৬. রাসেলীয় মোক্ষের লক্ষণ ও পরীক্ষা

রাসেলীয় মোক্ষের লক্ষণ ও পরীক্ষা

এক

“Three passions, simple but overwhelmingly strong, have governed my life: the longing for love, the search for knowledge, and the unbearable pity for the suffering of mankind.”––Autobiography (Part-1)

সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরুতে গিয়ে সাইকেলের প্যাডলে পা দিয়ে হঠাৎ যিনি তাঁর প্রথমা স্ত্রীর প্রতি আকস্মিক অনাসক্তি অনুভব করে সেই মুহূর্তে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত করেন, আত্মহত্যার প্রাক্কালে শুদ্ধগণিতের অনুরাগ যাঁকে জিজীবিষু করে তোলে, কিংবা বার্টনের অ্যানাটমি অব মেলাঙ্কলি শীর্ষক গ্রন্থপাঠে যিনি অনায়াসে দৌর্মনস্য কাটিয়ে ওঠেন, অথবা ”অ্যাপ্রিকট” ফলের নামটির অভিনব ব্যুৎপত্তি আবিষ্কার করায় যাঁর কাছে ফলটি হয় স্বাদুতর, সেই অলোকসামান্য নিষ্কাম জ্ঞানসাধকের বুদ্ধিলোকে প্রবেশ করলে আমাদের আরামী বিশ্বাসপ্রিয় মন অস্থির হয়ে ওঠে; ঝলসে যায় তার শাণিত ঔজ্জ্বল্যে, শ্রান্ত হয় তার অবিরাম অস্বস্তিতে, যন্ত্রণার্ত হয়ে ওঠে আমাদের স্নেহলালিত বিশ্বাসগুলির নিষ্করুণ নিহননে।* এই স্ফটিকস্বচ্ছ বুদ্ধিলোকের মধ্যে দৃষ্টিপাত করলে যতদূর চোখ যায় শুধু দ্বিপ্রাহরিক দীপ্তিই আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু এ অন্তহীন মরুদাহনের পশ্চাতে গভীর বিশ্বাসের যে ছায়ানীড়টুকু আছে রাসেল-মানসের সেই মূল্যজগতের সন্ধান প্রথম আমরা পাই ১৯০৩ সালে প্রকাশিত “Freeman’s Worship” প্রবন্ধে। যুক্তিযুগের ধর্মহীন মানুষের জন্য তিনি এখানে এক নতুন মূল্যবোধের সন্ধান দিয়েছেন—যা সমস্ত প্রাচীন মতাদর্শ থেকে ভিন্ন হয়েও তাঁর মতে মানুষকে অন্য এক পথে মুক্তি দিতে পারে এই দুঃখ ও যন্ত্রণাবোধ থেকে। নিঃশ্রেয়স সম্বন্ধে তাঁর এ যুগানুগ ধারণাই এই প্রবন্ধে পর্যালোচ্য।

পূর্বজীবনে গণিত, পদার্থ-বিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি বিজ্ঞানের সশ্রম ও সানুরাগ অধ্যয়ন করেছেন রাসেল। মধ্যবয়সে ইতিহাস রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির জ্ঞান তাঁর ভাণ্ডারকে করে তুলেছে ঋদ্ধতর। প্রবীণ অবস্থায় তত্ববিজ্ঞানের চর্চা ও স্বাভাবিক সুতীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী মনোভাব তাঁর দর্শনকে করে তুলেছে গোঁড়া অভিজ্ঞতাবাদী ও বস্তুবাদী। নবতিপর এই অনন্য দার্শনিক, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়ে রাস্তায় নেমেছেন, এবং পারমাণবিক অস্ত্রের আস্ফালনে মানবজাতি নিজেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারে এই সাবধানবাণীতে সোচ্চার হতে হতে শেষ নিঃশ্বাসটুকুও মানুষের প্রতি ভালোবাসায় আশঙ্কায় উদবেগে, বিতর্কে বিচারে ব্যয় করে গেছেন। ভাববাদী অধিবিদ্যা ও বুদ্ধিবাদী জ্ঞানবিদ্যার প্রতি তাঁর ব্যঙ্গোজ্জ্বল পরীবাদী (cynical) দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দৃঢ়-প্রোথিত। রক্ষণশীল নীতিশাস্ত্রের অনেক মূলনীতিই তাঁর কাছে যুক্তির পরীক্ষায় টেঁকেনি বলে স্থানবিশেষে অত্যন্ত মঙ্গলপ্রদ হলেও গ্রহণযোগ্য হয়নি। সর্বোপরি ঐতিহ্য হিসেবে খ্রিস্টধর্মের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা থাকলেও এর অনেক ভিত্তিস্থানীয় সত্যই তাঁর কাছে অবৈজ্ঞানিক ও যুগের অনুপযোগী মনে হওয়ায় তাঁর নিতান্ত আপন সদসৎ বিবেক কোনোদিনই এই পবিত্র বিশ্বাসগুলিতে কোনো আলম্বনীয় ভূমি খুঁজে পায়নি। সারাজীবন ধরে একটিমাত্র সাধনায় তাঁর স্থির-লক্ষ্য প্রয়াস—সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তিমাত্র নির্ভর হওয়ার সাধনা। এর জন্য তাঁকে বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কেননা মানুষের স্বাভাবিক যে আবেগিতা ও যুক্তিবিরোধী অনুভূতিপ্রবণতা—তার কথা জোর করে ভুলে গিয়ে তিনি সত্য সন্ধান করতে চেয়েছেন। ফলে আশ্রয় হিসেবে কোনো ঈশ্বরকে সামনে পাননি ”প্রমাণাভাবাৎ”। দৃশ্যজগতের অন্তরালে কোনো শুভ না থাকলে এবং মানবজীবনের ভগ্ন বৃত্তচাপগুলির অন্তে কোনো স্বর্গীয় বৃত্তের বা অতিমর্ত্য সান্ত্বনার আশা না থাকলে আমাদের চিন্তা ব্যথিত হয়, মানুষের এই দুর্ভোগ ও উপভোগকে নিষ্কারণ ভাবতে ভালো লাগে না—সুদ্ধু এই জন্য তিনি শূন্যে কোনো ঐশ্বরিক বিচারালয়ের কল্পনা করতে পারেননি। তাঁর চিরজাগ্রত যৌক্তিক বিবেক তাঁকে মানসিক তৃপ্তির জন্য সত্য-বিকৃতি ঘটাতে দেয়নি। আর তাই প্রথম থেকেই তিনি বুঝেছেন এ জীবনে স্বস্তিকর অনেক কিছুই তাঁকে ছাড়তে হবে সরল সত্য লাভের আশায়—যার মধ্যে প্রধান হল তাঁর আস্তিক্য। বৌদ্ধিক নির্লিপ্ততার এ কঠিন তপশ্চর্যায় প্রথম ধাক্কা খেলেন রাসেল নিছক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার অন্তিম নিষ্ফলতায়। কীভাবে মানুষের এ নিছক জ্ঞানপিপাসা শেষপর্যন্ত তাকে নৈরাশ্যের মধ্যে এনে ফেলে তার এক নিষ্ঠুর বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন তাঁর “Science and Values” প্রবন্ধে।

”পদার্থবিদ্যার যত উন্নতি হ’তে লাগল ততই ক্রমে ক্রমে বহির্বিশ্ব সম্পর্কে আমরা এতকাল যা জানতাম বলে মনে করে এসেছি—তার থেকে ক্রমে ক্রমে বিজ্ঞান আমাদের বঞ্চিত করতে থাকলো। বর্ণশব্দ, আলো-অন্ধকার, আকৃতি ও প্রকৃতি এর একটিও নাকি প্রকৃতপক্ষে—যে বহিঃপ্রকৃতিকে দেবীর আসনে বসিয়েছিলেন জগৎভক্ত আয়নীয় দার্শনিকেরা—তার নিজস্ব ধর্ম নয়। শেষপর্যন্ত দেখা গেল যে এই সমস্ত ধর্মই প্রিয় বস্তুজগতের কাছ থেকে প্রেমিক দ্রষ্টার মধ্যে চলে এল আর প্রিয় বস্তুটির বিশুদ্ধ স্বরূপ হিসেবে পড়ে রইল একটা শুষ্ক অস্থিময় কঙ্কাল মাত্র—শীতল এবং ভয়ঙ্কর—হয়তো বা শুধুই একটি প্রেতসত্তা।” এখানে রূপকের ভাষায় রাসেল যা বলতে চেয়েছেন তা হল আধুনিক পদার্থবিদ্যার সুদীর্ঘ জড়োপাসনার শূন্যময় ফলের কথা। নির্মোহদৃষ্টিতে যতই পদার্থবিদেরা তাদের পরমপ্রিয় বস্তুসত্তার প্রকৃতিকে জানতে চেয়েছেন ততই তাঁরা দেখেছেন যে Matter বলে যাকে নিয়ে আমরা এত মাতামাতি করি এবং অন্তত যার দ্রষ্টৃনিরপেক্ষ (objective) বাস্তব অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা এত নিঃসন্দিগ্ধ—শেষ পর্যন্ত তার প্রকৃতি অপ্রণিধেয়; তার অস্তিত্বের কোনো সন্তোষজনক যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একটা আলেয়ার মতো সে জ্ঞানপিপাসুর সামনে থেকে সরে যাচ্ছে একটি একটি করে তার সত্তার অংশগুলিকে দ্রষ্টার মনের (subject) সম্পত্তি করে দিয়ে। আমরা যতই ভাবি না কেন “Matter is solid” আসলে এ বিশ্বাসও অসহায় মানুষের প্রিয় কুসংস্কার। কেননা আজকের পদার্থবিদ বেশ জানেন—“it is a wave of probability undulating in nothingness”। হাইসেনবার্গের অনির্ণয়বাদ আমাদের জানাল যে বস্তুজগতের আদি উপাদান ইলেকট্রনের নৃত্যচ্ছন্দ অনিয়মিত। আর এই খামখেয়ালি তরঙ্গের আধার ইথার সম্পর্কেও অনস্তিত্ব অন্তত অস্তিত্বের সমান যুক্তিসহ। আর তাই শেষ পর্যন্ত সান্তায়ানার ভাষায় বলতে হয় যে বিজ্ঞানের অনেকখানিই জান্তব বিশ্বাস (animal faith) আর বাকিটুকু তার মনোমতো অ্যাবসট্রাকশান।

বিজ্ঞানের সমস্ত কীর্তিই ব্যর্থ হয়ে যায় যদি সে বস্তুবিশ্বে একটি একরূপতা না দেখাতে পারে, যদি সে প্রকৃতির কোনো বিশেষ বিভাগে জ্ঞাত তথ্যাবলি থেকে অজ্ঞাত ঘটনাবলি সম্পর্কে নিঃসংশয় ভবিষ্যদ্বাণী না করতে পারে। অথচ এই সুদীর্ঘ তপস্যার পর আজও তাকে প্রশ্ন করতে হয় ”কখনো কি এমন পরিস্থিতি আসে যাতে একগুচ্ছ জ্ঞাত ঘটনা থেকে আমরা কোনো ঘটনান্তর অনুমান করতে পারি পূর্ণ নিশ্চিতি অথবা অর্ধাধিক সম্ভাব্যতার সঙ্গে?”

যদি এ জিজ্ঞাসার উত্তর হত ইতিবাচক তাহলে বলা যেত যে অদৃষ্ট ঘটনাবলি সম্পর্কে আমাদের সব সামান্যীকরণই (যা আমরা কোনো প্রশ্ন না তুলেই করে থাকি হামেশাই) যুক্তিযুক্ত। আর যদি এর উত্তর হয় নেতিতে তাহলে আমাদের সমস্ত বিজ্ঞানই মধ্যযুগীয় কুসংস্কারগুলির মতো অন্ধ। এযাবৎ নৈয়ায়িকরা এ প্রশ্নটিকে অনেক তাত্বিক প্যাঁচে ফেলেছেন বটে, কিন্তু এর নগ্ন সোজাসুজিভাবে কোনো উত্তর এঁরা কোনোদিনই দিতে পারেননি। রাসেল নিজে বলেছেন—এর কোনো উত্তর তাঁর জানা নেই, অথচ—

“Until an answer is forthcoming one way or other…our faith in the external world must be merely animal faith,”

অথচ অন্ধবিশ্বাস বর্জনের সংকল্পে যিনি অটল তাঁর কাছে শুধুমাত্র তাঁর সযত্ন-গঠিত বিজ্ঞানের ইমারতের ভিত্তি বলেই কোনো অপ্রামাণ্য বিশ্বাস গৃহীত হতে পারে না। আর সেজন্যই আজকের তাবৎ পদার্থবিদকে বলতে হয়—নাঃ, পারমার্থিকতঃ পদার্থ বলে কিছু নেই। সবই নেহাত আকস্মিকতা। মনোবিজ্ঞানী স্বীকার করেন—মন বলে কিছু নেই। আছে কেবল পরিবর্তনমান মানস অবস্থা, যাদের অলাতচক্রবৎ ধারা আমাদের মনে একটা ঐকিক অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের অধ্যাস জাগায়। এভাবে, শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান আত্মঘাতী।

আজ বিজ্ঞানের দ্বারা অতিরিক্ত স্পষ্টীকৃত এ মরুময় জগৎচিত্র দেখে আতঙ্কিত মানুষ নিঃসহায় চোখ ঢেকে বলছে ক্যামুর আর্তনাদী পতিত সত্তার মতো—

”সত্য, আলোর মতো, আমাদের চোখ ঝলসে অন্ধ করে দেয়। অপরপক্ষে মিথ্যার মনোরম গোধূলির আধো-অন্ধকার সমস্ত বস্তুকেই সুন্দরতর করে তোলে।”

কিন্তু এ সুবিধাবাদী অনৃতানুরাগ কখনোই রাসেলের নয়। কোনো স্থিরবুদ্ধি সত্য-সন্ধানীই একে মানতে পারবেন না। যতই অনন্যোপায় হোন না কেন। এই যুক্তিলোকের শূন্যতা, বিজ্ঞানপ্রদীপিত ব্রহ্মাণ্ডের এ অন্তিম উদ্দেশ্যহীনতা, জড়প্রকৃতির এ অসহ নিশ্চেতনার অনস্বীকার্য সত্যের সঙ্গে অবিরোধী কোনো মুক্তির উপায় তাঁকে খুঁজতে হবে।

মানুষ হিসেবে রাসেলকে স্বপ্ন দেখতেই হবে। তবু যতদূর সম্ভব সেই স্বপ্নকে তিনি করতে চান জাগ্রদবস্থার অপরিপন্থী—যাতে স্বপ্নভঙ্গে নৈরাশ্যের আঘাত তাঁকে পঙ্গু করে না ফেলে। আর ”মুক্তমানবের উপাসনা” প্রবন্ধে এই স্বপ্ননির্মাণের কাজেই তাঁকে আমরা নিরত দেখি।

দুই

“There is a stark joy in the unflinching perception of our true place in the world, and a more vivid drama than any that is possible to those who hide behind the enclosing walls of myth.”–Dreams and Facts

কোনো মরণোত্তর অনন্ত জীবনের সুখকর মিথ্যা দিয়ে রাসেলের মোক্ষবাদ তৈরি নয়। তিনি জানেন মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত ও শক্তিহীন। তার ওপর ও তার সমগ্র প্রবংশের ওপর মন্থর অথচ নিশ্চিত মরণ নেমে আসে নীরন্ধ্র নিষ্করুণতায়। তার সমস্ত ভালোমন্দ বিচারের প্রতি অন্ধ, ধ্বংসে অবলীল, সর্বশক্তিমান জড়প্রকৃতি দিবারাত্র তার ওপরে নর্তমান। মানব সন্তানকে আজ হারাতে হয় প্রিয়জনকে, কাল নিজেকে। এর মধ্যে, যতক্ষণ না সেই অমোঘ দণ্ডাজ্ঞা আসে ততক্ষণ সে জিইয়ে রাখতে পারে তার শুভবোধ ও মহৎচিন্তাকে—যা তার ক্ষুদ্র আয়ুষ্কালটিকে শ্রেষ্ঠ সার্থকতা দেয়; অনিবার্য অদৃষ্টের দাসত্ব না করে সে যদি তার স্বনির্মিত আদর্শবেদিকায় তার উপাসনার অর্ঘ্য সাজায়, জড় জগতের এই অনিয়ত আকস্মিকতার কথা জেনে তার ওপর তার শুভাশুভবিচার বা আদর্শগুলিকে আরোপ না ক’রে আবার তার শুভহীনতাকে নিন্দাও না করে, যদি সে তার চিন্তাকে ব্যাপৃত রাখে মানুষের সাধারণ মঙ্গলচিন্তায়—তা হলেই সে জীবন্মুক্ত। মর্ত্যের ওপর কোনো ঠুনকো ঔচিত্যবুদ্ধিজাত মিথ্যা স্বর্গের ধারণা আরোপ না করেই যদি সে তার চিন্তাজগতে একটা আদর্শলোক নির্মাণ করে পৌঁছোতে পারে এক ভালোবাসার জগতে; এ নিষ্করুণ জগতে তার নিজের ক্ষুদ্রতা অনুভব করেও এবং পরিণতিতে তার সমস্ত আশানিরাশা সহ তার নিশ্চিত অবলুপ্তির কথা মনে রেখেও যদি সে সাহসীর মতো যেমন-তেমন-ভাবে এই বাস্তবের মুখোমুখি হতে পারে—একটা অনাত্ম্য দৃষ্টিকোণ নিয়ে—সামনে রেখে এক নতুন ধ্যানচিত্র—যার অশোককিরণে নিজ্ঞাত হয়ে তার প্রাত্যহিক প্রতিটি কর্ম হয়ে ওঠে প্রেমসুন্দর—তবেই সে হয় মুক্ত। সে মুক্ত তার চিন্তায় ও আদর্শ-অভীপ্সায়, তার এ সীমিত অস্তিত্বের পার্থিব বন্ধন থেকে, মুক্ত এই ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় কণাতুল্য ছোট্ট গ্রহটির থেকে—যার পরে তার বিন্দুসম দেহটি, নির্বল, হাতড়ে চলেছে। এমনকি এক অর্থে সে মুক্ত মৃত্যুর করালতা থেকেও—অন্তত যতদিন বাঁচে। কেননা মহদ্ভয় কালকে সে জয় করেছে, নিরাকাঙ্ক্ষতার দ্বারা তার কামনার নদী এত সমুদ্র-উদার হয়ে গেছে যে কোনো উপকূলকে সে আর ভয় করে না। এইভাবে একদিকে আমাদের ঈপ্সার সংকোচ ও সমর্পণে ও অন্যদিকে অবাধ চিন্তার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানসাধক আবার ফিরে পাবে বিচার-পূত তার পুরাতন মূল্যবোধগুলিকে। তবে এবার আর সে ভুল করবে না মূল্যজগৎ ও বস্তুজগতের মধ্যে কোনো ঐক্য খুঁজে। বাসনাভারাক্রান্ত চিন্তার কাছে যে শিব-সুন্দরের মঙ্গললোককে মনে হয়েছিল বাস্তববিরোধী-নিরাসক্ত বুদ্ধি, তাকেই আবার ফিরে পাবে অনীপ্সিত ধনের মতো। কেননা রাসেলের মতে ঘটনার পরে আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলির অন্যায় আরোপ জড়প্রকৃতি সহ্য করে না। রূঢ় আঘাতে তাকে চূর্ণ করে, কিন্তু তাকে জানতে গিয়ে যদি আমরা ভালোমন্দ বিচারকে একদম সরিয়ে রাখি—তাহলে সে কৃপা করে আমাদের মূল্যবোধগুলিকে সহ্য করে যায়।

রাসেল কল্পনা করেছেন এক স্যাডিস্টিক ক্রীড়াময় ঈশ্বরের, যিনি ভালোমন্দহীন এই অনুপাস্য জড়সৃষ্টির মধ্যে মানুষের মতো একটি উপাসনাপ্রবণ প্রাণী সৃষ্টি করেছেন শুধু তার ইচ্ছেগুলিকে, স্বপ্নগুলিকে ঔচিত্যবোধগুলিকে বাড়তে দিয়ে—বাস্তবের নির্দয় আঘাতে তাদের শোচনীয় বিচূর্ণনে দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। এই ন্যায়-শুভ-সুন্দর ইত্যাদির প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন বাস্তবজগৎকে জয় করা যাবে শুধু তার অনিবার্যতা মেনে নিয়ে এবং তারই মধ্যে মানব-প্রেম ও উচ্চভাবনার মধ্যে দিয়ে, সে আমাদের চিন্তা ও আবেগের যেটুকু স্বাধীনতা মঞ্জুর করেছে, তার শ্রেষ্ঠ উপযোগ ঘটিয়ে।

রাসেলের ভাষায় তাই পরমপুরুষার্থ হল আমাদের সহমরণশীলদের (fellow-mortals) এই মৃত্যুময় পথযাত্রায় যতদূর সম্ভব সাহায্য করা, তাদের ব্যর্থতায় সান্ত্বনা দেওয়া, দুঃখে সহানুভূতি দেওয়া এবং এইভাবে তাদের মরণাভিযানের সংক্ষিপ্ত পথটিকে সাধ্যমতো আলোকিত ও কঙ্করমুক্ত করা। বাস্তবের নিষ্ঠুরতাকে স্বীকার করে নেয় যে অকুণ্ঠ প্রেমের আদর্শ—তার উপাসনাই রাসেলের মতে মুক্তমানবের একমাত্র উপাসনা।*

বিজ্ঞান আমাদের বারবার জানিয়ে দেয় যে প্রকৃতির মহান শক্তির কাছে মানুষের জীবন, জিজ্ঞাসা ও আশানিরাশা অত্যন্ত তুচ্ছ জিনিস। বাইরে মানুষ আসলে এই জড়জগতের দাস; তাকে ”কাল”, ”অদৃষ্ট” এবং ”মৃত্যু”র কাছে নতজানু হতেই হবে শেষ পর্যন্ত—কেননা তার সমস্ত ঈপ্সিত দ্রব্য এমনকি সে নিজেও এদের গ্রাসগ্রন্ত। কিন্তু বাইরে—কায়িকভাবে সে এত বদ্ধ হলেও অন্তরে সে মুক্ত, তার কল্পনায় সে অপাপবিদ্ধ। বাস্তব হোক না শুষ্ক, অসুন্দর এবং অশিব। সে তার মহৎকল্পনার আলোকে তার সীমিত গণ্ডির মধ্যে কি তাকে সুন্দর করে তুলতে পারে না?

“When without the bitterness of impotent rebellion, we have learnt both to resign ourselves to the outward rule of Fate and recognize that the non-human world is unworthy of our worship, it becomes possible at last to transform and refashion the unconscious universe, so to transmute it in the crucible of imagination, that a new image of shining gold replaces the old idol of clay.”

আবার শুধুমাত্র ব্রহ্মাণ্ডের নিরাবেগ ঐশ্বর্যের (Passionless Splendour) চিন্তাও আমাদের এনে দিতে পারে নির্বাণ। এবং তখন আমাদের আর দুঃখের সঙ্গে ধার্মিকদের মতো এই অনিত্য-অসুখ-দুর্দশাময় জগতের কাছে অনিবার্য আত্মসমর্পণ করতে হয় না, আমরা তার সঙ্গে নিজের আমি-গুটিয়ে-নেওয়া সত্তাকে একাকার করে তাকে আত্মস্থ করে ফেলি। এর ফলে বন্ধ হয় স্বার্থসংঘাত, অস্থায়ী ইষ্টের জন্য উদগ্র কামনা; তার পরিবর্তে জন্মায় চিরন্তনের জন্য এক শুদ্ধতর পিপাসা। এই—“to burn with passion for eternal things”-ই তাঁর মতে মানুষের আসল অপবর্গ। আর এ অপবর্গের অন্যতম উপায় হল “Contemplation of fate”। কারণ দুর্বার নিয়তিই যদি আমাদের ভাবনাধীন হয় তবে কালাগ্নি আমাদের মধ্যে আর কোনো দাহন সৃষ্টি করতে পারে না।

তিন

“A truly scientific philosophy will be more humble, more piecemeal, more arduous, offering less glitter ofoutward mirage to flatter fallacious hopes, but moreindifferent to fate, and more capable of accepting the world without the tyrannous imposition of our human and temporary demands.”

––Mysticism and Logic

আমাদের যুগে যা সবচেয়ে বেদনাদায়ক তা হল যে এযুগে যারা নিশ্চিন্ত বোধ করে তারা আকাট নির্বোধ আর যাদের বিন্দুমাত্র বোধশক্তি বা চিন্তাশক্তি আছে তারাই সন্দেহাকুল ও সংকল্পহীন।* কিন্তু রাসেলের ধারণা এই ধরনের একটা উভয়সঙ্কট অনিবার্য নয়। তাঁর মতে মানুষের যুক্তিনির্ভরতা বজায় রেখেই আমরা এক সুন্দর শান্তিময় নিশ্চিন্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারি। এবং

“Such a world is possible, it waits only for men to wish to create it.”

কিন্তু কী করে তা সম্ভব—সে সম্পর্কে কি রাসেল যথেষ্ট স্পষ্ট এবং স্ববিরোধমুক্ত?

এই অনুচ্ছেদে আমরা তাই আলোচনা করব। রাসেলীয় অপবর্গের ধারণায় যে ক’টি আপাতবিরোধ দেখা যায় একে একে সেগুলি বিচার করে তার সমাধানকল্পে রাসেলের বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য তা হবে আমাদের বিচার্য বিষয়।

তাঁর চিন্তায় যে প্রথম বিরোধ আমাদের চোখে পড়ে তা হল একই সঙ্গে বিজ্ঞানের যথেষ্টতা মানা ও না মানা। প্রাথমিকভাবে তিনি স্বীকার করেন নির্দ্বিধায় যে শুধুমাত্র বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের কখনও চরিতার্থতা দেবে না যদি তার সঙ্গে যুক্ত না হয় জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে একটা সঠিক ধারণা বা wisdom যেটা কখনোই বিজ্ঞানচর্চা থেকে আসতে পারে না। কাজেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমাদের মূল্যবোধ দেবে না—তাদের কাছ থেকে তা আশা করাই অন্যায়—এবিষয়ে অন্তত রাসেল বিজ্ঞানবিরাগী টলসটয়ের সঙ্গে একমত।* শুধু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ভিত্তিতে কোনো সমাজ হলে তা হবে অসম্পূর্ণ এবং হয়তো বা অশুভ। কেননা মানুষের বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসাই তার একমাত্র প্রবৃত্তি নয়—এর সম্পর্কে রাসেল স্পষ্টই বলেছেন:

“As ingredients they are good; as the sole driving force they are likely to be disastrous.”

অর্থাৎ মানবপ্রকৃতির শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক দিকগুলিকে একচ্ছত্র আধিপত্য দিলে তারা মানুষের আবেগ ও অনুভূতি ইত্যাদিকে নষ্ট করে তাকে যান্ত্রিক করে তুলবে—আর এ বিপর্যয় হবে মারাত্মক, কেননা এক দুর্বল মুহূর্তে জ্ঞানসাধক রাসেল নিজেই স্বীকার করেছেন:

“Even more important than knowledge is the life of emotions.”

একদিকে এই ঔদার্য থাকলে কী হবে অন্যদিকে বারবার রাসেল বলেছেন মানুষকে বিজ্ঞান-মাত্রনির্ভর হতে, শুধু যুক্তি ছাড়া আর কিছুকে না মানতে। যদি বৈজ্ঞানিক যুক্তি না পেলে কোনো কিছুকে মানা আমাদের অনুচিত হয়, অথচ যদি বিজ্ঞান আমাদের আদর্শের সন্ধান না দেয় তা হলে আদর্শ না মানাই কি আমাদের কর্তব্য নয়? অথচ রাসেল একই সঙ্গে বজায় রাখতে চান তাঁর যুক্তিভক্তি ও আদর্শভক্তি, এমনকি যুক্তির দ্বারা আদর্শকে পাওয়া যায় না জেনেও। এই সমস্যার সমাধান হত যদি রাসেল এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অভাবপূরক অন্য কিছুর সন্ধান দিতে পারতেন।

কিন্তু তাও তিনি পারেন না। জিনস বা এডিংটন যেভাবে ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছেন বলে মনে করেন তার সম্পর্কে তাঁর ক্ষমাহীন বিদ্রূপ:

“The poor physicist, appalled at the desert that their formulae have revealed, call upon God to give them comfort…and the answer that the physicist think they hear to their cry is only the frightened beating of their own hearts.”

শুধু নিঃসহায় হয়ে পড়েছেন বলে আবার ভাবাবেগের ভূমিতে নেমে আসবেন, সে পাত্র রাসেল নন।

সেদিক দিয়েও তিনি সংস্কারবর্জনের সংস্কারে বদ্ধ। Kant বা Spencer-এর মতো স্পষ্টভাবে যুক্তিরাজ্য ও বিশ্বাসের রাজ্যে স্পষ্ট সীমারেখাও তিনি টানতে পারছেন না। এবং বারবার মেনে নিয়েও তিনি বিজ্ঞানের বা সত্যসন্ধানের অ-পর্যাপ্ততা স্বীকার করতে পারেন না। ঘুরে ফিরে বলেন:

“Knowledge, if it is wide and intimate, brings with it a realization of distant times and places, an awareness that the individual is not omnipotent or all-important, and a perspective in which values are seen more clearly.”

এই সংঘাতের সমাধান করতে গেলে রাসেলকে ঝুঁকে পড়তে হয় তাঁর বিরুদ্ধবাদী দার্শনিক Spinoza-র intellectual love of God-এর প্রায়-সমগোত্রীয় আদর্শের দিকে—যার ফলে দেখা দেয় নতুন এক আত্মবিরোধ।

তৃতীয় স্ববিরোধ রয়েছে তাঁর সৃষ্টিতত্ব ও নীতিতত্বে। সৃষ্টিতত্বের বর্ণনায় তিনি দ্বৈতবাদী: মানুষ ও জড়প্রকৃতির মৌলিক পার্থক্য স্বীকার করেন। এবং মনে করেন যে অচেতন, ও যদৃচ্ছাক্রমে নৃত্যন্তী প্রকৃতির বুকে সহসা এই আশাভরা মানুষের উৎপত্তি একটা আকস্মিক ঘটনা। এইভাবে একদিকে বাস্তবের শক্তিমত্ততা ও অন্ধতা অন্যদিকে মানুষের দুর্বলতা ও চক্ষুষ্মানতা তাঁর দর্শনে ঘটনা ও আদর্শের দ্বন্দ্বকে আরো ঘনিয়ে তুলেছে। অথচ শেষ পর্যন্ত তিনি এ দুয়ের এক আশ্চর্য সহাবস্থানকে সম্ভব মনে করেছেন ও এই নীতিবর্জিত বস্তুলোকেই মানুষের আদর্শগুলিকে স্থান করে দিতে চেয়েছেন।

“Amid such a world, if anywhere, our ideals henceforward must find a home.”

উত্তর-শিল্পবিপ্লব বিজ্ঞানপ্রভাবিত সমাজে যেসব আদর্শবাদী কবিরা এই দোটানায় পড়ে, বৈজ্ঞানিক সত্যের ধ্রৌব্যে বিশ্বাস রেখে জগৎকে পাপী ও অকরুণ জেনে বাস্তবের বিরুদ্ধে প্রমিথীয় আস্ফালনে ফেটে পড়েছিলেন, জগতের প্রতি তাঁদের সেই সঘৃণ মনোভাবও রাসেলের পছন্দ নয়। কেননা তাঁর মতে এ ধরনের জগৎবিরাগও বন্ধনস্বরূপ। কিন্তু শুধুমাত্র নির্বাসনা হয়ে তথ্যসন্ধান করার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বা জীবনে মূল্যবোধের সঞ্চার হবে কী উপায়ে? এই সদর্থক মূল্যই বা কী—যদি তা না হয় কোনো পারমার্থিক ন্যায়দণ্ডে বিশ্বাস বা ঐশ্বরিক করুণায় আস্থা?—রাসেল উত্তরে বলবেন যে এ হল “respect for what is best in man.” (”মানুষের মাঝেই যা সর্বোত্তম”) কিন্তু শুধুমাত্র এ দিয়ে কি মানুষবেঁচে থাকতে পারে? আর এইটুকু মূল্যবোধই বা কোন যুক্তিপরায়ণতা আমাদের দেবে? কোথা থেকে আসবে সেই উত্তম-অধমের বিবেচক শ্রেয়োবোধ যার দ্বারা মানুষের সবটুকুই নচ্ছার নোংরামি নয় এই সবিচার প্রত্যয় জাগ্রত হবে? এ প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর রাসেল কোথাও দেননি। মনে হয় এ ব্যাপারে রাসেলের উপলব্ধিই সম্বল আর তাই তিনি এখানে নীরব। হয়তো এই কারণেই পরবর্তীকালে Freeman’s Worship-এ প্রচারিত এই ধোঁয়াটে উপলব্ধিনির্ভর আদর্শপূজাতে তিনি আস্থা হারান। তথাচ তিনি শেষপর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে আধুনিক বিজ্ঞানের সংশয়িতা যাঁদের সবরকম ধর্মবিশ্বাস থেকে চ্যুত করেছে তাঁদের পক্ষে দুঃসহ নিরাশার মুহূর্তে এই রকম একটা মোক্ষচিন্তা, একটা আত্মিক পরাজয় (inward defeat) থেকে তাদের বাঁচাতে পারে।

তবে শেষপর্যন্ত এই মুক্তিপথ সাধারণ্যের পক্ষে কতটা তৃপ্তিদায়ক হতে পারে সে নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। ”এ পর্যন্ত কোনো মিথ্যা দিয়ে নিজেকে সুখী করিনি”—এ গর্ব প্রখরবিবেক রাসেলকে সারা জীবন ধরে যে পরিতৃপ্তি দেয়—এবং শুধুমাত্র ”মানুষের দুঃখ কিছুটা লাঘব করেছি” এই সন্তোষ মানবদরদী রাসেলের জীবনে যেভাবে আর সব মহৎ মূল্যের অভাব পুষিয়ে নেয়—তেমন কজনের ক্ষেত্রে সম্ভব? ক’জন তাঁর মতো যুক্তিপরায়ণতার শুদ্ধ আবেগের ‘পরে বেঁচে থাকতে পারে, এবং তজ্জন্য সংশয়দীর্ণতাকে “arduous uncertanity” বা “stark joy” বলে মহিমান্বিত বোধ করে!

এই প্রয়োগগত অসুবিধে আমাদের রাসেলীয় চিন্তার শেষ তাত্বিক অসংগতিতে পৌঁছে দেয়। তিনি নিজেই বলেছেন যে অধিকাংশ মানুষই তাদের ইচ্ছানুযায়ী বিশ্বাস তৈরি করে। এবং আমাদের বিশ্বাসগুলি হল আসলে এক ধরনের দিবাস্বপ্ন, যা অতিরঞ্জিত ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যানুযায়ী আমাদের বাসনাসঙ্ঘের চিত্রায়িত পরিপূরণ। বরং বাস্তব জগতের রূঢ় আঘাতে এই মায়াময় বিশ্বাসের জগতে দুয়েকটি প্রমার প্রবেশই আকস্মিক। যদি তাই হয় তাহলে হঠাৎ একদিন এই স্বপ্নপ্রিয় মানুষ জাগ্রৎস্বভাব ও যুক্তিবাদী হয়ে উঠবে—এই ধরনের চিন্তাও কি যা ঘটলে ভালো হয় তা দিয়ে যা বস্তুত ঘটবে তা নির্ধারণ করার দৃষ্টান্ত নয়?

এর উত্তরে অবশ্য রাসেল বলবেন যে তিনি দেখিয়েছেন যে বিজ্ঞানে বিশ্বাস ও মূল্যবোধের মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্বন্ধ না থাকলেও তারা পরস্পর বিরোধীও নয়। আর তাই আমাদের জ্ঞানলোকে যুক্তিবাদিতাকে বজায় রেখেও আবেগ ও কর্মজগতে শুভৈষণাকে প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব নয়। আর যা অসম্ভব নয় তা এযাবৎ ঘটেনি বলে ভবিষ্যতেও ঘটবে না—এ যেমন ভাবা যেতে পারে তেমনি তা এযাবৎ না ঘটলেও ভবিষ্যতে ঘটবে—এও ভাবা যেতে পারে। কেননা এক্ষেত্রে “hope for the future is at least as rational as fear”।

চার

”রঙচঙে সার্সির মধ্যে দিয়ে রকমারি আলো, ধূপদীপ স্তবস্তুতি—ওসবে আমি নেই। শুনতে শুনতে কত কী ভাব আসে—মনে হয় ওরা চক্রান্ত ক’রে আমাকে দিয়ে আস্তিক্যের তরফে অনেক কিছু বলিয়ে নিতে চায় যা বলতে আমার বুদ্ধির মানা।”—[তীর্থংকর-গ্রন্থে দিলীপ রায় কর্তৃক বিধৃত রাসেলের উক্তি রবীন্দ্রনাথের প্রতি:]

রাসেলকে আমরা শ্রদ্ধা না করে পারি না তাঁর এই অগুপ্ত স্বতোবিরোধের জন্যই। তাঁর মধ্যে রয়েছে মিসটিসিজম ও লজিকের সে চিরন্তন দোটানা যাকে তিনি নিজেই আদর্শ দার্শনিকের গুণ বলে মনে করেন। একদিকে তাঁর মিসটিক প্রবণতা তাঁকে স্বপ্নপ্রিয় ও ভালোবাসার পিপাসু এবং দিৎসু করে তুলেছে, অন্য দিকে তাঁর কঠোর যুক্তিবাদ—যাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ”বুদ্ধির গুরুবাদ”—তাঁকে করে রেখেছে সন্ন্যাসীর মতো সংযমী। প্রাণপণে বিশ্বাস করতে চেয়েও তিনি অনেক কিছুতে বিশ্বাস করতে পারেননি গোঁড়ামি বর্জনের একটা কৃচ্ছ্রতর গোঁড়ামিবশে। এর ফলে এমনকি নিজের জীবনেও রাসেল স্বোদ্ভাবিত রাস্তায় মুক্তিলাভ করেননি—করেছেন ভিন্নতর উপায়ে—নারী প্রেমের পথে।

আর তাই জীবনের অন্তিমলগ্নে যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর শুষ্ক অথচ অতিশ্রদ্ধেয় (cold but lofty) জ্ঞানলোক পরিত্যাগ করে প্রেমের নিবিড় স্বর্গে তিনি উপনীত হয়েছেন—ততক্ষণ তাঁকে আক্ষেপ করতে হয়েছে—

”দীর্ঘবর্ষগুলি গেল আমি খুঁজে চলি শান্তি, একা!

পেয়েছি সুতীব্র সুখ, একাকীত্ব, উন্মাদনা এবং যন্ত্রণা, তবু

শান্তির মেলেনি আজো দেখা।”

[আত্মজীবনীর উৎসর্গপত্র]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *