১. জীবনানন্দ ও অন্তর্মুখ দেহবোধ

জীবনানন্দ ও অন্তর্মুখ দেহবোধ

১. দেখেই তো লিখি আমরা, দেখেই তো অবাক হই। আর, অবাক না হলে কী আর বাক তেমন বিনাসাজে সেজে বেরোয় যাতে ঠিকরে পড়ে চমৎকৃতি? ‘দেখে’ ‘শুনে’, ‘ছুঁয়ে’—এই সব অসমাপিকা ক্রিয়ার অসমাপ্তিই তো উপচে পড়েছে ”রম্যাণি বীক্ষ্য, মধুরাংশ্চ নিশম্য শব্দান”—এই ”ল্যপ”-প্রত্যয়ান্ত কালিদাসী লবজে! কিন্তু দেখা শোনা, ছোঁয়া ছাড়াও অন্য কোনো এক বিশেষ রকমের টের পাওয়া বা বোধশক্তি কাজ করে আমাদের মধ্যে যার মধ্যে ডুব দিয়ে অরূপরতন তুলে আনেন কেউ কেউ। সেই অল্প ক’জন হন কবি। দেখে শুনে, ছুঁয়ে, শুঁকে ভাবস্থির অনামা বন্ধুর গন্ধে তো আনমনা হই আমরা সবাই-ই—সব সুখিত দুঃখিত ‘জন্তু’-ই। কিন্তু আমরা সবাই তো কবি নই! মনে রাখা দরকার—কেবল, কেউ কেউ কবি।

এই প্রবন্ধে আমি সেই বিশেষ রকমের টের পাওয়া অভিজ্ঞতা, বা (বাংলার সেই সর্বশক্তিমান ক্রিয়াপদটি ব্যবহার করে বলতে পারি—) লাগার স্বরূপ নিয়েই ভাবতে বসেছি। যদিও এই লাগাটুকুই কবিতাসৃষ্টির পক্ষে পর্যাপ্ত কারণসামগ্রী নয়। অপরিহার্য কিন্তু যথেষ্ট নয়। কী জাদুবলে কবি তাঁর একার এই টের পাওয়া অনুভবটিকে শব্দের ঢেউ তুলে অন্য সকল সহৃদয়ের হৃদয়ে টের পাওয়ানোতে পরিণত করেন তা না বিচার করলে, অথবা পাঠকের হৃদয়ে বহুদিন আগে মৃতা মীরা বা মৈত্রেয়ীর শ্লোক আওড়ানো থেকে কী করে তাঁদের লগন লাগি আমাদের ভালোলাগার রসনিষ্পত্তিতে জমে ওঠে তার বিশ্লেষণ না করলে কাব্যবিচার অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তবু কবির শব্দকলা, অথবা পাঠকের রসানুভূতি নিয়ে নয়, কবির অভিজ্ঞতা নিয়েই এই প্রবন্ধ।

২. ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান মোটামুটি দুরকমের হতে পারে বলে মনে করা হয়। বাহ্য প্রত্যক্ষ আর মানস প্রত্যক্ষ। চোখ, কান, নাক, ত্বক, জিভ এসব ব্যবহার করে কোনো বাইরের জিনিসকে সবুজ বা হলুদ, ক্যানক্যানে বা সুরেলা, সুগন্ধি অথবা আঁশটে, খসখসে অথবা মসৃণ, টক বা মিষ্টি বলে জানা একরকমের অভিজ্ঞতা। একে বলি বাহ্য প্রত্যক্ষ। আর নিজের মনের ভেতর তাকিয়ে বিষণ্ণতা, তীব্র ইচ্ছা, আশা, আনন্দ, অথবা উগ্র অসন্তোষ টের পাওয়া—আরেক রকমের অভিজ্ঞতা। এই দ্বিতীয় রকমের জানাও চোখ কান দিয়ে দেখা-শোনার মতোই অপরোক্ষ বলে একে বলে আন্তর বা মানস প্রত্যক্ষ। এ-ও যেন একরকমের তাকানো, শুধু বাইরে নয় মনের ভেতর তাকানো।

কিন্তু আমরা যারা শরীরী জীব (কথাটা ‘অশ্রুজল’—শব্দের মতো পুনরুক্তিদুষ্ট শোনালেও এক্ষেত্রে মানুষের এই আধিদৈহিকতা নিম্নরেখার্হ) তাদের আরেক তৃতীয় রকমের অভিজ্ঞতা সর্বদাই হচ্ছে। এই তৃতীয় রকমের বোধ তেমন কিছু রহস্যময় বা অলৌকিক দুর্লভ ব্যাপার নয়। মাথাধরা, গলাজ্বালা করা, বুকে ব্যথা এগুলোই তার উদাহরণ—যদিও এই যন্ত্রণাত্মক দৃষ্টান্ত ছাড়াও শ্বাস নেওয়ার আভ্যন্তর অনুভব, সারা শরীর জুড়ে রোমাঞ্চ বা শিহরন, —রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ”এ তনু ভরিয়া পুলক রাখিতে নারি”—ইত্যাদি অভিজ্ঞতাও এই রকম, না-বাহ্য-না-মানস প্রত্যক্ষের দৃষ্টান্ত। এগুলোকে ঠিক মানস প্রত্যক্ষ বলতে পারি না কারণ এগুলোর উদ্দিষ্ট বিষয়বস্তু বা জ্ঞেয়গুণটি নিতান্তই দৈহিক। আমাদের রাগ, দ্বেষ, আশা, আকাঙ্ক্ষা চিন্তা বা কল্পনা—হাঁটুতে বা বাঁ-কানে হয় না, যদিও হাঁটুর ব্যথা বিষয়ে আমার চিন্তা হতে পারে, লজ্জার ফলে আমার কান লাল হয়ে যেতে পারে। এবং—এই মুহূর্তে যেমন—আমার কানের সম্ভাব্য রক্তিমা কল্পনা করে আমার অন্য মানস অবস্থা উপস্থিত হতে পারে। তথাপি লজ্জাটা আমার কানের ধর্ম নয়, চিন্তা বা কল্পনাটা নয় হাঁটুর গুণ। অথচ পেটে, মাথায় অথবা বুকে যে ব্যথা টের পাই তা পেটেরই ধর্ম—তাই তদবিষয়ক জ্ঞানকে মানস প্রত্যক্ষ বলা চলে না। পক্ষান্তরে এই ব্যথা শরীরের ধর্ম হলেও, আমার শরীরের অনেক ধর্ম যেমন বাহ্যেন্দ্রিয় গোচর—তেমন করে চোখ দিয়ে দেখে, হাত দিয়ে স্পর্শ করে কিন্তু আমার ঘাড়ে বা বুকে ব্যথা কেউ—অন্য কেউ (অথবা আমি নিজেও)—টের পায় না। ডাক্তার পেট টিপে যখন ব্যথা আছে কিনা জিগেস করেন তখন তাঁর বাইরে থেকে কোনো স্পর্শজন্য ‘ব্যথার’ জ্ঞান হয় না বলেই তাঁকে জিগেস করতে হয় ”লাগছে?” এই যে ব্যথা লাগাটা এটা আমার ব্যথা বিষয়ে আমার একার ভেতর থেকে অনুভব। ভেতর থেকে অথচ মন বিষয়ে নয়, দেহ বিষয়ে। এই ‘ভেতর’ শুধু যে ”অন্তর” অর্থে ভেতর তা নয় (কারণ অন্তরকে তো দেহ বলি না)। এটা দেহকে অন্য কেউ কেটে ফেলে হৃৎপিণ্ডে অথবা মস্তিষ্কের মধ্যে হাত বা ছুরি বা লেজার রশ্মি চালিয়ে যে ভেতরকে দেখতে ছুঁতে পারে সে ভেতরও নয়।

যার শরীর সে ছাড়া এই ভেতরকে সাক্ষাৎ অনুভব করার এক্তিয়ার নেই কারুরই। অথচ শরীরের (স্থানিক) ভেতরে যত কিছু প্রত্যঙ্গ আছে সবই যে শরীরের মালিকের কাছে এই রকম তৃতীয় প্রকারের প্রত্যক্ষগোচর তাও নয়। যেমন শত চেষ্টা বা মনঃসংযোগ করলেও আমার মস্তিষ্কের ভেতরে দুটি গোলার্ধকে সংযুক্ত করে যে সেতুর মতো ‘কর্পাস ক্যালোসাম’ রয়েছে তার মধ্যে ঘটমান অবস্থাগুলির সাক্ষাৎ অনুভব আমাদের কারুরই আয়ত্তের মধ্যে নেই। ভূয়োদর্শী সুবিনয় মুস্তফী যে বেড়ালটিকে হাসিয়ে পেটে খিল ধরিয়ে দিয়েছিলেন—সেই বেড়াল নিজের পেটের খিল ধরাটিকে ভেতর থেকে টের পেলেও—তার দ্বারা ভুক্ত ইঁদুর যে তার পেটের ভেতরে ‘হুররে’ বলে হেসে খুন হচ্ছে ‘সেই খিল কেটে কেটে’—তা বাহ্য, মানস অথবা শারীরিক কোনো সংবেদন দিয়েই ‘দেখতে পাওয়া’ —বেড়ালটির পক্ষে অসম্ভব ছিল! বড়ো হৃদরোগচিকিৎসকও নিজের চার কুঠুরির হৃৎপিণ্ডের ভেতরে রক্ত যাওয়া-আসার নাটক অনুমানের দ্বারাই জানেন—প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্বারা নয়। এই তৃতীয় প্রকার অনুভবকে (সচেতন প্রয়াসে অথবা প্রখর সংবেদনশীলতার দ্বারা অনায়াসে) ধরারই নাম দিচ্ছি—”অন্তর্মুখ দেহবোধ”।

ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, ব্যাধি, পীড়া, আঘাত থেকে যেমন এই দেহবোধ সকলেরই হয়, তেমন সেরকম দুর্ঘটনা বা দুরবস্থা ছাড়াও নিজের শ্বাসের দিকে লক্ষ রাখলে, নিজের আবেগমথিত অবস্থায় শরীরের ‘ভেতর’কার অবস্থা টের পেতে পারলেও—এক রকমের নিয়ত ছন্দোময় অথবা অনিয়ত আকস্মিক, শান্ত অথবা আনন্দময় এক এক অবস্থা এইধরনের অন্তর্মুখ শরীর চেতনার বিষয়ীভূত হতে পারে।

৩. বিংশ শতাব্দীর সব থেকে গভীর ও স্বকীয় চিন্তার পথিকৃৎ ভারতীয় দার্শনিক আচার্য কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য (ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হবার বছর দশেক আগে) তাঁর সাবজেক্ট অ্যাজ ফ্রীডম (Subject As Freedom) গ্রন্থের দুটি অধ্যায়ে এই আধিদৈহিক অহংতার বিশ্লেষণ করেছেন বিশদ ভাবে। আমি এখানে “subjectivity” শব্দের অনুবাদ করছি ”অহংতা” শব্দ দিয়ে। যে-কোনো জ্ঞানে জ্ঞাতা নিজেকে অহম বলে আর দৃশ্যমান বা জ্ঞেয়মান বিষয়টিকে ”ইদম” বলে জানে। তার থেকেই বলা যায় যে জ্ঞানের বা চেতনার দুটি দিক বা খুঁটি আছে। একটি অহম আরেকটি ইদম। অন্য ভাষায় জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয়। কিন্তু ‘জ্ঞাতা আর জ্ঞেয়’ বললে ঠিক পুরোটা বলা হয় না। আমি যদি লক্ষ করি যে শিশুটি একটি ফড়িংকে দেখছে তাহলে শিশুটিকে জ্ঞাতা আর ফড়িংটিকে জ্ঞেয় বলা যায়—কিন্তু আমার কাছে উভয়ই ‘ইদম’-বা বিষয় মাত্র। কেবল আমিই আমার কাছে ‘অহম’, শিশুটিই নিজের কাছে অহম। এই জন্যই রেনে দেকার্তে যখন প্রমাণ করেন যে ”আমি ভাবি, তাই আমি আছি” —তিনি একথা প্রমাণ করেন না যে দেকার্তে ভাবেন, তাই, দেকার্তে আছেন। কোনো ব্যক্তিনাম দিয়েই ‘অহম’-এর কাজ হয় না (যদি হত তাহলে ”অহম” সকলেরই নাম হত। বস্তুত এটা কারুরই নাম নয়—আমারও নয়। আবার এটা একটা বর্ণনাত্মক বিধেয়ও নয়—এটা হল একটা অনুপম স্ব-নির্দেশক একমাত্রবাচক সর্বনাম!) আর এই অহমের অনুভূতিই হল অহংতা বা সাবজেক্টিভিটি। ধ্রুপদী ভারতীয় বেদান্তে একে ‘প্রত্যকচৈতন্য’ও বলা হয়েছে। যা কিছু আমার চেতনার সামনে (অগ্রে, পূর্বে) এসে বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তাকে যদি বলি ‘ইদম’—তাহলে যে সাক্ষীর সামনে এরা দাঁড়ায় তা নিজে কখনো ‘আঁখির আগে’ এসে দাঁড়ায় না। বরাবর দৃষ্টিপথের শুরুতে থেকেও যে দৃষ্টিপথের অগোচর থেকে যায় সেই ‘অহম’-কেই বলে বরাবর পেছনে থাকা ‘প্রত্যক চৈতন্য’।

প্রশ্ন উঠতে পারে: শুধু জাগ্রৎ ও স্বপ্নময়, গভীর জ্ঞানহীন সুষুপ্তিরও পরপারে যে প্রত্যকচৈতন্যের শাস্ত্রীয় ঠিকানা, শারীরিক ব্যথাবেদনা, রোমাঞ্চ বা শ্বাস গ্রহণের অনুভূতি প্রসঙ্গে তার কথা উঠছেই বা কী করে? বিশুদ্ধ অহংতার অনুভব তো শোনা যায় নির্বিতর্ক সমাধিতেই হয়ে থাকে সাধকের অথবা যোগীর। আপামর প্রাণীসাধারণ অন্তর্মুখশারীরবোধ কী করে সেই একই অহংতার বার্তাবহ হতে পারে?

এই প্রশ্নের সম্যক জ্ঞান রয়েছে ”শারীরিক অহংতা” বিষয়ক দুটি অধ্যায়ে কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্যের পূর্বোল্লিখিত বই-এ। খুবই সংক্ষেপে এখানে তাঁর যুক্তিজালের কাঠামোটুকু উপস্থাপন করবার চেষ্টা করছি।

প্রথমত: আমার শরীর, অন্যসব শরীরের মতোই একটি জড় বস্তুপিণ্ড বলে আধা-দৃশ্যমান হলেও, আমার হাত পা মাথা পেট অন্যসব মানুষের হাত পা মাথা পেটের সমগোত্রীয় বলে জানা থাকলেও —এমনকী বহিরিন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হিশেবেও আমার শরীর একটি অনন্যতা দাবি করে। যে-কোনো ঘন ত্রিমাত্রিক বস্তুরই সব দিক আমার অভিজ্ঞতায় যুগপৎ ধরা পড়ে না। গাছের গুঁড়ি, পাথরের চাঁই অথবা একটি থামেরও চারিপাশে ঘুরে আমাকে ক্রমে ক্রমে সামনের পেছনের দুপাশের চেহারা ঠাহর করতে হয়। তোমার, আপনার, অন্যের শরীরও আমার কাছে তেমনই এক ঘন ত্রিমাত্রিক বস্তু যার কেবল চারপাশের উপরিভাগ (surface)-টুকু আমার দৃষ্টিগোচর। গাজরটিকে যতই ভাঙি, পনিরটির ভেতরে যতইছুরি চালাই, শরীরটিকে কেটে যতই ভেতরে ঢুকি—কেবল নতুনতর ”উপরিভাগ”-ই উন্মোচিত হবে, অন্য শরীর আমার ইন্দ্রিয়ের কাছে কেবল স্তরে স্তরে উপরিতলেরই সমাহার! কিন্তু বহিরিন্দ্রিয়ের কাছেও আমার শরীরের সবটুকু—পুরো বাইরের উপরিভাগও আমার গোচর নয়। আমি আমার নিজের শরীরের চারিপাশে ঘুরে এসে আমার সামনে, পেছন, পিঠ, মাথার ওপরটুকু, সব দেখে নিতে বস্তুতও পারি না, কল্পনাও করতে পারি না (এখানে আয়নার প্রসঙ্গ তুলে লাভ নেই)। এমনকী আমার পেছনটা কেমন দেখতে তা ভাবতে গেলেও আমাকে কল্পনা করতে হয়—আমি যদি অন্য লোক হতাম তাহলে আমার পৃষ্ঠদেশ আমার চোখে কেমন দেখাত—ইত্যাদি! এই জন্যই এমনকী স্থূলদেহের স্তরেও যা ”অহম” শব্দের বাচ্য সেই শারীর আত্মা অন্যসব ‘ইদং’ পদবাচ্য জড় বা চেতন শরীর থেকে পৃথক এক অনন্য পদার্থ।

দ্বিতীয়ত: আমার মাথার ভিতরে যে বোধ কাজ করে, আমার বুকের চারিপাশে যে ”স্বপ্ন নয়—শান্তি নয় কোন এক বোধ”—লেগে থাকে, আমি যখন বালটিতে জল টানি অথবা আঁশটে পানাপুকুরে ডুব দিয়ে আসি তখন যে অন্তর্মুখদেহবোধ আমার একার হয়—সেই বোধের বিষয়বস্তু হিসেবে অনুভূত শরীর বাইরের বস্তুজগতের হয়েও ঠিক উপরিতল বা উপরিভাগের শরীর নয়। এর অন্তরালবর্তিতা শাণিততম সার্জনের ছুরিকেও এড়িয়ে যায়। এই অনুভূত ভিতর-ত্ব শারীরিক হয়েও তাই অহংতা-দিয়ে মাখানো।

তৃতীয়ত: মানসপ্রত্যক্ষ আর বাহ্য প্রত্যক্ষ—দুরকমের জ্ঞানেই একটা জ্ঞান ও জ্ঞেয়পদার্থের ভেদ প্রতীয়মান হয়—অন্তর্মুখদেহবোধে সেই ভেদ যেন তিরোহিত হয় বলে মনে হয়। আমি চোখ মেলে গোলাপকে লাল দেখি কিন্তু আমার দেখা বা চাক্ষুষ জ্ঞানটাই যে গোলাপ বা তার লালিমা নয় একথা রোদের মতো স্পষ্ট ও উজ্জ্বল আমার কাছে। বিশপ বার্কলে অথবা বসুবন্ধু-ও বড়জোর বলতে পারেন যে আমার দেখাটা গোলাপের লাল হওয়ার অপরিহার্য শর্ত বা কারণ—কিন্তু প্রত্যক্ষ বোধের কাছে আমার দেখাটা লাল নয়—গোলাপটা লাল; আর গোলাপটা একটা স-বিষয়ক জ্ঞান নয়, দেখাটা সবিষয়ক এবং জ্ঞানাত্মক। তেমনি, আমার মানসিক উদবেগ আর তদবিষয়ক আমার জ্ঞান—দুটি আলাদা জিনিস। আমি কোনো খবর পেয়ে আনন্দে অধীর হয়ে উঠলাম। আবার সেই অধীরতা নিজের মধ্যে লক্ষ্য করে আমি বিষণ্ণ হয়ে উঠতে পারি—”কেন আমি এত সহজে খুশী হই?” —এই আফশোশে। এখানে অন্তঃপ্রত্যক্ষের বিষয়বস্তু একটি হর্ষ এবং অন্তঃপ্রত্যক্ষজ্ঞানটি একটি বিষাদময় মনোবিজ্ঞান। দুটির দ্বিত্ব স্পষ্ট। কিন্তু আমার দেহসন্ধিতে যে যন্ত্রণা অথবা সারা শরীর জুড়ে যে স্পন্দনবোধ সেই বোধ আর তার বিষয় অপৃথকসিদ্ধ। তাই ভট্টাচার্য বলেছেন “The bodily feeling is but the felt body” (শারীরিক সংবেদনা সংবেদিত শরীর ছাড়া আর কিছু নয়)। এই জ্ঞান ও বিষয়ের ঐক্য অহংতা বা প্রত্যকচেতনার আরেকটি মাত্রা।

ফরাসি অবভাসবিদ্যার প্রমুখ দার্শনিক মের্লো পঁতির প্রিয় লেখক পল ভালেরির একটি রচনা ‘মঁসিয়ে তেস্তের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা’-তে একজায়গায় একটি বর্ণনা আছে যাতে শারীর চেতনার এই নির্বিষয়তার একটি সপ্রাণ ছবি পাওয়া যায়—

”এটা তেমন কিছু নয়”…সে বললো… ”একটা বড়জোর একটা সেকেন্ডের শতভাগের একভাগের ব্যাপার। …দাঁড়াও তোমাকে বলছি…এক এক সময়ে আমার সারা শরীর যেন আলোকিত হয়ে ওঠে…খুব অদ্ভুত ব্যাপার এটা…হঠাৎ আমি যেন নিজের ভেতরটা দেখতে পাই। …আমার মাংসের গভীর স্তরে স্তরে কী ঘটছে তাও যেন আমি টের পাই। একটা ঘূর্ণিঝড়ের মতো, একটা স্তম্ভের মতো, একটা ব্যথা যেন আস্তে আস্তে পেখম মেলে দেয়। তুমি কি দেখতে পাও সেরকম কিছু? …আমার ব্যথার এসব সজীব জ্যামিতিক আকারগুলিকে? কয়েকটা বিদ্যুচ্চমকের মতো যা ঘটে তার স্পষ্টতা স্পষ্ট কিছু ধারণার সঙ্গেও তুলনীয়। তারা আমাকে বুঝিয়ে দেয়, জানিয়ে দেয়, এখান থেকে ওখানে—তারপর আবার ওখানে…আমার ”নিজে”র বা ”আত্মা”র ভেতরে যেন কয়েকটা কুয়াশাভরা জায়গা দেখা দেয়—আস্তে আস্তে খোলা একটা উদার প্রান্তর যেন চোখে পড়ে। আমার ছড়াতে থাকা যন্ত্রণা আমাকে বাধ্য করে এই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বালুকণার মতো ব্যথাবিষয়গুলিকেও লক্ষ করতে। তারপর…তারপর…যেমুহূর্তে আমি নিজের কষ্টের আর্তনাদ শুনি অমনি…ওই বিষয়বস্তুটি —ওই ভয়ানক বিষয় (object)টি ছোটো হতে হতে আমার অন্তরের নজর থেকে একেবারে উধাও হয়ে যায়।”

(PAUL VALÉRY: An Anthology, Selected by JarrenR. Lawler, Routledge. 1977, page 15)

এই যে অন্তর্মুখদেহবোধে ব্যথার স্থানিক পরিচয় আমরা ভেতর থেকে পাই এই যে ছড়িয়ে পড়ার অনুভব—অতঃপর সারা শরীরব্যাপী একটা সংবেদন এই দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন ভট্টাচার্যও। ধূসর পাণ্ডুলিপি-র ‘পিপাসার গান’ কবিতায় জীবনানন্দ চেয়েছেন—

”শুধু মোর দেহের তালাশে

শুধু মোর স্নায়ু শিরা রক্তের তরে

এ-মাটির পরে

আসিব কি নেমে!…”

অবশ্যই এ পিপাসা শল্যচিকিৎসক অথবা শবভূক শকুন হবার বাসনা নয়। এখানে যে শারীরিক অহংকে তিনি খুঁজেছেন—

”তার ছিলো যে পিপাসা,

আর যেই ব্যথা ছিল—যেই ঠোঁট, চুল

যেই চোখ—যেই হাত আর যে আঙুল

রক্ত আর মাংসের স্পর্শসুখ ভরা

যেই দেহ একদিন পৃথিবীর ঘ্রাণের পসরা

পেয়েছিলো—”

মজা হল এই যে ‘আঙুলের ডগায় রক্ত আর মাংসের স্পর্শসুখ’,-এর কথা শুনলে হঠাৎ মনে হতে পারে লাশকাটা ঘরের কোনো অটপ্সির ডাক্তারের অভিজ্ঞতার কথা বলছেন উনি। কিন্তু অবশ্যই এখানে অভিপ্রেত মাংসরক্ত, আঙুলের বাইরের নয় —আঙুলের ভিতরের।

নির্বিষয় প্রত্যকচৈতন্য বা চিৎপ্রকাশের স্বরূপ বোঝানোর জন্য আঙুলের কথা তুলেছেন—আশ্চর্যের বিষয়—চিৎশক্তিবিলাসী কাব্য যোগবাসিষ্ঠ-মহারামায়ণও। যোগবাসিষ্ঠের তৃতীয় বা উৎপত্তিপ্রকরণের দশম অধ্যায়ে একটি শ্লোক পাচ্ছি—

”অঙ্গুষ্ঠস্যাথবাঙ্গুল্যা বাতাদ্যস্পর্শনে সতি।

জীবত শ্চেতসো রূপং যৎ তৎ পরমম আত্মনঃ।।”

(যো.বা. ৩।১০।৪২)

এর আক্ষরিক অর্থ হল: ”বুড়ো আঙুলের অথবা অঙ্গুলির দ্বারা, হাওয়া ইত্যাদির ছোঁয়া ছাড়াই, জীবিত চেতনার যে রূপ টের পাওয়া যায় তাই হল আত্মার পরম রূপ।”

সাধারণত স্পর্শানুভূতি হতে গেলে আমার আঙুল দ্বারা অন্য কিছুকে ছুঁতে হয়। অথবা হাওয়া এসে আমার আঙুলকে ছুঁয়ে যায়—তবে আমার স্পর্শসুখ হয়। কিন্তু হাওয়া দিয়ে অথবা এক আঙুল দিয়ে অন্য আঙুলকে ছুঁয়ে যে স্পর্শ তা হল স-বিষয়ক। সে স্পর্শ হল আঙুলের অথবা হাওয়ার স্পর্শ। তাই তা বাহ্যপ্রত্যক্ষ। কিন্তু হাওয়া বা অন্য কোনো আঙুলের ত্বক ছাড়াও নিজের বুড়ো আঙুলের ডগা পর্যন্ত ভেতর থেকে যে জীবনের উষ্ণতা, যে চেতনার স্পন্দন, যে অন্তর্মুখস্পর্শ পাওয়া যায় তার দ্বারাই প্রত্যগাত্মার, শুদ্ধ অহংতার রূপ উপলব্ধ হয়। জীবনানন্দের নিজের নামে, কবিতার নামে (ধূসর পাণ্ডুলিপি-র অন্তর্গত দীর্ঘ ৩৪ স্তবকের ৩০৬ লাইনের কবিতা ”জীবন” দ্রষ্টব্য) এবং ‘মৃত্যুর আগে’ ‘বোধ’ ‘সময়ের কাছে’ প্রভৃতি মহান কবিতার মধ্যে এই ‘প্রাণ’ বা ‘জীবনের’ই ছটা বিচ্ছুরিত হয়েছে। এই বিষয়বস্তুহীন প্রাণমাত্রের অন্তঃস্পর্শ সকলেই টের পায় কিন্তু জীবনানন্দ অথবা মের্লো পঁতি, যোগবাসিষ্ঠ অথবা অভিনবগুপ্ত এই টের পাওয়া টের পেয়ে বিস্ময় অনুভব করেন। তাঁদের এই বিস্ময়প্রসূত বাণীই—আরো নানান শুভসংযোগবশত কখনো কখনো কবিতা হয়ে ওঠে।

৪. এই প্রসঙ্গে এই অন্তর্মুখ দেহবোধের আরেক বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের কথা বলে এই প্রবন্ধ শেষ করতে চাই। যদিও আমার একার বোধেই আমার এই শরীরের ভেতরকার অহংতা ধরা পড়ে—এই অহংতার বোধ সর্বদাই এই শরীর ছাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়তে চায়।

যদিও প্রত্যেক ইন্দ্রিয়েরই এরকম একটা অন্তর্মুখ অহংতার দিক আছে, স্পর্শেন্দ্রিয়ের মধ্যে এই অন্তর্মুখতা এবং তজ্জন্য দেহ ছাড়িয়ে উপচে পড়ার স্বভাবটা সব থেকে প্রকট। মানুষ তাই অন্য মানুষকে স্পর্শ করবার সময়ে সব থেকে বেশি নিজের শরীর জুড়ে নিজেকে অনুভব করে। আর সেই স্পর্শমৈথুনের চরমসীমায় নিজের চামড়ার সীমান্ত ছাড়িয়ে সে সত্যিসত্যিই অন্যের শরীরেরও যেন অন্তর্মুখবোধের ভাগীদার হচ্ছে বলে—(দুর্ভাগ্যবশত—ভ্রান্ত) এক অনুভব তার হয়। কবি এবং অধ্যাত্মসাধকরা সব সজীব পদার্থেরই ভেতরে একই প্রাণ, একই অহংতা, একই চেতনার সাক্ষাৎকারের জন্য সচেতন প্রয়াস কল্পনা বা ধ্যানাভ্যাসের দ্বারা করে থাকেন। জীবনানন্দের প্রখ্যাত কবিতা ‘ঘাস’ এই প্রয়াসের দলিল—

”আমারো ইচ্ছা করে….এই ঘাসের শরীর ছানি

—চোখে চোখ ঘষি, ঘাসের পাখনায় আমার পালক,

ঘাসের ভেতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড়

ঘাস-মাতার শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।”

এই কবিতায় ঘাসের বাহ্যস্পর্শে যে কবি সন্তুষ্ট নন তা স্পষ্ট। তিনি চান ঘাস হয়ে কেমন লাগে তা জানতে। এই ‘হয়ে জানা’ মানেই চোখের দেখার হাত ছেড়ে দিয়ে অন্য এক আলো নিয়ে জগতের জীবনের অন্য জীবের, পৃথিবীর, হিজলের ভেতরে ঢুকে পড়া।

অবশ্যই একথা স্মরণীয় যে কেবল এই ঢুকে পড়াটুকুই কবিতা লেখার পক্ষে যথেষ্ট নয়। যে অনায়াস ধ্বনিকৌশল হাতে থাকলে নির্জনমধ্যাহ্নে রোদ ছায়ার মাখামাখি বোঝানোর জন্য আলুলায়িত ‘ল’কারের ধূম লাগিয়ে লেখা যায়—

”হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা” অথবা ‘ন’ ধ্বনির যে নগ্ন নির্জনতা থেকে যায়—”নরম নদীর নারী” শব্দগুচ্ছের মধ্যে, অথবা গায়ে লেপটে আঁকা সিক্ত বসনের ক্লাসিক রূপকল্পকে হঠাৎ এক অহংতা মাখানো শারীরিকতায় সপ্রাণ করে লেখা যায়

”সেই জল-মেয়েদের স্তন

ঠাণ্ডা-শাদা-বরফের কুঁচির মতন

তাহাদের মুখচোখ ভিজে

ফেনার শেমিজে

তাহাদের শরীর পিছল!”

—সেই সর্বেন্দ্রিয়সজাগ হৃদয়ভেদী বাকধনুক সকলের হাতে থাকে না। কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে দেহ-আত্মার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের মাঝখানে চেতনার স্বভাবলক্ষণ হিশেবে যে ”অমুক হলে কেমন লাগে” —জাতীয় ধর্মকে ধরা হয়েছে—সেই ধর্ম এই অন্তর্মুখদেহবোধ ছাড়া হয় না। আর তাই ‘আধ্যাত্মিক’ শব্দের মধ্যে যে ‘আত্মিক’ আছে—তার সংস্কৃতভাষাতে প্রকৃত অর্থ ”শারীরিক”। শ্যামাসঙ্গীতের মধ্যে সব থেকে আধ্যাত্মিক গানগুলির নাম তাই ”দেহতত্বের গান”। হৃদিকমলে যখন ধূম লাগে—তখন তাই ইন্দ্রিয়গুলির দেখে অবাক লেগে যায়। জীবনানন্দ শুধু ঘাস বা সোনালি ডাঙার চিল হয়ে দেখতে চান তা নয়—মুমূর্ষু রোগীর হাসপাতালের বিছানার পাশে অর্ধভুক্ত কমলালেবুর কোয়া হয়েও তিনি বুঝতে চান। আর এই কমলালেবুতে কতটা ভেতরে উনি ঢুকতে চান তা বোঝাতে ব্যবহার করেন ”করুণ মাংস” শব্দটি।

এই যে দেহের ভেতরকার স্বাদ (”দেহের স্বাদের কথা কয়” —’অবসরের গান’, ধূসর পাণ্ডুলিপি) এ স্বাদ অনেক সময়েই মুখের নয়, অনেক সময়েই তা পীড়ার স্বাদ, এমনকী নষ্ট শসা, পচা চালকুমড়োর স্বাদ। কিন্তু এই পীড়া, এই দংশন, এই পচনের অনুভূতিও বিস্ময়বিলাসী কবির কাছে বাঞ্ছনীয়। তার কারণ এই নয় যে কবি আত্মপীড়নের কোনো কামবিকারে ভোগেন। তার কারণ এই অন্তর্মুখ দেহবোধ—একটি শরীর, একটি ব্যক্তি, একটি আত্মাকে ছাপিয়ে সতত অনন্তে ছড়িয়ে পড়বার আকুলতা নিয়ে আসে। এই স্বাদ—এই বোধ বিষয়ে একটিমাত্র বিশেষণ জীবনানন্দের প্রিয়—”অগাধ—অগাধ!” আর মহাপ্রাণবর্ণপ্রেমিক এই কবিটির সবথেকে নিজস্ব, সব থেকে বহুল ব্যবহৃত শব্দ হল ”ঢের”। এই ‘ঢের’ শব্দটির মধ্যে যে অশেষ, ঢালাও, উপচে পড়া ঔদাস্য আছে তাতে তাঁর এই দেহাতীত দেহবোধ সব থেকে সুগম্ভীর অনুনাদে বেজে ওঠে। আরো গভীর এক রহস্য হল এই যে—যেহেতু এই অন্তর্মুখ শরীর সংবিৎ বিষয়হীন (objectless) সেহেতু এর সামনে কোনো বাধা বা সীমা নেই। object কথার এক মানে ইংরিজিতে ‘বাধা দেওয়া, বিঘ্নিত করা’। object নেই বলে এই অনুভূতি অবাধ—এর কেবল ভিতরই আছে, বাহির নেই। কোনো ইঁদুর, ঈগল, কীট, বা মানুষ—এর বাইরে নেই। সব কিছুই এর ভিতরে বলেই সব কিছুর ভিতরেই এই বাধাহীন বোধ কাজ করে। এমনকী আকাশেরও ভিতরে আকাশ, পাথরেরও ভিতরে এক প্রাণময় অহল্যার আহ্লাদ খুঁজে পায় এই পারদের মতো ছড়িয়ে পড়া কেন্দ্রহীন অন্তঃস্পর্শের অপরিসীম বৃত্ত। কবির কবিতা, আনন্দবর্ধন, অভিনবগুপ্ত, মম্মট সকলের মতেই এক আলোকসামান্য প্রতিভার কার্য। এই প্রতিভার আলো শুধু নিজেকে এবং বিশ্বের তাবৎ অন্তর-বাহিরের বিষয়কে প্রকাশিত করে তা নয়, সতত স্বতন্ত্রভাবে ক্রিয়াশীল ও সৃষ্টিলীলামগ্ন বলে এই আলো যাকে প্রকাশ করে তাকে নতুন করে পাবে বলে ক্ষণে ক্ষণে নতুন আকারে সাজায়। চোখ দিয়ে গন্ধ শোঁকে, কান দিয়ে স্পর্শ পাওয়ার চেষ্টা করে, জিভ দিয়ে রং রূপ ধরবার জন্য ব্যাকুল হয়—আর সব থেকে বেশি অনুভব করে প্রাণ দিয়ে। এই প্রাণই বৈদিক ঋষিদের, উপনিষদের প্রধান দেবতা। সব ইন্দ্রিয়ের রাজা। আর জীবনানন্দ তাঁর ‘বোধ’ কবিতায় গলা খুলে বলেছেন—

”আমি সব দেবতারে ছেড়ে/আমার প্রাণের কাছে চলে আসি”

প্রতিভার বা চিৎশক্তির এই দ্বিতীয় ক্ষমতাটির নাম, কাশ্মীর শৈবদর্শনে এবং ভর্তৃহরির শাব্দিক দর্শনে —’বিমর্শ’। আর এই বিমর্শের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে রসবেত্তা কবি দার্শনিক অভিনবগুপ্ত লিখেছেন—

”একটি ঘট (জড় পদার্থ) নিজের ভেতর নিজে চমৎকৃত হয় না, নিজেকে নিয়ে ভাবে না, নিজেকে নিজে প্রকাশিত বা জ্ঞানে ভাসমান করে না—তাই বলা হয় যে সে সচেতন নয়, সে বেঁচে নেই। কিন্তু ‘চৈত্র’ নামে ব্যক্তি নিজের ভেতরে ”অহম” বলে সম্ভোগ করে, উল্লসিত হয়, বৈচিত্র্যে বেড়ে উঠে চমৎকৃত হয়, নিজেকে নিয়ে ভাবে, নীল হলুদ, সুখদুঃখ অথবা এই সবের অভাবের অবভাসযোগে নিজের ভেতরটাকে নিজে আলোকিত করে—তাই বলা হয় যে চৈত্র চেতনাবান, সে বেঁচে আছে। এই রকমই বিমর্শও শুধু নিজেকে প্রকাশিত বা আলোকিত করেই খুশি নয়—বিমর্শ সব কিছু সহ্য করে, সব কিছু করতে চায়, করতে পারে—পরকে আত্মা করে নেয়, নিজের আত্মাকে পর বানিয়ে ফেলে, পর আপন উভয়কে এক করে ফেলে, একীকৃত নিজপর উভয়কে বর্জন করে স্বতন্ত্র থাকতে চায়। যে অন্তরের ভাষাতে নিত্যশব্দময় তার স্বভাব সেই শব্দ কোনো সামাজিক সংকেত-সাপেক্ষ ভাষার শব্দ নয়, সেই উচ্চারণ যেন নিজের দিকে নিজের মাথা নেড়ে সায় দেওয়া বা ইঙ্গিত করার মতো সর্বদা এক অবিচ্ছিন্ন চমৎকারাত্মক না-বলা-বাণী।” (ঈশ্বর প্রত্যভিজ্ঞাবিমর্শিনী ১।৫।১৩) একটি সংবিৎ বা অনুভূতি যার দিকে মুখ করে থাকে তাকেই বলে তার বিষয়। এই বিশেষ অন্তর্মুখী দেহানুভূতি আত্মসুখী বলেই বিশ্বসুখী, এর কারুর দিকে না তাকানোই নিজের দিকে তাকানো, সবার দিকে তাকানো। এর মুক্তি ধূলায় ধূলায় ঘাসে ঘাসে।

অভিনবের মতে এই অন্তর্মুখ শব্দময় প্রতিভার বিমর্শই বিশ্বব্যাপী মহাসত্তার জনক। একই উৎস থেকে উৎসারিত বলেই কবির এই প্রাতিভ অনুভব সকল সহৃদয়ের হৃদয়ে ভাবের তরঙ্গ তোলে। আমার একার আলাদা ‘বোধ’—আমরা যারা দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালোবেসেছি সেই আমাদের সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আমার ধারণা জীবনানন্দ তাঁর সমস্ত নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা সত্বেও, আধুনিক বৃহৎযন্ত্রোত্তর, শিকারী সভ্যতার রিক্ততার মড়কের ইঁদুরের রক্তফেনামাখা দোসর হয়েও, এই অন্তর্মুখ দেহবোধের মধ্যে দিয়ে, এই বিমর্শের ছোঁয়াতেই মহাপৃথিবীর কবি হতে পেরেছেন।

গাঙ্গেয় পত্র সম্পাদক অঞ্জন সেনের অনুরোধে লিখিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *