বৃহৎ রতিশাস্ত্র – ডাঃ সমরেন্দ্রনাথ পান্ডে সম্পাদিত
প্রকাশক : রাজেন্দ্র লাইব্রেরী
পরিমার্জিত সংস্করণ : জানুয়ারি ২০১০
অসম্পূর্ণ বই
.
রতিশাস্ত্রের উৎপত্তি ও প্রারম্ভিক কথা
ভারতীয় ঐতিহ্যের একটি বিশেষ দিক আছে।
আমাদের জীবনের যা কিছু শ্রেষ্ঠ দিক—তা সে সমাজ, দর্শন, জীবনসূত্র, পারিবারিক নিয়ম-শৃঙ্খলা সব কিছুই একটি বিশেষ ধর্মের ভিত্তিতে স্থাপিত।
আর্যজাতির যা-কিছু জীবনদর্শন সবই বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ব্যক্ত। আর্য-ঋষিরা অনুভব করেছিলেন, সাধারণ মানুষের জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত করতে হলে তাদের জীবনের সমস্ত কিছু মূল অংশকেই ধর্মের নিয়মে বাঁধতে হবে। তাই আমরা প্রাচীন ইতিহাস, দর্শন, বিবাহ, দাম্পত্য জীবন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সামুদ্রিক বিচার, তন্ত্রমন্ত্র সব কিছুই ধর্মের মধ্য দিয়ে দেখতে পাই।
বিবাহ তাই আমাদের দাম্পত্য ধর্ম— স্ত্রী তাই সহ-ধর্মিনী অর্থাৎ স্বামীর ধর্ম আচরণকে যে সহায়তা করে।
প্রাচ্য ঋষিদের এই অনাদি গভীর ধ্যানমন্ত্র আমরা যুগে যুগে দেবদেবীর বা স্বয়ং শ্রীভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী বলে বিশ্বাস করে এসেছি।
শুধু বিবাহ নয়—দাম্পত্য জীবন ও রতিপ্রকৃতি সুখমন্ডিত করবার ও এ বিষয়ে বিশদ জ্ঞান দেবার জন্যে যে সব শাস্ত্র রচিত, তাও ভগবান বা দেবদেবীর মুখনিঃসৃত বাণী হিসেবে ব্যক্ত হয়েছে। ভারতের জনগণ যুগে যুগে তা বিশ্বাস করেছে। তাই রতিশাস্ত্র, কামশাস্ত্র বা কামসূত্রম্, কোকশাস্ত্র প্রভৃতি আমরা শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকি।
পদ্মপুরাণও পুরাণের একটি অংশ। ব্রহ্মপুরাণ, শিবপুরাণ ইত্যাদির মত এটিও উচ্চ আসন দাবী করে। এর মধ্যে সামাজিক চিকিৎসা, সামুদ্রিক, রতিশাস্ত্র প্রভৃতি বিবিধ অংশ আছে—যা স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব প্রশ্নোত্তরছলে পরমাপ্রকৃতি পার্বতীর কাছে ব্যক্ত করেছেন।
এই পদ্মপুরাণও মনুসংহিতা, যজুর্বেদ, সংহিতা ইত্যাদির মত ভারতীয় জীবনের বিরাট ধর্মের সুমহান ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তাই পদ্মপুরাণকে আমরা শ্রদ্ধা করি। ভারতীয়রা বিশ্বাস করতেন, বিবাহ শুধু পাশ্চাত্য পদ্ধতির মত কন্ট্রাক্ট বা চুক্তিবদ্ধ দৈহিক মিলন নয়—এ হলো নরনারীর আজীবন ধর্মীয় বন্ধন।
তাই বিবাহকে দৃঢ়ভাবে জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দাম্পত্য জীবনকে প্রকৃত শিল্পের মত প্রকৃত সুমর্যাদা দিয়ে উচ্চ মানবিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছে আমাদের শাস্ত্রগুলি।
পদ্মপুরাণের একটি অংশই হলো এই রতিশাস্ত্র। এটি পাশ্চাত্য নগ্ন যৌন আলোচনার মত অশ্লীল নয়—এই গ্রন্থের মধ্যে বিভিন্ন পুরুষ ও নারীজাতির লক্ষণ, কিরূপ মিলন উত্তম, কিভাবে শ্রেষ্ঠ সন্তান-সন্ততি লাভ করা যায় বিবাহযোগ্য কন্যা নির্ণয় ও তাদের নানাবিদ লক্ষণ, নারী গমনের কালাচার বিচার, সতী, অসতী, জারজ প্রভৃতি নির্ণয়, সৃষ্টিতত্ত্ব, মানবের ভাগ্য নির্ণয় ইত্যাদি একান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।
কিন্তু বর্তমান বইটি শুধু অনুবাদ নয়—প্রতিটি অংশের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা এবং বাস্তবে কি ভাবে এই মহান গ্রন্থটিকে অনুসরণ বা এর সম্পূর্ণ অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা যায় তেমনিভাবে এর সরল বিবরণ প্রদত্ত হয়েছে। প্রাঞ্জলতা ও বিস্তৃত ব্যাখ্যাই এই গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য।
এ ছাড়া মহর্ষি বাৎস্যায়নের কামসূত্রের কিছু মূল্যবান অংশ এতে সন্নিবিষ্ট। আশা করা যায়, এই গ্রন্থ পাঠে দেবাদিদেব মহাদেবের মুখনিঃসৃত বাণী তথা ভারতীয় রতিবিজ্ঞান সমাজজীবনের পক্ষে কতটা মঙ্গলদায়ক তা বুঝতে এবং সে বিষয়ে বিস্তৃত জ্ঞানলাভ করতে সাহায্য করবে। দাম্পত্য জীবনকে কল্যাণের পরশমণির স্পর্শে সঞ্জীবিত করে তুলে এটি মহামূল্য কোহিনূরের মত দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য বলে প্রমাণিত হবে।
সাধারণ মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হ’লে গ্রন্থকার এবং প্রকাশকের পরিশ্রম সার্থক।
এস. এন. পাণ্ডে






Leave a Reply