রতিশাস্ত্র – তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

চার জাতীয় নরনারী এইভাবে ভাগ করা এবং রতিশাস্ত্র ও রতিপ্রকৃতি অনুসারে তাদের পৃথক পৃথকভাবে ভাগ করে কোন পুরুষের সঙ্গে কোন নারী উপযুক্ত তা বিচারের এই অপূর্ব পদ্ধতি যে কেবল বিজ্ঞানসম্মত তাই নয়, ভারতীয় রতিশাস্ত্রের এই প্রকৃতিবিচার খুব সূক্ষভাবে ভাগ করে এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে, যা সারা বিশ্বের যৌন-বিজ্ঞানীদের কাছে পরম বিস্ময়।

চার জাতির নারীর প্রকৃতি আর গুণাগুণ ফোন সম্পূর্ণ পৃথক, তেননি তাদের সন্তুষ্টির উপায়ও সম্পূর্ণ বিভিন্ন। একই নারী জাতি কিন্তু যেহেতু তাদের শ্রেণী বিভিন্ন, তাই একই ভাবে যে হয় সন্তুষ্ট ও পরম আনন্দিত, অন্য শ্রেণী তাতে বিন্দুমাত্র আনন্দ পায় না।

এই সন্তুষ্টি বিধানের পার্থক্য থেকেই বিভিন্ন জাতিকে বেশ ভালভাবে বিচার করা যায়।

চার জাতির নারী-পুরুষের সম্মন্ধে বিস্তৃত সব কথা শুনতে পেলেন পার্বতী।

তিনি তারপর মহাদেবের মুখের দিকে চেয়ে বললেন- আপনার মুখে রতিশাস্ত্র শ্রবণ করে পরম তৃপ্তি লাভ করেছি। আমার হৃদয়ে যেন দিব্য জ্ঞানের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে। এখন চার জাতির নারী কি উপায়ে সন্তোষ লাভ করে তা বর্ণনা করুন।

কি ভাব পদ্মিনী নারী সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, কি উপায়েই বা চিত্রিণীর সন্তোষ বিধান হয়ে থাকে, শঙ্খিনী কিভাবে তৃপ্ত লাভ করে, হস্তিনী নারীর পরিতৃপ্তির উপায়ই বা কি তা আমার কছে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করুন। আমি তা শোনবার জন্য একান্ত প্রয়াসী।

আমি আপনার একান্ত অধীনা, তাই আমার উপর করুণা থাকলে এই জ্ঞানদান থেকে বিরত থাকবেন না।

শাস্ত্রোক্ত ভাষায়-

শ্রুতং ত্বয়েরিতং সর্ব্বং রতিশাস্ত্রং মহেশ্বর।
অধুনা ক্ৰহি যে ব্ৰহ্মন্ নারীণাং তুষ্টিসাধনং ।।
কেন বা পদ্মিনী প্রীতা কেন তুষ্টা চ চিত্রিণী।
শঙ্খিনী কেন প্রীতা স্যাদ্ধস্তিনী বা কথং ভবেৎ।
তৎসৰ্ব্বং ক্ৰহি মে দেব যদ্যন্তি করুণাময়ি ।।

পার্বতীর কথা শুনে মহাদেব মৃদু হেসে বললেন- হে ভগবতি, তুমি যা জিজ্ঞাসা করলে তা এবারে বলছি। পদ্মিনী, চিত্রিণী, শঙ্খিনী ও হস্তিনী এই চার জাতীয়া নারীরা সন্তোষ বিধান কিভাবে হয়ে থাকে এবারে তা বর্ণনা করছি। মন দিয়ে তা শ্রবণ কর।

শৃণু দেবি প্রবক্ষ্যামি তৎ পৃচ্ছসি ত্বয়ানঘে।
পদ্মিনী চিত্রিণী চৈব শঙ্খিনী কামিনী তথা।
হস্তিনী চৈব দেব পরিতুষ্যতি যেন বৈ ॥

পদ্মিনীর তুষ্টি সাধনের উপায়

শিব বললেন—প্রথমে পদ্মিনী নারী কিসে তুষ্ট হয় তাই বর্ণনা করছি।

পদ্মিনী নারীরা নারীজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তারা কাম বা নির্লজ্জতা পছন্দ করে না। তাই তাদের কাছে কখনও বৃথা নির্লজ্জতা প্রকাশ করা উচিত নয়।

তারা প্রকৃত ধার্মিক। তাই ধর্মকথা ও মিষ্টবাক্য তাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তাদের কাছে পুরাণ, উপনিষদ্ ভাগবত ইত্যাদি ধর্ম আলোচনা বা এই সব গ্রন্থ নিয়ে আলাপ আলোচনা করলে তারা সন্তুষ্ট হয়, শাস্ত্র পাঠ ও মধুর আলাপ তাদের সবচেয়ে খুশি করে।

এইসব বাক্য আলাপন ছাড়া তারা রত্ন অলংকারে দেহ বিভূষিত করতে ভালবাসে। বেশি খেতে তারা ভালবাসে না বটে, তবে সুস্বাদু পানীয় তাদের খুব প্রিয়। তাদের সমাদরে ঐ সব প্রদান করলে তারা সুখী হয়।

শৃণু দেবি প্রবক্ষ্যামি পদ্মিনী-তুষ্টি সাধনং।
যেন প্রীতা ভবেৎ সা চ তৎ শৃণুস্ব মহেশ্বরি।
সুখাসনে সমাসীনং তাঞ্চ পতিপরায়ণাং।
ধর্ম্মেন বচসা ধীমান্ পরিতুষ্যতি সাদরং ॥
মধুরেণ চ বাক্যেন প্রীতিমৃৎপাদয়েৎ হৃদি।
ভোগ্যং বহুবিধং দেয়ং রত্নালঙআরমুত্তমং।
পানীয়ঞ্চ প্রদাতব্যং তদা স্যাং পরিতোষিতা ॥

চিত্রিণীর চিত্তবিনোদনের উপায়

চিত্রিণী নারীর প্রকৃতি কিছুটা প্রেমপূর্ণ।

তারা প্রেমপূর্ণ ব্যবহার, প্রেমপূর্ণ বাক্য ও হৃদয়গত ভালবাসা পছন্দ করে। তাই তাদের সঙ্গে ঠিক সেই ধরনের ব্যবহার করা উচিত।

চিত্রিণী জাতীয়া নারীরাও ধর্ম আলোচনা পছন্দ করে, তবে সেই সঙ্গে কথা ও কাহিনী—গল্প উপন্যাস ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ বা আলোচনা শুনতে খুব ভালবাসে।

চিত্রিণী নারীদের মন জয় করতে হলে তাদের বা পাশে বসিয়ে প্রেমপ্রীতিপূর্ণভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের কাছে নানা উপন্যাস, ইতিহাস ইত্যাদির গল্প করতে হবে ও বশ্যতা স্বীকার করতে হবে।

চিত্রিণী পরমাপ্রীতা যেন ভবেৎ সুরেশ্বরি।
শৃণুষ্কৈকমনাভূয় তদ্ববক্ষ্যামি সমাসতঃ ॥
বামপার্শ্বে সমাসীনাং চিত্রিণীং চিত্রসুন্দরীং।
প্রেমালাপেন সংভাষ্য ইতিহাসদিকেন চ ॥
বিজ্ঞাপয়িত্বা বশতাং সন্তোয়য়তি তাং ধ্রুবং ॥

শঙ্খিনীর চিত্তরঞ্জনের উপায়

শঙ্খিনী নারীর প্রকৃতি পদ্মিনী চিত্রিণী থেকে অনেকটা পৃথক ধরনের। তাদের প্রকৃতি ওদের থেকে অনেকটা বেশি পরিমাণে কামার্ত। তারা ধর্ম-আলোচনা, শাস্ত্র বা উপন্যাস সাহিত্য আলোচনা মোটেই পছন্দ করে না।

তবে সুমিষ্ট বাক্য, প্রেমপূর্ণ সম্ভাষণ ইত্যাদি তারা পছন্দ করে। তা ছাড়া, সাজসজ্জায় ঘটা তাদের খুব বেশি। প্রচুর সজ্জার দ্বারা তারা সর্বদা পুরুষের মন আকর্ষণ করতে প্রয়াসী হয়ে থাকে।

তাই শঙ্কিনী নারীকে শুধু মিষ্ট বাক্য বলে কোন লাভ হয় না। তাদের মিষ্ট প্রেমপূর্ণ সম্ভাষণ করে প্রেম নিবেদন করতে হয়। তারপর নানাবিধ যত্ন, অলংকার ও বিবিধ সুন্দর সুন্দর বস্ত্র আভরণ ইত্যাদি তাদের প্রদান করতে হয়। নিয়ত আকর্ষণীয় মোহিনী ভাষার দ্বারা তাদের চিত্ত প্রফুল্ল করতে হয়।

মিষ্টেন বচসা দেবি নৈব তুষ্যতি শঙ্খিনী।
সা চ তুষ্যতি রত্নেন বিধিাভরণেন বৈ ॥
মহার্ঘ্যেণ চ বস্ত্ৰেণ প্ৰণয়ভাষণেন বৈ।
এতৈঃ সন্তোীসতা নারী শঙ্খিনী তুষ্ট মানসা ॥

হস্তিনীর সন্তুষ্টির উপায়

শিব তারপর বললেন- হে মহাদেবি, এতগুলি নারীর সন্তুষ্টির উপায় শুনলে। কিন্তু হস্তিনী নারীর সঙ্গে তাদের কারও তুলনা করা চলে না।

তার কারণ অন্য নারীরা যাতে পরম সন্তুষ্ট হয় তা কোন দিনই হস্তিনা নারীকে সম্ভষ্ট করতে পারে না। কি অলংকার, কি রত্নসম্ভার বিভূষণরাজি, কি মধুর প্রণয় বচন, কিছুই হস্তিনী নারীর মনকে আকৃষ্ট করতে বা তাদের হৃদয় জয় করতে সমর্থ হয় না।

হস্তিনী নারীর প্রকৃতি হলো—সর্বদা কুক্রিয়ায় রত থাকা। কদাচারে থাকতে তারা ভালবাসে। কোন উত্তম প্রকৃতির পুরুষের সঙ্গে ভালভাবে দিনযাপন করা তার প্রকৃতি বিরুদ্ধ।

সে চায় কদাচারী, দুষ্ক্রিয়সক্ত অত্যাচারী পুরুষকে।

তাদের সঙ্গে দিনরাত ভূরি ভূরি ভোজন, প্রয়োজন হলে নেশা বা মদ্যপান এবং তাদের সঙ্গে দিবারাত্র নানা প্রকার কুক্রিয়ার অনুষ্ঠান—এ সব করতে পারলেই, সে সর্বদা প্রসন্ন থাকে।

তা ছাড়া, সে কামার্ত প্রকৃতির—তাই সর্বদা কামার্ত আলোচনা এবং ঐ সব চিন্তা ও কর্ম করে সে প্রচুর আনন্দ পেয়ে থাকে।

রত্নৈর্ব্বা ভূষণৈর্ব্বাপি তথা চ মিষ্টভাষণৈঃ।
বসনেন চ দিব্যেন ন তুষ্যতি কদাচন ॥
প্রণয়ভাষণেনৈব চিত্তঞ্চ নৈব তুষ্যতি।
সদা কদাচারা সা চ কুক্রিয়ায়ানিরতা সদা ॥
ভোজনৈৰ্ব্বিপুলৈশ্চৈব কুক্রিয়ানুষ্টিতৈরপি।
পরিতুষ্যতি হে দেবি হস্তিনী ক্রূরমানসা ॥

মহাদেব বললেন-হে দেবি, তোমার কাছে অত্যুত্তম রতিশাস্ত্রের বিষয় বর্ণনা করে তোমাকে শোনালাম। যারা নিজেদের কল্যাণ ও সকলের মঙ্গল চায়, তারা এই সমস্ত পাঠ করে সেইমত কাজ করবে। এদে তাদের জীবন আনন্দে পূর্ণ হবে, তারাও সর্বদা সুখী হয়ে মহানন্দে দিন কাটাতে পারবে, সন্দেহ নাই।

ইতি তে কথিতং দেবি রতিশাস্ত্রমনুত্তমং।
এতদ্‌বিচার্য্য বিজ্ঞায় ক্রিয়তে শুভাকাঙ্খিভিঃ ॥

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *