প্রথম পরিচ্ছেদ
ভারতের জনসাধারণের ধারণা দেবত্মা হিমাচল চিরদিন দেবদেবীদের পরম লীলাক্ষেত্র—তাঁদের বিচরণ ভূমি।
ধ্যানগম্ভীর হিমালয়ের একটি অংশ কৈলাস পর্বত — পাশেই মানস সরোবর। প্রকৃতির অপূর্ব্ব শোভা নিকেতন। এই কৈলাসেই বিচরণ করেন দেবাদিদেব মহাদেব ও মূল্য শক্তিস্বরূপা দেবী পার্বতী।
একদিন এই হিমাচলের কৈলাস শিখরে দুজনে অবস্থান করছিলেন। দেবাদিদেব মহাদেব সমাসীন ছিলেন সিদ্ধচারণ-সেবিত রমণীয় কৈলাসে। এমন সময় জগজ্জননীরূপা পার্বতী তাঁকে প্রশ্ন করলেন-
“হে জগন্নাথ, জগৎপতি, নরলোকে কি করে সম্ভোগ প্রবর্তিত হলো সে কথা শ্রবণ করবার জন্যে আমার একান্ত বাসনা হচ্ছে। অতএব আপনি ঐ সমস্ত বিষয়ে আমার কাছে দয়া করে কীর্তন করুন। আমাকে সর্বদা আপনার একান্ত অধীনা বলে মনে করবেন।”
প্রকৃতপক্ষে জননী পার্বতী যে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ তা ধারণা করলে ভুল হবে। তিনি পরমাশক্তি—তাঁর জ্ঞানের বহির্ভূত কোনও বিষয়ই যে থাকতে পারে না, আমরা ধর্মশাস্ত্র পাঠে তা জানতে পারি।
তবে তিনি কেন এমন প্রশ্ন করলেন?
জনসাধারণের শিক্ষার উদ্দেশ্যেই তিনি এইভাবে প্রশ্ন করলেন এবং বিস্তৃতভাবে মহাদেবের কাছ থেকে সমস্ত শিক্ষা করার মানসে তার ব্যাখ্যা শুনতে চাইলেন। প্রকৃত সংস্কৃত শাস্ত্রে যে শ্লোকটি লেখা আছে তা হচ্ছে :
কৈলাসশিখরে রম্য সিদ্ধচারণসেবিতে।
শঙ্করং পরিপপ্রচ্ছ গৌরী প্রকৃতিরীশ্বরী ॥
কথং মনুষ্যলোকেহস্মিন্ সম্ভোগঃ সম্প্রবর্ত্ততে।
তদ্বদস্ব জগন্নাথ তদধীনাস্মি সৰ্ব্বথা ॥
হে দেবাদিদেব, তুমি সুপন্ডিত, সর্বশাস্ত্রে অতি বিচক্ষণ। এই তিন ভুবনে তোমার অজ্ঞাত বস্তু কিছু নেই। রতিশাস্ত্র অতি গুহা, বিচিত্র শাস্ত্র-এর মধ্যে যে সব গুপ্ত তথ্যাদি আছে তা জানবার জন্যে আমার বড়ই কৌতূহল হয়েছে।
নরনারী ভেদ, কিরূপ পুরুষের সঙ্গে কেমন নারীর মিলন হয়, সে সব লক্ষণ বলুন। বিবাহের শুভাশুভ তথ্য, কি কারণে পুত্র, কন্যা বা নপুংসক জনো, কেউ অল্পদিনে মারা যায়, কেউ দুর্বল, কেউ বা সরল হয় কেন, কেন জীব দশমাস দশদিন জঠর আগারে বাস করে, কি করলে নারীজাতি পতিব্রতা বা ব্যাভিচারিণী হয়, কেউ অধার্মিক, কেউ ধার্মিক হয়, এ সব কারণ শোনবার ইচ্ছা আমার হয়েছে। পার্বতীর কথা ধীরভাবে শ্রবণ করলেন শূলপাণি। অপূর্ব এক আনন্দে তাঁর হৃদয় বরে উঠল। সারা মুখমন্ডল উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
তিনি বললেন, হে গিরিনন্দিনি, তুমি জগজ্জননী — আদিমাতা প্রকৃতি, জগৎ সংসার তোমার মায়াতে আচ্ছন্ন। কিন্তু দেবি, তুমিই সেই মহামায়ায় বিমোহিত হয়ে যে যাবতীয় পূর্বকথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হচ্ছ এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় সন্দেহ নেই।
শাস্ত্রগত শ্লোক :
ত্বমাদ্যা জগত্যাং মাতা মায়ৈব তব কেবলং।
তয়ৈব মোহিতা ত্বং হি চিত্তমেতৎ নগাত্মজে ॥
মহাদেব তারপর পার্বতীকে সমস্ত প্রাচীন কথা স্মরণ করতে বললেন।
সারা বিশ্বজগতের মাতা পরমা প্রকৃতি পাবর্তী। তিনিই অখন্ড অনন্ত সংসারের মূলশক্তি। সমগ্র বিশ্বজগৎ তাঁর থেকেই উদ্ভুত শক্তির প্রকাশই হলো এই লক্ষ কোটি ভুবন। তাই এ বিষয়ে সমস্ত কথাই পার্বতী ইচ্ছা করলে ধীরে ধীরে স্মরণ করতে পারেন।
মহাদেব তাই বললেন- হে মহাদেবি, কৈলাস শিখরে তোমার সঙ্গে বিহারকালে যে সব ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল সেই মনোরম পূর্বকথা স্মরণ কর।
সারা পৃথিবী যখন আদিকালে প্রলয়পয়োধিজলে নিমগ্ন ছিল, সেই কালে আমি (মহাদেব) তোমারই সঙ্গে এই রমণীয় কৈলাস শিখরে বিরাজিত ছিলাম। শাস্ত্রগত শ্লোক:
স্মর স্মর মহাদেবি পূর্ব্বকথাং মনোরমাং।
কৈলাস-মূৰ্দ্ধনি জাতাং ত্বয়া সার্দ্ধাং নম প্রিয়ে ॥
জলার্ণবে সংসারেহস্মিন অহমেব ত্বয়া সহ।
কৈলাসশিখরে রম্যে স্থিতবান্ পরমেশ্বরি ॥
তারপর সেই সুদূর অতীত দিনে বিশ্বের যত নরনারীর সৃষ্টি হয়েছিল কিভাবে, সেই বিষয়ে প্রাচীন কথা বলতে গিয়ে মহাদের জীবসৃষ্টির মূলসূত্র, তাঁর নিজের সঙ্গে জননী পার্বতীর বিহারের কথা পার্বতীর সমীপে ধীরে ধীরে ব্যক্ত করলেন। সব কথা তাঁকে স্মরণ করালেন।
তিনি বললেন-প্রিয়ে, সেকালে তুমি বিহার বাসনা প্রকাশ করেছিলে- আমি তাই তোমার সঙ্গে ক্রীড়া করেছিলাম।
কিন্তু আমি সবসময় উর্দ্ধরেতা হয়ে অবস্থান করতাম। হে বরাননে, সেই সব পূর্বকথা তুমি কেন বিস্মৃত হতে চলেছ?
আমি এই প্রকারে বিহার করতে থাকলেও তাতে তোমার তৃপ্তি সঞ্চার হলো না। তুমি তোমার বিরক্তি প্রকাশ না করায় তা আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু তুমি আমার প্রতি কূপিতা হয়ে আমার সামনে থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেলে। তোমার নেই আকস্মিক প্রস্থানের কারণ আমি ভালভাবে বুঝতে পারলাম না- তাই অত্যন্ত ব্যাকুলচিত্ত হয়ে উঠলাম।
তুয়া সার্দ্ধং তদা রেমে রম্ভকামা চ ত্বং যদা।
উর্দ্ধরেতা নদাহন্তু-বিস্মৃতানি কথং প্রিয়েঃ।।
অতৃপ্তাসি তথাপি ত্বং কুপিতা তু নমোপরি।
অন্তর্হিতা গতা দেবী ব্যাকুলোহহং তদা প্রিয়ঃ।।
এইভাবে প্রতিটি বাক্যের শাস্ত্রগত শ্লোক আমরা পর পর একইভাবে প্রদান করছি।
জগৎজননী পাবর্তী।
মহাদেব তাই অনন্যোপায় হয়ে কি করেন, কোথায় যান, কিছুই স্থির করতে না পেরে ব্যাকুলিত চিত্তে চঞ্চলভাবে নানাদিকে ভ্রমণ করে করে ক্লান্ত হয়ে হতাশভাবে উপবেশন করতে বাধ্য হলেন। সঙ্গে সঙ্গে অপূর্ব দিব্য স্তবমালা তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হতে লাগলো।
স্তব ও প্রার্থনায় পার্বতী বিগলিত হলেন। এই স্তব প্রভাবে মহাদেবের কামনা সিদ্ধ হলো— আবার পার্বতী এসে দেখা দিলেন তাঁর সামনে। মহাদেব বন্দনা করলেন—হে দেবি, তুমি আদিমাতা, তুমিই অনন্ত প্রকৃতি, তোমার মায়াকে অনুভব করবার শক্তি এই তিন ভূবনে ক’জনের পক্ষে সম্ভব?
মহাদেব বললেন- হে দেবি, আমি যখন এইভাবে স্তব করে চলেছিলাম, তখন তুমি প্রসন্না হয়ে সহাস্যমুখে আমার সামনে আবির্ভূতা হলে। হে অনযে, তখন আমি আমার আত্মাকে সার্থক জ্ঞান করতে লাগলাম।
কিং করোমি ক্ক গচ্ছামি ইতি চিন্তোপরোহভরম্
স্তবশ্চ তব দেবেশি মনুখাগ্নির্গতোহভবৎ ।।
স্তোত্রস্যাস্য প্রসাদেন সিদ্ধকামো হৃহং তদা।
ত্বঞ্চৈব প্রকৃতি দেবি তব মায়া দুরত্যয়া।
স্তবে পরিতুষ্টা ত্বমাবিরভূঃ পুরো মম।
সম্মিতবদনা দেবি সার্থকোহহং তদানখো।।
মহাদেবের কাতর প্রার্থনায় গিরিরাজনন্দিনী প্রসন্না হলেন। তিনি তখন আবার মহাদেবের কাছে বিহারের অভিলাষ প্রকাশ করলেন।
মহাদেব তাঁর ইচ্ছে পূর্ণ করলেন। তখন মহাদেব দেবীকে কামার্ত দেখে সুদীর্ঘ দ্বাদশ বর্ষ তাঁর সঙ্গে পরম সুখে ক্রীড়া করলেন।
ধীরে ধীরে কথাগুলি বলে মহাদেব তারপর বললেন— কিন্তু হে পাৰ্বতী, আমি নিস্কাম যোগী—অর্থাৎ আমি নিষ্কামভাবে তোমার সঙ্গে ক্রীড়া করেছিলাম।
কিন্তু তখন আমার হৃদয়ে কামের সঞ্চার হয়নি। আমার সে বিহার ছিল সম্পূর্ণ কামগন্ধহীন। তাই সে ক্রীড়াতে তুমি বিন্দুমাত্র পরিতৃপ্ত হতে পারলে না। তখন আমি তোমাকে বললাম- হে দেবি, তুমি কি কারণে আমার প্রতি এভাবে কূপিতা হয়েছিলে?
আমার কথা শুনে তুমি তখন তোমার মনের ভাব পূর্ণরূপে আমার কাছে ব্যক্ত করলে। তখন আমি সব বুঝতে পারলাম।
মহাদেবের হৃদয়ে তখন এর পূর্ব কারণ প্রকটিত হয়ে উঠল তিনি বুঝতে পারলেন কেন পার্বতী কিছুতেই তৃপ্ত হতে পারছেন না।
মহাদেব জানেন তিনি নিষ্কাম যোগী।
কিন্তু নিষ্কাম বিহারে বা ক্রীড়ায় পার্বতীর পরিতৃপ্তি হবে না। তাই তিনি তখন পার্বতীর চিত্তবিনোদনের জন্যেই নিজের দেহ থেকে কাম ও রতির সৃজন করলেন। এইভাবে পার্বতীর চিত্তবিনোদনের জন্য কাম ও রতির সৃষ্টি হলে তিনি কামভাবে তাঁর সঙ্গে ক্রীড়া করলেন।
মহাদেবের দক্ষিণ অঙ্গ থেকে কামের ও বাম অঙ্গ থেকে সুন্দরী কাম- বিনোদিনী রতির সৃষ্টি হলো।
তখন থেকেই ক্রমে নরনারী প্রভৃতি নানা জীবের সৃষ্টি শুরু হতে লাগল।
নিষ্কামোহহং পরং যোগী তৃপ্তির্ন জায়তে তব।
অবোচঞ্চ মহাদেবী কথং কুপ্যসি পাৰ্ব্বতী ॥
প্রীত্যর্থং তব দেবেশি সৃজামি মদনং রতিং।
ক্রীড়ামি কামভাবেন প্রজাং সৃজামি চ ক্রমাৎ।।
ইত্যুত্ত্বা দেবদেবেশো দক্ষাঙ্গাৎ কামমসৃজ।
বামাচ্চ সুন্দরীং দেবীং রতিং রতিবিনোদিনীং।।
তারপর থেকেই জগৎসংসার নরনারীতে সমাকীর্ণ হয়ে উঠল। এই হলো রতিশাস্ত্রমতে জীবসৃষ্টির মূল কথা।
পার্বতীও ক্রীড়াপরায়ণা হয়ে সেই সময় থেকে বিহারে পরিতৃপ্ত হতে লাগলেন। তারপর থেকেই বিহারে হর-পার্বতীর আনন্দ ও জীব-সৃষ্টি একসঙ্গে চলতে লাগল।
তদা প্রভৃতি বিশ্বোহয়ং নরনারীসমাকুলঃ।
ক্রীড়াপরায়ণৌ দেবৌ পার্ব্বতী-পরমেশ্বরৌ।।
এইভাবে মহাদেব প্রাচীন রতি ও কামের উৎপত্তি ও তাঁদের রতির উৎপত্তি থেকে বিশ্বজগতের নরনারী, জীবজন্তুর সৃষ্টির কথা বর্ণনা করলেন।
এখানে একটি কথা আছে। তা হলো, এই বর্ণনার মধ্যে কিছুটা রূপকের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বের সৃষ্টি আর নরনারীর সৃষ্টিতত্ত্বকে বিরাট উচ্চ ও মহান আসন দেবার জন্যেই হর-পার্বতীর বিহার থেকে বিশ্বের নরনারী সৃষ্টির কথা শাস্ত্রে বলা হয়েছে।
এর মূলীভূত কারণ হলো পরমাত্মা অনন্ত, অখন্ড। পরমাত্মা থেকে উদ্ভুত প্রতিটি জীবাত্মা। জীবাত্মা আবার পুরুষ ও প্রকৃতি দুইবাগে ভাগ হয়ে রতিবিহাররূপ আনন্দের মধ্য দিয়ে বংশবৃদ্ধি করে চলে। জীবাত্মার তৃপ্তি ও আনন্দ পরমাত্মারও আনন্দ। আবার বিশ্বের নরনারীর সৃজন ও বংশবৃদ্ধির জন্যেও রতি ও কামের একান্ত প্রয়োজন।
এই জন্যেই গ্রন্থে এইভাবে রতিশাস্ত্র বিষয়ে প্রারম্ভ বর্ণনা করা হয়েছে।
মহাদেব কর্তৃক রতিশাস্ত্রের প্রশংসা
এইভাবে হর-পার্বতীর বিহার ও কাম রতি ও জগতের নরনারীর সৃষ্টি বিষয়ে বর্ণনা করার পর মহাদেব রতিশাস্ত্রের প্রশংসা করতে লাগলেন।
তিনি বললেন, পৃথিবীতে রতিশাস্ত্র সর্বশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ বলে পরিগণিত।
সমস্ত পৃথিবী এমন কি ত্রিজগত পর্যন্ত এই শাস্ত্রের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত।
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও ইন্দ্রাদি দেবগণ সর্বদা এই সুখাবহ শাস্ত্র দিবারাত্র হৃদয়ে চিন্তা করে থাকেন।
এই শাস্ত্রের বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারলে হৃদয় পরম সন্তোষ ও সুখের উদয় হয়। সর্বশাস্ত্রে বলে, এই শাস্ত্র অতি প্রয়োজনীয় — জ্ঞেয় শাস্ত্রগুলির মধ্যে অন্যতম।
এই শাস্ত্র মনোহর রসের আকর। যারা মূর্খ, অহঙ্কারী বা দাম্ভিক তারাই এই শাস্ত্র সম্যক্ বুঝতে না পেরে এ বিষয়ে কদর্থ করে থাকেন।
রতিশাস্ত্র যে অবিদিত থাকে, কেবল নারীর মন ভোলাবার জন্যে তার সঙ্গে ক্রীড়া করে, সে কামগন্ধপূর্ণ পশুর সমান।
এইভাবে মহাদেব রতিশাস্ত্রের প্রশংসা করে এই শাস্ত্রির অভ্যন্তরে যে যে বিষয়গুলি আছে তার বিস্তৃত বর্ণনায় ব্রতী হলেন। সে সব বিষয়ে একে একে বর্ণনা করা হবে।
রতিশাস্ত্রং বিনা দেবি নাস্তি শাস্ত্রং ধরাতলে।
অস্মিন্ প্রতিষ্টিতা পৃথ্বী অস্মিন্নেব জগত্ৰয়ং ॥
ব্রহ্মা বিষ্ণুশ্চ রুদ্রশ্চ ইন্দ্রাদ্র্যা অসুরদ্বিষঃ।
চিন্তয়ন্তি হৃদা সর্ব্বে শাস্ত্রমেতৎ সুখাবহং ॥
পুরুষভেদ কথা
রতিশাস্ত্রগ্রন্থের প্রারম্ভে সর্বপ্রথম রতিশাস্ত্রানুযায়ী নারী ও পুরুষকে চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।
চারটি জন্তুর সঙ্গে চার জাতির পুরুষকে তুলনা করা হয়েছে। ওই জন্তুগুলির প্রকৃতি যেন কিছুটা প্রতিফলিক হয় এই মানুষগুলির মধ্যে।
শুধু প্রকৃতি নয়, দেহ, রতিবিহার, মানসিক অবস্থা সব দিক বিচার করে এই চারটি ভাগ বর্ণনা করা হয়েছে।
অবশ্য বিশ্বের যাবতীয় পুরুষ বা নারী এই চার ভাগেই যে সীমাবদ্ধ তা নয়।
দুই ধরনের গুনবিশিষ্ট অর্থাৎ মাঝামাঝি বহু নারী আছে এই পৃথিবীতে। তবে মোটামুটি ভাগের জন্যে এই চারটি ভাগই ধরা হয়ে থাকে। তাই এই চারটি ভাগের বর্ণনা—সুন্দর তুলনামূলক। এই বিভাগ যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে স্বীকৃত হয়ে আসছে।
চার জাতির পুরুষ হলো—
(১) শশক জাতীয় পুরুষ।
(২) মৃগী জাতীয় পুরুষ
(৩) বৃষ জাতীয় পুরুষ।
(৪) অশ্ব (তুরগ) জাতীয় পুরুষ।
চত্বার পুরুষাশ্চৈব স্ত্রীজাতীয় স্তথৈব চ।
আদৌ শশ্য মুগস্ট বৃষণ্টৈব তৃতীয়কঃ ॥
চতুর্থস্তুরগণ্টৈর নরা এতে চতুৰ্ব্বিধাঃ।
বক্ষ্যামি লক্ষণঞ্চৈসাং শুধুদাবহিতা মম ॥
চার জাতীয় পুরুষের নামকরণ করবার পর প্রত্যেক বিষয়ের পুরুষের নাম লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে।
শশক জাতীয় পুরুষের লক্ষণ ও গুণাগুণ
শশক জাতীয় পুরুষের দেহ নাতিখর্ব ও নাতিদীর্ঘ হয়ে থাকে। তার শরীর কন্দর্পের মত অপরূপ কান্তিবিশিষ্ট ও সুলক্ষণযুক্ত।
শশক জাতীয় পুরুষের হৃদয়ে বিন্দুমাত্র পাপ থাকে না। সে ব্যক্তি সবসময় শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শন করে থাকে। গুরু দেবতা ও ব্রাহ্মণদের প্রতি থাকে হৃদয়ের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা— তাদের সে মনে-প্রাণে পূজা করতে ভালবাসে। সে ব্যক্তি কৃষ্ণ ভক্তিপরায়ণ হয়ে দিনযাপন করে থাকে—নিরন্তর কৃষ্ণকথা শুনতে সে অত্যন্ত ভালবাসে।
শশক জাতীয় পুরুষ শিষ্ট, শান্ত ও পরোপকারপ্রবৃত্তিযুক্ত হয়ে থাকে। তারা হয় প্রকৃত হৃদয়গত প্রেমিক — উচ্চ মানসিক প্রেম তারা পছন্দ করে। তারা হয় একনিষ্ট—একজনকে প্রকৃত ভালবাসতে চায়, বিভিন্ন নারীর প্রতি তাদের আসক্তি দেখা যায় না।
নাতিখর্ব্বো নাতিদীর্ঘঃ কামকান্তিঃ সুলক্ষিতঃ।
আপাপ্পা ভক্তিমাংশ্চৈচ গুরু-দেব-দিজার্চ্চকঃ।।
সদা চ সাধুসংসর্গী কৃষ্ণকথাপরায়ণঃ।
পরদার-বিমুখশ্চ কৃষ্ণকথাসু লালসঃ ॥
গভীরবচনঃ শিষ্টঃ শান্তঃ পরোপকারকঃ।
শশকঃ স চ বিজ্ঞেয়— চিহ্নিত ॥
মৃগ জাতীয় পুরুষের লক্ষণ ও গুণাগুণ
মৃগ জাতীয় পুরুষেরা সাধারণতঃ দীর্ঘাঙ্গ হয়ে থাকে। তাদের দেহ সুশীতল মুখমন্ডল সদা হাস্যপরিপূর্ণ থাকে। সেই ব্যক্তি যখন স্নান করে তখন খুব যত্ন করে তার গাত্রমার্জ্জনা করতে ভালবাসে।
মৃগ জাতীয় পুরুষকে তার চলাফেরার ভঙ্গি থেকেও অনেকটা চিনতে পারা যায়। দীর্ঘ অঙ্গ বলে তারা যখন জোরে হাঁটে তখন যেন তারা লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে বলে মনে হয়।
এই পুরুষেরা হয় বহুভোজী ও ভোজনবিলাসী। শশকদের থেকে তারা কিছুটা বেশী আহার করতে থাকে। তারা বেশ বলবান হয়ে থাকে তবে বিশেষ স্থূল হয় না। তারা দিনরাত সংগীতে রত থাকতে ভালবাসে, দেবতা ও অতিথির সেবা করে।
গুরু ও দ্বিজের প্রতি এদের শ্রদ্ধা থাকে এরাও কৃষ্ণকথা শুনতে ভালবাসে। শশক পুরুষের সঙ্গে এই বিষয়ে ওদের চমৎকার মিল থাকে।
কিন্তু শশক পুরুষের থেকে ওদের প্রধান পার্থক্য এই যে, শশকের মন যেমন নির্মল ও বিশুদ্ধ হয়, পাপের লেশমাত্র থাকে না, মৃগের ঠিক তা নয়। তারা বাইরে অনেক ধর্মপরায়ণ হলেও অন্তরে তারা কিছুটা কপট থাকে। সাধারণতঃ বাইরে থেকে অবশ্য সেটা বুঝতে পারা যায় না।
মৃগ জাতীয় পুরুষরা শশকের থেকে একটু বেশি নারীসঙ্গ-অভিলাষী হয়—তাদের প্রেমের সঙ্গে কিছুটা কামগন্ধ মেশানো থাকে। তবে তারাও বহুনারীতে অত্যাধিক আসক্তি পরায়ণ হয় না।
দীর্ঘাঙ্গঃ শীতগাত্রশ্চ উর্দ্ধনেত্রঃ স্মিতাননঃ।
স্নানে সমার্জ্জতে গাত্রমুৎপত্যোৎপত্য গচ্ছতি ॥
বহ্বাশী বলবাংশ্চৈব কৃষ্ণকথাপরায়ণঃ।
রাত্রিন্দিবঃ গীতরতো দেবতাথিসেবকঃ
গুরুদ্বিজাকেশ্চৈব কঠোরহৃদয়স্তু বৈ।
কপটী মৃগজাতিশ্চ চিহ্ন—সম্মিতঃ ॥
বৃষ জাতীয় পুরুষের লক্ষণ ও গুণাগুণ
বৃশ জাতীয় পুরুষের পা ক্ষুদ্র এবং জিহ্বা দীর্ঘ হয়ে থাকে। ওদের দেহ থেকে গুবাকের গন্ধ বের হয়ে থাকে। ওরা অতিরিক্ত মাত্রায় ভোজনপ্রিয় হয়ে থাকে। দেহ হয় হৃষ্টপুষ্ট—অনেক সময় ওরা খুব স্থূলাঙ্গও হতে পারে।
ওরা সব সময় নারীদর্শনে অভিলাষী হয়ে থাকে। শুধু দর্শন নয়, মনে-প্রাণেও ওরা নারীসঙ্গ দিবারাত্র কামনা করে থাকে।
এরা নিলজ্জ ও অধার্মিক হয়ে থাকে। কোনো কথা বলতে বা কোনো অন্যায় কাজ করতে এদের মনে বাধে না।
শৃঙ্গারসাধনপরায়ণ হয় এরা। চিত্ত সর্বদাই মদনানলে কাতর থাকে। এদের মন সর্বদা পাপে রত থাকে পাপ প্রবৃত্তি যেন এদের মনের সঙ্গে সব সময় জড়িয়ে থাকে। যে কোনো পাপ করতে এদের বাধে না। এদের নিদ্রা বেশি হয় না, চোখ দুটি প্রফুল্ল থাকে। মধ্যমদেহযুক্ত হয় এই পুরুষেরা।
বৃষ জাতীয় পুরুষেরা মৃগ ও শশকের থেকে অনেক বেশি কামপ্রবৃত্তিপূর্ণ হয়ে থাকে। কামের জন্য কোনো নিলজ্জ বা পাপ কাজ করতে ওদের মনে বাধে না। এদিক থেকে আগের বর্ণিত দুইজাতির থেকে এরা অগ্রহণ্য। প্রচুর ভোজনের জন্যও এরা স্থূলাঙ্গ হয়ে থাকে। রাসভের (গাধার) চিহ্নযুক্ত এই সব পুরুষেরা।
হ্রস্বপদো দীর্ঘজিহ্বঃ পুগগন্ধিকলেবরঃ।
বহ্বাশী হৃষ্টপুষ্টাঙ্গো নারীদর্শনলালসঃ ।।
নির্লজ্জো ধৰ্ম্মহীনোশ্চ পাপেষু নিরতঃ সদা।
শৃঙ্গারে মন আধত্তে মদনাতুরমানসঃ ।।
প্রফুল্লসয়নশ্চৈব নিদ্রাং ন ভজতে বহু।
রাসভস্যৈব চিহ্ন-সম্মিতঃ।
কীৰ্ত্তনং বৃষজাতেন্ত্র—লক্ষণঃ বিদ্ধ
অশ্ব জাতীয় পুরুষের লক্ষণ ও গুণাগুণ
মহাদেব অতঃপর অশ্ব জাতীয় পুরুষের লক্ষণাদি বর্ণনা করতে লাগলেন।
অশ্ব জাতীয় পুরুষের দেহ রক্তবর্ণ হয়, শরীর খুব স্থুল হয়ে থাকে। এই জাতীয় পুরুষের ঘুম খুবই কম হয়। তারা দ্রুত চলাচল করতে পারে।
তারা অধার্ম্মিক, মদনকাতর, মিথ্যাবাদী ও দুরাচর হয়ে থাকে। যে কোনো কদাচারে তারা সহজেই রত হয়ে থাকে।
পরনিন্দা, পরচর্চা করতে তারা খুব ভালবাসে। তারা প্রচুর ভোজন করতে পারে এবং ভোজনে তাদের যথেষ্ট আকাঙ্ক্ষা থাকে। তারা ধর্মহীন ও ক্রোধপরায়ণ হয়।
যে কোনো রমণী দেখলেই তারা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে ও তার সঙ্গ কামনা করে।
অশ্ব জাতীয় পুরুষেরা অত্যন্ত কামার্ত হয়ে থাকে। ধর্মে তাদের মতি থাকে না। নিজ স্বার্থসিদ্ধি ও কামতৃষ্ণা চরিতার্থ করবার জন্যে যে কোন কুকর্ম বা কদাচারে তারা লিপ্ত হতে পারে।
অশ্ব জাতীয় পুরুষের রতিশক্তি অন্য তিন জাতীয়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়। তার পরেই অবশ্য বৃষের স্থান।
শৃণু দেবি প্রবক্ষ্যামি অশ্বজাতেম্ভ লক্ষণং
কৃষ্ণাঙ্গো ধর্মহীনশ্চ নিদ্ৰাং গচ্ছতি কৰ্হিচিৎ ॥
দ্রুতগামী স্থলকায়ো মদনাতুরমানসঃ।
মিথ্যাভাষী দুরাচারঃ কদাচারপরায়ণঃ ॥
সদা ক্রোধিতচিত্তশ্চ পরাপবাদতারকঃ।
বহুভোজী সদা তুষ্টঃ সদা ধৰ্ম্ম-বিবর্জিতঃ ॥
যা কাঞ্চিৎ রমণাং প্রাপ্য ফুলসুরত মানসঃ
ইত্যেত কথিতং দেবি চতুঃ পুরুষ লক্ষণং।
অধুনা কিং প্রবক্ষ্যামি কমন্যৎ শ্রোতুমিচ্ছসি ॥
নারীভেদ নিরূপণ
এইভাবে মহাদেব চার জাতির পুরুষের বর্ণনা পার্বতীকে শোনালেন।
পার্বতী সব শুনে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকার নারীভেদের কথা শুনতে চাইলেন।
মহাদেব বললেন—আগেই বলেছি, চার জাতীয় পুরুষের মত নারীও চার প্রকারের। বিধাতার রাজ্যে জীবসৃষ্টির এমনি মাহাত্ম্য যে প্রত্যেক জাতির অনুরূপ ভিন্ন ভিন্ন প্রকার নারীও তিনি ঠিক সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ যেমন ঠিক চার জাতির কিংবা তার মাঝামাঝি মিশ্র জাতির হয়ে তাকে।
চার জাতির পুরুষের রতিপ্রকৃতি ও চরিত্র যেমন ভিন্ন হয়—চার জাতির নারীর ক্ষেত্রে ও ঠিক তাই হয়ে থাকে।
আবার ঠিক যে যে জাতির পুরুষ, ঠিক তেমনি নারীরাও সেই সেই জাতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে।
চার জাতির নারী হলো-
(১) প্রথম জাতীয় অর্থাৎ পদ্মিনী
(২) দ্বিতীয় জাতীয় অর্থাৎ চিত্রিণী।
(৩) তৃতীয়া নারী অর্থাৎ শঙ্খিনী।
(৪) চতুর্থী নারী অর্থাৎ হস্তিনী।
প্রথমা পদ্মিনী নারী দ্বিতীয়া চিত্রিণী তথা।
তৃতীয়া শঙ্খিনী চৈব চতুর্থী হস্তিনী তথা।
এবং শাস্ত্রোনিতাঃ সিদ্ধাশ্চতুর্দ্ধা নারীজাতয়ঃ।।
পদ্মিণী নারীর লক্ষণ ও গুণাগুণ
ইতিহাস পাঠকমাত্রেই চিতোরের রাণী পদ্মিণীর নাম হয়ত শুনেছেন। তিনি নাকি অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন। শাস্ত্রে মহাদেবের বর্ণিত সমস্ত সুলক্ষণ কি তাঁর মধ্যে বর্তমান ছিল।
পদ্মিণী জাতীয়া নারী পতিব্রতা হয়ে থাকে। তারা অত্যন্ত ধর্ম-পরারণ হয়। সৎপথে থাকতে এবং ধর্ম আচরণ করতে তারা ভালবাসে। অসাধু কথা বা অসৎ আলোচনা করতে তারা একেবারেই পছন্দ করে না।
পদ্মিণী নারীরা পরম রূপবতী হয়ে থাকে। তাদের গাত্র থেকে পদ্মফুলের মত সুন্দর গন্ধ নির্গত হয়। তাদের নেত্র মৃগের মতো মনোহর, কষ্টের মিষ্ট কঙ্কার কোকিলের সঙ্গে তুলনা করা চলে।
তাদের নয়নের সুমনোহর কটাক্ষে যেন সারা জগৎ বিমোহিত হয়ে যায়, এমনি অপূর্ব সে চোখের দৃষ্টি। তারা যখন চলে তখন যেন মরালের কথা মনে পড়ে।
কমলিনীর মতো সদা হাস্যময় তাদের শুভ আনন। তারা পরম স্নেহময়ী ও সর্বপ্রকার সুলক্ষণযুক্ত হয়ে থাকে।
পদ্মিণী নারীকে শাস্ত্রে সর্ব নারীর মধ্যে সবশ্রেষ্ঠ অর্থাৎ উত্তম বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
সতী পতিব্রতা যা চ সদা ধৰ্ম্মপরায়ণাঃ।
মৃগাক্ষী পদ্মগন্ধা চ সুবাণী কোকিলস্বনা ।।
জগন্মোহয়তে যা চ কটাক্ষৈঃ সুমনোহরেঃ।
মরালগমনা যা চ যা তু স্মিত শুভাননা।।
সদা স্নেহময়ী যা তু—সুলক্ষিতা।
শাস্ত্রেষু তাদৃশী নারী পদ্মিণী সা স্মৃতা বুধৈঃ ॥
চিত্রিণী নারীর লক্ষণ ও গুণাগুণ
চিত্রিণী নারীর গুণাবলী অনেকটা পদ্মিণীর মত। তবে পদ্মিণীর দেহের চেয়ে তারা একটু বেশি লম্বা হয়।
চিত্রিণী নারীর দেহও অপূর্ব সুন্দর ও লাবণ্যমন্ডিত, তাদের চিত্ত দৃঢ় অর্থাৎ লোভ ইত্যাদিতে তারা বিগলিত হয় না।
চিত্রিণী নারী সর্বদা জিতেন্দ্রিয় ও সত্যবাদিনী হয়ে থাকে—তারা মিথ্যা বাকা বলা বা তেমন আচরণ পছন্দ করে না। তারা সর্বদা দেবতা, ব্রাহ্মণ ও গুরুজনদের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করে থাকে। একমাত্র পতি ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের প্রতি কদাচ আকৃষ্ট হয় না।
প্রলোভন বা প্রচুর অর্থও সচরাচর চিত্রিণী নারীর মন জয় করতে বা তাদের বিপদগামিনী করতে পারে না।
কাম খুব বেশি থাকে না এই নারীদের। অল্প মিলন বা বিহারেই তারা সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত হয়। তারা সকলের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে— সকলের প্রতি মিষ্টবাক্য প্রয়োগ করে।
পাপকর্মের প্রতি তাদের মন আকৃষ্ট হয় না। সর্বদা ধর্মপথে থেকে পূজা অৰ্চণা করতে তারা ভালবাসে। দয়া, ক্ষমা, সততা এই যেন তার অঙ্গের ভূষণ। যে সবনারী এই সব অমূল্য সদ্গুণগুলির আধার, তাদেরই শাস্ত্রে চিত্রিণী বলে আখ্যা প্রদান করা হয়েছে।
সুন্দরী দৃঢ়চিত্তা যা সদা চ সত্যভাষিণী।
সদা ভক্তিমতী চৈব দেবদ্বিগুরুম্বপি ॥
চিত্তং ন বসতে যস্যাশ্চান্যেষু স্বপতিং বিনা।
অলোপুপা ভবেদ যা চ সন্তুষ্টা স্বল্পমৈথুনে ॥
সৰ্ব্বেষু প্রিয়বাক্যা চ পাপচিত্তা ন কৰ্হিচিৎ।
দয়া কক্ষশাশ্চ ধৰ্ম্মশ্চ যস্যাঃ স্যাদঙ্গভূষণং।
—চিত্রিণী সা কথিতা বুধৈঃ ॥
শঙ্খিনী নারীর লক্ষণ ও গুণাগুণ
শঙ্খিনী নারীর দেহ ও প্রকৃতি অন্য এই প্রকার নারীর থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে থাকে। তাদের পাত্র থেকে সর্বদা ক্ষারের গন্ধ অনুভূত হয়ে থাকে। এদের কেশ হয় দীর্ঘ, নাক হয় ঈষৎ উন্নত, তাই এদের দেহ মোটামুটি ভাল হলে বেশ ভালই দেখায়।
শঙ্খিনী নারী হয় ভোজনবিলাসিনী। সব সময়ই যেন তাদের ক্ষুধার উদ্রেক হয়ে থাকে। তাদের দেহ একটু স্থূল ধরনের হয়। স্তনদ্বয় হয় উন্নত ও কঠোর। এই নারীদের ধর্মে ততটা গতি থাকে না। ধর্ম-আলোচনা বা সৎ কথা এরা ততটা ভালবাসে না। কেউ সুপরামর্শ দিলে সচরাচর তা গ্রহণ করতে চায় না। এরা কুবুদ্ধিমতী হয়। এরা উচ্চ স্বরে হাস্য করতে ভালবাসে। সেই হাস্য-ধ্বনিতে যে গগন বিদীর্ণ হয়।
একটু স্থূল বলে এদের আকৃতি মোটামুটি সুন্দর হয়।
এরা সর্বদা মদনাতুরা হয়ে কামবশে হাস্য পরিহাস করতে ভালবাসে। নিজ পতিকে ত্যাগ করে সর্বদা অন্য পুরুষের সঙ্গে মিলন-বাঞ্ছা করে।
এদের হৃদয় কপটতায় পূর্ণ। নিজের প্রবৃত্তি ও কু মনোভাব এরা সর্বদা নানা মিথ্যা কথার আড়ালে গোপন করে। এরা নিরন্তর শৃঙ্গারে উন্মত্ত হয়ে থাকে – আর তা ছাড়া পাপ কথায় দিন রাত্রি কাটাতে ভালবাসে। দেব, দ্বিজ বা গুরুজনে এদের বিন্দুমাত্র ভক্তি থাকে না।
শঙ্খিনী স্যাৎ ক্ষারগন্ধা দীর্ঘকেশোর্দ্ধনাসিকা।
সদা ক্ষুধাবতী সা চ পীনোন্নতঘটস্তনী ॥
গগনোচ্চাতিহাস্যা চ সদা কুবুদ্ধিশালিনী।
সুন্দরী মদনার্তা চ কামহাস্যপরায়ণা ॥
অন্যৈশ্চ কুরুতে বাঞ্ছাং ত্যত্ত্ব তু স্বপতিং শুভং।
সদা শৃঙ্গারমত্তা পাকথাপরায়ণা ॥
ন বিভেতি সদা সা চ গুরুজনেভ্য এব তু।
—চ শাস্ত্রোক্তং লক্ষণং স্মৃতং ॥
হস্তিনী নারীর লক্ষণ ও গুণাগুণ
হস্তিনী নারীর আকার ও আচরণ সবই অন্য সব জাতীয় নারীদের থেকে একেবারে পৃথক।
হস্তিনীদের মত তাদের শরীর হয় প্রকান্ড — অনেক সময় তারা ভীষণ ভাবে স্থূলাঙ্গী হয়ে থাকে।
তাদের অঙ্গে সব সময় যেন মদগন্ধ প্রবাহিত হতে থাকে। এই নারী নিচের আচারভ্রষ্ট হয়ে সব সময় কদাচারে প্রবৃত্ত থাকে।
এদের মাথায় চুল খুব সামান্য মাত্র থাকে, মুখে মৃদু মৃদু হাসি লেগেই থাকে। চোখদুটি হয় টকটকে লাল। সেই চোখে এরা সব সময় চারিদিকে তাকিয়ে দেখে। এদের স্তনদ্বয় হয় উচ্চ ও কঠিন এবং স্বর হয় কর্কশ ও গম্ভীর। এরা সামান্য সুন্দরী হয় কিন্তু দেখতে প্রবীণা অর্থাৎ প্রকৃত বয়সের চেয়ে এদের বয়স অনেক বেশি দেখায়।
হস্তিনী নারী সর্বদা মদনবিহ্বলা থাকে ও মদনবশে নির্লজ্জার মতো আচরণ করে। পুরুষের সংস্পর্শে এদের সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে ও মন আনন্দ রসে পূৰ্ণ হয়।
এই জাতীয় নারী দিবারাত্র শৃঙ্গারে মনোনিবেশ করে। নিজের পতির প্রতি রতিকামন ছাড়া অন্য আকর্ষণ বেশি থাকে না – প্রয়োজন হলে নিজের পতি ছাড়াও অপর পুরুষসহ সুখ সম্মিলন করে থাকে। ওদের পাপপ্রবণতা অত্যন্ত বেশি।
এই জাতীয় নারী কাম এবং স্বার্থের জন্য যে কোন পাপকাজ করতে বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করে না।
যে সমস্ত নারীরা স্বার্থের জন্য পাপের পথে পা বাড়ায় এবং বিপদগামিনী হয় বা ব্যভিচারিণী হয়, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ হস্তিনী জাতীয় ও কিছুটা শঙ্খিনী জাতীয়া নারী।
ধর্মকর্ম বা দেবদ্বিজ-গুরুজনে ভক্তি ওদের থাকে না। এ বিষয়ে কেউ তাদের উপদেশ দিলেও ওরা অবহেলায় তা উপেক্ষা করে থাকে।
কদাচারী সদা নারী হস্তিনী মদগন্ধিনী।
স্বাচারবর্জ্জিতা স্থূলা স্বল্পকেশা স্মিতাননা ॥
লোহিতনয়না সা চ পীনোন্নত-পয়োধরা।
প্রবীণা সুন্দরী কিঞ্চিৎ গভীরস্বরসংযুক্তা ॥
নিলর্জ্জা মদনে সা তু সদা মদনবিহ্বলা।
রোমাঞ্চিতসমগ্রাঙ্গী পুরুষস্পর্শনাৎ সদা ॥
শৃঙ্গারে মনমাধত্তে কামেন চ অহর্নিশ।
পতিং ত্যত্ত্বা তু সা চ—হন্যৈঃ সুখং সদা ॥
