৩. পান্থজনের সখ্য : আয়ুব-সাহিত্যের আরেক আয়াম

পান্থজনের সখ্য : আয়ুব-সাহিত্যের আরেক আয়াম

চিরসখা হে, ছেড়ো না

‘…জানতে যে চায় কিসের গুণে যিশু

প্রাণ পুনরায় জাগিয়েছিলেন শবে,

তার কপোল ও আমার অধর ছুঁয়ো—

চুম্বনে, সব সহজ সরল হবে’

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অনূদিত এই কবিতাটি জালালউদ্দিন রুমির রচনা। বহু বছর আগে পড়েছিলাম (হয়তো স্মৃতি সামান্য হেরফের করেছে!) ইশকুলের ছাত্র হিশেবে, বুঝিনি। অনেক বন্ধুত্ব গড়া ভাঙার মধ্যে দিয়ে, বন্ধুত্ব ও প্রেমের বিষয়ে নানান প্রাচীন ও আধুনিক, পাশ্চাত্য ও ভারতীয়, সাহিত্যিক ও দার্শনিক, দেহময় ও শব্দময় টেকসট পড়েও—আজও ঠিক ঠিক যে বুঝি তা নয়। তবে শরীরী মানুষ-দুজনের ভালোবাসার মধ্যেই পাওয়া যাবে দিব্য প্রেরণা বা ঐশী শক্তির মৃতসঞ্জীবনী সামর্থ্যের চাবিকাঠি—এ জাতীয় কোনো বিশ্বাসই যে রুমি আমাদের মধ্যে সংক্রামিত করার চেষ্টা করছেন তা টের পাই। পশ্চিমের নকলে প্রেম ও সখ্যের মধ্যে এক প্রগাঢ় পার্থক্য গড়ে তুলে আমরা অবশ্য এই মৌলিক বন্ধুত্ব বন্ধনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে খুবই বিভ্রান্ত ও বিমূঢ় হয়ে বসে আছি। এই নিবন্ধে চেষ্টা করছি (লিঙ্গভেদ-নিরপেক্ষ) ভালোবাসার মৈত্রী, সখ্য, সৌহার্দ্যের দিকটি নিয়েই মূলত কথা বলবার।

১২০৭ খ্রিস্টাব্দে খোরাসান প্রদেশে (আধুনিক আফগানিস্থানে) জন্মে জালালউদ্দিন রুমি পারসিক মরমিয়া সুফি দার্শনিকদের মধ্যে অনন্য খ্যাতি ও মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি ও জরথুস্ট্রীয় সম্প্রদায় নির্বিশেষে গভীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন—মুখ্যত তাঁর পাণ্ডিত্য ও কাব্যপ্রতিভার সুবাদে।

ইসলাম ধর্মাচার্য পিতার সঙ্গে বাল্যে কৈশোরে বাগদাদ,মক্কা, দামাস্কাস, প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে বাস করে শেষ পর্যন্ত পশ্চিম তুর্কির ‘কোন্যা’ (Konya) নামক স্থানে এসে রুমি বসবাস ও সুফি ধর্মদেশনার কাজ করতে থাকেন।

সুফি সাধকদের জীবনে গভীর বন্ধুত্ব স্থাপন ও তাদৃশ একজন না একজন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে একত্রে বসবাস করার প্রচলন প্রাচীন কাল থেকেই ছিল। রুমির জীবনে সে-রকম একজন সখা রূপে প্রথমে এসেছিলেন তাবিজ শহর থেকে আগত শামস-আদ-দিন। কিন্তু তিন বছর এই—অন্যান্য রুমি-অনুরাগীদের ঈর্ষাপাত্র—শামস-আদ-দিন কে ‘গতি, ভর্তা, প্রভুঃ, সাক্ষী, নিবাসঃ, শরণং, সুহৃৎ’ মেনে একই গৃহে তাঁর সঙ্গে বাস করার পর সহসা একদিন রুমির জীবনে দুর্লগ্ন এল। কোনো অজানা কারণে ১২৪৭ খ্রিস্টাব্দে হঠাৎ একদিন শামস-আদ-দিন উধাও হয়ে গেলেন। বন্ধুর বিরহসন্তপ্ত রুমি প্রায় তিরিশ হাজার স্তবকে রচনা করলেন তাব্রিজবাসী শামসের জন্য গীতিকবিতাবলী।

অতঃপর তাঁর সখ্য হয়েছিল হাসাম-উদ-দিন ছেলেবির সঙ্গে। এই বন্ধুত্বের ভাবোচ্ছ্বাস ও সখ্যভক্তির রসাস্বাদ থেকেই উৎসারিত হল তাঁর বিশ্ববিশ্রুত মরমিয়া মহাকাব্য মসনবী। আজও সুফি পারস্য সাহিত্যে এই কাব্যের প্রভাব ইংরেজিতে শেকসপিয়রের প্রভাবের সঙ্গে তুলনীয়।

বন্ধু খোঁজা, বন্ধু পাওয়া, বন্ধুর ছেড়ে যাওয়া, বন্ধুর বিরহের মধ্যে দিয়ে মানুষের অন্তরতম চিরসখার বিরহমিলনের আস্বাদ লাভ করা—এইসব গূঢ়তত্ব রুমির কবিতায় যেভাবে কালজয়ী অভিব্যক্তি পেয়েছে তা আবু সয়ীদ আয়ুবের অজানা ছিল এমন হতে পারে না।

কোয়ান্টাম ফিজিক্স থেকে হ্বাইটহেডের দর্শন অবধি অবাধ বিচরণশীল এই বিশ্বচিন্তাপথিক বাংলা শেখার অনেক আগে ফার্সি শিখে ফার্সি কবিতার রসে নিমজ্জিত ছিলেন। জীবনের শেষ দিকে ফিরে তাকিয়ে নিজের বৌদ্ধিক আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে তিনি সুরেন গোস্বামী, হুমায়ুন কবীর, কালিদাস ভট্টাচার্য, অম্লান দত্ত, শিবনারায়ণ রায়,—এইসব বন্ধুর কথা এবং এঁদের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের সখ্যের কথা আপ্লুতচিত্তে স্মরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সাধনায়, গানে ও কবিতায় কোনো এক অচেনা চিরসখার সন্ধান বিষয়ে তিনি বার বার লিখেছেন। কিন্তু সাক্ষাৎভাবে একটি বিমূর্ত ধারণা হিসেবে ‘বন্ধুত্ব’ বা ‘সখ্য’—কী? সখ্য বা বন্ধুত্ব আদৌ সম্ভব কিনা দুজন মানুষের মধ্যে এ নিয়ে বিশ্লেষণী দার্শনিক রচনাতে তিনি কখনো হাত দিয়েছিলেন বলে জানি না। তবু বন্ধুত্ব ব্যাপারটি নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে দার্শনিক বিবেচনা আয়ুবের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল বলে অনুমান করাটা মোটেই কষ্টকল্পনা হবে না। আজ তাঁর দর্শনচিন্তা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে, তাই আমি বন্ধুত্ব বা সখ্য বিষয়েই তন্নিষ্ঠভাবে ভাবব ঠিক করেছি। মনস্তাত্বিক বা ঐতিহাসিক ভাবে তাঁর ওপর রবীন্দ্রনাথের বা রুমির প্রভাব কতখানি ছিল সে গবেষণা অন্য যোগ্যতর গবেষক করতে পারেন। আমার এখানে সীমিত উদ্দেশ্য: ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শনে বন্ধুত্ব বিষয়ে যে গভীরতম সমস্যাগুলি তোলা হয়েছে তার দুয়েকটির দিকে ইঙ্গিত করে আমার নিজের ভাবনায় সখ্য-সম্বন্ধের অসম্ভবতা এবং অনিবার্যতা—যুগপৎ impossibility এবংnecessity-র যে বিরোধাভাস ওঠে তার কথা আলোচনা করা। সমাপ্তিতে আয়ুবের চিন্তায় গালিবের ‘নারীপ্রেম ও ঈশ্বর ভাবনা’ থেকে এই ‘দ্বিতীয় আত্মা’র সঙ্গে সহিত-ত্ব বা সাহিত্যের অনিবার্যতা এবং অসম্ভবতা কীভাবে খেলা করেছে তার দিকে একটু হাতছানি দিয়ে উপসংহার করতে চাই। আয়ুব যদি বন্ধুত্ব নিয়ে আলাদা করে দার্শনিক আলোচনা করতেন তাহলে কীরকম হত এটাই ভাবার চেষ্টা করছি। গালিবের ভাষায়—’য়ুঁ হোতা তো ক্যা হোতা?’

২. ‘একাকী ন রমতে, স দ্বিতীয়ম ঐচ্ছৎ’

‘বন্ধু’ এবং ‘সখা’ দুটিই ঋগবেদের শব্দ। কিন্তু বেদে ‘বন্ধু’ মানে ঠিক বাংলায় যাকে বন্ধু বলে তা নয়। যদিও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত সেই অর্থটি। একধরনের মিল, সারূপ্য, এবং বন্ধন বা সাযুজ্যসম্পর্ক হল ‘বন্ধু’ শব্দের বৈদিক মানে। ক্রান্তদর্শী ঋষিরা নাকি সতের বন্ধু খুঁজে পেয়েছিলেন অসতের মধ্যে (১০.১২৯) এই রহস্যময় উক্তি সায়নাচার্যকেও ভাবিয়েছে। আদি কামনার প্রসঙ্গেই নাসদীয় সূক্ত বলেছে এই সৎ অসতের ‘বন্ধুতার কথা’।

‘সখা’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে বার বার ঋগবেদের (১০.৭১) বিখ্যাত জ্ঞানসূক্তের মধ্যে। ‘জ্ঞান’ এই সূক্তের দেবতা হলেও এর মুখ্য প্রতিপাদ্য হল ভাষা বা বাক-এর উৎপত্তি এবং পরস্পরের ভাব ও ভালোবাসা বিনিময়ে বাক-এর অপরিহার্যতা। প্রেম থেকেই এল শব্দ দিয়ে নাম দেবার আগ্রহ। জিনিসকে, মানুষকে, তার নাম ধরে ডাকার প্রেরণা। তাই প্রেমহীন শব্দপ্রয়োগ ছিন্নমূল, সখ্যহীন বাক্য বৃথা।

ছাঁকনি দিয়ে ছাতু ছাঁকবার মতো করে ধীমান জ্ঞানীরা মন দিয়ে বাককে শুদ্ধ করে সযত্নে বার করে আনলেন হৃদয়গুহার মধ্যে থেকে—তার ফলে সখারা তাদের সখ্যকে জানতে পারল, আর শুভময় একটি লক্ষ্মী শ্রী, একটি সম্পদের চিহ্ন অঙ্কিত হয়ে গেল ভাষার ওপরে। জ্ঞানসূক্তের এই দ্বিতীয় ত্রিষ্টুপটি বার বার আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে যাস্কের নিরুক্তে, পতঞ্জলির মহাভাষ্য, সায়ন ও অন্যদের বেদ ব্যাখ্যায়। ‘অত্রা সখায়ঃ সখ্যানি জানতে’—এক্ষেত্রে ‘সখা’ মানে কী? ‘সখ্য’ শব্দটি বহুবচনে কেন? অনেক রকমের বন্ধুত্ব, অনেক রকমের মিত্রতা হয় বলে? সায়ন টেনেহিঁচড়ে মানে করেছেন—সমান যাদের ‘খ্যা’, বা ‘খ্যাতি’ অর্থাৎ জ্ঞান তারাই ‘সখা’। এই ব্যাখ্যা দশম মণ্ডলের শেষ ১৯১ সূক্তের সঙ্গে মেলে। আমাদের মনগুলি, আমাদের আকুতি আমাদের হৃদয়গুলি সব সমান হোক। আমরা যেন এক পথে চলি, এক সাথে বলি—”সংগচ্ছধ্বং, সংবদধ্বং, সং বো মনাংসি জানতাম” ইত্যাদি। কিন্তু সাক্ষাৎ ‘খ’ শব্দটির মানে ইন্দ্রিয়। কারণ ‘খ’ মানে ছিদ্র বা আকাশ। আর ইন্দ্রিয়রা বাহ্য বস্তুকে গ্রহণ করার জানলা বা ফুটো বিশেষ। কাজেই যাদের চোখ, কান, ঘ্রাণশক্তি, স্বাদশক্তি সমান বা সহ-সংবেদনের এক সুরে বাঁধা—তারাই ‘স+খ’—এ-রকম অর্থও সমীচীন হতে পারে। বিশেষত হাতে হাত রাখলে যে মনে হয় একটাই স্পর্শ আর পাণীন্দ্রিয় হয়ে গেল! দুজনেই স্পর্শকারী, দুজনেই স্পৃষ্ট। একটিই স্পর্শনক্রিয়া। রবীন্দ্রনাথ তাই বন্ধুর বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে, ধরতে, ভাবতে, সাথে রাখতে উৎকণ্ঠিত থাকেন।

সূক্তটিতে এরপরেই উঠেছে অসমানতার প্রসঙ্গ। যদিও বাক বা ভাষা ব্যবহার করে সকলেই—সকলে সমানভাবে বাককে চিনতে বা বুঝতে পারে না। অনেকেই শব্দকে দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না। কেবল অল্প কয়েকজনের কাছে বাক স্বেচ্ছায় নিজেকে মেলে ধরেন যেমন করে—’উশতী জায়া’ নিজের শরীরকে খুলে ধরেন ভালোবেসে দয়িতের সামনে। অথচ বাকশক্তির এই অসমান দাক্ষিণ্য সত্বেও, কারুর কপালে সফলা ভাষা, কারুর কারুর বা নিষ্ফলা অপুষ্পা ভাষা হওয়া সত্বেও, সখার কর্তব্য নিজের সহাধ্যায়ী সখাকে ছেড়ে না যাওয়া। বাক্যবলে বলীয়ান সরস্বতীর কৃপাপাত্র বাকযুদ্ধে বিজয়ী বন্ধু তার দুর্বল পরাজিত বন্ধুকে কখনো ছেড়ে যাবে না, তাকে সহায়তা করতে পরান্মুখ হবে না। কারুর জ্ঞানের গভীরতা হবে অবগাহন স্নানের যোগ্য, কারুর বা জ্ঞান উপর ভাসা, তাতে কোমরটুকু কোনোমতে ডোবে; কাজেই চোখে-কানে সমান হলেও সখাগণ হয় মনের গতিতে বুদ্ধির বেগে নিতান্ত অসমান—কেউ তীব্র, কেউ মন্দ।

‘অক্ষণ্বন্তঃ কর্ণবন্তঃ সখায়ঃ মনোজবেষু অসমাঃ’ তাহলেও যে বন্ধুকৃত্য দায়িত্বকে জানে সে কখনো তার সহাধ্যায়ী সখাকে ত্যাগ করে না। অন্যত্র ঋগবেদ দানসূক্তে আছে সে সখাই নয়—যে বন্ধুকে দান না করে, ভোগ্যবস্তু ভাগ না করে একা ভোগ করে। বাকবৈভবও যদি ধন বা বৈভব হয়, তাহলে অসম প্রতিভাশালী বাকবিশারদরা তাদের সৎ সমানাকূতি মন্দতর সখাদেরও ভুলে যাবেন না। আবার ‘মনোজবে’ শ্লথতর সহপাঠী যদি মুদি চাষি বা তাঁতি হয় সেও তার বাকপটু বন্ধুকে ভুলে যাবে না। ভাষার ওপর আমাদের যে অধিকার রয়েছে তা শুধু একাকী ঈর্ষালু কৃপণ জীবন যাপন করার জন্য নয়। পরস্পরনির্ভরশীলতারূপী যে সখ্য—সেই সখ্য সহকারে জগৎকে জানবার জন্য।

যদি সে বন্ধুকে ফেলে রেখে এগিয়ে যায় তাহলে ভাষাতে তার কোনো অধিকার থাকে না। ‘ন তস্য বাচি অপি ভাগঃ অস্তি’, সে যা শোনে যা শেখে—তা মাঠে মারা যায়, তার কারণ সে সাধু কর্মের পথ চেনেনি। যশ অর্থের প্রতিযোগিতায় উন্মাদ কৃতঘ্ন সাম্প্রতিক বাকবিশারদদের তাই পাণ্ডিত্য থাকলেও ‘বাকে ভাগ’ নেই। একদিকে এই ভাষার সঙ্গে সমান ভাগ করে নেওয়ার সম্বন্ধ খ্যাপন করার দ্বারা শব্দের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা (private language) বা বলবানের একচেটিয়া অধিকারকে (linguistic hegemony) যেমন খণ্ডন করা হল—তেমনি অন্যদিকে এই বুদ্ধির ও জ্ঞানের বৈষম্য সত্বেও অন্ন, ক্ষমতা ও সম্পদের সমবণ্টনের উপদেশের দ্বারা জ্ঞানসূক্তে সখ্যের এথিকস একটা আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে বলে মনে করি। যজুর্বেদীয় বৃহদারণ্যক উপনষিদে কিন্তু এই সমমনা, সহভাষী, সমানহৃদয়, ভাষায় ভাগবসানো পরস্পরের প্রতি অত্যাগসহিষ্ণু বন্ধু সমাজের কথা ছেড়ে বন্ধুত্বের তথা প্রেমের একটা অন্য মেটাফিজিকাল দিকের কথা প্রথম থেকে বলা রয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার হল এই যে এখানে গাঢ়তম সখ্য হচ্ছে আত্মার সঙ্গে (অহং-এর সঙ্গে) মৃত্যুর। প্রিয়তম বন্ধু হয়ে, দ্বিতীয় আত্মা হয়ে এখানে দেখা দিয়েছে মরণ।

অহং এর প্রথম বিকাশে হিরণ্যগর্ভ—আগামী সৃষ্টির সোনালি সম্ভাবনাময় এক ক্ষুধার্ত স্বয়ম্ভু পুরুষ হঠাৎ চাইলেন যে আমার একজন দ্বিতীয় আত্মা হোক। ‘সো’হকাময়ত দ্বিতীয়ো মে আত্মা জায়েত ইতি’। কী দরকার ছিল এই দ্বিতীয়ের? বৃহদারণ্যক একটু পরেই বলেছেন—একা একা তাঁর মোটেই মজা হচ্ছিল না। ‘একাকী সে বৈ নৈব রেমে।’ সে জন্যই তো আজও একা একা মানুষের আনন্দ হয় না। শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলেছেন এখানে ‘রম’ ধাতুর অর্থ ‘রতি বা ক্রীড়া’। একা খেলা যায় না। তিনি খেলতে চাইলেন। এই জায়গাটা উপনিষদমগ্ন রবীন্দ্রনাথের কবিতায় গানে বার বার নানান রূপকে উপমায় ফিরে ফিরে এসেছে। আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বরের প্রেম মিছে হত। তখন তিনি আপনি ছিলেন একা তখন কোথাও কারোর জন্য ছিল না পথ চাওয়া। আমি যখন আসিনি তখন পরমাত্মার কোনো খেলার সাথি ছিল না। তাই তিনি দ্বিতীয়ম ঐচ্ছৎ। কিন্তু অবাককাণ্ড এই যে যেই তিনি এই দ্বিতীয় আত্মা তৈরি করলেন অমনি তাঁর একরকমের শঙ্কা হল। এখানে অবশ্য অদ্বৈতবাদী শঙ্কর ‘আত্মা’ শব্দের মানে করেছেন ‘শরীর’ যেহেতু আত্মা তাঁর মতে দুটো হয় না! তা হোক গে। খেলার সাথি হিশেবে এই দ্বিতীয় আসার পরেই স্বয়ম্ভু অহং-এর মনে জাগল ভয়। একদিকে রিরংসা, রতিকামনা অন্যদিকে ভয়। কিসের ভয়? যদি আমাকে খেয়ে ফেলে? যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়? আর এই ভয়ই হচ্ছে অহং-এর মৃত্যুভয়। বন্ধু ছাড়া আমার চলে না—একা থাকতে ভাল্লাগে না, কিন্তু বন্ধুকে যত ভালোবাসি তত আমার আমিত্ব আমার স্বার্থ দু-রকম আতঙ্কে ভোগে—এক হল আমার নিজস্বতা হারিয়ে যাচ্ছে—আমি তো ওই দ্বিতীয়ের, ওই বন্ধুর, কেনা গোলাম হয়ে যাচ্ছি—পরতন্ত্র হয়ে যাচ্ছি। আর অন্য ভয় হল—ও যদি আমায় ছেড়ে চলে যায়? গ্রস্ত হবার ভীতি আর ত্যক্ত হবার ভীতি—এই দুই ভীতি দিয়ে তৈরি সখা প্রীতির শরীর! এই ভীতি যদি নেই তো প্রীতিও নেই!

এই আমির মরণভয় থেকে তার মুক্তি আসে—উপনিষদের ভাষাতে কেবল একই উপায়ে—যখন বাক ও মন-প্রাণ, সূর্য ও অগ্নি, আত্মমেধ যজ্ঞের দ্বারা একই মৃত্যু দেবতায় পর্যবসিত হন তখন মৃত্যুই ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান’ হয়ে, মৃত্যুই তাঁর বন্ধু হন। ‘মৃত্যু ইঁহার আত্মা হন’। মৃত্যুর সঙ্গে সখ্যপ্রেম দ্বারা অভিন্নতা লাভ করে ইনি মৃত্যুভয়কে জয় করেন।

তাঁর ‘সখেব সখ্যুঃ’ নামক প্রবন্ধে আবু সয়ীদ আয়ুব স্বয়ংই রবীন্দ্রনাথের এই মরণ-সখ্যের দিকটি অতি সূক্ষ্ম সাহিত্যিক ও মনোবৈজ্ঞানিক-বিশ্লেষণের দ্বারা খুলে ধরেছেন। কৈশোর থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত বিভিন্নরূপে রবীন্দ্রভাবনায় এই যে মরণের সঙ্গে মিতালি, এই মৃত্যুকেই দ্বিতীয় আত্মা হিসেবে বরণ করে নেওয়ার আকুতি, আমি কেবল এখানে বৃহদারণ্যক উপনিষদে তার বীজটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। আয়ুব প্রশ্ন করেছেন মরণকে বা জীবনের অবসান বা ধ্বংসাভাবকে জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা ‘হে মহাসুন্দর শেষ’ —বলবার মানে কী? (পান্থজনের সখা, পৃ. ৭৬) আয়ুবের মন জড়বিজ্ঞান বিদগ্ধ সংশয়ী এবং problem of Evil তথা বিশ্বে এত বেশি ব্যাখ্যাহীন কষ্ট, এত অজস্র অকারণ অকল্যাণের সমস্যাতে পীড়িত তাঁর বুদ্ধি। এই ঔপনিষদিক মৃত্যুসখ্য তাই কোনোদিনই পুরোপুরি গ্রহণীয় হয়ে ওঠেনি আয়ুবের পক্ষে। কিন্তু তবু, সখ্য পিপাসার পেছনে যে একটা অহংমরণের আত্মবিরোধী বাসনা কাজ করে—উপনিষৎ ও রবীন্দ্রনাথের বন্ধু-তত্বের মধ্যে এটা লক্ষ্য না করে উপায় নেই।

একবিংশ শতকের মার্কিন ও ব্রিটিশ দর্শনে এই মুহূর্তে অ্যারিস্টটলের চারিত্রিক কুশলধর্মের নীতিশাস্ত্র (Virtue Ethics) নিয়ে বিরাট শোরগোল চলছে। ফলে নিকোম্যাকিয়ান এথিকস নামক তাঁর মহাগ্রন্থে, বহু অনুচ্ছেদজুড়ে অ্যারিস্টটল যে বন্ধুত্বের রকমফের এবং প্রকৃত বন্ধুর স্বরূপ ও প্রবৃত্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তা নিয়েও বড়ো বড়ো নীতিদার্শনিকরা গভীরভাবে পুনর্বিচার করছেন। আশ্চর্যের কথা হল অ্যারিস্টটলের আলোচনায় (প্লেটোর প্রতিতুলনায় বিপরীত মেরুতে) কোনো ব্রহ্মতত্ব বা সর্বাত্মভাব, শাশ্বত নিত্যস্বরূপ অদ্বৈত চেতনার নামগন্ধও না থাকলে কী হবে, অ্যারিস্টটলও কিন্তু শেষ পর্যন্ত বন্ধুর সংজ্ঞা দিয়েছেন: ‘দ্বিতীয় আত্মা’। আমাদের দেশে যেমন প্রচলিত নীতি শ্লোকে বন্ধু, সুহৃৎ, মিত্র, সখা এই চাররকম বন্ধুর পার্থক্য করা হয়েছে—

‘অত্যাগ সহনো বন্ধুঃ সদৈবানুমতঃ সুহৃৎ।

একক্রিয়ংভবেন্মিত্রং সমপ্রাণঃ সখা মতঃ।।’

তেমনি অ্যারিস্টটল তিন রকমের বন্ধুত্বের কথা বলেছেন—

১। দরকারের বা স্বার্থের বন্ধুত্ব—Friendship of Utility

২। সুখের বা সখের বন্ধুত্ব—Friendship of Pleasure

৩। চারিত্র্যগুণের সদভাবের বন্ধুত্ব—Friendship of Virtue

তাঁর আলোচনাতেও অনেক সমাহিত সমস্যার জট রয়ে গেছে—যা নিয়ে পরবর্তী পাশ্চাত্য দর্শনে সিসেরো, সেনেকা, টমাস অ্যাকুইনাস, মন্ত্যাঁ, ইমানুয়েল কান্ট ইত্যাদিরা অতি সূক্ষ্ম আলোচনা, লক্ষণ, বিভাগ, পরীক্ষা ইত্যাদি চালিয়ে গেছেন। কান্টের দ্বারা উত্থাপিত বন্ধুত্বের অন্তর্নিহিত এক বিরোধের প্রসঙ্গ আমি এবার উত্থাপন করতে চাই।

এই যে বন্ধু মানে এমন আরেকজন যাকে ত্যাগ করা আমার পক্ষে অসহনীয়—অত্যাগসহনো বন্ধুঃ—একথা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কান্ট এক বিচিত্র সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। মানবচরিত্র এক দোমড়ানো বাঁকা কাঠ—তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এই যে যাকে ছাড়া তার চলে না তাকেই সে সহ্য করতে পারে না। অত্যাগসহন বন্ধু তাই তার দু-চোখের বিষ হয়ে দাঁড়ায়।

৩. প্রিয়বন্ধুগণ! কেউ কারুর বন্ধু নয়

মারিয়া ফন হার্বাট নামে একজন প্রেমে প্রত্যাখ্যাতা নৈতিকতায় নিষ্ঠাবতী মহিলাকে ১৭৯২ সালে কান্ট একটি ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন। তাতে এক জায়গায় এই আপসহীন আদর্শবাদী নীতিবাগীশ ইমানুয়েল কান্ট লিখছেন—

‘ভালোবাসা—তা পতি পত্নীরই হোক, অথবা বন্ধুর প্রতিই হোক—পূর্বশর্ত হিসেবে ধরেই নেয় যে পরস্পরের চরিত্রের প্রতি উভয়ের সমান সশ্রদ্ধ সম্মান বজায় থাকবে। মাত্র এই সসম্মান ভালোবাসাকেই বলা যায় সৎচারিত্র্য ভিত্তিক ভালোবাসা (এখানে কান্টের মাথায় রয়েছে অ্যারিস্টটলের তৃতীয় প্রকার মৈত্রী)। এ ছাড়া অন্য কোনো রকমের প্রেম নেহাত অন্ধ জৈব আকর্ষণ।

আদর্শ ভালোবাসা চায় প্রিয়জনের কাছে নিজেকে নিঃশেষে মেলে ধরতে; আর উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেও আশা করে একই রকমের হৃদয় ভাগ করে নেওয়া, যেখানে কোনো রকমের অবিশ্বাসী স্বল্পকথন বা কথা না বলতে চাওয়ার পিছুটান থাকবে না।

বন্ধুত্বের আদর্শ এটাই দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের মধ্যে সহজাত রয়ে গেছে এক ধরনের সংকোচ ও দ্বিধা, যা এই অকপট আত্ম-উন্মোচনে একটা বাধা সৃষ্টি করে। কেউ বেশি, কেউ বা কম পরিমাণে একটুখানি স্বস্বরূপ অপ্রকাশিত গোপনে রেখে দেয়। অন্যত্র কান্ট তাঁর মেটাফিজিক্স অব মরালস গ্রন্থে বলেছেন যে মানুষকে এই আংশিক আত্মগুপ্তির জন্য দোষ দেওয়া যায় না। পরম পারস্পরিক অকপট অনর্গলতার লগ্নেও একধরনের ”সংকোচেরি বিহ্বলতা” যেন মানুষের জিভকে আটকে ধরে। পুরোপুরি দু-জন দু-জনকে জেনে গেলে কোনো দূরত্ব, কোনো রহস্য, পরস্পরের বিষয়ে কোনোই বিস্ময়বোধ থাকবে না—এই ভীতি শুধু স্বাভাবিক নয়, যুক্তিযুক্তও বটে। কারণ একটু অজানার ব্যবধান ছাড়া অপরের প্রতি সেই সশ্রদ্ধ সম্ভ্রমবোধ থাকে না যা ছাড়া, কান্ট মনে করেন, বন্ধুত্ব টেঁকে না। আদর্শ বন্ধুত্ব তাই যুগপৎ এক পারস্পরিক উন্মোচন ও অবগুণ্ঠনের দাবি করে বলেই, কান্ট মারিয়া ফন হার্বাটকে লেখেন, প্রাচীন গ্রীক ও রোমান মুনিরা বলে গেছেন—’ওহে বন্ধুগণ, বন্ধু বলে কিছু নেই।’ এ জগতে প্রকৃত সখ্য সম্ভবই নয়। হয়তো কান্টেরই প্রথম ক্রিটিকের ভাষা ব্যবহার করে বলা যায় যে মানবিক সম্পর্ক ও কর্তব্যনীতির জগতে—বন্ধুত্ব একটি আইডিয়া অব রিজন—আলেয়ার মতো প্র্যাকটিকাল রিজন তার দিকে ছুটে চলে—কিন্তু কখনোই ঠিক ঠিক বাস্তবে তাকে ছুঁতেপারে না।

উনিশ-শো নব্বই-এর দশকের প্রথম দিকে জাক দেরিদা এই ইওরোপীয় পুরাণোক্তি—’বন্ধো! ন সন্তি বন্ধবঃ’—‘My dear Friends, There are no friends.” নিয়ে একটি বিশ্লেষণী গ্রন্থ রচনা করেন তার নাম Politics of Friendship. এখানে কেবল তার নাম উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হচ্ছি। আপাতত ‘বন্ধুত্ব’ সম্বন্ধটি নিয়ে আমি আমার নিজস্ব কতকগুলি অসুবিধের কথা দ্রুতগতিতে উল্লেখ করতে চাই।

৪. ‘মন শুধু বলে অসম্ভব, এ অসম্ভব।’

(ক) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পালটায়। দুটি পরস্পর নিরপেক্ষ অনিয়মিতভাবে পরিবর্তমান সম্বন্ধির মধ্যে কোনো অপরিবর্তনীয় সম্বন্ধ সম্ভব নয়। অথচ যে সম্বন্ধ নিতান্ত সাময়িক স্বল্পকালস্থায়ী তাকে প্রকৃত বন্ধুত্ব বলতে বাধে। যেকোনো পরিচিতি বা সহাবস্থান বা অচিরস্থায়ী মোহই তো আর সখ্য নয়! সখ্য প্রতিজ্ঞা করে ‘আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না’। কিন্তু কয়েকটি কথার, কয়েকটি করমর্দনের, কয়েকটি দৃষ্টি বিনিময়ের দ্বিধা থরোথরো চূড়ে এই শাশ্বতী মৈত্রীর অমরাবতী কেবল কবিতাতেই ভর করতে পারে। বাস্তবে কর্তব্যমাত্রসার একঘেয়েমি অথবা অস্থায়ী উচ্ছ্বসিত অনুরাগ এই দোটানায় পড়ে অনিত্য দুটি চরিত্রের মধ্যে নিত্য এক বন্ধুত্ব নিতান্তই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

(খ) অপর ব্যক্তি হয় আমার প্রয়োজনে লাগে অথবা লাগে না। যদি সে আমার প্রয়োজনে লাগে অর্থাৎ তাকে আমি কোনো স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে ব্যবহার করি—এমনকী নিছক একাকিত্বমোচন অথবা ভাববিনিময়ও যদি সেই প্রয়োজন হয়—তাহলে সে বন্ধু নয় কারণ ব্যবহার্য বা ব্যবহৃত মানুষ বন্ধু হয় না।

আর যদি সে অদরকারি হয় তাহলে আমার জীবনে সে অবান্তর—সে বন্ধু নয়, তাকে ছাড়াও আমার দিব্যি চলে যায়। এ ছাড়া আর তৃতীয় কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই অপর ব্যক্তি আমার বন্ধু হতে পারে না। এই অসম্ভবতার সামনে দাঁড়িয়ে—’আত্মৈব হি আত্মনোবন্ধুঃ’ নিজেই নিজের বন্ধু অথবা ‘বন্ধু তো অপর নয়, দ্বিতীয় আত্মা, নিজেরই অন্যরূপ’—এই জাতীয় গোঁজামিল দিয়ে লাভ নেই। বন্ধু হতে গেলে নিজের আত্মা হলে চলবে না—অপর হতে হবে। আর অপর হলে—প্রয়োজনীয় অথবা অপ্রয়োজনীয় হবে—আর উভয়ক্ষেত্রেই বন্ধুত্ব অসম্ভব হবে।

(গ) বন্ধুত্বের হয় কোনো কারণ বা ভিত্তি থাকবে অথবা থাকবে না। যদি যুক্তি বা ভিত্তি থাকে তাহলে বন্ধুত্ব একটি ত্রিপদীসম্বন্ধ—যথা:

‘যদু, মধুর সংগীত প্রতিভার জন্য, মধুর বন্ধু’

(A is a Friend of B, for the sake of F)

যদি বন্ধুত্ব অহৈতুকী হয় তাহলে তা একটি দ্বিপদী সম্বন্ধ

‘যদু—মধুর বন্ধু’

এখন, যদি অমুক তার রূপ, গুণ, বিদ্যা, বুদ্ধি, রসবোধ, দয়ামায়া, ইত্যাদি কোনো ধর্মের ভিত্তিতে আমার বন্ধু হয় তাহলে আমার আসল টান ওই ধর্মেরই ওপরে—নিছক অমুকের ওপরে নয়। যদি অমুক সেই ধর্মটি হারায়, মধু-র যদি সংগীতপ্রতিভা নষ্ট হয়ে যায়, অথবা তমুকের যদি অমুকের থেকেও অধিকতর মাত্রায় ওই ধর্মটি থাকে তাহলেই অমুক আর আমার বন্ধু থাকবে না। কিন্তু তাহলে এ-রকম সহেতুক প্রীতিকে ওই ব্যক্তির প্রতি—ধর্মনিরপেক্ষভাবে ও ধর্মী মানুষটির প্রতি সখ্য বলা যাবে না। অথচ নির্ধর্মক অহেতুক নিষ্কারণ ভালোবাসা শুনতে যতই ভালো ঠেকুক তাকে ঠিক র্যা শনাল ফ্রেন্ডশিপ—সযৌক্তিক বন্ধুত্ব বলা যায় না। যে ভালোবাসা—অকারণে আসে, সে যে-কোনো সময়ে অকারণে চলে যেতেও পারে। য়েটস বিদ্রুপ করে লিখেছেন:

“I heard an old religious man

But yesternight declare

That he had found a text to prove

That only god, my dear

Could love you for your self alone

And not for your yellow hair”.

অহেতুক ভালোবাসা যদি সম্ভবও বা হোত, অহেতুক বলেই তা অন্ধ হোত; আর এ জাতীয় খামখেয়ালি অন্ধ বন্ধুত্বকে বন্ধুত্ব বলা চলে না। অথচ তৃতীয় কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই বন্ধুত্ব সম্ভব নয়।

(ঘ) বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্বন্ধ নিয়ে অ্যারিস্টটল থেকে কান্ট পর্যন্ত সকলে এতটা ভেবেছেন তার কারণ পারিবারিক মাতৃত্ব, সন্তানত্ব, ভ্রাতৃত্ব, পতিপত্নীত্ব ইত্যাদি সম্বন্ধের মতো এই সম্বন্ধটি কোনো নৈসর্গিক বা সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য, অনির্বাচিত—Unchosen—বন্ধনের দ্বারা আবদ্ধ নয়। এ হল এক স্বাতন্ত্র্যময় পরস্পরের নিরপেক্ষতাময় স্বেচ্ছানির্বাচিত বন্ধনহীন গ্রন্থি। রবীন্দ্রনাথও তো শেষের কবিতায় এই জাতীয় বন্ধনহীন গ্রন্থি নিয়েই কল্পনায় নিরীক্ষা চালিয়েছেন। এটাও লক্ষণীয় যে এই স্বাতন্ত্র্যবিলাসী বন্ধুত্বের রাখি বাঁধে ঘর ছেড়ে পথ চলার অনিয়মিত আকস্মিকতা—’পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি।’ আয়ুব যে পান্থজনের সখ্য নিয়ে ভাবিত তার মধ্যে রয়েছে এই স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার অ-বন্ধন। সুফিরাও তাই সংগঠিত ধর্মের বাইরে গিয়ে সমাজের নিয়মে অনিগড়িত থেকে সখ্য রসের আস্বাদন করতে চেয়েছেন। সক্রেটিসের ফ্রীড্রাস বা সিম্পোসিয়ামেও এই রকম বাঁধনছাড়া বাঁধনেরই প্রসঙ্গ উঠেছে। পরস্পরের প্রতি গভীর নির্ভরশীলতা ছাড়া বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। যাকে ছাড়া আমার চলে না সেই যদি আমার আসল স্বাতন্ত্র্যবাধক রজ্জু হয় তাহলে তার কাছে আমার অনন্যমুখপ্রেক্ষিতা, স্বাধীনতার অহংকার করা চলে কি? স্বাতন্ত্র্যাভিমানী মানুষ তাই বন্ধুত্ব যত গাঢ় হয় ততই বুঝতে পারে যে ওই প্রিয়জনটি তার স্বাতন্ত্র্য কেড়ে নিয়েছে—তার একটু অদর্শন, ক্ষণিকের অপ্রতিক্রিয়া, কয়েকদিনের উপেক্ষা তার রাত্রির ঘুম, দিনের কর্মক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। যত যত এই পরতন্ত্রতা বাড়ে, যতই তাকে ছাড়া থাকা আমি সহ্য করতে পারি না ততই আমার স্বাতন্ত্র্যহরণকারী এই বন্ধুকে আমি সহ্য করতে পারি না। এই জন্যেও বন্ধুত্ব অসম্ভব।

৫. সম্বন্ধ, বুদ্ধিবিভ্রাট, এবং চিরবন্ধুর প্রতি গালিব-আয়ুবের অভিমানী অভিযোগ

যাঁরাই এ-পর্যন্ত আমার চারটি যুক্তি শুনেছেন—তাঁরাই আশা করি ভাবছেন যে এগুলি নিতান্তই কু-যুক্তি। আয়ুব সাহেব শুনলে বলতেন এ হল শূন্যবাদী নাগার্জুন অথবা Appearance & Reality-র লেখক Bradley অথবা ‘জগৎ মিথ্যা’ প্রমাণকারী অদ্বৈতবাদী খণ্ডনখণ্ডখাদ্যকার শ্রীহর্ষের বিধ্বংসী আর্গুমেন্টের মতন বুদ্ধি বিভ্রাট। অপরোক্ষানুভূতিতে জানি আমরা যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়, বন্ধুত্ব থাকে, হয়তো কখনো-সখনো ভেঙে যায়, কিন্তু পেছন পানে তাকিয়ে মৃত্যুর আগে অনেক মানুষই বলতে পারে ‘অমুক আমার প্রাণের বন্ধু ছিল—’ সমপ্রাণঃ সখা মতঃ। যে Excluded Middle নিয়ম দিয়ে, দ্বিকোটিক সংশয়ের আক্রমণে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সিদ্ধ বন্ধুত্বের বাস্তবতাকে খণ্ডন করা হয় সে নীতিটিই হয়তো ক্লাসিকাল লজিকে খাটলেও, মানুষে মানুষে প্রীতিবন্ধনের বিষয়ে অপ্রযোজ্য। তার কারণ নিজ না পর, আত্মা না অনাত্মা?—এই দুই বিকল্পেরই তো পরপারে সেই বিচিত্র সম্বন্ধ যাতে অনাত্মা হয়ে ওঠে দ্বিতীয় আত্মা, পর হয়ে ওঠে নিজ। Other থেকেও বন্ধু হয়ে যায় নিজের Self।

আয়ুব তাঁর গালিবের প্রেমাস্পদ বিষয়ে লেখাতে তীক্ষ্ণভাবে অদ্বৈতবাদের বিরোধিতা করেছেন—এবং বলেছেন যে প্রেমিক চায় নিবিড়তম মিলন। আত্মবিলোপ নয়। ইরানের কোনো শ্রেষ্ঠ কবি বন্ধুত্বের চরম অবস্থায় আমিই তুমি হয়ে যাই বলেছেন বটে, অভিনবগুপ্তও পরাত্রিশিকা গ্রন্থে লিখেছেন ”দয়িত! ত্বমেব অহম অস্মি”—কিন্তু আয়ুব এ জাতীয় একীভবনকে অতিরঞ্জন বলে উপেক্ষা করেছেন। অথচ দ্বিষ্ঠ যে-কোনো সম্বন্ধ নিয়েই—শুধু বন্ধুতা নয় যে-কোনো দুটি পদার্থের মধ্যেই যে সম্বন্ধ তার লজিকের বিচারে যে অসম্ভবতা, তা ব্রাডলির ‘সম্বন্ধের ধাঁধা’ বোঝাতে গিয়ে আয়ুবই বহু প্রশংসিত প্রথম প্রকাশিত বাংলা প্রবন্ধে অতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিপাদন করেছেন। aRb এই রাসেলীয় উদাহরণ না দিয়ে (হয়তো অবচেতন ভাবে তৎকালীন হিন্দুমুসলমান সমাজের রমণীদের কথা ভেবে) তিনি উদাহরণ নিয়েছেন মুখের ওপর ঘোমটা—ওপর শব্দবাচ্য সম্বন্ধটির। এই সম্বন্ধ সত্য হতে গেলে চাই মুখের সঙ্গে ওপরের আর ওপরের সঙ্গে ঘোমটার আরো দুটি সম্পর্ক। মুখ আর ওপর যদি তৃতীয় একটি সম্বন্ধে সম্বদ্ধ থাকে তাহলে ওপরের সঙ্গে ওই তৃতীয় সম্বন্ধটিরও একটি চতুর্থ সম্বন্ধ থাকবে। এভাবে অসমাপ্য এক অনবস্থার দোষে আক্রান্ত হবে এই প্রত্যক্ষাসিদ্ধ মুখ ও ঘোমটায় অবগুণ্ঠন সম্বন্ধ। কিন্তু আয়ুব যেমন এই ধরনের যুক্তি বা আরেকটু মূর্ত মানবিক অভিজ্ঞতা নির্ভর আমার বন্ধুত্ব বিরোধী চারটি যুক্তিকে বুদ্ধিবিভ্রাট বলে উড়িয়ে দেবেন—তেমন করে তিনি কি উড়িয়ে দিতে পারবেন বিপরীত চরিত্রের দুই প্রিয় কবি—রবীন্দ্রনাথ ও গালিবের অপরোক্ষ অনুভূতিকে? সেই অপরোক্ষ অনুভূতি কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঈশ্বর অথবা অজানা বন্ধুর জন্য কেবল চিরবিরহেরই সাক্ষ্য দিচ্ছে। আয়ুবের অনুবাদে গালিব বলছেন—

‘বন্ধুর সাথে মিলন ভাগ্যে ছিল না

যদি আরও বাঁচতাম, এই প্রতীক্ষাই চলতো।’

রবীন্দ্রনাথ এক উদাসী প্রদোষের শ্রীরাগে নিজেকে সম্বোধন করে বলছেন—

‘কার মিলন চাও বিরহী? তাহারে কোথা খুঁজিছ?’

আয়ুব আর গালিব যদি বা অকারণ নিষ্ঠুরতায়, নিরুত্তর উপেক্ষায়, অভিমানী হয়ে পথে পথে ঘুরছেন, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ঘরভাঙা শূন্যতার মধ্যে মৃত্যুময় নিজ আত্মার মধ্যেই এই চির সখাকে পাবেন বলে কান পেতে রয়েছেন মৃত্যু সত্যের চুপি চুপি কথা বলা শুনবেন বলে। সেই মৃত্যু আত্মা কি সত্যিই তাঁর দ্বিতীয়? যখন সেই বন্ধু সত্যিই দাঁড়াবে এসে—সেই মৃত্যুসুন্দর আত্মাকে তখন কি জোরগলায় অহং থেকে আলাদা বলে দ্বৈতবাদকে জিতিয়ে দেওয়া যাবে? মনে তো হয় কোনো অচিন্ত্য ভেদাভেদ-বাদেই এই সখ্য তত্বের পর্যবসান।

যখন বন্ধু সঙ্গলিপ্সায় সখাকে দেখতে আকুল আর্ত কবি ওদিক থেকে শুধু পান নিরুত্তর উপেক্ষা, তখন গালিব লেখেন—

‘এদিকে আমি—শত সহস্র আর্তনাদ

ওদিকে তুমি—এক পরমাশ্চর্য না-শোনা’

[মৈঁ অওর সদহজার—নবা-এ জিগর-খরাশ

তূ অওর বোহ না-শুনীদন কেহ কেয়া কহূঁ!]

খানিকটা যেন এরই উচিত শাস্তি কল্পনা করে তিনি যে কল্পনা করেন তা হল—ঈশ্বর বা চিরসখা ওদিকে একা বসে আছেন—আর এদিকে আমি নেই, কেবল ঈশ্বর একাই আছেন। উপেক্ষা করার মতো, উৎপীড়ন করার মতো, প্রতীক্ষায় উন্মুখ করে রাখার মতো দ্বিতীয় কোনো কেউতাঁর নেই!

‘নহ যা কুছ তো খুদা থা,

কুছ নহ হোতা তো খুদা হোতা

ডুবোয়া মুঝ কো হোনে-নে

নহ হোতা মৈঁ তো কেয়া হোতা—’*

(গালিব আয়ুব পৃ. ১৩৯)

এই কল্পনা, আশ্চর্য ভাবে, মিলে যাচ্ছে বৃহদারণ্যকের এবং রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিপূর্বকালীন ঈশ্বরের একাকীত্ব কল্পনার সঙ্গে। ‘তখন তুমি আপনি ছিলে একা/আপনাকে তো হয়নি তোমার দেখা’। নিজের থাকাটাকেই অভিশাপ দিচ্ছেন আধুনিকতার দুঃখাভিমানী গালিব—এটুকু পার্থক্য বাদ দিলে বেদের কবি, রবীন্দ্রনাথ ও গালিব তিনজনই সখ্যের স্বরূপ বন্ধুকে ‘জানিবার গাঢ় বেদনা’র অনুভব করছেন নিজেকে সরিয়ে ফেলে, কল্পনায়, সেই নিষ্ঠুর নির্বাক প্রেমিককে একলা রেখে। পারতে কি তুমি আমায় ছাড়া থাকতে? কাকে কষ্ট দিতে তখন? কার মিলন-প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করতে যদি তুমি সত্যিই হতে একা? সানন্দ আত্মনিবেদনেই হোক, আর অভিমানী কল্পনাতেই হোক, নিজেকে মুছে ফেলা ছাড়া ”পিয়া-মিলন কি আস” মেটার কোনো উপায় নেই। অদ্বৈতে যাঁদের অরুচি, তাঁদের কপালে আছে বড়ো-জোর ”বিরহ বড়ো ভালা লাগে!” এই সান্ত্বনা।

————

*আমার অনুবাদ-প্রয়াস—

”থাকতো না যদি কিছুই কোথাও

থাকতেন ভগবান।

কিছু নাহ’লেও তবু ঈশ্বর

একাকী বর্তমান।

ডোবালো আমাকে এই হওয়াটাই

মরলাম আমি থেকে।

যদিনা হ’তাম কী হত তাহলে

নাহয় নিতাম দেখে!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *