সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
সর্বজনপাঠ্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি উপন্যাস
প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞান কাহিনি গল্প
1 of 2

অলীক কথামালা – অনীশ দেব

অলীক কথামালা

গোটা ব্যাপারটা ঠিক কবে থেকে যে শুরু হল অসিত তাই ভাবছিল। গলার কাছটায় যে ব্যথা সেটা প্রথম ও টের পেল কবে? এটুকু মনে আছে, কানের ব্যথাটা শুরু হয়েছিল গলার ব্যথার ঘণ্টাকয়েক পরেই। তারপরে দুটো ব্যথাই একেবারে মিলিয়ে গিয়েছিল। তার বদলে নতুন উপসর্গ হিসেবে শুরু হল এই আশ্চর্য ঘটনা…।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েই অসিত টের পেল ঢোঁক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। নানারকম কায়দায় নতুন ধরনের নানা চুমুক দিয়ে ও চায়ের কাপ শেষ করল। না, ব্যথাটা মোটেই মিলিয়ে গেল না। মুখটা বিচ্ছিরিরকম তেতো লাগছিল।

বাবা অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে রোজকার মতো মাঠে পায়চারি করতে বেরিয়ে গেছে। ফেরার সময় কারও খেত-বাগান থেকে টুকিটাকি শাকসবজি যা পারে ম্যানেজ করে ফিরবে। নিতান্ত না কিনলেই নয় এমন জিনিস ছাড়া বাবা কিছু কেনে না। আর অসিতকেও বাজার-টাজারের দায়িত্ব কখনও দেয় না। একে ম্যানেজ-মাস্টার, তার ওপর হাড়কেপ্পন। অসিত জানে, পাড়ার কেউ সাতসক্কালে বাবার মুখ দেখতে চায় না। সুবু, ভোলা, নদে ওরাও কি কম বলতে ছাড়ে অসিতকে! বলে, তোর বাপটা মাইরি সেফ ডিপোজিট ভল্ট। পিঁপড়ের চাষ করে গুড়ের ব্যাবসা করলে পারত।

অসিত সবই হজম করে। বাবাকে কখনও কিছু বলে না। ও জানে, বাবা ম্যানেজ-মাস্টার হতে পারে, হাড়কেপ্পন হতে পারে, কিন্তু সংসারের চাকাটা ঘুরিয়ে তো যাচ্ছে! একার পেনসনের পয়সায় চাকা ঘুরতে চায় না, গোল চাকা তেকোণা হয়ে যেতে চায়, তবু ঘোরাচ্ছে তো!

মালা এসে চায়ের কাপটা নিয়ে গেল। বলে গেল, দাদা, তোকে সুবুদা একটু আগে ডাকতে এসেছিল। তুই ঘুমোচ্ছিলি। তোকে সীতেশবাবু দেখা করতে বলেছে—চায়ের দোকানে।

খাটে বসে-বসেই মালার চলে যাওয়া দেখল অসিত। এবারে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে। তবে বাবা বোধহয় আর পড়াতে পারবে না। অসিত একবার মিনমিন করে বাবাকে বলতে গিয়েছিল এ ব্যাপারে। বাবা সোজাসুজি বলে দিয়েছিল, হায়ার সেকেন্ডারি পর্যন্ত তো আমি পড়ালাম, এবারে তুমি দ্যাখো—কিছু একটা ব্যবস্থা করো।

অসিত চলে এসেছিল। ও কী ব্যবস্থা করবে? না আছে পেটে বিদ্যে, না আছে পকেটে পয়সা। ইস, মালার যদি চট করে বিয়ে হয়ে যেত! ওকে দেখতে তো ভালোই। দু-বেলা ঠিকমতো খেতে পায় না, তবু স্বাস্থ্য দেখলে অবাক হতে হয়। সত্যি, অসিতের কিছু একটা করা উচিত।

খাট থেকে উঠে দেওয়ালের পেরেক থেকে জামাটা নিল অসিত। তখনই খাটের মাথার দিকের জানালা থেকে মিষ্টি শিসের শব্দ শুনতে পেল। দোয়েল ডাকছে। জানলার বাইরের খোলা জমিতে কয়েকটা করবী, শিউলি, আর একটা বড় লেবু গাছ আছে। পাখিটা প্রত্যেক বছর এই সময়টায় এসে আশেপাশে কোথায় যেন বাসা বাঁধে। একটা মাস গলা ফাটিয়ে শিস দেয়—তারপর কোথায় উধাও হয়ে যায়। অবশ্য একটাই পাখি প্রতি বছর আসে কিনা কে জানে! তবে দেখে অসিতের তাই মনে হয়। সে যাই হোক, বিনিপয়সায় দোয়েলের ঘুমভাঙানি গান—এ যে রাজার কপালেও জোটে না!

জামাটা গায়ে গলাতে-না-গলাতেই বাইরে থেকে ডাক শুনতে পেল অসিতঃ সিতু—অ্যাই, সিতু—।

অসিত বেরিয়ে এল। কলতলায় হাত-মুখ ধুয়ে নিল। বাইরের বারান্দায় মা রোজকার মতো রেডিমেডের সেলাই শুরু করে দিয়েছে। পুরোনো মেশিন ছ্যাকরাগাড়ির মতো শব্দ তুলে ঘড়ঘড় করে ঘুরছে। একপাশে উনুনে আগুন দিচ্ছে মালা। ধোঁয়ায় অসিতের চোখ জ্বালা করছিল। দেখল সুবু দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখেই বলল, কী বে শালা, এই ঘুম ভাঙল?

অসিত চোখ কুঁচকে ইশারা করে মায়ের দিকে দেখাল। সুবুটার বড্ড মুখ খারাপ।

ও রাস্তায় নেমে এল। সুবু বলল, সেই সক্কাল থেকে সীতেশদা তোকে খোঁজ করছে—দীনুদার চায়ের দোকানে বসে আছে।

ওরা দুজনে জলদি পা চালাল।

সাড়ে আটটা বেজে গেছে। কয়েকটা বাচ্চা সাদা-সবুজ পোশাক পরে পিঠে-হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। উলটোদিক থেকে আসা দুটো সাইকেল রিকশা ওদের পেরিয়ে গেল। তার পিছনেরটায় আলোবউদি বসেছিল। ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। চলন্ত রিকশা থেকেই অসিতকে দেখল আলোবউদি। হাসল। রিকশাগুলো প্যাঁক-প্যাঁক শব্দ করে এগিয়ে গেল।

সুবু অসিতের পিঠ চাপড়ে দিল, বলল, তোর কপাল আছে মাইরি!

অসিত মনে-মনে মজা পেল। সুবুরা ভাবে আলোবউদির সঙ্গে ওর একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু আসলে তা নয়। আলোবউদির বোন নীলা এ-পাড়ায় দিদির সঙ্গেই থাকে। অসিত নীলার সঙ্গে কথা-টথা বলতে ওদের বাড়িতে যায়। সেইসঙ্গে তাপসদা আর আলোবউদির সঙ্গেও আড্ডা দেয়, চা খায়। আর তাপসদা সিগারেট দিলে খায়।

একটু পরেই নীলাদের বাড়ির কাছে এসে গেল ওরা। ছোট দোতলা বাড়ি। গ্রিলের রেলিং দেওয়া সুন্দর বারান্দা। আর সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুন্দর নীলা। গায়ে-পায়ে একটা গোলাপি ম্যাক্সি। সকালের বাতাসে ঘাঘরা হয়ে উড়তে চাইছে।

তাপসদার বাড়িটা নতুন। বছরচারেকের মতো বয়েস। পাড়ার সকলেই জানে তাপসদা কীভাবে এই বয়েসে বাড়ি করেছে। তাপসদা রেল কোম্পানির স্টোরে চাকরি করে।

সুবু মাথা উঁচু করে নীলাকে দেখল। অসিতকে টেনে বারান্দার একেবারে নীচ দিয়ে হেঁটে যেতে চাইল। অসিত ওর মতলব বুঝতে পারল। নীচ ঘেঁষে হেঁটে যেতে যেতে সুবু মুখ তুলে নীলার ম্যাক্সির দিকে দেখবে।

ও সুবুর হাত ধরে টান মারল। সুবু ছিটকে ওর কাছে সরে আসতে-আসতে বলল, যাঃ শালা!

নীলা তখন ওপর থেকে অসিতকে দেখছিল। অসিত ওর দিকে তাকাল। ঠোঁটে দুটো আঙুল ছোঁয়াল। নীলা চোখ ছোট করে এক চিলতে হাসল। ওর মুখে এখনও ঘুমের ছাপ। অসিত মাথায় আঙুল চালিয়ে চুল পরিপাটি করার চেষ্টা করল। ইস, জামাটা কেমন ময়লা লাগছে! পাজামাটাও কাচব-কাচব করে কাচা হয়নি। মুখে-গালে অকারণেই হাত চালাল। দাড়ির খোঁচা টের পাওয়া যাচ্ছে।

ওরা অনেকটা এগিয়ে গেছিল। অসিত ঘাড় ঘুরিয়ে নীলাকে দেখল আর একবার। সুবু বলল, কী বে, কাটা পোনা চারা পোনা দুটোই খাবি?

অসিত বলল, কী ফালতু বকছিস!

এমনসময় বাঁকের মুখে দীনুদার দোকানটা দেখা গেল। দোকানের কাছ ঘেঁষে একটা ছাইরঙা অ্যামবাসাডর দাঁড়িয়ে আছে। অসিত গাড়িটা চেনে। গজেন দাসের গাড়ি। স্টেশন রোডের কাছে ইট-চুন-সুরকির বড় দোকান আছে। তা ছাড়া কাকটরির কাজ করে। লোকটা কি চা খেতে এসেছে না দেখা করতে এসেছে সীতেশদার সঙ্গে?

সীতেশদা চায়ের দোকানে বসেছিল। পাটভাঙা পাঞ্জাবি-পাজামা গায়ে। চুল তেলতেলে—টানটান করে আঁচড়ানো। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। কথাবার্তা বলে ধীরে-ধীরে, থেমে-থেমে। সীতেশদা কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকে পাড়ার অনেক রাস্তা সারানো হয়েছে, অনেক টিউবওয়েল বসেছে এখানে-ওখানে। এই বর্ষায় নানা গাছপালা, চারা, লতা বসানো হয়েছে, আর কুণ্ডুদের ইট ভাঁটার একপাশে পাঁচিল ঘিরে তৈরি হয়েছে শিশু উদ্যান।

সীতেশদা চায়ের কাপে চুমক দিচ্ছিল। গজেন দাস সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। কী যেন বলছিল সীতেশদাকে। বোধহয় অনুনয়ের সুরে কোনও আর্জি পেশ করছিল। রোগাটে চেহারায় বাবরি চুল আর রিমলেস চশমা। ঠোঁটে পানের লাল ছোপ। দেখে হঠাৎ করে কীর্তনিয়া মনে হয়। নদে বলে, ও ব্যাটা বহু মেয়ের কেত্তন করে দিয়েছে।

অসিত আর সুবুকে দেখে সীতেশদা হেসে বলল, আয়, আয়। তোর ঘুম ভাঙল?

অসিত হাসল চোখ নামিয়ে। সুবু ওকে ঠেলে একটা বেঞ্চিতে বসিয়ে দিল, নিজেও বসল। অসিত জানে সীতেশদা এখন ওকে কী বলবে। কিন্তু জুতসই কোনও জবাব যে ওর কাছে নেই! বাপটা খালি ম্যানেজ করার ধান্ধায় ঘোরে, অথচ সীতেশদাকে ম্যানেজ করতে পারছে না। পাড়ার যত ম্যাঁও সামলাতে হবে এই অসিতকে।

গজেন দাস তখন হাত-পা নেড়ে চোয়াল নাড়তে-নাড়তে বলছিল, ও আপনি কিছু ভাববেন, না সীতেশবাবু। যা-যা লাগবে আমি পাঠিয়ে দেব। আমি আপনার সঙ্গে আছি—নো প্রবলেম।

হেসে নমস্কার করে গজেন দাস গাড়ি নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় নির্মল পরিবেশে একরাশ কুৎসিত কালো ধোঁয়া উগড়ে দিয়ে গেল।

সীতেশদা দীনুদাকে বলল, দীনুদা, দুটো চা দাও ওদের—।

পাড়ার হাই-স্কুলের ইতিহাস স্যার পরিমলবাবু দোকানের ভেতরদিকটায় বসে চা খাচ্ছিলেন, আর খবরের কাগজ পড়ছিলেন। সুবু অসিতকে দেখে হঠাৎই যেন উঠে পড়লেন। কাগজ রেখে চায়ের দাম দিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার সময়ে সীতেশদাকে একবার দেখলেন। সীতেশদা পরিমল স্যারের ছাত্র ছিল। অসিত নিজেও।

সীতেশদা অসিতকে বলল, কী রে, আমার ওই ব্যাপারটার কী হল?

অসিত অনেকক্ষণ ধরেই মনে-মনে একটা উত্তর খাড়া করবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। ওদের বাড়িটা পুরোনো—ঠাকুরদার আমলের। একতলা মাথা গোঁজার ওই ঠাঁইটা ছিল বলেই বাড়ি ভাড়া গুনতে হয় না। বাবা সবসময় এই কথাটা শোনায়। তবে সমস্যাটা বাড়ি নিয়ে নয়—বাড়ির লাগোয়া একফালি জমিটা নিয়ে। একসময়ে ওটায় বাগান ছিল। অসিত শুনেছে, বিয়ের পরে মা ওখানে বাগান করেছিল। তখন বাবারও শখ ছিল। পরে যতই দিন গড়িয়েছে বাঁচার লড়াইয়ের তাপে শখ ততই শুকিয়ে গেছে। ফলে এখন পুরোনো যে-ক’টা গাছ টিকে গেছে, আর নিজে থেকেই যে দু-চারটে গাছ বা আগাছা হয়েছে তাই নিয়েই খুশি থাকে এককালের বাগানটা। বর্ষায়-বসন্তে সেজেগুজে ফুলেফেঁপে ওঠে। আর বাকি সময়টা হাঁপানি ধরা বুড়ির মতো হাঁপায়। সীতেশদা ওই জমিটুকু ব্যবহার করতে চাইছে বহুদিন থেকে।

সীতেশদা কাউন্সিলর হয়েছে মাসছয়েক। তার আগে পাড়াতেই ক্লাব-টাব নিয়ে ব্যস্ত থাকত। আর ক্লাবের নাম করেই নানারকম মহিলা সমিতি, বেকার যুবক কমিটি, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটি তৈরি করেছিল। পরে ক্লাব উঠে গেছে, কিন্তু ওইসব সমিতি বা কমিটিগুলো দিব্যি টিকে থেকেছে। তখনই সীতেশদা অসিতকে বলেছিল, সিতু, তোদের বাড়ির লাগোয়া ওই পোড়ো জমিটা আমাদের সংগঠনের কাজের জন্যে দরকার। ঘর-টর আমরাই করে নেব—ভাড়াও দেব। তুই একটা ব্যবস্থা কর।

ক্লাব করার সময়েও সীতেশদা জমিটা চেয়েছিল। বলেছিল, ওখানে ফ্রি কোচিং সেন্টার, ব্যায়ামাগার, চিকিৎসা কেন্দ্র, লাইব্রেরি—আরও কত কী করবে। কী করে যে ওই এক চিলতে জায়গায় এতগুলো জনহিতকর কেন্দ্র খোলা সম্ভব তা অসিতের মাথায় ঢোকেনি। তবু ও বলেছিল ব্যাপারটা বাবাকে জানাবে।

কথাটা বাবাকে বলামাত্রই আগুন জ্বলে উঠেছিল। বাবা এমনিতেই সবসময় অসিতকে যা-নয়-তাই বলে। সেদিন বাবার আর কোনও জ্ঞান ছিল না। মা সবসময় চুপচাপ থাকে, রেডিমেডের সেলাই করে একমনে। সেই মা-ও সেলাই ফেলে ছুটে এসেছিল। কোনওরকমে থামিয়েছিল বাপ-ছেলের ঝগড়া।

অসিতের বক্তব্য ছিল, জমিটা তো এমনিতে পড়েই রয়েছে। তা হলে ভাড়া দিলে ক্ষতি কী! মাসে-মাসে টাকা পাওয়া যাবে। এ-কথা শুনে বাবা খেপে উঠেছিল। বলেছিল, কক্ষনো নয়। পৈতৃক ভিটের এক কণাও আমি ভাড়া দেব না। তার ওপর ওদের দিলে দুনিয়ার ছোকরাগুলো দিনরাত্তির এখানে পড়ে থাকবে, হইহুল্লোড় খিস্তিখেউড় করবে…মালা বড় হচ্ছে সে খেয়াল কি রাখো? সবসময় তো তোমার সীতেশদার এঁটুলি হয়ে টোটো করছ—।

সীতেশদাকে বাবার আপত্তির কথা জানিয়েছিল অসিত। সঙ্গে-সঙ্গে সীতেশদার মুখ থেকে পেটেন্ট হাসির ছোঁওয়াটা মিলিয়ে গিয়েছিল। কতকগুলো আজেবাজে রেখা মুখটাকে বিচ্ছিরি করে দিয়েছিল। চাপা গলায় দাঁতে দাঁত চেপে সীতেশদা বলেছিল, ঢ্যামনাটাকে রাজি করাতে পারলি না। দাঁড়া, দেখছি…।

বাবাকে অসিত পছন্দ করে না ঠিকই, কিন্তু সীতেশদার চাপা কথাটা শুনে ওর ভীষণ খারাপ লেগেছিল। তক্ষুনি ক্লাবের একটা ছেলে, অপু, বলেছিল, তুমি ভেবো না, সীতেশদা। ও আমরা ম্যানেজ করে নেব।

অসিত লক্ষ করেছিল, ক্লাবের যারা-যারা ওর বন্ধু তাদের অনেকেই হঠাৎ অপরিচিতের চোখে তাকিয়েছিল অসিতের দিকে।

অসিত চলে এসেছিল, এবং তারপর থেকেই ও ক্লাব থেকে কেমন যেন দলছুট হয়ে যাচ্ছিল। এরপর মালা একদিন ওকে বলেছিল, পাড়ার কিছু ছেলে ওকে দেখে অশ্লীল ইশারা করে, মন্তব্য করে। আগে এমন করত না। অসিত বুঝতে পারছিল সব, কিন্তু মালাকে কিছু বলতে পারেনি।

এইভাবে যখন আলাদা হতে-হতে ও সীতেশদার কাছ থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছে তখন একদিন সীতেশটাই বাড়িতে এসে পিঠ চাপড়ে ওকে আবার ডেকে নিয়ে গেছে। বলেছে, ওর চাকরির একটা ব্যবস্থা করে দেবে, আর বেকার যুবকদের ব্যাবসা করার জন্য যে-সরকারি লোন দিচ্ছে সেটাও ম্যানেজ করে দেবে।

তারপর থেকেই আবার আগের মতো হয়ে যেতে চেয়েছে অসিত। মালাও ওকে আর কোনও অসুবিধের কথা বলেনি।

ভোটে জিতে সীতেশদা কাউন্সিলর হওয়ার পর ওরা যখন উৎসব করছিল, তারই মধ্যে ভোলা হঠাৎ ওকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলেছিল, সিতু, এবারে জমিটার ব্যবস্থা করে দে। নইলে সীতেশদার খুুব অসুবিধে হবে।

অসিত অবাক হয়ে গিয়েছিল। সেই শুরু। তারপর থেকে অপু, সুবু, নদে ওরা ওকে নিয়মিত তাগাদা দিয়েছে। আর গত সপ্তাহে সীতেশদা হাসি মুখে ওর কাঁধে হাত রেখে বলেছে, সিতু, এবারে যাহোক একটা ব্যবস্থা কর। নইলে আমাদের কাজকর্মে অসুবিধে হচ্ছে। ফলে পাড়ার লোকেও সাফার করছে। তোরা তো শুধু-শুধু জমিটা ফেলে রেখেছিস…।

অসিত শান্তভাবে বলেছিল, বাবাকে বলব।

কিন্তু বাড়িতে ফিরে সে-কথা বাবাকে আর বলেনি। জানে, বলে কোনও লাভ নেই। সুতরাং দিনের-পর-দিন ওই একটা কথা শুনে-শুনে অসিতের কান যেন ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল। ও ভাবছিল, ওরা তো সরাসরি বাবাকে বলতে পারে। সীতেশদা একবার এমন কথা বলেও ছিল, তুই যখন পারলি না, তখন আমরা একবার বলে দেখি। কিন্তু তখন অসিতই বারণ করেছিল। কারণ ও জানত, বাবা একইরকম খেপে উঠবে। উলটোপালটা কথা বলবে। সেসময়ে যদি অপু, নদে ওরা পালটা অসম্মান করে বাবাকে! কিংবা হাত চালিয়ে দেয়…

অসিতের মাথাটা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। কী করবে, কী করা উচিত ভেবে উঠতে পারছিল না। অথচ সীতেশদা যেরকম অধৈর্য হয়ে উঠছে, তাতে…।

সীতেশদা চশমার কাচ মুছে আবার জিগ্যেস করল, কীরে, সিতু, আমার ওটার কী করলি বল?

দীনুদা চা দিয়েছিল। সুবু চায়ে শব্দ করে চুমুক দিল। অসিত যেন সময় কাটাতেই চায়ের কাপে ঠোঁট নামাল। সুবু সীতেশদাকে লুকিয়ে অসিতের গা টিপল।

সীতেশদা আবার বলল, জানিস তো জমি ফেলে রাখাটা অন্যায়। তোদের জমিটা ওরকমভাবে প্রায় বিশবছর পড়ে আছে। বিশবছরে ওই জমিটুকুতে কতটা ধান হত জানিস? কতগুলো লোক খেয়ে বাঁচতে পারত বল!…আসলে তোরা দেশের কথা কিছু ভাবিস না। স্বার্থপর।

অসিতের গলার ব্যথাটা বেড়ে গেল। কথা বলতে গিয়ে ওর কথা কেমন জড়িয়ে গেল। ও কোনওরকমে বলল, কালকে ফাইনাল বলব, সীতেশদা।

ওর বিচিত্র স্বরে সীতেশদা চমকে উঠল। ভালো করে দেখল রোগা ছেলেটাকে। তার সঙ্গে ইয়ারকি মারছে নাকি? অবশ্য মুখ দেখে তা মনে হল না।

সীতেশদা বলল, কালকের পর কিন্তু আমার ছেলেরা আর ওয়েট করতে পারবে না। ওরা ধৈর্যের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে তুই যা ল্যাজে খেলাচ্ছিস…। আচ্ছা, তোর বোনটা এখন কী করছে?

হায়ার সেকেন্ডারি পাস করে বসে আছে। আর পড়বে না।

অসিতের কথায় সুবুও চমকে উঠল। এর মধ্যেই অসিতের গলাটা কেমন পালটে ফ্যাঁসফেঁসে হয়ে গেছে। কোনও কথা জোরে বেরোচ্ছে, কোনওটা আস্তে।

সীতেশদা বলল, ওকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস। গজেন দাসের একজন অফিস সেক্রেটারি দরকার। আমাকে বলছিল। আমি একটা চিঠি দিয়ে মালাকে—মালাই তো নাম তোর বোনের?—মালাকে পাঠিয়ে দেব। দ্যাখ, যদি একটা হিল্লে হয়ে যায়।

অসিত আপত্তি জানিয়ে কী একটা বলতে গেল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোল বলে মনে হল না। ও চা শেষ করে ঘাড় নেড়ে উঠে পড়ল। সুবু বসেই রইল।

চলে আসতে-আসতে অসিত দেখল, সীতেশদা সুবুকে কী যেন বলছে, আর ওরা দুজনেই তাকিয়ে আছে অসিতের দিকে।

বাড়িতে ঢোকার সময়েই অসিত টের পেল কান দুটো ব্যথা করছে। ছোটবেলায় মাঝে-মাঝে ওর কানে ব্যথা হতো। কটকটানি ব্যথা। কিন্তু এ-ব্যথার ধরনটাই অন্যরকম। ঠিক বোঝানো যায় না।

ওকে ফিরে আসতে দেখে মালা অবাক হল। সাধারণত অসিত দশটা-এগারোটায় ফেরে। তখন রুটি-তরকারি বা যা হোক কিছু মুখে গুঁজে টিফিনটা সেরে নেয়। তারপর সঙ্গে-সঙ্গেই আবার বেরিয়ে যায়। ওর স্নান বা দুপুরের খাওয়ার সময় দেড়টা-দুটো।

মালা বারান্দায় তোলা উনুনে রান্না করছিল। মায়ের মেশিন একইরকমভাবে চলছে। অসিত কোনও কথা না বলে সোজা ঢুকে গেল নিজের ঘরে। জামাটা খুলে শুয়ে পড়ল আবার। কানের ব্যথাটা বাড়ছে। গলাটাও কেমন অদ্ভুত জ্বালা করছে। অসিত ক্রমশ ভয় পেয়ে যাচ্ছিল।

জানলা দিয়ে গাছের ডাল-পাতা দেখা যাচ্ছে। দোয়েল পাখিটা লেজ খাড়া করে ডাল থেকে ডালে লাফাচ্ছে। শিস দিচ্ছে। কিন্তু শিসের শব্দটা কেমন বিচিত্র শোনাচ্ছে না! অসিত দু-হাতে কান চেপে ধরল কিছুক্ষণের জন্য। দোয়েলটা যে-গাছে বসে আছে, সেই গাছের শেকড় ছড়িয়ে রয়েছে ওর পিতৃপুরুষের ভূমির অন্তরে। কালই সীতেশদাকে একটা স্পষ্ট উত্তর দিতে হবে। উত্তর যদি সীতেশদার মনের মতো না হয়, তা হলে…।

মালা এসে ঘুরে ঢুকল। হাতের থালায় রুটি তরকারি। বলল, কী রে, দাদা, শুয়ে আছিস যে! খাবি না?

অসিত বলতে চাইল, আমার শরীর ভালো নেই। কিন্তু কথাগুলো কেমন অদ্ভুত শোনাল। তা ছাড়া আরও একটা জিনিস খটকা লেগেছে অসিতের। মালার বলা কথাগুলোও ওর কানে অন্যরকম শুনিয়েছে। কেমন যেন তীক্ষ্ণ, ধাতব, জড়ানো স্বর।

অসিত মাথা নাড়ল। কোনওরকমে বলল, গলায় কানে অসহ্য ব্যথা। ডাক্তার…ডাক্তার…। তারপর দু-হাতে আবার কান ঢাকল। চোখ বুজে ফেলল একইসঙ্গে।

এইভাবে শুয়ে থাকতে-থাকতে কখন যে ও ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙল মালার ধাক্কায়। মালা ওকে ডেকে-ডেকে কী যেন বলছে। অসিত সে-কথার একটি বর্ণও বুঝতে পারছিল না। অসিত মালার হাতে নিজেকে ছেড়ে দিল। কথা না বুঝতে পারলেও ও মালার ইশারা আঁচ করতে পারছিল। তাই জামাটা গায়ে দিয়ে নিল। মালা ওর কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বর হয়েছে কি না। পরীক্ষা করে যেন স্বস্তি পেল। তারপর অসিতকে একরকম জোর করেই একটা রুটি আর তরকারি বলতে গেলে খাইয়েই দিল।

মা এসে ঘরে ঢুকল। কী যেন বলল মালাকে। কুড়িটা টাকা দিল ওর হাতে। মালা সেটা ব্লাউজের ফাঁকে গুঁজে দাদাকে নিয়ে বাইরে এল।

বাবা কলতলায় স্নান করছিল। মাথায় জল ঢালা থামিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে কিছু বলল। মালা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে অসিতকে নিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়।

বেলা প্রায় বারোটা হলেও ঝাঁঝাঁ রোদ্দুর নেই। একটা মেঘের পরত সূর্যকে প্রশমিত করে রেখেছে। একটা রিকশো ডেকে মালা অসিতকে নিয়ে তাতে উঠে বসল। কোথায় যাবে বলতেই রিকশোর চাকা ঘুরতে শুরু করল।

সকালে দাদার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল মালা। তখনই ও রাস্তায় বেরিয়ে একটা বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে ভোলাকে খবর দিয়েছিল। ভোলা যে মালার ব্যাপারে দুর্বল তা মালা জানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোলা অপুকে নিয়ে হাজির হয়েছিল। তারপর মালাকে নিয়ে গিয়েছিল সীতেশদার কাছে। সীতেশদাই একেবারে শশব্যস্ত হয়ে নামজাদা এক ই-এন-টি স্পেশালিস্টকে ব্যক্তিগত চিঠি লিখে দিয়েছে। বলেছে, দুপুরে উনি বাড়িতে লাঞ্চ করতে আসেন। আমার চিঠি দেখালে সিতুকে দেখে দেবেন। আর তুমি আমাকে এসে বলে যেয়ো সিতু কেমন আছে। মাঝে-মাঝে এসো আমার এখানে—যোগাযোগ রেখো।

ডাক্তারবাবু নানানভাবে পরীক্ষা করলেন অসিতকে। বিভিন্ন মাপের টিউনিং ফর্ক হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে অসিতের কানের কাছে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন, কপালে আর মাথায় ঠেকিয়ে নানান প্রশ্ন করলেন। কিন্তু অসিতের জড়ানো গলার উত্তর কিছু বোঝা গেল না। ও শুধু মাথা নাড়ছিল।

একইরকম বিশদভাবে অসিতের জিভ-গলা-নাক পরীক্ষা করলেন তিনি। কিন্তু রহস্য পুরোপুরি যে ভেদ করতে পারলেন তা নয়। অসিতকে কাগজে লিখে তিনি প্রশ্ন করতে লাগলেন, আর অসিতও কাগজে লিখে উত্তর দিতে লাগল।

প্রায় আধঘণ্টা-চল্লিশমিনিট পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তারবাবু কপালে ভাঁজ ফেলে যা বললেন তা শুনে মালা চমকে গেল।

তিনি বললেন, আপনার দাদা শুধু আলট্রাসনিক শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। মোটামুটিভাবে কুড়ি থেকে কুড়ি হাজার পর্যন্ত কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ মানুষ শুনতে পায়। আমার মনে হচ্ছে, এই রেঞ্জের কোনও শব্দই আপনার দাদা শুনতে পাচ্ছেন না। কী করে এরকম হল বুঝতে পারছি না। আরও কিছুদিন আপনারা দেখুন। তবে ওঁর নিজের কথা উনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন, বুঝতে পারছেন। অথচ আমরা একটুও বুঝতে পারছি না। তাতেই মনে হচ্ছে ওঁর ভোকাল কর্ডও আলট্রাসনিক রেঞ্জের ভাইব্রেশন জেনারেট করছে। তবে আরও ডিটেইল্ড পরীক্ষা বা অপারেশান ছাড়া শিয়োর করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

আলট্রাসনিক শব্দতরঙ্গ! মালা অবাক হয়ে ভাবছিল। মানুষ যেসব শব্দ শুনতে পায় না দাদা তাই শুনছে! যে-শব্দতরঙ্গে কোনও মানুষ কথা বলতে পারে না, সেই শব্দতরঙ্গ বেরিয়ে আসছে দাদার গলা থেকে। এখন তা হলে কী হবে? কে বুঝবে দাদার কথা! দাদাও তো আর কারও কথা বুঝতে পারবে না। মালার কান্না পেয়ে গেল।

ডাক্তারবাবু কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে বললেন, এগুলো সাধারণ ওষুধ। জ্বর-টর হলে বা ব্যথা হলে খাইয়ে দেবেন। পুরো ব্যাপারটা ঠিকমতো না বুঝে এর বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। বলা যায় না, যেমন হঠাৎই এটা শুরু হয়েছে তেমন হঠাৎ করেই আবার নিজে থেকে সেরে যেতে পারে।

মালা টাকা দিতে গেলে ডাক্তারবাবু নিলেন না। সীতেশদা যখন চিঠি লিখে দিয়েছেন তখন টাকাপয়সার প্রশ্নই ওঠে না। সীতেশদাকে দেবতা বলে মনে হচ্ছিল মালার।

অসিতকে নিয়ে রিকশোয় ফিরতে-ফিরতে মালার গাল বেয়ে দু-এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল। ডাক্তারবাবুর প্রশ্নের উত্তরে অসিত লিখে জানিয়েছিল যে, ওর গলায় বা কানে আর তেমন ব্যথা নেই। কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলতে না পারা, বা কারও কথা শুনতে না পাওয়ার ব্যথা কি কম!

অসিত চুপচাপ রিকশোয় বসেছিল। ওর কোনওরকম শারীরিক কষ্ট হচ্ছিল না। বরং এই নিঃশব্দ জগৎটাকে ওর বেশ ভালো লাগছিল। অবশ্য পুরোপুরি নিঃশব্দ বলা ঠিক হবে না, কারণ গাছের পাতার মৃদু আন্দোলনের কম্পন এখন ওর অতি-সুবেদী কানের পরদায় ধরা পড়ছিল। কারা যেন সমবেতভাবে বিষাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। হাহাকার তুলছে, হায়! হায়!

একটা অদ্ভুত সুর অসিতকে চমকে দিল।

মনমরা হয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে ছিল ও। বাইরে সন্ধের অন্ধকার বেশ গাঢ় হয়ে গেছে। ঘরে একটা টিমটিমে বাল্‌ব জ্বলছে। ইলেকট্রিকের বিল যাতে কম ওঠে সেজন্য বাবা সব ঘরেই পঁচিশ বা চল্লিশ ওয়াটের বেশি বাল্‌ব লাগায় না। এতে মালার পড়াশোনার বড় কষ্ট হতো, কিন্তু উপায় কী!

এখন সেই ঘোলাটে আলোতেই ছুঁচোটাকে দেখতে পেল অসিত। দেওয়ালের কোণ ঘেঁষে ইতিউতি ঘোরাফেরা করছে। আর আশ্চর্য! ওই কুৎসিত প্রাণীটির কাছ থেকেই না ভেসে আসছে সুরেলা ধ্বনি?

অসিত বিছানায় উঠে বসল। অবাক চোখে লক্ষ করত লাগল ছুঁচোটাকে। এতক্ষণ ও ভেবেছে যে, মোটামুটি নিঃশব্দ এক জগতে ও ঢুকে পড়েছে। অথচ, এই মুহূর্তে, এখন, ও কী অদ্ভুতভাবেই না মোহময় সুরের সন্ধান পেল। এই সুর এর আগে কখনও ও শুনতে পায়নি। যদিও ছুঁচো দেখেছে, বা তাদের বিশ্রী কিচকিচ শব্দও শুনেছে বারকয়েক।

ভ্রাম্যমাণ ছুচোঁটাকে কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করছিল অসিতের। বলতে ইচ্ছে করছিল, তুই আমার দোয়েল পাখি।

ঠিক সেই সময়ে বাবা ঘরে ঢুকল। জামা খুলে দেওয়ালের পেরেকে ঝোলাতে গিয়েই ছুচোঁটাকে দেখল। এবং তৎক্ষণাৎ বিশ্রী মুখে হিংস্রভাবে প্রাণীটার দিকে তেড়ে গেল। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কীসব বলে উঠল অসিতকে। বলতেই থাকল।

বিছানায় বসে বাবাকে দেখছিল অসিত। কৃপণ বুড়ো মানুষটা অসিতের দিকে তাকিয়ে সার্কাসের ক্লাউনের মতো অঙ্গভঙ্গি করছে। তার কথা এক বর্ণও শুনতে পাচ্ছিল না অসিত। সেই জন্যই ওর হাসি পেয়ে গেল। ওর হাসি দেখে বাবা আরও ক্ষিপ্তভাবে হাত-পা ছুড়তে লাগল। অসিত আর অপেক্ষা করল না। ধুত্তেরি, বলে বিছানা ছেড়ে উঠে জামা গায়ে দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল।

রাস্তায় সাইকেল, সাইকেল রিকশা, লোকজনের ভিড়, খোলা দোকানপাট ইত্যাদি মিলে জমজমাট ব্যাপার। কিন্তু কোনও শব্দ নেই।

অসিত আপনমনে হাঁটতে লাগল। পথে একটা কুকুর দেখে সেটাকে ‘হুস, হুস’ করে তাড়াল। কুকুরটা অসিতের দিকে পিছন ফিরে থাকলেও ওর কথা বোধহয় শুনতে পেল। কারণ, ঘুরে তাকিয়ে চট করে পথ ছেড়ে সরে গেল।

চলতে-চলতে রাস্তার লোকগুলোকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছিল অসিত। কী বিচিত্রই না লাগছে! কোনও কথা শুনতে না পেলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাবভাব দেখে ঘটনাগুলো আন্দাজ করতে পারছিল ও। আর বেশ মজা পাচ্ছিল।

হাঁটতে-হাঁটতে নীলাদের বাড়ির কাছে চলে এল ও। নীলাকে চেঁচিয়ে ডাকবে নাকি? ওদের একতলার ঘরগুলো অন্ধকার। দোতলায় আলো জ্বলছে। হঠাৎ কী মনে হওয়ায় অসিত চিৎকার করে উঠল, নীলা, নীলা! শিগগির নেমে এসো! তোমাকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে!

অসিত জানত, ওর কথা ও নিজে ছাড়া আর কেউ শুনতে পাবে না। সেইজন্যেই এই খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথাগুলো বলতে পেরে ওর তৃিপ্ত হল। ভালোবাসার কথা এইভাবে বলতে পারলে কত ভালো লাগে। আচ্ছা, আর কেউ ছাড়া শুধু নীলা যদি ওর কথা শুনতে পেত, বুঝতে পারত, তা হলে!

নীলার কথা ভাবতে-ভাবতেই অসিতের সাহস বেড়ে গেল। ও ঢুকে পড়ল বাড়ির ভেতরে। তাপসদা নিশ্চয়ই এখন বাড়িতে নেই। শুধু নীলা আর আলোবউদি রয়েছে। নীলা কি এখনও সেই সকালের ম্যাক্সিটা পরে রয়েছে? নাকি ওর সেই লাল ছাপা শাড়িটা?

একতলার অন্ধকার ঘরগুলো পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল অসিত। চলতে-চলতেই ও ইচ্ছে করে সুর তুলে নীলার নাম ধরে ডাকছিল। এখন নীলার নাম হাজারবার উচ্চারণ করতেও কোনও ভয় নেই।

এমনসময় অন্ধকার একটা ঘরের ভেজানো দরজা খুলে গেল। ঘর থেকে পা টিপে-টিপে বেরোল নীলা। সকালের গোলাপি ম্যাক্সিটা পরে রয়েছে ও। কিন্তু ও বেরিয়ে আসতে-না-আসতেই দুটো সবল হাত ওকে আবার টেনে নিল ঘরের মধ্যে। দরজার পাল্লাটা দেওয়ালে বাড়ি খেয়ে নড়ে গেল। অসিত জানে, ভালোবাসাবাসির শব্দ ওর শুনতে পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু তবুও দেওয়ালে শরীর লেপটে দু-কানে হাত চাপা দিল ও। ওর বুকের ভেতরে পাহাড় ভাঙতে লাগল হুড়মুড় করে। অসিত একশোতলা বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছিল অতলে। ওর কান্না পেয়ে গেল। কিন্তু সেই কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পাচ্ছিল না।

অসিত অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে চুপিচুপি পালিয়ে এল বাইরে। তাড়া খাওয়া দিশেহারা একটা চিতল হরিণ ছুটোছুটি করছিল ওর বুকের বাগানে। ভাবছিল, শ্রুতি আর স্বরের মতো দৃষ্টিটাও যদি যেত তা হলে বেশ হতো।

নীলাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোনদিকে যে ও পা চালিয়েছিল তা ওর খেয়াল নেই। খেয়াল হল ভোলা ওর পিঠে হাত রাখতে।

অসিত দেখল, ও দীনুদার চায়ের দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে। দোকানের কাছাকাছি একটা বড় অশ্বত্থ গাছ। গাছের প্রাচীন কাণ্ড ঘিরে গোল বাঁধানো চাতাল। গজেন দাস ইট-সিমেন্ট-বালি দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছে। সেই চাতাল এখন জমজমাট। সীতেশদা সেখানে বসে রয়েছে মধ্যমণি হয়ে। আর তাকে ঘিরে নদে, সুবু, অপু—সবাই। অনেকের হাতেই চায়ের কাপ। তাতে চুমুক দিচ্ছে।

ভোলা ওকে সীতেশদার কাছে নিয়ে গেল। কী যেন বলল।

অসিত লক্ষ করল, সীতেশদাসুদ্ধ সবাই অবাক চোখে ওকে দেখতে লাগল। সীতেশদা অসিতকে কী যেন জিগ্যেস করল। উত্তরে অসিত মাথা নাড়ল। ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

মেঘলা আকাশ বাতাসের টুঁটি টিপে ধরেছে। চারপাশ থমথমে গুমোট। তার ওপর অসিতের নিঃশব্দ জগৎ আর সকলের তীক্ষ্ণ নজর। অসিতের একটা হাত ওর অজান্তেই গলায় চলে গেল।

কোথা থেকে একটা খাতা জোগাড় করে সীতেশদা ওকে লিখে প্রশ্ন করল, কেমন আছিস এখন?

অসিতও লিখে জবাব দিল, ভালো, খুব ভালো।

কেন যে ওই কথাগুলো ও লিখল! লিখতে গিয়ে অসিতের হাত কাঁপছিল। ওর বুকের বাগানে হরিণটা ছুটোছুটি করছিল তখনও।

কিন্তু ওর উত্তরটা সীতেশদা জোরে-জোরে পড়ে শোনাতেই আর সবাই হো-হো করে হেসে উঠল। যদিও হাসির কোনও শব্দ অসিত শুনতে পাচ্ছিল না, তবুও ওর কান লাল হয়ে গেল। ও চেঁচিয়ে বলল, সীতেশদা, বিশ্বাস করুন, আমি আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। আমার গলায়-কানে আর কোনও ব্যথা নেই।

অসিতের কথা কেউ বুঝল না। হাসতে-হাসতেই সীতেশদা লিখে প্রশ্ন করল, তোর বাপকে বলেছিলি আমার লাস্ট ওয়ার্নিং-এর কথা?

প্রশ্নটা পড়ে অসিত সীতেশদাকে আবার খুঁটিয়ে দেখল। সাদা কাগজে লেখা হরফগুলো কি এই লোকটার আঙুলগুলোই লিখল? এই লোকটাই না একদিন ঢ্যামনা বলেছিল অসিতের বুড়ো বাবাকে?

অসিতের মাথার ভেতরে কেউ যেন এক লাথি মেরে সাজানো দাবার ছক উলটে দিল। ও চিৎকার করে উঠল, জান থাকতে শালা তোমাকে ওই জমি দেব না। আমাদের বাপ-ঠাকুরদার ভিটেয় শালা তুমি ঘুঘু চড়াবে ভেবেছ? লেতা হয়ে পাবলিকের হোগায় বাঁশ দেওয়া! গজেন দাসের কেত্তনে শালা খোল বাজাও—তোমার লজ্জা করে না, জানোয়ার—।

অসিত উত্তেজনায় হাত-পা ছুড়ে কথা বলছিল। ওর কথা কেউ শুনতে না পেলেও ভাব বুঝতে পারছিল। সুতরাং আচমকাই একটা ঘুসি এসে পড়ল ওর পেটে।

অসিত ঝুঁকে পড়ল। আর তখনই অনেকগুলো চেনা কিংবা অচেনা হাত ওকে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করতে লাগল। বারবার। পথচারী অনেকেই ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছিল, তবে তারা নির্বিকারে পা ফেলে চলে যাচ্ছিল।

একটা জোরালো লাথি অসিতকে ছিটকে ফেলে দিল রাস্তায়। পড়ে যেতে-যেতে একটা ছুঁচোর সুরেলা ধবনি শুনতে পেল ও। এটাই কি একটা কুৎসিত প্রাণীর সুন্দর প্রতিবাদ? অসিতের চোখের সামনে সবকিছু ঘুরপাক খাচ্ছিল।

একটু পরেই সচেতন হল অসিত। রাস্তার ধুলোয় ও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কানে আসছে এক অদ্ভুত মিষ্টি ডাক। খুব মিহি—যেন ঝাড়লণ্ঠনের টুংটাং।

মুখ তুলে দেখতে চেষ্টা করল ও। কাছেই ঢালু নর্দমা। তারই পাড়ে ড্যাবড্যাবে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বসে আছে কুৎসিত পোকাটা। ওরই দেহ থেকে বেরিয়ে আসছে এই নবীন জলতরঙ্গ।

ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল অসিত। হাত-পায়ের ধুলো ঝেড়ে নিল। ঠোঁটের কোণ জ্বালা করছে। মাথায় কেউ ছুঁচ ফোটাচ্ছে যেন। কয়েকসেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ও বাড়ির দিকে পা বাড়াল। পেছনে, অশ্বত্থ গাছের দিকে, আর তাকাল না। ও জানে, অপু-নদে ওরা সবাই হিংস্র অথচ অবিশ্বাসের নজরে ওকে দেখছে। ভাবছে, এই রোগা ভীতু ছেলেটার মধ্যে হঠাৎ কোন পাগলামি বাসা বাঁধল! পাগলামিতে না ধরলে কেউ এরকম বোকার মতো হঠকারী কাজ করে!

অসিত দু-পা বাড়াতেই অপু ছুটে এল ওর কাছে। একটা চিরকুট ধরিয়ে দিল হাতে। ঝাপসা নজরে সেটা পড়ে ফেলল অসিতঃ তোর বাবাকে বলে রাখিস কিন্তু। কাল আমরা ফাইনাল কথা বলতে যাব।

অসিত চিরকুটটা দুমড়ে-মুচড়ে চেপে ধরল হাতের মুঠোয়। তারপর ছুড়ে ফেলে দিল নর্দমায়। অপু সেটা দেখল কি না কে জানে। অসিত ওর দিকে একটিবারের জন্যও ফিরে তাকায়নি।

গুমোট কেটে গিয়ে হঠাৎই খানিক ফুরফুরে বাতাস বইল। অসিতের রোমকূপে বাতাসের কণার ছোঁয়া লাগল। ও হাঁটতে লাগল বাড়ির দিকে। রাস্তার লোকজন কমে এসেছে, দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে। অসিত সব দেখেও যেন দেখতে পাচ্ছিল না। ওর চোখে ভাসছিল পিতৃপুরুষের একফালি জমিটুকু। বুকের ভেতরে একটা অলৌকিক অনুভব নিয়ে ও নীলাদের বাড়িটা পেরিয়ে গেল। নীলার কথা ওর মনে পড়ল না।

বাড়ির কাছে এসে কী যেন মনে হল অসিতের। ও দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। তারপর পাশের পতিত জমিটুকুর কাছে এগিয়ে গেল। ভাঙা বাখারির বেড়া পেরিয়ে অন্ধকার মাটিতে পা রাখল। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন। শিউলি, করবী, লেবু গাছের পাতার কাঁপুনি শুনতে পাচ্ছিল অসিত। এইসব আশ্চর্য শব্দ ও আগে কখনও শোনেনি। রাতের আঁধারে এইসব কুচিকুচি শব্দমালা ফিসফিস করে এক মোহময় সুর জাগিয়ে তুলছিল। একইসঙ্গে আরও কত বিচিত্র সঙ্গীত শুনতে পেল অসিত। আগাছার অন্তরাল থেকে নিশাচর কীটপতঙ্গের দল অসিতকে উপহার দিচ্ছে এক স্বপ্নময় জলসা। ক’দিন আগেও যা ছিল কর্কশ কান্না, আজ তা অসিতের কানে অন্যরকম এক আগমনি গান।

আনন্দে কান্না পাচ্ছিল অসিতের। এই সুর, এই গানের কথা, কোনওদিনই ও জানতে পারেনি। কেউ বলেনি ওকে। ওর অদ্ভুত অসুখটাই খুলে দিয়েছে এই নতুন জগতের দরজা। সারা জীবনের শোনা কথাগুলো একপলকে ওর কাছে অর্থহীন মিথ্যে হয়ে যাচ্ছিল।

এমনসময় টিপটিপ বৃষ্টি নামল। আর একইসঙ্গে সুরেলা শিসের শব্দ শুনতে পেল অসিত। ও মুখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। নদীর স্রোতের মতো সাবলীল ভঙ্গিতে ডানা নেড়ে বাতাস কেটে উড়ে চলেছে দুটো বাদুড়। ওরাই শিস দিচ্ছে সুরেলা আওয়াজে।

অসিত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল রাতের আকাশে উড়ে যাওয়া প্রাণী দুটোর দিকে। ওর চোখে গালে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল। বাদুড়, ছুঁচো, কীটপতঙ্গ, এইসব কুৎসিত জীবগুলোর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এত মধুর গোপন সঙ্গীত!

অসিত বাদুড়ের শিস নকল করে শিস দিল। নিজের গলায়-কানে হাত বোলাল। বলল নিজের মনেই, আহামরি অসুখ রে আমার! আমায় ছেড়ে তুই যাস না।

সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত পিতৃপুরুষের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিভোর হয়ে রইল অসিত। বাবাকে হঠাৎই ওর ভীষণ ভালো লাগছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *