দেহ গেহ বন্ধুত্ব : ছটি শারীরক তর্ক – অরিন্দম চক্রবর্তী
দেহ গেহ বন্ধুত্ব : ছটি শারীরক তর্ক – অরিন্দম চক্রবর্তী
প্রথম প্রকাশ : জুলাই ২০০৮
প্রচ্ছদ : বাবুল দে
.
উৎসর্গ
যাঁর কাছে প্রথম বাংলা রচনা লিখতে শেখা
সেই আমার অগ্রজ
ড. শান্তনু চক্রবর্তী-কে
.
প্রাগভাষ
শ্বাস নিতে ছাড়তে হয় সবাইকেই। কিন্তু শ্বাসপ্রশ্বাসের দিকে লক্ষ্য রাখতে পারে না অনেকেই। রাখতে পারলে অনেক লাভ। অনুরূপ ভাবে থাকতে, বাঁচতে, জানতে, ভুগতে, সময়ের কড়াইতে রান্না হতে হয় সবাইকেই—কিন্তু থাকা, বাঁচা, জানা, ভোগা, কালের স্বরূপ কী তা নিয়ে ভাবতে চায় না বা পারে না অধিকাংশ মানুষই। নিজেদের ভাবনার অনিচ্ছা বা অক্ষমতাকে তারা ঢাকা দিতে চায় কখনো ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে, কখনো বা ”অত ভেবে কী লাভ?” এই কীট-কাঠ-পাথরসুলভ জড়তার মোহ আবরণে। দার্শনিকরা যখন—শৌখিন শব্দবিলাস বা কালক্ষেপের জন্য নয়—প্রাণের দায়ে অস্তিত্ব, সত্য-মিথ্যা, কাল, আত্মা-অনাত্মা, জীবনের পরমকাম্য মঙ্গল-অমঙ্গল, কর্তব্য-অকর্তব্য, সুন্দর-অসুন্দর নিয়ে ভাবেন, কথা বলেন, লেখেন, তখন এই চিন্তাবিমুখ ব্যস্ত উপকরণবান সফল অতৃপ্ত উন্নয়নশীল ব্যক্তিরা বিরক্ত হয়ে বলেন—”এসব বিমূর্ত ব্যাপার নিয়ে ভাবা মানে সময় নষ্ট করা, এসব জীবনযাপনের পক্ষে প্রাসঙ্গিক নয়”। কেউ কেউ আবার গণদরদের পেশী ফুলিয়ে যুগান্তকারী বিপ্লবসাধনের অতিদর্পে বলেন ”ভেবে, বুঝে, ব্যাখ্যা করে, বিশ্লেষণ করে কী লাভ? কিছু হাতে কলমে করে তো দেখাও, সমাজটাকে পালটাও তো আগে!”—যেন না ভেবেচিন্তেই কিছু পালটানো যায় (রাজনৈতিক দল ছাড়া)।
এই ধরনের মন্দমতি মানুষের উপরভাসা বুদ্ধিগর্বে দুঃখিত ও আতঙ্কিত হতে হতেও আমি অস্তিত্ব, সত্যতা, আত্মা, সুন্দর-কুৎসিত, প্রমা-অপ্রমা এই জাতীয় ধ্রুপদী দার্শনিক বিষয়বস্তু নিয়েই বিচারবিবেচনা করতে ভালোবাসি এবং মনে করি এই বিষয়গুলি শ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই আমাদের প্রাত্যহিক-প্রাতিক্ষণিক জীবনের পক্ষে প্রয়োজনীয়। কিন্তু ঠিক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের শরীর, তার ভিতর বাহির, আমাদের বন্ধুত্বের ভাঙাগড়া, আমাদের ঘরকন্না ও গৃহকর্মের দায়িত্বভার, আমাদের গল্পবলার গল্পশোনার প্রবণতা, আর আমাদের স্বাতন্ত্র্যবোধ।
সত্তা, শূন্যতা, স্মৃতি, ধর্মাধর্ম, প্রমাণ, বিশ্বচৈতন্য ইত্যাদি দার্শনিক বিষয়গুলিকে যেমন দৈনন্দিন ও মূর্ত প্রয়োজনীয় বলে চেনা মুশকিল, তেমনি বন্ধুত্ব, গৃহস্থালি, সেবাযত্নের কর্ম, গল্পকাহিনীর আকারপ্রকার, শরীরের ব্যথা ”লাগা”র স্বরূপ, এসব ঘরোয়া প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন বিষয়কে দার্শনিক বলে চেনা মুশকিল। কিন্তু চোখের সামনে, নিজের শরীরের ভিতরে বা রান্নাঘর বা বৈঠকখানার কোণে যে গভীর দার্শনিক সমস্যার ফাঁদ পাতা আছে—তার দিকে নজর ফেরানোর চেষ্টাতেই এই সংকলনের লেখাগুলি লেখা।
‘বৃত্তান্ত’ বিষয়ে লেখাটি গাঙ্গেয় পত্র সম্পাদক অঞ্জন সেন ”ন্যারেটিভ” বিষয়ক বিশেষ সংখ্যার জন্য ফরমাইশ করেছিলেন। ক্ষমাশীল বন্ধুত্ব ও জলৌকার মতো ধৈর্য নিয়ে আমাকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত লিখিয়ে নিয়েছেন এবং এই সংকলনে পুনর্মুদ্রণের অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন। ”পান্থজনের সখ্য” লেখাটি লিখতে হয়েছিল সাহিত্য অকাদেমির আবু সয়ীদ আয়ুব স্মারক একটি সম্মেলনের তাগিদে। ওঁদের কাছে এই চাপটুকুর জন্য অধমর্ণ রইলাম।
ফিলসফিতে প্রখ্যাত ও প্রাচীনতম হল স্বাতন্ত্র্য ও নিয়তিবাদের বিতর্ক। ওই বিষয়ে আনকোরা নতুন বস্তু ভেবে বার করা মুশকিল। তাই খানিকটা নূতনত্বের লোভে ওই প্রবন্ধটি পদ্যাকারে লিখে ফেলেছি। এক কালে পদ্যাকারে কড়া কড়া দার্শনিক যুক্তি সাজানোর চল ছিল সংস্কৃত সাহিত্যে। বৌদ্ধ তার্কিক ধর্মকীর্তি, নৈয়ায়িক জয়ন্তভট্ট, মীমাংসক কুমারিল ভট্ট, পদ্যাকারে—কারিকা ও নানাছন্দোময় শ্লোক দ্বারা দার্শনিক যুক্তিযোজনা করে গেছেন। তবে মাদৃশ অকবির এই সাহস কবি ও দার্শনিকরা নিজগুণে ক্ষমা করবেন কিনা জানি না।
বাকি যে গদ্য প্রবন্ধগুলি এখানে একত্রিত হল তাদের মধ্যে কোনোটাই সাহিত্য হিসেবে পরিগণিত হবার যোগ্য নয়। অবশ্য কেউ যদি ধরে ধরে এই লেখাগুলো পড়েন তাহলে হয়তো বা লেখক, এবং লেখকের মাধ্যমে অতীতের নামী-অনামী অন্যান্য কবিমনীষীর সঙ্গেও, কিছুক্ষণের জন্য এক রকমেরসহিত-ত্ব, সাহিত্য, ঘটেও যেতে পারে। কোনো পাঠকের সেরকম কালাতীত অধ্যয়ন-সখ্য আমার সঙ্গে ঘটে গেল কিনা তা আমি জানতে না পারলেও সেটা হবে আমার পরম সৌভাগ্য। আমার দুর্দৈব যেমন আমার অজ্ঞাতসারেও ঘটতে পারে, সৌভাগ্য তো সেরকমই! আর, এক বিচিত্র ন্যায্যতার বশে, অজানা বন্ধুর সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচয়সত্বেও সহৃদয় হৃদয়সংবাদ—জানা সৌভাগ্যের থেকেও কেন জানি না, বড়তর সৌভাগ্য বলে মনে হয়।
দেহ, গেহ, বন্ধুত্ব, আখ্যান, নাস্তিকের পরমার্থ, মানুষের ইচ্ছার স্বতন্ত্রতা-পরতন্ত্রতা, এই বিষয়গুলির মধ্যে কোনো একসূত্রগ্রন্থনার চেষ্টা করিনি। কেবল একটু কল্পনা, একটু বিশ্লেষণ, একটু পূর্বসূরীদের মতের উদ্ধরণ-বিবরণ, একটু ঊহাপোহ, খণ্ডনমণ্ডন করে এইভাবে ভাববার ভঙ্গিমাটুকু হয়তো প্রত্যেকটি প্রবন্ধেই কমবেশি সাধারণ ধর্ম হিশেবে চোখে পড়বে।
এই ভাবনার স্টাইলটা যাঁদের ভালো লাগবে তাঁরা হয়তো লেখাগুলো একবারের বেশিও পড়বেন (”ধন্য আশা কুহকিনি”), আর যাঁদের পক্ষে এই স্টাইলটা অরুচিকর হবে তাঁরা অনুষ্টুপ-সম্পাদক অনিল আচার্যকে গালিগালাজ করতে চাইবেন। তবে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়—মাত্র কয়েকমাসের পরিচয়ে—যেভাবে আমাকে কল্যাণমিত্র হিশেবে গ্রহণ করে আমার বাংলা লেখাগুলি ছাপাবার জন্য আমাকে এবং প্রকাশকদের প্ররোচিত করেছেন তাতে আমি এবং আমার দার্শনিক অসম্বদ্ধপ্রলাপের অল্প কয়েকজন অনামা পাঠক তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকছি।
তেমনি, আবার, সংখ্যাগুরু তিতিবিরক্ত পাঠকদের কাছ থেকে এই দার্শনিক ছয়(আ)লাপ-পাঠজনিত বিভ্রান্তি ও বিরক্তি প্রসূত ভর্ৎসনার খানিকটা ভাগও শিবাজীকেই নিতে হবে ভেবে মায়া হচ্ছে।
অরিন্দম চক্রবর্তী


Leave a Reply