রতিশাস্ত্র – ষষ্ট পরিচ্ছেদ

ষষ্ট পরিচ্ছেদ

পুরুষ জাতির বিভিন্ন লক্ষণ ও চিহ্ন বর্ণনা

নারীর লক্ষণ-অলক্ষণের বিচার যেমন করা হলো, তেমনি আবার পুরুষ জাতির শরীরেও এমন সব চিহ্ন আছে যা দেখে তাদের সুখ বা দুঃখ কিংবা তাদের ভাগ্য কেমন হবে—তাদের জীবনে উন্নতি সম্ভব হবে না অবনতি ঘটবে তা বলা যায়।

অনেকে আজকাল হয়ত এ সব চিহ্নে বিশ্বাস করেন না।

কিন্তু ধীরে ধীরে জীবনে বাস্তব অভিজ্ঞতা ঘটতে থাকলে তাঁরা এ সব বিশ্বাস করতে বাধ্য হন।

পুরুষ বা নারীর হয়ত বিরাট উচ্চকূলে জন্ম—কিন্তু তারা তাদের দেহের বিভিন্ন লক্ষন অনুযায়ী ভাগ্য লাভ করে।

তাই লক্ষপতির ঘরে জন্ম নিলেও কত লোক যারা নানান ধরনের কুলক্ষণযুক্ত—তারা ধীরে ধীরে সমস্ত অর্থ নিঃশেষ করে জীবনে অশেষ কষ্ট পায়।

আবার হয়ত কোন লোক খুব গরীব বা মধ্যবিত্ত ঘরে তার জন্ম, সে নিজের চেষ্টায়, উদ্যমে, ভাগ্যে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে ধনে, মানে, প্রতিষ্ঠায় সমাজে শ্রেষ্ঠ লোক বলে নিজেদের পরিচয় দিতে পারে।

তাই কোন লোক তার মেয়ের বিবাহাদির জন্য যদি পাত্র খুঁজতে যায়, তবে শুধু বংশ বা চেহারা দেখে বিচার করলেই হবে না, পুরুষ জাতির নানা কুচিহ্ন তার দেহে বর্তমান কিনা তা দেখা একান্ত আবশ্যক।

আমরা জানি, স্বদেশে ও বিদেশে এমন হাজার হাজার লোক ছিলেন যাঁরা নিতান্ত গম্ভীর হয়েও জগতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হয়েছেন।

সেক্সপীয়ার ছিলেন ঘোড়ার গাড়ি কোচম্যান, ষ্ট্যালিন ছিলেন কামারের ছেলে, হিটলার ছিলেন মুচির ছেলে, মোঁপাসা ছিলেন পতিতার পুত্র। আমাদের দেশেও শরৎচন্দ্র, আলামোহন দাস, স্যার জেমসেদজী টাটা, কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রভৃতি অজস্র মনীষী ও শ্রেষ্ঠ ধনী নিতান্ত গরীবের ঘরে জন্মেছিলেন।

তাই ভাগ্য বা সুখ সৌভাগ্যের পরিবর্তনে মানুষের বিশ্বাসী হওয়া আবশ্যই উচিত।

আমাদের শাস্ত্রে আরও আছে—

স্ত্রীয়াশ্চরিত্রং পুরুষস্য ভাগ্যং।
দেবাঃ ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ

কোন পুরুষের ভাগ্যে যে কি আছে, তা দেবতারা পর্যন্ত জানতে বা বলতে পারেন না। তাই সুখ-দুঃখ-সৌভাগ্য ইত্যাদির চিহ্ন যে অনেকটা এ বিষয়ে পূর্বাহ্নে শুভ সূচনা করে সে কথা অবশ্য স্বীকার্য।

মহাদেব অতঃপর পুরুষজাতির সুখদুঃখের যে বর্ণনা দিলেন তা একে একে বলা হচ্ছে।

যে লোকের কন্ঠস্বর, বুদ্ধি ও নাভি গভীর হয় তাকে সুখী ও সুলক্ষণযুক্ত বলে জানবে। অর্থাৎ সে লোকের গলার স্বর বেশ ভারী হয়, বুদ্ধি বেশ ধীরস্থির এবং বেশ ভালভাবে অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে সে কোনও কাজ করে না, আর তার নাভির গর্ত বেশ গভীর থাকে।

এ ছাড়া যার বুক, শির ও ললাট (কপাল) প্রশস্ত, সেও লক্ষ্মীবান পুরুষ বলে বর্ণিত হয়েছে।

স্বরো বুদ্ধিশ্চ নাভিশ্চ ত্রিগম্ভীরমুদাহৃতম।
এবত্তূ যস্য বিস্তীর্ণং তস্য শ্ৰীঃ সৰ্ব্বতোমুখী।
উঃ শিরো ললাটঞ্চ ত্রিবিস্তীর্ণং প্রশস্যতে ॥

তারপর অন্য আরও কতকগুলি লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে।

যে পুরুষের কটিদেশ বিশাল (বেশ চওড়া যার কোমর ও নিতম্ব), সে বহু পুত্র লাভ করে থাকে।

যে পুরুষের বাহু সুদীর্ঘ (অনেক সময় আজানুলম্বিত বলে শ্রেষ্ঠ পুরুষদের বর্ণনা করা হয়), সে নরশ্রেষ্ঠ ও সুখ সম্পন্ন হয়ে পরম শান্তি ও আনন্দে দিন কাটাতে পারে।

যে পুরুষের বক্ষদেশ বিশাল (অর্থাৎ মাথা যার বড়), সে নরলোকে সর্বত্র পূজা পায়। এই পুরুষরা সর্বত্র সুমেধা ও নিজ কীর্তির মহত্বের জন্যে সকলের কাছে পুজনীয় হয় এবং সকলেই তাদের গুণের জন্য তাদের শ্রদ্ধা ভক্তি করেন।

কটির্বিশালা বহুপুত্রভাগী
বিশালহস্তো নর-পুঙ্গবঃ স্যাৎ।
উরো বিশালং ধনধান্যভোগী
শিরো বিশালং নবপূজিতঃ স্যাৎ ॥

অতঃপরে আরও কতকগুলি পুরুষজাতির লক্ষণ বর্ণনা করা হচ্ছে। এগুলি সব সুচিহ্ন।

যে পুরুষ বিশেষ কঠিন কাজকর্ম করে না, অথচ তার হাতদুটি হয় শক্ত ও কঠোর, অনেক পথ চলেও যার পা দুটি থাকে কোমল, আর যে পুরুষের করতল রক্তবর্ণ অর্থাৎ লালচে রঙের হয়, সেই পুরুষ যে সুখী হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

অকৰ্ম্মকঠিনৌ হস্তৌ পাদাবন্ধনি কোমলৌ।
যস্য পাণিতলৌ রক্তৌ ন সুখী নাত্র সংশয়ঃ ॥

যে পুরুষের নিশ্নাগ্র অর্থাৎ লিঙ্গের অগ্রভাগ স্থূল হয় সে সুখী হয়, যে পুরুষের শিশ্ন দীর্ঘ বা অনেক বেশী লম্বা সে দুঃখ পায়, যে পুরুষের শিশ্ন ছোট কিন্তু কৃশ হয় সে সৌভাগ্য লাভ করে থাকে।

স্থূল শিশ্নঃ সুখী চৈব দীর্ঘাশিশ্মশ্চ দুঃখিত।
কৃশশিশ্মশ্চ সৌভাগ্যলক্ষণং নাত্র সংশয়ঃ ॥

যে পুরুষের নেত্র (চোখদুটি) স্নিগ্ধ—অর্থাৎ যার দুটি চোখের দৃষ্টি কোমল ও সুন্দর, সে সুখ ও সৌভাগ্যশালী হয়ে থাকে।

যে পুরুষের দন্ত স্নিগ্ধ অর্থাৎ চকচকে ও সুন্দরভাবে সাজান সে উত্তম খাদ্য ভোজন করে থাকে।

যে পুরুষের হস্ত স্নিগ্ধ অর্থাৎ যার হাত সুঠাম ও সুদৃশ্য হয় সে ঐশ্বর্যশালী হয়ে থাকে।

যে পুরুষের পদদ্বয় স্নিগ্ধ অর্থাৎ যার দুটি পা সুঠাম, কোমল ও সুদর্শন, সে নানা যানবাহনের অধিকারী হয়ে থাকে।

সৌভাগ্যং লভতে নূনঃ নেত্রস্নেহ-সমান্বিতঃ।
উত্তমং ভোজনং চৈব দত্ত-স্নেহ-যুতশ্চ হি।
হস্তস্নেহেন চৈশ্চর্য্যং পাদস্নেহেন বাহনম ।।

এবারে সবচেয়ে সুখ ঐশ্বর্য্য ও সম্পদযুক্ত পুরুষের একটি বিশেষ লক্ষণ এখানে বলা হচ্ছে।

দুটি ভ্রুর মধ্যে কপালে যদি কোনও পুরুষের রক্তবর্ণ অর্থাৎ লাল রঙের রেখা থাকে, তবে সে সর্ব ঐশ্বর্যযুক্ত ও অতুলনীয় সুখের অধিকারী হয়ে থাকে।

পৃথিবীর মধ্যে তেমন পুরুষের মত সুখ ও ঐশ্বর্য্য একাধারে কেউ উপভোগ করতে পারে না। এই চিহ্ন অত্যন্ত সুলক্ষণযুক্ত।

কিন্তু এখানে একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে।

ঐ রেখাটি সম্পূর্ণ নিচের থেকে ওপর পর্যন্ত আগাগোড়া লালবর্ণ হতে হবে। যদি তা না হয়ে এই রেখার উপরের দিকের কিছুটা অংশ নীলবর্ণ হয় বা নীল আভা বের হয়, তাহলে সে পুরুষ জীবনে কখনও সুখলাভ করে না।

ভ্রুবোর্মধ্যে চ যা রেখা রক্তবর্ণা ভবেদযদি।
সর্ব্বৈশ্বর্য্য সমাযুক্তঃ স সুখী নাত্র সংশয়ঃ ॥
তস্যোর্দ্ধে যদি রেখা স্যাৎ নীলবর্ণা চ দীর্ঘিকা।
ন সুখং লভতে ক্কাপি ইতি শাস্ত্রবিনির্ণয়ঃ ॥

মহাদেব অতঃপর রতিশাস্ত্রে সুখদুঃখের আরও নানা চিহ্ন একে একে বর্ণনা করে চললেন।

যদি কোন পুরুষের নাকের অগ্রভাগে বর্তুলাকার (বোতলের মত গোল) চিহ্ন থাকে এবং সেই চিহ্ন যদি কিছু শুক্ল অর্থাৎ সাদা রঙের আভাযুক্ত হয় তাহলে সেই পুরুষ যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন পরম সুখে দিন যাপন করে।

জীবনে কখনও কোনও অভাব বা অশান্তি এসে তাদের ক্লেশ দিতে পারে না।

যে লোকের কপালে শুক্লরেখা অর্থাৎ সাদা রঙের রেখা দেখা যায় সেই পুরুষ আজীবন সুখে দিন কাটায়—জীবনে কখনও কষ্ট পায় না। কামশাস্ত্রে এইসব সুলক্ষণগুলি যা লেখা আছে তা কখনও মিথ্যা হয় না।

বার্ত্তুলাকারচিহ্নঞ্চ নাসাগ্রে যদি দৃশ্যতে।
কিঞ্চিৎ শুক্লঞ্চ তচিহ্নঞ্চ সুখী নাত্র সংশয় ॥
ললাটে যদি জায়তে শুক্লরেখা নরস্য চ ।
সুখিনং তং বিজানীয়াৎ কথিতং কামশাস্ত্রিণা ॥

এতক্ষণ ধরে মহাদেব পুরুষের সুখ, সৌভাগ্যের কতকগুলি রেখা বর্ণনা করলেন। এবারে তিনি এমন কতকগুলি চিহ্ন বর্ণনা করলেন, যা থাকলে মানুষ জীবনভর দুঃখভোগ করে এতে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।

গৌররূপা চ যা রেখা যদি স্যাৎ নেত্রসংস্থিতা।
দুঃখভোগী ভবেচ্চৈর নাত্র কার্য্যা বিচারণা।
নাসামূলে চ যৎ চিহ্নং দৃশ্যতে পীতবর্ণকম্
তঞ্চ তুঃখস্য মূলং স্যাৎ নাত্র কার্য্যা বিচারণা ।।

এ ছাড়া যদি কোন পুরুষের অধরে অর্থাৎ ঠোঁটে অরুণবর্ণ অর্থাৎ টকটকে লাল চিহ্ন থাকে, তবে তারা সারা জীবন দুঃখের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে থাকে।

যদি কোনও পুরুষের অঙ্গুষ্ঠের মূলদেশে কৃষ্ণবর্ণ রেখা দেখা যায় তাহলে সেই পুরুষ যতদিন জীবিত থাকে, দুঃখে শোকে তার কাল অতিবাহিত হয়ে থাকে।

যদি কোনও পুরুষের করতলে মংস্যপুচ্ছের চিহ্ন থাকে—সেই চিহ্ন সুখ ও ধর্মময় জীবনের লক্ষণ। কিন্তু সেই মৎস্যপুচ্ছের নিম্নভাগে বর্তুলাকার ধূম্রবর্ণ চিহ্ন থাকলে সেটি খুব খারাপ। যতদিন সে বেঁচে থাকে খুব দুঃখে তার দিন অতিবাহিত হয়।

যদি স্যাদারুণং বর্ণং চিহ্নং কস্যাপি চাধরে।
তদা তস্য বিজানীয়াৎ জীবনং দুঃখমূলকম্ ॥
অঙ্গুষ্ঠমূলমধ্যে যা রেখা স্যাৎ কৃষ্ণবর্ণিকা।
দুঃখমূলং হি তস্য স্যাৎ জীবনং নাত্র সংশয় ॥
মীনপুচ্ছসমীপে চ যস্য চিহ্নং ব্ৰজত্যধঃ।
বক্রাকৃতিঃ ধূম্রবর্ণং দুঃখেন তস্য জীবনম্ ॥

যদি কোন পুরুষের তর্জনীর অগ্রভাগে অর্থাৎ তর্জনীর আগায় গোলাকার চিহ্ন দেখা যায় তাহলে সে কখনো সুখে কখনও বা দুঃখে দিনযাপন করে। তার জীবন মধ্যম ধরনের হয়।

তৰ্জ্জন্যগ্রে চ যা রেখা গোলকারা ভবেদ্যদি।
সুখং সুঃখং বিজানীয়াৎ মধ্যমং জীবনং ধ্রুবম্ ॥

যে পুরুষের হাতে অনামিকা ও মধ্যমা এই দুটি আঙুলের মধ্যের পর্বে যদি দীর্ঘাকৃতি কোনও রেখা বা চিহ্ন আদি দেখা যায়, আর সেই রেখা বা চিহ্ন যদি চিক্কণ অর্থাৎ সরু হয়, তাহলে সেই পুরুষ আজীবন পরম সুখে দিনযাপন করে।

এছাড়া আয়ুরেখার পাশে যদি কোনও পীতবর্ণ চিহ্ন বা লম্বালম্বি কোনও রেখা (পীতবর্ণ) দেখা যায় তাহলে তা শুভ লক্ষণ বলে জানবে। সে পুরুষ যতদিন জীবিত থাকবে পরম সুখে তার দিন কাটবে।

এখানে একটা কথা বলা আবশ্যক।

রতিশাস্ত্র মতে আয়ুরেখা বলতে আমাদের ভারতীয় মতে যে আয়ুরেখা, তাই বোঝাবে—অর্থাৎ কনিষ্ঠার মূলের একটু নিচে থেকে তর্জনীর দিকে যে রেখা গেছে সেই রেখা। পাশ্চাত্য মতে ওকে হৃদয়রেখা বলে। পাশ্চাত্য বা কিরোর মতে আয়ুরেখা তর্জনীর কিছু নীচে থেকে মণিবন্ধের দিকে নেমে এসেছে, এই গ্রন্থে তাকে আয়ুরেখা ধরা হয়নি।

যস্য পাণিতলে চিহ্ন মধ্যমানামপৰ্ব্বণোঃ।
সুদীর্ঘাকৃতিকং স্নিগ্ধং সুখং তস্য বিনিৰ্দ্দিশেৎ।
আয়ুঃসমীপগা রেখা যদি স্যাৎ পীতবর্ণিকা।
শুভ সা তথিকা চৈব সুখমূলং হি জীবনম্ ॥

এবারে হাতের রেখার মধ্যে আরও কয়েকটি প্রধান প্রধান রেখার কথা বলা হচ্ছে—যে সব পুরুষের করতলে তারা পরম সুখে সারা জীবন অতিবাহিত করতে পারে।

যদি কোনও পুরুষের হাতে পদ্মচিহ্ন, তোরণচিহ্ন অথবা ধনুচিহ্ন থাকে তবে সেই পুরুষ পরম সুখে দিন কাটায় বলে শাস্ত্রকারগণ নির্দেশ দিয়েছেন।

এই তিনটি রেখার যে কোনও একটি থাকলে মোটামুটি সুখী হয়—তিনটি রেখা বা দুটি রেখা একত্রে থাকলে সে সারা জীবন পরম আনন্দে ও সুখে জীবন অতিবাহিত করে।

পঙ্কজং তোরণং পাণৌ ধনুৰ্ব্বা দৃশ্যতে যদি।
সুখং তস্য বিজানীয়াং ইতি শাস্ত্রবিদাং মতম্ ॥

এবারে হৃদয়রেখা বা ভারতীয় মতে আয়ুরেখা স্বন্ধে বলা হচ্ছে।

পুরুষের হাতে কনিষ্ঠা থেকে যে রেখা তর্জনীর দিকে দেখা যায়, সে রেখা যদি কোনস্থানে ছিদ্র বা কর্তিত না হয়, তবে সেই পুরুষ সুখে নূর্ণ হয়ে আনন্দময় জীবন যাপন করে। সে জীবনে কখনও দুঃখ অনুভব করে না—বিবিধ ঐশ্বর্য্যে তার ঘর সর্বদা পূর্ণ থাকে।

কনিষ্ঠাৰ্জ্জনীং যাবৎ রেখা ভবতি চাক্ষতা।
স সুখী সুখভোগী চ সৰ্ব্বৈশ্বৰ্যসমন্বিতম্ ॥

এবারে পুরুষের করতলের আর একটি প্রধান রেখার বর্ণনা করা হচ্ছে।

পুরুষের অঙ্গুষ্ঠালির গর্ভে অর্থাৎ বৃদ্ধা অঙ্গুলির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় যদি স্বরচিহ্ন বা যবের মত আকৃতির চিহ্ন থাকে তবে সে পুরুষ অতুল ঐশ্বর্য্যের অধীশ্বর হয়ে পরম সুখে দিন কাটায়।

জীবনে কোনও দিন সে দুঃখ পায় না বা দুঃখ হলেও তার জীবনে স্থায়ী হতে পারে না।

অঙ্গুষ্ঠোদরমধ্যে তু যবো যস্য বিরাজতে।
উন্নতং শোভনং কস্য জীবনং নাত্র সংশয়ঃ ॥

এবারে একটা কথা আলোচনা করা আবশ্যক। তা হলো যদি কোনও পুরুষের সুখ ও দুঃখের চিহ্ন একত্রে দেখা যায়, তাদের ভাগ্যে কি হবে?

যদি সুখের ও দুঃখের চিহ্ন সমান হয় তবে মাঝামাঝি জীবন কাটাবে, সুখর চিহ্ন বেশী হলে সে সুখ ভোগ করবে। এই নিয়মেই সুখদুঃখের বিচার করা হয়ে থাকে।

যে পুরুষের হাতের চেটোয় (করতলে) তুলা বা দাঁড়িপাল্লা মীন বা ঐ ধরনের মংস্যাকার রেখা ও বজ্র-আকারের রেখা থাকে, সে ব্যবসায়ে প্রচুর সাফল্য লাভ করে। প্রচুর অর্থ সে সারা জীবনে উপার্জন করে থাকে। সে ধনী হয়—অনেক পুত্রকন্যাসহ পরম সুখে কাল কাটায়।

এ বিষয়ে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

তিনটি চিহ্ন একত্রে থাকলে সম্পূর্ণ ফললাভ করবে। দুটি থাকলে আংশিক এবং যে কোনও একটি থাকলে সামান্য ফল পাবে।

মীন তুলা তথা বজ্রং করমধ্যে চ দৃস্যতে ॥
তস্য বাণিজ্যসিদ্ধিস্যাৎ পুরুষস্য ন ভবেৎ ধ্রুব।
ধনাঢ্যশ্চ স বিজ্ঞয়ো বহুপুত্রো ন সংশয়ঃ ॥

যে পুরুষের হাতের মধ্যে অঙ্কুশ, কুন্ডল কিংবা ছত্র বা ছাতার চিহ্ন দেখা যায় অর্থাৎ তিনটি চিহ্ন একত্রে থাকলে সে রাজচক্রবর্তী উপাধি পায়। রাজার অনুগ্রহে সে দেশের মধ্যে বিখ্যাত ব্যক্তি হতে পারে এবং পরম সুখে তার দিন কাটে। যদি দুটি মাত্র থাকে সে রাজতুল্য সুখী হবে। একটিতে রাজাধীনে সাধারণ চাকুরী দ্বারা সুখে জীবনধারণ করবে।

কুন্ডলং অঙ্কুশং ছত্রং যস, হস্ততলে ভবেৎ।
তস্য রাজ্যং মহাশ্রেষ্ঠ শাস্ত্রোক্তবচনং যথা ॥

যে পুরুষের হাতে পর্বত, কঙ্কণ বা কাঁকন, যোনি, নৃমুন্ড এবং ঘটাকৃতি চিহ্ন দেখা যায়, সে ব্যক্তি নিশ্চয়ই রাজার মন্ত্রী হয়ে থাকে। সব কটি চিহ্ন না থাকলেও কয়েকটি থাকলে, অন্ততঃ দুটি থাকলে মন্ত্রীর মত সম্মান পেয়ে থাকে। যদি কারও উর্ধ্বরেখা বা ভাগ্যরেখা হাতের মণিবন্ধ থেকে সোজা অনামিকা পর্যন্ত খাড়া উঠে যায় সে ব্যবসার দ্বারা অজস্র অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হয়। সে পুত্র পৌত্র প্রাপ্ত হয়ে পরম সুখে দিন কাটায়।

গিরি কঙ্কণযোনীনাং নরমন্ডঘটস্য চ।
করেবৈ যস্য চিহ্নানী রাজলক্ষ্মীঃ ভবেন্নরঃ ॥
অনামিকোর্দ্ধরেখায়াং ব্যবসায়ে ধনাগমঃ।
সুখেন জীবতে পুত্রপৌত্রগৃহাদিমান্ নরঃ ॥

যে পুরুষের অনামিকায় চক্ৰচিহ্ন থাকে সে নানা উপায়ে কিংবা বন্ধু দ্বারা অর্থ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। কিন্তু যদি তা না থেকে বিপরীত কোনও চিহ্ন থাকে (যেমন ক্রুশ বা কালো তিল) তার নানা বিষয়ে অর্থ ক্ষয় হয়ে থাকে।

চক্রশ্চ অনামিকায়াংসর্ব্বদ্বারা ধনং লভেৎ।
তস্য বিপরীতে তু এব ব্যয়োভবতি নিশ্চিতম্ ॥

এবারে করতল বর্ণনা শেষ করে মহাদেব পদতল সম্বন্ধে কয়েকটি চিহ্ন পার্বতীর কাছে বর্ণনা করলেন।

যে পুরুষের পদতলে কমল বা পদ্ম, তড়াগ বা পুকুর, অঙ্কুশ অথবা বজ্ৰচিহ্ন অংকিত থাকে, সে ব্যক্তি খুব ভাগ্যবান। সে প্রচুর ধনের অধিকারী হয় এবং রাজার মত সম্মান লাভ করে থাকে। এমন কি সবগুলি চিহ্ন থাকলে সে রাজা হতেও পারে।

পদ্মনং চক্রং তড়াগ-অঙ্কুশং বাপি তোরণং
বজ্ৰং যস্য পাদতলে স রাজা ভবতি ধ্রুব ॥

যার পায়ের বৃদ্ধঙ্গুলের মূল থেকে চরণের তল পর্যন্ত বিস্তৃত রেখা দেখা যায় সে নিঃসংশয়ে রাজা হয় এবং প্রচুর ধনসম্পদ নিষ্কন্টকে ভোগ করে।

যস্য বৃদ্ধাঙ্গুলের্মূলাৎ রেবা পাদে চ দৃশ্যতে।
রাজ্যং লভতে ধ্রুবম্ ভুঙক্তে বিকন্টাকাং মহীম্‌ ॥

যে পুরুষের দুটি পা অনেক শিরাযুক্ত, কুটিল, রুক্ষ, পায়ের পিঠ অর্থাৎ উপরের অংশ সূর্গের মত বড়, নখগুলি পান্ডুর বর্ণ এবং আঙ্গুল বিবর্ণ ও সরু সরু, সে ব্যক্তি অতি অবশ্যই দরিদ্র হয়।

বক্রোসূর্পাকারৌ চ বিরুক্ষৌ পাদৌ শিরালকে।
সংশুঙ্কৌ পান্ডুরনখৌ নিঃস্বস্য বিরলাঙ্গুলী ॥

যে পুরুষের দুটি চরণতল মৃদু বা নরম, কমল উদরের মত অর্থাৎ পদ্মফুলের মত কোমল, অঙ্গুলীগুলি মনোহর, নখগুলি লালচে রঙের, চরণের পিঠে অর্থাৎ উপরের অংশ কূর্মপৃষ্ঠের মত অর্থাৎ কচ্ছপের পিঠের মত সুগোল, উন্নত, সে নিশ্চয়ই রাজপদ বা উচ্চপদ পায় এবং পরম সুখের মধ্যে তার দিন কাটে।

মৃদুতলৌ কমলোদর সন্নিভৌ শ্লিষ্টাঙ্গুলী তাম্রনখৌ।
শিরোজঝিতৌ কূর্ম্মেন্নতৌ সুপাঞ্চীঃ নৃপতেঃ স্মৃতৌ ॥

যে পুরুষের দুটি জানু ও উরুদেশ পরস্পর সমান ও আয়ত থাকে, সে নিসন্দেহে রাজপদ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। যে ব্যক্তির জানু কৃশ বা রোগা হয় সে অল্পভোগ্য হয়—সে জীবনে প্রচুর পরিশ্রম করেও যথেষ্ট উন্নতি করতে পারে না।

যে লোকের জানু নিম্ন অর্থাৎ পেছনের দিকে একটু বাঁকানো এবং উপরের দিকে ফোলা নয়, সে স্ত্রীরত অর্থাৎ স্ত্রৈণ হয়। যার জানু দেখতে বিকট আকার সে দরিদ্র হয়, আর যার জানু মাংসল সে অতি অবশ্য ধনবান হয়ে থাকে।

উরবো জানবঃ তুল্য নৃপস্যোগচিতাঃ স্মৃতাঃ।
নিৰ্ম্মাংসজানুঃ সৌভাগ্যমল্পঃ নিম্নেরতঃ স্ত্রিয়াঃ।
বিকটেশ্চ দরিদ্রাঃ স্যুঃ সমাংসৈরাঢ্য এব চ

যে পুরুষের জঙ্ঘা অল্প অল্প লোমে পরিপূর্ণ, যেটি হাতীর শুঁড়ের মত ক্রমশঃ সূক্ষ্ম হয়ে সরলভাবে নেমে আসে, জঙ্ঘার প্রত্যেক রোমবিবর বা লোমকূপ মাত্র একটি লোম থাকে, সেই লোক নিশ্চয়ই শ্রেষ্ঠ লক্ষযুক্ত ও পরম সৌভাগ্যের অধিকারী হয় রাজা বা মহাপুরুষ ব্যক্তিদের জঙ্ঘা এই ধরনের হয়ে থাকে।

হস্তিকরোপমা জঙ্ঘা শ্রেষ্ঠ অল্পরোমযুতা।
রোমৈকৈকং কূপকে স্যাৎ ভূপানান্ত মহাত্মকাম্‌ ॥

যে পুরুষের কোমর (কটিদেশ) সিংহের কোমরের মত অর্থাৎ ওপরে ও নিচে দুদিকে চওড়া হয়ে উঠে গেছে, কিন্তু মাঝখানে সরু, সে লোক নিঃসন্দেহে পরম সুখী হয় এবং রাজার কৃপা বা রাজপদ পায়।

কিন্তু যে লোকের কোমর সরু কিন্তু আগাগোড়া লম্বালম্বি সরু হয়ে উঠে গেছে অর্থাৎ তা কপির (বানরের) কোমরের মত, সে লোক দরিদ্র হয়। যার নাভি দক্ষিণাবর্তী ও গভীর, সে রাজতূল্য সম্মান পায়।

ভবেৎ সিংহ কটি রাজা নিঃস্ব কপিটটির্নরঃ।
নাভিশ্চ দক্ষিণাবর্তী গভীরাজতুলা শুভা ॥

যে লোকের পেটে একটিমাত্র বলী থাকে (মাংসল উঁচু পিন্ড) সে ব্যক্তি শত বৎসর পরমায়ু পায়। যার বলি দুটি, সে ব্যক্তি স্ত্রীভোগী হয়। আর যার পেটে তিনটি বলী দেখা যায়, সে নরপতি কিংবা অধ্যাপক বা আচার্য (জ্ঞানী ও সুখী) হয়। যার পেটের তিনটি বা দুটি বলী সোজা বা সরল হয়, সে পরম সুখী হয়ে থাকে।

যে ব্যক্তির পেটে বলিরেখা চক্রাকার অর্থাৎ গোল, সে অগম্যা নারীতে সমাযুক্ত হয় আর যে সব লোকের দুটি পাশ স্থুল অর্থাৎ মোটা এবং মাংসল, তারা রাজতূল্য সুখী হয় কিংবা নৃপতি বা রাজচক্রবর্তী পদ প্রাপ্ত হয়।

একবলিঃ শতায়ুঃ স্যাং স্ট্র্যভোগী দ্বিবলী স্মৃতঃ।
ত্রিবলিঃ জ্ঞানী আচার্য ঋজুভিৰ্ব্বনিভিঃ সুখী।
অগম্যাগমী চক্রবলি ভূপাঃ পাশ্চেষ্ট মাংসলৈঃ ॥

যে লোকের পিঠের পার্শ্বদেশ বেশ বিস্তৃত, সে ধনী হয় যার পার্শ্বদেশ নিম্ন ও লাল রঙের, সে নিঃস্ব হয়ে থাকে।

যে ব্যক্তির কাঁধ বৃষ বা হস্তীর কাঁধের মত, কিংবা কলাগাছের মত সংবদ্ধ ও উন্নত, সে মহাভাগ্যবান লোক হয়। সে বহু লোকের কাছ থেকে সম্মান পায় এবং রাজার মত খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করে।

ধনিনো বিপুলৈঃ পার্শ্বৈঃ নিঃস্বা রক্তৈশ্চ নিম্নগৈ।
বুষস্কন্ধো গজস্কন্ধঃ কদলীস্কন্ধঃ এব চ।
মহাভাগো মহাধন্যঃ স সৰ্ব্ব পার্থিবোপম্ ॥

যে লোকের মাথা অর্থাৎ শির ছাতার মত আকৃতিবিশিষ্ট (ছত্রাকৃতি) সে রাজার মত সুখী, ধনবান ও কল্যাণাস্পদ হয়ে থাকে। যে ব্যক্তির মাথা শিরাযুক্ত, উঁচু ও প্রশস্ত, সে নিশ্চয়ই রাজা হবে।

কিন্তু যার শির ঘটাকৃতি বা ঘটের মত সংকীর্ণ, সে পাপাত্মা ও ধনহীন বা গরীব হয়ে থাকে।

ছত্রাকারৈঃ শিরোভিস্তু নৃপঃ শিবময়ো ধনী।
শিরালসুন্নতং নৃপ প্রশস্তশ্চ শিরো যদি।
ঘটমূর্দ্ধা পাপরুচিধনাদ্যৈঃ পরিবর্জ্জিতঃ ॥

এবারে মহাদেব মানুষের মুখাবয়ব সম্পর্কে বর্ণনা করে দেবী পাবর্তীকে শোনালেন।

মুখই মানুষের মনের পরিচয়। মুখের চেহারা দেখে কে কেমন লোক কার চরিত্র ভাল, কে মন্দ তা অনেকটা বোঝা যায়।

মহাদেব উক্ত রতিশাস্ত্র অনুযায়ী–যে লোকের বদন ভয়ংকর বা ভয়াল অর্থাৎ দেখলে ভয় জাগে, সে নিশ্চয়ই দুঃখী ও ভাগ্যহীনা হয়। যে লোক মেয়েদের মুখের মত কোমল মুখবিশিষ্ট, সে সুপুত্র লাভ করে সুখী হয়। যে লোকের মুখখানি বর্তুলের মত গোল সে সম্পত্তি প্রাপ্ত হয়। আর যাদের মুখ খুব লম্বা তারা দ্রব্যহীন বা বিষয়সম্পত্তিহীন হয়ে থাকে।

যে সব লোকের বদনমন্ডল পদ্মের মত বিকশিত, তারা ধনধান্য প্রভৃতি সম্পত্তির অধিকারী হয়। আর যার মুখে কখনও হাসি ফোটে না—মুখ গম্ভীর, সে দুঃখী ও দরিদ্র হয়।

মহাসুখং দুর্ভগানাং স্ত্রীমুখং পুত্রমাপ্লুয়াৎ।
আচ্যানাং বর্ত্তুলং বক্ত্রং নির্দ্রব্যাণাঞ্চ দীর্ঘকম্ ॥
পদ্মবত্রশ্চ পুরুষা ধনধান্যাদি ভোগিন।
স হাস্যবদনা যে তে দুঃখদারিদ্র্যভোগিনঃ ॥

যে লোকের নাক উন্নত সে সকলের প্রিয়পাত্র হয়। আর যার নাকে তিল ও সরু লোম অনেক থাকে সে দুঃখী, গরীব ও দুশ্চরিত্র হয়। যার নাক শুষ্ক পাখির মত, সে উচ্চপদ প্রাপ্ত হয়। আর যাদের নাক তিলফুলের মত, তারা ভোগশীল হয়ে থাকে।

উচ্চনাসাশ্চ যে মৰ্ত্তোস্তে সৰ্ব্বে জনবল্লভাঃ।
তিলরোমসংধূক্তা নাসা দুঃখিতা ধৰ্ম্মশীলবর্জ্জিতাঃ।
পার্থিক শুকনাসাশ্চ তিলপুষ্পাশ্চ ভোগিনঃ ॥

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *