২. আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে

আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে

লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাগ এবং সেবাযত্নের কর্মমর্যাদা

১. গবেষকের গৃহলক্ষ্মী

হল্যান্ড দেশের কোনো শহরে থাকেন এক বিবাহিত পুরাতত্বের অধ্যাপক। আজ কয়েকসপ্তাহ ধরে এই প্রবীণ প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ পণ্ডিতের নাওয়া খাওয়া নেই। তিনি একটি পুরাতন পাণ্ডুলিপি পাঠ করতে গিয়ে লক্ষ করেছেন যে সেখানে একটি পৃষ্ঠায়, একটি পঙক্তিতে, এমন একটি বিন্দু রয়েছে যার ফলে ওই প্রাচীন গ্রন্থটির পুরো মানেটাই পালটে যাচ্ছে। সারা দুপুর তিনি পড়ার টেবিল ছেড়ে ওঠেননি। মধ্যাহ্নভোজন করেননি। উত্তেজনায় তিনি পাগলের মতো হয়ে গেছেন। আর কেবল আকৃতিবিবর্ধক কাঁচের মধ্যে দিয়ে এই বিন্দুযুক্ত পাঠটিকে বারবার পরীক্ষা করে চলেছেন। রাত হয়ে গেছে। এদিকে তাঁর গৃহিণী প্রতীক্ষা করে করে অধীর হয়ে শেষে তাঁর চেয়ারের পেছনে এসে তাড়া দিচ্ছেন—”নাও এবার খেতে চলো, কাজ শেষ করে ওঠো। আমি আর খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে পারছি না।” কাজপাগল গবেষকমশাই প্রত্যুত্তরে বলছেন—”আরে খেতে যাবার প্রশ্নই ওঠে না। কতো ভালো ভালো ডাচ সংস্করণে এই গ্রন্থটি মুদ্রিত দেখেছি। কেউ কখনো এই অক্ষরটিকে লক্ষই করেনি। এখন আমি এটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। এই বিন্দুটির রহস্য ভেদ না করে আমি আসছি না।” ওই এক ফোঁটা বিন্দু নিয়ে শরীর স্বাস্থ্য, বাড়ির দিনচর্যা, সব উলটোপালটা করে কী লাভ একথা ভেবে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাঁর পত্নী বললেন ”বাবারে বাবা, এইটুকু একটা অক্ষর নিয়ে কী এত দুশ্চিন্তা করতে হয়? কই দেখি তোমার বিন্দু! উফ কী আপদ!” —এই বলে গৃহিণী যেই পাণ্ডুলিপির ওপর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন তখুনি পৃষ্ঠার ওপর থেকে পণ্ডিতের নস্যির গুঁড়োটি উড়ে গেল। প্রবীণ প্রাচ্যবিদ চেয়ার ছেড়ে উঠে খেতে গেলেন। উদভট অক্ষরটি নেই জেনে—সে রাত্রে তাঁর নিশ্চিন্ত নিদ্রা হল।

এইটুকু গল্প বলে, তারপর কিয়ের্কেগার্ড লিখছেন—

”এই গল্পের সারমর্ম-উপদেশ কী তা কি ভেঙে বলার দরকার আছে? যদি এই গবেষক বিবাহিত না হতেন, তিনি হয়তো শেষে পাগলই হয়ে যেতেন, …নিঃসন্দেহে তিনি পত্রপত্রিকায় ওই বিন্দুযুক্ত পাঠটি নিয়ে নানান শোরগোল তুলে আরো কয়েকজন পুরাতত্ববিদকে খেপিয়ে তুলতেন। …আর যদি তিনি একজন অবিবাহিত সৌন্দর্যবিলাসী রোম্যান্টিক প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ হতেন…তাহলে হয়তো সারাদিন গ্রন্থাগারে খাটুনির পর সারারাত তাঁকে কোনো প্রেয়সীর সঙ্গে আবেগের খেলায় মাততে হত—কেবলমাত্র গবেষণার এই জাতীয় বিষাদজনক সমস্যার ক্লান্তি ভুলতে। ভোরবেলা যখন আবার নিজের শূন্য বাড়িতে ফিরে তিনি অন্ধকার পড়ার ঘরের জানলা খুলে পাণ্ডুলিপি পড়তে বসতেন তখন তাঁর মন থাকত ভারাক্রান্ত, শরীর খিন্ন। অবশ্যই তাঁর থাকতে পারত গভীর রাতের মানিনী প্রিয়তমা—কিন্তু তাঁর থাকত না কোনো সংসারনির্বাহক সহকারিণী। তাঁর জীবনে থাকত না এমন কোনো লোক যে তাঁর বিন্দু উড়িয়ে দিতে পারে!”

সরেন কিয়ের্কেগার্ডের এই অনবদ্য রূপকথাটির পাশাপাশি আমিরাখতে চাই ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের পারিবারিক প্রবন্ধ-এর ৩৮তম প্রবন্ধ ”কাজ করা”-র শেষ অনুচ্ছেদটিকে।

ইংরেজ সরকারের কর্মচারী ভূদেব লেখালেখিকেই ‘কাজ’ বলতেন। এবং যে লেখালেখির জন্য তিনি মাইনে পেতেন তা সবটাই ইংরেজিতে। এই প্রবন্ধে, প্রথমত, তিনি স্বীকার করেছেন যে হিন্দুকলেজের সহপাঠী কোনো বন্ধুর উপদেশ সত্বেও তিনি কোনোদিনই ভারতীয়দের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে, ইংরেজিতে ভাবতে এবং ইংরেজিতে স্বপ্ন দেখতে পারেননি। ফলে, প্রতিদিন তাঁকে গড়ে ৫০/৬০ টি চিঠি এবং অগুনতি রিপোর্ট লিখতে হত বটে—কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত ”শীঘ্র শীঘ্র ইংরেজি লিখিতে” পারতেন না। ফলে তাঁর প্রচুর কাজ জমে যেত। অথচ তাঁর বন্ধুবাৎসল্য ও আড্ডাপ্রিয়তা ছিল মজ্জাগত এবং সর্বজনবিদিত—

”আমার আত্মীয় বন্ধুবান্ধব যখন যিনি আমার সহিত দেখা করিতে আসিতেন যতই হাতে কাজ থাকুক না, আমি নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে তাঁহাদের সহিত বসিয়া বাক্যালাপ করিতাম। অনেক কাজ পড়িয়া আছে বলিয়া তাঁহাদের কথাবার্তায় অন্যমনস্কতা বা চাঞ্চল্য প্রদর্শন করিতাম না। তাঁহাদের কাহাকেও পাইলে কাজ কর্ম একেবারে ভুলিয়া গিয়া আলাপ করিতাম।”

বন্ধুরা ভাবতেন ভূদেব কর্মব্যস্ততার মধ্যেও এতটা নিশ্চিন্তে আড্ডা দিতে পারেন তার কারণ তাঁর ”কার্যে লঘুহস্ততা”—তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফেলার ক্ষমতা। কিন্তু ভূদেব স্পষ্ট লিখেছেন যে তাঁদের এই ধারণা ছিল ভুল।

”আদৌ কোনো বিষয়েই আমার ক্ষিপ্রকারিতা গুণ নাই। ক্রমে বহুকালের অভ্যাসবশতঃ কোন কোন বিষয়ে একটু লঘুহস্ততা জন্মিয়াছে বটে কিন্তু অতি সামান্য মাত্রায় এবং ইংরেজী লেখায় কিছুমাত্র নহে। তবে ইংরেজীতে এত কাজ কেমন করিয়া করিতাম? কাজে অনেক সময় দিতাম। এত সময় কোথা হইতে পাইতাম?”

এই মূল্যবান প্রশ্নটির জবাবেই এই অমূল্য প্রবন্ধটি রচিত।

এর নাম ”কাজ করা” হলেও আসলে এর বিষয়বস্তু হল একালের ভাষায় ”টাইম-ম্যানেজমেন্ট”। এই প্রবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদটি কথোপকথনের আকারে এবং গদ্যালংকারের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। স্পষ্ট লেখা না থাকলেও কথোপকথনটির পাত্রপাত্রী নিশ্চয়ই ভূদেব এবং ভূদেব গৃহিণী।

”আজ বিকালে অমুকের আসিবার সম্ভাবনা আছে; কতকটা কাজ বাকি রহিয়াছে, না সারিয়া রাখিলে কথোপকথনের সুখোপভোগহইবে না; তোমারও যদি কোন কাজ বাকি থাকে তাহা এই সময়ে সারিয়া লও”

এর পরেই কয়েকটি তারকাচিহ্ন। মানে বিকালে হয়তো বন্ধুরা এসে চলেও গেছেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেল, অতঃপর ভূদেবজায়া—

”রাত দুপুরে বসে ও কি হচ্চে? খাওয়া নাই, ঘুম নাই, অসুখ করবে”

”না অসুখ হইবেনা, আমি তো একবার ঘুমাইয়াছিলাম। আর এইটা না লিখিলেই নয়। কালি না পাঠাইতে পারিলে …

”কি হইবে? একটু বাহাদুরির ত্রুটি! হউক গে!”

প্রতিশ্রুত কর্ম সমাপ্তির ‘মরণরেখা’র নিকটবর্তী উদবিগ্ন পুরুষ লেখকের এই আধুনিক চাকুরে-পুরুষ-সাধারণ কাজ-পাগল ”বাড়াবাড়ি” যেমন বাস্তব, তেমনি বাস্তব গৃহিণীর এই সাদর বিদ্রূপ—যার পিছনে আছে ”স্বাস্থ্য আগে, না কাজ আগে?”—এই চিরন্তন দরদী জিজ্ঞাসা। যা ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে অনন্য এবং দুর্লভগুণ তা হল নিজের সিরিয়াস কাজ নিয়ে পত্নীর জবানিতে মৃদু হাসবার ক্ষমতা। অবশেষে হিতচিন্তক দরদ ও বকুনির কাছে কর্মাভিমানী ব্যস্ততার পরাজয় হল। ‘ঘরের’ জিৎ, ‘বাইরে’-র হার। শেষ লাইনটি ইঙ্গিতময় অর্থগর্ভতায় অনন্যসাধারণ—মূল ‘টাইম ম্যানেজমেন্ট’ প্রসঙ্গ থেকে না সরে এসেও গৃহলক্ষ্মীর কল্যাণময়ী কর্মবাধকতার সরস সমর্থন—

”সে রাত্রিতে কিছুই লেখা হইল না সত্য

—কিন্তু অন্যান্য রাত্রিতে হইত।”

এতক্ষণে আশা করি বোঝা যাচ্ছে কিয়ের্কেগার্ড ও ভূদেবের একান্ত ভিন্ন স্বাদের এই দুটি আখ্যান-ব্যাখ্যানের মধ্যে আংশিক সমাপতন ঠিক কোন জায়গায়।

গার্হস্থ্য ও গৃহিণীর পিছুটানের গুণগানকারী এই দুটি গল্পেই কিন্তু একটা জিনিস ধরে নেওয়া হয়েছে। দৈনন্দিন আহারনিদ্রার প্রয়োজন বিষয়ে উদাসীন পুরুষকে সেবাযত্ন করার ভার তার বৌ-এর। পুরুষ তার বাহ্যজগতের কর্মে, অধ্যয়নে, অধ্যাপনে, গবেষণায়, লোক ঠকানোর শিল্পে, বিনিয়োগ বিনিময় কুসীদ আদায় করায়, ট্যাক্সি অথবা ট্রাক অথবা ট্রেন চালানোয়, অথবা সৃষ্টিমূলক কাজের দ্বারা অর্থোপার্জনে ”শিশুভোলানাথের” মতো মগ্ন থাকবে। আর সুস্থতা ও প্রকৃতিস্থতার অতন্দ্র প্রহরী মাতৃসুলভ ধর্মপত্নী তাকে যথাকালে নাইয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে তারই ”কর্মসংগ্রহে” ও ”কর্মসমাপনে” সাহায্য করবে। ”সময় নেই” বলেই হোক, ”পারে না” বলেই হোক, ”করতে চায় না” বলেই হোক, রান্না করা, বিছানা তোলা, শিশুপালন করা—সর্বোপরি দৈনন্দিন অশন বসন শয়ন মার্জন কর্মের খেয়াল রাখার স্বগৃহকর্ম পুরুষের জন্য নয়—ওটা নারীদের এলাকা এই বিশ্বাস এখনো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের, এবং অধিকাংশ (শিক্ষিত অশিক্ষিত মিলিয়ে ধরলে) বাঙালির দৃঢ়মূল ধারণা। মনুসংহিতায় যেমন কোনো বয়সেই ”ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যম অর্হতি” বলা রয়েছে। তারই একটি বিদ্রূপাত্মক প্রতিধ্বনি করে ভারতীয় পুরুষদের বিষয়ে একটি ভূয়ো ”স্মৃতিবচন” সৃষ্টি করে বলতে পারি

”মাতা করোতি কৌমারে

কান্তা করোতি যৌবনে।

স্নুষা চ বার্দ্ধক্যে কর্ম

মা কুর্যাৎ স্বগৃহে পুমান।।”

(”স্নুষা” মানে পুত্রবধূ।)

স্বল্প সময়ের মধ্যে বহুকার্য সম্পাদনার তিনখানি প্রয়োজনীয় মূলসূত্র প্রণয়ন করতে গিয়ে বহুদর্শী ভূদেবও স্বীকার করেছেন—

”তদভিন্ন, আমাকেও ঘরের কোনো খুঁটিনাটি লইয়া বিব্রত হইতে হইত না, সেজন্যও অনেকটা সময় পাইতাম।”

অথচ ঘরের এই খুঁটিনাটি লইয়া কাউকে না কাউকে তো বিব্রত হ’তে হ’ত; তা নইলে ঘর, বাসনপত্র, কাপড়চোপড়, ধোয়া, মোছা, কাচা, পাট করা, রান্না, পরিবেশন, বাজার অতিথি-আপ্যায়ন ইত্যাদি প্রতিদিন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হ’ত কী করে?

এই সমস্তই ছিল এবং দেড়দুই শতাব্দী পরেও আছে—অন্তত এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার আধাশহুরে সমাজে—মহিলাদের কাজ। এই তথাকথিত নারীকৃত্য নিয়ে, এবং লিঙ্গভেদে কর্মভেদের যৌক্তিকতা-অযৌক্তিকতা নিয়েই আমি এই প্রবন্ধে কথা বলতে চাই। এখন অবশ্য সমাজ অনেক পালটেছে। ইওরোপ, আমেরিকায় এবং পাশ্চাত্যপ্রভাবান্বিত ভারতীয় সমাজেও বিবাহিত পুরুষ ক্রমে ক্রমে তার সাংখ্যের পুরুষের মতো নিষ্ক্রিয় দ্রষ্টা ভোক্তার ভূমিকা ত্যাগ করে গৃহকর্মে কিয়দংশে সময় ব্যয় করতে শিখেছে। কিন্তু গৃহভৃত্য ও দাসদাসীর দ্বারাই গৃহকর্ম পারতপক্ষে সম্পাদনীয়, এবং দৈনন্দিন সেবাযত্ন ঘরপরিষ্কার ইত্যাদি কাজ গৃহস্বামী বা স্বামিনী কারুর পক্ষেই স্ব-ধর্ম নয় এবং সময়ের অপব্যয় মাত্র—এজাতীয় একটা ধারণা বর্তমানে স্ত্রীপুরুষ উভয় শ্রেণীর মধ্যেই নতুন করে শিকড় গেড়েছে বলে মনে হয়। ফলে—

(ক) গৃহকর্ম ও সেবাযত্ন জাতীয় কাজ কর্মমর্যাদার মাপকাঠিতে নিম্নমানের কাজ (বাধ্য হয়ে করতে হয়, কিন্তু করাটা সম্মানজনক নয়)

(খ) গৃহকর্ম ও সেবাযত্নজাতীয় কাজ মহিলাদেরই যোগ্য—পুরুষদের নয়।

এই দুই প্রথাগত বিশ্বাসের দ্বিতীয় (খ) টি শিথিল হয়ে এলেও প্রথমটি (ক) এখনো যথেষ্ট দৃঢ়প্রোথিত হয়ে আছে। আর, আমার ধারণা (ক) একটি মারাত্মক রকমের ভুল ধারণা যা ততটা আলোচিত হয় না বলেই সংশোধিত হয় না।

তথাকথিত অন্দরমহল বা প্রাইভেট স্ফিয়ারের এই গেরস্থালি কাজকর্মকে একেবারে বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন সামাজিক মানুষের আদর্শ কর্মজীবনের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন না করলে প্রাচ্যে এবং পাশ্চাত্যে হাজার হাজার বছর ধরে নারী জীবনের কার্য ও কর্ম, স্বাতন্ত্র্য ও পারতন্ত্র্য, নারীকর্মের সার্থকতা ও নিরর্থকতা নিয়ে যেসব পিতৃতান্ত্রিক মগজধোলাই চলে এসেছে—তার মূলোচ্ছেদ করা দূরে থাক—তার ভ্রান্তিগুলিও আমাদের চোখে পড়বে না।

২. কর্ম, অকর্ম, লালন ও ললনাকর্ম

একটা সর্বজনবিদিত কথা বলে শুরু করা যাক। কাজ অনেক রকমের। এবং এক এক রকমের কাজের তুলনায় অন্যগুলোকে অ-কাজ বলে মনে হতে পারে। যেমন শারীরিক কাজ আর মানসিক কাজ। শারীরিক খাটুনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কতটা বলপ্রয়োগ করে কতখানি ভারী বস্তুপিণ্ডকে কতখানি স্থানান্তরণ অথবা তার আকৃতি প্রকৃতি পরিবর্তন করা গেল তার আপাতত পরিমাপযোগ্য হিসেব করা সম্ভব বলে সেই কাজকেই যদি সব কাজের আদর্শ মানদণ্ড করি, তাহলে ফার্মা-র শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করতে পারার মতো যুগান্তকারী মানসিক (গাণিতিক) কাজকেও আদৌ কাজ বলেই না মনে হতে পারে। গান্ধিজী বা মেধা পাটকর উপোস করছেন—দশদিন ধরে, সাম্প্রদায়িক রক্তক্ষয় অথবা বাঁধ বানানোর নাম করে ভূমি থেকে নিম্নবর্গের মানুষকে উৎখাত করার প্রতিবাদে। সেই অনশন কী একটা কর্ম? যে অর্থে ভারীভারী মালপত্র মাথায় করে হাওড়া স্টেশনের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে নিয়ে যাওয়াটা কর্ম? যখন কুলির কাজ বা কয়লাখনির শ্রমিকের কাজের কথা ভাবি, তখন ভাবা, পরিকল্পনা করা, অপেক্ষা করা, বিবেচনা করা এসব অকাজের মতো শোনায়।

অথচ, শুধু বুদ্ধিজীবী নয়, কর্মদক্ষ শিল্পী, স্থপতি, বাগানের মালি, ট্যাক্সিচালক, জনপ্রিয় ‘পপমিউজিক’-গায়ক—সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে মানসিক কাজ করতেও সময় লাগে, কৌশল লাগে, মনঃসংযোগ ও শ্রম লাগে, মানসিক খাটুনির চাপ কখনো কখনো শারীরিক খাটুনির থেকেও বেশি অনুভূত হয়।

পক্ষান্তরে, আবার, মানসিক বা বৌদ্ধিক কাজকেই প্রাধান্য ও কেন্দ্রীয়স্থান দিলে—হাতেপায়ে খেটে, গতর দিয়ে, মাংসপেশী দিয়ে যে কাজ করা হয়, ক্রমে ক্রমে সেই কাজকে যান্ত্রিক অ-কাজ বলে মনে হতে পারে। স্বতন্ত্র সজ্ঞান কাজ বলতে তখন প্রধানত (বা একমাত্র) মানসিক কাজই ‘কাজের কাজ’ বলে প্রতীয়মান হয়।

আসলে এই ”শারীরিক বনাম মানসিক” বিভাজনটি খুবই স্থূল একধরনের বর্গীকরণ। কাজকে ভাগ করা যায় স্পষ্টতর কতকগুলি বর্গে—যার প্রত্যেকটির মধ্যেই শরীর মন উভয়েরই শ্রম কমবেশি পরিমাণে জড়িত থাকে। যথা—

বাচিক কর্ম, চিন্তাপূর্বক রচনা বা লিখনকর্ম, উৎপাদন কর্ম, বিক্রয়কর্ম, ক্রয়কর্ম, শিল্পসৃষ্টিকর্ম, নির্মাণকর্ম, ধ্বংসকর্ম, চিকিৎসাকর্ম, প্রতিরক্ষা বা শান্তিরক্ষা কর্ম, শিক্ষণকর্ম, ইত্যাদি। শিল্পসৃষ্টির কর্মও আবার বিচিত্র প্রকারের হতে পারে। অভিনয়কর্ম, নৃত্যকর্ম, গীতবাদ্যকর্ম, চিত্রাংকন কর্ম, বয়নশিল্পকর্ম, অলংকারনির্মিতিকর্ম, ইত্যাদি। এর মধ্যে বয়নশিল্প, মণিরত্ন অলংকারনির্মিতি কর্ম বিশুদ্ধ কলা নয়—প্রয়োজনীয় শিল্প হয়েও কলা পর্যায়ভুক্ত। আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে গৃহাভ্যন্তরের রুচিসম্মত সজ্জীকরণ একটি (শুদ্ধ নয়) শিল্পমিশ্রকলা। এখন কোনো গৃহবধূ যদি বলেন যে বিবাহের পূর্বে পিতৃগৃহে এবং বিবাহের পরে পতিগৃহে তিনি গৃহসজ্জারূপ শিল্পকর্মেই ব্যাপৃত থাকেন—তাতে কিন্তু সন্দেহের ভ্রূ-ক্ষেপণ হবে। অর্থের বিনিময়ে পরের গৃহে ‘আভ্যন্তরসজ্জীকরণ’কেই বলা হবে শিল্প। আবহমান কাল থেকে বিনাপারিশ্রমিকে দরদ ও কল্পনা দিয়ে স্বগৃহে মা-বোন-বৌরা যা করে এসেছেন তা যতই শ্রীময়ী পরিচ্ছন্ন সজ্জা হোক না—তাকে ঠিক সৃষ্টিমূলক শিল্পকর্ম বলা চলবে না!

প্রতিরক্ষা বা শান্তিরক্ষা কর্ম বলতে আমি পুলিশের কাজ বোঝাচ্ছি। আর যে কাজের জন্য প্রাচীন বর্ণবিভক্ত সমাজ ক্ষত্রিয়দের আলাদা করে রেখেছিল, এবং যে কাজে যোগদান করবার জন্য দেশাত্মবোধের দোহাই দিয়ে সমস্ত দেশেই তরুণতরুণীদের আহ্বান করা হয়—সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্রিয়াকেই আমি বলছি ধ্বংসকর্ম। মেশিন গান দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বহু নরহত্যা করা, বোমা বা মিসাইল ছুঁড়ে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, ইত্যাদি কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারলে আধুনিকতম সভ্য দেশগুলিতে খুবই মোটা মাইনের চাকরি পাওয়া যায়। অবশ্য নিজে হাতে হত্যা না করে যুদ্ধক্ষেত্রের হাজার হাজার মাইল দূরে বসে কম্প্যুটারে হুকুম দিয়ে মাত্র বোতামটিপে যাঁরা এই ধ্বংসকর্ম করতে পারেন—অর্থাৎ যাঁরা যুদ্ধ করেন না, করান তাঁদের মাইনে আরো অনেক বেশি হয়। আশ্চর্য হল এই যে কাজকর্মের এই তালিকার মধ্যে কোথাও নেই সবার পক্ষে অপরিহার্য, প্রতিদিন জরুরি, সব থেকে নিকটতম, সদাপরিদৃশ্যমান সামাজিক কাজটির কথা। এই কাজটির নাম ”লালন-পালন”, ”পোষণসেবন”। যত্ন-আত্তি করে পরিবারের সদস্যদের বহির্জগতের আঘাত ও শ্রমজনিত ক্ষয়ক্ষতি, খেদ ও ভাঙাচোরা মেরামত করে, বিশ্রাম ও পুষ্টিদান করে বহির্জগতেরই যোগ্য করে তোলার দুরূহ বিরামহীন এই কাজটি সাধারণত নীরবে করে থাকেন মা, বৌ, বৌদি, দিদি, বোন, চাকর, পাচক, চাকরানি প্রভৃতিরা।

আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের জনক এমিল ডুরখাইম শ্রমবিভাগ নিয়ে একখানি প্রায় সাড়ে তিনশোপাতার বই লিখলেন। কিন্তু সেই বই-এর ইংরেজি অনুবাদের সূচিপত্রে বা বিষয় নির্দেশিকায় কোথাও “woman” শব্দটি বা “housework” শব্দটি পাচ্ছি না। তাছাড়া, ঘরের কাজ যে কাজ বলে ইংরিজিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিগণিতই হয় না তাতো একটি প্রচলিত শব্দ থেকেই প্রমাণিত হয়। বাইরে চাকরি করেন যেসব জননীরা তাঁদের বলা হয় “working mother” —কর্মিণী জননী। তার মানে যাঁরা চাকরি না করে বাড়িতে রান্না, গোছানো, আসবাবপত্র ধুলামুক্ত রাখায় ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন তাঁরা যা করেন তা work নয়।

পুরুষমানুষ ‘বিবাহ’ নামক চুক্তির মাধ্যমে একজন মহিলাকে ঘরে আনে তার (এবং/অথবা তার বাবামার) ঘর সংসারের কাজের লোক জোগাড় করার জন্য—এই অর্থনৈতিক সামাজিক অপ্রিয় সত্যটি যে কেবল পুরোনো বাংলার বরযাত্রার প্রাক্কালীন ”মা, তোমার জন্য দাসী আনতে চললাম”—এই বয়ানটিতেই লুকিয়ে আছে তা নয়—ডুরখাইমের সমাজতত্বেও স্পষ্টই বলা আছে, আদিতে বিবাহ হল পুরুষের শ্রমলাঘবকারী চুক্তি বিশেষ। কিন্তু মানুষ যত সভ্য হয় পুরুষের চুক্তিবদ্ধ ”বহির্জগতের” কাজকর্ম যতই টাকার লেনদেন ও চাহিদার বৃদ্ধি ও জোগানের হ্রাস অনুযায়ী দামি হয়ে ওঠে, পিতৃগৃহ ছেড়ে আসা মেয়েটির স্বামীর ঘরে খাটুনি ততই যেন আদানপ্রদানের চুক্তির বাইরে, বড়োজোর একটা ”অন্দরমহলের” অমূল্য আত্মদান হিশেবে, বা নৈতিক কর্তব্য হিসেবে ”কাজ” শ্রেণী থেকে বহিষ্কৃত হয়, কর্মরূপে অদর্শনীয় হয়। শেষপর্যন্ত মিথ্যে কথা না বললে, চুরি না করলে যেমন কেউ পারিশ্রমিক বা কৃতিত্ব পায় না, তেমনি নিজের সংসারে দিবারাত্র খাটলেও সেটা অ-করণের মতো অনুল্লেখযোগ্য, অ-পুরস্কার্য হয়ে উপেক্ষিত হয়।

অবশ্যই ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির সার্বিক বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সমান-অধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকারের ধুয়াও সোচ্চার হয়েছে। ফলে মুক্ত বাজারে চাকরির ও অর্থোপার্জনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন প্রথমত: পশ্চিমী, অতঃপর তাঁদের অনুকরণে এশিয়ার মহিলাবৃন্দও। এখানে মনে রাখতে হবে, কৃষিপ্রধান পশুপালক সমাজে কিন্তু প্রাচীন কাল থেকেই পুরুষের সাথে সাথে কখনো বা পুরুষের থেকে বেশি শ্রম ও সময় দিয়ে মহিলারা কাজ করে এসেছেন—ঘরে শুধু নয়—বাইরে, খেতে, খামারে, পাহাড়ে উপত্যকায়।

১৯৮৫ সালে Journal of Labor Economics-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে (মানবমূলধন, প্রযত্ন, এবং লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাগ) শিকাগোর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার পরিসংখ্যান দ্বারা দেখিয়েছেন যে উনিশশো পঞ্চাশের দশক থেকে তিরিশ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত যত মহিলারা বাজারে বাইরে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেছেন তত তত বিবাহবিচ্ছেদ বেড়েছে, গর্ভধারণ ও শিশুজন্মদানের হার কমেছে এবং গৃহকর্মের বাজারীকরণ (অর্থাৎ মাইনে দিয়ে শিশুপালন ইত্যাদি করানো) বৃদ্ধি পেয়েছে। বাইরের অর্থকরী পেশায় যোগ দেবার আগে যে সময় ব্যয় করে মহিলারা দামহীন লালনপালনাদি গৃহকর্মে দক্ষতা অর্জন করে সগৌরবে সংসারনির্বাহ করতেন—সেই সময় ও কুশলতা পণ্যের ও শ্রমের খোলা বাজারে বিক্রয় করলে তাঁরা অনেক বেশি স্বাধীনতা ও অর্থ উপার্জন করতে পারবেন। আর এই বোধ জাগ্রত হলে পরে অত্যাচারী বা উদাসীন স্বামীর অধীনস্থ থাকা, পুরস্কারহীন সেবাকর্মে বা প্রণয়ের ”পুতুল খেলা”য় মগ্ন থাকার একটি স্বাস্থ্যকর লাভজনক বিকল্প খুঁজে পেয়ে মার্কিন নারী আরো ঘন ঘন অপছন্দের বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসছে। একেই বলে ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানো’।

গর্ভধারণ ও শিশুপালনের জন্য আবশ্যিক ও বিকল্পহীন ভাবে নারীকে যেভাবে ঘরবন্দী হতে হত তাতে ”উৎপাদনহীন/উপার্জনহীন”—কালক্ষেপ হয় বলে একবার পেশাগত বাজারীকৃত কাজের সন্ধান পেলে গৃহিণীরা আর পুরুষের অশুল্কদাসী হয়ে পুরুষের সহায়তাহীন সেবাকর্মে বন্দী থাকতে প্রেরণা পান না।

কিন্তু একটি ব্যাপার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গ্যারি বেকার-ও বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন। স্ত্রীজাতির এই লালনের বদলে উপার্জন, দরকার হলে পয়সা দিয়ে দাসী রেখেও অফিসে কাজ করায় গোটা পরিবার অর্থকারীভাবে উপকৃত হলেও, যে হারে তিরিশ বছরে মহিলাদের বাজারের কাজে যোগদান বেড়েছে, সে হারে কিন্তু মহিলাদের ঘণ্টাপ্রতি পারিশ্রমিক বাড়েনি।

The modest increase in the hourly earnings of women relative to men, during the last 30 years in the united states and many other western countries has been an embarrassment to the human capital-interpretation of sexual earnings differentials.”

শুধুমাত্র গ্যারি বেকার নন— R. Gronau, L. Goldschmidt-Clermont প্রভৃতি অর্থনীতিবিদরা বিনামাইনের ঘরের কাজ বিষয়ে সত্তর ও আশির দশকে বড়ো বড়ো পরিসংখ্যান ভিত্তিক গবেষণা চালিয়ে ‘থিয়োরি অব হোমপ্রোডাকশন’ নামে একটি উপশাখা মূলধারার অর্থনীতির মধ্যে সংযোজন করেছেন। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থায় বাজারে বিক্রয়যোগ্য কাজ যেহেতু করতে যেতে হয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে, কমবেশি দূরে, —সেহেতু শ্রমিক বা চাকুরিজীবীর দৈনন্দিন গৃহ-থেকে-কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য খরচ হওয়া সময়টা তার উৎপাদনক্ষমতা ও কর্মস্থলনির্বাচনের অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। মূলধারার অর্থনীতিবিদরা তাই আজকাল ‘ঘরে বসে কাজ করলে এর উৎপাদন/রোজগার’ কতটা হত আর ‘কলকারখানায় বা অফিসে কাজ করে এর উৎপাদন/রোজগার কতটা হয়’—এই তুলনার মধ্যে যাতায়াতের কালব্যয় এবং ক্লান্তিজনিত শরীরক্ষয়ের একটা পরিমাপযোগ্য হিশেবকেও অন্তর্ভুক্ত করার দিকে ঝুঁকছেন। এই পরিমাপের মধ্যে অবশ্যম্ভাবী ভাবে এসে যাচ্ছে ঘরকন্নার কাজের মূল্য ও সময়সাপেক্ষতার প্রশ্ন। একদিকে যেমন ঘর থেকে দূরে সিনেমা থিয়েটার দেখতে যাবার সন্ধ্যায় একই সঙ্গে বাইরে রাতের খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা করাটা অন্তত ছোটো পরিবারের পক্ষে বুদ্ধির কাজ, অন্যদিকে পয়সা বাঁচাতে গেলে এই দুটি যুগ্ম-”মজার” জুটি কেটে যায়—এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দেখা দেয়। তেমনি লোকজনকে খেতে ডাকলে রান্না করার বদলে বাইরে থেকে খাবার আনানো রোজগেরে গিন্নির পক্ষে শ্রমলাভ করলেও ছাপোষা গৃহস্থের পক্ষে বিশেষত সেই আতিথ্যের দিনেই নিজেরা রান্না করে খাওয়ানোটাই ব্যয় সংক্ষেপকারী। অথচ দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার কাছে গৃহিণীর স্বাস্থ্যরক্ষার পক্ষে কেনা খাবার খাইয়ে পরিশ্রম এড়ানো—এক্ষুনি বেশি ব্যয়সাধ্য হলেও—আখেরে হয়তো চিকিৎসার খরচা কমানোর সহায়ক। এইভাবে গৃহকর্মের মূল্য শেষপর্যন্ত স্ত্রীপুরুষের শ্রমবিভাগ এবং কালক্রমে শ্রমবিনিয়োগ পরিণতির বিচারে পর্যবসিত হয়েছে।

শুধু পুঁজিবাদী নয়, এমনকী মার্কসবাদী অর্থনীতিতেও গৃহকর্মকে কর্ম বা শ্রম হিসেবে স্বীকার করার অনেক অসুবিধে ছিল। তরুণ মার্কস যখন শ্রমের বিচ্ছিন্নতা বা ইতরীকরণ (alienation) ইত্যাদি ধারণার অবতারণা করছিলেন তখন তিনি কলকারখানা তথা বাজারে বিক্রয়যোগ্য শ্রমের কথাই মূলত ভাবছিলেন। আর (তাই ইংরেজি অনুবাদে “at home” কথাটির প্রচলিত রূপকার্থ ধরে নিয়ে) তিনি লিখেছিলেন যে পুঁজিবাদের অধীনে মানুষ (পুরুষমানুষ?) যখন কাজ করে, খাটে তখন “He is not at home” (সে স্বস্থ, ধাতস্থ, নিজগৃহবাসী থাকে না) আর যখন সে বাড়িতে থাকে তখন “he is not working”. কিন্তু সেকেলে গৃহিণীর ঘরের কাজ অবিশ্রাম, অন্তহীন—কারণ তথাকথিত বিশ্রামস্থল অর্থাৎ গৃহই হল তার কর্মস্থল। মার্কসের শ্রমতত্ব মেনে নিলে তাঁর বিষয়ে বলতে হয় “If she is not at home whenever she is working, then, since she works only at home– she is not at home when she is at home”—গৃহকর্মব্যাপৃতা গৃহিণী স্বগৃহেই পরবাসিনী, তাঁর গৃহে থাকাই তাঁর গৃহে (”স্বস্তি”-স্থানে) না-থাকা, তাঁর কাজও অকাজ, গৃহও অগৃহ।

শ্রমকে পণ্য করে বিক্রি করার যে সংগঠিত বা অসংগঠিত বাজার যাতে বৃহৎ বা ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি বা কুটীর শিল্পের উৎপাদিত মালপত্রের চাহিদা জোগানের টানাপোড়েন, এবং শ্রমের বাজার পূর্ণ বা অপূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে মূল্য নির্ধারণ হয় গৃহকর্ম বা ঘরকন্নার শ্রম সেই জাতীয় বাজারের আওতাতেই পড়ে না বলে আপাতত মনে হয়। এবং তাকে—অর্থাৎ তথাকথিত ”মা বোনেদের সেবাযত্ন” ও গৃহকর্মকে বাজারের আওতায় আনাটাই অনুচিত বলে আমাদের অনেকেরই ধারণা।

এমনকী যৌনকর্মী বা পেশাদার ভিখিরিদের কাজও যেভাবে কাজ হিশেবে স্বীকৃত এবং পারিশ্রমিক দ্বারা (ন্যায় বা অন্যায়ভাবে) পুরস্কৃত, গৃহবধূর কাজ সেভাবে স্বীকার্য কিনা তাই নিয়েও অনেক অনেক সংশয়ের অবকাশ আছে। স্বগৃহ যেহেতু ”বিশ্রম”—অর্থাৎ শ্রমের অভাব—উপভোগ করার স্থান হিশেবেই পুরুষের চোখে সংরচিত (constructed) সেহেতু স্বগৃহ স্বগৃহই থাকবে না যদি সেই গৃহের কাজের জন্য কেউ পারিশ্রমিক দাবি করে।

যদিও, হয়তো বা এই প্রবন্ধের পাঠক উচ্চশিক্ষিত বিদগ্ধ কোনো পুরুষ মানুষই জোর গলায় এইসব কথা বলবেন না তবু পিতৃতান্ত্রিক বাঙালিসমাজের অনেক পুরুষমানুষই—এবং অধিকাংশ মহিলাও হয়তো —গৃহকর্ম কেন ঠিক ”কাজ” নয় তার যুক্তি হিসেবে নিম্নলিখিত সাতটি যুক্তির কয়েকটিকে অন্তত অস্পষ্টভাবে সমর্থন করবেন:

১. ঘরের কাজ ঠিক কাজ নয় কারণ ওতে কিছুই নতুন জিনিস উৎপাদন হয় না। বড়োজোর ধুলোবালি দূর করা, পরিবারের লোকদের এবং অতিথিদের ক্ষুধাতৃষ্ণা দূর করা, অসুখবিসুখের কষ্ট কমানো ইত্যাদি ”নেগেটিভ” (ধ্বংসাত্মক) সৃষ্টি করা (অসুখবিসুখ বা রোগজীবাণুর প্রাগভাব রক্ষা করা)—ওই কাজের ফল হতে পারে।

২. অভ্যাস হয়ে গেলে পরে ওতে শারীরিক খাটুনি বা ক্লেশ ততটা হয় না। যে কায়ক্লেশ খেতখামারে অথবা কারখানায় খাটলে হয়, অথবা বাসে ট্রামে যাতায়াত করে অফিসে হাড়ভাঙা খাটুনিতে হয়। সে তুলনায় অধিকাংশ স্থলে গৃহকর্ম—বিশেষত শ্রমলাঘবকারী যন্ত্রপাতি এবং দাসদাসীর সহায়তায়—মোটেই শ্রমসাধ্য নয় বলে ওই কাজ ”কাজ” নয়।

৩. গৃহকর্ম কর্মই নয় কারণ ওটা কেবল যান্ত্রিক শারীরিক কাজ। ওতে মাথা লাগে না। বুদ্ধি খাটাতে হয় না। এখানে সাবধানে লক্ষ্য করতে হবে যে পুরুষমানুষ (অথবা তার স্থলাভিষিক্ত চাকুরিজীবী মহিলা) যখন বাস্তবে কম্প্যুটার বা মোটর পাটর্স তৈরির কারখানায় ‘যন্ত্র’ নিয়ে কাজ করে, তখন শত অভ্যস্ত ও যান্ত্রিক হলেও, তার কিন্তু ‘কাজ’ হিশেবে সম্মান আছে—যেহেতু তা করা হয় ঘরের বাইরে এবং বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রদ্বারা। কিন্তু শিলনোড়া, বা হাতাখুন্তি ইডলি বানাবার ছাঁচ অথবা কাঁথাসেলাই-এর ছুঁচ দিয়ে যে কাজই করা হোক—তাকেই এক অস্পষ্ট অবজ্ঞার সঙ্গে যুগপৎ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ”যান্ত্রিক” অথচ ঠিক যন্ত্রচালনামূলক নয় বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যান্ত্রিকতা দুরকমের—সম্মানজনক যান্ত্রিকতা (”সারাদিন হাসপাতালে X-Ray মেশিন চালাচ্ছেন”) আর তুচ্ছ-যান্ত্রিকতা (”রোজ বসবার ঘরে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালিয়ে পরিষ্কার করছে”।)

বলাবাহুল্য, এই প্রথম তিনটি যুক্তিই সর্বৈব অমূলক, সছিদ্র। তা শুধু নয়, এই দ্বিতীয় আর তৃতীয় যুক্তি পরস্পরবিরোধী। কোনো কাজ যদি শুধুমাত্র শারীরিক পরিশ্রমমূলক হয় (তিন নম্বর যুক্তি) তাহলে সেই কাজে কোনো শারীরিক খাটুনি নেই (দুনম্বর যুক্তি) তা হতেই পারে না। অভ্যাসের ফলে যদি ঘর গোছানো, রান্না করা, শিশুপালন ও অতিথিসৎকারের পরিশ্রম ”গায়ে লাগে না”—এমন হয়, তাহলে অভ্যাসের ফলে অফিসকাছারি কারখানায় কাজও গায়ে না লাগার কথা। আর সেবাযত্নের কাজে, রান্নার কাজে, পরিবারের সদস্যদের নিত্যনূতন রোগ-দুশ্চিন্তা-সামাজিক বিপর্যয় সামাল দিয়ে তাদের পোষণ করার কাজে যদি কেউ বলেন ”মাথা লাগে না” তাহলে কখনো সেই ব্যক্তি নিজে সেজাতীয় কাজ করেননি বলেই প্রমাণিত হয়। দিনে দশটা দুরূহ অপারেশন করে যে শল্যচিকিৎসক অভ্যস্ত—তাঁর কাজে যতটা মাথা লাগে—দক্ষ অভ্যস্ত গৃহকর্মনিপুণা গৃহিণীর কাজে ততটাই মাথা লাগে। কেবল সেই ”মাথা”র অনেকখানি হল ”হৃদয়”। আর হৃদয় দিয়ে করা কাজকে কাজ মানতে আপাতত সকলেরই অসুবিধে। এ বিষয়ে কলিন ড্যানবি (“Lupita’s Dress: Care in Time”, Hypatia, Fall 2004) লিখছেন—”নারীবাদী চিন্তায় “Care” তথা সেবাযত্নের কর্মনীতিশাস্ত্র প্রসঙ্গে হৃদয়াবেগ দিয়ে সেবাকর্মকে অন্যকর্ম থেকে বিশিষ্ট ভাবে বোঝা হয়েছে। বাজারের শীতল হৃদয়হীনতার বিপরীত মেরুতে এক উষ্ণ পারিবারিক বা বন্ধুত্বমূলক সম্বন্ধ হিশেবে “Caring” কে ধরা হয়েছে। কিন্তু এ জাতীয় নিছক বিপরীতকরণ বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা দরকার।”

যদিও ”ওকস” মানে সংস্কৃতে গৃহ বা ঘর, তাই যাঁরা বনেই ঘর বাঁধেন সেই সব বনবাসীকে বলে ”বনৌকসঃ” যে প্রাণী জলে থাকে তাকে বলে ”জলৌকা” (জোঁক), যে দেবতারা দ্যুলোকে থাকেন তাঁরা ”দিবৌকসঃ”। আর এই ওকস বা গ্রীক শব্দ ওইকস থেকে এসেছে “Oekonomics” বা ”ইকনমিকস” শব্দটি। কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্য ইকনমিকস গৃহাভ্যন্তরে মানবিক সম্বন্ধ ও তার পরস্পরনির্ভরতার থেকে সযত্নে দূরে থেকেছে।

ইকনমিকস এবং যন্ত্রপ্রযুক্তিবিদ্যা ”কাজ” (work) কে বুঝতে শিখেছে এক আশ্চর্যরকমের যন্ত্র-ব্যবহার, শরীরসঞ্চালন ও সম্পদসৃষ্টির বাজার-ভিত্তিক মাপকাঠিতে। আর সেই মাপকাঠি মনে করে সাদর সহৃদয় সেবা একটা মেরুতে রয়েছে—আর ঠিক তার বিপরীত মেরুতে রয়েছে নিরাদর হৃদয়হীন যান্ত্রিক কাজ। এই বৈপরীত্যকে গভীরতর করার জন্য বলা হয়“Machines can do many useful things but they cannot care.” আবার “As any good manager knows, people are not machines”.

অথচ যদি এই বৈপরীত্য মানতে হয় তাহলে মানবিক সম্পর্কসংস্থাপক সেবাকর্ম নিতান্ত অযান্ত্রিক (যেমন গৃহের সেবাকর্ম) অথচ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অফিসে খেতখামারে লাভজনক কর্ম নিতান্ত যান্ত্রিক। কোনো অর্থেই সেবাকর্মকে ‘যান্ত্রিক’ বলা চলে না। ড্যানবি, Noddings, Tronto প্রভৃতি নারীবাদী দার্শনিকের কাজ উল্লেখ করে বলছেন যে পরের প্রয়োজন বোঝবার ক্ষমতা, অন্যের অনুভূতির প্রতি মনোযোগ, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা, একটা গোটা ছোটোখাটো সামাজিক-সংগঠনের দায়িত্ব নেওয়া, সবসময়ে ভঙ্গুর সম্বন্ধকে মেরামত করতে প্রস্তুত থাকা—ইত্যাদি যেসব বৈশিষ্ট্য বা দক্ষতাগুলি সেবাকর্ম বা লালনকর্মের মূলে রয়েছে, সেই দক্ষতাগুলিকে ঠিক এই ভাষায় ”কর্মকুশলতা” বলে মেনে নেয়নি আধুনিক ম্যানেজমেন্ট শাস্ত্র। এগুলিকেই পরিমাপযোগ্য একটা যান্ত্রিক খরচ imageউশুল, বিনিয়োগimageপ্রতিদান ইত্যাদির নিরিখে মূল্যায়ন করা হয়েছে “these qualities are re-coded in masculinized management jargon to mark their higher status and pay”. কিন্তু মূলে রয়েছে একটি চিন্তা “our base concept of work remains machine-like.” একটি কাজের পিছনে হৃদয়ের উষ্ণতার কথা তোলা মানেই সশ্রদ্ধভাবে সেই কাজটিকে যান্ত্রিক-মূল্যবান কাজের এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলা। এই ঝোঁকের কথা মনে রেখে এবার আরো চারটি যুক্তি শোনা যাক:—

৪. যান্ত্রিক হোক অথবা বুদ্ধিপূর্বক হোক, প্রয়োজনীয়, শ্রমসাধ্য যাই হোক না কেন গৃহকর্ম গৃহিণীরা করেন ভালোবেসে, প্রাণ দিয়ে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে। অতএব ওটা ঠিক ‘কাজ’ নয়। বিশেষত দক্ষ পরিবার ও স্বামীপুত্রকন্যার প্রতি সমর্পিতপ্রাণা মহিলারা স্বাধীনভাবে, নিজইচ্ছায়, সানন্দে যে কাজ করেন, না করে থাকতে পারেন না—সেই কাজকে শ্রম বলা চলে না। বলা বাহুল্য, এই যুক্তিটির মধ্যে আছে দুটি হেতুবাক্য বা প্রাক-স্বীকৃতি। প্রথমত, কেবল ইতরীকৃত কাজই কাজ, দ্বিতীয়ত: গৃহকর্ম গৃহিণীর পক্ষে ইতরীকৃত কাজ নয়। এই দুটি হেতুবাক্যই সুগভীর ভাবে আপত্তিকর এবং সন্দেহজনক।

পঞ্চমত: গৃহকর্মের কোনো পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কথা দিয়ে, কাজ দিয়ে, নীরব মানসিক সাহচর্য ও সমর্থন দিয়ে, কখনো বিরোধ কখনো প্রশ্রয়, কখনো বাধা কখনো প্রোৎসাহন দিয়ে আমার মা বৌ আমাকে যে সেবা করেন, যে পোষণ করেন তার কী মাপজোখ সম্ভব? আর সেজন্যই তা বাজারের পণ্য হবার যোগ্যই নয়। আর তাই একে চাকরি বা পেশার মতো বেতনযোগ্য কর্ম হিশেবে ভাবাটাই ভুল। এই যুক্তির পেছনে থাকতে পারে মাতৃস্নেহের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা অথবা মাতৃঋণের অপরিশোধ্যতা বিষয়ে আপ্লুত কৃতজ্ঞতা, কিন্তু এই যুক্তিটি শোনায় মাল্যদান করে নিখরচায় কাজ আদায় করার মতো শ্রদ্ধার ছদ্মবেশে শোষণের অজুহাত-তুল্য। যুক্তিটি যে অসার তা সহজেই দেখানো যায় এভাবে। দাসদাসীদের দ্বারা প্রায় সমস্ত গৃহকর্মই যখন করিয়ে নেওয়া হয়, এমনকী ”ইমোশানাল সাপোর্ট” কাজটুকুও যখন স-বেতন মনোবিশ্লেষক ”কাউন্সেলর” বা ”থেরাপিস্ট” করেন—তখন ঘণ্টা হিশেবে, কাজের প্রকৃতি হিশেবে, কাজের সংখ্যা হিশেবে অতিসহজেই সেই কাজগুলিরই পরিমাপ করা হয়ে থাকে। বিছানাতোলা, বাসনমাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, ঘরমোছা, আসবাবের ধুলোঝাড়া, শিশুপালন, রোগীর সেবা, রন্ধন, পরিবেশন ইত্যাদি কাজকে পৃথক পৃথক ধরে নিয়ে পরিচারিকার পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়। বরং একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সারাদিন ঠান্ডাঘরে বসে কতটা কাজ করলেন তার পরিমাপ কেবল ক’টা হস্তাক্ষর করলেন, কতজন লোকের সঙ্গে কথা বললেন তার হিশেব করে করা সম্ভব হয় না। উপাচার্যের কাজের এই ”অপরিমেয়তা” যদি তাঁর ‘কাজের শেষ নেই’ এই সিদ্ধান্তের অনুকূল হয়, তাহলে গৃহকর্মের এই (পরিমেয়?) অসংখ্যতা এবং এই অন্তহীনতাও কেন গৃহিণীর নিয়তকর্মময়তারই প্রমাণ হবে না? এক ক্ষেত্রে অপরিমেয়তা হবে মহার্ঘতা ও অবিশ্রান্ততার ভিত্তি (জজসাহেব চুপ করে বসে থাকলেও সারাদিন কাজে ব্যস্ত) অন্যক্ষেত্রে সেই অপরিমেয়তাই হবে অবৈতনিক নিত্যকর্ম বা অকর্মতার ভিত্তি (গৃহকর্ত্রী সারাদিন ঘর সাজাতে আর রান্নাবান্না করতে ভালোবাসবেন এতো স্বাভাবিকই—তিনি তো আর ‘কাজ’ করতে বাইরে যান না!)—এই যুক্তির বিষমতা নিতান্তই বিপজ্জনক মূর্খতা!

ষষ্ঠত: কেউ বলতে পারেন যে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া, দাঁত মাজা, স্নান করা, নিয়মিত খাওয়া ইত্যাদিতে যতই সময় লাগুক আর পরিশ্রম হোক—এসব ক্রিয়াকে ‘কাজ’ বলে দাবি করা বা তার জন্য কৃতিত্ব দাবি করা যেমন সংগত নয়, তেমনি গৃহিণীর গৃহকর্ম তাঁর নিজেরই কাজ, আপন স্বাস্থ্যের রক্ষণাবেক্ষণের তুল্য, তাঁর ব্যক্তিগত ‘প্রাইভেট’ কাজ; পাব্লিক স্ফিয়ারে এই কাজকে ব্যয়িত সময়, শরীর সঞ্চালন, কুশলতা অর্জনের সময়-বিনিয়োগ, মনঃসংযোগ ও বুদ্ধিপ্রয়োগ, ক্লেশ, অনিচ্ছা-দমন, ও কষ্টবোধ ইত্যাদি পাঁচ রকমের মাপকাঠি দিয়ে মাপা আদৌ উচিত নয় (যদিও ওই পাঁচ নিরিখে গৃহকর্মই সব থেকে দামি কাজ হওয়া উচিত!)। গৃহ হল গৃহিণীরই বৃহত্তর শরীর। তাই তার সেবা হল তাঁর স্বদেহপরিচর্যার মতো। তার জন্য কেন তিনি বিশেষ করে কর্মশীলতার বাহাদুরি দেখাবেন?

এই যুক্তিতেও অজস্র ছিদ্র। সব থেকে বড়ো ছিদ্র হল এই। গৃহ যদি গৃহিণীর নিজের ব্যাপকতর শরীরের তুল্য হয়—তাহলে একই যুক্তিতে তা গৃহস্থ সকলেরই শরীরবৎ। স্বামী এবং স্ত্রী, পিতা এবং মাতা উভয়ের পক্ষেই তাহলে এই গেহ-দেহের রক্ষা ও শোভাবৃদ্ধির জন্য সমপরিমাণ কর্মব্যস্ত থাকাটাই স্বাভাবিক হত। কিন্তু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে ”গৃহিণী গৃহমুচ্যতে”—এই পুরাতন কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে গৃহিণীর একরকমের জড়-অচেতন চিত্র যাতে ঘরদোরের অঙ্গ হিসেবে সেবাকর্মনিপুণা এক মহিলাকে ধরেই নেওয়া যায়। তাতে গৃহকর্মকে একটা রোদবৃষ্টির মতো নৈসর্গিক ঘটনা, প্রাকৃতিক ব্যাপার হিশেবে ধরে নিলে ওটাকে আর পুরুষের কাজের মতো প্রযত্নসাধ্য বুদ্ধিপূর্বক পুরস্কার যোগ্য কর্ম হিশেবে মানতে হয় না। বাড়ির বাগানে যেমন ফুল ফোটে রান্নাঘরে তেমনি রান্না হয়, আবার খাবার টেবিলে খাবার হাজির হয়, তা নইলে ”গৃহকর্তা গৃহমুচ্যতে”—গৃহকর্তা পুরুষের আবাসস্থলই তার শরীর এটাও কেন ধরে নেওয়া হল না? নারীর পিতৃগৃহ অথবা পতিগৃহ যে তার বিকল্পহীন অবিচ্ছেদ্য অত্যাজ্য শরীর, আর পুরুষের নিজের গৃহও তার পক্ষে পরিহার্য অবিকল্প (optimal) একটি বাসস্থান মাত্র—শরীর নয়, এই বৈষম্যকেই তো বলে ‘পিতৃতন্ত্র’।

সপ্তমত: এই পূর্বোক্ত যুক্তিরই জের টেনে কেউ বলতে পারে যে গর্ভধারণ স্তন্যদানের মতন লালনপালন প্রাকৃতিক নিয়মেই মাতৃজাতির কর্তব্য। এটা তাদের স্বধর্ম—তারা ছাড়া কেউ করতে পারে না; একাজ না করে তারাও থাকতে পারে না। অতএব এই কাজ সমাজের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়া হলেও কেউই ঠিক তাদের ওপরে এটা চাপিয়ে দেয় না। তাই এই কাজকে মহিলাদের স্কন্ধে কর্মভার বলা যায় না।

এই যুক্তিও বলতে না বলতেই ঠুনকো এবং বাজে বলে প্রতিপন্ন হয়। পুরুষের স্বভাব ঘরের মধ্যে অকর্মণ্যতা এবং কেবল বুদ্ধি দেওয়া আর সব পরিদর্শন করে মন্তব্য করা—এই অজুহাতেই কি তাহলে পুরুষ কিছু করলেই সেটা কাজ হয়ে ওঠে? কোনো খাটুনিই তাহলে কাজ নয় যদি না তা কর্মীর অনভ্যস্ত অথবা অপছন্দ হয়? তাহলে যদি কেউ ছোটোবেলা থেকে ভয় পেয়ে তীর বেগে লম্বা রাস্তা দৌড়োতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে পরে তার এই তীব্রবেগে ছোটার ক্রিয়াটাকে ‘কাজ’ বলা হবে না? যদি এই দৌড়োবার দক্ষতার জন্যই সে দূরপাল্লার দৌড় প্রতিযোগিতায় অনেক মেডেল পায় এবং পুলিশে চাকরি পায় অথবা ইশকুল দৌড় শেখানোর শিক্ষকতা করে তাহলেও কি দৌড়ানো তার পক্ষে ”স্বাভাবিক” বলে তার কাজটা ”কাজ” হবে না? একটি হলিউড ছবি বছর দশেক আগে হয়েছিল ”ফরেস্ট গাম্প” নামে। তাতে একটি মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী বাচ্চার এক অলৌকিক দৌড়দক্ষতা ও পিং পং খেলার প্রবণতা থেকে সে অলিম্পিকে স্বীকৃতি এবং জাতীয় চ্যাম্পিয়ানশিপ এবং মিলিটারিতে চাকরি পায়। সেখানে কখনোই অনায়াস, স্বাভাবিক, স্বেচ্ছাপূর্বক কাজ ”কাজ” বা ”পেশা” হতে পারে না তা ধরে নেওয়া হয়নি। উলটোটাই দেখানো হয়েছে। অনিচ্ছুক অনভ্যস্ত অস্বাভাবিক কর্মকর্তাই ক্রিয়াশীল—স্বেচ্ছায়, অভ্যস্ত, সহজাত প্রবৃত্তিবশে যে যা করে সেটা অক্রিয়া—এই ধারণাটা ঠিক যতটাই মিথ্যা, দুঃখের বিষয়, ততটাই আমাদের অবচেতনায় দৃঢ়প্রোথিত।

৩. রত্নগর্ভা গৃহকর্ত্রী রাসসুন্দরীর সংসারযাত্রা: একটি দ্বান্দ্বিক অবভাসতত্ব

মহাভারতে পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসকালে পাণ্ডবঘরনী দ্রৌপদীকে করতে হয়েছিল বিরাট রাজার ঘরে রানির পরিচারিকা ”সৌরিন্ধ্রী”র কাজ। দুষ্ট কীচকের রিরংসার শিকার হওয়া ছাড়াও তাতে ছিল দ্রৌপদীর দৈনন্দিন দাসীত্বের বেদনা। বিরাট রাজপরিবারের ফাইফরমাশ খাটতে হত। অপছন্দের পুরুষমানুষদেরও মন ভরিয়ে চলতে হত। অথচ দ্রৌপদী ছিলেন অত্যন্ত তেজস্বিনী, একটু মুখরাও বটে—বিদ্রূপশাণিত বাক্য প্রয়োগে পটীয়সী। নিজের বীর এবং পণ্ডিত পাঁচস্বামীর দুর্দশা দেখে বারো বছর ধরে তাঁদের সঙ্গে পথে পথে ঘুরে তিক্ত হয়ে, নিজের পুত্রবধূকে আশীর্বাদ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন ”পুত্রবতী হও, কিন্তু তোমার যেন পণ্ডিত আর বীর পুত্র না হয়”! তাঁর ওপর চরম অন্যায়ের পর অন্যায় হয়েছে—কিন্তু তিনি সর্বদা স্পষ্টভাষায় তার প্রতিবাদ করেছেন। তবু তিনি পঞ্চস্বামীর সেবাতে অভ্যস্তা। শাশুড়ি কুন্তীও নিশ্চয়ই তাঁকে হুকুম করতেন। রবি বর্মার একটি বিখ্যাত ছবিতে লালশাড়িপরা দ্রৌপদীর সামান্য সেবাকর্মও হয়ে উঠেছে ক্লেশকর কর্মভার। হয়তো বা এ ছবি বিরাটপর্বের। হয়তো বা রাজশ্যালক কীচকের জন্যই তাঁকে নিয়ে যেতে হচ্ছে ভৃঙ্গারে ভরা মাধ্বীসুরা। কিন্তু আমার মনে হয় পৌরাণিক আখ্যানের দ্রৌপদীর খেদ ছাড়াও এই ছবিটির ব্যঞ্জনা রয়েছে সম্ভ্রান্ত রাজগৃহিণীদেরও দৈনন্দিন সেবাকর্ম যে মানসিক গ্লানি, শারীরিক ক্লান্তি এবং আত্মিক প্রতিরোধের জনক হয়—তার দিকে! পরিচর্যা এখানে দুরদৃষ্ট হিশেবে নাটকীয় ভাবে ধিক্কৃত।

রবি বর্মার দ্রৌপদীর সঙ্গে যদি প্রতিতুলনা করি য়ান ভারমিয়ারের (Jan Vermeer) বিখ্যাত প্রাতঃরাশ প্রস্তুতকারিণী দুধ ঢালা মহিলার ছবিটির—তাহলে দেখব দ্বিতীয় ছবিটিতে কোনো প্রতিবাদ নেই, রয়েছে মেনে নেওয়া। বরং গেরস্থালির একটা প্রাত্যহিক ”প্রাকৃতিক” স্নিগ্ধতা ও স্বাভাবিকতাই যেন ফুটে উঠেছে সদ্য সেঁকা পাঁউরুটি ও চীজ সাজানো টেবিলের ওপর জাগ-ভর্তি স্বাস্থ্যকর দুধঢালার প্রাতঃকালীন ”রিচুয়াল”টির মধ্যে। অন্দরমহলে প্রতি প্রত্যূষে পুরুষমানুষরা ওঠবার আগে মেয়েদের যে শ্রমদান চলে তার একটা লক্ষ্মীমন্ত ছবিই যেন স্বভাবসিদ্ধ বাস্তববোধের সঙ্গে তুলে ধরেছেন এই ওলন্দাজ শিল্পী। দুটি ছবিই এঁকেছেন পুরুষমানুষ। রবি বর্মা বা ভারমিয়ার কাউকেই শিশুপালন বা সংসারের দৈনন্দিন পাকশালার কাজ করতে হত বলে মনে হয় না। যাঁকে করতে হত তেমন একজন উনিশশতকীয় কথাশিল্পী—রাসসুন্দরী দাসী ছিলেন বাল্যে বিবাহিতা আদরিণী জমিদার গৃহিণী। অবিভক্ত বাংলার পাবনায় তাঁর জন্ম ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে। আর বারোবছরে চলে এলেন শ্বশুরবাড়ি ফরিদপুরের এক গ্রাম্য জমিদারের সংসারে। তাঁর নিজের স্বভাবোক্তি অলংকারে সাজানো উত্তমপুরুষীয় তুলিতে আঁকা গৃহকর্মের ছবিটি দেখা যাক—

”ঐ বাটীতে আটজন চাকরানী ছিল। তাহারা বাহিরের লোক। সেসময়ে ঘরের কাজের লোক ছিল না। ঘরের মধ্যে আমি একা মাত্র ছিলাম। আমি পূর্বের ঐ নিয়মমত সংসারের সমুদয় কাজ করিতাম! অধিকন্তু ঐ কয়েকটি (সব মিলিয়ে রাসসুন্দরীর ১০টি সন্তান হয়েছিল) সন্তান পালন করিতে হয়। এই সকল কাজের গতিকে আমার দিবারাত্র বিশ্রাম ছিল না। আর অধিক কি বলিব, আমার শরীরের যত্নমাত্রও ছিল না। অন্য বিষয়ে যত্ন দূরে থাকুক, দুবেলা আহার প্রায় ঘটিত না; কাজের গতিকে কোন দিবস একবার আহারও ঘটিত না।…এমনি কাজের ভিড়…সংক্ষেপে দুই এক দিবসের কথা বলা আবশ্যক বটে। আমি ঐ ছেলেগুলি নিদ্রিত থাকিতে থাকিতে প্রভাতে উঠিয়া ঘরের সকল কাজ করিতাম। উহাদের খাওয়ানো হইলে পরে অন্যান্য কাজ মিটাইয়া বিগ্রহ-সেবায় যাহা দিতে হয় তাহা সমুদয় দিয়া, আমাদের ঘরের রান্নার সকল আয়োজন করিয়া পাক করিতাম। সে পাকও নিতান্ত কম নহে। এক সন্ধ্যা দশ বারো সের চাউল পাক করিতে হইত। এদিকে বাটীর কর্ত্তাটির স্নান হইলেই ভাত চাই, অন্য কিছু আহার করিতে বড় ভালবাসিতেন না। এজন্য অগ্রে তাঁহার জন্য একপ্রস্থ পাক হইত। পরে অন্যান্য সকল লোকজনের জন্যে পাক হইত। এই প্রকার পাক করিতেই প্রায় বেলা তিন চারিটা গত হইত।

একদিন এই সকল খাওয়া-দাওয়া মিটাইয়া আমি যখন ভাত খাইতে বসিব ঐ সময়ে একজন লোক আসিয়া অতিথি হইল। …সে বলিল চাটটি ভাত পাইলে খাই। আমি যে তাহাকে পাক করিয়া দিব, সেসময়ও নাই। আর কি করিব, আমার ঐ যে মুখের ভাতগুলি ছিল, সেই ভাতগুলি ঐ অতিথিকে ধরিয়া দিলাম। আমি ভাবিলাম, রাত্রিতে পাক করিলে খাওয়া যাইবেক। পরে বৈকালে যে সকল কাজ করিতে হয়, তাহা একমত সারিয়া ছেলেদিগকে ঘুম পাড়াইয়া পাক করিতে চলিলাম। কিন্তু ঐ সময় আমার অত্যন্ত ক্ষুধা হইয়াছিল। আমি ঘরের মধ্যে একা, আর অন্য লোক নাই। ঘরের খাবার দ্রব্য নানাপ্রকার আছে। তাহা আমি খেলেও খেতে পারি, কে বারণ করে। বরং আমাকে খাইতে দেখিলে ঘরের লোকেরা সন্তুষ্ট হইবে। কিন্তু আমি ভাত ছাড়া অন্য জিনিস আপনি লইয়া কখনও খাইতাম না। এই জন্য আমার অনেক খাদ্য খাওয়ার বাদ হইয়া গিয়াছিল। আর আমি বিবেচনা করিলাম, আজ আমার খাওয়া হয় নাই শুনিলে সকলে গোল করিবে। বিশেষতঃ মায়ে খেতে বসিলে ছেলেপিলে আসিয়া ভারি গোলযোগ করিবে, তাহাতে অনেক সময় নষ্ট হইবে এবং কাজের অনেক হানি হইবে। আর সে লেঠা করিয়া কাজ নাই, এই ভাবিয়া পাক করিতে চলিলাম। তখন পাক করিয়া অনেক রাত্রি বসিয়া থাকিলাম। বাহির বাটীর কাছারী আর ভাঙ্গে না, কর্তাও বাটীর মধ্যে আইসেন না। তখন আমি অন্যান্য সকল লোককে ভাত দিয়া এক প্রকার কাজ মিটাইয়া কর্তার ভাত লইয়া বসিয়া থাকিলাম, আর মনে মনে ভাবিতে লাগিলাম, কর্তা এতক্ষণ পর্যন্ত আইলেন না, ইহার পরে ছেলেরা জাগিয়া উঠিবে। তাহা হইলে আমার আজি আর খাওয়া হইবেক না। এই ভাবিতে ভাবিতে সেই ভাবনাটি সিদ্ধ হইল। কর্তাও বাটীর মধ্যে আসিলেন, ছেলে একটি জাগিয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল। আমি কর্তার সম্মুখে ভাত দিয়া ঐ ছেলেটিকে আনিলাম। মনে করিলাম, কর্তার খাওয়া হইতে হইতে ছেলেটির ঘুম আসিবে। না হয় কোলে লইয়াই খাওয়া যাইবেক। তাঁহার খাওয়া হইতে না হইতেই আর একটি ছেলে উঠিয়া কাঁদিতে লাগিল। তখন মনে করিলাম, এ দুজনাকে লইয়াই খাওয়া যাইবে, এই বলিয়া সে ছেলেটিও আনিলাম। আমি ঐ দুই ছেলে লইয়াই ভাত খাইতে বসিলাম। ইতিমধ্যে দৈবাৎ ঝড় বৃষ্টি আসিল। তখন ঐ ঘরের দীপটাও নিভিয়া গেল। তখন অন্ধকার দেখিয়া ঐ দুই ছেলে কাঁদিতে লাগিল। আমার এত ক্ষুধা হইয়াছিল যে, আমি যদি ঐ ঘরে একা থাকিতাম, তাহা হইলে ঐ অন্ধকারেই ভাত খাইতাম। যে সকল চাকরাণী আছে তাহারা বাইরের লোক। রাত্রিকালে ছেলেদুটিকে কিছু অন্ধকারেও বাহিরে রাখা যায় না। বিশেষ ছেলে দুটি কাঁদলে কর্তাটি, কাঁদে কেন কাঁদে কেন, বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে সোর করিবেন। তদপেক্ষা আমার না খাওয়াই ভাল। তখন কাজে কাজেই ঐ ভাত ঐখানে রাখিয়া অন্য ঘরে যাইতে হইল। পরে ঝড় বৃষ্টি কম হইলে ঐ ছেলেরা ঘুমাইয়া পড়িল। তখন অধিক রাত্রি হইয়াছে, আমারও অতিশয় আলস্য হইল সুতরাং সে দিবস আর খাওয়া হইল না। পর দিবস ঐ নিয়মে সকল কাজ তাড়াতাড়ি সারিয়া পাক করিতে চলিলাম। আমার যে কল্য খাওয়া মোটেই হয় নাই তাহা কেহ জানে না। আমি সকল লোকের খাওয়া হইয়া গেলে পর খাইব ভাবিয়াছিলাম, কিন্তু কোলের ছেলেটিকে একটি লোকে রাখিয়াছে। তখন তাহাকেও খাইতে দিতে হয়, ছেলেটিকেও দুধ খাওয়াইতে হয় সুতরাং ঐ ছেলেটিকে ভাত দিয়া ছেলে কোলে লইয়া আমি ভাত খাইতে বসিলাম। বসা মাত্রেই ছেলেটি কোলের মধ্যে হাগিয়া দিল। তখন ঐ ছেলে কোলে থাকিয়া ঐ ভাতের উপর এত প্রস্রাব করিল যে সমূদয় ভাত এককালে ভাসিয়া চলিল।”

এই বর্ণনার মধ্যে একদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা চরম আত্মত্যাগ, অতিথিপরায়ণতা, একা হাতে প্রায় প্রাত্যহিক একটা অন্ন মহোৎসবের রান্না, দৈনন্দিন অল্পাহার অনাহার এবং ”ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের” ইতিহাস। অন্যদিকে রয়েছে একটা কষ্টসহিষ্ণু দায়িত্ববোধ, জটিল সাংসারিক সম্পর্কজালের মধ্যে একা ভারসাম্য বজায় রাখার প্রতিমুহূর্তের সুচিন্তিত সংগ্রাম। ভার্জিনিয়া হবুলফ “Professions for women’’ নামক একটি প্রবন্ধে বিদ্রূপাত্মক ভাবে লিখেছেন যে রক্ষণশীল পরিবারে বিবাহিতা মেয়েদের কাছ থেকে আশা করা হয় যেন সে গৃহদেহলীর দেবকন্যার মতো শুদ্ধ নিষ্কলঙ্ক আদর্শ সেবিকা হবে—তার কোনো নিজস্ব ইচ্ছা বা বাসনাই থাকবে না। সে পরের জন্য বলিপ্রদত্তা। “You may not know what I mean by the Angel in the House. I will describe her as shortly as I can. She was intensely sympathetic. She was immensely charming. She was utterly unselfish. She excelled in the difficult arts of family life. She sacrificed herself daily…in short, she was so constituted that she never had a mind or wish of her own, but preferred to sympathize always with the minds and wishes of others.”

পূর্বোল্লিখিত রাসসুন্দরীদাসীর ”আমার জীবন-এ” যদিও প্রায় এরকমই এক আত্মবিলোপকারী গৃহলক্ষ্মীর চিত্র আঁকা হয়েছে—তবু শেষ পর্যন্ত দীর্ঘজীবিনী রাসসুন্দরী ৮৮ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঈশ্বরের সঙ্গে কথোপকথন করে এই নিরহংকার অস্মিতা নিয়ে গদ্য পদ্য লিখে জাঁকিয়ে সংসার করলেন—তাঁর স্বকীয় চিন্তায় কিন্তু কোনো দেবত্বের অভিমান ছিল না। কোনো angelic purity বা স্বর্গীয়তার ছোঁয়াও ছিল না তাঁর চাপা কৌতুক ও সরল দুঃখের স্মরণবেদনার হালকা জলরঙে আঁকা সংসারের রক্তমাংসের টানাপোড়েনের গল্পে। কোলের ছেলের মূত্রে দিনান্তের প্রথম অন্নের গ্রাসটিও ভেসে গেল—তাতে এই নাস্তানাবুদ ক্ষুধার্ত শ্রান্ত জননী কর্ত্রী, ভোক্তী এবং মানুষীই হয়ে রইলেন। তাঁর আত্ম-নির্মাণে (self-construction যাকে বলে আজকাল) যেই ভার্জিনিয়া হবুলফ অনেক ঘাটতি, অনেক বিচ্ছিন্নতা, অনেক ”কৃতার্থ কৈংকর্যের (happy slave) শোচনীয় গহ্বর দেখাবার চেষ্টা করবেন তিনিই কিন্তু, দুঃখের বিষয়, বুদ্ধিজীবিনী লেখিকার জীবন সত্বেও আত্মানুসন্ধানে হতাশ হয়ে অল্পবয়সে আত্মঘাতিনী হলেন। তার মানে এই নয় যে এঁদের মধ্যে রাসসুন্দরীই পূর্ণাঙ্গ ”অমোঘ” মানুষী আর ভার্জিনিয়া হবুলফ একজন ”মোঘজীবিত” অসম্পূর্ণা ব্যক্তি। দুজনেরই মনুষ্যত্ব অত্যন্ত জটিল এবং সমৃদ্ধ। দুজনের সংবেদনশীলতাই গভীর। কিন্তু একজনের দৃষ্টি থেকে আরেকজনকে বোঝা বোধহয় কখনোই সম্ভব হবে না। (একালের কোনো মহিলা ঐতিহাসিক রাসসুন্দরীর আত্মজীবনীর বাদ-ছাঁদ দিয়ে ইংরেজী অনুবাদ ও ইংরেজী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে রাসসুন্দরীর টেকস্টের ওপরে এরকমই অবিচার করেছেন বলে গৌতম ভদ্র মনে করেন।) অতএব সংসারের ঘানি টানার দুঃসহ কষ্টের ‘ফেনোমেনলজি’ হিশেবে কারটা বেশি যথাযথ এই প্রশ্নই তোলা চলে না। বিশ শতকের প্রথম ভাগে ইউরোপে একজন গড়পড়তা গৃহবধূর দৈনন্দিন কাজের অবভাসতাত্বিক বিশ্লেষণ সব থেকে গভীর ভাবে করেছেন একরকম নারীবাদের জনয়িত্রী সিমোন দ বুভোয়া, তাঁর ”দ্বিতীয় যোনি” গ্রন্থে সেই বিশ্লেষণে আসবার আগে ”একরকম নারীবাদী” এই কথাটি বিষয়ে একটু সতর্ক হওয়া দরকার।

৪. নারীবাদের রকমফের

সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, যৌনপরিচয়াত্মক, লিঙ্গপরিচয়াত্মক, জ্ঞানতাত্বিক, নৈতিক—যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের পটভূমিকাতেই যে সব নারীবাদীরা এক কথা বলেন তা নয়। এমনকী নারীকর্মের নৈতিকতা ও লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাগ, তথা মহিলাদের কাজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বনাম সামাজিক নির্ভরশীলতা নিয়েও তাঁদের নিজেদের মধ্যে গভীর মতভেদ আছে। আমেরিকা ও ইওরোপে প্রথমযুগের নারীবাদীরা পুরুষের সমান অধিকার, পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাজারে অংশ নেওয়া এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সরকার নির্বাচনে ভোটের অধিকার ইত্যাদি দাবি করতেন। পরবর্তীকালে সমত্বের থেকেও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বিপরীত বিষমতা। সুদীর্ঘ কালের অমানুষিক অত্যাচার ও প্রতিবাদহীন অবমাননা ও বঞ্চনার পর সমত্বপ্রতিষ্ঠার জন্য অনেকক্ষেত্রেই প্রয়োজন বিপরীত প্রাধান্য। একেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলে ”ইতিবাচক ক্রিয়া” (affirmative action)। কাজেই দ্বিতীয় প্রজন্মের তীব্র নারীবাদীরা একসময়ে চেয়েছেন নারীশাসিত সমাজ—যা পুরুষকে দাবিয়ে রাখবে। অবশ্য তার থেকেও বেশি জোর দিয়ে অন্য আরেক রকমের নারীবাদীরা বলেছেন যে, যেই ব্যক্তিস্বাধীনতার ভিত্তিতে সমাজ সমান মানব-অধিকারের কথা তোলে—সেটাই ছদ্মবেশে পরম্পরাক্রমে জোটবদ্ধ পুরুষ সমাজের হৃদয়হীন প্রতিযোগিতার বাজারে শ্রমের ইতরীকরণ ও সামাজিক সম্পর্ককে পণ্যীকৃত করার ”উদারনৈতিক” চক্রান্ত। কাজেই নারীবাদের মধ্যে প্রধান দুটো দল হয়ে গেছে। এক হল—ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী লিঙ্গনিরপেক্ষ মানব-অধিকারনিষ্ঠ উদারনৈতিক নারীবাদ—দার্শনিকদেরমধ্যে যার সমর্থক হলেন মার্থা নুসবাম। অন্যদিকে রয়েছেন তীব্র বা র্যা ডিকাল নারীবাদীরা। এই দ্বিতীয় দলের মধ্যে আবার তীব্রতর হলেন নারীসমলিঙ্গক-প্রণয়ভিত্তিক লেসবিয়ান নারীবাদীরা, যাঁরা হয় বিপরীতলিঙ্গক বিবাহ তথা প্রথাগত পরিবার ব্যাপারটাকেই সন্দেহের চোখে দ্যাখেন অথবা পরিবারের বিষমলিঙ্গক পিতৃশাসিত চেহারাটাকে আমূল পালটে দিতে চান—যার ফলে গর্ভধারণ ব্যাপারটা নারীর আবশ্যিক বা সহজাত শারীরিক চরিত্র এই মূলধারণাটাই প্রত্যাখ্যাত হয়। সমলিঙ্গকমিলনোৎসাহী উগ্র নারীবাদী না হয়েও তীব্র নারীবাদী হতে পারেন মার্কসবাদী। সেক্ষেত্রে বিশেষত: সমাজের নিম্নবর্গের ধনহীন ক্ষমতাহীন পরিবারের রমণীদের ওপর যে শোষণ হয় তার এক রকমের ব্যাখ্যা হতে পারে এই ভাবে: পুঁজির মালিক দরিদ্র পুরুষশ্রমিকের ওপর যে শোষণ চালালো তার পুরো ধাক্কা সামলাতে সামলাতে আবার ঘরের ভিতর সেই হতাশা ইতরীকৃত শ্রমিক-পতির বিকৃত পৌরুষের শোষণও নিম্নবর্গের নারীসমাজকে ক্ষতবিক্ষত করে—এই বিশ্লেষণ থেকে, সুস্থতর সমাজে উৎপাদন সম্পর্কগুলির মধ্যে লিঙ্গগত উৎপীড়নমুক্তির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন মার্কসীয় নারীবাদীরা।

উত্তর-আধুনিক কালে সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে সন্দিহান ”তীব্র” নারীবাদ হল সেবাযত্ন ভিত্তিক-নৈতিকতাতে আস্থাবান নারীবাদ। এই নারীবাদ উপযোগবাদী, হিতবাদী, কান্টীয় শুদ্ধবুদ্ধিবাদী, সার্বিক নিয়মভিত্তিক সবরকমের নীতি দর্শনকে নাকচ করে, পরিস্থিতি ও পারস্পরিক সম্বন্ধের ভিত্তিতে (সারদা মা’-এর ভাষায় ”যেখানে যেমন সেখানে তেমন, যখন যেমন তখন তেমন”—এই জাতীয়) এক হৃদয়ের সাড়া-প্রধান নৈতিকতার সমর্থন করেন। ব্যক্তির অন্যনিরপেক্ষ ”স্ব-নিয়তত্ব” (auto-nomy)-কে এঁরা অনেক সময়েই পুংপ্রাধান্যের মিথ্যা আস্ফালন বলে সন্দেহের চোখে দ্যাখেন। মানুষে মানুষে, নারীপুরুষে, সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে, শিশু ও তার অভিভাবক প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে, ক্রেতা ও বিক্রেতা, অধ্যাপক ও ছাত্রছাত্রী, চিকিৎসক ও রোগী, বন্ধু, সহকর্মী, প্রতিবেশী—এঁদের সকলের সঙ্গে সকলের যে সম্পর্কের শাখাপ্রশাখা জাল বিস্তার করে রয়েছে—তার প্রতি নজর দিয়ে প্রতিটি পরিস্থিতি ও সম্পর্ক সমূহের আলাদা আলাদা দায়িত্ব, কর্তব্য, প্রত্যাশা, প্রতিদান, শাস্তি, পুরস্কার, ভালো, মন্দ, ন্যায় অন্যায়, বিচারার্হ হয়। এই সম্পর্ককেন্দ্রিক (ব্যক্তি বা নিয়মকেন্দ্রিক নয়) নৈতিকতার আলোকে দেখলে পরে, কৃষি, বাণিজ্য, অধ্যাপনা, যুদ্ধবিগ্রহ, শাসন, প্রতিরক্ষা, দণ্ডদান, বিজ্ঞান প্রযুক্তিবিদ্যার সব রকম কাজের পশ্চাতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চোখে পড়ে লালনপোষণ সেবাযত্নের কাজই। তাই সেবাযত্নভিত্তিক নীতিবিদ বা care Ethicistরা তথাকথিত পরিচর্যাত্মক কাজকেই মানবিক দরদী কল্যাণকর্ম হিসেবে আদর্শ করেছেন। যদি সচেতন মূল্যায়নযোগ্য কাজের পশ্চাতে থাকতে হয় প্রযত্ন তাহলে যত্ন করার কাজই যে সব থেকে বেশি নৈতিক কাজ হবে এই সহজ ব্যাপারটা কেন এতদিন দার্শনিকদের চোখে পড়েনি এটাই আশ্চর্য। সেবাযত্নের এথিকসের সূত্রপাত যাঁর মনস্তাত্বিক গবেষণা থেকে সেই ক্যারল গিলিগান লিখেছেন—

”নিজের এবং অন্যের দরকারের ডাকে সাড়া দেওয়ার, অন্যকে আঘাত না দেওয়ার, কষ্ট না দেবার (প্রায় অসম্ভব, সর্ব-উদযোগ স্তব্ধকারী) ব্রত থেকে শুরু করে ছোট থেকে বৃহত্তর সম্বন্ধের বৃত্তগুলিতে যোগসূত্র জ্ঞাপন, রক্ষণ ও বর্ধনের পরিপোষক যে চেতনা মানবিক সম্পর্কগুলির গতিপ্রকৃতি নিয়ে দরদের সঙ্গে ভাবে—সেই চেতনাই হয়ে দাঁড়ায় নীতিবোধ বা সদসৎ বিচারের ক্ষমতা। এই ক্ষমতা ব্যক্তিচেতনানিষ্ঠ হৃদয়াবেগ এবং বস্তুনিষ্ঠ স্বচ্ছদৃষ্টিকে এমন ভাবে জুড়ে দেয় যে তাতে চিন্তন ক্রিয়া এবং সেবাকর্মের মধ্যে একটা স্বাভাবিক মেলবন্ধন ঘটে। (“Reply to Critics, Ethic of Care, 1993)

যত্নদরদের জয়গানকারিণী নারীবাদীদের মধ্যে ইদানীংকালে প্রমুখ হলেন নেল নডিংস (Nel Noddings) ভার্জিনিয়া হেল্ড, জোন ট্রোন্টো (Joan Tronto) প্রভৃতিরা। সিমোন দ বুভোয়া এর অনেক আগেকার যুগের—পঞ্চাশের দশকের দার্শনিক। তিনি বেঁচে থাকলে সম্ভবত এই জাতীয় সেবাযত্নের নীতিশাস্ত্রকে একটু সন্দেহের চোখেই দেখতেন।

৫. ধূলোর সঙ্গে নিষ্ফল নিরন্তর লড়াই: অন্তঃপুরের অন্যায় অন্তবর্তিতা ও সিমোন দ বুভোয়া।

বিশশতকের প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক নাট্যকার রাজনৈতিক সাহিত্যিক জঁ পল সার্ত্র সুদীর্ঘকাল বসবাস করেছেন তাঁর প্রেয়সী সহকর্মিণী দর্শনশাস্ত্রে সমান ব্যুৎপন্না সাহিত্যিক সিমোন দ বুভোয়ার সঙ্গে। আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি-চারণায় শেষ বয়সে সিমোন বলেছিলেন তাঁদের ছোট্ট লেখালেখিসর্বস্ব বাউন্ডুলে সংসার বিষয়ে—

”বলাই বাহূল্য ঘরের কাজ—রান্নাবান্না ইত্যাদি আমিই করতাম, সার্ত্র, কিছুই করতেন না। তিনি তো ওই জাতীয় কাজ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিলেন তার কারণ তিনি একজন পুরুষমানুষ…আমার মনে হয় না যে সার্ত্রের সঙ্গে আমার প্রেম-সম্পর্কের কারণে আমি ওই নিত্যনৈমিত্তিক গৃহকর্মের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। বরং তিনি নিজে হাতে ওই কাজগুলি আদৌ করতে পারতেন না—তার কারণ প্রথাগত পুরুষ মানুষের মতো মানুষ হয়েছিলেন বা শিক্ষালাভ করেছিলেন বলেই তাঁকে গৃহস্থালির নিত্যকৃত্য থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকতে হয়েছিল।”

সিমোনের নিজের গ্রন্থরচনা, অধ্যাপনা, বহির্বিশ্বে নারী অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের কাজ এবং সাহিত্যসাধনা কিন্তু সার্ত্রের মতনই নিরলস ভাবে চলেছিল। আধুনিক সমাজবিদ্যার ভাষায় তিনি গৃহকর্ম করতেন Second Shift—দ্বিতীয় চাকরি হিশেবে যদিও সেই দ্বিতীয় চাকরি সব গৃহবধূর মতনই ছিল অবৈতনিক। বুভোয়ার Sceond Sex বইতে এই দৈনন্দিন একঘেয়ে, ছুটিহীন পুরস্কারহীন, স্বীকৃতিহীন ঘরকন্নার কাজের এক অতি সূক্ষ্ম অতি প্রাণস্পর্শী বাস্তব বর্ণনা আছে—যার কিছু অংশের আমি ভাবানুবাদ করার চেষ্টা করছি—

”ঘরোয়া কাজ—তা সে একাই হোক, অথবা দাসীর সাহায্য নিয়েই হোক—সেই কাজের দ্বারা নারী, নিজেকে, নিজের শারীর-মানস সীমাবদ্ধতাকে, অতিক্রম করে কোনো উদবর্তিতা (transcendence)-র অভিমুখী হতে তো পারেই না, বরং পুরুষের উদবর্তিতা সম্ভব হয় তার সঙ্গিনী গৃহিণীর বাধ্যতামূলক অন্তবর্তিতা (immanence)-র মূল্যে।

এই কাজের দ্বারা একজন নারী নিজের ঘরটাকে নিজের করে নেয়; নিজের জীবনের সামাজিক একটা কুলুঙ্গী তৈরি করে নেয়, এবং নিজের জন্য একটা পেশা বা বৃত্তি তৈরি করে নেয়। তাতে করে, রান্নার উনুন, আসবাবপত্র, থালাবাসন, ঝকঝকে তকতকে করে রাখা, এসব জড় জিনিসকে নিয়ে তার তৃপ্তি করে সংসার করা হয়, কিন্তু তার আত্মসীমিত অন্তর্বর্তিতা থেকে কোনো মুক্তিই সে পায় না (no escaps from immanence)—আর পায় না তার নিজস্ব বিশেষ ব্যক্তিত্বের কোনো স্বীকৃতি।

এই ঘরকন্নার কাজের প্রকৃতিই সম্পূর্ণ নঞর্থক। ধোয়া মানে ময়লা হটানো: গোছানো মানে এলোমেলো ছড়ানো ভাব নষ্টকরা, আর দারিদ্র্যের সীমার নীচে তো এই কাজে কোনো সন্তুষ্টিই সম্ভব নয়। নোংরা বস্তির ঘর, নারীর ঘাম ও অশ্রুপাত সত্বেও নোংরা বস্তির ঘরই থেকে যায়। অগণন মহিলা (আজো সারা পৃথিবীতে) সারাজীবন ধুলোময়লার বিরুদ্ধে এই অন্তহীন সংগ্রাম চালিয়েই দিনাতিপাত করে। এমনকী সমাজের উচুঁতলার মহিলার পক্ষেও সেই সংগ্রামে জয়লাভ নিতান্তই সাময়িক। তার কারণ গৃহকর্মের মতো অন্তহীন পুনরাবৃত্তিমূলক যন্ত্রণা আর হয় না। এ যেন সিসিফাসের গল্পে সেই প্রকাণ্ড পাথরকে ঠেলে তোলার মতো—যাকে ওপরে তোলা মাত্রই তা আবার গড়িয়ে পড়বে নীচে এবং আবার তাকে তুলতে হবে।

যা পরিষ্কার ছিল তা ব্যবহৃত হয়ে নোংরা হবে, যা নোংরা তাকে আবার দিনের পর দিন, বারবার, ঝেড়ে, ধুয়ে, মেজে পরিষ্কার করতে হয়। কেবল প্রহর গুনে গুনে গৃহিণী (নিজে বেঁচে এবং অন্যকে বাঁচিয়ে রাখতে রাখতে) নিজেকে ক্ষয়িয়ে ফেলেন।

তিনি কিছুই করেন না—কেবল বর্তমানে যা আছে তাকে ঠিক সেই রকম কোনোমতে রক্ষা করেন। তিনি কোনো শুভ বা দামি জিনিসকে জিতে নেওয়ার কথা ভাবেনও না। কেবল অশুভ, পচা, বাজে জিনিসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন—করেই চলেন। খাওয়া, ঘুমোনো, খাবার দেওয়া, ধোয়া, মোছা, ঝাড়া, …বৎসরগুলি, আর ক্রমে ক্রমে, থাকে থাকে, ওপর দিকে স্বর্গাভিমুখী হয়ে জমে ওঠে না। কেবল একঘেয়ে ধূসর সমতল ভূমি তাঁর দৃষ্টির সমান্তরাল সম্মুখে বিস্তৃত হতে থাকে, আশাহীন স্বপ্নহীন—ধুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জেতা আর হয়ে ওঠে না।”

বুভোয়ার বিশ্লেষণে শুধু এই তিনটি নেতিবাচক দিকই যে গৃহকর্মকে দুঃসহ করে তোলে—প্রথমত অনতিক্রমণীয় অন্তর্বতিতা (immanence), দ্বিতীয়ত: পুনরাবৃত্তিমূলক সৃষ্টিহীনতা, তৃতীয়ত কেবলমাত্র নঞর্থক দোষ ”গ্লানি অপসারণ—তা শুধু নয়; অনেক মহিলাই এই নোংরা ও অতি ব্যবহারের গ্লানির বিশৃংখলার বিরুদ্ধে দৈনিক ঘানি টানতে টানতে—একরকমের মনোবিকারের শিকার হন। পতঞ্জলির যোগসূত্রে আছে—শৌচাৎ স্বাঙ্গজুগুপ্সা পরৈঃ অসংসর্গঃ।”

এর প্রকৃত অর্থ না নিয়ে আক্ষরিক অর্থ নিলে শুচিতার বাতিকগ্রস্ত অনেক গৃহকর্ত্রীরই বর্ণনা হিশেবে এই বাক্যটিকে নেওয়া যায়। ”আমাদের এই বাড়িটা দিন দিন একটা বস্তির মত নোংরা হয়ে যাচ্ছে, চাকররা ঠিকমত ঝাড় পোঁছ করে না, এই যে আমি এত খেটে আলমারি পরিষ্কার করলাম বিছানা তকতকে করলাম, এগুলি ব্যবহার করে এখুনি বাড়ির লোকেরা নোংরা করে দেবে”—এই রকম অভিযোগ বড়োলোক মধ্যবিত্ত, দেশ, বিদেশ, এযুগ সেযুগ নির্বিশেষে শোনা যায় পরিষ্কার-মনস্ক গৃহিণীদের মুখে। নিজের এবং অন্যের পরিচর্যা ও পোষণের জন্যই যে কাজ আরম্ভ হয়েছিল সেই কাজের সাফল্যের পথে অন্যের এবং নিজের বেঁচে থাকাটাই সব থেকে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ”জানলা খুলোনা, ধুলো ঢুকবে” ”কাউকে এই বিছানায় শুতে দিও না, চাদর কুঁচকে যাবে”, ”এ ঘরে কেউ যেন না ঢোকে, পায়ে জুতোতে ময়লা ঢুকবে”; ”দরজা দিয়ে রোদ এলে সিল্কের পর্দার রং জ্বলে যাবে ”সোফার মধ্যে অতিথি বসলে ঘামের দাগ হবে” এই চিন্তায় কোনো গৃহকর্ত্রী ন্যাপথলিন গুলি ছড়িয়ে, ফিনাইল ছিটিয়ে, অন্ধকার বদ্ধঘরে বসে থাকেন, (”যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে…আছি রাত্রি দিবস ধরে দুয়ার আমার বন্ধ করে…ধুলায় একাকার”—রবীন্দ্রনাথের এই আধ্যাত্মিক গানটির শারীরিক ব্যাখ্যা করলেই এই মনোভাবটি স্পষ্ট হবে) অথবা বারবার স্নান করেন। অবশ্যই এই বর্ণনা অতিরঞ্জিত। কিন্তু এই দিকে যাবার একটা ঝোঁক তথাকথিত সু-গৃহিণীর মধ্যে বিরল নয়।

বুভোয়া আরো বলেছেন যে অনেক সময়েই ব্যস্ত বা প্রবাসী স্বামীর দ্বারা উপেক্ষিতা স্ত্রীগণ মাদক দ্রব্যের বদলে নেশার মতো ঘর সাজানো, ঘর গোছানো ইত্যাদিতে আসক্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের এই কর্মকে কর্ম বা অকর্ম না বলে বিকৃত কর্ম বা বিকর্ম বলাই বোধহয় ভালো।

আরো অনেক সূক্ষ্মবিচার ও অনুভবের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বুভোয়া দেখিয়েছেন যে ঘরকন্নার সব কর্মভেদই এই একই রকমের নেতিবাচক বা ক্ষয়কারক নয়। রান্নাবান্না ও স্বামীপুত্রকন্যার স্বাস্থ্যরক্ষার কাজ হয়তো আরো ইতিবাচক ও খানিকটা সর্জনাত্মকও হতে পারে। অথচ এই নিজের সংসারের ভেতরে গুটিয়ে থাকার ফলে তার যে নিভৃত একান্ত ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে তাকে ”ব্যক্তিত্ব” (individuality) বলে স্বীকৃতিই দেয় না কোনো সমাজ, আর সেও ক্রমে সে স্বীকৃতি চাইতে ভুলে যায়। কারণ সে একজন আত্মবিলোপকারিণী সেবিকা মাত্র।

স্বামীপুত্রকন্যার জন্য আত্মবলিদান ও (যদিও তারাই ওর ওপর নির্ভরশীল) তাদের ওপর নির্ভরশীলতার একটা রাজনীতি গৃহকর্মনিরতা বধূকে আচ্ছন্ন করেই রাখে—

“The cook’s moment of triumph arrives when she puts a successful dish on the table: The culinary alchemy then pursues its course. Food becomes chyle and blood, …Thus, to maintain living bodies is of more concrete vital interest than to keep a fine floor in proper condition; the cook’s effort is evidently transcended towards the future”.

সাধারণ ভাবে যত্নকর্মের (পিতৃতন্ত্র-প্রচারিত) হেয়ত্ব বা অর্থহীনত্ব মেনে নিয়েও বুভোয়া যেভাবে রান্নার কাজে বর্তমান-মাত্র-সীমিততা থেকে একটা মুক্তির আভাস দিয়েছেন—সেটিকেই পরবর্তী কালে আর একটু বিস্তারিত রূপে লক্ষ্য করেছেন সেই সব নারীবাদী যত্ন-নৈতিক দার্শনিকরা যাঁরা সেবাযত্নকে বলেছেন আদর্শমানবিক কৃতি।

স্পেলম্যান (Elizabeth Spelman) তাঁর একটি অনবদ্য প্রবন্ধ ”হাউসহোল্ড এ্যাজ আ রিপেয়ার শপ”-এ দেখিয়েছেন যে: শুধু গাড়ি বা বাথরুমের কল বা কমোড বা টেলিফোনের লাইনই যে ভেঙে বা বিকল হয়ে যায়, এবং তাকে মেরামত করতে হয় তা নয়। আমরা মানুষরা শুধু ভঙ্গুর জিনিসের জগতে বাস করি তা নয়—আমরা নিজেরাও ভঙ্গুর জিনিস। আমাদের শরীর ও আত্মা, স্বাভাবিক প্রকৃতির গঠন অনুযায়ীই, ভাঙন-সাপেক্ষ, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার দিকে তাদের প্রবণতা। আমরা যেহেতু সামাজিক জীব, আমাদের পরনির্ভরতার চেহারাটা নির্ভর করে নানান সম্পর্কের সুতোর ওপরে। সেই সম্পর্কবন্ধনগুলি ক্ষয়ে যেতে চায়, ছিঁড়ে যেতে চায়, কখনো সমূহ ভেঙে পড়ে, কখনো তাতে আমাদের ভালোই হয়, কখনো বা খারাপ হয়। চিরাচরিত মহিলাদের কাজকর্ম ও সামাজিক ভূমিকার ইতিহাস বিচার করলে দেখা যায় যে এই জাতীয় ক্ষয়-ভাঙন-ছিন্নতা-ধাক্কা—সম্বন্ধনাশের ”মেরামতি”র কাজ চলে মানুষের ঘরের ভিতরে, গৃহের নিরাপত্তার মধ্যে যেখানে স্বকীয়তার নির্মাণ, বিনির্মাণ, পুনর্নির্মাণ—এইসব কাজ চলে শারীরিক, পুষ্টিগত মানসিক, আধ্যাত্মিক, শৈক্ষিক, নৈতিক—সবরকমের স্তরে। আর এই কাজ প্রথাগত ভাবে করে এসেছেন মায়েরা, মেয়েরা, বৌয়েরা। ধরেই নেওয়া হয়েছে যে তাঁদের লিঙ্গগত ভূমিকা হল একাজে কুশল হওয়া —“for mending bodies and spirits frayed or broken by the wear & tear of life”.

কথা হল—এ কাজ তো কাউকে না কাউকে করতেই হবে। না করলে কারুরই জীবন চলবে না, ”উন্নয়ন” তো দূরের কথা। এ কাজ করতে বহু সময় লাগে, এর ”পুরস্কার” বা ”মুনাফা” স্বল্পসময়ে হাতে হাতে পাওয়া যায় না। এ কাজকে ”স্ত্রীলোকের কাজ” বলে অবমাননা করে অথবা ”স্ত্রীলোকের মত স্বার্থশূন্য ত্যাগব্রতিনীদেরই কাজ” বলে শ্রদ্ধার ছলে এড়িয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ”পৌরুষ” মানে যদি হয় ”সেবাযত্নকর্মে বিমুখতা বা অপারগতা” তাহলে সেই পৌরুষ—যতই বুদ্ধিদীপ্ত বা যুদ্ধমাতাল হোক, যতই রতিকুশল বা যন্ত্রনির্মাণবিশারদ হোক—মনুষ্যত্বহীনতার নামান্তর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *