অশনি ও আবেগথেরাপি
ঘড়িতে সকাল আটটা। কিন্তু অশনি তখনও আড়মোড়া ভাঙছিল। ওর বড় বেড-টি-র শখ। একটু আগেই ও বেড-টি-র স্বপ্ন দেখেছে। মুক্তোমালা আদর করে ওকে ডাকছে। বিয়ের প্রথম দিককার মতো নরম ছোঁয়ায় ওর ঘুম ভাঙাচ্ছে। তারপর ঘুম-জড়ানো চোখ খুলতেই হাতে তুলে দিচ্ছে ধোঁয়া-ওঠা চায়ের কাপ। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে স্বপ্নের মধ্যেই অশনি বুঝতে পারছিল ও ভুল দেখছে—অর্থাৎ, স্বপ্ন দেখছে। ওটা ধোঁয়া-ওঠা চায়ের কাপ না হয়ে হবে রোয়া-ওঠা ফুলঝাড়ু। আর বেড-টি-টা নির্ঘাত ডেথ-বেড-টি।
বিছানায় উঠে বসে সবে প্রথম হাইটা তুলছিল অশনি। হাই ইনকমপ্লিট রয়ে গেল। মুক্তোমালা কী কাজে যেন শোওয়ার ঘরে এসেছিল, ঠান্ডা গলায় ফরমান শুনিয়ে গেল, জলদি বাজারে যাও। বাবার শরীরটা ভালো নয়। দেরি হলে রান্না দেরি হবে, আর রান্না মানে অফিসে দেরি হলে শেষে কিন্তু আমার দোষ দিয়ো না।
বাবা বলতে অশনির পিতা, মুক্তোমালার শ্বশুর। কিন্তু সে কেবল ভারতীয় সামাজিক বিধি অনুসারে। অশনির বদ্ধমূল বিশ্বাস, ওর বিয়ের পর থেকেই ওর নিজের পিতা মুক্তোমালার পিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। তার ওপর মুক্তোমালার আসল পিতা মাইনাস হয়ে গেছে সেই কোন ছোটবেলায়। সেইজন্যই ও হয়তো অশনির ফাদারকে নিজের ফাদারের পুনর্জন্ম বলে ধরে নিয়েছে। কে জানে! মোট কথা ফাদার আর ডটারের স্নেহ-শ্রদ্ধা-ভালোবাসার লড়ালড়িতে অশনির অবস্থা ‘মাপ করো’ উপদেশ পাওয়া ভিখিরির মতো।
অতএব মুখ বেজার করে বাজারের থলে নিয়ে অশনি বেরিয়ে পড়ল। বেরোনোর সময়ে দেখল বসবার ঘরে সোফায় হেলান দিয়ে বাবা খবরের কাগজ পড়ছে। সামনের টেবিলে চা-বিস্কুট। মুক্তোমালা বাবাকে আর-একটা বিস্কুট সাধছে। আর বাবা একটি হত্যারহস্য খবরের কাগজ দেখে-দেখে বউমা অথবা মেয়েকে পড়ে শোনাচ্ছে।
হুঁ! বাবার শরীর ভালো নয়! আর অশনি বুঝি দারা সিং! যখন-তখন যা খুশি হুকুম করলেই হল। কিন্তু মুক্তোমালার হুকুমের প্রতিবাদ করা অশনির সাহসে কখনও কুলোয়নি। প্রতিবাদ করার কথা ভেবেছে বহুবার, ঠিক শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম জপ করার মতো—কিন্তু আসল কাজের সময়েই দ্যাখে ওর হাত-পাগুলো কেমন বশে থাকে না। বুকটা কেমন ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকে। আর মুক্তোমালার কথা মানতে ইচ্ছে করে। ভয়ে হোক, ভক্তিতে হোক, ওর বাধ্য হতে ইচ্ছে করে।
সুতরাং বেরোনোর মুখে অশনি বলে গেল, চা-টা গরম করে রেখো, বাজারটা সেরে আসছি।
অশনির এই করুণ কাহিনি আজকের নয়, কম সে কম আধযুগ পুরোনো। এতদিনের চেষ্টাতেও ও সিংহ হয়ে উঠতে পারেনি—সেই শশকটিই রয়ে গেছে।
অশনির চেষ্টার রকমফের ছিল মন্দ নয়। একবার বাবার সঙ্গে পিস টিটি, মুক্তোমালার সঙ্গে যুদ্ধং দেহি। এবং তার আশু ফলাফল সগৌরবে পরাজয়ঃ বরণং। তারপর শাড়ি-গয়না দিয়ে মন নরম করার চেষ্টা। তাতেও কিছুদিন পর বোঝা গেল সেটা একমুখী পরিকল্পনা। লাভের মধ্যে রানিসাহেবার মরজিমাফিক কখনও-সখনও ভালোবাসা আদান-প্রদানের লাইসেন্স। অর্থাৎ যে-কে সেই।
অতঃপর বন্ধুদের পরামর্শ নিতে গিয়ে শুনল তারাও অনেকটা একই টাইপের সাজেশান বহুদিন যাবৎ খুঁজে বেড়াচ্ছে। তখন কে যেন বলেছিল, শোন, এটা স্রেফ তোর মনের ব্যাপার। তুই বরং একবার সাইক্রিয়াটিস্ট দেখা।
চুপিচুপি তাই করেছিল অশনি। সবকিছু শোনার পর মনের ডাক্তার ওকে খুঁটিয়ে জরিপ করেছে। তারপর আচমকা প্রশ্ন করেছে, গলার কাছটা ভারী-ভারী লাগে? এমন মনে হয় যে, কোনও মালা-টালা পরে আছেন?
অশনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে বলেছে, হ্যাঁ…না…মানে, মাঝে-মাঝে মনে হয়।
ডাক্তারবাবু টেবিলে চাপড় মেরে গর্বের হাসি হেসে বলে উঠেছেন, এই তো, কেস ক্লিয়ার! একটা বেঙ্গলি প্রবাদ আছে জানেন তো, বানরের গলায় মুক্তোমালা? আপনার বউয়ের নামটাই এমন যে, সেটাকে ওই প্রবাদের সঙ্গে কানেক্ট করে নিয়ে আপনি নিজেকে ইয়ে…আই মিন হীনম্মন্যতায় ভোগেন। একটা সারভেন্ট সাইকোলজি সবসময় আপনার মধ্যে কাজ করে চলে।
অশনি পাথর। গলার কাছে উঠে আসা কাতর আর্তনাদটাকে অতি কষ্টে গিলে ফেলল।
ডাক্তারবাবু সেসব গ্রাহ্যই করলেন না। বলে চললেন এক নিশ্বাসে, আপনি বউয়ের নামটার কথা ভুলে যান। তা হলেই সব ও-কে হয়ে যাবে। সিক্সটি ফোর, প্লিজ।
শেষের কথাটা যে ভিজিটের অঙ্ক সেটা বুঝতে অশনির কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে গিয়েছিল।
মুক্তোমালাকে অশনি মাঝে-মধ্যে ‘মালা’ বলে ডাকত। ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার পরই ও মালা নামটাকে পারমানেন্ট করে দিল। মুক্তোমালার বিস্ময় অথবা ভ্রূকুটি ওকে টলাতে পারেনি। কিন্তু তাতেও ফলং নাস্তি।
তখন মরিয়া হয়ে অশনি তন্ত্র-মন্ত্র-তাবিজ-কবচ খুঁজতে লাগল। বশীকরণ… খুশিকরণ সবরকম পদ্ধতিরই খানাতল্লাশ নিতে শুরু করল। খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনগুলো গোয়েন্দার চোখে বিশ্লেষণ করতে লাগল। অলৌকিক শক্তিওয়ালা ‘মহাপুরুষদের’ দোরে-দোরে গোপন ধর্নার আয়োজন শুরু করল। যে করে হোক মুক্তি চাই-ই চাই! ‘স্ত্রৈণ’ উপাধি নিয়ে অশনি বৈতরণী পেরোতে চায় না।
ঠিক এইরকম একটা মানসিক অবস্থার মধ্যে একটা অদ্ভুত বিজ্ঞাপন অশনির নজরে পড়ল।
রাত্রিবেলা খবরের কাগজের দখল পেয়ে কাগজটা খুঁটিয়ে পড়ছিল, তখনই শেষ পৃষ্ঠার ছোট্ট বিজ্ঞাপনটায় চোখ আটকে গেলঃ
বৈজ্ঞানিক যুগের নবতম অবদান
আবেগথেরাপি
দূর থেকে প্রিয় কিংবা অপ্রিয়জনের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন। যন্ত্রটির আকার পকেট ট্রানজিস্টারের মতো—ব্যবহারের সু-উপযোগী। দাম মাত্র দুশো টাকা। প্রখ্যাত তান্ত্রিক বিজ্ঞানীর অমূল্য আবিষ্কার—তন্ত্র ও বিজ্ঞানের অপূর্ব সমন্বয়। ব্যবহারে সন্তুষ্ট না হলে টাকা ফেরত।
তারপর প্রাপ্তিস্থান উল্লেখ করে একটা ঠিকানা দেওয়া আছে।
অশনি আর দেরি করল না। পরদিন সকালেই অফিস থেকে সোজা প্রাপ্তিস্থানে গিয়ে হাজির। কড়কড়ে দুইশত টাকা প্রদান। এবং পকেট ট্রানজিস্টারের আকৃতিসম্পন্ন আবেগথেরাপি যন্ত্র আনয়ন।
বাড়িতে এসেই যন্তরটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ল অশনি। ওর প্রাইভেসি বলতে এই ছয় বাই চার ঘরটুকু। অতএব সেখানে বসে নিরাপদে যন্ত্রটি দেখতে লাগল আর সঙ্গে দেওয়া নিয়মাবলীর ছাপা কাগজটা বারবার করে খুঁটিয়ে পড়তে লাগল।
অশনি আনন্দে খুশিতে কাঁপতে শুরু করল। ছাপা কাগজটায় যা-যা লিখেছে তা যদি সত্যি-সত্যিই হয়, তা হলে তো মার দিয়া কেল্লা। এতদিনে বোধহয় ক্রীতদাস জীবনের অবসান হবে। কিন্তু অশনি কি সেরকম কপাল করে এসেছে? এইটুকু যন্ত্রের কি সত্যিই এতটা শক্তি হতে পারে?
যন্ত্রটা ছোট্ট ট্রানজিস্টার রেডিয়োর মতো দেখতে। রং কালো। একদিকে আধুলি মাপের একটা ছোট্ট জানলা। মুখে জাল দেওয়া। আর উলটোদিকে কুড়িটা ছোট-ছোট ‘নব’—ঠিক রেডিয়োর ভলিয়ুম কন্ট্রোল নবের মতো। এ ছাড়া অন-অফ করার জন্য একটা খুদে সুইচ আছে।
নবগুলোর প্রত্যেকটায় এক-দুই করে কুড়ি পর্যন্ত নম্বর দেওয়া আছে। নম্বরগুলো এক-একটা আবেগের সাংকেতিক নাম। যেমন নিয়মাবলী পড়ে অশনি জেনেছে পাঁচ নম্বরটার অর্থ ভালোবাসা। সাত নম্বরটা ক্রোধ। তেরো নম্বরটা উদাসীনতা। উনিশ নম্বর অশ্রদ্ধা। এরকম কুড়িরকম আবেগের কুড়িটা নম্বর। যে-ব্যক্তিকে আবেগথেরাপি করা প্রয়োজন তার মাথার দিকে প্রথমেই যন্ত্রের ওই ছোট্ট জানলাটা তাক করতে হবে। তারপর সুইচ টিপে যন্ত্রটা অন করে দরকার মতো নব ঘোরাতে হবে। যেমন সাত নম্বর নবটা পুরো ডান দিকে ঘুরিয়ে দিলে সেই মানুষটি রাগে একেবারে আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠবে। আবার পুরো না ঘুরিয়ে আধাআধি ঘোরালে রাগটাও হবে মাঝামাঝি। এভাবে প্রত্যেকটা আবেগকেই আলাদা করে খুশিমতো কন্ট্রোল করা যায়। যেমন-যেমন দরকার তেমন-তেমন করে আবেগের ডোজ খুশিমতো কমাতে বাড়াতে পারবে অশনি।
দু-একটা বিজ্ঞানের কথাবার্তাও নিয়মাবলীর কাগজটায় লেখা আছে। যেমন, যন্ত্রটা অন করলেই তার জানলা দিয়ে একরকম অদৃশ্য তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ বেরিয়ে আসে। সেটা নির্দিষ্ট ব্যক্তির মগজের কোশগুলোকে উত্তেজিত করে তোলে। বিভিন্ন নব ঘোরালে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের কম্পাঙ্ক আর ধরনধারণ পালটে যায়, আর সেই অনুযায়ী মগজের বিভিন্ন অংশের কোশ উত্তেজিত হয়ে মানুষটিকে বিভিন্নরকম আবেগ প্রকাশে বাধ্য করে। মানুষের মধ্যে মূল যে-কয়েকটি আবেগ রয়েছে সেগুলোকে ফ্রয়েডীয় রীতিতে আরও শাখা-প্রশাখায় ভাগ করে মোট কুড়িটি আবেগ-উপআবেগ পাওয়া গেছে। আবিষ্কারক তান্ত্রিক-বিজ্ঞানী আশা করেন যে, এতেই খদ্দেরের চাহিদা ভালোরকম মিটে যাবে।
কী ব্যাপার, বাথরুমেই ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?—মুক্তোমালার ঝাঁজালো গলা শোনা গেলঃ জলদি বেরোও, বাবা যাবেন। কোনও একটা কাণ্ডজ্ঞান নেই।
অশনি তখন বিশরকম আবেগের বিশরকম নম্বর মুখস্থ করছিল। চমকে উঠে যন্ত্র আর কাগজ তোয়ালের আড়ালে লুকিয়ে বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে। বউয়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই হেসে উঠে বলল, অ্যায়সা দিন নেহি রহেগা, বিবিজি!
মুক্তোমালা তাচ্ছিল্যের গলায় বলে উঠল, পাগল আর কাকে বলে!
অশনির সেসব গ্রাহ্য হওয়ার নয়। ও তখন মনে-মনে আওড়াচ্ছেঃ…পাঁচ—ভালোবাসা, ছয়—লোভ, সাত—ক্রোধ—।
অশনি অ্যাকশন শুরু করল রাতে।
বিয়ের পরপর বেচারা বউয়ের ভালোবাসা পেত নিয়মিত। কিন্তু তারপরই অকস্মাৎ সেখানে ভাঁটা পড়েছে। প্রথম তিন-চার বছরে সন্তান না আনার পরিকল্পনা নিয়েছিল দুজনেই। অথচ পরিবার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে-সঙ্গে স্বামীকে আদর সোহাগ করার ব্যাপারেও সরকারি রেশনিং-এর অভিশাপ লেগেছে। বউয়ের এই ভাবসাব দেখে অশনি একদিন বলেই ফেলেছিল, মালা, তুমি মাইরি ফ্রিজিড।
মালা সঙ্গে-সঙ্গে চোখ মটকে বলেছে, আর তুমি বুঝি ভিসুভিয়াস!
অশনি ফিউজ হয়ে গেছে।
এরপর প্রাকৃতিক কি কৃত্রিম কারণে জানা নেই, তিন প্রাণীর সংসার তিন প্রাণীরই রয়ে গেছে—অশনি, পিতা ও পত্নী। শুধু লক্ষ্মী নামে শান্তশিষ্ট একটি কাজের মেয়ে সকাল-বিকেল আসে। মুক্তোমালা মেয়েটিকে খুবই পছন্দ করে, ভালোবাসে, আবার বকা-ঝকাও করে। বাড়িতে সবাই স্নেহ-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় মিলিয়ে-মিশিয়ে বেশ মাখো-মাখো হয়ে আছে, শুধু অশনিই যেন আমড়ার আঁটি—মেঝেতে দিনরাত ড্রপ খাচ্ছে।
ঘড়িতে এখন নিশ্চয়ই এগারোটা বাজে। অশনি বিছানায় গা ঢেলেছে সাড়ে দশটায়। তখন থেকেই ঘুমের ভান করে চোখ বুজে মটকা মেরে পড়ে আছে। যন্তর বালিশের তলায় রেডি।
একটু পরেই মালা এসে আলো নিভিয়ে পাশে শুয়ে পড়ল। অশনি আস্তে-আস্তে একটা হাত বাড়িয়ে মালার বাহুতে রাখল। সামান্য চাপ দিয়ে কাছে টানল। সঙ্গে-সঙ্গেই শান্ত গলায় জবাব ভেসে এল, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো—বিরক্ত কোরো না। এবং অশনির হাতটা অহিংসপথে যথাস্থানে ফিরিয়ে দেওয়া হল।
মাঝেমধ্যেই অশনি এরকম হাত ফেরত পায়। কিন্তু আজ আর নয়! অশনি একেবারে সহিংস হয়ে গেল। অন্ধকার বালিশের নীচ থেকে যন্ত্র বের করে সুইচ অন করল। তারপর সন্তর্পণে ছোট্ট জানলাটা স্ত্রীর মস্তকে তাক করে পঞ্চম বোতামটিকে পুরোটা ঘুরিয়ে দিল। ওয়ান-টু-থ্রি স্টার্ট।
মুক্তোমালা চকিতে স্বামীর দিকে ফিরল। তারপর অশনিকে একেবারে জাপটে ধরল।
অশনি কোনওরকমে যন্ত্রটাকে বালিশের খাঁজে নামিয়ে রাখল—অবশ্য যন্ত্রের জানলাটা তখনও মোটামুটি মালার মাথার দিকে তাক করা। তারপর মালার সঙ্গে অন্ধকারে সুর মেলাল।
মালা যে এরকম ভিসুভিয়াসের মতো উদ্দাম হয়ে উঠতে পারে, তা অশনি কখনও কল্পনাও করেনি। এ যেন বিলিতি ফুলশয্যার রাত। তার ওপর রাতের যেন আর শেষ নেই। আনন্দে আর বিস্ময়ে অশনি কোনও কথা বলতে পারছিল না।
ঘণ্টাখানেক পর অশনি মুক্তোমালার হাত থেকে মুক্ত হল। তারপর ও যন্ত্রটাকে অফ করে অন্ধকারেই কপাল তিনবার ঠেকাল। জয় বাবা তান্ত্রিক বিজ্ঞানী! গরিবের কপাল তা হলে শেষ পর্যন্ত খুলল!
সকালবেলা অশনি লক্ষ করল, মুক্তোমালা ঠিক সহজভাবে ওর সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। দু-একবার চোখও নামিয়ে নিল। না, গত রাতের কথা মালা ভোলেনি। ভোলার কথাও নয়।
বাজার-টাজার সেরে এসে অশনি বাবার সঙ্গে চায়ের আসরে যোগ দিল। বাবা এখনও খবরের কাগজ পড়ছে। খবরের কাগজের দখল না পেয়ে অশনি আজ আর অখুশি হল না। চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে দিব্যি টুকটাক গল্প জুড়ে দিল। বারকয়েক অকারণেই বলে ফেলল, বুঝলেন বাবা, এখন হল গিয়ে বিজ্ঞানের যুগ।
বাবা বলল, হুঁ—। চোখের নজর কিন্তু খবরের কাগজের দিকে।
মুক্তোমালা ব্যস্তভাবে একবার ঘরে ঢুকে বাবার সুবিধে-অসুবিধের কথা জিগ্যেস করল—আর কিছু লাগবে কি না, বাবা কোথাও বেরোবেন কি না, বেরোলে কখন বেরোবেন ইত্যাদি।
অশনি অনেকক্ষণ ধরে মালার শ্বশুর-ভক্তি দেখল। তারপর গম্ভীরভাবে বলল, আজ শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে—অফিস যাব না। রান্নার জন্যে আর তাড়াহুড়ো কোরো না।
মুক্তোমালা চুপ করেই ছিল। কিন্তু কাগজ নামিয়ে বাবা সন্তানের দিকে তাকাল। চিন্তিত সুরে জানতে চাইল, কেন, ম্যাজম্যাজ করছে কেন?
অশনি মালার দিকে তাকাল। মুক্তোমালা চকিতে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
তখন অশনি একটু হেসে বিজ্ঞভাবে বলল, এখন হল গিয়ে বিজ্ঞানের যুগ—। তারপর চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়ল। অফিস কি আর ও এমনি-এমনি কামাই দেবে! আবেগথেরাপি যন্ত্র দিয়ে মালার ওপরে নতুন-নতুন অ্যাকশন করে বিজ্ঞানের দিগ্বিজয়কে ও অব্যাহত রাখবেই।
ও এখন লক্ষ্মীর গলা শুনতে পাচ্ছে। বেচারি মালার তিরস্কার সবই নির্বিবাদে গ্রহণ করে। বউয়ের মুখে অশনি কত কোটিবার যে শুনেছে, এরকম মেয়ে হয় না! আর কথায়-কথায় অশনির সঙ্গে লক্ষ্মীর তুলনা তো আছেই!
সুতরাং এটাই সেকেন্ড অ্যাকশনের মাহেন্দ্রক্ষণ।
যন্ত্রটা জামার আড়ালে লুকিয়ে অশনি রান্নাঘরের কাছাকাছি গিয়ে হাজির। মুক্তোমালা তখন লক্ষ্মীর ওপরে শাসন ফলাচ্ছে। কারণ, বাসন ঠিকমতো মাজা হয়নি। মাজা বাসনের গায়ে এঁটো লেগে আছে।
তোকে রোজ-রোজ একই কথা বলি, তবু তোর চৈতন্য হয় না।
লক্ষ্মী কাঁচুমাচু মুখে চুপ।
অশনি যন্ত্রটা লক্ষ্মীর মাথার দিকে তাক করে সুইচ টিপে সাত নম্বর নব বোঁ করে ঘুরিয়ে দিল। ক্রোধ স্টার্ট।
সঙ্গে-সঙ্গে লক্ষ্মী মুখঝামটা দিয়ে ফোঁস করে উঠলঃ অত যদি তোমার ছুচিবাই, বউদিদি, তো নিজে মেজে নিলেই পারো। দিনরাত্তির অমন ট্যাঁকট্যাঁক করে কথা আর সহ্য হয় না।
মুক্তোমালা স্পিকটি নট। ওর চোখ দুটো রসোগোল্লার মতো হয়ে গেছে। যেন মঙ্গলগ্রহ থেকে পাঁচ-পাওয়ালা কোনও প্রাণী আচমকা ওর সামনে এসে হাজির হয়েছে।
লক্ষ্মী, এসব কী যা-তা বলছিস! তুই কি পাগল হয় গেলি?
কী বললে, বউদি, আমি পাগল! তা তুমি রোজ অমন ছাগলের মতো আমায় গুঁতোও কেন বলো দিকি? ন্যায্য কথা বললেই যত দোষ! কোথাকার লাটসাহেবের বউ এয়েছেন যেন, হুঁঃ!—লক্ষ্মী দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অশনিকে একঝলক দেখল।
যা, তুই এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা!—মুক্তোমালার মুখ টকটকে লাল। হাত-পা রাগে থরথর করে কাঁপছে।
অশনি মনে-মনে মুচকি হেসে উনিশ নম্বর নবটাকে আড়াই প্যাঁচ ঘুরিয়ে দিল। ব্যস, ক্রোধের ওপর অশ্রদ্ধার বিষফোঁড়া চেপে বসল।
হুঁঃ—বেরিয়ে যা বললেই যেন বেরিয়ে যেতে হবে। তোমার বাপের বাড়ি যে বেরিয়ে যাব?—লক্ষ্মী মুখ ঘুরিয়ে অশনির দিকে তাকিয়ে বলল, এটা দাদাবাবুর বাড়ি। দাদাবাবু বললে তবেই বেরোব—।
লক্ষ্মীর এই কথায় মুক্তোমালা চোখ কপালে তুলে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে-কাঁদতে কীসব বলতে লাগল বোঝা গেল না। লক্ষ্মী তখনও সমানে মুখ চালিয়ে যাচ্ছে। অশনি উলটোদিকে নব ঘুরিয়ে সুইচ টিপে যন্ত্রটা অফ করে দিল।
সঙ্গে-সঙ্গে লক্ষ্মীর চোখ কপালে তোলার পালা।
তোমায় এসব কী অকথা-কুকথা বললুম গো, বউদিদি! আমার মাথায় কি শাঁকচুন্নি ভর করেছিল! এ কী পাপ করলুম গো আমি!—বলেই হাউমাউ করে কেঁদে মেয়েটা সটান মালার পা জাপটে ধরলঃ আমায় তুমি বঁটি দিয়ে কেটে ফ্যালো। আমার মুখে নুড়ো জ্বেলে দাও গো—।
অশনি আরও কয়েকসেকেন্ড দাঁড়িয়ে দুই লেডিজের লাগামছেঁড়া কান্নাকাটি দেখল। অকারণেই গলা তুলে বলল, বুঝলে, এ হল গিয়ে বিজ্ঞানের যুগ। তারপর চলে যেতে গিয়েই দেখল পিছনে বাবা দাঁড়িয়ে। চেঁচামেচি কান্নাকাটি শুনেই বোধহয় এসেছে।
অশনি যন্ত্রটা কিছুক্ষণ আগেই লুকিয়ে ফেলেছিল। তবে বাবা দেখতে পেয়েছে কি না কে জানে। অশনি বাবাকে চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে গেল ভেতরের ঘরের দিকে।
অশনি লক্ষ করল, মালার পুরোনো প্রতাপ যেন ধীরে-ধীরে অনেকটা মিইয়ে গেছে। কথাবার্তা কম বলছে। প্রতি পদে অশনিকে ডাক দিতেও ভুলে যাচ্ছে। আপনমনেই কী যেন ভাবছে।
সারাদিনের সামান্য কথাবার্তায় অশনি জেনেছে লক্ষ্মী এখনও কাজে বহাল রয়েছে। অনেক করে ক্ষমা-টমা চেয়ে ও নাকি স্বীকার করেছে ওদের ফ্যামিলিতে বরাবরই ভূতে-পাওয়ার রোগ আছে। এরকম ও আর কখনও করবে না। করলে গলা টিপে বউদিদিমণি যেন ওর মুখে নুন ঠেসে দেয়। এরকম আরও কত কথা।
মুক্তোমালা এসব কথা বাবাকে বলছিল। অশনি কোনওরকমে হাসি চেপে সেখান থেকে সরে এসেছে।
বিকেলে বাবা বেরিয়েছিল। রোজই এরকম আড্ডা মারতে বা তাস-টাস খেলতে বেরোয়। সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ বিষণ্ণমুখে ফিরে এসে বউমাকে খবর দিল, জানো, আজ সকালে হরিপদ মারা গেছে। স্ট্রোক হয়েছিল।
হরিপদ বোস বাবার প্রাণের বন্ধু। সেই কোন ছোটবেলা থেকেই দুজনে প্রায় গলায়-গলায়। সুতরাং বাবা যে আঘাত পাবে তাতে আর সন্দেহ কী!
বাবা মুখ কালো করে চেয়ারে বসতেই মুক্তোমালা একগাল হেসে বলল, সত্যি, একটা দারুণ খবর শোনালেন, বাবা।
বাবা চমকে উঠে বউমার মুখের দিকে তাকাল।
স্নেহের বউমা তখন আপনমনেই বলে চলেছে, সত্যি, কতদিনে যে এরকম খুশির খবর শুনিনি। হরিপদ কাকা মারা গেছেন! আঃ, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বুড়ো হয়ে কী কষ্টটাই না পাচ্ছিলেন। হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে—।
বউমা! এসব কী বলছ তুমি? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে!
পাশের ঘরের জানলা থেকে চুপিসাড়ে অশনি সব দেখছিল। চিতাবাঘের মতো ঘাপটি মেরে যন্ত্রটাকে ও তাক করে রেখেছিল মালার মাথা লক্ষ্য করে। খুশি ও আনন্দের এক নম্বর নব পুরোটা ঘোরানো।
বাবা ও বউমার অবস্থা যখন চরমে, তখন অশনি যন্ত্রটা অফ করে ভিজে বেড়ালটি সেজে পাশের ঘরে এসে প্রবেশ করল। সঙ্গে-সঙ্গে মুখে আঁচল চেপে মালা তিরবেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
অশনি ভালোমানুষি সুরে জানতে চাইল, কী হয়েছে, বাবা?
বাবা মাথায় হাত রেখে বসেছিল। আস্তে করে শুধু বলল, বউমাকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করো। তোমার সম্বন্ধ ঠিক করার সময়ে যতদূর খোঁজ নিয়েছিলাম তাতে ওদের ফ্যামিলিতে পাগলামির ধাত আছে বলে শুনিনি। অবশ্য…।
অশনি ছোট্ট করে ‘হুঁ’ বলে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
মালার খোঁজে শোওয়ার ঘরে এসে দেখল ঘর অন্ধকার করে বেচারি বিছানায় উপুড় হয়ে ফুলে-ফুলে কাঁদছে। উৎফুল্ল অশনি দরজাটা বন্ধ করে বউকে সান্ত্বনা দেওয়ার মহান কর্তব্য পালন করতে মনোযোগ দিল।
অশনি বাবাকে কখনও রাগতে দেখেনি বা চিৎকার করে কথা বলতে শোনেনি। ওর খুব সাধ হচ্ছিল আবেগথেরাপি যন্ত্রের কেরামতি দেখিয়ে বাবাকে তেলেবেগুনে আগুন করে দেয়। সেইজন্যেই তক্কে-তক্কে ছিল। পরদিন সকালে চায়ের টেবিলেই সুযোগ এসে গেল।
মনে-মনে অশনি ঠিক করেছিল, আজই ও মুক্তোমালাকে শেষবারের মতো টাইট দেবে। তা হলে ওর সাধ পূর্ণ হবে। পত্নী বশ মানবে। আর অশনিও রোজ ভোরবেলা বেড-টি পাবে।
মালার অবস্থা আপাতত মোটেই সুবিধের নয়। গতকাল রাতে অশনিকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করেছে। না, যন্ত্রটা ব্যবহার করতে হয়নি। কাঁদতে-কাঁদতেই মালা স্বামীকে বলেছে, আমার বোধহয় মাথা-টাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নইলে বাবার সামনে ওরকম আজেবাজে কথা বলি! আবার দ্যাখো, লক্ষ্মী মেয়েটাও কেমন বজ্জাত। সক্কালবেলায় পাগলের মতো কী ঝগড়াটাই না করল। আচ্ছা, আমরা সবাই কি আস্তে-আস্তে পাগল হয়ে যাচ্ছি?…কে জানে, হয়তো শনির দশায় ধরেছে।
অশনি বউকে আদর করতে-করতে বলেছে, তুমি ওসব বাজে চিন্তা ছেড়ে একটু ঘুমোও তো দেখি!
তারপর মুচকি হেসে মনে-মনে বলেছে, এসব শনির দশা নয়, ডার্লিং অশনির দশা!
মুক্তোমালার মুষড়ে পড়া অবস্থা দেখে অশনির মনের ভাব সমবেদনার দিকে টার্ন নিয়েছিল। সেইজন্যই কাল রাতে আর যন্ত্র দিয়ে ভালোবাসা আদায় করেনি। কিন্তু আজ সকালে নিজের দীর্ঘদিনের অত্যাচারিত হওয়ার ইতিহাস রোমন্থন করতেই ‘বাঙালি জাগো’ মনোভাব ফিরে এল। তার ওপর ‘বেড-টি’ না পাওয়ার আক্ষেপ ও বিরক্তি। অতএব ওয়ান-টু-থ্রি, অ্যাকশন।
চায়ে পরপর ক’টা চুমুক দিয়ে বাবা বলল, বউমা, চা-টা আজ দারুণ হয়েছে। আমাকে আর-একটা বিস্কুট দাও তো।
অশনি থেরাপি যন্ত্রের ক্রোধ, বিরক্তি, তাচ্ছিল্য ও অশ্রদ্ধা—মোট চারটে নব ফুল অন করে মুক্তোমালার মস্তক তাক করে বসেছিল। অতএব বউমা মুখে নেড়ে বলে উঠল, বিস্কুট লাগলে নিজে নিয়ে নিন, আমি দিতে পারব না। বসে-বসে খালি ফরমাস।
অশনি এবার যন্ত্র তাক করল বাবার মাথার দিকে। সঙ্গে-সঙ্গে বাবা চেয়ার ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল, ডটার-ইন-ল, হোল্ড ইয়োর টাং! ডোন্ট ফরগেট, আই অ্যাম ইয়োর ফাদার-ইন-ল।
বাবা একসময়ে প্রাইমারি স্কুলে ইংরেজি পড়াত। বেঁচে থাকতে মায়ের মুখে শুনেছিল, রেগে গেলে বাবা নাকি ক্রমশ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বাড়াতে থাকে আর গলার স্বর উঁচু পরদায় তোলে। অশনির বালক বয়েসে মা বিদায় নিয়েছে। বাবা-ই ওকে মানুষ করেছে, কিন্তু ভদ্দরলোকের রুদ্রমূর্তি অশনির কখনও দেখার সুযোগ হয়নি। আজ হচ্ছে।
ফাদার-ইন-ল আর ডটার-ইন-ল ততক্ষণে পানিপথের যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে। আর অশনির যন্ত্র তালে তাল মিলিয়ে একবার একে তাক করছে, আর-একবার ওকে।
এমনসময় ঘরে ঢুকে পড়ল লক্ষ্মী। বিচিত্র দৃশ্য দেখে সে তো একেবারে থ। অশনিকে লক্ষ্য করে বলল, এসব কী কাণ্ড হচ্ছে গো, দাদাবাবু?
অশনি অমনি অন্য নবগুলো কমিয়ে দিয়ে ফুল ডোজে বিনয় চালিয়ে দিল। ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে বাবা ও বউমা বৈষ্ণব বিনয়ে গদগদ।
বাবা কোমল সুরে তখন বলতে শুরু করেছে, আমাকে ক্ষমা করে দাও, বউমা। আমার ভীষণ অন্যায় হয়ে গেছে। আর কখনও এরকম হবে না।
আর বউমাও কম যায় না। মাথায় ঘোমটা দিয়ে গলায় আঁচল জড়িয়ে ঝপ করে শ্বশুরমশাইকে এক সাষ্টাঙ্গ প্রণামঃ অন্যায় আমার হয়েছে, বাবা। আমায় শাস্তি দিন।
তারপর একটানা অনুশোচনা, অনুতাপ, বিলাপ, প্রলাপ ইত্যাদি চলছিল, অশনি যন্তর অফ করে ঘর থেকে সটকে পড়ল।
লক্ষ্মী তখনও হাঁ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। বোধহয় গতকাল বউদিমণির সঙ্গে ওর বিচিত্র ঝগড়ার কথা ভাবছিল।
ততক্ষণে সংবিৎ ফিরে পেয়ে, লক্ষ্মীকে দেখে ফাদার-ডটার দুজনের অবস্থাই ডেলিকেট।
অশনি নাটকের শেষটুকু উঁকি মেরে দেখেই শোওয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। হাতের যন্ত্রটা লক্ষ্মী দেখতে পেয়েছে কি না কে জানে!
শেষ সংশয়ের উত্তর অশনি পেয়ে গেল একটু পরেই। ফোলা চোখ নিয়ে নাক টানতে-টানতে ঘরে এসে ঢুকল মালা। ঢুকেই সটান অশনির পা জড়িয়ে ধরে বলল, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে তুমি বাঁচাও।
অশনি যন্ত্রটা লুকিয়ে ফেলেছিল। বউকে দু-হাতে ধরে দাঁড় করিয়ে অবাক হয়ে বলল, কীসের বাঁচানোর কথা বলছ, মালা? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!
অশনির বুকে মাথা রেখে মালা বলল, লক্ষ্মী আমাকে সব বলেছে। তুমি হাতে করে রেডিয়োর মতো কী একটা নাড়াচাড়া করছিলে আর তাতেই নাকি আমার আর বাবার মাথার গোলমাল শুরু হয়ে গিয়েছিল। কালও যখন লক্ষ্মী আমার সঙ্গে ঝগড়া করছিল তখনও তোমার হাতে ওই কালো রঙের যন্ত্রটা ছিল। তুমি সব জানো। সেদিন রাতেও নিশ্চয়ই ওই যন্ত্রটা তুমি কাজে লাগিয়েছিল। নইলে—।
অশনি আর কঠোর হতে পারল না। আবেগে গদগদ হয়ে মালাকে সব ফাঁস করে দিল। এমনকী বালিশের নীচ থেকে আবেগথেরাপি যন্ত্রটা বের করেও দেখাল।
মালা দুঃখ-কান্না সব ভুলে গিয়ে হাঁ করে যন্ত্রটা দেখতে লাগল। দেখা, শোনা, শেষ হলে ও বলল, তাই বলে শুধু-শুধু তুমি আমাকে এরকম নাজেহাল করলে?
অশনি পালটা প্রশ্ন করল, শুধু-শুধু মানে?
তারপর যন্ত্রসমেত হাত নেড়ে বলল, আমার দাবিদাওয়া না মিটলে এই যন্ত্রের রাইট অ্যান্ড লেফট অ্যাপ্লিকেশান চলতেই থাকবে।
মালা অবাক হয়ে জানতে চাইল, কীসের দাবিদাওয়া?
অশনি একে-একে সবিস্তারে নিজের বঞ্চিত জীবনের ইতিহাস বউকে শুনিয়ে দিল। এমনকী বেড-টি খাওয়ার অ্তৃপ্ত বাসনার কথাও বাদ দিল না।
মালা সব শুনে হেসে বলল, ব্যস, এই? কাল থেকে তুমি দেখে নিয়ো। তুমি হলে আমার সব, তোমাকে আমি কখনও হেলা-শ্রদ্ধা করতে পারি! তবে লক্ষ্মীটি, ওই যন্ত্রটা তুুমি বাড়ি থেকে বিদেয় করো। নইলে সবসময় ভয়ে-ভয়েই আমি মরে যাব। বাব্বাঃ, কী লজ্জা, কী লজ্জা!
শ্বশুরের সঙ্গে এনকাউন্টারের কথা মনে করে মালা মরমে মরে গেল যেন।
অশনি এগিয়ে এসে বউকে নতুন বউয়ের মতো করে আবার কাছে টানল। মুক্তোমালা নীচু গলায় বলল, তুুমি আজ আর অফিসে যেয়ো না। বাবাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আগে ঠান্ডা করো। বাবাকে আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছি না।
অশনি বলল, তথাস্তু। আর যন্তরটাকেও আমি আবর্জনার স্তূপে নিক্ষেপ করে দিচ্ছি। তা বলে তোমার শর্ত তুমি ভুলো না যেন! কাল সকালের বেড-টি দিয়েই আমার নতুন লাইফ শুরু হোক। প্রমিস?
মুক্তোমালা ওর হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে বলল, প্রমিস! প্রমিস! প্রমিস!
সঙ্গে-সঙ্গে ‘হিপ হিপ হুররে’ বলে এক কানফাটানো চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল অশনি এবং পরমুহূর্তেই আবেগথেরাপি যন্ত্রটাকে সর্বশক্তি দিয়ে এক ভয়ংকর আছাড় মারল মেঝেতে।
[মুক্তোমালা প্রতিদিনই ছোট্ট ট্রানজিস্টার রেডিয়ো মাথার কাছে নিয়ে শুতে যায়। আজও সঙ্গে নিয়েছিল। অশনি ঘুম ভেঙে দেখল সেটা দু-টুকরো হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। আর সামনের দেওয়ালে মালার বাপের বাড়ির হোল ফ্যামিলির গুরুদেবের ফটো টাঙানো ছিল—সেই ফটোর কাচ ভেঙে চৌচির। এবং গুরুদেবের ঠোঁটে যেন তান্ত্রিক-বিজ্ঞানীর হাসি।
মুক্তোমালা তখন রাগ-থমথমে মুখে সদ্য-স্বপ্ন-ভেঙে-জেগে-ওঠা স্বামীকে কটমট করে দেখছে।]
