৪. কী বৃত্তান্ত?

কী বৃত্তান্ত?

বর্ণনা, রচনা, ঘটনা, কল্পনা

১. ভারত-কথক ব্যাস বনাম ব্রহ্ম-তার্কিক ব্যাস

২০০৭ অগাস্টের প্রথম দিনে বারাণসীতে ‘ব্যাস মহোৎসব’ পালিত হচ্ছিল, উত্তরপ্রদেশ সরকারের উদযোগে। প্রাতঃকালীন সভায় আমরা কয়েকজন দর্শন, সংস্কৃত ও সাহিত্যের অধ্যাপক ব্যাসদেবের রচিত ব্রহ্মসূত্র গ্রন্থের বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। কথা উঠেছিল, ব্যাসদেব উপনিষদগুলির মধ্যে নানান প্রকার আপাতবিরোধী বচন দেখে (”সবার আগে ছিল অসৎ” ”আগে ছিল সৎ”—এজাতীয়; ”প্রথমে কিছুই ছিল না” ”প্রথমে যা ছিল সব মৃত্যু দিয়ে আবৃত ছিল”—এজাতীয়;) তাদের সমন্বয় ঘটিয়ে একটা সুষম স্বসংগত তর্কসহিষ্ণু ব্যাখ্যা দেবেন বলেই তো স্বল্পাক্ষর, অসন্দিগ্ধ, সারবৎ এই ‘ব্রহ্মসূত্রা’বলী রচনা করেছিলেন, তাহলে সেই ব্রহ্মসূত্রেরই আবার ছ-সাত রকমের পরস্পর বিবদমান ভাষ্য কেন রচিত হল? আর এই সব ভাষ্যের মধ্যে, শঙ্করের ভাষ্যটা না রামানুজেরটা, শ্রীমধ্বেরটা না শ্রীকণ্ঠেরটা, বল্লভেরটা না নিম্বার্কেরটা, কোনটা ঠিক—অর্থাৎ কোনটাতে সূত্রকার ব্যাসের বিবক্ষিত অর্থ সম্যকভাবে উপপাদিত হয়েছে—এই প্রশ্ন কি তোলা যায়? তোলা উচিত? এর উত্তর হয়?

বেশ তর্কাতর্কি হল। কিন্তু কেউ তাঁদের বক্তৃতায় বা প্রশ্নোত্তরদানের সময়ে কোনো গল্প, কাহিনী, বা আখ্যায়িকা বললেন না। শ্রোতৃমণ্ডলী মাঝে মাঝেই অস্থির অথবা নিদ্রালু হয়ে পড়ছিলেন। কেবল শেষ দিকে একজন বক্তার সঙ্গে আরেকজনের আর তাদের দুজনের সঙ্গে একজন বিদগ্ধ শ্রোতার একটু উত্তেজিত উষ্ণ বাক্য বিনিময়কালে সবাই একটু নড়েচড়ে বসলেন। অথচ এই দিনই সন্ধ্যাবেলায় এই ব্যাস উৎসব আয়োজকরাই এনেছিলেন বারাণসীরই অন্য এক মঞ্চে অন্য এক সভাগৃহে মধ্যপ্রদেশ ছত্তিশগড় থেকে ‘তীজনবাঈ’-নাম্নী একজন গ্রাম্য মহাভারত-কথাকারকে। আমরা কাশীর বিশ্রী যানজট অতিক্রম করে শহরের অন্যপ্রান্তে সেদিনই রাতে তীজনবাঈ-এর ‘পাণ্ডবাণী’ শুনতে গেলাম। তিনি লাল শাড়ি পরে, হাতে একটি একতারা গোছের যন্ত্র নিয়ে স্টেজের ডান থেকে বাঁদিকে, বাঁ থেকে ডান দিকে হেঁটে হেঁটে ‘কর্ণবধের’ গল্প বললেন। আবালবৃদ্ধবনিতা শ্রোতৃমণ্ডলী, কাশীর পণ্ডিতরা, রাজনৈতিক নেতারা, আমাদের মতো অধ্যাপক শিক্ষক গবেষকরা, ছাত্রছাত্রী, সাংবাদিক, সাধারণ নাগরিকরা সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো অপলক নেত্রে চেয়ে থেকে তাঁর অমৃতসমান মহাভারতের গল্প শুনলো। এই গল্পের মধ্যে অতিনাটকীয় আবেগমথিত অতিরঞ্জন, আজগুবি সংযোজন, গ্রাম্য রঙ্গরসিকতা, অনেক কিছুর মিশ্রণ সত্বেও একবারও এ প্রশ্ন উঠলো না, ”তীজনবাঈ কি গল্পটা ঠিক বলছেন? কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে রথের চাকা বসে যাওয়ায় শরসন্ধান স্থগিত রাখা সূর্যপুত্র দানবীর কর্ণের মর্মান্তিক মৃত্যুর এই বৃত্তান্ত কি সত্য? অথবা মহাভারতে কর্ণের মৃত্যুর কাহিনী যেভাবে বলা হয়েছে তীজনবাঈ কি সঠিক ভাবে তা পুনর্বর্ণনা করতে পেরেছেন?”

অথচ ঠিক ভুলের প্রশ্ন যে একদম ওঠেইনি তা নয়। সকলেই শুধু তীজনবাঈ-এর কণ্ঠস্বর, সাজপোশাক এবং আসরজমানো ব্যক্তিত্ব নিয়েই ভাবছিলেন তা নয়। কর্ণকে ওইভাবে মারাটা কি অর্জুনের উচিত হল? কৃষ্ণ ওইভাবে একই মায়ের পেটের দুটি ভাইকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে কি ঠিক করলেন? এই প্রশ্ন নতুন করে উঠিয়ে সকলের হৃদয়ে আলোড়ন তুললো এই মন-মাতানো আখ্যান-পুনঃকথন। আখ্যানটি নিজে সত্য না মিথ্যা এ প্রশ্ন না উঠলেও নৈতিক সত্য আর অনৃত নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করলো ওই গল্পকথন।

২. আখ্যান না ব্যাখ্যান

দার্শনিক (বা বৈজ্ঞানিক) তত্ব বা থিয়োরী আর লোকপ্রচলিত গল্প, বৃত্তান্ত (ন্যারেটিভ) এর তুলনা করতে উদযুক্ত হয়ে, প্রথমেই, আমিও একটা সকালসন্ধ্যার গল্প ফেঁদে বসলাম। অবশ্য এই গল্পটা কল্পিত গল্প নয়, একটা সত্যি ঘটনা। আমি কেবল পয়লা অগাস্ট ২০০৭ বারাণসীতে সকালে সন্ধ্যায় ব্যাসমহোৎসব অনুষ্ঠানে কী কী হয়েছিল তার বর্ণনা করলাম। পরদিন স্থানীয় হিন্দী সংবাদপত্রেও ছবিসহ এই বর্ণনা বেরিয়েছিল। আরো সংক্ষেপে এবং ওইসব অধি-তাত্বিক (মেটা-থিয়োরেটিকাল) প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে কিন্তু এই প্রবন্ধের শুরুতে আমার ওই অসাংবাদিক বর্ণনা কি (এই ‘রচনা’র অংশ হিশেবে) তীজনবাঈ-এর কর্ণহত্যার গল্পের মতনই ‘বৃত্তান্ত’ কথন? তা তো মনে হয় না। বরং মনে হয় যে খবর না হলেও আমার কথনটি গল্প বলাও নয়। আমি যে অত তারিখে অমুক সময়ে এই সভা আর এই মহাভারত কথা-গান হয়েছিল বলেছি, একথা, যতই হোক, ঘটনারই তো বর্ণনা। তীজনবাঈ তো খালি কল্পিত গল্প বলছেন—তিনি তো আর বলছেন না যে কর্ণকে যুদ্ধের মধ্যখানে সত্যি সত্যি খ্রিস্টপূর্ব অত সালে কৃষ্ণার্জুন হত্যা করেছিলেন! আমি বলছি সংবাদ বা ইতিহাস, তীজনবাঈ বলছেন পুরাণের গল্প।

যদিও দিন আর রাতের দু-আসরেই সংগতি ও সত্যের সন্ধান চলেছিল—ব্রহ্মসূত্রে-র এতগুলি ব্যাখ্যানের মধ্যে সঙ্গতি কোথায় আর কর্ণবধের আখ্যানটার মধ্যে সত্যস্বরূপ কৃষ্ণের এত মিথ্যাচারের সংগতি কোথায়? তবু একটা দর্শনের ইতিহাস আর একটা পুরাণের গল্প। গল্প আর ইতিহাসের এই পার্থক্য, বৃত্তান্ত আর তত্বের এই প্রভেদ, আখ্যান আর ব্যাখ্যানের মাঝখানে এই সীমারেখা, ঘটনা-বর্ণনা আর উপাখ্যান-রচনার মধ্যে এই ব্যবধান কি আমরা অনায়াসে এতটা নির্বিবাদে টানতে পারি? আর, যদি বা তা পারি এ দুয়ের মধ্যে মানুষের, সমাজের, উপকার ও সত্যনির্ণয়ের জন্য কোনটা বেশি জরুরি, বৃত্তান্ত না তত্ব? গল্প না ইতিহাস? আখ্যান, না, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যান? এই দুটি প্রশ্ন নিয়ে বর্তমান নিবন্ধ। বিশেষত দ্বিতীয় প্রশ্নটি নিয়ে।

৩. বর্ণ, রঞ্জন, সত্য, আরো-সত্য

ইংরিজির ‘ডেস্ক্রিপশান’ শব্দটির বাংলা অনুবাদ করা হয় ”বর্ণনা”। কিন্তু ইংরিজি শব্দটির মধ্যে যদি থেকে থাকে স্ক্রিপ্ট বা লেখারঅনুষঙ্গ, বাংলা শব্দটিতে রয়েছে রঙ বা বর্ণের অনুষঙ্গ (যদি না ‘বর্ণ’ অর্থে উচ্চারিত অক্ষর বা ধ্বনিকে ধরা হয়—আর সেই বর্ণমালার বর্ণ এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয় বলেই মনে হচ্ছে)। এই লিখন আর অঙ্কন, শব্দের দলিল প্রস্তুত করা আর বর্ণলেপন করে হুবহু চিত্রিত করা এই দুটি কাজের মধ্যে, ভাবতে লোভ হয়, একটা বিরাট কৃষ্টিগত ও ঐতিহ্যগত তফাত আছে। অবশ্য ”পয়লা অগাস্ট বারাণসীতে দিনের বেলায় ব্রহ্মসূত্রের আলোচনা হল”—এই বর্ণনা বা বর্ণনক্রিয়ার মধ্যে কোনো রঙ চড়ানো নেই; একটি বাস্তব ঘটনাকে সংক্ষেপে সাদামাটা আটটি শব্দের একটি বাংলা বাক্য দ্বারা উপস্থাপিত করা হল। কিন্তু ”কৃষ্ণ মরণোন্মুখ কর্ণের কাছে গিয়ে তাঁর বত্রিশ পাটি দাঁত দান হিশেবে ভিক্ষা করলেন”—তীজনবাঈ-এর এই গল্পবলার বাক্যটির মধ্যে কোনো তারিখযুক্ত বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করার ভানটুকুও নেই। নেই যে, তার প্রমাণ হল ঠিক কটার সময়ে ব্রহ্মসূত্রের আলোচনা হল এই প্রশ্ন পূর্বোক্ত বর্ণনাকারীকে করলে সে জবাব দিতে পারবে বা চাইবে। কিন্তু ঠিক কত তারিখ কটার সময়ে কৃষ্ণ কর্ণের কাছে দাঁত চাইলেন সেটা তীজনবাঈকে জিজ্ঞাসা করাটাই হাস্যকর। দ্বিতীয়ত: ”আপনি জানলেন কী করে যে বারাণসীতে এই আলোচনা সভা হয়েছিল? আপনি কি ওখানে ছিলেন?” —এই প্রশ্ন পূর্বোক্ত সাংবাদিক বা প্রত্যক্ষদর্শীকে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে। কিন্তু ”আপনি জানলেন কী করে যে কুরুক্ষেত্রে আহত ম্রিয়মাণ কর্ণের কাছে এসে কৃষ্ণার্জুন দাঁত চেয়েছিলেন? আপনি কি সেখানে ছিলেন?” —এ জাতীয় প্রশ্ন করা তীজনবাঈকে বিদ্রূপ করার বা তাঁর বাকক্রিয়াকে না বোঝার শামিল।

ঘটনাবর্ণনা তথ্য ও বাস্তব সত্যকে ধরতে চায়, বৃত্তান্তরচনা কোনো সত্য বা তথ্য বা তত্বকেও ধরতে চায় না। দ্বিতীয় ক্রিয়াটির উদ্দেশ্য মনোরঞ্জন, কল্পনাশক্তির উজ্জীবন ও প্রকাশন, বড়োজোর কোনো তত্বের দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ আকলন। প্রথম ক্রিয়াটির অর্থাৎ তথ্যোপস্থাপনের উদ্দেশ্য জগতের সংঘটিত পরিস্থিতির হুবহু রেকর্ড রেখে যাওয়া।

এই প্রস্তাবিত প্রধান পার্থক্যটিকে অবশ্য অনেক ভাবেই খণ্ডন, অথবা খণ্ডন না হলেও সন্দেহভাজন, করে তোলা যায়। রবীন্দ্রনাথ গল্পসল্প বইতে নিজের নাতনি ‘পুপে’ (নন্দিতা?)-কে বলেছেন যে সে মেয়েটি যে তাঁর মানুষী নাতনি পুপেদিদি এটা হল সত্য আর সে যে পরীস্থানের পরী এটা হল আরো সত্য। সে না হয় কবির হেঁয়ালি হল কিন্তু ”মনোরঞ্জনের” মধ্যে যে ”রঞ্জন”—আর ”বস্তুবর্ণনের” মধ্যে যে ”বর্ণন”—এই দুই কথারই তো মানে রং করা। তীজনবাঈ কি আর পাশ্চাত্য ‘বৈজ্ঞানিক ইতিহাস’-এর ‘বাস্তব সত্যের’ ‘বেঁটে খাটো’ ধারণাটি (”ওগো সত্য বেঁটে খাটো/বীণার তন্ত্রী যতই ছাঁটো”—কণিকা) মেনে নিয়ে স্বীকার করবেন যে কেবল লোকের মন ভোলাতে বানিয়ে বানিয়ে তিনি কর্ণের দাঁতের গল্পটা বলেছেন? তিনি, যতদূর আন্দাজ করতে পারি, বলবেন যে সংস্কৃত মহাভারতে থাকুক আর না থাকুক কর্ণ সত্যিই তাঁর সবক’টি দাঁত খুলে দিয়েছিলেন কৃষ্ণের হাতে। একথা সত্য কারণ তাঁর পাণ্ডবানি শিক্ষক তাঁকে তাই শিখিয়েছেন আর একথা সত্য না হলে ‘কর্ণবধ’ পালার শেষ দৃশ্যটা দাঁড়ায় না।

৪. দাতাকর্ণের দাঁত

এস্থলে কৃষ্ণের দ্বারা কর্ণের দাঁত ভিক্ষার বৃত্তান্তটি সংক্ষেপে বলা দরকার। কারণ উত্তর ও মধ্যভারতে বহু প্রচলিত এই উপ-আখ্যানটি অধিকাংশ বাঙালি পাঠকেরই অজানা।

রথচক্র মাটিতে বসে যাওয়ার পর কর্ণ যখন ধনুর্বাণ ত্যাগ করে সেই আটকানো চাকাটিকে উঠিয়ে রথটিকে সচল করবার চেষ্টা করছেন, তখনই শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুন তাঁরই অগ্রজ কর্ণকে উদ্দেশ্য করে পাশুপত অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। ইতিপূর্বেই মাতা কুন্তী দাতাকর্ণের কাছ থেকে তাঁর অভেদ্য কবচকুণ্ডল চেয়ে নিয়েছিলেন, অতএব কর্ণের বক্ষভেদ করে রক্ত বেরুতে লাগলো। অর্জুন নিজেও এই অন্যায় যুদ্ধে মহাবীর কর্ণকে ”পরাজিত” করে অত্যন্ত বিবেকদষ্ট হয়ে রয়েছেন—এই করুণ নাটকীয় মুহূর্তে তীজনবাঈ আরেকটি গল্পের অবতারণা করলেন। অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ বললেন ”সকলে বলে কর্ণ দানবীর—যে-কোনো প্রার্থীকে তার প্রার্থিত বস্তু যে দান করতে রাজি থাকে, চলো তো দেখি অর্জুন এই মৃত্যুলগ্নে পরীক্ষা করে দেখি সে কতবড় দাতা!” এখানে বলা প্রয়োজন যে কথককার যে মণ্ডলী পিছনে বসিয়ে, রঙ্গমঞ্চের সম্মুখভাগে দীর্ঘদেহিনী পৃথুলা রুপোর মোটা মোটা অলংকারে সজ্জিতা গাঢ় কাজলটানা আরক্ত নয়না তীজনবাঈ গল্প বলতে বলতে পদচারণ করছেন—সেই সব গায়ক বাদকরা মাঝে মাঝেই পিছন থেকে গল্প শ্রোতা হিশেবে আবেগসূচক ”ছি ছি” ”আহা” ”হায় হায়”—ইত্যাদি মন্তব্য ও গ্রাম্য চুটকি উচ্চারণ করে চলেছেন—মাঝে মাঝে ছত্তিসগড়ী হিন্দীতে ঢোলক বাজিয়ে উচ্চগ্রামে গান-টান তো হচ্ছেই। আমরা সবাই যেন দেখতে পাচ্ছি কর্ণের বুক থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। কথক মহিলা বলছেন: কৈলাস পর্বত থেকে দিব্যদৃষ্টিতে হরপাবর্তী উত্তেজিত ও আপ্লুত হয়ে এই ভ্রাতৃবিরোধ ও নৃশংস যুদ্ধের দর্শন করছেন। পাশাপাশি শিব পার্বতীর এই কথোপকথনের বৃত্তান্তও যোজিত হয়ে দর্শকশ্রোতাদের কল্পনার চোখে শুধু কর্ণবধ নয় দেবতাদের দ্বারা মর্ত্যে কর্ণবধের সাক্ষাৎ দর্শনের ও দর্শন করিয়ে দিচ্ছে। এমনকী গাণ্ডীবধন্বা অর্জুনও শত্রুর এই অন্তিম লগ্নে কৃষ্ণের দান চাইতে যাওয়ার ব্যাপারটাতে রুষ্ট এবং বিস্মিত হলেন। শ্রীকৃষ্ণ বললেন—”না, তোমার জানা দরকার কতবড়ো মহাপুরুষকে তুমি বধ করলে। কর্ণের মহত্ব স্থাপনের জন্যই আমি এই পরীক্ষা নিতে চলেছি।” ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে তৎক্ষণাৎ মুমূর্ষু কর্ণের সামনে গিয়ে হাত পেতে কৃষ্ণ বললেন ”আমার কিছু ভিক্ষা চাইবার আছে”। কর্ণ বললেন—”আমি তো দেখছেন মরতে বসেছি, এখন আমি কী দিতে পারি?” ব্রাহ্মণবেশী কৃষ্ণ বললেন, ”আপনার দুপাটি দাঁত আপনি আমাকে দান করুন”। (এর মধ্যে কাহিনী আরো পল্লবিত হবে—কুরুক্ষেত্রের মধ্যেই গঙ্গাস্রোত খুঁড়ে তুলে সেই জলে ধুয়ে দাঁতের পাটি কৃষ্ণ গ্রহণ করবেন নচেৎ নয় ইত্যাদি)। কর্ণ কোনোমতে কোমর থেকে তরোয়াল খুলে বত্রিশপাটি দাঁত মুখ থেকে কেটে বার করে কৃষ্ণের হাতে দিলেন। এই নিষ্ঠুরতার উৎকট কাহিনীতে শ্রোতৃবৃন্দ যখন মনে মনে কৃষ্ণের ওপর ধিক্কারে মুখর হয়ে উঠছেন তখন বৃত্তান্তের মধ্যে হঠাৎ এসে মিশলো ”যুক্তি”-যোজনা, আখ্যানের মধ্যে ব্যাখ্যান। জুগুপ্সায় জড়োসড়ো অর্জুনকে কৃষ্ণ বুঝিয়ে বললেন—সূর্যপুত্র কর্ণ সারাজীবন বীরের মতো সৎ ভাবে বেঁচেছেন, তাঁর দানের পুণ্যে তিনি সশরীরে স্বর্গে যাবেন, কিন্তু তাঁর পবিত্র দেহে এই দাঁতগুলি কেবল অশুচি প্রত্যঙ্গ হিশেবে ছিল—আজ আমি তা উৎপাটিত করে মহামানব পুণ্যাত্মা কর্ণকে নিষ্পাপ সর্বতোভদ্র করে ঊর্ধ্বগতির জন্য এই নাটক করলাম। কিন্তু কর্ণের দাঁত এত অপবিত্র কী করে হল? কৌরবসভায় দূ্যতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরের পুনঃ-পুনঃ পরাজয়ের পর যখন দ্রৌপদীকে সভাস্থলে বিবস্ত্র করা হচ্ছিল তখন নিজ ভ্রাতৃবধূর সেই বস্ত্রহরণ দেখতে দেখতে কর্ণ দুর্যোধনের বয়স্য হিশেবে দাঁত বার করে হেসেছিল। উৎপীড়িতা দ্রৌপদীর লজ্জা ও অপমানে অতিহাস্যের সেই মহাপাতক দাতা কর্ণের সমস্ত পুণ্য কর্মকে আচ্ছন্ন করেছিল। কৃষ্ণ কৃপা করে সেই দুষ্কৃতি-ক্লিন্ন দন্তপঙক্তি ছিনিয়ে নিয়ে ”বঞ্চিত করে বাঁচালেন”—কর্ণকেই। হর-পার্বতী এই কাহিনীর মুখ্য দ্রষ্টা শ্রোতা হিশেবে এই ব্যাখ্যা শুনে কৃষ্ণের স্তুতিতে মুখর হলেন। কোনটা ভালো কাজ, কোনটা মন্দ কাজ, কে ভালো কে খারাপ, তার বিচার মানুষের অসাধ্য এই কথা ঘোষণা করে তীজনবাঈ ”কানহাইয়ার দুর্জ্ঞেয় দিব্য চরিত্রের বন্দনায়” নেচে উঠলেন—আর অশ্রুবিষাদের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক ও শুভাশুভ বিচারের বিস্ময়কর গোলোকধাঁধায় চমৎকৃত চলাচলে রোমহর্ষিত শ্রোতৃমণ্ডলী তীজনবাঈ-এর সাথে সাথেই মহাভারতের অমৃতসমান কথা শুনে পুণ্যবান বোধ করলেন। এই হল কর্ণের দাঁতের গল্প। অথবা, সেই গল্পের গল্প।

৫. কী হলে কী হতে পারত? তর্ক, প্রসঙ্গ

এবারে কেউ যদি বলেন যে বৃত্তান্তটি মহাভারতের গল্পের একটি পল্লবিত গ্রাম্য পুনর্বিন্যাস মাত্র—এই কথকের উদ্দেশ্য কয়েক ঘণ্টার জন্য শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করা মাত্র—এর সঙ্গে তথ্যের তো নয়ই, সত্যেরও কোনো যোগ নেই—তাহলে আমার তো মনে হয়, অনেকগুলি স্তরে ভুল হবে।

প্রথমত, তীজনবাঈ যাঁদের কাছ থেকে এই উপ-বৃত্তান্তটি শিখেছেন সেই সব পূর্বসূরী পাণ্ডবাণী কথকদেরকে তিনি আপ্ত—যথার্থ বক্তা—সত্য কথক হিশেবেই জানতেন। এবং আধুনিক ”নিজগৃহে পরবাসী”—শহুরে শিক্ষিত লোকের কাছে এই কর্ণবধের পালা যতই ”এথনিক মজা”—বা উপজাতীয় প্রান্তবাসী সংস্কৃতির ”ইন্টারেস্টিং”-দৃষ্টান্ত মাত্র হোক—মধ্যপ্রদেশের মহাভারত-প্রাণ কৃষ্ণভক্ত শ্রোতাদের কাছে কর্ণের দন্তভিক্ষা কৃষ্ণের লীলার একটি অপরিহার্য ‘বাস্তব’—অঙ্গ। যেমন গোবর্ধন ধারণ, যেমন ”আমি মাখন খাইনি” বলে হাঁ করে যশোদাকে বিশ্বরূপ দেখানো, যেমন গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা, তেমনি এই বৃত্তান্তও সাদামাটা অর্থেই সত্য। তীজনবাঈ যা রচনা করবেন ওই ভূমিকায় তা সঞ্জয়ের মতন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণতুল্য।

দ্বিতীয়ত, যদি বা ”অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের কাছে ওটা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়”, এটা (‘গালে-জিভ-ঢুকিয়ে?’) মেনে নেওয়া হয়—শুধু আপেক্ষিকভাবে নয় অন্য আরেকভাবেও এই বৃত্তান্তের সত্যতা অনস্বীকার্য। আমার অজান্তে যদি আমারই মাতৃগর্ভজাত কিন্তু শৈশবে জননী-পরিত্যক্ত অগ্রজ সূতপুত্র হিশেবে বেড়ে উঠে—মহাধনুর্ধর হয়ে আমারই বিপক্ষে অত্যাচারী শত্রুর দলে যোগ দিয়ে আমার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তাহলে ছলে-বলে-কৌশলে তাঁকে যুদ্ধে নিধন করাটা আমার কর্তব্য? নাকি, না জেনেও আমি তাতে ভ্রাতৃবধের পাপে লিপ্ত হব? নাকি একাজ আমার পক্ষে পাপজনক হলেও তা কর্তব্য? কোনো অবশ্যকর্তব্য (তার মানে উচিত) কাজও কি অকুশল তথা অন্যায় হতে পারে? পাপস্পর্শহীন পুণ্যধর্ম কি কিছু আছে? —এই সব বিচারের জন্য আমাদের চাই উদাহরণ। তাই মহাভারতে বিশেষত শান্তি ও অনুশাসন পর্বে যখনই কূট কতর্ব্যাকর্তব্য বিচারের প্রশ্ন উঠেছে তখনই মর্যারল থিয়োরি গল্পের সাহায্য নিয়ে বলেছে ”অত্রাপ্যুদাহরন্তীমম ইতিহাসং পুরাতনম।” এই ‘উদাহরণ’ বা ‘দৃষ্টান্ত’ ব্যাপারটি কী তা বোঝার চেষ্টা করলে বৃত্তান্ত কথন আর সত্যান্বেষীর তত্ববাচন তথা বৈজ্ঞানিকের ব্যাখ্যাপ্রদানের মধ্যে নিকট সম্বন্ধটা—অন্তত আকাশপাতাল প্রভেদের অত্যন্তাভাবটুকু—স্পষ্ট হবে। ভারতীয় র্যা শনালিটি একটা অত্যন্ত ব্যাপক, শাখাপ্রশাখাজটিল এবং বহুকেন্দ্রিক সূক্ষ্ম ব্যাপার। কিন্তু তার একটি কেন্দ্রবিন্দুতে আছে যুক্তি বা অনুমিতির ধারণা (”তর্ক”— ”যদি এটা হত তাহলে ওটা হত, কিন্তু ওটা হয়নি, হতে পারে না, তাই এটা হয়নি”—এ জাতীয় জ্ঞাতসারে বাস্তব ঘটনাবিরোধী আরোপিত সম্ভাবনাময় ”প্রসঙ্গ” আর্গুমেন্ট এই অনুমান থেকে, আবার, আলাদা ব্যাপার)। এখন অনুমানের দ্বারা যখন অনুমিতিতে আসা হয় তখন—বিশেষত ‘পাব্লিক’ বিচারসভায় পরকে বোঝানোর জন্য অনুমান করে দেখাতে গেলে, প্রতিজ্ঞা (‘পাহাড়ে, না দেখা গেলেও, আগুন আছে’) হেতুর (কারণ, ‘ধোঁয়া আছে’) ঠিক পরেই ন্যায়সূত্রকার গৌতম বলেছেন—আমাদের চাই উদাহরণ।

৬. দৃষ্টান্ত কাকে বলে?

গৌতম ন্যায়সূত্রে (১.১.৩৬) এই উদাহরণের পারিভাষিক লক্ষণ দিয়েছেন—”সাধ্যসাধর্ম্যাৎ তৎধর্মভাবী দৃষ্টান্ত উদাহরণম”। লক্ষ করুন—এই উদাহরণের সংজ্ঞার মধ্যে ঢুকে রইল দৃষ্টান্ত কথাটিও। আমাকে সাধন করতে হবে আগুন (পাহাড়ে) তাহলে আগুনযুক্ত অন্য কোনো জায়গা যেটা বাদী প্রতিবাদী, বক্তা-শ্রোতা, অনুমানকারী আর যার উদ্দেশে অনুমান প্রয়োগ করা হচ্ছে সেই পূর্বপক্ষ উভয়ের সম্মত একটা দৃষ্টান্ত হল উদাহরণ। যেমন, রান্নাঘর—যেটা আগুনযুক্ত শুধু নয় (কাঠের উনুন বা কয়লার উনুন হলে—বিশেষত একটুও ভিজে কাঠ দিয়ে ধরালে) ধোঁয়া (হেতু) আর আগুন সেখানে যুগপৎ বিদ্যমান। অন্য একটি উদাহরণ যা নিয়ে যুক্তিদীপিত সাংখ্যের সঙ্গে ন্যায়প্রখর বৌদ্ধের সহস্রাব্দ ব্যাপী বাগযুদ্ধ চলেছিল—তার দিকে চোখ ফেলা যাক। প্রকৃতিতে রয়েছে কেবল ”সংঘাত”—সংঘাত মানে এখানে—ঝগড়াঝাঁটি নয়—বহু উপাদানে তৈরি একসঙ্গে জড়ো করা অবয়ব সমূহের পিণ্ডীকৃত সমূহ। দেহ একরকমের সংঘাত, হাত পা মাথা পেটের সংঘাত। গাছ একরকমের সংঘাত। পাহাড়, নদী, মানুষের তৈরি বাড়িঘর দোর—যে দিকে তাকাই সর্বত্র কেবল বিভাজ্য অনেকাবয়বগঠিত সংঘাতের ছড়াছড়ি। সাংখ্যদার্শনিক অনুমান প্রয়োগ করলেন::

দেহাদি জড় নৈসর্গিক পদার্থ (সংঘাত—অতিরিক্ত কোনো অন্য জাতীয়)

অতিরিক্ত কোনো অন্য জাতীয় পরের জন্য (পরার্থ)

যেহেতু তা সংঘাত।

এবং উদাহরণ দিলেন—”যথা, শয্যা, গৃহ ইত্যাদি”। এই ছোট্ট অনুমানটির দ্বারা অজড় পুরুষ বা আত্মার প্রমাণ দেওয়া হল। বিছানা দেখলে যেমন সেটা কারু না কারু শোওয়ার জন্য রচিত শয্যা বলে অনুমিত হয় তেমন দেহপুর রয়েছে তাতে শয়নকারী কোনো পুরুষের জন্য—(শাব্দিকরা তো বলেন পুরে শয়ান বলেই আত্মার নাম”পুরুষ”)। এক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক অ-নারী পুরুষ মানে করাটা নেহাত ট্রেন্ডি বোকামো হবে! নৈরাত্ম্যবাদী বৌদ্ধ (জড়বাদী চার্বাকের মতো না হলেও) কিছুতেই এই রকম সংঘাতমাত্রেরই পরার্থত্ব মানবেন না। মানলে পরে তাঁকে শেষপর্যন্ত ঈশ্বর অথবা আত্মা এজাতীয় জিনিস যা নিত্য, অবয়ব বা উপাদানকারণ থেকে প্রতীত্যসমুৎপন্ন নয়—এরকম ”পর”—মানতে হবে। তাহলে তো ”সব কিছু ক্ষণিক”—এ দেহমনের স্রোত বা ‘সন্তান’ ধারার বাইরে কোনো আত্মা নেই—এই মৌলিক বুদ্ধবচনেরই উলটো দিকে চলে যাবে তত্ব। তাই তিনি এই অনুমানে হেত্বাভাস দেখাবেন। কিন্তু শয্যার উদাহরণটি যে বাদীর এবং প্রতিবাদীর উভয়সম্মত পরার্থত্বের উদাহরণ তা অস্বীকার করা যাবে না। বিছানা বিছানার জন্য থাকে না (ফুল ফুলের জন্য ফুটতে পারে, আকাশ আকাশের জন্যই থাকতে পারে) বিছানা থাকে অন্য কারো শোওয়ার জন্য। এবার দেখা যাক ‘দৃষ্টান্তের’ ডেফিনিশনটা কী? বৃত্তান্ত কাকে বলে বোঝার পক্ষে দৃষ্টান্ত কাকে বলে বোঝাটা নিতান্ত অপরিহার্য (এই দুটি শব্দের মধ্যে ”অন্ত্যমিল”—আছে—এটা একটা ইঙ্গিতবহ শ্লেষ!)।

গৌতম বলছেন—”লৌকিক এবং পরীক্ষকের দুজনেরই যে পদার্থে বুদ্ধির সমানতা আছে তা-ই দৃষ্টান্ত” (ন্যায়সূত্র ১.১.২৫)। এখানে ‘লৌকিক’ মানে সাধারণ লোক, ছাত্র, অথবা পূর্বপক্ষের প্রতিবাদী দার্শনিক বুঝতে হবে। ‘পরীক্ষক’ মানে যে যুক্তি সাজিয়ে অনুমান করে লৌকিককে একটা কিছু বোঝাচ্ছে, প্রতিপাদন করছে। যা দেখা যাচ্ছে না সেরকম জিনিসও পরীক্ষা ও উপপত্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করছে যে সে হল পরীক্ষক। ধোঁয়াচ্ছন্ন রান্নাঘরে যে আগুন আছে তাতে লৌকিক এবং পরীক্ষকের ঐকমত্য আছে, শয্যা যে পরার্থেই রচিত হয় তাতে আছে সাংখ্য আত্মবাদী আর বৌদ্ধ অনাত্মবাদীর মধ্যে ”বুদ্ধিসাম্য”।

আইজাক নিউটন প্রমাণ করতে বসেছেন যে মহাকর্ষ নামে এক শক্তি গ্রহগুলিকে সূর্যের চারিপাশে (কেন্দ্রাভিগ শক্তির টানে, কেন্দ্রাতিগ প্রবণতা সত্বেও) ঘূর্ণ্যমান রেখেছে। সেই আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের আদিগ্রন্থ ‘প্রিনকিপিয়া’তেও নিউটনকে সাহায্য নিতে হচ্ছে একটি উদাহরণের, একটি দৃষ্টান্তের। নিউটন লিখছেন—”যেমন একটি আঙুলে যদি কেউ দড়ি বেঁধে দড়ির অপর প্রান্তে পাথর বেঁধে ঘোরায় তাহলে পাথর ছিটকে পড়বে না—আঙুল কেন্দ্র করে ঘুরতেই থাকবে।”—দৃষ্টান্ত তো দেওয়া হল। যে পাঠক মহাকর্ষের নামও শোনেনি—সূর্য আর গ্রহের মধ্যে কোনো বন্ধনের কথা স্বপ্নেও ভাবেনি হঠাৎ দপ করে তারও ভেতরে একটা আইডিয়া যেন প্রকাশিত হয়ে উঠলো। দৃষ্টান্ত এই আলো জ্বালায় বলেই বোধহয় ইংরিজিতে আলো-বাচক lustre শব্দটি ব্যবহার করে দৃষ্টান্তকে বলে Illustration! নিউটন এই দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করেই বলছেন ‘ঠিক এমনই’ এক আকর্ষণী সূত্র হচ্ছে এক শক্তি বা প্রবণতা যার নাম ”মহাকর্ষ”।

আসলে এই উদাহরণ তো ছোট্ট একটি আখ্যায়িকা, নিউটনের আপেল গাছের তলায় বসে থাকার গল্পটির মতন। (যদিও ট্রিনিটি কলেজে সরল বিশ্বাসী ট্যুরিস্টদের দেখানো হয়—”এই সেই আপেল গাছ যার থেকে টুপ করে খসে পড়া আপেল দেখে নিউটন মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করেন”) কোন গাছ, কত তারিখ, কটার সময়ে আপেল পড়লো জিগেস করি না, —তেমনি কার আঙুল, কিসের সুতো, কীরঙের পাথর, কে বাঁধলো, কখন ঘোরালো জিগেস করি না।

দ্যানিস দিদেরোর ”নিয়তিবাদী জাক”—উপন্যাস আরম্ভ হচ্ছে বৃত্তান্তের এই সামান্য-বিশেষ চরিত্রের দিকে স্পষ্ট অঙ্গুলি নির্দেশ করে—

”কীভাবে তাদের দেখা হল? হঠাৎ, সবায়ের যেমন হয়। তাদের নাম কী? তাতে আপনার কী? তারা কোথা থেকে আসছে? সবচেয়ে কাছের জায়গাটা থেকে। তারা যাচ্ছে কোথায়? —কে কোথায় যাচ্ছে তা কি কেউ জানে?”—

জাক অদৃষ্টবাদী হতে পারে, কিন্তু তার উৎপত্তি স্থিতি এবং লয় দৃষ্টান্তেরই বিশ্বে—যেখানে বর্ণনা, রচনা, ঘটনা কল্পনা—এক নিয়ত-অনিয়ত ছন্দ মেনে মানুষের ‘জীবিত কাল’ (lived time) কে কল্পনার দ্বারা পুনর্বিন্যস্ত করতে করতে চলতেই থাকে।

৭. বৃত্তের অন্ত? সময়, সম, যতি ও গল্পশেষ

কখনো বৃত্তান্তকথন হয় ইতিহাসের কার্যকারণ ব্যাখ্যারই ”বাহানা” বা অজুহাত। কোনো ইওরোপীয় ঐতিহাসিক সাহায্য নেন ইডিপাসের বা ওল্ড টেস্টামেন্টের আইজ্যাকের বলিদানের গল্পের, কোনো ভারতীয় ঐতিহাসিক সাহায্য নেন মহাভারত বা রামায়ণের গল্পের। কোনো সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশেষজ্ঞ জর্জ বুশের দ্বারা পাকিস্তানের পর্ণকুটীরের সামনে মিলিটারি সাহায্য ও সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য ডলার সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে সোনার হরিণ বলে বুঝিয়ে দিতে পারেন। মারীচ সংবাদ আসলে যুদ্ধনীতির একটা ‘বৈজ্ঞানিক’ কার্যকারণ কল্পনা। কখনো বা বৃত্তান্ত হয় নিছক খেলা। কিন্তু খেলাকে কেবল মনোরঞ্জন ভাবলে চলবে না।

যোগবাসিষ্ঠে ”বালকাখ্যায়িকা” (উৎপত্তিপ্রকরণ) যেমন। ”অলীক নগরে তিন রাজপুত্র। দুজন জন্মায়ইনি, তৃতীয় জনের মা তাকে গর্ভেই ধরেনি। এরা বেরিয়ে পড়লো অনস্তিত্বশীল এক জায়গার উদ্দেশে। পথে দেখলো আকাশে নির্মূল এক ছায়াশীতল গাছ—পাশে তার তিনটি সরোবর—একটির সব জল শুকিয়ে গেছে অন্যটিতে কোনোদিন জল ছিল না। তাতে তিন নাস্তিময় রাজপুত্র চান করে…”। প্রায় ”লাল গানে নীল সুর হাসি হাসি গন্ধে”র মতো এই বৃত্তান্তও কিন্তু যোগবাসিষ্ঠে গভীর তত্ববর্ণনার উপকরণ। যোগবাসিষ্ঠ ভারতীয়দর্শনের একটি পরমশ্রদ্ধেয় মহাগ্রন্থ। অথচ তা পরতে-পরতে বৃত্তান্তেরই তোষাখানা। গ্রন্থকার স্বয়ং বলেছেন—এই সব গল্প কান্তার মতন শ্রবণরতিকর, যুগপৎ পিতার মতন শাসনকারী উপদেষ্টা।

সময় শেষ হয়ে যায়, কথা ফুরোয় না। বৃত্তের অন্ত নেই। একটি কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে সমান দূরত্ব বজায় রেখে অন্য একটি বিন্দু অনন্তকাল ধরে যে গতিপথে রেখা তৈরি করে চলে তার শেষ কোথায়? সেই বৃত্ত তো অন্তহীন। তবু যেখানে থামতে হয় সেখানেই তৈরি হয় বৃত্তান্ত। এই থামার জায়গাটি কাল্পনিক (arbitrary অর্থে) অথচ সব থেকে বেশি বাস্তব। বিশ্রামের বিরতিটুকু যেমন অভাব পদার্থ হয়েও Real। কাল বা মৃত্যু—তার সত্তা এই চলার মধ্যে থামার ওপরেই নির্ভরশীল। থামা দিয়ে তৈরি হয় যতি—যতিই হল ছন্দের প্রাণ। সমান ব্যবধানে বারবার একটু থামা না হলে ছন্দ হয় না, আর থেমে, শুরু করে, আবার থেমে, আবার শুরু করে—’সম’-এ ফিরে এসে (‘সম’-ব্যাপারটাই তো বিস্ময়কর—তবলিয়ার চাঁটি, গায়কের হাত, শ্রোতার নিমগ্ন শরীর—সমকালে একই যতিস্থলে দুলে উঠে থামে—সজীব-জড় পৃথক পৃথক জিনিসের এই ভেদের মধ্যে অভেদ ঘটে ওঠাকে বলে সম—তিনতালের ষোলোতম জায়গাটি, একতালের বারোতম, রূপকের সপ্তম, ঝাঁপতালের দশম) এই লয়ের আবর্তনই হল তাল। ভালো ভালো বৃত্তান্তের থাকে তাল—যার অন্য নাম কাল।

‘যতি’ এসেছে যেখান থেকে সেই ধাতু থেকেই একই অর্থ বয়ে নিয়ে এসেছে ”যম”। কাল। মৃত্যু। কথকের বাক্যমালার সাময়িক সংযমন, সমে এসে আকাঙ্ক্ষাপূরণ হলে পরে গল্প দাঁড়িয়ে যায়। ছোটোগল্প জমে গেলে সেই বৃত্তের অন্তটিতে দাঁড়িয়ে মনে হয় ”শেষ হয়ে হইল না শেষ”। একটি দৃষ্টান্ত যেমন বুঝিয়ে দেয় যে অন্তহীন দৃষ্ট অদৃষ্টের মধ্যে অনেকসমবেত এক সামান্য রয়েছে—কর্ণের দাঁতের ‘ঘটনা’ তেমন (কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্যের ভাষায়) এক হার্দ্য-সামান্য (heart universals)-এর মাধ্যমে অন্তহীন এক মানব-জিজ্ঞাসাকে সামনে তুলে ধরে। যতদিন, মানুষের গলা থাকে, কান থাকে, শরীরের সন্ধিতে সন্ধিতে ‘আমি যদি অপরের স্থানে থাকতাম তাহলে কী করতাম’—এই কল্পনা থাকে—ততদিন গল্প বলা চলতেই থাকে। অজস্র, অশেষ গল্প। সেই একই গল্প।

৮. শারীর-জীবিতকাল, তথ্যময় ইতিহাস-কাল, ক্রীড়াময় বৃত্তান্ত-কাল এবং কল্পনা-প্রমাণ।

গল্প থামা, না থামা, এই প্রসঙ্গে সময়ের তত্ব একটু জাহির করে সপ্তম অনুচ্ছেদটি শেষ করেছি। কিন্তু বৃত্তান্তের সঙ্গে কালের কী সম্পর্ক তা মোটেই স্পষ্ট করতে পারিনি। এই ব্যর্থতায় তেমন বেশি লজ্জিত হবার কিছু নেই। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিককার এক দার্শনিক মহারথী সময় ও বৃত্তান্তের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তিন খণ্ডে বিভক্ত প্রকাণ্ড মহাগ্রন্থ লিখেও কাল ও আখ্যানের রহস্যের কুলকিনারা পাননি। আমার অগোছালো আত্মজৈবনিক অর্ধপক্ব বিশ্লেষণের দ্বারা যে এই গল্পময় বেলা, অবেলা, কালবেলার তত্ব জলের মতো সহজ হয়ে যাবে তা কেউ আশা করতে পারেন না। যে পাশ্চাত্য দার্শনিক তিনখণ্ড ‘টাইম অ্যান্ড ন্যারেটিভ’ লিখে স্বকার্মধন্য সেই পলরিক্যোর-এর দুয়েকটি চিন্তা-মণির প্রতিবিম্বন করবার আগে—এযাবৎ আমাদের আলোচনার মোদ্দা কথাটা একটু ঝালিয়ে নিই।

(ক) যে-কোনো পুরাণ-আখ্যানের কথন (যা:সর্বদাই হয়:পুনঃকথন),

(খ) দার্শনিক বাদানুবাদ, আর (গ) তথ্যসংগ্রহপূর্বক ইতিহাস গ্রন্থনা—এই কখগ যদিও তিনরকমের অ-সদৃশ বাক-ক্রিয়া (Speech-act)—তবু কোনো-না-কোনো ভাবে তিনটিরই উদ্দিষ্ট সত্য উদঘাটন।

আর সত্যের নিজের মধ্যে সীমা, অন্ত, বা ক্রমিকতা থাক আর না থাক উদঘাটন-ক্রিয়া বা যে-কোনো কথনই যেহেতু হয় পদসীমা, পদচ্ছেদ, যতি, ও বাক্যবচনার ক্রমিকতার মাধ্যমে—সেহেতু কালের ছন্দ ও ক্রমিকতা উদঘাটিত সত্যের ওপর আরোপিত হতে বাধ্য। বৃত্তান্তের ”অন্ত” অংশটা আসছে এই বিকল্পিত কালচ্ছেদ (যাকে চলচ্চিত্রকাররা বলেন “cut”-কর্তন) ও কালক্রম থেকে। মানুষ—শুধু শিল্পী, নাটুকে, ফাজিল মানুষ নয়—বৈজ্ঞানিক, নৈয়ায়িক, সত্যানুসন্ধিৎসু মানুষও—হুইজিঙ্গা বলেছেন—মূলত ক্রীড়ামোদীজীব (Homo Ludens)। কালকর্তিত কল্পনার এক বিশ্বজনীন খেলারই নাম বৃত্তান্তকথন—গল্প বলা। এই পর্যন্ত নিষ্কর্ষ সামনে রেখে এবার সময় ও বৃত্তান্তের প্রসঙ্গে ফিরে আসছি। গিলগামিশ, বেতালপঞ্চবিংশতি বৃহৎকথা, কথাসরিৎসাগর, আরব্যরজনীর কথাশতক, বোকাচিও-র ডেকামেরন, চসারের ক্যান্টারবারি টেলস—ইত্যাদি কালজয়ী বৃত্তান্তসংগ্রহের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। অনেক গল্প শিথিলভাবে গাঁথা রয়েছে যেন একটিই মহাকাহিনীর সুতোতে। কথক-লেখক ও শ্রোতা-পাঠকের মধ্যবর্তী কল্পিত, সংঘটনকাল, বাস্তব আখ্যানকাল আর পঠন-পুনঃকথন কালেরও মধ্যে প্রবহমাণ এক অন্তর্বর্তী উত্তমপুরুষ বৃত্তান্তবিলাসী অস্মিতাময় (সাবজেক্টিভ) সংবিৎ যেন এই গল্পোর্মিমালার সংকলক, গ্রন্থনাকার।

একদিকে এই অনন্তকালোদ্দিষ্ট অবিচ্ছেদ গাঁথুনি যেমন দরকার—তেমনি মালা হতে গেলে চাই একটি ফুল (বা মণিরত্ন) আর অন্য একটি ফুলের মধ্যে একটি সীমারেখা। প্রেমে বা প্রেমজনিত অসূয়ায় পাগল হয়ে গেলে মানুষ নিজের বা অন্যের জীবননাশও করতে পারে—এই সত্যকে দৃষ্টান্তিত করতে গিয়ে একটি বৃত্তান্ত; আবার ক্ষুধার্ত অতিথি সেবার জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত থাকে কোনো কোনো মানুষ—এই সত্যকে বোঝানোর জন্য আরেকটি গল্প; সংযম ও কৃচ্ছ্রসাধনের ভেক ধারণ করে অনেক সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীই ভেতরে ভেতরে হাস্যকর রকমের ভোগলোলুপ থেকে যায় এই সাংসারিক সত্যের নিদর্শন যদি একটি প্রহসনগল্প, তেমনি টাকার লোভে চালাক মানুষও বোকার মতো আচরণ করে এই সত্যের উদাহরণ আরেকটি নকশা। এই গল্পগুলি বলা হতে পারে পরপর অথবা বেণীর মতন জড়িয়ে পাকিয়ে—এবং এদের মধ্যে শ্রোতা ও বক্তার অভিন্নতা ধরে নিলেও এই প্রতিটি বৃত্তান্তের আলাদা আলাদা গল্পকাল থাকতে পারে।

বৃত্তান্তের নিজস্ব জগৎ কালকল্পনাহীন হতেই পারে না। এমনকী যদি গল্প শুরু হয় ”এদিকে, তারপর, রাজকন্যা যখন গুলিসুতো খেয়ে ফেলল—তখন—” তারও মধ্যে একটা পৌর্বাপর্যের ক্রম, একটা ”অতঃপর” ”একই সময়ে” ”তার আগে”—ইত্যাদির অভিনয় অন্তত থাকতেই হয়। বৃত্তান্ত হল ‘ক্রিয়া’র বর্ণন—আর আশ্রিত ক্রমরূপতা হল ক্রিয়ার ক্রিয়াত্ব। এই বিষয়ে পল রিক্যোর যে তিন রকমের কালের পার্থক্য করেছেন তার প্রসঙ্গে আসবার আগে—জগৎ, বা গল্প, কিংবা গল্পের জগৎ শুরু হওয়া না হওয়া নিয়ে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং বেশ মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতন রূপকথা শোনাতে চাই। এই রূপকথাটির ”আবিষ্কর্তা”—প্রসিদ্ধ অস্ট্রিয়ান মনীষী, বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাদার্শনিক ল্যুডহ্বিগ হ্বিটগেনস্টাইন। এই গল্পটি তিনি কোথাও লেখেননি কিন্তু ছাত্রদের কাউকে মুখে বলেছিলেন—আর সেই থেকে হ্বিটগেনস্টাইনের ছাত্রদের পরম্পরাক্রমে ”ওরাল ট্র্যাডিশনে” গল্পটা চলে এসেছে।

একজন প্রত্নতাত্বিক গবেষক এক দুর্গম পর্বতচূড়ায় দুটি গুহা আবিষ্কার করল। প্রথম গুহায় সে দেখতে পেল একদল ছোটো ছোটো বালক-তপস্বীকে যারা সমস্বরে ”এক”, ”দুই”, ”তিন”, ”চার”, ”পাঁচ”, ”ছয়”… এইভাবে চিৎকার করেই চলেছে। সে বুঝতে পারল যে এরা এক থেকে শুরু করে পূর্ণসংখ্যাগুলির নাম আবৃত্তি করতে শুরু করেছে—যদিও কোনোদিনই ওরা শেষ করতে পারবে না এই কাজ।

দ্বিতীয় গুহায় গিয়ে সে দ্যাখে অতিবৃদ্ধ জরাভারাতুর লম্বাদাড়িওয়ালা কয়েকজন তপস্বী বিড়বিড় করে বলছেন ”ছয়”, ”পাঁচ”, ”চার”, ”তিন”, ”দুই” ”এক” ”শূন্য” ”আঃ”—এই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁরা চুপ করে গেলেন। কৌতূহলী গবেষক এগিয়ে গিয়ে ওদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলে ”আজ্ঞে আপনারা কী করছিলেন এতক্ষণ, তিনি হেসে বললেন— ”বৎস! আমরা পূর্ণসংখ্যার সমগ্র শ্রেণীটিকে এক এক করে উল্লেখ করছিলাম—বিপরীত ক্রমে। কমতে কমতে এই মাত্র শূন্যে এসে শেষ করলাম।” বিস্ময়বিমূঢ় গবেষক জিজ্ঞাসা করলেন—”ঠিক বুঝলাম না, আপনারা কবে শুরু করেছিলেন?” বৃদ্ধ তপস্বী বললেন ”ওহে বালক, সংখ্যাশ্রেণীর যেহেতু শেষ নেই, আর আমরা শেষ থেকেই শুরু করেছিলাম, আমরা কখনো শুরুই করিনি।” যদি এই দুনম্বর গুহার ব্যাপারটাকে লজিক্যালি আজগুবি মনে হয় কারো তাহলে তাকে স্বীকার করে নিতে হবে যে কাল বা জগৎ অনাদি—এই বিশ্বে ঘটনাস্রোত ”কখনো শুরু হয়নি”—এজাতীয় তত্বও আজগুবি। অথচ ”সৃষ্টি অনাদি” এধরনের কথা অনেকেই ভেবে থাকেন। বরং বিগ ব্যাং দিয়ে মহাবিশ্বের সূত্রপাত এটাই বুঝতে দেরি হয়।

এই উদভটবৃত্তান্তটি অবশ্য ফাঁদাই হয়েছে কাল, প্রারম্ভ ও অন্ত বিষয়ে আমাদের চিন্তাকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গুছিয়ে নেবার তাগাদায়। মহামতি ইমানুএল কান্ট তাঁর শুদ্ধ বিচারবুদ্ধির আত্মবিরোধী যুক্তি (অ্যান্টিনোমি) সাজাতে গিয়ে যেমন ”জগৎ একটা নির্দিষ্ট ক্ষণে আরম্ভ হয়েছিল” আবার ”জগতের কখনো আরম্ভই হয়নি”—এই উভয়মতকেই খণ্ডন করে বুদ্ধির বিভ্রাট দেখিয়েছেন, সেরকম হ্বিটগেনস্টাইনও মাত্র এই কাহিনীর দ্বারাই নাটকীয় ভাবে ”শুরুহীন একটা ধারাবাহিকপ্রক্রিয়ার সমাপ্তি হল”—এই সম্ভাবনাটিকে কল্পনা করে দেখালেন যে ওটা অকল্পনীয়। (তর্করসিকরা এ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে থাকুন: কোনো সম্ভাবনাকে যথা ”সবুজ বিজোড় সংখ্যাতে হাসি হাসি গন্ধ”—যদি অকল্পনীয় ও অসম্ভব বলে প্রমাণ করতে বা বুঝতেও হয় তাহলেও কী সেই সম্ভাবনাটি—অন্য কোনো সম্ভাবনা নয় ওইটিকেই—বুঝে কল্পনা করে, ভাবনার বিষয় করে নিয়ে, তার পরেই তাকে অভাবনীয় অকল্পনীয় অবোধ্য প্রমাণ করতে হয় না?)

হ্বিটগেনস্টাইনের দুই গুহার গল্পেতে যেরকম সাক্ষাৎভাবে অনারব্ধ কালিক ক্রিয়া নিয়ে খেলা করা হয়েছে, সেভাবে না হলেও অগ্র, পশ্চাৎ, বর্তমান, জীবিত, মৃত, পূর্ব, পর—এইসব কালিক সীমায়ন ও তার পুনর্বিন্যাসকে তত্ব ও কৌতুকে উপজীব্য করে যোগবাসিষ্ঠ মহারামায়ণেরও অনেক গল্প বিতত হয়েছে। সেই গল্পগুলিও গাঁথা রয়েছে কৌটোর ভেতরে কৌটো, তার ভেতরে আবার কৌটো এরকম এক স্তরক্রমে। ব্রাহ্মণ সুতীক্ষ্মের জিজ্ঞাসার জবাবে অগস্ত্ব্যমুনি আখ্যায়িকাতে বললেন কারুণ্য আর অগ্নিবেশ্যের কথা। অগ্নিবেশ্য বলেছিলেন অপ্সরা সুরুচি আর ইন্দ্রের এক দেবদূতের গল্প। সুরুচিকে দেবদূত বলেছিলেন এক মুমুক্ষু রাজার স্বর্গপ্রত্যাখ্যানের গল্প—যেই রাজা বাল্মিকীকে সংসার থেকে মুক্তির উপায় জিগেস করায়, বাল্মিকী বলেন বশিষ্ঠ ও রামের কথা। বশিষ্ঠ রামকে বলেছিলেন লীলা ও পদ্মের অদ্ভুত বৃত্তান্ত। মহারাজ পদ্মের মৃত্যুতে তাঁর বিলাসিনী বিচারশীলা মহিষী লীলা শোকার্তা হয়ে তাঁর স্বামীর শবদেহকে পুষ্পাভরণে সাজিয়ে রেখে ধ্যানযোগে জ্ঞানস্বরূপিনী সরস্বতীদেবীকে আহ্বান করেন। সরস্বতী তাঁকে চিদাকাশ থেকে দেখান যে একদিকে (আগামী?) কোনো দেশান্তরে (এইখানে শবীভূত) পদ্মই আবার পরাক্রান্ত রাজা বিদূরথ হয়ে রাজত্ব করছেন। সেখানে বিদূরথের পাশে রয়েছেন আরেকজন ”লীলা”—এঁকে দ্বিতীয় লীলা নামে গ্রন্থটি অভিহিত করেছেন। …”অনন্তর লীলা(১) বিদূরথের সেই মহিষীকে (লীলা ২) দর্পণে প্রতিবিম্বিত নিজেরই আকৃতির ন্যায় অবলোকন করিয়া সরস্বতীকে বলিলেন—”হে দেবি! একি আশ্চর্য ব্যাপার! এই রাজমহিষী আমারই আকৃতি সম্পন্না হইলেন কিরূপে? এই রাজা বিদূরথই যদি পদ্ম হন তাহা হইলে আমার রাজপ্রাসাদের শয়নগৃহে যে পুষ্পশয্যায় শবদেহ হইয়া পদ্ম আছেন তিনি কে? এই দ্বিতীয় লীলা, এই ভিন্ন দেশের মন্ত্রী অমাত্য সেনাপতি সৈন্য জনপদবাসিগণ, ইঁহারা কি বাস্তব না কৃত্রিম?” সরস্বতী এই প্রশ্নের জবাবে লীলাকেই পালটা প্রশ্ন করলেন—”তুমিই বল কোনটি প্রকৃত পরমার্থ আর কোনটি কৃত্রিম বা মায়িকা?” লীলা বলিলেন ”এই যে আমি আমার মৃত পতির রাজ্যে রাজপাট সামলাইতেছি ইহাই অকৃত্রিম, ওই যে অন্য একটি আমার অনুরূপ স্ত্রী লইয়া বিদূরথ রাজ্য করিতেছেন উহা কৃত্রিম।” সরস্বতী তখন লীলাকে বলিলেন—”পৌরাণিক বশিষ্ঠ হইতে পৃথক, কিন্তু বশিষ্ঠেরই মত ‘বিত্ত-বেশ-বয়স-কর্ম-বিদ্যায়’ অনুরূপ আরেক ব্রাহ্মণ ছিলেন তাঁরও নাম ”বশিষ্ঠ”—এবং তাঁর পত্নীরও নাম ছিল অরুন্ধতী। তাঁহাদের পাহাড়ের সানু দেশে কুটীর ছিল—তাহার অঙ্গনে বসিয়া ব্রাহ্মণ বশিষ্ঠ একদিন হস্তী-অশ্ব-সেনা-ছত্র চামরাদি আড়ম্বরপূর্ণ এক রাজাকে যাইতে দেখিয়া মনে মনে রাজা হইবার বাসনা পোষণ করেন। আজ আটদিন হইল ওই কুটীরের আঙ্গিনায় (মণ্ডপে) বসিষ্ঠের দেহান্ত হইয়াছে—অরুন্ধতী তাহার দেহ পাহারা দিয়া বসিয়া আছেন। তোমার স্বামী পদ্ম যে এত সুদীর্ঘকাল পঞ্চাশষাট বৎসর রাজত্ব করিতেছিল—আর তুমি—বস্তুত অরুন্ধতী যে তাহার রাজ্ঞী হইয়া বিলাস করিতেছিলে এ সকল ব্যাপারই মৃত্যুকালীন বসিষ্ঠের বাসনা ও সংকল্পের দ্বারা নির্মিত ব্যাপার যাহা ওই কুটীর প্রাঙ্গণে এই আট দিনে মণ্ডপের মধ্যেই সংঘটিত হইতেছে। এইবার বল কে সত্য—বসিষ্ঠ, পদ্ম, না বিদূরথ? কে কৃত্রিম—অরুন্ধতী, প্রথম লীলা—তুমি, না ওই দ্বিতীয়া লীলা?”

গল্পটি আরো অনেক প্লটের প্যাঁচ এবং তত্ব কথার মাধ্যমে—এক রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধে বিদূরথের দেহান্ত সম্পাদন করিয়ে—দ্বিতীয়া লীলাসহ প্রথম লীলাকে ফিরিয়ে এনেছে পদ্মের রাজত্বে। এবং মৃত পদ্ম পুনর্জীবিত হয়ে লীলা এবং তাঁর প্রতিবিম্ব লীলা (২) —সহ আরো বহু বৎসর সমৃদ্ধ রাজভোগ উপভোগ করেছেন। এই বৃত্তান্তগুলিতে জীবিতকালের মধ্যেই তিনবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গেছেন বশিষ্ঠ:=পদ্ম=বিদূরথ। শেষ পর্যন্ত অমৃতের পথযাত্রিণী প্রবুদ্ধা (জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিতা) লীলা বুঝেছেন যে এই সব বিকল্প বিশ্বগুলি, এই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ জগৎ—আমাদেরই কল্পনা নির্মিত মনোময়। কিন্তু এই বোধ যোগবাসিষ্ঠের প্রথম শ্রোতা (অকালবৈরাগ্যে বিষণ্ণ তরুণ) রাম, দ্বিতীয়, তৃতীয়—অন্তিম শ্রোতা আমরা—আমাদের মধ্যে জাগাতে পারি কেবল আখ্যায়িকার মাধ্যমেই, শুষ্ক অপ্রতিষ্ঠ তর্কের মাধ্যমে নয়। ”উৎপত্তি প্রকরণ” (যোগবাসিষ্ঠ, তৃতীয় প্রকরণ) এই লীলার গল্পের মাঝখানেই এই বৃত্তান্তপদ্ধতিতে তত্বোপদেশের মহিমা কীর্তন করেছেন এই সুন্দর (‘বসন্ততিলক’) ছন্দের দুটি কবিতায়—

”যৎ কথ্যতে হি হৃদয়গময়োপমান—

—যুক্ত্যা গিরা মধুরযুক্ত পদার্থয়া চ।

শ্রোতু স্তদঙ্গ হৃদয়ং পরিতো বিসারি

ব্যাপ্নোতি তৈলমিব করিণি বার্য শংকাম।।

ত্যক্তোপমানম অমনোজ্ঞপদং দুরাপং

ক্ষুব্ধং ধরাবিধুরিতং বিনিগীর্ণবর্ণম।

শ্রোতুর্ন যাতি হৃদয়ং প্রবিনাশমেতি

বাক্যং কিলাজ্যমিব ভস্মনি হূয়মানম।। (উৎপত্তি, ৮৫, ৪৬-৪৭)

উপমানযুক্তি দ্বারা হৃদয়ংগম কথা ও কাহিনীর মাধ্যমে যে তত্ব বোঝানো হয় তা জলের মধ্যে তেলের ফোঁটার মতো শ্রোতার হৃদয়ে সহজে ছড়িয়ে পড়ে। অ-মনোহারী উপমানহীন তর্কমাত্র দ্বারা যা বোঝানো হয় তা ভস্মে ঘি ঢালার মতো ব্যর্থ হয়, শ্রোতায় হৃদয়ে না প্রবেশ করেই তা প্রবিনষ্ট হয়। যদিও ভর্তৃহরি আমাদের মনে করিয়েছেন (বৈরাগ্যশতকে) যে, সময় চলে যায় না, আমরাই চলে যাই, শারীরক জীবের অনুভবে যে-কোনো অনুভূয়মান বর্তমানই আসে বিগত আর আগামীর মধ্যবর্তী রূপে। যদিও খুঁজতে গেলে এই বিশুদ্ধ ”এখন”-টিকে পাওয়া মুশকিল—এই পিছল অধুনা ক্রমাগত নিজেক তুলে দিচ্ছে প্রত্যক্ষ থেকে স্মৃতির হাতে। আর সংস্কার-লেশটুকু ফেলে রেখে যেমন যেমন জীবিতকাল (lived time) ‘ভূত’ হয়ে যাচ্ছে তেমন তেমন নতুন নতুন অধুনা আকৃষ্ট হয়ে খুলে বেরিয়ে আসছে যেন এক প্রত্যাশিত সংকল্পিত বিকল্পিত আগামী অনাগতের পাকানো সুতোর কন্দুক থেকে। স্মরণ আর প্রত্যাশার মাঝখানে এই সক্রিয় হয়ে চলার অনুভূতিরই অন্য নাম ”ইদানীং”।

পল রিক্যোর তাঁর ”সময় ও বৃত্তান্ত” গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের মধ্যভাগে ”ইতিহাস ও কল্পকাহিনীর ওতপ্রোত গ্রন্থনা” নামক (৮ম) অধ্যায়ে কথাশিল্পী পুরাণবৃত্তান্তকথক ও ঘটনা-গবেষক অতীত-সাংবাদিক ঐতিহাসিকের পরস্পরনির্ভরতা নিপুণ ভাবে প্রতিপাদন করেছেন। ইতঃপূর্বে অন্য একটি অধ্যায়ে রিক্যোর ‘প্রতিজ্ঞা’ (প্রেমিস) হিশেবে ধরেই নিয়েছেন যে ইতিহাস যেহেতু উপন্যাস নয়—তার নির্ণয় ও নির্ধারণের জন্য চাই ”প্রমাণ”—যা সাধারণত হয় দলিল, নথি, খনন, গণন, সংখ্যায়ন, অনুমান দ্বারা সমর্থিত ”এভিডেন্স” বা ”ওআরেন্ট”। কিন্তু এই ‘প্রমাণ’ ঐতিহাসিকের হাতে তুলে দেয় না কোনো (হ্যামলেটের বাবার প্রেমের মতো) আত্ম-প্রচারক অতীত। ঐতিহাসিককে বিকল্প সম্ভাব্য হতে-পারত-ঘটনাপরম্পরার পুনর্নির্মাণ করে—তাদের মধ্যে থেকে সম্ভাব্যতমকে সক্রিয় ভাবে নির্বাচন করতে হয়। আর এই কাজে তার ”শিক্ষক” হয় জীবননাটকের ক্রীড়াময় কাল-পুনর্বিন্যাসামোদী ঔপন্যাসিক, গল্পকথক, কল্পকাহিনীর কথাশিল্পী। ইতিহাসরচয়িতা ঔপন্যাসিকের অনুকরণ করেন। ঠিক যেমন জীবিতকালে আমরা অধুনা সময়টিকে সম্বন্ধের জাল বিস্তার করে বুঝি ”সাম্প্রতিক, সমসাময়িক, আমারই সঙ্গে এককালীন”—এই ধারণাটির মাধ্যমে; ব্যক্তিগত স্মৃতিরও সীমা ছাড়িয়ে ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, বৃদ্ধপরিচিতদের শব্দপ্রমাণ দ্বারা সেই সাম্প্রতিকের পূর্বসীমায় রাখি ক্রমদীর্ঘায়মান এক ”আগেকার, পুরাকাল”কে; আবার ”যখন রবো না আমি এ ধরায়” —এ জাতীয় আগামী কল্পনায় পশ্চাৎ সীমায় রাখি ”আগামী ভবিষ্যৎ” প্রজন্মের সম্বন্ধ সময়কে—তেমনি কল্পকাহিনীকারও কিন্তু তাঁর কাল-খেলায় নকল করেন ‘বাস্তব’ স্মৃতিচারণাকারী, দৃষ্ট, শ্রুত, ‘প্রমাণিত’ ইতিবৃত্ত-সংগ্রাহক ঐতিহাসিকেরই। ফলে কল্পকাহিনীর বর্ণনার ক্রম যেরকমই হোক না কেন—ফ্ল্যাশব্যাকে পিছিয়ে যাওয়া, আত্মজৈবনিক বর্তমানে গড়িয়ে চলা, অথবা সায়েন্স ফিকশনের মতো বা ভবিষ্যপুরাণের মতো অনাগত বর্ণনার ভান করা—কল্পকাহিনীর বর্ণিত ঘটনার সংঘটনকাল কিন্তু এই সম্প্রতি, পুরাতন, আগামীর ত্রিধাবিস্তরণের অনুকৃতিই হতে বাধ্য। অতএব—যে কল্পকাহিনীর কাছ থেকে তথাকথিত ”বৈজ্ঞানিক” ঐতিহাসিকও তাঁর পূর্ববৎ-অনুমানের শিল্পটুকু ধার করছেন—অনেক কল্পনীয় গল্পের মধ্যে কোন গল্পটা সব থেকে জুৎসই শোনাচ্ছে সেই ”ঔচিত্যবিচার চর্চা” করার জন্য—সেই কল্পকাহিনী নিজেই কিন্তু আদিতেই উপ-ইতিহাস (Quasi-history)—বা ইতিহাসের অনুকরণ। গল্পকার শুরু করেন ”আসলে কী হয়েছিল জানো?”—বলে। আর সাংবাদিক আজকের তাজা খবরকে বলেন—”স্টোরি”। অতএব পুরাবৃত্ত যে কল্পবৃত্তান্তের ওপর নির্ভরশীল তার গভীর কারণ হল এই, যে কল্পবৃত্তান্তের পাঠক বা শ্রোতাকে—ধরে-নেওয়া-একজন-বৃত্তান্তবক্তার সঙ্গে এই চুক্তিতেই প্রবেশ করতে হয় যে বৃত্তান্তবক্তা তাঁর নিজের দেখা বা শোনা বা পরম্পরাপ্রাপ্ত কোনো বাস্তব-অতীতকেই (কল্পকাহিনীতেও) মেলে ধরছেন। কেবল এই শ্রোতা-বক্তার চুক্তিটি কল্পকাহিনীর ক্ষেত্রে, ”ধরো বা মনে করো যেন”—(”বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে”) এই ভূমিকাটুকু দিয়ে বন্ধনীগ্রস্ত। আর তথাকথিত ”সত্যি ঘটনার” ইতিহাসে—”এরকমই হয়েছিল”, ”ইতি-হ-আস”—এই দাবি করে অন্য এক ”ভূমিকা” পালন করছেন অতীত সংবাদের বক্তা ও শ্রোতারা। “If this hypothesis stands up, we can say that fiction is quasi-historical, just as much as history is quasi-fictive” (Time and Narrative, Vol.3, p.190)

ইতিহাসের প্রমাগুলি সবিকল্পক সপ্রকারক—”এটা এজাতীয়” ধরনেরই জ্ঞান বা অবধারণ। নামকল্পনা, জাতিকল্পনা, কালকল্পনা, গুণকল্পনা, বর্গী-করণকল্পনা ব্যতীত সবিকল্পক জ্ঞান সম্ভব হয় না। অতএব ইতিহাসের পক্ষে মুখ্য ‘প্রমাণ’ হল কল্পনা প্রমাণ। কল্পনাশক্তি যে যথার্থজ্ঞানের জন্য অপরিহার্য উপকরণ একথা পাশ্চাত্য প্রমাণশাস্ত্রে সব থেকে স্পষ্ট করে বলেছেন কান্ট। ইন্দ্রিয়জ সংবেদনসমূহেরা আমাদের কাছে ”প্রদত্ত” হয় অবশভাবে। বহির্জগৎ থেকে ওরা এসে চিত্তে ভিড় করে এলোমেলো ভাবে কেবল দেশ ও কালের পূর্বতঃসিদ্ধ শুদ্ধ আকারদ্বয়ের ছাঁচে ঢালাই হয়ে। যতক্ষণ না পর্যন্ত সর্বমানবসাধারণ বৌদ্ধিক শুদ্ধ-ধারণাগুলির বাঁধনে তারা ক্রিয়া-গুণ-সম্বন্ধ-সংখ্যা-অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব-কার্যকারণ-ইত্যাদি অবধারণযোগ্য ”প্রকার” বা ”বিধেয় বিশেষণের” আকার পাচ্ছে ততক্ষণ তো যথার্থ অযথার্থ কোনো রকমের অনুভব, কোনো রকমের বচন, কথন, অধ্যবসায় বা ব্যবসায়ই হয়ে ওঠে না। অথচ ইন্দ্রিয়সংবেদন আর বৌদ্ধিক আকার এরা এত বিপরীত স্বভাব যে এদের দ্বিতীয়টা দিয়ে প্রথমটাকে গুছিয়ে গেঁথে তোলার জন্য চাই এক সেতুবন্ধসামর্থ্য—এমন এক মানসিক শক্তি যা ইন্দ্রিয়সংবেদনের মতো মূর্ত, সাক্ষাৎকারের মতো সজীব, অথচ বিষয়ের অনুপস্থিতিতেও বিমূর্ত চিন্তার মতো সামান্যীকরণে সক্ষম। আর এই শক্তিরই নাম কল্পনা। স্মৃতি ও প্রত্যাশায় প্রণষ্ট অনুপস্থিত অতীত ও প্রাগভাব প্রতিযোগী ভবিষ্যৎকে জানতে এই কল্পনার অপরিহার্যতা সুবিদিত। যা কান্ট তাঁর “Schematism” নামক দুরূহ অধ্যায়ে দেখিয়েছেন তা হল—এই যে বর্তমানকে জানতে, বিজ্ঞানে, প্রাত্যহিক বহিরন্তরের প্রমাজ্ঞানের জন্যও এই কল্পনাপ্রমাণই আমাদের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার, দেখা আর বোঝার মধ্যবর্তী জ্ঞান-ঘটক। এই কল্পনায়ই আশ্রয় নেন ইতিহাস কথক, দার্শনিক বিচারক এবং কবি-কল্পকাহিনীকার।

রিক্যোর-এর কথা ঠিক হলে এই কল্পনার প্রয়োজনেই ইতিহাসকে হতে হয় অর্ধ-উপকথা, আর উপকথাকে হতে হয় অর্ধ-ইতিহাস। মূলে আছে প্রতিবিম্বন। যা হয়েছে তা তো হয়েইছে। তার ছবি লেখা হল কথন। কথন দিয়ে তৈরি হয় কথা। কথা নিয়ে কল্পনার একটু মুক্ত খেলা দিয়ে তৈরি হয় উপকথা (যে বৃত্তান্ত তথ্য হতে চায় না, দাবিও করে না বাস্তব ‘আসল’-পনা!)। রিক্যোর যেন বলছেন—ইতিহাস হল উপ-উপ-কথা!

প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, সাংবাদিকের খবর, ঐতিহাসিকের গবেষণা-প্রমাণিত দলিল, দার্শনিকের বিচারসহ সিদ্ধান্ত এদের মতো মহাভারতের কথাও বৃত্তান্ত হিশেবে উদাহরণ-উপমান-আখ্যায়িকা সমৃদ্ধ সত্যোদঘাটনই বটে। তিনকালে এই গল্পমালা কথিত, কথ্যমান, কথনীয়।

আচখ্যুঃ কবয়ঃ কেচিৎ সম্প্রত্যাচক্ষতে পরে।

আখ্যাম্যন্তি তথৈবান্যে ইতিহাসমিমং ভুবি।

পূর্বে দ্বৈপায়ন ব্যাসের মতো কোনো কোনো কবি এই গল্প বলেছিলেন, সম্প্রতি পিটার ব্রুকস আর তীজন বাঈ এর মতো কথকরা বলছেন। ভবিষ্যতে এই সত্যের থেকেও সত্য সব বৃত্তান্ত বলবেন লীলা-সরস্বতীর মতো ভার্চুয়াল রিয়ালিটিতে ভ্রাম্যমাণ সাইবার গিরিপথের পথিক আমাদের পৌত্রীপ্রপৌত্রীদের প্রজন্ম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *