৪. প্রমোশন অফিসার

০৪.

 কাবাডিয়া অ্যাণ্ড লাখোটিয়া কর্পোরেশনের ফরেন সেলস প্রমোশন অফিসার সুনীথ ব্যানার্জি তার চেম্বারে বসে ফোন করছিল। তখন বিকেল সাড়ে চারটে। চৌরঙ্গির এই বাড়িটা সতেরো তলা। স্কাইক্র্যাপার যাকে বলে, তাই। তেরো তলায় এই কোম্পানির বিরাট অফিস। ইলেকট্রনিক্স সংক্রান্ত জিনিস বিদেশে রপ্তানি করাই মুখ্য কারবার। সুনীথ ফরেন সেল এর চার্জে। তার প্রকৃত নাম সুনীত। কিন্তু কবে একবার কোন বিদেশি কোম্পানি ভুল করে তার নামে টি অক্ষরের পাশে এইচ বসিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে সে সুনীথ হয়ে গেছে।

–হ্যালো! দয়াময়ী ট্রডিংস? মিঃ মৈত্র নাকি? আমি সুনীথ ব্যানার্জি বলছি। হা…আগামী পরশুই তো ডেলিভারি ডেট।…ঠিক আছে। অসুবিধে হবে না। এখনও সময় আছে হাতে।..কী বললেন?..হাঃ হাঃ হাঃ! দ্যাটস মাচ। ইয়ে মিঃ মৈত্র, সেনের খবর কী?.আই সি! ঠিক আছে। মুখোমুখি দেখা হলে সব শুনব। আসছেন তো পার্টিতে?…হ্যাঁ অবশ্যই আসুন..না, তোরা আসছে না। ওর। শরীরটা ভাল নেই।…হাঃ হাঃ হাঃ! ও নো, নো, মিঃ মৈত্র! ওসব কিছু না। ঠিক আছে। দেখা হবে। উইশ ইউ গুড লাক। থ্যাং!

সুনীথ ফোন রেখে দিল। কিন্তু হাতটা তুলল না তখুনি। কয়েক মুহূর্ত ওভাবে চুপচাপ বসে রইল। তারপর বাঁহাতে টেবিলে আটকানো একটা বোতাম টিপল। রেয়ারা এসে সেলাম দিল।

মিস চ্যাটার্জি!

বেয়ারা চলে গেল। সুনীথ পাইপটা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হল। সকাল থেকে আজ মন-মেজাজ ভাল নেই। প্রচণ্ডভাবে তাল কেটে গেছে দিনের শুরুতেই। তাকে বাইরের নানান সমস্যার ঝামেলা সব সময় পোয়াতে হয়–সেটা সয়ে গেছে। কিন্তু আজ সমস্যা ঢুকে পড়েছে তার ঘরেই! বোকা আহাম্মক একটা অর্ধশিক্ষিত লোক তাকে আজ সকালে অপমান করে গেছে! ঘটনাটা ঘটেছে ভোরার সামনেই। ভোরা তার স্ত্রী। গতবছর রোমে গিয়ে ভোরার সঙ্গে আলাপ এবং প্রেম। তারপর সুনীথ একা ফিরেছিল। ছমাস আগে ভোরা হঠাৎ লিখল, আমার মা বাবা রাজি। আমি পাকাপাকিভাবে যাচ্ছি। সব রকম পরিস্থিতির জন্যেই তৈরি হয়ে যাচ্ছি। তুমি বোম্বের সান্তাক্রুজ এয়ারপোর্টে থেকো …

তারপর সত্যিই ভোরা এল এবং স্ত্রী হয়ে গেল। কিন্তু ইটালির মেয়েদের মানসিক গঠনের সঙ্গে বাঙালি মেয়েদের যে এত মিল আছে, সে ভেবে দেখেনি। ইটালির পাড়াগাঁর মাঠঘাট প্রকৃতি সে দেখে এসেছে। পরে মনে পড়েছিল, বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে তার বড় বেশি মিল। আর ইটালি তো উন্নত দেশ নয়। ভারতের অনেক আর্থিক সমস্যা অবিকল সেখানে রয়েছে। কাজেই ইটালিয়ান মেয়ের সঙ্গে এদেশের–বিশেষ করে বাঙালি মেয়ের আবেগ প্রায় একই রকম হবে। তাও স্বাভাবিক।

কিন্তু যা হবার তা তো আজ সকালেই হয়ে গেল! ভোরা অল্পস্বল্প বাংলা বলতে পারে–বোঝে অনেক বেশি। গার্গীর বাবা তার সামনেই চেঁচামেচি করে গেল। ভোরা না থাকলে লোকটাকে চাবুক মেরে শায়েস্তা করে ফেলত।

কে এই গার্গী! সাদাসিধে সাধারণ মেয়ে। আপাতদৃষ্টে তার মধ্যে কোন চার্ম নেই। সামাজিক মর্যাদায় সুনীথের চেয়ে একশো ধাপ নিচুতে আছে বলা যায়। তার সঙ্গে প্রেম! হাস্যকর আর উদ্ভট ব্যাপার। সুনীথ বড়জোর খান তিনেক ইনল্যান্ড এ অব্দি লিখেছিল–নিছক ওর বাঙালি মহিলাসুলভ সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিতে! ওটা কোন গভীর ব্যাপার নয়। সুনীথের এই একটা ভাল বা মন্দ অভ্যাস আছে। সে মেয়েদের প্রতি অসম্ভব ভদ্র আচরণ করে। তার সুদর্শন চেহারা বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব মেয়েদের সহজেই আকৃষ্ট করে আনে। তারপর তেমনি সহজেই পতঙ্গের মতো পুড়ে মরে। গার্গীর সঙ্গে মৈত্রের বাড়িতে আলাপ হয়েছিল। তারপর আরও বার কতক মৈত্রের মারফত দেখাসাক্ষাৎ এবং একসময় সুনীথ গার্গীকে নিয়ে তার অভ্যাসমতো খেলতে গেল। গার্গী যেন কয়েক মিনিটের মধ্যে ধরা পড়ল তার হাতে।

না, সুনীথ তার প্রেমে পড়েনি। সে তাকে নিছক লীলাসঙ্গিনী হিসেবেই চেয়েছিল। তবে মেয়েটা এসব মৌলিক ব্যাপারে বড় সাবধানী–যেন অ্যালার্জি আছে। তাকে নিয়ে বাইরে কোথাও যাওয়া কিংবা অগত্যা হোটেলবাসও সম্ভব হয়নি।

কিন্তু মাখামাখি করতে গিয়েই সুনীথ একদিন চমকে গিয়েছিল। গার্গীর সে এক আলাদা চেহারা। মনে মনে খুবই ভড়কে গিয়েছিল সুনীথ। কিন্তু মুখে স্মার্টনেস বজায় রেখেছিল। মেয়েটিকে যত সহজ ভেবেছিল, তা নয়। তারপর থেকে সে অ্যাপ্রোচের ভঙ্গি বদলেছিল। কিন্তু…।

মিস চ্যাটার্জি এল। রুবি চ্যাটার্জি। সুনীথ বলল, বসো।

রুবির বয়স অনুমান করা কঠিন। আপাতদৃষ্টে পঁচিশের এদিকেই মনে হয়। নিজের চেহারায় প্রাকৃতিক যে সেকসি ভাব আছে, সে তা আরও উগ্র করতে পটু। তার দিকে না তাকিয়ে উপায় থাকে না পুরুষ মানুষের। মার্কেটিং সেকশনের সুপারভাইজার সে। একটু হেসে বসল। তারপর ভুরু কুঁচকে বললজাস্ট এক মিনিট পরেই বেরুচ্ছিলুম।

তাই বুঝে! ভেরি সরি রুবি! …বলে সুনীথ ঘড়ি দেখল। তারপর বলল, তুমি তো আজ পার্টিতে থাকছ?

–হ্যাঁ, কেন?

–হয়তো আমার যাওয়া হচ্ছে না।

–সে কী!

–একটু আগে মৈত্রকে ফোন করেছিলুম। ইউ নো হিম। দয়াময়ী ট্রডিংস এর! ওকেও বললুম, যাব। কিন্তু তারপর মনে পড়ল-আজ ইভনিংএ একটা জরুরি প্রোগ্রাম আছে।

রুবি হাসল।–বউঘটিত?

সুনীথ হেসে বলল–ভ্যাট! ভোরা ইজ অলরাইট।

–দেন?

–তুমি মৈত্রকে আমার একটা চিঠি পৌঁছে দেবে প্লিজ রুবি। খুব কনফিডেনসিয়াল চিঠি। তোমাকে আমি বিশ্বাস করি। সুনীথ সাদাকাগজের প্যাড টেনে নিল। লিখতে গিয়ে রুবির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ফের বলল।

আমার মান-মর্যাদার সঙ্গে জড়িত আছে চিঠিটা। মাইন্ড দ্যাট প্লিজ! এবং মৈত্রকে চিঠিটা গোপনেই দেবে। কেউ যেন না দেখে!

রুবির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে গম্ভীর মুখে বলল–চিঠির বক্তব্য ফোনে বলা যেত না বুঝি?

ঘাড় নেড়ে সুনীথ বলল–না। তাছাড়া মৈত্রকে আর এখন পাওয়াও যাবে না। ফোন করার সময় ও বলল, বেরিয়ে যাচ্ছে। একেবারে হোটেল ডিলুকসের পার্টিতে হাজির হবে। বাড়িতে ওকে পাওয়া যাবে না। তুমি তো জান, সে কী ব্যস্ত লোক!

রুবি নিচের ঠোঁটের কোনা কামড়ে নিজের সুদৃশ্য রক্তিম নখগুলো দেখতে দেখতে বলল–ইউ আর এ ভেরি মিট্রিয়াস ম্যান, সুনীথ!

সুনীথ খুক খুক করে হাসল মাত্র। চিঠিটা খুব ছোট। দ্রুত লিখে ভাঁজ করে একটা খামে ভরল। তারপর গ্লাসের জল নিয়ে খামের মুখের আঠাটা ভিজিয়ে এঁটে দিল। খামের ওপরে লিখল : মিঃ আর মৈত্র, অফ দয়াময়ী ট্রেডিং কর্পোরেশন। কোনায় লিখল, প্রাইভেট। তারপর খামটা রুবির দিকে এগিয়ে হাসতে হাসতে বলল-উইশ ইউ গুড লাক। এর জন্যে পুরস্কার পাবে, রুবি।

রুবি ঠোঁট বাঁকা করে বলল, তোমার পুরস্কারে অরুচি ধরে গেছে।

–সত্যি নাকি?

 রুবি খামটা তার ব্যাগে ভরে রাখল। কোন জবাব দিল না।

–আমার ওপর অরুচি ধরেনি তো, রুবি?

এবার রুবি হাসল।আমি তো রাক্ষুসী নই যে নরমাংস খেয়ে বেঁচে আছি!

–আমাকে এক কামড় খেয়ে দেখতে পার তাহলে! টেস্ট মন্দ নয়।

 –ভ্যাট! অসভ্য!

–রুবি, এখন তুমি কি বাড়ি ফিরবে সোজা?

–হয়তো। কেন?

বাড়ি থেকে পার্টিতে যাবে তো?

 –হ্যাঁ, কেন?

–আমি তোমার ওদিক হয়েই যাব। পৌঁছে দিতে পারি।

 রুবি ঘড়ি দেখে বলল–পার্টি তো আটটার আগে নয়। আমার ইচ্ছে ছিল, আমার এক মাসতুতো দিদির ওখান হয়ে ঘুরে বাড়ি যাব। অসুস্থ। একবার দেখে আসা উচিত। কিন্তু বড্ড দেরি হতে পারে।

সুনীথ ব্যক্তভাবে বললনা, না। পার্টিতে তোমার থাকা চাই-ই। মিঃ কাবাডিয়া অমন করে বললেন তোমাকে!

রুবি হেসে বলল- হ্যাঁ, রুজির মালিকের আদেশ অমান্য করার সাহস নেই, জানি। যদিও তোমার সেটা আছে। তুমি আমার অনেক ওপরে। তুমি পারো তা।

আজ পার্টিতেই নিজের ভবিষ্যৎ তুমি নিজেই তৈরি করে নিতে পারো রুবি। মাইন্ড দ্যাট।

কীভাবে বলতো?

জুনিয়ার কাবাডিয়া স্টেটস থেকে ফিরল। মনে হচ্ছে, তার জন্যে আলাদা চেম্বার খোলা হবে অফিসে, নানামহলে চেনাজানার প্রাথমিক কাজটা এই পার্টি থেকেই পত্তন করা হচ্ছে। তুমি সহজেই ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারো! তোমার চোখে স্বর্গের ছবি আছে।

–ভ্যাট! ফের অসভ্যতা।

 সুনীথ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল তুমি তো জানো, আমার মধ্যে একজন প্রিমিটিভ ম্যান আছে–সে কোনদিনই সভ্য হবে না!

–আমি উঠি।

সুনীথ তক্ষুনি উঠে দাঁড়াল। সরি। চলো আমিও বেরুচ্ছি। তোমাকে। পৌঁছে দিয়ে চলে যাব। অবশ্য সেজন্যে কোন পুরস্কার দাবি করব না!

রুবিও হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল।–দেবার মতো পুরস্কার আপাতত কিছু নেই।

একটু পরে দুজনে লিফটের সামনে লাইন দিল। লিফট অটোমেটিক। কিছুক্ষণ পরে ওরা নিচে নামল। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সুনীথ তার গাড়িতে চাপল। সে নিজেই ড্রাইভ করে। ড্রাইভার রাখেনি। রুবি তার বাঁপাশে বসল। গাড়ি গেট দিয়ে বেরিয়ে বড়রাস্তায় পড়ল।

রুবি বলল–আমি চিঠিটা মৈত্রকে দিলুম কি না, কীভাবে টের পাবে?

–মৈত্রকে ফোন করলেই।

কিন্তু মৈত্রও যদি তোমার মতো কাট করে পার্টি থেকে?

–মৈত্র আসবেই। ওর স্বার্থ প্রচণ্ড বেশি।

কথা কথা বলছি। যদি দৈবাৎ না আসে, কী করব?

–তোমার কাছে রেখে দেবে এবং…

 হঠাৎ তাকে চুপ করতে দেখে রুবি বলল কী হল?

গাড়ির গতি কমিয়ে দিল সুনীথ। বলল–মাই গুডনেস! তোমাকে আসল কথাটা বলাই হয়নি। আমি হঠাৎ একবার বাইরে যাচ্ছি। আজই। ফিরতে দুতিন দিন দেরি হবে।

–অফিসের কাজে?

–না। পার্সোনাল।

—-নিশ্চয় জানাওনি কাবাডিয়াকে?

সুনীথ হাসল।–না। তাহলে বেঁকে বসত বুড়ো। তুমি কিন্তু ফাঁস করো না লক্ষ্মীটি! ভোরাকে বলে যাব–ম্যানেজ করে ফেলবে।

-তাহলে ডিসিসানটা হঠাৎ নিয়েছ মনে হচ্ছে!

—-দ্যাটস রাইটি রুবি।

—কিন্তু ব্যাপারটা কী খুলে বলবে?

সুনীথ ঘড়ি দেখে বলল হাতে সময় বড় কম। তোমাকে পৌঁছে এক জায়গায় জরুরি কাজ সেরে যাব বাড়িতে। ওখান থেকে ঝটপট বেরিয়ে পড়ব। তবু যতটা পারি সংক্ষেপে বলছি কারণ, তোমাকে আমি বিশ্বাস করি, রুবি।

–অত আবেগ দিয়ে কথাটা বললে আমার বুক ছাঁৎ করে ওঠে কিন্তু।

—কেন?

–তুমি বিবাহিত পুরুষ, তাই।

-নো, আই অ্যাম..কী বলব? …ইটান্যাল ব্যাচেলর! ওয়েটিং ফর মাই ব্রাইড!

–কে সে?

 সুনীথ একটু হেসে ওর দিকে তাকিয়ে বলল–যদি বলেই ফেলি, তুমি!

রুবি হাসতে গিয়ে গম্ভীর হল–অ্যাকসিডেন্ট করবে। ঠিকমত ড্রাইভ করো।

না, আমি ড্রিঙ্ক করিনি। তোমার ভয়ের কারণ নেই।

একটা চুপ করে থাকার পর রুবি বলল–ভোরা ইজ এ ভেরি গুড গার্ল। বিউটিফুল উওম্যান, অ্যাকমপ্লিজড!

–নো। ভোরা ইজ এ প্রব্লেম। আমার লাইফ শালা হেল হয়ে গেল!

 –আবার ঝগড়াঝাটি করছ বুঝি?

 –তেমন কিছু না। প্রতিদিন যা হয়।

 যাকগে, যা বলছিলে–বলো!

সুনীথ ঠোঁট কামড়ে একটু চুপ থাকার পর বলল ব্ল্যাকমেলিং কাকে বলে জানেনা তো?

জানব না কেন? …রুবি চমকে উঠে বলল।–তোমাকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছে নাকি?

-হ্যাঁ। ভোরাই তার মূলে। তার মানে, ভোরার বোকামির জন্যেই আমার। ব্ল্যাকমেলার সুবিধে পেয়েছে। যাই হোক, শিগগির এর একটা শেষ নিষ্পত্তি করে ফেলতে চাই। আজই নিষ্পত্তির ব্যাপারটা শুরু হয়েছে। একটা ফাঁদ তৈরি করেছিলুম অনেক যত্নে।

ফাঁদে পাখি পড়েছে। এবার হেস্তনেস্ত।

 রুবি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। বলল–কিছু বুঝলুম না।

–পরে সব ক্লিয়ার করব। ভালয়-ভালয় ফিরে আসি।

–কিন্তু যাবে কোথায়?

মোহনপুরে!

রুবি অবাক হয়ে বলল–মোহনপুরে! ওখানে তো আমাদের কোম্পানির কারখানা রয়েছে। কোম্পানিও এ ব্যাপারে জড়িত আছে বুঝি?

জড়িয়ে পড়েছে। যদিও কোম্পানি এখনও টের পায়নি ব্যাপারটা। টের পেলে কাবাডিয়া লাখোটিয়া দুজনেই মরবে।

–তুমি ওঁদের জানাচ্ছ না কেন?

জানাচ্ছি না। কারণ এ ব্যাপারে ওদের কোন হাত নেই। ওদের অগোচরে ওই শুওরের বাচ্চা মৈত্রের ফুসলানিতে আমি গুড-উইলটা কাজে লাগাতে গেছি। গিয়েই বিপদে পড়েছি। কোম্পানি টের পেলে খুব খারাপ হবে স্বভাবত। আমার চাকরি যাওয়ার কথা পরে রইল, গুণ্ডা দিয়ে আমাকে খুন করবে কাবাডিয়া, লাখোটিয়া। ওদের সর্বনাশ হয়ে যাবে যে! ইমপোর্ট লাইসেন্স তক্ষুনি ক্যান্সেল হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো এসে হামলা করবে। সে একটা তুমুল কাণ্ড হবে!

রুবি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ছিল। বলল–তুমি আমাকে এতে জড়াচ্ছ!

-প্লিজ রুবি। তোমাকে একটুও জড়াচ্ছি না। তোমার কাজ শুধু এই চিঠিটা মৈত্রকে দেওয়া–আজ রাতের পার্টিতেই এটা মৈত্রের হাতে পৌঁছানো চাই। ব্যস, তোমাকে আর কিছু করতে হবে না। যদি দৈবাৎ মৈত্র না আসে, তুমি রেখে দেবে। যদি এমন হয় যে আমিই আর ফিরলুম নানষ্ট করে ফেলবে!

রুবি আরও পেয়ে বলল–সে কী! কী বলছ তুমি!

ম্লান হাসল সুনীথ।–সব রকম সম্ভাবনার কথাই বলছি। জীবনে তো কত কী ঘটে! যাকগে–এসে গেছি।

— গাড়ি একটা দশতলা বাড়ির গেটে ঢুকল। লনে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে দাঁড় করাল সুনীথ। রুবি নামল। কিন্তু দাঁড়িয়ে রইল। সুনীথ বলল–চলি রুবি।

রুবি দ্রুত গাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে ওর কাছে গিয়ে বলল প্লিজ সুনীথ! আমাকে এভাবে একরাশ ভাবনার মধ্যে ফেলে চলে যেও না! অন্তত মিনিট দশেকের জন্য এস। জাস্ট এক কাপ কফি খেয়ে যাবে।

সুনীথ ঘড়ি দেখে নিয়ে একটু হাসল।ঠিক আছে। তোমার খাতিরে। কিন্তু দশমিনিটের বেশি নয়।….

দুজনে লিফটে করে পাঁচতলায় পৌঁছাল। চারশো তিন নম্বর ফ্ল্যাট রুবির। রুবি ফ্ল্যাটটা কিনেছে। ওর মাকে নিয়েই থাকত। মা দুমাস আগে মারা গেছেন। এখন একলা থাকে। ওর বাবা ছিলেন মিলিটারি অফিসার। চীনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মারা যান। রুবি এখন বুঝতে পারে বিয়ে করাটা জরুরি হয়ে উঠেছে। অথচ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ওরা। এ ফ্ল্যাটে সুনীথ অনেকবার এসেছে। রুবি একজন পার্টটাইম পরিচারিকা রেখেছে। সে ভোরে আসে, রুবি বেরোলে সে চলে যায়। আবার আসে সন্ধ্যা ছটায়। রাত নটার আগেই চলে যায়।

দরজা বন্ধ করতেই সুনীথ হঠাৎ রুবিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। রুবি বলল–আঃ! এজন্যে আমি ডাকিনি!

সুনীথ ওকে ছেড়ে দিয়ে বলল–তবে কি করুণা করে?

ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে রুবি কিচেনের দিকে এগিয়ে বলল–লক্ষ্মী– ছেলের মতো জানলা খুলতে থাকো। ফ্রেশ এয়ার পাবে।

–তোমার ঘরে এয়ার কুলার থাকা উচিত।

রুবি কিচেন থেকে জবাব দিল–এই নিয়ে একশো একবার কথাটা বললে। তুমিই একটা প্রেজেন্ট করো না দেখি!

–ঠিক বলেছ। আমারই উচিত ছিল প্রেজেন্ট করা। আমি প্রমিজ–দেব।

–খুব হয়েছে।

রুবি কিচেন থেকে বেরিয়ে প্রিভিতে ঢুকল। সুনীথ একটা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিল। হঠাৎ টের পেল, পাইপটা গাড়িতে পড়ে আছে। একটু পরে রুবি বেরিয়ে বেডরুমে ঢুকল। সুনীথ বলল–চারমিনিট খরচ হয়ে গেল কিন্তু।

রুবি শাড়ি ছেড়ে একটা নীলচে ফুলহাতা শেমিজ পরে ফের কিচেনে চলে গেল। পর্দার ফাঁকে সুনীথ দেখতে পেল, সে পারকোলেটারে কফি তৈরি। করছে। হঠাৎ তার এই এসে পড়াটা নিজের কাছে এত ভাল লাগল যে, সুনীথ রেডিওগ্রামের দিকে এগিয়ে গেল। যে লংপ্লেয়িং অ্যাডভেঞ্চার চাপানো ছিল সেটাই বাজিয়ে দিল। ঘর ভরে গেল সঙ্গীতে। রুবি কফি আর স্ন্যাকসের ট্রে এনে হেসে বলল হ্যাঁ। মুড রিল্যাকস করে নাও। সেজন্যে আরও দশমিনিট খরচ করলে এমন কিছু ক্ষতি হবে না তোমার। এখন তো মোটে পাঁচটা কুড়ি হয়েছে।

সুনীথের পাশে এসে বসল। কফি ঢালতে থাকল পট থেকে। সুনীথ একটা হাত ওর কাঁধে তুলে জড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতে বলল কুড়ি-পঁচিশ নয়। অনন্তকাল তোমার সঙ্গে এভাবে কাটাতে পারলে সুখী হতে পারতুম রুবি। রিয়্যালি, তোমার দুচোখে শুধু নয়, তোমার সারা অস্তিত্বে তোমার এই ঘরে সবকিছুতে স্বর্গ আছে। আই জাস্ট ফিল ইট, বাট আই অ্যাম নাও ইন দা হেল অফ এ মেস!

–আঃ পড়ল তো!

সুনীথ আবেগে বলল–থাক। কফি রাখো। তারপর দুহাতে ওকে ঘোরাল। চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল। রুবির ঠোঁটে শান্ত হাসি। বশ মেনে গেছে সঙ্গে সঙ্গে–অন্ততঃ সুনীথকে অস্বীকার করার মতো মনোবল তার। নেই।

সুনীথ ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখল। রুবি আর বাধা দিল না। তারপর সুনীথই মুখ সরিয়ে নিয়ে বিকৃতমুখে বলল–আমার শালা লাইফ! ব্যালান্সটাই নষ্ট হয়ে গেছে। রুবি, কফির বদলে যদি অন্য কিছু অফার করতে!

রুবি শান্ত হেসে মাথা দোলাল–আমি তো ড্রিঙ্ক করিনে, তুমি জানো।

–পার্টিতে করো!

কদাচিৎ। নেহাত ফর্মালিটি।

 –হবে। তোমার কাছে নিভৃতে কখনও ড্রিঙ্ক করে আসিনি। কারণ মেয়েদের এ ব্যাপারে কার কী রিঅ্যাকশান হবে, আমি বুঝিনে। তাই রিস্ক নিইনে।

রুবি চটুল হেসে বলল–তুমি সব প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করো। আমার এখানেই তোমাকে ড্রিঙ্ক করার লিবার্টি দিলুম।

সুনীথ আবার ওর গালে সশব্দে চুম্বন করে বলল–এমন সময় এই অফার পেলুম, যখন আমি…

–থামলে যে?

 –থাক। দাও, কফিই খাই।

 রুবি আবেগের তাপে চঞ্চল হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। কিন্তু সুনীথ আশ্চর্যভাবে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। নিঃশব্দে দুজনে কফি খেতে থাকল। মাঝে মাঝে আলতো আঙুলে কিছু স্ন্যাক্স।

শেষ চুমুক দিয়ে সুনীথ উঠে দাঁড়াল। অনেক দেরি হয়ে গেল। ক্ষমা করো, রুবি। আসি তাহলে।

সে দরজার দিকে এগোল। রুবি উঠে গেলে সে ঘুরে দাঁড়াল। রুবির কী যে ইচ্ছে করছিল এখন তার মুখে সেই ইচ্ছের আবেগ যেন টলমল করছে। তার শরীর কাঁপছে। সে আস্তে শুধু বলল–সুনীথ!

–আই লাভ ইউ, রুবি। ফর হেভনস সেক! বাট প্লিজ ডোন্ট ট্রাই টু সিডিউস মি নাও। আচ্ছা চলি।

রুবির চোখদুটো মুহূর্তে জ্বলে উঠল। ক্ষোভে–হয়তো নিজের এই হঠকারী আবেগময় ইচ্ছেটা নতুন করে টের পেয়েই। সে কিছু বলল না।

সুনীথ বেরিয়ে গেল। সে দরজায় পিঠ রেখে কয়েক মুহূর্ত ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর শান্তভাবে সোফার দিকে এগোল কিন্তু তার মনে তখনও সেই হঠকারী প্রাকৃতিক ঝড় চলছে। ব্যর্থ বাঘিনীর হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে অবচেতনার অন্ধকার অরণ্য থেকে। কতক্ষণ বসে থেকে সে নিজেকে দমন করতে পারল। তারপর ব্যাগ খুলে সুনীথের খামটা বের করল। একটু ইতস্ততঃ করল রুবি। তারপর খামটা নিয়ে কিচেনে গেল। জলে খামের মুখ ভিজিয়ে নিয়ে ড্রইং রুমে ফিরল। তারপর একটা আলপিন দিয়ে সাবধানে মুখটা খুলতে থাকল।

চিঠিটা বের করে ভাজ খুলে সে দেখল, ইংরেজিতে যা লেখা আছে তার মানে দাঁড়ায় ও মৈত্র, আমিও হঠাৎ মোহনপুরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলুম। রিজার্ভেশন ক্যান্সেল করাইনি ভাগ্যিস। ফিরে এসে সব জানাব। সেনকে বিশ্বাস করা কঠিন। জিরো আট নয় সাত।

এই সময় দরজায় কে বোতাম টিপল। মিঠে শব্দ তুলল ঘণ্টা ঝটপট চিঠিটা খামে ঢুকিয়ে মুখ এঁটে ব্যাগে ভরে ফেলল রুবি। সুনীথই কি কিছু বলতে ফিরল? পরিচারিকা মারিয়াম্মার এখনও আসার সময় হয়নি। তাহলে নিশ্চয় সুনীথ।

সে দরজার কপাটের ফুটোয় চোখ রেখে আগন্তুককে দেখার দরকার মনে করল না। তার বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে সুনীথই কিছু বলতে ভুলেছে। তাই সে দরজা খুলে দিল। অমনি দুজন লোক তার ঘরে ঢুকে পড়ল। একজন তার বুকে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে বলল-চুপ! অন্যজনের হাতেও রিভলভার। সে দরজায় পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। অচেনা দুজন লোক।

–সুনীথ ব্যানার্জির চিঠিটা চাই। শিগগির!

ভয়ে রুবি কাঠ হয়ে গিয়েছিল। ইংরেজিতে কথা বলছে লোকটা। চেহারা দেখে অবাঙালি মনে হয়। সে রিভলবারের নলটা রুবির হার্টে রেখে চাপ দিয়ে ফের বলল–অটোমেটিক। গুলি বেরিয়ে যাবে। ঝটপট দাও!

রুবি আঙুল তুলে ব্যাগটা দেখিয়ে দিল।

লোকটা ব্যাগের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর ব্যাগ খুলে খামটা বের করল। খামের মুখ খুলে চিঠিটায় দ্রুত চোখ বুলিয়ে সে দ্বিতীয় লোকটার দিকে চোখের ইশারা করল। দ্বিতীয় লোকটা এগিয়ে এসে রেডিওগ্রামের আওয়াজ চড়িয়ে দিল।

তারপর সে ঘুরে রুবিকে বলল–পুলিশে গেলে মারা পড়বে। মুখ বন্ধ করে রাখবে। সাবধান। মৈত্রও জানবে না।

ওরা বেরিয়ে গেলে কয়েক মুহূর্ত সম্বিৎহারা অবস্থায় রুবি দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথা ঘুরছিল। সে সোফায় বসে পড়ল। কতক্ষণ দুহাতে মাথাটা ধরে বসে রইল। এক সময় মুখ তুলে বড় একটা নিশ্বাস ফেলল।

স্বপ্ন দেখল না তো?

না, স্বপ্ন নয়। সবই বাস্তব। কিন্তু সুনীথকে কী ভাবে ব্যাপারটা জানাবে? ওরা শাসিয়ে গেল। আর সুনীথকে পাচ্ছেই বা কোথায়?

হ্যাঁ, হাওড়া স্টেশনে মোহনপুরের ট্রেন কখন ছাড়ে জেনে নিলে…

কিন্তু সে-সাহস আর রুবির হচ্ছে না। সে একটা পিলোয় মাথা রেখে, সোফায় শুয়ে পড়ল। পার্টিতে সে কিছুতেই যাবে না। চাকরি ছেড়ে দেবে বরং। …রেকর্ডটা বেজেবেজে একসময় থেমে গেল। কতক্ষণ পরে দরজায় ফের ঘণ্টা বাজল। বুক ধড়াস করে উঠেছিল। কিন্তু ঘণ্টা তিনবার বেজেছে। তার মানে মারিয়াম্মা। ঘড়ি দেখল, এর মধ্যে ছটা বেজে গেল!