পঞ্চম পরিচ্ছেদ
বিবাহের যোগ্যাযোগ্য কুমারী নির্ণয়
পার্বতী চার জাতির নরনারীর বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত হয়ে মহাদেবকে বললেন- হে দেব, এখন আমার কাছে কুমারীর লক্ষণসমূহ কীর্তন করুন।
বিবাহের উপযুক্ত কুমারী নির্ণয় অত্যন্ত সহজ বিষয় নয়।
উচ্চ বংশে জন্ম নিলে বা আপাদমধুর চেহারা হলেই যে সে উত্তম কুমারী হবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
কোন্ নারী বিবাহের যোগ্যা, কে অযোগ্যা, কাকে বিবাহ করলে শুভ ফল হয়, কাকে বিবাহ অশুভ ফলপ্রদ, এসব অত্যন্ত চিন্তা ও বিচারের বিষয়।
প্রাচীনকালে আমাদের দেশের ঋষিবাক্য প্রদত্ত বিধানসমূহ আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তব জীবনে অনুসরণ করে চলতাম। তাই সেকালে বিবাহ অসুখীর সংখ্যা খুবই কম ছিল। যাঁরা একটু পন্ডিত ও বুদ্ধিমান শ্রেণীর মানুষ, তাঁরা সকলেই এই সব শুভাশুভ বিচার করে বিবাহ করতেন এবং সুখী দাম্পত্য জীবনযাপন করতেন। অবশ্য অসুখী যে ছিল না এমন নয়—তবে তাদের সংখ্যা নগন্য। তার কারণ তারা হয়ত শাস্ত্রমত বিচারে প্রবৃত্ত হতেন না।
আজকে যুগ পালটেছে। মানুষ আজ সব কিছুকে যুক্তি-তর্ক দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করতে চায়।
আমরা দেখি, ইচ্ছামত চোখের নেশায় যুবক যুবতীরা বিবাহ বা প্রেমে আবদ্ধ হয় এবং তাদের জীবন অল্পদিনের মধ্যেই বিষময় হয়ে ওঠে।
দাম্পত্য জীবনের সুখ, আনন্দ, সমৃদ্ধি থেকে তারা বিরত হয়-বিবাহ তাদের কাছে বিষবৎ মনে হয়। তাই আজ বিবাহবিচ্ছেদ প্রথা আমাদের দেশে এত প্রভাব বিস্তার করছে।
কিন্তু আমরা সেই সব প্রথার প্রশংসা যতোটা করে থাকি তা সম্পূর্ণ ভুল। তা আমাদের ভারতীয় রীতি এবং আচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আমরা যদি বিবাহ বিচ্ছেদের চিন্তা এত বেশি না করে কি উপায়ে দাম্পত্য জীবন অধিকাংশ সুখময় করে তোলা যায় তা নিয়ে চিন্তা করতাম, তবে দেশ জুড়ে আজ এই বিধান প্রবর্তিত হত না। দাম্পত্য জীবন নিয়েও আজ এই সর্বগ্রাসী সমস্যার সৃষ্টি হত না।
বিবাহবন্ধন যে আজীবনের বন্ধন এই সংস্কার হৃদয়ের মূলে দৃঢ় করে সুখী দাম্পত্য জীবনের অন্বেষণে যদি আমরা ফিরতাম, তাহলে এই কুমারী-বিচারের সার্থকতা যে কতো বেশি তা মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারতাম।
বিবাহের যোগ্যা অযোগ্যা কুমারী নির্ণয়ের শাস্ত্রগত বিধান এবার বর্জন করছি।
বদ ব্রহ্মন মহাভাগ কুমারীলক্ষণং শুভ।
কা বা বিবাহনীয়া চ কা ত্যাজ্যা ভবেদ ধ্রুবং ।।
পার্বতীর অনুরোধে মহাদেব অতঃপর বিবাহের যোগ্যা অযোগ্যা কুমারী নির্ণয়ের বর্ণনায় ব্রতী হলেন।
মহাদেব বললেন- শোন দেবি, যে কন্যা শ্যামাঙ্গী, যার কেশরাশি মনোহর দেহে অল্প অল্প লোমপংক্তি বর্তমান, যে কন্যা মনোহারিণী মনোহর ভ্রুমুক্ত, সুশীলা, মন্থর গতিশালিনী, সুদন্তা ও পঙ্কজাক্ষী এবং যে কন্যার কটিদেশ ক্ষীণ, সেই কন্যা কুলহীনা হলেও কুলের কল্যাণকারিণী হয়ে থাকে। এমন কন্যা খুব বেশি দেখা যায় নী সত্য, তবে যদি কখনও এরূপ কন্যা দেখা যায় তবে কুলহীনা হলেও তেমন কন্যাকে বিবাহ করা উচিত।
শাস্ত্রে বলেছেন—‘স্ত্রীরত্নং দুষ্কুলাদপি’—তাই খারাপ কুলে জন্ম নিলেও এরূপ নারী রত্নসদৃশা–তাদের বিবাহ করতে কোন আপত্তি ওঠে না।
শ্যামা সুকেশী তনুলোমরাজী।
সুভ্রুঃ সুশীলা সুগতিঃ সুদন্তা ॥
বেদীবিমধ্যা যদি পঙ্কজাক্ষী।
কুলেন হীনাপি বিবাহনীয়া ॥
মহাদেব আরো বললেন- যে কন্যা ধৃষ্টা, অর্থাৎ অতিরিক্ত কথাবার্তা বলে বা প্রগল্ভা, কুদস্তা অর্থাৎ যার দাঁত উঁচু বা ফাঁক বেশি বা দাঁতের জন্যে মুখের চেহারা খারাপ দেখায়, পিঙ্গলনয়না অর্থাৎ যার চোখের মণি ঠিক কালো না হয়ে একটু পিঙ্গল ধরনের, যার মধ্যদেশ পুষ্ট—অর্থাৎ যার কোমর নিতম্ব ইত্যাদি পুষ্ট কিন্তু অন্য অংশ তত পুষ্ট নয়, যার সারা দেহ লোমে পরিপূর্ণ থাকে, এই ধরনের কন্যার যতো উচ্চ কুলেই জন্ম হোক না কেন—এমন কি সে যদি রাজকন্যাও হয়, তবু সে বিবাহের যোগ্য নয়। সে কন্যা কুলক্ষণযুক্ত — তাকে বিবাহ করা কখনও উচিত নয়।
ধৃষ্টা কুদন্তা যদি পিঙ্গলাক্ষী।
লোম্বা সমাকীর্ণপদাঙ্গযষ্টিঃ ॥
মধ্যে চ পুষ্টা যদি রাজকন্যা।
কুহেহপি যোগ্যা না বিবাহনীয়া ॥
মহাদেব তারপর শাস্ত্রমতে আরও কুলক্ষণা নারীর বর্ণনা করতে লাগলেন। তিনি বললেন- যে কন্যা ধূম্রবর্ণা অর্থাৎ ফ্যাকাশে কালো রঙের অধিকাঙ্গী অর্থাৎ যার দেহে কোন অতিরিক্ত অঙ্গ থাকে (কোন কোন মেয়ের শরীরে হাতে বা পায়ে ছয়টি আঙ্গুল থাকে এমনি) রোগিণী অর্থাৎ সর্বদা যে নারী ভোগে, লোমশূন্যা অর্থাৎ যার দেহ এত চকচকে যে খুব সূক্ষ্ণ একটি লোম পর্যন্ত নাই, অথবা যার দেহে বেশি লোম থাকে, সে কন্যা কুলক্ষণযুক্তা।
এ ছাড়া বাচাল অর্থাৎ যারা বেশি কথা বলে, পিঙ্গলবর্ণ, নক্ষত্রনামিকা, বৃক্ষনামিকা, নদীনাম্নী, পক্ষিনাম্নী, সর্পনাম্নী, অস্তিগিরি নারী অর্থাৎ নক্ষত্র, বৃক্ষ, নদী, পাখি, সাপ বা পাহাড়ের নামে যে মেয়ের নামকরণ হয়ে থাকে অথবা ভীষণানাম্নী অর্থাৎ যে মেয়ের ভয়ংকর নাম হয়, দূতীনামধারিণী অর্থাৎ দূতীর নামে যার নাম হয়, এরূপ কন্যার লক্ষন ভাল নয়, অর্থাৎ তারা কুলক্ষণযুক্তা। এমন নারীকে কখনও বিবাহ করা উচিত নয়।
এখানে একটা কথা।
নদীনাম্নী ও নক্ষত্রনাম্নী কন্যাকে বিবাহ করা উচিত নয় একথা বলা হলেও তার মধ্যে কয়েকটি বিচারে শুভ সূচিত হয়।
গঙ্গা, যমুনা, গোমতী, সরস্বতি এই চার নদীর নাম, তুলসী, মালতী, এই দুই বৃক্ষের নাম এবং রেবতী, অশ্বিনী ও রোহিনী এই তিন নক্ষত্রের নামকরণ হলে তাতে দোষ নেই। এই সব নামের কন্যা অশুভ হয় না।
নোদ্বহেৎ কপিলাং কন্যাং নাধিকাঙ্গীং ন রোগিণীং ।
নালোমিকাং নাতিলোম্নাং ন বাচালাং ন পিঙ্গলাং ।।
ঋক্ষবৃক্ষনদীনাম্নীং নাস্তপৰ্ব্বতনামিকাং।
ন পক্ষ্যহিপ্রেষ্যনাম্নাং ন চ ভীষণনামিকাং ।।
অন্যত্র
গঙ্গা চ যমুনাচৈব গোমতী চ সরস্বতী।
নদীনাং নামতো বৃক্ষে মালতী তুলসী তথা।
রেবতী চাশ্বিনী তেষু রোহিণী শুভদা ভবেৎ ॥
এ ছাড়া বিবাহের অযোগ্যা আরও কয়েক শ্রেণীর নারীর কথা বলা হয়েছে।
যে কন্যার চক্ষু ট্যারা অর্থাৎ যে নারী কেকরা, যে কন্যা দুঃশীলা বা সকলের অপ্রিয় কার্যাদি করে, সে নারী পিঙ্গলবর্ণা ও হাসলে যার গালে কূপ অর্থাৎ টোল দেখা যায় সেই নারীকে বন্ধকী বলা হয়।
এরূপ নারী বিবাহের যোগ্যা নয়— তাদের কখনও বিবাহ করা উচিত নয়।
নেত্রে যস্যাঃ কেকরে পিঙ্গলে বা
স্যাদ্ দুঃশীলা স্যাদবলোলেক্ষণা চ।
কূপৌ যস্যাঃ গন্ডয়োঃ সম্মিতে চ
নিঃসন্ধিগ্ধাং বন্ধকীং ত্বাং বদন্তি ॥
মহাদেব এইভাবে বিভিন্ন সুলক্ষণ ও কুলক্ষণযুক্ত নারীর কথা বর্ণনা করলেন।
তারপর তিনি বিবাহযোগ্যা কুমারীর বিভিন্ন বিভাগ করে তাদের লক্ষণসমূহ বর্ণনা করতে প্রয়াসী হলেন।
মহাদেব বললেন—শোন দেবি হৈমবতী, জগতে যতো নারীজাতি অর্থাৎ কুমারী নারী আছে, তাদের বিচার করবার জন্যে প্রধানতঃ তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
বিবাহযোগ্যা কুমারী বিচার করতে হলে এই ভাগ অনুযায়ী বিচার করে বিবাহে অগ্রসর হওয়া চাই।
মহাদেবের বাক্য অনুসারে জগতের যাবতীয় কুমারীকে তিন ভাগে বিভক্ত হ’ল :-
(১) উত্তমা কুমারী। (২) মধ্যমা কুমারী। (৩) অধমা কুমারী।
অবশ্য লক্ষণ অনুযায়ী বিচার করলে অনেক কুমারী আছে যাদের উত্তমার কিছু লক্ষণ ও মধ্যমার কিছু লক্ষণ মেলে, এমনি মাঝামাঝি অনেক নারী দেখা যায়।
তেমনি মধ্যমা ও অধমার মিশ্রণযুক্ত কুমারীও দেখা যায়। তবে অধমার গুণ যে কুমারীর মধ্যে বেশি, তেমন কুমারী সর্বদা পরিত্যাজ্য।
তাই বিবাহে বিচার্য বিষয়ের মধ্যে সবার আগে দেখতে হবে এই কুমারী বিচার।
উত্তমা কুমারীর লক্ষণ
মহাদেব সর্বপ্রথমে উত্তমা কুমারীর লক্ষণাদি বর্ণনা করতে লাগলেন।
যে নারীর দেহ নাতিদীর্ঘ, নাতিহ্রস্ব, যার বর্ণ শ্যাম, দেহ ক্ষীণ, গতি গজেন্দ্রের মত, করতল রক্তপদ্মের মত, স্তন খুব উচ্চ নয় আবার খুব ক্ষুদ্রও নয় এবং যে নারী ধর্মপরায়ণা ও পতিব্রতা, তাকেই উত্তম নারী বলে জানবে।
সকল বিজ্ঞ লোকের মতে এই উত্তমা কুমারী বা সর্বশ্রেষ্ঠা কুমারী প্রত্যেকটি পুরুষের জীবনকে সুখময় করে তুলতে পারে।
শৃণু দেবি প্রবক্ষ্যামি নাৰ্য্যাস্তু ত্রিবিধ মতাঃ।
উত্তমা মধ্যমা জ্ঞেয় তথা চৈবাধমা স্মৃতা ॥
নাতিদীর্ঘা নাতিহ্রস্বা শ্যামাঙ্গী ক্ষীণদেহিকা।
গজেন্দ্র-গামিনী চৈব রক্তপদ্মকরা শুভা।
পতিপরায়ন যাতু তথা মধ্যবিধস্তনী।
ধার্ম্মিকা চৈব যা নারী সৈবোত্তমা প্রকীর্তিকা ॥
মধ্যমা কুমারীর লক্ষণ
মহাদেব তারপর বললেন-উত্তমা কুমারীর লক্ষণ তোমার কাছে পাঠ করলাম, তা শুনলে। এবারে মধ্যমা কুমারীর দেহে কি কি লক্ষণ থাকে তা বর্ণনা করছি শোন।
মধ্যমা নারীর দেহ মাঝামাঝি হয়। তারা খুব দীর্ঘ বা বেঁটে হয় না, খুব রোগা বা মোটাও হয় না। তাদের দীর্ঘ চুল থাকে। তারা কোন দিন কোন আলস্য করে না। সব কাজ তারা সুন্দররূপে করতে পারে ও তা করতে ভালবাসে। তাদের নাভি গভীর হয়। সুখ ও দুঃখ দুই-ই তাদের কাছে সমান। সব সময় তারা হেসে কথা বলে থাকে। তারা সদাচারপ্রিয় হয় ও মিষ্টভাষায় আলাপ করে থাকে। ধর্মপথে তাদের সব সময় মতি থাকে—অধর্মের পথে আকৃষ্ট হয় না। অল্প আহার করে এই নারীরা আনন্দিত হয়—বেশি ভোজন করতে কখনও ভালবাসে না।
এ নারীরা সকলকে আত্মীয়ের মত দেখে— গুরুজন বা গুরুস্থানীয় ব্যক্তিদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা-ভক্তি করে থাকে। দেব ব্রাহ্মণ প্রভৃতির প্রতি তাদের হৃদয় একান্ত ভক্তিতে পূর্ণ থাকে।
এইসব সুলক্ষণ যে সব নারীর থাকে তারা মধ্যমা কুমারী অর্থাৎ তাদের বিবাহ করলে মোটামুটি সুখে দিন কেটে যায়।
মধ্যকায়া দীর্ঘকেশী যদালস্যবিবর্জ্জিতা।
সমভাবা চ যা নারী দুঃখেষু চ সুখেষু চ ॥
সদা হাস্যমুখী যা চ তথা গভীরনাভিকা।
মিষ্টভাষা চ সৰ্ব্বত্র সদাচার-পরায়ণা ॥
ধর্ম্মে মতিঃ সদা যস্যাঃ সন্তুষ্টা স্বল্পভোজনে।
আত্মভাবা চ সৰ্ব্বেষু গুরুভক্তি-পরায়ণা ॥
দেবপূজারতা সাধ্বী দ্বিজসেবা-পরায়ণা।
মধ্যমা রমণী সৈব সৰ্ব্বশাস্ত্রেষু কীৰ্ত্তিকা ॥
অধমা কুমারীর লক্ষণ
এতক্ষণ মহাদেব উত্তমা ও মধ্যমা কুমারীর যে বিবরণ দিলেন তা হলো সুলক্ষণযুক্ত। ঐ সব লক্ষণযুক্ত নারীকে বিবাহ করলে মঙ্গল হয়ে থাকে।
এবারে তিনি অধমা কুমারীর লক্ষণ বর্ণনা করতে লাগলেন। অধমা কুমারীর লক্ষণগুলি যে নারীর থাকে, তাকে বিবাহ করলে জীবন বিষবৎ হয়, দাম্পত্য জীবন কখনও সুখমন্ডিত হতে পারে না।
এই নারীর হস্তপদ ক্ষীণ হয়, কিন্তু দেহ তার তুলনায় মোটা হয়—বিশেষ করে দেহের মধ্যদেশ অর্থাৎ মাঝের অংশ মোটা হয়। এদের চোখ অর্থাৎ চোখের তারা কালো না হয়ে পিঙ্গলবর্ণ হয়ে থাকে। এদের দেহে বহু লোম থাকে, দাঁত খুব কম থাকে বা ফাঁক ঠাঁক হয়ে থাকে। এরা কুদর্শন হয়! এরা অত্যন্ত উচ্চস্বরে হাসে। এরা বাচাল বা প্রগল্ভা হয়— অতিরিক্ত বেশি কথাবার্তা বলে সকলের বিরক্তি উৎপাদন করে।
এদের পেট মোটা হয়। সুমিষ্ট কথা এরা কখনও বলে না বা ভুলেও মিষ্ট কথা মুখ দিয়ে বের হয় না। এদের স্বর হয় কর্কশ। এরা নির্লজ্জের মত কথাবার্তা বলে, মনসর্বদাই বিকল থাকে—কথাবার্তার মধ্য থেকে রোগের ভাব সব সময় ফুটে ওঠে। কাউকে এরা গ্রাহ্য করতে চায় না।
এদের হাত পা লম্বা হয়, চুল হয় ছোট ছোট। তা ছাড়া আগে বর্ণিত কুলক্ষণ কিছু কিছু এদের মধ্যে থাকে।
এদের লক্ষ্মীশ্রীযুক্ত চালচলন কখনও দেখা যায় না। ধর্ম বা শাস্ত্রমত আচার আচরণ করতে এরা ভালবাসে না। নিজের ধর্মমত ত্যাগ করে ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করতে পর্যন্ত এরা কুণ্ঠিত হয় না।
এই ধরনের কুলক্ষণযুক্ত নারী যে গৃহে বাস করে, সেখানে কখনও লক্ষ্মীর আগমন হতে পারে না।
এই সব লক্ষণ দেখেও যে লোক এই ধরনের মেয়েকে বিবাহ করে তারা সারা জীবন চরম দুঃখ ভোগ করে থাকে।
হে দেবি, তোমাকে এই ভাবে তিন প্রকার কুমারীর বিষয়েই বর্ণনা করে শোনালাম। এবারে বল তুমি আর কি কি কথা শুনতে ইচ্ছা কর?
অধমা যা কুমারী চ শৃণু তস্যা হি লক্ষণং।
ক্ষীণপাতকরা চৈব বহুলোমাক্ষিপিঙ্গিলা ॥
সুদীর্ঘদর্শনা চৈব তথা বিরলদন্তিকা।
উচ্চহাসা চা বাচালা কর্কশাঙ্গী মহোদরী ॥
নিলজ্জা ক্রোধপূর্ণা চ সদা বিকলমানসা।
দীর্ঘপদকার চৈব খর্ব্বকেশা কুলক্ষণা ॥
স্বাচারবিহীনা যা তু পরিত্যজ্যাধমা মতা।
যদগৃহে নিবসেৎ সা চ তত্ৰ লক্ষ্মীর্নগচ্ছতি ॥
পতিস্বতস্য ভবেদ্দুঃখী নাত্র কার্য্যা বিচারণা।
কীৰ্ত্তিতং ত্বব দেবেশি কুমারীত্রয়লক্ষণং।
বদ দেবি মহাভাগে কিমন্যৎ শ্রোতুমিচ্ছসি ॥
মহাদেব এই ভাবে তিন শ্রেণীর কুমারী বিভাগের লক্ষণ বর্ণনা করলেন।
প্রত্যক্ষ জীবনে আমাদের এ বিষয়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করতে হবে, তা হলো— বাস্তবে সব কটি লক্ষণ হয়ত একই নারীর মধ্যে দেখা যায় না।
কিন্তু মোটামুটি কুলক্ষণ বেশি যার মধ্যে দেখা যাবে, তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। সুলক্ষণ যার মধ্যে বেশি থাকবে, তাকেই গ্রহণ করতে হবে।
উদাহরণ :
(১) ধরা যাক, রমেনবাবু নামক এক ভদ্রলোক তাঁর ছেলের বিবাহের জন্য মেয়ে দেখতে গেলেন।
সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, মেয়েটি ধার্মিক অর্থাৎ ধর্মে তার মতি আছে, সুশীলা, কখনও চীৎকার করে কথাবার্তা বলে না, দেহ মোটামুটি ভাল গঠনের, শরীরের কোন খুঁত নাই, কথাবার্তা বেশ সুমিষ্ট, সুদন্তা, দীর্ঘকেশী, কিন্তু মেয়েটির পায়ে হয়ত একটু লোম বেশি আছে।
এখানে সব সুলক্ষণের সঙ্গে মাত্র একটি কুলক্ষণ দেখে তিনি পাত্রীকে মনোনীত করতে পারেন।
(২) এবারে হয়ত বিনয়বাবু নামে এক ভদ্রলোক তাঁর একমাত্র আদরের ভাগ্নের জন্য মেয়ে দেখতে গেলেন।
ভাগ্নেকে তিনি পরম যত্নে মানুষ করেছেন। সে ভাল চাকুরী করে–চরিত্র ও ভাল।
মেয়ে দেখতে গিয়ে তিনি দেখলেন, মেয়েটির গড়ন মোটামুটি ভাল, কথাবার্তা মিষ্ট, মেয়েটি অধার্মিক নয় (যতটা বোঝা গেল) কিন্তু তার চোখ ট্যারা, দাঁত ফাঁক ফাঁক, পায়ে প্রচুর লোম আছে, গায়ের ত্বক মসৃণ নয় (খসখসে)।
এখানে সুলক্ষণ কম এবং তাও ঠিক ধরা যায় না। কিন্তু অনেকগুলি কুলক্ষণ বর্তমান।
অথচ তার ভাগ্নে সুশীল, সুবোধ, শান্ত, জ্ঞানী ও ধার্মিক।
তাই তিনি মেয়ে দেখে সন্তুষ্ট হলেন না এবং পরে কৌশলে সে সম্বন্ধ ভেঙে দিলেন।
এইভাবে রতিশাস্ত্র মতে যোগ্যা অযোগ্যা কুমারী নির্ণয় করে বিবাহাদি করলে জীবন আনন্দে ভরে ওঠে এবং বিবাহিত জীবন সুখময় হয়, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
যদি ভাল জ্যোতিষী পন্ডিতকে মেয়ে দেখার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যাবার সুবিধা না থাকে, তবে মহাদেব উক্ত এই রতিশাস্ত্রসম্মত বিধান বিচার করে কুমারী দেখলে তাতে সর্বদা সুফলই আশা করা যায়।
অবশ্য এ ছাড়া বিবাহে বিচার্য আরও বিষয় আছে-–যেমন সতী অসতী নির্ণয়, জারজ নির্ণয় ইত্যাদি। এ বিষয়েও পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলিতে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। রতিশাস্ত্রসম্মত আলোচনা এ বিষয়গুলিকে প্রাঞ্জল ও সহজ করে তুলেছে সন্দেহ নাই।
