্যর দিকে তাকায়। সেও একটু বিস্মিত।

আবার আগের মতো প্যাট্রিশিয়া দুটো ছবির চোখ থেকে কানের গ্যাপ যে সমান তাও দেখিয়ে দেয়।

বোথ আর সেম, ইউ অল ক্যান সি।

মারকো ফিসফিস করে শেফটেলকে কিছু বললে সে হাত তুলে থামায়। মেয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বোঝায় ছবির মানুষ এক নয়। আলিয়াও মাথা হেলিয়ে বলে সে জানে।

প্যাট্রিশিয়াকে বসতে বলে মাইকেল আবার এগোন জাজেদের দিকে। ফেসিয়াল এক্সপার্টের এই ডিডাকশান প্রুভ করতে এনাফ যে দুটো লোক এক।

অবজেকশান! শেফটেল ওঠেন, কেসের রায় ঘোষণায় উনি ইনফ্লুয়েন্স করতে পারেন না।

নোটেড। জাজ ডভ বলেন, শেফটেল আপনার কোনো প্রশ্ন আছে প্যাট্রিশিয়াকে?

ইয়েস ইয়োর অনার। শেফটেল এবার প্যাট্রিশিয়ার দিকে ঘোরেন, আপনি কত বছর প্রফেশানালি এই কাজ করছেন?

মোর দ্যান টেন ইয়ারস।

কার কাছে কাজ শিখেছেন?

ভিভিয়ান গেটস।

কী মনে হয়? কাজের জায়গায় তাঁকে ছাপিয়ে গেছেন?

প্যাট্রিশিয়া হাসে, নেভার। গুরুকে শিষ্য ছাপিয়ে যেতে পারে না।

দ্যাটস অল। শেফটেল নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে আলিয়াদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন।

.

শেফটেল যে হাসিটা হাসলেন তাতেই বোঝা গেল কেস আমাদের হাতে।

অনিন্দ্য ডিনারের পর হোটেলের লনে পায়চারি করতে করতে আলিয়াকে বলে।

হোপফুলি। আলিয়াও তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে।

আই থিঙ্ক আলিয়া, আর কুড়ি দিনের মধ্যে উই আর গোইং ব্যাক। উফ! কী শান্তি। যে যার নিজের বাড়ি নিজের জীবনে ফিরব।

অনিন্দ্যর আজকের অস্থিরতা আলিয়াকে একটু অবাক করে। জানে সে মানুষ। তাও তার বাবার মুক্তির থেকে তাদের নিজের জীবনে ফেরা নিয়ে অনিন্দ্য মেতে উঠবে এটা আলিয়া ভাবেনি।

আমি তোমাকে আবার বলছি অনি, গো ব্যাক। চাকরিটা বাঁচাও।

একসঙ্গেই ফিরব না হয়। এই তো, হয়েই এল।

হাঁটা থামিয়ে অনিন্দ্যর হাত ধরে আলিয়া তাকে লনের বেঞ্চে বসায়।

তুমি কিছু লুকোচ্ছ আমার থেকে?

অনিন্দ্য চোখ সরিয়ে নেয়, না তো।

কী হয়েছে অনি? অল ওকে?

মাথা নাড়ে অনিন্দ্য। ভাই আজ সপ্তাহ খানেক হল দিল্লি গেছে। নতুন পাগলামি, সে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ওপর হওয়া অত্যাচারের ডকুমেন্টেশন করবে।

ওয়াট?

বাড়িতে এমনিতেই সবাই আমাদের নিয়ে মাথা খারাপ করছে তার মধ্যে ভাই…কী যে করে! এখনও বড় হল না।

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কী হয়েছে?

তাদের কাশ্মীর থেকে ওখানকার মুসলিমরা তাড়িয়ে দিচ্ছে উইথ দ্য হেল্প অফ পাকিস্তান।

আলিয়া ঘুরে বসে, ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট কী করছে?

নো আইডিয়া। তবে ব্যাপারটা হাশ হাশ রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে, যা শুনলাম।

মানুষগুলোকে নিজেদের জায়গা থেকে উচ্ছেদ করে দিচ্ছে, এও তো নাৎসি অত্যাচারের সামিল!

মোর অর লেস। হিন্দু-মুসলিম, খ্রিস্টান-ইহুদি…ধর্ম হচ্ছে সব থেকে বড় তাস, যা খেলে সাধারণ মানুষকে খুব সহজে হাতের মুঠোয় আনা যায়। একে অপরের প্রতি লেলিয়ে দেওয়া যায়। জার্মানি পোল্যান্ড দখল করে দেশের সীমা বিস্তার করতে চেয়েছিল, পাকিস্তান চাইছে কাশ্মীরকে কেড়ে ভারতের মুণ্ডচ্ছেদ করতে…সময়ের এদিক আর ওদিক, ইস্যু কিন্তু এক। ক্ষমতার প্রদর্শন।

তার মানে পণ্ডিতদের ইহুদিদের মতো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি করে রেখে দেবে?

.

ক্যাম্পেই তো থাকছে বেশিরভাগ পণ্ডিত, যারা প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছে বাড়িঘর ছেড়ে। গিরিজার বাবা অবন্তী কিচলু চোখের জল মোছেন। আমাদের ভাগ্য ভালো দিল্লিতে আত্মীয়স্বজন আছে। না-হলে আমাদেরও যে কী অবস্থা হত…!

অম্লান, সরোজ দুজনেই মন দিয়ে ওঁর কথা শুনছে।

কী অরাজকতা যে চলছে ওখানে, ভাবতেই পারবেন না। তারা বলে মেয়েটার কথা জানতে পেরেছেন, সেটা শ্রীনগর বলে। এরকম কত তারা যে রোজ কনভারটেড হচ্ছে কাশ্মীরের প্রত্যন্ত এলাকায় সে হিসেব কে রাখে? রাজৌরি গ্রামে সাত ঘর হিন্দু বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা। তার মধ্যে একজন পরিবার বাদে বাকি সবাই বাধ্য হয়েছে ইসলাম নিতে। যারা কনভারটেড হয়নি তাদের মেরে ধরে হাত পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়েছে জানোয়ারগুলো!

এত সব দেখে পুলিশ কিছু…

অবন্তী হাসেন, হাতের পুতুল। কাদের জানেন? পাকিস্তানের। দুজন হিন্দু পুলিশ রিভোল্ট করাতে তাদের রাতারাতি মেরে ফেলা হয়েছে।

এসব শুনে অম্লানের অস্থির লাগে। আমি যাব, যা হয় হোক। কার সঙ্গে যোগাযোগ করব বলুন?

একটু ভাবেন অবন্তী।

কার সঙ্গে বলব? সবাই মৃত্যু ভয়ে দিন কাটাচ্ছে, কেউ কিছু করতে পারবে কি?

তাও। কেউ একজন যে…

একজনই পারে। আরবাজ ভাই। পুলিশে আছেন কিন্তু তিনি আমাদের সাপোর্টে। গিরিজা বলে।

পিঠের ব্যাগ থেকে কাগজ পেন বার করে অম্লান ওর দিকে এগিয়ে দেয়। ঠিকানা লিখে দাও—বলে একটু থমকায়। বাট হি ইস আ মুসলিম। হেল্প করবে তো?

করবে। আরবাজ ভাই তারাকেও হেল্প করতে এসেছিল।

গিরিজা লেখা শেষ করে কাগজটা ফেরত দিয়ে বলে, একটা রিকোয়েস্ট আছে। আমার বাড়ির ঠিকানাটাও লিখে দিয়েছি। একবার দেখে আসবেন। রোজ মন কেমন করে…গিরিজার চোখে জল টলটল করে, সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে কিছু সময়ের জন্য। অবন্তী ধরা গলায় বলেন, একটা ইনফরমেশান দিয়ে রাখি, কাজে লাগতে পারে। পাড়ার একজনকে ফোন করে জানতে পেরেছি ইমতিয়াজ, যে তারাকে বিয়ে করেছিল, খুন হয়েছে। মাহোল গরম হয়ে আছে। হিন্দু দেখলেই…সাবধানে থাকবেন। কেন জানি না আলিয়া বেটির জন্য মনটা কেমন করছে।

আলিয়া?—অম্লান অবাক, আলিয়া তো আমার বউদির নাম!

আমি যে আলিয়ার কথা বলছি, সে তারার বন্ধু ছিল। জানি না দেখা হবে কিনা, হলে বলবেন গিরিজা ওদের কাউকে ভোলেনি।

.

১৬

সকালবেলা দেশসেবার কাজে বসার আগে স্নান সেরে হুজত আয়নার সামনে আসেন। পরনে পাট ভাঙা কুর্তা, চোস্ত, গায়ে গরম জ্যাকেট। ড্রেসিং টেবিল থেকে চিরুনি তুলে মাথা আঁচড়াতে গিয়ে মনে হয় বাঁ দিকের সিঁথের পাশটায় অনেকটা চুল উঠে গেছে। আঙুল দিয়ে চুলের ডগা ধরে ওপরে তুলে লক্ষ করেন সত্যি জায়গাটা ফাঁকা লাগছে।

মন খারাপ হয়ে যায়। বুড়ো হয়ে গেলেন? হবেন নাই বা কেন? বাবা বাসিত উল ইসলামের জুতোয় পা গলিয়ে রাজ্য চালানো মুখের কথা নয়।

কট্টর মুসলিমপন্থী চিফ মিনিস্টারের শাসনে কাশ্মীরের সমগ্র চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। ইসলামকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য হিন্দু নাম হাটিয়ে রাস্তাঘাট এমনকী জায়গার নাম পরিবর্তন করে মুসলিম নাম রাখা হয়। কাশ্মীরি মুসলিমদের কাছে বাসিত আরও প্রিয় হয়ে ওঠেন যখন উপত্যকায় বহুমাত্রায় হিন্দু বিদ্বেষ ছড়াতে শুরু করে।

বাবার পরে হুজত গদিতে বসার পর কাশ্মীরবাসী খুশি হয়। ভাবে বাপের মতোই ছেলে। কিন্তু দিল্লি মোহনলালকে গভরনর বানিয়ে দেওয়ায় হাওয়া ঘুরে যায়। ‘মুসলিম ফ্রন্ট’ ধুয়ো তোলে, হুজত উল ইসলাম দিল্লির চর। তার ক্ষমতা সীমিত, বকলমে রাজ্য চালান মোহনলাল। হুজতের বিরুদ্ধে প্রচার ছড়ানোর সঙ্গে এও ছড়িয়ে যায় কাশ্মীরি পণ্ডিত মানেই ভারতের গুপ্তচর।

পরিস্থিতি বেসামাল হচ্ছে দেখে ১৯৮০-তে তাঁকে সরিয়ে হঠাৎ করে মহম্মদ শাহকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গায়ত্রী দেবী জম্মু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী করে দেন। তাতে পণ্ডিতদের অবস্থার অবনতি হয়। গায়ত্রী দেবীর কানে বারবার সে কথা তুললেও আশ্চর্যভাবে তিনি মাথা ঘামান না। ৮৫-তে শাহকে হারিয়ে গদি ফেরত পায় হুজত। ততদিনে কিডনির অসুখে গায়ত্রী গত হয়েছেন এবং দিল্লির চেয়ারে বসেছেন তাঁর ছেলে প্রতাপ।

কাশ্মীরি মুসলমানদের চোখে ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে হুজত কেএলএফ-এর সঙ্গে হাত মেলান। শুরু হয় পি ও কে থেকে সন্ত্রাসবাদীদের এখানে আগমন।

ঝক্কি সামলাতে সামলাতে হু-হু করে কখন বয়স বেড়ে গেছে হুজতের খেয়ালই নেই। চোখের পাশে ভাঁজ। হাসলে লাফ লাইন স্পষ্ট…লুকোবেন কী করে? আয়না তো মিথ্যে বলে না।

একবার শুনবে? স্ত্রীকে হাঁক পাড়েন।

কী হয়েছে?

হালিমা ঘরে আসে।

আমি রুমাল ইস্ত্রি করে রেখে দিয়েছি তো।

এদিকে এসো।

ব্যাপার কী বুঝতে না পেরে সে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ায়। গোস্তাবা বানাব, জলদি বলো। মশলা পিষতে হবে।

ভালো করে দেখোতো, আমার মাথার চুল কি কমে যাচ্ছে?

হালিমা ফিক করে হেসে ফেলে। কমেছে তো। আমি তো সেদিন বললাম, কেয়ার করলে না।

কবে বললে?

এই তো ক’দিন আগে।

বুড়ো হয়ে গেলাম হালিমা?

সে তো আমিও হয়েছি। সময় কি থেমে থাকে?

তাই বলে টেকো হয়ে যাব?

হুজত আবার আয়নায় নিজেকে দেখেন।

আলমারির পাল্লা খুলে ভেতর থেকে একটা ফারের টুপি বার করে হালিমা এগিয়ে দেয়। এবার থেকে এটা পরে থেকো, সবসময়। ট্রেডমার্ক করে নাও। জে কে মুখ্যমন্ত্রী হুজত সাব মানে মাথায় কাশ্মীরি টুপি।

হুজত হাত বাড়িয়ে টুপিটা নিয়ে মাথায় পরে নিজেকে দেখেন, মন্দ লাগছে না বলো?

আমার মহারাজকে কি দেখতে মন্দ নাকি? হালিমা হুজতের পেছনে এসে দাঁড়ায়। আজও নিকাহর দিনের মতোই হ্যান্ডসাম।

আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই হুজত বলেন, মেরি জান হালিমা। জি খুশ কর দিয়া। বউয়ের দিকে ঘুরে চিবুক ধরে বলেন, কী চাই বলো?

কিছু চাই না। ছাড়ো, গোস্তাবা বানাব, মশলা…

সারাজীবন তো কিছু চাইলে না। বলো না, কী দিতে পারি?

হালিমা হাসে।

হুকুম জান।

ইয়াসিনকে মদত করা বন্ধ করে দাও। হালিমা মুখ ফস্কে বলে ফেলে।

হুজত গম্ভীর হয়ে যান।

পারবে না?

হাত সরিয়ে নিয়ে খাট থেকে রুমাল, পেন ইত্যাদি দরকারি জিনিস পকেটে ঢোকাতে থাকেন।

‘কী চাই’ বলার আগে এবার থেকে ভেবে বলো।

সরকার চালানোর কাজ আমার, তোমার ঘর। একে অপরের কাজে দখলদারি না করাই ভালো।

ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল হালিমা, হুজতের কথা কানে যেতে চৌকাঠ অবধি এসে থমকায়, ঘর আর সরকার মিলে মিশে এক হয়ে গেলে?

মতলব?

হালিমার কথার মানে বুঝতে পারেন না হুজত। সমঝা নহী।

পণ্ডিতদের ঘরের আগুন আমাদের ঘরেও লাগতে পারে। হালিমা এবার সরাসরি স্বামীর চোখের দিকে তাকায়। জানি সরকার তোমার, ঘর আমার ডিপার্টমেন্ট। তাও বলছি। তাড়িয়ে দিয়ে দেশ দখল তো হিটলারও করেছিল। তাকে দুনিয়া কীভাবে মনে রেখেছে জানো নিশ্চয়ই?

হালিমা!—হুংকার ছাড়েন হুজত, আমি তোমার স্বামী! কার সঙ্গে কার তুলনা করছ? আল্লাহ সে ডরো।

আমারও এক কথা। আল্লাহ সে ডরো। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় হালিমা।

কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকার পর হুজতের মনে হয় ‘পণ্ডিতদের ঘরের আগুন আমাদের ঘরেও লাগতে পারে’ বলে হালিমা কী ইঙ্গিত দিয়ে গেল? তাকে আবার ডাকতে যাবে, ঠিক তখনই জানলা দিয়ে নীচে লনের দিকে নজর যায়। পার্টির লোকেরা জড়ো হয়েছে। ঘড়িতে দশটা বাজে। দেরি না করে নেমে আসেন তিনি।

প্রায় সবাই হাজির। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। কেউ এদিক ওদিক জটলা পাকিয়ে কথা বলছে। মন্ত্রীকে দেখামাত্র এগিয়ে আসে ভক্তরা, সালাম জানায়।

ওয়ালেকুম আসসালাম।

সাজিদ কাগজ এগিয়ে দেয়।

জনাব, দিল্লির ওই পাঁচজনকে জেল থেকে রিহা করার কথা আপনি আজ মনে করাতে বলেছিলেন। রুবাইয়া ম্যাডামকে আর কতদিন কিডন্যাপ করিয়ে…

কল বুক করো, অভি।

সাজিদের ইশারায় বেয়ারা লম্বা তারযুক্ত কালো টেলিফোনটা নিয়ে আসে। কল বুক করতে ব্যস্ত হয় সাজিদ। ততক্ষণে আরেকজন এগিয়ে আসে।

ইমতিয়াজের খুনের ফ্যায়সলা এখনো হল না স্যার। কুছ করনা পড়েগা। বোঝাই যাচ্ছে এ পণ্ডিতদের কাজ।

লোকাল থানা কী বলছে?

নাগবল থানা এতদিন ধরে চেষ্টা করেও কিছু বার করতে পারল না। খুনিকে ধরতে না পারলে বুঝতেই পারছেন আগামী দিনে কী হতে পারে?

স্যার, লগ গয়া লাইন। বাত কিজিয়ে—সাজিদ রিসিভার এগিয়ে দেয়।

প্রতাপজি সালাম। খবর কী?

ভালো। এত সকালে? জরুরি কিছু?

অফ কোর্স। রুবাইয়াকে ছাড়ার অন্য কোনো রাস্তা তো এতদিনেও বেরোলো না। কেএলএফ গোঁ ধরে বসে আছে। জেল থেকে তাদের সাথীদের মুক্তি না দিলে…

কর দেঙ্গে রিহা।

এ তো শুনেই যাচ্ছি স্যার। অব কুছ অ্যাকশান লিজিয়ে।

অ্যাকশান! ফোনের ওপার থেকে প্রতাপ হাসেন, লে লিয়া মেরে দোস্ত। অলরেডি সেন্ট দ্য অর্ডার।

থ্যাঙ্ক ইউ দোস্ত, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।

ফোন রেখে জয়ের হাসি হেসে হুজত সবার দিকে ফেরেন, হো গয়া কাম। রুবাইয়া বাড়ি ফিরছে।

মাশাআল্লাহ!

তার সঙ্গে আমাদের বন্ধুদের খাতিরদারি শুরু কর দো।

সবাই হইহই করে ওঠে। এসবের মধ্যেও হালিমার কথাটা মনে খচখচ করে। কী বলতে গিয়ে বলল না…।

পাঁচজন টেররিস্টকে আপনি ছেড়ে দিচ্ছেন স্যার?

প্রতাপকে ফোনে শেষ কথা এটাই বলেছিলেন মোহনলাল। আর কিছু বলতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী দেশের কথা, মানুষের কথা না ভেবে একগুচ্ছ আতঙ্কবাদীদের ছেড়ে দিচ্ছেন—এর থেকে বড় হঠকারিতা কী হতে পারে! সবাই জানে রুবাইয়ার কিডন্যাপটা এদের ছাড়ানোর একটা চাল। সেটা জেনেও প্রতাপ রাই এ কাজ করছেন কী করে? কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সেফটি নিয়ে কেন কেউ ভাবছেন না?

ছেড়ে দিলে কী হতে পারে মোহনলাল জানতেন। আর তাই হল। জেল থেকে বেরিয়ে শ্রীনগরে আসার পর মায়সুমা বাজারের রাস্তা বন্ধ করে স্টেজ খাটিয়ে পাঁচজনকে সংবর্ধনা দেওয়া হল। উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে মকবুল, আমানুল্লাহরা এমনভাবে স্টেজে উঠে হাত নাড়ল যেন সিনেমার হিরো।

আমাদের মকসদ কী?

মকবুল মাইক্রোফোন হাতে স্টেজের সামনে এসে জানতে চাইলে হাজার লোকের সম্মিলিত গলা শোনা যায়—

আজাদি! আজাদি! আজাদি!

কিসসে আজাদি?

ইন্ডিয়া সে।

দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মহেন্দ্র দেখছিল তাদের উল্লাস। টিউশান থেকে ফেরার সময় মেইন রাস্তা বন্ধ দেখে অন্য রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছিল। সেখানেও বাধা পেয়ে আটকে যায়।

পরিস্থিতি ক্রমশ সঙ্গীন হয়ে যাচ্ছে। তার ছোট বোনকে এখন বাড়ি থেকে বেরোতে গেলে মুসলমান মেয়েদের মতো মাথা থেকে ওড়না ঢেকে বেরোতে হয়। তার মা শিখিয়েছে। বলেছে কেউ কিছু জানতে চাইলে প্রথমেই ‘আসসালামু আলেকুম’ বলবি, তাহলে তোকে প্রাণে মারবে না। মাঝে মাঝে ওর মনে হয় গিরিজারা চলে গিয়ে ভালোই করেছে। আবার পরক্ষণেই মনে হয় ‘এসকেপিজিম’ মানে আরেকজনকে জিতিয়ে দেওয়া। যা হয় হোক, বাড়ির সবাই চলে গেলেও সে এখান থেকে নড়বে না।

.

স্ট্যাচু! নড়বে না।

হালিমা ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু বলতে গেলে হুজত হাত তুলে বলেন, না না কথা বলাও যাবে না, চুপ করে থাকো।

স্বামীর আদেশ পালন করতে হালিমা এক জায়গায় থেমে থাকে। হুজত এগিয়ে এসে তার গালে চুমু খেয়ে বলেন, সকালের জন্য সরি। তখন ওভাবে তোমায় ধমকানো উচিত হয়নি।

কিছু না বলে হালিমা রান্নাঘর থেকে রাতের খাবার এনে মাটিতে বিছোনো দস্তরখানে রাখে।

চলে এসো। ঠান্ডা হয়ে যাবে।

আগে বলো, মাফ করলে কিনা?

কর দিয়া। অব আও।

গলা শুনেই বোঝা যায় বরফ গলেনি। তাও সে হুজতের সঙ্গে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। থালায় খাবার বেড়ে এগিয়ে দেয়।

গোস্তাবা আর লাগলে বলো। ভাত অল্প দিলাম, তুমি তো আজকাল রাতে বেশি খেতে চাও না।

তুমি খাবে না?

হ্যাঁ।

হুজত হাত ধুয়ে ভাতের ওপর গোস্তাবা ঢালতে গিয়ে থেমে যান।

তার আগে আমায় বলো। সকালে কী একটা বললে…পণ্ডিতদের ঘরের আগুন আমাদের ঘরে লাগবে নাকি…কিছু বুঝিনি তখন।

হালিমা চোখ নামিয়ে নিজের পাতে খাবার বাড়তে থাকে, উত্তর দেয় না।

কী হল বলো! কী বলতে গেছিলে?

কিছু না।

না বললে আমি আজ খাব না। হুজত পাত থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বলেন, বলো আগে।

আহ! হুজত সাব…খানা খালো।

নহী।

হালিমা গোস্তাবার হাঁড়িতে হাতাটা রেখে বলে, জিদ মত করো। পহলে খালো…

আমি জিদ্দি, ইউ নো।

জানি। তাই বলছি। খেয়ে নাও। তারপর নাহয়…

খাওয়ার আগে বললে কী হবে?

হুজতের সন্দেহ গাঢ় হয়। খাবারের থালা সরিয়ে খানিক এগিয়ে এসে হালিমার হাত নিজের মাথায় রাখেন তিনি।

বলো, নাহলে…

সঙ্গে সঙ্গে হালিমা হুজতের মুখে হাত রাখে।

তো ফির বতাও।

যাদের তাড়াবার জন্য এত কিছু করছ তাদেরই একজনের সঙ্গে তেহজিব প্রেম করছে। জম্মুর কলেজে।

মাথায় বাজ পড়ে হুজতের। নিজের মেয়ের সম্বন্ধে এমন কথা শুনতে হতে পারে হুজত ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকেন হালিমার দিকে।

তাই তখন বললাম যে…

কওন হ্যায় লড়কা?

করণনগরে থাকে। ভালো পরিবারের ছেলে।

নাম?

হালিমা চুপ করে থাকে।

জওয়াব দো! হুজতের গলার আওয়াজে সে কেঁপে ওঠে।

অনুরাগ মুন্সী।

তুমি চেনো?

ওর দাদা মহেন্দ্র মুন্সীর কাছে তেহজিব এক সময় টিউশান নিতে যেত। সেখানেই আলাপ। তারপর কলেজে পড়তে গিয়ে…

ব্যাস!

হুজতের মুখ লাল হয়ে উঠেছে।

কাল হি বুলাও উসকো জম্মু সে। এই মাসেই ওর বিয়ে দিয়ে দেব।

নেহাত খাবার ফেলে উঠতে নেই তাই যা হোক করে কিছু খেয়ে হুজত স্টাডিরুমের রকিং চেয়ারটায় বসে সিগারেট ধরান। ভেতরটা অস্থির অস্থির করছে। তেহজিব হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল অনেকদিন। মুখে মুখে তর্ক করা, হুজতের কাজের খুঁত ধরা, ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা। এসব বাড়াবাড়ি দেখেই তাকে জম্মু পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু পণ্ডিতের ছেলের সঙ্গে প্রেম করলে এই মুহূর্তে কাশ্মীরি মুসলিম সম্প্রদায় মেনে নেবে না।

মিনিস্ট্রি তো দূর, হুজতের এখানে থাকাও মুশকিল হয়ে যাবে। বারণ করেও কাজ হবে না, মেয়েকে হুজত খুব ভালো করে চেনেন। জোর করে সম্পর্কে ইতি টানতে বললেই সে বেঁকে বসবে। তার থেকে তাকে তলে তলে যা করার করতে হবে।

টেবিলের ওপর রাখা ফোনটায় নজর যেতে রিসিভার তুলে হুজত নম্বর ডায়াল করেন।

সাজিদ।

স্যার! এত রাতে?

করণনগরের মহেন্দ্র মুন্সীকে আমার চাই।

.

১৭

জগা ক’দিন ছুটিতে ছিল, ফিরে গাছের পরিচর্যা করতে গিয়ে দেখে বেশ কয়েকটা মরে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোও কেমন নেতিয়ে পড়েছে। খুরপি দিয়ে গোড়া খুঁড়ে, মাটির ভেতর শেকড় ঢুকিয়ে জল ঢালে ভালো করে।

আমি না থাকলেই কারোর আর খেয়াল নেই। গাছ বলে কি মানুষ নয়? প্রাণ নেই? আরে বাবা, নিজেরাই তো শখ করে পুঁতেছিলে। তাহলে এখন অবহেলা কেন?

কী রে জগা, নিজের মনেই বকে চলেছিস? থলি হাতে শিবাজী গেটের দিকে এগোতে এগোতে বলেন।

না বাবু, বলছিলাম যে গাছগুলো এ ক’দিন কি জল পায়নি?

জানি না। জানার মতো মনের অবস্থা এখন কারোর নেই। শেষ কথাগুলো নিজেকে বলে শিবাজী গেট খোলেন।

কেন, আবার কী হল? জগা খবরের গন্ধে খুরপি ফেলে এগিয়ে আসে।

কিছু না। তুই কাজ কর।

শোনো, শিঙি পেলে এনো তো। তোমার মেয়ে খেতে চেয়েছে।

মাথা নেড়ে শিবাজী বেরিয়ে গেলেন। অনিমা জগাকে বলেন, আজ পঞ্চমী আসেনি, দুটো নারকোল কুরে দিবি?

এইতো দিন না, হাত খালি।

বাগানের কলে হাত ধুয়ে নারকেল কুরুনি নিয়ে জগা রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় বসে পড়ে।

আচ্ছা মা, বড়দাবাবুর খবর সব ভালো তো?

হ্যাঁ রে।

আর ছোড়দাবাবুর?

ভালো।

পাড়ায় শুনছিলাম সেও নাকি কোথায় চলে গেছে?

অনিমা সতর্ক হয়ে যান।

কাজে গেছে।

তবে মল্লিক মাসিমা বলছিল, বউ আসার পরেই সবাই কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল।

অনিমা নারকেলের জল ছেঁকে গ্লাসে ঢালতে গিয়ে থেমে বলেন, তাই নাকি?

হ্যাঁগো মা। দুঃখ করছিল, জমজমাট বাড়িটায় এখন যেন নিশি ডাকে।

ছাকনিটা টেবিলে রেখে বাইরে বেরিয়ে আসেন অনিমা। ওনাকে বলিস আমি বলেছি নিজের চরকায় তেল দিলে ভালো হয়। বউমার সঙ্গে ঝগড়ায় তো কান পাতা যায় না।

তা যা বলেছেন মা।

হে হে করে হেসে জগা নারকেল কোরায় মন দেয়। অনিমাও নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

সিঁড়ির মাথা থেকে সবটা শোনেন সুষমা। জগাকে ধমকাতে গিয়েও কিছু না বলে ঘরে ফিরে আসেন।

আজকাল সারাক্ষণ বুকের ভেতরটা আনচান করে। দুই ছেলে বাড়ি ছেড়ে কতদূরে পড়ে আছে। কবে আসবে কে জানে?

অনিন্দ্যরা চলে যাওয়ার পর থেকে মল্লিক গিন্নির মতো তারও এ কথা মনের কোণে উঁকি মারেনি তা নয়, কিন্তু তিনি পাত্তা দেননি। কিন্তু অম্লান চলে যাওয়ায় উঠতে বসতে বারবার মনে হচ্ছে, তবে কি সংসারে অলক্ষ্মীর পা পড়ল? অনির কথায় নেচে কোথা থেকে এক অপয়া মেয়েকে বউ করে নিয়ে এসে সর্বনাশ করলেন শেষে?

আজেবাজে বোকো না তো! সুনীতি সুষমার মনের সন্দেহকে দাবিয়ে দিয়েছিলেন।

আমায় ছুঁয়ে বলো তো, তোমার মনে একবারও এ কথা আসেনি?

না আসেনি। এসব কূটকচালি আমার মাথায় আসে না।

আমি কূটকচালি করছি না, আলোচনা করছি।

প্লিজ কোরো না। অন্য কথা বলার থাকলে বলো, নাহলে চুপ করে থাকো।

চুপ করে থাকলেই কি সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যায়? ফুলশয্যার রাত থেকে অঘটন শুরু হয়েছে। বিদেশ বিভূঁইয়ে অনি পড়ে আছে, চাকরিটাও হয়ত থাকবে না। দুর্গাপুজো, কালীপুজো সব ছেলে-বউ ছাড়া কেটে গেল। যাও বা কেস জিতে ফিরে আসার একটা ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যেই ছোট ছেলেটা আগুনে ঝাঁপ দিল। কাশ্মীরের কথা কে ঢোকালো ওর মাথায়?

স্ত্রীর বাকি কথা পাত্তা না দিলেও সুনীতি অনেকবার ভেবেছেন এই বিষয়টা নিয়ে—অম্লানকে কাশ্মীর যাওয়ার বুদ্ধিটা কে দিল?

.

আমি দিয়েছি।

অর্পিতার কথা শুনে শিবাজী হতবাক।

তুই? মানে তুই কোত্থেকে জানলি যে কাশ্মীরে…

মায়ের কাছেই তো শুনলাম। ছোড়দা বলছিল বউদির বাবার ওপর ডকুমেন্টরি করতে জেরুসালেম যাবে, তাই আমি সাজেস্ট করলাম তুই কাশ্মীর যা।

অত্যন্ত অন্যায় কাজ করেছ তুমি! শিবাজী ঝাঁঝিয়ে ওঠেন। কোনো আইডিয়া আছে ওখানে কী হচ্ছে?

জানি বাবা। তাই তো বললাম যেতে। আমার থেকেও ছোট একটা মেয়েকে…

আমি এসব শুনতে চাই না।

কেউ চাইছে না। ওই মেয়েটা যদি তোমার মেয়ে হত আর সবাই যদি তোমার মতো শুনব না বলত তখন কী করতে?

বুবলি!

এবার ধমকে ওঠেন শিবাজী।

বড় বড় কথা বলতে শিখেছ না? একবারও ভেবে দেখেছ বাপ্পার কিছু হয়ে গেলে কী সাংঘাতিক একটা কাণ্ড ঘটে যাবে? এমনিতেই দাদা বউদি অনি আর আলিয়াকে নিয়ে পাগল হয়ে আছে…ছি ছি! ভেরি ভেরি ব্যাড। তুমি জানো বাপ্পা হুজুগেবাজ ছেলে। তাকে নাচাবার আগে একবারও ভেবে দেখলে না?

.

কেস নিয়ে শেফটেলের ভাবার দিন শেষ। এতদিন সরকার পক্ষের উকিল একটার পর একটা সাক্ষী এনে তাক লাগিয়ে কেস তাদের দিকে করে নিয়েছেন। মাস জেনোসাইড নিয়ে পাবলিক সিমপ্যাথি আছেই। তাই শুধু জেরুসালেম নয়, যেখানে যত ইহুদি আছে সবাই এই কেসের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রত্যেকটা ডেটে কোর্টে কী হচ্ছে তার খবর রাখছে। রাস্তায়, অফিসে রেস্তোরাঁতে সর্বত্র একটাই আলোচনা, মারকো ডেমিয়ানুকের ফাঁসি নিশ্চিত তো? আইনের ফাঁক দিয়ে লোকটা বেরিয়ে যাবে না তো?

ডালিয়া, ডভ আর জি-ও সমান চাপের মুখে। ঠান্ডা মাথায় হিয়ারিং শুনে যেতে হচ্ছে, কারোর দিকেই তারা বেশি ঝুঁকতে পারবেন না। নিজেদের চেম্বারে অনেক সময় এও আলোচনা করেছেন, কেন শেফটেল একটা হেরে যাওয়া কেস যেচে নিতে গেলেন!

কিন্তু তারা আন্দাজ করতে পারেননি শেফটেল পরের ডেটে এক মোক্ষম ঘুটিকে কাঠগড়ায় এনে হাজির করবেন। এতদিন প্রতিপক্ষের কথা চুপ করে শুনে গেছেন তিনি, টুঁ শব্দ করেননি। এবার তার সময় এসেছে। ভিভিয়ান পোলোনস্কি নামটা ডাকতেই প্যাট্রিশিয়ার গলা শুকিয়ে যায়। আজও জাজেদের ডেস্কের সামনে ইভান আর মারকোর ছবি, তার এক পাশে ভিভিয়ান এসে দাঁড়ান। উল্টোদিকে উইটনেস বক্সে প্যাট্রিশিয়া।

মে আই? শেফটেল জাজদের পারমিশান চান।

প্রসিড।

ভিভিয়ান, সবার আগে জিগ্যেস করি এখানে যারা আছেন তাদের কাউকে আপনি চেনেন?

ইয়েস, অফ কোর্স।

কাকে?

প্যাট্রিশিয়া। আমার স্টুডেন্ট ছিল।

গ্রেট। উনি ছাত্রী হিসেবে কেমন ছিলেন?

ভালো।

শুধু ভালো না বেস্ট?

ভিভিয়ান হাসেন, বেস্ট নয়, তবে বেশ ভালো।

ওকে। প্যাট্রিশিয়া এই মুহূর্তে কী করছেন আপনি জানেন?

জানি। নামকরা ফেসিয়াল এক্সপার্ট, যে হলিউডেও কাজ করছে।

আই সি। আপনি এখানে রাখা দুটো ছবি দেখেছেন?

দেখেছি।

কী মনে হল দেখে? দুজনে এক লোক?

ইম্পসিবল!

ডালিয়া আর ডভ একে অপরের দিকে তাকান। অনিন্দ্য আর আলিয়াও।

কিন্তু প্যাট্রিশিয়া বলছেন দুজনে এক।

আই ডাউট হার।

কেন?

ইটস অভিয়াস ইয়োর অনার। ইফ উই টেক আ ক্লোজার লুক, দুটো মানুষের কানের শেপ দেখুন। ইভানের কানের মাথাটা নর্মাল কিন্তু মারকোর কানের মাথার দিকটা একটু ফোল্ড করা।

ইস হি রাইট প্যাট্রিশিয়া?

শেফটেলের প্রশ্নে প্যাট্রিশিয়া চোখে চশমা এঁটে ভালো করে লক্ষ করে।

বুঝতে অসুবিধে হলে আপনি এখানে আসতে পারেন।

জায়গা ছেড়ে ভিভিয়ানের পাশে এসে আরেকবার দেখে প্যাট্রিশিয়া।

ভিভিয়ান যা বললেন সেটা কি সত্যি?

আই…আই মিন টু সে…

কাম টু দ্য পয়েন্ট প্যাট্রিশিয়া। ডালিয়া অর্ডার করেন।

গলা খাঁকারি দিয়ে প্যাট্রিশিয়া বলে, ইয়েস, মনে হচ্ছে তাই।

আই হোপ দ্য কোর্ট রিমেমবার্স, উনি বলেছিলেন বয়সের সঙ্গে অনেক কিছু পাল্টালেও কানের শেপ পাল্টায় না। তাহলে মারকোর কান কম বয়সে একরকম আর বয়সে ফোল্ড হয়ে যেতে পারে কি ইয়োর অনার?

প্যাট্রিশিয়া ঘামতে শুরু করে। ওদিকে মাইকেল অস্বস্তিতে। বাকি সবাই খানিক হতাশ হলেও একমাত্র আলিয়ার মুখে প্রশান্তি। মনে মনে তার ঈশ্বরকে সে ধন্যবাদ জানায়, এখানে আসার পর এই প্রথম।

আন্সার হিম প্যাট্রিশিয়া। ডভের গলার সুর চড়ে।

না, পারে না।

তাহলে আপনি কীভাবে বললেন দুটো লোক এক! শেফটেল সামান্য তেড়ে ওঠেন।

অবজেকশান! উনি আমার উইটনেসকে অ্যাকিউস করছেন। মাইকেল উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।

ওভাররুল্ড। কন্টিনিউ শেফটেল—ডালিয়ার কপালে ভাঁজ।

নাও লেট মি আস্ক ইউ ভিভিয়ান, আর কিছু ফিচারস আলাদা মনে হচ্ছে?

হচ্ছে। সি হিজ আইস। ইভানের চোখের পাশ দুটো সামান্য হলেও নীচের দিকে নামানো কিন্তু মারকোর দুচোখের সাইড ওপরদিকে ওঠা।

ইজ হি রাইট প্যাট্রিশিয়া?

এবার আর বেশি সময় না নিয়ে সে মাথা নাড়ে। ইয়েস।

বয়সের সঙ্গে চোখের শেপ চেঞ্জ হয় ভিভিয়ান?

নো, নেভার। বয়সের ভারে আপনার কাঁধ ঝুঁকে যেতে পারে কিন্তু ডাউন ওয়ার্ডস পয়েন্টেড চোখ কখনোই ওপর দিকে উঠে যাবে না।

তাহলে আপনি সেদিন কোর্টের সময় নষ্ট করলেন কেন মিস প্যাট্রিশিয়া? জাজেরা সবাই বিরক্ত।

নো ইয়োর অনার। আমি, আসলে…মানে…প্যাট্রিশিয়া কীভাবে নিজেকে ডিফেন্ড করবে বুঝতে পারে না।

টেক ইউর সিট। অ্যান্ড মাইকেল, এরপর এমন সাক্ষী এনে কোর্টকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে উই হ্যাভ টু টেক অ্যাকশান।

.

যেভাবে ডালিয়া ডরনার বললেন, সত্যি কি কোনো অ্যাকশান নেওয়া হবে?

কোর্ট থেকে হোটেলে ফিরে আলিয়া ফ্রেশ হয়ে সন্ধের চা আর স্ন্যাক্স অর্ডার করে।

এটা একটা ওয়ার্নিং। অনিন্দ্য একটা ফ্রাইয়েড চিকেন তুলে নিয়ে বলে, আজ একটু ভালো লাগছে তো?

একটু না, অনেকটা অনি। আই অ্যাম সো সো হ্যাপি!

হেসে ফেলে অনিন্দ্য। এমনই হ্যাপি থাকো। তোমায় স্যাডনেস মানায় না।

ইউ নো, আমি আজ গডকে থ্যাঙ্কস জানিয়েছি, বলেই আলিয়া ঘড়ি দেখে, ইন্ডিয়ায় কল করতে হবে, খেয়াল রেখো।

সময় আছে। এখানে সাতটা মানে ওখানে সাড়ে ন’টা, খাওয়ার তোড়জোড় চলছে।

চলো না, ফোন করে আসি। যতক্ষণ না সবটা বলছি আমার তর সইছে না।

আধ ঘণ্টা পর যাই?

বাচ্চা মেয়ের মতো আলিয়া অনিন্দ্যর হাত ধরে টানাটানি শুরু করলে তাকে অগত্যা উঠে পড়তে হয়। রুম লক করে রিসেপশানে এসে কল বুক করে।

আমি বলব, তুমি না।

মজা লাগে অনিন্দ্যর। অনেকদিন পর সেই পুরোনো আলিয়াকে পাওয়া গেছে। মাঝের কয়েক মাস বেচারি কেমন গুটিয়ে গিয়েছিল। মুখে না বললেও সারাক্ষণ একটা যন্ত্রণা কুরে কুরে খেত। মারকোকে নিয়ে তার শ্বশুরবাড়ির কাছে যে অসম্মান হয়েছে সেটাকে ফেস করতে চাইত না। কলকাতায় ফোন করলে কথা বলত না। বলত যেদিন ভালো খবর হবে সেদিন সে যেচে কথা বলবে। আজ তার সেই দিন।

স্যার, ইয়োর কল।

রিসেপশান থেকে ডাকলে সোফা ছেড়ে আলিয়া লাফিয়ে এগিয়ে যায়।

হ্যালো, বাবা। একটা গুড নিউজ আছে…ইয়েস, ফাইনালি থিংস আর লুকিং ব্রাইট অ্যান্ড সানি। আজ আমাদের উকিল কোর্টে তাক লাগিয়ে দিয়েছে…

বউয়ের হাসিমুখ দেখে অনিন্দ্যর ভালো লাগে, মিষ্টি মুখটায় আজ যেন হাজার সূর্য উঠেছে। বুড়ো আঙুল দিয়ে চোখের কোনার জল মুছে পাশে গিয়ে রিসিভার চাইতে দেখে ধীরে ধীরে আলিয়ার হাসি মিলিয়ে যাচ্ছে।

কী হয়েছে? এনিথিং রং?

অনি…

ফোনটা প্রায় ছিনিয়ে নেয় অনিন্দ্য। হ্যালো, হ্যাঁ বাবা কী হয়েছে? বাপ্পা ঠিক আছে তো?

ওপাশ থেকে সুনীতির ম্রিয়মান গলা শোনা যায়, বাপ্পা ঠিক আছে কিন্তু তোর মা ঠিক নেই।

মানে?

তোর মায়ের একটা স্ট্রোক হয়েছে। নানা ব্যাপারে টেনশান করতে করতে…এদিকে আজ দুপুর থেকে শিবাজীর ধুম জ্বর। বাপ্পা নেই, তুই নেই। খুব অসহায় লাগছে। তোরা কি একবার আসতে পারবি?

.

১৮

এ সময়ে কাশ্মীরে এতটা ঠান্ডা হবে আশা করেনি ওরা। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ গরম জামা জ্যাকেট আছে ওদের সঙ্গে। শ্রীনগর বাস স্ট্যান্ডে নেমে অম্লান আর সরোজ আগে একটা চায়ের দোকানে ঢুকে পড়ে। চা অর্ডার করে অম্লান চারদিকে নজর বোলায়।

কাশ্মীর! কথায় বলে সুন্দর জায়গায় থাকলে মানুষের মনটাও সুন্দর হয়ে যায়, তাহলে লোকগুলো হানাহানি করে মরছে কেন? দুদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ খেত ঘেরা ধূসর উঁচু পাহাড়। গলা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা বরফের মাফলার জড়ানো। তার ওপারেই কি পাকিস্তান? মনে প্রশ্ন জেগেছে। বাসে বসা লোকগুলোকে দেখে সন্দেহ হয়েছে এদের মধ্যে কি কেউ টেররিস্ট? ফেরানের ভেতর থেকে লুকিয়ে রাখা বন্দুক বার করে কখন কার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে কেউ জানে না। হয়ত মাঝরাস্তায় ব্লাস্ট করে বাসটাকে উড়িয়ে দিতে পারে! অজানা আতঙ্কের আর এক নামই কি কাশ্মীর?

আশপাশের দৃশ্যের সঙ্গে এইসব কঠিন মুখগুলোর ভিডিও করতে করতে এসেছে সরোজ। একে পরিস্থিতি প্রতিকূল তার ওপর ক্যামেরা হাতে দেখলে লোকজন চড়াও হতে পারে ভেবে কিড ব্যাগে ফুটো করে লেন্স তাক করে রেখেছে। এখনও অবধি সেরকম কিছু চোখে না পড়লেও বাস স্ট্যান্ডে ‘কুপর উপর’ ডাক শুনতেই মনে পড়ে অবন্তী কিচলু বলেছিলেন পি ও কে যাওয়ার জন্য এভাবে সওয়ারি ডাকা হয়।

যাবি নাকি?

পাগল!

সরোজ চা শেষ করে পয়সা মিটিয়ে আসে। অফিসার আরবাজের সঙ্গে আগে দেখা করতে হবে।

সেতো হবে। কিন্তু…চল না একবার ঘুরে আসি। কভার করতে এসে ভয় পেলে চলবে? অম্লান চা শেষ করে সিগারেট ধরায়।

না না, একদম না। এসেই জান খোয়াতে পারব না।

বন্ধুর কথা কানে না তুলে অম্লান বাসের দিকে এগোয়, ভাই, কখন ছাড়বে?

পাঁচ মিনিটে। যাবেন?

যাব। অম্লান হাত নেড়ে সরোজকে ডাকে।

এক দৌড়ে সরোজ এগিয়ে এসে বলে, পাগলামি করিস না অম্লান, কেস খেয়ে যাব দুজনেই। সঙ্গে ক্যামেরা আছে।

কে কার কথা শোনে! সিগারেটে শেষ টান মেরে সরোজকে ঠেলে তুলে অম্লান বাসে উঠে বসে। স্থানীয় লোকেরা কাশ্মীরি ভাষায় কী বলছে বোঝা যায় না, তবে ঠান্ডা শব্দটা কয়েকবার কানে আসে।

খুব ঠান্ডা নাকি? অম্লান জানতে চায়।

বরফ স্টার্ট হয়ে গেছে। কুপওয়ারা মে বহুত স্নো গিরা কল।

এখনি?

নভেম্বরের শেষ, ক’দিন পর এই বাসও বন্ধ হয়ে যাবে।

অম্লানের হাতটা সরোজ খামচে ধরে, এখনও বাস ছাড়েনি, চল নেমে যাই। আটকে গেলে কী হবে?

উত্তর না দিয়ে অম্লান কথা চালিয়ে যায়। কুপওয়ারাতে হোটেল আছে?

প্রশ্ন শুনে লোকটা পাশের লোকের দিকে তাকিয়ে হাসে। হোটেল? এইতো বারামুল্লাহ ভেঙে দশ বছর হল সবে কুপওয়ারা তৈরি হয়েছে।

শুনলি? আমরা কি রাস্তায় থাকব?

হয়ে যাবে কিছু একটা, দাঁড়া না।

কী হয়েছে ভাই, কুছ প্রবলেম হ্যায়?

নহী। ভাবছিলাম কোথায় থাকব।

আপনারা ট্যুরিস্ট?

হ্যাঁ।

এই সময় বেড়াতে এসেছেন, তাও কুপওয়ারা! কেউ তো ওদিকে যায় না।

একটা একটা করে মাথা তাদের দিকে ঘুরতে থাকে। অম্লান এবার অস্বস্তিতে, মনে মনে উত্তর খোঁজে।

বাস স্ট্যান্ডে চা খাচ্ছিলাম, কানে এল কুপর…ব্যাস উঠে পড়লাম। সরোজ ম্যানেজ দেয়।

শুধু কুপর কানে এল? উপর আসেনি?

গম্ভীর গলায় একজন বলে উঠলে দুজনে তার দিকে তাকায়।

ভুরু নাচিয়ে সে আবার জানতে চায়, কী, আসেনি?

এসেছে। হমনে সোচা, উপর মানে পাহাড়ের ওপর অবধি বাস যাবে।

বাসসুদ্ধ সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে। নিজেদের ভাষায় তাদের নিয়ে ইয়ারকি ঠাট্টা চলে খানিক। কিছু না বুঝলেও মুখে হাসি ঝুলিয়ে দুজনে মাথা নাড়তে থাকে।

কোই নহী। আপনারা আমার বাড়িতে থেকে যান, যতদিন ইচ্ছে। গম্ভীর গলার লোকটি এবার উঠে এসে ওদের সামনের সিটে বসে। আসতে করে বাসের চাকা গড়াতে শুরু করেছে।

না না, তাই হয় নাকি। আমরা বাইরের লোক…

আমাদের কাছে মেহমান ভগবান, আপনাদের শ্রীনগর ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। লোকটা এবার হাত বাড়িয়ে দেয়, আমার নাম রওফ। আপনাদের নাম?

মুখে কথা নেই ওদের। সরোজ ভাবে আইডেন্টিটি লুকিয়ে মুসলিম নাম বলবে কিনা।

কেয়া হুয়া? নাম?

অম্লান বসু আর সরোজ প্রসাদ।

হিন্দু মেহমান! কোথা থেকে আসছেন?

আমি কলকাতা আর…

আমরা দুজনেই কলকাতার। সরোজ অম্লানের পায়ে ধাক্কা মারে। জানে দিল্লি শুনলে রিঅ্যাক্ট করতে পারে।

কলকত্তা! বহত অচ্ছে হোতে হ্যায় কলকত্তাকে লোগ। কোই বাত নহী। আজসে আপ মেরি জিম্মেদারি।

.

মহেন্দ্রর গা ঘেঁষে বাসটা বেরিয়ে যায়।

এ ভাই, সরে দাঁড়ান! ধাক্কা লাগলে তো ড্রাইভারের দোষ হবে। হেল্পার চেঁচায়, পণ্ডিত হ্যায় কেয়া তু?

কথাটা কানে যেতে অম্লান জানলা দিয়ে দেখে চশমা পরা নিরীহ গোছের একটা লোক বাসের দিকে তাকিয়ে আছে। ধমক খেয়ে সম্বিৎ ফিরলে সাইকেল নিয়ে এক পাশে সরে আসে মহেন্দ্র। সেদিনের পর থেকে সত্যি তার মাথা কাজ করছে না, ঘুম উড়ে গেছে।

হুজতের অফিস থেকে সমন আসার পর বাড়ির সবাই রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেও মহেন্দ্র স্টেডি ছিল।

এত ভাবছ কেন তোমরা? আমরা তো আর কাউকে খুন করিনি যে চিফ মিনিস্টার পুলিশের হাতে তুলে দেবে!

মুখে এসব বললেও মনটা খচখচ করছিল কেন তাকে ডেকে পাঠালো।

সকাল ন’টায় আসার কথা, মহেন্দ্র দশ মিনিট আগেই চলে আসে। আসতেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে হুজতের অফিস ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। হুজত হাত দেখিয়ে তাকে সামনের চেয়ারে বসতে বলেন।

চা?

খেয়ে এসেছি।

বেয়ারা বেরিয়ে যায়। ঘরে এখন আর কোনও তৃতীয় ব্যক্তি নেই।

আমার মেয়ে তেহজিব তোমার কাছে টিউশান নিত?

আজ্ঞে হ্যাঁ। অনেকদিন আগে।

অনুরাগ মুন্সী কে?

আমার খুড়তুতো ভাই। মহেন্দ্র অবাক হয়ে বলে, কেন?

উসকো ঘর আনে মত দো।

মহেন্দ্র প্রথমটায় বোঝে না। মতলব?

মতলব জব তক তেহজিবকা নিকাহ নহী হো রহা হ্যায়, ও যেন বাড়ি না আসে।

কিন্তু তেহজিবের নিকাহর সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?

ফিজুল কি বাতে ম্যায় নহী করতা। হুজত ধমকে ওঠেন, সম্পর্ক আছে বলেই বলছি। তোমার নালায়েক ভাই আমার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে। তেহজিবকে ডেকে পাঠিয়েছি, আজ বাড়ি আসছে। ওর দেখাদেখি যদি তোমার ভাই পেছন পেছন আসে তবে পণ্ডিতদের লাশের মধ্যে আরেকটা লাশ যোগ হলে আমায় দোষ দিও না।

হুজতের কথাগুলো যতবার মনে পড়ে মহেন্দ্রর শিরদাঁড়া হিম হয়ে যায়। বাপ মরা ভাই তার, মায়ের সঙ্গে তাদের কাছেই থাকে। সে নিজে জম্মু গিয়ে অনুরাগকে বলে এসেছে এখন বাড়ি না আসতে। ভাই বারবার কারণ জানতে চাওয়ায় বলেছে অশান্তির জেরে হামেশা কারফিউ চলছে, বাইরের কাউকে দেখলে হাজারো জেরা। জানে না এসব বলে কতদিন আটকে রাখতে পারবে অনুরাগকে, কারণ ডিসেম্বরে কাকিমার জন্মদিনে তার বাড়ি আসার কথা। এর মধ্যে তেহজিবের বিয়ে হয়ে গেলে ভালো, নাহলে…মহেন্দ্র আর ভাবতে পারে না, মাথা ঘুরে যায়। কোনোমতে দোকানের পাল্লা ধরে নিজেকে সামলায়।

দোকান বন্ধ করার সময় হয়েছে আকবরের। এখন কোনো কাস্টমারকে মাংস বেচতে পারবে না বলতে গিয়ে আকবর দেখে, লোকটা কেমন টলছে।

কী হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ?

মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল।

মহেন্দ্র স্যার!

চেনা গলা পেয়ে মহেন্দ্র ঘুরে দেখে আলিয়া এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে।

দোকানে তালা দিতে দিতে আকবর বলে, বেটি, এই সময় এখানে?

একগাল হাসে আলিয়া। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। দেখলাম আপনি বেরোচ্ছেন, দাঁড়িয়ে গেলাম।

স্কুল যাওনি?

আলিয়া এড়িয়ে যায়। চাচা, শাহিদকে অনেকদিন দেখছি না?

বাড়িতে রোজ এ নিয়ে কথা হয়। সে জানে সইফ শাহিদের সঙ্গে এমন কোথাও গেছে যা বলে গেলে মুশকিলে পড়ত। অনেক চেষ্টা করেও কারোর থেকে জানতে পারেনি, ওদের বন্ধুরাও এড়িয়ে গেছে। তাই অগত্যা বটমালুতে শাহিদের বাবার দোকানে আসা। ছেলের কথা জানতে চাইতেই আকবরের চোখ মুখ পাল্টে যায়।

শাহিদের সঙ্গে কী দরকার?

অনেকদিন মহল্লায় দেখি না। তাই…

দোকানের চাবি জামার পকেটে রেখে আকবর স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল বের করে বলে, কাম সে গয়া হ্যায়।

কাহাঁ?

বোলকে নহী গয়া। চলো, খুদা হাফিজ।

এক সেকেন্ডের মধ্যে আকবর সাইকেল চালিয়ে কেটে পড়ে সেখান থেকে।

ঝুঠা আদমি! সব মালুম হ্যায় ইসকো।

আলিয়াকে অনেকদিন চেনে মহেন্দ্র, কখনো এমন রেগে যেতে দেখেনি। একটু অবাক হলেও কিছু জিগ্যেস না করে সাইকেল নিয়ে বেরোতে যায়। এতক্ষণে আলিয়া লক্ষ করে মহেন্দ্রর হাঁটাচলা স্বাভাবিক লাগছে না।

স্যার, কী হয়েছে আপনার?

কিছু না।

বলুন না স্যার, আমি যদি কোনো হেল্প করতে পারি।

ইচ্ছে হয় মনের কথা বলে হালকা হতে। কিন্তু এমন একটা পরিবারের সঙ্গে গন্ডগোল বেঁধেছে যে এই ডামাডোলের বাজারে বলা ঠিক হবে না। তাছাড়া আলিয়া বাচ্চা মেয়ে। পাঁচকান হয়ে গেলে মহেন্দ্রকে আস্ত রাখবে না হুজত। এসব ভেবে সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে সিটে বসতে যাবে, এমন সময় কিছুটা দূরে একটা বাস এসে থামে।

বটমালু, বটমালু…উতরো।

হেল্পার পা দানি ছেড়ে নেমে দাঁড়াতে হুড়মুড় করে যাত্রীরা নামতে থাকে। সাইকেল নিয়ে মহেন্দ্র ততক্ষণে বাসের কাছাকাছি চলে এসেছে। পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে চোখ পড়ে যাওয়ায় ব্রেক কষে সাইকেল থামায়। লাল জ্যাকেট, পিঠে ব্যাগ নিয়ে খোশমেজাজে বাস থেকে নেমে আসছে অনুরাগ।

.

১৯

কোর্ট চত্বরে প্রবেশ করতেই একদল ক্যামেরাধারী সাংবাদিক জন আর আলিয়ার কাছে ধেয়ে যায়।

কী মনে হচ্ছে? মারকো ফাইনালি ছাড়া পেয়ে যাবে?

দুজনকেই শেফটেল বলেছেন মিডিয়ার সঙ্গে কথা না বলতে। এড়িয়ে যেতে গেলে এরা রাস্তা আটকায়।

আইন কি সবার জন্য এক? নাকি যাদের পয়সা আছে তাদের জন্য আলাদা?

প্রশ্নটা শুনেই মাথাটা গরম হয় জনের।

ওয়াট ডু ইউ মিন?

যে প্রশ্ন করেছে সে মুচকি হেসে বলে, ইউ নো ওয়াট দ্যাট মিন্স।

নো, আই ডোন্ট! কারণ এতগুলো মাস এখানে কীভাবে আমরা আছি সেই খবর কি মিডিয়া রেখেছে? উই আর অলমোস্ট ফিনিশড। উকিলকে টাকা দিতে পারছি না।

দাদার হাতে ধরে টানে আলিয়া, কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বলে, এরা প্রোভোক করছে, ইগনোর।

তবু জন থামে না, শুধু তাই নয়, একজন বেকসুর লোকের ওপর দিয়ে কী যাচ্ছে সেটা আপনারা দেখছেন? একজন অসুস্থ বয়স্ক মানুষকে এতদিন সেলে আটকে রেখে দিয়েছে, কিছু হয়ে গেলে ইজরায়েল সরকার দায় নেবে? এগুলো নিয়ে আপনারা কথা বলবেন না, ইউ জাস্ট ওয়ান্ট ব্রেকিং নিউজ, রাইট?

কোনোমতে জনকে ভিড় থেকে বার করে আলিয়া কোর্টরুমে ঢোকে। তার মনে হয়, সেখানেও সবক’টা চোখ তাদের দিকেই কেমন একটা ঘৃণাভরে তাকিয়ে আছে। বেঞ্চে বসে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে পাশে রাখতেই বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। অনিন্দ্য নেই। সে একা। থাকলে হয়ত জনকে এসব বলতে দিত না, হাসিমুখে মিডিয়াকে ট্যাকেল করে বেরিয়ে আসত।

তাহলে কি আলিয়া সিচুয়েশন ট্যাকেল করতে শেখেনি এখনো? তা কী করে হয়? কবে থেকে সে বাড়ির বাইরে। একা একটা দেশে গিয়ে পড়াশোনা করেছে, নতুন ভাষা শিখেছে, নতুন মানুষের সঙ্গে সংসার পেতেছে, বাবার জন্য লড়াই করতে আরেক দেশে এসেছে…সে ট্যাকেল করতে পারে না তো কে পারে? তাহলে সেদিন অনিন্দ্যর সঙ্গে ও কি দুর্ব্যবহার করে ফেলল, নাকি অনিন্দ্য তার মন বুঝতে চাইল না?

আমি টিকিট বুক করছি। কাল পেয়ে গেলে ভালো। তুমি তোমার জিনিস গুছিয়ে নাও, আমি আমারটা নেবো।

আমার জিনিস? তুমি কি আমায় ইন্ডিয়া ফিরতে বলছ অনি?

অবাক অনিন্দ্য। বলব না? শুনলে তো মায়ের কী হয়েছে। উই মাস্ট বি দেয়ার।

অনি আমার বাবা…ইউ নো দ্য সিচুয়েশান।

ইউ নো ইট টু বেবি। আমাদের বাড়ি ফিরতেই হবে। বাবা ইজ অ্যালোন।

মাই বাবা ইজ অ্যালোন টু।

হিপ পকেটে ওয়ালেট ভরে বেরোতে গিয়ে দাঁড়ায় অনিন্দ্য। একা কোথায়? জন আছে তো। আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি, ও বলল ইফ আলিয়া ওয়ান্টস, যেতে পারে…

আই ডোন্ট ওয়ান্ট। আলিয়া সামান্য দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, পরের ডেট আমাদের জন্য মারাত্মক ইমপর্ট্যান্ট। পুরো কেসটা তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

শেফটেল তো বলেছে, কী হবে। আমরা জিতছি।

থামিয়ে দেয় আলিয়া। জিতছি আর জিতে গেছির মধ্যে অনেক ফারাক। আমার পক্ষে এই মুহূর্তে যাওয়া ইম্পসিবল।

ভুরু তুলে তাকায় অনিন্দ্য। কেন? জন যথেষ্ট রেসপনসিবল। তোমার কি মনে হয়, তুমি না থাকলে…

খাটের ধারে মাথা এলিয়ে আলিয়া চোখ বন্ধ করে। তুমি বলছ জন আছে, সে রেসপনসিবল। ইয়েস হি ইজ। কিন্তু আমার মনের অবস্থাটা বোঝো। কেসের দিনগুলোতে না থাকলে আই উইল ডাই। ওই একটা দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য বাবাকে দেখতে পাই। এই সময় বাবার পাশে থাকাটা সবথেকে জরুরি।

আর আমার মায়ের পাশে? অনিন্দ্যর গলা অন্যরকম শোনায়।

সেটাও ইকুয়ালি ইমপর্ট্যান্ট বলেই তোমায় আটকাচ্ছি না অনি। ইউ প্লিজ গো। তোমার বাড়ির লোক নিডস ইউ।

খাটের ধারে আসে অনিন্দ্য। মুখ থমথম করছে।

তোমার বেলায় আমি তো সব ছেড়ে চলে এসেছিলাম। চাকরির পরোয়া করিনি, এমনকী বাড়ির কারোর কথা কানে তুলিনি। সেটার কোনো দাম নেই? অ্যান্ড আমার বাড়ির লোক নিডস ইউ টু।

এটা দর কষাকষির সময় নয়। যাও, টিকিটের বন্দোবস্ত করো।

তুমি তাহলে যাবে না, ফাইনাল?

আলিয়া অনিন্দ্যর কাছে এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরে। আমাদের দুজনেরই মনের অবস্থা ভালো নেই। কেন খুঁচিয়ে ঘা করে এটাকে ইস্যু করতে চাইছ?

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অনিন্দ্য আস্তে করে আলিয়ার হাতটা ছাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। দুদিন পর চলে যাওয়ার সময় পর্যন্ত সে তার সঙ্গে নিজে থেকে একটা কথাও বলে না। আলিয়া কিছু জিগ্যেস করলে উত্তর দিয়েছে, অবান্তর মনে হলে চুপ করে থেকেছে। এয়ারপোর্টে আসতে চেয়েছিল আলিয়া, অনিন্দ্য ট্যাক্সিতে ওঠার সময় মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে বুঝিয়ে দিয়েছে এক সন্ধেয় ও কতটা পর হয়ে গেছে।

.

তুই একা? আলিয়া আসেনি?

অনিমা দরজা খুলে অনিন্দ্যকে একা দেখে অবাক।

ওর বাবার কেসের ডেট সামনে, তাই আসতে পারল না।

ও। আয় আয়…

অনিমা কথা না বাড়িয়ে হাঁক পাড়েন, দাদা, অনি এসেছে।

দোতলা থেকে সুনীতি নেমে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন।

তুই পাশে না থাকলে আমি জোর পাই না কিছুতে। বয়স হচ্ছে তো।

অনিন্দ্য বাবার চোখ মুছিয়ে দেয়। আজ তো আর দেখতে যাওয়া হবে না। কাল সকালেই…

ওদের কথার মাঝেই অর্পিতা বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। দাদা!

কীরে বুবলি, কাকু কেমন আছে?

জ্বর নেই, তবে খুব উইক।

চলো বাবা, ঘরে যাই।

বউদির বাবার কেসের খবর কী রে? অল ওকে তো?

আজ খুব ক্লান্ত, কাল বলছি সব।

অনিন্দ্য দাঁড়ায় না। লাগেজ টেনে দোতলায় উঠে নিজের ঘরে আসে। আলো জ্বালাতেই খাটটা দেখেই ফুলশয্যার রাতের কথা মনে পড়ে। কনে সেজে আলিয়া বসে গান গাইছে।

‘তুমি যে আমার দিশা অকূল অন্ধকারে

দাওগো আমারে ভরে নীরব অহংকারে।’

.

সাইলেন্স ইন দ্য কোর্ট!

ডালিয়ার গলার আওয়াজে আলিয়ার হুঁশ ফেরে। পাশ থেকে ব্যাগটা তুলে কোলে রাখে। যেন অনিন্দ্য এখন ওখানেই আছে।

ইউ ক্যান প্রসিড শেফটেল।

থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার। উই নো হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্ট এডনা রবার্টসন আজ আমার উইটনেস। সো লেট মি আস্ক হার, ইভান ডেমিয়ানুকের আইডি কার্ড আপনি চেক করে দেখেছেন?

ইয়েস।

দেখে কী মনে হল?

বছর পঞ্চাশের এডনা বেশ কনফিডেন্ট। ইটস ভেরি সিম্পল ইয়োর অনার। কার্ডে ইভানের সিগনেচার আসল নয়।

হাও কাম?

ট্রেবলিঙ্কা থেকে যে রেজিস্টার পাওয়া গেছে সেখানে ইভানের হাতের লেখার সঙ্গে এই লেখাটা মিলছে না। মোর দ্যান দ্যাট, আইডিতে দুরকমের ইঙ্ক ইউজ করা হয়েছে। যে কালিতে ইভানের নাম লেখা আছে সেই কালিতে বাকি ডিটেলস আর সিগনেচার করা হয়নি।

শিওর?

টু হান্ড্রেড পারসেন্ট।

নো মোর কোয়েশ্চেন্স।

মাইকেল, ইউর টার্ন।

আমার কোনো প্রশ্ন নেই ইয়োর অনার।

শেফটেল আজকে কোর্টরুম দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। আমার পরের উইটনেস, ফরেনসিক এক্সপার্ট জুলিয়াস গ্রান্ট।

এডনা নেমে যেতেই জুলিয়াস উইটনেস বক্সে এসে বসে মাইক্রোফোন তার হাইটে অ্যাডজাস্ট করে নেয়।

এডনা যা বলে গেলেন তার সঙ্গে আপনি একমত?

ইয়েস।

এই কোর্টকে আপনার আর কী জানানোর আছে?

অবজেকশান। হি ইজ পুটিং ওয়ার্ডস ইন হিজ মাউথ। মাইকেল জানে কথা বলা অবান্তর।

ওভাররুল্ড! জাজ ডভ, জুলিয়াসকে হাত দেখিয়ে বক্তব্য পেশ করতে বলেন।

ইভান ডেমিয়ানুকের যে ছবি আইডি কার্ডে আছে সেটায় দুটো স্টেপলার হোলস আছে, দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়? তার মানে ছবিটা কার্ডে স্টেপল করে আটকানো হয়েছিল। কিন্তু আপনি যদি কার্ডের ব্যাক সাইড দেখেন, দেখবেন সেখানে কোনো স্টেপলার হোল নেই। সো ইটস ক্লিয়ার এই ছবিটা অন্য কোথাও থেকে এনে এখানে সাঁটানো হয়েছে।

উই আর উইনিং! জন হাসিমুখে আলিয়ার দিকে ঘোরে। নিজের উত্তেজনা ধরে রাখতে পারে না।

আই স্টেট দিস ইস আ ক্লিয়ার কেস অফ ফরজারি। ইন ফ্যাক্ট এটা ইভান ডেমিয়ানুকের ছবিই নয়।

সবাই অবাক। মৃদু গুঞ্জন শুরু হয় ঘর জুড়ে। ক্যামেরাগুলো ঘুরে যায় মারকোকে তাক করে তার অভিব্যক্তি রেকর্ড করতে।

তাহলে কার ছবি? ডালিয়া জানতে চায়।

এটা ইভান মারচেঙ্কোর ছবি। জার্মানির এস এস আর্মির অন্তর্ভুক্ত ইভান ট্রেবলিঙ্কা নয়, সোবিবোর ক্যাম্পে গ্যাস চেম্বার অপারেটার ছিল। তাকেই ইভান দ্য টেরিবল বলে জানত সবাই। ইভান মারচেঙ্কো কোনোভাবেই মারকো ডেমিয়ানুক হতে পারে না।

আই থিঙ্ক পারে। মাইকেল উঠে দাঁড়ান।

আমি একটা ভিডিও এখানে দেখাতে চাই, ইফ ইউ পারমিট ইয়োর অনার।

পারমিটেড।

জাজেদের ডান দিকের দেওয়ালে টাঙানো পর্দার সামনে প্রজেক্টার ফিট করে সেখানে মারকো ডেমিয়ানুকের জেরুসালেম জেলে বন্দি থাকা কিছু ছবি দেখান মাইকেল।

হ্যাভ আ ক্লোজার লুক। মাইকেল আঙুল তুলে পয়েন্ট করেন, জামা বদলাবার সময় মারকো যখন খালি গা হন তখন তার কোমরের নীচে একটা ট্যাটু দেখা যায়। ক্যান ইউ অল সি?

শেফটেল, জাজেরা, জন আলিয়া সহ সবাই মনযোগের সঙ্গে দেখে।

প্রোজেক্টার অপারেটরকে সামান্য জুম করতে বলেন মাইকেল। এবার দেখুন কী লেখা আছে? ‘বি প্লাস’। মারকোর ব্লাড গ্রুপ। আই হোপ উই অল রিমেমবার একমাত্র এস এস আর্মির শরীরে ব্লাড গ্রুপ ট্যাটু করা হত।

দিস ইস ভেরি ফানি ইয়োর অনার। এস এস আর্মির হাতে ট্যাটু করা হত, কোমরে নয়। শেফটেল হাসেন।

ট্যাটু করা হত সেটা ঠিক তো? কোনো সাধারণ মানুষ সেই সময় গায়ে ব্লাড গ্রুপ ট্যাটু করে রাখত বলে অনারেবল কোর্ট কি শুনেছেন? নাও মিস্টার ডেমিয়ানুক ক্যান ইউ প্লিজ এক্সপ্লেইন?

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *