৫. স্বাতন্ত্র্যবিচার : একটি দার্শনিক অক্ষরবৃত্ত পদ্য

স্বাতন্ত্র্যবিচার : একটি দার্শনিক অক্ষরবৃত্ত পদ্য

খিদে পেলে ডাল ভাত রুটি চায় লোকে

খেতে পেলে শুতে চায়, ভোগে রোগে শোকে।

তাই ব’লে ”ভাত” আর ”খাওয়া” ”শোয়া ”ভোগা”

—কাকে বলে তাই নিয়ে ভেবে ভেবে কেন হ’বো রোগা?

আরেক জিনিস আছে ভরাপেট মানুষেরও চাহিদার ধন

তার নাম স্বাধীনতা, শোনা যাচ্ছে, তাকে চায় সকলে—

—আবাল-বুড়ো স্ত্রীপুরুষ জন।

বাঞ্ছনীয় কোনো কিছু পেতে গেলে সে বস্তুর স্বরূপটি জানার দরকার,

কারণ বাঞ্ছার পৃষ্ঠভূমিতেও থেকে থাকে এটা নাকি ওটা নেবো—

এই স্বীয় নির্বাচনশক্তির আকার।।

যদিও একথা ঠিক বিদ্রোহী কবির মতে ক্ষুধাতুর শিশু চায় ভাত নুন

চায়না স্বরাজ

বড়দের ‘খিদে’ বেশ আপেক্ষিক, সয়েও খিদের কষ্ট

কারু কারু স্বাধীনতা চাওয়াটাই কাজ।

এও ঠিক ভাতের বদলে দিলে ”অন্নত্বে”র নির্দোষ লক্ষণ

কারোই মেটে না ক্ষুধা, অতিব্যাপ্তি অব্যাপ্তি করেও বর্জন

কাকে বলে ভাত জেনে গরিবের ভরে না তো পেট।

তবে, মধুমাখাবিষ লোভনীয় হলেও তা ত্যাজ্য এটা যে না বোঝে

সে ক্ষুধিত নিতান্ত নিরেট।

”বুঝতে চেওনা কিছু, এই নাও ধানের জমির পরিবর্তে দিচ্ছি স্বাধীনতা

লাল শালু মোড়া

বেকার ছেলেটি পাবে কল-সেন্টারের চাকরি—তুমি পাবে প্রশ্নহীন চিন্তাহীন

দাস্য-স্বাধীনতা আগাগোড়া”।

এহেন প্রচারে ভরে কিছু পেট, কিছু মাথা, তবু বাকি থেকে

যায় অনেক সওয়াল

‘ঝুটা’ কিনা এ ‘আজাদী’, —স্বাধীনতা সমস্যার ছুঁচ বেঁধে—

সেই ছুঁচ হতে পারে একদিন ফাল।

কাজেই স্বাতন্ত্র্য ঠিক কাকে বলে তা না জেনে তার লোভে কেন আঁকুপাঁকু?

অসাধ্য স্বাতন্ত্র্যলাভ, অথবা এখনি আমরা রয়েছি স্বাধীন—জেনে

অতঃপর খাওয়াও তো যেতে পারে সুগন্ধ তামাকু?

”স্বতন্ত্র”, ”স্বাধীন”, ”মুক্ত”, ”স্বরাট” এসব শব্দ

মোটামুটি যদি সমার্থক

তাহলে দেখাই যাক কী বা সেই আহামরি বাচ্যবস্তু

যার জন্য রক্তটক্ত ঢালাও সার্থক?

নেহাত নেতাজি খুবই ব্যস্তব্যক্তি

”রক্ত পেলে স্বাধীনতা দিতে পারি” বলেই খালাস।

যে বেচারা রক্ত দিলো—মরে গিয়ে স্বাধীনতা টের পায় নাকি তার লাশ?

অপরের জন্য প্রাণদান করা মহৎ কার্যই বটে;

কোনো কোনো শহীদের স্মৃতি তাই জাগে।

তবু, এই রামের জীবন বলিদান ক’রে শ্যামের স্বাতন্ত্র্য লাভে

কিন্তু কিন্তু লাগে।

যাকগে ওসব কথা, যারা সুখদুঃখ ঝগড়াঝাঁটি নিয়ে বেঁচে বর্তে আছি

সেরকম আমাদের মতো সাদামাটাদের কাজকর্ম বিষয়েও

”স্বাধীনতা” কোন অর্থবাচী?

আপাতত ভাবা যাক সে কথাই—তারপর ভাবা যাবে

প্রাণ দেওয়া ঠিক কিনা স্বরাজের নামে।

এই যে যা-ইচ্ছে-তাই করে লোকে, —যাচ্ছেতাই—,

ব্যাপারটি ভেবে ভেবে

ফিলজফারের মাথা ঘামে।।

লিখতে পারি, না-ও পারি, গদ্যের বদলে যদি ইচ্ছে হয়

পদ্য কিংবা ছাইপাঁশ লিখে যেতে পারি।

কেউ তো ধরেনি ঘাড়ে—আমি

এই কলমচালনা ক্ষেত্রে স্বচ্ছন্দবিহারী।

এরই নাম স্বাধীনতা। দমকা হাওয়ার মতো বাধাবন্ধহীন।

কখনো ঝড়ের বেগ, কখনো বা মন্দ মন্দ, কখনো গুমট স্তব্ধ

বাতাসের মতো নাকি মুক্ত মানুষের মন স্বরাট স্বাধীন।

এই উপমাটি শুনে মাথা নাড়ে

আবহাওয়া বিজ্ঞানের অধ্যাপক

ঘাঘু, সন্দিহান।

এলোমেলো হাওয়াটিও অমোঘ নিয়ম মানে প্রকৃতির

দাঁড়ান, দাঁড়ান!

এলোমেলো মনে হয় আমাদের কম জানা, না জানার বশে।

সেরকমই, স্নায়ুবিদ্যা মনোবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম জ্ঞানাভাবে নিয়মনিগড়বদ্ধ মানুষেরা

জেদের মুক্ত ভেবে বসে।

এই যে লিখছেন আপনি, মাঝে মাঝে থামছেন

এতো একটা প্রাকৃতিক সংঘটন-ই

মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে কলকাঠি নেড়ে।

সকল কার্যেরই থাকে কারণ, পুনশ্চ সেই কারণেরও

কারণ কলাপ চলে বেড়ে।

এই ভাবে আমরা তা জানি আর না-ই জানি

কার্যকারণের আছে জগতে, শরীরে, মনে,

অনিবার্য নিশ্ছিদ্র শিকল।

কী করে বাইরে তার হাত চলবে, ইচ্ছা হবে, চেষ্টা হবে, ক্রিয়া হবে?

—দেহযন্ত্র চমৎকার কল।।

এই খানে কিছুক্ষণ থামা যাক। শুধুই তর্কের তোড়ে ভেসে গিয়ে

দুটি কথা কী করে বা ভুলি?

হাড়ে হাড়ে টের পাই সংশয়ের দোলনাতে

যে মুহূর্তে দুলি

কী খাবো? ভাত না রুটি? নিয়তিবাদীর কথা মানবো কী মানবো না?

কবিতাটি লিখি বা না লিখি?

এই দ্বিধা, এই দুই ভাগ হয়ে ভাগদুটি ”অথবা”র

অবন্ধনে বাঁধতে যে শিখি

সে কী নয় স্বাধীনতা? অন্তত: ভাবার রাজ্যে

মানা না মানার ক্ষেত্রে না থাকলে এটুকু ফ্রীডাম,

”শোনো বাছা, মানুষ স্বাধীন নয়”—এই নির্ধারণবাদী

কথারই কী দাম?

দ্বিতীয় কথাটি হল আঙুল নাড়ানো আর আঙুলের নড়া

এই উভয়ের মাঝে আছে বিরাট ফারাক

পারকিনসনস রোগী নাড়ায় না তবু তার থরোথরো নড়ে হাত।

—তবে ভাবা যাক—

কী বা সেই অধিক মার্জিন যাতে নড়াই নাড়ানো হয়ে

আঙুলের মালিক-কে করে তোলে খুশি।

আঙুল আমার কথা শোনে, আমি

রসায়ন বৈদ্যুতিক নিসর্গের দাস নই

যতই না অক্সিজেন শুষি।।

”মানুষ স্বাধীন নয়—হতেই পারেনা। যথা অ্যামিবা ইত্যাদি”—

চালাকের মতো যেই যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন পূর্বনির্ধারণবাদী

শ্রোতাকে বোঝাতে চান—তিনি কি তড়িৎস্পর্শে

শ্রোতার মস্তিষ্কে এই মতটিকে ঢোকাতে উৎসুক?

তাতো নয়, মগজধোলাই নয়—তর্ক দিয়ে বোঝানোর

আছে অন্য সুখ।

শোনো বিপরীতপক্ষে যুক্তিগুলি, তারপর ভেবে চিন্তে

নিজের ইচ্ছেতে তুমি মানো বা

না মানো।

এও কী স্বাতন্ত্র্য নয়? বোঝা, মানা, যৌক্তিকতা স্বীকার করানো?

এতেও তো সংশয়ের ফাঁক আছে,

—কল্পনার মুক্তির জানালা আছে

কার্যকারণের অন্ধ কারাগারে কী করে সম্ভব?

এতেও কি স্বাধীনতাহীনতার ‘বৈজ্ঞানিক তত্ব’খানা

মানবে না চির পরাভব?

যেখানেই দ্বিধা আছে, দ্বন্দ্ব আছে,

সংশয়ের দোলাচল আছে,

সেখানেই স্বাধীনতা রয়ে গেছে—”অথবা”র ডালপালা

অনিয়ত বিকল্পের গাছে।।

পিঁপড়ে জাতিটি খুবই সুশৃঙ্খল মনে হয়,

সংঘবদ্ধ, সদাব্যস্ত কর্মঠও বটে

কেবল গুড়ের রসে নিমগ্ন থাকার কালে

পিঁপড়ের ব্যস্ততার অবসান ঘটে

অথচ একটি পিঁপড়ে স্বীয় গতিপথে যদি

পায় কোনো বাধা

তাহলে বিকল্প খোঁজে এদিকে সেদিকে ঘুরে

কখনো বা নেয় রাস্তা যেটি নয় আগে থেকে সাধা।

সন্দেশের যে বাটিতে লহমায়

যূথবদ্ধ পিপীলিকা দূরবাণী মিডিয়া ছাড়াই এসে জোটে

তারা তো ভেবেই কাজ করে বলে মনে হয়

তা না হলে হঠাৎ বাটিটি নাড়লে

কেন গণআতঙ্কের হট্টগোল ওঠে?

তখনো ছিটকে পড়া বিভ্রান্ত একটি কীট

কোন পথে পুনর্বার মাধুর্যে ফেরত যাবে

করে বিবেচনা

যদি বলো ”সেই সব বিবেচনা

মানুষ দর্শনকারী চাপায় কীটের ‘পরে

পোকাটির নিজস্ব বিবেক নেই, নেই গুণপনা”—

তাহলে মানুষ কেন নয় পিপীলিকাবৎ

অভ্যাস ও জৈবিক তাগাদাকেই

ভেবে নিয়ে বিচারবিবেক

কী করে নিশ্চিত হ’লে মহাজগতের এই

ছোট সৌরজগতের ক্ষুদ্রকীট নরজাতি

ধরেনি এ স্বাতন্ত্র্যের ভেক?

যা ভূত, যা ঘটে গেছে কখনো কি সে ঘটনা

না-ঘটার পরিবর্ত সম্ভাবনা রাখে?

অতীতেও বিকল্প বা স্বাধীনতা আছে এটা পাগলও ভাবেনা

শুধু সায়েন্স ফিকশনে ঘটে থাকে।

গত বছরের কেনা রঙিন টিভির স্থলে গতবছরেই করি

সে টাকায় অন্ধ ছেলেমেয়েদের উদার খয়রাত?

অতীতের এ-অথবা উদভট শোনায় খুবই

অনাগত কালেই তো স্বাতন্ত্র্যবোধের সূত্রপাত!

অথচ ঘটবে কিংবা ঘটবে না এই নির্মধ্যম নীতি

ভবিষ্যতে খাটবে না—কে বলেছে

সে কোন বিধাতা?

আজ যা ভবিষ্য তাই পরশু অতীত হবে।

—আমার বয়স, স্থিতি, মনোভাব বদলালে,

বদলাবে ঘটনার গণিতের খাতা?

যা হবার তাই হবে; হবে না তা, যা না-হবার।

হওয়া, করা, ঘটা, চাওয়া সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রে এ নিয়ম, বলবো ক’বার?

তবুও মাধবী দ্বিধা বোধ করে, কথার কম্পিত শীর্ষে দুলে চলে

সংশয়ের বিকল্পের দোল।

সাতটি অমরাবতী সেই দোলযাত্রাকালে কল্পনার আবীর ছড়িয়ে বলে

খোল দ্বার খোল।

রাজনীতি ব্যবসায় মিথ্যা স্বাতন্ত্র্যের কতো বিজ্ঞাপনে ঢাকে

সেই সংশয়ের মুখ।

নিসর্গ নিয়ম মেনে স্মৃতি পিপীলিকা চলে,

প্লেটোর গুহায় মায়াশৃঙ্খলিত জীব ভাবে

এ শিকলই স্বাধীনতা সুখ।

স্বাধীনতা আছে কি না আছে নিয়ে গুহামুখে তর্ক বাঁধে।

সূর্যালোকে ধাঁধায় শৃঙ্খলমুক্ত তাত্বিকের চোখ।

তবে কি ”আঁধারই ভালো?” অসংখ্যবন্ধন মাঝে মুক্তিময়

মানবদৃষ্টির বড় ক্ষতি করে সত্যের আলোক?

তর্কাতর্কি দুপক্ষেই করে, তবু কল্পনা ও ভাবনায়

থাকে খুঁতখুঁত

অনুশোচনায় ভাবি: এ কাজের পরিবর্তে ওই কাজও করা যেত

এও তো অদ্ভুত।

যতদিন এর দোষ, ওর গুণ, এর ওটা অন্যায় হয়েছে করা

ইত্যাকার থাকবে ভাবনা

ততদিন অদৃষ্ট বা নির্ধারণবাদের দোহাই দিতে

আমরা যাবো না।

ততদিন দায়িত্ব নিতেই হবে—নিজের কাজের—

তা-সে কৃত হোক, হোক করণীয়।

দায়িত্ব নেওয়ারই এক নামান্তর স্বাধীনতা,

শ্রান্ত সিসিফাস নয়,

অশেষদায়িত্ব গিরিধারী আমি কৃষ্ণ রমণীয়।

ভবিষ্যৎ জানা নেই, কিন্তু এই অজ্ঞানের বোধ আছে

—আছে আরো ভালো-তর হবার উচ্চাশা।

বই লেখা হয়ে আছে পাতাই ওল্টাচ্ছি, নাকি

আমারই কর্মের কালি

দিয়ে লেখা অদৃষ্টের ভাষা?

আবার সে ‘নাকি’ সুর? স্বাধীনতা আছে নাকি নেই—এতো

প্রশ্নই আবার হল, দুত্তোর! দুত্তোর!

প্রথম দিনের মতো শেষের দিনের সূর্য বেচারাও

পেল না উত্তর।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *